ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার: প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য হয়রানিমুক্ত সেবার দুয়ার

Send
হিটলার এ. হালিম
প্রকাশিত : ১২:২০, এপ্রিল ০৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৪, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৮

যশোরের আরবপুর ডিজিটাল সেন্টারকেস স্টাডি-১
যশোর সদরের বড় ভেকুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা মাসুরা বেগম (৪৭)। আরবপুর ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের (ইউডিসি) উদ্যোক্তা আরিফুজ্জামানের তৈরি ‘গ্রামের হাট’ নামের একটি ই-মার্কেটিং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তিনি এখন প্রতিমাসে লাখ টাকার হস্তশিল্প পণ্য বিক্রি করছেন। সব খরচ বাদে এখন মাসে কমপক্ষে তার ২০ হাজার টাকা মুনাফা হয়। বছর দশেক আগে অবশ্য তার এ অবস্থা ছিল না।
মাসুরা প্রায় ১০ বছর ধরে হস্তশিল্পের কাজ করছেন। তিনি মূলত নকশিকাঁথা, শাড়ি, থ্রি পিস, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, বেডশিট, কুশন কাভার ইত্যাদি তৈরি করে বিক্রি করেন। আগে নিজে অল্প কিছু পণ্য তৈরি করতেন এবং অন্যদের কাছ থেকে কিছু পণ্য সংগ্রহ করতেন। সেগুলো নিয়ে বিক্রি করতেন বিভিন্ন স্থানে।
২০১৪ সালে সদরের আরবপুর ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের একটি অনুষ্ঠানে যশোরের জেলা প্রশাসকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিতি ছিলেন। সেখানে মাসুরা বেগম তার হাতে তৈরি পণ্য নিয়ে হাজির হন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কর্মকর্তারাই সেগুলো কিনে নেন এবং এগুলো বিপণনে ই-মার্কেটিংয়ের বিষয়ে পরামর্শ দেন।
এরপর আরিফুজ্জামান ‘গ্রামের হাট’ নামে একটি ই-মার্কেটিং ওয়েবসাইটে মাসুরার তৈরি নকশিকাঁথা, বেডশিট, থ্রি পিস ইত্যাদির ছবি তুলে সেগুলো ওয়েব পোর্টালে যুক্ত করে দেন। সঙ্গে যুক্ত করেন পণ্যের ধরণ, মূল্য, প্রাপ্তিস্থান এবং উদ্যোক্তার নাম ও মোবাইল ফোন নম্বর। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মাসুরাকে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিক্রেতারা মোবাইল ফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন। তারা বাড়ি এসে পাইকারি দরে কিনে নিয়ে যেতে থাকেন মাসুরার তৈরি পণ্য।
মাসুরা বলেন, এখন আমাকে আর বিক্রির জন্য কারও ওপর নির্ভর করতে হয় না। সারাবছরই পণ্যের বিক্রি থাকলেও বিভিন্ন উপলক্ষে বিক্রি বেড়ে যায় বলে জানান তিনি। মাসুরা জানান, ৬০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করে এখন তার পুঁজি প্রায় ১১ লাখ টাকা।
কেস স্টাডি-২
মুজিবর রহমানের বাড়ি পশ্চিম মৌতলায়। তার মেয়ে-জামাই থাকেন ইতালির রোমে। মোবাইল ফোনে কথা বলার খরচ বেশি হওয়ায় স্বভাবতই তাদের যোগাযোগটা হতো কম। তবে সেই চিত্র বদলে দিয়েছে সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার ১২ নম্বর মৌতলা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার ডিজিটাল সেন্টার। ইন্টারনেটের বদৌলতে এখন সেখানে গিয়ে নিয়মিত ভিডিও কলে কথা বলছেন তিনি মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে।
মুজিবর রহমান বলেন, ‘এখানে বসে মেয়ে-জামাইকে দেখে খুব ভালো লাগে। মেয়ে ইতালি যাওয়ার পর ওর এক ছেলে হয়েছে। নাতি আধো আধো স্বরে সঙ্গে কথা বলে, আমাকে দেখে হাসে। প্রাণটা জুড়িয়ে যায়।’
কুড়িগ্রামে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে সেবা নিচ্ছেন একজন নারীকেবল এই দুইটি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারই নয়, দেশজুড়ে এমন সেন্টারের সংখ্যা এখন পাঁচ হাজার দুইশটিরও বেশি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন প্রকল্পের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করেছিল ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র। সেটিই পর্যায়ক্রমে রূপান্তরিত হয় ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছেও ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিতে ২০১০ সালে যাত্রা শুরু করে এই ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র। ওই বছরের ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কার্যালয় থেকে এবং নিউজিল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রশাসক হেলেন ক্লার্ক ভোলা জেলার চর কুকরিমুকরি ইউনিয়ন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে এর উদ্বোধন করেন। লক্ষ্য ছিল, এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে আধুনিক ডিজিটাল সেবা ইউনিয়ন পর্যায়েও পৌঁছে দেওয়া, যেন এসব প্রতিষ্ঠান ২০২১ সালের মধ্যে একটি তথ্য ও জ্ঞানভিত্তিক দেশ প্রতিষ্ঠায় যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারে।
জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা দেখেছি, তৃণমূলের সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তিকে যুক্ত করার জন্য এটা একটা হাব। আমার কাছে ডাক বিভাগের পোস্ট ই-সেন্টারগুলো যেমন একটি হাব, তেমনি ইউডিসিগুলোও আমার কাছে হাব। ২০১৮ সালে আমার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো ইউডিসি ও ডাক বিভাগকে সক্রিয় করা।’ তিনি আরও বলেন, আমার তৈরি সার্ভিসের জন্য ডেলিভারি পয়েন্ট দরকার। পোস্ট ই-সেন্টার ও ইউডিসি সেই ডেলিভারি পয়েন্ট হতে পারে।
ইউডিসিতে কিছু সমস্যা রয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এর কোনও নীতিমালা নেই। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের মধ্যে সমন্বয়হীনতাও রয়েছে। কোনও টেকসই মডেল নেই। এর জন্য সময় লাগবে। তবে যে সাপোর্টটুকু লাগবে, তা আমরা দেওয়ার চেষ্টা করবো।
তিনি বলেন, বেশিরভাগ সেন্টারের কানেক্টিভিটি (ইন্টারনেট সংযোগ) নেই। মোবাইল ইন্টারনেটের মডেম দিয়ে কাজ চালানো হয়। এসব সমস্যা দূর করতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের যাত্রার শুরুতে ইউডিসির ভূমিকা অনস্বীকার্য ছিল উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এগুলো যদি না হতো তাহলে আজকে ডেলিভারি পয়েন্ট হিসেবে এগুলোকে চিহ্নিত করা যেত না।
জানা গেছ, দেশের ৪ হাজার ৪৫৪টি ইউনিয়নে ইউডিসি, ৩২৫টি পৌরসভায় পৌর ডিজিটাল সেন্টার (পিডিসি) ও সিটি কর্পোরেশনে ৪০৭টি নগর ডিজিটাল সেন্টার (সিডিসি) স্থাপন করা হয়েছে। ইউডিসির সমন্বয়কারী ও এটুআই (একসেস টু ইনফরমেশন) কর্মকর্তা পারভেজ হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইউডিসি থেকে বর্তমানে ১১৬ ধরনের সেবা দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি সেবা তালিকায় যুক্ত হয়েছে ই-কমার্স এজেন্ট ব্যাংকিং। এরই মধ্যে ৩ হাজার ইউডিসিতে এজেন্ট ব্যাংকিং চালু হয়েছে। অন্যদিকে ৪৩৮টি ই-কমার্স সাইট যুক্ত হয়েছে ইউডিসিতে। ফলে এখন গ্রামে থেকেই শহরের পণ্য কেনা যাচ্ছে।’ তিনি জানান, বছরে সোশ্যাল সেফটিনেটের ৫৪ হাজার কোটি টাকা ইউডিসির মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। বর্তমানে দেশের পাঁচটি জেলায় এই প্রকল্পের পাইলটিং হচ্ছে।
পারভেজ হাসান জানান, ইউডিসি উদ্যোক্তাদের মধ্যে ১০ শতাংশের মাসিক আয় পাঁচ হাজার টাকা। ১০ হাজার টাকার ওপরে আয় করেন ৭০-৮০ শতাংশ উদ্যোক্তা। আর ৫ শতাংশ উদ্যোক্তার আয় মাসে লাখের ওপরে। ইউডিসির মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ইউডিসির উল্লেখযোগ্য সরকারি সেবার মধ্যে রয়েছে জমির পর্চা, জীবন বীমা, পল্লী বিদ্যুতের বিল পরিশোধ, সরকারি ফরম, পাবলিক পরীক্ষার ফল, অনলাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, অনলাইনে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ভিজিএফ-ভিজিডি তালিকা, নাগরিক সনদ, নাগরিক আবেদন, কৃষি তথ্য, স্বাস্থ্য পরামর্শ ইত্যাদি। বেসরকারি সেবার মধ্যে রয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ছবি তোলা, ইন্টারনেট ব্রাউজিং, ই-মেইল, চাকরির তথ্য, কম্পোজ, ব্রিটিশ কাউন্সিলের ইংরেজি শিক্ষা, ভিসা আবেদন ও ট্র্যাকিং, ভিডিও কনফারেন্সিং, প্রিন্টিং, স্ক্যানিং, ফটোকপি, লেমিনেটিং উল্লেখযোগ্য।
জানা গেছে, প্রতিটি ইউডিসিতে দু’জন উদ্যোক্তা কাজ করেন— একজন নারী, একজন পুরুষ। ইউডিসির কাজের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত স্থানীয় প্রশাসন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা উপজেলা ই-গভ. ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জেলা ই-গভ. ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে তদারকিসহ ইউডিসি টেকসইকরণের কাজে সরাসরি সম্পৃক্ত। জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনাররা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে থাকেন।
ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে বসে প্রবাসী স্বজনের সঙ্গে কথা বলছেন একজনইউডিসি পরিচালনার নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশ
গত ৩ ডিসেম্বর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ‘নাগরিক সেবায় ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার: ভূমিকা, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বলা হয়, গবেষণার আওতাভুক্ত গ্রামাঞ্চলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খানা ২০১৬ সালে ইউডিসি থেকে বিভিন্ন ধরনের সেবা নিয়েছে। ২০১৩-১০১৫ সালে ৪ কোটি ৫০ লাখ সেবাগ্রহীতা ইউডিসি থেকে সরাসরি সেবা নিয়েছে বলে জানানো হয়।
টিআইবি’র ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইউডিসিতে ডিজিটাল সেবাদান কার্যক্রম শুরুর পরে জমির পর্চা তোলার আবেদন, পাসপোর্টের আবেদন ফরম পূরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ হ্রাস পাওয়ায় নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ লেনদেনের ঝুঁকি কমেছে। স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে ইউডিসি পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের সুপারিশসহ ১১ দফা সুপারিশও পেশ করে টিআইবি।
সরজমিনে যশোরের আরবপুর ইউনিয়ন ডিজটাল সেন্টারে (ইউডিসি) গিয়ে জানা যায়, উদ্যোক্তা আরিফুজ্জামান ২০০৯ সালের দিকে স্থানীয় তরুণদের নিয়ে গড়ে তোলেন শতদল মিডিয়া সেন্টার। পরের বছর সারাদেশে ইউনিয়ন তথ্যকেন্দ্র চালু হলে তিনি ইউনিয়ন কাউন্সিলের পাশে তাদের ছোট্ট কক্ষে এই কাজ শুরু করেন। এরপর ২০১৪ সালে রি-ব্র্যান্ডিং হলে এখানেই ইউডিসির কার্যক্রম শুরু করেন তিনি। 
আরিফুজ্জামান এখন ইউডিসিতে সরকারি-বেসরকারি সব সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ, জমির ই-পর্চা, নামপত্তন (মিউটেশন), ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, পাসপোর্ট ফরম পূরণ, ভিসা আবেদন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, ই-চালান, পেনশনভাতাসহ প্রায় ১০০ ফরম প্রিন্ট ও পূরণ, জেলা প্রশাসন থেকে দেওয়া সব ধরনের লাইসেন্সের ফরম, নাগরিক আবেদন (ই-ফাইলিং) প্রভৃতি সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। রয়েছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় ছয় মাসের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও আউটসোর্সিং কোর্স।



আরিফুজ্জামান বলেন, ‘প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ১০টি পর্চার আবেদন করতে হয় এখানে। মাত্র ১০০ টাকায় আমরা ই-পর্চার কাজটি করে থাকি। ২০১২ সাল থেকে এই ইউনিয়নে প্রায় ২০ হাজার পর্চার কাজ করা হয়েছে।’
শিগগিরই ‘গ্রামের হাটে’র একটি শোরুম যশোর শহরে উদ্বোধনের পরিকল্পনার কথা জানালেন আরিফুজ্জামান। এখান থেকে নকশিকাঁথা, যশোর স্টিচ, খেজুরের গুড়-পাটালিসহ যশোরের বিখ্যাত পণ্যগুলো বিপণন করা হবে বলে জানান তিনি।
জানা গেছে, প্রতি মাসে গড়ে দুই শতাধিক সেবাগ্রহীতা বিভিন্ন সেবা নিতে আসেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার উমর মজিদ ইউনিয়ন পরিষদের ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে। জন্ম সনদের আবেদন ফরম, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি দফতরে চাকরির আবেদন ফরম পূরণ, কম্পিউটার কম্পোজ, অনলাইনে জমিজমা সংক্রান্ত বিভিন্ন কাগজ উত্তোলনসহ বিভিন্ন সেবা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে এই সেন্টারে।
উমর মজিদ ইউনিয়ন পরিষদের ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে সেবা নিতে আসা ওই ইউনিয়নের বালাকান্দি গ্রামের সোহরাব হোসেন বলেন, আমি জমির খতিয়ান তোলার কাজে এসেছি। ডিজিটাল সেন্টারের কারণে ভালোই সুবিধা হয়েছে। আগে এই কাজের জন্য ১০ কিলোমিটার দূরের উপজেলায় যেতে হতো। এখন হাতের কাছেই অনলাইন সুবিধা পাচ্ছি। হয়রানি ও সময়ের অপচয়— দু’টোই কম হচ্ছে।
ওয়ারিশ সনদের আবেদন করতে আসা ফাতেমা খাতুন জানান, হাতের কাছে এমন সেবা পেয়ে ভালো লাগছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের কারণে উপকার হচ্ছে। আমাদের আর অন্য কোথাও ঘোরাঘুরি করতে হচ্ছে না।
এই ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তা মমিনুল ইসলাম জানান, বিভিন্ন অনলাইন সেবা ছাড়াও এই ডিজিটাল সেন্টারে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দেওয়া হয়। ফলে ইউনিয়নবাসী হাতের কাছেই অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করতে পারছেন। অনেকে বিদেশ থেকে প্রিয়জনের পাঠানো টাকা এলাকায় বসেই তুলতে পারছেন।
সাতক্ষীরার মৌতলা ডিজিটাল সেন্টারে কয়েকজন সেবাগ্রহীতাসাতক্ষীরার বিভিন্ন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার থেকে প্রতিদিন হাজারও সেবা গ্রহণ করছেন সীমান্তবর্তী সাতক্ষীরা জেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
সরজমিনে মৌতলা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, রধুনাথ মহালদার অপেক্ষায় রয়েছেন। তিনি তার জমির কাগজপত্র তুলবেন। তিনি বলেন, আগে জমির পর্চার জন্য বিভিন্ন অফিসে ছুটতে হতো। কিন্তু অনলাইনের মাধ্যমে কোনও ধরনের হয়রানি ও ঘুষ ছাড়া খুব সহজেই এখন জমির পর্চা তোলা যায়। আর ইউনিয়ন পরিষদে ডিজিটাল সেন্টার হওয়ায় এখন শহরে যাওয়া লাগে না।
সাতক্ষীরার সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী আগড়দাড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দা সাখাওয়াতউল্লাহ। তার মেয়ে ও জামাই থাকেন সিঙ্গাপুরে। মোবাইল সম্পর্কে ভালো ধারণা না থাকায় মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তাকে ভরসা করতে হয় ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের ওপরেই।
শ্যামনগর উপজেলার ভুরুলিয়া ইউনিয়নের আবু সাইদ নামে এক তরুণ জানান, এসএসসি পরীক্ষা শেষ। এখন স্কুলে যেতে হচ্ছে না। তাই ইউনিয়ন পরিষদের ডিজিটাল সেন্টারে কম্পিউটার শিখছি। শুনেছি এখান থেকেই কলেজে ভর্তির আবেদন করা যায়।
একই ইউনিয়নের শাহরিয়ার ইমতিয়াজ পলক বলেন, আগে হাতে চাকরির আবেদন করতে নানা ঝামেলায় পড়তে হতো। চালানের মাধ্যমে টাকা দিতে হতো। তারপরও বাড়িতে প্রবেশপত্র আসত না। এখন অনলাইনে আবেদন করে মোবাইল থেকেই টাকা দেওয়া যায়। অনলাইনেই চলে আসে প্রবেশপত্র। ঝামেলা শেষ।
মৌতলা ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা আল আমিন বলেন, বিভিন্ন ধরনের সরকারি-বেসরকারি সেবা থাকায় এখন মানুষের হয়রানি কমেছে। স্বল্প সময়ে সেবাও নিশ্চিত হচ্ছে।
মৌতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাঈদ মেহেদী বলেন, আগে মানুষ ইউনিয়ন পরিষদে আসত না। ডিজিটাল সেন্টারের কারণে এখন ইউনিয়ন পরিষদই সেবার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি) এরই মধ্যে সম্ভাবনাময় ও সহায়ক ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নত হয়েছে। মানুষ এর থেকে সুফল পাচ্ছে। আমরা দেখেছি, যারা ইউডিসি থেকে জমির পর্চা তুলেছেন তারা ফি ছাড়া অতিরিক্ত কোনও অর্থ ব্যয় করেননি, হয়রানির শিকারও হননি। অন্যদিকে যারা প্রচলিত পদ্ধতিতে জমির পর্চা তুলতে গেছেন তারা হয়রানির শিকার হয়েছেন, ক্ষেত্র বিশেষে তাদের অতিরিক্ত অর্থও ব্যয় করতে হয়েছে।
তবে ইউডিসিতে কিছু ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা গেলে এই ক্ষেত্রটি আরও সম্ভাবনাময় হয়ে উঠবে। ইতিবাচক ফল পাবে দেশ। 

/টিআর/

লাইভ

টপ