ফেসবুকের ফেক আইডি চিহ্নিত করা কতটা কঠিন

Send
হিটলার এ. হালিম ও আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ১০:০৬, জুন ১১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৬, জুন ১১, ২০১৮

ফেসবুক

দেশে ফেসবুক ব্যবহার করেন আড়াই কোটির বেশি মানুষ। এর মধ্যে ভুয়া বা ফেক আইডিধারীর সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। বছর দুয়েক আগেও এ সংখ্যা ছিল মোট ব্যবহারকারীর অর্ধেক। বর্তমানে এ সংখ্যা অনেক কমেছে বলে মনে করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।

ফেসবুকের আইডি খোলার পদ্ধতি সহজ হওয়ায় ফেক আইডি খোলা হচ্ছে একের পর এক। ভুয়া আইডি থেকে বিতর্কিত পোস্ট, বিতর্কিত ছবি, বিদ্বেষমূলক পোস্ট দিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু কোন আইডি থেকে, কারা করেছে তা অনেক সময়ই চিহ্নিত করা যায়নি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় ভুয়া আইডি চিহ্নিত করতে পারে। আবার কখনও পারে না প্রযুক্তিগত দুর্বলতার কারণে। অনেক সময় লাইসেন্সবিহীন ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম না মানার কারণেও ফেক আইডিগুলো চিহ্নিত করা যায় না।  

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) একজন সিনিয়র সহকারী কমিশনার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফেক আইডি বলতে আসলে কিছু নেই। নাম-ঠিকানা হয়তো মিথ্যা দিয়ে আইডিগুলো পরিচালনা করা হয়। কিন্তু আইডিগুলো রিয়্যাল। সেগুলো কেউ না কেউ পরিচালনা করে। দেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী অধিকাংশ মানুষেই একাধিক আইডি ব্যবহার করে। এদের মধ্যে পরিচিত বা তারকাদের নামে অনেকে আবার আইডি খুলে প্রতারণা করে। সাইবার জগতে প্রতিদিনই অপরাধের সংখ্যা বাড়ছেই। কখনও হুমকি, কখনও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া, আবার কখনও গুজব রটানো হচ্ছে। এদের সবাইকেই আইনের আওতায় আনা সম্ভব।’

সাধারণ মানুষ হয়রানি হলে সেগুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত হয় না কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাইবার সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগের সংখ্যা অসংখ্য। গুরুতর অপরাধগুলোর সবাইকেই আইনের আওতায় আনা হয়। তবে তাদের গ্রেফতারে কিছুটা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়, তাই কখনও কখনও দেরি হয়।’

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘মূল সমস্যা হলো সাইবার অপরাধের স্বীকার হলে মানুষ সাধারণত একটি জিডি করেই চুপ করে থাকে। আমাদের থানাগুলোতে প্রতিদিন অসংখ্য জিডি হয়। প্রতিটি জিডি যদি একেকজন কর্মকর্তা তদন্ত করেন তাহলে গড়ে অন্তত অর্ধশত জিডির তদন্ত করতে হবে প্রতিদিন একজন পুলিশ সদস্যকে। তাই বিলম্ব হয়।’

সিটিটিসি’র সিনিয়র এই সহকারী কমিশনার বলেন,  ‘তাছাড়া একই আইপি দিয়ে শত শত কম্পিউটার ব্যবহার হয়, কখনও কখনও সেই কানেকশন আবার পরিবর্তন হয়। তাই সহজে নির্দিষ্ট অপারেটরকে পাওয়া যায় না। সময় নিয়ে কাজ করতে হয়। তাই সাইবার অপরাধ তদন্তে বিলম্ব হয়।’ তবে অসাধ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।    

সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের উপকমিশনার মো. আলিমুজ্জামান জানান, প্রতিটি ঘটনারই তদন্তই হয়। অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা হয়। তবে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি।   

দেশের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবি’র সাধারণ সম্পাদক ইমদাদুল হক বলেন, ‘যেসব আইএসপি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান ইন্টারনেট সেবা দেয় যাদের, তাদের মধ্যে কেউ কিছু করলে ধরা সম্ভব। কিন্তু যেসব আইএসপি অবৈধ, লাইসেন্স নেই তাদের কাছ থেকে যারা ইন্টারনেট সেবা নেয় তাদের ট্রেস করা মুশকিল।’

এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের গ্রাহকের তথ্য, লগবুক মেনটেইন করেন। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী ১ বছর পর্যন্ত এগুলো সংরক্ষণের নিয়ম হলেও অবকাঠামোগত জটিলতার কারণে ৬ মাস রাখা হয়। ফলে কোনও ব্যবহারকারী যদি ফেক আইডি খুলে অনিষ্ট সাধন করতে চায় তাহলে তাকে সহজে খুঁজে বের করা সম্ভব।’

এক প্রশ্নের জবাবে ইমদাদুল হক বলেন, ‘এখন আর সেই অর্থে কোনও সাইবার ক্যাফে নেই। অবৈধ সংযোগ নিয়ে যারা ব্যবসা করে তারাই কোথাও সংযোগ দিয়ে সাইবার ক্যাফে পরিচালনা করে থাকে। এসব সাইবার ক্যাফেতে ব্যবহারকারীদের লগবই রাখার কথা থাকলেও রাখা হয় না। ফলে কে কখন কোন পিসিতে বসে অনিষ্ট করে যাচ্ছে তা জানা কঠিন।’

তিনি জানান, দেখা গেল কোনও পিসি থেকে একটা আইডি খুলে অপকর্ম করা হয়েছে। কিন্তু সেই পিসি একের পর এক গিয়ে ব্যবহার করেছেন ১০ জন। তাহলে অপরাধীকে খুঁজে বের করা হবে কীভাবে?  

টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কমিশন সাধারণত ভুয়া বা ফেক আইডি খোঁজে না, দেখে না কারও বিরুদ্ধে কী লেখা হলো। এটা আসলে সম্ভবও নয়। কমিশনে কোনও অভিযোগ এলে তা খতিয়ে দেখা হয়, সংশ্লিষ্ট আইডি দিয়ে কী হয়েছে। কমিশন সেই মতো ব্যবস্থা নেয়। ভুক্তোভোগীর সঙ্গে কথা বলে উপযুক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আইডি ব্লক বা বন্ধ করার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়। এছাড়া আইনি পরামর্শও দিয়ে থাকে।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক অপারেটর্স গ্রুপের (বিডিনগ) ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ‘ফেক আইডি খুঁজে পাওয়া যায় না, বন্ধ বা ব্লক করা যায় না— এসব কথা সব সময় সঠিক নয়। আসলে আপনি কতটা আন্তরিক বা সিরিয়াস তার ওপর বিষয়টি নির্ভর করে।’

তিনি বলেন, ‘সহজ পথ হলো ফেসবুকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা। ক্ষতির কারণ তাদের প্রমাণসহ দেখাতে পারলে তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। এর আগে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ দেখে যে পোস্ট বা ছবি দেওয়া হয়েছে তা অভিযোগকারীর সঙ্গে কতটা সংশ্লিষ্ট, সামাজিক জীবনে কতটা গুরুত্ব বহন করছে সেসবও দেখা হয়।’ তবে তিনি এ-ও বলেন, আইপি (ইন্টারনেট প্রটোকল) ধরে ধরে সব ফেক আইডি খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে বিকল্প পথেও খুঁজতে হয়।

সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ‘সরকারের যে চ্যানেল আছে সেই চ্যানেল দিয়ে সরকার ফেসবুকের কাছে তথ্য চায়। ফেসুবক কিছু তথ্য দেয়, কিছু দেয় না। সরকার আন্তরিকভাবে চাইলে ফেসবুক তার গুরুত্ব অনুধাবন করে ঠিক করে চাহিদার কতটুকু তথ্য তারা দেবে। তথ্য দিলেই কিছু জিনিস ধরা পড়ে।’

 

/এইচআই/

লাইভ

টপ