এবার নতুন ‘মানে’ বাজারে আসছে দোয়েল

Send
হিটলার এ. হালিম
প্রকাশিত : ১৪:২৯, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫২, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৯

দোয়েল ল্যাপটপ

জাতীয় পাখি দোয়েলের নামে দেশের নিজস্ব ব্র্যান্ডের ল্যাপটপের নাম রাখা হয়। কিন্তু উৎপাদন শুরুর পর থেকেই বহুবিধ সমস্যায় দোয়েল কখনও স্বাবলম্বী হতে পারেনি। ডানা ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতেই কাটিয়ে দিলো প্রায় ৮ বছর। তবে সব সমস্যা ঝেড়ে ফেলে দোয়েল নতুনভাবে গুণগত মান বজায় রেখে আবারও বাজারে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ বছরের শেষ নাগাদ দোয়েল বাজারে নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এবার দোয়েল ল্যাপটপের মান ও দাম হবে আকর্ষণীয়। অন্যান্য ব্র্যান্ডের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিগগিরই দেশের এক নম্বর ব্র্যান্ডে পরিণত হবে বলে সংশ্লিষ্টদের আশা। ব্যবসা বাড়ানো, নতুন বিপণন কৌশল হাতে নেওয়া, গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী ল্যাপটপ সরবরাহের দিকে এবার বেশি নজর দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। বর্তমান সরকার শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে ল্যাপটপ তুলে দেওয়ার যে উদ্যোগ নিয়েছে সেখানে প্রথম পছন্দ হবে দোয়েল। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের হাতে যে ডিজিটাল ডিভাইস দেওয়া হবে সেগুলোও দোয়েলের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান টেলিফোন শিল্প সংস্থায় (টেশিস) তৈরি হবে।
জানা গেছে, রাজধানীতে দুটি বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে দোয়েল ল্যাপটপের। টঙ্গীতে টেশিসের নিজস্ব বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে। অন্যদিকে কারখানা থেকে কিনে নিয়েও অনেকে ল্যাপটপ বিক্রি করে থাকেন। দোয়েল ল্যাপটপ বাজারে আসার আগে থেকেই বেশ আলোচনায় ছিল। কম দামের হওয়ায় বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গে বেশ হৈচৈ পড়ে যায়। বাজারে এলে এই ল্যাপটপ কেনার জন্য ক্রেতারা লাইন ধরে। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই ক্রেতাদের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। একের পর এক অভিযোগ আসতে থাকে। ল্যাপটপ অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া, বেশিক্ষণ চার্জ না থাকা, হ্যাং হওয়া, অপারেটিং সিস্টেম ঠিকমতো কাজ না করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ জমা পড়ে বিক্রয় সেন্টারগুলোতে। চারটি মডেলের প্রথমটিতে (প্রাইমারি) সমস্যা থাকায় দোয়েল ল্যাপটপের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস) একসময় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে অবশ্য আবার চালু হয় দোয়েলের উৎপাদন।
নতুনরূপে দোয়েলের বাজারে আসার বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দোয়েল এবার বাজারে এলে ওয়ান অব দ্য বেস্ট ব্র্যান্ড হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। এবার এর মান ও দামের দিকে আমরা বেশি নজর দিচ্ছি। যে ল্যাপটপ কেনার জন্য মানুষ একসময় লাইন দিয়েছে সেই ল্যাপটপ না কেনার কোনও কারণ নেই।’ তিনি জানান, গত মেয়াদে মন্ত্রিত্বের মেয়াদ স্বল্প সময়ের হওয়ায় দোয়েল ল্যাপটপের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারেননি। এবার নতুন করে দায়িত্ব পেয়েই দোয়েলের দিকে মনোযোগী হয়েছেন।
মন্ত্রী মনে করেন, প্রথমবার দোয়েল সফল না হওয়ার পেছনে মূল কারণ বাজার না থাকা। তিনি বলেন, ‘বাজার না থাকলে একটি পণ্য কেন চলবে। মূলত সে সময় ল্যাপটের মান ও মূল্যের দিকে নজর দেওয়া হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যদি দোয়েল ল্যাপটপ সংযোজন না করে তৈরি করি তাহলে দাম আরও কম পড়বে।’
মন্ত্রী জানান, আইসিটি বিভাগকে দোয়েল ১৫ হাজার ল্যাপটপ দিয়েছে। আগামীতে আরও দেবে। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, সরকারি কাজে দোয়েল ল্যাপটপ ব্যবহার করলে টেশিস তা তৈরি করেই চাহিদা মেটাতে পারবে না। আমরা এই বিষয়গুলোর দিকে এবার নজর দেবো। প্রথমবার দোয়েল ল্যাপটপে যেসব সমস্যা ধরা পড়ে তা চিহ্নিত করে সমাধানের পথ তৈরি করেই নতুন করে আবারও দোয়েল উৎপাদন করা হবে, যাতে প্রথমবারের সমস্যাগুলো আর না থাকে। তহবিলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এবার তহবিল নিয়ে কোনও সমস্যা হবে না। আগেই বরাদ্দ দেওয়া হবে।’
তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের হাতে দোয়েল ল্যাপটপ তুলে দেওয়া হবে। সহযোগী ব্র্যান্ড হয়তো থাকতে পারে। তবে মূল ব্র্যান্ড হবে দোয়েল। দোয়েলের কারখানায় ডিজিটাল ডিভাইসও তৈরি করা হবে, যেগুলো শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল শিক্ষাগ্রহণে ব্যবহার হবে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) কাছ থেকে ৪৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে দোয়েল ল্যাপটপ প্রকল্প শুরু হয়। ২০১১ সালের অক্টোবর মাসে দোয়েল ল্যাপটপের উদ্বোধন হয়। উদ্বোধনের পর থেকে প্রথম ১৭ মাসে মাত্র ২৫ হাজার ল্যাপটপ তৈরি করে টেশিস। সক্ষমতা অনুযায়ী এই সংখ্যা হওয়ার কথা ছিল ১ লাখের বেশি। কিন্তু চাহিদা না থাকায় উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো যায়নি। এরপরই ঋণের টাকা ফিরিয়ে নিয়ে যায় বিটিসিএল। মূলত তখন থেকেই শুরু হয় অর্থিক অনটন। সেই অনটন কখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি দোয়েল।
জানা যায়, সংকটের শুরু আসলে আরও আগে থেকে। টেশিসের ল্যাপটপ প্রকল্পে সরকারি কোনও বরাদ্দ ছিল না। ওই প্রকল্পের অংশীদার হিসেবে মালয়েশিয়ার টিএফটি (টিএফটি টেকনোলজি গ্রুপ) এবং বাংলাদেশের টুএম করপোরেশন মোট বিনিয়োগের ৭০ শতাংশ করার কথা থাকলেও বিনিয়োগ করে মাত্র ২০ শতাংশ। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান দুটির সম্পূর্ণ টাকা বিনিয়োগ না করা এবং সরকারের বরাদ্দ না থাকায় শুরু থেকেই সংকটের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে ল্যাপটপ প্রকল্প।
দেশে দোয়েল ল্যাপটপ তৈরির কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে টেশিসে তা অ্যাসেম্বল (যন্ত্রাংশ সংযোজন) করা হয়। চীনের প্রযুক্তিপণ্যের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হেয়ার কোম্পানি থেকে ল্যাপটপের যন্ত্রাংশ এনে টেশিসে অ্যাসেম্বল করা হয়। যদিও দেশীয় ব্র্যান্ড হওয়া এই ল্যাপটপের প্রতি মানুষের সীমাহীন আগ্রহ ছিল।

আরও পড়ুন: দোয়েল ‘ল্যাপটপ’ ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতেই শেষ!

               লাভে থেকেও পুঁজিবাজারে আসতে ‘সক্ষম’ নয় টেশিস!

 

/ওআর/এমওএফ/

লাইভ

টপ