অপব্যবহার বন্ধে ‘সোশ্যাল মিডিয়া ডিক্লারেশন’ জরুরি?

Send
হিটলার এ. হালিম
প্রকাশিত : ১৫:২২, আগস্ট ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:০৩, আগস্ট ১৩, ২০১৯

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম

দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যাও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম উপযুক্ত ব্যবহারের পাশাপাশি অপব্যবহারও হচ্ছে এবং হালে তা ব্যাপকহারে বেড়েছে। অথচ এসব ব্যবহারে দেশে এখনও কোনও গাইডলাইন তৈরি হয়নি। সরকারিভাবে কোনও উদ্যোগের কথাও শোনা যায়নি। কেউ কেউ বলছেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়া ডিক্লারেশন’ ম্যানুয়াল করা গেলে তা সবার জন্যই নিরাপদ হতো। তবে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী বলেছেন, এধরনের ডিক্লারেশনের প্রয়োজন নেই, বরং সামাজিক মাধ্যমগুলো ব্যবহারের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে।    

তথ্য-প্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময় এসেছে অন্তত একটা নীতিমালা তৈরির।  সাম্প্রতিক সময়ে  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যা হচ্ছে, তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। নীতিমালা তৈরি হলে সবার উদ্বেগ কমবে এবং ওই মাধ্যমগুলোর ব্যবহারকারীরা নিরাপদ থাকবে।

নীতিমালা বা কোনও নির্দেশনা থাকলে ব্যবহারকারীদের সামনে অন্তত একটা দৃশ্যমান বাধা থাকে, যা তাদেরকে বিপথগামী হওয়া বা যেকোনও অপকর্ম করা থেকে বিরত রাখবে। এতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিরাপদ ব্যবহারের নিয়মাবলী উল্লেখ থাকবে। সেসব নিয়মাবলী মেনে চললে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিরাপদ থাকবে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘আমাদের এখানে প্র্যাক্টিক্যালি আইন আছে। বিষয়টি আমাদেরও চিন্তায় এসেছে। এজন্য আমরা সচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। এসব কারণে আমাদের এ ধরনের কোনও ডিক্লারেশন প্রয়োজন নেই। এসবের আগে সামাজিক মাধ্যমগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষকে সচেতন করাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।’

তিনি জানান, সরকারের আইসিটি বিভাগ এরইমধ্যে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যকম চালিয়েছে। পুস্তিকা প্রকাশ করেছে। আইসিটি বিভাগের অধীনে ডিজিটাল সিকিউরিটি এজেন্সি গড়ে তোলা হয়েছে। ডিপার্টমেন্ট অব টেলিকমের (ডিওটি) অধীনেও সিকিউরিটি এজেন্সি হয়েছে,বিটিআরসিতে (টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা) সংশ্লিষ্ট শাখা রয়েছে। ফলে আমাদের পৃথক করে অন্যকিছু করার প্রয়োজন হয়নি।

মন্ত্রী বলেন, ‘এখন বর্ষাকাল। এ সময়ে দেশের স্কুল-কলেজগুলোতে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা কঠিন। শীতকালে এই কর্মসূচি আরও জোরদার করা হবে। এ কাজে সারাদেশের বিটিসিএল অফিস, পোস্ট অফিস ও টেলিটক অফিসগুলোকে সম্পৃক্ত করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বিস্তারিত তথ্য সংবলিত একটা পুস্তিকা প্রকাশ করে সারাদেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির জন্য চেষ্টা করবো।’

সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে ‘সোশ্যাল মিডিয়া ডিক্লারেশন’ বিষয়ক একটি ম্যানুয়াল প্রকাশ করা হয়েছে। ওই ম্যানুয়ালকে সংশ্লিষ্টরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ বলে অভিহিত করেছেন। ওই ডিক্লারেশনে দায়িত্বশীল পক্ষ হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, সরকার, গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরসঙ্গে জড়িতরা মনে করছেন, এই কোড অব কন্ডাক্ট শ্রীলঙ্কায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের নিরাপদে থাকতে সহযোগিতা করবে।

কলম্বো সোশ্যাল মিডিয়া ডিক্লারেশনের সঙ্গে জড়িত হারিথা ধননায়েকে (আইটি ম্যানেজার, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, শ্রীলঙ্কা) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটা হলো আমাদের কোড অব কন্ডাক্ট। এটা মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাধা হবে না। মানুষের অধিকারগুলোর মধ্যে যে ডিজিটাল অধিকারও রয়েছে, সে সম্পর্কে  এটা মানুষকে সচেতন করবে। এটা ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল সাক্ষরতা নিশ্চিতের পাশাপাশি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে সহায়তা করবে। এতে করে সমাজের মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার করবে না।’

হারিথা আরও বলেন, ‘এই কোড অব কন্টাক্ট মানুষকে জানাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কতদূর পর্যন্ত নিরাপদে ব্যবহার করা যায়। কোন সীমা পর্যন্ত ব্যবহার করলে সীমা লঙ্ঘন হয় না। রাষ্ট্র ও সরকারকে বিব্রত করা হয় না। কারও মাধ্যমে কেউ ক্ষতিরও শিকার হয় না।’

বিভিন্ন সময় দেশে এ ধরনের ছোটখাট কাজ দেখা গেছে। শিশুদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের গাইড লাইন তৈরি হয়েছে গ্রামীণফোন ও ইউনিসেফের সৌজন্যে। গুগলও নিরাপদ ইন্টারনেটের জন্য কাজ করেছে। ফেসবুক প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সেসবের মধ্যে ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম’ এসেছে অল্পবিস্তর। তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রেনিউর ল্যাব বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর কর্মশালা করিয়েছে। সেখানে বুকলেটও দেওয়া হয়েছে। তাতে স্পষ্ট করে দেখানো হয়েছে— কীভাবে ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিরাপদ থাকা যাবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রেনিউর ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী আরিফ নিজামী বলেন, ‘আমাদের দেশে বড় আকারে কোনও ডিক্লারেশন না এলেও ছোট ছোট পরিসরে বেশ কাজ হয়েছে। সুফলও মিলেছে।’ তিনি বিশেষভাবে মনে করেন, এসব করার আগে সরকারের উচিত সরকারি কর্মকর্তারা কীভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করবেন, তার একটি নীতিমালা তৈরি করা।  তিনি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুটো ঘটনার উদাহরণ (আড়ংয়ে একই পাঞ্জাবি  দুই দামে বিক্রি হওয়ার ঘটনায় সৃষ্ট পরিস্থিতি ও ফেনীতে নুসরাত হত্যাকাণ্ডের পরে সেখানকার ওসির ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া) দিয়ে বলেন, ‘তারা যদি জানতেন তারা কীভাবে এই মাধ্যম ব্যবহার করবেন,কী করতে পারবেন আর কী করতে পারবেন না, তাহলে ঘটনা এতদূর গড়াতো না।’

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ