behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Led ad on bangla Tribune

‘সবমিলিয়ে আমিই ইরেশ’

এহতেশাম ইমাম।।২০:১৭, নভেম্বর ২৬, ২০১৫

ejযতটা লেখা দরকার, ততটা লেখা হয় না। যত ছবি তুলতে চাই, সেটি তোলা হয়ে ওঠে না। আবার কাজ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে গেলেও, ভাবতে হয় পড়তে-পুরোপুরি কাজ হয়ে ওঠে না। করছি সব কিছুই আর প্রতি মুহূর্তে নিজেকে আবিষ্কার করছি নতুন নতুন করে।-এগুলো নাটক বা সিনেমার কোনও ডায়লগ নয়, নিজের কথাগুলো এভাবেই বলছিলেন ইরেশ যাকেরের। জনপ্রিয় বললে ভুল হবে,তুমুল জনপ্রিয় এই অভিনেতা এক হাতে সামলাচ্ছেন এশিয়াটিক ৩৬০ ডিগ্রির নির্বাহী পরিচালনার দায়িত্ব আর অন্য হাতে নিজের অভিনয় ও অন্যান্য সৃজনশীল কাজগুলো। কর্পোরেট জীবন আর সৃজনশীলতার ধারাবাহিকতা রক্ষায় সময়ের অভাব হলেও কিভাবে মানিয়ে নিচ্ছেন এই ব্যক্তিত্ব। বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছের নিজের ইচ্ছা, প্রচেষ্টা, পরিমিতিবোধ থেকে শুরু করে সব কিছু। কী করে শত ব্যস্ততার মাঝেও ব্যস্ততার আটপৌড়ে জীবনে নিজেকে ধরে রেখেছেন নিজস্ব স্বকীয়তায়।

মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসার কাঙাল লে শিল্পের সততা আর থাকে না

যে কোনও শিল্প সত্ত্বার খোরাক সংগৃহীত হয় সেগুলোর চর্চায়। কিন্তু, সেই শিল্পকেন্দ্রিক ব্যক্তিত্ব যদি প্রশংসার কাঙাল হয়ে যায় তাহলে সে শিল্পীর আর সততা থাকে না।  ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকেই বলছি— আগে দেখা যেত একটা ছবি ফেসবুকে শেয়ার করলে হাজার লাইক পড়ার সঙ্গে মিলত ঢের প্রশংসা। একটা পর্যায় যেয়ে দেখলাম ওটাই অণুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে ছবি তোলা উদযাপনটা অনেকটা ফেসবুক কেন্দ্রিক হয়ে পড়ছিল।

যে কারণে কিছুটা হলেও আবার স্বেচ্ছায় পিছিয়ে এসেছি ছবি তোলার বিষয়টিতে। নতুন করে ছবি তোলা শিখছি। গত সপ্তাহ মুম্বাই গিয়ে স্ট্রিট ফটোগ্রাফি কোর্স করে এসেছি। শেখারতো কোনও শেষ নাই। বোম্বেতে গিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে যখন সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়ে ছবি তোলার বিষয়টি উপভোগ করেছি। প্রতিদিন ১২-১৩ ঘন্টা যখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ছবি তোলার চেষ্টা করেছি।

এ কারনেই বলছি প্রশংসার কাঙাল হওয়ার মানসিকতা নিজেই মেনে নিতে পারছিলাম না। আর এ কারণেই বিশ্বাস করি যেকোনও শিল্পই প্রশংসা পাওয়ার দাবি রাখে। কিন্তু শিল্পী যদি প্রশংসার কাঙাল হয়ে ওঠে তাহলে সেটি আর শিল্প থাকে না।

IMG_2693

অনেক কাজ একসঙ্গে নয়

কর্পোরেট জীবন আর অভিনয় জীবন। দুই জীবনে একসঙ্গে তাল মিলিয়ে যাওয়া অনেকটা চ্যালেঞ্জিং। এশিয়াটিক ৩৬০ ডিগ্রী নির্বাহী পরিচালক হওয়ার কারণে একসঙ্গে অনেকগুলো বিষয় খেয়াল রাখতে হয়। একইসঙ্গে নিজেকে প্রতিনিয়ত প্রস্তুত রাখতে হয় বিভিন্ন নাটক বা সিনেমার চরিত্র অনুযায়ী নিজেকে তৈরি রাখতে। এশিয়াটিকের প্রতিটি বিভাগে আলাদা আলাদা প্রডাকশন টিম রয়েছে। আর আমি প্রোডাকশোন টিমের কাজগুলোর সঙ্গে তত্ত্বাবধায়নেও অনেকটা জড়িয়ে আছি। এর বাইরে ক্লায়েন্টদের সঙ্গে মিটিং থেকে শুরু করে খুটিনাটি অনেক বিষয়ই খেয়াল রাখতে হয়।

ছবির সঙ্গে কথা...

ছবি তোলা বা অফিসের কাজের সঙ্গে তুলনা করলে সে অনুযায়ী লিখা অনেক কম হয়। আমার বাকি কাজগুলো অনেকটা টিম নির্ভর। ফলে সেগুলো সময় আর সিডিউল মেনে করতে হয়। কিন্তু, ছবি তোলার বিষয়টা পুরোটাই নিজের। আমাদের জবাবদিহিতার ক্ষেত্র অনেক। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও কাজ করতে হয়।

এটি একান্তই ব্যক্তি কেন্দ্রিক একটি পছন্দের জায়গা। যেখানে আমি আমার মতো অনেক ধরনের এক্সপেরিমেন্ট করতে পারি। তবে ছবি তুলতে তুলতে একটা সময় যেয়ে বুঝতে পেরেছি ছবি তোলা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার ক্ষেত্রে কিছু বেসিক  বিষয় সর্ম্পকে ধারণা রাখতে হবে। এ কারণে সম্প্রতি ভারতের বোম্বে থেকে স্ট্রিট ফটোগ্রাফির ওপর একটি কোর্স করে এসেছি।

ইরেশের মতে শেখারতো কোনও শেষ নাই। বোম্বেতে গিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে সারসরি সাক্ষাৎ ভিন্নভাবে বিভিন্ন বিষয়বস্তু নিয়ে ভাববার সুযোগ করে দিয়েছে।

IMG_2526

শেখার আছে সবখানে

আমরা অনেকেই বলে থাকি জীবন একটা নাট্য মঞ্চ আর আমরা সেই মঞ্চে অভিনয় করে যাচ্ছি সব সময়। সেই মঞ্চেই আমরা দেখছি, শিখছি আবার নতুন করে জীবনের বিভিন্নক্ষেত্রে প্রয়োগ করছি। যা করছেন বা যেটা করছেন সেটা উপভোগ করতে পারলে সহজেই আপনার কাজ অনেকটা উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করে ওঠা খুব জরুরি।

মুম্বাইয়ের ফটোগ্রাফি কোর্সটি করার পর এখন পরিকল্পনা করছি ছবি তোলার জন্য কয়েকটি দেশ ভ্রমণের। এর মধ্যে চলতি মাসে নেপালে একটি ফটো ট্রিপে যাবো। আগামী মাসে যাচ্ছি থাইল্যান্ডে আর ডিসেম্বরে সময় করতে পারলে একই কাজে ইস্তাম্বুল যেতে পারি। আর এ মধ্যে সুযোগ করতে পারলে ভারতের রাজস্থানেও একটা ট্রিপ দিতে পারি ছবি তোলার জন্য। তবে ছবি তোলাটাকে একটি কারণ হিসেবে দেখলেও,বিদেশের মাটিতে পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন পরিস্থিতি নিজেকে নিজের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয় নানাভাবে।

শেকড়সন্ধানী জীবন

আমার আসলে নিজেদের রুটটাকে চিনতে অনেক কম সময় দেই। যেটা আসলে হওয়া উচিৎ না। আমি গত বছর বেশ কয়েকবার আমার দেশের বাড়িতে চট্টগ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানে যেয়ে একটা বিষয় বুঝতে পেরেছি খুব কাছ থেকে। সমসাময়িক মানুষেরা এখন আর গ্রামে থাকতে চান না। তাদের কাছে গড়ে ওঠা যৌক্তিক কারণেই সবার মধ্যে একটা শহরমুখী হবার প্রবণতা খেয়াল করেছি। একারণে নতুন একটা প্রজেক্ট নিয়েছি গ্রামের লোকদের নিয়ে কাজ করার জন্য।

পরিকল্পনাটি হচ্ছে আমার গ্রামের সবার একটি পোট্রেট ফটোশ্যুটের পরিকল্পনা করছি। আমি মনে করি সামাজিক ক্রমবর্ধান পরিবর্তন বোঝার জন্য এটি একটি ভাল কাজ হতে পারে।

IMG_2629

সমালোচনায় মেপে দেখুন ব্যক্তিত্ব

ছবি তুলতে যেয়ে শিখেছি নিজের জন্য অনেক কিছু। কারণ শুরুর দিকে আমার তোলা কোনও ছবি নিয়ে কেউ ক্রিটিসিজম করলে ভেতরে ভেতরে সহ্য করা কঠিন হয়ে যেত। কিন্তু পরে যখন নিজেকে ছেড়ে দিলাম, দেখলাম মানুষের গঠনমূলক সমালোচনা আমাকে আরও অণুপ্রাণিত করছে। কারণ আপনি যদি শেখার ক্ষেত্রে নিজেকে না ছেড়ে দেন তাহলে আরও ভালোর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারবেন না। এটা খুবই জরুরি।

ব্যক্তি পর্যায়ের সমালোচনা অনেকে নিতে পারেননা। ধরেন আপনাকে অনুরোধ করে নাটকের জন্য কেউ সময় নিল। কিন্তু, সেই নাটকের সময় আপনার অভিনয়ের সমালোচনা নেওয়া কিন্তু খুব কঠিন। যারা আমার কাজ দেখে সমালোচনা করে তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। অভিনেতা হিসেবে বিভিন্ন সময় খেয়াল করেছি অভিনয়ের মান খারাপ হয়ে যাচ্ছে। উদাহরণ দিয়ে বলি, কয়েক বছর টানা অনেক নাটক করেছি। নাটক করতে করতে নিজের অভিনয়ের একটা ধরন তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এক সময় দেখলাম স্ক্রিপ্ট করার সময় অনেক বিরতি দিচ্ছি। একদিন এক বন্ধু বিষয়টা ধরিয়ে দিল। হয়তো ঠিক ওই্ মুহূর্তে ওটা তাৎক্ষনিক নেওয়া কঠিন।

সমাজ গঠনে স্যাটায়ারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

সার্বিকভাবে সমাজে স্যাটায়র আমার কাছে সব সময়ই একটু গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। একটি সাকসেসফুল ইন্টেলেকচুয়াল সোসাইটির জন্য স্যাটায়ার ভাবধারার প্রভাব অনেক।

‘দেশ-ই-গল্প’ করার সময় অনুভব করেছি যে অনেক বিষয় উঠে এসেছে যা সাধারণভাবে আমরা বলতে পারি না। এখানে অনেক চরিত্র উঠে এসেছে যেমন, উদীয়মান বাংলা সিনেমার নায়িকার চরিত্র অভিনয়, সারাদিন বাসায় বসে হিন্দি সিরিয়াল ও হিন্দি ছবি দেখেন এমন একজন সাধারণ গৃহিনী চরিত্র, সন্ত্রাসীর ভুমিকায়, গবেষকের ভূমিকায়, একজন রাজনীতিবিদের ভূমিকা। দেশ-ই-গল্প একটি বিনোদনমুলক অনুষ্ঠান হলেও এখানে দেশ বিদেশের নানান অসঙ্গতি ব্যাঙ্গাত্বক ভাবে তুলে ধরা হতো। বলা যায় অসঙ্গতি তুলে ধরার একটি গ্রহণযোগ্য উপায়ও ছিল এটি। আক্ষরিক অর্থে বিনোদন পেলেও বিষয়টি কিন্তু একবারের জন্য হলেও সচেতন দর্শকদের ভাবাবে। এ কারণেই বলি স্যাটায়ারের গুরুত্ব অনেক।

IMG_2665

অভিনয়েই মুক্তি

অভিনয়ের জায়গাটা হচ্ছে আমার জন্য মুক্তির স্থান।মানুষ খুব সহজে তার নিজস্ব চিন্তা ঘরানা থেকে বের হতে পারে না। আর আমার ক্ষেত্রে অভিনয়ের সময়টুকু হচ্ছে নিজের ঘোর থেকে বের হবার মুহূর্ত। কারণ, অভিনয়ের সময়ে আমি আমার সাধারণ জীবনের নিজের স্বত্ত্বার বাইরে থাকতে পারি। যেটা আমাকে জীবনের প্রত্যহিক একঘেয়েমি থেকে দূরে রাখে। ক্যামেরার সামনের সময়টুকু আমি ভুলে যাই আমার তথাকথিত জীবন। এসময়টুকুই আমার জীবনের স্বার্থকতা। বইপড়া আর অভিনয় করাটা আমার কাছে অনেকটা ধ্যান করার মতো।

বাস্তবতার মুখোমুখী হই

’পুট ইয়োরসেল্‌ফ ইন্টু দ্য ফায়ার’ নিজের কাছে নিজেকে আবিষ্কারের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে নিজেকে বিভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যে পরীক্ষা করা। এটা না করলে বোঝা কঠিন নিজের সর্ম্পকে নিজের সক্ষ্যমতা নিয়ে। এতে যদি আপনি বাহ্যিক কোনও অর্জন নাও থাকে, অনন্ত মনস্তাত্বিক একটা অর্জন আপনার আসবে। আর সেটি সময়ের ফেরে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেটা আপনাকে বাস্তব জীবনে আরো সম্মুখীন হতে সহায়তা করবে।

আপনার আয়েশি জীবনের বাইরে থেকে যা করবেন সেটাই আপনাকে সহায়তা করবে জীবন থেকে শিক্ষা নিতে।

ছবি:সাজ্জাদ হোসেন।

/এফএএন/

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ