‘যুবনীতি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে কি?’

Send
নাফিজ ইমতিয়াজ।।
প্রকাশিত : ২০:৫৪, অক্টোবর ২১, ২০১৫ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:০৩, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৫

nafiz imtiaz২০১৫ যুব নীতিমালা সংশোধনের বছর। জাতীয় সংসদের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি জাতীয় যুবনীতি চূড়ান্ত করার আগে এর উপর যুবসংগঠনগুলোর মতামত নিয়ে তা চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর আগে গত ২৬ এপ্রিল যুব উন্নয়ন নীতিমালা সংশোধনীর খসড়া যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ওয়েব সাইটে প্রকাশ করে তাতে মতামত দিতে ১৫দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়। তবে সেই ১৫দিন গড়িয়ে এরই মধ্যে সেটি পৌছেছে পাঁচ মাসে।

তার পরও বলা উচিৎ, যুব নীতিমালা সর্বসাধারণের মতামতের জন্যমন্ত্রণালয় যে প্রকাশ করেছে তা প্রশংসা পাওয়ার দাবি রাখে। কিন্তু গত চার দশকের বেশি সময় ধরে যুব নীতিমালার বিষয়ে যে দাবিটি সবচেয়ে জোরালো হয়ে যুব সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বার বার এসেছে তা হলো, নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে যুবকদের অংশগ্রহণ। বরাবরের মতো এবারও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর তাদের পোষ্য কিছু এনজিও ছাড়া যুবকদের অংশগ্রহণে কোনও উদ্যোগ নিয়েছেন বলে চোখে পড়ে না।

তবে যুব নীতিমালায় বেশ কিছু পরিবর্তন অত্যন্ত ইতিবাচক এবং যুগোপযোগী বলে মনে হয়েছে। যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতিমালার সঙ্গে সংগতি রেখে যুব বয়সসীমা ৩৯ থেকে কমিয়ে ৩৫ করা হয়েছে। এছাড়া যুব উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা বৃদ্ধির যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা প্রশংসনীয় | এছাড়া বিশেষত ভিন্নভাবে সক্ষম যুবদের জন্য বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণের উদ্যোগ বৃদ্ধির প্রস্তাব ভালো লেগেছে |

বিগত কয়েকটি নির্বাচনের সময় আমরা দেখেছি দেশের যুব জনগোষ্ঠী নির্বাচনে বড় একটি ফ্যাক্টর হয়ে দাড়িয়েছে। কারণ ভোটারদের অন্তত ৪০ ভাগের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ যারা নির্বাচনের ফলাফলকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেন। আর এই যুবদের একটা বড় অংশই প্রগতিশীল, প্রযুক্তিবাদী, শেকড়মুখী এবং স্বজাত্যবোধে উদ্বুদ্ধ। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ বিনির্মাণে এই যুব জনগোষ্ঠী নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিষয়টি অনুধাবণ করে আওয়ামী লীগ বিগত নির্বাচনের সময় তাদের নির্বাচনী ম্যানিফ্যাস্টোতে শুধুমাত্র যুবদের জন্য একটি বিশেষ অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করে। বাংলাদেশে যুব উন্নয়নের ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক। এমনকি নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় সারা বাংলাদেশ ঘুরে রাজনীতির সঙ্গে সংযুক্ত নয় বরং সামজিক আন্দলনে যুক্ত এমন যুবদের সঙ্গে মত বিনিময় করেন। আর নির্বাচনী মেনিফ্যাস্টোতে এই মতবিনিময়ের প্রতিফলন ছিল সুস্পষ্ট।

একই প্রতিফলন সংশোধিত যুব নীতিমালায় পড়বে – এটাই ছিল কাঙ্ক্ষিত। তথাপি কিছু বিষয় ঘোলাটেই রয়ে গিয়েছে। যেমন যুব ক্ষমতায়ন। স্বাধীনতার পর যুব মন্ত্রণালয়ের অধীনে যুব ফেডারেশন গঠিত হয়। পরে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, মেধা-সংকট এবং রাজনীতিকরণের কারণে এই ফেডারেশন পরিত্যক্ত ও বিলুপ্ত হয়। কিন্তু যুব সামাজিক সংগঠনগুলো তখন থেকেই দাবি তোলে পুরো বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে এমন একটি যুব সংসদ গঠনের যা যুব নীতিমালা প্রণয়ন, যুব উন্নয়ন ও ‘বুদ্ধিবৃত্তিক যুব নেতৃত্ব’ নির্মানে কাজ করবে। এবং এই দাবি বরাবরই উপেক্ষিত হয়েছে।

খসড়া নীতিমালায় যুব উন্নয়নে অগ্রাধিকারের তালিকায় শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও উদ্যোগ এর পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিতভাবেই যুক্ত হয়েছে তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়ন, কিন্তু বাদ পড়ে গেছে একটা মৌলিক বিষয়।

বর্তমানে প্রতিযোগিতার বাজারে বিশ্বে প্রতিটি দেশের অগ্রগতি অনেকাংশে নির্ভর করে সে দেশের নেতৃত্ব কতটা মেধাবী কিংবা কতটা মেধাশূন্য তার ওপর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ক্ষমতাধর দেশগুলো চেষ্টা করে যাচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মেধাবী নেতৃত্বের বিকাশকে অবদমিত করতে, যাতে করে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। বিগত তিন দশকে বিশ্বের যতগুলো দেশ উন্নয়নের রোল মডেল হয়েছে, তারা এগিয়েছে মেধাবী এবং সুযোগ্য নেতৃত্বের কারণেই। কাজেই ভবিষ্যতের পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিতে হলে মেধাবী যুব নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়ায় মনোনিবেশ করতে হবে। আর কেবল প্রশিক্ষণ দিয়ে নেতা তৈরি করা যায় না, নেতৃত্ব বিকাশে প্রয়োজন হয় সহায়ক পরিমণ্ডল, যথাপোযুক্ত সুযোগ এবং গুণগত বিকাশের পরিচর্যা। কাজেই মেধাবী যুব নেতৃত্বের বিকাশ যদিও যুব নীতিমালার প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল, তথাপি খসড়া নীতিমালায় তা একেবারেই অনুপস্থিত। এটা কি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্তাদের মেধাদারিদ্রের কারণে, নাকি এর পেছনে অন্যকোনও বিষয় রয়েছে আছে, তা বোঝা যায়নি।

তবে সামগ্রিক বিচারে খসড়া নীতিমালায় যুব কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্তারোপ প্রশংসনীয়। বিশেষ করে আইসিটি ভিত্তিক স্টার্টাপগুলোকে স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানের প্রস্তাব বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানকে পোক্ত করতে সহায়তা করবে। এছাড়া সেচ্ছাসেবাকে অভিজ্ঞতা হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাবনা একটি বড় ইতিবাচক অগ্রগতি।

শুধু স্বাধীনতার জন্য বুকের রক্ত ঢেলে দেওয়াই নয়,স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে আজকের অবস্থানে আনার পেছনে কোটি যুবার হাত দেশে এবং বিদেশে পরিশ্রম করে যাচ্ছে নিরন্তর। একটি সময়োপযোগী যুব নীতিমালা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে অনেকদূর। আর এই নীতিমলা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে যুব অংশগ্রহণ অপোসযোগ্য নয়।

লেখক: ট্রাস্টিবোর্ড সদস্য, ইউনাইটেড ন্যাশনস ইয়ুথ অ্যান্ড স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ।

লাইভ

টপ