behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Led ad on bangla Tribune

'বিজ্ঞান আসলে ছবির মতোই চমৎকার!'

নওরিন আক্তার১৬:২২, জানুয়ারি ২১, ২০১৬

মহাজাগতিক বিষয়বস্তু তিনি আঁকেন সুনিপুণ দক্ষতায়। রহস্যময় ছায়াপথ এসে থমকে দাঁড়ায় তার তুলির টানে। অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে আঁকাআঁকি নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোন পড়াশোনাই করেননি তিনি! তিনি শিল্পী আরিফ আহমেদ। ধানমন্ডির দৃক গ্যালারিতে চলছে মহাজাগতিক বিষয়বস্তু নিয়ে তার একক চিত্র প্রদর্শনী-‘সায়েন্স ইন্সপায়ার্ড পেইন্টিং।’ কাজের প্রেরণা, আগ্রহ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শিল্পী আরিফ আহমেদ মুখোমুখি হয়েছিলেন বাংলা ট্রিবিউনের।  

শিল্পী আরিফ আহমেদ

বাংলা ট্রিবিউন: বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো এ ধরনের প্রদর্শনী আয়োজিত হলো। কেন বিষয়বস্তু হিসেবে মহাকাশকে বেছে নেওয়া?

আরিফ আহমেদ: মহাকাশ নিয়ে প্রচণ্ড আগ্রহ আমার বরাবরই। আর আঁকাআঁকির ইচ্ছা তো ছিলো সেই স্কুল জীবন থেকেই। একসময় চাইতাম মহাকাশ নিয়ে পড়াশোনা করবো। চারুকলায় পড়ারও ইচ্ছা ছিলো। শেষ পর্যন্ত কোনটাই হয়নি। কিন্তু আগ্রহের জায়গাটি কমেনি কখনও।

 

বাংলা ট্রিবিউন: প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া প্রতিটি ছবির কাজ অত্যন্ত নিখুঁত। এতো নিখুঁত কাজের পেছনের নিশ্চয় প্রচুর পড়াশোনা আছে?

আরিফ আহমেদ: মহাকাশ বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো সম্পর্কে জেনেছিলাম কলেজ জীবনে। আসলে ছোটবেলা থেকেই মহাকাশের প্রতিটি বিষয় খুব আগ্রহ করে পড়তাম। এমনকি আমি নিজে রিফ্লেক্টিং টেলিস্কোপও বানিয়েছিলাম আকাশ দেখার জন্য। প্রচণ্ড আগ্রহ, অধ্যাবসায় এবং ইচ্ছাশক্তিই ছিলো এসব ছবির পেছনের গল্প।

সায়েন্স ইন্সপায়ার্ড পেইন্টিং এক্সিবিশন

বাংলা ট্রিবিউন: পেইন্টিংগুলো কোন মাধ্যমে করা হয়েছে?
আরিফ আহমেদ: বেশিরভাগই অ্যাক্রেলিকে করা হয়েছে। কিছু আছে অয়েল, মিক্স মিডিয়া ও সাদা টেক্সচারে। কাপড়ের ক্যানভাস ব্যবহার করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ যেন মহাকাশের রহস্যময়তা বুঝতে সেভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছি।  

নিজের আঁকা ছবির সঙ্গে শিল্পী আরিফ আহমেদ


বাংলা ট্রিবিউন: মহাকাশের কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে?

আরিফ আহমেদ: মহাকাশের রহস্যময়তা খুব চমৎকার। এতো বিশাল এর আয়তন যে, জানতে শুরু করলে হারিয়ে যেতে হয়। প্রদর্শনীতে যে চিত্রকর্মগুলো রয়েছে, সেগুলো বেশিরভাগই নেবুলার উপর করা। নেবুলা খুব ইন্টারেস্টিং একটা জিনিস। এটি আসলে হাইড্রোজেন হিলিয়াম এবং ডাস্টের একটি মিশ্রণ। নেবুলা অনেক বেশি রঙিন হয়। মেঘের মতো বিভিন্ন আকৃতিরও হয়। মহাকাশের কয়েক হাজার আলোকবর্ষ জুড়ে ছড়ানো থাকে নেবুলা। সাধারণ ক্যামেরা দিয়ে দেখা যায় না অবশ্য। অ্যাস্ট্রোনোমিকাল ক্যামেরা দিয়ে দেখতে হয় নেবুলা। নামগুলোও অনেক মজার। যেমন ঈগল, ক্র্যাব।

 

বাংলা ট্রিবিউন: পেশাগত জীবনে তো আপনি অধ্যাপনা করছেন?

আরিফ আহমেদ: আমি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মাল্টিমিডিয়া অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ টেকনোলোজি বিভাগের এসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে কাজ করছি। পাশাপাশি ‘আরিফ অ্যাকাডেমি অব ভিজুয়াল আর্ট’ নামে আমার একটি নিজস্ব প্রতিষ্ঠান আছে। এখানে মূলত অ্যাডভান্স লেভেলের থ্রিডি, ক্যারেকটার অ্যানিমেশনসহ এমন কিছু কোর্স করানো হয় যেটা অন্য কোথাও করানো হয় না।  

শিক্ষার্থীরা এসেছিল প্রদর্শনী দেখতে
বাংলা ট্রিবিউন:
বাংলাদেশে এ ধরনের বিজ্ঞানমনস্ক কাজ কেন সেভাবে হচ্ছে না বলে আপনার ধারণা?   

আরিফ আহমেদ: আসলে একটা ব্যাপার কী, আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটি ধারনা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে বিজ্ঞান মানেই অংক, সূত্র এবং কঠিন কোনও বিষয়। এটা একদমই ঠিক নয়। বিজ্ঞান খুবই মজার বিষয়। বিজ্ঞানকে জানলে অনেক নতুন বিষয় সম্পর্কে জানা যায়। আমার প্রদর্শনীতে যে শিশুরা এসেছে, তারা সবাই কিন্তু কয়েকটি করে নতুন শব্দ শিখেছে। তারা আগ্রহ নিয়ে দেখেছে মহাকাশের রঙিন রূপ। আমি তাদেরকে বলতে চাই, বিজ্ঞান আসলে ছবির মতোই চমৎকার! কেবল জানার ইচ্ছাটা থাকতে হবে। আবার আরেকটা বিষয় হচ্ছে আমাদের দেশে যারা চারুকলায় পড়ছে তাদের বেশিরভাগেরই স্বপ্ন থাকে পাশ করার পর পিকাসো অথবা লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মতো শিল্পী হওয়ার। কিন্তু পাশ করার পর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে সে শখ আর পূরণ হয় না। কেউ কেউ ছবি আঁকলেও বিষয়বস্তু থাকে একেবারেই গতানুগতিক। যেমন ফুল, পাখি, মানুষ, প্রকৃতি। এগুলো বিষয়বস্তু হিসেবে অবশ্যই ভালো। কিন্তু এগুলো থেকে বের হয়ে নতুন কিছু করতে পারলে সেটাও একটা চমৎকার পরিবর্তন হতো। এভাবে কেউ ভাবে না।

শিল্পী আহসান হাবীবের সঙ্গে...

বাংলা ট্রিবিউন: এটাই তো আপনার প্রথম একক প্রদর্শনী। তার উপর গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে একেবারে নতুন একটা বিষয় নিয়ে। অভিজ্ঞতার কথা বলুন।

আরিফ আহমেদ: ২০০৫ সালে গ্রুপ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছিলাম। এটাই আমার প্রথম একক প্রদর্শনী। এবং সত্যি কথা বলতে কী, এতো বেশি সাড়া পাবো সেটা কখনও চিন্তাও করিনি। উদ্বোধনীর দিন থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিদিনই প্রচুর মানুষ এসেছেন প্রদর্শনী দেখতে। অনেক স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা এসেছে দলবেঁধে। আজকে যেমন বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে অনেকে চলে এসেছেন প্রদর্শনী দেখতে। গতকাল একজন এসেছিলেন কুমিল্লা থেকে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমার কাছ থেকে কালকে একজন ছবি কিনেছেন, উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন। এটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া।

 

বাংলা ট্রিবিউন: তাহলে তো বলতে হয় প্রথম উদ্যোগ হিসেবে সফল একটি প্রদর্শনী এটা! এ উদ্যোগের পেছনে কার অনুপ্রেরণা সবচেয়ে বেশি ছিলো?  

আরিফ আহমেদ: সফলভাবে এ প্রদর্শনী আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে কেবল আহসান হাবীবের অনুপ্রেরণাতেই। উনার সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক আগে থেকেই। আমি তখন শখের বশে ল্যান্ডস্কেপ, স্ক্রিন লাইটের কাজ করতাম। উনি আমার কাজ দেখে প্রশংসা করতেন এবং আরও ভালো কিছু করার অনুপ্রেরণা দিতেন। উনার আগ্রহেই আজকের এই প্রদর্শনী। তাই আমি বিশেষভাবে ধন্যবাদ দিতে চাই উন্মাদ ও আহসান হাবীবকে।

শিল্পী আরিফ আহমেদ


বাংলা ট্রিবিউন: ভবিষ্যতে এ ধরনের নতুন কিছু করার ইচ্ছা আছে কী?

আরিফ আহমেদ: অবশ্যই! আসলে এটা তো কেবল শুরু। এই প্রদর্শনী থেকে পাওয়া উৎসাহ আমাকে নতুনভাবে চিন্তা করার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। বিশেষ করে তরুণরা এতো বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে যে এটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া ছিলো। ভবিষ্যতে অ্যানিমেশনের মাধ্যমে কিছু করার ইচ্ছা আছে। এটা তো ছিলো সায়েন্স ইন্সপায়ার্ড পেইন্টিংস। সামনে ‘সায়েন্স এনাবেল পেইন্টিং’ নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আছে।  

 

বাংলা ট্রিবিউন: ‘সায়েন্স এনাবেল পেইন্টিং’ ব্যাপারটা কী?
আরিফ আহমেদ: এটা সরাসরি বিজ্ঞান ব্যবহার করে আঁকা হবে। যেমন কেমিক্যাল রিঅ্যাকশন বা  যন্ত্র ব্যবহার করে ছবি আঁকা। সেন্ট্রি ফিউগাল ফোর্স বা কেন্দ্র বিমুখী বল প্রয়োগ করে ব্যবহার করা হবে বিজ্ঞানচালিত যন্ত্র। কেউ যদি বলেন ছবি আঁকার মধ্যে বিজ্ঞান কেন আসবে তাহলে আমি তার সঙ্গে একমত নই। যুগ এগিয়ে যাচ্ছে, পরিবর্তিত হচ্ছে প্রযুক্তি। আমাদেরকেও এগিয়ে যেতে হবে। নতুন কিছুকে স্বাগত জানানো মানে কিন্তু এই না যে আমরা পুরনোকে ভুলে যাচ্ছি অথবা হারিয়ে ফেলছি। বরং এর মানে আমরা পুরনোকে আরও সমৃদ্ধ করছি, সেই সঙ্গে আমরা নিজেরা সমৃদ্ধ হচ্ছি।    

 

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
/এনএ/

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune
টপ