তুরাগের নদে ভেসে ওঠা প্রশ্নগুলো

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
২৮ জুন ২০২৬, ১৪:০২আপডেট : ২৮ জুন ২০২৬, ১৫:০৭

তুরাগ নদী থেকে দুই দিনে তিন তরুণের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা গভীর উদ্বেগ, বেদনা এবং অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একটি সভ্য, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমরা কখনোই এমন দৃশ্য দেখতে চাই না— যেখানে কোনও তরুণ নিখোঁজ হবে, পরে তাঁর মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করা হবে, আর পরিবারগুলো প্রিয়জন হারানোর শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়বে। এই মৃত্যুগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি মরদেহের পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, অসংখ্য স্বপ্ন, অপূর্ণ সম্ভাবনা এবং অসহনীয় এক শোকের ইতিহাস।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তুরাগ নদী থেকে উদ্ধার হওয়া তিনজনের মধ্যে অন্তত দুজনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে— এগুলো কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে? কোনও পরিকল্পিত সহিংসতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এতে জড়িত ছিল কিনা, তা নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, ঘটনাগুলোকে সাধারণভাবে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক পরিচয় কখনোই একজন নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে না। মত ও পথের পার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই ভিন্নমত কখনোই সহিংসতার কারণ হতে পারে না। রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, প্রত্যেক মানুষের জীবন সমান মূল্যবান এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদগুলোরও পক্ষভুক্ত। ফলে কোনও ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার হলে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো দ্রুত, নিরপেক্ষ, কার্যকর এবং স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা।

এই ঘটনার একটি বিশেষ দিক গভীরভাবে নাড়া দেয়। গণমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহত সুমনের পরিবারের সদস্যরা তাঁর মোবাইল থেকে সব ছবি মুছে ফেলেছেন, বাসায় থাকা ছবিগুলো ছিঁড়ে ফেলেছেন, এমনকি তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটিও ভেঙে ফেলেছেন। সন্তান হারানোর অসহনীয় শোক মানুষকে অনেক সময় এমন কিছু করতে বাধ্য করে, যা বাইরে থেকে অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। প্রিয়জনের স্মৃতি চোখের সামনে থাকলে যন্ত্রণা আরও তীব্র হয়ে ওঠে—এমন অনুভূতি শোকাহত পরিবারের মধ্যে কাজ করতেই পারে। সে বাস্তবতাকে অবশ্যই সম্মান জানাতে হবে।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়। একজন বাবা-মা, যাঁরা সন্তানের মৃত্যুর শোকে বিপর্যস্ত, তাঁরা কেন সন্তানের সব স্মৃতি একযোগে মুছে ফেলতে চাইবেন? এটি কি শুধুই অসহনীয় শোকের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে? পরিবারটি কি কোনও ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক বা অন্য কোনও চাপের মুখে ছিল? কেউ কি তাঁদের ভয়ভীতি দেখিয়েছে বা প্রভাবিত করেছে? নাকি এটি সম্পূর্ণভাবে তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত? এসব প্রশ্নের উত্তর আজ জানা না গেলেও, একটি নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সুমনের পরিবারের সদস্যরা এবং স্বজনেরা এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে অনাগ্রহী ছিলেন, অনেক প্রশ্নের জবাবে তাঁরা নীরব থেকেছেন। সন্তান হারানোর শোকে বিপর্যস্ত একটি পরিবারের নীরবতা অবশ্যই সংবেদনশীলতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। গভীর শোক মানুষকে বাকরুদ্ধ করে দিতে পারে— এটাই স্বাভাবিক। তবে একইসঙ্গে প্রশ্নও উত্থাপিত হয়, এই নীরবতা কি শুধুই শোকের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর পেছনে অন্য কোনও কারণ রয়েছে? পরিবারটি কি কোনও ধরনের ভয়, অনিশ্চয়তা বা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল? একটি নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের স্বার্থে বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

কারণ, একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্তে কোনও তথ্যই তুচ্ছ নয়। প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি আলামত, প্রতিটি পরিস্থিতি তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন একজন তরুণ নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার হয় এবং পরে তাঁর স্মৃতিচিহ্নগুলো দ্রুত সরিয়ে ফেলা হয়, তখন তদন্তকারী সংস্থার দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় ঘটনার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা। সত্য উদ্‌ঘাটনের স্বার্থে কোনও সম্ভাবনাকেই আগেভাগে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।

এখানে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের তথ্য, দাবি ও পাল্টা দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তুরাগে লাশ উদ্ধার বিষয়ে কয়েকটি প্রচারিত তথ্য ভিত্তিহীন, অন্যদিকে বিভিন্ন মহল ভিন্ন দাবি করছে। এ ধরনের পরিস্থিতি গুজব, বিভ্রান্তি এবং অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করে। যখন রাষ্ট্র দ্রুত, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে তথ্য উপস্থাপনে ব্যর্থ হয় বা বিলম্ব করে, তখন গুজবই সত্যের জায়গা দখল করে নেয়। একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।

বাংলাদেশের ইতিহাসে রহস্যজনক মৃত্যু, রাজনৈতিক সহিংসতা, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং বিভিন্ন অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা জনমনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। বিচারহীনতার দীর্ঘ সংস্কৃতি মানুষের আস্থাকে দুর্বল করেছে। ফলে আজ যখন রাজনৈতিক পরিচয়সম্পন্ন তরুণদের মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার হয়, তখন মানুষের মনে সন্দেহ, শঙ্কা ও প্রশ্ন তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এই সন্দেহ দূর করার একমাত্র পথ হলো স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পেশাদার তদন্ত।

তুরাগের এই মৃত্যুগুলোর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়— এটি মানবাধিকার, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহির প্রশ্ন। রাষ্ট্রের উচিত ঘটনাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা, প্রয়োজনে উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা এবং তদন্তের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা। কারণ, সত্য গোপন থাকলে শুধু কয়েকটি পরিবারের বেদনা দীর্ঘস্থায়ী হবে না, রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থার সংকট কিন্ত আরও গভীর হবে।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
হেফাজতে নির্যাতন: আইন আছে, বিচার নেই কেন? 
একটি অসত্য দাবি এবং জনআস্থার প্রশ্ন 
ফুটবল থাকবে, কিন্তু এই গল্পটা আর থাকবে না 
সর্বশেষ খবর
সব শ্রেণির মানুষের প্রতিচ্ছবি বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে: রাশেদ আল মাহমুদ
সব শ্রেণির মানুষের প্রতিচ্ছবি বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে: রাশেদ আল মাহমুদ
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় সাবেক এমপি নূর মোহাম্মদের তিন দিনের রিমান্ড
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় সাবেক এমপি নূর মোহাম্মদের তিন দিনের রিমান্ড
বিচার বাধাগ্রস্ত করতে ট্রাইব্যুনাল আইন নিয়ে রিট: চিফ প্রসিকিউটর
বিচার বাধাগ্রস্ত করতে ট্রাইব্যুনাল আইন নিয়ে রিট: চিফ প্রসিকিউটর
হরমুজ এখনও সম্পূর্ণ ইরানের নিয়ন্ত্রণে: আরাঘচি
হরমুজ এখনও সম্পূর্ণ ইরানের নিয়ন্ত্রণে: আরাঘচি
সর্বাধিক পঠিত
সড়কের দুই পাশে সারি সারি কালেমার পতাকা, প্রশাসনের নজরদারি
সড়কের দুই পাশে সারি সারি কালেমার পতাকা, প্রশাসনের নজরদারি
১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব সংসদে
১০০০ ও ৫০০ টাকার নোট বাতিলের প্রস্তাব সংসদে
চীনা কোম্পানিকে ১৮ মাসের চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী: বিডা চেয়ারম্যান
চীনা কোম্পানিকে ১৮ মাসের চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী: বিডা চেয়ারম্যান
তুরাগ নদ থেকে ৩ লাশ উদ্ধার, জানা গেলো পরিচয় 
তুরাগ নদ থেকে ৩ লাশ উদ্ধার, জানা গেলো পরিচয় 
ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে যা জানালো আইভ্যাক
ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে যা জানালো আইভ্যাক