সেকশনস

লিঙ্গ বৈষম্য শেখানোর পাঠ্যপুস্তক

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০১৭, ১২:৩০

সাদিয়া নাসরিন (১) জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পাঠ্যপুস্তক রচনা ও সম্পাদনায় যে সব পুরুষ এবং নারীরা আছেন তাদের জেন্ডার সংবেদনশীলতা খুব নিম্নস্তরে। কিন্তু সেই নিম্নেরও যে একেবারে তলদেশ আছে, এবং তারা সেই তলদেশে পড়ে গেছেন তার প্রমাণ পাওয়া গেল এবছরের পাঠ্যপুস্তকে। প্রথম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইয়ে পাঠ ১২-তে ‘ও’ অক্ষর চেনানোর উপকরণ হিসেবে ‘ওড়না’কে ব্যবহার করা হয়েছে। মেয়ে শিশুর ছবি দিয়ে লেখা হয়েছে- ‘ওড়না চাই’। এর আগে ও আমরা বোর্ডের দ্বাদশ শ্রেণির ‘পৌরনীতি ও নৈতিক শিক্ষা’ দ্বিতীয় পত্রের পাঠ্য বই ও গাইড বই দশম অধ্যায়ে দেখেছি ইভ টিজিংয়ের কারণ হিসেবে মেয়েদের ‘অশালীন পোশাক ও বেপরোয়া চালচলন’ এর কথা লেখা হয়েছে। এবার মায়ের পেট থেকে পড়ার সাথে সাথেই আমাদের শিশুদের ওড়না চেনানো বাধ্যতামূলক করার ইজারাটা এনসিটিবিকে দেওয়া হয়েছে!
(২) এনসিটিবি’র তৃতীয় শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ বইতে বহুবচন এর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, ‘যা দিয়ে একাধিক ব্যক্তি বা বস্তু বোঝায় তাকে বহুবচন বলে। উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, 'মায়েরা বড় দুর্বল'। বইটি লিখেছেন, অধ্যক্ষ মো. জয়নাল আবেদীন। একই বইতে তিনি মাতা-পিতার প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য বিষয়ক রচনায় লিখেছেন, ‘মা, দিনরাত সন্তানের সেবা যত্ন করেন, আর বাবা জোগান দেন সন্তান বেঁচে থাকার খাবার, ওষুধ ও কাপড়। বাবার পরিচয়ে সন্তান গড়ে উঠে’। আমার গ্রেড থ্রিতে পড়া শিশুপুত্র বইতেই এই লাইনটি কেটে দিয়ে লিখেছে, ‘মায়েরা বড় শক্তিশালী। কারণ মায়েরা অনেক টাকা রোজগার করতে পারে, আমাদের জন্ম দিতে পারে।’
দশ বছর বয়সী একটা শিশুর বোধটুকুও এই অধ্যক্ষের নেই যে, বাবা-মাকে আইডল বানিয়ে শিশুদের মনস্তত্ত্বে লিঙ্গ বৈষম্যের বিষ ঢুকিয়ে দেন! তার কাছে মায়েরা দুর্বল! বাবার পরিচয়ে সন্তান গড়ে ওঠে! আর মা? মায়ের পরিচয় দরকার নেই সন্তানের জীবনে? বাবা হলেন রুটি-রুজির মালিক, সন্তানের পরিচয়দাতা! মানে সন্তানের জীবনের প্রথম ঈশ্বর পিতা? মায়ের কাজ সন্তানের সেবা যত্ন করা আর রান্না করা, মানে বুয়ার মহান ভার্সন?

(৩) চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বইয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বীরপুরুষ’ কবিতাটির নামকরণই বলে দিচ্ছে বীর কেবল পুরুষই হতে পারে, নারী নয়। কবিতাটিতে দেখানো হয়েছে, একদল ডাকাতের সঙ্গে যুদ্ধ করে মাকে রক্ষা করছে তার শিশুপুত্র। মা তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলছেন, ‘ভাগ্যিস খোকা ছিল!’ বয়সে বড় হওয়া সত্ত্বেও কেবল নারী হওয়ার কারণেই তার রক্ষাকর্তার ভূমিকায় শিশুপুত্র? যে শিশুটি তৃতীয় শ্রেণিতে ‘মায়েরা দুর্বল’ শিখে বড় হচ্ছে সে-ই পরের ক্লাসে শিখছে মায়েরা এতো দুর্বল যে, নিজের জীবন রক্ষা করার জন্য তাকে শিশুপুত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়!

(৪) ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পাঠ্যপুস্তক নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী। তারা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ২৫ টি বইয়ের ৩ হাজার ৪৬৪ পৃষ্ঠা বিশ্লেষণ করেছেন। এই গবেষণার কিছু উল্লেখযোগ্য তথ্য পাঠকদের জানাতে চাই:  

(ক) পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে সবাই পুরুষ। পাঠ্যপুস্তক রচনা ও সম্পাদনায় মোট পুরুষ ছিলেন ১২৯ জন আর নারী ছিলেন ৩০ জন। চিত্রাঙ্কনে ও প্রচ্ছদে ৫ জন নারী আর পুরুষ ৫৬ জন।

(খ) বিভিন্ন টেক্সটের মাঝে ছবি উপস্থাপনার ক্ষেত্রে নারীর ছবি একেবারেই প্রাধান্য পায়নি। বিশেষ করে বিজ্ঞানের বইয়ে যেসব ছবি ব্যবহার করা হয়েছে তার সব-ই ছেলেদের ছবি।

(গ) পাঠ্যপুস্তকে জ্ঞানের অথিউরিটি মানেই পুরুষকে দেখানো হয়েছে, এক্ষেত্রে নারীর উপস্থাপন একেবারেই দুর্বল।

(ঘ) পাঠ্যপুস্তকের গণিত বইয়ে বিভিন্ন অংকে সরাসরি বলা হয়েছে- ‘দুইজন পুরুষ যে কাজ ২ দিনে করতে পারে সেই কাজ ৩ জন নারী করে চারদিনে’ অর্থাৎ নারী পুরুষের চেয়ে দুর্বল।

(ঙ) মমতাময়ী চরিত্র মানেই সর্বদা নারীকে চিত্রায়িত করা হয়েছে আর পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি একজন পুরুষ। বইয়ের বিভিন্ন পৃষ্ঠায় আর্থিক লেন-দেন বা ক্রেতার ছবি হিসেবে পুরুষকেই দেখানো হয়েছে।

(চ) মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গদ্যগুলোতে নারীর অবদান উপেক্ষিত দেখানো হয়েছে।

(ছ) ছেলের কাজ মানেই কঠিন ও বাইরের কাজ আর মেয়ের কাজ মানেই কম পরিশ্রমের ও ঘরের কাজ দেখানো হয়েছে। পুরুষকে রোগী এবং নারীকে সেবিকা হিসেবে দেখানো হয়েছে।

(৫) তার মানে, রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থা এমন করা হয়েছে যে, শুধুমাত্র স্কুলের পাঠ্যপুস্তক পড়িয়েই আমাদের সন্তানদের সহিহ নারীবিদ্বেষী এবং জেন্ডার অসংবেদনশীল হিসেবে করে গড়ে তুলতে পারবো। ভালো, খুব ভালো। হুদাই দেশে ক্রমবর্ধমান নারী বৈষম্য, ধর্ষণ, ইভটিজিং, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, শিশুবিয়ে, যৌতুক ইত্যাদির কারণ খুঁজতে গিয়ে দিনের খাবার, রাতের ঘুম হারাম করে ফেলছি। আর অকারণেই পুরুষকূলের গুষ্টি উদ্ধার করে ফেলছি। এই রকম উন্নত (?) মানের একটি শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে যে পুত্রশিশু বা মেয়েশিশুটি শিক্ষা অর্জন করবে, সে বড় হয়ে নিপীড়ক পুরুষ হবে, পুরুষতন্ত্রের সেবাদাসী নারী হবে এটি তো থিওরি অব রিলেটিভিটি’র মতোই সরল। অতএব, পুরুষতন্ত্রের জয় হোক। স্কুলগুলো সব মাদ্রাসা হোক। ঘরে ঘরে লিঙ্গ সমতার জন্য চেঁচামেচি বন্ধ করে বরং আমরা চলুন আমাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাই যেন তারা সহিহ পুরুষ এবং নারী হিসেবে তৈরি হতে পারে। কী দরকার সমাজে অহেতুক টেনশন তৈরি করার, তাই না?

এই পাঠ্যপুস্তকগুলো যারা লিখছেন তাদের মস্তিষ্কের উর্বরতা বা ঘনত্ব নিয়ে আমার কোনও প্রশ্ন নেই। কিন্তু আমি খুব অবাক হয়েছি এটা ভেবে যে, দেশের এতজন শিক্ষাবিদ যারা পাঠ্যপুস্তক রচনা থেকে পাঠ্যসূচি অনুমোদন দেওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে কাজ করেন, তারা সবাই একসাথে এত অসংবেদনশীল হলেন কি করে? তাদের মধ্যে এমন কি কেউ নেই, যারা মা’কে রোজগার করতে দেখেছেন? আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, নারীমন্ত্রী, সাংসদ, সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদে, ব্যাংকে, পুলিশে, সেনাবাহিনীতে, এমন কী গার্মেন্ট সেক্টরে কাজ করা মায়েদের কথা ভুলে যান এমন বই অনুমোদন দেওয়ার আগে? নিদেনপক্ষে সেলাই করে হলেও, হাঁস মুরগির ডিম বা মাচার লাউটা বিক্রি করে যে মায়েরা সংসারে অর্থ সরবরাহ করেন এমন লক্ষ লক্ষ মায়েদের উপেক্ষা করার সাহস তারা পান কি করে?

আমাদের নারী রাজনীতিবিদগণের কাছে একটা অনুরোধ করি। ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ কী জিনিস, কোন প্রক্রিয়ায় আসে তা আগে নিজেরা বুঝুন। ক্ষমতায়নের শিক্ষা, উদ্যম আর মানসিকতা মানুষের মগজেই তৈরি হয়। তাই নারীর প্রতি সংবেদনশীলতাটা আর সম্মানবোধ শিশুদের মগজেই দিন। পুরুষতন্ত্রের রাজনীতিটা আগে বোঝার চেষ্টা করুন, রাজনীতিটা ওখানটাতেই করুন। পুরুষের আনুকূল্যে ক’টা আসন আর পুরুষের নিয়ন্ত্রণে রাজনীতি করে আপনারা হয়তো মনে করছেন পুরুষ নারীর জন্য রাস্তা ছেড়ে দেবে। কিন্তু পুরুষ যে এক ইঞ্চি মাটি ও নারীর জন্য ছাড়ে না তা এইরকম বিশ্রী একটা শিক্ষাবোর্ড আর ‘গড়াল মার্কা’ পাঠ্যপুস্তকের দিকে তাকালে ও বোঝেন না? এতো অসংবেদনশীল লোকজন পাঠ্যপুস্তক রচনা ও সম্পাদনায় থাকে কিভাবে? স্কুলের বইয়ে শেখাবেন ইভটিজিং এর জন্য নারীর পোষাকই দায়ী আবার নারী নির্যাতন বন্ধের আইন করবেন তা তো হয় না। এত আইন, এত সনদ আর লক্ষ্যমাত্রা পূরণে নাভিশ্বাস না তুলে বরং শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুরুষতন্ত্রের অভিশাপমুক্ত করুন। চিকিৎসার চেয়ে রোগের প্রতিকারে গুরুত্ব দিন। আমাদের শিশুদের বাঁচান।

আর আমাদের নারী অধিকার আন্দোলের নেতারা, প্রজেক্ট নির্ভর আন্দোলন থেকে বের হয়ে আসুন দয়া করে। ইউনিসেফ এর কিছু উদ্যোগ ছাড়া এনজিওদের ও উল্লেখযোগ্য কোন কাজ চোখে পড়েনি এই বিষয়ে। শিক্ষা ব্যবস্থা জেন্ডার সংবেদনশীল হলে যে নারীর প্রতি বৈষম্য ও নিপীড়ন এমনিতেই কমে যাবে সেই সত্যটুকু তো আপনাদের অন্তত না জানার কথা নয়। এত ইস্যু নিয়ে কাজ করার দরকার নেই তো। কাল থেকে একটাই আন্দোলন করুন না। পুরুষতান্ত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার জায়গাটা চিহ্নিত করুন, কাজ করার জন্য সরকারকে চাপ দিন। প্রতিটি ক্লাসে, পাঠ্যসূচিতে জেন্ডার এডুকেশন বাধ্যতামূলক করার জন্য আন্দোলন করুন। প্রতিটি স্কুলে শিক্ষকদের জেন্ডার প্রশিক্ষণের প্রজেক্ট হোক। এই একটা বিষয়ে অন্তত আপনারা ঐক্যবদ্ধ হোন, একসাথে আওয়াজ তুলুন।

লেখক: প্রধান নির্বাহী, সংযোগ বাংলাদেশ; কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

লাভ বোম্বিং: আবেগ শিকারির গোপন ক্ষেপণাস্ত্র

লাভ বোম্বিং: আবেগ শিকারির গোপন ক্ষেপণাস্ত্র

সর্বশেষ

যশোরে খুন হওয়া ব্যক্তির পরিচয় মিলেছে

যশোরে খুন হওয়া ব্যক্তির পরিচয় মিলেছে

এনআইডি জালিয়াতি:  ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র

এনআইডি জালিয়াতি: ২০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক চক্র

মে মাসের মধ্যে সবার জন্য পর্যাপ্ত টিকা পাবে যুক্তরাষ্ট্র: বাইডেন

মে মাসের মধ্যে সবার জন্য পর্যাপ্ত টিকা পাবে যুক্তরাষ্ট্র: বাইডেন

ভুট্টাক্ষেতে গৃহবধূ মরদেহ, স্বামী আটক

ভুট্টাক্ষেতে গৃহবধূ মরদেহ, স্বামী আটক

ভারতের পর জিম্বাবুয়েও করে দেখালো

ভারতের পর জিম্বাবুয়েও করে দেখালো

‘পর্যটন খাতে ধারাবাহিক উন্নয়ন অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করবে’

‘পর্যটন খাতে ধারাবাহিক উন্নয়ন অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করবে’

সিংগাইরে ছাত্রলীগ নেতা হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার ৩

সিংগাইরে ছাত্রলীগ নেতা হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার ৩

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা প্রত্যাহার চেয়ে  ‘সিটিও ফোরাম’ সভাপতির চিঠি

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা প্রত্যাহার চেয়ে  ‘সিটিও ফোরাম’ সভাপতির চিঠি

গ্রেফতারকৃতদের জামিন না দেওয়ায় ফের মশাল মিছিল

গ্রেফতারকৃতদের জামিন না দেওয়ায় ফের মশাল মিছিল

৩৭১ ইউনিয়ন পরিষদে ভোটের তারিখ ঘোষণা

৩৭১ ইউনিয়ন পরিষদে ভোটের তারিখ ঘোষণা

আফগানিস্তান না খেললে ‘বিকল্প’ আছে বাংলাদেশের

আফগানিস্তান না খেললে ‘বিকল্প’ আছে বাংলাদেশের

খাল থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার

খাল থেকে অজ্ঞাত ব্যক্তির লাশ উদ্ধার

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.