X
সোমবার, ২৬ জুলাই ২০২১, ১০ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

একজন নির্মাতা পরোক্ষভাবে নিজেকেই প্রকাশ করেন : আবু সাইয়ীদ

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০১৯, ০৮:০০

আবু সাইয়ীদ ১৯৮৮ সালে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আবর্তন’ নির্মাণের মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালনা শুরু করেন। সেটি সে বছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আসরে শ্রেষ্ঠ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। ১৯৯২ সালে নির্মাণ করেন দ্বিতীয় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ধূসর যাত্রা’। সেটিও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।
২০০০ সালে তিনি প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। সেলিম আল দীনের কাহিনী ও চিত্রনাট্য অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রটির নাম ‘কিত্তনখোলা’। যার জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালক বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। এছাড়া বিভিন্ন দেশে-বিদেশে তার চলচ্চিত্র প্রদর্শিত ও পুরস্কৃত হয়েছে।

প্রশ্ন : মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের বাইরে ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম নির্মাণের যে চর্চা সেখানে আমাদের অর্জন কেমন?

উত্তর : বাংলাদেশে একজন ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম মেকারের সংগ্রাম বহুমাত্রিক। চলচ্চিত্রে যে সৃজনশীল চিন্তার চর্চা থাকতে হয় আমাদের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে তা একেবারেই অনুপস্থিত। এই ধরনের চলচ্চিত্রে প্রেমের গল্প ছাড়া অন্য কিছুই সেভাবে ভাবা হয় না। একটি প্রেমের গল্পকে উপস্থাপনের জন্য এমন সব উপকরণ থাকে, যা প্রায় সব চলচ্চিত্রে একই। আর সেজন্য কমার্শিয়াল চলচ্চিত্রকে ফর্মুলা চলচ্চিত্রও বলা হয়ে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে এইসব ফর্মুলা চলচ্চিত্রকেই চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। এটা এক ধরনের বন্ধ্যাত্ব। সেকারণে এ ধরনের চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা ওঠা দর্শকের পক্ষে ইনডিপেনডেন্ট চলচ্চিত্রকে চলচ্চিত্র হিসেবে নেয়াটা কঠিন হয়ে যায়। আবার দেখুন: এক ধরনের দর্শক বা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট মানুষ তথাকথিত জীবনঘনিষ্ঠ বা বক্তব্যধর্মী চলচ্চিত্রকেই ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম মনে করে থাকেন। আমি যখন ১৯৮৮ সালে ‘আবর্তন’ শিরোনামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করি তখন অনেক দর্শকই এ চলচ্চিত্রটিকে গ্রহণ করেননি। কারণ তখন মনেই করা হত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু মানেই মুক্তিযুদ্ধ, খেটে খাওয়া মানুষ, মাদকদ্রব্য ইত্যাদি। ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মের ধারণা নির্দিষ্ট আবর্তে ঘুরপাক খাওয়া কোনো কাজের কথা নয়। এটিও এক ধরনের বন্ধ্যাত্ব। বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা থাকতে হবে ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মে। আরো গভীরে গিয়ে ভাবতে হবে। সার্বিক বিবেচনায় যদি আপনি অর্জনের কথা বলেন, আমাদের অর্জন অনেক তা আমি বলব না। তবে ইনডিপেনডেন্ট চলচ্চিত্রের এক ধরনের চর্চা হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে আমরা একটা জায়গায় পৌঁছাতে পারবো এটা বলা যায়। তবে কতটা সময়ে তা নির্ভর করবে আমরা নিজেদেরকে চলচ্চিত্র বোঝাপড়ার দিক থেকে কতটা প্রস্তুত করতে পারলাম।

 

প্রশ্ন : বাংলাদেশে একটা প্রজন্ম চলচ্চিত্র নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে কি না? গান নাচ থাকলেই তাকে চলচ্চিত্র বলা হবে এ ধারণার পেছনে কী কারণ?

উত্তর : যদি আপামর দর্শকের দৃষ্টিতে বলেন তাহলে একরকম। আবার যদি বলেন যারা চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত তাদের কাছে একরকম। আপনি সামগ্রিক না কি পার্টিকুলার দর্শকের কথা বলছেন সেটাই কথা। সবাই সব চলচ্চিত্র গ্রহণ করবে না। দর্শক চলচ্চিত্রকে কিভাবে দেখে সেটা আপনাকে চিন্তা করতে হবে। অনেকে হয়তো ইউরোপীয় ধারার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বা আমেরিকান কমার্শিয়াল সিনেমা, যেখানে একটা অ্যাপ্রোচ আছে সে সিনেমাগুলোতে প্রভাবিত হচ্ছে। ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মের পাইওনিয়ার ভারত বা বাংলাদেশ নয়। আমেরিকা থেকে আসা তাই সেখানকার দর্শক আপগ্রেড থেকেই যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের দর্শকের এক ধরনের সীমাবদ্ধতা আছে। এখানে ফিল্মের ধারণাতেও অনেক গ্যাপ আছে। তারপরেও কিছু দর্শক আছে যারা ফিল্মটাকে তাদের চিন্তার ভেতর থেকে দেখার চেষ্টা করেন।

 

প্রশ্ন : আপনার চলচ্চিত্র-যাত্রা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র থেকে শুরু। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছেন। বাংলাদেশে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পৃষ্ঠপোষকতা কম কেন?

উত্তর : শুধু স্বল্পদৈর্ঘ্যই নয়, বাংলাদেশে সমগ্র ইনডিপেনডেন্ট ফিল্মের পৃষ্ঠপোষকতাই কম। এখানে যে নির্মাতারা টিকে আছেন বা টিকে ছিলেন তারা নিজস্ব প্রাণশক্তির জোরেই সেটা পেরেছেন। তবে আমি মনে করি স্বল্পদৈর্ঘ্যে স্ট্রাগলটা বেশি। নতুন এবং তরুণরা সাধারণত স্বল্পদৈর্ঘ্য নির্মাণ করে থাকেন, তাদের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সত্যিই কঠিন। আশি-নব্বই দশকে শর্টফিল্মের একটা দর্শক ছিল। তখন শর্টফিল্মের প্রদর্শনী হত কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিভিন্ন জেলা শহরে। কিন্তু এখনকার সময়ে তেমনটা হচ্ছে না।

 

প্রশ্ন : মহাভারতের গল্পে আপনি ‘রূপান্তর’নির্মাণ করেছেন। দ্রোণাচার্য একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুল কেটে নিচ্ছে। তারপর মধ্যমা দিয়ে তীর চালনা করার নিয়ম শুরু হচ্ছে। সেখানে চলচ্চিত্রটির গল্পেই পরিচালক তার চলচ্চিত্রের নাম ‘গুরুদক্ষিণা’থেকে পরিবর্তন করে ‘রূপান্তর’রেখেছেন। তো সাহিত্য থেকে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে আপনার এই যে নিজের রূপান্তরের ভাবনা, এক ভাবনা থেকে আরেক ভাবনায় চলে যাওয়া, এটা একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র পরিচালকের জন্য কতটা জরুরি এবং আজকের পরিচালকদের মধ্যে এটা দেখতে পান কি না?

উত্তর : খুবই জরুরি। শুধু নির্মাতার জন্য নয়, একজন মানুষের জন্যও জরুরি। আমি যে রিয়েলিটির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি সেটা যদি আমাকে একসময় অনুভব করায় যে আমি ভুল পথে হাঁটছি তাহলে অবশ্যই আমাকে নতুন পথ খুঁজে নিতে হবে। এই নতুন পথই তখন হবে আমার চিন্তা ও কর্মের পথ। এইভাবে প্রতিটি মানুষকে এগিয়ে যেতে হয়। এভাবেই নতুন ভাবনার উদ্ভব ঘটে। বর্তমানে ইনডিপেনডেন্ট চলচ্চিত্রের পরিচালকেরা এক্ষেত্রে কোন পর্যায়ে আছে সেটা আমি বলতে পারব না, তবে নিশ্চয়ই তারা সাহসী। তারা ভাবতে পারেন এবং নিজের পথ খুঁজে নিতে পারেন বলে আমার ধারণা।

 

প্রশ্ন : আপনি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে আপনার চলচ্চিত্রে বিভিন্নভাবে তুলে ধরেছেন। তাদেরকে নিয়ে  চলচ্চিত্র কম নির্মাণ হওয়ার কারণ কী?

উত্তর : আসলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করতে গেলে অনেক জানাশোনার বিষয় আছে। তাছাড়া এ বিষয়ে নির্মাতার আগ্রহ থাকতে হবে। বর্তমান বাস্তবতায় এ ধরনের কাজে বেশকিছু জটিলতা আছে এবং এক ধরণের সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়। তবে সবকিছুর উপরে হচ্ছে নির্মাতার আগ্রহ। একজন নির্মাতা তার আগ্রহের উপর ভিত্তি করেই কাজ করবেন এটাই স্বাভাবিক। 

 

প্রশ্ন : নাট্যকার সেলিম আল দীনের ‘কিত্তনখোলা’নাটক থেকে আপনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। নাটক থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের যে প্রক্রিয়া এখানে দৃশ্য তৈরি করা থাকে, সংলাপ দেয়া থাকে। সবকিছু একটা সাজানো অবস্থায় থাকে। নাটকে স্ক্রিপ্টের কাজ অনেকটাই নাট্যকার দিয়ে দেন। নাটক থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ তুলনামূলক সহজ?

উত্তর : একদিকে যেমন সহজ আবার অন্যদিকে জটিলও। একটি নাটকের পাণ্ডুলিপিতে অনেক কিছু পাচ্ছি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো অনেককিছুকে বাদ দিতে হয় এবং অনেক কিছুকে যুক্ত করতে হয়। শুধু নাটক নয় কোনো উপন্যাস থেকে চিত্রনাট্য লেখার সময় সংযোজন-বিয়োজনটা ঠিকমতো হওয়া চাই। কী কী বাদ দিতে হবে আর কী কী রাখতে হবে এই সিদ্ধান্ত নেয়াটা অতি গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যদি বলেন যে, তিনি সাহিত্যকর্মটি হুবহু অনুসরণ করে চলচ্চিত্র বানিয়েছেন তাহলে বুঝতে হবে তার সাহিত্য ও চলচ্চিত্র বোঝাপড়ার মধ্যে কোনো সমস্যা আছে। আমার ‘কিত্তনখোলা’চলচ্চিত্রে অনেক চরিত্র বাদ দেয়া হয়েছে আবার অনেক চরিত্রের পরিধি ছোট করে আনা হয়েছে। আবার নাটকের শেষ দৃশ্য ও চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্য একেবারেই আলাদা। হুমায়ূন আহমেদের ‘জনম জনম’ উপন্যাস নিয়ে ‘নিরন্তর’ নামে যে চলচ্চিত্রটি আমি নির্মাণ করেছি সেখানে তিনি কিন্তু তিথির প্যারালাল আরো কয়েকটি চরিত্র নির্মাণ করেছিলেন কিন্তু আমি শুধুমাত্র তিথিকে কেন্দ্র করেই চলচ্চিত্রটি বানিয়েছি। এই যে বাদ দেয়া বা সিদ্ধান্ত নিতে পারাটা, সেটাও খুব দরকারি। হুমায়ূন আহমেদের অনেক লোভনীয় সংলাপ বাদ দিয়ে আমি নতুন করে সংলাপ লিখেছি। নাসরীন জাহানের উপন্যাস থেকে ‘শঙ্খনাদ’ নির্মাণ করেছি সেখানেও তাই ঘটেছে। চন্দ্রানীর মতো চরিত্রকে বাদ দেয়া হয়েছে। এ চলচ্চিত্রে শুধু একটি দৃশ্যে একটি বেদেনী চরিত্র আছে। সংযোজন-বিয়োজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক মাধ্যম থেকে আরেক মাধ্যমে যেতে গেলে মোডিফাই করাটা জরুরি।

 

প্রশ্ন : আপনার চলচ্চিত্রে হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি যেমন যাত্রাপালা, বাঁশি, গ্রামীণ খেলাধুলা, নদী এসবের চিত্রায়ণ আছে। একজন পরিচালকের মধ্যে তার সংস্কৃতির বোধ থাকা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ? এটা কি চলচ্চিত্র নির্মাণে সহায়তা করে?

উত্তর : সাংস্কৃতিক বোধ বা সংস্কৃতির সাথে যোগাযোগ অবশ্যই একজন পরিচালকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র বিষয়বস্তু নয়, আঙ্গিক গঠনেও এ সকল উপকরণ সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা যে ভুখণ্ডের প্রতিনধিত্ব করেন সেই ভূখণ্ডের লোকসংস্কৃতির সাথে তার যোগাযোগ আছে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অনেক সময় অনেকের ক্ষেত্রে এমনটা নাও ঘটতে পারে। যে নির্মাতা বরাবরই শহরে বসবাস করেন তাহলে তার সাথে এই সংস্কৃতির যোগাযোগ নাও থাকতে পারে। তাই এটিকে একজন নির্মাতার জন্য অনিবার্য ধরে নেবার কোনো কারণ নেই। আমাদের আবহমান সংস্কৃতি আমাদের চলচ্চিত্রে জায়গা নিক সেই চেষ্টা আমাদের করা উচিত। কিন্তু চলচ্চিত্রে এর স্থূল ও আরোপিত উপস্থাপনকে নিরুৎসাহিত করাও উচিত।

 

প্রশ্ন : ‘বাঁশি’চলচ্চিত্রে কবি জীবনানন্দ দাশের প্রসঙ্গ আছে‘বাংলাদেশের রূপবৈচিত্র্য ভবিষ্যতে থাকবে কি না’ এমন কথা একটি চরিত্র বলছে সেখানে এবং টলস্টয়ের ‘little girl wiser than menগল্পের প্রসঙ্গ আছে, ব্যাখ্যা করা হয়েছে কিভাবে সংঘাত থেকে সম্প্রীতিতে আসা যায়। এই যে বক্তব্যধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি, এ ধরনের কাজ এখন কম হচ্ছ কেন?

উত্তর :  অন্যদের কথা বলাটা আমার জন্য উচিত নয়। তবে একটি চলচ্চিত্রে বক্তব্য থাকতেই হবে আমি তা মনে করি না। বরং বক্তব্যধর্মী চলচ্চিত্রের নামে আমাদের দেশে যা বলা হয় তাতে আমার কোনো আগ্রহ নেই। বিষয়বস্তুই নির্ধারণ করবে চলচ্চিত্রের শেষটা কি হবে। আমাদের দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে ‘বাঁশি’ চলচ্চিত্রে এক ধরণের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে তবে অবশ্যই তা উচ্চকিত নয়। ‘শঙ্খনাদ’ অনেকটা রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হওয়ার পরেও ঐ অর্থে কোনো বক্তব্য তুলে ধরা হয়নি। প্রতিটি চলচ্চিত্রেই কিছু একটা বলার বা তুলে ধরার চেষ্টা থাকবে। মূল ব্যাপারটা হচ্ছে, একজন দর্শক চলচ্চিত্রটি থেকে কিভাবে বক্তব্যটি গ্রহণ করলেন।

 

প্রশ্ন : ‘নিরন্তর’চলচ্চিত্রে শাবনূরকে নেয়ার কী কারণ ছিল? তার অভিনয়ে আপনি সন্তুষ্ট ছিলেন কি না?

উত্তর : আমি চেয়েছিলেন চলচ্চিত্র অভিনেতা, অভিনেত্রী বলে যারা পরিচিত তারাও আমার চলচ্চিত্রে কাজ করুন। ‘কিত্তনখোলা’-তে যেমন আমি মৌসুমীকে কাস্ট করেছিলাম কিন্তু পরে তিনি লোকেশনে গিয়েও কাউকে না বলে চলে এসেছেন। একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণভাবে তাকে কয়েকদিন থাকতে হবে হয়তো সেজন্য তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছিলেন। এরপর আমি শাবনূর, ইলিয়াস কাঞ্চন ও ফেরদৌসের সাথে কাজ করি। শাবনূর বেশ আন্তরিকতার সাথে কাজটি করেছেন। দেশে-বিদেশের সকল দর্শক তার কাজে সন্তুষ্ট। 

 

প্রশ্ন : ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ বা গণ-অর্থায়ন থেকে এখন চলচ্চিত্র হচ্ছে। তানভীর মোকাম্মেল একটি নির্মাণ করেছেন। খন্দকার সুমন নামে তরুণ পরিচালক ‘সাঁতাও’নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করছেন। আপনি করেছেন তাদের আগে। প্রযোজক সংকটের এই কালে গণ-অর্থায়ন কতটুকু সাহায্য করে?

উত্তর : আমি ‘একজন কবির মৃত্যু’ নামে গণ-অর্থায়নে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছি, ‘সংযোগ’ চলচ্চিত্রের অনেকটা শ্যুটিং সম্পন্ন করেছি। আমি যখন গণ-অর্থায়নে চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করি তখন এক ধরণের ভয় কাজ করেছে, শেষ পর্যন্ত সফল হবো তো! শুধু আমার না, অনেকেরই সাফল্য নিয়ে সংশয় ছিল। কিন্তু এখন সংশয় অনেকটাই কেটে গেছে। বাংলাদেশে বেশকিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র গণ-অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে। কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে আমার ‘একজন কবির মৃত্যু’ দেখার পরে সেখানকার পরিচালক উজ্জ্বল বসু গণ-অর্থায়নে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। গণ-অর্থায়নে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুধু অর্থের যোগান দেয় না, অর্থকে স্বাধীনও করে। এই প্রক্রিয়ায় একজন চলচ্চিত্র পরিচালক অনেক স্বাধীনভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ অনেক বেশি পান। গণ-অর্থায়নে না হলে ‘একজন কবির মৃত্যু’ সাধারণ একজন প্রযোজকের টাকায় নির্মাণ করা সম্ভব ছিল না। এখনো গণ-অর্থায়নে চলচ্চিত্রের কাজ বিস্তর আকারে শুরু হয়নি, তবে আমি আশাবাদী যে, ভবিষ্যতে হবে এবং আমাদের চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

 

প্রশ্ন : আপনার সম্প্রতি নির্মিত চলচ্চিত্র ‘ড্রেসিং টেবিল’দেখে অনেক দর্শক হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে আপনার নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর সাথে এটার দূরত্ব অনেক। আপনি এ সমালোচনাকে কিভাবে দেখবেন।

উত্তর : আমি জনপ্রিয় কোনো চলচ্চিত্র পরিচালক নই। ধরে নেয়া যায় পাঁচশো থেকে এক হাজার দর্শক আছে যারা আমার সব চলচ্চিত্র দেখেছেন এবং আমার চলচ্চিত্র নিয়ে তাদের এক ধরণের মূল্যায়নও আছে। আমি তাদের কারো মতকে ইগনোর করতে পারি না। ব্যক্তিজীবনে তো অনেক উত্থান-পতন থাকে, আমাকেও এসবের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এর প্রভাব বা অন্য কোনো বাস্তবতার প্রভাব কোনো একটি কাজে পড়বে এটা খুবই স্বাভাবিক।

 

প্রশ্ন : অনেক সময় বলা হয়, একজন পরিচালকের ব্যক্তি জীবনের ছাপ বা অভিজ্ঞতা তার চলচ্চিত্রে পড়ে। ব্যাপারটিকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করেন?

উত্তর : একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা পরোক্ষভাবে একটি চলচ্চিত্রে নিজেকেই বা নিজের চিন্তাকেই প্রকাশ করে থাকেন। একটি চলচ্চিত্রের ভেতরে ঐ চলচ্চিত্রের পরিচালকের মানসিক গঠন, চিন্তা-চেতনা, আদর্শ, দর্শন, চিন্তার অসাড়তা, বিকৃতিও প্রকাশ পায়। এটা স্বাভাবিক। 

//জেডএস//

সম্পর্কিত

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

থিয়েটার

থিয়েটার

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২১, ১২:১৮

বিকালের মেঘ ভেদ করে ঠোঁটজুড়ে আসে স্নিগ্ধ জলধারা। বহমান শান্ত জীবনের স্তুতি। তিনি হেসে চলেন, মন মাতানো মুগ্ধতা ছড়ায় চারপাশে। কংক্রিট শহরের মিহি আলোর অডিটোরিয়ামে মানুষ মানুষের বিশ্বস্ত চোখ খোঁজে। স্বপ্ন দেখে সরল বৈভবহীন জীবনের। যে স্বপ্নের স্পন্দন এখন ছড়িয়ে গেছে সমস্ত বাংলাদেশে। মঞ্চে যিনি অনর্গল কথা বলছেন সেই ‘আলোকিত মানুষ’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। বাগ্মী এ মানুষটির জীবন বহু কাজে বহু সৃষ্টিতে উদ্ভাসিত।

তাঁকে বুঝতে হলে তাকাতে হবে তাঁর অজস্র সৃষ্টিশীল বইয়ের দিকে, পাঠ নিতে হবে তাঁর আত্মজৈবনিক বইয়ের সরস বয়ান। জানতে হবে তাঁর ব্যাপক কর্মজীবন সম্পর্কে। চোখ খোলা রেখে আমাদের নিবিষ্ট হতে হবে সবুজ নিসর্গ, মানুষের কাছাকাছি বাংলার শ্যামল প্রান্তরে, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যে। সেই প্রকৃত সত্য খুঁজতে গিয়ে যন্ত্র বা নাগরিকতার ছোবলে যেখানে তাঁর হৃদয়ও আশাহত হয়েছে।

তিনি কবিতায় উচ্চারণ করেছেন―

একা একা টের পাই চারপাশে―আকাশে ও নিচে―
অবিশ্রান্ত আর্তনাদে ভেঙে যায় বহুদিনকার
ধানভানানীর গান এদেশের, পাটক্ষেত, বেহুলার ঘর―
ঢেঁকির পুরনো গল্প, সাপ, ঝোপ, দোয়েলের দেশ―
বাংলাদেশের আবহমানের।
(শাব্দিত কলঘর, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ২০)

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, জন্ম ২৫ জুলাই ১৯৩৯ সালে। অবিভক্ত ভারতে কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায়। পিতা সেময়কার স্বনামধন্য অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও নাট্যকার আযীম উদ্দীন আহমেদ, মাতা করিমউন্নেসা বেগম। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলায়। দেশভাগের পর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ পরিবারের সাথে চলে আসেন তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে। পিতার চাকরি সূত্রেই তার শৈশবের কিছু সময় কাটে টাঙ্গাইলের করটিয়ায়। সেখানকার বংশী নদী তাঁর শৈশবের মনোহর চিন্তায় দারুণভাবে গেঁথে আছে। তাঁর আত্মজৈবনিক বই বহে জলবতী ধারা প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, নিষ্ফলা মাঠের কৃষক ইত্যাদি তাঁর বহমান জীবনের নানান অভিজ্ঞতা, জীবন গল্পের সুনিপুণ বৃত্তান্ত। পিতার নাট্যচর্চা ও কবিতার খেয়াল তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করত। কলেজে পড়া অবস্থায় বুঁদ হয়েছেন কবিতায় ও সরল জীবনের দর্শনে। মূলত তার ব্যাপ্তিময় জীবনের ভিতটা সেসময়ই রচিত হয়েছিল। কলেজজীবনে তার কিছু শিক্ষকের অবদানও এক্ষেত্রে স্বীকার্য। কলেজজীবনেই তিনি ভ্রমণ করেন ইংরেজি কবিতা ও বাংলা কবিতার অপার সৌন্দর্যের ভূমিতে। যা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৬১ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে যোগদানের মধ্যদিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়। যা অব্যাহত ছিলো ১৯৯২ সাল পর্যন্ত। হরগঙ্গা কলেজ ছাড়াও শিক্ষকতা করেছে সিলেট মহিলা কলেজ, রাজশাহী কলেজ, ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজ (বর্তমানে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ) এবং সর্বশেষ ঢাকা কলেজে দীর্ঘসময় অধ্যাপনার পর অবসর গ্রহণ করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে বাংলা পড়াতেন। অধ্যাপক হিসেবে তার সফলতা ও জনপ্রিয়তা ছিল গগনচুম্বী। মূলত তাঁর সকল কাজের মাধ্যমেই তিনি মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। উজাড় করে দিয়েছেন সবটুকু। শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিজের কথায়―

আমি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলাম। সাহিত্যের স্বপ্ন ও সৌন্দর্য আজীবন আমার চেতনা-জগতে যে-হীরের দীপ্তি ছড়িয়েছে আমি সেই উজ্জ্বলতাকে ছাত্রদের ভেতরে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছি। তাদের সেই আনন্দে উজ্জীবিত করতে চেয়েছি। পরীক্ষায় ছাত্রদের বেশি নম্বর পাওয়াবার জন্যে পরিশ্রম করে জীবন নিঃশেষ করাকে আমার কাছে ‘দুর্লভ মানবজন্মে’র অপচয় বলেই মনে হয়েছে। জীবন কত দীপান্বিত ও জ্যোতির্ময় তা একজন ছাত্র সবচেয়ে ভালো করে জানতে পারে তার জীবনে দীপান্বিত শিক্ষকদের কাছ থেকে। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১১)

বর্তমান সময়ের শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে স্পষ্ট কথা বলতেও এ সফল অধ্যাপক দ্বিধা করেননি। প্রসঙ্গক্রমেই তিনি লিখেছেন―

আজ দেশের স্কুল-কলেজগুলোয় কার্যত লেখাপড়া হচ্ছেই না। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ লক্ষ শিক্ষকের অধিকাংশই শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নন, যাঁরা যোগ্য তাঁরা ছাত্রদের দেন অতি সামান্য। ফলে অভিভাবকরা কেউই বিদ্যালয়কে আজ তাঁদের সন্তানদের বিকাশের অঙ্গন হিসেবে মনে করেন না। ফলে বাণিজ্যিক উদ্যমসম্পন্ন গৃহশিক্ষকরা আজ হয়ে উঠেছেন ছাত্রসমাজের মূল আশ্রয়। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১৭৬)

বাংলাদেশের ষাটের দশকে নতুনধারার সাহিত্য সৃষ্টির আন্দোলনের পুরোধা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। প্রায় একযুগ ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা সম্পাদনা করার মাধ্যমে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলা সাহিত্য বাঁকবদলের ধারায়, প্রগতিশীল সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াসে। নিশ্চিত আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন সেসময়কার তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনালগ্ন হতে যুক্ত হন উপস্থাপনায়। রুচিশীল ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, উপস্থাপনায় তার নিজস্ব ধরন ইত্যাদি কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় উপস্থাপক খ্যাতিতে ও ব্যক্তিত্বে। তাঁর হাত ধরেই অনেক মেধাবী তরুণ উঠে আসে। তাঁর ‘আমার উপস্থাপক জীবন’ বইটিতে তিনি তুলে ধরছেন তাঁর উপস্থাপক জীবনের নানান দ্বন্দ্ব ও প্রতিকূলতা। বর্ণনা করছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে যাত্রা আর সমৃদ্ধির বিভিন্ন দিক। আমাদের মহান মুত্তিযুদ্ধে পাকসেনাদের হাতে আটক হয়েছিলেন তিনি। উপস্থাপক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচিয়ে ছিল বলে তিনি বইটিতে বলেছেন নির্দ্বিধায়। তাঁর ‘সংগঠন ও বাঙালি’ বই পাঠকের কাছে খুবই জনপ্রিয়। জাতীয় জীবনে সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা, বাঙালির সংগঠনের দুর্বলতা এবং তা কীভাবে আমাদের জাতীয় জীবনে উন্নতির মূলবাধা হয়ে দাঁড়ায় তার স্পষ্ট বয়ান রয়েছে বইটিতে। সংগঠনের অভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রায় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, ব্যক্তি ডুবে থাকে তা আত্মকেন্দ্রিকতায় এসবের সত্য উপলব্ধি উঠে এসেছে তাঁর লেখায়।

১৯৭৮ সালে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। তিনি কবিতায় লিখেছেন―

রাত্রিকে বাসে না ভালো কেউ সম্প্রতি। কেননা এ
রাত্রি সব এক করে দেয়। রাত্রির নির্বাক কাফন
জামার পৃথক রঙ, স্বতন্ত্র চুলছাঁটা, আস্তিনে মাপ
মুছে দিয়ে সবাইকে আদ্যোপান্ত এক পাতলুনের ভেতর
নিয়ে আসে।
(মৃত্যুময়ের জন্য, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ৫৬)

হ্যাঁ, তিনি এমন রাত্রিকেই দূর করতে চেয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন সংস্কৃতিমান, মুক্ত চেতনার সৃজনশীল মানুষ না হলে আগামী বাংলাদেশ হবে অনুর্বর, অন্ধকার। তিনি বইয়ের সোনালি অক্ষরে, জ্ঞানের অমৃতবাণীতে বদলাতে চেয়েছেন সমাজকে, তরুণদের। বই পড়া আন্দোলন ও নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লক্ষ হচ্ছে―আগামী দিনের অর্থাৎ তরুণদের বড় করে তোলা ও তাদের সংঘবদ্ধ জাতীয় শক্তিতে পরিণত করা। প্রায় বিয়াল্লিশ বছর ধরে তাঁর নেতৃত্বে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বিভিন্নভাবে কাজ করে চলেছে অবিরাম। এগুলো মধ্যে রয়েছে―দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রম, পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি, আলোর ইশকুল, কেন্দ্রের লাইব্রেরি, আলোকচিত্র চক্র, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি। সারা দেশে প্রায় ২৪ লাখ ছাত্র/ছাত্রী বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কার্যক্রমের সাথে যুক্ত। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন―

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবনের সর্বাধিক কীর্তি হিসেবে দেখা দেয়। যেখানে আমরা অনেকে মিলে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারি না, সেখানে একক প্রচেষ্টায় এত বড় একটা প্রতিষ্ঠান গড়া যে তাঁর বিশেষ যোগ্যতার প্রকাশ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর ব্যাপ্তি সারা দেশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের সীমানা ছাড়িয়েও।…সায়ীদ লিখেছেন প্রচুর। কবিতা ও ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও ভাষণ, স্মৃতিকথা ও জার্নাল, নাটক ও অনুবাদ।…তাঁর মধ্যে মিলিত হয়েছে শিল্পী ও কর্মী, ভাবুক ও উদযোগী। তাঁর চিন্তা ও সাধনায় দেশ ক্রমাগত উপকৃত হোক। (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, পৃ. ৩৫, ৩৬)

সত্যিকারভাবেই বহুমুখী কাজের মাধ্যমে তিনি উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩২টি। গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতায় সাহিত্যে বিভিন্ন শাখায় তিনি অবদান রেখেছেন ও রেখে চলেছেন। সামাজিক নানা কাজেই তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। যেমন ডেঙ্গু প্রতিরোধ আন্দোলন, পরিবেশ দূষণবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি। তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন সম্মাননা ও পুরস্কার। এগুলোর মধ্যে আছে―জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার (১৯৭৭), র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার (২০০৪), একুশে পদক (২০০৫), পরিবেশ পদক (২০০৮), বাংলা একাডেমি পদক (২০১২) ইত্যাদি।

‘আলোকিত মানুষ চাই’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের দেখানো পথেই আগামী দিনের তরুণদের মধ্যে ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’ বই পড়ার মাধ্যমে এমন অনুভূতির প্রবহমানতায়, চর্চায় হয়তো আমরা পাব সংঘবদ্ধ, প্রগতিশীল, আত্মকেন্দ্রিক জীবনকে পেছনে ফেলে আসা দেশপ্রেমিক বুদ্ধিদীপ্ত এক প্রজন্ম। যা বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।

এ মহীরুহের জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা।

সহায়ক গ্রন্থ

১. বহে জলবতী ধারা (প্রথম খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
২. বহে জলবতী ধারা (দ্বিতীয় খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০১১।
৩. মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৮৮।
৪. নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৫. বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৬. আমার উপস্থাপক জীবন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৫।
৭, সংগঠন ও বাঙালি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
৮. আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, সম্পাদনা―আতাউর রহমান, ঢাকা, ২০১৫।
৯. ইন্টারনেট।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

থিয়েটার

থিয়েটার

গহন

গহন

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২১, ০৯:০০

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (২৩ জুলাই, ১৮৯৮-সেপ্টেম্বর ১৪, ১৯৭১) বিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি কথাসাহিত্যিক। তার সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি গল্পগ্রন্থ, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধের বই, ৪টি আত্মজীবনী, ২টি ভ্রমণ কাহিনী, ১টি কাব্যগ্রন্থ এবং ১টি প্রহসন। তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, পদ্মশ্রী এবং পদ্মভূষণ পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন।

 

যা খুব ছোট, তাকে খুব কাছ থেকে না দেখলে ভালো করে চেনা যায় না। দূর থেকে তা অস্পষ্ট দেখায়। কিন্তু যা খুব বড়, একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে তাকে না দেখলে, তার ব্যাপ্তিটা অধরা থেকে যায়। প্রথম হিমালয় দর্শনে ঠিক এই রকমই একটা সম্ভ্রম জাগানো অনুভূতি হয় যেকোনো মানুষের। কিন্তু আস্বাদন পরিপূর্ণ হয়, শুধু দূর থেকে নয়, যখন কাছে গিয়েও তাকে দেখি।
কিন্তু আমার তারাশঙ্করের দর্শন ঘটেছিল এর ঠিক বিপরীত ক্রমে। তাঁকে প্রথমে দেখেছিলাম খুব কাছ থেকে, পরম স্নেহের নৈকট্যে। সে প্রথম যে ঠিক কবে তা আজ আর বলতে পারি না—তবে স্মৃতির ভেতরে প্রথম যে ছবিটি দেখি তা সম্ভবত ১৯৪৮ এর, এবং স্থান কলকাতারই বাগবাজারের ১/১ আনন্দ চ্যাটার্জি লেনের একটি বাড়ির দোতলার ঘরে। একটি সাবেকী আমলের খাটের ওপর চড়ে আমরা তিনটি শিশু খেলছি, লাফাচ্ছি, কখনো বা নাচছি—আর অদূরেই কৃষ্ণবর্ণ ধ্যানমগ্ন এক প্রৌঢ় ছোট্ট একটি কাঠের ডেস্কের ওপর গভীর নিবিষ্ট হয়ে লিখে চলেছেন পাতার পর পাতা। মুক্তোর মতো অক্ষরে একে একে ফুটে উঠছে বাংলা কথাসাহিত্যের উজ্জ্বলতম রত্নখনি। তবু সে সান্নিধ্য এত সহজ ছিল বলেই হয়তো আজও সমানভাবে স্পষ্ট। তিনি লিখছেন আর আমরা—তাঁর নাতিনাতনিরা খেলছি। খেলা যখন ছিল তোমার সনে/তখন কে তুমি তা কে জানতো? জানতে পারিনি ঐ নৈকট্যের জন্যই হয়তো-বা। ফলে আমাদের খেলাটা ছিল অবাধ। কখনো ঘরে কখনো ঘর ছাড়িয়ে বারান্দায়—সরু লম্বা বারান্দার ওপাশে আরেকটা বারান্দায় কখনো কখনো দেখা দিতেন লং ক্লথের পাঞ্জাবি পরা, সাদা চুল এক বৃদ্ধ। দাদুর যামিনী দা—শিল্পী যামিনী রায়। মাঝে মাঝে দুই জ্যোতিষ্কের বার্তাবিনিময় হতো এপার ওপার।
ইতিমধ্যে দাদুর সাহিত্যিক খ্যাতি বাড়ছিল। বাড়ি তৈরির কাজও চলছিল। ১৯৪৯ এ বাগবাজার ছেড়ে তিনি উঠে গেলেন টানাপার্কে তাঁর নিজস্ব বাড়িতে। তার কিছুকাল পরেই আমরাও চলে এলাম পাইকপাড়ায় গোয়েল্কা গার্ডেন্স-এর একটি আশ্চর্য সুন্দর ফুটফুটে ফ্ল্যাটে। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। খুব কাছেই দাদুর বাড়ি। রোজ বিকেলে খেলতে যেতাম ওবাড়ির পাশের মাঠে। বাড়ির সামনেই বোগেনভেলিয়ার ছায়অর নিচে দুপাশে রোয়াক, মাঝে বেতের চেয়ার পাতা। দাদু বসে আছেন। তাঁকে ঘিরে আরো কতজন। কথা হতো কত বিষয়ে। মাঝে মাঝেই শৈল দাদু এসে উপস্থিত হতেন। সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। দাদুর বাড়ির ঠিক বিপরীতে আর্মড পুলিশের ক্যাম্প। তার ওপাশে ইন্দ্রবিশ্বাস রোডের ওপর বাড়ি করেছিলেন শৈল দাদু। প্রতিদিন সকালে বন্ধু সন্দর্শনে তাঁর আসাটা ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। দাদুও যেতেন।
কিন্তু সে অনেক পরের ঘটনা। ১৯৬০-৬১ নাগাদ তখনো সজনীকান্ত দাস বেঁচে। শনিবারের চিঠি প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত রমরমিয়ে। শৈলজানন্দের বাড়ি থেকে পূবদিকে আরেকটু এগোলেই সজনীকান্তের বাড়ি। নিচে বিশাল অফিস, প্রেস আর সেখানেই বাংলার তাবড় তাবড় সাহিত্যিকদের আড্ডা। সে আড্ডায় তারাশঙ্করকে, শুনেছি বড়বাবু বলেই চিহ্নিত করা হতো।
দেখতে দেখতে আমাদের টালা-পাইকপাড়া অঞ্চলটা একসময় সাহিত্যিকদের তীর্থস্থান হয়ে উঠল। মন্মথ দত্ত রোডের একটি ফ্ল্যাটে কাজী নজরুল ইসলাম; কিন্তু তাঁর চৈতন্য তখন মহামগ্ন। আরেকটু এগিয়ে সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্র। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীও এলেন কিছুকাল পরে, শৈলজানন্দের বাড়ির একতলায়। পাইকপাড়ায় আমাদের বাড়িরই কাছে হাউসিং স্টেটে থাকতেন গৌরকিশোর ঘোষ।
চাঁদের শোভা থাকে, সূর্যের রামধনু। বিদ্রোহী কবি তখন ফুলের জলসায় নীরব। তাঁকে বাদ দিলে, বাকিরা ছিলেন তারাশঙ্করের...। তাঁর সভার নিত্য অতিথি।
কিন্তু আরো দুজন ছিলেন, তাঁরা শুধু তাঁর... ছিলেন না, তাঁর ভাবের অংশীদারও ছিলেন। একজন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র, আমার বড়মামা সনৎকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরেকজন আমার বাবা, তারাশঙ্করের জ্যেষ্ঠ জামাতা শান্তিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়। শুধু আত্মীয় নয়, এঁরাও ছিলেন তাঁর সভার...।
আরো কতজন, কত গুণীজন, কত কবি সাহিত্যিক শিল্পী যে তাঁর বাড়িতে পদচিহ্ন রেখে গেছেন তার হিসাব দেওয়া অসম্ভব। এসেছেন বনফুল, অচিন্ত্যসেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, প্রবোধ সান্যাল, আশাপূর্ণা দেবী, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী—এমনি আরো কত যে গুণীজন। আর এঁদের... আর ফুলের গন্ধে—টালাপার্কের বাড়ি ভরে উঠত প্রতিবছর ৮ই শ্রাবণ—তারাশঙ্করের জন্মদিন। বাড়িতে মানুষ ধরত না। তাই ম্যারান বেঁধে—সে এক বিপুল আয়োজন। ফুলের গন্ধের সঙ্গে যোগ দিত খাবারের মন মাতানো গন্ধ।
বছরে দুটি দিনের জন্য আমাদের ছিল একমাত্র প্রতীক্ষা দুর্গা পুজো আর আটই শ্রাবণ। আমাদের মধ্যে আবার আমার দিদি, শকুন্তলার প্রতীক্ষা ছিল সবচাইতে ব্যাকুল। কারণ, কি সৌভাগ্য ওরও জন্মদিন ঠিক ওই ৮ই শ্রাবণ। একে বড় নাতনি, তার জন্মদিনের ঐ একসূত্রতা। দাদুর কাছে ওর ছিল একটু বিশেষ সমাদর। ওকে নিয়ে কবিতাও লিখেছিলেন তিনি—
তুমি যখন হবে পঞ্চদশী
আমি হব ষাট বছরের বুড়ো
তুমি খাবে কড়মড়িয়ে মেঠাই
আমি খাব চেটে চেটে ঝুরো।

দাদুর বয়স যখন পঁয়তাল্লিশ, তখন দিদির জন্ম। অতএব দাদুর যখন ষাট, দিদি তখন পঞ্চদশী। টীকা আরো একটু হয়তো অপ্রায়োগিক হবে না। বীরভূমে মিঠাইকে বলে মেঠাই, মেটাই, কিংবা আরো সঠিকভাবে বললে ‘মিটিই’। মনে হতে পারে মিঠাই কি তবে কড়মড়িয়ে খাওয়া যাবে? আসল কথা হলো, মেঠাই মানে বীরভূমে সন্দেশ নয়—গুড় আর বেসনের লম্বা লম্বা কাঠিভাজা, ওখানে বলে সিড়িভাজা—তার নাড়ু—বেশ শক্ত, কড়া পাকেঢ়। কড়মড়িয়েই খেতে হয়। প্রতিবছর পুজোর সময় ঘরে ঘরে এইসব মেঠাই, নারকেল খণ্ড, খই বিনু—এমনি আরো কত কি তৈরি হতো। আর ঝুরো হলো শুকনো বালিগুড়। এও বীরভূমেরই শব্দ।
সে তো আসবেই। তারাশঙ্করের কবিতায় বীরভূম আসবে না, লাভপুর আসবে না—তাই হয়! কোনো না কোনোভাবে আসবেই আসবে। তাঁর শেকড় যে ঐ মাটিতেই। আর জীবনের শেষ মুহূর্তেই তাঁর ভ্রুযোগ ছিন্ন হয়নি। প্রায়ই যেতেন গ্রামের বাড়িতে। তাঁদের যে সাবেক বৈঠকখানা বাড়ি—খড়ের চাল, এপাশ ওপাশ বারান্দা, সামনে বাগান—আর এই বাগানেই তিনি রোয়াক বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন, ভারী সুন্দর একটা গোলঘর বানিয়ে ছিলেন। সামনে নানান ফুলের গাছ। রোয়াকের পাশে চেয়ার পাতা—এখানেই বসতেন বন্ধুবান্ধব পরিচিতজনের সঙ্গে। গল্প হতো। কখনো অন্ত্যজ শ্রেণির বহু মানুষ আসতেন। তাঁর কাছে তাঁরাও ছিল আপনজন। পুজোর সময় সবাইকে কাপড় দিতেন। অর্থ সাহায্য দিতেন সাধ্যমতো।
লাভপুরকে তিনি ভোলেননি। আর লাভপুরও আজও ভোলেনি তাঁকে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

থিয়েটার

থিয়েটার

গহন

গহন

উৎসবে গল্প

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২১, ১২:৫৩

যেকোনো উৎসবের আনন্দ দ্বিগুণ করে দিতে বিশেষ সংখ্যার জুড়ি নেই। বরাবরের মতো এবারও বাংলা ট্রিবিউন প্রকাশ করেছে বিশেষ সংখ্যা। সীমিত পরিসরের এই সংখ্যাটি সাজানো হয়েছে তারুণ্যের গল্প দিয়ে। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।

সূচিপত্র

গহন ।। মোয়াজ্জেম আজিম

ব্যাট-বল ।। কামরুন নাহার শীলা

থিয়েটার ।। কাজী সাইফুল ইসলাম

মন্তাজের নিজের জমি ।। মাসউদ আহমাদ

শীতের অপেক্ষা করছি না ।। এনামুল রেজা

কোথাও কিছু হচ্ছে ।। পারিজাত মৈত্র

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

থিয়েটার

থিয়েটার

গহন

গহন

থিয়েটার

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২১, ১২:১৬

আমি যখন বাসা থেকে বের হই তখন সকাল ৭টা। আমি দাঁড়িয়ে আছি রাস্তার পাশে একটি অটো ধরব বলে। ফাল্গুনের শেষ। বহুদিন বৃষ্টি নেই। গুমোট, ময়লা প্রকৃতি। সবুজ পাতায় জমে থাকা ধুলো রাতের কুয়াশায় ভিজে এমন ভাবে লেপটে আছে—ক্লাস টু তে পড়ার সময় কলাপাতায় বরইয়ের আচারের শেষটুকু যেভাবে থাকত। আমি একটি অটো ধরে এলাম চৌরাস্তা। আমি কোথায় যাব—, তা এখনও ঠিক করিনি। আমার এ যাত্রা অনেকটাই উদ্দেশ্যহীন, এবং একা।

কদিন ধরে আমার ভিষণ মন খারাপ—পালাবার জন্য ব্যাকুল। থিয়েটারের কাজটা ছেড়ে দিয়ে খুবই একা হয়ে গেছি। থিয়েটারে থাকারও কোনো উপায় ছিল না। থিয়েটারে আমাকে মেয়ে সেজে অভিনয় ও নাচ করতে হতো। তাতে আমার কোনো অসুবিধা ছিল না। কিন্তু বিপদ হলো অন্য কারণে।

চৌরাস্তা থেকে কাওরাকান্দি যাবার বাসে চড়ে বসলাম। জানালার কাছে একটি সিট পেলাম। সকালের রোদ এসে আমার শরীরে জড়িয়ে আছে শীতের চাদরের মতো। জানালায় চোখ রেখে বাইরে তাকিয়ে আছি, আমার হাতে—দ্য ট্রাভেলস অব মার্কো পোলো, বইটি। ম্যানুয়েল কোমরু সম্পাদনা করেছে বইটি।

একটু পরে বইটিতে মন দেই। মার্কো পোলো গিয়েছিল বেথেলহেম শহরে। পূর্বদেশ থেকে তিনজন জ্ঞানী লোক এসেছিল বেথেলহেমে। তখন রাজা হেরোদের রাজত্বকাল। তারা রাজা হেরোদকে বলেছিল—আমরা আকাশের একটি নক্ষত্র লক্ষ করে এখানে এসেছি, ইহুদিদের রাজার জন্ম হয়েছে। রাজা বলেছিল—তোমরা তার সন্ধান পেলে আমাকে খবর জানাবে। আমি তাকে শ্রদ্ধা জানাতে যাব।

কিন্তু সেই জ্ঞানীদের কাছে স্বপ্নযোগে বার্তা এসেছিল—তোমরা রাজাকে জন্ম নেওয়া শিশুটির খবর জানাবে না। রাজা শিশুটিকে (মুসলমানদের ঈসা আ. আর খ্রিষ্টানদের কাছে—ইসা) মেরে ফেলবে। রাজা হেরোদের ভয়ে বেথেলহেম থেকে সেদিনই ইসা মসিকে নিয়ে মা মরিয়ম পালিয়ে চলে এসেছিলেন মিশরে।

আমি ছিলাম থিয়েটার কর্মী, আমার মুখে ধর্মের কথা সত্যিই বেমানান। কিন্তু থিয়েটার করতে গিয়ে অনেক কিছুই শিখেছিলাম। উচ্চমার্গের বই পড়তে হয়েছিল। একবার আমাকে বেশ্যার অভিনয় করতে হয়েছিল—তখন আমাকে পড়তে হয়েছিল, ভারতের জমিদারদের উপপত্নী, লেডি অফ দ্যা টাউন, কি করে ফিরিঙ্গি বাজারে বেশ্যালয় হলো আরও কত কি!

আবার নারী চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে শিখেছিলাম—কত কষ্ট করে নারীরা নিজেদের মানিয়ে নিয়ে চলে শ্বশুর বাড়িতে। মাকে দেখতাম—বুড়ো বয়সেও বাবার বাড়িতে যাবার জন্য কেমন উন্মুখ হয়ে থাকত। মনে হতো ওটাই তার আসল বাড়ি। অথচ, সারা জীবন পরের বাড়িতে নারীদের কাটিয়ে দিতে হয়।

নারীদের সাথে খারাপ আচরণ করো না কখনোই। নারী সেজে দেখো একবার, কত কষ্ট করে সারা জীবন পরের বাড়িটাকে আপনার বানিয়ে বসত করে তারা!

মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। বহু বছর মায়ের সোনামুখটি দেখা হয়নি। তার মৃত্যুতে আরও ছন্নছাড়া জীবন হয়েছে আমার। আমার বড় ভাই তার বৌ নিয়ে আলাদা হয়ে গিয়েছিল মায়ের মৃত্যুর পরপরই। অথচ তার বিয়ের আগে তিনি আমাকে খুবই আদর করতেন। আচ্ছা, বিয়ে করলেই মানুষ কেন বদলে যেতে থাকে? না কি সবই শয়তানের খেলা? ভ্রান্ত পথে নিয়ে গিয়ে দোজখবাসী করতে চায়। বেহেস্ত থেকে বের হবার সময় ইবলিশ আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে এনেছিল—আল্লাহ প্রিয় আদম সন্তানকে সে ভ্রান্ত পথে নিয়ে যাবে। মানুষ হয়তো ইবলিশের চক্রান্তেই পড়ে আছে।

স্পিডবোটে পদ্মা পার হয়ে একটি এসি বাসে চড়ে বসলাম। সিটে গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে দিতেই গাড়ি চলতে শুরু করে—ক্লান্ত আমি ঘুমিয়ে পড়ি। ঠিক ঘুম নয়, তন্দ্রা। আমি দেখতে পাই, বাদল নামের একটি ছেলের সুন্দর পবিত্র হাসি। তখন আমি কেবল থিয়েটারে ঢুকেছি। আমার চেহারা ভালো ছিল, গায়ের রঙ ছিল ফর্সা, বয়স সতেরো পার করেছিল কেবল। আমার বুকের দুটি কৃত্রিম স্তন বক্ষবন্ধনীতে আটকে দিয়ে আমাকে একটি ঘাগরা পরাবার পর, আমাদের পরিচালক অনেকক্ষণ আমার বুকের দিকে তাকিয়ে বলেছিল—উহু, বোঝার কোনো উপায় নাই, তোকে দিয়েই হবে। এই সমির, ফোম দিয়ে ওর পাছা আরও একটু ভারী করে আমাকে দেখাও।

কথা শেষ করে পাশের সেটে চলে যায় পরিচালক দিপু ভাই। সমির আমার নিতম্ব আরও একটু ভারী করে—, যতটা ভারী করলে পুরুষের কাম জাগে।

সাজগোজ শেষ করে আমি যখন নাচ করার জন্য প্রস্তুত হতাম, তখন আমার নিজের প্রেমে নিজেই পড়েছিলাম। বাদল ছিল আমার প্রথম প্রেমিক। আমি ছেলে হয়েও ছেলে প্রেমিকের কোনো অভাব ছিল না আমার। তখন খুব হাসি পেত, মেয়েরা এসে আমার হাত ধরত। আমার বন্ধু হতে চাইত। আমি একবার ইচ্ছে করেই একটি মেয়ের সাথে আলিঙ্গন করেছিলাম।

সে সব দুষ্টমি যে জীবনে এত বড় কষ্টের কারণ হবে তা ভাবিনি কোনো দিন। থিয়েটার করতে ভালো লাগত, তাই দিনরাত থিয়েটার নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম। মানুষ যখন আমার অভিনয়ের প্রশংসা করত, তখন ভাবতাম এক সময় আর এসব মেয়ে সেজে আর কাজ করতে হবে না। কোনো নায়কের চরিত্র নিয়ে অভিনয় করব।

কিন্তু হঠাৎ করেই নায়কের চরিত্র পাওয়া যায় না। তাছাড়া দলে মেয়েরা কম ছিল, তাই আমাকে কিছুতেই ছাড়তে চায়নি দলের পরিচালক।

বছর চারেক আগেকার কথা। সিরাজগঞ্জ গিয়েছিলাম থিয়েটার করতে। তিন দিনের শো। দুদিন পরই আমাদের এক রকম পালিয়ে আসতে হয়েছিল। শো শেষ করে আমরা রুমের দিকে যাচ্ছিলাম। তখনও আমাদের গায়ে থিয়েটার কস্টিউমস। কতগুলো বদমাইস ছেলে এসে রানু বু আর আমাকে তুলে নিয়ে গেল। ওরা বারবার রানু বু’র পাছায় থাপ্পড় মেরেছিল, আর যখন জানলো আমি ছেলে—তখন খুব করে পেটাল আমাকে। আমাদের উদ্ধার করেছিল পুলিশ গিয়ে। এ ঘটনা শুনে হাসতে হাসতে মরে সবাই। কিন্তু কষ্টে, অপমানে আমি শুধুই কেঁদেছিলাম। এক টানা সাত দিন পরে আমি রুম থেকে বেরিয়েছিলাম। মানুষ এত নিষ্ঠুর হয়! কেউ একজন বলেছিল— শালার পাছা মেরে দে! পুলিশ না এলে হয়তো ওরা ওটাই করত।

তারপর ভেবেছিলাম থিয়েটার আর নয়। অন্তত নারী চরিত্রে আর করব না। ছেলেদের চরিত্র পেলে করব। পরিচালক আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো দেখত। সে আমাকে ছেলের রোল দিলো। কিন্তু সবাই হইচই করে উঠত, সীমাকে দেখার জন্য। আমারই থিয়েটার নাম ছিল—সীমা!

কয়েকটি শো করার পর আমাদের খরচের টাকাই ওঠে না। একই হয়তো বলে ভাগ্য। অল্প বয়সী সুন্দরী একটি মেয়ের অভাবে আমাদের থিয়েটার বন্ধ হতে চলেছে। অনেক খোঁজ করা হলো কিন্তু পাওয়া গেল না। দলে এতগুলো মানুষ, সবার মধ্যে হাহাকার। কে কি করবে? কোথায় যাবে? কি খাবে?

থিয়েটারে এসে ধীরে ধীরে জানলাম—যারা থিয়েটার করে তাদের নাম হয় ঠিকই, মানুষ তাদের ভালোবাসে, বড় মনে করে। কিন্তু তাদের কষ্টের শেষ নেই। শেষজীবনে এক রকম না খেয়ে মরতে হয়। যখন তারা এ সত্য উপলব্ধি করে তখন আর বেরোবার সময় থাকে না। কারণ অন্য কোনো কাজ তাদের জানা থাকে না। তাদের মনটাও এমন নরম হয় যে বাইরের কোনো কাজ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।

শেষ পর্যন্ত আমি আবার সীমা হলাম। সবাই বলল, একটি মেয়ে পেলেই আমাকে ছেলের চরিত্রে ফিরিয়ে আনা হবে। এতগুলো মানুষের দুর্দশা দেখে আমি ভাবলাম থাকি না ছদ্মবেশে, কি এমন ক্ষতি। এতগুলো মানুষের মুখে যদি ভাত জোটে।

ঢাকায় নেমে নিজেকে অসহায় লাগছে। পৃথিবীতে সবচেয়ে কষ্ট হচ্ছে একা হয়ে যাবার কষ্ট। আমার বড় বোন রওশনারা আমার সাথে কথা বন্ধ করে দিয়েছে, শুধু মেয়ে সেজে থিয়েটার করি বলে। অথচ মা মরে যাবার পর সে-ই ছিল আমার একমাত্র আশ্রয়। বড়ভাবি লোকের কাছে বলে বেড়ায়— আমি না কি হিজড়া।

এ থিয়েটারের জন্য সবকিছুই হারাতে হয়েছে আমার, সামাজিক মর্যাদা পর্যন্ত। অথচ আজ সে থিয়েটারই আমাকে ছাড়তে হলো। বুকের ভেতর যে রক্তের নদী আছে তা আমি টের পাচ্ছি। এ রক্তের নদীটি দীর্ঘ-দীর্ঘ পথ চলে এসে সব রঙ হারিয়ে, যখন পানির রঙে সাজে তখন সে দুচোখে ঝরে পড়ে।

একটি আবাসিক হোটেলে এসে পাঁচ ঘণ্টার জন্য রুম নিলাম। সন্ধ্যার পরপরই বের হব আমি। হোটেলের ওয়াশ রুমে ঢুকে অনেকক্ষণ ধরে গোসল করে, নিচে নেমে এলাম দুপুরের খাবার খাব। আমার প্রিয় গরুর মাংস আর পাতলা ডাল-সরষে ভর্তাও ছিল।

খাওয়ার পরপরই দুচোখের পাতা ভারী হয়ে এলো। ঘুম একটি সিগারেট টানার সময় দিচ্ছে না। তাড়াহুড়ো করে দুটি টান মেরেই বিছানায় লেপটে গেলাম যেন বহুকাল ঘুমাইনি। আবার যেন তাও নয়—আকাশের সবচেয়ে দূরের নক্ষত্রটির সাথে কথা বলে বলে পার হয়ে গেছে কোটি বছর। দুচোখের পাতায় একটু ঝিম লাগতেই ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে কটকটে রোদ। গোটা ঢাকা শহরটা ভেসে যাচ্ছে সূর্যতাপের প্রখরতায়। অদ্ভুত উদাস দুপুর—ঘরবন্দি পাখির মতো ছটফট করতে থাকি!

আজকের দুপুরটাকে মনে হতে থাকে কারবালা আর মৃদু বয়ে চলা ফোরাত নদীর অসমাপ্ত কান্নার মতো। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা (এত হত্যা, স্রোতের মতো বয়ে যাওয়া রক্ত, নক্ষত্রের ঘুমভাঙ্গা আর্তনাদ! তৃষ্ণা) দেখতে হয়েছিল।

দুপুর এত বিরহ ডাকে কেন? এত বিরহকে সহ্য করতে পারে! অন্তরের গভীরে বসে থেকে কাঁদায়!

একটি সুন্দরী মেয়ে খুঁজতে থাকে গোটা থিয়েটারের সবাই মিলে। শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল—কিন্তু মোটেও অভিনয় জানে না। নাচ হয় না কিছুই। শুধু দেহতে মাংসের তুফান তুলতে পারে। তাতে যৌনতা হয়, কিন্তু শিল্পের কিছু থাকে না। একটি শোতে কাজ করার পর কাজল আর কাজ করতে পারেনি। পরে শুনেছিলাম শিমুল যাত্রাদলের মেয়ে ছিল। নাম কাজল। পরিচয় গোপন করে থিয়েটারে এসেছে।

থিয়েটারে কাজ করতে হলে অভিনয়টা ভালো জানতে হয়। রুমে বসে একটির পর একটি সিগারেট টেনে যাচ্ছি আর ঘড়িতে সময় দেখছি। আমার সাথে কোনো মোবাইল ফোন নেই। আসলে মোবাইলটা বন্ধ করে ঘরেই রেখে এসেছি। ওটা আজকাল অপ্রয়োজনীয় যন্ত্র হয়ে উঠেছে আমার কাছে। তাছাড়া কেউ আমাকে ফোন করবে না। কে খোঁজ নেবে আমার। কেউ তো নেই। যারা ছিল একে একে চলে গেছে সব। মা বেঁচে থাকলে জীবন কি আর এমন হতো? কত দিন আদর পাইনি। স্নেহ, ভালোবাসা ভুলতেই বসেছি। কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়নি, বা ভালোবেসে কেউ বলেনি—আমি তোমাকে ভালোবাসি।

সারা জীবন মেয়ে সেজে রইলাম। পুরুষরা এসেছে ভালোবাসতে! আমার প্রেমে পড়ে কেউ কেউ সিগারেট ধরেছে, কেউ গঞ্জিকা সেবন করেছে, কেউ আবার বাঙলা মদ খেয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করেছে।

বছর খানেক আগের কথা। সিলেট গিয়েছিলাম দশ দিনের জন্য। সেখানে এক ছেলে এমন প্রেমে পড়ল, আমার কাছে পাত্তা না পেয়ে একদিন সন্ধ্যায় মদ খেয়ে এসে চিৎকার করে বলতে থাকে, আমি তোমাকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করব না সীমা!

অনেকেই হাসত, কিন্তু আমার বুকের ভেতর বয়ে যেত রক্তের নদী। এ কি পাপ নয়? মিথ্যে সেজে আর কত! ছেলেরা প্রেমে পড়ছে মিথ্যে এক নারীর। প্রথম-প্রথম মিথ্যে নারী সেজে অভিনয় করে আনন্দ পেতাম। ক্রমশ নিজেকে ছোট মনে হতো। মন খারাপ হতো। সবকিছু ঝেড়ে মুছে নিজেকে আবার থিয়েটারের মঞ্চে নিয়ে দাঁড় করাতাম। আমার অভিনয় আর নাচ দেখে মানুষ মুগ্ধ হতো। আমার অভিনয় দেখে পরিচালক দিপু ভাই শিশুর মতো শব্দ করে কেঁদে উঠেছিল একদিন। তারপর কান্না জড়ানো কণ্ঠে সে বলেছিল—তুই যদি মেয়ে হতি রে, আকাশ ছুঁতি—আকাশ।

আমি মেয়ে নই, এ কষ্টেই তার বুক ফেটে যাচ্ছিল।

সে মঞ্চেই লিয়াকতের সাথে দেখা হলো আমার। খুবই ভদ্র ছেলে, একটি ফুল আমাকে দিয়ে চলে গিয়েছিল। ওর চোখে ছিল ভালোবাসার পরাগ আর বিনয়ের হাসি। সেরাতে আমি ঘুমুতে পারিনি অসহ্য যন্ত্রণায়। নিজেকে মেয়ে মনে হতে থাকে। আমার হরমোন বুঝি পরিবর্তন হচ্ছে ধীরে ধীরে।

হোটেল থেকে বেরিয়ে রাত ৮টার দিকে ফকিরাপুল এসে বান্দরবানের বাস ধরে উঠে বসলাম। নন এসি, কিন্তু সিটগুলো দারুণ। বাস ছাড়ার ফাঁকে দুকাপ লাল চা আর দুটি সিগারেট টেনে নিলাম। আজকাল সিগারেট একটু বেশি টানতে হচ্ছে। কেন, কে জানে!

গাড়ি চলছে। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের গান বাজছে—বারে বারে কে যেন ডাকে আমারে/ কার ছোঁয়া লাগে যেন মনোবীণা তারে/ কি যেন সে খুঁজে মরে আকাশের পারে...

লিয়াকত প্রায় প্রতিদিনই দেখা করতে আসে আমার সাথে। ওর হাতে কখনও থাকে ফুল, কখনও থাকে নানা রকম খাবার, আবার কখনও থাকত আমার জন্য নানা রকম গিফ্ট। এ সব কিছুই আমার জানা ছিল না। আমি অবশ্য পরে জেনেছিলাম, খাবার থিয়েটারের সবাই মিলে খেয়ে মজা করত। গিফ্ট নিয়ে যেত মেয়েরা। ওরা বলত—সুজন তো ছেলে। এ মেয়েদের ড্রেস দিয়ে কি করবে!

কথাও ঠিক। তারা লিয়াকতকে নিয়ে মজা করত। কিন্তু এ মজা যে এতটা কষ্ট টেনে নিয়ে আসবে তা বুঝতে পারেনি কেউ। শুধু লিয়াকত কেন, আমাকে মেয়ে ভেবে যে সব ছেলেরা এসেছে, তাদের অনেকের সাথেই মজা করত থিয়েটারের লোকেরা।

লিয়াকতের বাবা ধনী, তাই সে টাকা খরচ করতে থাকে থিয়েটারের অন্য সবার জন্য। আমার সাথে ওর দেখা হতো প্রায় প্রতিদিনই। কথা হতো কম। আমি মেয়েলি কণ্ঠে কথা বলার চেষ্টা করতাম, পাছে ধরা পড়ে না যাই। তাহলে তো থিয়েটারের বারোটা বাজবে।

গাড়ি কুমিল্লা এসে যাত্রা বিরতি দিল ত্রিশ মিনিটের জন্য। সবাই খেতে চলে গেছে। আমি একটি সিগারেট টানছি। মনটা বিষণ্ন হয়ে আছে শ্রাবণ- আকাশের মতো। এত মেঘ কোথা থেকে এলো!

শুনেছি গাছেদের ভেজা নিশ্বাস না কি মেঘ হয়ে যায় আকাশে, তাই আবার ঝরে পড়ে মাটিতে! আর মানুষের ভেজা নিশ্বাস কষ্ট হয়ে জমে থাকে অন্তরে—যা এক সময় ঝরে পড়ে অশ্রু হয়ে।

গাড়ি যখন বান্দরবান শেষ স্টেশনে থামল, তখন ফজরের আজান হচ্ছে। মুয়াজ্জিন ডাকছে—হাইয়া আলাস সালাহ, হাইয়া আলাল ফালাহ (নামাজের জন্য এসো, কল্যাণের জন্য এসো)..., আজ যেন আবার নতুন করে উপলব্ধি করলাম। এত সুন্দর আহ্বান অথচ নামাজ পড়াই হয়নি। আমি দাঁড়িয়ে আছি মসজিদের সামনে, মনটা অনুশোচনায় ভরে আছে। ব্যাগ হাতে নিয়ে অজুখানায় গিয়ে অজু করলাম। পাহাড়ি উপত্যকায় মসজিদটি বেশ সুন্দর।

ফজরের নামাজ শেষ করে রাস্তায় এসে দাঁড়াই। চারিদিকে উঁচু পাহাড়, পাহাড়ের গা বেয়ে রাস্তা। মসজিদের সামনেই বান্দরবান বাসস্ট্যান্ড। সকাল হলেই এখানে মানুষের ভিড় বাড়ে। একটু সামনেই কয়েকটি হোটেল, রেস্টুরেন্ট। আমি উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটি করছি। কোথায় যাব, কি করব কিছুই বুঝতে পারছি না। তবে এ-টুকু বুঝতে পারছি, এখানে দল বেঁধে আসতে হয়। খোলা জিপ (চাঁন্দের গাড়ি) এখানকার বাহন। একা গেলেও যে ভাড়া লাগে, আবার দশজন গেলে ওই একই ভাড়া। সামান্য কিছু কম বেশি।

একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পেটভরে পাহাড়ি কলা আর কেক খেয়ে নিলাম। খাবার আবার কখন কপালে জোটে কে জানে। পাশেই একটি টি-স্টল। চা শেষ কেবল সিগারেট জ্বালাব—এরই মধ্যে একটি চাঁন্দের গাড়ি এসে থামে দোকানের সামনে। ড্রাইভার ডাকছে—একজন লাগবে, একজন…

সিগারেট ফেলে প্রায় দৌড়ে গিয়ে উঠে পড়লাম। আঁকাবাঁকা-উঁচুনিচু পথে গাড়ি চলতে থাকে প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে। শহরটুকু ছাড়তে সময় লাগে না। এর পরই শুরু হলো পাহাড়ি পথ।

তখনও সূর্য খোলস মুক্ত হয়নি। আঁধো আলো-অন্ধকারে ছুটছে গাড়ি। বেশ কিছু দূর আসার পর আমি একজনকে জিগ্যেস করলাম—ভাই আমরা কোথায় যাচ্ছি?

লোকটি আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলে— থানচি।

আর কোনো প্রশ্ন করার সাহস হলো না আমার। কিন্তু বুকের ভেতর কয়েকটি প্রশ্ন বারবার উঁকি মারতে থাকে। কতক্ষণ লাগবে? সেখান থেকে কোথায় যাওয়া যাবে? সেখান থেকে ফিরব কি করে? সেখানে থাকার জন্য কোনো আবাসিক হোটেল আছে কি না?

একটু পরই সব প্রশ্ন হারিয়ে গেল আমার বুক থেকে। প্রচণ্ড রকম বাতাস, পাহাড় বেয়ে গাড়ি এত উপরে উঠছে যে মেঘ ছুঁয়ে চলছে আমাদের গাড়ি। সূর্য উঠতে দেখতে পেলাম, পাহাড়ি উপত্যকায় জমে আছে মেঘ, সাদা মেঘ। একেবারেই খাড়া পাহাড়, বাতাসের শব্দ সাথে নিয়ে ছুটছে গাড়ি। মাঝে মাঝে ভয়ে পিলে চমকে যাচ্ছে—এই বুঝি গাড়ি একেবারে নিচে পড়ে যাবে।

গাড়ি এসে থামে একটি আর্মি চেকপোস্টে। চেকপোস্ট পার হতেই চোখে পড়ে একটি নদী, এ যেন অলৌকিক কোনো জলের ধারা—আসমানি কিতাবে যে রকম বর্ণনা থাকে। প্রথমে মনে হয়েছে আকাশের সফেদ মেঘ। চারদিকে খাড়া পাহাড়, পাহাড় আড়াল করে সূর্যের আলো, মেঘ আর কুয়াশা জড়িয়ে আছে নদীটাকে। চির শান্ত, ধ্যানমগ্ন, উদার; অবারিত। গোলপাতা, শাল আর বাঁশ বন নদীর পাড় ধরে এমন ভাবে উঠে এসেছে পাহাড়গুলোতে যেন পিকাসোর আঁকা বিখ্যাত কোনো পেন্টিং।

এত জীবন্ত, মনোমুগ্ধকর, স্নিগ্ধ, আবেদনময়ী প্রকৃতি এ প্রথম দেখলাম আমি। এখানে প্রতিদিনই বসন্ত! হলুদ আর ছাইরঙ পাখিরা দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় পাহাড়ি উপত্যকায়। পাহাড়ি কলা, পেঁপে, আতা আর বেতফল নিয়ে রাস্তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে উপজাতি মেয়েরা। ওদের পরনে থাকে স্কার্ট আর টপস্। গাড়ি থামিয়ে টুরিস্টরা কিনে নেয় ওদের পাহাড়ি ফল।

কেউ কেউ আবার মুরগি আর হরিলয়াল পাখি বিক্রি করে। থানচি আসতে আমাদের তিন ঘণ্টা লেগেছিল গাড়িতে। গোটা পথই ছিল অদ্ভুত রোমাঞ্চকর। প্রকৃতি এক পাহাড়ের সাথে অন্য পাহাড় এমনভাবে জোড়া লাগিয়ে রেখেছে যেন মানুষের জন্য রাস্তা তৈরি করে রেখেছে।

সবুজ পাহাড় বেয়ে সূর্যের আলো নিচে নেমে আসে, অনেকটা কুয়াশার মতো তৈরি হয়। দেখা যায় গাছেরা মাটি থেকে পানি সংগ্রহ করে কিভাবে তার আকাশে ছড়িয়ে দেয়, আর রোদে তা বাস্প করে নিয়ে মেঘে রূপান্তর করে।

থানচি এসে আমাকে রেখে ওরা চলে গেল। আমি আবার একা। কিছুই ভাবছি না। মাথা পুরোপুরি ফাঁকা করে বসে আছি বাঙালি এক রেস্টুরেন্টে। গরম সিঙ্গাড়া আর চা খেয়ে একটি সিগারেট হাতে নিয়ে গোটা বাজারটা ঘুরে দেখছি। একটি বটগাছ আছে বাজারের মধ্যে। এখানে উপজাতি আর বাঙালিদের দোকান রয়েছে।

এখানে যে বহুদূর থেকে লোকজন আসে বাজার করতে তা বোঝা গেল। কিন্তু কত দূর? তা বুঝেছিলাম দুদিন পরে। থানচি গোটা অঞ্চলের কেন্দ্র। পাশেই বিজিবি ক্যাম্প। ক্যাম্পটি সাঙ্গু নদীর তীরে। গোটা থানচি বাজারটাই সাঙ্গু নদীর তীরে। কি করব কিছু বুঝতে পারছি না। বিজিবি ক্যাম্পে দাঁড়িয়ে দেখলাম—সাঙ্গু নদী পাড়ে কাঠের শক্ত সামপান ভেড়ানো। সামপানগুলো চলছে স্পিডবোটের ইঞ্জিন নিয়ে। এ সাঙ্গু নদী ধরেই দূরে চলে যায় পর্যটক আর পাহাড়িরা।

কি করব ভাবছি। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম শান্ত নিরিবিলি একটি জায়গায়। একেবারেই সাঙ্গু নদীর পাড়ে। এখানে বেশ লম্বা একটি সিঁড়ি, এ সিঁড়ি বেয়েই নেমে যায় সাঙ্গু নদীতে। সিঁড়ির মুখেই একটি সরাইখানা। এখানেই উপজাতিরা বিশ্রাম নেয়। চারদিকে বাঁশের বেড়া, বেড়ার ফাঁক-ফোঁকর খুঁজে অবিরাম বাতাসের খেলা চলে। এখানে কারেন্ট নেই, নেই কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক।

সরাইখানা দেখে মনে হলো যেন সেলজুক সাম্রাজ্যের পথে হেঁটে ক্লান্ত কোনো তুর্কী যোদ্ধার গোপন বিশ্রামাগার। কোনো চেয়ার নেই। চাঁদের মতো গোল একটি টেবিল, যতটুকু উঁচু হলে কাঠের মেঝেতে বসে খাওয়া যায়। ওখানে বসে এক কাপ চা খেলাম। আমার পাশেই বসে আছে একটি মারমা মেয়ে আর একটি ছেলে। মেয়েটি দেখতে সুন্দরী। বারবার আমাকে দেখছে। ওরা ভালো বাংলা বলতে পারে।

কথায় কথায় জানা হলো ওরা স্বামী-স্ত্রী। ওদের সামপানে আমাকে নিয়ে যেতে পারবে রেমাক্কি পর্যন্ত। ওদের ঘরেই থাকার ব্যবস্থা করে দেবে। এখান থেকে যারাই দুর্গম এলাকায় যাবে, তাদের থাকতে হবে মারমা বা খিয়াংদের ঘরে, এছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। কিন্তু ওদের সাথে গেলে আমাকে পালিয়ে যেতে হবে। বিজিবির হাতে ধরা খেয়ে অনেক রকম সমস্যা হতে পারে। এখানে নাম-ধাম এন্ট্রি করতে হবে, সাথে গাইড নেবার নিয়ম আছে। এটা নিরাপত্তার জন্যও।

আমার আর ওদের সাথে যাওয়া হলো না। আমি নিজেই সাহস করলাম না। সরাইখানা থেকে বেরিয়ে এসে মনমরা হয়ে থানচি বাজারে ঘুরছি। এরই মধ্যে একটি দল আমার চোখে পড়ল, তারা ফর্ম পূরণ করছে। আমি কাছে গিয়ে বল্লাম—ভাই আমি একা, আপনাদের গ্রুপের সাথে নিতে পারেন।

আপনি কোথায় যাবেন? আমাকে প্রশ্ন করে ওদের মধ্যে একজন।

বললাম—জানি না। আপনারা যেখানে যাবেন সেখানেই যাব।

একটু হেসে তারা আমাকে বলল—আমাদের একজনই কম হচ্ছে। আমরা ন’ জন। আপনি হলে আমাদের দশজন হয়। দু’টি বোট নিতে হবে।

আমাদের নাম, বাড়ির ঠিকানা ও বাড়ির একটি ফোন নাম্বার, ন্যাশনাল আইডিসহ কাজগপত্র খুবই দ্রুত করে নিতে থাকে গাইড। তারপর থানচি থানায় (পাশের পাহাড়ের ওপর) গিয়ে পুলিশ আমাদের সবার ছবি তুলে সব রিপোর্ট রেখে বিদায় দিলো। বর্ডার গার্ড থেকে বিদায় নিয়ে আমরা নৌকায় উঠে পড়লাম।

অদ্ভুত এ অভিজ্ঞতা। নৌকাটা দেড় ফুট চওড়া, কিন্তু লম্বা। মোটা কাঠ, যেন পাথরের ধাক্কা খেয়ে ফেটে না যায়। সাঙ্গু নদী হচ্ছে পাথুরে নদী। শুকনো মৌসুমে পানি থাকে মাত্র এক ফুট থেকে দুফুট। নৌকার পিছনে একটি লোহার লম্বা হাতল, তাতেই ইঞ্জিনের পাখা লাগানো। নৌকা ঠেলে নিয়ে যাবার জন্য শক্তিশালী স্পিড বোটের ইঞ্জিন। প্রচণ্ড রকম শব্দ করে চলছে বোট। দুপাশে উঁচু পাথরের পাহাড়। নদীর তলায় পাথর। পাহাড়ের গায়ে কোটি বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা নাম না জানা হরেক রকমের গাছ।

এখানে কোনো নেটওয়ার্ক নেই, পাহাড়ি এ নদীতে চলছি—আমরা যেন কোনো আদিম সময়ের হাত ধরে হাঁটছি। সবচেয়ে আসল কথা হলো এটি হচ্ছে পাহাড়ি লোকদের পথ। অন্য কোনো পথ নেই। বোট চলছে, দানবের মত পাহাড় আর পুরনো সব গাছ, যেন দানবের নখ বা প্রাচীন গ্রিক দেবতাদের বসবাসের জায়গা।

মনে পড়ছে লিয়াকতের কথা। লিয়াকত কোনো দিনই বুঝতে পারেনি, আমি ছেলে। ওর পাগলামি, বিষণ্নতা, ভালোবাসার উন্মাদনা দেখে এক সময় থিয়েটারের সবাই ওকে বোঝাতে চেষ্টা করাতে থাকে—আমি সীমা নই, আমার নাম সুজন। আমি মেয়ে সেজে অভিনয় করি।

কিন্তু কিছুতেই কারো কথা বিশ্বাস করতে চায় না লিয়াকত, সে বলত—ও ছেলে হলেও আমি ওকে বিয়ে করব। আপনারা বুঝতেছেন না, ওকে ছাড়া আমি বাঁচি না।

ওর চোখে পানি ঝরত সরু ঝরনার মতো। ওকে দেখে আমি নিজেও খুব কষ্টে পড়ে গেলাম। কোনো মেয়ের সাথে আমার প্রেম হয়নি সত্যি, কিন্তু আমার জন্য কারো এত ভালোবাসা—সে ভালোবাসার ঢেউ আমাকে প্লাবিত করে দিচ্ছিল প্রতিমুহূর্তে। আমার চোখের পানি শেষ হতো না। শো-তে খুবই কষ্ট করে মুখে হাসি ধরে রাখতে হত। কান্নার রোল হলে এমনভাবে কাঁদতাম, আমার সাথে দর্শকরাও কাঁদত। তখন আমার (সীমার) সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এবার সিনেমায় ডাক আসে। নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করতে হবে।

টানা চার ঘণ্টা বোট চলার পর আমরা চলে এলাম রেমাক্কি। এবার নৌকা ছেড়ে দিলাম। হাঁটার পালা। রেমাক্কি বাজারে বসে আমরা কলা, রুটি, কেক আর চা খেয়ে সিগারেট ধরালাম। এর মধ্যে ওদের সাথে আমার পরিচয় ঘটেছে। ওদের মধ্যে ছ’জন ডাক্তার, আরিফ নামে একটি ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। আর দুজন অন্য একটি ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করেছে। ওদের মধ্যে একজন নিপু পাহাড়ি মদ খেয়ে নিলো কয়েক ঢোক। এখানে মদ মুদি দোকানে পাওয়া যায়।

রেমাক্কি ছোট একটি নগরের মতো, প্রাচীন নগর সভ্যতার মতো এখানকার জীবন। চারদিকেই উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের চূড়ায় মানুষের বসতি। বিজিবির ক্যাম্প, দোকানপাট। আমি ভেবেছিলাম এ পর্যন্তই আমাদের শেষ গন্তব্য। কারণ তার পর কোনো যানবাহন নেই। যেখানেই যাব হেঁটে যেতে হবে।

রেমাক্কিতে সামান্য কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম, পাথরের পাহাড়ি পথে! এবার ঠিকঠিক হাজার বছর পিছনে ফিরে গেলাম। একটি ইংরেজি ছবি দেখেছিলাম—আদিম মানুষদের নিয়ে। আমার মনে হতে থাকল আমি সেই মুভিটির ভিতরে আছি।

আমার কলম কি করে এ পথের বিবরণ দেবে, তা বুঝতে পারছি না। এই সৌন্দর্য, প্রকৃতি, সূর্যের আলো আর গাছের ছায়া, ভয়ংকর, রোমাঞ্চকর অবস্থার কোনোভাবেই বিবরণ দেওয়া যায় না। দুপাশে আকাশচুম্বি পাথরের পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে জড়ানো সবুজ বন। আমাদের পথ সেই দুপাহাড়ের উপত্যকা, ঠিক উপত্যকাও নয়—অনেকটা নদীর মতো। তবে পানি নেই। নীচে বিশাল বিশাল পাথর। এক একটি পাথর যেন এক একটি কালো-সাদা মেঘের চাকা। এ পাথর বেয়ে, আবার পাথরের ফাঁকে সরু পথ বেয়ে হাঁটতে থাকি আমরা। সামনে গাইড ইমন। একটি মানুষও নেই। গা ছমছম করছে, মাঝে মাঝে ডেকে উঠছে পাখি। লম্বা কালো লেজের পাখিরা বসে থাকে নীরবে।

মাঝে মাঝে দেখতে পাচ্ছি পানির স্রোতে, ঝরনার পানি এসে ভেসে যাচ্ছে। ওটাকে ওরা ঝিরি বলে। সেই সব ঝিরি থেকে পানি খেয়ে আবার হাঁটতে থাকি আমরা। এভাবে সাড়ে তিন ঘণ্টা এসে যখন নাফাখুম এসে দাঁড়ালাম তখন সন্ধ্যা। খুমের’র বিশাল জলরাশি আর উঁচু পাহাড় দেখে বিহ্বলতায় ঘিরে রাখল আমাদের অনেকক্ষণ। এদিকে নিজের ব্যাগ কখনো মাথায় আবার কখনো হাতে নিচ্ছি, ক্লান্ত শরীর।

সেখান থেকে পানি খেয়ে, সিগারেট টেনে দেখলাম সূর্য পশ্চিম আকাশের একেবারেই শেষের দিকে। অজু করে একটি পাথরের উপর দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ে নিলাম। কবলামুখী হয় আমার সাথে সিজদা করে একটি পাখি। ভাবলাম, এ রাতে কোথায় যাব আমরা? এ দুগর্ম পথ! এখানে থাকবই-বা কোথায়? হঠাৎ চোখে পড়ল—পাহাড়ের ওপর কয়েকটি বাঁশের তৈরি ঘর, দোকান। উপজাতিদের একজন এসে জানাল ইচ্ছে করলে এখানে তোমরা থাকতে পারো। কিছুটা অবাক হয়েছিলাম, কিভাবে?

পরে অবশ্য জেনেছিলাম এ সব অঞ্চলে যারাই ঘুরতে আসুক, তাদের থাকতে হবে এ সব উপজাতিদের ঘরেই। একটি বড় রুমের মধ্যে ঢালাই বিছানায় আট, নয় বা দশ জন। মশারি নেই, বিছানার চাদর নেই, নামে মাত্র বালিশ।

নাফাখুম থেকে আমরা হাঁটতে থাকলাম। তখন আকাশে চাঁদ উঠেছে। শুনেছি পাহাড়ে মানুষ খুন হতো আগে। আমরা যেখানে এসেছি এখানে যদি খুন করে কেউ আমাদের দেহ রোদে শুকাতে দেয়, কেউ টেরও পাবে না।

হঠাৎ শুনতে পেলাম একটি পাখির ডাকের শব্দ আর টর্চের আলো। গাইড ওর ছোট্ট স্পিকারে গান বাজাতে থাকলো ফুল ভলিউমে। ভয়ে আমাদের বুকের ভেতর দুরুদুরু করছে। যা ভেবেছিলাম তাই সামনে কয়েকজন পাহাড়ি অস্ত্রধারী।

শেষের দিকে খুবই পাগলামি করতে থাকে লিয়াকত। আমাকে না দেখে সে থাকতে চায় না। ইচ্ছামতো টাকা খরচ করে, আর অনেকেই আমার সাথে দেখা করিয়ে দেবার নাম করে ওর কাছ থেকে টাকা নিত। কি করব, কিছুই বুঝতে পারছি না। আর বিষয়টা নিয়ে কারো সাথে আলোচনাও করা যাচ্ছিল না।

এ যেন রোমান গ্লাডিয়েটরের মতো। গ্লাডিয়েটরদের খেলতে হতো বাঘ বা সিংহের সাথে। হয় বাঁচো, না নয় হিংস্র পশুটাকে মারো। রোমানরা খুব মজা করে সে খেলা দেখত, আর উল্লাস করত।

রাতের সৌন্দর্য আর ভয় নিয়ে আমরা আবারও হাঁটলাম প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টা। আমরা গিয়ে উঠলাম পাহাড়ের চূড়ায় একটি গ্রামে। গ্রামের নাম- থুইচা পাড়া। পাহাড়ের উপর প্রায় দশটি ঘর, তিনটি মুদি দোকান নিয়ে এ পাড়া। পাশেই আরও উঁচু পাহাড়ে বিজিবি ক্যাম্প। ওটা জিন্না পাড়া। এখানে এসে দম ছাড়লাম আমরা। একটি কাজুবাদাম গাছের নিচে বাঁশের মাচাং করা, সেখানে গিয়ে বসলাম। শরীরের প্রতিটি কোষ যেন নিস্তেজ হয়ে গেছে।

এখানে পানির ব্যবস্থা দেখে খুব ভালো লাগল, কয়েল পাইপ দিয়ে পানি আনা হয়েছে ঝরনা থেকে। অনবরত পানি আসছে। ঠান্ডা প্রকৃতির পানি। এ পানিতেই ওদের নাওয়া-খাওয়া সব চলে।

সেরাতে গোসল করে ঘুমুতে গেলাম আমরা। রাতের খাবার হলো জুম চালের ভাত, পাহাড়ি মুরগির মাংস আর আলুভর্তা। ও রান্না মুখে তোলার মতো নয়। কিন্তু আমরা খেলাম, আগ্রহ নিয়েই খেতে হলো। সেদিন আর রাত জাগল না কেউ। কাঠের দোতলা ঘর। আমি শুয়েছি একেবারেই বেড়ার কাছে।

রাত বাড়ছে। গাঢ় নীরবতা আমাদের গ্রাস করছে, অদ্ভুত গাঢ় নীরবতা। রাতজাগা পাখিরা ডাকছে সহসা।

লিয়াকতের সাথে শেষ দেখা হয়েছিল এক সন্ধ্যায়। আমি সীমা সেজেছিলাম। তারপর আমি এক এক করে আমার শরীরের সব পোশাক খুলতে থাকি ওর সামনেই। তাতেও ওর বিশ্বাস করছে না লিয়াকত। এক সময় আমি আমার গায়ের সবটুকু পোশাক খুলে দিলাম, আর লিয়াকত আমার নগ্ন শরীর দেখে শিশুর মতো চিৎকার করে কেঁদে উঠল। ওর কান্নায় জড়িয়ে ছিল মায়া আর ভালোবাসা। স্বপ্ন ভেঙে যাবার কষ্ট। ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে। ওর কান্না দেখে আমিও যেন কখন কাঁদতে থাকি। অনেকক্ষণ পর বুঝতে পেরেছিলাম আমার শরীর সম্পূর্ণ অনাবৃত। চোখের পানিতে আমার বুক ভেসে যাচ্ছে। মেঝেতে গড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছে লিয়াকত।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

গহন

গহন

গহন

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২১, ১২:১০

১.

একটা পোড়া গন্ধ সহোদরার মতো আমার সাথে লেগে আছে সে অনেক্ষণ। ঠিক মাংস পোড়া না, আবার বন পোড়াও না। মনে হয় পালক পোড়া গন্ধ। তবে উৎকট গন্ধ না, আবার মিষ্টিও না—হালকা একটা পালক পোড়া গন্ধই এতক্ষণ ধরে হাঁটতেছে আমার সাথে সাথে। শ্মশানের মতো বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াতেই গন্ধটা যেন একটু নড়েচড়ে উঠে জানান দিলো এটাই তার অঙ্গারখানা। এখানকার ছাইই সুরমা হয়ে লেগে আছে রোহানের চোখে। এখানকার গন্ধই আতর হয়ে লেগে আছে মেহগনির গায়ে।

‘রোহানরে যাদু আমার, এইডা তুই কী করলি।’ রানু খালার এই বিলাপ আমাকে খুব একটা বিচলিত করেনি, আমি যেমন দাঁড়িয়ে ছিলাম তেমনি আছি। মোখলেচ-রোহানের সাগরেদ যার সাথে দেখা হইছিলো গতবার—আমাকে চিনতে পারে। চেনার আলামত হিসাবে আমার কাছে এসে দাঁড়ায়, হয়তো কোন কথা ওর বুকের ভিতর আকুপাকু করতেছে। কিন্তু এই মুহূর্তে বলা কতটা শোভন হবে তা ভেবে সে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না। আমি নিজে থেকে আগায়ে গিয়া বললাম, ‘মন খারাপ কইরো না মোখলেচ। তোমার উস্তাদ শান্তির দেশেই গেছে। ওর জন্যে এরচেয়ে ভাল আর কিই-বা হইতে পারতো।’ পাশ ফিরে তাকাতেই আমি মোখলেচের বদলে একটা শিশু মেহগনিকে ঈশ্বরের তপ্ত নিশ্বাসে কেঁপে কেঁপে উঠতে দেখি।

আমার মনে হয়, যদি উঁকি দেই এই অসমাপ্ত বাড়িটার কোনার একটা রুমে, যা গত পনেরো বছর ধরে ছিলো রোহানের আস্তানা, দেখবো এখনও সে হেলান দিয়ে বসা এবং পাশে বসে আসে মোখলেচ ও আরো দুই একজন গাঞ্জুট্টি স্যাঙ্গাৎ। শেষবারের প্রথম দর্শনের দৃশ্যটা তো এমনই ছিলো। রোহান আমাকে দেখে অবিশ্বাসী দৃষ্টি নিয়ে শূন্যতার দিকে তাকিয়ে ছিলো, যেন মরা মাছের খোলা চোখ, যেন ঘোলা পানির নিচে শুয়ে আছে দুইটা শিশু কাছিম। আমি কি রোহানের দিকে তাকায়ে মুচকি মুচকি হাসতেছিলাম?—হয়তো তাই। এই এখনও যেমন আমি টের পাচ্ছি আমার ঠোঁটের কোণে একটু হাসি হাসি ভাব, আর আমার মুখমণ্ডলে উদ্ভাসিত হচ্ছে একটা অচেনা প্রাপ্তির নিষ্ঠুর তৃপ্তি। রোহান হয়তো বুঝতে পারতেছিল না আমার এত খুশি হওয়ার কী আছে। এত বছর পর এমন আচমকা এসে রোহানকে খুশি করার সুযোগ আর আদৌ আছে কিনা তা নিয়ে আমি কিছুটা সন্দিহান ছিলাম। তারপরও প্রথম দেখার মুহূর্তে তো আর এত কথা, এত রাগ, এত অভিমান মনে থাকে না। হয়তো একটু পরেই একটা একটা করে মনে পড়বে। আর আমার উচ্ছ্বাস চুপসাইতে থাকবে বেলুনের মতো। আমার খুব ইচ্ছা করতেছিলো রোহানকে একটু জড়ায়ে ধরি। যদি রোহান একটু উঠে এসে আমাকে একটা হাগ দিতো, আমি এটা কল্পনা করতে পারি, এটুকুই, এর বেশি আমি ওর কাছ থেকে আশা করতে পারি না। রোহান যেমন বসা ছিলো তেমনই বসে থাকে। এক মুহূর্তের জন্যে চোখ নামিয়ে আবার চোখ তুলে তাকায় আমার চোখে সরাসরি। আমার মনে হয় রোহানের চোখ দুইটা আমার চোখের ভিতর দিয়ে আমার কলিজায় গিয়ে ঘা মারল। এই চাহনি নতুন না, কিন্তু এত বছর পরও তা একই রকম থাকবে তা আমি আশা করি নাই।

রোহানের চোখ আর আমার চোখের সামনে নাই, কিন্তু ওর ঘা-মারা-দৃষ্টি এখনও আমায় দেখছে এই পোড়া গন্ধমাখা বাড়িটার ভিতর বসে বসে। আমি এই ক্লান্ত অবসন্ন শরীর নিয়ে বাড়ির ঐ কোনার রুমটার দিকে আর আগানোর সাহস করলাম না। আমি তো জানি ঐ ঘরে আর এখন কেউ নাই; এমনকি স্মৃতিরাও মৃত। বাড়িটা আগের চাইতে অনেক বেশি জঙ্গলাকীর্ণ হইছে। গতবার যখন আসছিলাম তখন রোহান পাঁচটা মেহগনির চারা লাগাইছে দেখাইতেছিলো। আর বলতেছিলো, 'নেক্সট যখন আসবা দেখবা এইগুলো আর চারা নাই বিশাল বৃক্ষ হয়ে গেছে।’

রোহানের পক্ষে কি আর কখনও জানা সম্ভব হবে যে মাত্র দুই বছরের মাথায় ওর খোঁজে এসে ওর লাগানো মেহগনির পাশে আমি এতিমের মতো বসে আছি। চোখের সামনে ওর বাগানবাড়ি; এটা একসময় শ্মশানবাড়ি হিসাবে পরিচিত ছিল। দূরে দেখা যাচ্ছে পুষ্কুনির পাড়। যে কারো হঠাৎ দেখে মনে হতে পারে ওটা মহুয়ার তীর, পুষ্কুনির পাড় না। তীর লাগোয়া শ্মশানের মঠটা রোহানের মতোই গোঁয়ার, ভেঙে ভেঙেও স্বাক্ষী হয়ে থাকার জিদ সারা অঙ্গে মেখে দাঁড়িয়ে আছে; যেন কিছুতেই মিশবে না, কিছুতেই বলবে না আমাকে একটু ধরো। কেবল ওর বাড়িটার ভেতরই ঝোপঝাড়ে ঠাসা, নিশ্চয় গরু ছাগলও সেখানে যেতে ভয় পায়। দেখলে বোঝা যায়, বাড়িটা এখন সাপ-নেউল, শেয়াল আর সজারুর দখলে চলে গেছে। এই পুষ্কুনিতে তো কেউ কখনও গোসল করতে আসে বলে মনে হয় না, আসে কি? পানির রং দেখে মনে হয় শুধু ভূত-পেত্নীই পারে এই পুকুরে গোসল করতে। দুই বছর আগে মোখলেচ বলতেছিলো, রুম আর এই পুষ্কুনির পাড় এই তার গুরুর দুনিয়া। এর বাইরে সে গত পনেরো বছরে কোথাও যায় নাই।

‘মোখলেচ, তোমার গুরু নাকি গোয়ালন্দ গেছিলো? তুমি কিছু জান?’

‘না আপা গুরু জীবনেও এই বাড়ির বাইরে যায় নাই, খোদার কসম। আমি আছি না—আমি যাই, যেখানেই যাওয়া লাগে। গুরু বাইর হয় না। উনার কাছে সবাই আসে, উনি কারো কাছে যায় না।’

মোখলেচের কথা শুনে আমার রাগ হওয়া উচিত ছিলো কিন্তু আমি তা না করে মুচকি মুচকি হাসছি আর খোঁচাচ্ছি মোখলেচকে আমার মাথায় বিঁধে থাকা ক্রুশকাঁটা দিয়ে। মনে মনে বলছি, আরও আরও কথা বল মোখলেচ; আমার খুব জানা দরকার রোহান কী কী করে।

‘তোমার গুরু এখন সাধু সাজছে, না?’

‘জি আপা গুরুর কোনো লোভ নাই। উনি খাঁটি সাধু।’

আমি মনে মনে বলি একটা ড্রাগ ডিলার কেমনে সাধু হয় মোখলেচ? প্রশ্নটা গিলে ফেলে বরং মোখলেচকে একটা হাসি উপহার দেই। মোখলেচ গুরুর গরিমায় কিছুটা স্ফীত হয়ে ওঠে। মানুষ এমনই মাকাল ফল, তার বাহির দেখে ভিতর বোঝার উপায় নাই। রোহান সাদা কাপড় পড়ে, চুল দাড়ি কাটে না, একটা সাধু সাধু ভাব আছে। প্রথম দেখে আমারও তাই মনে হইছিলো, তারপর ড্রাগের সাথে সম্পৃক্ততার কথা মাথায় নিয়ে কিছুতেই আর সাধু হিসাবে দেখতে পারতেছিলাম না। এই সুফি বেশ নিয়ে ও যখন মিথ্যা বলে, যখন বলে ও গোয়ালন্দ গেছিল চাচিকে খুঁজতে, চাচি নাকি এখন গোয়ালন্দ মাগিপাড়ার নেত্রী, তখন আমার পক্ষে ওর এই সুফি ভাবকে হিপোক্র্যাসি ছাড়া আর কিছুই মনে হয় নাই। আবার ভাবি, ও হয়তো আমাকে আঘাত করার আর কোন অস্ত্র না পেয়ে চাচিকে বেছে নিছে। ও জানে আমাকে কোথায় আঘাত করলে ব্যাথায় নীল হয়ে যাব, কিন্তু টুঁ শব্দটাও করব না। চাচি চলে যাওয়ার পর থেকেই তো রোহান আসলে সাধু ভাব নিয়ে নিছিলো। সেই ছোটবেলায় যখন রোহানের বয়স ৭-৮ তখনই ও কথা বলতো না, সমবয়সীদের সাথে খেলতে যাইতো না, চেয়ে কখনও খাইতো না। দিলে খাইতো না দিলে চুপচাপ পুষ্কুনির পাড়ে গিয়ে বসে থাকতো।

একটা জীবন পুষ্কুনির পাড়ে বইসা পার করে দিলি রোহান?

২.

মাঝেমধ্যে ভাবি আমাদের ফ্যামিলির পাপটা কোথায়? আমরা সবাই এত অভিশপ্ত কেন? চাচি চলে যাওয়ার পর রোহানকে সত্যি আমি কোলেপিঠে করে বড় করেছি। সারাদিন আমার পিছে পিছে ঘুরতো, রাতেও আমার সাথেই শুইতো। ওমা! বছর দু'য়েক যাওয়ার পরই দেখি ছেলের নুনু খাড়ানো শুরু করছে। যদিও রানু খালা বলছিলো বাচ্চাদের নুনু সেক্সের জন্যে খাড়ায় না, প্রস্রাবের প্রেসারে নাকি খাড়ায়। আস্তে আস্তে ও আমার বুকেও হাত দেওয়া শুরু করল। আমি যতই হাতটা পেটে নিয়ে দেই কিছুক্ষণ পর দেখি হাতটা আবার বুকে চলে আসছে। তারপর দিতাম চিপা ঝাড়ি, জোরে কিছু বলাও যেত না। পাশের খাটেই আবার ছোট ফুপি। তারপরও ছোটফুপি কেমনে কেমনে যেন টের পায়। একদিন রোহানকে বলে, 'রোহান এবার বড় হইছো বাবা, এখন আর আপুর সাথে ঘুমানোর দরকার নাই, ঠিকাছে? এখন থেকে পাশের রুমে শুইবা।' রোহান বরাবরের মতই কিছু বলে না। শুনল কী শুনল না তাও বোঝা যেত না। পাশের রুম আমার পড়ার রুম, একটা ছোট্ট চকি ছিলো। পরের দিন আমি নিজেই সেখানে ওর জন্যে বিছানা করে দেই, রাতে সাথে নিয়ে গিয়ে শোয়ায়ে দেই। শেষে একটা চিমটি দিতেও ভুলি না।

ওমা! অর্ধেক রাত পর দেখি ও আবার আমার বিছানায়। সেটাও ফুপি টের পায় এবং রোহানকে ঝাড়ি দেয়। ঘোষণা করে যদি কথা না শোনে তাহলে নানির বাড়িতে পাঠায়ে দেবে। রোহানের নুয়ে পড়া মাথা আরো আরো নুয়ে পড়তেছিলো। ওর পুরো শরীরে ফুটে উঠতেছিলো লজ্জা আর কষ্টের এক আশ্চর্য পারিজাত। আমার খুব ইচ্ছা করতেছিলো ওকে একটু আদর করি, একটু মাথায় হাত বুলায়ে দেই, আর একবার বুকের সাথে মিশায়ে দেই প্রিয় মুখটা। কিন্তু ফুপির ভয়ে আমি রোহানের দিকে তাকাতেও পারতেছিলাম না।

মেয়েমানুষ হয়ে জন্মাইছি, সাহস দেখানোরও সাহস নাই। মধ্যাহ্নের এই নির্জনতা উপভোগেরও উপায় নাই। নিজের অজান্তেই ইন্দ্রিয় সংকেত দিচ্ছে—ওঠা উচিত, ওঠা উচিত। এরই মধ্যে অচেনা পাখির অদ্ভুত আর্তনাদ ক্ষণে ক্ষণে অত্নরাত্মা কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। আমি পাখি খুব বেশি চিনি না। দুয়েকটা কমন পাখি চিনি—শালিক, কাক, ঘুঘু, চড়ুই। কিন্তু এমন কোনো পাখির দেখা এই বাড়িতে পাই নাই। হঠাৎ করে একটা বাচ্চার কান্না আমার সমস্ত শরীর এমন কাঁপায়ে দিলো যে আমি ঠিক বুঝতেছিলাম না কী করব। এদিক সেদিক চোখ যেতেই আমার মাথার উপর রেনট্রির ডালে বসা একটা পেঁচাকে দেখলাম। মনে পড়ল আমি পেঁচাও চিনি; দেখছি আগেও বহুবার। পেঁচা নাকি ভেংচি মারে, ওদের ডাকও নাকি বাচ্চার কান্নার মতো শোনায়, দাদি বলতো। আমি কখনও পেঁচার ভেংচি বা কান্না শুনছি বলে মনে পড়ছে না। দাদি বলতো নির্জন দুপুরে বা সন্ধ্যায় এরা ডাকে আর কোনো মানুষকে একা দেখলে পুরা মাথাটা উল্টা দিকে ঘুরায়ে এমন ম্যাজিক দেখাবে যে তোর যদি জানা না থাকে তো ভয়ে মুতে দিতে পারিস। দাদির কথা মনে পড়াতে একটু সাহস পেলাম। পেঁচাটার দিকে ভালো করে তাকালাম। দেখি ও আমাকে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতেছে। ওর চোখে চোখ পড়তেই আমি কেঁপে উঠলাম। মনে হলো আমি এই চোখ চিনি। যে দৃষ্টি আমার চোখ হয়ে বুকের ভিতর গিয়ে ঘা মারে। আমাকে চোখ সরানোর কোনো রকম সুযোগ না দিয়ে পেঁচাটা শাই করে আমার উপর দিয়ে উড়ে চলে গেল। পোড়া গন্ধটা আবারও এসে নাকে লাগল।

৩.

রোহানের মামাবাড়িতে এখন আর কেউ নাই। নানুর কথা মনে আছে, খুব দেমাগী মহিলা ছিলো। চাচিও নিশ্চয় নানুর স্বভাব পাইছিলো। চাচিরও দেমাগে নাকি মাটিতে পা পড়তো না। এইগুলো অবশ্য ছোট ফুপির কথা। আমার মনে হয় চাচির নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পেছনে ছোট ফুপির অসূয়াই ছিলো বড় কারণ। চাচির প্রতি ছোট ফুপির ঈর্ষা আমি ছোট মানুষ তবুও বুঝতাম। ছোট ফুপি আর দাদি যেন কোমর বেঁধে লেগে ছিলো চাচিকে বাড়িছাড়া করার জন্যে। নিজেও এমন একটা ফ্যামিলির সাথে গাঁটছড়া বাঁধার পর জানি, মানুষ কিভাবে মানুষকে পাগল বানায়ে ফেলে।

দাদাও ততদিনে নিজের সব দাপটের নিচে চাপা পরা এক মরা বাঘ, যার নখ আছে ধার নাই, রাগের গরগর আছে হুঙ্কার নাই। যে দাদার ভয়ে আমার বাবা-চাচা চিরদিন শিশুই থেকে গেল। সেই দাদা এখন ছোট ফুপির হুঙ্কারে সদা কম্পমান, আম্মা ছাড়া কোনো কথা বলে না। কথা শুরু এবং শেষ দুই জায়গায় দুই আম্মার ব্যবহার আমার পিত্তি জ্বালায়ে দিত। মনে মনে ভাবতাম কবে এই অভিশপ্ত পরিবার আমি ত্যাগ করব। কবে আমার ইন্টার পরীক্ষাটা শেষ হবে, কবে কোন একটা ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে উঠবো। একবার বাড়ির বাইরে যাইতে পারলে জীবনেও আর এমুখো হবো না। তখন একবারও রোহানের কথা ভাবতাম না। আমার নিজের জীবনই তখন এত বিষায়ে উঠছিলো যে একটু শ্বাস নেওয়ার জন্যে হলেও আমাকে বাড়ি ছাড়তে হবে, এই ছিলো দিন-রাত্রির কল্পনা। দাঁত-মুখ খিঁচে তখন একটাই কাজ ছিলো পড়াশোনা। বুঝতে পারছিলাম, এই অভিশপ্ত জায়গা থেকে আমার পরিত্রাণ পাওয়ার একটাই পথ—কোনো একটা ভার্সিটিতে ভর্তি। আহা! রোহান তুইও যদি আমার মতো চিন্তা করতে পারতি, যদি পড়াশুনাটা করতি, যদি দেশ ছেড়ে আমার কাছে চলে আসতে পারতি, তাহলে বিদেশের বাড়িতে আমরা যা খুশি তাই করতে পারতাম। 'চল পালায়ে যাই' তোর অবুঝ আবদারই হয়তো তখন আমরা সত্যি বানায়ে ফেলতে পারতাম। আচ্ছা পালায়ে যাওয়ার বুদ্ধি তোরে কে দিছিলো?

মাঝে মাঝে ভাবি রোহানের মাথায় কেন আসছিলো পালায়ে যাওয়ার কথা? ও তখন স্কুলেও যায় না। একদিন যায়তো তিন দিন যায় না। কারো কথাও শুনে না; না ফুপির, না আমার। ততদিনে দাদার কথা বলার শক্তিও আর অবশিষ্ট নাই। ও মনে করতো ওর সব আবদারই যেহেতু আমি মেনে নেই বিয়ের আবদারও বোধ হয় মেনে নেব; গাধা একটা।

রোহানের বড়মামার চেহারাও একটু একটু মনে পড়ে। এখন দেখলে আর চিনবো কিনা কে জানে। ছোটমামার কথা কিছুই প্রায় মনে নাই। শুনছি ছোটমামা এখন কানাডায় থাকে। আর বড়মামা ঢাকায়। উনাদের বাড়ি এখন শেয়াল-কুকুর আর পোকামাকড়ের দখলে। এই বাগানবাড়িটাও বড়মামা নিজে শুরু করছিলো রিটায়ার্মেন্ট লাইফে থাকবে বলে। কী কারনে যেন কিছুদূর করে আর করে নাই। পরে রোহান এসে এখানে আস্তানা গাড়লো। আস্তানা হিসাবে বাড়িটা সত্যিই চমৎকার। চারদিকে দেয়াল ঘেরা, বিশাল পুষ্কুনি সাথে চারপাশে নানা রকম গাছের সমাহার। এমন একটা বাড়ি থেকে যে ইনকাম হওয়ার কথা তা দিয়েই কিন্তু রোহান চলতে পারতো। ওর ড্রাগ ডিলিংয়ে জড়াতে হইছিলো কেন? না মোখলেচকে যেকোন ভাবেই হোক খুঁজে বের করতে হবে। গ্রামে কেউ না কেউ ওর খোঁজ দিতে পারবে নিশ্চয়।

৪.

বাড়িটা থেকে বের হয়ে একটা গোপাট ধরে কয়েকশ গজ গেলেই সড়ক। সড়কটা এখনও পাকা হয় নাই। তবে রিকশা চলে আর আধা মাইল মতো গেলেই রিকশা স্ট্যান্ড পাওয়া যায়। রাস্তাটার কাছে যেতেই দেখি একটা খালি রিকশা আসতাছে। জিগাইলাম গাংনি বাজারে যাবে কিনা, সেও রাজি হয়ে গেল। বাজার বলতে যা বোঝায়, গাংনি বাজার আসলে সেরকম না। একটা খোলা যায়গা, পাশে একটা প্রাইমারি স্কুল এবং এই স্কুল মাঠে সপ্তাহে দুইদিন হাট বসে। এলাকার মানুষ গাংনি বাজার হিসাবেই চিনে; রোহানের নানাবাড়ির কাছে। সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে নিশ্চয় কেউ না কেউ মোখলেচের খোঁজ দিতে পারবে।

’চইত মাইয়া দিনের রোইদ গো আম্মা অক্করে আড্ডিত গে লাগে’ রিকশা ওয়ালার এই কথায় মনে করার চেষ্টা করলাম লাস্ট কবে চৈত্র মাসের রোদে বাইরে ছিলাম। না মনে পড়ে না। খুব বেশি চেষ্টা করতেও ইচ্ছা করতেছে না। তারপরও আমার ইচ্ছাকে তোয়াক্কা না করে আমার মনই হিসাব করে দেখলো যে গতবারও এই সময়েই আমি রোহানের খোঁজে আসছিলাম, এবারও প্রায় একই সময়ে আবার আসালাম। হ্যাঁ ফেব্রুয়ারীর শেষ, তার মানেতো চৈত্র মাসই। খুব তাতিয়ে রোদ উঠছে, কিন্তু বাতাসে একটা স্নিগ্ধ আমেজ আছে। বাতাসের কারণে রোদটা কেমন যেন পিছলায়ে পড়ে যাচ্ছে গা থেকে। অবশ্য আমি রিকশার হুডের নিচে বসে ভাবছি আর উনি ঠাডা রোদের মধ্যে রিকশা চালাচ্ছে, দুই জনের দুই রকম লাগারই কথা। আমি যে এতক্ষণ রোদে ঘোরাঘুরি করলাম তাও কিন্তু চৈত্র মাসের রোদের তেজ টের পাইলাম না। মনে মনে বলি, আমার হাড্ডি পুড়ে গেছে গো চাচা, আমার গায়ে রোদ লাগে না।

রিকশায় যে বাতাসটা এসে গায়ে লাগতেছে তা খুবই আরামের, ঘুম চলে আসবে বেশিক্ষণ এই রিকশায় চুপচাপ বসে থাকলে। স্বচ্ছ নীল আকাশ, বাতাসের ঝাপটানি নাই, কিন্তু মোলায়েম পরশটা আছে। পুরা রাস্তা ফাঁকা, রিকশা তো নাই-ই মানুষজনও চোখে পড়ছে না। গ্রামের দুপুর এত নির্জন হয়? কেমন যেন ভুতুড়ে একটা নির্জনতা; চকচকে রোদ, কিন্তু চারপাশ নিস্তরঙ্গ নিথর। রোহানের আস্তানাতেও একাই ছিলাম, তবে এতোটা নির্জনতা অনুভব করিনি। এখন এত ভুতুড়ে লাগছে কেন? রিকশাওয়ালা চাচাকে তো বদলোক মনে হয় নাই, যে নির্জন পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে।

'আম্মা আপনে কার বাড়ি যাইবেন?'

রিকশাওয়ালা চাচার এই কথা আমাকে ভুতুরে চিন্তার বাইরে নিয়ে আসে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলি ’রোহানের মামা বাড়ি, চিনেন?’

‘নাম না বললে তো চিনবো না।’

‘গাংনির ফরাজী বাড়ি, চিনেন?’

‘হ চিনুম না কে? আমরাতো চোদ্দগুষ্টি এই এলাকায়ই বড় হৈছি। ফরাজীগো বাড়িতে এহন আর কেউ থাহে না। গ্রামের সব বদ মানুষ রাতে গিয়া ঐহানে জমা হয়। গাঞ্জামদ খায়। ঐহানে কেন যাইবেন?’

‘আমার আত্মীয়র বাড়ি এটা। আমি রোহানের চাচাত বোন। রোহানকে চিনেন?’ ওনার নীরবতা আমাকে জানান দিলো যে চিনে না। আমি কী মনে করে যেন আবার প্রশ্ন করলাম। ’সাধুকে চিনেন?’ এবারও উনি নীরব। মনে মনে ভাবি কী বালের সাধু তুমি রোহান; এলাকার মানুষই তোমারে চিনে না। ভাবেসাবে তো মনে হইছিলো তুমি এলাকার বিরাট পির। সবাই তোমার পা-ধোঁয়া পানি নেওয়ার জন্যে লাইন দেয়। হয়তো ভাবটা আমার সাথে বেশিই দেখাইছিলা।

রোহানকে রেখে যখন ঢাকা চলে গেলাম; তারপর থেকে ওর একটাই কাজ ছিলো, আমাকে কষ্ট দেওয়া। যা যা করলে আমি কষ্ট পাবো, যা যা বলতাম না করার জন্যে, চিঠিতে বা বাড়ি আসলে ও তাই আরো বেশি বেশি করে করতো। কয়েক বছর যাওয়ার পর আমি যখন বুঝতে পারি ব্যপারটা, তারপর আর কিছু বলতাম না। বাড়ি আসা, চিঠি লেখাও ক্রমাগত কমায়ে দিছিলাম। রোহান যদি আমার চাচাত ভাই কাম প্রেমিক না হইতো, মানুষ কতটা অবুঝ হইতে পারে তা হয়তো জানাই হইতো না। বুঝলাম তোর সাথে আমার একটা সেক্সসুয়াল সম্পর্ক হয়ে গেছিলো। সেটা এক সাথে এক লেপের নিচে শোয়ার কারণেই হোক, আর তোর প্রতি দয়া পরবশ হয়েই হোক। তোর ছোট বেলার সমস্ত না পাওয়া ভালবাসা আমি যেন নানাভাবে তোকে পুষিয়ে দিতে চাইতাম। সেই চাওয়া থেকেই তোকে প্রথমে বুকে হাত দিতে দেওয়া, তারপর বুক চুষতে দেওয়া, এবং কোনো একসময় কোন রাহুর টানে যে তোর সাথে সেক্সে লিপ্ত হইছিলাম তা ভাবলে এখনও আমার লজ্জা লাগে। তখনতো উঠতি বয়স। মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে বসা। এক একটা দিন মনে হইতো এক একটা বছর। কিছুতেই পার করতে পারতাম না। টিভি দেখে, বই পড়ে, গান শুনেও যখন দিন পার করতে পারতাম না, তখনই শুরু হইতো ফুপির চোখ ফাঁকি দিয়ে তোর সাথে লুকোচুরি খেলা। একদিনতো আমি তোর ঠোঁটে এমন কামড় বসায়ে দিলাম যে ঠোঁট থেকে গলগল করে রক্ত বাইর হচ্ছিলো। তখন সন্ধ্যার অন্ধকার বেশ ঘন হয়ে গেছে। কল তলায় তুই আমারে পিছন থেকে গিয়ে জড়ায়ে ধরলি। আমি কিছু না বলে ঘুরে তোকে জড়ায়ে ধরে চুমু খাইতে গিয়ে ঠোঁটে এমন চুষাণ দিলাম, কোন ফাঁকে ঠোঁট ফেঁটে রক্ত বাইর হইলো আমি টেরও পাই নাই। এইটুকু ছেলে তারপরও কী বুদ্ধি; ঘরে গিয়ে ফুপিকে বললি কলের ডাণ্ডার বারি খেয়ে ঠোঁট ফাটাইছিস। আমিও দৌড়ায়া গেলাম। ফুপি আমাকেই অর্ডার করল, ‘সোমা তাড়াতাড়ি ডেটল আর তুলা আন। দেখ কী অবস্থা করছে!’ আমি দৌড়ায়ে ডেটল মাখা তুলা দিয়ে তোর ঠোঁটে চেপে ধরলাম। কিন্তু হাসি থামাইতেই পারতেছিলাম না। ফুপি দিল ধমক। আমি বললাম ফুপি, ’ও এত বোকা কেন?’ আমি হাসতে হাসতে বাইরে চলে গেলাম। আমার পক্ষে এই জিনিস ডিল করা আর সম্ভব হচ্ছিলো না।

আহারে রোহান, তুই কি আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যেই এত কিছুর আয়োজন করলি? কিন্তু কোন কিছুই আমাকে কষ্ট দিতে পারলো না। তোর বোঝা উচিত ছিলো আমরা একই মাটি দিয়ে বানানো, একই কাঠের আগুনে পোড়া পুতুল। তোর মা ভেগে গেছিলো, না গুম হয়ে গেছিলো তা কেউ কোনদিন খোঁজও করল না। তার কিছুদিন পর আমার মাওতো মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছিলো, যখন উনার কোন ভাবেই মরার কথা না। উনার একটা মেয়ে বাচ্চা ছিলো, শাশুড়ির আদরের বউ ছিলো, শ্বশুরও সংসারের সব দায়িত্ব বড়বউয়ের হাতে দিতেই বেশি পছন্দ করতো—সেই মা মাত্র তিন দিনের জ্বরে মরে গেল। বাবা ঢাকা থেকে আসারও সুযোগ করতে পারলো না। আসলো মৃত্যুর পরের দিন। লাশ নিয়ে আমরা সবাই বসা; ভৈরব থেকে দুই বস্তা চা এনে ঢেকে রাখা হইছে লাশ। আমরা কাঁনতে কাঁনতে কাহিল হয়ে সব চুপ মেরে গেছি। সারা বাড়ি জুড়ে কবরের নিস্তব্ধতা আর মাদ্রাসা থেকে ডেকে আনা কয়েকটা ছেলের নাকি সুরের কুরআন তেলোয়াত ছাড়া কিচ্ছু ছিলো না। চাচা তখন ঢাকায়, খবর পেয়েও বাড়ি আসলো না। চাচির নিখোঁজ হওয়ার মাস তিনেকের মধ্যেই চাচা ঢাকা চলে গেল। তারপর আর কারো খোঁজই নিলো না কোনদিন - না তোর, না আমাদের, না উনার বাবা-মার। এমনতো না যে উনি গোল্লায় গেছে, সেই সাহসতো উনার ছিলো না। উনিতো দিব্যি বিয়ে করে, চাকরি করে, সংসার করে বেশ স্বাভাবিক নাগরিক জীবনই পার করল। শুধু বাড়ির লোকজনকে দেখালো উনার সকল নিরাসক্তি। কী লাভ হইলো তাতে? একটা সংসার একটা পরিবার চিরদিনের জন্যে ছড়িয়ে গেলো দুনিয়ার নানা প্রান্তে, আর যারা যেতে পারলো না তারা একে একে মিশে গেল মাটির সাথে একটা না বলতে পারা লজ্জা নিয়ে।

এগুলোকে আমি দাদার পুঞ্জীভূত পাপের ফল হিসাবেই দেখি। এর শুরু অনেক আগে, দাদার এলাকায় প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব নেয়ার ভিতর দিয়ে। বিত্তবৈভরের লোভ, দেশভাগের সুযোগে হিন্দুদের সম্পত্তি নামমাত্র মুল্যে হাতায়ে নেওয়া, বিচারের নামে সাধারণের উপর অত্যাচারের ফসলই আমাদের জীবনে কষ্ট আর ভোগান্তি হয়ে ফেরত আসছে রোহান। দাদা নিজেও শেষ বয়সে দেখে গেছে উনার পরিবারের স্খলন। দেখে গেছে উনার আদরের ছেলেদের মধ্যে একজনও স্বাভাবিক পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে পারে নাই। যদিও দৃশ্যত চাকরি বাকরি করা সাধারণ মধ্যবিত্ত অহংকারী জীবনের অধিকারী হইতে পারছিলো দুইজনই। কিন্তু এই দৃশ্যের ভিতর ছিলো দগদগে ঘা। এই গ্যাংগ্রিন হয়ে যাওয়া ঘা আমাদের কাউকেই স্বস্তিতে থাকতে দেবে না। তুই দেখে নিস রোহান, একজনও স্বাভাবিক মৃত্যু পাবে না।

৫.

গাংনি বাজারের দোকানদার আর রিকশাওয়ালা চাচার সহযোগিতায় সহজেই পেয়ে গেলাম মোখলেচকে। গ্রামের মানুষ এখনও একজন আর একজনের খোঁজ খবর রাখে। মোখলেচ গ্রামেই আছে। গতকাল সন্ধ্যায় লোকজন তারে দেখছে, সে বাড়িতেই আছে। এসব খবরা-খরব গাংনি বাজারেই পেয়ে গেলাম। মোখলেচদের বাড়িতে গিয়ে ওকে পাইতেও বেশি সময় লাগে নাই। এখন ওকে নিয়ে যাচ্ছি রোহানের কবর জিয়ারত করতে।

আমি বাড়ি থেকে যাওয়ার বছর খানেক পরই রোহান নানিরবাড়ি চলে যায়। ততদিনে আমাদের বাড়িতেও ফুপি আর দাদা ছাড়া কেউ নাই। ফুপিকে রোহান কখনই সহ্য করতে পারতো না। ততদিনে তাগড়া জোয়ান ও গোয়ার হয়ে উঠছে। ওর গায়ের শক্তির সাথে পারে এমন কেউই বাড়িতে নাই। তার সর্বোচ্চ ভুক্তভোগী মনে হয় আমিই। আবার নিজেকে দোষী বলেও মনে হয়। আমার আশকারা রোহানের জীবনে সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে হাজির হইছিলো। মাঝে মাঝে এও মনে হয় আমি কি রোহানকে ব্যবহার করেছি। আমি কি পেডোফিল?

আমি চোখের ইশারায় ওকে বসায়ে রাখতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ও যতবার উঠতে চাইতো ততবারই আমি চোখ রাঙ্গাতাম। ও উঠতে গিয়েও আবার বসে পড়তো। মাঝেমধ্যে ফুপি বা দাদা ওরে ধমকও দিত। ‘হেই সারাদিন তুই ঘরের মধ্যে কি করস?’ রোহান মাথা নিচু করে বাইর হয়ে যেত আর আমি মুচকি মুচকি হাসতাম। ওকে ঝাড়ি খাওয়াতে পারাই যেন আমার সফলতা। সেই রাগ সে আমার উপর উসুল করতে নানা ভাবে। হায়রে জোরে জোরে ঠাপ মারতো। আমি ওর এই রাগটা উপভোগ করতাম। একবার ওরে আমি অনেক ভয় পাওয়ায় দিছিলাম। তখন আমার পিরিয়ড শুরু হবে হবে করতেছে আমি বুঝতেছিলাম। তার মধ্যেই ও আমাকে জোরাজুরি শুরু করল। আমি অনেক বলেও ওকে থামাতে পারলাম না। করার পর ও টের পাইছে যে ওর পেনিস রক্তে লাল হয়ে গেছে। আমি আবার পরের দিন সকালে আমার সালোয়ারের রক্ত দেখালাম ওরে। ও ভয়ে নীল হয়ে গেছিলো আর প্রতিজ্ঞা করছিলো জীবনেও আমার উপর জোর খাটাবে না। এই প্রতিজ্ঞা অবশ্য ও তিনদিনও রাখে নাই; আমি নিজেই রাখতে দেই নাই। আমি এমন ভাব করতাম যেন আর একটু সাধলে খাব। এইটা বুঝে ও আমাকে পিড়াপিড়ি করতো, করতেই থাকতো। শেষ পর্যন্ত ওকে জয়ী হতে দিতাম। এই করতে করতে কনডম ব্যবহার করা পরেও একবার প্র্যাগনেন্ট হয়ে গেলাম। প্রথমবার পিরিয়ড মিস হওয়ার পরই বুঝতে পারছি যে দেরি করা ঠিক হবে না। সাথে সাথে একদিন কলেজ ফাঁকি দিয়ে রোহানকে নিয়ে নরসিংদী গেলাম। পরিচিত এক আপার সহায়তায় সেবার রক্ষা পাইছিলাম।

আমার আশকারা পাইয়া ওর এমন সাহস হইছিলো, এখন ভাবতেই অবাক লাগে। এই পুচকা এত সাহস কোত্থেকে পাইছিল। বেশ কয়েকবার তো ঢাকায় এসে বায়না ধরতো যে আমাকে নিয়ে সে হোটেলে থাকবে। আমি অবশ্য ততদিনে ইফতির সাথে প্রেম করা শুরু করছি। ওরে ঝাড়ির উপর রাখতাম। আর পাত্তা দিতাম না। দুইতিন বার ট্রাই করেই বুঝছে যে ডাল আর গলবে না। সম্ভবত এর পরই ও গাঞ্জা খাওয়া শুরু করে। পরে শুনছি গাঞ্জা, মদ, ফেন্সি, ইয়াবা হয়ে হিরোইনে গিয়ে ঠেকছিল। যতদিন নানু জীবিত ছিলো ততদিন পয়সার অভাব হয় নাই। বড়মামাও তখন ঘনঘন বাড়ি আসতো। ছোটমামাও নানু বললে কেন টাকা পাঠাতে হবে সেই প্রশ্ন কখনই করতো না। করবেই বা কেন, মার দায় শোধ করার আরতো কোন পথ নাই টাকা ছাড়া। তাই যখনই আবদার তখনই টাকা। আর টাকা ওঠানো, খরচ করা তখন রোহানেরই কাজ। আস্তে আস্তে বড়মামার কান হয়ে যখন ছোটমামা পর্যন্ত পৌঁছালো রোহানের নেশা করার গল্প ততদিন রোহানের আর ফেরার অবস্থা রইল না। যদিও নানুর মৃত্যুর পর মামারা টাকা পয়সা দেওয়া একদমই বন্ধ করে দেয়, তাতে কী; ড্রাগির আবার পয়সার অভাব হয় নাকি। সেই থেকেই মনে হয় ব্যবসার শুরু। এলাকার নেতা আর পুলিশও ছিলো ওর ব্যবসার অংশিদার। ওরে আর পায় কে? রোহানের হাত ধরে বাজিতপুর, কুলিয়ারচর, নিকলি, মিটামইনসহ কিশোরগঞ্জের প্রায় পুরাটাই এখন ড্রাগিদের স্বর্গরাজ্য। এগুলো সবই রানু খালার মুখের কথা। এত শানশৌকত, এত যার ক্ষমতা, এত এত শিষ্য ও স্যাঙ্গাৎ থাকা সত্ত্বেও ওর আত্নহত্যা করা লাগল কেন? কবরের পাশে দাঁড়ায়ে দোয়ার বদলে এই প্রশ্নটাই করব তোকে রোহান।

৬.

গোরস্থানে পৌঁছার পর মোখলেচকে আমার অপ্রকৃতস্থ মনে হচ্ছিল। প্রথম দেখে কিন্তু আমি একদমই বুঝতে পারি নাই যে ও নেশাগ্রস্ত । এখনতো মনে হচ্ছে নেশায় বুদ হয়ে আছে; নাকি ওর স্বভাবই এরকম। কোনকিছুই নিজ সিদ্ধান্তে করতে পারে না। কাউকে বলে দেওয়া লাগে কী করতে হবে। না হয়, কবর দেখাতে এসে ও একবার গোরস্থানে পূর্বকোনায় গিয়ে দাঁড়ায়ে, মনে মনে কী যেন মাপে, আবার পশ্চিম কোনায় এসে দাঁড়ায় কী কারণে। কয়েক কদম হাটে, আবার থামে, আবার আমার কাছে আসে, কী যেন বলতে চায় কিন্তু বলে না, আবার খোঁজে। একবার এসে বলে গেল, ’একটু সময় দেন আপা কবর খুঁজতাছি।’ এক একরের চেয়েও কম জায়গা নিয়ে এই গোরস্থান, সেখানে কবর খুঁজে বাইর করতে হবে কেন আমি বুঝলাম না। মোখলেচ কি দাফনের সময় ছিলো না? প্রশ্নটা করা ঠিক হবে কিনা বুঝতাছি না।

মোখলেচকে দেখে যতটা গরীব, শেকড়হীন, ছিন্নমূল শিশু যে খড়কুটোর মতই সমাজে ঠিকে আছে আমাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে, তরুন বয়সে যারা হঠাৎই হয়ে উঠে সমাজের উঠতি কোন রংবাজের চেলা, যার মা-বাবার সন্ধান কোনদিনই তার পেয়ে উঠা হয় নাই, যারা দৈবক্রমে কৈশোর উত্তীর্ণ হতে পারলে হয়ে উঠে নেশা দ্রব্যের চলমান দোকান তাদেরই একজন ভেবেছিলাম। কিন্তু বাড়ি গিয়ে দেখলাম, না, তা না। ওর মাকে দেখে মনে হলো নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে উঠার ট্রানজিসন পিরিয়ড পার করতেছে। বাবা ছিল দলিল লেখক, বড়ভাই বিদেশ থাকে, আরেক ভাই ঢাকায় চাকরি করে। মোখলেচ নিজে ইন্টার পাস বাদাইম্মা। খাওয়া পরার কোন সমস্যা নাই। বড় ভাই নাকি বিদেশ নিবে সেই স্বপ্নে বিভোর।

'আমার ছোটডা ফারাজীগো ভাইগ্না সাধুর পাল্লায় পইড়া নষ্ট হইয়া গেছে গো মা।’ মোখলেচের মা আমাকে দেখেই এই কথাগুলো বলে উঠেছিলো। আমি শুনলাম কী শুনলাম না সেই দিকেও উনার খুব একটা খেয়াল নাই। যেন বলাটাই উনার কর্তব্য। আমার শোনা-নাশোনা দিয়ে উনার কিছু যায় আসে না। আমিও এই কথার কোন উত্তর না দিতে পাইরা চুপ থাকি। মোখলেচ ঘর থেকে বাইর হয়ে আসে। আমাকে চিনতে ওর বিন্দুমাত্র দেরি হয় নাই। ঘর থেকে বাইর হয়ে সে আমাকে পা ছুঁয়ে সেলাম করে বসতে পারে ভেবে আমি কিছুটা শংকিত এবং সতর্ক ছিলাম। আল্লার রহমত সে তা করেনি। ’স্লামালাইকুম আপা,’ বলে সে পাশে এসে এমন তমিজের সাথে দাঁড়ায় যেন আমি সত্যি ওর গুরু-মা। আমিও টুকটাক দুয়েকটা কথা বলার পর আসল কথায় আসি। বলি যে আমি রোহানের কবর জিয়ারত করতে চাই। আমার এই কথাটা শুনার সাথে সাথে ওর চেহারায় যে হাসির রেশটা ছিলো তা মিশে গিয়ে পথ হারানো মানুষের উদ্বেগের চিহ্ন ফুটে উঠে। ওর এই ভাবান্তর আমাকে কিছুটা হতাশ করলেও আমি তা বুঝতে দেই না; বা আমি নিজেও তা বুঝতে চাই না। আমার কথাতো খুব পরিষ্কার। রোহানের কবরটা দেখতে যাবো; এর বেশি কিছু না।

মোখলেচকে খুব অপ্রকৃতিস্ত, উদ্ভ্রান্ত একজন মানুষ মনে হচ্ছিল। এই পশ্চিম দিকে যাচ্ছে তো এই পূর্বমাথায় গিয়ে দিকভ্রান্ত পথিকের মত দাঁড়ায়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করছে সে এখন কোথায়। আমি খুব বেশি নেশাগ্রস্ত মানুষ দেখি নাই। যা দেখছি রোহানকেই গতবার দেশে আসার পর, তাও একবারই তো দেখা। সেই দেখায় মনে হইছিলো, নেশাখোর গুলা মনে হয় টাইম আর স্পেসটা ঠিক কোথায় তা চিহ্নিত করতে পারে না। মোখলেচের এতক্ষণ কবর খোঁজার কসরত দেখে যা বুঝলাম, মোখলেচ আসলে জানে না রোহানের কবর কোথায় বা সে ভুলে গেছে। নেশাগ্রস্ততার কারণে ঠিক মনে পড়ছে না সে গোরস্থানে কেন আসছে, বা কী খোঁজে, বারবার হয়তো তার মনে পড়ছে কিন্তু পরক্ষণেই হয়তো তা আবার গুলায়ে ফেলতেছে। শেষ পর্যন্ত মোখলেচকে আমি নিজে থেকে ডেকে এনে বললাম, মুখলেচ সত্য করে বলতো সমস্যা কী? তুমি এমন করতেছো কেন? তুমি কি জান রোহানের কবর কোথায়? এবার মোখলেচ আমার সামনে দাঁড়ায়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করে। আমি একটু হকচকিয়ে গেলাম। এখানে কান্নার কী হইল, বুঝতেছি না। একটু ধাতস্থ হওয়ার পর জিজ্ঞেস করলাম। কী হইছে মোখলেচ? যা সত্য তাই খুলে বল আমি কিছু মনে করব না। ‘আপা, আমি জানি না আসলে গুরুর কবর কোথায়। গুরু মারা যাওয়ার আগে আমাদেরকে বলছিলো, ‘যদি উনি মারা যায় তাইলে আমরা যেন উনাকে উনার রুমেই বসায়ে কবর দেই ।’ উনি বলছিলো, ‘কাফনের কাপড়ও পড়ানোর দরকার নাই। উনি যে সাদা কাপড় পরতো তাইতো কাফনের কাপড়। আর উনার মৃত্যুর পর আমরা যেন কেউ না কাঁদি বরং গাঞ্জা-মদ খাইয়া যেন ফুর্তি আমোদ করি। তাইলেই গুরু হিসাবে উনার আত্না শান্তি পাইবো। আর বলছিলো, কোন একদিন নাকি কোন একজন আইসা এই বাগানবাড়িতে মাজার বানাইবো।'

'আমরা তা করতে পারি নাই আপা। গুরুর মৃত্যুর পর আমরা চেষ্টা করছিলাম খুব গোপনে যেন দাফনটা শেষ করতে পারি কিন্তু কেমনে যেন জানাজানি হয়ে গেল। বড়মামার কানে গেল কথা। বড়মামা সাথে সাথে গাড়ি নিয়া রওয়ানা করছে ঢাকা থেইক্কা। আর ফরাজীগোর চাচাতো ভাই মিথুন ফরাজী আমাদের আইসা বাগানবাড়িতে শাসায়ে গেছে। যদি মামা আসার আগে আমরা কিছু করি তাইলে কারো নিস্তার নাই। আমরা ওর কথা শুনি নাই। আমরা আমাদের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম গুরুরে রুমে দাফন করার, কিন্তু তার আগেই বড়মামা এক গাড়ি পুলিশ নিয়া আইসা হাজির। উনারা যখন ইউনিয়ন পরিষদ প্রঙ্গনে আইসা হাজির তখনই আমরা খবর পাই, তারপরতো আপা জান বাঁচানো ফরজ মনে কইরা আমরা সবাই গুরুরে সেখানে রাইখাই পালাই। আমিতো আপা পরে ছয় মাস বাড়িতে আসতে পারি নাই। এখনও আমার নামে থানায় ড্রাগ ডিলিংয়ের মামলা আছে। ছয় মাস পলায়ে, তিন মাস জেল খাইট্টা, তারপর এখন জামিনে আছি আপা। বড় ভাই লাখ টাকা খরচ কইরা আমারে বাইর করে আনছে। প্রমিজ করাইছে যে আর কোনদিন নেশাপানি খামু না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমারে ব্রুনাই লইয়া যাইবো।

গুরুর লাশ যেখানেই দাফন করুক আপা। উনি বাগান বাড়িতেই আছে। উনারে এহান থেইক্কা কেউ সরাইতে পারব না। আপনে দেইখা নিয়েন। বড়মামা এই যে বিছানায় পড়ছে আর উঠতে পারব না। উনি গুরুর মনে খুব কষ্ট দিছে। খুব চেষ্টা করছে গুরুরে বাগানবাড়ি থেইকা উৎখাত করার, পারে নাই। আর পারবও না। একদিন ঠিকই এই বাড়িতে মাজার উঠবো। আমি নিজেই করুম। বিদেশ থেইকা আইসা এইডাই অইব আমার প্রথম কাজ।’

যতই আমি মুখলেচের কথা শুনতেছিলাম ততই আমার রানু খালার কথা মনে হইতেছিলো। রানু খালা কিন্তু একবারের জন্যেও বলে নাই যে বড়মামার সাথে রোহানের বাড়ি নিয়া ঝামেলা চলতেছিল। দেশে এসে প্রথম আমার উনার সাথেই কথা হয়। উনার কথা শুনে মনে হইছিলো বড়মামা যেন রোহানের শোকেই স্ট্রোক করছে। রানু খালা বলতেছিল যে রোহানকে গোরস্থানেই দাফন করা হইছে। বড় ভাইজান নিজে উপস্থিত থেকে একাজ করে তারপর ঢাকা গেছেন। রোহানের সাগরেদদের উদ্ধত ব্যবহারই বড় ভাইজানের অসুস্থতার কারণ। রোহানের সাগরেদরা রোহানকে বাগানবাড়িতেই দাফন করতে চাইছিলো; এমন কি, শুধু বাগান বাড়িতেই না রোহান যে রুমে থাকতো সে রুমেই। এই রকম বেদাত কাজ কি মেনে নেওয়া যায় নাকি! একটা গাঞ্জাখোরের মাজার হবে বাগানবাড়িতে তাও ভাইজান জীবিত থাকতেই।

রোহান বহুদিন ধরেই নাকি বড়মামার সাথে ওর মার ওয়ারিস নিয়ে দেন-দরবার করতেছিলো। অনেক দেন-দরবার করার পর বড়মামা দাবি করে বসে যে রোহানের মা আসলে ওনাদের বাবার মেয়ে না। সে মার আগের তরফের সন্তান, বাবা এইকথা কাউকে জানতে দেয় নাই। চাচি নিখোঁজ হওয়ার পর বড়মামাদের পক্ষ থেকে যে কেউ কোন খোঁজখবর নিলো না, উল্টা চাচির দোষ খুঁজে বেড়াচ্ছিল সবাই, এতদিন পর এসে শুনি তখন থেকেই নাকি এই সব বলাবলি শুরু করছিলো। যাই হোক বড়মামা রোহানকে কোন সম্পত্তির ভাগ দিতে রাজি হয়নি। ছোটমামা নাকি রোহানকে কিছু টাকা পয়সা দিছিলো তবে তা সম্পতির ভাগ হিসাবে না, এমনি ভাগ্নে হিসাবে। যদিও রোহানের মৃ্ত্যুর পর বড়মামা নাকি বলছে সজিব (ছোটমামা) যে টাকা পয়সা দিছে তা হিসাবে ধরলে রোহান তার সম্পত্তির তিনগুন নিয়ে নিছে। আর এত বছর ধরে যে থাকলো খাইলো তার হিসাবতো বাদই। ’আসলে সব দোষ মার বুঝলি সোমা,’ রানুখালা বলে। ‘মার লাই পেয়ে যেমন আপা নষ্ট হইছিলো তেমন রোহানও হইল। আমি বুঝলাম না, আম্মা কিন্তু আমাদের সব ভাই বোনের বেলায়, একেবারে কাট কাট, পান থেকে চুন খসোনো যেত না। কিন্তু আপা আর রোহানে বেলায় একদম দিলদরিয়া। আম্মা নাই উনাকে কোন কিছুর জন্যে দোষারোপ করতে মন সায় দেয় না। কিন্তু দেখ, ওনার লাইয়ের ফলাফল দেখ।’

কাকে বিশ্বাস করব, মোখলেচকে নাকি রানু খালাকে? অবশ্য উনারা উনাদের দিক থেকে হয়তো সত্যই বলতেছে। যার যার পার্সপেকটিভ থেইকা, যা তারা বিশ্বাস করে, যেভাবে দেখে। যে মৃত্যুকে মোখলেচ স্বেচ্চামৃত্যু হিসাবে গ্লোরিফাই করতাছে, সেই একই মৃত্যুকে রানুখালা কালিমা লেপতেছে ওভার ডোজের মৃত্যু বলে। বড়মামার স্ট্রোক রানুখালার কাছে রোহানের শোক সহ্য করতে না পারার ফল; আর মোখলেচের কাছে মালিকের শাস্তি। রানুখালা রোহানকে কখনই পছন্দ করতো না। আজব! নিজের হারায়ে যাওয়া বোনের একমাত্র ছেলে, খালা হিসাবে উনার দায়িত্ব ছিলো ছেলেটাকে মানুষ করার নূন্যতাম চেষ্টা করা। তাতো করলই না, সারাজীবন রোহানের বদনাম বলে বেড়ানোই যেন উনার কাজ। সেই গাধা রোহানও নাকি একবার ক্ষেপছিলো রানু খালার মেয়েকে বিয়ে করার জন্যে। রোহানটা আসলেই গাধা ছিলো। ও যে নিজেরে কি মনে করতো তা আমি আজও বুঝে উঠতে পারি নাই। রাজ্যহারা এক রাজার চরিত্রে অভিনয় করল ও সারা জীবন।

‘বড়মামা পরে প্রচার দিছে আমরা নাকি লাশ নিয়াই পলাইছিলাম। কিন্তু আপা বিশ্বাস করেন আমরা লাশ নেই নাই। লাশ লাশের জায়গাতেই ছিলো আমরা নিজের জান হাতে নিয়া পলাইছিলাম। কিন্তু বড়মামা কয় উনি নাকি বাগান বাড়িতে গিয়া কোন লাশ পায় নাই। আমি জানি আপা গুরু বাগান বাড়ির মধ্যেই মিশে গেছে। উনারে বড়মামা চাইলেই সরাইতে পারব না। আপনি দেইখেন বড়মামার বিরাট ক্ষতি অইবো। উনি জীবনে উনার সম্পদ ভোগ কইরা মরতে পারব না। উনার ধনসম্পদ সব কাউয়াকুলি খাইবো। আপনি দেইখেন আপা।’

আসলে রোহানের কবর কই দেওয়া হইছে তা কেউ জানে না বড়মামা ছাড়া। ছোট ফুপি হয়তো ঠিকই কইছে, রোহানকে কবর দেওয়া হয় নাই নদীতে ভাসায়া দেওয়া হৈছে। বড়মামা আতঙ্কে ছিলো ওরা আবার উনার অনুপস্থিতিতে লাশ এনে বাগান বাড়িতে দাফন করে কিনা। গাঞ্জুটিদের দিয়া তো কোন বিশ্বাস নাই। এই জন্যে উনি লাশ গুম করে ফেলছে যেন ওরা চাইলেও তা খুঁজে না পায়। ফুপি যদিও শিউর না নদীতে ভাসায়ে দিছে না কোথাও এমনি মাটি চাপা দিছে যেন কেউ খুঁজে না পায়। ছোট ফুপির এই কথা আমি রোহানের বিরুদ্ধে উনার বিষোদগারের অংশ হিসাবে নিছিলাম। এখন দেখতেছি রোহানের অমঙ্গলাকাঙ্খী শুধু ছোট ফুপিই ছিলো না ওর নানি বাড়ির লোকজনও একই দলে। এত এত গরল নিয়ে রোহান তুই কেমনে টিকে ছিলি এত দিন? আহারে সোনা আমার, তোর জন্যে কিছুই করতে পারলাম না।

৭.

বাসে ওঠার আগে মোখলেচকে বললাম, যদি পার বাগানবাড়িটা জঙ্গল বানায়ে ফালাও। যত পার গাছ লাগাও, দেখবা একদিন এই বাড়ি আপনাতেই মাজার হয়ে গেছ, তোমার বানাইতে অইব না। মোখলেচ আমার কথা শুনল কী শুনল না বোঝা গেল না। আমি বাসে উঠে বসলাম। সারাদিন পর বসে বাসের সিটকেই দুনিয়ার সবচেয়ে আরামের জায়গা মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল বাসের এই নোংরা সিটের মধ্যে আমার শরীরটা ঢুকে গেছে। দীর্ঘ সময় যে দাঁড়িয়ে ছিলাম তা বসার পর মনে হইল। বাসটা চলতে শুরু করল। সকালের স্নীগ্ধতা আর নাই সেই জায়গায় একটা ইতরপ্রাণীর গন্ধযুক্ত তপ্ত নিশ্বাসের বায়ু ধেয়ে আসছে বাসের উল্টা দিক থেকে। তারপরও চোখ বুজে বসে থাকতে ভাল লাগছে পিঠ আর কোমরের আরামের জন্যে। মনে হচ্ছে আমার জীবনের একটা অধ্যায় বুঝি শেষ করে আসলাম। পেঁচার দৃষ্টিটা কিছুতেই চোখ থেকে সরাতে পারছি না। এখন যতবার রোহানের মুখটা মনে করার চেষ্টা করছি ততবারই রোহানের চোখ সমেত পেঁচার গোলগাল মুখটাও মনে পড়ছে। দাদির কাছে শুনছি, মৃত মানুষের আত্না কখনও কখনও নানা পশুপাখির রূপ ধরে প্রিয়জনদের কাছে আসে। আমাদের বাড়িতে তাই কখনও কুকুর, বিড়াল বা পশুপাখিকে, এমনকি কাককেও লাটি দিয়ে তাড়ানোর নিয়ম ছিলো না। বরং যতটা পারা যেত সবাইকে কিছু না কিছু খাইতে দিত দাদি। বিশেষ করে কুকুর-বিড়ালকে বেশি দিতো। রোহান তুইও কি এখন পেঁচা হয়ে আমাদের সাথে দেখা করতে আসবি?

হঠাৎ দেখি পেঁচার বদলে আমার পাশের সিটে চাচি এসে বসছে। সম্পূর্ণ উলঙ্গ, গায়ে একটা সুতাও নাই। বলে আমার সাথে উনিও অস্ট্রেলিয়া চলে যাবে। আমি ভয়ে কুকড়ায়ে যাইতেছি। কেউ দেখে ফেললে কেলেঙ্কারির আর সীমা থাকবে না। আমি আড়চোখে দেখছি কেউ আমাদের দেখতেছে কিনা; না কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নাই। গাড়িটা দেখি আস্তে আস্তে একটা আঁকাবাঁকা পথ ধরে গহিন জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে যাইতেছে। চারদিকের অন্ধকার ঘন হয়ে আসতাছে। আর আমার ভয়টা একটু একটু কমতাছে। একটু পর দেখি যেখানে চাচি বসা ছিলো সেখানে রোহান। আমি ওর দিকে তাকাতেই বলে, 'সোমাপু, গাড়ির স্টিয়ারিংটা ধর ড্রাইবার কিন্তু নেমে চলে গেছে'। আমি তাকায়ে দেখি সত্যি ড্রাইভিং সিটে কেউ নাই। আমি সিট থেকে উঠে ড্রাইভিং সিটের দিকে আগায়ে যাইতেই দেখি গাড়ির স্টিয়ারিংও নাই; ভয়ে আমার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠার সাথে সাথে টের পাই গাড়িটা একটা ক্রেচক্রেচ শব্দ করে থামলো। দেখি, না সবকিছু যেমন ছিলো তেমনই আছে। গাড়িটা আগের মতই আবার চলতে শুরু করল। ভয়ে ভয়ে রোহান যে সিটটায় বসা ছিল সেদিকে তাকালাম, দেখি একটা জমাট অন্ধকার বসে আছে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

থিয়েটার

থিয়েটার

সর্বশেষ

অক্সিজেন কারখানায় অভিযানে শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগ

অক্সিজেন কারখানায় অভিযানে শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগ

মেয়র আইভীর মায়ের মৃত্যু

মেয়র আইভীর মায়ের মৃত্যু

ভালো খেলতে পারাকেই বড় করে দেখছেন সৌম্য 

ভালো খেলতে পারাকেই বড় করে দেখছেন সৌম্য 

স্কুলশিক্ষার্থীকে আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগ

স্কুলশিক্ষার্থীকে আটকে রেখে ধর্ষণের অভিযোগ

১ কোটি ১৮ লাখের বেশি ভ্যাকসিন দেওয়া শেষ

১ কোটি ১৮ লাখের বেশি ভ্যাকসিন দেওয়া শেষ

পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে দুই রাজনৈতিক কর্মী নিহত

পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে দুই রাজনৈতিক কর্মী নিহত

কুমিল্লায় একদিনে রেকর্ড ৭০১ শনাক্ত, মৃত্যু ১৫

কুমিল্লায় একদিনে রেকর্ড ৭০১ শনাক্ত, মৃত্যু ১৫

নৌ পুলিশের ওপর হামলা: প্রধান আসামি গ্রেফতার

নৌ পুলিশের ওপর হামলা: প্রধান আসামি গ্রেফতার

কোভিড মোকাবিলায় সামাজিক আন্দোলন গড়তে হবে: জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী

কোভিড মোকাবিলায় সামাজিক আন্দোলন গড়তে হবে: জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাহস করে মারতে হয়: শামীম

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাহস করে মারতে হয়: শামীম

সম্প্রচারের আগে কাদা মেখে বিতর্কে জার্মান সাংবাদিক

সম্প্রচারের আগে কাদা মেখে বিতর্কে জার্মান সাংবাদিক

দুর্বল দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া আবশ্যক

কপ-২৬ মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকে পরিবেশমন্ত্রীদুর্বল দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া আবশ্যক

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

থিয়েটার

থিয়েটার

গহন
শীতের অপেক্ষা করছি না

শীতের অপেক্ষা করছি না

মন্তাজের নিজের জমি

মন্তাজের নিজের জমি

ব্যাট-বল

ব্যাট-বল

কোথাও কিছু হচ্ছে

কোথাও কিছু হচ্ছে

কবিতা নিয়ে কোনো সন্তুষ্টি নেই, আছে নিরাময়ের অযোগ্য এক অতৃপ্তি : মিনার মনসুর

কবিতা নিয়ে কোনো সন্তুষ্টি নেই, আছে নিরাময়ের অযোগ্য এক অতৃপ্তি : মিনার মনসুর

© 2021 Bangla Tribune