X
শুক্রবার, ০৮ অক্টোবর ২০২১, ২২ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

শান্তি ও স্বস্তি

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৫, ২১:০৯

শান্তি ও স্বস্তি‘‘কয়েকদিন পর রাইয়ান জানালো ওর বাবা দু’টি পাখি কিনেছেন। ওরাও একটা ফুড লিস্ট বানিয়েছে। ওরা পাখি দুটির নাম দিয়েছে আবির ও সিরাজ। ওয়াহি কিনলো কিছুদিন পর। ও নাম দিলো মিনু আর বিনা।
এরপর স্কুলে দেখা হলেই তিন বন্ধু টিয়া পাখি নিয়ে আলাপ জুড়ে দিতাম।’’

 

এক.
শান্তি ও স্বস্তিকে বাবা যেদিন প্রথম বাসায় নিয়ে আসেন সেই দিনটির কথা স্পষ্ট মনে আছে আজও। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করেছিলাম। বাবা প্রমিজ করেছিলেন– দারুণ কিছু গিফট দেবেন।
পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি তখন। দিনটি ছিল রবিবার। সকাল থেকে ঝুম ঝুম বৃষ্টি পড়ছিল বাইরে। আকাশ থেকে পৃথিবীর দিকে একটা ঝর্ণা ছেড়ে দেয়া হয়েছে যেন।
স্কুলে যেতে কষ্ট হয়েছিল সেদিন। বৃষ্টিতে রিকশা পাওয়া সহজ নয়। পেলেও রিকশাচালকরা যেতে চায় না। বাবার ছাতার নিচে হেঁটে যাচ্ছিলাম দু’জনে। যদিও কষ্ট হচ্ছিলো কিন্তু মজাও ছিল অনেক। এটা অন্যদিনের চেয়ে আলাদা কিছু।
স্কুলের গেইটে এসেই বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘বাবা, মনে থাকবে তো?’
বাবা হেসে বললেন, ‘মনে আছে, তুই ঠিক মতো পড়ালেখা কর। পুরস্কার নিয়ে এত ভাবার দরকার নেই। তুই তো জানিস আমি কথা দিলে রাখি। মন দিয়ে ঠিকমত লেখা পড়া কর।’
‘আমি কি ঠিকমত পড়ছি না?’ বাবাকে মন খারাপ করে জিজ্ঞাসা করি।
ছাতাটা আরেকটু আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে বাবা বললেন, ‘আমি জানি তুই খুব সিরিয়াস ছাত্র। গত পরীক্ষায় ভালো করেছিস। কিন্তু জীবন তো এখানেই শেষ নয়। এই যে তোকে এসব বলছি সেটা শুধু তোর ভালোর জন্য। যাতে আরও ভালো করিস।’
এই বলে বাবা চলে গেলেন। এক অনর্বিচনীয় মনের ভাব নিয়ে তাড়াতাড়ি ক্লাসরুমে ঢুকলাম। কে যেন ডাকলো, হাই রাব্বী, ভিজে গেছিস নাকি!
মন দিয়ে সব ক্লাস করলাম। ততক্ষণে বৃষ্টি থেমেছে। কখন যে সূর্য তার লুকিয়ে রাখা মুখটি বের করে পৃথিবীর বুকের উপর আলো ছড়ালো টের পাইনি। পরিষ্কার নীল আকাশ। সূর্য যেন হাসছে।
বাসায় যেয়ে দেখি বাবা তখনও ফেরেননি অফিস থেকে। মনে মনে ভাবছিলাম বাবা বোধহয় গিফট কিনতে গেছেন কোথাও। তাই দেরি হচ্ছে ফিরতে। বাবা সাধারণত অফিস থেকে বাসায় ফিরতে দেরি করেন না। বিকেলেই চলে আসেন। আমাকে সাড়ে আটটায় স্কুলে দিয়ে অফিসে যান। আমি দু’টায় ফিরি ভ্যানে করে। উনি কিছুক্ষণ পরে আসেন।
স্কুলে থেকে এসে গোসল করে ভাত খেতে বসলাম। মা হরেক রকম তরকারি রান্না করেছিলেন সেদিন। লাল শাক, পুঁইশাক, শিঙ মাছ, মুরগির মাংস, আরও কত কী। তৃপ্তি করে খাওয়া শেষ করে দিলাম টানা ঘুম!
মা বিকেলে ঘুম থেকে তুললেন। পাঁচটা বেজে গেছে। বললেন, ‘হানিফ, বাবা তোমার অনেকদিনের চাওয়া গিফটটা এনেছে।’ আমি বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠি।
‘সত্যি?’
‘হ্যাঁ, সত্যি। বাবার রুমে গিয়ে দেখ।’
তড়িঘড়ি গেলাম বাবার রুমে। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘বাবা আমার পুরস্কার কোথায়?’
বাবা বললেন, ‘বারান্দায় গিয়ে দেখ।’
বারান্দা বাবার রুমের সঙ্গে লাগানো। এজন্য এ রুমে প্রচুর বাতাস। আলো। আমি বারান্দায় যেয়ে এক বিস্ময়কর জিনিস দেখলাম। একটি খাঁচা। সেই খাঁচার ভেতর দুটি টিয়া পাখি। বিশ্বাস করতে পারছিলাম না কী দেখছি। কী চমৎকার একটা পুরস্কার। রঙিন বাঁকা বাঁকা ঠোট ওদের। আমার বাবাটা আসলেই অন্যরকম।
বন্ধুদের দেখেছি ভালো রেজাল্ট করলে বাবারা অনেক দামি দামি জিনিস দেয়। শাবাবকে ওর বাবা একটা ল্যাপটপ দিয়েছে। লুবাবাকে দিয়েছে মোবাইল ফোন। আমরা একই বিল্ডিংয়ে থাকি। কিন্তু আমার বাবা আমাকে এমন কিছু দিলেন যা সেসবের চেয়েও চমৎকার। দারুণ লাগছিল। পশু-পাখি পালা বিরাট অভিজ্ঞতার ব্যাপার। দায়িত্ব নেয়া শেখায়।
আমার কোনো ভাইবোন নেই। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান আমি। একা একা থাকি। ভালো লাগে না অনেক সময়ই। টিয়া দুটোকে পেয়ে ভালো লাগছিল। বারান্দা থেকে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরলাম।
‘থ্যাংকু বাবা।’
বাবাও খুশি হলেন মনে হলো। সঙ্গে অবশ্য বললেন, ‘পড়াশোনাটা কিন্তু ঠিকমতো করতে হবে।’
কিছু না বলে হাত-মুখ ধুতে গেলাম। মনটা আনন্দে ভরে গেল। বাবার প্রতি কিছুটা উষ্মা ছিল। সেটা এতদিন পর চলে গেল। আহ্, খুব মজা।

দুই.
টিয়া পাখি দুটোকে আনার সঙ্গে সঙ্গে যেন আমাদের সংসারে একটা পরিবর্তন ঘটে গেল। আমার তো জীবনটাই বদলে গেল। সেদিন রোববার রাতেই বাবা আর আমি ওদের খাবারের একটা লিস্ট করলাম। রাতে ডিনারের পর বাবা তাঁর রুমে ডাকলেন।
‘হানিফ, আজ থেকে তোমার দায়িত্ব বেড়ে গেল। আরও খেয়াল রাখতে হবে চারিদিকে। পড়ালেখার পাশাপাশি টিয়া দুটিরও যত্ন নিতে হবে কিন্তু। মনে রেখো, ওদের ভালো-মন্দ তোমাকেই দেখতে হবে এবং গাফলতি চলবে না। ওদের কষ্ট দেয়া যাবে না। এই যে এটা নে।’ এই বলেই আমাকে একটা কাগজ বাড়িয়ে দিলেন।
একটা খাবারের তালিকা–
কলা : সকাল ও দুপুর
ভেজা ছোলা : সকাল
ভাত : দুপুর
সরিষা : বিকেল
সঙ্গে পানি দিতে হবে সবসময়।
তালিকার উপরে দেখলাম আন্ডারলাইন করে লেখা, “শান্তি ও স্বস্তির খাবারের তালিকা”।
আমি তো হেসে উঠলাম।
‘বাবা, একি লিখেছো তুমি? শান্তি-স্বস্তি তো মানুষের মনের অনুভূতি। এর আবার খাবারের তালিকা হয় নাকি?’
‘ধুর, বোকা ছেলে, শান্তি ও স্বস্তি তো টিয়া পাখি দুটোর নাম রাখলাম। ওদের জন্যই এই খাবার লিস্ট।’
আমি আবার দৌড়ে বারান্দায় গেলাম। ওদের সারা গায়ে গাঢ় সবুজ পালক। ঠোট দুটো টকটকে লাল। ঘেষাঘেষি করে বসে আছে। মনে হলো দুটোতে খুব ভাব আছে। এক ধরনের কোমলতা ওদের মুখে। বৃষ্টি হওয়ায় আজ আবহাওয়াও ঠান্ডা।
খাবারের লিস্টটা দরজায় টেপ দিয়ে লাগানো হলো।
এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটলো। আমরা যখন এসব করছি বারান্দায় একটা বিড়ালও দাঁড়িয়ে ছিল। ও মাঝে মাঝে রাতে আসতো। বাবার বিড়াল এটা।  আমার মতোই বিড়ালটিও খাঁচার দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর চোখ গাঢ় সোনালি। আমি ভয় পাই। হঠাৎ দেখি বিড়ালটা শান্তি ও স্বস্তির খাঁচার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
চিৎকার দিয়ে উঠলাম, ‘বাবা, বিড়াল।’
বাবা বিছানায় পেপার পড়ছিলেন। আমি টেবিলের পাশে রাখা পুরানো লাঠিটা নিয়ে দৌড়ে ওকে তাড়াতে গেলাম। মনে হলো বিড়ালটা শান্তি ও স্বস্তিকে পছন্দ করছে না। ওদের খামছি দিতে চেয়েছিল।
দোতালার বারান্দা থেকে দৌড়ে অন্ধকারের মধ্যে পালালো বিড়ালটা।
বাবা কেমন যেন রেগে উঠলেন।
‘বিড়ালটাকে তাড়ালি কেন? ওকে তোরা এমন করিস কেন? তোদের কোন দয়া-মায়া নাই? আগেও দেখেছি তুই, মা, দিবাদাই সবাই বিড়ালটাকে দেখলেই তাড়া করিস। সেজন্য ও আজকাল আর আসেই না।’
এটা ঠিক বিড়াল দেখলেই সবাই আমরা দৌড়াই ওকে। দাদি বেশি করে। দাদিকে আমি ছোটবেলা থেকে দিবাদাই বলি। খুব ছোট যখন, দিদা-ভাই বলতে পারতাম না, উচ্চারণ করতাম ‘দিবাদাই।’ এখন বড় হয়েও তাই বলি। বিড়ালটা তাঁর বেশি অপছন্দ। অথচ ওকেও বাবাই এনেছিলেন একসময়।
আমি বিড়ালকে সাপের মতো ভয় পাই। মা তাই টেবিলের কাছে লাঠি রেখে দিয়েছে। ও আসলেই যেন তাড়া করি। যতই বড় হয়েছি সে ভয় যায়নি। আল্লাহ জানে কেন এই ভয়। কিন্তু আজকের ভয়টার কারণ আছে। বিড়ালটা টিয়াগুলোর দিকে যাচ্ছিলো। আমি শিউর, শান্তি ও স্বস্তিকে মারার জন্য আসছিল ও। বাবা বিশ্বাস করবে না অবশ্য।
বললাম, ‘বাবা, আমি চিৎকার করেছি, কারণ বিড়ালটা শান্তি ও স্বস্তিকে মারার জন্য আসছিলো।’
‘বলেছে তোকে’, এই বলে বাবা উঠে বসলেন। তাঁর মুখে কি যেন চিন্তার ছাপ। এরপর বললেন, আজ ঘুমাতে যা। এসব নিয়ে তোর বেশি মাথা ঘামানোর দরকার নাই।
টিভি দেখতে বসলাম। কিন্তু আজ আর মন বসছে না। অস্থির লাগছে। মনে বিষণ্নতা ও পুলক দুটোই। টিয়া দুটোকে পেয়ে ভালো লাগছিল খুব। কিন্তু বিড়ালটার কথা ভেবে ভয় পেলাম। পাখিদের দিকে ও এভাবে কটমট করে তাকাচ্ছিলো কেন? বাবা তো কিছুই বুঝল না।

তিন.
এক বছর পার হলো এভাবে।
কত কিছু ঘটেছে আমাদের বাসায় এর মধ্যে। কত সুখ-দুঃখের মিশ্রন। মনের বন্ধ জানালাগুলো খুলতে কষ্ট লাগে। কত স্মৃতির বাতাস আসে সেখানে। আমার মনে আজও শান্তি ও স্বস্তি অমর। ওরা চিরন্তন হয়ে গেল আমার কাছে। মনে হয় যেন আজো ওরা টুকটুকে লাল ঠোঁট নিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে পাশের বাগানে। কি যে পবিত্র ওদের মুখ দু’টি। আমি যে দূর থেকে দেখি ওদের। মনে হয় যেন আমি আজও খাবার দিচ্ছি শান্তি ও স্বস্তিকে। উড়ে উড়ে বসছে বারান্দায়। মনে কত পুলক আমার।
বাবার দেয়া ফুডলিস্ট ফলো করে খাবার দিতাম আমি ওদের প্রতিদিন। ওদের কথা বলা শিখাতে লেগেছিলাম। প্রথমে শিখালাম ‘হানিফ’ বলা। এটা তো ওরা সহজেই বলতো। তেমন কষ্ট হয়নি।  জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এইভাবেই গেল। কত যে খেয়াল রাখতে হতো আমাকে। নিয়ম করে কথা শেখানো। খাওয়ানো। ওদের বড় করেছি আমি। যেন আমিও অনেক বড় হয়ে যাচ্ছি। যেন অনেক শক্ত সামর্থ একজন আমি।
আজও যখন একলা থাকি এসব ভাবি। ঝড়ো বায়ুর মতো হু হু করে ওদের কথা ঢুকে পড়ে মনের ভেতর। মনে আজো আনন্দ বয়ে যায় ওদের জন্য। আমি নিজেও যেন শান্তি ও স্বস্তি পাই।
বাবা যখন দেখতেন আমি শান্তি ও স্বস্তিকে নিয়মিত খাওয়াই, কথা বলা শেখাই তিনি খুশি হতেন। আমিও তখন আনন্দ পেতাম। এ আনন্দ তো খুলে বলা যায় না। বাবা যেন এতদিনে বুঝলেন আমিও কিছু পারি।
সত্যি বলতে কি, রবীন্দ্রনাথের অমর চরিত্র বলাই যেমন গাছপালাকে মনপ্রাণ ঢেলে ভালোবাসতো তেমনি পাখিদের প্রতিও আমার মনে জন্মেছিল গভীরতর ভালোবাসা। বলাই শুনতে পেত গাছের কান্না-হাসি। ঘাস আর পাতাদের আর্তনাদ। আমিও বুঝতে পারতাম পাখিদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার অনুভূতি। ওরা মাঝে মাঝে মন খারাপ করে বসে থাকতো। মাঝে মাঝে কি যেন আনন্দ দেখতাম ওদের চোখে।
একদিন পানি ঢেলে ঢেলে গোসল করাচ্ছিলাম। বাবা ঘরে এসে দেখলেন। হাসতে হাসতে বললেন, ‘বাহ বাহ্, তুই তো দেখছি অনেক রেসপনসিবল হয়ে গেছিস।’
আমিও হাসলাম। খুব ভালো লাগলো বাবার কথা শুনে।
বাবার প্রশংসা শুনতে ভালো লাগে আমার। এত কম প্রশংসা করেন। তবে অন্যদের কাছে বোধহয় প্রশংসা করেন। মা বলেন, তোমার প্রশংসা তো আমাকে বলেন। অন্যদের বলেন। সামনে প্রশংসা করতে হয় না।
তবে আমার বাবা সবসময় কথা দিলে রাখেন। হয়তো সাথে সাথে নয়। কিন্তু একদিন না একদিন তিনি কথা রাখবেনই। আমি জানি। এটা আমার বড় সুখ।
শান্তি ও স্বস্তিকে যে কথা বলতে শিখিয়েছি সেজন্য বাবা একটা সিডি কিনে দিলেন। সিনেমার সিডি। ‘হ্যারিপটার এন্ড দ্য সাবলেট অব ফায়ার।’ এটা আরেকটা গিফট, আমি বুঝেছি। মাঝে মাঝে বাবা বেশি টাকা খরচ করে ফেলেন।
‘কি দরকার ছিল এটার, টিভিতে তো ধারাবাহিকভাবে দেখাচ্ছেই’, বললাম বাবাকে।
তুই যে শান্তি স্বস্তিকে কেয়ার নিচ্ছিস সেজন্য কিনে দিলাম। তোর জন্যও তো কিছু করতে হবে আমাকে– নাকি?
আমি মাথা নাড়ালাম শুধু।
বাবা আসলে জানতেন আমি ছবিটা খুব পছন্দ করি। টিভিতে এমন সময় দেখায় দেখতে পারি না। বাবা যে কীভাবে সব বুঝে ফেলেন। মন পড়ে ফেলতে পারেন তিনি।
এই গিফটা পেয়েও খুব পুলক হলো। যদিও বেশি কিছু প্রকাশ করিনি। তবে পাখি দু’টির প্রতি আরও ভালোবাসা বেড়ে গেল।

চার.
স্কুলে আমার অনেক বন্ধু। তবে এদের মধ্যে দুইজন বিশেষ বন্ধু আছে। সবার বোধহয় এমন থাকে। ওইরকম বন্ধুরা ভাই-বোনের মতো হয়ে যায়। আমার সেই দুই বন্ধু হলো রাইয়ান এবং ওয়াহি।
ভালো বন্ধু পাওয়া সহজ নয়। নামেই বন্ধু অনেকে– কাজে নয়। সবাই কেবল নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। ভালো দিনগুলোতে সবাই বন্ধু হয়ে যায়। মন খারাপের সময় কাউকে পাওয়া যায় না। ধারে কাছেও দেখি না তাদের। একদিন ক্লাসে মিস বুঝিয়েছেন এরকম বন্ধুরা হলো ‘সুখের পায়রা’।
আমাদের ক্লাশেও কয়েকজন সুখের পায়রা আছে। রাইয়ান এবং ওয়াহি অবশ্য সুখের পায়রা নয়। ওদের মধ্যে সেরকম স্বভাব দেখিনি। আমার সাত বছরের বন্ধু ওরা। আশা করি বাকি জীবনও বন্ধু থাকবে। একদিন ওদের দাওয়াত দিলাম আমাদের বাসায়। ওদের বাবা-মাও এসেছিলেন। মা সেদিন ছুটি নিয়ে অনেক কিছু রান্না করেছেন। ওনারা লিভিং রুমেই বসেছিলেন। আমরা তিন বন্ধু মিলে অনেক গল্প করলাম। খেলাম। আমার আসল লক্ষ্য ছিল শান্তি ও স্বস্তিকে দেখানো। ওদের সারপ্রাইজ দিলাম। আমি পাখিকে কথা বলা শিখিয়েছি। কিছু না বলেই ওদের বারান্দায় নিয়ে বললাম, এই হলো আমাদের শান্তি ও স্বস্তি। তোমরা ‘হানিফ’ বলো, শান্তি-স্বস্তিও ‘হানিফ’ বলবে। রাইয়ান ও ওয়াহি জানে আমার ডাক নাম হানিফ।
রাইয়ান বেশি বিস্মিত হলো। বললো, কোথায় পেলি ওদের?
বাবার কথা বললাম।
ওয়াহি জানতে চাইলো কোনটার নাম শান্তি আর কোনটার নাম স্বস্তি। ওদের কাছে দুটোকেই এক রকম মনে হচ্ছিলো। আমি বোঝালাম, যে পাখিটা একটু বড়ো আর গায়ের রঙ বেশি সবুজ সেটাই হলো শান্তি আর যেটা ঠোট একটু ছোট এবং একটু কম লাল সেটা স্বস্তি। নামও যে বাবার দেয়া সেটাও বললাম। গত পরীক্ষায় দ্বিতীয় হওয়ায় যে এই পুরস্কার পেলাম তাও জানালাম।
রাইয়ান তো নাম শুনে অবাক। হাসতে হাসতে বললো, ‘অদ্ভুত তো।’ ওয়াহি আবার খিল খিল করে হাসছে।
আমি একটু রেগে গেলাম। তোদের সুন্দর লাগেনি?
তারপর বাবার মতো গম্ভীর হয়ে বললাম, দোস্ত, এই সময় সমাজে তো শান্তি ও স্বস্তিই বেশি দরকার। দেখো না, পেপারে আর টিভিতে প্রতিদিন কী দেখায়। দেশের মানুষ ভালো নাই। শুধু মারামারি। দেখ পাখি দু’টা কিন্তু মারামারি করে না। ওই যে বাগানের গাছগুলোও মারামারি করে না। আমাদের উচিত ওদের মতো হওয়া। পৃথিবী কত সুন্দর হতো তাহলে। রাইয়ান ও ওয়াহি আমার কথা শুনলো তন্ময় হয়ে। চোখ বড় বড় করে। এ জন্যই ওদের দু’জনকে আমার ভালো লাগে।
আসলে এসব দার্শনিক কথা বাবার কাছ থেকে শোনা। বাবা মাঝে মাঝে এসব বলে ওঠেন। অনেকবার শুনেছি। এমন করে বোঝান যে, মনে ঢুকে যায়। আমিও এখন বন্ধুদের এসব শুনাই। বাবার কথাগুলো অন্যদের শোনাতে ভালো লাগে। আমি বাবার মতো করেই ওদের বলি। বাবার অনেক কিছু আমি জানি। মা বলেছে। বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করতেন। আমি শুনেছি। তবে বাবাকে মনে হতো সক্রেটিসের মতো।
রাইয়ান ও ওয়াহি দরজায় শান্তি ও স্বস্তির ফুডলিস্ট দেখে বিশেষ অবাক হলো।
ওয়াহি তো বলেই ফেললো, ‘পাখিকে এত যত্ন করিস? ফুড লিস্টও বানিয়েছিস?’
বললাম, খুব কষ্ট হয় আমার। নিয়ম করে খাওয়াতে হয়। না হলে ওরা দাপাদাপি শুরু করে দেয়। শুধু কিচকিচ করবে তখন। আমি এখন বেড়াতেও যাই না। তা হলে ঘরের অন্যরা যদি ভুলে যায় খাবার দিতে। মাকে বললে বলবে, তোমার বাবাকে বলো, বিড়াল, পাখি এসব কি যে শুরু হয়েছে। এসব সামলাতে পারবো না আমি।
রাইয়ান বললো, আঙ্কেল তোকে অনেক দায়িত্ববান বানিয়ে ফেলেছে।
‘হ্যাঁ, বাবা বলে, একদিন আমাকে নাকি পৃথিবীর দায়িত্ব নিতে হবে। তাছাড়া শান্তি ও স্বস্তি আমাদের পরিবারেরই দুজন এখন’, বললাম ওদের।
ওদের দেখাতে হলো কীভাবে কথা বলা শিখিয়েছি। আমি সুর করে ডাকতেই ওরা রোবটের মতো সুর করে ‘হানিফ’ বলে উঠলো। রাইয়ান আর ওয়াহি বিশ্বাসই করতে পারছিল না ব্যাপারটা। এতদিন পর ওদের ভারি সারপ্রাইজ দিলাম। ভালো লাগছিল।
রাইয়ান তো আজই ওর বাবাকে পাখি কিনে দিতে বলবে বলে জানালো। সাথে সাথে ওয়াহিও বললো,‘আমিও কিনবো।’ ওরা আঙ্কেলদেরও ডেকে আনলো বারান্দায়। খুব মজা হলো সেদিন।
কয়েকদিন পর রাইয়ান জানালো ওর বাবা দু’টি পাখি কিনেছেন। ওরাও একটা ফুড লিস্ট বানিয়েছে। ওরা পাখি দুটির নাম দিয়েছে আবির ও সিরাজ। ওয়াহি কিনলো কিছুদিন পর। ও নাম দিলো মিনু আর বিনা।
এরপর স্কুলে দেখা হলেই তিন বন্ধু টিয়া পাখি নিয়ে আলাপ জুড়ে দিতাম। যার যার অভিজ্ঞতা শুনতাম আমরা। আমি ওদের পরামর্শ দিতাম। কারণ আমার যে বেশি অভিজ্ঞতা। তবে তিনজনেরই আনন্দের আর সীমা নেই। পাখি পালতে পালতে আমরা যেন অন্যদের চেয়ে আলাদা হয়ে গেলাম। আমাদের আলাদা একটা জগত তৈরি হলো। আমাদের মনে হতো একদিন আনন্দের এই আলো সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেবো আমরা। আমি বিশেষ পুলকিত হতাম এই ভেবে যে, আমি এক্ষেত্রে ওদের নেতা।

পাঁচ.
জীবন স্রোতের মতো বয়ে যায়। সেই স্রোতে মিশে থাকে সুখ ও দুঃখ দু-ই। মাঝে মাঝে জীবনে কেবল সুখের প্রবাহ থাকে। এরকম সময়ে যদি দুঃখ আসে তখন জলোচ্ছ্বাসের মতো মনে হয় তাকে। যার আঘাতে সুখ যেন হারিয়ে যায় বহু দূরে।
আমার জীবনেও তেমনি জলোচ্ছ্বাস এলো হঠাৎ। ২০০৯-এর সেই সময়টায় দেশে চলছিলো তুমুল হরতাল-অবরোধ। প্রায় গৃহযুদ্ধ। স্কুলে যেতে পারতাম না। বন্ধুদের সঙ্গেও তাই দেখা হতো না। পেপারে দেখতাম শুধু মানুষ মারা যাচ্ছে। কত ভয়ানক সংবাদ যে থাকতো পেপারে। অনেক পোড়া, গুলি খাওয়া, রক্তাক্ত মানুষে ছবি দেখেছি তখন পেপারে। আমার চোখে অনেক সময় পানি চলে আসতো এরকম ছবি দেখে। শিশুদেরও দেখতাম এসব ছবিতে। শিশুদের কান্নার ছবি দেখেছি অনেকদিন।
আমার স্কুল ছিল ইকবাল রোডে। আমাদের বাসা থেকে তা কাছেই ছিল। কিন্তু ঝুঁকির পরিমাণ ছিল তখন অনেক বেশি। আমরা স্কুলে না গেলেও চলতো কিন্তু বাবা মাকে চাকুরিতে যেতেই হতো। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েই বাবা আর মা অফিসে যেতেন। প্রতিদিন রাতে দেখতাম তারা পরের দিনে আসা-যাওয়া নিয়ে টেনশন করতেন। ভয়াবহ অবস্থা তখন। খুব সতর্ক থাকতে হতো। অনেকে জখম হচ্ছিলেন।
বাবা শিক্ষকতা করতেন। পাশাপাশি তিনি বিকেল-সন্ধ্যায় কোথায় যেন কাজ করতেন। ফলে প্রতিদিনই বের হতেন।
এভাবে জুন এলো। জুন মাসের এগারো তারিখ। মঙ্গলবার। বাবা সেদিনও বের হলেন নয়টার দিকে। হরতাল ছিল সেদিন। আমি স্কুলে যাইনি। শান্তি-স্বস্তির যত্ন নিচ্ছিলাম। এই কয়েক বছরে ওরা বেশ বড় হয়েছে। খাবারও লাগে অনেক বেশি। পরিবারেও ওরা অতি আপন সদস্য। তবে এইসময় ওদের প্রতি অবহেলাও হতো খুব। বাসায় কারো মনে শান্তি ছিল না। টেনশন থাকতো। কেউ বের হলেই না ফেরা পর্যন্ত টেনশন চলতো। ১১ জুনও টেনশন করছিলাম, বাবা কখন ফিরবে ভালোভাবে।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাই মন চলে যাচ্ছিলো আকাশের সাদা সাদা মেঘগুলোর দিকে। মেঘগুলো কোথায় যায়? ওদের বাবা মায়ের কাছে? কিংবা বন্ধুদের কাছে? ওদের দেশে কি কোন দুশ্চিন্তা আছে? না বোধহয়। আকাশের জগত তো শান্তির জগত। মাঝে মাঝে এসব ভাবতে ভাবতেই বিছানায় এসেই ঘুমিয়ে পড়তাম।
অসময়ের এসব ঘুম থেকে মা অনেক সময় ডেকে তুলতেন। সেদিনও তাই হলো।
‘যাও গোসল করো। দুপুর হয়েছে।’ বললেন মা।
আমি বললাম, ‘মা, বাবা আজ কখন আসবে?’
মা বললেন, ‘চলে আসবে কিছুক্ষণ পরে। তুমি যাও।’
সময় যত যাচ্ছিলো, আমি ততই দুশ্চিন্তা করছিলাম সেদিন। সন্ধ্যা হলো একসময়। মা বললেন, ‘হানিফ, তোমার বাবা আসছেন না কেন আজ। ফোনও দেখছি বন্ধ। টেনশন করতে করতে জীবনটা কয়লা হলো।’
মা এভাবেই বলেন সবসময়। আর এসময় আমার রাগ হয়। মায়ের উচ্চ রক্তচাপ। ডাক্তার বলেছেন, অতিরিক্ত টেনশনই এই সমস্যার কারণ। মায়ের এ সমস্যাটি মায়ের প্রায়ই হতো। ডাক্তার টেনশন করতে নিষেধ করেছেন। আমি করেছি। বাবা করেছেন।
তাও মা টেনশন থামাবেন না। আমি গলা চড়িয়ে বললাম, ‘তুমি না খালি খালি টেনশন কর। আর প্রেসার বাড়াও।’
‘তোর বাবা অফিস থেকে এত দেরি করে আসবে, আর আমি টেনশন করবো না? হাসি হাসি করে বসে থাকবো?’
মনে হলো মা অনেক রেগে গেছেন। আমি আর তর্ক করলাম না। খাবার খেয়ে নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুম আসছিলো না। আসলে বাবার জন্য যে আমিও ভাবছিলাম। পড়ার সময়ই নানান আকাশ কুসুম ভাবছিলাম। বাবা তখনও বাসায় ফেরেনি। বেশ অস্বস্তি হচ্ছিলো আমারও। কিছুক্ষণের মধ্যে আমিও টেনশন করতে শুরু করলাম। আলতো একটু ঝিমুনিও চলে এলো।

শান্তি ও স্বস্তি

ছয়.
ঘুমে বেশ ডুবে গিয়েছিলাম বোধ হয়। ফোনটা বেজে উঠলো। মা এই ফোনটা কিনে দিয়েছেন। স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে দরকারি কথা বলার জন্য। স্কুলে ক্লাস শেষ হলেই ভ্যানে উঠতে হয়। বন্ধুদের সঙ্গে কোন কথাই বলা যায় না। আবার বাবা-মাও টেনশন করেন আমার সঙ্গে কথা না বলতে পারলে। এই ফোনেই অফিস থেকে মা-বাবা আমার সঙ্গে কথা বলেন। টেবিলেই থাকে ফোনটি।
কিন্তু এখন কে ফোন করছে– নিশ্চয়ই বাবা, কিন্তু অপরিচিত নাম্বার যে!...তাও হাত বাড়িয়ে দিলাম।
‘হ্যালো খোকা’
‘হ্যালো, বাবা?’
বাবার কথাগুলো স্বাভাবিক শোনাচ্ছিলো না। কেমন যেন কাঁদো কাঁদো গলা। কণ্ঠটা কেমন দুর্বল শোনালো। আমি ভয় পেয়ে যাই। বুকটা ধড়পড় করে উঠে। এতক্ষণ যে ভয় কাজ করছিলো সেটাই এবার শব্দ করে বেরিয়ে এলো:
‘কী হয়েছে, বাবা? তুমি আসছো না কেন?’
বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো শোনালো। ‘হানিফফফফ, আমি গুরুতর আহত হয়েছি।’ বাবার কণ্ঠে কান্না আর কষ্ট।
হঠাৎ যেন চোখ দুটো অশ্রুর পুকুর হয়ে যায়। কেউ যেন ছুরি বসালো কোথাও আমার শরীরে। ভয়ঙ্কর কোন আঘাত পেলাম যেন।
নিজেকে সামলে নিয়ে বলে উঠলাম, ‘কী বললে বাবা?...কীভাবে...?’
‘হানিফ, আমি ঢাকা মেডিক্যালে আছি, মাকে বলো। আমার অবস্থা খারাপ। আমাকে দেখতে আসো তোমরা...মনে হচ্ছে মরে যাবো।’
‘বাবা, কী বলছো...মরে যাওয়ার কথা বলছো কেন....এক্ষুণি আসছি আমরা।’
ফোনটা রেখে অজান্তেই একটা চিৎকার দিলাম...‘মাআআ’। বিষাদে ছেয়ে গেল মনটা। ছোটাছুটি করতে শুরু করলাম। মা ঘুম ভেঙ্গে দৌড়ে এলেন। চোখে মুখে বিরক্তি, উদ্বেগ। ভেবেছেন আমি বোধ হয় বিড়ালকে দেখে চিৎকার করেছি। কিন্তু আমাকে ঢুকরে কাঁদতে দেখে ভয়ে কেঁপে উঠে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কি হয়েছে, হানিফ?’
‘মা, বাবা আহত হয়েছেন খুব। বলছেন বাঁচবে না। মেডিক্যাল কলেজে আছেন। যেতে বলেছেন এখনি।’ এক নাগাড়ে অনেক কথা বলে আবার কাঁদতে শুরু করলাম।
‘কি ভাবে জানলি তুই, কি বলছিস এসব?’ মা আমার শরীরে ঝাঁকুনি দিলেন।
‘সত্যি মা। বাবা কোথা থেকে যেন ফোন করেছিলেন। তুমি ফোন করো।’ মায়ের চোখে মুখে অচেনা এক আতঙ্কের ছাপ। পাগলের মতো ফোন করতে লাগলেন। কিন্তু বাবার ফোন বন্ধ। বাসার সবাই জড়ো হয়ে গেল মায়ের চারপাশে। দাদা দাদি, কাজের মেয়ে স্বপ্না– সকলের ঘুম ভেঙ্গে গেছে ততক্ষণে। সবাই যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
সবচেয়ে বেশি কাঁদতে শুরু করলেন দাদি। ওনাকে কাঁদতে দেখলে আমার খুব কষ্ট লাগে। আমিও জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করলাম। মা দৌড়ে ব্যাগ নিয়ে রেডি হয়ে গেলেন। সবাই আমরা হাসপাতালে যাবো। আমি বারান্দায় শান্তি ও স্বস্তি’র কাছে গেলাম। ইচ্ছা করছিল ওদের বাবার খরবটা দিই। ওরা কি কিছু বুঝলো? কেমন যেন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আমি আরও কেঁদে ফেললাম। ওদের এত শান্ত দেখে আমি বুঝে ফেললাম সত্যি বাবার খারাপ কিছু হয়েছে।
নীলক্ষেত্রের কাছে দিয়ে শহীদ মিনারের পাশেই মেডিক্যাল কলেজ। অনেক আগে বাবা শহীদ মিনার দেখাতে এনেছিলেন। তখন মেডিক্যাল কলেজ দেখিয়ে বলেছিলেন কখনও কেউ আহত হলে এখানে আসতে হয়। আজ আমরা এলাম সেই একই কারণে। হরতাল থাকায় অনেকক্ষণ কোন গাড়ি পাওয়া যাচ্ছিলো না। অনেক কষ্টে দুটো স্কুটার রাজি হলো। মা আর আমি একটা সিএনজিতে; দাদা-দাদি আরেকটা সিএনজিতে। দুটি গাড়ি পাশাপাশি চলছে। দাদি যদি অজ্ঞান হয়ে যান– এই ভয়ে তাঁকেও নিয়ে আসা হয়েছে।
জরুরি বিভাগে ঢুকেই মা কোথায় কোথায় যেন খোঁজ করতে শুরু করলেন। দাদাও অনেক তথ্যকেন্দ্র খুজতে গেলেন। আমি দাদিকে ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। এখানে কেমন যেন অন্যরকম গন্ধ। মানুষ আর মানুষ। সবাই ব্যস্ত।
একজন চশমা পরা লোক বসে আছে একটা রুমে গ্রিলের জানালার ভেতর। মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে। মা আকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আচ্ছা, আজ আহমেদ ইসলাম নামে কোন লোক কি ভর্তি হয়েছে এখানে, আপনি কি একটু সাহায্য করতে পারবেন ভাই?’
বেটে খাটো লোকটা, পান চিবাতে চিবাতে একটা বড় খাতা খুললেন, ‘...একসিডেন্টের কেইস?...তিন তলায় যান অর্থপেডিক বিভাগে, আপনারা কী ওনার ফ্যামিলি?’
‘কত নাম্বার বেডে?’ মা জানতে চাইলেন।
‘ওয়ার্ডে যেয়ে দেখেন।’ বলে লোকটা অন্য কাজে মন দিলেন।
মা আর দাদা প্রায় দৌড়ে লিফটের দিকে যাচ্ছেন। আমি আর দাদিও জোরে জোরে হাটতে শুরু করলাম। বিশাল বিল্ডিং। ফ্লোরেও অনেক মানুষ শুয়ে আছে। ট্রলিতে শুয়ে আছে অনেক। তাদের টেনে টেনে নেয়া হচ্ছে কোথাও যেন। বাতাসে কেমন যেন গন্ধ। সাদা সাদা ড্রেস পরে ঘুরছে অনেকে।
দাদা ডাকলেন, ‘হানিফ তাড়াতাড়ি আসো।’
আমি দাদিকে প্রায় টানতে টানতে এগোতে শুরু করলাম।
আগে লিফটে উঠলে কেমন যেন মজা লাগতো। মনের মধ্যে কিসের যেন স্পন্দন হতো। আজ কোন কিছু নেই। কেবল আতঙ্ক আর উদ্বেগ। দাদা-দাদি-মা কেউ কথা বলছেন না। আমিও চুপ করে থাকলাম।
লিফট খুলতেই মা প্রায় দৌড়ে করিডর পার হলেন। আমি আর দাদি আস্তে আস্তে আগাচ্ছি।
একসময় দূর থেকে দেখছি মা পেয়ে গেছেন বাবার খোঁজ। দরজার বাইরে একটা স্যাঁত স্যাঁতে বিছানায় বাবা শুয়ে আছে। শরীরের অনেক জায়গায় ব্যান্ডেজ। শার্টটা দেখলাম কেমন ময়লা। রক্তের দাগ এখানে সেখানে। আমি পা দু’টো ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। বুঝতে পারছি না কী করবো। বাবার শরীরটা নড়ছে না। খুব ঠান্ডা মনে হলো।
দাদা কী সব ডাক্তারি কাগজপত্র পড়ছেন। দাদিরে সামলানো যাচ্ছে না। মা সাদা এপ্রন পরা একজন মহিলার সঙ্গে কথা বলছেন। আমি অবাক হয়ে দাদাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘দাদা, উনি কী ডাক্তার?’
‘না, উনি নার্স’, বললেন দাদা। ওনার মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাসে লাগছে। মনে হলো আমাদের পরিবারের সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল আজ থেকে।
ইতিমধ্যে একটু একটু করে অনেক খবর জমা হলো। অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে বাবার এই অবস্থা হয়েছে। বাসে বাবার একজন বন্ধুও ছিল– সাফায়েত জাব্বার। তিনি বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন। হরতাল ছিল বলে বাসে কারা যেন ইট ছুঁড়ে মেরেছে। ইট এসে লেগেছে বাবার মাথায়। সাথে সাথে মাথা ফেটে যায়। সবাই হুড়াহুড়ি করে নেমেছে বাস থেকে। বাবা অনেকক্ষণ বাসেই পড়েছিলেন। পরে সাফায়াত সাহেব বাবাকে খোঁজ করতে করতে বাসের ভেতর পান এবং টেনে কোলে তুলে রিক্সায় ওঠান।
দাদা খোঁজা খুঁজি করলেন, কিন্তু সাফায়াত আঙ্কেলকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। হয়তো চলে গেছেন। দাদা আবার জরুরি বিভাগে গেলেন কোন ফোন নাম্বার পাওয়া যায় কি না সেই আশায়। বাবার ফোনটাও কোথাও পাওয়া গেল না। আমি বাবার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। স্যালাইনের একটা সুঁই বাবার হাতে ঢোকানো হয়েছে। মাথার চুল কেটে ফেলা হয়েছে অর্ধেক। ব্যান্ডেজ বাঁধা সেখানে।
একজন লোক আসলেন এপ্রন পরা। মা আর দাদা ঘিরে ধরলেন তাঁকে।
‘আপনারা কী ওনার আত্মীয়?’ জিজ্ঞাসা করলেন।
‘হ্যাঁ, ডক্টর’, মা জবাব দিলেন। আমি বুঝলাম উনিই বাবার চিকিৎসা করবেন। তাঁর কথা শোনার জন্য কান খাড়া করে রাখলাম।
ওনার কাছে বাবার অবস্থা শোনা গেল। বাবাকে এখনি আরও উন্নত চিকিৎসা দেয়া দরকার। সাফায়াত আঙ্কেল কোথায় কোথায় যোগাযোগ করেছেন। বাবাকে অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হবে। রক্ত লাগবে। আমাদের সরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে বললেন ডক্টর। দু’জন নার্স বাবার শরীর নাড়া-চাড়া করতে শুরু করলো।
দাদি আর আমি পাশের একটা বেঞ্চিতে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

সাত.
হাসপাতালে যখন দ্বিতীয় দিন এলাম তখন বাবা সুন্দর একটা রুমে। এবার জুতা খুলে ডুকতে হলো। অনেক রোগী এই রুমে। সবাই শুয়ে আছে। রুম জুড়ে কত যে যন্ত্রপাতি। প্রথমে আমি আর দাদা বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। এখনও ঘুম ভাঙ্গেনি তাঁর। ব্যান্ডেজের আয়তন এবার আরও বেড়েছে। চুল সব ফেলে দেয়া হয়েছে।
বাবার মাথায় আঘাত করা পাথরের টুকরাটার কথা ভাবতে লাগলাম চুপচাপ। যেন আমাকেই কেউ সেটা ছুঁড়ে মেরেছে।  মনটা বিষাদসিন্ধু হয়ে গেল। কত যে তোলপাড় হচ্ছে সেখানে। বাবার এই মুখ তো কোনদিন দেখেনি। দেখার কথা ভাবিওনি। গোঁফ  দাঁড়িওয়ালা বাবার সেই নির্মল মুখ কী আর দেখবো কোনদিন! কেমন যেন দুঃস্বপ্নের ঘোরে আছি। দাদা, মা কারও মুখের দিকে আর তাকানো যায় না।
আমি আর দাদা বের হওয়ার পর মা ঢুকলেন রুমটিতে। তাঁর চোখে মুখে বিষাদের ছাপ। নার্স এসে বললেন, ডাক্তার সাহেব দাদা আর মা’র সঙ্গে কথা বলতে চান। আমিও ওনাদের সঙ্গে ঢুকে পড়লাম। ডাক্তার কী বলেন শোনার খুব ইচ্ছা আমার। ডাক্তারের ডাকের কথা শুনে মা যেন আরও মন খারাপ করলেন।
নার্সের কথা মতো চার তলার আট নম্বর রুমে ঢুকলাম মা ও আমরা। দরজাটা বন্ধই ছিল। নার্স প্রথমে ঢুকলেন, তারপর আমাদের ঢাকলেন। এই ডক্টরকে আগে দেখিনি। চুলগুলো সাদা, বাবার মতো মুখে দাঁড়ি গোঁফ। অনেক বয়স্ক। বিশাল এক টেবিলের অপরদিকে বসে আছেন। সালাম দিয়ে মা আর দাদা বসলেন। আমিও পাশে বসতে নিয়েছিলাম। দূরের চেয়ার দেখিয়ে, মা বললেন হানিফ তুমি ওইখানে বসো।
মা কেন আমাকে পাশে বসতে দিলেন না বুঝতে পারলাম না। বাবার কথা আমি জানবো না?
আপনারা আহমেদ সাহেবের কে কী হন? জানতে চাইলেন ডক্টর।
মা আর দাদা ওনাদের পরিচয় দিলেন। আমার কথা বললেন। ডাক্তার সাহেব ভাবলেশহীন চোখে একবার আমার দিকে তাকলেনও। তারপর কথা বলতে শুরু করলেন। আমি দূর থেকেও কিছুটা শুনতে পেলাম। দাদা আর মায়ের মুখে রাজ্যের কৌতূহল। ভয়ে মুখ শুকিয়ে আছে তাদের। ডাক্তারের দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন।
“আমি ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকী। জানি আপনাদের মন খারাপ। কিন্তু কী করবেন। দেশটাতে তো অরাজকতা চলছে। রাজনৈতিক কারণে সকলে আমরা কোন না কোনভাবে সাফার করছি।” তারপর থামলেন উনি খানিকটা।
‘ডাক্তার সাহেব আমার স্বামীর কী অবস্থা?’, মা বিস্তারিত জানতে উদগ্রীব।
“দেখুন, আমি এখনি পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারছি না। স্ক্যান রিপোর্টটা আসুক। ইট তো সরাসরি কোন মাথায় এসে লেগেছে। আর এ জায়গাটা শরীরের সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করে।’ বলেই ডাক্তার হাত দিয়ে মাথার পেছনটা দেখালেন।
বুঝলাম বাবা এ জায়গাটাতে আঘাত পেয়েছেন।
ডাক্তার বলেই যাচ্ছেন।
‘ইসলাম সাহেবের আঘাত বেশ গভীর। এখন শরীরে এর প্রতিক্রিয়া কী হয় তা এখনি বোঝা যাবে না। স্মৃতিশক্তিতে কোন সমস্যা হয় কিনা তাও বুঝতে সময় লাগবে। মনে হয় কিছু হবে। আপনারা মানসিক প্রস্তুতি রাখুন। ওনার জ্ঞান ফিরে এলে কোন কিছু চিনতে সমস্যা হলে জোরাজুরি করবেন না আপনারা। অনেক সময় উনি হয়তো সামান্য আগের ঘটনাটিও ভুলে যেতে পারেন।...’
ডাক্তার সাহেবের কথা শুনতে শুনতেই মা ঢুকরে কেঁদে উঠলেন: ‘ডক্টর, এসব কোনভাবেই কি চিকিৎসাযোগ্য নয়? আমাদের চিনতে পারবে না ও?’
ডাক্তার বললেন, ‘আপনি শান্ত থাকুন। এত অস্থির হবেন না। এরকম তো সবসময় হবে না। মাঝে মাঝে এসব সিমটম দেখা যেতে পারে। এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। ইমপ্রুভও করতে পারেন। ওনার কিছু সার্জারির দরকার। আপনারা একজন এই কাগজগুলোতে স্বাক্ষর করে দিন।’
‘বাবা, আপনি করেন’ বলে মা কাগজগুলো দাদার দিকে ঠেলে দিলেন।
আমার কেমন যেন বিমর্ষ লাগছিল। বাবা যে কবে সুস্থ্য হবে!
ডাক্তার উঠে দাঁড়ালেন। আমরাও তখন উঠে দাঁড়ালাম।
‘ঘাবড়ানোর কিছু নেই, সব ইমপ্রুভ করবে আর সবকিছু সহজভাবে নিতে হবে।’ এই বলে আমাদের বিদায় দিলেন ডাক্তার। আমরা তিনজন কেউ কারো সঙ্গে কথা বলছি না। অন্ধকারে ডেকে গেল যেন সবার মন। নিয়তি কেন আমাদের এমন কষ্ট দিচ্ছে বুঝতে পারছি না। আমি আর মা বাসায় এলাম। দাদা হাসপাতালেই থেকে গেলেন। রাতে ফিরবেন।

আট.
আমার হাসপাতালে যাওয়া অনেক কমে গেল। মা আর দাদাই আসা যাওয়া করেন এখন। দাদি শুয়ে শুয়ে কেবল কাঁদেন। বাসায় প্রায়ই একা একা লাগে। অনেকদিন শান্তি আর স্বস্তির ভালো করে যত্ন নেওয়া হয় না। বাবা নাই বলে ওদের এখন আর কলা এনে দেয়া হয় না। কেবল ভাত খাচ্ছে ওরা। ওরাও সারাদিন ঝিম মেরে বসে থাকে। আগের মতো আর কিচকিচ করে না। ঝাপটা ঝাপটিও করে না। আমিও আর ওদের বলি না...‘হানিফ’ বলে ডাকো তো!’
প্রায় তিন সপ্তাহ পর বাবা সুস্থ্য হয়ে বাসায় এলেন। সবাই ব্যস্ত। তবে সবাই আমরা খেয়াল করলাম বাবা আর আগের মতো নেই। অনেক পাল্টে গেছেন তিনি। আমরা সবাই শুধু তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকি। কী চেহারাটা কী হয়ে গেল। ডাক্তার যা বলেছিলেন তাই হলো পুরোপুরি। বাবার স্মৃতিশক্তি আর আগের মতো কাজ করছে না। ওনার যে কী হয়েছিল সেটাও বলতে পারছেন না। মনে নাই।
হাসপাতাল ছাড়ার দিন ডাক্তার এও বলে দিলেন মাকে, দুর্ঘটনার ব্যাপার নিয়ে বাবার সঙ্গে যেন উচ্চবাচ্য করা না হয়। আমাকেও এ ব্যাপারে মা নিষেধ করে দিলেন।
আমার আর কোন নিষেধেরই দরকার ছিল না। আমি বাবার কাছাকাছিই আর যাচ্ছিলাম না। কাছাকাছি গেলেই মন খারাপ হতে লাগলো। বাবা পাঁচ মিনিট আগে কি করেছেন সে কথাও মনে করতে পারছিলেন না। তাঁকে সেটা মনে করিয়ে দিতে হতো। এই যেমন, রাতের খাবার খাওয়া শেষ করলেন তিনি। কিছুক্ষণ পরেই মাকে আবার বলবেন, ‘রাশেদা, আমাকে ভাত দাও; একটা ডিম ভেজে দিও।’
ডিম ভাজি বাবার ফেভারিট। আমি দাদার কাছে শুনেছি, ছোটবেলা থেকে নাকি এটা বাবার প্রিয় খাবার।
কিন্তু এখন তো আর ডিম ভাজি দেয়া যাবে না। বরং আমি আর মা বাবাকে অনেকক্ষন বুঝিয়ে বলি যে, কিছুক্ষণ আগেই তিনি রাতের খাবার খেয়ে ফেলেছেন। শোনার পর বাবা অনেক পরে মাথা নাড়লেন, হ্যাঁ তাঁর মনে পড়েছে তিনি ডিনার করে ফেলেছেন।
এ ধরনের স্লো স্মৃতিশক্তি নিয়ে কাজে কর্মেও বাবার সমস্যা হতো। দিন রাত বাবাকে নিয়ে এসব জটিলতায় সবাই ক্লান্ত হয়ে যেতে লাগলাম আমরা। শান্তি ও স্বস্তি দুটোই ধীরে ধীরে হারাতে লাগলো পরিবার থেকে।

নয়.
এই ফাঁকে আবার আসল শান্তি ও স্বস্তির খবর দেয়া যাক। ইতোমধ্যে ওদের যত্ন-আত্তি অনেক কমে গিয়েছিল। আমার মনোযোগ পুরোটাই রাখতে হতো বাবার দিকে। বাবার আচরণে অস্বাভাবিক ব্যাপার দেখে যেত অনেক। তাই যতক্ষণ জেগে থাকতেন– আমরা খুব নজর রাখতাম ওনার দিকে। বাবা ঘুমালে আমি শান্তি ও স্বস্তির কাছে যেতাম। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার ওদের খাবার-দাবার অনেক কমে গিয়েছিল। সেই সকালের সরিষা ও কলা দেখতাম বিকালেও পড়ে আছে। খাচার এক পাশে যেয়ে চুপচাপ বসে থাকতো ওরা। আগের মতো আমাকে দেখে ধাপাধাপি দেখতাম না। খায় কম। নড়েও না-চড়েও না। কিছুই করে না।
ইতিমধ্যে শীত শেষ হয়েছে। বসন্ত আসবে। কিন্তু আমাদের পরিবারে সবারই দুশ্চিন্তা। বাবার পাশাপাশি আমার শান্তি ও স্বস্তির জন্যও দুশ্চিন্তা হতে শুরু করলো। ওরা না খেলে তো বাঁচবে না। বিশেষ করে ভয় হতো শান্তির জন্য। ও একদম খেতো না।
একটু একটু সুস্থ্য হয়ে বাবাও বারান্দায় এসে দেখতেন ওরা খাচ্ছে না। তিনি পাখিদের বিষয়ে বেশি জানেন। কয়েকদিন এভাবে দেখে তার মুখটা গম্ভীর হয়ে থাকতে দেখতাম। আমি জানতাম শান্তির এ অবস্থা নিয়ে বাবার মনে কোন ভয় লেগেছে।
অক্টোবর এলো। আগের মতো আর হরতাল হচ্ছে না এখন। আমার স্কুল আবার শুরু হয়ে গেল। সেই ভোরে উঠে স্কুলে যাওয়া, দুপুরে ফেরা, বিকালে পড়তে বসা। ব্যস্ত হয়ে গেলাম আমি। স্কুলে যাওয়ার আগে স্বপ্নাকে বলে যেতাম শান্তি ও স্বস্তিকে গোসল করাতে, খাবার দিতে। মাকেও বলতাম। কিন্তু স্কুলে যেয়ে দুশ্চিন্তা হতো, শান্তি ও স্বস্তিকে খাবার দেয়া হয়েছে কি না কে জানে?
অক্টোবরের শেষ সপ্তাহের একটা দিন। সেদিন তিনটা ক্লাস টেস্ট ছিল। সবই ভালোভাবে হলো। বাসায় ফিরলাম। বাবা কোথায় যেন কোথায় গিয়েছেন। সবার দেখি মন খারাপ। মা বিষন্ন মুখে বলে আছেন। মাকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কি হয়েছে মা? তিনি কিছু বলছেন না। রান্নাঘরের সামনে স্বপ্না দাঁড়িয়ে আছে ভাবলেশহীন। তাকে জিজ্ঞাসা করেও কিছু জানতে পারলাম না। কেবল ইশরায় বারান্দার দিকে দেখালো। বুকটা ধক করে উঠলো। শান্তি-স্বস্তির কিছু হলো নাকি! দৌড়ে বারান্দায় গেলাম। মনটা শূন্য হয়ে গেল। আমার সব আনন্দ যেন কেউ নিয়ে গেল। এরকম খারাপ কোন দৃশ্যের কথা কোন দিন ভাবিনি।
চোখটা পানিতে ভরে গেল। মনে হলো আমার চারপাশে আর কিছু নেই। খাচার ভেতর শুয়ে আছে শান্তি। চোখ দুটো বন্ধ। বুঝতে আমার সময় লাগলো না, ও মারা গেছে। চিরকালের জন্য হারিয়ে গেল পাখিটা আমার। কখনো আর ও ডানা ঝাপটাবে না। কিচকিচ করবে না। হানিফ বলে ডাকবে না। শান্তির গায়ে রক্তের দাগও ছিল। কিসের যেন খামছির দাগ। মা আর স্বপ্না কখন যেন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ওনারা বললেন সকালে বারান্দার দরজা খুলেই ওকে এভাবে পাওয়া গেছে। মনে হয় বিড়াল রাতে আঁচড় দিয়েছে। দুর্বল ছিল বলে বিড়ালের থাবা থেকে সরে পড়তে পারেনি।
মনে পড়লো সেদিনটির কথা। যেদিন আমরা ওদের ফুড লিস্ট করছিলাম সেদিনই বিড়ালটা কেমন রেগেমেগে তাকাচ্ছিলো শান্তি-স্বস্তির দিকে। তার মানে শেষ পর্যন্ত ও প্রতিশোধ নিয়েছে?
খাঁচার এক পাশে একেবারে শিকের পাশে লেগে বসে আছে স্বস্তি। স্বপ্না বললো সকাল থেকে কিছুই খাচ্ছে না। তাকাতেই মনে হলো ও যেন কাঁদছে। বন্ধুহীন একা হয়ে গেল স্বস্তি। সোজা যেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। আমার আজ কিছু ভালো লাগছে না। ভাতও খেলাম না।
মা ডাকলেন। ধমকালেন। কাকুতি মিনতি করলেন। কিন্তু তাও উঠলাম না। পাখিটিকে হারিয়ে ভালো লাগছে না। প্রবল দুঃখ আর আতঙ্ক লাগছিল। আমাদের পরিবারে এমন হচ্ছে কেন। বাবার এ অবস্থা। শান্তি মরে গেল। নিয়তি কেন আমাদের সবকিছু এভাবে দুঃখে ভরে দিচ্ছে। কী অন্যায় করছি আমরা। চোখে অশ্রুধারা বইতে থাকলো। শুধু কান্না আসছিল।
কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি বুঝতে পারিনি। বিকেলে উঠে দেখি বাবা আর স্বপ্না বাসার পাশের বাগানটির কোনায় ছোট একটা গর্ত খুড়েছে। বাবার মুখটা শুকিয়ে আছে। ছোট একটা কবর বানানো হচ্ছে মাটি খুড়ে। আমি ওঠার পর সেখানে শান্তিকে রাখা হলো। বাবা ওর গায়ের উপর মাটি ভরে দিলেন। অনন্ত বিশ্রামের জগতে চলে গেল শান্তি। আমাদের সঙ্গে ওর আর দেখা হবে না কোনদিন। স্বস্তিও ওকে আর পাবে না সঙ্গে। একা একা আমাদের ছেড়ে কীভাবে থাকবে শান্তি– বুঝতে পারছি না। স্বস্তিকে ছাড়া ওর কষ্ট হবে অনেক। আমাকেও নিশ্চয়ই অনেক মিস করবে শান্তি। কত যে বেশি বেশি খাওয়াতাম ওকে। আবার চোখ বেড়ে পানি নামতে লাগলো।

দশ.
সময় যত গড়িয়েছে আমি বুঝেছি, শান্তিকে ছাড়া স্বস্তির ভালো লাগছিল না একট্ওু। থাকতে ইচ্ছা করছিল না। এখন আবার ও খাঁচায় ছোটাছুটি করে। তবে এটা যে আগের মতো আনন্দে নয় বুঝতে পারি। ও, এখন মুক্তি চাইছে। ওকে সেখানে রাখা হয় সেখান থেকে বাগানে শান্তির কবর দেখা যায়। খাঁচার কোনায় বসে প্রায়ই এক মনে ওদিকে তাকিয়ে থাকে স্বস্তি। খাওয়া দাওয়া প্রায় বন্ধই করে দিয়েছে। কতকিছু দিচ্ছি কিন্তু কিছুই খেতে চায় না। আবার ভয় পাই আমি। বাঁচবে তো স্বস্তি। ও-ও যদি মরে যায়? বিড়ালটা আর আসছে না এদিকে। কিন্তু এখন স্বস্তির যে কষ্ট হচ্ছে এতেই তো ও মরে যাবে ও! আমার কথা ও আর ভাবছে না। শান্তিকে হারিয়ে আমার শোক, বাবার ব্যথা বোধহয় স্বস্তির মনে আসে না। আমাদের কথা ছাপিয়ে শান্তির কথাই ওর মনে পড়ছে। ও বোধহয় শান্তিকে খুব বেশি মিস করে। মনে হয় ভাবছে শান্তির সঙ্গে গেলেই ভালো হতো। কী ভেবে যেন স্বস্তির যত্ন বেড়ে গিয়েছিল পরিবারে। কিন্তু ও আর গ্রাহ্যই করছে না।
বছর শেষে আমার পরীক্ষার মাস চলে এল। পড়ালেখার চাপটা ছিল বেশি মাত্রায়। বৃহস্পতিবার  আড়াই ঘণ্টার ইংরেজি পরীক্ষা দিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। শনিবারে আবার গণিত পরীক্ষা। সব চ্যাপ্টার রিভিশন দিতে হবে। বাবা আবার ম্যাথস্ এর রেজাল্টাই খেয়াল করবেন বেশি। তবুও স্বস্তির কাছে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। তারপর পড়তে বসলাম। কিন্তু দিনগুলো খুব ক্লান্তিকর লাগছিল। রাত দশটাতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। অথচ এগারোটার আগে তো কোনদিন ঘুমাই না।
সকালে ঘুম থেকে উঠতেও দেরি হয়ে গেল। বাবা বিছানায় নেই। বারান্দায় যেয়ে রীতিমতো শিউরে উঠি। এ কোন আতঙ্কের প্রহর। পাখির খাঁচাটা খালি। বাবা উঠানে শান্তির কবরের কাছে একটু একটু করে মাটি খুঁড়ছেন। একটা বড় সাদা কাগজের উপর স্বস্তি শুয়ে আছে। শেষদিন শান্তি যেভাবে শুয়ে ছিল। পাখাগুলো আর টানটান নেই। পা দুটো সোজা হয়ে আছে।
স্বস্তিকে দাফন করা হলো শান্তির পাশেই। আমার খুব বেশি খারাপ লাগছিল না। ওরা একসঙ্গে থাকতে পারবে এখন থেকে। অনন্তকাল তারা এভাবেই থাকবে। কেউ পারবে না তাদের এই একান্ত ঘুম ভাঙ্গাতে।
বাসায় এসে বাবা ঢুকরে কেঁদে উঠলেন। আশ্চর্য হলাম। এরকম তো কোনদিন দেখেনি।
একা একা নিজেই বলে উঠলেন, ‘না, এবার বিড়ালটা মারেনি। একা থাকতে থাকতেই স্বস্তি মরে গেল। কত যে যত্ন করলাম ওদের এত বছর।...’
বাবার কথা আটকে গেল। কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে গেলেন। চোখ-মুখ ফুলে আছে তার। তাকানো যাচ্ছে না।
আমি বারান্দায় খালি খাঁচাটার কাছে যেয়ে বসে থাকলাম। কেউ নেই সেখানে। কেউ নেই আজ কোথাও। বেডরুমে যেয়ে এবার আমিই একা একা কেঁদে ফেললাম। জানতাম, আর কোনদিন শান্তি আর স্বস্তির সঙ্গে দেখা হবে না। ওদের হারিয়ে আমার ভেতরের শান্তি ও স্বস্তির জগতটা একেবারে হারিয়ে গেল যেন। কিন্তু ওরা তো নিশ্চুপ আরামের অন্তত এক শান্তির জগতে থাকতে পারবে। এর তো তুলনা নেই। ভালো থাকুক ওরা। প্রিয় শান্তি ও স্বস্তির জন্য আমি না হয় কষ্ট নিয়েই থাকবো।

এগার.
বহুদিন পার হলো। ডায়েরিতে সবসময় আর লেখা হয় না প্রিয় কথাগুলো। বড় হয়ে গেছি। কত ব্যস্ততা। কিছুদিন আগে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করে চাকুরি পেলাম। বাবা-মা অনেক বুড়ো হয়ে গেছেন। স্বপ্না আর আমাদের বাড়িতে কাজ করে না এখন। প্রায় সাত বছর হলো সে চলে গেছে। এখন যে কাজ করে তার নাম রেহানা।
সেই পুরানো বাড়িতে বাবা-মাকে নিয়েই আছি আজও। ওনারা চাকুরি থেকে অবসর নিয়েছেন। পরিবারে আমিই এখন বাইরে কাজ করি। আর্থিক দিক আমিই সামলাই। সবমিলে ভালো আছি আমরা। তবে আজও শান্তি আর স্বস্তির কথা মনে পড়ে। ওদের ভুলে যাইনি। আমি তো জানি ওরা মরে যায়নি। আমি কখনো ওদের কবরের দিক তাকাই না। তাকাতেও চাই না। আমার মনের জগতে ওরা আছে। ওদের ওড়াওড়ি দেখি আজও। ওরা আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে না। আমিও আছি ওদের পাশে। ওরা মুক্ত হলেও আমাকে ছেড়ে যায় না কোথাও। এটা যে কত ভালো লাগে। যখন একা থাকি, অবসর সময়, নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। চোখে অনেকসময় পানি চলে আসে। চোখের পানিতে দূরের আকাশকে অস্পষ্ট লাগে। সাদা সাদা মেঘগুলোকে পাখির ভাস্কর্য মনে হয়। মনে হয় মেঘগুলো পাখি হয়ে গেছে। মনে হয় ওই সাদা পাখি দুটোই শান্তি ও স্বস্তি। ওরা যেন কথা বলে।
‘কাঁদছো কেন, হানিফ?’
আমি বলে উঠি, ‘একা লাগছে যে।’
‘কী বলছো তুমি এসব। আমরা তো তোমার কাছেই আছি। সাথে আছি। চিরকাল থাকবো। চল, বাগানে খেলি।’
এই বলে ওরা উড়তে শুরু করে। আর কী আশ্চর্য, দেখি আমিও খেলছি ওদের সঙ্গে। আমরা তিনজন..আমি...স্বস্তি...শান্তি। সেই ছোটবেলায় ফিরে গেছি যেন আবার। আমরা মজা করতে থাকি সেই জগতে। যে জগতে দুঃখ বলে কিছু নেই। চিরকাল সেই জগতে মজা করতে থাকবো আমরা। আমরা তিনজন।
-----------------------------------
আল-রাব্বী : লন্ডন গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ঢাকা-এর অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী। গল্পটি ২০১৪ সালের জুন মাসে লিখিত।

সম্পর্কিত

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ২০:২০

এবছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন ৭৩ বছর বয়সী তানজানিয়ার ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ। তিনি ১০টি উপন্যাস লিখেছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য : প্যারাডাইস (১৯৯৪), বাই দ্য সি (২০০১) এবং ডেজারশন (২০০৫)। ইতোপূর্বে তার উপন্যাস ‘প্যারাডাইস’ বুকার প্রাইজের শর্টলিস্টে এবং ‘বাই দ্য সি’ লংলিস্টে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গুরনাহর লেখায় ঔপনিবেশিকতার দুঃখ-দুর্দশা এবং শরণার্থীর কষ্টকর জীবনধারার গল্প উঠে এসেছে। ২০১৬ সালের ২১ জানুয়ারি, ফ্রাঙ্কফুটে তার এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন ফেবিয়ান রোথ, মারা হোলজেনথল, লিসা জিংগেল। 


প্রশ্ন : বিশ্বসাহিত্য, উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য এবং গ্লোবাল সাউথের মতো সাহিত্যের লেবেল সম্পর্কে আপনি কী ভাবছেন? আপনি কি মনে করেন এগুলো সাহিত্য বা একইসঙ্গে আপনার লেখা বিচারে উপযোগী কিছু? আপনি কি লেখক হিসেবে নিজেকে বিবেচনা করার সময় এই মানদণ্ডে বিচার করেন কিনা?
আবদুলরাজাক গুরনাহ : লেবেল অবশ্যই দরকারি, প্রথমত, তা প্রাতিষ্ঠানিক কারণেই। কেউ তাদের বিদ্যায়তনে তুলনা করতে, বাণিজ্যিক কারণে বা প্রকাশনার স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। আপনি মানুষকে বোঝাতে পারেন এটি এমন একটি বিশেষ কিছু, যাতে তারা আগ্রহী হয়ে উঠবে। যাই হোক, আমি নিশ্চিত নই তাদের সাংগঠনিক উদ্দেশ্য ছাড়াও এগুলোর দরকার কতটুকু। নিজেকে বর্ণনা করার জন্য আমি এই মানদণ্ড ব্যবহার করবো না, এগুলো সংস্কৃতি উৎপাদনের প্রক্রিয়া নয়। এইসব লেবেল সাহিত্যকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে, উত্তর-ঔপনিবেশিক রীতি-নির্ভর সমালোচনা করে এবং কিছু বলতে ও কিছু শনাক্ত করতে সহায়তা করে। অন্যদিকে এইসব লেবেল সাহিত্যের ব্যাখ্যাকে একপ্রকার সীমাবদ্ধই করে। কারণ সাহিত্যে বর্ণনার চেয়েও বেশি কিছু রয়েছে।

প্রশ্ন : তাহলে আপনি কি নিজেকে উত্তর-ঔপনিবেশিক বা বিশ্বসাহিত্যের লেখক মনে করেন? 
আবদুলরাজাক : আমি এইসব প্রপঞ্চের কোনোটিই ব্যবহার করব না। আমি নিজেকে কোনো ধরনের লেখক বলিও না। আসলেই আমি নিশ্চিত নই যে, আমি আমার নাম ছাড়া অন্য আর কী বলার আছে। আমি অনুমান করি, যদি কেউ আমাকে চ্যালেঞ্জ করে—‘আপনি কি একজন ...এর মধ্যে একটি ...?’ আমি সম্ভবত ‘না’ বলব। আমি চাই না আমার সঙ্গে কিছু জুড়ে থাকুক। অন্যদিকে এটি নির্ভর করে কিভাবে এই প্রশ্ন উত্থাপন করা হবে—উদাহরণ স্বরূপ যদি একজন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেন ‘আপনি কি একজন বিশ্বসাহিত্যের লেখক’, তখন তিনি প্রশ্নের উত্তরে তিনি কী লিখবেন? কিন্তু আমি তা নই। আমি এরমধ্যেরও জটিল একটা কিছু।

প্রশ্ন : এই বর্ণনা কি অপরিহার্য?
আবদুলরাজাক : এটি এমন কোনো অপরিহার্য পদ্ধতি নয়, যা আমি নিজে মনে করি, কিন্তু সাংবাদিকের জন্য এই জিজ্ঞাসা অপরিহার্য হতে পারে। তিনি আমাকে তার বোর্ডে তর্জনী তুলে বলতে পারেন, উনি একজন বিশ্বসাহিত্যের লেখক। আমি ধারণাকে এভাবেই দেখি। এই ধরনের গোষ্ঠীগুলোকে প্রতিহত করার একপ্রকার প্রাকৃতিক প্রবণতা রয়েছে, যেমন আমি আপনাকে এখন একটু জটিল করে উত্তর দিচ্ছি।

প্রশ্ন : আমাদের পরবর্তী প্রশ্ন পূর্ববর্তী প্রশ্নের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত—বিশ্বসংস্কৃতি প্রায়শই দক্ষিণ এবং উত্তর গোলার্ধের সংস্কৃতি থেকে আলাদা। আপনি এই লেবেলগুলোকে কীভাবে দেখেন, বিশেষ করে সাহিত্যের ক্ষেত্রে?
আবদুলরাজাক : পৃথিবী সত্যিই উত্তর এবং দক্ষিণ হিসেবে তৈরি করা হয়নি। তবে এটিকে এমন করে বর্ণনা করা ফ্যাশনেবল মনে হচ্ছে। ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড’ বা ‘অনুন্নত বিশ্ব’-এর মতো বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করার প্রচেষ্টা ছিল, কিন্তু উত্তর এবং দক্ষিণ শব্দ দুটি অন্যান্য শব্দের তুলনায় আরো চলনসই বলে মনে হচ্ছে। যাইহোক, এটিই বাস্তবতাকে বর্ণনা করে, ঐতিহাসিক পার্থক্য বর্ণনা করে এবং অবশেষে এটি অন্য আরেকটি কুৎসিত শব্দ ‘উপনিবেশবাদ’ থেকে পরিত্রাণ দেয়। তাই এই বিষয়গুলি সম্পর্কে কথা বলার জন্য উত্তর-দক্ষিণ শব্দ ব্যবহার করা ভালো। ঐতিহাসিক সাম্রাজ্যবাদ তথাকথিত উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যকার এই পার্থক্যগুলো একীভূত করেছে এবং উপনিবেশিকতার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং সংহত সমস্ত ধ্যানধারণার কারণে আমি মনে করি এসব এখনও অব্যাহত আছে। তাই আমি বলতে চাই যে, হ্যাঁ, পার্থক্য আছে এবং উত্তর ও দক্ষিণ শব্দদুটি পুরোপুরি যথার্থ না হলেও, এই পার্থক্যগুলোর বর্ণনা করার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে নিরপেক্ষ উপায় এই শব্দদুটির মধ্যে রয়েছে। আপনার এই শব্দদুটিকে স্থান হিসাবে বিবেচনা করা উচিত নয় : এগুলো মনোভাব, বোঝাপড়া, প্রত্যাশা প্রভৃতির সাথে সম্পর্কযুক্ত। তাই চীনের এমন কিছু অংশ থাকতে পারে যা পশ্চিমের মতো সমৃদ্ধ এবং কিছু অংশ সমৃদ্ধ নয়। এটা আসলে জায়গার বিষয় নয়। যখন আপনি নিরপেক্ষ বা মধ্যবর্তী থাকার চেষ্টা করেন, তখন এটি স্থানের দিক থেকে কিছুটা বিবেচনা করে। যখন ‘মধ্যবর্তী’ সত্যিই উত্তর এবং দক্ষিণের মধ্যে নয়, কিন্তু এই দুটি লেবেলের মধ্যে এক ধরনের মধ্যবর্তী বা অনির্দিষ্টতা আছে। সেখানেই আমি মনে করি, আপনি নিজেকে উদার মানুষ হিসেবে ভাবেন, নিজেকে বিশ্বের মানুষ হিসেবে এবং সর্বোপরি মানুষ হিসেবে দেখার চেষ্টা করেন। যাইহোক, এখানে আসল পার্থক্য আছে—আসুন আমরা বলি আপনার জীবনের ধরন—আপনি যেই হন না কেন, আপনি উত্তর দিকেরই হন বা দক্ষিণ দিকেরই হন আমাদের জীবন ভিন্ন হবে, আপনি চান বা না চান। এই সংস্কৃতিতে রাষ্ট্র আপনাকে হাসপাতাল, স্কুলসহ নানান সেবা ও সুবিধা দিয়ে থাকে। কিন্তু অন্যান্য দেশে [অনুন্নত দেশ] তাদের কাছে এরকম কিছুই নেই, তাই এই জায়গাগুলির মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য রয়েছে। যার ফলে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক ঘটনা বিভিন্ন সমাজে ঘটেছে।

প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন ‘শরণার্থী সংকট’ অনেক পরিবর্তন এনেছে? যদি তথাকথিত দক্ষিণ দেশগুলোর লোকেরা জার্মানিতে আসে—উদাহরণ স্বরূপ, তারাও জার্মানির পরিবর্তন করে—যেমন অন্যান্য অনেক দেশ পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। 
আবদুলরাজাক : ঠিক আছে, আমি বলছি না যে সবকিছু চিরকালের মতো একই থাকবে; অবশ্যই সবকিছুর পরিবর্তন ঘটছে। অন্যদিকে, কী বা কারা পরিবর্তিত হবে বলে আপনি মনে করেন? যদি বলা যায়, এক মিলিয়ন শরণার্থী জার্মানিতে আসলো, কাদের বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি—জার্মানির নাকি শরণার্থীর? সুতরাং এই প্রশ্নে আমার মত হলো, কিছুটা হলেও এটি একটি পার্থক্য তৈরি করবে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ভবিষ্যতে যেকোনও প্রত্যাবাসনের একটি শর্ত : তারা সরাসরি ইংরেজি শিখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদিও এতে কোনো সমস্যা নেই, তবে এটাকে ইতোমধ্যে একটি শর্ত হিসেবে তৈরি করাই বলে দেয় যে, অন্যরা যখন এখানে আসবে তাদেরকে আমাদের মতোই হতে হবে। চলবে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ১৭:২৭

১৯৬৯ সাল। গণঅভ্যুত্থান চলছে। এমন সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র লিখে ফেললেন ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ নামে একটি কবিতা, যার প্রথম দুটি লাইন স্লোগানের মতো মানুষের মুখে মুখে—‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’
কবিতাটি তখনকার কোনো পত্রিকা প্রকাশ করার সাহস না পেলেও আহমদ ছফা’র কল্যাণে রাতারাতি এ-দুটি লাইনে ছেয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব দেয়াল। এ দুটি লাইন গণঅভ্যুত্থানকে যেন বারুদের মতো উসকে দেয়। ফলশ্রুতিতে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে যান এই কবিতার স্রষ্টা, কবি হেলাল হাফিজ। সিক্ত হতে থাকেন অজস্র মানুষের ভালোবাসায়। এবং অবিশ্বাস্যভাবে, এর পরপরই তিনি হয়ে যান নীরব। ১৯৬৯ থেকে ’৮৬, দীর্ঘ ১৭ বছরের অপেক্ষা শেষে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তার ১ম কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে। বাংলা কাব্যগ্রন্থের ইতিহাসে সর্বাধিক বিক্রিত এই বইয়ের তুমুল জনপ্রিয়তার জোয়ারে ভেসে না-গিয়ে বরং আবারো নীরবতা এবং তার প্রিয় আলস্যকেই প্রশ্রয় দিলেন কবি। কাটিয়ে দিলেন গুনে গুনে আরো ৩৪ টি বছর। ১ম বই প্রকাশের জন্য যা সময় নিয়েছিলেন, ২য় বইয়ের ক্ষেত্রে নিলেন তার দ্বিগুণ! অবশেষে নীরবতার অবসান ঘটিয়ে ২০১৯ সালের শেষে, ৩৪ বছর পর ঠিক ৩৪ টি কবিতা নিয়েই হাজির হলেন তিনি।
গত ৫ ও ২৪ জানুয়ারি ‘বাংলা ট্রিবিউন’-এর সঙ্গে জাতীয় প্রেসক্লাবের অতিথি-কক্ষে চলা দীর্ঘ এক আলাপে কবি হেলাল হাফিজ খোলাসা করেন তার জীবনের নানা বিষয়াদি। বলেছেন বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ নিয়ে বিস্তারিত আলাপের পাশাপাশি নিজের জীবনের দর্শন ও নানান অভিজ্ঞতার কথাও।
'বাংলা ট্রিবিউন'-এর হয়ে এই আলাপ চালিয়েছেন তরুণ চলচ্চিত্রকর্মী, নির্মাতা শাহনেওয়াজ খান সিজু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আই.ই.আর. বিভাগের শিক্ষার্থী, তরুণ লেখক রেজওয়ান হাবিব রাফসান এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাদিরা ভাবনা


শাহনেওয়াজ খান সিজু : বিয়ে তো আর করলেনই না, এখন যদি কেউ প্রস্তাব দেয়, কী করবেন?
হেলাল হাফিজ : এখন? এখন বিয়ে-টিয়ে করাটা যে খুব অন্যায় হবে তা নয়। কিন্তু বিয়ে বলতে আমাদের মনে প্রথম যে ধারণা আসে, সে বয়স তো আর নাই।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : একজন সঙ্গী হিসেবে?
হেলাল হাফিজ : এই পড়ন্ত বেলায় মন তো চায় একজন বন্ধু পাশে থাকুক। যতটা না শারীরিক কারণে তার চেয়ে বেশি মানসিক।
 
নাদিরা ভাবনা : যেমন?
হেলাল হাফিজ : এই মনে করো চোখের সামনে একজন মানুষ আছে। ঔষধ খাবো, প্যাকেটটি এগিয়ে দিলো। পানি খাবো, গেলাসটি নিয়ে এলো। এই যা।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : বিকেলে চায়ে একসাথে চুমুক দেওয়া…
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, হ্যাঁ।
 
নাদিরা ভাবনা : এখন কি তার জন্য অনুতাপ হয়?
হেলাল হাফিজ : অনুতাপ না ঠিক, তবে এখন প্রয়োজনীয়তা বোধ করি খানিকটা। একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো। কিন্তু আমি, আমি তো আমার একাজীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি একদম শৈশব থেকেই। মা চলে যাওয়ার পর থেকে।
 
নাদিরা ভাবনা : মানে একদম ছোটবেলা থেকেই?
হেলাল হাফিজ : An Outsider!
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : মায়ের শাসন না পাওয়াটা কি আপনার বোহেমিয়ান জীবনের মূল কারণ?
হেলাল হাফিজ : না, না, না—আমার ক্ষেত্রে যা হয়েছে সেটা বাধ্যতামূলক। এইভাবে জীবনযাপনে আমি বাধ্য, আর কোনো উপায় ছিলো না আমার।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : জীবনানন্দ দাশের কবি হয়ে ওঠার পেছনে তার মা কুসুমকুমারি দাশের সান্নিধ্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তেমনি হেলাল হাফিজের কবি হয়ে ওঠার মূল কারণ কি তার মাতৃবিয়োগ?
হেলাল হাফিজ : আমার মনে হয় বিষয়টা এরকমই, মাতৃহীনতা। তোমাদের আমি খুব স্পষ্টভাবেই বলে দিচ্ছি যে, আমার কবি হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ এই মাতৃহীনতার বেদনা। এটা আমাকে প্রতিনিয়ত পুড়িয়েছে। আজকে যে হেলাল হাফিজকে দেখছো তোমরা, তার এই অবস্থানে আসা এবং তাকে তৈরি করার রাস্তাটা মাতৃহীনতার বেদনাই পরিষ্কার করে গেছে।
 
নাদিরা ভাবনা : আমাদের জীবনে এরকম হয় যে, আমরা যখন কারো দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হই, তখন বেদনা নতুন করে জেগে ওঠে।
হেলাল হাফিজ : আমি তো অনেক মেয়ের দ্বারাই প্রত্যাখ্যাত হয়েছি, নিজেও করেছি অনেককে। অনেকের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। কী রকম? আমি ভেবেছি মেয়েটি বোধহয় আমাকে ভালোবাসে। আসলে তা নয়, সে আমার কবিতাকে ভালোবাসে। আমি সেটাকে মনে করেছি হয়তো আমাকে ভালোবাসে! ফলে এই মুগ্ধতার দেয়ালটা যখন উঠে গেছে তখন বিরহ ছাড়া আর কোনো উপায় আসলে থাকেনি।
আবার এর উল্টাও হয়েছে। মেয়েটি হয়তো আমাকেই ভালোবাসে। কিন্তু আমি ভাবছি, ও আমাকে আর কি ভালোবাসবে? ও তো আমার কবিতাই বোঝে না, কিংবা বুঝতে চেষ্টাও করে না। যে রকম হয়েছে রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর ক্ষমতাই ছিলো না যে তাকে বুঝবে।
খুব প্রতিভাবান মানুষ সে নারী হোক বা পুরুষ—প্রেমহীন সে থাকে কী করে! একজন লেখিকা আছেন না, সুইসাইড করলো?
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : সিলভিয়া প্লাথ?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, সিলভিয়া প্লাথ। কত সুন্দর মহিলা ছিলেন, ফুলের মতো। সে তো পুরুষকে ভালোবাসতেই চেয়েছিলো। প্রত্যাখ্যাত না হলেও হয়তো বনিবনা হয়নি এমন বেদনা থেকে একটি মেয়ে সুইসাইড করতে পারে? ভাবা যায়! ওর ছবি দেখলেই তো ইচ্ছে হয় প্রেম করি! প্রেম আসলে নারী-পুরুষের ব্যাপার না, মানুষের ব্যাপার। এটা আসার হলে এমনিই আসবে। জোর করে আর যাই হোক ভালোবাসা হয় না।
 
নাদিরা ভাবনা : আচ্ছা, আপনার কবিতা নিয়ে যদি কেউ গান করতে চায়?
হেলাল হাফিজ : হয়েছে তো।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : না মানে, আপনার কি কখনো শুধু গানের কথা ভেবে কিছু লিখতে ইচ্ছে করেনি? যে রকমটা বব ডিলান, গুলজার বা শ্রীজাত করছেন?
হেলাল হাফিজ : না না না। আমি শুধু কবিতা নিয়েই থাকতে চেয়েছি আজীবন।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্ত্বিক ঘটক বলেছিলেন, তার নিজের বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য যদি সিনেমার চাইতে ভালো কোনো মাধ্যম তিনি পেতেন তবে সেই মাধ্যমকেই তিনি বেছে নিতেন। আপনি কেন কবিতার বাইরে গল্প, উপন্যাস, চিত্রনাট্য কিংবা অন্য কোনো শিল্প-মাধ্যমের দিকে ঝুঁকলেন না? সব ছেড়ে কেন শুধু কবিতা নিয়েই থাকছেন?
হেলাল হাফিজ : কবিতা ছাড়া অন্য কোনো কিছু আসলে টানেনি তেমনভাবে। আমার মনে হয়েছে যে, জীবনে আমার অল্প কিছু যদি করার থাকে তাহলে হয়তো এই মাধ্যমটিতেই আমি পারবো। আর আমি সত্যিই খুব কম প্রতিভাবান, নিজের সম্পর্কে আমি উচ্চ কোনো ধারণা আসলে পোষণই করি না। সুতরাং আমি নিজের লাগাম নিজে টেনে ধরার এই অভ্যাসটা খুব ভালোভাবেই আত্মস্থ করেছি।
 
নাদিরা ভাবনা : এটাকে পরিমিতিবোধ বলবেন?
হেলাল হাফিজ : পরিমিতিবোধ, Exactly এই শব্দটা। পরিমিতিবোধ এবং কোথায় কখন কতটুকু থামতে হবে, অধিকাংশ বাঙালিই এটা জানে না। এখানে তোমরা বলতে পারো যে, আপনি কি একটু বেশিই থেমে গেছেন? উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ। আমি একটু বেশিই থেমে গেছি। এটার কারণ আমি কম প্রতিভাবান এবং আলস্য আমার অসম্ভব প্রিয়। এই দুটো মিলে এবং ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র প্রবাদপ্রতিম খ্যাতি ও মানুষের ভালোবাসা আমাকে অস্থির করে ফেলেছে একদম। আনন্দ যেমন দিয়েছে তেমনি আতঙ্কিতও করেছে যথেষ্ট। রাতের পর রাত আমার ঘুম হয়নি।
 
নাদিরা ভাবনা : নতুন বই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই তো দ্বিতীয় সংস্করণ চলে এসেছে। এই যে এত খ্যাতি, আপনার কথায় মানুষের ভালোবাসা…
হেলাল হাফিজ : এটা অসম্ভব বিক্রি হচ্ছে। অসম্ভব ভালো বিক্রি হচ্ছে।
 
নাদিরা ভাবনা : আমি কিন্তু আপনার বই দুটোর মধ্যে এক ধরনের যোগসূত্র দেখতে পাই। প্রথমটা ছিলো আমি জ্বলছি, ‘যে জলে আগুন জ্বলে।’ আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে আমি এখন নিজেকেই সান্ত্বনা দিচ্ছি কিংবা আমি এখন কিছুটা স্তিমিত কিছুটা শান্ত, তাই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’। ঠিক আছে না ব্যাখ্যাটা?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, ঠিক আছে।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : বইটা প্রকাশ করতে এত সময় নিলেন কেন?
হেলাল হাফিজ : ভেতরে ভেতরে একটা ভয় কাজ করেছে যে, আরেকটা বই যদি প্রকাশ করি সেটা প্রথম বইয়ের ধার-কাছেও যেতে পারবে কি না। ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’র জন্য প্রায় ২০০ কবিতা থেকে ৩৪ টি কবিতা আমি বেছে নিয়েছি।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : বইটা পড়েছি আমি। এক লাইনের কবিতাও আছে এতে। একরকম experiment-ই করলেন বোধহয়!
হেলাল হাফিজ : এই বইয়ে আমি দুটো বিষয়ে কাজ করতে চেয়েছি—একটা হলো বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যে নেশা…
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : স্মার্টফোন?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ। সেই স্মার্টফোনকে কাব্যাকারে মলাটবন্দি করতে চেয়েছি। এই বইটা পড়তে কারো ২০ মিনিটের বেশি সময় লাগবে না, কিন্তু পড়ে সে আর বেরুতে পারবে না। একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে যাবে। এবং একটু পরেই আবার সে প্রথম থেকে পড়তে শুরু করবে—এই হলো এক। আর একটা বিষয় যা করতে চেয়েছি—এই যে আমরা একটা অস্থির সময় পার করছি, সমাজে হানাহানি—দুর্নীতি, একটা মেয়ে ঘর থেকে একা বের হতে পারছে না, অসহনশীলতা, রাজনীতি বিপথে চলে গেছে, সেইখানে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমি ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’-তে কেবলই প্রেমের কথা বলেছি, কেবলই বিরহের কথা বলেছি, কেবলই ভালোবাসার কথা বলেছি। আমি বোঝাতে চেয়েছি যে, প্রেমও প্রতিবাদের একটা ভাষা, প্রেম দিয়েও জয় করা যায়। আমার এই কোমলতায় কিছু মানুষও অনুপ্রাণিত বা প্রভাবিত হয় সেখানেই আমার সার্থকতা। চলমান সময়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে অনবরত আমি প্রেমের জয়গান গেয়েছি, বিরহের কথা বলেছি। বিরহ কিন্তু প্রেমেরই বড় অংশ, বিরহ মানুষকে নষ্টও করতে পারে আবার তৈরিও করতে পারে। বিরহ উপভোগের বিষয়।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : বইটির আর কোনো বিশেষত্বের কথা কি জানতে পারি?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ। একটা কবিতা আমার বাবার। কবিতাটির নাম পিতার পত্র—‘রেটিনার লোনাজলে তোমার সাঁতার/পিতৃদত্ত সে মহান উত্তরাধিকার।’
একটি চিঠিতে এই কবিতাটি লেখার পর বাবা আরও লিখেছিলেন, ‘এই কষ্ট, এই বেদনা তুমি লালন করবে, শুশ্রূষা করবে এদের, এবং চেষ্টা করবে এই বেদনাকে শিল্পে রূপান্তরিত করতে।’ আমি সেই চেষ্টাটাই করেছি, আর কিছু না। আব্বাকে সম্মান জানানোর জন্য ওনার এই কবিতাটি আমি ইনভার্টেড কমার ভেতরে আমার বইয়ে স্থান দিয়েছি। যেন একশো বছর পরে পাঁচজন লোকের হাতেও যদি এই বইটা থাকে, তারা যেন আমার পাশাপাশি আমার বাবাকেও পান।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : বাহ্, চমৎকার! আরেকটা প্রশ্ন করি?
হেলাল হাফিজ : নিশ্চয়ই। 
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : কবিতা অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের সাথে কীভাবে সম্পর্কিত বলে আপনি মনে করেন?
হেলাল হাফিজ : শুধু সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মধ্যেই নয় বরং সমস্ত শিল্প মাধ্যমের মধ্যে—যেমন গান, চলচ্চিত্র, নাটক, উপন্যাস—সবচেয়ে উঁচু স্তরের শাখা হলো কবিতা। এখন ধরো একজন ঔপন্যাসিক তার কোনো বিষয় বোঝাতে, কোনো সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে উনি ৭ পৃষ্ঠা লিখে ফেলতে পারেন। কিন্তু একজন কবির জন্য তা বোঝাতে দুটি পঙক্তিই যথেষ্ট। এজন্যই তুমি দেখবে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি স্বরণীয় হয়ে আছেন প্রথমত কবিরা, তারপরে বিজ্ঞানী-সহ অন্য সবাই।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : Visual Poetry’র ব্যাপারে আপনার কী ধারণা?
হেলাল হাফিজ : বুঝিনি। আবার বলো।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : আন্দ্রেই তারকোভস্কির মতো অনেক চলচ্চিত্রকারই তাদের সিনেমাতে Seen-এর পর Seen সাজিয়ে কবিতা বলে গেছেন, সেই Visual Poetry-কে আপনি কীভাবে দেখেন? আপনি যা লিখে প্রকাশ করছেন ওনারা তা Visually বলছেন। আপনার কবিতা বোঝার জন্য পাঠকের নির্দিষ্ট একটা ভাষায় পারদর্শী হওয়া আবশ্যক, কিন্তু সিনেমার ক্ষেত্রে বিষয়টা আলাদা। একেবারে বর্ণজ্ঞানহীন কোনো দর্শকের সঙ্গেও সিনেমা খুব সহজে Communicate করতে পারে।
হেলাল হাফিজ : আমি তো সেটাই বললাম, কবিতা হচ্ছে সবচেয়ে উঁচুস্তরের শিল্পমাধ্যম। কবিতা না লিখেও একজন কবি হতে পারে। ভালো ছবি এঁকে, ছবি তুলে, ভালো রাজনীতি কিংবা সিনেমা করেও কবি হওয়া যায়। কবিতা লেখার চাইতে Poetic হওয়াটা বেশি জরুরি। আর কবিতার ব্যাপারটা কি, ধরো প্রথমত বর্ণজ্ঞান থাকতে হবে। তারপর শুধু বর্ণজ্ঞান থাকলেই হবে না, ভালো লেখাপড়াও জানতে হবে। শুধু লেখাপড়া জানলেই হবে না, আগ্রহ থাকতে হবে কবিতার প্রতি। এ কারণেই পাঠককেও অনেকটা তৈরি হয়েই নামতে হবে যে আমি কবিতা পড়বো। কবিতাকে বোধগম্য করা কবির একার কাজ নয় পাঠকেরও কিছু কাজ আছে।
 
নাদিরা ভাবনা : আপনার কথা শুনে এখন মনে হচ্ছে যে, ‘Poetry is the mirror, where we can see the whole sky!’
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ এবং সেটা এতই সংক্ষেপিত যে তোমাকে বারবার ঘোরে ফেলে দেবে।
 
নাদিরা ভাবনা : আমি নিজেও যখন লিখতে যাই তখন মনে হয় যে ‘এটা সম্ভবত বুঝবে না কেউ।’ একারণেই Elaboration হয়ে যায়। অথচ আপনার কবিতা এক লাইন পড়লেই বুঝে যাই তার Background-টা কী বা কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা।
হেলাল হাফিজ : এটা হচ্ছে মুন্সিয়ানা এবং এটা আমার কবিতার একটা বড় Plus Point. তুমি রবীন্দ্রনাথের গীতবিতান ধরো, এতবড় গানের বইটা নিয়ে যদি বসো এবং প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ৩০০০ বা ৩৫০০ গান তুমি করলে। তুমি দেখবে একটি গানও তোমার বোধের অগম্য নয়। সবকটা গান মনে হবে যে, আরে এটা তো আমিও লিখতে পারি!
 
নাদিরা ভাবনা : আমারই কথা…
হেলাল হাফিজ : আমার কথা তো পরে, ওনার লেখা পড়ে মনে হবে যে আমি তো নিজেও এমন লিখতে পারি। একটা কঠিন শব্দ নাই, যুক্তাক্ষর যথাসম্ভব কম। তোমাকে খুঁজে খুঁজে যুক্তাক্ষর বের করতে হবে। মানে কতবড় প্রতিভাবান হলে এটা সম্ভব! বুঝতেই পারছো ব্যাপারটা। উনি নিজেই তো বলেছেন, ‘সহজ কথা কইতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায় না বলা সহজে।’ সহজ কথা বলাই তো সবচেয়ে কঠিন কাজ।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : আপনার সম্বন্ধে আমরা যতটুকু জানি, একজন আবুল হাসান হতে চেয়ে আপনি হেলাল হাফিজ হয়ে উঠেছেন, একজন কবির স্বাতন্ত্র্য গড়ে ওঠার প্রথম ধাপ কি তবে অনুসরণ, অনুপ্রাণিত কিংবা ঈর্ষান্বিত হওয়া?
হেলাল হাফিজ : যেকোনো শিল্পীরই শৈল্পিক ঈর্ষা থাকতে হবে। নোংরা ঈর্ষা হলে হবে না।
 
নাদিরা ভাবনা : অনুকরণ না, তাইতো?
হেলাল হাফিজ : অনুকরণ, অনুসরণ কোনোটাই না। আমি তো বলেছিই যে, আমার সমসাময়িক কবিদের মধ্যে একমাত্র আবুল হাসানকেই আমি ঈর্ষা করি। আর কাউকে ঈর্ষা করি না। তার মানে কী? সবচেয়ে বেশি ভালোওবাসি তাকে।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : শিল্প তো মনুষ্যত্বের জয়গান গায়, পৃথিবীর দুঃখের অবসান চায়। কিন্তু তারপরেও এই সমগ্র পৃথিবীর এত এত মহান সব শিল্পী, শিল্পকর্ম, বিশ্বমোড়লদের প্রভাবিত করতে পারেনি বা পারছে না কেন? কেন পৃথিবীর সর্বত্র এখনো অন্ধকারের জয়?
হেলাল হাফিজ : না, এইখানে তোমার পুঁজিবাদের প্রভাব আছে। কারণ পুঁজিবাদ তো শিল্পের বিকাশ ঘটতে দেবে না।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : না, মানে ঠিক কী কারণে বব ডিলান বা জন লেননের গান কিংবা পৃথিবীর এত এত মহান শিল্পীদের শিল্পকর্মগুলোর মূলভাষ্য বিশ্বনেতাদের প্রভাবিত করতে পারছে না? ডোনাল্ড ট্রাম্পও তো দিনশেষে একজন মানুষ, কেন তাকে ডিলান কিংবা বব মার্লে ছুঁয়ে যায় না?
হেলাল হাফিজ : সব মানুষ আলাদা, সবার শিল্পবোধ এক নয়।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : সমসাময়িক কবিদের মধ্যে কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের সাথে সম্ভবত পরিচিত আপনি। ওনার কবিতা নিয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাই।
হেলাল হাফিজ : ইমতিয়াজ মাহমুদ আমার ভক্ত, আমিও তার ভক্ত। ওর লেখার মধ্যে আলাদা একটা ব্যাপার আছে।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে কোনো স্মৃতি কি মনে পড়ে?
হেলাল হাফিজ : পারিবারিকভাবে তসলিমার সঙ্গে আমার খুবই অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিলো, একে তো মাটির টান, তার ওপরে অনুজ রুদ্র’র প্রেমিকা। ওদের মধ্যে এটা-সেটা নিয়ে সাংসারিক ঝামেলা লেগেই থাকতো, তখন আমিই যেতাম সেসব মেটাতে। এবং এই করতে করতেই আমি তসলিমার প্রেমে পড়ে যাই, তবে ব্যাপারটা একপাক্ষিক ছিলো। এইখানে তোমাদের বলে রাখি, আমার 'বেদনাকে বলেছি কেঁদো না'র প্রথম যে কবিতা, ‘ব্রক্ষ্মপুত্রের মেয়ে’, সেটা কিন্তু তসলিমাকে ভেবেই লেখা। ওকে আমি ‘তনা’ নামে ডেকেছি।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : আপনি বরাবরই বলেছেন যে, একজন প্রকৃত শিল্পী যদি হতে হয় তবে ক্ষমতা থেকে তার দূরে থাকাই ভালো।
হেলাল হাফিজ : আমি এটা সবসময়েই বলি। পাওয়ারের সঙ্গে কবির মেশা কখনো ঠিক না। কবি হলো একটা সার্বভৌম সত্তা Sovereign identity. একটা সমাজ বা জনগোষ্ঠী কী অবস্থায় আছে, এটা সেই সমাজের কবিদেরকে দেখে বোঝা যায়। কবি হলো একটি সমাজের ব্যারোমিটার, সমাজটা কি নষ্ট-ভ্রষ্ট না কি ভালো, কতটুকু সভ্য আর উন্নত তা কবিদের আচরণ দেখলেই বোঝা যায়। সমাজের কবিরা যদি পোষা পাখি হয়ে যায়, তাহলে ধরে নিতে হবে সে সমাজ দ্রুত গতিতে অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে। কবি একটি জনগোষ্ঠীকে স্বপ্ন যেমন দেখাবে, তেমনি সেই জনগোষ্ঠীর স্বপ্নভঙ্গের বেদনাকেও সে চিহ্নিত করে দেবে। কোথায় ভুল-ত্রুটি হচ্ছে তা দেখিয়ে দেয়াও কবির দায়িত্ব। এর অর্থ এই না যে কেউ রাজনীতি করতে পারবে না। নিশ্চয়ই পারবে। একজন কবির একটি রাজনৈতিক সংগঠন করার যাবতীয় অধিকার অবশ্যই আছে। নিশ্চয়ই করবে সে। কিন্তু আমার ধারণা যে, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হলে একধরনের চিন্তাগত সীমাবদ্ধতা Automatically-ই আরোপিত হয়ে যায়।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : সক্রিয় রাজনীতিতে একধরনের সহিংস, কঠোর মনোভাব আছে যার প্রতি একজন শিল্পীর নরম মন সহজে সায় দিতে চায় না।
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, ঠিক এই কারণেই একজন কবির রাজনীতি থেকে একটু দূরে থাকতে পারাই ভালো। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে তার রাজনৈতিক সংগঠন করারও সম্পূর্ণ অধিকার আছে। অবশ্যই আছে। সুকান্ত করেছে না? তারপরে ঐ যে ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত’ যিনি লিখলেন?
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : সুভাষ মুখোপাধ্যায়?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়। উনি তো সক্রিয় রাজনীতিই করতেন। সুকান্ত করতেন। এমনকি কাজী নজরুল ইসলামও। আমি এই যে বারবার বলছি, আমি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য না। তুমি দশজন কবির বই নিয়ে বসো, সবচাইতে বেশি রাজনৈতিক কবিতা পাবে আমার লেখায়।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : প্রয়াত কবি মাহবুবুল হক শাকিল, আপনার ঘনিষ্ঠজন বলেই চিনি আমরা। উনিও কিন্তু সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন।
হেলাল হাফিজ : মাহবুবুল হক শাকিল—ও তো আমার কবিতা অসম্ভব পছন্দ করতো। এবং ময়মনসিংহ গেলে বাড়িতে যাওয়া-আসা ছিলো। এবং শাকিলই আমার চোখের চিকিৎসার সময়ে শেখ হাসিনার সাথে আলাপ করে পুরো বিষয়টা নিজে একক দায়িত্বে সামলিয়েছিলো। আমাকে সে বলেছে যে, আপা মানে নেত্রী তো আপনাকে খুব পছন্দ করে কিন্তু আপনি এত দূরে দূরে থাকেন কেন? আমি তখন বলেছি যে, ভাই দূরে-কাছে তো ব্যাপার না। আমি আমার কাজ করছি, উনি ওনার কাজ করছেন।
তো আমি যখন বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলাম ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তখন ৪৫ বছর পর শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার মুখোমুখি দেখা।
 
নাদিরা ভাবনা : নতুন কবি বা লেখকদের লেখা কি পড়েন?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, সেটাই তো বেশি জরুরি। আমার সময়কে আমি কীভাবে ধরবো? আমার তো ৭২ বছর বয়স। তুমি আমার কবিতা পছন্দ করো বলে তোমার হয়তো আমাকে একটু কাছে বসতে দিয়েছো, নাহলে তো আমাকে কেউ ধারে কাছেও বসতে দেবে না। তাই না? আমি তোমাকে না পড়লে বুঝবো কীভাবে? কাছাকাছি থাকলে হয়তো একটু বন্ধুত্ব হতে পারে। কিন্তু এর বেশি তো আর সম্ভব না। তাহলে আমি আমার সময়কে বুঝবো কীভাবে? তোমার কবিতা পড়ে, গান শুনে কিংবা পেইন্টিং দেখেই তো বুঝতে হবে তোমাকে, তাই না?
 
নাদিরা ভাবনা : তার মানে নতুনদের ভালো লাগে। অনুপ্রাণিতও হন তাদের দ্বারা?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। হবো না কেন? কোনো ভালো লেখা পড়লে দারুণ লাগে। এইতো কিছুদিন আগে একটা মেয়ের লেখা দেখলাম Facebook-এ। তার সঙ্গে আমার পরিচয় নাই সেভাবে। আমিই তাকে Friend Request পাঠিয়ে বন্ধু হয়েছি। তাকে বলেছি যে আমার Inbox-এ কিছু লেখা দাও তোমার। আমি হাতের কাছে তরুণদের যত লেখা পাই, পড়ি। এখন হয়েছে কী! একটা কাল্ট বা ঘরানা মানে একটা স্বতন্ত্র ধারা জন্ম নিয়েছে, যা কিনা বছরে বছরে হবে না এমনকি যুগে যুগেও না। যেমন জীবনানন্দ দাশ একটা ঘরানা। রবীন্দ্রনাথ একটা ঘরানা।
 
নাদিরা ভাবনা : নজরুল?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, নজরুলও একটা ঘরানা। কিছুটা ঘরানা আবুল হাসানও। আবুল হাসানের কবিতার কোনো নাম-টাম না থাকলেও বোঝা যাবে যে এটা আবুল হাসান।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : Signature?
হেলাল হাফিজ : Exactly, একজন কবির যে স্বাতন্ত্র্য, কবিসত্তা, এটা থাকা জরুরি।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : স্যার, জীবনে তো অনেক অনেক রূপসী নারীরই সান্নিধ্য পেলেন। একটা বিষয় জানতে চাই যে, একজন নারীর রূপ নাকি ব্যক্তিত্ব, কোনটা আপনাকে বেশি টানে?
হেলাল হাফিজ : দুটোই, আমি মনে করি যে দুটোই জরুরি। শুধু বাহ্যিক রূপ দিয়ে তো কোনোকিছু চিরস্থায়ী হবে না। এটার সঙ্গে যদি ভেতরের ভালো সংমিশ্রণ ঘটে তাহলে ব্যাপারটা জমে আরকি। এটা কেবল নারী নয় বরং পুরুষদের ক্ষেত্রেও একই।
 
নাদিরা ভাবনা : কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে বোধহয় রূপের বিষয়টা একটু বেশিই জরুরি?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ এটাও সত্য। কিন্তু এটাই সর্বেসর্বা না। এটাই সবকিছু না। আমি নিজেই তো একসময় সুদর্শন ছিলাম, কিন্তু এখন? তুমি আমার কবিতা ভালোবাসো বলেই আমার পাশে বসেছো, আমি যদি না লিখতাম তাহলে কেউই আমাকে এই বয়সে এতটা গুরুত্ব দিতো না। যাই হোক, কিছুদিন আগে ‘প্রথম আলো’ জিজ্ঞাসা করেছিলো যে, আপনার এত এত নারী ভক্ত। তারা আপনাকে উপহার হিসেবে কী দেয়? উত্তর দিলাম, সবচেয়ে বেশি পেয়েছি চুমু। একসময় প্রচুর পেতাম। এখন তো পড়ন্ত বেলা, এখন মালা পাই, ব্রেসলেট পাই, ফুল পাই।
 
নাদিরা ভাবনা : চুমুও পান?
হেলাল হাফিজ : একেবারে যে পাই না তা না, তবে পাই। পাবার একটা জায়গা তো হলোই এখন! (ভাবনাকে ইঙ্গিত করে)
 
নাদিরা ভাবনা : তা তো বটেই।
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : এখন একজন মহান মানুষকে নিয়ে আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে যাচ্ছি, যাকে শুধু রাজনীতির ফ্রেমে আমরা আবদ্ধ রাখতে পারি না। উনি সার্বজনীন, উনি সবার। অন্তত একজন বাঙালি যদি হয়ে থাকি আমরা। বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ, এ দুটো আপনার কাছে সমার্থক কিনা স্যার?
হেলাল হাফিজ : বাঙালি জাতির জন্য একজন মানুষ, কেবল একজন মানুষই স্বতন্ত্র, স্বাধীন এবং সার্বভৌম একটি ভূখণ্ডের স্বপ্ন দেখেছেন, তার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। আর কোনো বাঙালি বাঙালির জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমির কথা চিন্তা করেনি। কোনো কবি করেনি, কোনো রাজনীতিবিদ করেনি, কেউ করেনি।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : একমাত্র বাঙালি...
হেলাল হাফিজ : একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানই বাঙালির জন্য একটি স্বতন্ত্র, স্বাধীন, সার্বভৌম আবাসভূমির স্বপ্ন দেখেছেন এবং তা শুধু দেখেনই নয় বরং সারাজীবনের সংগ্রাম দিয়ে সেটা বাস্তবায়িত করেছেন।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : বারবার জেল খেটেছেন…
হেলাল হাফিজ : তার সমকক্ষ আর কেউ নাই। কেউ নাই। এটা একদম বিনা বাক্যব্যয়ে মানে এই শব্দকে কোনোভাবেই Ignore করা সম্ভব না। এটা যদি কেউ অস্বীকার করতে চায় সে হয়তো বাঙালিই না। করেনি যে তা নয়, অনেকেই করছে। কিন্তু সেটা খুবই অযৌক্তিক, খুবই অপরিশীলিত মনের পরিচয়। তার রাজনীতির বিরুদ্ধতা হতে পারে কিন্তু তার যে অবদান, কাজ…
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : তার বিরোধীতা করা সম্ভব না।
হেলাল হাফিজ : একদম।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : আপনার গুরুই বলা যায়—আহমদ ছফা—তার প্রভাব কেমন আপনার ওপরে?
হেলাল হাফিজ : ছফা ভাই অনেক অনেক আদর করতেন আমাকে। এবং আমার ঐ যে কবিতাটা যখন বেরুলো ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’, তখন হুমায়ুন কবির নামে একজন কবি ছিলেন, বরিশাল বাড়ি তার। আমাকে নিয়ে ছফা ভাই আর হুমায়ুন ভাই গিয়েছিলেন দৈনিক পাকিস্তানের সম্পাদক আহসান হাবীবের কাছে। তখনকার দৈনিক পাকিস্তান পরে দৈনিক বাংলা হয়। হাবীব ভাইয়ের কাছে গিয়ে ছফা ভাই বললেন, এই যে হেলাল হাফিজ আর এই তার কবিতা। হাবীব ভাই কবিতাটি পড়ে আর আমার দিকে তাকান।
 
নাদিরা ভাবনা : বাচ্চা এই ছেলেটা করেছেটা কী?
হেলাল হাফিজ : যাইহোক, পরে হাবীব ভাই বললেন, ছফা ও তো বাচ্চা ছেলে কষ্ট পাবে, কিন্তু কবিতাটি আমি ছাপতে পারবো না। আমার চাকরি থাকবে না, এমনকি কাগজও বন্ধ করে দিতে পারে। সরকারি কাগজ তখন পাকিস্তানের। তবে এরপরেই বলেন তিনি যে, হেলালের আর কবিতা না লিখলেও চলবে, তার অমরত্ব নিশ্চিত হয়ে গেছে। এইতো এখনও কানে বাজে কথাটা। তখন ছফা ভাই এসে হুমায়ুন কবিরকে সাথে নিয়ে, ওনারা তখন লেখক-শিবির করতেন, বাম ঘরানার Underground সশস্ত্র বিপ্লবী ছিলেন। দুই রাতে সমস্ত ক্যাম্পাসের দেয়াল ভরে গেলো এই কবিতার পঙক্তিতে।
‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’
মাঝরাতে চিকা মেরে মেরে করেছিলো এসব। পুরো ক্যাম্পাস। কার্জন হল, আর্টস বিল্ডিং। তখন তো এতকিছু ছিলো না ক্যাম্পাসে। এই দুটিই বড়, মূল বিল্ডিং। সমস্ত দেয়ালে চিকা মারার এই কাজের নেতৃত্বে ছিলেন ছফা ভাই। উনি ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক স্যারের শিষ্য।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : আব্দুর রাজ্জাক স্যারকে নিয়ে তো উনি একটা বইও লিখেছিলেন, ‘যদ্যপি আমার গুরু’।
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ। আচ্ছা শোনো, আমি আর কথা বলতে পারবো না, এই যে আমার কাশি হচ্ছে বারবার। তোমরা ৩ জন মিলে এটা গুছিয়ে লিখো আর কোনো তথ্যের যদি ঘাটতি পড়ে কিংবা কিছু নিয়ে কোনো দ্বিধা যদি হয় তবে আমাকে ফোন করো।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : স্যার, একটা শেষ প্রশ্ন করি?
হেলাল হাফিজ : আচ্ছা করো।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : পিডিএফ বনাম কাগুজে বই, কার পক্ষে আপনি?
হেলাল হাফিজ : অনেকের ধারণা যে বই বোধ হয় উঠে যাবে, বই থাকবে না। কিন্তু আমার মনে হয় বই থাকবে। কারণ বইয়ের কাগজের যে গন্ধটা লাগে নাকে এটা কিন্তু খুবই হৃদয়গ্রাহী একটা ব্যাপার। এবং তুমি যতই অনলাইন পড়ো না কেন, এই যে বাইন্ডিং করা বই, এটা হাতে নিলে মনে হয় যেন লেখককেই ধরে আছো। এই স্পর্শ, আবেদনটা তুমি অন্য কোথাও পাবে না। আমাকে তো কত ছেলে-মেয়েই বলেছে যে, ঘুমানোর সময় ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ তাদের বালিশের নিচে থাকে।
 
নাদিরা ভাবনা : আমারও তো থাকে।
হেলাল হাফিজ : এই যে দেখো জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। চিন্তা করো কেমন লাগে তখন? কথাটা কত মানুষ যে বলেছে আমাকে!
 
নাদিরা ভাবনা : ব্যাপারটা এমন না যে শুধু পড়েই রেখে দিলাম, একটা ঘোরের বিষয় আছে।
হেলাল হাফিজ : এজন্যই আমি ১৭ বছর অপেক্ষা করেছিলাম বইটার জন্য আর এই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ এটার জন্য ৩৪ বছর। এটা এমন না যে বেশি সময় নিয়ে বের করেছি বলে এটা সমকক্ষ তার, বরং আমি স্বীকারই করি যে এটা দূর্বল খানিকটা। ৩-৪ টা টিভি অনুষ্ঠান করেছি বইটা বেরুবার পরে এবং প্রতিটাতেই স্বীকার করেছি।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : প্রথম বই সবসময়েই প্রিয়।
হেলাল হাফিজ : না না, যেটা বাস্তব সেটা তো বলতেই হবে। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ যখন আমি লিখেছি, তখনকার সময় আর এখন কি এক? ঐ সময় আমি কোথায় পাবো? কবিতা তো আর হাওয়ায় হাওয়ায় হয়ে ওঠে না।
 
নাদিরা ভাবনা : এবার চা খাব।
হেলাল হাফিজ : শুধু চা কেন? তার আগে কাবাব-নান খাবো এবং আমি খাওয়াবো। চলো, এতক্ষণে ক্যান্টিন খুলে গেছে...

/জেডএস/

সম্পর্কিত

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ১৭:৪৩

২০২১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জিতে নিলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ। ৭ অক্টোবর বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় বিকেল পাঁচটায় এই পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে রয়েল সুইডিশ অ্যাকাডেমি।

তানজানিয়ার নাগরিক আবদুলরাজাক গুরনাহ যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। তিনি মূলত ইংরেজিতে লেখেন। তার  বিখ্যাত কয়েকটি উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে প্যারাডাইস (১৯৯৪), বাই দ্য সি (২০০১), এবং ডেজারশন (২০০৫)।

১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন আবদুলরাজাক গুরনাহ। তানজানিয়ায় বেড়ে উঠলেও ১৯৬০ সালের পর শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাজ্যে যান এই সাহিত্যিক। অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ক্যান্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। সুইডিশ একাডেমি বলেছে, আবদুলরাজাক গুরনাহের আপোষহীন ও দরদী লেখায় উপনিবেশিকতার দুর্দশা আর শরণার্থীদের জীবনের নানা কষ্ট-ব্যাঞ্জনার গল্প ফুটে উঠেছে।

২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জিতে নেন আমেরিকান কবি লুইস গ্লাক। সুইডিশ অ্যাকাডেমির পক্ষ থেকে বলা হয়, গ্লাককে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে তার নিরাভরণ সৌন্দর্যের ভ্রান্তিহীন কাব্যকণ্ঠের কারণে, যা ব্যক্তিসত্তাকে সার্বজনীন করে তোলে। ২০১৯ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন অস্ট্রিয়ান লেখক পিটার হান্দক। তার বিরুদ্ধে সার্বিয়ার নেতা স্লোবোদান মিলোসেভিচের বলকান যুদ্ধ সমর্থনের অভিযোগ রয়েছে।

২০১৮ সালে নোবেল কমিটির এক সদস্যের স্বামী ও জনপ্রিয় আলোকচিত্রী জ্যঁ ক্লদ আর্নোর বিরুদ্ধে যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগ আনা হয়। পরে ওই ঘটনায় তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে আদালত। যৌন কেলেঙ্কারির পাশাপাশি বিজয়ীর নাম ফাঁস করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিতর্কের মুখে স্থগিত করা হয় ২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেল প্রদান।

কেলেঙ্কারির কারণে ২০১৯ সাল থেকে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে শুরু করে রয়েল সুইডিশ একাডেমি। পাল্টে যায় নোবেল কমিটির কাঠামোও। সে বছর ২০১৯ সালের বিজয়ীর পাশাপাশি ঘোষণা করা হয় ২০১৮ সালের স্থগিতকৃত বিজয়ীয় নামও। ২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান পোলিশ লেখক ওলগা তোকারজুক।

সরাসরি নোবেল ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৮ সালেই প্রথমবারের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা বাতিল করা হয়। এর আগে দ্বিতীয় ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ও এ বিভাগে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। তবে ওই সময় যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে দেওয়া হয়নি।

২০১৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জিতে নেন জাপানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক কাজু ইশিগুরো। ২০১৬ সালে অ্যাকাডেমি আমেরিকান রক সংগীতের কিংবদন্তি বব ডিলানকে এই পুরষ্কার দেওয়া হয়।

এর আগে ১৪ জন নারী সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন। প্রয়াত টনি মরিসন একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ নারী যিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন।

প্রসঙ্গত, ১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসে আলফ্রেড নোবেল নিজের মোট উপার্জনের ৯৪% (৩ কোটি সুইডিশ ক্রোনার) দিয়ে তার উইলের মাধ্যমে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করেন। এই বিপুল অর্থ দিয়েই শুরু হয় পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান।

১৯৬৮ সালে তালিকায় যুক্ত হয় অর্থনীতি। সে বছর পুরস্কার ঘোষণার আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন আলফ্রেড নোবেল। আইনসভার অনুমোদন শেষে তার উইল অনুযায়ী নোবেল ফাউন্ডেশন গঠিত হয়। তাদের ওপর দায়িত্ব বর্তায় আলফ্রেড নোবেলের রেখে যাওয়া অর্থের সার্বিক তত্ত্বাবধান করা এবং নোবেল পুরস্কারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা করা। বিজয়ী নির্বাচনের দায়িত্ব সুইডিশ অ্যাকাডেমি আর নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটিকে ভাগ করে দেওয়া হয়।

/জেজে/

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ২০:৪৮

শিশুরা খেলবে
এই তো নিয়ম
বুড়োরা দেখবে
তাই বুঝি কম
হঠাৎ দেখছি
হলদিয়া মাঠে
বদলিয়ে গেছে
আগম নিয়ম :

বুড়োরা খেলছে
শিশুরা দেখছে

(আগম-নিয়ম/ লঘু সংগীত ভোরের হাওয়ার মুখে)

আমাদের জীবন যে সব সময় শৈশবকে বহন করে চলেছে, এই কবিতার মধ্যে সেই বার্তা পাই। বয়স্ক মাত্রই একদিন শিশু ছিল, কিন্তু বুড়ো হয়ে অনেকে ভুলে যান সে-কথা। কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ভোলেননি! সে-জন্যই বোধ হয় আমাদের মনোজগতের 'আগম-নিয়ম' বদলে দিতে চেয়েছিলেন তিনি! 'হলদিয়া'র ঠিক পরের লাইনে 'বদলিয়ে' শব্দটি কী মাধুর্য এনেছে! তাঁর মনের বয়স যে বাড়েনি, কাছে গেলেই সে-কথা টের পাওয়া যেত। মধুর-আনন্দে ভরিয়ে দিতেন আমাদের ছেলেবেলা!

কখনও মজার গল্প বলতেন। একবার তাঁর বাড়িতে গিয়ে মুখোমুখি বসেছি, ওমনি তাঁর পায়ে এসে বসল একটা মশা! 'ঠাস' শব্দে মশাটাকে মেরে অলোকরঞ্জন বললেন :
—আমাদের বন্ধু তারাপদকে চেনো?
—তারাপদ রায়? বহু কবিতা পড়েছি তাঁর।
—আমাদের শৈশবে ওর একটা ডেরা ছিল কলকাতায়। রাতে মশার বাড়বাড়ন্ত। মশারি টাঙিয়ে ঘুমোত তারপদ।
—তাই?
—রাত দু'টোর মধ্যে ঘরের সমস্ত মশা ঢুকে পড়ত ওর মশারির ভেতর।
—সেকি! তারপর?
—তারাপদ তখন আলত করে মশারি থেকে বেরিয়ে এসে খোলা মেঝেতে ঘুমিয়ে দিব্যি কাটিয়ে দিত বাকি রাতটা!

কী আশ্চর্য! ১৭ নভেম্বর অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর চলে যাওয়ার দিনটিতেই তারাপদ রায়ের জন্মদিন। কীরকম তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গিয়েছে দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু। আজ অলোকদার জন্মদিনে তাঁর কথাগুলো কানের কাছে বেজে উঠছে পিয়ানোর সুরের মতো। আর ভাবনার অতল মিলিয়ে যাচ্ছে জলের গভীরে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে নবনীতা দেবসেনের মৃত্যুর পর তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, বুদ্ধদেব বসুর চলে যাওয়ার দিনটিতে নবনীতা ঘটনাচক্রে ছিলেন অলোকরঞ্জনের জার্মানি বাড়িতে। সেদিন সারা রাত তাঁরা শুধু বুদ্ধদেবের স্মৃতিচারণ করেছিলেন, তারপর এক সময় জানালা দিয়ে আলো আসতে শুরু করে, ভোর হয়ে যায়।

বাজে রে গুপীযন্ত্র বাজে মহাঅন্ধকারে

চটকা ভেঙে সংসারীরা গণপিটুনি দিতে
আছিলা চোর খুঁজে বেড়ায়, নাগরদোলা থেকে
দুঁদে সয়তান ধার্য করে কোনজন সজ্জন,
বাকিরা প্রাণ খোয়ায় তার একটি ইঙ্গিতে,
নবারুণের বদলে দেখি শুধুই রাত বাড়ে—

তবুও গুপীযন্ত্র বাজে মহাঅন্ধকারে

(গুপীযন্ত্র বাজে/ শুনে এলাম সত্যপীরের হাটে)

তখন কি ভেবেছিলাম ঠিক তার পরের বছর নভেম্বরে তিনিও চলে যাবেন আমাদের ছেড়ে! কবি আলোকরঞ্জন দশগুপ্তর প্রয়াণ আমাদের কাছে রাত বাড়ার মতোই 'মহাঅন্ধকার' এনে দিয়েছে। প্রয়াণের পর এই তাঁর প্রথম জন্মদিন। কাছের মানুষকে হারালে, কেন জানি না, তাঁর সঙ্গে যাপনের দিনগুলোই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বারবার। পর্দায় দেখা সিনেমার দৃশ্যের মতোই, একের পর এক। যদবপুরে শক্তিগড়ের মাঠের কাছে তাঁর ফ্ল্যাটে আমাদের আড্ডা হয়েছে বহুবার। টের পেতাম শব্দ প্রবাহের রূপান্তর। শক্তিগড় শব্দটির মধ্যে একটা স্পেস দিয়ে উচ্চারণ করতেন তিনি। শক্তি (স্পেস) গড়ের মাঠ! কিন্তু কেন? একটা স্পেসের মধ্যে দাঁড়িয়ে কি তিনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কোনও মেধাবী-মজা করতেন? তা ধরার সাধ্য আমার নেই। তবে তিনি শক্তির কবিতার কাছে বারবার যেতে বলতেন, সেকথা মনে আছে। যখন তাঁর কাছে 'বৈষব পদাবলি' বুঝতে গিয়েছি, তখনও তিনি বলেছিলেন-- 'শক্তির কবিতা বৈষ্ণব পদাবলির জঙ্গম উত্তরাধিকার বহন করেছে'। এই নিয়ে তাঁর একটি লেখাও রয়েছে। সেই লেখা পাওয়া যায় 'যা হয়েছে যা হতেছে এখুনি যা হবে' বইয়ে।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির আয়োজনে লিটল ম্যাগাজিন মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল শিলিগুড়ির বাঘাযতীন পার্কে। সেখানে কবিতা পড়তে যাব জেনে অলোকদা বললেন, 'আমার বন্ধু অশ্রুকুমার সিকদার শিলিগুড়িতে থাকেন। ওঁর সঙ্গে দেখা করে এসো। বলবে আমি পাঠিয়েছি।' সেই মতো ফোন করে অশ্রুবাবুর বাড়িতে গেলাম। তাঁর 'আধুনিক কবিতার দিগবলয়' কত ছোটবেলায় পড়েছিলাম। বইটা আমার বাবার সংগ্রহে ছিল। এবার অশ্রুবাবু উপহার দিলেন 'গাংচিল' থেকে প্রকাশিত তাঁর 'এক কুড়ি প্রবন্ধ'। বইটা পড়ে কী ভীষণ ঋদ্ধ হই এখনও! শেষ দিন পর্যন্ত অশ্রুবাবুর সঙ্গে সুযোগাযোগ থেকে গিয়েছিল একমাত্র অলোকঞ্জনের সৌজন্যেই!

এর কিছুদিন পর নন্দন চত্বরে লিটল ম্যাগাজিন মেলায় অলোকরঞ্জন দশগুপ্তর কবিতাপাঠ শুনেছিলাম :

প্রজাপতির পরনে ছিল হলুদ টাই,
তুমি কিন্তু দেখলে শুধু হলুদটাই।

যেদিকে চাও এখন শুধু ঘূর্ণিঝড়,
উড়তে গিয়ে গাছগুলিও দূর-শিকড়।

বরণডালায় কেউ রেখেছে বিষবারুদ,
যজ্ঞের চাল নষ্ট-করা কপিশ দুধ

খেতের মধ্যে ছলকে  যায়, এমন সময়
ভয় সাহস এবং কিনা সাহস ভয়।

এর ভিতরে ছোট্ট বুকে সাহসভরে
একটুখানি রং-বদলের আড়ম্বরে

পাড়ার প্রজাপতি আঁচল হলুদ টাই,
তুমি কিন্তু দেখলে শুধু হলুদটাই!

'হলুদ টাই'-এর সঙ্গে 'হলুদটাই'-এর আশ্চর্য অন্তমিল ভাবা যায়! কিংবা 'ঘূর্ণিঝড়' এর সঙ্গে দূর-শিকড়-এর? আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত তাঁর 'তুষার জুড়ে ত্রিশূলচিহ্ন' বইয়ে আছে এই কবিতা। নিজেকে 'আড় ভাবুক' বলতেন তিনি। একবার এর মানে জানতে চেয়েছিলাম তাঁর কাছেই। বলেছিলেন, যেকোনো বিষয়কে আড়াআড়ি ভাবা। অলোকরঞ্জনের সঙ্গ না-পেলে মনে হয় জীবনটাই বিবর্ণ থেকে যেত।

২০১৮ সালে অক্টোরব মাসে দিল্লি থেকে ফোন করে বললেন : 'দেশ পত্রিকায় তোমার কবিতাটা ভালো লেগেছে। আমার বোনের বাড়িতে বসে লেখাটা পড়লাম।' একজন তরুণের কাছে এর চেয়ে বেশি পাওয়া আর কী হতে পারে! আজ, তাঁর 'পদ্ধতি ও খণ্ড খণ্ড মেঘ' আবার খুলে বসেছি। বইটা এক সময় তাঁর সংগ্রহে ছিল না। কলেজ স্ট্রিট বাটার তিন তলায় 'বিকল্প' প্রকাশনা থেকে একটা কপি সংগ্রহ করে আমি দিয়েছিলাম তাঁকে। এই বই আমার চোখের সামনে খুলে দিয়েছিল জার্মান সাহিত্যের জানলা। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত আমার কাছে খোলা জানালার মতোই। যে-জানালা দিয়ে আমার ঘরে সব সময় আলো-বাতাস আসছে...।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:৪৭

এ বছর ‘দ্য বুকার প্রাইজ’-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে শ্রীলঙ্কার ৩৩ বছর বয়সী লেখক অনুক অরুদপ্রাগাসামের উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’। বইটি চলতি বছরের ১৩ জুলাই যৌথভাবে প্রকাশ করেছে আমেরিকার হোগার্থ প্রেস এবং হামিশ হ্যামিল্টন। আমেরিকার পাশাপাশি ইংল্যান্ডের গ্রান্টা বুকস থেকেও ১৫ জুলাই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়।

উপন্যাসের বিষয়বস্তু গৃহযুদ্ধোত্তর শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি।

‘২০২১ বুকার প্রাইজ’-এর সংক্ষিপ্ত তালিকা ঘোষণা করা হয় ১৪ সেপ্টেম্বর।

উপন্যাসর মূল চরিত্র কৃষ্ণ, যাকে কেন্দ্র করেও গল্প গড়ে ওঠে। দেখানো হয়, কৃষ্ণ বর্তমান সময়ের কলম্বোর একটি এনজিওতে চাকরি করে। যে এক সময় শ্রীলঙ্কার উত্তরে যাত্রা করে– যেখানে গৃহযুদ্ধের কুরুক্ষেত্র ছিলো– সেখানে সে তার দাদীর তত্ত্বাবধায়কের শ্মশান যাত্রায় যোগ দেয়।

‘এ প্যাসেজ নর্থ’ একটি গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন দার্শনিক উপন্যাস। কাহিনিটি প্রাথমিকভাবে গড়ে উঠেছে দীর্ঘ বাক্য ও পার্টিসিপেল ফ্রেইজ ও সাবঅডিনেট ক্লজ দিয়ে। সংলাপ গঠিত হয়েছে সরাসরি প্রশ্ন না করে পাস্ট পারফেক্ট টেনস দিয়ে।

অনুক অরুদপ্রাগাসাম এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি চেয়েছেন কৃষ্ণর সঙ্গে তার দাদীর আবেগমথিত সম্পর্কের স্বরূপ তুলে ধরতে।

যাই হোক, উপন্যাসের শেষে দেখা যায় দাদী-নাতির সম্পর্ক প্রাসঙ্গিক থাকলেও কৃষ্ণ আছন্ন হয়ে পড়ে রানীর বিষণ্নতায়, যিনি তার দুটি সন্তান হারিয়েছেন এমনকি আঞ্জুমের সঙ্গে সম্পর্কও তার অতীত।

উপন্যাসটি একই সঙ্গে রাজনৈতিকও, সংলাপের ভেতরে প্রকাশ পেয়েছে তামিল জনগণের উপর শ্রীলঙ্কার সরকারের অত্যাচারের বিষয়ে নিন্দা।

অনুক অরুদপ্রাগাসাম শ্রীলঙ্কার তামিল লেখক, তিনি ইংরেজি ও তামিল ভাষায় লেখেন। 

তার প্রথম উপন্যাস ‘এ স্টোরি অব এ ব্রিফ ম্যারেজ’ প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে, অনূদিত হয় ফরাসি, জার্মান, চেক, মান্দারিন, ডাচ এবং ইতালিয় ভাষায়। এই উপন্যাসটি ২০০৯ সালের গৃহযুদ্ধের চূড়ান্ত অবস্থা নিয়ে লেখা, যা দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যের জন্য লাভ করে ডিএসসি প্রাইজ এবং ডিলান টমাস পুরস্কার। এছাড়া জার্মান আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পায়। 

অরুদপ্রাগাসাম ১৯৮৮ সালে শ্রীলঙ্কার কলোম্বোর একটি তামিল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়তে ১৮ বছর বয়সে তিনি আমেরিকা গমন করেন। লেখাপড়া শেষ করে তিনি ভারতের তামিল নাড়ুতে বসবাস করছেন। এছাড়াও তিনি কলোম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেছেন।

অরুদপ্রাগাসামের প্রথম উপন্যাস ‘এ স্টোরি অব এ ব্রিফ ম্যারেজ’ ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের সময়কালে লেখেন। এতে দীনেশ ও গঙ্গার একটি দিন ও রাতের বর্ণনা করা হয়, যারা শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর উত্তর-পূর্ব উপকূলের ক্যাম্পে বোমা বর্ষণের কারণে বিয়েতে বাধ্য হয়।

অনুক এখন তার তৃতীয় উপন্যাস লিখছেন, এর কাহিনি গড়ে উঠেছে মা ও তার মেয়ের তামিল ডায়াসপোরা নিয়ে, যার কিছুটা নিউইয়র্কে ও কিছুটা টরেন্টোতে।

২০২১ বুকার প্রাইজ-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া বাকি ৫টি বই হলো : দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক ড্যামন গালগুটের ‘দ্য প্রমিজ’; যুক্তরাষ্ট্রে প্যাট্রিসিয়া লকউডের ‘নো ওয়ান ইজ টকিং অ্যাবাউট দিস’; সোমালিয়ান/যুক্তরাজ্যের নাদিফা মোহাম্মাদের ‘দ্য ফরচুন মেন’; যুক্তরাষ্ট্রের রিচার্ড পাওয়ার্সের ‘বিউইলপডারমেন্ট’ এবং ম্যাগি শিপস্টেডের ‘গ্রেড সার্কেল’ উপন্যাসটি।

আগামী ৩ নভেম্বর ‘২০২১ বুকার প্রাইজ’-এর বিজয়ীর নাম প্রকাশ করা হবে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

সেন্ট লুইস লিটারারি অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন অরুন্ধতী রায়

সেন্ট লুইস লিটারারি অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন অরুন্ধতী রায়

দোলা যে রাতে সেলিমের ফ্লাটে যায়

দোলা যে রাতে সেলিমের ফ্লাটে যায়

জব্দ করো নোবেল

জব্দ করো নোবেল

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—পাঁচসাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

কে পাচ্ছেন সাহিত্যে নোবেল?

কে পাচ্ছেন সাহিত্যে নোবেল?

সর্বশেষ

৫ গোলের ম্যাচে বেলজিয়ামকে হারিয়ে ফ্রান্স ফাইনালে

৫ গোলের ম্যাচে বেলজিয়ামকে হারিয়ে ফ্রান্স ফাইনালে

আফগানিস্তানে বিক্রি হচ্ছে অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্র

আফগানিস্তানে বিক্রি হচ্ছে অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্র

ফাইনালে খেলার আশা ছাড়ছেন না বাংলাদেশ কোচ

ফাইনালে খেলার আশা ছাড়ছেন না বাংলাদেশ কোচ

শিগগিরই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার ঘোষণা তালেবানের

শিগগিরই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার ঘোষণা তালেবানের

মধ্যরাতে ভূমিকম্পে কেঁপে উঠলো দেশ

মধ্যরাতে ভূমিকম্পে কেঁপে উঠলো দেশ

© 2021 Bangla Tribune