X
বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

ফ্রসোয়াঁ ত্রুফোর শেষ সাক্ষাৎকার

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৫, ০১:৩৩

ভূমিকা ও ভাষান্তর : বিধান রিবেরু ||

  truffaut [ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালক ফ্রাসোঁয়া রোলাঁ ত্রুফো। তিনি জন্মেছেন ১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। আর মৃত্যুবরণ করেছেন ১৯৮৪ সালের ২১ অক্টোবর। শুধু চলচ্চিত্র পরিচালক বললে ত্রুফোকে গণ্ডিবদ্ধ করে ফেলা হয়। তিনি একাধারে চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক, অভিনেতা, চলচ্চিত্র সমালোচক এবং সর্বোপরী চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় যা ফরাসি নবতরঙ্গ নামে পরিচিত, সেই আন্দোলনের সামনের সারির একজন। পুরো দুনিয়ার এই ফিল্ম আইকন জীবদ্দশায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন ২৫টি। প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ কাহিনিচিত্র ছিল ‘দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’ (১৯৫৯)। এরপর একে একে তিনি নির্মাণ করেছেন ‘শুট দ্য পিয়ানো প্লেয়ার’ (১৯৬০), ‘জুলে এন্ড জিম’ (১৯৬১), ‘দ্য ওয়াইল্ড চাইল্ড’ (১৯৭০), ‘টু ইংলিশ গার্লস’ (১৯৭১), ‘ডে ফর নাইট’ (১৯৭৩), ‘দ্য ওম্যান নেক্সট ডোর’ (১৯৮১) ইত্যাদি সব চমৎকার চলচ্চিত্র।
মার্কিন পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্কার ২০১০ সালের ২৯ জুলাই ত্রুফোর সর্বশেষ সাক্ষাৎকারটি পুনঃপ্রকাশ করে। সেই সংস্করণে উল্লেখ করা হয়, সাক্ষাৎকারটি বেশ ভালোভাবেই নিয়েছিলেন বের্ট কারদুলো। এই পত্রিকার আগে সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয় গ্যারি মরিস সম্পাদিত ‘এ্যাকশন! ইন্টারভিউজ ইউদ ডিরেক্টরস ফ্রম ক্লাসিক্যাল হলিউড টু কনটেম্পরারি ইরান’ নামক বইতে। নিউ ইয়র্কার পত্রিকায় বলা হয়, এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ত্রুফোর জীবন ও কর্ম, দুটোই বেশ স্পষ্টভাবে ধরা যায়।
প্রভাবশালী চলচ্চিত্রকার ফ্রাসোয়াঁ ত্রুফো আমার ভীষণ পছন্দের একজন নির্মাতা। তাঁকে আমি বলি প্রেম ও নারীদের নির্মাতা। প্রেম ও নারীকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রে ত্রুফো যেমন পরিপক্ক, তেমনি তিনি শিশুর মনস্তত্ব উন্মেষেও অসাধারণ। ‘জুলে এন্ড জিম’, ‘টু ইংলিশ গার্লস’, ‘দি স্টোরি অব এ্যাডেল এইচ’, ‘দি ম্যান হু লাভড ওম্যান’– এসব ছবিতে ত্রুফো আবির্ভুত হন প্রেম ও নারীভিত্তিক গল্পকার হিসেবে। আবার প্রথম ছবি ‘ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’ কিংবা ‘দি ওয়াইল্ড চাইল্ড’ ছবিতে বালক মনের বহিঃপ্রকাশেও আমরা তাঁর দক্ষতার প্রমাণ পেয়েছি। ‘দি ওয়াইল্ড চাইল্ড’ ছবিতে অভিনয়েও তিনি ছিলেন অনবদ্য।

যাহোক, বের্ট কারদুলোর সাক্ষাৎকারটি নিউ ইয়র্কার পত্রিকায় ছাপা হয় ‘অল্টার ইগো, অটোবায়োগ্রাফি, এ্যান্ড অতরিজম: ফ্রাসোয়া ত্রুফোস লাস্ট ইন্টারভিউ’। বাংলা করলে এই শিরোনাম দাঁড়ায়: ‘পরানের দোসর, আত্মজীবনী ও লেখকবাজি: ফ্রাসোয়া ত্রুফোর শেষ সাক্ষাৎকার’। ইংরেজি ও ফরাসি- দুই ভাষাতেই এই সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয় ১৯৮৪ সালের মে মাসে প্যারিসে, ত্রুফোর নিজের প্রযোজনা সংস্থা ‘লে ফিল্ম দ্যু ক্যারোস’-এর কার্যালয়ে। এর আগে একই বছরের ১৩ এপ্রিল ত্রুফো শেষবারের মত টেলিভিশনে বারনার্ড পিভোটের সঞ্চালনায় ‘এ্যাপোস্ত্রোফ’ অনুষ্ঠানে একটি সাক্ষাৎকার দেন। এরপর ২১ অক্টোবর মস্তিষ্কে কর্কট রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।]

 

ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ ছবির একটি দৃশ্য প্রশ্ন: আমরা আমাদের আলোচনা আন্তোয়ান দোয়ানেল (এই চরিত্রটি ত্রুফো সৃষ্টি করেছেন এবং বারবার ফিরিয়ে এনেছেন বিভিন্ন চলচ্চিত্রে। যেমন- ‘দি ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’ থেকে শুরু করে ‘স্টোলেন কিসেস’, ‘বেড এ্যান্ড বোর্ড’ বা ‘লাভ অন দ্য রান’ চলচ্চিত্রে এই নামের চরিত্র ঘুরেফিরে এসেছে) চক্রের উপর। তবে আপনার অন্য ছবি নিয়েও আমরা আলাপ করবো। চলচ্চিত্র পরিচালক হওয়ার পেছনে আপনার জীবনে কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে?ত্রুফো: যুদ্ধের সময় আমি অনেক ছবি দেখেছি, আর এখান থেকেই আমি সিনেমার প্রেমে পড়ি। সিনেমা দেখার জন্য আমি নিয়মিত স্কুল পালাতাম- এমনকি সকালবেলাতেই, প্যারিসের অনেক প্রেক্ষাগৃহই সকাল সকাল খুলতো। প্রথমে নিশ্চিত ছিলাম না, আমি কি চলচ্চিত্র সমালোচক হবো, না পরিচালক। কিন্তু আমি জানতাম এমন কিছু একটাই হবো আমি। লেখালেখি করার কথাটাই ভাবতাম আসলে, ঔপন্যাসিক হওয়ার কথা ভাবতাম। পরে ঠিক করলাম চলচ্চিত্র সমালোচনা লিখবো। এরপর ধীরে ধীরে ভাবতে লাগলাম, আমাকে চলচ্চিত্র বানাতে হবে। আমার মনে হয়, ওই যে যুদ্ধের সময় চলচ্চিত্রগুলো দেখেছি, সেটা ছিল আমার একধরনের শিক্ষানবীশির কাল।নবতরঙ্গের চলচ্চিত্রকারদের, আপনি জানেন, অনেক সময় সমালোচনা করা হয় যে তাদের অভিজ্ঞতার অভাব ছিল। এই আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে উঠে আসা মানুষেরা- এদের মধ্যে আমিও আছি, যে আমি ‘কাইয়ে দ্যু সিনেমা’ পত্রিকায় লেখা ও কয়েক হাজার সিনেমা দেখা ছাড়া কিছুই করিনি। আমি কোনো কোনো ছবি চৌদ্দ কি পনেরোবার দেখেছি- যেমন জঁ রেনোয়ার ‘দ্য রুলস অব গেম’ (১৯৩৯) এবং ‘দ্য গোল্ডেন কোচ’ (১৯৫৩)। সিনেমা দেখার কিন্তু তরিকা আছে, একজন পরিচালকের সহযোগী হিসেবে আপনি যা শিখবেন, তার চেয়েও বেশি শিখবেন ওই তরিকায়। চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়া দেখে ক্লান্ত কিংবা একাডেমিক হওয়া ছাড়াও শেখাটা সম্ভব। সহযোগী পরিচালকরা আসলে দেখতে চান চলচ্চিত্র কিভাবে নির্মিত হয়, কিন্তু যখন ক্যামেরার সামনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটতে থাকে, তখন বেচারারা বার্তাবাহকের কাজ করেন, তাই ওই চাওয়াটা তাদের ব্যাহত হয়। কথাটি ঘুরিয়ে বলি, তাদের সবসময়ই এমন কাজ করতে হয় যা সেটের বাইরে। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে যখন আপনি একটি ছবি দশ বা এর বেশিবার দেখেন, তখন ওই ছবির সংলাপ ও সঙ্গীত আপনার মনে গেঁথে যায়। আপনি তখন খুঁজতে শুরু করেন এই ছবিটি নির্মাণ হয়েছে কিভাবে, আর এভাবেই আপনি সহকারী পরিচালকের চেয়েও বেশি শিখতে পারেন।

প্রশ্ন: ছেলেবেলায় কোন ছবিটি আপনার নজর কেড়েছিল? যে ছবির কারণে আপনি সিনেমার নিয়মিত দর্শক হয়ে গেলেন?
ত্রুফো: ফরাসি ছবিগুলোই প্রথমে ভালো লাগত, যেমন অঁরি-জোর্জ ক্লুজোর ‘দি র‍্যাভেন’ (১৯৪৩), মারসেল কারনের ‘দি ডেভিলস এনভয়জ’ (১৯৪২)- এই ধরনের ছবিগুলো তখন বেশি দেখতে চাইতাম। একই ছবি বারবার দেখার এই অভ্যাস আমার দুর্ঘটনাবশত হয়েছে, প্রথমে আমি চুপিচুপি ছবিগুলো দেখতাম। এরপর বাবা মা বলতেন, ‘চল আজ রাতে সিনেমা দেখতে যাই’, কাজেই একই ছবি এভাবে আবার দেখা হয়ে যেত, আর আমি তো বলতে পারতাম না যে এই ছবি আগে একবার দেখেছি। যাক, এই কারণে একটি চলচ্চিত্র বারবার দেখার অভ্যাস হয়ে গেল- যুদ্ধ শেষের তিন বছরের মাথায় ‘দি র‍্যাভেন’ ছবিটি আমার দেখা হয়ে যায় নয় বা দশবার। কিন্তু ‘কাইয়ে দ্যু সিনেমা’র সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার পর ফরাসি চলচ্চিত্র দেখা বন্ধ হয়ে যায়। পত্রিকার বন্ধুরা, যেমন জাক রিভেত তো ব্যাপারটা অসম্ভব ভাবতো যে আমি ‘দি র‍্যাভেন’ ছবির সব সংলাপ গড়গড় করে বলে দিতে পারতাম, মার্সেল কার্নের ‘দি চিলড্রেন অব প্যারাডাইস’ দেখেছি চৌদ্দবার। 

প্রশ্ন: কিছুক্ষণ আগে আপনি রেনোয়ার দুটি চলচ্চিত্রের কথা বললেন, ডজন-খানেকবার দেখেছেন সেসব ছবি। আপনার উপর রেনোয়ার প্রভাব সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
ত্রুফো: আমি মনে করি, রেনোয়াই একমাত্র পরিচালক যিনি হাতে-কলমে বেশ নির্ভুলভাবে কাজ করেন, চলচ্চিত্রে তিনি কখনো ভুল করেননি। তিনি যদি কখনো ভুল না করে থাকেন, আমার মনে হয়, সেটার কারণ তিনি সবসময় সারল্যের উপর ভর করে সমাধান খুঁজতেন- মানব সমাধান। তিনিই একমাত্র পরিচালক যিনি কখনো ভান ধরেননি। নিজের স্টাইল নিয়ে চিন্তিত ছিলেন না, আর আপনি যদি তাঁর সম্পর্কে জানেন-  দেখবেন সেগুলো বেশ বিস্তৃত, যেহেতু তিনি সব বিষয় নিয়েই কাজ করেছেন- যখন আপনি আটকে যাবেন, বিশেষ করে যারা তরুণ চলচ্চিত্র পরিচালক, তারা শিখতে পারবেন রেনোয়ার কাছ থেকে- কি করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়, রেনোয়ার কাছ থেকে সমাধান আপনি পাবেনই।
রবার্তো রসেলিনি, উদাহরণ দিচ্ছি, একেবারে অন্যরকম। চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে পুরোপুরি তিনি যান্ত্রিক ও প্রযুক্তিগত দিকগুলো এড়িয়ে যেতে পারতেন, এখানে তিনি বেশ শক্তিশালী ছিলেন। ওসব যন্ত্রপাতির কোনো অস্তিত্বই উনার কাছে ছিল না। চিত্রনাট্য নিয়ে তিনি একবার মন্তব্য করেছিলেন, সেখানে দুনিয়ার যত বাড়তি কথা, যেমন- ‘ইংলিশ আর্মি অরলেয়ান্সে ঢুকেছে’, আপনি হয় তো ভাবছেন- ‘ঠিক আছে তাঁর হয় তো অনেক বাড়তি লোক দরকার।’ আপনি এবার ‘জোয়ান অব আর্ক এ্যাট দ্য স্ট্যাক’ (১৯৫৫) দেখুন, সেখানে দেখবেন একটা ছোট্ট সেটের ভেতর গাদাগাদি করে কার্ডবোর্ড দিয়ে বানানো সৈন্য দাঁড়িয়ে আছে। রসেলিনি যখন চলচ্চিত্রে প্রশান্তিভাব আনেন, এমনকি একটি উদ্দেশ্যহীনভাবও আনেন, যেমনটা তিনি করেছিলেন ভারত নিয়ে, সেটা একই সাথে বিস্ময়কর, আবার বর্ণনাতীতও বটে। এই যে চলচ্চিত্রে আড়ম্বর না করা, বিষয়ের প্রতি নম্রতা নিয়ে থাকা, এসবই শেষ পর্যন্ত কাজটাকে মহৎ করে তোলে। রসেলিনির ‘জার্মানি ইয়ার জিরো’ (১৯৪৭) চলচ্চিত্রটি আমার ভাল লাগে, এটার কারণ সম্ভবত, শৈশব বা শিশুকিশোর ভিত্তিক চলচ্চিত্রের প্রতি আমার দুর্বলতা। এটা ছাড়াও রসেলিনিই প্রথম সততার সাথে, প্রায় প্রামাণ্যচিত্রের মত করে বাচ্চাদের তুলে ধরেছেন চলচ্চিত্রে। বাচ্চাদেরকে তিনি গুরুত্ব সহকারে, চিন্তাশীল হিসেবে তুলে ধরেছেন- বাচ্চাদের আশপাশে থাকা বড়দের তুলনায়- ক্যানভাসে যেমন থাকে- ছবির ছোট উপাদান বা পশুতে পরিণত করেননি শিশুদের। ‘জার্মানি ইয়ার জিরো’ ছবিতে বাচ্চাটি নিজের সারল্য ও সংযম প্রদর্শনে ছিল অসাধারণ। এই চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়েই কোনো বাচ্চা সিনেমার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছে, আর এটা হয়েছে এমন এক সময়ে যখন তাদের চারপাশের পরিবেশ ছিল বেশ অস্থির।
রেনোয়ার ভেতর রসেলিনির একটি বৈশিষ্ট্য কিন্তু বেশ স্পষ্ট: কাহিনীচিত্রে যতটুকু পারা যায় জীবনের কাছাকাছি থাকার বাসনা। রসেলিনি তো একবার এও বলেছিলেন, আপনার চিত্রনাট্য লেখার দরকার নাই- একমাত্র শুকরেরাই চিত্রনাট্য লেখে- চলচ্চিত্রে দ্বন্দ্ব হাজির হবে স্বাভাবিক নিয়মেই। একটি নির্দিষ্ট স্থান ও কাল থেকে উঠে আসা চরিত্র মুখোমুখি হবে ভিন্ন আরেক স্থান থেকে উঠে আসা চরিত্রের: আর এখানেই তো, তাদের মধ্যকার স্বাভাবিক দ্বন্দ্ব আপনি আবিষ্কার করবেন, এখান থেকেই শুরু করুন। অন্যকিছু আবিষ্কারের কোনো দরকার নাই। আমি রসেলিনির মত মানুষের দ্বারা খুবই প্রভাবিত- এবং রেনোয়া- যাঁরা সিনেমার জটিলতা থেকে নিজেরদের মুক্ত করতে পেরেছিলেন, যাঁদের জন্য চরিত্র, গল্প কিংবা মূলভাব দুনিয়ার অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। 

প্রশ্ন: আপনার উপর মার্কিন সিনেমার প্রভাব নিয়ে কিছু বলুন।
ত্রুফো: আপনি জানেন, আমাদের অনেক ঋণ, ফ্রান্সে, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেমার কাছে, এটা মার্কিনীরা নিজেরাই জানেন না ভালো করে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ করে শুরুর দিককার সিনেমাগুলো, এগুলোকে এখনকার মার্কিনীরা বিশেষ পাত্তাটাত্তা দেন না, এ বিষয়ে জানেনও না। অথচ ফরাসি নবতরঙ্গের সময় মার্কিন অনেক পরিচালক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, আমার মনে পড়ছে সিডনি লুমেট, রবার্ট মুলিগান, ফ্যাঙ্ক ত্যাশলিন এবং আর্থার পেনের কথা। তাঁরা আমেরিকান চলচ্চিত্রের খোলনলচে পাল্টে দিয়েছিলেন, অনেকটা ফ্রান্সের নবতরঙ্গের সময়কার পরিচালকদের মত। তাঁদের জীবন ছিল ভীষণ সতেজ, তাঁদের প্রথম চলচ্চিত্র, মানে প্রথম দিককার চলচ্চিত্র, যুক্তরাষ্ট্রের সূচনালগ্নের চলচ্চিত্র ছিল সজীব, একইসাথে এই মানুষগুলো ছিলেন দারুণ মেধাবী। তাঁদের চলচ্চিত্র দুই গুণকেই একত্র করতে পারত। একটা সময় পর মার্কিনীরা তাঁদের আর মূল্য দিত না, যেহেতু তাঁরা অতটা পরিচিতি পাননি আর বাণিজ্যিকভাবেও তেমন সফল নন। যুক্তরাষ্ট্রে সাফল্যই সবকিছু, আপনি তো আমার চাইতেও এটা ভালো জানেন। 

প্রশ্ন: ফরাসি নবতরঙ্গ কেন শৈল্পিকভাবে সফল হয়েছিল?
ত্রুফো: নবতরঙ্গের সূচনালগ্নে লোকজন তরুণ নির্মাতাদের নতুন চলচ্চিত্রের সমালোচনা করত, তারা বলত, “সর্বেসর্বা হয়েছে, এ আর এমন ভিন্ন কি, আগেও তো এমন ছবি হয়েছে।” আমি জানি না নবতরঙ্গের পেছনে যদি কোনো পরিকল্পনা থাকত তাহলে কি হত, কিন্তু যতদূর বুঝি, এই নবতরঙ্গ কখনোই সিনেমার বিপ্লব ঘটাতে আসেনি, এমনকি আমার আগের পরিচালকদের থেকে আলাদা করে আমাকে প্রকাশ করার জন্যও আসেনি। আন্তরিকতার ঘাটতি না থাকলে সিনেমা সবসময় চমৎকার এক বিষয়, আমি এভাবেই চিন্তা করেছি। আমিও অন্যদের মত ছবিই বানাবো, তবে তাদের থেকে ভালো বানাবো, এটাই ছিল মনে।
আঁদ্রে মালরু (ফরাসি লেখক ও তাত্ত্বিক) সুন্দর একটা কথা বলেছেন, “সেরা শিল্পকর্ম উৎকৃষ্ট আবর্জনা নয়।” (কিন্তু আবর্জনা বা বাজে ছবি আরেকটু ভালো করে বানালেই সেটা শিল্পে উন্নীত হয় বলে মনে করতেন ত্রুফো) এখনো আমি মনে করি, ভালো চলচ্চিত্র হল খারাপ চলচ্চিত্রকেই আরেকটু ভালো করে বানানো। ঘুরিয়ে বললে, আনাতোল লিতভাকের ‘গুডবাই এ্যাগেইন’ (১৯৬১) আর আমার ‘দ্য সফট স্কিন’ (১৯৬৪) ছবির মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখি না। একই জিনিস, একই চলচ্চিত্র, শুধু ‘দ্য সফট স্কিন’ ছবিতে যারা অভিনয় করেছেন তাদেরকে চরিত্রগুলো মানিয়েছিল। আমরা সত্যি সত্যি ঘণ্টা বাজাতে পেরেছিলাম, কমপক্ষে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু অন্য ছবিতে যা হয়, ঘণ্টা বাজে না ঠিকঠাক ভাবে, কারণ ওটা ইনগ্রিদ বেরিম্যান বা এ্যান্থনি পারকিন্স অথবা ইভ মঁতাঁর জন্য যুৎসই চলচ্চিত্র ছিল না। কাজেই “গুডবাই এ্যাগেইন” শুরু থেকেই এক মিথ্যার উপর ভর করে এগিয়েছে। নবতরঙ্গে নতুন ও ভিন্ন ধরনের সিনেমা বানানোর ভাবনা ছিল না, কিন্তু বাস্তবকে সত্যি সত্যি তুলে ধরার প্রয়াস ছিল। যখন চলচ্চিত্র বানানো শুরু করি তখন এটাই ছিল মাথার ভেতর। জঁ দোলানয়ের “দ্য লিটিল রেবেলস” (১৯৫৫) ছবির চেয়ে “দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ” (১৯৫৯) তেমন বিশাল ভিন্ন কিছু নয়। এ দুটো একই, যে কোনো বিচারে বেশ কাছাকাছি। আমি আমারটা বানাতে চেয়েছি কারণ আমি অন্যটার কৃত্রিমতাকে পছন্দ করিনি- এটুকুই।

প্রশ্ন: আমরা জানি, আপনি পরিচালক হওয়ার আগে চলচ্চিত্র সমালোচক ছিলেন। আপনার প্রথম প্রবন্ধ কোন চলচ্চিত্রকে নিয়ে ছিল?
ত্রুফো: চার্লি চ্যাপলিনের “মডার্ন টাইমস” (১৯৩৬), ফিল্মক্লাবে একটি পুরনো প্রিন্ট দেখেছিলাম ছবিটার। পরে পুলিশ অবশ্য ওই কপিটা নিয়ে নেয়, কারণ ওটা চুরি করা কপি ছিল! এরপরই আমি কাইয়ে দ্যু সিনেমায় লেখা শুরু করলাম, ধন্যবাদ আঁদ্রে বাজাঁকে। জঁ অরেঁস ও পিয়ের বোসদের মত যারা চিত্রনাট্য লিখতেন, ফরাসি চলচ্চিত্রের ফসিল, তাদের একঘেয়ের কাজের উপর কাইয়ে পত্রিকায় আগুন লাগানো এক প্রবন্ধ লিখে ফেলি সেসময়। এই এক প্রবন্ধের জোরে আমি কাজ পেয়ে যাই সাপ্তাহিক শিল্প ও বিনোদন পত্রিকায়। সেখানে আমি টানা চার বছর চলচ্চিত্রের উপর কলাম লিখেছি। 
আমি মনে করি চলচ্চিত্র সমালোচক হওয়ার বিষয়টি আমাকে সাহায্য করেছে, কারণ এই কারণে আমি চলচ্চিত্রকে ভালোবেসেছি, প্রচুর চলচ্চিত্র দেখাও হয়েছে এ কারণে। আপনি যদি চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখি করেন তো সেটা আপনাকে চলচ্চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে অনেক সহায়তা করবে। এই লেখালেখিটা বুদ্ধিচর্চায় আপনাকে বাধ্য করবে। আপনি যখন একটি চিত্রনাট্যকে দশ লাইনের সারসংক্ষেপে পরিণত করেন, তখন ওই চিত্রনাট্যের সবল ও দুর্বল দুই দিকই ধরা পড়ে। সমালোচনা ভালো চর্চা, কিন্তু এই কাজ আপনার বেশিদিন করা ঠিক নয়। ফিরে দেখলে দেখি, আমার সমালোচনাগুলোর বেশিরভাগই নেতিবাচক, ওগুলোতে প্রশংসার বদলে নিন্দা করার প্রবণতাই ছিল অধিক; আমি কারও পক্ষে লেখার চাইতে আক্রমণেই ছিলাম বেশি সাবলীল। এবং এটা নিয়ে এখন আমার আক্ষেপ হয়। আমি এখন আর ওরকম উদ্ধত নই। তবে সমালোচনামূলক অভিব্যক্তি আমার ভালো লাগে। 

লে মিসতোঁ  প্রশ্ন: আপনি চার বছর যাবৎ চলচ্চিত্র সমালোচনা করেছেন, কিন্তু এর ফাঁকেই আপনি চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগ খুঁজছিলেন, তাই না?ত্রুফো: হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই। আমি তখন ১৬ মিলিমিটারে ছোট ছোট ছবি বানানো শুরু করেছিলাম, ওগুলো অবশ্য দেখানোর মত কোনো কাজ নয়। অপেশাদার কাজে যতরকম ত্রুটি থাকে তার সবটাই ওসব ছবিতে ছিল, অতিশয় ভণিতাও হাজির ছিল সেসব কাজে। কোনো গল্প ছিল না, গল্প না থাকাটাই সেসময় অপেশাদার নির্মাতাদের একটা অহমিকার মত ব্যাপার ছিল। বোধহয় এখান থেকেই আমি কিছু শিখেছি, যেমন কিছু দেখানোর বদলে কি করে পরামর্শ দেয়া যায়। প্রথমদিককার এসব কাজে তেমন কিছুই ছিল না, শুধু দরজা বন্ধ আর দরজা খোলা ছাড়া- সময় আর শ্রমের কি অপচয়!আমার আসল ছবি, ১৯৫৭ সালে, নাম ছিল “লে মিসতোঁ”, ইংরেজিতে “দি মিসচিফ মেকার্স” (বাংলায় ‘দুষ্টু ছেলের দল’)। এই ছবিতে গল্প ছিল, সেসময় কিন্তু স্বল্পদৈর্ঘ চলচ্চিত্রে গল্প বলার চল তেমন একটা ছিল না!  আর এই ছোট ছবির সুবাদেই আমি অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়ে যাই। কিন্তু “লে মিসতোঁ” ছবিতে সংলাপের সঙ্গে ধারাভাষ্যও যোগ করেছিলাম কিছু জায়গায়, একারণে নির্মাণ প্রক্রিয়াও অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। আর ছবিটারও ভাগ্য ছিল বলতে হবে। ব্রাসেলসের এক উৎসবে ছবিটি পুরস্কার পেয়েছিল, যদ্দুর মনে পড়ে। ম্যুরিস পোঁয়ের গল্প অবলম্বনে বানিয়েছিলাম “লে মিসতোঁ”, এ ছবির চিত্রনাট্যটি মৌলিক ছিল না। একটা ধারাবাহিকের সূচনা হিসেবেই গণ্য করেছিলাম চিত্রনাট্যটি। তিনটা বা চারটা ভিন্নভিন্ন ছোট দৈর্ঘ্যের ছবির জন্য তখনও যেমন পয়সা পাওয়া যেত, এখনও পাওয়া যায়, কিন্তু পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্রের জন্য আর্থিক যোগান পাওয়াটা সহজ নয়। এটা বুঝে আমি পরিকল্পনা করি একটা বিষয়, যেমন শৈশবকে কেন্দ্র করে কয়েকটি গল্প সাজিয়ে ফেলতে হবে। আমার এরকম পাঁচটা না ছয়টা গল্প তৈরি ছিল। আমি “লে মিসতোঁ” দিয়ে শুরু করলাম, কারণ ওটা শুট করা আমার জন্য সহজ ছিল। যখন ছবির কাজ শেষ হল, পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারলাম না, কারণ চলচ্চিত্রে সাহিত্যের গন্ধটা ছিলই। বিষয়টা খুলে বলছি: “লে মিসতোঁ” হল পাঁচ বাচ্চার গল্প, ওরা তরুণ প্রেমিক প্রেমিকার এক জুটির উপর নজরদারি করে। এই বাচ্চাদের নির্দেশনা দিতে গিয়ে আমি লক্ষ্য করলাম, মেয়েটির প্রতি ওদের কোনো আগ্রহ নেই, মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জেরার্ড ব্লাঁয়ের স্ত্রী বের্নাদেত লাফোঁ। লাফোঁর স্বামী ব্লায়ের প্রতিও ঈর্ষা কাজ করছিল না ছেলেদের। ওদেরকে বানোয়াট হলেও ঈর্ষান্বিত করতে হয়েছে, এই বিষয়টা পরে আমাকে খুব ভাবিয়েছে। আমি নিজেকে পরে বললাম, যদি আবার কখনো বাচ্চাদের নিয়ে ছবি বানাই, তাহলে তাদের জীবনঘনিষ্ঠ ছবিই বানাবো, সেখানে যতটুকু সম্ভব কল্পকাহিনী অল্পই যোগ করব।

প্রশ্ন: একজন লেখক-পরিচালকের জন্য প্রথমে সমালোচক হওয়া কি একটু বেমানান? যখন আপনি কোনো দৃশ্য শুট করতেন, তখন কি আপনার সমালোচক সত্তা আপনার ঘাড়ে চেপে বসত, বলত: ‘এটা কি ঠিক হচ্ছে?’
ত্রুফো: নিজের ভেতর একটা অস্বস্তি কাজ করে বৈকি, কারণ আমি শুধু সমালোচকই ছিলাম না, প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি চলচ্চিত্রও দেখেছি। কাজেই আমি সবসময়ই ভাবতাম, ‘এই কাজটা তো ওমুক-ওমুক সিনেমায় করা শেষ’, ‘পর্নো ছবির চেয়েও এটা খারাপ হয়েছে’, ইত্যাদি। তাছাড়া আদৌ এটার গুরুত্ব থাক, না থাক, কাহিনীসূত্র ঠিকঠাকভাবে এগুচ্ছে কি না, সেটা নিয়ে আমার সংশয় কাটতো না। আমি সারাক্ষণই একটা চিত্রনাট্যকে কাটাছেঁড়া করতে থাকতাম মাথার ভেতর, হয় তো একটা দাঁড় করালাম, শেষ মুহূর্তে দেখ গেল সেটা আর ক্যামেরাবন্দি করতে চাচ্ছি না।

প্রশ্ন: তাহলে কিভাবে একটি চলচ্চিত্রের কাজ শেষ করতেন?
ত্রুফো: উপন্যাসের উপর সিনেমা বানালে, উদাহরণস্বরূপ বলছি, আপনি চাইলে চলচ্চিত্র বানানো দুম করে বন্ধ করে দিতে পারবেন না। যন্ত্রপাতি যখন চালু হয়ে যায়, চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে যায়, তখন চাইলেই কাজ বন্ধ করে দেয়া যায় না। আর আমি অভিনেতাদের খুব পছন্দ করি, অন্তত কয়েক জন আছে- যাদের আমার ভালো লাগে, তাদের সঙ্গে কথা দিলে সেটা তো রাখতে হয়, তারাই হল কথা না ভাঙার অনুপ্রেরণা। কিন্তু একবার যখন আপনি শুরু করে দিলেন, ওই ধরনের সমস্যা আসলে দূর হয়ে যায়, ওই যে কাহিনীসূত্র নিয়ে সন্দেহপ্রবণতা, এ ধরনের সন্দেহ করা কিন্তু স্বাভাবিক ব্যাপার। তখন শুধু ছবি বানানোর যে প্রতিদিনকার ঝক্কি সেটাই থাকে। সেগুলো পুরোপুরি প্রযুক্তিগত সমস্যা, আর সেসব হাসিখেলার মধ্যেই সমাধান হয়ে যায়- বিষয়টি কিন্তু বেশ আনন্দের। যখন শুটিং শেষ, তখনও কিন্তু ওসব সন্দেহ ফিরে ফিরে আসে।

প্রশ্ন: ‘দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’ ছবির চিন্তা কখন এলো?
ত্রুফো: ‘লে মিসতোঁ’ ছবির শুটিং যখন করছি, তখন থেকেই ‘দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’ (বাংলায় বলতে পারেন ‘চারশো আঘাত’) আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে, তখন ছবির নাম ঠিক করে রেখেছিলাম ‘আন্তোয়ান রানস আওয়ে’।

(আংশিক)

 

দ্রষ্টব্য : সাক্ষাৎকারে প্রথম বন্ধনীর ভেতরকার কথাগুলো অনুবাদকের।

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১২:৫১

মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬) লেখক পরিবার থেকেই এসেছিলেন। পিতৃমাতৃ—দুকূলই লেখক ছিলেন। এমনকি শ্বশুরকূলও। পুরুষানুক্রমেই এঁরা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মহাশ্বেতা দেবীর জীবনটা সাহিত্যের কাছেই সঁপে দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন দুহাত খুলে। ‘হাজার চুরাশির মা’ (১৯৭৪) তার অন্যতম আলোচিত উপন্যাস। গ্রন্থখানির পাঠপরিক্রমায় কিছুটা সাবধানী মনে এগুতে হয়। মাঝেমধ্যেই নিত্যনতুন চরিত্রের দেখাসাক্ষাৎ ঘটে। সিংহভাগ চরিত্রই দিব্যনাথ-সুজাতা পরিবারের। উপন্যাসখানি বুঝে নিতে চাইলে এদের মধ্যকার পারষ্পারিক সম্পর্ক স্মরণে রাখা খুবই জরুরি। পরিবারটি অনেকটা উনিশ শতকের ক্লাব-কালচারের ন্যায় সামন্তধারায় গড়ে ওঠে। ভোগবাদী প্রবৃত্তি এদের মধ্যে তীব্রতর। দিব্যনাথের নিজস্ব ‘চার্টার্ড অ্যাকাউনটেনসির আফিস।’ প্রতিনিয়ত মোটা টাকা আসে। জ্যোতি, নীপা অথবা তুলির স্বামীরাও কর্পোরেট কর্পোরেশনে হাই সেলারির জব করে। সবাই ভোগবিলাসে মত্ত। এদের চারিত্রিক স্খলনও কম নয়। অফিসের টাইপিস্ট মেয়েকে নিয়ে দিব্যনাথের ঢলাঢলি, মাঝেমধ্যেই রক্ষিতা নিয়ে বাইরে সান্ধ্য কাটানো। ঢেকেঢুকে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে সর্বসম্মুখে সহাস্যে এসব ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়। এসব সে পৌরুষ-অধিকার বলেই জানত। কেবল বর্তমান নয়, চিরকালই দিব্যনাথ নারী নিয়ে নোংরামি করে আসছে। শাশুড়িও কম প্রশ্রয় দেয়নি। ছেলে তার ‘পুরুষ বাচ্চা’, স্ত্রৈণ নয় বলে অহংকারও করত। দিব্যনাথের পিতাও নাকি যৌবনকালে এমনই ছিল। প্রায়শই সন্ধ্যাবেলা নারী নিয়ে বাইরে কাটাত। পরপর দুই পুরুষের নৈতিক অধঃপতন তৃতীয় পুরুষ জ্যোতি অথবা নিপাদের কাছেও সমভাবেই সমর্থন পায়। সামন্ত প্রভুর ন্যায় দিব্যনাথ নিজেকে পরিবারের ‘বস’ বলে বিবেচনা করত। সন্তানেরা অনেকেই ইনিয়েবিনিয়ে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে বাবাকে ‘বস’ বলেই সম্বোধন করত। এমনকি কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতীও। তবে এই সন্তানের মেজাজটা ছিল খানিকটা ভিন্ন ধার ও ধারার।

২.
অর্থবিত্তে স্বচ্ছল হলেও পরনারীতে অভ্যস্থ হওয়ায় দিব্যনাথ-সুজাতার দাম্পত্য-সম্পর্ক সুখের ছিল না। দিব্যনাথ সুজাতাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতো না। বরং যৌন পার্টনার হিসেবেই বিবেচনা করত। অসুখবিসুখ হলে খোঁজখবর নিত না। নবজাতকের কান্না থেকে বাঁচার জন্য তেতলায় ঘুমাত। প্রসূতি স্ত্রী থেকে দূরে অবস্থান করত। শাশুড়িমাও ছিল নারীবিদ্বেষী মহিলা। সুজাতার সন্তান জন্মদান সইতে পারত না। প্রসবকাল দেখলেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেত। তীব্র প্রসবযন্ত্রণা নিয়ে সুজাতাকে একা একাই নার্সিং হোমে যেতে হতো। দিব্যনাথের নজর কেবল একদিকে—‘আবার মা হবার যোগ্য শরীর হচ্ছে কি না সুজাতার।’ দুবছর পরপর সুজাতার চার সন্তান জন্মে। জ্যোতি, নীপা, তুলি। সর্বশেষ ব্রতী। প্রথম ও শেষে পুত্রসন্তান, মাঝখানে দুটি কন্যাসন্তান। ব্রতীর দুবছর বয়সকালে সুজাতা লম্পট দিব্যনাথের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেছিল। লেখকের ভাষায়—দিব্যনাথ কিছুতেই ওঁকে পঞ্চমবার ‘মা’ হতে বাধ্য করতে পারেনি। দিব্যনাথ সুজাতাকে ফার্মের কাজ ছেড়ে দিতে বলেছিল। সুজাতা মানেনি। ‘কাজ না-ছাড়া সুজাতার দ্বিতীয় বিদ্রোহ।’ 
বাবামায়ের মধ্যকার এই টানাপড়েন ব্রতী খানিকটা বুঝতে পারত। বুঝতে পারত মাতৃবক্ষের সুগভীরে লুকানো তীব্র গোপন ব্যথা। ব্রতীর মনটা কম্পাসের কাটার ন্যায় মমতাময়ী মাতা জগজ্জননী সুজাতার দিকে হেলে থাকত। ব্রতী সর্বদা মায়ের ওপর চোখদুটো সুস্থির রাখত। দশ বছর বয়সেও খেলাধুলা ফেলে বাড়ি চলে আসত। শিয়রে বসে মায়ের মাথায় বাতাস করত। এজন্য দিব্যনাথ ব্রতীকে সইতে পারত না। কনিষ্ঠ সন্তান হলেও শত্রু বিবেচনা করত। ব্রতীকে টিপ্পনি কেটে দিব্যনাথ কখনো বলত ‘মাদার্স চাইল্ড’ কখনো বলত ‘মেয়েমার্কা ছেলে। নো ম্যানলিনেস।’                 
মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে এই পুঁজিবাদী পরিবারের চরিত্রগুলো দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে পারিবারিক ‘বস’ দিব্যনাথ ও জ্যেষ্ঠ তিন সন্তান জ্যোতি, নীপা, তুলি। সেইসঙ্গে এদের পূর্বপ্রজন্ম ঠাকুরমাও। অপরদিকে সুজাতা ও তার কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতী। এই দ্বন্দ্ব কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমসাময়িক সমাজ অথবা রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব। এমনকি বৈশ্বিকও। বিশ্বজগৎ সংসার তখন ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দুধারায় দ্বিধাবিভক্ত। দ্বন্দ্বটা এতই জটিল ছিল যে, ভাই-বোন, পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীর সমুদয় সামাজিক ও আত্মিক বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। এমনকি রক্তের বন্ধনও।
 
৩.
দিব্যনাথপুত্র ব্রতী পিতার পুঁজিবাদী আদর্শে আস্থা হারিয়েছিল। আস্থা হারিয়েছিল সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থাপনায়। আস্থা হারিয়েছিল মুনাফাখোর ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্ধ নেতাদের ওপর। পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থার স্বপ্ন লালন করত। সমতাভিত্তিক একটি সুন্দর সুষম সমাজ বিনির্মাণের লক্ষে হৃদয় তার জেগে উঠেছিল। লেখকের ভাষায়, তখন সত্তর দশক। মুক্তির কাল। মুক্তির দশকে জনমুক্তির আন্দোলনে অনেকটা সংগোপনেই সংযুক্ত হয়েছিল ব্রতীরা। তখন সাম্রাজ্যবাদী শোষক সরকার ক্ষমতায়। জেলের পাঁচিল উঁচু করে। নতুন নতুন ওয়াচ টাওয়ার বসায়। বন্দিদের জন্য ফটকঅবন্দি খোলে না। সুগভীর রাতে ভ্যানভর্তি বন্দি এলে লেখকের ভাষায়—‘ওপর থেকে ক্রেন নামে। জন্তুর মত বন্দীকে যন্ত্রের নখে আঁকড়ে ক্রেন উঠে যায়, জেলের ভেতর নামিয়ে দেয়।’ জন্তুর মতো হলেও যারা জেলে যায়, তারা অন্তত প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু বাইরের ব্রতীরা নিদারুণভাবে প্রাণটা হারায়। রাষ্ট্রযন্ত্র নানা উপায়ে নির্মম নির্যাতন অব্যাহত রাখে। নির্জন সলিটারি সেলে নির্যাতন চালায়। লেখকের ভাষায়—‘সাউন্ডপ্রুফ। দরজা-জানালায় ফেলটমোড়ানো ফাঁপা রবারের নল বসিয়ে সাউন্ডপ্রুফ করা। ঘরের আর্তনাদ, গোঙানি, মারের আওয়াজ, জেরাকারীর গর্জন, সব শব্দ ঐ নলের জন্য ঘরের ভেতরেই বন্দী থাকে।’

৪.
বিজিত, প্রার্থ, লালটু, সমু ব্রতীর বিপ্লবী বন্ধু। এরাও চেয়েছিল স্বসমাজটিকে বদলে দিতে। সহযোদ্ধা বন্ধুদের বাঁচাতেই সেদিন ব্রতী গিয়েছিল সমুদের বাড়িতে। কিন্তু বাঁচাতে পারেননি। নিজেও বাঁচতে পারেনি। গভীর রাতে সমুদের বাড়ি ঘেরাও করে গুন্ডারা। হিংস্র গলায় বলে—‘বের করে দিন, লয়তো ঘরে আগুন দিমু!’ ব্রতীর কণ্ঠ শুনে কেউ একজন বলে ওঠে—‘হালায় আরেক মালটারে জুটাইছে। বাইর হ ঘটির পোলা।’ হাতে হাত রেখে স্লোগান দিতে দিতে ব্রতীরা বেরিয়ে আসে। বাইরে অন্ধকার। ঘুটঘুটে আধার মুখ হাসি-উল্লাসে ফেটে পড়ে। ভয়ংকর গন্ডগোল। ‘বাড়ী বাড়ী আলো নিভে যাচ্ছে, দরজা জানালা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চমকে সরে যাচ্ছে ভয়চকিম মুখ।’ সহসা স্লোগান থেমে যায়। সমবেত ঘাতকেরা খটখট গুলির শব্দ করতে করতে চলে যায়। সমুর দরিদ্র বাবা থানায় গেলে আততীয়দের নাম শুনে ধমকে ওঠে পুলিশ। পুলিশভ্যান আসতে আসতে সরে যায় ঘাতকেরা। নিতু ওরফে দীপুর মতো ভদ্রছেলেকে তো থানার সামনেই পিটিয়ে হত্যা করে। ‘প্রকৃত খুনি কখনো বন্দুক ধরে না।’ ব্রতী-সমুদের হত্যা-পরিকল্পনাকারীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এমনকি প্রত্যক্ষ ঘাতকদেরও বিচার হয় না। বুক ফুলিয়ে এরা নির্বিবাদে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। সমুর দিদিকে দেখে নির্মম ব্যঙ্গ করে, হাহা করে হাসে আর বলে—‘তর ভাইয়ের ছাদ্দ করলি না ক্যান? ভাল কইরা খাইতাম!’ সুজাতার মনে কত প্রশ্ন—যে শহরে এমন সব জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়, সেখানে পরপর কী করে সংস্কৃতিমেলা, রবীন্দ্রমেলা অনুষ্ঠিত হয়?

৫.
সুজাতা টেলিফোনেই ব্রতী হত্যার খবর পায়। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে—‘কাটাপুকুরে আসুন।’ পিতা দিব্যনাথ কাটাপুকুরে না গিয়ে দৌড়ায় পত্রিকা-অফিসে। পুত্রহত্যার খবর ধামাচাপা দিতে দিব্যনাথ ‘দড়ি টানাটানি করে বেড়াচ্ছিলেন।’ সফলও হয়েছিলেন। লেখক বলছেন—‘দিব্যনাথের ছোটাছুটি দড়ি টানাটানি সফল হয়েছিল। পরদিন খবরের কাগজে চারটি ছেলের হত্যার খবর বেরোয়। নাম বেরোয়। ব্রতীর নাম কোন কাগজে ছিল না।’ পত্রিকাপাতা থেকে ব্রতীকে মুছে দিয়েছিল দিব্যনাথ। মুছতে পারেনি মর্গ থেকে। সেখানে  ব্রতীর অবস্থান ‘হাজার চুরাশি’ নম্বরে। সেদিন ব্রতীর মৃত্যু পিতার কাছে কলঙ্কজনক মৃত্যুরূপে বিবেচিত হয়েছিল। মমতাময়ী মা সুজাতা সুস্থির থাকতে পারেননি। ছুটে গিয়েছিলেন কাটাপুকুরের লাশ ঘরে। প্রাণধন পুত্র ব্রতীর মৃত্যু নিয়ে কোথাও একটু সংশয় ছিল। তাই মুখটুকু দেখতে চেয়েছিলেন। অসীম করুণায় ডোম জানিয়েছিল—‘কি আর দেখবেন মাইজী? মুখ কি আর আছে কিছু?’ সীমাহীন মমতায় সুজাতা সবলে ব্রতীর মুখের আবরণ সরিয়ে দেয়। ‘শানিত ও ভারী অস্ত্রের উলটো পিট দিয়ে ঘা মেরে থেঁতলানো, পিষ্ট, ব্রতীর মুখ।’ আঙুল বোলানোর মতো ইঞ্চি পরিমাণ জায়গাও মসৃণ ছিল না। সবই দলিত, মোথিত, থেঁতলানো। তবু সুজাতা ব্রতী! ব্রতী! বলে আঙুল বোলায়। 
ব্রতীদের অপরাধ, ওরা দেয়ালে দেয়ালে বয়ান লিখত। ওরা লাল অক্ষরে লাল শব্দে দেয়াল রঙিন করে তুলত। কেবল মুক্তকণ্ঠে সমবেত স্লোগানই ধারণ করত না, প্রাণভরে বিশ্বাসও করত। দেবীর ভাষায়—‘ব্রতীরা এই এক নতুন জাতের ছেলে। স্লোগান লিখলে বুলেট ছুটে আসে জেনেও ব্রতীরা স্লোগান লেখে। কাটাপুকুর যাবার জন্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয়।’ ব্রতীরা এতটাই সমাজবিরোধী যে, দিব্যনাথের ন্যায় পিতারা মুখাগ্নিও করতে আসে না। ব্রতীদের লাশ কাটাপুকুরের মর্গে পড়ে থাকে। রাতে পুলিশ গাদাগাদি করে শ্মশানে বয়ে আনে। এরপর আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। শ্রাদ্ধে বিশ্বাসীজনও যথানিয়মে শ্রাদ্ধ করার সুযোগটুকুও পায় না। স্ফীত লাল চোখে বসে থাকতে হয় সারাটা দিন।

৬.
নকশাল আন্দোলনকে (১৯৭০) কেন্দ্র করে মহাশ্বেতা দেবী উপন্যাসটির আখ্যানভাগ সাজিয়েছেন। কল্পনার সঙ্গে সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতার দরকারি সমন্বয় ঘটয়েছেন। সেই সঙ্গে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তির সংগ্রামে (১৯৭১) কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা ‘বাংলাদেশের সহায় ও সমর্থনকল্পে পশ্চিমবঙ্গ তোলপাড় করে ফেলেছিল।’ কিন্তু নকশাল আন্দোলনের হত্যাকাণ্ড তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি অথবা এরমধ্যে পৈশাচিকতা খুঁজে পাননি। যদি পেতেন, ‘তাহলে ত কলকাতার কবি ও লেখক ওপারের পৈশাচিকতার সঙ্গে এপারের পৈশাচিকতার কথাও বলতেন।’ কিন্তু বলেননি। মূলত প্রান্তজনের বেঁচে থাকার লড়াই, লড়াই শেষে নিদারুণ পরিণতিই তুলে আনতে চেয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী। দেবীর গদ্যশেলীতে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও অসীম মমতায় সেটি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। উপন্যাস হয়ে উঠছে উপভোগ্য সেইসঙ্গে সাব-অলটার্ন হিস্ট্রির দরকারি দালিলিক শিল্পকর্ম। ২৮ জুলাই প্রয়াণদিবসে লেখকের প্রতি অশেষ প্রণতি।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১৮:৩৬

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা। কাঁটাবনে অবস্থিত প্রকাশনা সংস্থা ‘উজান’ এমন ঘোষণা দিয়েছে তাদের প্রকাশিত ‘কোরিয়ার কবিতা’ ও ‘কোরিয়ার গল্প’ নিয়ে আলোচনার জন্য।
এই বই দুটিতে রয়েছে কোরিয়ার বিশ ও একুশ শতকের উল্লেখযোগ্য কবিদের কবিতা এবং একই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিকদের ছোটগল্প। 
উজানের এই আয়োজনে সহযোগিতা করছে লিটারেচার ট্রান্সলেশন ইনস্টিটিউট অব কোরিয়া। 
বই আলোচনার সর্বোচ্চ পুরস্কার ২০ হাজার টাকা। এছাড়া দ্বিতীয় পুরস্কার ১৫ হাজার এবং তৃতীয় পুরস্কার ১০ হাজার টাকা। এই প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত সর্বোচ্চ ১০ আলোচকের প্রত্যেককে দেওয়া হবে ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের বই। 
আলোচনাগুলো বাছাই করবেন দেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও অনুবাদকদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারক কমিটি। একজন একটি বই নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন। আলোচনা বাংলাভাষায় লিখিত বা ভিডিও মাধ্যমে হতে হবে। 
অংশগ্রহণে ইচ্ছুক অনলাইনে ফরম পূরণ করতে করতে পারবেন এসব লিংকে www.ujaninfo.com, www.porospor.info। ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আলোচনা জমা দিতে হবে [email protected] এ।
বিস্তারিত জানতে এবং বই সংগ্রহ করতে পারবেন www.ujaninfo.com, www.facebook.com/UjanPrakashan, https://www.facebook.com/UjanBooks থেকে।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

কথা হয় জানি না 

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২১, ১৯:৪৪

কিছু ছবি এখনও আছে বলে কথা বলার দু-একটা মানুষ পাওয়া যায়>প্রতিবার মেঘ হলে মেঘমল্লার শুনে বৃষ্টি ভোলা যায় না>নিহত পশুররক্ত আর মাংস বাতাসে>দুঃখ আছে বলে কয়েকটা কবিতা এরপরও লেখা হবে>সকালগুলো ঘুমিয়ে কাটে বলে আর অপরাধবোধ জাগে না>রাত পেয়ে যাই>বাতাস কিন্তু ঘুরে যাচ্ছে>সময়ে সব বদলায় এ তত্ত্ব এখনও প্রমাণের চেষ্টা চলে>ঘরের মধ্যেও এক নেশা আসে বাইরেও এক নেশা যায়>নেশা>হেই হ্যালো, আমি হাস্নাহেনার গন্ধও পাচ্ছি>মাংসের গন্ধের সাথে>ছবি কিন্তু সব কথার উত্তর দেয়>হুহু করে উত্তর>থেকে বাতাস আসবে দুমাস পরেই>যদি বলি ছবিকে, কী, সে পাল্টা প্রশ্ন করে না>যদি বলি, কেন ও ইত্যাদি, পাল্টা প্রশ্ন করে না>যার যা উত্তর তা বুঝিয়ে দেয় আজকাল প্রতি রাতেই প্রায়>উত্তর পেতে পেতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে…>চরাচরে পাখি থাকলে বলে দিয়ো তাদের পাখায় আর কোনো শব্দ নেই>তাদের ওড়ায় আর কোনো নীরবতা নেই<

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বোকা দুপুরের নাম

বোকা দুপুরের নাম

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২১, ১২:১৮

বিকালের মেঘ ভেদ করে ঠোঁটজুড়ে আসে স্নিগ্ধ জলধারা। বহমান শান্ত জীবনের স্তুতি। তিনি হেসে চলেন, মন মাতানো মুগ্ধতা ছড়ায় চারপাশে। কংক্রিট শহরের মিহি আলোর অডিটোরিয়ামে মানুষ মানুষের বিশ্বস্ত চোখ খোঁজে। স্বপ্ন দেখে সরল বৈভবহীন জীবনের। যে স্বপ্নের স্পন্দন এখন ছড়িয়ে গেছে সমস্ত বাংলাদেশে। মঞ্চে যিনি অনর্গল কথা বলছেন সেই ‘আলোকিত মানুষ’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। বাগ্মী এ মানুষটির জীবন বহু কাজে বহু সৃষ্টিতে উদ্ভাসিত।

তাঁকে বুঝতে হলে তাকাতে হবে তাঁর অজস্র সৃষ্টিশীল বইয়ের দিকে, পাঠ নিতে হবে তাঁর আত্মজৈবনিক বইয়ের সরস বয়ান। জানতে হবে তাঁর ব্যাপক কর্মজীবন সম্পর্কে। চোখ খোলা রেখে আমাদের নিবিষ্ট হতে হবে সবুজ নিসর্গ, মানুষের কাছাকাছি বাংলার শ্যামল প্রান্তরে, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যে। সেই প্রকৃত সত্য খুঁজতে গিয়ে যন্ত্র বা নাগরিকতার ছোবলে যেখানে তাঁর হৃদয়ও আশাহত হয়েছে।

তিনি কবিতায় উচ্চারণ করেছেন―

একা একা টের পাই চারপাশে―আকাশে ও নিচে―
অবিশ্রান্ত আর্তনাদে ভেঙে যায় বহুদিনকার
ধানভানানীর গান এদেশের, পাটক্ষেত, বেহুলার ঘর―
ঢেঁকির পুরনো গল্প, সাপ, ঝোপ, দোয়েলের দেশ―
বাংলাদেশের আবহমানের।
(শাব্দিত কলঘর, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ২০)

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, জন্ম ২৫ জুলাই ১৯৩৯ সালে। অবিভক্ত ভারতে কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায়। পিতা সেময়কার স্বনামধন্য অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও নাট্যকার আযীম উদ্দীন আহমেদ, মাতা করিমউন্নেসা বেগম। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলায়। দেশভাগের পর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ পরিবারের সাথে চলে আসেন তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে। পিতার চাকরি সূত্রেই তার শৈশবের কিছু সময় কাটে টাঙ্গাইলের করটিয়ায়। সেখানকার বংশী নদী তাঁর শৈশবের মনোহর চিন্তায় দারুণভাবে গেঁথে আছে। তাঁর আত্মজৈবনিক বই বহে জলবতী ধারা প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, নিষ্ফলা মাঠের কৃষক ইত্যাদি তাঁর বহমান জীবনের নানান অভিজ্ঞতা, জীবন গল্পের সুনিপুণ বৃত্তান্ত। পিতার নাট্যচর্চা ও কবিতার খেয়াল তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করত। কলেজে পড়া অবস্থায় বুঁদ হয়েছেন কবিতায় ও সরল জীবনের দর্শনে। মূলত তার ব্যাপ্তিময় জীবনের ভিতটা সেসময়ই রচিত হয়েছিল। কলেজজীবনে তার কিছু শিক্ষকের অবদানও এক্ষেত্রে স্বীকার্য। কলেজজীবনেই তিনি ভ্রমণ করেন ইংরেজি কবিতা ও বাংলা কবিতার অপার সৌন্দর্যের ভূমিতে। যা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৬১ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে যোগদানের মধ্যদিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়। যা অব্যাহত ছিলো ১৯৯২ সাল পর্যন্ত। হরগঙ্গা কলেজ ছাড়াও শিক্ষকতা করেছে সিলেট মহিলা কলেজ, রাজশাহী কলেজ, ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজ (বর্তমানে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ) এবং সর্বশেষ ঢাকা কলেজে দীর্ঘসময় অধ্যাপনার পর অবসর গ্রহণ করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে বাংলা পড়াতেন। অধ্যাপক হিসেবে তার সফলতা ও জনপ্রিয়তা ছিল গগনচুম্বী। মূলত তাঁর সকল কাজের মাধ্যমেই তিনি মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। উজাড় করে দিয়েছেন সবটুকু। শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিজের কথায়―

আমি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলাম। সাহিত্যের স্বপ্ন ও সৌন্দর্য আজীবন আমার চেতনা-জগতে যে-হীরের দীপ্তি ছড়িয়েছে আমি সেই উজ্জ্বলতাকে ছাত্রদের ভেতরে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছি। তাদের সেই আনন্দে উজ্জীবিত করতে চেয়েছি। পরীক্ষায় ছাত্রদের বেশি নম্বর পাওয়াবার জন্যে পরিশ্রম করে জীবন নিঃশেষ করাকে আমার কাছে ‘দুর্লভ মানবজন্মে’র অপচয় বলেই মনে হয়েছে। জীবন কত দীপান্বিত ও জ্যোতির্ময় তা একজন ছাত্র সবচেয়ে ভালো করে জানতে পারে তার জীবনে দীপান্বিত শিক্ষকদের কাছ থেকে। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১১)

বর্তমান সময়ের শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে স্পষ্ট কথা বলতেও এ সফল অধ্যাপক দ্বিধা করেননি। প্রসঙ্গক্রমেই তিনি লিখেছেন―

আজ দেশের স্কুল-কলেজগুলোয় কার্যত লেখাপড়া হচ্ছেই না। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ লক্ষ শিক্ষকের অধিকাংশই শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নন, যাঁরা যোগ্য তাঁরা ছাত্রদের দেন অতি সামান্য। ফলে অভিভাবকরা কেউই বিদ্যালয়কে আজ তাঁদের সন্তানদের বিকাশের অঙ্গন হিসেবে মনে করেন না। ফলে বাণিজ্যিক উদ্যমসম্পন্ন গৃহশিক্ষকরা আজ হয়ে উঠেছেন ছাত্রসমাজের মূল আশ্রয়। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১৭৬)

বাংলাদেশের ষাটের দশকে নতুনধারার সাহিত্য সৃষ্টির আন্দোলনের পুরোধা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। প্রায় একযুগ ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা সম্পাদনা করার মাধ্যমে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলা সাহিত্য বাঁকবদলের ধারায়, প্রগতিশীল সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াসে। নিশ্চিত আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন সেসময়কার তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনালগ্ন হতে যুক্ত হন উপস্থাপনায়। রুচিশীল ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, উপস্থাপনায় তার নিজস্ব ধরন ইত্যাদি কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় উপস্থাপক খ্যাতিতে ও ব্যক্তিত্বে। তাঁর হাত ধরেই অনেক মেধাবী তরুণ উঠে আসে। তাঁর ‘আমার উপস্থাপক জীবন’ বইটিতে তিনি তুলে ধরছেন তাঁর উপস্থাপক জীবনের নানান দ্বন্দ্ব ও প্রতিকূলতা। বর্ণনা করছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে যাত্রা আর সমৃদ্ধির বিভিন্ন দিক। আমাদের মহান মুত্তিযুদ্ধে পাকসেনাদের হাতে আটক হয়েছিলেন তিনি। উপস্থাপক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচিয়ে ছিল বলে তিনি বইটিতে বলেছেন নির্দ্বিধায়। তাঁর ‘সংগঠন ও বাঙালি’ বই পাঠকের কাছে খুবই জনপ্রিয়। জাতীয় জীবনে সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা, বাঙালির সংগঠনের দুর্বলতা এবং তা কীভাবে আমাদের জাতীয় জীবনে উন্নতির মূলবাধা হয়ে দাঁড়ায় তার স্পষ্ট বয়ান রয়েছে বইটিতে। সংগঠনের অভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রায় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, ব্যক্তি ডুবে থাকে তা আত্মকেন্দ্রিকতায় এসবের সত্য উপলব্ধি উঠে এসেছে তাঁর লেখায়।

১৯৭৮ সালে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। তিনি কবিতায় লিখেছেন―

রাত্রিকে বাসে না ভালো কেউ সম্প্রতি। কেননা এ
রাত্রি সব এক করে দেয়। রাত্রির নির্বাক কাফন
জামার পৃথক রঙ, স্বতন্ত্র চুলছাঁটা, আস্তিনে মাপ
মুছে দিয়ে সবাইকে আদ্যোপান্ত এক পাতলুনের ভেতর
নিয়ে আসে।
(মৃত্যুময়ের জন্য, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ৫৬)

হ্যাঁ, তিনি এমন রাত্রিকেই দূর করতে চেয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন সংস্কৃতিমান, মুক্ত চেতনার সৃজনশীল মানুষ না হলে আগামী বাংলাদেশ হবে অনুর্বর, অন্ধকার। তিনি বইয়ের সোনালি অক্ষরে, জ্ঞানের অমৃতবাণীতে বদলাতে চেয়েছেন সমাজকে, তরুণদের। বই পড়া আন্দোলন ও নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লক্ষ হচ্ছে―আগামী দিনের অর্থাৎ তরুণদের বড় করে তোলা ও তাদের সংঘবদ্ধ জাতীয় শক্তিতে পরিণত করা। প্রায় বিয়াল্লিশ বছর ধরে তাঁর নেতৃত্বে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বিভিন্নভাবে কাজ করে চলেছে অবিরাম। এগুলো মধ্যে রয়েছে―দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রম, পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি, আলোর ইশকুল, কেন্দ্রের লাইব্রেরি, আলোকচিত্র চক্র, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি। সারা দেশে প্রায় ২৪ লাখ ছাত্র/ছাত্রী বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কার্যক্রমের সাথে যুক্ত। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন―

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবনের সর্বাধিক কীর্তি হিসেবে দেখা দেয়। যেখানে আমরা অনেকে মিলে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারি না, সেখানে একক প্রচেষ্টায় এত বড় একটা প্রতিষ্ঠান গড়া যে তাঁর বিশেষ যোগ্যতার প্রকাশ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর ব্যাপ্তি সারা দেশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের সীমানা ছাড়িয়েও।…সায়ীদ লিখেছেন প্রচুর। কবিতা ও ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও ভাষণ, স্মৃতিকথা ও জার্নাল, নাটক ও অনুবাদ।…তাঁর মধ্যে মিলিত হয়েছে শিল্পী ও কর্মী, ভাবুক ও উদযোগী। তাঁর চিন্তা ও সাধনায় দেশ ক্রমাগত উপকৃত হোক। (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, পৃ. ৩৫, ৩৬)

সত্যিকারভাবেই বহুমুখী কাজের মাধ্যমে তিনি উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩২টি। গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতায় সাহিত্যে বিভিন্ন শাখায় তিনি অবদান রেখেছেন ও রেখে চলেছেন। সামাজিক নানা কাজেই তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। যেমন ডেঙ্গু প্রতিরোধ আন্দোলন, পরিবেশ দূষণবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি। তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন সম্মাননা ও পুরস্কার। এগুলোর মধ্যে আছে―জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার (১৯৭৭), র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার (২০০৪), একুশে পদক (২০০৫), পরিবেশ পদক (২০০৮), বাংলা একাডেমি পদক (২০১২) ইত্যাদি।

‘আলোকিত মানুষ চাই’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের দেখানো পথেই আগামী দিনের তরুণদের মধ্যে ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’ বই পড়ার মাধ্যমে এমন অনুভূতির প্রবহমানতায়, চর্চায় হয়তো আমরা পাব সংঘবদ্ধ, প্রগতিশীল, আত্মকেন্দ্রিক জীবনকে পেছনে ফেলে আসা দেশপ্রেমিক বুদ্ধিদীপ্ত এক প্রজন্ম। যা বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।

এ মহীরুহের জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা।

সহায়ক গ্রন্থ

১. বহে জলবতী ধারা (প্রথম খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
২. বহে জলবতী ধারা (দ্বিতীয় খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০১১।
৩. মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৮৮।
৪. নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৫. বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৬. আমার উপস্থাপক জীবন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৫।
৭, সংগঠন ও বাঙালি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
৮. আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, সম্পাদনা―আতাউর রহমান, ঢাকা, ২০১৫।
৯. ইন্টারনেট।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২১, ০৯:০০

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (২৩ জুলাই, ১৮৯৮-সেপ্টেম্বর ১৪, ১৯৭১) বিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি কথাসাহিত্যিক। তার সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি গল্পগ্রন্থ, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধের বই, ৪টি আত্মজীবনী, ২টি ভ্রমণ কাহিনী, ১টি কাব্যগ্রন্থ এবং ১টি প্রহসন। তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, পদ্মশ্রী এবং পদ্মভূষণ পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন।

 

যা খুব ছোট, তাকে খুব কাছ থেকে না দেখলে ভালো করে চেনা যায় না। দূর থেকে তা অস্পষ্ট দেখায়। কিন্তু যা খুব বড়, একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে তাকে না দেখলে, তার ব্যাপ্তিটা অধরা থেকে যায়। প্রথম হিমালয় দর্শনে ঠিক এই রকমই একটা সম্ভ্রম জাগানো অনুভূতি হয় যেকোনো মানুষের। কিন্তু আস্বাদন পরিপূর্ণ হয়, শুধু দূর থেকে নয়, যখন কাছে গিয়েও তাকে দেখি।
কিন্তু আমার তারাশঙ্করের দর্শন ঘটেছিল এর ঠিক বিপরীত ক্রমে। তাঁকে প্রথমে দেখেছিলাম খুব কাছ থেকে, পরম স্নেহের নৈকট্যে। সে প্রথম যে ঠিক কবে তা আজ আর বলতে পারি না—তবে স্মৃতির ভেতরে প্রথম যে ছবিটি দেখি তা সম্ভবত ১৯৪৮ এর, এবং স্থান কলকাতারই বাগবাজারের ১/১ আনন্দ চ্যাটার্জি লেনের একটি বাড়ির দোতলার ঘরে। একটি সাবেকী আমলের খাটের ওপর চড়ে আমরা তিনটি শিশু খেলছি, লাফাচ্ছি, কখনো বা নাচছি—আর অদূরেই কৃষ্ণবর্ণ ধ্যানমগ্ন এক প্রৌঢ় ছোট্ট একটি কাঠের ডেস্কের ওপর গভীর নিবিষ্ট হয়ে লিখে চলেছেন পাতার পর পাতা। মুক্তোর মতো অক্ষরে একে একে ফুটে উঠছে বাংলা কথাসাহিত্যের উজ্জ্বলতম রত্নখনি। তবু সে সান্নিধ্য এত সহজ ছিল বলেই হয়তো আজও সমানভাবে স্পষ্ট। তিনি লিখছেন আর আমরা—তাঁর নাতিনাতনিরা খেলছি। খেলা যখন ছিল তোমার সনে/তখন কে তুমি তা কে জানতো? জানতে পারিনি ঐ নৈকট্যের জন্যই হয়তো-বা। ফলে আমাদের খেলাটা ছিল অবাধ। কখনো ঘরে কখনো ঘর ছাড়িয়ে বারান্দায়—সরু লম্বা বারান্দার ওপাশে আরেকটা বারান্দায় কখনো কখনো দেখা দিতেন লং ক্লথের পাঞ্জাবি পরা, সাদা চুল এক বৃদ্ধ। দাদুর যামিনী দা—শিল্পী যামিনী রায়। মাঝে মাঝে দুই জ্যোতিষ্কের বার্তাবিনিময় হতো এপার ওপার।
ইতিমধ্যে দাদুর সাহিত্যিক খ্যাতি বাড়ছিল। বাড়ি তৈরির কাজও চলছিল। ১৯৪৯ এ বাগবাজার ছেড়ে তিনি উঠে গেলেন টানাপার্কে তাঁর নিজস্ব বাড়িতে। তার কিছুকাল পরেই আমরাও চলে এলাম পাইকপাড়ায় গোয়েল্কা গার্ডেন্স-এর একটি আশ্চর্য সুন্দর ফুটফুটে ফ্ল্যাটে। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। খুব কাছেই দাদুর বাড়ি। রোজ বিকেলে খেলতে যেতাম ওবাড়ির পাশের মাঠে। বাড়ির সামনেই বোগেনভেলিয়ার ছায়অর নিচে দুপাশে রোয়াক, মাঝে বেতের চেয়ার পাতা। দাদু বসে আছেন। তাঁকে ঘিরে আরো কতজন। কথা হতো কত বিষয়ে। মাঝে মাঝেই শৈল দাদু এসে উপস্থিত হতেন। সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। দাদুর বাড়ির ঠিক বিপরীতে আর্মড পুলিশের ক্যাম্প। তার ওপাশে ইন্দ্রবিশ্বাস রোডের ওপর বাড়ি করেছিলেন শৈল দাদু। প্রতিদিন সকালে বন্ধু সন্দর্শনে তাঁর আসাটা ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। দাদুও যেতেন।
কিন্তু সে অনেক পরের ঘটনা। ১৯৬০-৬১ নাগাদ তখনো সজনীকান্ত দাস বেঁচে। শনিবারের চিঠি প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত রমরমিয়ে। শৈলজানন্দের বাড়ি থেকে পূবদিকে আরেকটু এগোলেই সজনীকান্তের বাড়ি। নিচে বিশাল অফিস, প্রেস আর সেখানেই বাংলার তাবড় তাবড় সাহিত্যিকদের আড্ডা। সে আড্ডায় তারাশঙ্করকে, শুনেছি বড়বাবু বলেই চিহ্নিত করা হতো।
দেখতে দেখতে আমাদের টালা-পাইকপাড়া অঞ্চলটা একসময় সাহিত্যিকদের তীর্থস্থান হয়ে উঠল। মন্মথ দত্ত রোডের একটি ফ্ল্যাটে কাজী নজরুল ইসলাম; কিন্তু তাঁর চৈতন্য তখন মহামগ্ন। আরেকটু এগিয়ে সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্র। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীও এলেন কিছুকাল পরে, শৈলজানন্দের বাড়ির একতলায়। পাইকপাড়ায় আমাদের বাড়িরই কাছে হাউসিং স্টেটে থাকতেন গৌরকিশোর ঘোষ।
চাঁদের শোভা থাকে, সূর্যের রামধনু। বিদ্রোহী কবি তখন ফুলের জলসায় নীরব। তাঁকে বাদ দিলে, বাকিরা ছিলেন তারাশঙ্করের...। তাঁর সভার নিত্য অতিথি।
কিন্তু আরো দুজন ছিলেন, তাঁরা শুধু তাঁর... ছিলেন না, তাঁর ভাবের অংশীদারও ছিলেন। একজন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র, আমার বড়মামা সনৎকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরেকজন আমার বাবা, তারাশঙ্করের জ্যেষ্ঠ জামাতা শান্তিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়। শুধু আত্মীয় নয়, এঁরাও ছিলেন তাঁর সভার...।
আরো কতজন, কত গুণীজন, কত কবি সাহিত্যিক শিল্পী যে তাঁর বাড়িতে পদচিহ্ন রেখে গেছেন তার হিসাব দেওয়া অসম্ভব। এসেছেন বনফুল, অচিন্ত্যসেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, প্রবোধ সান্যাল, আশাপূর্ণা দেবী, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী—এমনি আরো কত যে গুণীজন। আর এঁদের... আর ফুলের গন্ধে—টালাপার্কের বাড়ি ভরে উঠত প্রতিবছর ৮ই শ্রাবণ—তারাশঙ্করের জন্মদিন। বাড়িতে মানুষ ধরত না। তাই ম্যারান বেঁধে—সে এক বিপুল আয়োজন। ফুলের গন্ধের সঙ্গে যোগ দিত খাবারের মন মাতানো গন্ধ।
বছরে দুটি দিনের জন্য আমাদের ছিল একমাত্র প্রতীক্ষা দুর্গা পুজো আর আটই শ্রাবণ। আমাদের মধ্যে আবার আমার দিদি, শকুন্তলার প্রতীক্ষা ছিল সবচাইতে ব্যাকুল। কারণ, কি সৌভাগ্য ওরও জন্মদিন ঠিক ওই ৮ই শ্রাবণ। একে বড় নাতনি, তার জন্মদিনের ঐ একসূত্রতা। দাদুর কাছে ওর ছিল একটু বিশেষ সমাদর। ওকে নিয়ে কবিতাও লিখেছিলেন তিনি—
তুমি যখন হবে পঞ্চদশী
আমি হব ষাট বছরের বুড়ো
তুমি খাবে কড়মড়িয়ে মেঠাই
আমি খাব চেটে চেটে ঝুরো।

দাদুর বয়স যখন পঁয়তাল্লিশ, তখন দিদির জন্ম। অতএব দাদুর যখন ষাট, দিদি তখন পঞ্চদশী। টীকা আরো একটু হয়তো অপ্রায়োগিক হবে না। বীরভূমে মিঠাইকে বলে মেঠাই, মেটাই, কিংবা আরো সঠিকভাবে বললে ‘মিটিই’। মনে হতে পারে মিঠাই কি তবে কড়মড়িয়ে খাওয়া যাবে? আসল কথা হলো, মেঠাই মানে বীরভূমে সন্দেশ নয়—গুড় আর বেসনের লম্বা লম্বা কাঠিভাজা, ওখানে বলে সিড়িভাজা—তার নাড়ু—বেশ শক্ত, কড়া পাকেঢ়। কড়মড়িয়েই খেতে হয়। প্রতিবছর পুজোর সময় ঘরে ঘরে এইসব মেঠাই, নারকেল খণ্ড, খই বিনু—এমনি আরো কত কি তৈরি হতো। আর ঝুরো হলো শুকনো বালিগুড়। এও বীরভূমেরই শব্দ।
সে তো আসবেই। তারাশঙ্করের কবিতায় বীরভূম আসবে না, লাভপুর আসবে না—তাই হয়! কোনো না কোনোভাবে আসবেই আসবে। তাঁর শেকড় যে ঐ মাটিতেই। আর জীবনের শেষ মুহূর্তেই তাঁর ভ্রুযোগ ছিন্ন হয়নি। প্রায়ই যেতেন গ্রামের বাড়িতে। তাঁদের যে সাবেক বৈঠকখানা বাড়ি—খড়ের চাল, এপাশ ওপাশ বারান্দা, সামনে বাগান—আর এই বাগানেই তিনি রোয়াক বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন, ভারী সুন্দর একটা গোলঘর বানিয়ে ছিলেন। সামনে নানান ফুলের গাছ। রোয়াকের পাশে চেয়ার পাতা—এখানেই বসতেন বন্ধুবান্ধব পরিচিতজনের সঙ্গে। গল্প হতো। কখনো অন্ত্যজ শ্রেণির বহু মানুষ আসতেন। তাঁর কাছে তাঁরাও ছিল আপনজন। পুজোর সময় সবাইকে কাপড় দিতেন। অর্থ সাহায্য দিতেন সাধ্যমতো।
লাভপুরকে তিনি ভোলেননি। আর লাভপুরও আজও ভোলেনি তাঁকে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

সর্বশেষ

বাগেরহাটে পানিবন্দি হাজারো পরিবার, টর্নেডোতে বিধ্বস্ত বাড়িঘর

বাগেরহাটে পানিবন্দি হাজারো পরিবার, টর্নেডোতে বিধ্বস্ত বাড়িঘর

ক্যাম্প থেকে পালিয়ে কুড়িগ্রামে আটক ৯ রোহিঙ্গা

ক্যাম্প থেকে পালিয়ে কুড়িগ্রামে আটক ৯ রোহিঙ্গা

করোনায় আটকে আছে ত্রিদেশীয় বৈঠক

করোনায় আটকে আছে ত্রিদেশীয় বৈঠক

কিউকম ও রানার এর মধ্যে ব্যবসায়িক চুক্তি

কিউকম ও রানার এর মধ্যে ব্যবসায়িক চুক্তি

বলপূর্বক কাবুল দখল করলে তালেবান স্বীকৃতি পাবে না: যুক্তরাষ্ট্র

বলপূর্বক কাবুল দখল করলে তালেবান স্বীকৃতি পাবে না: যুক্তরাষ্ট্র

বিলের মাঝখানে উপহারের ঘর, ডুবলো পানিতে

বিলের মাঝখানে উপহারের ঘর, ডুবলো পানিতে

নতুন রূপে ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের’ পথ চলা

নতুন রূপে ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের’ পথ চলা

পাকিস্তান-ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৯ ওভারের ম্যাচটিও শেষ হলো না

পাকিস্তান-ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৯ ওভারের ম্যাচটিও শেষ হলো না

দেয়ালেও করোনাভাইরাস, সাতক্ষীরা মেডিক্যালের ল্যাব বন্ধ

দেয়ালেও করোনাভাইরাস, সাতক্ষীরা মেডিক্যালের ল্যাব বন্ধ

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় পরিবেশমন্ত্রীর

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় পরিবেশমন্ত্রীর

সেই লাকী আক্তারের কণ্ঠে কন্যা ও কান্নার গল্প (ভিডিও)

সেই লাকী আক্তারের কণ্ঠে কন্যা ও কান্নার গল্প (ভিডিও)

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের দেখভালে জাতিসংঘ-সরকার একমত

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের দেখভালে জাতিসংঘ-সরকার একমত

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

থিয়েটার

থিয়েটার

গহন
শীতের অপেক্ষা করছি না

শীতের অপেক্ষা করছি না

মন্তাজের নিজের জমি

মন্তাজের নিজের জমি

© 2021 Bangla Tribune