X
রবিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৪ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

ফ্রসোয়াঁ ত্রুফোর শেষ সাক্ষাৎকার

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৫, ০১:৩৩

ভূমিকা ও ভাষান্তর : বিধান রিবেরু ||

  truffaut [ফরাসি চলচ্চিত্র পরিচালক ফ্রাসোঁয়া রোলাঁ ত্রুফো। তিনি জন্মেছেন ১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। আর মৃত্যুবরণ করেছেন ১৯৮৪ সালের ২১ অক্টোবর। শুধু চলচ্চিত্র পরিচালক বললে ত্রুফোকে গণ্ডিবদ্ধ করে ফেলা হয়। তিনি একাধারে চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক, অভিনেতা, চলচ্চিত্র সমালোচক এবং সর্বোপরী চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় যা ফরাসি নবতরঙ্গ নামে পরিচিত, সেই আন্দোলনের সামনের সারির একজন। পুরো দুনিয়ার এই ফিল্ম আইকন জীবদ্দশায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন ২৫টি। প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ কাহিনিচিত্র ছিল ‘দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’ (১৯৫৯)। এরপর একে একে তিনি নির্মাণ করেছেন ‘শুট দ্য পিয়ানো প্লেয়ার’ (১৯৬০), ‘জুলে এন্ড জিম’ (১৯৬১), ‘দ্য ওয়াইল্ড চাইল্ড’ (১৯৭০), ‘টু ইংলিশ গার্লস’ (১৯৭১), ‘ডে ফর নাইট’ (১৯৭৩), ‘দ্য ওম্যান নেক্সট ডোর’ (১৯৮১) ইত্যাদি সব চমৎকার চলচ্চিত্র।
মার্কিন পত্রিকা দ্য নিউ ইয়র্কার ২০১০ সালের ২৯ জুলাই ত্রুফোর সর্বশেষ সাক্ষাৎকারটি পুনঃপ্রকাশ করে। সেই সংস্করণে উল্লেখ করা হয়, সাক্ষাৎকারটি বেশ ভালোভাবেই নিয়েছিলেন বের্ট কারদুলো। এই পত্রিকার আগে সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয় গ্যারি মরিস সম্পাদিত ‘এ্যাকশন! ইন্টারভিউজ ইউদ ডিরেক্টরস ফ্রম ক্লাসিক্যাল হলিউড টু কনটেম্পরারি ইরান’ নামক বইতে। নিউ ইয়র্কার পত্রিকায় বলা হয়, এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে ত্রুফোর জীবন ও কর্ম, দুটোই বেশ স্পষ্টভাবে ধরা যায়।
প্রভাবশালী চলচ্চিত্রকার ফ্রাসোয়াঁ ত্রুফো আমার ভীষণ পছন্দের একজন নির্মাতা। তাঁকে আমি বলি প্রেম ও নারীদের নির্মাতা। প্রেম ও নারীকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রে ত্রুফো যেমন পরিপক্ক, তেমনি তিনি শিশুর মনস্তত্ব উন্মেষেও অসাধারণ। ‘জুলে এন্ড জিম’, ‘টু ইংলিশ গার্লস’, ‘দি স্টোরি অব এ্যাডেল এইচ’, ‘দি ম্যান হু লাভড ওম্যান’– এসব ছবিতে ত্রুফো আবির্ভুত হন প্রেম ও নারীভিত্তিক গল্পকার হিসেবে। আবার প্রথম ছবি ‘ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’ কিংবা ‘দি ওয়াইল্ড চাইল্ড’ ছবিতে বালক মনের বহিঃপ্রকাশেও আমরা তাঁর দক্ষতার প্রমাণ পেয়েছি। ‘দি ওয়াইল্ড চাইল্ড’ ছবিতে অভিনয়েও তিনি ছিলেন অনবদ্য।

যাহোক, বের্ট কারদুলোর সাক্ষাৎকারটি নিউ ইয়র্কার পত্রিকায় ছাপা হয় ‘অল্টার ইগো, অটোবায়োগ্রাফি, এ্যান্ড অতরিজম: ফ্রাসোয়া ত্রুফোস লাস্ট ইন্টারভিউ’। বাংলা করলে এই শিরোনাম দাঁড়ায়: ‘পরানের দোসর, আত্মজীবনী ও লেখকবাজি: ফ্রাসোয়া ত্রুফোর শেষ সাক্ষাৎকার’। ইংরেজি ও ফরাসি- দুই ভাষাতেই এই সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয় ১৯৮৪ সালের মে মাসে প্যারিসে, ত্রুফোর নিজের প্রযোজনা সংস্থা ‘লে ফিল্ম দ্যু ক্যারোস’-এর কার্যালয়ে। এর আগে একই বছরের ১৩ এপ্রিল ত্রুফো শেষবারের মত টেলিভিশনে বারনার্ড পিভোটের সঞ্চালনায় ‘এ্যাপোস্ত্রোফ’ অনুষ্ঠানে একটি সাক্ষাৎকার দেন। এরপর ২১ অক্টোবর মস্তিষ্কে কর্কট রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।]

 

ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ ছবির একটি দৃশ্য প্রশ্ন: আমরা আমাদের আলোচনা আন্তোয়ান দোয়ানেল (এই চরিত্রটি ত্রুফো সৃষ্টি করেছেন এবং বারবার ফিরিয়ে এনেছেন বিভিন্ন চলচ্চিত্রে। যেমন- ‘দি ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’ থেকে শুরু করে ‘স্টোলেন কিসেস’, ‘বেড এ্যান্ড বোর্ড’ বা ‘লাভ অন দ্য রান’ চলচ্চিত্রে এই নামের চরিত্র ঘুরেফিরে এসেছে) চক্রের উপর। তবে আপনার অন্য ছবি নিয়েও আমরা আলাপ করবো। চলচ্চিত্র পরিচালক হওয়ার পেছনে আপনার জীবনে কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে?ত্রুফো: যুদ্ধের সময় আমি অনেক ছবি দেখেছি, আর এখান থেকেই আমি সিনেমার প্রেমে পড়ি। সিনেমা দেখার জন্য আমি নিয়মিত স্কুল পালাতাম- এমনকি সকালবেলাতেই, প্যারিসের অনেক প্রেক্ষাগৃহই সকাল সকাল খুলতো। প্রথমে নিশ্চিত ছিলাম না, আমি কি চলচ্চিত্র সমালোচক হবো, না পরিচালক। কিন্তু আমি জানতাম এমন কিছু একটাই হবো আমি। লেখালেখি করার কথাটাই ভাবতাম আসলে, ঔপন্যাসিক হওয়ার কথা ভাবতাম। পরে ঠিক করলাম চলচ্চিত্র সমালোচনা লিখবো। এরপর ধীরে ধীরে ভাবতে লাগলাম, আমাকে চলচ্চিত্র বানাতে হবে। আমার মনে হয়, ওই যে যুদ্ধের সময় চলচ্চিত্রগুলো দেখেছি, সেটা ছিল আমার একধরনের শিক্ষানবীশির কাল।নবতরঙ্গের চলচ্চিত্রকারদের, আপনি জানেন, অনেক সময় সমালোচনা করা হয় যে তাদের অভিজ্ঞতার অভাব ছিল। এই আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে উঠে আসা মানুষেরা- এদের মধ্যে আমিও আছি, যে আমি ‘কাইয়ে দ্যু সিনেমা’ পত্রিকায় লেখা ও কয়েক হাজার সিনেমা দেখা ছাড়া কিছুই করিনি। আমি কোনো কোনো ছবি চৌদ্দ কি পনেরোবার দেখেছি- যেমন জঁ রেনোয়ার ‘দ্য রুলস অব গেম’ (১৯৩৯) এবং ‘দ্য গোল্ডেন কোচ’ (১৯৫৩)। সিনেমা দেখার কিন্তু তরিকা আছে, একজন পরিচালকের সহযোগী হিসেবে আপনি যা শিখবেন, তার চেয়েও বেশি শিখবেন ওই তরিকায়। চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রক্রিয়া দেখে ক্লান্ত কিংবা একাডেমিক হওয়া ছাড়াও শেখাটা সম্ভব। সহযোগী পরিচালকরা আসলে দেখতে চান চলচ্চিত্র কিভাবে নির্মিত হয়, কিন্তু যখন ক্যামেরার সামনে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটতে থাকে, তখন বেচারারা বার্তাবাহকের কাজ করেন, তাই ওই চাওয়াটা তাদের ব্যাহত হয়। কথাটি ঘুরিয়ে বলি, তাদের সবসময়ই এমন কাজ করতে হয় যা সেটের বাইরে। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহে যখন আপনি একটি ছবি দশ বা এর বেশিবার দেখেন, তখন ওই ছবির সংলাপ ও সঙ্গীত আপনার মনে গেঁথে যায়। আপনি তখন খুঁজতে শুরু করেন এই ছবিটি নির্মাণ হয়েছে কিভাবে, আর এভাবেই আপনি সহকারী পরিচালকের চেয়েও বেশি শিখতে পারেন।

প্রশ্ন: ছেলেবেলায় কোন ছবিটি আপনার নজর কেড়েছিল? যে ছবির কারণে আপনি সিনেমার নিয়মিত দর্শক হয়ে গেলেন?
ত্রুফো: ফরাসি ছবিগুলোই প্রথমে ভালো লাগত, যেমন অঁরি-জোর্জ ক্লুজোর ‘দি র‍্যাভেন’ (১৯৪৩), মারসেল কারনের ‘দি ডেভিলস এনভয়জ’ (১৯৪২)- এই ধরনের ছবিগুলো তখন বেশি দেখতে চাইতাম। একই ছবি বারবার দেখার এই অভ্যাস আমার দুর্ঘটনাবশত হয়েছে, প্রথমে আমি চুপিচুপি ছবিগুলো দেখতাম। এরপর বাবা মা বলতেন, ‘চল আজ রাতে সিনেমা দেখতে যাই’, কাজেই একই ছবি এভাবে আবার দেখা হয়ে যেত, আর আমি তো বলতে পারতাম না যে এই ছবি আগে একবার দেখেছি। যাক, এই কারণে একটি চলচ্চিত্র বারবার দেখার অভ্যাস হয়ে গেল- যুদ্ধ শেষের তিন বছরের মাথায় ‘দি র‍্যাভেন’ ছবিটি আমার দেখা হয়ে যায় নয় বা দশবার। কিন্তু ‘কাইয়ে দ্যু সিনেমা’র সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার পর ফরাসি চলচ্চিত্র দেখা বন্ধ হয়ে যায়। পত্রিকার বন্ধুরা, যেমন জাক রিভেত তো ব্যাপারটা অসম্ভব ভাবতো যে আমি ‘দি র‍্যাভেন’ ছবির সব সংলাপ গড়গড় করে বলে দিতে পারতাম, মার্সেল কার্নের ‘দি চিলড্রেন অব প্যারাডাইস’ দেখেছি চৌদ্দবার। 

প্রশ্ন: কিছুক্ষণ আগে আপনি রেনোয়ার দুটি চলচ্চিত্রের কথা বললেন, ডজন-খানেকবার দেখেছেন সেসব ছবি। আপনার উপর রেনোয়ার প্রভাব সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
ত্রুফো: আমি মনে করি, রেনোয়াই একমাত্র পরিচালক যিনি হাতে-কলমে বেশ নির্ভুলভাবে কাজ করেন, চলচ্চিত্রে তিনি কখনো ভুল করেননি। তিনি যদি কখনো ভুল না করে থাকেন, আমার মনে হয়, সেটার কারণ তিনি সবসময় সারল্যের উপর ভর করে সমাধান খুঁজতেন- মানব সমাধান। তিনিই একমাত্র পরিচালক যিনি কখনো ভান ধরেননি। নিজের স্টাইল নিয়ে চিন্তিত ছিলেন না, আর আপনি যদি তাঁর সম্পর্কে জানেন-  দেখবেন সেগুলো বেশ বিস্তৃত, যেহেতু তিনি সব বিষয় নিয়েই কাজ করেছেন- যখন আপনি আটকে যাবেন, বিশেষ করে যারা তরুণ চলচ্চিত্র পরিচালক, তারা শিখতে পারবেন রেনোয়ার কাছ থেকে- কি করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়, রেনোয়ার কাছ থেকে সমাধান আপনি পাবেনই।
রবার্তো রসেলিনি, উদাহরণ দিচ্ছি, একেবারে অন্যরকম। চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে পুরোপুরি তিনি যান্ত্রিক ও প্রযুক্তিগত দিকগুলো এড়িয়ে যেতে পারতেন, এখানে তিনি বেশ শক্তিশালী ছিলেন। ওসব যন্ত্রপাতির কোনো অস্তিত্বই উনার কাছে ছিল না। চিত্রনাট্য নিয়ে তিনি একবার মন্তব্য করেছিলেন, সেখানে দুনিয়ার যত বাড়তি কথা, যেমন- ‘ইংলিশ আর্মি অরলেয়ান্সে ঢুকেছে’, আপনি হয় তো ভাবছেন- ‘ঠিক আছে তাঁর হয় তো অনেক বাড়তি লোক দরকার।’ আপনি এবার ‘জোয়ান অব আর্ক এ্যাট দ্য স্ট্যাক’ (১৯৫৫) দেখুন, সেখানে দেখবেন একটা ছোট্ট সেটের ভেতর গাদাগাদি করে কার্ডবোর্ড দিয়ে বানানো সৈন্য দাঁড়িয়ে আছে। রসেলিনি যখন চলচ্চিত্রে প্রশান্তিভাব আনেন, এমনকি একটি উদ্দেশ্যহীনভাবও আনেন, যেমনটা তিনি করেছিলেন ভারত নিয়ে, সেটা একই সাথে বিস্ময়কর, আবার বর্ণনাতীতও বটে। এই যে চলচ্চিত্রে আড়ম্বর না করা, বিষয়ের প্রতি নম্রতা নিয়ে থাকা, এসবই শেষ পর্যন্ত কাজটাকে মহৎ করে তোলে। রসেলিনির ‘জার্মানি ইয়ার জিরো’ (১৯৪৭) চলচ্চিত্রটি আমার ভাল লাগে, এটার কারণ সম্ভবত, শৈশব বা শিশুকিশোর ভিত্তিক চলচ্চিত্রের প্রতি আমার দুর্বলতা। এটা ছাড়াও রসেলিনিই প্রথম সততার সাথে, প্রায় প্রামাণ্যচিত্রের মত করে বাচ্চাদের তুলে ধরেছেন চলচ্চিত্রে। বাচ্চাদেরকে তিনি গুরুত্ব সহকারে, চিন্তাশীল হিসেবে তুলে ধরেছেন- বাচ্চাদের আশপাশে থাকা বড়দের তুলনায়- ক্যানভাসে যেমন থাকে- ছবির ছোট উপাদান বা পশুতে পরিণত করেননি শিশুদের। ‘জার্মানি ইয়ার জিরো’ ছবিতে বাচ্চাটি নিজের সারল্য ও সংযম প্রদর্শনে ছিল অসাধারণ। এই চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়েই কোনো বাচ্চা সিনেমার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছে, আর এটা হয়েছে এমন এক সময়ে যখন তাদের চারপাশের পরিবেশ ছিল বেশ অস্থির।
রেনোয়ার ভেতর রসেলিনির একটি বৈশিষ্ট্য কিন্তু বেশ স্পষ্ট: কাহিনীচিত্রে যতটুকু পারা যায় জীবনের কাছাকাছি থাকার বাসনা। রসেলিনি তো একবার এও বলেছিলেন, আপনার চিত্রনাট্য লেখার দরকার নাই- একমাত্র শুকরেরাই চিত্রনাট্য লেখে- চলচ্চিত্রে দ্বন্দ্ব হাজির হবে স্বাভাবিক নিয়মেই। একটি নির্দিষ্ট স্থান ও কাল থেকে উঠে আসা চরিত্র মুখোমুখি হবে ভিন্ন আরেক স্থান থেকে উঠে আসা চরিত্রের: আর এখানেই তো, তাদের মধ্যকার স্বাভাবিক দ্বন্দ্ব আপনি আবিষ্কার করবেন, এখান থেকেই শুরু করুন। অন্যকিছু আবিষ্কারের কোনো দরকার নাই। আমি রসেলিনির মত মানুষের দ্বারা খুবই প্রভাবিত- এবং রেনোয়া- যাঁরা সিনেমার জটিলতা থেকে নিজেরদের মুক্ত করতে পেরেছিলেন, যাঁদের জন্য চরিত্র, গল্প কিংবা মূলভাব দুনিয়ার অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। 

প্রশ্ন: আপনার উপর মার্কিন সিনেমার প্রভাব নিয়ে কিছু বলুন।
ত্রুফো: আপনি জানেন, আমাদের অনেক ঋণ, ফ্রান্সে, যুক্তরাষ্ট্রের সিনেমার কাছে, এটা মার্কিনীরা নিজেরাই জানেন না ভালো করে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ করে শুরুর দিককার সিনেমাগুলো, এগুলোকে এখনকার মার্কিনীরা বিশেষ পাত্তাটাত্তা দেন না, এ বিষয়ে জানেনও না। অথচ ফরাসি নবতরঙ্গের সময় মার্কিন অনেক পরিচালক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, আমার মনে পড়ছে সিডনি লুমেট, রবার্ট মুলিগান, ফ্যাঙ্ক ত্যাশলিন এবং আর্থার পেনের কথা। তাঁরা আমেরিকান চলচ্চিত্রের খোলনলচে পাল্টে দিয়েছিলেন, অনেকটা ফ্রান্সের নবতরঙ্গের সময়কার পরিচালকদের মত। তাঁদের জীবন ছিল ভীষণ সতেজ, তাঁদের প্রথম চলচ্চিত্র, মানে প্রথম দিককার চলচ্চিত্র, যুক্তরাষ্ট্রের সূচনালগ্নের চলচ্চিত্র ছিল সজীব, একইসাথে এই মানুষগুলো ছিলেন দারুণ মেধাবী। তাঁদের চলচ্চিত্র দুই গুণকেই একত্র করতে পারত। একটা সময় পর মার্কিনীরা তাঁদের আর মূল্য দিত না, যেহেতু তাঁরা অতটা পরিচিতি পাননি আর বাণিজ্যিকভাবেও তেমন সফল নন। যুক্তরাষ্ট্রে সাফল্যই সবকিছু, আপনি তো আমার চাইতেও এটা ভালো জানেন। 

প্রশ্ন: ফরাসি নবতরঙ্গ কেন শৈল্পিকভাবে সফল হয়েছিল?
ত্রুফো: নবতরঙ্গের সূচনালগ্নে লোকজন তরুণ নির্মাতাদের নতুন চলচ্চিত্রের সমালোচনা করত, তারা বলত, “সর্বেসর্বা হয়েছে, এ আর এমন ভিন্ন কি, আগেও তো এমন ছবি হয়েছে।” আমি জানি না নবতরঙ্গের পেছনে যদি কোনো পরিকল্পনা থাকত তাহলে কি হত, কিন্তু যতদূর বুঝি, এই নবতরঙ্গ কখনোই সিনেমার বিপ্লব ঘটাতে আসেনি, এমনকি আমার আগের পরিচালকদের থেকে আলাদা করে আমাকে প্রকাশ করার জন্যও আসেনি। আন্তরিকতার ঘাটতি না থাকলে সিনেমা সবসময় চমৎকার এক বিষয়, আমি এভাবেই চিন্তা করেছি। আমিও অন্যদের মত ছবিই বানাবো, তবে তাদের থেকে ভালো বানাবো, এটাই ছিল মনে।
আঁদ্রে মালরু (ফরাসি লেখক ও তাত্ত্বিক) সুন্দর একটা কথা বলেছেন, “সেরা শিল্পকর্ম উৎকৃষ্ট আবর্জনা নয়।” (কিন্তু আবর্জনা বা বাজে ছবি আরেকটু ভালো করে বানালেই সেটা শিল্পে উন্নীত হয় বলে মনে করতেন ত্রুফো) এখনো আমি মনে করি, ভালো চলচ্চিত্র হল খারাপ চলচ্চিত্রকেই আরেকটু ভালো করে বানানো। ঘুরিয়ে বললে, আনাতোল লিতভাকের ‘গুডবাই এ্যাগেইন’ (১৯৬১) আর আমার ‘দ্য সফট স্কিন’ (১৯৬৪) ছবির মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখি না। একই জিনিস, একই চলচ্চিত্র, শুধু ‘দ্য সফট স্কিন’ ছবিতে যারা অভিনয় করেছেন তাদেরকে চরিত্রগুলো মানিয়েছিল। আমরা সত্যি সত্যি ঘণ্টা বাজাতে পেরেছিলাম, কমপক্ষে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু অন্য ছবিতে যা হয়, ঘণ্টা বাজে না ঠিকঠাক ভাবে, কারণ ওটা ইনগ্রিদ বেরিম্যান বা এ্যান্থনি পারকিন্স অথবা ইভ মঁতাঁর জন্য যুৎসই চলচ্চিত্র ছিল না। কাজেই “গুডবাই এ্যাগেইন” শুরু থেকেই এক মিথ্যার উপর ভর করে এগিয়েছে। নবতরঙ্গে নতুন ও ভিন্ন ধরনের সিনেমা বানানোর ভাবনা ছিল না, কিন্তু বাস্তবকে সত্যি সত্যি তুলে ধরার প্রয়াস ছিল। যখন চলচ্চিত্র বানানো শুরু করি তখন এটাই ছিল মাথার ভেতর। জঁ দোলানয়ের “দ্য লিটিল রেবেলস” (১৯৫৫) ছবির চেয়ে “দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ” (১৯৫৯) তেমন বিশাল ভিন্ন কিছু নয়। এ দুটো একই, যে কোনো বিচারে বেশ কাছাকাছি। আমি আমারটা বানাতে চেয়েছি কারণ আমি অন্যটার কৃত্রিমতাকে পছন্দ করিনি- এটুকুই।

প্রশ্ন: আমরা জানি, আপনি পরিচালক হওয়ার আগে চলচ্চিত্র সমালোচক ছিলেন। আপনার প্রথম প্রবন্ধ কোন চলচ্চিত্রকে নিয়ে ছিল?
ত্রুফো: চার্লি চ্যাপলিনের “মডার্ন টাইমস” (১৯৩৬), ফিল্মক্লাবে একটি পুরনো প্রিন্ট দেখেছিলাম ছবিটার। পরে পুলিশ অবশ্য ওই কপিটা নিয়ে নেয়, কারণ ওটা চুরি করা কপি ছিল! এরপরই আমি কাইয়ে দ্যু সিনেমায় লেখা শুরু করলাম, ধন্যবাদ আঁদ্রে বাজাঁকে। জঁ অরেঁস ও পিয়ের বোসদের মত যারা চিত্রনাট্য লিখতেন, ফরাসি চলচ্চিত্রের ফসিল, তাদের একঘেয়ের কাজের উপর কাইয়ে পত্রিকায় আগুন লাগানো এক প্রবন্ধ লিখে ফেলি সেসময়। এই এক প্রবন্ধের জোরে আমি কাজ পেয়ে যাই সাপ্তাহিক শিল্প ও বিনোদন পত্রিকায়। সেখানে আমি টানা চার বছর চলচ্চিত্রের উপর কলাম লিখেছি। 
আমি মনে করি চলচ্চিত্র সমালোচক হওয়ার বিষয়টি আমাকে সাহায্য করেছে, কারণ এই কারণে আমি চলচ্চিত্রকে ভালোবেসেছি, প্রচুর চলচ্চিত্র দেখাও হয়েছে এ কারণে। আপনি যদি চলচ্চিত্র নিয়ে লেখালেখি করেন তো সেটা আপনাকে চলচ্চিত্র বোঝার ক্ষেত্রে অনেক সহায়তা করবে। এই লেখালেখিটা বুদ্ধিচর্চায় আপনাকে বাধ্য করবে। আপনি যখন একটি চিত্রনাট্যকে দশ লাইনের সারসংক্ষেপে পরিণত করেন, তখন ওই চিত্রনাট্যের সবল ও দুর্বল দুই দিকই ধরা পড়ে। সমালোচনা ভালো চর্চা, কিন্তু এই কাজ আপনার বেশিদিন করা ঠিক নয়। ফিরে দেখলে দেখি, আমার সমালোচনাগুলোর বেশিরভাগই নেতিবাচক, ওগুলোতে প্রশংসার বদলে নিন্দা করার প্রবণতাই ছিল অধিক; আমি কারও পক্ষে লেখার চাইতে আক্রমণেই ছিলাম বেশি সাবলীল। এবং এটা নিয়ে এখন আমার আক্ষেপ হয়। আমি এখন আর ওরকম উদ্ধত নই। তবে সমালোচনামূলক অভিব্যক্তি আমার ভালো লাগে। 

লে মিসতোঁ  প্রশ্ন: আপনি চার বছর যাবৎ চলচ্চিত্র সমালোচনা করেছেন, কিন্তু এর ফাঁকেই আপনি চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগ খুঁজছিলেন, তাই না?ত্রুফো: হ্যাঁ, তা তো অবশ্যই। আমি তখন ১৬ মিলিমিটারে ছোট ছোট ছবি বানানো শুরু করেছিলাম, ওগুলো অবশ্য দেখানোর মত কোনো কাজ নয়। অপেশাদার কাজে যতরকম ত্রুটি থাকে তার সবটাই ওসব ছবিতে ছিল, অতিশয় ভণিতাও হাজির ছিল সেসব কাজে। কোনো গল্প ছিল না, গল্প না থাকাটাই সেসময় অপেশাদার নির্মাতাদের একটা অহমিকার মত ব্যাপার ছিল। বোধহয় এখান থেকেই আমি কিছু শিখেছি, যেমন কিছু দেখানোর বদলে কি করে পরামর্শ দেয়া যায়। প্রথমদিককার এসব কাজে তেমন কিছুই ছিল না, শুধু দরজা বন্ধ আর দরজা খোলা ছাড়া- সময় আর শ্রমের কি অপচয়!আমার আসল ছবি, ১৯৫৭ সালে, নাম ছিল “লে মিসতোঁ”, ইংরেজিতে “দি মিসচিফ মেকার্স” (বাংলায় ‘দুষ্টু ছেলের দল’)। এই ছবিতে গল্প ছিল, সেসময় কিন্তু স্বল্পদৈর্ঘ চলচ্চিত্রে গল্প বলার চল তেমন একটা ছিল না!  আর এই ছোট ছবির সুবাদেই আমি অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়ে যাই। কিন্তু “লে মিসতোঁ” ছবিতে সংলাপের সঙ্গে ধারাভাষ্যও যোগ করেছিলাম কিছু জায়গায়, একারণে নির্মাণ প্রক্রিয়াও অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। আর ছবিটারও ভাগ্য ছিল বলতে হবে। ব্রাসেলসের এক উৎসবে ছবিটি পুরস্কার পেয়েছিল, যদ্দুর মনে পড়ে। ম্যুরিস পোঁয়ের গল্প অবলম্বনে বানিয়েছিলাম “লে মিসতোঁ”, এ ছবির চিত্রনাট্যটি মৌলিক ছিল না। একটা ধারাবাহিকের সূচনা হিসেবেই গণ্য করেছিলাম চিত্রনাট্যটি। তিনটা বা চারটা ভিন্নভিন্ন ছোট দৈর্ঘ্যের ছবির জন্য তখনও যেমন পয়সা পাওয়া যেত, এখনও পাওয়া যায়, কিন্তু পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্রের জন্য আর্থিক যোগান পাওয়াটা সহজ নয়। এটা বুঝে আমি পরিকল্পনা করি একটা বিষয়, যেমন শৈশবকে কেন্দ্র করে কয়েকটি গল্প সাজিয়ে ফেলতে হবে। আমার এরকম পাঁচটা না ছয়টা গল্প তৈরি ছিল। আমি “লে মিসতোঁ” দিয়ে শুরু করলাম, কারণ ওটা শুট করা আমার জন্য সহজ ছিল। যখন ছবির কাজ শেষ হল, পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারলাম না, কারণ চলচ্চিত্রে সাহিত্যের গন্ধটা ছিলই। বিষয়টা খুলে বলছি: “লে মিসতোঁ” হল পাঁচ বাচ্চার গল্প, ওরা তরুণ প্রেমিক প্রেমিকার এক জুটির উপর নজরদারি করে। এই বাচ্চাদের নির্দেশনা দিতে গিয়ে আমি লক্ষ্য করলাম, মেয়েটির প্রতি ওদের কোনো আগ্রহ নেই, মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জেরার্ড ব্লাঁয়ের স্ত্রী বের্নাদেত লাফোঁ। লাফোঁর স্বামী ব্লায়ের প্রতিও ঈর্ষা কাজ করছিল না ছেলেদের। ওদেরকে বানোয়াট হলেও ঈর্ষান্বিত করতে হয়েছে, এই বিষয়টা পরে আমাকে খুব ভাবিয়েছে। আমি নিজেকে পরে বললাম, যদি আবার কখনো বাচ্চাদের নিয়ে ছবি বানাই, তাহলে তাদের জীবনঘনিষ্ঠ ছবিই বানাবো, সেখানে যতটুকু সম্ভব কল্পকাহিনী অল্পই যোগ করব।

প্রশ্ন: একজন লেখক-পরিচালকের জন্য প্রথমে সমালোচক হওয়া কি একটু বেমানান? যখন আপনি কোনো দৃশ্য শুট করতেন, তখন কি আপনার সমালোচক সত্তা আপনার ঘাড়ে চেপে বসত, বলত: ‘এটা কি ঠিক হচ্ছে?’
ত্রুফো: নিজের ভেতর একটা অস্বস্তি কাজ করে বৈকি, কারণ আমি শুধু সমালোচকই ছিলাম না, প্রায় তিন হাজারের কাছাকাছি চলচ্চিত্রও দেখেছি। কাজেই আমি সবসময়ই ভাবতাম, ‘এই কাজটা তো ওমুক-ওমুক সিনেমায় করা শেষ’, ‘পর্নো ছবির চেয়েও এটা খারাপ হয়েছে’, ইত্যাদি। তাছাড়া আদৌ এটার গুরুত্ব থাক, না থাক, কাহিনীসূত্র ঠিকঠাকভাবে এগুচ্ছে কি না, সেটা নিয়ে আমার সংশয় কাটতো না। আমি সারাক্ষণই একটা চিত্রনাট্যকে কাটাছেঁড়া করতে থাকতাম মাথার ভেতর, হয় তো একটা দাঁড় করালাম, শেষ মুহূর্তে দেখ গেল সেটা আর ক্যামেরাবন্দি করতে চাচ্ছি না।

প্রশ্ন: তাহলে কিভাবে একটি চলচ্চিত্রের কাজ শেষ করতেন?
ত্রুফো: উপন্যাসের উপর সিনেমা বানালে, উদাহরণস্বরূপ বলছি, আপনি চাইলে চলচ্চিত্র বানানো দুম করে বন্ধ করে দিতে পারবেন না। যন্ত্রপাতি যখন চালু হয়ে যায়, চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে যায়, তখন চাইলেই কাজ বন্ধ করে দেয়া যায় না। আর আমি অভিনেতাদের খুব পছন্দ করি, অন্তত কয়েক জন আছে- যাদের আমার ভালো লাগে, তাদের সঙ্গে কথা দিলে সেটা তো রাখতে হয়, তারাই হল কথা না ভাঙার অনুপ্রেরণা। কিন্তু একবার যখন আপনি শুরু করে দিলেন, ওই ধরনের সমস্যা আসলে দূর হয়ে যায়, ওই যে কাহিনীসূত্র নিয়ে সন্দেহপ্রবণতা, এ ধরনের সন্দেহ করা কিন্তু স্বাভাবিক ব্যাপার। তখন শুধু ছবি বানানোর যে প্রতিদিনকার ঝক্কি সেটাই থাকে। সেগুলো পুরোপুরি প্রযুক্তিগত সমস্যা, আর সেসব হাসিখেলার মধ্যেই সমাধান হয়ে যায়- বিষয়টি কিন্তু বেশ আনন্দের। যখন শুটিং শেষ, তখনও কিন্তু ওসব সন্দেহ ফিরে ফিরে আসে।

প্রশ্ন: ‘দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’ ছবির চিন্তা কখন এলো?
ত্রুফো: ‘লে মিসতোঁ’ ছবির শুটিং যখন করছি, তখন থেকেই ‘দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ’ (বাংলায় বলতে পারেন ‘চারশো আঘাত’) আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে, তখন ছবির নাম ঠিক করে রেখেছিলাম ‘আন্তোয়ান রানস আওয়ে’।

(আংশিক)

 

দ্রষ্টব্য : সাক্ষাৎকারে প্রথম বন্ধনীর ভেতরকার কথাগুলো অনুবাদকের।

সম্পর্কিত

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমার B ও ৯

আমার B ও ৯

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:২৫

উদ্ভিদ

এই অপরাহ্ণে কে কার জন্যে অপেক্ষায় থাকে?
যে ড‌াঙায় ছিপ ফেলে বসে থাকে অনন্তকাল 
তার কী জলে নামার কথা ছিল? না ধুলোঝড়ে
বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে এক
ঝলক চোখে চোখ রাখবার জন্য ব্যাকুলতা ছিল
নিছক প্রেমও আজকাল ঘোড়ারোগের মতন
দাঁড়িয়ে থেকে জাবর কাটতে কাটতে বুনোঘাস
সেখানে না থাকে ঘাসফড়িং না থাকে কাচপোকা
ধুলোবালির সংসারে অপেক্ষাও হাই তুলে বসে!
যে প‌ারে সে সব পারে খড়কুটো হয়েও টিকে 
থাকতে পারে! অসীম ধৈর্য যার থাকে তার জীবনও
বড় টেকসই; মুখোশ সরিয়ে সবুজ দিগন্ত দেখতে
পায়! হে সন্দেহ এসব ছোঁয়াচে উদ্ভিদের কাছে না 
গিয়ে জ্বলন্ত আগুন ছুঁয়ে দ্যাখো, ঝলসে যাওয়া
সময়ের ভেতরে আলো-অন্ধকার মর্মতলে বাজায়
ত্রিকাল মগ্ন সুর। সুন্দরের দিকে যত ছাইভস্ম উড়ে
এসে জুড়ে বসে কিরিচ হয়ে। দ্বিধার উপকূলে ঝরা
পাতাদের বিরহসঙ্গীত। বক্ররেখা থেকে চাঁদের নদীতে
যে নামে তার ক্ষতও নীলবর্ণ হৃদয়ের মতন। কোথাও
কী আচমকা অচেনা হাওয়া বয়ে গেল? না চূর্ণ হতে
হতে যে মানুষ হারিয়েছে গন্তব্য তার জন্য কোনো পথ
নির্দিষ্ট হলো? ভাদ্রের শেষ দিনে প্রাণের ওপর দিয়ে
তীর্থ যাবার বাসনা নিয়ে যিনি আগুনের গা ঘেঁষে 
বসেন তার জ্ঞান সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।।


বৃক্ষ
 
মায়া আছে ছায়া নেই। আজকাল 
বৃক্ষরাও বেকেচুরে বসে। স্বার্থের ঘেরা
টোপে সম্পর্করাও মুখ ফিরিয়ে নেয় 
সময়ের কার্নিশ বেয়ে যে যায় সে যায়
শরতের এমন দিনে প্রগাঢ় শব্দে বাজে
আগুন লিরিক। পথের ওপর দিয়ে পথ
চলে যায়। জলের ক্রন্দনে ভাসে আলোর
গোলক, আত্মার ধ্বনি। তারপর একা
একা বহুদূর। যেদিকে তাকাই মুখোশ
ভর্তি মুখ আর বিষজল।সব জ্বালিয়ে
পুড়িয়ে ঘাতক থিতু হয়ে বসে।অস্তিত্বের
ভেতরে এত দাহ এত শূন্যতা বুঝিনি 
আগে। লোভের অনলে খাক হয়ে যাচ্ছে
মন, সময় ও বৃক্ষ। কৃতঘ্নর লোলুপ ক্ষুধা
রক্ত‌াক্ত করে তোলে দিগন্ত। যথারীতি
পরমায়ু খেয়ে ফ্যালে লোভার্ত কুমির
ভাবনার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে খণ্ডখণ্ড
পাথর, গন্তব্যের ওপর উৎকণ্ঠা হাঁ-মুখ
খুলে বসে। সব উপমা, ঘ্রাণ, সৌন্দর্য
অদৃশ্য হতে হতে অনিশ্চিত করে তোলে
মুহূর্ত। গন্তব্য বলতে দূরত্ব, হলুদ বৈভব


শহর

একটি শহর কীভাবে মানুষের মস্তিষ্ক ভোঁতা
করে দিতে পারে তা কী তুমি জানো? নানা
পদের মানুষ শহরভর্তি। মুখোশের আড়ালে
হিংস্রতা না দেখা অভিশাপ ধূসরতা বাঁচার
বিশ্বাস। চোখহীন চোখের যাতনা লোভের
আঙটায় ঝুলিয়ে অন্ধত্ব বরণ করে নিয়েছে
যে তাকে চক্ষুষ্মান করাও বড় কঠিন আজ
ডানা ভেঙে গেলে পাখিও মুখ থুবড়ে পড়ে
শহরের উপকণ্ঠে! নীলাভ শূন্যতা কয়েদির
ম্লান হাসির সাথে দগ্ধ হতে হতে বিমূঢ় হতে
থাকে। সেই আমার বলতে আমি! নিঃসঙ্গতা
দগ্ধ পথরেখা ভাদ্রের ধূম্রজাল করোনার ক্ষীণ
ইতস্তত দ্রোহ জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে শহরকে
বৈষম্যে মুড়িয়ে দিতে উদ্যত। কী অনুচিত তা
কী শহর বোঝে? না তুমি? মধ্যদুপুরে ভাঙা
চশমার আর্তনাদ না দেখা অরণ্য ন্যায় ও
অন্যায়ের মুখোমুখি বসে। এত জটিলতা 
ভালো নয় জেনো, বিবরণের সরলীকরণ
ভালো যদিও প্রত্যাশার পরিমাপ নীতিশাস্ত্র
বোঝে না। কালের আয়নায় দ্যাখো সংসার 
সঙ সেজে উঠে যাচ্ছে যাত্রামঞ্চে। চারদিকে
এত অসঙ্গতি এত লোভ কোনো নিবৃত্তি নেই

/জেডএস/

সম্পর্কিত

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমার B ও ৯

আমার B ও ৯

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

সুমোহিনী ভেনাস

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:২০

নেফারতিতি

জানি, রাজ্ঞী নেফারতিতি, চৌষট্টি কলায় পারদর্শী।
ক্ষীণকটি তনু তন্ত্রে জগৎ এখনও মন্ত্রমুগ্ধ,
ফারাওর রক্তস্রোত বাঁধা ছিল তোমার স্নানদৃশ‍্যে
শারীরিক অনুবাদে কত কবি বিষণ্ণ উন্মাদ।
স্বপ্নোপম রূপজ্ঞানে যত বাক‍্যাবলি অধীনস্থ
বহ্নি রহস‍্য কান্তায় ঝলসে ওঠে পুরুষ হৃদয়।
নয় মিথ্যা অহংকার। মিশরীয় সভ‍্যতার মাথা
নত সম্রাজ্ঞী চরণে। দূর ভবিষ্যৎ দ‍্যুতিময়।
কী করে সম্ভব হলো! চিরন্তন পুরুষ শাসনে
সে আয়ত্তাতীত দেবী গূঢ় রাজকার্যে সর্বেসর্বা!
দু’চোখের নীল শর্তে আখনাতেন সম্মোহিত, যেন
ভ্রুভঙ্গের স্থিতি ফুঁড়ে ছুটে আসে ধনুকচ‍্যুত তির।
জাদুবিদ্যা দৃশ‍্যভ্রম। প্রাচীন ধর্মের কড়া নেড়ে
জাগছে দেবতা আতেন! তরুণ সূর্যের প্রেমে রানি!
পুরুষ–প্রধান দেশ অধিষ্ঠিত নারীর আশ্রয়ে!
মনুষ্য নখের ধারে ছিন্নভিন্ন ক্ষমতা বিন‍্যাস।
নির্বাক, নিস্পন্দ চোখে শবাধারে মিশর সুন্দরী!
প্রিয় দেবী নেফারতিতি অসতর্কে প্রস্তর পুত্তলি।

               
সুমোহিনী ভেনাস

হে স্বর্ণকেশী সুন্দরী, তুমিই কী মোহিনী ভেনাস!
অপরূপা চুপ কেন? অমন কটাক্ষে কোটি কোটি
পুরুষের নিদ্রাভঙ্গ। তন্বী, তুমি শিখরদশনা
চিত্রশিল্পী বতিচেল্লি বিমুগ্ধ বিস্ময়ে এঁকেছেন
ওই সৌন্দর্য-ফোয়ারা। নগ্ন দেহে সমুদ্র জাতিকা।
কুচযুগ পক্ব আতা, রতিমন্ত্রে শ্রেষ্ঠ সুমোহিনী
যেন অনন্ত কৌতুক খেলা করে বিম্ব ওষ্ঠাধরে।
যোনিপুস্প ঢাকা দিতে নিজ কেশ টানো দিগম্বরী!
কী অমেয় রূপরাশি! মোহে বুঁদ ত্রিলোক-পুরুষ
তুমি জগৎ বন্দিতা, শশিবাক‍্যে শ্রেষ্ঠ হে বিদূষী।
তবে কোন্ অভিশাপে রাজকুমারী মিরহা শ্রান্ত বৃক্ষ?
এত ঈর্ষাপরায়ণ! মহোদয়া এত, এত ক্রোধ!
কোথাও উঠেছে প্রশ্ন, পরঃকামে স্খলিতা ভেনাস।
যতসব ক্ষুদ্র মনা বিশ্ব নিন্দুকের কথা থাক।
জানি, হে প্রসন্নময়ী, ভুল তব শৃঙ্গারশতকগাথা।
এসো দেবী বঙ্গদেশে। স্থিত হও মাতৃকা আমার,
বিশ্বখ্যাত আ্যডোনিস ধীরে ধীরে নিঃশব্দ প্রণয়ে
ধ্রুব বিষ্ণু অবতার। তুমি তার প্রিয়া বরণাভী।
দেখো পবিত্র গোলাপ দেব মন্ত্রে প্রফুল্ল কমল
অপরূপ পুন্যব্রতে তব হংসী শ্বেত লক্ষ্মীপেঁচা 
আফ্রোদিতি কেন ভাবো এ তোমার দীর্ঘ পরবাস!
সুবর্ণ আপেল নয়, স্পর্শ নাও ধান‍্যের সুবাস।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

পৃথিবী

পৃথিবী

মাছ ও রন্ধনশালা

মাছ ও রন্ধনশালা

জীবনে-মরণে মহীয়সী

জীবনে-মরণে মহীয়সী

আমার B ও ৯

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২৩:৫৬

The most beautiful experience we can have is the mysterious. It is the fundamental emotion that stands at the cradle of true art and true science.’… Albert Einstein

শুনতে পায় সব্যসাচী। শুনতে পায় তার মতোই অনেকে।

সেই রহস্যের মধ্যে বিভোর এক শৈশব। তাকিয়ে থাকে। এক মহাসঙ্গীত বাজে। বিস্ময়ভ্রমণ আর ফুরোয় না।

সেই চলা। কত বই! পংক্তি, শব্দ, ধ্বনি …

  • কে আছো পথ দ্যাখাও।
  • খোঁজো, খোঁজো, খোঁজো, খোঁজো, খোঁজো, খোঁজো

মাথা ঝনঝন ক’রে ওঠে। এও সম্ভব! বিস্ফোরণ ঘটবে?

পা ঠক ঠক করে। তবুও পা ঠুকে উঠে পড়ে সে। পাঠক! পাঠক!

Golden eggs! সে কেমন?

‘…তবুও নক্ষত্র নিজে নক্ষত্রের মত জেগে রয়! –

তাহার মতন আলো হৃদয়ের অন্ধকার পেলে

মানুষের মত নয়, – নক্ষত্রের মত হতে হয়!...’

ওই ‘!’ নিয়েই জীবনানন্দ থেকে বিনয়ে ঢুকেছিলো সব্যসাচী।

বলেছিলো ‘বিনয় আপনি আমার B ও ৯’

‘নক্ষত্রের আলোয়’ পড়েছিলো ‘চাঁদ নেই দেখি দূরে নক্ষত্রেরা জ্বলে।’

  • সব্যসাচী তোমার কাছে বিনয়
  • বিনয়ের সাথেই বলি, সে ঘোর কাটাতে গেলে তাঁকে আরও গভীরে পড়তে হয়।

 

বিশ্রাম 

‘চোখে তার
যেন শত শতাব্দীর নীল অন্ধকার;
স্তন তার
করুণ শঙ্খের মতো— দুধে আৰ্দ্র— কবেকার শঙ্খিনীমালার;
এ-পৃথিবী একবার পায় তারে, পায়নাকো আর।’
… জীবনানন্দ দাশ

সেখানেই কি জুড়ে গ্যালো—

‘রূপকথা শুনেছি সে—কঙ্কাবতী, পদ্মমালা, শঙ্খিনীমালার।/ …/ভিজে অন্ধকারে ব’সে পরস্পর সেইসব রূপকথা বলি।’… বিনয় মজুমদার

‘কিন্তু কেউ আমার কবিতা সম্বন্ধে উচ্চবাচ্য সুরু করলো না, প্রশংসাও করলো না’

‘সব চুপচাপ, যেন আমার বই প্রকাশিত হয়নি’

‘কেউ ভালো ক’রে রিভিউও করলো না।’

 

নীরবতা!

হাসছি আমি। নীরবতাই আমাদের অলংকার। উচ্চবাচ্যই যদি শুরু না হয়, তাহলে প্রশংসার প্রশ্ন আসছে কেন, বিনয়! প্রশংসার শংসাপত্র প্রথম বইয়ের ক্ষেত্রে এক ফুয়েল অবশ্যই। আপনি নিশ্চই জানেন আপনার পূর্বে এবং সমসাময়িক বহু কবির লেখা, আর আমরা জানি আপনার পরে বহু উৎকৃষ্ট কাজ নীরবতায় ডুবে গ্যাছে। আপনি তবু আপনার জীবদ্দশায় স্বীকৃতির আলো পেয়েছেন, বাকিদের! থাক।

‘এই বিরাট দূরত্ব থেকে নক্ষত্রদের অস্তিত্বের খবর এনে দিচ্ছে কিসে। সহজ উত্তর হচ্ছে আলো।’… (বিশ্বপরিচয়/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

‘আমার কবিতা বেশ পুরোনো ধাঁচের, সেগুলিকে ঠিক আধুনিক কবিতা বলা চলে না।’

‘অন্যান্য তরুণ কবির ঢঙে লেখা তো আর চাইলেই হয়ে ওঠে না। ফলে এরূপ চিন্তা আমি করতাম না।’

—কবিতা কতবার কাটাছাঁটা ক’রে বুঝলেন ‘জীবনানন্দকে নকল করা এত সহজ ব্যাপার নয়’?

যদিও অনেকের ক্ষেত্রেই আমি দেখলাম তাকে নকল করা বেশ সহজ। কেউ বলছেন মরীচিকা, কেউ বলছেন চোরাবালি। কেউ বলছে ডুবডুবডুব, কেউ বলছে খালি। যদিও আপনার পরম্পরার প্রতি আস্থা প্রবলভাবে দেখি যখন আপনি বলেন—‘অগ্রজকে অস্বীকার করে কিছুই সম্ভব নয়’।

 

কেউ স্বয়ম্ভু নয়, আপনার অগ্রজরাও নয়, আপনার অনুজরাও নয়।

 

‘ধূসর জীবনানন্দ, তোমার প্রথম বিস্ফোরণে/ কতিপয় চিল বলেছিলো, ‘এই জন্মদিন’।’

 

জীবনানন্দের ঝ’রে যাওয়া নিয়ে আপনার জিজ্ঞাসা ও প্রাপ্ত উত্তর পাঠক আরেকবার প’ড়ে ফেলুক।

আপনার আত্মোপলব্ধি আপনার জ্বালানি হোলো। ঢঙ নয় ঢং ঢং ক’রে ব্রেক হোলো। শুরু হোলো আরেক যাত্রা।

রচনার পদ্ধতিতে নির্মাণের আলো পড়লো, আপনি সচেতন হলেন, যা সন্ধানী মানুষের সুনির্দিষ্ট শিল্পযাত্রা। হৃদয়ঙ্গম ও আত্তীকরণ, সেই সাথে পূর্বসূরির কাজগুলোকে চিহ্নিত ক’রে ব্যাপক প্রভাব কাটিয়ে ওঠা, নিজস্ব ভাষা-সন্ধান আপনাকে ‘বিনয়’ করলো।

সাঁচি, অমরাবতী, অজন্তা নিয়ে ভাবি।

তর্ক থাকুক। তা স্বাস্থ্যকর। তবুও elimination, analogy, editing, substitution, standard elements, dimension এই অনুষঙ্গে জীবনানন্দের ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ কবিতাটি সেই আত্মস্থ করার প্রমাণ বললে অত্যুক্তি হবে না। যা ইউনিক স্টাইলেই গতিময়।

রেখা রেখা রেখা

রঙ রঙ রঙ

আলো আলো আলো

স্পেস স্পেস স্পেস

অশোক মিত্র ‘নকশা’ প্রবন্ধে বলছেন—‘রসবিচারে রেখার মূল্য নিরূপণ হয় তা অন্যান্য চিত্র উপাদানের সঙ্গে কেমন মিলেছে, মিশেছে, তারই উপর।’

চোখের চেনাজানার প্রসঙ্গে Leonardo ও Raphael পেইন্টিং প্রসঙ্গে শ্রী মিত্রের লেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আমি তখনই আপনার elimination—এর প্রসঙ্গ নিয়ে ভাবছিলাম।

যে প্রথম বারে বারে ফিরে আসে বিশ্বের সৃষ্টিতে
কখনো-বা অগ্নিবর্ষী প্রচণ্ডের প্রলয় হুংকারে,
কখনো-বা অকস্মাৎ স্বপ্নভাঙা পরম বিস্ময়ে
শুকতারানিমন্ত্রিত আলোকের উৎসবপ্রাঙ্গণে।’

রবীন্দ্রনাথের ‘প্রান্তিক’ যা কবির রোগমুক্তির পর, তা তো আপনার আশ্রয়। শুরু -> শেষ -> শুরু… এই আলো-ছায়াতেই সে সম্পর্কিত।

গায়ত্রী আপনার কল্পনা নয়।

 

বিশ্রাম 

‘তবুও পাইন গাছ, ঋজু হয়ে ক্রমে বেড়ে ওঠে,/প্রকৃত লিপ্সার মতো, আকাশের বিদ্যুতের দিকে।’

১। চাকার ইতিহাস নয়, আপেক্ষিক স্থিতির মুক্তিতে আপেক্ষিক গতিময়তায় আপনি আলো ফেললেন।

২। প্রকরণ আপনাকে দিয়েছে মিলন ও বিচ্ছেদের গুণ।

৩। ‘জড় হইতে জন্তু এবং জন্তু হইতে মানুষ পর্যন্ত যে একটি অবিচ্ছেদ্য ঐক্য আছে এ কথা আমাদের কাছে অত্যদ্ভুত বোধ হয় না; কারণ বিজ্ঞান এ কথার আভাস দিবার পূর্বে আমরা অন্তর হইতে এ কথা জানিয়াছিলাম;…'—(পঞ্চভূত / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

৪। মাটি, গাছ, জল, আকাশ সবাই কি কথা বলতো কবির সাথে? কী কথা বলতো?

৫। জড় ও মনুষ্যআত্মা, দূরত্ব মাপবে কে? —

৬। ‘পাথর হোক লোহা হোক বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় তাদের মধ্যে কোনো নড়াচড়া নেই। তারা যেন স্থিরত্বের আদর্শস্থল। কিন্তু এ কথা প্রমাণ হয়ে গেছে যে তাদের অণু পরমাণু, অর্থাৎ অতি সূক্ষ্ম পদার্থ, যাদের দেখতে পাই নে অথচ যাদের মিলিয়ে নিয়ে এরা আগাগোড়া তৈরি, তারা সকল সময়েই ভিতরে ভিতরে কাঁপছে। ঠান্ডা যখন থাকে তখনো কাঁপছে, আর কাঁপুনি যখন আরো চড়ে ওঠে তখন গরম হয়ে বাইরে থেকেই ধরা পড়ে আমাদের বোধশক্তিতে।’… (বিশ্বপরিচয়/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

৭।’ আমরা জড়বিশ্বের সঙ্গে মনোবিশ্বের মূলগত ঐক্য কল্পনা করতে পারি সর্বব্যাপী তেজ বা জ্যোতিঃ-পদার্থের মধ্যে। অনেক কাল পরে বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে যে আপাতদৃষ্টিতে যেসকল স্থূল পদার্থ জ্যোতির্হীন, তাদের মধ্যে প্রচ্ছন্ন-আকারে নিত্যই জ্যোতির ক্রিয়া চলছে। এই মহাজ্যোতিরই সূক্ষ্ম বিকাশ প্রাণে এবং আরো সূক্ষ্মতর বিকাশ চৈতন্যে ও মনে। বিশ্বসৃষ্টির আদিতে মহাজ্যোতি ছাড়া আর কিছুই যখন পাওয়া যায় না, তখন বলা যেতে পারে চৈতন্যে তারই প্রকাশ। জড় থেকে জীবে একে একে পর্দা উঠে মানুষের মধ্যে এই মহাচৈতন্যের আবরণ ঘোচাবার সাধনা চলেছে। চৈতন্যের এই মুক্তির অভিব্যক্তিই বোধ করি সৃষ্টির শেষ পরিণাম।’ …(বিশ্বপরিচয়/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

তুলনামূলক জায়গা থেকে ঢুকে পড়ি—

৮। জগতের সঙ্গতি ও অসঙ্গতির মধ্যে এক সম্পর্কের সূত্র উপলব্ধি করা, জড়, উদ্ভিত, মানুষ যে এক অবিচ্ছেদ্য ধারায় প্লাবিত—এই বিশেষ ভাবনা আপনাকে দিলো ব্যতিক্রমী নির্মাণ।

৯। আপনি বললেন এভাবে—‘সৃষ্টির মূল যে সূত্রগুলি তা জড়ের মধ্যে প্রকাশিত, উদ্ভিদের মধ্যে প্রকাশিত, মানুষের মধ্যেও প্রকাশিত… অতএব জড় এবং উদ্ভিদের জীবন অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করতে লাগলাম আমি। এবং তাদের জীবনের ঘটনাকে মানুষের জীবনের ঘটনা ব’লেই চালাতে লাগলাম’।

১০। এভাবেই যা চিন্তায় ছিলো তাকে বিশেষ ক’রে আনলেন আপনি। নিজস্বতা ভাবনার গুণে আলোকিত হোলো।

১১। মনে পড়ছে Empedocles মিলিয়ে দিলেন Heraclitus, Thales, Anaximenes।

১২। রবীন্দ্রনাথ বললেন ‘এ তরু খেলিবে তব সঙ্গে,/সংগীত দিয়ো এরে ভিক্ষা/ দিয়ো তব ছন্দের রঙ্গে/পল্লবহিল্লোল শিক্ষা।’

‘বৃক্ষ ও প্রাণীরা মিলে বায়ুমণ্ডলকে সুস্থ, স্বাস্থ্যকর রাখে।

এই সত্য জানি, তবু হে সমুদ্র, এ অরণ্যে কান পেতে শোনো—

ঝিঁঝি পোকাদের রব—যদিও এখানে মন সকল সময়

এ-বিষয়ে সচেতন থাকে না, তবুও এই কান্না চিরদিন

এইভাবে রয়ে যায়, তরুমর্মরের মধ্যে অথবা আড়ালে।’

                                ১২ অক্টোবর ১৯৬০

১৩। সবকিছুর শেষে—‘আমি এখন যা লিখছি সে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক।’—বিনয় এ ইচ্ছে কেন!

 

বিশ্রাম

বিজ্ঞান, বিনয়, benign কি?, উৎপন্ন জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা! মিথস্ক্রিয়া? কবিতার সার্থকতা?

Isaac Asimov মহাবিশ্বের কাছে দাঁড়ালেন।

পড়তে পড়তে পৌঁছে গেলাম আবির্ভাব ও বিলয়ে।

আপনার লেখায় প’ড়ে ফেলি জন্মের রহস্য—

‘পাখি থেকে পাখি জন্মে, গাছ থেকে গাছ জন্মে, যন্ত্র থেকে যন্ত্র জন্মে, কবিতার থেকে

সকল কবিতা জন্মে, তারা থেকে সেইভাবে কেবল তারাই জন্মে—এ এক নিয়ম।

নিয়মিত গর্ভ হয়ে মাতৃগর্ভে এ-সকল—সকলই চিরকাল জন্মলাভ করে…’

জননী তারা, সন্তান তারা, ‘পিতাকে আসলে এক তারা হতে হয়—সন্তানলাভের জন্য হতে হয়…’

 

আপনি বিস্মিত হতে জানেন, তাই তো আমরা আপনার লেখায় বিস্মিত হই।

 

‘একটি চুম্বক ভেঙে খণ্ড খণ্ড করা হলে তার/প্রত্যেক খণ্ডই এক সম্পূর্ণ চুম্বক হয়ে যায়’

‘তপ্ত লৌহদণ্ড জলে প্রবিষ্ট হবার শান্তি আচম্বিতে নামে।’

‘জলীয় গান বাষ্পীভূত হয়ে যায়’

‘তবু সব বৃক্ষ আর পুষ্পকুঞ্জ যে—যার ভূমিতে দূরে দূরে/চিরকাল থেকে ভাবে মিলনের শ্বাসরোধী কথা।’

‘শুনেছি যে কতিপয় পতঙ্গশিকারী ফুল আছে’

‘আলোকসম্পাতহেতু বিদ্যুৎসঞ্চার হয়, বিশেষ ধাতুতে হয়ে থাকে।’

‘আকাশআশ্রয়ী জল বিস্তৃত মুক্তির স্বাদ পায়, পেয়েছিলো।'

‘…ক্ষত সেরে গেলে পরে ত্বকে/ পুনরায় কোশোদ্গম হবে না…’

‘বাষ্পের সহিত যদি বাতাসের মতো নাই মেশো’

‘জরায়ু ত্যাগের পরে বিস্তীর্ণ আলোকে এসে শিশু/ সৃষ্টির সদর্থ বোঝে, নিজস্ব পিপাসা, ক্ষুধা পায়’

‘শাশ্বত, সহজতম এই দান—শুধু অঙ্কুরের/ উদগমে বাধা না দেওয়া, নিষ্পেষিত অনালোকে রেখে/ফ্যাকাশে হলুদবর্ণ না—ক’রে শ্যামল হতে দেওয়া।’

‘দুপুরে মেঘের রঙ সাদা কিম্বা কালো হয় অন্য কোনো রঙের হয় না। / রাত্রি এলে সন্ধ্যাবেলা মেঘগুলি বহুবর্ণ হয়/ সোনালি রুপালি হয়, শুধুমাত্র রাত্রি এলে এ প্রকার হয়।’

‘জন্মের সময়ে সব মানুষের—শিশুদের ওজন অত্যন্ত কম থাকে।’

‘উদয়ের কালে সূর্য বৃহৎ, রক্তাভ হয়ে ওঠে।/… /মৃত্তিকা জলের চেয়ে দ্রুত তপ্ত হয় ব’লে সমুদ্রোপকূলে/সকালে স্থলের থেকে সাগরে দিকে এক বায়ু বয়ে যায়।…।’

পড়তে পড়তে শুধুই ঢুকে পড়ে এরা। আপনি যা লিখলেন কোনোটিও অজানা নয়, তবুও আপনি জানা ও দ্যাখার মধ্যে নির্মাণের গুণে বুনে দ্যান সেই রহস্য, ঢুকিয়ে দ্যান সেই রস আপনার নির্দিষ্ট ফর্মুলায় যা নতুন ক’রে দৃষ্টিকে শানিত করে, ভাবনাকে ভাস্বর করে, চেতনায় দ্যায় বিদ্যুতের চমক।

‘এই মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনাই সমগ্র বিশ্বব্যাপারের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনোটিই বিচ্ছিন্ন নয় কিছু নয়।’ এই সারকথা আপনি বললেন—‘এই বিপুল বিশ্ব—তার সম্পর্কে বিস্ময়বোধ করা ছাড়া একজন কবি আর কি করতে পারে!’

আপনি যাই মনে করুন, আমি গাইছি—‘তাই, দুলিছে দিনকর চন্দ্র তারা,/চমকি কম্পিছে চেতনাধারা,/আকুল চঞ্চল নাচে সংসারে, কুহরে হৃদয়বিহঙ্গ।’ আপনি আমার সঙ্গে গলা মেলান।

 

কেন আমি উৎপন্ন জ্ঞান বলেছি?

এককথায় আপনার ইন্দ্রিয়ানুভূতির ফসল অনুভবে উজ্জ্বল হয়েছে আপনারই প্রকাশে যা আপনার ভেতরে উদ্ভূত দর্শন।

এ বিষয়ে : নির্দিষ্ট à সাধারণ, এবং সেই সাধারণ থেকে সার্বিক সূত্রের দিকে যাত্রা আপনাকে বিশেষ করেছে সাধারণ থেকে।

আপনি নির্দিষ্টকে সাধারণ করতে গিয়ে, লেখায় সাধারণ ভাবনাকে টপকে বিশেষ দর্শনে উপনীত হলেন যা আপনার কবিতাকে মহৎ গুণ দিলো।

খুব সহজ কিন্তু জহবাবু ও সহবাবু নিয়ে এলো ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’—তে ‘কলা দিয়ে গেছে’ কবিতাটা—

‘মনে হয় শব্দ দিয়ে, শব্দের চেহারা এই ফল/সিঙাপুরী, মর্তমান এইসব বিশেষণে ফলের চেহারা নানারূপ/হয়ে যায়, চাঁপাকলা নামেও তো কলা আছে এক।’

আপনার ‘প্রাণী সৃষ্টি’ কবিতার দিকে তাকাই—

‘ঙুঙৃ’, ‘ঙাঙুঙা’, ‘ঞাঞ’ এই তিনটি শব্দ নিয়ে দেবতা বানিয়েছিলেন ও পাখি বসিয়েছিলেন। শব্দ তাকে যেমন অপিরিচিত থেকে পরিচিত করাচ্ছেন, তার সাথে সাথে আপনি artistic imperfection-এ তাকে সচেতন ভাবেই ব্যতিক্রমী স্থানে বাঁধছেন। ‘আকাশের দিকে তাকান। দেখুন একটি পাখি বসে আছে।’—এই পাখিকে আকাশে বসানোতে আমি আজও রোমাঞ্চিত হই।

আরেকটা দিক ‘আপনিও এরকম নতুন দেবতা বা দেবী সৃষ্টি করতে পারেন, যদিও আপনি মানুষ।’

এই লাইনটি লেখার আগে আপনি ইতিমধ্যেই মানুষ হয়ে দেবতা সৃষ্টি ক’রে ফেলেছেন, তার পরেই সৃষ্টির সমস্ত আলিঙ্গনে স্রষ্টা হিসেবে পাঠকের মধ্যদিয়ে যেকোনো মানুষকে সেই আসনে বসিয়ে দিচ্ছেন। শুধু রচনায় নয় পরীক্ষাগারে পাঠককে আপনি আপনার সহকর্মী ক’রে তুলছেন।

‘হ্বিয়াতুলি’ গাছের কথা ভাবি, ‘ফরাই-হা’ শব্দের কথা।

‘বিশেষণ’ কবিতাটা পাঠককে আরেকবার পড়তে বলি।

এগুলো ভাবতে ভাবতেই মনে হয় প্রচল অর্থবোধকতার ঘেরাটোপ টপকে শ্রাব্য ও দৃশ্যের আলোয় আপনি সৃষ্টির উৎসধ্বনিকে স্পর্শ করেছিলেন বিস্তৃতির পথে, যা আমাকে আলোড়িত করেছিলো গভীরভাবে।

আপনার লেখা পড়তে পড়তে সেই কথা—‘ঘ্রাণেন অর্ধভোজনং’ হয়েছে কি না জানি না, তবে এটা জানি—পাঠক তার শিক্ষায় দীক্ষায় অভিজ্ঞতায় যাপনে আপনার লাইনে হাঁটবে না। সে তার অনুভবে ও বোধে নিজস্ব রাস্তায় আপনার রচনাটি থেকে নিজের আলো জ্বালবে। যিনি লিখলেন আর যিনি পড়লেন তাদের চলা অর্ধেক বা গোটায় দাঁড়িয়ে থাকে ব’লে মনে হয় না।

কানে বাজছে আপনার লাইন—‘ধ্বনি শুধু ধ্বনি শুনে এবং না দেখে/আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি কাঠে শিরীষ ঘষা ধ্বনি।’

 

বিশ্রাম

 

‘কবিতাগুলি বিকশিত হয়ে বিশুদ্ধ গণিত হয়ে গেছে’

আপনি Mechanical Engineering এর ছাত্র ছিলেন। এরকম বহু ছাত্রই ছিলো, আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু আপনাকে যে বিষয় ভাবিয়েছে তা আমাদের ভাবিয়েছে। আপনার উদ্দেশ্য সফল।

‘I became more and more convinced that even nature could be understood as a relatively simple mathematical structure. This lucidity and certainty made an indescribable impression upon me.’ … Albert Einstein

এই উক্তি নিয়ে আপনার কাছে আসি। আপনার মডেলে ঢুকি বহির্বিশ্বকে ধারণ করার জন্য।
গণিত ও কবিতা, তাদের সঙ্গম ও বিচ্ছেদ সারা পৃথিবীতেই বহু চর্চিত। সেখানে আপনি নতুন নন, আপনার সংযোজন নতুন। ব্যক্তিগতকে বিশ্বগতকে করার প্রক্রিয়ায় সেই গণিতের শিখাটি আপনি জ্বেলে রেখেছিলেন নিরন্তর।

‘স্মরণে আসে অনেক কাল পড়েছি বিজ্ঞান,/ গণিত দিয়ে বেঁধেছে নর বিপুল বিশ্বের/সকল কিছু…’

‘ত্রিগুণে বিশ্লিষ্ট হলে ইনটারপোলেশন সিরিজের মতো/টার্মের পরেই টার্ম হয়ে যেন এ-সকল ঘ’টে যায় ঘ’টেই চলেছে

‘জ্যামিতি জমিতে ছিলো, পঙক্তিতে-পঙক্তিতে শুধু জ্যামিতিই ছিলো।’

‘আমাদের জ্ঞানদণ্ডে এক প্রান্ত শুদ্ধতম গণিত নামক শাস্ত্র আর/অন্য প্রান্ত আমাদের সকলের পরিচিত কবিতা ও কাব্য-কাব্যগুলি।/ এ এক নিয়মমাত্র, গণিত যে-ধারে থাকে আসলে বিশ্বের সব রস–/বিশ্বের সকল রস জড়ো হয়ে এসে জমা হয়ে থাকে রসের আকারে।/অন্য ধার যেই ধারে কবিতা রয়েছে তার মুখ দিয়ে এই রস পড়ে,/ বার হয়ে এসে পড়ে বাহিরের জগতে ও জগতের মোহনাগুলিতে।’

‘সঙ্গত কারণে শেষে মনে হয়, মনে হতে থাকে / চিরায়ত গণিতের সর্বোচ্চ শাখাটি আমি এবং ঈশ্বরী—/সর্বত্র বিরাজমান, বিশ্বের সকল কিছুতেই/ রূপ ও শক্তি হয়ে বিদ্যমান আছি দুজনেই।’

‘ক্রিয়াশীল থিওরেম অথবা নিয়মটিকে খুঁজে পেতে হলে সমাধান/হয়তো গণিতমতে ট্রায়াল মেথড দিয়ে বার করা, অজ্ঞাতের মান।’

‘তাহলে এক্সের বর্গ এবং ওয়াইয়ের বর্গ এবং জেডের বর্গ যোগ ক’রে নিলে—/ এই যোগফল তার ব্যাসার্ধের বর্গ হয়, এই হলো বেলুনের আকারের সূত্র তার পরে…’

‘যে কোনো গণিতসূত্র নিয়ে তার পরবর্তীদের।/বাঁ পাশে আনার পরে সে সমীকরণে/সমান চিহ্নের পরে–ডান পাশে শূন্য হয়ে যায়।’

এভাবে পড়তে পড়তে…

‘দৈর্ঘ্য, ভর ও সময় এই তিন এককের কথা/প্রায়শই উচ্চারিত হয় পৃথিবীতে,/ যেন আর কিছু নেই এই তিন একক ব্যতীত/অন্যান্য একক নেই এইরূপ কথা শোনা যায়।’

‘আমিই গণিতের শূন্য’

‘ধরিত্রীর সব প্রাণী’-র মধ্যে আমিও ভাবছি কীভাবে ঢুকে গণিতচেতনা কবিতার শরীরে, গণিতের দর্শন ইউনিভার্সাল সেটে খেলা করছে, আর তার রূপ, রস, গতি-প্রকৃতি একজন মানুষ নিবিড় অবলোকনে ও হাতে, কলমে মিশিয়ে দিচ্ছে থিওরি ও প্র্যাক্টিকালের পারস্পরিক বিনিময়ে। অখণ্ডের মতো খণ্ড, অভেদের মধ্যে ভেদ, অভিন্নতার মধ্যে ভিন্নতা, জেনারেলের মধ্যে পার্টিকুলার। এই জেনারেল প্রবলেমকে সমাধান করাই অনুভূতির সবচেয়ে বড় কাজ এবং সেখানেই থিওরেমের প্রাসঙ্গিকতা। এখান থেকেই বহির্বিশ্বের সংযোগ ও রসসিক্ত কবিতার জন্ম। আমরা এই সংযোগ থেকেই আত্মীয়তায় পৌঁছোই, ভেতর ও বাইরের নিরলস বিনিময় টের পেতে শুরু করি। ফর্মুলা বা থিওরেমের এই প্রয়োজনীয়তার প্রয়োগ আপনি কবিতায় করেছেন নিরন্তর যা আপনার কবিতাকে দিয়েছে ব্যাপ্ত (শূন্য ও পূর্ণতার) আলিঙ্গন। আমার তুলে ধরাগুলো আলাদা ক’রে দ্যাখালেও এর সম্পূর্ণ পাঠ বুনন শব্দকে কতটা প্রাধান্য দিয়েছে টের পাই, যদিও কোথাও ধারাবাহিক এই বুনন আপনার নিজস্ব জিজ্ঞাসা ও বিশ্বাসের উপর আলো ফেলতে ফেলতে বড় বেশি রকমের দীর্ঘ হয়েছে। ওই দীর্ঘ যাত্রায় যদিও আপনি ক্লান্ত হননি। আমি পাঠক হিসেবে হয়েছি কখনো।

আপনি আমাকে বললেন—‘দেখেছ গণিত আর কবিতা হুবহু মনে থাকে।’

আপনি আস্বাদ নিয়েছেন particular problem থেকে theorem এ পৌঁছনো পর্যন্ত। এই ব্যুৎপত্তি, এই সমীকরণ।

কিছু বলবেন Bertrand Russell ও Emily Dickinson?

কিছু বলবেন William Rowan Hamilton?

‘রুবাইয়াৎ’-এর ওমর খৈয়াম, আপনি?

রোমানিয়ান কবি ও গণিতবিদ Ion Barbu আপনাকে নিয়েও ভাবছি।

আর এগোতে এগোতেই অনিন্দ্য রায়ের কথা মতো ঘুরে এলাম KAZ MASLANKA-র ব্লগে। পড়লাম ‘Polyaesthetics and mathematical poetry’, এবং পরিচিত হোলাম তাঁর দেওয়া ‘Mathematical Poetry’-র সংজ্ঞার সাথে।

বিনয় আপনি জানেন এই বাংলাতেও গণিত ও কবিতা নিয়ে অনেক কাজ হচ্ছে? অনিন্দ্য রায়ের ‘অঙ্ক কবিতা’ ব’লে গবেষণামূলক কাজটি পড়তে পারেন। লেখার শুরুতে আছে—‘বব গ্রুম্যান ও বিনয় মজুমদারকে’।

একটা মজার জায়গা দিয়ে এই পর্ব শেষ করি—

‘ভোলানাথ লিখেছিল,
তিন-চারে নব্বই

গণিতের মার্কায়
কাটা গেল সর্বই।
তিন চারে বারো হয়,
মাস্টার তারে কয়;
‘লিখেছিনু ঢের বেশি’
এই তার গর্বই।’
… রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পাঠক এরও শেষে আপনারা আরেকবার বিনয়ের ‘কবিতা বুঝিনি আমি’ থেকে ‘প্রায় প্রত্যহই আমি’ প’ড়ে ফেলুন আরেকবার।

 

বিশ্রাম

 

‘সমুদ্র, নক্ষত্র, চাঁদ, নদী, ফুল সহজেই একসঙ্গে কলরব করে’

কবিতা সংযোগ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড --> রসসিক্ত কবিতা

কবিতা সংযোগহীন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড --> রসবিরহিত কবিতা

এই রসপূর্ণতার উপলব্ধিতে স্টিমুলাস ও রেসপন্সের কথা আমি ভাবি।

‘রসাত্মক বাক্য লেখা কবে যে আয়ত্ত হবে, ভাবি’—আর তা আয়ত্তের পর বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংযোগের কথা ভাবেন। ‘বহির্বিশ্ব কবিতা নামক পাত্রে রসনিষেক করে’।

এই সংযোগের কথা আপনি বারংবার বলছেন।

‘কোনো ফলের রসই—আম, লিচু প্রভৃতি ফলের রসে স্বয়ংসম্পূর্ণ রস থাকে না, মুখগহ্বরের লালার সহিত মিলনেই ও-রস মিষ্ট হয়, হয়ে যায়…’

এই আদিম, অকৃত্রিম রসের ধারা আপনাকে প্লাবিত করেছে শেষ দিন পর্যন্ত বুঝতে পারি। আপনি নিজেই কবিতায় সচেষ্ট হন, সেই লোভটুকু জাগিয়ে রাখেন। সেখানে জ্যোৎস্নাকামী এক চিন্তন যেমন দেখি, তেমনই দেখি বারংবার ‘মাংস’ শব্দের আশ্রয়, দেখি ‘শূন্যলেহন’, ‘তমোরস’, ‘আহার্যের ঘ্রাণ’, ‘লাস্যময়ী অগ্নি’, ‘পিপাসার্ত তুলি’, ‘মাতালের আর্ত নেশা’, ‘সুগভীর মুকুরের প্রতি ভালোবাসা’, ‘মিলনচিৎকার’, ‘আশ্চর্য ফুল’, ‘রসাবিষ্ট হরিতকী ফল’,‘সেতু শুয়ে থাকে ছায়ার উপরে’ ‘কুসুমের শব্দময় হাসি’, ‘তেলের খনির নিচে ভালোবাসাবাসি’, ‘যৌনাঙ্গ’, যুবক ও যুবতীর ভাব, রমণ, ‘নরম-নরম লাগে চাঁদের পাহাড়’, ‘মদিরা’, ‘গুহার রস’, ‘ভুট্টার কাত হয়ে পড়া’, ‘দেখি, টিপি, টানি, ঘষি’…

রস তার আদি মধ্যে অন্তে একাকার। সে কাব্যের প্রাথমিক গুণগুলোর একটি।

এমন কি আপনার ‘অঘ্রানের অনুভূতিমালা’ নারীভূমিকা বর্জিত আপনার কথায়, কিন্তু একাকিত্বের মধ্যেও আদিরস বর্জিত ব’লে আমার মনে হয় না। প্রকৃতির মধ্যেও আমি রসসন্ধানী হয়ে সেই রূপ, রস, গন্ধ, বর্ণের কাছে যাচ্ছি। আপনার অবগাহন আমার বাইরেটাকে ভেতরের আলিঙ্গন দিচ্ছে। আমিও সেই সংযোগে বুঁদ হয়ে মোহানা মোহানা মোহানা মোহানা বলতে বলতে কাত হয়ে পড়ছি। আমার কল্পনাবিস্তার আমারই। আপনার হাত নেই।

‘প্রতি অঙ্গ লাগি  কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর’ 

‘‘বাল্মীকির কবিতা’ বইখানির কথা মনে পড়লেই আমি খুব লজ্জা পাই। তার কারণ অত্যন্ত অশ্লীল গোটা কয়েক কবিতা এই বইতে আছে।’

আপনি অন্যদিকে তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার উদাহরণ দিয়ে লিখেছিলেন ‘এতো অশ্লীল কবিতা। সমস্ত ডাক্তারী বইও অশ্লীল।…’

সঙ্গম ও প্রশান্তি। চুম্বন, লেহন, স্পর্শ, মর্দন। সৃষ্টি ও সম্ভাবনার মধ্যে আমরা ঝুঁকে পড়ি।

বিশ্বসাহিত্যের বহু লেখাই তবে অশ্লীল!

আপনি তো যৌনতার অবগুণ্ঠন খুললেন, দ্যাখালেন এইভাবেও লেখা হয়। একে জড়তামুক্তি হিসেবেই দেখছি।

আপনিই তো লিখলেন—‘—এই ব্যাপারের তুল্য অন্য কোনো কীর্তি মানুষের নেই বলে স্পষ্ট টের পাই।’

কবি নিষ্কাম নন।

কবির যৌন আকাঙ্ক্ষা আছে বাকিদের মতোই। ফলে ‘অশ্লীল’ শব্দটাকেই আজ বড় বেশি অশ্লীল মনে হয়।

কুমারসম্ভবের কবি কালিদাস কী বলছেন?

Nudity নিয়ে চিত্রশিল্পীরা, চলচ্চিত্রশিল্পীরা?

 

পাশাপাশি দুটো ছবি—Claude Monet—এর ‘Lady in the garden’ আর Paul Cezanne-র ‘The smoker’। ব্যক্তির উপস্থিতি দুরকম সংযোগের মধ্যে আছে, অথচ এই দুজনের জড়িয়ে থাকার উপর ছবির ফ্রেমমুক্তি দাবি করছে দুটো অবস্থা। ছবির রসাস্বাদনের সময় একজনের উপস্থিতি তার চারপাশকে প্রকট করছে, আরেকটিতে চারপাশ—ব্যক্তিটিকে প্রকট করছে।

 

বিশ্রাম

 

সংযোগ

১। নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে একজন মানুষ সমস্ত রহস্যের মুখোমুখি হচ্ছেন।

২। দিনপঞ্জী তাঁর কবিতাকে আশ্রয় করছে।

৩। পারিপার্শ্বিক জগতের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করছেন।

৪। পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধির আলো কল্পনাশ্রয়ী হচ্ছে।

৫। বিষয়বস্তুকে অবলম্বন ক’রে নিজস্ব যুক্তি ও বিচারের আলোয় অধীত শিক্ষাকে মিশিয়ে দিচ্ছেন।

৬। অবয়ব থেকে অনুভূতির ক্ষরণ ঘটছে, চুইয়ে পড়ছে বলা ভালো।

৭। সঞ্জাত সিদ্ধান্ততে উপনীত হচ্ছেন।

৮। বস্তুর সাথে মানসিক সম্পর্ক।

৯। বৈশ্বিকতার দিকে অগ্রসর হতে গিয়ে বর্ণনার মধ্যদিয়ে বিশেষকে সাধারণ করা।

১০। concrete to abstract

১১। জীবন ও জগৎ একই শরীরে মিশে খুঁড়ে চলেছে রহস্যের পথ। এক শিশুর মনস্তাত্ত্বিক ক্রমবিকাশও জায়গা নিয়েছে।

১২। ভাব শব্দের অধীনে ‘যন্ত্রের অন্তর্নিহিত তত্ত্ব, দেহবিধৃত অনুভূতি, গণিতের দর্শন, কবিতার অনুভূতি’ লেখার বীজ হয়েছে।

১৩। Psychological association, দর্শনসমীকরণ, হৃদয়াবেগ সমীকরণ।

১৩। ঘুম, ক্ষত, রহস্য, জন্ম, যৌবন, অসুখ, আলিঙ্গন, মিলন, জ্বলা, জেগে ওঠা, নিরাময়, মাধুর্য, মৃত্যু, বার্ধক্য, সুখ, আত্মহত্যা, বিরহ, নেবা, আপেক্ষিক স্থিতি, আপেক্ষিক গতি, যোগ, বিয়োগের এক আশ্চর্য সমীকরণ।

১৪। শরীর যার আছে, ভাবনাও তার আছে।

১৫। মহাকালো ও আলোর মাঝে এক পর্যটন। সম্পর্কিত কার্যকারণের ছায়ায় এসে বসে।

বলা যায় এ যা কিছু, তার রসায়নই আপনার লেখার সজীব উপস্থিতি। আপনার কাব্যরচনার উপকরণ যা আপনাকে দিয়েছে নিজস্ব রাজপথ। সময়ের মধ্যে থেকে বৃহত্তর উম্নীলন।

 

বিশ্রাম

 

‘চিরকাল একত্রিত হয়ে থাকো’

আপনার নির্মাণ সেই পথেই চলেছে। কারণ আপনি আপনার ভাবনার প্রয়োগ করেছেন আপনার লেখায়।

দেহ ও অন্তর এক এবং অভিন্ন এই ভাবনায় আপনি পৌঁছে যান অবয়ব ও ভাবের একাত্মরক্ষায়।

নারীদেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ ও কবিতার যোগ নিয়ে আপনার লেখাটার কাছে দাঁড়াই।

উত্তেজনাপূর্ণ, যৌনতাপূর্ণ এবং রহস্যময় অনুভূতি?

আপনার প্রেম একমুখী?

গায়ত্রী? ঈশ্বরী?

শারীরিক?

মানসিক?

আত্মিক?

বিকৃত?

গুপ্ত?

নগ্ন?

না?

হ্যাঁ?

প্রেম প্রেমই।

‘শুধু কৌতুকে কেন মনোলীনা অমন দুললে?’

‘মানুষীর আকৃতির মতো তুমি দেখা দিয়েছিলে’

‘আর অন্ধকার নয়, আর নয় অবাঞ্ছিত ছায়া।’

‘প্রত্যাখ্যাত প্রেম আজ অসহ ধিক্কারে আত্মলীন।’

‘পর্দার আড়ালে থেকে কেন বৃথা তর্ক ক’রে গেলে—’

‘সফল কবিতা আজ নিপুণিকা প্রেমিকার মতো’

‘ছবি আঁকবার কালে, কোনো যুবতীর ছবি আঁকার সময়ে/ তার সব প্রত্যঙ্গকে হাজির রাখাই হলো বেশি দরকারি—’

‘পরস্পর ভালোবেসে শুয়ে আছি ঈশ্বরী ও আমি ও সময়’

‘যে-কোনো সহসম্পর্ক স্থাপন প্রকৃতপক্ষে, সখি, লেহন মর্দন ঠাপ চুম্বনের মতো মান রূপে…’

‘ভুট্টাটি সহজভাবে ঢুকে গেল সঙ্গে সঙ্গে ধাক্কা শুরু করি।’

‘আমার ঠিকানা আছে তোমার বাড়িতে,/ তোমার ঠিকানা আছে আমার বাড়িতে,/চিঠি লিখব না।/আমরা একত্রে আছি বইয়ের পাতায়।’

পাঠক যে কবিতাগুলো থেকে এই লাইন তুলেছি সেগুলো খুঁজে আরেকবার পড়তে পড়তে উপরে করা পশ্নগুলোর উত্তর খুঁজুন।

প্রেম প্রেমই।

 

বিশ্রাম

 

আপনার অভিজ্ঞ ছন্দ

‘আমাদের পুরাণে ছন্দের উৎপত্তির কথা যা বলেছে তা সবাই জানেন। দুটি পাখির মধ্যে একটিকে যখন ব্যাধ মারলে তখন বাল্মীকি মনে যে ব্যথা পেলেন সেই ব্যথাকে শ্লোক দিয়ে না জানিয়ে তাঁর উপায় ছিল না। যে পাখিটা মারা গেল এবং আর যে একটি পাখি তার জন্যে কাঁদল তারা কোনকালে লুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু এই নিদারুণতার ব্যথাটিকে তো কেবল কালের মাপকাঠি দিয়ে মাপা যায় না। সে-যে অনন্তের বুকে বেজে রইল। সেইজন্যে কবির শাপ ছন্দের বাহনকে নিয়ে কাল থেকে কালান্তরে ছুটতে চাইলে। হায় রে, আজও সেই ব্যাধ নানা অস্ত্র হাতে নানা বীভৎসতার মধ্যে নানা দেশে নানা আকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সেই আদিকবির শাপ শাশ্বতকালের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে রইল। এই শাশ্বতকালের কথাকে প্রকাশ করবার জন্যেই তো ছন্দ।’… রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

(আপনার ছন্দ নিয়ে বলতে যাওয়া অতিরিক্ত। আপনিই সব বলেছেন প্রবন্ধে।)

কয়েকটি কথা

১। আপনিও প্রকাশ করলেন ছন্দে।

২। বাঁধলেন মুক্তি দিতেই।

৩। আপনি গণিতের মানুষ, গাণিতিক মডেল আপনার ভেতরে। আপনার ছন্দ তাই ভারসাম্য বজায় রেখেই সাবলীল।

৪। আপনার মাত্রাজ্ঞান স্মরণীয়।

৫। পরিমাপে আপনি সিদ্ধহস্ত।

৬। মিশ্রকলাবৃত্তর মতো বনেদি ছন্দের ব্যবহার আপনাকে মানাল। সংযত ও গম্ভীর ভাব তাকে মান্যতা দিলো। ঘোড়দৌড় কি আপনার কবিতায় মানায়?

 ৭। ওই ২মাত্রার জিরিয়ে নেওয়া।

৮। ছন্দের সঙ্গে জিহ্বার সম্পর্ক।

৯। আট-ছয় আট-ছয় পয়ারের ছাঁদ কয় …

১০। আপনি কানে কানে বললেন—‘কেউ নিখুঁত পয়ার লিখতে পারলেই তাকে কবি ব’লে স্বীকার করা যায়, স্বীকার করা উচিত।’

আমি হেসে মনে মনে বললাম—‘এ আপনার পয়ার লেখার নিখুঁত পদ্ধতি আবিষ্কারের আনন্দ মাত্র’।

এক বিশ্বপথিক এভাবেই হাঁটে, এক বিস্ময়বালক এভাবেই খ্যালে, এক মহামস্তিষ্ক এভাবেই চলে,

এক অবিরাম ঘড়ি থামে না

থামে না।

অসীমতায় হাত রাখে সীমায় ব’সে।

মহাবিশ্বর স্পন্দন মাপে নিজের তৈরি স্টেথোস্কোপ দিয়ে।

এক নক্ষত্র দেখি আমি।

বিনয় আপনি—

শুধু গণিতে নয়

শুধু গায়ত্রীতে নয়, ঈশ্বরীতে নয়

শুধু সঞ্জাত দর্শনে নয়

শুধু বিজ্ঞানে নয়

শুধু ছন্দে নয়

শুধু ভুট্টায় নয়

শুধু ‘প্রকৃত প্রস্তাবে’, ‘মুকুরে প্রতিফলিত’ নয়

আপনি আমার B ও ৯। আপনি কবিতাময়, কবিতাময়…

মৌমাছির রসনা মিষ্টতাকে পূর্ণ ক’রে নিলো। পান করলো।

মনে পড়ছে

একটা প্রশ্ন ক’রে আপনাকে বিব্রত ক’রে ও আপনার একটি কবিতা দিয়ে শেষ করি—

‘কে কত বড় গুরু তা বিচার হয় তার শিষ্য দিয়ে।’—আপনার গুরু হওয়ার বাসনা জেগেছিলো কেন?

 

এ জীবন / বিনয় মজুমদার

পৃথিবীর ঘাস, মাটি, মানুষ, পশু ও পাখি—সবার জীবনী লেখা হলে

আমার একার আর আলাদা জীবনী লেখা না-হলেও চলে যেতো বেশ।

আমার সকল ব্যথা প্রস্তাব প্রয়াস তবু সবই লিপিবদ্ধ থেকে যেতো।

তার মানে মানুষের, বস্তুদের, প্রাণীদের জীবন প্রকৃতপক্ষে পৃথক পৃথক

অসংখ্য জীবন নয়, সব একত্রিত হয়ে একটি জীবন মোটে; ফলে

আমি যে আলেখ্য আঁকি তা বিশ্বের সকলের যৌথ সৃষ্টি এই সব ছবি।

বল্কলে আঙুল রেখে আমি বলি ‘এ কী বলো’ এবং উত্তর পাই ‘গাছ’।

পাতায় আঙুল রেখে আমি বলি ‘এ কী বলো’ তখন উত্তর পাই ‘গাছ’।

শিকড়ে আঙুল রেখে আমি বলি, ‘এ কী বলো’ তবুও উত্তর পাই ‘গাছ’।

কুসুমে আঙুল রেখে আমি বলি ‘এ কী বলো’, এবারো উত্তর পাই ‘গাছ’।

তা সত্ত্বেও পৃথিবীতে অত্যন্ত বিশিষ্ট ব’লে ফুলকে পৃথক ক’রে ভাবি—

প্রণয়িনী ফুল বলি, এ রীতিও রয়ে গেছে; প্রকৃতিতে ব্যক্তি আছে,

                                                        ব্যক্তি পূজা আছে।

জীবন ফুরিয়ে এল, এই সব জেনে খ্যাতি তৃপ্তি প্রণয়ের সেঁক

চেয়ে চেয়ে শালবনে বাঁশবনে এ জীবন কাটিয়ে দিয়েছি।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

পর্ব—তিন

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২৩:৫৪

পূর্বপ্রকাশের পর

এরিস্টটলের সাহিত্যতত্ত্ব

এরিস্টটল (৩৮৪ খ্রি. পূ.-৩২২ খ্রি. পূ.) ছিলেন প্লেটোর সবচেয়ে বিখ্যাত ছাত্র। তাঁর জন্ম মেসিদোনিয়ায়। ১৭ বছর বয়সে তিনি এথেন্সে এসে প্লেটোর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ৩৪৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্লেটোর মৃত্যুর পরে তিনি এথেন্স ত্যাগ করেন। ৩৩৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তিনি পুনরায় এথেন্সে ফিরে আসেন এবং তাঁর স্কুল লাইসিয়াম শুরু করেন। ৩২২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তিনি লাইসিয়াম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন এবং ঐবছরই ক্যালচিস নামক শহরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বলতে গেলে জ্ঞানবিজ্ঞানের এমন কোনো শাখা যার ওপর এই ৬২ বছরের জীবনে এরিস্টটল কাজ করেননি। জ্ঞানবিজ্ঞানের এই সকল শাখায় তিনি যে বইগুলো রচনা করেছিলেন সেগুলো হারিয়ে গেছে। যা আছে তা সম্ভবত তার লেখা বই নয়, বরং খুব সম্ভবত তাঁর কাছ থেকে নেওয়া বিভিন্ন লেকচার নোটের সংকলন। ফলে এগুলো প্লেটোর ‘দি রিপাবলিক’-এর মতো সুলিখিত নয় এবং সাহিত্যগন্ধীও নয়। সাহিত্য বিষয়ে ‘পোয়েটিকস’ নামে তাঁর যে বইটি আমাদের কাছে আছে সেটিও সেরকম একটি লেকচার নোটের সংকলন। নোটগুলো তিনি হয়তো তাঁর লাইসিয়ামে লেকচারের জন্য তৈরি করেছিলেন। ফলে গ্রন্থভুক্ত বিষয়গুলোর আলোচনায় সুসংগঠিত পরম্পরা নেই, এবং ক্ষেত্রবিশেষে অনেক অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতা রয়েছে। তারপরও এটিই সাহিত্যতত্ত্ব বিষয়ে দুনিয়ার সকল দেশে সবচেয়ে বেশি রেফারেন্স দেওয়ার একটি বই। এরিস্টটলের সাহিত্যতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা মানে হলো এই বইটি নিয়েই আলোচনা।

‘পোয়েটিকস’ গ্রন্থের পরিচ্ছেদগুলোকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যায়। পরিচ্ছেদ-১ থেকে পরিচ্ছেদ-৫ পর্যন্ত বিস্তৃত প্রথম পর্বটিকে বলা যেতে পারে গ্রন্থটির সূচনা পর্ব যেখানে মাইমেসিস বা শিল্পের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য অনুকরণের অর্থ ও প্রকরণের আলোচনা রয়েছে। দ্বিতীয় পর্বের বিস্তৃতি পরিচ্ছেদ-৬ থেকে পরিচ্ছেদ-২২ পর্যন্ত। এ পর্বে মাইমেটিক আর্ট বা অনুকরণ শিল্পের একটি রূপ হিসেবে ট্র্যাজেডির গঠন ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে। পরিচ্ছেদ ২৩ থেকে ২৬ পর্যন্ত তৃতীয় পর্বে রয়েছে ট্র্যাজেডির সাথে মহাকাব্যের তুলনা। আমরা এখানে বইটির পরিচ্ছেদ ধরে আলোচনা করব না। আমরা এখানে বরং ‘মাইমেসিস’ বিষয়ে এরিস্টটল ও প্লেটোর ভাবনার পার্থক্য এবং সেই পার্থক্যের সূত্র ধরে এরিস্টটল কর্তৃক সূচিত সাহিত্যবিষয়ক নতুন ভাবনার গতিপথ দেখব।

একথা বহু পণ্ডিত বলেছেন যে, এরিস্টটলের পোয়েটিকস ভিতরে ভিতরে প্লেটোর মাইমেসিস থিয়োরির একটি সমালোচনা এবং মাইমেসিসের বিরুদ্ধে প্লেটোর উচ্চারিত অপবাদগুলোর একটি জবাব। তবে সে জবাব সরাসরি নয়, হয়তো তাতে গুরুনিন্দা হয় বলেই এরিস্টটল সরাসরি প্লেটোর নামও উচ্চারণ করেননি এবং প্লেটোর অপবাদের ধরে ধরে একটি একটি করে জবাবও দেননি।

প্লেটোর আলোচনার মতোই এরিস্টটলও তাঁর আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছেন মাইমেসিসকে, তবে মাইমেসিসের কোনো সংজ্ঞা দেওয়ার তিনি প্রয়োজন করেননি। সংজ্ঞা দিলে সে সংজ্ঞা গুরুর ভাবনার প্রতি সরাসরি দ্রোহ রূপে উচ্চারিত হবে সে ভাবনায়ও তিনি মাইমেসিসের সংজ্ঞা না দিয়ে থাকতে পারেন। তবে সংজ্ঞায় না বললেও আলোচনায় এরিস্টটল ধীরে ধীরে স্পষ্ট করেছেন তিনি কীভাবে মাইমেসিস বিষয়ে প্লেটো থেকে আলাদাভাবে ভাবছেন। প্লেটো বারবার বলেছেন যে, মাইমেসিস হলো প্রকৃতিকে এবং প্রকৃত বস্তুকে সত্য ও সঠিক রূপ থেকে ধাপে ধাপে বিকৃত করার একটি প্রয়াস। অথচ এরিস্টটল তাঁর পোয়েটিকসের ৪ নং পরিচ্ছেদে লিখেছেন ‘Poetry in general seems to have sprung from two causes, each of them lying deep in our nature. First, the instinct of imitation is implanted in man from childhood, one difference between him and other animals being that he is the most imitative of living creatures, and through imitation he learns his earliest lessons; and no less universal is the pleasure felt in things imitated.’

আশ্চর্যের সাথে লক্ষণীয় যে এই বাক্যদুটোতে এরিস্টটল যতগুলো অবধারণকে প্রকাশ করেছেন তার সবকটাই প্রায় সরাসরি মাইমেসিস বিষয়ে প্লেটোর অবধারণগুলোকে অস্বীকার করে। প্লেটো বলেছেন মাইমেসিস প্রকৃতিকে তথা প্রকৃত সত্যকে একধাপ বিকৃত করে। তার মানে প্লেটোর মতানুযায়ী মাইমেসিস একটি প্রকৃতিবিরুদ্ধ প্রক্রিয়া। কিন্তু এরিস্টটলের মতে মাইমেসিস প্রকৃতির গভীরে প্রোথিত এবং প্রকৃতির গভীর থেকে উৎসারিত (lying deep in our nature)। এরিস্টটলের মতে অনুকরণের প্রবৃত্তি মানবের জন্ম থেকে অর্জিত। তাই এ প্রবৃত্তি পরিহার্য তো নয়ই বরং এই প্রবৃত্তিই মানুষকে পশুজগতের থেকে আলাদা করেছে, অর্থাৎ এটি মানবজন্মকে মহীয়ান করে তুলতে পারে এমন এক চর্চা। অথচ প্লেটো বলেছিলেন মাইমেসিস বা অনুকরণ মানুষকে অজ্ঞানতার অন্ধকারের দিকে চালিত করে। আরো এক ধাপ এগিয়ে এরিস্টটল বলেছেন অনুকরণ একটি সার্বজনীন নান্দনিক আননন্দের উৎস। প্লেটো বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই অনুভব করতেন যে, তাঁর সুযোগ্য শিষ্য এই অবধারণগুলোর প্রতিটির মধ্যদিয়ে তাঁকে একটি করে চপেটাঘাত করছেন। 

মাইমেসিসকে এভাবে মহীয়ান করে তুলে এরিস্টটল ইহাকে শিল্পের জন্য অপরিহার্য ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন শিল্পের যতরূপ আছে সবই আদিতে অনুকরণ। শিল্পের রূপ নির্ধারিত হয় অনুকরণের মাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে। অনুকরণের মাধ্যম ভাষা হলে শিল্পরূপটির নাম হয় সাহিত্য, মাধ্যম সুর হলে তার নাম হয় সঙ্গীত, মাধ্যম ছন্দ (rhythm) হলে তার নাম হয় নৃত্য। অনুকরণের মাধ্যমের পরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনুকরণের বস্তু বা বিষয়টি। অনুকরণের বিয়য়বস্তু মহৎ মানুষের কর্মকাণ্ড হলে নির্মিত হয় মহাকাব্য বা ট্র্যাজেডি আর নিচশ্রেণি বা খল চরিত্রের মানুষের অনুকরণের মধ্যদিয়ে নির্মিত কমেডি। অনুকরণের অন্তর্গত এই সকল বিষয় বিবেচনায় রেখেই মাইমেসিস সম্পর্কে ভাবতে হবে। মাইমেসিসকে ভাবতে হবে অনুকরণের মাধ্যম, বিষয় ও চারিত্র্যের সাথে সংশ্লিষ্ট করে, প্লেটোর ‘ফরম’ সম্পর্কিত মতবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট করে নয় কিংবা মিরর ইমেজের উৎপাদক হিসেবে জ্ঞান করে নয়। ‘ফরম’ সম্পর্কিত প্লেটোর মতবাদের সাথে মেলাতে গেলেই মাইমেসিসের দায় হয়ে পড়ে যে বস্তুকে সে অনুকরণ করছে তার একটি দার্পণিক প্রতিবিম্ব বা মিরর ইমেজ তৈরি করা। কিন্তু মাইমেসিস তার মাধ্যম, বিষয়বস্তু আর চরিত্রগত আচার (manner) দ্বারা এমনভাবে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন একটি বিষয় যে তার দায় পড়েনি বস্তুর দার্পণিক প্রতিবিম্ব তৈরি করা। এভাবে ভাবতে পারলে মাইমেসিসকে মুক্ত করা যাবে প্লেটোর আরোপিত অপবাদগুলো থেকে। এ কথা বোঝাতেই এরিস্টটল ‘পোয়েটিকস’-এর একদম শুরুতেই বলেছেন ও I propose to treat of poetry in itself| এই in itself এর ইঙ্গিত হলো মাইমেসিসকে প্লেটোর ‘ফরম’ সম্পর্কিত মতবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট করে ভাবা যাবে না। এভাবে এরিস্টটল প্লেটোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে মাইমেসিসকে শুধু শিল্প অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিতই করেননি, মাইমেসিসের মাধ্যমে অর্জিত শিল্পের রূপ ও প্রকরণ সম্বন্ধেও তিনিই প্রথম তাত্ত্বিক ধারণা দিয়েছেন।

এরিস্টটলের তত্ত্বমতে সাহিত্য মাইমেটিক আর্ট হিসেবে দার্পণিক প্রতিবিম্ব তৈরি করে না, বরং বস্তুর আইকন তৈরি করে। এরিস্টটল ‘পোয়েটিকস’-এর ৪র্থ পরিচ্ছেদে লিখেছেন ‘Thus the reason why men enjoy seeing a likeness is that in cotemplating it they find themselves learning or inferring, saying perhaps ‘Ah, that is he’. For if you happen not to have seen the original, the pleasure will be due not to the imitation as such, but to the execution, the colouring, or some such other cause.’ এরিস্টটল এখানে বলেছেন যে, মাইমেসিসের কাজ হলো সাদৃশ্যভিত্তিক, সাদৃশ্যের মাধ্যমে অনুকৃত বস্তুর কাছাকাছি যাওয়া (seeing a likeness), মোটেই অবিকল বস্তুটি উৎপাদন করা নয়। আর এই সাদৃশ্যের জন্য মূল বস্তুটি আদৌ দরকারিও নাও হতে পারে। কারণ মূল বস্তু আদৌ না দেখেও, শুধু অনুকৃত বস্তু দেখেও আনন্দ লাভ ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে অনুকরণ নয়, কাজটির সম্পাদন (execution), সে সম্পাদনে রঙের ব্যবহার বা অন্য কোনো বিষয়ের কারণেও আনন্দটি লাভ করা যেতে পারে। মোটের ওপরে এরিস্টটল পুরোপুরি সরে গেছেন প্লেটোর সেই আপ্ত ধারণা থেকে যে, মাইমেটিক আর্টের কাজ হলো বস্তুর প্রতিবিম্ব উৎপাদন। এরিস্টটল বরং বলতে চান অনুকৃত বস্তু কোনো দিন না দেখেও বস্তুর এই অনুকরণশিল্পের সাধনা সম্ভব। কথাটি আরো স্পষ্ট হয় ‘পোয়েটিকস’-এর ২৫তম পরিচ্ছেদে। সেখানে এরিস্টটল বলছেন not to know that a hind has no horns is a less serious matter than to paint it inartistically । দেখা যাচ্ছে, শিংসমেত একটি হরিণী অংকন করা যা বস্তু সত্যের পুরো লঙ্ঘন তা-ও মাইমেটিক আর্টে মেনে নেওয়া সম্ভব। তার মানে হলো মাইমেটিক আর্টের কাজ নয় প্রকৃতির প্রতিবিম্ব নির্মাণ, তার কাজ হলো অনুকরণের নিজস্ব রীতি-বৈশিষ্ট্যের মধ্যে থেকে নান্দনিক আনন্দ সৃষ্টির লক্ষ্যে বস্তুর প্রতীকী উপস্থাপন বা বস্তুর আইকন নির্মাণ।

আইকন মানে ঠিক বস্তুটি নয়, বরং বস্তুর সাথে অপরিহার্য সম্পর্কযুক্ত এমন কিছু যা ঐ বস্তুকে বোঝায়। ‘গাছ’ দ্বারা আমরা যে বস্তুটি বুঝি তার সাথে ‘গাছ’ ধ্বনির কোনো অপরিহার্য সম্পর্ক নেই, বরং যে সম্পর্কটি আছে তা সম্পূর্ণ খামখেয়ালি গোছের। ফলে ‘গাছ’ শব্দটি বস্তু গাছের কোনো আইকন নয়। কিন্তু একটি মুখমণ্ডলের ছবি মুখমণ্ডলটির আইকন কারণ এর সাথে মুখমণ্ডলটির অনস্বীকার্য ও অপরিহার্য সম্পর্ক রয়েছে। একটি মুখমণ্ডলের ছবি, সত্যিকারের কোনো মুখমণ্ডলের প্রতিকৃতি না হয়েও আইকনিক হওয়ার মধ্যদিয়ে আনন্দ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়, যেমন কার্টুনের জন্য আঁকা মুখমণ্ডলগুলো আমাদেরকে আনন্দ দিয়ে থাকে। কার্টুনরূপ মনুষ্য চেহারা মানুষের চেহারার সাথে ন্যূনতম সাদৃশ্য নিয়েই মাইমেটিক আর্ট হতে পারছে, কোনো নির্দিষ্ট চেহারার সাথে আদৌ সাদৃশ্যপূর্ণ হতে হচ্ছে না। ঐ ন্যূনতম সাদৃশ্য থেকেই দর্শক চিনতে পারছে আইকনটি কিসের? আর চিনতে পারার মধ্যদিয়েই তার মধ্যে এক আনন্দ অনুভবের অনুরণন ঘটছে। আইকনিক উপস্থাপনার দ্বারা এরিস্টটল এরূপ মাইমেটিক আর্টের কথা বলেছেন যা প্লেটোর বলা মাইমেটিক আর্টের ভাবনা থেকে যোজন যোজন দূরের ভাবনা। প্লেটো মাইমেটিক আর্টকে বর্জনীয় বলছেন কারণ, এই আর্ট বস্তুর প্রতিবিম্বে খুঁত তৈরি করে (flawed image), আর এরিস্টটল মাইমেটিক আর্টের নান্দনিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে সেই খুঁতকেই মূল্যায়ন করছেন। এই ভাবনা দ্বারা এরিস্টটল নিশ্চিত করছেন যে, মাইমেটিক আর্টের উৎকর্ষের পরিমাপক মোটেই সাদৃশ্যের সঠিকতা নয় বা নিখুঁত সাদৃশ্য নয়। বরং এর উৎকর্ষের পরিমাপক হবে আর্ট হিসেবে চর্চার জন্য এর উপযোগী বিভিন্ন কলাকৌশল ও রীতিনিয়ম। যা ঘটে তার নিখুঁত বর্ণনা মাইমেটিক আর্ট হলে ইতিহাস হতো ট্র্যাজেডি বা কমেডির চেয়ে উঁচু সাহিত্য। অথচ, আমরা জানি ইহিতাস সাহিত্য নয়, বরং ট্র্যাজেডিই সাহিত্য। ট্র্যাজেডি যা ঘটেছে তার বয়ান নয়, যা ঘটতে পারে তার বয়ান। যা ঘটেছে তা নয়, বরং যা ঘটতে পারে বা পারত মাইমেসিসের মাধ্যমে তার অনুকরণের দিকেই এরিস্টটলের আহ্বান।

প্লেটো সাহিত্য বা মাইমেটিক আর্টকে নিষিদ্ধ করার পেছনে একটি যুক্তি দেখিয়েছিলেন এই যে, ইহা মানুষের অনুভবগুলোকে জাগিয়ে তুলে তার যুক্তিবুদ্ধিকে (Reason) বিনষ্ট করে। প্লেটোর এই বক্তব্যের বিপরীতে রয়েছে এরিস্টটলের ‘ক্যাথারসিস’ তত্ত্ব। এরিস্টটলের ক্যাথারসিস তত্ত্ব অনুযায়ী ট্র্যাজেডি মানুষের মাঝে ‘করুণা’ ও ‘ভীতি’র অনুভব (pity and fear) জাগিয়ে মানুষের যুক্তিবুদ্ধিকে (Reason) বিনষ্ট তো করেই না, বরং এই অনুভূতিগুলো প্রবলভাবে জাগিয়ে তুলে তা মানুষের অনুভবরাজ্য থেকে সরিয়ে দিয়ে অর্থাৎ মানুষের অনুভরাজ্যের অপদ্রব্য সরিয়ে দিয়ে মানুষটিকে বিশুদ্ধ করে তোলে এবং এর মাধ্যমে মানুষটির যুক্তিবুদ্ধি (Reason) আরো পরিষ্কার হয়, শানিত হয়। এভাবেই এরস্টিটল তাঁর পোয়েটিকসে পরোক্ষে সাহিত্যের বিরুদ্ধে তাঁর গুরুর উত্থাপিত অভিযোগসমূহ খণ্ডন করেছেন এবং অনুকরণধর্মী শিল্প হিসেবে সাহিত্যের জয়গান উচ্চারণ করেছেন যা সাহিত্যের পাঠকদেরকে সাহিত্য বুঝতে ও সাহিত্যের রসাস্বাদনে হাজার হাজার বছর চিন্তার আশ্রয় হিসেবে কাজ করেছে। সাহিত্য সম্পর্কে এরিরস্টলের এই ভাবনার পরে আমরা আসবো রোমান যুগের আর এক সাহিত্যবোদ্ধার ভাবনার সাথে পরিচিত হতে। তিনি হলেন লঞ্জাইনাস, যাঁর নাম আমরা অনেকে লঙিনুস রূপে উচ্চারণ করে থাকি। চলবে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমার B ও ৯

আমার B ও ৯

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২২:৩৫

তুমি নামের অচেনা কেউ

চার উপাঙ্গ সমানে দোলাও
বিলিয়ে যাও জুরাসিক কালের গান
তুমি কি পাখির মতন?

অথবা মূক বৃক্ষের মতন নির্বিকার
          ফ্যাকাসে ধুলোর সরানে
          ঢেলে দাও মধুর অম্লজান।

সবরমতী এক্সপ্রেসের মতন 
ধেয়ে আসে ঈশান-ঘূর্ণি
পাখিরা পালায়—ভেঙে যায় ডানার অহংকার
শেকড়ের ওজরেও নুয়ে পড়ে বৃক্ষ।

তুমি আসলে বাতাস
ভেঙে দাও প্রকাশরূপ—আলোর সংস্করণ।


জল ছাড়া অন্যকিছু 

শৈশবের নদী
যার ঢেউগুলোকে কুমারীর কুচ ভেবে
লাফিয়ে ওঠে পানকৌড়ি,

মানুষ পানিউড়ি হলে
জেনে যায় কবিতা আসলে উলঙ্গ সমুদ্দুর
যার চিকন ঢেউয়ে যুবতী আঁচলের ভ্রম,

মুহাজির মানুষ ঢেউ সোয়ারি হলে
জেনে যায় কবিতা জল ছাড়া কিছু নয়
যে কেবল তৃষ্ণা মেটায় না—ডুবিয়েও মারে।


নাস্তিকাল

বারবেলা পড়ে আছে
                  নাগরিক উঠোনে
কণ্ঠস্বরগুলোর ওপর 
            সেঁটে আছে লকডাউন 

ও পৌষালি পাখি
গান গাইবার আগে মিলিয়ে নাও
          গ্রহস্ফুটের নক্ষত্র সংখ্যা

পরিযায়ী মেঘের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে—ফলাফল
বাক্য নাস্তি, শ্রুতি নাস্তি, দর্শন নাস্তি।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমার B ও ৯

আমার B ও ৯

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমার B ও ৯
সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—তিনসাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

শেকড়ে ও সত্তায় শাহাবুদ্দিন

শেকড়ে ও সত্তায় শাহাবুদ্দিন

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—দুইসাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সর্বশেষ

শিক্ষক ও সহায়ক পদ বাড়ছে প্রাথমিকে, দ্রুত পদোন্নতির সুপারিশ

শিক্ষক ও সহায়ক পদ বাড়ছে প্রাথমিকে, দ্রুত পদোন্নতির সুপারিশ

না ফেরার দেশে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ী তারকা

না ফেরার দেশে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ী তারকা

রাশিয়ার নির্বাচনে এগিয়ে পুতিনের দল

রাশিয়ার নির্বাচনে এগিয়ে পুতিনের দল

আজ থেকে প্রতিদিন ৪ ঘণ্টা সিএনজি স্টেশন বন্ধ

আজ থেকে প্রতিদিন ৪ ঘণ্টা সিএনজি স্টেশন বন্ধ

আইসিটি আইনের মামলায় বিএনপি সমর্থিত ১১ আইনজীবীর জামিন

আইসিটি আইনের মামলায় বিএনপি সমর্থিত ১১ আইনজীবীর জামিন

© 2021 Bangla Tribune