সেকশনস

যে অপরাধ ভোলার নয়

আপডেট : ১৫ জুন ২০২০, ১৫:২৫

কাজী জাহিন হাসান কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড হত্যার ঘটনায় শুরু হওয়া বিক্ষোভ বর্ণবাদ নিয়ে দীর্ঘ অমীমাংসিত আলাপকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
অল্প কিছুদিন আগেই, পরিচিত এক ব্রিটিশ নারীর সঙ্গে বর্ণবাদ নিয়ে কথা হচ্ছিলো। কথায় কথায় আমি তাকে বললাম ইংল্যান্ডের স্কুলগুলোর ছাত্রদের ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ আর শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের মাহাত্ম্য না পড়িয়ে এর ভয়ংকর দিকগুলো নিয়ে পড়ানো উচিত।  সেদিন সেই পরিচিত আমার কথায় অনেকটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। উনি অভিযোগের সুরে বললেন, সবাই নাকি আলাদা করে শুধু ব্রিটিশদেরই সমালোচনা করে, জাপানি আর অটোমান সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে কেউ কথা তোলে না। সঙ্গে এও বললেন, যাদের ব্রিটেন নিয়ে এতই অভিযোগ, তারা ব্রিটেনে কেন আসে বা এখানে থাকেই বা কেন!
এরকম ঘটনা নতুন কিছু নয়। ব্রিটেনে বসবাসরত বাদামি চামড়ার মানুষরা ব্রিটিশদের অতীত নিয়ে প্রশ্ন তুললে তাদের একটাই কথা—‘এখানে ভালো না লাগলে দেশে চলে যাও।’ ব্রিটিশদের উদ্দেশে আমার কথাটা হচ্ছে—তোমাদের যা দরকার তা হলো ইতিহাসের যথাযথ পাঠ। আর সেটাই এখানে আমি দেওয়ার চেষ্টা করছি।

সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাস পাঠের জন্য ধরে নিই ব্রিটেন ও তার কলোনিগুলো ভিন্ন ভিন্ন দুটি শহর। আরও ধরে নেওয়া যাক তোমাদের সাদা চামড়ার পূর্বসূরীরা থাকতো ইংলিশপুরে (অ্যাঙ্গেলটাউন), আর আমার বাদামি চামড়ার পূর্বসূরীরা থাকতো বাংলাপুরে (বেঙ্গলটাউন)। মনে করি, শুরুর দিকে দুই শহরের বেশিরভাগ লোকই ছিল কৃষক।  

একদিন ইংলিশপুরের (অ্যাঙ্গেলটাউন) একদল লোক জোরপূর্বক বাংলাপুর (বেঙ্গলটাউন) দখল করে নিলো। সঙ্গে এটাও নিশ্চিত করলো যেন আমাদের বাংলাপুরের বাজারে শুধু ইংলিশপুরের পণ্যই বিক্রি হয়। আর আমাদের বাজারে যখন পণ্য বিক্রি হওয়া শুরু হলো তখন তোমাদের ইংলিশপুরের আধুনিক কলকারখানায় বিনিয়োগ বেড়ে গেলো। বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হতে থাকলো ইংলিশপুরের উন্নয়ন, কারণ সেখানকার কৃষকরা তাদের কৃষিকাজ ছেড়ে চলে আসলো কারখানায়, বেশি বেতনের কাজ করতে।

পাশাপাশি ইংলিশপুরের মানুষেরা বাংলাপুরের প্রত্যেক কৃষকের কাছ থেকে করও নেওয়া শুরু করলো।

এই করের টাকা দিয়ে ইংলিশপুরে তৈরি হতে থাকলো একের পর এক সুন্দর পার্ক, আধুনিক হাসপাতাল আর স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়; উল্টোদিকে বাংলাপুর দিন দিন গরিব হতে শুরু করলো, আর এখানকার কৃষকরা অশিক্ষিতই রয়ে গেলো। এই পুরো সময়টা ইংলিশপুরের মানুষরা বাংলার মানুষদের বললো—‘তোমরা আমাদের অধস্তন। কারণ তোমরা অশিক্ষিত। আর আমরা বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ে এসেছি। আমরা তোমাদের চেয়ে অনেক উঁচু জাত, কারণ আমরা শ্বেতাঙ্গ। আর সেজন্য তোমাদের আমরাই শাসন করবো। ওহ! আর আমাদের তৈরি করা এই অপূর্ব রেলপথগুলো চোখ মেলে দেখো একবার!

এসবের প্রায় তিন শতক পর, বাংলাপুরের মানুষরা বিদ্রোহ করলো, আর ইংলিশপুরের মানুষরা উপলব্ধি করলো এই বাংলাপুর শাসন করতে গেলে তাদের জীবনের ওপর হুমকি আসতে পারে। ইংলিশপুরের মানুষরা ইতোমধ্যে যেহেতু ধনী হয়ে গেছে, আরও ধনসম্পদ গড়ার লোভ করে তারা আর জীবনের ঝুঁকি নিতে চায়নি। তারা বাংলাপুর ছেড়ে চলে গেলো।

কিন্তু ওরা গেলো আমাদের বাংলাপুরকে অনুন্নত রেখেই। আজ বাংলাপুরের অনেকেই ইংলিশপুরে যাচ্ছে সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করতে, অথবা আধুনিক হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা নিতে, অথবা সেখানকার ঝকঝকে শপিং মলগুলোতে চাকরি করতে। আর যখনই বাংলাপুরের মানুষরা ইংলিশপুরের মানুষদের অতীতের দম্ভ আর নিষ্ঠুরতা নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছে, তোমরা তাদের বলছো ‘আমরা যে তোমাদের এই সুন্দর শহরে থাকতে দিয়েছি তাতেই তোমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। আর আমাদের নিয়ে যদি তোমাদের এত অভিযোগই থাকে তাহলে এখানে থেকো না।’    

সত্যিটা হলো, তোমাদের শহর সম্পদশালী হয়েছে কারণ তোমার পূর্বসূরীরা আমার পূর্বসূরীদের সম্পদ লুণ্ঠন করেছে। তোমাদের ইংলিশপুরের বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল আর পার্কগুলো গড়ে উঠেছে আমার পূর্বপুরুষের দেওয়া করের টাকায়। আর সে কারণেই ইংলিশপুর তোমাদের যতটা, ঠিক ততটাই এই বাংলাপুরের মানুষেরও।

আমরা বাংলার মানুষরা যখন ইতিহাস নিয়ে কথা বলি, তোমাদের ইংলিশদের যথাযথ উত্তর হওয়া উচিত এরকম-‘আমি দুঃখিত যে আমার পূর্বসূরীরা তোমাদের পূর্বসূরীদের সম্পদ লুট করেছে। আমাদের পূর্বসূরীরা ভুল করেছে। আমি স্বীকার করি, ইংলিশপুর তোমাদের পূর্বসূরীদের করের টাকাতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আর সেজন্যই এখানে তোমাদের ততটাই অধিকার আছে যতটা আছে আমাদের।’   

তোমাদের পূর্বসূরীদের অপরাধের জন্য আমরা তোমাদের দোষ দিই না।

তবে তোমরাও কখনও প্রত্যাশা করোনা যে আমরা পূর্বসূরীদের সঙ্গে সংঘটিত হওয়া অপরাধের কথা ভুলে যাব। সেটা কোনোদিনও হবে না।

লেখক: চেয়ারম্যান, টু-এ মিডিয়া লিমিটেড

 

/এফইউ/এমএমজে/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

গলিত-লবণের চুল্লি: বিদ্যুতের ভবিষ্যৎ?

গলিত-লবণের চুল্লি: বিদ্যুতের ভবিষ্যৎ?

কর্মক্ষেত্র পুনরায় সচল করার পূর্বে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হোন

কর্মক্ষেত্র পুনরায় সচল করার পূর্বে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত হোন

আড়াই লাখ জীবন বাঁচাতে পারবো কি?

আড়াই লাখ জীবন বাঁচাতে পারবো কি?

সর্বশেষ

লেখক মুশতাক আহমেদের দাফন সম্পন্ন

লেখক মুশতাক আহমেদের দাফন সম্পন্ন

ইয়াবা পরিবহনের অভিযোগে বাসচালকসহ গ্রেফতার ২

ইয়াবা পরিবহনের অভিযোগে বাসচালকসহ গ্রেফতার ২

ভারতে ফেসবুক ইউটিউব টুইটারকে যেসব শর্ত মানতে হবে

ভারতে ফেসবুক ইউটিউব টুইটারকে যেসব শর্ত মানতে হবে

ধানমন্ডিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণীকে ছাদ থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগ

ধানমন্ডিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণীকে ছাদ থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগ

প্রেমের টানে সংসার ছাড়া স্বামীকে ঘরে ফেরালো পুলিশ!

প্রেমের টানে সংসার ছাড়া স্বামীকে ঘরে ফেরালো পুলিশ!

রংপুরের বিভিন্ন উপজেলায় এক কেজি ধান-চালও কেনা যায়নি!

রংপুরের বিভিন্ন উপজেলায় এক কেজি ধান-চালও কেনা যায়নি!

করোনায় হিলি ইমিগ্রেশন দিয়ে যাত্রী পারাপার বন্ধ, রাজস্ব ঘাটতি ৫ কোটি

করোনায় হিলি ইমিগ্রেশন দিয়ে যাত্রী পারাপার বন্ধ, রাজস্ব ঘাটতি ৫ কোটি

দেবিদ্বারে গণসংযোগে হামলা, গুলিবিদ্ধসহ আহত ৫

দেবিদ্বারে গণসংযোগে হামলা, গুলিবিদ্ধসহ আহত ৫

কুমিল্লায় ওরশের মেলায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে ৩ জনকে ছুরিকাঘাত

কুমিল্লায় ওরশের মেলায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে ৩ জনকে ছুরিকাঘাত

পঞ্চম ধাপে ২৯ পৌরসভায় ভোট রবিবার

পঞ্চম ধাপে ২৯ পৌরসভায় ভোট রবিবার

লেখক মুশতাকের মৃত্যুতে ১৩ রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগ

লেখক মুশতাকের মৃত্যুতে ১৩ রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগ

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ১১ কোটি ৩৭ লাখ ছাড়িয়েছে

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ১১ কোটি ৩৭ লাখ ছাড়িয়েছে

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.