X
বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১, ১০ আষাঢ় ১৪২৮

সেকশনস

আমরা কোন তিমিরে

আপডেট : ১৫ জুন ২০২০, ১৫:২৮

দাউদ হায়দার ২৫ মে ২০২০, পুলিশ হত্যা করলো কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডকে। হত্যার ছবি যদি ভিডিও না করা হতো, আমেরিকাসহ বিশ্বের মানুষ কি জানতো? লাগাতার বিক্ষোভ, আন্দোলন হতো? বর্ণ বিদ্বেষের ভয়ঙ্কর চিত্রচরিত্র নিয়ে কথা উঠতো, সোচ্চারে ফেটে পড়তো?
ঘটনা একদিনের নয়, যুগযুগান্তের প্রবাহিত। যে তিমিরে ছিলাম সেই তিমিরেই অভ্যস্ত, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং তথাকথিত ‘সাম্যের’ নামে।
বলা হচ্ছে, জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ড দুনিয়ার চোখ খুলে দিয়েছে। তার মানে, এতকাল খোলেনি, প্রত্যেকেই অন্ধ, হঠাৎ চক্ষুষ্মান। অথবা, চোখে ঠুলি ছিল, আচমকা খুলে গেছে, দেখছে উপরে-নিচে-সামনে-পিছনে-ডাইনে-বাঁয়ে স্তূপাকৃত ঘেন্নার জঞ্জাল। সরাবে কে? দায় কার? রাষ্ট্রের নাকি সমবেত জনতার? বলা হয়, জনগণই সমস্ত ক্ষমতার উৎস। ঠিক জনতাই পারে সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিতে। সবটা পারে কী, কর্পোরেটের যাঁতাকলে? অর্থনৈতিক চাবুকে, ডান্ডায়?
দেশে-দেশে বিপ্লবের ঘটনা, ইতিহাস আমরা জানি। পড়েছি। তিন দশক আগে, যেহেতু প্রত্যক্ষদর্শী, সাক্ষী, বার্লিন দেওয়াল ধসের। পূর্ব জার্মানরা বাক স্বাধীনতা, গণতন্ত্রের জন্যে আন্দোলন করেছে, ওই ডামাডোলের ফয়দা কুড়িয়েছে পশ্চিম জার্মান। দেওয়াল ভেঙেছে পশ্চিমের মানুষ, পূর্ব জার্মানরা নয়। পশ্চিম জার্মান সরকার মওকা বুঝে তড়িঘড়ি কব্জা করেছে বিপ্লব। ফলাও করে প্রচারিত কৃতিত্ব পশ্চিম জার্মান সরকারের।

বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইউরোপের আন্দোলন, বিপ্লব। একটু ঝিমিয়ে গেলেই দেখা যাবে যে তিমিরে বাস ছিল, সেই তিমিরেই আবার সেঁধিয়ে দিচ্ছে সরকার তথা রাষ্ট্রক্ষমতা। আপাতত চুপ বলে আগ্নেয়গিরি নিশ্চিহ্ন। ঘুমিয়ে থাকলেও মূলত সুপ্ত। অপেক্ষমাণ।

বর্ণবৈষম্যের-জাতপাত নিয়ে মাতবররা, জর্জ ফ্লয়েডকে হত্যার পর, ‘অবশ্যই কিছু করণীয়, করতেই হবে, নির্যাতিতের পাশে থাকতেই হবে’, বলে মুখে ফেনা তুলেছেন। খুব ভালো বাহবা দিচ্ছি। কিন্তু আসল চেহারা কী দেখছি? দেখেও কিছু বলছি? বলছে কী মাতবর, মোড়লরা? না।

দুইবার ইসরায়েলে গিয়েছি, হাইফা ও তেলআভিভে। সাহিত্য সম্মেলনে নিমন্ত্রিত। আয়োজকরা সরাসরি বলেছেন, ‘ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের রাজনীতি নিয়ে কিছু বলবেন না।’ হাইফায় একটি সেমিনারে, বিষয় ছিল ‘পোয়েট্রি অ্যান্ড পলিটিক্স।’ তার মানে, কবিতায় রাজনীতির কথা বলা যাবে, কাব্যকলায় রাজনীতি, সৌন্দর্য, ঝামেলা বিচার ইত্যাদি, বাদ শুধু ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞ, জমিদখল, মানুষ উচ্ছেদ, ইতরতা, অমানবিকতা।

বিশ্বের মোড়লরাও ইসরায়েলি বর্বরতা নিয়ে রা কাড়তে নারাজ। কাড়লে সমুহ বিপদ। অথচ বৈষম্য, মানবিকতা বিষয়ে সোচ্চার, ঘিলু খামচাচ্ছে, চুল ছিঁড়ছে। মুখ ও মুখোশে দিব্যি ‘মানবিক’। কেউ কিছু বলছে না, বলার সাহস নেই। বললে থাপ্পড় মেরে বদন পাল্টে দেবে।

ইহুদিদের বিরুদ্ধে ইউরোপ-আমেরিকায় কুকথা, সমালোচনা করলে আখের ঝরঝরে। জার্মানির দুই-তিনজন রাজনৈতিক নেতা, দুইজন লেখক বলেছিলেন, ব্যস কোথায় যাবে, হাড়গোড় চিবিয়ে ওয়াক থু করেছে। ইসরায়েলের সমালোচনা করা মানেই ‘ইহুদিদের দুশমন’। ইসরায়েলের সাত খুন মাফ।

জার্মানি প্রতিবছর ইসরায়েলকে দশ বিলিয়নের বেশি ইউরো দিচ্ছে, যদিও গোপনে, লিখিত নয়, কিন্তু সবাই জানে। ওপেন সিক্রেট। ব্যবসাবাণিজ্যে নয়। বিশাল অঙ্কের অর্থ কেন?—হিটলারের পাপে, ইহুদি নিধনে। প্রায়শ্চিত্ত।

ইসরায়েল যা খুশি করবে, ফিলিস্তিনি মারবে, জায়গাজমি কেড়ে নেবে, কারোর বলার হিম্মত নেই। কোথায় বিশ্ব মোড়লের মানবিকতা?

বাংলাদেশ ছোট দেশ। হাজার-হাজার রোহিঙ্গা ঠাঁই নিয়েছে। উদ্বাস্তু। অবর্ণনীয় দুর্দশা। জীবন বিপন্ন। বাংলাদেশ দিশেহারা। বিপর্যস্ত। বৈশ্বিক মোড়লকুলের মায়াকান্না, দরদ। ল্যাটা চুকে গেলো। পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট কথাই বলেছেন, ‘কুম্ভিরাশ্রু বাদ দিয়ে রোহিঙ্গাদের ঠাঁই দিন।’ শুনবে না? শোনার কান নেই, দেখার চোখ নেই। বধির অন্ধ। মিয়ানমারকে চটানোর পাটা নেই বুকে। না আমেরিকার, না ইউরোপীয় ইউনিয়নের, চীনের, দক্ষিণ কোরিয়ার, জাপানসহ এশিয়ানের (এশিয়ার গোষ্ঠীভুক্ত জোট)। মূলে ব্যবসাবাণিজ্য রাজনীতি।

ইয়েমেন নিয়ে কী হচ্ছে? কাতারে-কাতারে মানুষ মরছে, মরুক। সৌদি আরবের নিষেধাজ্ঞা সৌদি আকাশ/সীমানা লঙ্ঘন করা যাবে না। মেনে নিয়েছে হম্বিতম্বির মোড়লরা। লজেন্সচুশ না চুষে মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে আঙ্গুল চুষছে। চুষবে। চোষাই তবে মানবিকতা?

জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডের পরে বর্ণ বৈষম্যের নানা দিক প্রকাশিত, উদ্ঘাটিত। কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেছেন, এই ইতিহাস বহুল বর্ণিত। চর্চিত। মূলে তিনিই যে দাস (স্লেভ) রফতানিকারক (ইতিহাস কৌশলে চাপা দিয়েছে) ক্রমশ প্রকাশিত। বর্ণবৈষম্য আন্দোলনে (আমেরিকায়) তিনটি শহর থেকে একটি সরিয়ে নিয়েছে। একটি ভাঙচুর।

ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে সতেরো শতকের কিঙ কিং (রাজা)-এর মূর্তি গুঁড়িয়ে নদীতে নিক্ষেপ। বেলজিয়ামের রাজা লিওপোল্ড দ্য সেকেন্ডের মাথা, মুখ দুই হাত পা ভেঙে তছনছ। ওঁরা প্রত্যেকে ব্ল্যাক স্লেভ আমদানি করে দেশ গড়েছেন, ব্ল্যাক নির্যাতন করেছেন, ব্ল্যাক মেরেছেন। হোয়াইটদের কাছে একদা পুজ্য মনমানসিকতায় এখনও কিছু বলতে পারছে না আন্দোলনের জোয়ারে। ইতিহাস বাদ দেবে?

কতটা জোয়ার, টের পেয়েছে ‘গন উইথ দ্য উয়িন্ড’ (GONE WITH THE WIND) ছবির স্বত্বাধিকারী।

‘গন উইথ দ্য উয়িন্ড’ মার্গারেট মিচহেলের উপন্যাস। ১৯৩৬ সালে লেখা। তিন কমা পঁচাশি (৩,৮৫) মিলিয়ন ডলারে তৈরি ১৯৩৯ সালে। দশটি অস্কার পুরস্কারে সম্মানিত। ছবির পরিচালক, প্রযোজক, অভিনেতা, অভিনেত্রী ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত লিখছি না। দরকার নেই।

‘গন উইথ ...’ আমেরিকার একটি টিভি চ্যানেল করোনাকালে শুরু করেছিল। ২২০ মিনিটের ছবি। ধারাবাহিক চলবে।

ছবিতে ব্ল্যাক এবং ব্ল্যাক স্লেভদের বহু ঘটনা, দৃশ্য। টিভি কর্তৃপক্ষ প্রদর্শনী বন্ধ করেন। জনরোষ? জনরোষের ভয়? ছবিটি ধ্বংস করা হয়েছে? না আর্কাইভে সংরক্ষিত।

বাংলাদেশ-ভারতের কথায় ফিরি। বর্ণবৈষম্য-ধর্মজাতপাত নিয়ে কি বিক্ষোভ, আন্দোলন হয়েছে, জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার পরে? হয়নি। কী করে হবে? ভারতে এতো জাতপাত, বর্ণ, ধর্ম, কেউ সংঘবদ্ধ নয়। আলাদা। আন্দোলন দানা বাঁধতে পারে না। পারবে না। মিছিল হয়নি। হবেও না। বাংলাদেশেও না। বাংলাদেশে কথায় কথায় মানববন্ধন হয়, ধর্মের সমালোচনা  করলে তো কথাই নেই, মারদাঙ্গা। বর্ণ বৈষম্য, জাতপাত নিয়ে সুশীলসমাজ, তথাকথিত আন্দোলনকারীরাও চুপ। মৌনী। নিস্তেজ।

ধর্মজাতপাত কতটা উগ্র, ভারতে, একটি উদাহরণ, প্রধানমন্ত্রী (তৎকালীন) ইন্দিরা গান্ধীকেও জগন্নাথ মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পরিচয় না-দিয়ে (নাম জিজ্ঞেস করেনি) দুইবার গিয়েছিলুম। জানতা পারলে?

খুব প্রচারিত মিডিয়ায়, কেরালায় মুখ্যমন্ত্রীর কন্যা মুসলমান বিয়ে করেছেন। ঘটা করে অনুষ্ঠান। মনে রাখতে হয়, কেরালা কমুনিস্ট রাজ্য। মুখ্যমন্ত্রী কমুনিস্ট। কন্যা-জামাই মায়ায় জড়িয়ে বিবাহিত। লোক দেখানো এবং রাজনীতির কারণেই (বিশেষত বিজেপিকে দেখানোর জন্যে), নিজেকে ধর্মজাতপাতের ঊর্ধ্বে দেখানোর চেষ্টা। এই চেষ্টার মধ্যেও লোক দেখানো। ফ্লয়েডকে হত্যার বিশ্ব জুড়ে ধিক্কার, আন্দোলন। বর্ণবৈষম্য, জাতপাত নিয়ে প্রশ্ন। সুযোগ ব্যবহার করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি নিশ্চয় ঘটকালি করে হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে দেননি। ভারতে-বাংলাদেশে হয়? না হয় না।

বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, আন্দোলন, কিন্তু লিঙ্গ বৈষম্য নিয়ে কোন দেশ কতটা সোচ্চার? নারী এখন পণ্য। দ্বিতীয় শ্রেণির। দেশসমাজে অবহেলিত।

ভারত-বাংলাদেশে পুলিশি নির্যাতন, গুম, হত্যা নিত্যদিন। আমরা কী এই নিয়ে বিক্ষোভ, আন্দোলনে সমাজরাষ্ট্রের ভিত কাঁপিয়েছি?

আমরা কোন তিমিরে? যে তিমিরে ছিলাম আছি সেই তিমিরেই, আলোর কণা কবে দেখবো, অজানা। আগুন প্রজ্বলন, বিপ্লব সর্বাগ্রে। মার্ক্স, লেলিন বেঁচে নেই, আজ বড়োবেশি প্রয়োজন। কথায় চিঁড়ে ভেজে না।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

বাংলা নববর্ষ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি

বাংলা নববর্ষ, সংস্কৃতি ও রাজনীতি

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর: নিয়তি ও ইতিহাস

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর: নিয়তি ও ইতিহাস

অন্নদাশঙ্কর রায়ের জন্মদিন, কেন জরুরি মননবোধে

অন্নদাশঙ্কর রায়ের জন্মদিন, কেন জরুরি মননবোধে

ইউরোপ: করোনা ও শীত

ইউরোপ: করোনা ও শীত

বঙ্গবন্ধু-ইন্দিরা আকর্ষণ

বঙ্গবন্ধু-ইন্দিরা আকর্ষণ

মুনীরুজ্জামান: কমরেড, বিদায়

মুনীরুজ্জামান: কমরেড, বিদায়

পুলুদার ‘শালা’

পুলুদার ‘শালা’

জার্মানির একত্রীকরণ, ৩০ বছর

জার্মানির একত্রীকরণ, ৩০ বছর

শাহাবুদ্দিন ৭০, জন্মদিনে শুভেচ্ছা

শাহাবুদ্দিন ৭০, জন্মদিনে শুভেচ্ছা

এ কে আব্দুল মোমেনের ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’

এ কে আব্দুল মোমেনের ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’

১৫ আগস্টের স্মৃতি

১৫ আগস্টের স্মৃতি

সর্বশেষ

দূরপাল্লার বাস ছাড়া সবই চলে ঢাকা-সাইনবোর্ড সড়কে

দূরপাল্লার বাস ছাড়া সবই চলে ঢাকা-সাইনবোর্ড সড়কে

বাবার চেয়ে ছেলে ২১ বছরের বড়!

বাবার চেয়ে ছেলে ২১ বছরের বড়!

ব্রাজিলের কাছে হেরে আর্জেন্টাইন রেফারিকে দুষলেন কলম্বিয়া কোচ

ব্রাজিলের কাছে হেরে আর্জেন্টাইন রেফারিকে দুষলেন কলম্বিয়া কোচ

খুলনার ৩ হাসপাতালে আরও ৬ মৃত্যু

খুলনার ৩ হাসপাতালে আরও ৬ মৃত্যু

তৃতীয় দিনের মতো বন্ধ দূরপাল্লার গণপরিবহন

তৃতীয় দিনের মতো বন্ধ দূরপাল্লার গণপরিবহন

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না রাখা গেলে ভারতের মতো অবস্থা হবে

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না রাখা গেলে ভারতের মতো অবস্থা হবে

রাজশাহী মেডিক্যালে একদিনে সর্বোচ্চ ১৮ মৃত্যু

রাজশাহী মেডিক্যালে একদিনে সর্বোচ্চ ১৮ মৃত্যু

চট্টগ্রামে উপজেলাগুলোতে রোগী বাড়ছে

চট্টগ্রামে উপজেলাগুলোতে রোগী বাড়ছে

ইউরোর শেষ ষোলোয় কারা দেখে নিন

ইউরোর শেষ ষোলোয় কারা দেখে নিন

বাড়িতে হামলার প্রতিবাদে সড়কে ওবায়দুল কাদেরের দুই বোন

বাড়িতে হামলার প্রতিবাদে সড়কে ওবায়দুল কাদেরের দুই বোন

শত বছরের বোতল বন্দি চিঠিতে কী লেখা ছিলো?

শত বছরের বোতল বন্দি চিঠিতে কী লেখা ছিলো?

এইচটি ইমামের ছেলে এমপি তানভিরের নাম ভাঙিয়ে প্রতারণা

এইচটি ইমামের ছেলে এমপি তানভিরের নাম ভাঙিয়ে প্রতারণা

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune