X
সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ২ কার্তিক ১৪২৮

সেকশনস

কল চালাতে ব্যর্থ কিন্তু পাটের বাজারটা ছাড়বেন না যেন!

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২০, ১৫:১৪

মাসুদা ভাট্টি কৃষক পরিবারে জন্ম বলেই কৃষির সঙ্গে জড়িত যেকোনও ঘটনার ওপরই চোখ পড়ে এবং সে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করি। বিস্তারিত জানতে গিয়ে বুঝি যে, কৃষিকাজের প্রতি আগ্রহটা কতটা প্রবল এখনও। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ করে দেওয়া নিয়ে আলোচনা চলছে। পাট বিষয়ে বলার মতো কথা অনেক। কারণ, প্রথমত যে অঞ্চলে আমার জন্ম সেখানে প্রচুর পরিমাণে পাট উৎপাদিত হয়, সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি পাট উৎপাদন সমৃদ্ধ এলাকাই সেটি। এই পাট উৎপাদনের সঙ্গে ওখানকার মানুষের জীবনের অনেক পর্বই জড়িত। যেমন, পাট ফুটখানেক বড় হওয়ার পরে প্রথমবার পাটের ভেতর থেকে ছোট পাট বেছে তুলে ফেলতে হয়, যাকে বলা হয় ‘বাছপাট’, এই বাছপাট পচিয়ে আঁশ করে বাজারে বিক্রি করে কৃষক তার সন্তানের মুখে জৈষ্ঠ-আষাঢ়ের ‘ফলফলাদি’ তুলে দেয়, এটা একসময় প্রতিটি কৃষক পরিবারের ক্ষেত্রে সত্য ছিল, এখন হয়তো অবস্থা বদলেছে। কারণ, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থাটা বদলেছে। পরে শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে উপযুক্ত সময়ে পাট কেটে, পচিয়ে, আঁশ ছাড়িয়ে, ধুয়ে, রোদে শুকিয়ে একেবারে ‘সোনা রঙ’ ধরিয়ে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়, তখন বিশাল বিশাল নৌকা নিয়ে পাটের ‘বেপারিরা’ এসে পাট কিনে নিয়ে যেতো একসময়, আজকাল দেখি নসিমন কিংবা লরিতে করে পাট চলে যাচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে দেখে, পাট বিক্রির অর্থে সংসার চালানোর অভিজ্ঞতা হওয়ায়, পাট সম্পর্কিত যেকোনও ঘটনাকেই একটু গভীরে গিয়ে দেখার ইচ্ছে হয়।

এছাড়া আরও মজার ব্যাপার হলো, পাট উৎপাদনকারী পরিবারে জন্ম হওয়ার পরে এমন এক পরিবারে গিয়ে বড় হয়েছি, যে পরিবারটি পুরোপুরি পাটনির্ভর কারখানার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ দেশের জুটমিলগুলোর ভেতরকার গল্পও খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। আদমজী জুটমিল যখন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং এই বৃহৎ পাটকলের বিশাল এলাকা জমি হিসেবে ভাগাভাগি হয়ে যায় তৎকালে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সমর্থকদের মাঝে, তখনও এ বিষয় নিয়ে লিখেছিলাম, বলাই বাহুল্য কোনও কাজ হয়নি। পরে একটি ছোটগল্প লিখেছিলাম, যেখানে এক পাগলের সামনে দিয়ে আদমজী পাটকলের এক শ্রমিকের মেয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের একটি কুখ্যাত এলাকায় যায়, পাগল হয়েও বিষয়টি তার ভালো লাগে না, তাই সে পৃথিবীকেই সে জন্য দায়ী করে অক্ষমের শেষ অস্ত্র গালাগাল দেয়।

অনেক দিন ধরেই শোনা যাচ্ছিলো বা বোঝা যাচ্ছিলো যে, দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর কপালে ‘খারাবি’ আছে। লোকসানে চলতে চলতে সরকার সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ার অজুহাত পেয়ে যাচ্ছিলো, অথচ পাকিস্তান আমলেও এই পাটকলগুলোই ছিল পাকিস্তানিদের কাছে ‘সোনার হরিণ’, পূর্ব পাকিস্তানের পাটের টাকাতেই গড়ে উঠেছিল পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাশহর পিন্ডি, রাজধানী ইসলামাবাদ। পূর্ব পাকিস্তান এই বঞ্চনাটা ধরতে পেরেছিল বলেই স্বাধীনতার দাবি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করতে পেরেছিল, অর্থাৎ দেশের স্বাধীনতা অর্জনেও ‘পাটের’ একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। পাকিস্তানি বড় ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর প্রত্যেকেই পূর্ব পাকিস্তানে পাটের ব্যবসায় নেমে পড়েছিল, স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু এই পাটকলগুলোকে জাতীয়করণ করে পাকিস্তানি ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর আয়কে বাংলাদেশ সরকারের ঝুলিতে ভরতে চেয়েছিলেন। আশা করা গিয়েছিল যে, কমবেশি ৮৭টি সরকারি পাটকল থেকে যে আয় হবে তা দিয়ে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ উন্মুক্ত হবে। চলছিল ভালোই, ১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশের মোট রফতানি আয় ছিল ৩৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার, তার মধ্যে ৩১ কোটি ৩১ লাখ ডলার আয় হয়েছিল কেবল পাট ও পাটজাতদ্রব্য রফতানি থেকে। এই আয়ের আশাবাদ থেকেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং দেশের পাটশিল্পকে নতুন মাত্রা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ঠিক এই সময়ই দেশের প্রায় ৬০ লাখ পরিবার নির্ভরশীল ছিল পাট উৎপাদন ও পাটজাত দ্রব্য তৈরির কারখানাগুলোর ওপর।

কেন তবে পাটকলগুলো লোকসানে পড়লো? কবে থেকে পড়লো? আবারও ফিরতে হয় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের কাছে। এই দিনের পর থেকে বাংলাদেশের যেসব দিক সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে তার মধ্যে পাটশিল্পও অন্যতম। অভিযোগ আছে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পাটকলগুলোকে একচেটিয়া ব্যবসা সফল করার সুযোগ দিয়ে বাংলাদেশের পাটকলগুলোকে বসিয়ে দেওয়ার রাজনীতিও তখনই শুরু হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের বদলে সস্তা কেমিকেল-নির্ভর তন্তু বাজার দখল করার ফলেও পাটের বাজার সংকুচিত হয়েছিল। তবে এও প্রচলিত ছিল যে, সামরিক সরকারগুলোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের পাটকলগুলোর শ্রমিক সংগঠনগুলোর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা থাকায় পাটকলগুলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভে ব্যর্থ হয়, আর দেশের অন্য আর দশটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতোই দুর্নীতিতে পুরোপুরি ডুবে যেতে যেতে শেষ পর্যন্ত বেগম জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদের সরকার এসে আদমজী, শম্ভুগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জের বড় পাটকলগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এই বন্ধ হওয়া পাটকলগুলোর কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির কতটা ক্ষতি হয়েছে কিংবা সামাজিকভাবে বাংলাদেশ কী কী অসুবিধা পোহাচ্ছে তা নিয়ে গবেষণা হয়নি বলে এ বিষয়ে বিস্তারিত বলার কোনও সুযোগ নেই।

২০০৮ সালে শেখ হাসিনার সরকার নতুন করে বাংলাদেশের পাটকল ও পাট উৎপাদনে গতি আনার চেষ্টা শুরু করে। পাটের জিন-রহস্য উন্মোচন করে নতুন সোনালি অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে বলে বাংলাদেশে নতুন এক আশাবাদও তৈরি হয়। উৎপাদনও বাড়ে। সর্বশেষ প্রাপ্ত এক্সপোর্ট প্রমোশন্স ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২০ সালের প্রথমার্ধে দেশের পাট ও পাটজাত দ্রব্য থেকে রফতানি আয় ৫১১.৭৩ মিলিয়ন ডলার, যা ২০১৯ সালে ছিল ৪২১.০২ মিলিয়ন ডলার। এই আয় দেশের ২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত ও ২০০টি বেসরকারি পাটকলের একত্রিত আয়। মজার ব্যাপার হলো, ২০০৮ সালের পর থেকে বাংলাদেশে বেসরকারি পাটকলের সংখ্যা আরও বাড়লেও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিয়েছে লোকসানে থাকা সরকারি পাটকলগুলো বন্ধ করে দেবে এবং দিয়েছে। এখানে কর্মরত প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিককে ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেক’ দিয়ে অবসরে পাঠানো হবে। ২৫ হাজার শ্রমিকের পরিবারে যদি গড়ে ৩ জন করেও (পরিবারের সদস্য সংখ্যা আরও বেশিই আছে) মানুষ থাকে তাহলে সংখ্যাটা দাঁড়াচ্ছে ৭৫ হাজারে, অর্থাৎ এ দেশের ৭৫ হাজার মানুষ বেকার হলো পাটকলগুলো বন্ধ হওয়ায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পিতা বঙ্গবন্ধুর মতোই দেশজ শিল্পের প্রতি অতিমাত্রায় আগ্রহী এবং বিশেষ করে পাটকলগুলোকে প্রণোদনা দিয়ে নতুন চেহারা দেওয়ার জন্যই ২০০৯ সালে নতুন করে বন্ধ থাকা পাটকলগুলোকে খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এদিকে বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে যে গণবিরোধিতা শুরু হয়েছে তাতে বাংলাদেশের মতো পাটোৎপাদনে প্রথম এবং পাটজাত দ্রব্য উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা রাষ্ট্রের জন্য তো বিষয়টি সোনার সঙ্গে সোহাগা যুক্ত হওয়ার মতো কাঙ্ক্ষিত ঘটনা হওয়ার কথা ছিল। তৈরি পোশাক শিল্প  নিয়ে যখন বাংলাদেশে থাকবে কিনা ক্রমশ বাংলাদেশ থেকে দূরে সরে যাবে– ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ঠিক তখনই পাট ও পাটজাত দ্রব্য নতুন আশাবাদ জাগাচ্ছে বাংলাদেশের জন্য। ২০২১ সাল নাগাদ সারা বিশ্বে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের বাজার ৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হওয়ার কথা জানাচ্ছে গ্লোবাল ট্রেড নামের বৈশ্বিক বাণিজ্যের ‘ফিজিবেলিটি’ নির্ধারণকারী সংস্থা। এখান থেকেই জানা যায় যে, বিগত কয়েক বছর ধরে কমতে থাকলেও ২০১৯ সালে এসে বাংলাদেশ আবার পাট ও পাটজাত দ্রব্য রফতানিতে শীর্ষ অবস্থানটি ফিরে পেয়েছে। তার মানে ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা গৃহীত পদক্ষেপগুলো কাজ করতে শুরু করেছিল বলতে হবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের মতো দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ধরলে বাংলাদেশের হাতে এখনও এমন কোনও বিকল্প পণ্য নেই যা কিনা পাটের জায়গা দখল করতে পারে।

বাংলাদেশের প্রতি ১ হাজার জন মানুষ প্রায় ৮,১৫৪ কেজি পাটজাত দ্রব্য ব্যবহার করে, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। সে বিচারে বাংলাদেশে প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারকেও অনেকটাই ঠেকিয়ে রেখেছে কেবল পাট। আর কেবল ২০১৮ সালেই সারা বিশ্বের পাট ও পাটজাত দ্রব্যের চাহিদার ৭৯% পূরণ করেছে বাংলাদেশ– এর চেয়ে গর্বের কোনও কারণ বাংলাদেশে ২০১৮ সালে ছিল কিনা ভেবে দেখার অনুরোধ জানাই সকলকে।

পাটকল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যা সরকারি মালিকানাধীন। সরকার সেগুলো লোকসানে চালাচ্ছিল, যা জনগণের জন্য ক্ষতির কারণ কিন্তু ব্যর্থতা হিসেবে সরকারেরই প্রথম ও প্রধান ব্যর্থতা এই বন্ধ করে দেওয়া। এখন এসব কারখানা বেসরকারি খাতে বা পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশিপে চালানোর কথা হচ্ছে, হয়তো আমাদের খুশি হওয়া উচিত এটা ভেবে যে, একেবারে বন্ধ তো আর হচ্ছে না! কিন্তু খচ খচ করছে কোথায় যেন, মনে হচ্ছে নাকের বদলে নরুন তো ধরিয়ে দিচ্ছে না সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত এই পাটকলগুলোকে বন্ধ করে জনগণের হাতে? আমরা আশা করতে চাই যে সরকার পাটকলগুলো বেসরকারি খাতে নিয়ে গিয়ে এর চেহারা ও বর্তমান লোকসানি অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে একে লাভজনক করবে। তার মানে সরকার স্বীকারও করছে যে তারা এগুলো লাভজনক করতে ব্যর্থ। কিন্তু এই ব্যর্থতাকে আমলে নিয়ে ২০২১ সালে যে বিশ্বে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা ৩ বিলিয়নের বেশি হবে তার অন্তত ৮০% কি বাংলাদেশের হাতে আনার কাজটি সরকার নিশ্চিত করতে পারবে? বন্ধ করায় যত আগ্রহ ও দ্রুতগতি, এই ৮০% পাট-ব্যবসা বাংলাদেশের হাতে আনায় সরকারের গতি ততটাই তীব্র হবে বলে বিশ্বাস করতে চাই। প্রতিবেশী ভারত তো আছেই পাটোৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে, সঙ্গে মালয়েশিয়া দৌড়াচ্ছে, আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সঙ্গে ইউরোপের বেলজিয়ামও পাটোৎপাদনের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চায়। সুতরাং মাননীয় সরকার, অতি দ্রুত ৩ বিলিয়নের বাজার ধরতে কোমর বেঁধে নেমে পড়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

পাটকল যেহেতু নেই, সেহেতু পাট মন্ত্রণালয়ও কি থাকার দরকার আছে? কিংবা পাটমন্ত্রী? গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের পরিধিও তবে বাড়ছে, তাই তো?

লেখক: সাংবাদিক

 

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

তারা করেন রাজনীতি আর প্রাণ যায় মানুষের

তারা করেন রাজনীতি আর প্রাণ যায় মানুষের

আয়শা খানম– যে দীপ নেভে না কোনোদিন

আয়শা খানম– যে দীপ নেভে না কোনোদিন

শেখ রাসেল এক অনন্য শিশুসত্তা

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২১, ০০:০৩

ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ নামের শুরুতেই আসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। তিনি আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। দিয়েছেন পরাধীনতা থেকে মুক্তি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের একমাত্র নেতা। তাঁর ডাকেই বাঙালিরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তি সংগ্রামে। তিনি আমাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। বাঙালিদের শ্রেষ্ঠ সন্তানকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করে স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি। এমন নির্মম হত্যাকাণ্ড পৃথিবীতে বিরল ও নজিরবিহীন। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সপরিবার হত্যাকাণ্ডের কালো অধ্যায় আজও  আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায় নানা বেদনায়। সেদিন হত্যাকারীদের কাছ থেকে রক্ষা মেলেনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেলেরও। ছোট শিশুকেও হত্যা করে তারা। সেদিন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। ১১ বছর বয়সে নির্মম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয়েছে সম্ভাবনাময় শেখ রাসেলকে। আজ  তিনি জীবিত থাকলে, হয়তো দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতেন। আজ  সেই শিশু শেখ রাসেলের ৫৮তম জন্মদিন। জাতি আজ  তাঁর জন্মদিন স্মরণ করছে হৃদয় থেকে।

শৈশব ও শেখ রাসেল

শেখ রাসেল ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ঢাকায় ঐতিহাসিক বঙ্গবন্ধু ভবনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ সন্তান। জন্মের পর বঙ্গবন্ধু নিজে সর্বকনিষ্ঠ পুত্রের নাম রাখেন শেখ রাসেল। এই নাম রাখার পেছনের একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। সেটি হলো, শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয় লেখক ছিলেন নোবেল বিজয়ী ব্যক্তিত্ব বার্ট্রান্ড রাসেল। তার নাম অনুসারে নিজের ছেলের নাম রাখেন। শৈশব থেকেই দুরন্ত প্রাণবন্ত রাসেল ছিলেন পরিবারের সবার অতি আদরের। তবে ছোট থেকেই রাসেল তাঁর বাবাকে খুব বেশি কাছে পায়নি। কারণ, সে সময় বঙ্গবন্ধুকে বেশিরভাগ সময় কাটাতে হয়েছে জেলের মধ্যে। সে সময় পিতার সঙ্গে শেখ রাসেলের সাক্ষাতের একমাত্র স্থান হয়ে ওঠে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। পুত্র শেখ রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু কারাগারের রোজনামচায় ১৯৬৭ সালের ১৪, ১৫ এপ্রিলে লিখেছেন, ‘জেল গেটে যখন উপস্থিত হলাম ছোট ছেলেটা আজ আর বাইরে এসে দাঁড়াইয়া নাই দেখে আশ্চর্যই হলাম। আমি যখন রুমের ভিতর যেয়ে ওকে কোলে তুললাম আমার গলা ধরে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কয়েকবার ডাক দিয়ে ওর মার কোলে যেয়ে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে ডাকতে শুরু করলো। ওর মাকে ‘আব্বা’ বলে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ব্যাপার কি?’ ওর মা বললো, ‘বাড়িতে ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ করে কাঁদে, তাই ওকে বলেছি আমাকে ‘আব্বা’ বলে ডাকতে।’ রাসেল ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকতে লাগলো। যেই আমি জবাব দেই সেই ওর মার গলা ধরে বলে, ‘তুমি আমার আব্বা।’ আমার ওপর অভিমান করেছে বলে মনে হয়।

পিতার সঙ্গে তাঁর শৈশব

শিশুকাল থেকে চঞ্চল ও সর্বকনিষ্ঠ সন্তান হওয়ার কারণে বঙ্গবন্ধু খুব ভালোবাসতেন শেখ রাসেলকে। যদিও খুব বেশি সময় বাবার সঙ্গে যাপন করতে পারেনি শেখ রাসেল। এ অল্প সময়ের মধ্যেই পিতা-পুত্রের এক অন্যরকম হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। শেখ রাসেল ছিলেন ভীষণ দুরন্ত। তার দুরন্তপনার সঙ্গী ছিল বাইসাইকেল। তিনি রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ছাড়াই সাইকেলে করে স্কুলে যেতেন পাড়ার আর দশ জন সাধারণ ছেলের মতো। বাবাকে দেখতে না পেয়ে মা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে আব্বা বলে সম্বোধন করতেন ছোট্ট রাসেল। এই চাপা কষ্ট ছোট্ট রাসেলের মতো তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও অনুভব করতেন। যা স্পষ্টত ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলনের পর থেকেই রাজবন্দি হিসেবে জেলে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। কারাগারে দেখা করার সময় রাসেল কিছুতেই তার পিতাকে রেখে আসবে না। পিতাকে ছেড়ে আসার কারণেই তাঁর মন খারাপ থাকতো সর্বদা। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় শেখ রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন ‘৮ ফেব্রুয়ারি ২ বছরের ছেলেটা এসে বলে, আব্বা বাড়ি চলো।’ কী উত্তর ওকে আমি দিবো। ওকে ভোলাতে চেষ্টা করলাম, ও তো বোঝে না আমি কারাবন্দি। ওকে বললাম, ‘তোমার মার বাড়ি তুমি যাও। আমি আমার বাড়ি থাকি। আবার আমাকে দেখতে এসো।’ ও কী বুঝতে চায়! কী করে নিয়ে যাবে এই ছোট্ট ছেলেটা, ওর দুর্বল হাত দিয়ে মুক্ত করে এই পাষাণ প্রাচীর থেকে! দুঃখ আমার লেগেছে। শত হলেও আমি তো মানুষ আর ওর জন্মদাতা। অন্য ছেলেমেয়েরা বুঝতে শিখেছে। কিন্তু রাসেল এখনও বুঝতে শিখেনি। তাই মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে যেতে চায় বাড়িতে।’

দেশরত্ন ও শেখ রাসেলের স্মৃতি

শেখ রাসেলের জন্মের পর বঙ্গবন্ধুর জেলযাপন অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে ছিল অধিক। অন্যদিকে বাড়িতে বেশিরভাগ সময় শেখ হাসিনা ও রেহেনার সঙ্গে সময় কাটাতেন রাসেল। তবে শেখ রেহেনা ও মাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা সংসার দেখাশোনা করতেন। এ সময়টায় রাসেলের একমাত্র সময় কাটানো ও খেলাধুলার সঙ্গী হন দেশরত্ন শেখ হাসিনা। তিনি  ‘আমাদের ছোট রাসেল সোনা’ বইয়ের ২১ পৃষ্ঠায় কারাগারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার বিষয়ে লিখেছেন, ‘আব্বার সঙ্গে প্রতি ১৫ দিন পর আমরা দেখা করতে যেতাম। রাসেলকে নিয়ে গেলে ও আর আসতে চাইত না। খুবই কান্নাকাটি করতো। ওকে বোঝানো হয়েছিল আব্বার বাসা জেলখানা আর আমরা আব্বার বাসায় বেড়াতে এসেছি। আমরা বাসায় ফেরত যাবো। বেশ কষ্ট করেই ওকে বাসায় ফিরিয়ে আনা হতো। আর আব্বার মনের অবস্থা কী হতো, তা আমরা বুঝতে পারতাম। বাসায় আব্বার জন্য কান্নাকাটি করলে মা ওকে বোঝাতেন এবং মাকে আব্বা বলে ডাকতে শেখাতেন। মাকেই আব্বা বলে ডাকতো।

শিশু রাসেলের নেতৃত্বগুণ

শেখ রাসেল মাত্র চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় ঘাতকের বুলেটে প্রাণ হারান। মাত্র ১১ বছর বয়সেই তাঁর কাজকর্ম ও আচরণে নেতৃত্বের গুণাগুণ স্পষ্ট ফুটে ওঠে। তিনি যেখানেই যেতেই সেখানেই খেলার আয়োজন করতেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে অনেক শিশুদের একত্রিত করতে পারতেন তিনি। এছাড়া স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে সে সময়ের তার বন্ধুর বয়ানে জানা যায়। একসঙ্গে পড়া তার এক বন্ধু সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, প্রায়ই শেখ রাসেল বন্ধুদের হাওয়াই মিঠাই কিনে খাওয়াতেন। নিজে খাওয়ার চেয়ে বন্ধুদের মধ্যে হাওয়াই মিঠাই বিলাতেই রাসেল বেশি পছন্দ করতেন। আর সেজন্য স্কুলের বাইরে থেকে হাওয়াই মিঠাই কিনে আনতেন। আর সেটা বিলানোর সময় প্রচুর হই-হুল্লোড় হতো। শেখ রাসেলের বন্ধু হাফিজুল হক রুবেল এক স্মৃতিকথায় বলেন, শেখ রাসেল ফুটবল খেলতে পছন্দ করতেন। ক্লাসের ফাঁকে বা টিফিনে তারা ফুটবল খেলতেন। খেলার ক্ষেত্রে রাসেলের আগ্রহই ছিল বেশি। তিনি অন্যদের উৎসাহ দিতেন। আর ক্লাসে তার আচরণ ছিল শান্ত। পড়া ধরলে সবার আগে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতেন তিনি। আর উত্তর জানা না থাকলে চুপ করে থাকতেন। রুবেল আরও বলেন, রাসেল পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। ভালো রেজাল্টও করতেন। তখন স্কুলের নিয়ম ছিল রেজাল্ট শিটে অভিভাবকের স্বাক্ষর নিয়ে আবার স্কুলে জমা দিতে হতো। কিন্তু শেখ রাসেলের রেজাল্ট শিট জমা দিতে মাঝে মধ্যেই দেরি হতো। এজন্য সাধারণত তিন থেকে চার দিন সময় দেওয়া হতো। শিক্ষকেরা রেজাল্ট শিট জমা দিতে দেরির কারণ জানতে চাইলে রাসেল যথাযথ জবাব দিতেন। তার বাবা দেশে না থাকা বা রাষ্ট্রীয় কাজে ঢাকার বাইরে থাকার কারণেই এমন হতো বলে জানাতেন রাসেল।

নৃশংস হত্যাকাণ্ড

পৃথিবীতে যুগে যুগে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কিন্তু এমন নির্মম, নিষ্ঠুর এবং পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড কোথাও ঘটেনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মাত্র ১১ বছর বয়সে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ঘাতকদের বুলেটে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন শিশু শেখ রাসেল। হত্যাকাণ্ডের সময় শিশু রাসেল আতঙ্কিত হয়ে কেঁদে কেঁদে বলেছিলেন, ‘আমি মায়ের কাছে যাবো’। পরবর্তী সময়ে মায়ের লাশ দেখার পর অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে মিনতি করেছিলেন ‘আমাকে হাসু আপার (শেখ হাসিনা) কাছে পাঠিয়ে দিন’। ‘মা, বাবা, দুই ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী, চাচা সবার লাশের পাশ দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে সবার শেষে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে রাসেলকে স্বাধীনতার পরাজিত শক্তিরা। শেখ রাসেলের ছোট্ট বুকটা তখন ব্যথায় কষ্টে বেদনায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যাদের সান্নিধ্যে স্নেহ-আদরে হেসে খেলে বড় হয়েছে তাদের নিথর দেহগুলো পড়ে থাকতে দেখে শিশু রাসেলের ভেতরে কেমন হয়েছিল তা আজ অনুভব করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

আমাদের আবেগ ও ভালোবাসার নাম রাসেল

ঘাতকেরা হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধুর কোনও ছেলে অথবা কনিষ্ঠ পুত্র বেঁচে থাকলে একদিন দেশের নেতৃত্বে আসবে। তাই আগেভাগেই তাঁকে হত্যা করা হয়। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো বাঙালি জাতির ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতেন। বিশ্বের শোষিত মানুষের নেতা হতেন। অথবা বাবার দেওয়া নামের স্বাক্ষর রাখতেন পড়ালেখা ও গবেষণায়। বাঙালি জাতি একজন তীক্ষ্ণ দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শিশুকে হারিয়েছেন। যিনি ছোটবেলা থেকে অনেক গুণাবলি নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর গুণাবলির স্বাক্ষর রাখতেন বড় হয়ে নিশ্চয়ই তিনি। কীভাবে ঘাতকেরা ফুটফুটে সুন্দর শিশুর বুকে গুলি চালাতে পেরেছিল? শেখ রাসেলের মৃত্যুতে আমরা এক অসম্ভব প্রতিভাবান শিশুকে হারিয়েছি। শেখ রাসেল আমাদের আবেগ ও ভালোবাসার নাম।

রাসেলের আদর্শ ছড়িয়ে পড়ুক শিশুদের মাঝে

শেখ রাসেল ছোট থেকেই মেধাবী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের অধিকারী ছিলেন। সবকিছুতে একটু ভিন্ন ও তীক্ষ্ণভাবে চিন্তা করতেন। কারণ, তিনি ছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ও আমাদের জাতির পিতা সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। শেখ রাসেলের শরীরের প্রতিটি শিরায় বহমান ছিল সুন্দর আচরণ, মানবতা ও মমত্ববোধ। ফলে খুব দ্রুতই অন্য শিশুরা তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যেতেন। শেখ রাসেলের শিশুকালের ব্যক্তিত্ব, মানবতাবোধ, উপস্থিত বুদ্ধি, দূরদৃষ্টি ও নেতৃত্ব গুণসম্পন্ন বিষয়গুলো বাঙালি জাতিসহ বিশ্বের সব সব শিশুর মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক। এটি হলে দেশ, জাতি ও বিশ্বের মঙ্গল হবে। বিশ্ব একটি সুন্দর, মেধাবী ভবিষ্যৎ পাবে। শেখ রাসেল তাঁর বন্ধুদের যেভাবে খাবার, বই ও ক্রীড়াসামগ্রী উপহার দিয়ে ভালোবাসতেন, ঠিক তেমনি দেশের সব শিশু তার বন্ধুদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করুক। শেখ রাসেল ছিলেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন। তাঁর মৃত্যুতে জাতি এক সূর্যসন্তানকে হারিয়েছে। তার লালিত আদর্শ, চিন্তা ও মেধা বিশ্বের সব শিশুর মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক। এতে দেশ, জাতি ও বিশ্বের মঙ্গল হবে।

 
লেখক: অধ্যাপক; বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিবিদ; সদস্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং পরিচালক, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)।

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

জননেত্রী থেকে বিশ্বনেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকন্যা

জননেত্রী থেকে বিশ্বনেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুকন্যা

আওয়ামী লীগের এক সুদীর্ঘ গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের পথপরিক্রমা

আওয়ামী লীগের এক সুদীর্ঘ গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের পথপরিক্রমা

বিশ্ব শান্তির দূত বঙ্গবন্ধু

বিশ্ব শান্তির দূত বঙ্গবন্ধু

মুজিবনগর সরকারের গৌরবময় পঞ্চাশ বছর

মুজিবনগর সরকারের গৌরবময় পঞ্চাশ বছর

বাংলাদেশে বাড়ন্ত সাম্প্রদায়িকতা ও আমাদের করণীয়

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২১, ১৭:২১
মো. জাকির হোসেন সৃষ্টিতত্ত্বে মানুষে মানুষে কোনও পার্থক্য নেই। মহান আল্লাহ এই ধরণীতে মাটি থেকে একজন প্রতিনিধি সৃষ্টি করেন এবং তারপর তা থেকে ক্রমশ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন এই মানব জাতি। আল্লাহ বলেন– ‘হে মানব, আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিতি হও।’ (সুরা হুজুরাত: ১৩)।

অন্য এক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দুজন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী’। (সুরা নিসা: ১)।

মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা না করে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোত্র ইত্যাদিকে প্রাধান্য দিয়ে পার্থক্য করে দেখাই সাম্প্রদায়িকতা। পৃথিবীর সব ধর্মেরই মূল কথা শান্তি, সম্প্রীতি, ভালোবাসা, মৈত্রী। এই শিক্ষা থেকে সরে এসে এক সম্প্রদায়ের প্রতি অন্য সম্প্রদায়ের বিদ্বেষ, হিংসা ও আক্রোশেই সাম্প্রদায়িকতা।

গল্পে আছে শকুনের বাছা পিতার কাছে মানুষের মাংস খেতে চেয়েছিল। শকুন পিতা শূকরের মাংস জোগাড় করে তা মসজিদের পাশে আর গরুর মাংসের টুকরা মন্দিরের পাশে রেখে দেয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ। অগণিত লাশ পড়ে হিন্দু ও মুসলমানের। শকুন পরিবার মনের আশ মিটিয়ে মানুষের মাংস ভক্ষণ করে। সাম্প্রদায়িকতার নগ্ন প্রকাশ মানুষকে পশুতে পরিণত করে। সাম্প্রদায়িকতার কাছে পরাস্ত হয় মানবতা, সভ্যতা, মনুষ্যত্ব ও বিবেক। সাম্প্রদায়িকতা ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবনে ঐক্য, সংহতি, উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্তরায়। সাম্প্রদায়িকতা সমাজে শান্তি বিনষ্ট করে ধ্বংসের মুকে ঠেলে দেয়। সাম্প্রদায়িকতা তাই মানবজাতির জন্য এক ভয়ানক অভিশাপ।

বাংলাদেশ কোনও একক জনগোষ্ঠীর নয়। বাংলাদেশ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘এই দেশ হিন্দুর না, এই দেশ মুসলমানের না। এই দেশকে যে নিজের বলে ভাববে, এই দেশ তার। এই দেশের কল্যাণ দেখে যার মন আনন্দে ভরে উঠবে এই দেশ তার। এই দেশের দুঃখে যে কাঁদবে এই দেশ তার। এবং এই দেশ তাদের যারা এই দেশের মানুষের স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দিবে।’

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানব সভ্যতার একটি বড় ব্যর্থতা ও লজ্জা হলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে তাদের অধিকার ভোগে কার্যকর সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতা। আজকের আমেরিকাবাসী অনেকের পূর্ব পুরুষগণ ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও জাতি-গোষ্ঠীগত সংখ্যালঘু হিসেবে নির্যাতিত হয়ে নিজ রাষ্ট্র ছেড়ে নতুন পৃথিবীর সন্ধানে বের হয়ে মার্কিন মুলুকে বসতি গড়েন। একবিংশ শতাব্দীর ইউরোপ, আমেরিকায় সংখ্যালঘু মুসলমান, এশিয়ান ও কৃষ্ণাঙ্গরা প্রতিনিয়ত নিপীড়িত হচ্ছে। মিয়ানমারে সংখ্যালঘু মুসলমানদের অবস্থা বর্ণনাতীত। গান্ধীর অহিংস ভারত এখন সংখ্যালঘুদের জন্য সহিংস ভারত। বাংলাদেশেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সময়ে সময়ে নিপীড়িত হয়েছে, ভয়ংকর অধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে অস্বীকার করার উপায় নেই। সবকিছু পরও বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির মেলবন্ধন অনেক রাষ্ট্রের তুলনায় নজিরবিহীন। এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ তাদের পরস্পরের ধর্মীয় ও সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ পায়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে, মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান একত্রে লড়েছে। ’৭২-এর সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছে। যদিও দুই সামরিক শাসক জিয়া-এরশাদ সংবিধানের শল্য চিকিৎসা করে এর ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভয়ংকর মতবিরোধ থাকলেও একই স্রষ্টার সৃষ্টি, একই দেশের মানুষ, একই বাঙালি জাতিভুক্ত আমরা এরকম একটি সম্প্রীতির অনুভূতি সাধারণভাবে লক্ষণীয়। তবে ক্রমাগত বাড়ন্ত সাম্প্রদায়িকতার রোষানলে সেই সম্প্রীতি ম্লান হতে বসেছে। সম্প্রতি কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে হনুমানের প্রতিমার কোলে কোরআন রাখাকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা, খুলনা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, ফেনী ও সিলেটের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে হামলা-ভাঙচুর হয়েছে। নোয়াখালীর প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র চৌমুহনী পৌর এলাকায় জুমার নামাজের পর মিছিলকারীরা শহরের সড়কের দুই পাশে হিন্দুদের দোকানপাটে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাট চালান। বিভিন্ন মন্দির, আশ্রম ও বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। হামলার সময় ইসকন মন্দিরে থাকা যতন সাহা নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে।

নতুন করে সহিংসতা এড়াতে শনিবার সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত চৌমুহনী পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। বর্তমানে বিজিবি, র‌্যাব ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে। মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলার প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ-প্রতিবাদের মধ্যেই ফেনী শহরে নতুন করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল (শনিবার) বিকালে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের মানববন্ধন চলাকালে ঢিল ছোড়াকে কেন্দ্র করে সেখানে সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাসহ আহত হয়েছেন ১৫ জন। এ সময় ফেনী শহরে কয়েকটি দোকানে ভাঙচুর করা হয়। আগুন দেওয়া হয় একটি গাড়িতে। হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি আশ্রম ও মন্দিরে হামলা চালানো হয়।

পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা বিধানের জন্য ২৩ জেলায় বিজিবি নামানো হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সব ধর্মের মানুষের রক্তের মিলিত স্রোতধারায় এই বাংলার জমিন রক্তাক্ত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের আক্রমণের প্রধান দুটি টার্গেট ছিল – আওয়ামী লীগ ও হিন্দু সম্প্রদায়। স্বাধীনতার ৫০ বছর পর র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি নামিয়ে হিন্দুদের পূজার নিরাপত্তা বিধান সব বাঙালির জন্য, বিশেষ করে মুসলমানের জন্য বড়ই লজ্জার!

ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ফায়দা লুটার ষড়যন্ত্র কিংবা ইসলাম ধর্মের প্রতি বিদ্বেষের কারণে যদি কোনও হিন্দু প্রতিমার কোলে কোরআন রাখার মতো ঘৃণ্য কাজ করেও থাকে, তাহলে তার/তাদের শাস্তি হবে। হিন্দুদের উপাসনালয় কেন আক্রান্ত হবে? হিন্দু সম্প্রদায় কেন দায়ী হবে? রাষ্ট্রের আইন বলছে, একজনের অপরাধের জন্য অন্যজনকে শাস্তি দেওয়া যাবে না। আর কোরআনের আইন একাধিকবার উচ্চারণ করেছে, যার অপরাধের দায় সে বহন করবে। একজনের অপরাধের দায় কোনোভাবেই আরেকজন বহন করবে না।

একজন মুসলমান অপরাধ করলে কি সব মুসলমানকে শাস্তি দেওয়া হয়? তাহলে অপরাধী হিন্দুর দায় নিরপরাধ হিন্দুদের ওপর কেন চাপানো হবে? প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দিরে হামলা এটা যেন নিত্য ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে ধর্ম অবমাননা কিংবা কোরআন অবমাননার কথা বলে নাসিরনগর, রাউজান, ফটিকছড়ি, কক্সবাজার, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, সুনামগঞ্জ, যশোর ও খুলনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

কুমিল্লায় নানুয়া দিঘির পাড়ের একটি মণ্ডপের ঘটনায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মন্দিরে হামলার ঘটনা মোটেই সরলরৈখিক নয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের অভিযোগ অনুযায়ী, দুর্গাপূজায় দেশের বিভিন্ন স্থানে তিন দিনে ৭০টি পূজামণ্ডপে হামলা-ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এর বাইরে অন্তত ৩০টি বাড়ি এবং ৫০টি দোকান ভাঙচুর ও লুটপাট হয়।

‘তৌহিদি জনতা’র নামে বারবার এই যে অমুসলিমদের ওপর শারীরিক আক্রমণ, পূজামণ্ডপ, উপাসনালয়, ঘরবাড়ি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট চালানো হয়, তা কি ইসলাম সমর্থন করে?

মদিনার সংহতির কথা চিন্তা করে রাসুল (সা.) সেখানকার অধিবাসীদের নিয়ে তথা পৌত্তলিক, ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মধ্যে এক লিখিত সনদ বা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এ সনদকেই ‘মদিনা সনদ’ বলা হয়। মদিনা সনদে বলা হয়, স্বাক্ষরকারী ইহুদি, খ্রিষ্টান, পৌত্তলিক ও মুসলিমরা মদিনা রাষ্ট্রে সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবেন এবং একটি জাতি (উম্মাহ) গঠন করবেন। সব শ্রেণির লোক নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করতে পারবেন। রাসুল (সা.) উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা দিয়ে বলছিলেন, ‘যদি কোনও মুসলিম কোনও অমুসলিম নাগরিকের ওপর নিপীড়ন চালায়, তার অধিকার খর্ব করে, তাকে কষ্ট দেয় এবং তার থেকে কোনও বস্তু বলপ্রয়োগ করে নিয়ে যায়; তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহর বিচারের কাঠগড়ায় আমি তাদের বিপক্ষে অমুসলিমদের পক্ষে অবস্থান করবো। (আবু দাউদ, ৩০৫২)

সাম্প্রদায়িকতা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যারা মানুষকে সাম্প্রদায়িকতার দিকে ডাকে, সাম্প্রদায়িকতার জন্য যুদ্ধ করে, সংগ্রাম করে এবং জীবন উৎসর্গ করে, তারা আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, ৫১২৩)

একজন প্রকৃত মুসলমানের পক্ষে মন্দির-প্রতিমা ভাঙা তো দূরের কথা, মন্দির কিংবা প্রতিমা ভাঙার চিন্তা করাও সম্ভব নয়। আল্লাহ বলেন, “হে ইমানদারগণ! তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসব দেব-দেবীর পূজা-উপাসনা করে, তোমরা তাদের গালি দিও না। …।” (সুরা আনআ’ম: ১০৮)। অন্যদিকে, যুদ্ধের সময়ও ঘরবাড়ি ও উপাসনালয় ক্ষতিগ্রস্ত করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘……  ‘তোমরা কোনও নারীকে হত্যা করবে না, অসহায় কোনও শিশুকেও না; আর না অক্ষম বৃদ্ধকে। আর কোনও গাছ উপড়াবে না, কোনও খেজুর গাছ জ্বালিয়ে দেবে না। আর কোনও গৃহও ধ্বংস করবে না।’ (মুসলিম, ১৭৩১)। অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমি তোমাদের কয়েকটি উপদেশ দিয়ে প্রেরণ করছি, যুদ্ধক্ষেত্রে তোমরা বাড়াবাড়ি করবে না, ভীরুতা দেখাবে না, শত্রুপক্ষের কারও চেহারার বিকৃতি ঘটাবে না, কোনও শিশুকে হত্যা করবে না, কোনও উপাসনালয়ও জ্বালিয়ে দেবে না এবং কোনও বৃক্ষও উৎপাটন করবে না।’ (মোসান্নাফ আবদুর রাযযাক, ৯৪৩০)

যেখানে অন্য ধর্মের দেবতাকে গালি দেওয়া নিষিদ্ধ সেখানে মন্দির ভাঙচুর ও মানুষ হত্যা কীভাবে বৈধ হতে পারে? যারা এমনটি করছেন, তাদের পরিচয় আর যাইহোক তারা মুসলমান নয়। একজন প্রকৃত মুসলমান কখনোই ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতিতে আঘাত আসে এমন কোনও কাজ করতে পারে না। প্রকৃত ঘটনা অনুসন্ধান করে দোষীদের চিহ্নিত করার আগেই যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যাচারের মাধ্যমে মানুষকে উসকে দিয়েছেন, তারা সমাজে শান্তি বিনষ্ট করে সমাজকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়ে ভয়ানক ফিতনা সৃষ্টি করেছেন। এটি পবিত্র কোরআনের বিধানের লঙ্ঘন। মহান আল্লাহ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, “শৃঙ্খলাপূর্ণ পৃথিবীতে তোমরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।” (সুরা কাসাস: ৭৭)

ফিতনা-ফাসাদ আর বিশৃঙ্খলা যে কত জঘন্য কাজ, তা আমরা পবিত্র কোরআনের ছোট্ট এই আয়াত থেকে বুঝতে পারি। মহান আল্লাহ বলেন, ফিতনা-ফাসাদ হত্যার চেয়েও জঘন্য অপরাধ।” (সুরা বাকারা : ১৯১)

‘তৌহিদি জনতা’কে যারা মিথ্যাচার করে উত্তেজিত করে আমরা তাদের যেমন প্রতিরোধ করতে পারিনি, তেমনি ‘তৌহিদি জনতা’কেও বুঝাতে সক্ষম হইনি অমুসলিমদের ওপর শারীরিক আক্রমণ পূজামণ্ডপ, উপাসনালয়, ঘরবাড়ি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট কোরআন-হাদিসের বিধানের লঙ্ঘন। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মন্দির ও মণ্ডপে হামলার বিষয়টিকে সামনে রেখে ‘রাজনৈতিক কারণে ধর্মের অবমাননা ঘটছে কিনা’ এ প্রশ্ন রেখে একটি জরিপ চালায় ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগ। মোট ৪১ হাজার দর্শক এ জরিপে অংশ নেয়। অংশগ্রহণকারীদের শতকরা ৯২ ভাগের মতে, রাজনৈতিক কারণে ধর্মের অবমাননা ঘটছে। রাজনৈতিক কারণে যারা বারবার ধর্মের অবমাননা করছে, বিচার করে আমরা দোষীদের শাস্তি দিতে পারিনি।

হিন্দুদের দুর্গাপূজা উপলক্ষে শারদীয় শুভেচ্ছা জানিয়ে যারা রাস্তার মোড়ে মোড়ে ব্যানার টানিয়ে ছিল, জেলায় জেলায় যখন মণ্ডপ, ঘরবাড়ি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হলো, তাদের অধিকাংশই প্রতিরোধ দূরে থাক, খুঁজেও পাওয়া যায়নি। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থ উদ্ধারে এমন প্রতারণামূলক শুভেচ্ছা বাণীর ব্যবসা আর কতদিন চলবে?

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে ফেসবুকে গুজব ছড়িয়ে উগ্র ধর্মান্ধগোষ্ঠী অগ্নিসংযোগ ও হামলা চালিয়ে ধ্বংস করেছিল কক্সবাজারের রামুর ১২টি প্রাচীন বৌদ্ধবিহার ও ৩৪টি বসতি। সেই সঙ্গে চলে লুটপাট। হামলার ঘটনায় পুলিশের করা ১৮টি মামলার মধ্যে ৯ বছরে একটিরও বিচার হয়নি। রামু হামলার প্রত্যক্ষদর্শী তরুণ বড়ুয়া সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘বৌদ্ধদের ঘরবাড়িতে হামলা-ভাঙচুর চললেও পল্লির ভেতরে থাকা মুসলিম বাড়িগুলো ছিল সুরক্ষিত। এতে বোঝা যায়, হামলা যারা করেছিল, তারা চেনাজানা লোক। হামলার ঘটনা ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। তরুণ বড়ুয়া অভিযোগ করেছেন, যারা বৌদ্ধবিহারে হামলা চালিয়েছিল, অগ্নিসংযোগ করেছিল, সবার ছবি তখন ফেসবুকে, জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে। হামলার আগে তারা মিছিল-মিটিংয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিল। তদন্তের সময় আমরা হামলাকারীদের নামধাম পুলিশকে দিয়েছিলাম, হামলার ঘটনার ছবিও দিয়েছিলাম। কিন্তু আদালতে দাখিল করা পুলিশের অভিযোগপত্রে (চার্জশিট) তাদের একজনের নামও নেই। যারা হামলা করেনি, তাদের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন আমরা আদালতে গিয়ে কার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবো?’

তরুণ বড়ুয়া চাপা কষ্ট আর ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বলেন, ‘রামু হামলার বিচার পাবেন না সংখ্যালঘুরা, আশাও করি না। আমরা ঘটনাটা জিইয়ে রাখতে চাই না। আমরা শান্তিতে থাকতে চাই। যারা বিহারে হামলা করেছিল, অগ্নিসংযোগ চালিয়ে সবকিছু ধ্বংস করেছে, আমরা তাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। হামলার বিচারও চাই না। এখন আদালত মামলাগুলো ডিসমিস করে দিলে পারেন।’

রামু ধ্বংসযজ্ঞের এক বছরের মাথায় প্রায় ২২ কোটি টাকা খরচ করে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ধ্বংসস্তূপের ওপর ১২টি দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধবিহার নির্মাণ করে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। বিহার, মন্দির প্রতিমা সবই নতুন করে গড়ে তোলা যায়, কিন্তু হৃদয়ের ক্ষতটা শুকাবে কী দিয়ে?

শক্তি আর অস্ত্র দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হওয়া যায় না। মনের অন্ধকার দূর করাটাই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বড় হাতিয়ার। সম্প্রীতির ঐতিহ্য ও ধর্মের প্রকৃত বাণী ছড়িয়ে দিতে হবে। এমন শিক্ষা ও মননের চর্চা করতে হবে, যা মনের সংকীর্ণতাকে দূর করে। শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন করে প্রকৃত শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে, যা মনের সংকীর্ণতাকে দূর করে এমন মানুষ তৈরি করবে, যার মধ্যে উগ্রতা, সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না। আর এজন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক উদ্যোগও গ্রহণ করতে হবে। অমুসলিমদের নির্যাতনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। কুমিল্লায় মণ্ডপে কোরআন অবমাননার ঘটনা ও তার প্রতিক্রিয়ায় সংঘটিত পরিকল্পিত সন্ত্রাসের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দেখার প্রত্যাশা করছি।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যা ও বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বার্তা

রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যা ও বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বার্তা

তালেবানবিরোধীদের স্ববিরোধী অবস্থান

তালেবানবিরোধীদের স্ববিরোধী অবস্থান

আমি কেন তালেবানকে সমর্থন করি না?

আমি কেন তালেবানকে সমর্থন করি না?

পরীমণি, ‘সরি মণি’

পরীমণি, ‘সরি মণি’

তারা করেন রাজনীতি আর প্রাণ যায় মানুষের

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২১, ১৫:৫৮

মাসুদা ভাট্টি বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না– এই সত্য এখন প্রতিষ্ঠিত। আওয়ামী লীগের মতো একটি ঘোষিত সংখ্যালঘুবান্ধব সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও এই নিরাপত্তা কেন বারবার বিঘ্নিত হচ্ছে, কেন পালা-পার্বণে কিংবা কোনোরকম অজুহাত ছাড়াই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর আঘাত আসছে তার কারণও আমাদের কাছে এখন আর অজ্ঞাত নয়। জ্ঞাত এবং সাদা চোখে দেখতে পাওয়া কারণগুলোর অন্যতম হচ্ছে, এ দেশের সংখ্যাগুরু ধর্মবিশ্বাসীদের ধর্ম-মানসে পরিবর্তন, যা ইতিবাচক নয় এবং পূর্বে ঘটে যাওয়া সংখ্যালঘু-নির্যাতনের বিচারকার্যে দীর্ঘসূত্রতা কিংবা বিচার না হওয়া। আরও বড় কারণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগের মতো বড় ও সেক্যুলার ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর থেকেও সর্বধর্ম সম্মিলন কিংবা অন্য ধর্মে বিশ্বাসীদের প্রতি বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা, একত্রে বসবাসের ইচ্ছা ইত্যাদি ক্রমশ বিলীন হয়ে যাওয়া।

এই পরিবর্তন একদিনে হয়নি, ধীরে ধীরে হয়েছে এবং এখন এটি এতটাই প্রকট হয়ে পড়েছে যে এতদিন এ দেশের ধর্মবাদী শক্তির মধ্যে যে পরধর্ম-বিদ্বেষ ও আক্রমণাত্মক আচরণ লক্ষ করা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এখন আওয়ামী-রাজনীতিতে বিশ্বাসীদের মধ্যেও সেই একই আচরণ বা মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটিই সবচেয়ে বিপদের কথা।

খুব বেশি পেছনে যাওয়ার দরকার নেই, এবার দুর্গাপূজার মহাঅষ্টমীর দিনে কুমিল্লায় যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটা যে ইচ্ছাকৃত ঘটানো হয়েছে তা নিশ্চয়ই প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না। বোঝাই যাচ্ছে যে এই ঘটনা দিয়ে সারা বাংলাদেশকে একটি নরককুণ্ড বানানোর চেষ্টা হয়েছে এবং যারা এটি করতে চেয়েছে তারা সর্বোতভাবে সফলই হয়েছে বলতে হবে। নিঃসন্দেহে এই ভয়ংকর কাণ্ডের পর বাংলাদেশে বসবাসরত সংখ্যালঘু ধর্ম-সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আতঙ্ক তৈরি হবে এবং এ দেশে বসবাস বিষয়ে তাদের নতুন করে ভাবতে হবে। এবং এটাই যে এ দেশে সংখ্যালঘু-নির্যাতনের অন্যতম কারণ তা তো সেই পাকিস্তান আমল থেকে নির্মম সত্য হিসেবে আমরা জানি এবং বুঝি, কিন্তু এর প্রতিকার হিসেবে আমরা কোনও পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছি।

আমরা এই সত্যও স্পষ্টভাবে জানি যে ১৯৭৫ সালের পর থেকে এ দেশে হিন্দুদের জীবন ও সম্পদ পুরোপুরি অনিরাপদ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দু’দু’টি সামরিক শাসক ও তাদের হাতে সৃষ্ট রাজনৈতিক দলসমূহের কাছে সংখ্যাগুরুর ধর্ম ও তাদের আরও ক্ষমতাবান করার যে কদর্য রাজনীতি আমরা দেখেছি এ দেশে, তা অন্য কোনও আধুনিক রাষ্ট্রে দেখা যায়নি।

রাষ্ট্রের নগ্ন পৃষ্ঠপোষকতায় এ দেশে সংখ্যালঘু ধর্মসম্প্রদায়ের সংখ্যা তীব্রভাবে কমেছে এবং যেকোনও ছল-ছুতোয় এই জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণের তীব্রতা এবং পরিমাণ কেবল বেড়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সংখ্যাগুরুর ধর্মের কল্পিত শত্রু হিসেবে সব সময় সংখ্যালঘুর ধর্মকে দাঁড় করানোর ফলে এ দেশের সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বেও তার প্রচণ্ড বিরূপ প্রভাব পড়েছে, ফলে দুই সম্প্রদায়ের ভেতর আর মিল বা বন্ধুত্বের সুযোগও গেছে কমে। এমতাবস্থায় আওয়ামী লীগের সেই পুরনো অবস্থান অর্থাৎ ‘ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদ নয়’ বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে বললে পরিস্থিতির সম্পূর্ণ সত্য বিবরণ দেওয়া হবে না; বরং একথাটিই বলতে হবে যে জাতীয় পর্যায়ে যদিও দলটির নেতৃত্ব দেশের ভেতর ধর্ম-সম্মিলনকে বজায় রাখতে ইচ্ছুক কিন্তু দলটির তৃণমূলে এই ধারণাকে ছড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হয়নি। ১৩ বছরকাল সর্বাধিক সক্ষমতা নিয়ে ক্ষমতায় থাকার পরও দলটির এই ব্যর্থতা দেশের সুস্থ বিবেককে শুধু পীড়া দেয় তা নয়, বরং দলটির প্রতি এ বিষয়ে আস্থা রাখতেও অনেকে ভয় পাচ্ছেন।

দুঃখজনক সত্য হচ্ছে দেশের সংখ্যালঘু ধর্মবিশ্বাসীদের জীবন ও সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে আর কেউ বা কোনও পক্ষ কখনোই এগিয়ে আসেনি। এমনকি তাদের পক্ষ নিয়ে কথা বলা সমাজের বিশিষ্টজনের সংখ্যাও এ দেশে কমে গেছে। কুমিল্লার ঘটনার পর থেকে এই ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্য সরকারকে দায়ী করে অনবরত কথা বলে চলছেন নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করা ছোট-বড় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। প্রমাণ দেওয়ার যেহেতু দায় নেই সেহেতু তাদের সেসব বক্তব্য দেদার বণ্টন হচ্ছে অনলাইনে এবং কারা করছেন এসব?

যারা আসলে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশকে হিন্দু বা অমুসলিমশূন্য করে  কেবল মুসলিম-রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান তারা। বরাবরের মতো বিএনপিও তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগকে এজন্য দায়ী করছে এবং সর্বোতভাবে এদেশে তাদের ভারতবিরোধী রাজনীতি জীবিত রাখতে ‘হিন্দু-কার্ড’ খেলাকেই এখনও প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।

এতদিন ধরে এ দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলায় সবচেয়ে প্রধান প্রতিবাদকারীর ভূমিকা পালন করেছে দেশের সুশীল সমাজ। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই সমাজের পরিচিত মুখগুলোকে আমরা আর দেখতে পাচ্ছি না। এর কারণ হয়তো এটাই, তারা মনে করেন যে প্রতিবাদ করবেন কার বিরুদ্ধে? এ দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জীবন ও সম্পদ যদি আওয়ামী লীগের আমলেই সুরক্ষিত না থাকে তাহলে আর কখন থাকবে? এই চিন্তা থেকে হয়তো তারা প্রতিবাদ বা প্রতিরোধে একটু পিছিয়ে আছেন। কিন্তু আমরা যদি দেশের সুশীল সমাজের শক্তির কথা বলি তাহলে ১/১১-র কালে তাদের রাজনীতিবিদ হওয়া এবং রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীজন হওয়ার খায়েশ তাদের শক্তিকে যে সম্পূর্ণ বিনষ্ট করেছে তাতে সত্যিই আর কোনও সন্দেহ নেই। কারণ, এরপর থেকে কোনও রাজনৈতিক দলের কাছেই আর এই পক্ষটির কোনও ‘মূল্য’ নেই সেই অর্থে। এখনও আমরা কেবল দেশের সুশীল সমাজকে সরকার পরিবর্তন, নির্বাচন ইত্যাদি বড় বড় বিষয় নিয়েই কথা বলতে দেখি বা শুনি, কিন্তু দেশের ভেতর ঘটা সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারী নির্যাতনের মতো ‘ছোট’ বিষয় নিয়ে কথা বলতে বা কোনোরকম ভূমিকা পালন করতে দেখি না। ফলে দেশের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর (নারীসহ) পক্ষে কথা বলা মানুষের সংখ্যা এখন বলতে গেলে শূন্য।

এই অচলাবস্থার সঙ্গে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে যুক্ত হয়েছে উন্মুক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এই মাধ্যমটি সম্পূর্ণভাবে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে গুজব ছড়িয়ে দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে। ব্যক্তি-আক্রমণ, কুৎসা রটনা এবং মিথ্যা সংবাদ সাজিয়ে মানুষকে উসকে দেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যে বাংলাদেশে ভয়ংকর নজির স্থাপন করেছে তার প্রমাণ কুমিল্লা, রামু, বাঁশখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভোলা, সুনামগঞ্জসহ দেশের সর্বত্র ছড়ানো। দেশে ভয়ংকর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বলবৎ রয়েছে কিন্তু এই আইনে কেবল সাংবাদিক নির্যাতনের কথাই শোনা যায় কিন্তু এই আইনে কোনও সাম্প্রদায়িক দুর্বৃত্তকে বিচারের আওতায় এখনও আনা সম্ভব হয়েছে বলে জানা যায় না। তবে হ্যাঁ, এই আইনে মূল আসামি গ্রেফতার বা সাজা ভোগ না করলেও কল্পিত অভিযুক্ত হিসেবে অনেকেই ইতোমধ্যে বিনা বিচারে কারাভোগ করেছেন বলে প্রমাণ রয়েছে।

এতসব নেতিবাচক ঘটনার সঙ্গে সর্বসম্প্রতি কুমিল্লার ঘটনার পরে জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে প্রতিবেশী ভারত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ঘুঁটি হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহারের বিষয়টি। বিশেষ করে কুমিল্লার ঘটনা-পরবর্তী অন্যান্য জায়গায় সংখ্যালঘু আক্রমণ নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে পাঠানো পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতার চিঠি নিয়ে রাজনৈতিক জল শুধু ঘোলা নয়, একেবারে কৃষ্ণকালো হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের ভারতবিদ্বেষী রাজনীতির আগুনে ঘি নয়, এই ঘটনা কেরোসিন ঢালার মতো কাজ করবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দৃঢ়ভাবে বলেছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ধর্মসম্প্রদায়ের ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে। যদিও নোয়াখালী ওবায়দুল কাদেরের নিজের জেলা এবং সেখানকার ঘটনা মর্মান্তিক। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ভেতর এ নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে এবং গোয়েন্দা ব্যর্থতা নিয়েও দলটির মধ্যে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘুবান্ধব হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেওয়ার পরও যদি দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা দেওয়া না যায় তাহলে সেই ব্যর্থতা অন্য কারও ওপর চাপানোর যে সুযোগ থাকে না সে বিষয়টি দল হিসেবে আওয়ামী লীগ বুঝতে পারছে বলে প্রকাশিত খবরটি জানাচ্ছে। এখন কেবল কথার কথা নয়, কেবল ‘আনা হবে’ ‘করা হবে’ জাতীয় প্রতিশ্রুতিতে কাজ হবে বলে বিশ্বাস করার কোনও সুযোগ নেই। বরং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে দেশের ভেতর শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য অপরাধী যে ধর্মেরই হোক না কেন তাকে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির উদাহরণ তৈরি না করা গেলে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত এ দেশের রক্তপিপাসু রাজনৈতিক অপশক্তি তাদের রক্তাকাঙ্ক্ষা যেকোনও উপায়ে বজায় রাখবে বলেই মনে করি। তাতে কাদের রাজনৈতিক লাভ বা কাদের রাজনৈতিক ক্ষতি তা বলা না গেলেও দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ‘মানুষের’ যে আরও জীবনহানির ঘটনা ঘটবে তা নিয়ে কারও সন্দেহ থাকার কোনোই কারণ নেই।

লেখক: এডিটর ইনচার্জ, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

[email protected].com

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

আয়শা খানম– যে দীপ নেভে না কোনোদিন

আয়শা খানম– যে দীপ নেভে না কোনোদিন

সবার ভেতরেই পোশাকি বচন

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২১, ১৬:০৪

তুষার আবদুল্লাহ গতকাল রাতে ভেবেছিলাম আজ লিখবো না কিছু। লেখা কিংবা কথা বলা, সবই তো অপচয়। পত্রিকা বা পোর্টালের জায়গা ভরাট করে দেওয়ার জোগালি করা মাত্র। যা নিজে বিশ্বাস করি না তাই হয়তো লিখছি। যা বিশ্বাস করি তা হয়তো লিখতে পারছি না। বলার বেলায়ও একই চিত্র। এই যে মন ও কর্ম বা আচরণের দূরত্ব, এটা এক ধরনের অসুস্থতা। যারা রাজনীতি করছেন আর আমরা যারা বিভিন্ন পেশার সঙ্গে জড়িত, সবাই পোশাকি বচন নিয়ে আছি। একে অপরকে পোশাকি বচনে তুষ্ট বা দমন করে রাখতে চাই। কিন্তু যার সঙ্গে বিশ্বাস বা মনের যোগাযোগ নেই, সেই বচন টেকসই হয় না। দুর্যোগ প্রতিরোধ করতে পারে না। সাম্প্রদায়িকতা ‘ফনা’ তুলে দাঁড়ালেও বীণার কৃত্রিম সুর তাকে বশ মানাতে ব্যর্থ হয়।

সমাজ ও রাষ্ট্রে সাম্প্রদায়িকতা ‘ফোঁস’ করে উঠলে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দিকে আঙুল তুলি আমরা। নির্দিষ্ট করে ধর্মভিত্তিক দল বলে কিছু নেই এখন। সব রাজনৈতিক দলই ভোটবাজারে ধর্মকে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করছে। রাজনীতি কি শুধু সরকারি-বেসরকারি দফতরে কাজ আদায় কিংবা কাজ ফাঁকিতে? শিক্ষা, ব্যবসা, পণ্য বিক্রিতে উদারভাবে ধর্মের ব্যবহার হচ্ছে।

ধর্ম নিয়ে কট্টর অবস্থান সব অনুসারীর মধ্যেই আছে। হিন্দু-মুসলমানদের এ বিষয়ে একতরফা দোষারোপ করা যাবে না। রোগটি শুধু বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা মিয়ানমারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। সবাই রোগাক্রান্ত গোলকের। ভেতরে একটু উঁকি দিলেই, জীবন আচরণ ও অন্য ধর্মের প্রতি রাগ-অনুরাগ প্রত্যক্ষ করলেই রোগের লক্ষণ বোঝা যাবে। বাংলাদেশ ও এর চারপাশের ব্রিটিশশাসিত দেশগুলোতে ব্রিটিশরা যে বিষফোঁড়া ফাটিয়ে দিয়ে গেছে, সেই পুঁজ এখনও প্রবাহিত। উত্তাপটা বাড়ছেই।

মানুষ সাম্প্রদায়িক হলো কবে? ইতিহাস এর নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা দেবে কিনা জানি না। কোনও ইতিহাসই সংশয় ও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। সবাই নিজ নিজ মতলব মতো ইতিহাস তৈরি করে নিয়েছে। রাজনীতি, ধর্ম সবাই। তবে নিশ্চিত করে আমরা বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী ও বিশ্বাসীরা বলতে পারি- আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে অস্ত্র হিসেবে যখন ধর্মের ব্যবহার শুরু হলো তখন থেকেই ব্যক্তি, গোষ্ঠী, রাষ্ট্র সাম্প্রদায়িক হতে শুরু করে। এখন ক্ষমতায় আরোহন এবং টিকে থাকাও ধর্মের ওপর নির্ভরশীল। অসাম্প্রদায়িকতার পতাকা উড়ে বিস্ফোরিত হয় অসাম্প্রদায়িকতার ফাঁকা বুলি। আমরা ভোটের মতলবে, সামাজিক স্বার্থে অসাম্প্রদায়িকতার বসন নেই। কিন্তু ব্যক্তিজীবনে, আচরণে, চর্চায় আমাদের বহিঃপ্রকাশ সাম্প্রদায়িক। এজন্যই দেশি-বিদেশি গোষ্ঠী যখন তাদের স্বার্থ হাসিলের রণক্ষেত্রের নকশা তৈরি করে, তখন মুফতে পেয়ে যায় আমাদের মতো সৈনিক।

সাম্প্রদায়িক শক্তি যেকোনও জনপদেই লঘুদের ওপর চড়াও হয়। এটাই আধিপত্যবাদের ধর্ম। লঘুরা নির্যাতনের শিকার হলে, বিপন্ন বোধ করলে, নিরাপত্তাহীনতায় কুঁকড়ে থাকলে, অসাম্প্রদায়িকতার চাদর নিয়ে প্রায় সব রাজনৈতিক দলই এগিয়ে যায়। নিপীড়িতরা প্রথম প্রথম কারও কারও প্রতি বিশ্বাস রাখতো। কিন্তু দেখা গেলো- তাতে আগুন নেভে না। জমি, কন্যা, স্ত্রী, মায়ের ওপর থেকে লোভের চোখ সরে না। অঙ্ক কষে দেখা যায়, ভোটবাজারে বিক্রি হতে হতে আর কোনও ভাগশেষ নেই।

অভিবাসনের অন্যতম একটি কারণ সাম্প্রদায়িক আক্রমণ। দেশভাগের পর থেকে কম মানুষ তো ভিটে ছেড়ে এপার-ওপার হলো না। সব ভূখণ্ডেই এমন ভিটে ছাড়া মানুষের দল আছে। কিন্তু নতুন বসতিতেও কি তারা নিশ্চিত যাপনে আছে? সিদুঁর রাঙা মেঘ সর্বত্র তাদের তাড়া করেই বেড়াচ্ছে। কারণ ‘সাম্প্রদায়িকতা’র মতো আর কোনও পণ্যের চৌকাঠ অবধি বাজারজাত হয়নি। দুয়ার বন্ধ রেখেও কি এই পণ্যের প্রবেশ রোধ করা যাচ্ছে? যাচ্ছে না বলেই লেখন, বচন সবই অপচয়।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

/এসএএস/জেএইচ/

সম্পর্কিত

আমরা ‘নোবেল’ পেশাতেই আছি

আমরা ‘নোবেল’ পেশাতেই আছি

দৃশ্যমাধ্যম আপন শক্তিতে আলোকিত হোক

দৃশ্যমাধ্যম আপন শক্তিতে আলোকিত হোক

গ্রামীণ সুদের অস্বাস্থ্যকর অর্থনীতি!

গ্রামীণ সুদের অস্বাস্থ্যকর অর্থনীতি!

শিক্ষক ও মর্যাদার সংকট

শিক্ষক ও মর্যাদার সংকট

শেখ হাসিনায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি: স্বাভাবিক হলেও ব্যতিক্রম

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২১, ১৩:০৮

ড. প্রণব কুমার পান্ডে বঙ্গবন্ধু চারিত্রিকভাবে ছিলেন বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অধিকারী। খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সত্যের অনুসারী এবং মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই করতে বদ্ধপরিকর। সেই ছোটবেলায় স্কুলে পড়ার সময় একবার জেলা শিক্ষা অফিসারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছাত্রদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে তর্ক করেছিলেন। পরবর্তীতে তিলে তিলে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বিভিন্ন সময় আমরা প্রত্যক্ষ করেছি তাঁর প্রতিবাদী চরিত্রের। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করেছিল দেশবাসী। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগের ব্যাপক বিজয় হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক জান্তা যখন ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়, ঠিক সেই সময় বাংলার মানুষ কিছুটা দিশেহারা হয়ে পড়ে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু আগে থেকেই জানতেন এই হানাদার বাহিনীর হাত থেকে বাংলার মাটি ও মানুষকে রক্ষা করতে হলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেই হবে।

আর এই কারণেই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তিনি এক মহাকাব্যিক বক্তব্য প্রদান করেছিলেন।  একটি অলিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি যেভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের দৃশ্যপট রচনা করেছিলেন তা ইতিহাসে সত্যিই বিরল। সেই দিন বঙ্গবন্ধু যদি সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন তাহলে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে তাঁকে গ্রেফতার করে বাংলার মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রগতি রহিত করতো পাকিস্তানি জান্তা। কিন্তু, পাকিস্তানি শাসকরা বঙ্গবন্ধুকে চিনলেও তার ভেতরের যে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সেটা চিনতে কিছুটা হলেও ভুল করেছিলেন। আর এই কারণেই বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা না করে কূটনৈতিক ভাষায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে। তাঁর সেই বক্তব্য শুধু বাংলাদেশের জনগণকেই নয়, বিশ্ববাসীকে আকৃষ্ট করেছিল। এটি এমন এক ধরনের আবেগময় ভাষণ ছিল সে আবেগে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলার লাখো লাখো আবাল বৃদ্ধ বনিতা স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিল। এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফলে মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে আবির্ভূত হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা। কারণ, মাত্র নয় মাসে একটি দেশ স্বাধীন হয়েছে এরকম উদাহরণ পৃথিবীতে খুব কমই রয়েছে।

অনেকের মনে এতক্ষণ একটি প্রশ্ন জেগেছে যে আজকের লেখার শিরোনামের সঙ্গে এই বিষয়ের অবতারণা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? আমি মনে করি এটি সত্যিই যুক্তিযুক্ত। ৭ মার্চের ভাষণ প্রদান করা সব নেতার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এই ধরনের ভাষণ দেওয়ার জন্য প্রয়োজন অন্যরকম নেতৃত্ব, যা হবে নির্ভীক, বলিষ্ঠ এবং দূরদর্শী। বঙ্গবন্ধু তাঁর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। প্রথমদিকে সব ভালোই চলছিল। কিন্তু যখনই তাঁর এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে নেওয়া বিভিন্ন কার্যক্রম পাকিস্তানপন্থীদের স্বার্থে আঘাত হানে, তখনই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এর ভয়াল রাতে তাঁকে পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যের সঙ্গে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন পুরোটাই বাধাগ্রস্ত হয়।

এরপরে অনেক চড়াই-উৎরাই পার করে বঙ্গবন্ধুর কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দায়িত্বভার গ্রহণ করে দলকে সংগঠিত করে ক্ষমতায় নিয়ে যান। গত ১২ বছর শেখ হাসিনা যেভাবে দেশ শাসন করছেন তাতে স্পষ্টতই তার বাবার রাজনৈতিক গুণাবলি তাঁর নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে। এ বিষয়টি নিয়ে কোনও তর্কের অবকাশ নেই। বঙ্গবন্ধুর যেমন বাঙালির ও বাংলাদেশের জনগণের প্রতি ছিল অপরিসীম ভালোবাসা, ঠিক তেমনি শেখ হাসিনার রয়েছে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধু যেমন নীতির সঙ্গে কখনোই আপস করেননি, ঠিক তেমনি শেখ হাসিনাও নীতির কাছে আপস না করে কঠোরভাবে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে একটি শক্তিশালী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আমরা ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হবো এবং আশা করছি ২০৪১ সালে উন্নত বিশ্বে উন্নীত হবো। গত এক দশকে উন্নয়ন এমনি এমনি হয়নি। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অক্লান্ত পরিশ্রম এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের কারণে হয়েছে। তিনি চেষ্টা করেছেন উন্নয়নের সব মাত্রায় এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে, যাতে সার্বিকভাবে উন্নয়ন সূচকে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আমরা যেমন এশিয়ান টাইগার হয়েছি, ঠিক তেমনি সামাজিক সূচকে গত এক দশকের আমাদের উন্নয়ন পৃথিবীব্যাপী স্বীকৃত হয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করেছি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সাফল্যের কারণে জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্ক (এসডিএসএন) কর্তৃক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ‘এসডিজি প্রগ্রেস ওয়ার্ড’-এ ভূষিত করা হয়েছে জাতিসংঘের ৭৬তম সাধারণ অধিবেশনে।

বঙ্গবন্ধুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ১২ বছর ধরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাঁর যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন। এটি সত্যিই একটি সাহসী সিদ্ধান্ত। পিতামাতার আদর্শ সাধারণত সন্তানদের মধ্যে প্রতিফলিত হয়- এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য শেখ হাসিনার মাধ্যমে প্রতিফলিত হবে এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবারগুলোতে এই বিষয়টি সব সময় স্বাভাবিক হতে দেখা যায়নি। আমরা দেখেছি কীভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে সন্তানরা বিভিন্নভাবে দুর্নীতি ও অনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত হয়েছেন। অবশ্যই কেউ কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, সেসব সন্তানকে প্রতিপালনের ক্ষেত্রে হয়তো পিতামাতা ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু পাশাপাশি এটাও  ঠিক, যখন কেউ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন তখন তাঁর উচিত নিজের সম্মান রক্ষার্থে এবং দেশের মানুষের কথা ভেবে নিজের সন্তানদের নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু আমরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখেছি, অনেকেই তাঁদের সন্তানদের একদিকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি, আবার পাশাপাশি নিজেদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকের সন্তানদের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।

সেই জায়গা থেকে বিচার করলে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বঙ্গবন্ধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো শেখ হাসিনার চরিত্রের মাধ্যমে প্রতিফলিত হওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিক হলেও ব্যতিক্রম বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। শেখ হাসিনা তাঁর বাবার আদর্শকে শুধু লালনই করেননি, তাঁর  অপূর্ণ স্বপ্ন সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে পরিশ্রম করে চলেছেন। তাঁর প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশ অবশ্যই সোনার বাংলায় রূপান্তরিত হবে। তবে পাশাপাশি এটিও ঠিক, বঙ্গবন্ধু যেমন বিভিন্ন সময়ে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন, শেখ হাসিনা সেভাবে বিভিন্ন সময় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। কখনও বা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, আবার কখনও বা মৌলবাদের হামলার শিকার হয়েছেন। ঈশ্বরের অশেষ কৃপায় তিনি প্রতিবারই অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন।

তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এখন সবাই বাংলাদেশকে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বিবেচনা করে। ১২ বছরের কঠোর পরিশ্রমের ফলে শেখ হাসিনা আঞ্চলিক নেত্রী থেকে বিশ্বনেতৃত্বে রূপান্তরিত হয়েছেন। বড় বড় দেশের রাজনৈতিক নেতারা শেখ হাসিনার কাছে প্রায়ই জানতে চান বাংলাদেশের অবিস্মরণীয় উন্নয়নের মূলমন্ত্র। শেখ হাসিনা বারবার একই কথা বলেছেন যে জনগণকে ভালোবেসে, তাদের কথা চিন্তা করে, এবং সততার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করলে দেশের উন্নয়ন হবে এটিই স্বাভাবিক। এবং এই কারণেই তিনি উন্নয়নের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াসে লিপ্ত রয়েছেন। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাংলাদেশকে এবং বাংলাদেশের জনগণকে সোনার বাংলার জনগণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার তাঁর লড়াই চলমান রয়েছে। আবার এটিও ঠিক, তাঁর আশপাশে, এমনকি তাঁর দলেও এখনও কিছু অপশক্তির অন্তর্ভুক্তি হয়েছে, যারা সব সময় চেষ্টা করছে উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতে।  

অতএব, এই মানুষগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, আমাদের মনে রাখতে হবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত স্নেহের কিছু মানুষ, যাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু নিজের খাবার শেয়ার করতেন। সেই খন্দকার মোশতাক গংয়ের প্রেতাত্মারা আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বুঝতে হবে কারা তাঁর ভালো চায় এবং কারা তার খারাপ চায়? এই মানুষগুলোকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে। পরিশেষে বলতে চাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের দৃশ্যমানতা পিতা-কন্যার সম্পর্কের খাতিরে স্বাভাবিক হলেও বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা, এতে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।

লেখক: অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

/এসএএস/এমওএফ/এমএম/

সম্পর্কিত

শেখ রাসেল এক অনন্য শিশুসত্তা

শেখ রাসেল এক অনন্য শিশুসত্তা

বাংলাদেশে বাড়ন্ত সাম্প্রদায়িকতা ও আমাদের করণীয়

বাংলাদেশে বাড়ন্ত সাম্প্রদায়িকতা ও আমাদের করণীয়

তারা করেন রাজনীতি আর প্রাণ যায় মানুষের

তারা করেন রাজনীতি আর প্রাণ যায় মানুষের

সবার ভেতরেই পোশাকি বচন

সবার ভেতরেই পোশাকি বচন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

পাবজি খেলা নিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত কিশোর সংশোধনাগারে

পাবজি খেলা নিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত কিশোর সংশোধনাগারে

দক্ষিণ কোরিয়া গেলেন সেনাপ্রধান

দক্ষিণ কোরিয়া গেলেন সেনাপ্রধান

সম্পাদকের অনুসারীদের হাতে চবি ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি লাঞ্ছিত

সম্পাদকের অনুসারীদের হাতে চবি ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি লাঞ্ছিত

রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি, জেলখানা ওর আব্বার বাড়ি

রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি, জেলখানা ওর আব্বার বাড়ি

প্রেমিকার আপত্তিকর ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে যুবক গ্রেফতার 

প্রেমিকার আপত্তিকর ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে যুবক গ্রেফতার 

সেই বছরের আরব যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা পাঠাতে প্রস্তুত বঙ্গবন্ধু

সেই বছরের আরব যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা পাঠাতে প্রস্তুত বঙ্গবন্ধু

প্রথমবারের মতো আর্থশট পুরস্কার ঘোষণা

প্রথমবারের মতো আর্থশট পুরস্কার ঘোষণা

ফরাসি রাষ্ট্রদূতকে বেলারুশ ত্যাগের নির্দেশ

ফরাসি রাষ্ট্রদূতকে বেলারুশ ত্যাগের নির্দেশ

আমেরিকান মিশনারি অপহরণে হাইতির গ্যাং জড়িত: কর্মকর্তা

আমেরিকান মিশনারি অপহরণে হাইতির গ্যাং জড়িত: কর্মকর্তা

প্রাণঘাতী বন্যায় ভারতে বহু মানুষ নিখোঁজ

প্রাণঘাতী বন্যায় ভারতে বহু মানুষ নিখোঁজ

ফাতির নৈপুণ্যে পিছিয়ে পড়েও বার্সেলোনার দুর্দান্ত জয়

ফাতির নৈপুণ্যে পিছিয়ে পড়েও বার্সেলোনার দুর্দান্ত জয়

হাসপাতাল ছাড়লেন বিল ক্লিন্টন

হাসপাতাল ছাড়লেন বিল ক্লিন্টন

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune