X
শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ১০ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

শহর ছাড়ি, গ্রামে ফিরি!

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২০, ১৬:১৮

শান্তনু চৌধুরী কয়েক দিন আগে ভোরে অফিসে যাওয়ার আগে দেখি বাসার নিচে ট্রাক দাঁড়ানো। মালপত্রে ঠাসা। পেছনে কোনায় বসা একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক, স্ত্রী এবং দু’বাচ্চা। মাস্ক পরা আর মুখ নিচু থাকায় প্রথমে চিনতে পারিনি, পরে দেখলাম তিনি সেই লোক, আমি যে বাসায় ভাড়া থাকি তার ছয়তলায় থাকেন, মাঝে মাঝে সিঁড়িতে দেখা হতো। সালাম দিতাম বয়স্কজন জেনে। জানতে চাইলাম, বাসা ছেড়ে দিয়েছেন নাকি? প্রশ্ন শুনে কিছুক্ষণ নিরুত্তর। আবেগ এসে ভর করেছে চোখে মুখে, লজ্জায় আড়ষ্ট যেন! উত্তর এলো, না, গ্রামের বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। এরপর আর কিছু জিজ্ঞাসা করা চলে না। বাকিটা তো আমি, আপনি সবারই জানা। এরপর দেখলাম সামনের মাঠে যেখানে পাড়ার ছেলেরা ক্রিকেটে মেতে থাকতো তারই এক পাশে পুরাতন সোফা সেট, নষ্ট টেলিভিশন, ফ্যানসহ আরও কয়েকটি সামগ্রী কে যেন ফেলে রেখেছে। এরাও হয়তো ঢাকা ছেড়েছে। আর এসব সামগ্রী অপ্রয়োজনীয় মনে করে ফেলে রেখে গেছেন। সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন এবং আমার নিজস্ব অনুসন্ধান বলছে, করোনার যে শারীরিক ছোবল তার চাইতেও ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ছোবল এবং মানুষকে নিঃস্ব করে দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কয়েক দশক ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোতে বাস করে মানুষ বুঝে গেছে এই শহরটি তার আপন নয়, বরং কাজ থাকুক বা না থাকুক, যে গ্রামকে সে ফেলে এসেছে সেখানেই যেন তার শেষ আশ্রয়। সে কারণে শত শত মানুষ কাজ হারিয়ে শহর ছাড়ছেন, হয়তো সামনে সেটি হাজার হাজারে গিয়ে ঠেকবে।
যারা ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন তাদের কোনও আয়ের উৎস নেই। সরকারের কোনও অনুদানও জোটেনি তাদের ভাগ্যে, প্রথম প্রথম তারা হয়তো নানা মাধ্যম থেকে খাবারের সহায়তা পেলেও এখন তা নেই বললেও চলে। আর শুধু খাবারের বিষয়টা দেখলে তো হবে না। ঢাকায় বাসা ভাড়া দেওয়াও একটা বড় বিষয় এবং যত ছোট বাসাই হোক না কেন টাকার অংকটা নেহায়েত কম নয়। দীর্ঘদিন ধরে বেকার। আয় রোজগার বন্ধ। করোনার এই পরিস্থিতি তাদের জীবন এলোমেলো করে দিয়েছে। নষ্ট করে দিয়েছে সাজানো সংসার। এরা শুরুতেই হারিয়েছে বাসা ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য, এরপর খাবার নেই। অথচ এই মানুষগুলোই হয়তো কয়েক দশক বা কয়েক বছর আগে ঢাকায় এসেছিলেন নিজেদের ভাগ্য বদলাতে। কিন্তু ভাগ্যই আজ তাদের নিয়ে যাচ্ছে গ্রামে। এই সময়গুলোতে নিজেদের যতটা উন্নতি তারা ঘটিয়েছিলেন আবার সেটি পিছিয়ে গেলো। আর কখনও জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে কিনা সেটিই বা কে বলতে পারে। শহরের ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে বাধ্য হয়ে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন কর্মহীন মানুষ। প্রতিদিনই দেখা যায়, মালপত্র ট্রাকভর্তি করে ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। কেউ কেউ মালপত্র রেখেই যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গার্মেন্ট শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ। শুধু নিম্ন আয়ের মানুষই নয়, ঢাকা ছাড়ছেন মধ্যবিত্ত মানুষজনও।  রাজধানীর মেসগুলোও ফাঁকা হতে শুরু করেছে। করোনার ছোবলে বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাই মেসগুলো ছেড়ে দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ব্র্যাকের এক জরিপ এখানে তুলে ধরছি। সারা দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ২ হাজার ৩৭১ জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে ব্র্যাক মে মাসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। এতে দেখা যায়, ৩৬ শতাংশ লোক চাকরি বা কাজের সুযোগ হারিয়েছেন। ৩ শতাংশ লোক চাকরি থাকলেও বেতন পাননি। আর দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে যারা কাজ করেন, তাদের ৬২ ভাগই কাজের সুযোগ হারিয়েছেন। করোনার কারণে ১০টি জেলার মানুষের আয় কমে গেছে। ঢাকা জেলার মানুষের আয় কমেছে ৬০ ভাগ। এর ফলে যেটা হয়েছে, যারা ছোটখাটো কাজ করে ঢাকায় পরিবার নিয়ে চলতেন তারা আর টিকতে পারছেন না। পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। এতে ভাড়াটিয়ার পাশাপাশি লোকসানে পড়ছেন বাড়িওয়ালারাও। অনেক বাড়িওয়ালা তো বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, ঢাকা শহরে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হবে জানিয়ে এত টু-লেট আগে কখনও দেখা যায়নি। আগে কখনও একসঙ্গে এত বাসা খালি হয়নি।
দেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর টানা ৬৬ দিন কাজ পাননি অনেকে। আবার অনেকে, যারা বাড়িতে চলে গেছেন বা ভয় শঙ্কায় কর্মস্থলে যেতে পারেননি তাদেরও কর্মস্থল থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের প্রয়োজনীয়তা ফুরানোর মতো কঠিন পদক্ষেপের কথা। এদিকে, সরকার ‘ছুটি’ ঘোষণা করে চলাচল ও সামাজিক মেলামেশায় বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। তবে তার পুরোপুরি বাস্তবায়ন দেখা যায়নি বহু জায়গায়। সে কারণে এখন পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে কোভিড ১৯ নামক ঘাতকটি। সব জায়গায় লেজেগোবরে অবস্থা। সহসাই যে এটি সমাধান হচ্ছে না তা অন্ধও বলে দিতে পারে। আর এর প্রভাব অতিমাত্রায় পড়তে শুরু করেছে সাধারণ জনগোষ্ঠীর ওপর। জানা কথা, মহামারির সময় বা পরে সারা পৃথিবীতে বেকারত্ব বাড়বে, কিন্তু কেন জানি বারবার মনে হয় একটাই কথা, ত্বরিত এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিলে হয়তো আমরা অনেক কিছুই ঠেকাতে পারতাম। যাক সে অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু এই যারা গ্রামের ফিরে যাচ্ছেন, তারাও কি সেখানে ভালো থাকবেন? নেটিজনেরাও বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা করছেন। আসলে আগে যারা বেড়ানোর জন্য শহর থেকে গ্রামে ফিরতেন সেই সময়ের চেয়ে এখনকার বিষয়টা আলাদা। সেই আত্মীয়রাই এখন শহর ফেরত মানুষটিকে দেখবেন ভিন্ন চোখে। একটা প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। আবার এদের অধিকাংশই শহরের ভোটার হওয়ার কারণে গ্রামেও যে চেয়ারম্যান, মেম্বার বা সমাজপতিদের কাছে খুব বেশি পাত্তা পাবেন তা নয়। সেটা নিয়েও একটা দ্বন্দ্ব তৈরি হবে। আবার যাদের জায়গা সম্পত্তি হয়েছে সেগুলো যারা এতদিন ভোগদখলে ছিলেন তারাও বেজায় নাখোশ হবেন। আর এমন তো না যে গ্রামে কাজের কোনও অভাব নেই। আবার কাজ থাকলেও মূলত শহর থেকে যেসব নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত শ্রেণি গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন তারা সেসব কাজ করে অভ্যস্ত নন বা করার দক্ষতাও নেই। সে কারণে সংকটটা থেকেই যাচ্ছে।  
প্রকৃতপক্ষে সামগ্রিকভাবে আমাদের অর্থনীতি নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। অর্থাৎ, যার বাড়িভাড়া দেওয়ার ক্ষমতা ছিল, তার এখন আর সেই ক্ষমতা নেই। বাড়িওয়ালারও একই অবস্থা। খাওয়া ধাওয়া, চলাফেরা, পোশাক আশাকসহ সামগ্রিকভাবে সবার জীবনমান নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এবং করোনার এই মহামারিতে অর্থনীতির যে অভিঘাত নেমে আসছে সেই ক্ষত আদৌ সারবে কিনা প্রশ্নই থেকে যায়।
এখন কথা হলো, এসব থেকে উত্তরণের সঠিক কোনও সমাধান সরকারের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। ঢাকার উত্তরের মেয়র শুধু বিষয়টা তুলে ধরে এমনভাবে উত্তর দিয়েছেন, কাজ হারানো মানুষ ঢাকা ছাড়লে কীই বা করার আছে! এক্ষেত্রে প্রথমেই এগিয়ে আসতে হবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এই যে এত এত মানুষ কাজ হারাচ্ছে তাদের ভবিষ্যৎ যেন অভিঘাতে চৌচির না হয় সেটার দায়িত্ব নিতে হবে। প্রণোদনা দিয়ে হোক, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে হোক বা গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই জনশক্তি কীভাবে কাজে লাগানো যায় সেটিও ভাবতে হবে। কিন্তু দুঃখের কথা, সরকার এখনও করোনাভাইরাস মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে অর্থনীতি মজবুত বা সাধারণ মানুষের টিকে থাকার বিষয়টি গুরুত্বই পাচ্ছে না। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, মধ্যবিত্তের অহংবোধ থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। এখন খড়কুটো ধরে বেঁচে থাকাই বড় কথা। সুদিন হয়তো একদিন ফিরবে। সেদিন জেগে উঠতে হবে ফিনিক্স পাখির মতো। কারণ, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ।

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

কিশোরদের সামনে আদর্শ কারা?

কিশোরদের সামনে আদর্শ কারা?

‘এক ওসি কারাগারে, শত ওসি থানার পরে’

‘এক ওসি কারাগারে, শত ওসি থানার পরে’

আহারে ঈদ!

আহারে ঈদ!

যে-ই পারছে, সাংবাদিক মারছে!

যে-ই পারছে, সাংবাদিক মারছে!

সর্বশেষ

সেহরিতে করণীয়

সেহরিতে করণীয়

মির্জা আব্বাসের ব্যাখ্যার অপেক্ষায় বিএনপি

মির্জা আব্বাসের ব্যাখ্যার অপেক্ষায় বিএনপি

বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়েও ভাগ্য ঝুলে আছে কিংসলের!

বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়েও ভাগ্য ঝুলে আছে কিংসলের!

ভোটের হারে উচ্ছ্বসিত বিজেপি, দুইশ’ পারের আশা নেতাদের

ভোটের হারে উচ্ছ্বসিত বিজেপি, দুইশ’ পারের আশা নেতাদের

টাইমস হায়ার এডুকেশন র‍্যাংকিংয়ে সপ্তম স্থানে ডিআইইউ

টাইমস হায়ার এডুকেশন র‍্যাংকিংয়ে সপ্তম স্থানে ডিআইইউ

মুসা ম্যানশন সিলগালা, সকল রাসায়নিক দ্রব্য অপসারণ

মুসা ম্যানশন সিলগালা, সকল রাসায়নিক দ্রব্য অপসারণ

বাঁশখালীতে শ্রমিক হত্যার বিচার দাবিতে শাহবাগে সমাবেশ

বাঁশখালীতে শ্রমিক হত্যার বিচার দাবিতে শাহবাগে সমাবেশ

শিথিল হচ্ছে লকডাউন চলবে গণপরিবহন

শিথিল হচ্ছে লকডাউন চলবে গণপরিবহন

আগে ম্যাচ বাঁচানো, পরে জয়ের চিন্তা মুমিনুলদের

আগে ম্যাচ বাঁচানো, পরে জয়ের চিন্তা মুমিনুলদের

এ বছর চালের উৎপাদন বাড়াতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছি: কৃষিমন্ত্রী

এ বছর চালের উৎপাদন বাড়াতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছি: কৃষিমন্ত্রী

করোনায় মারা গেলেন ডুয়েটের ডেপুটি রেজিস্ট্রার

করোনায় মারা গেলেন ডুয়েটের ডেপুটি রেজিস্ট্রার

ফাইজারের সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম ভ্যাকসিন চুক্তি করবে ইইউ

ফাইজারের সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম ভ্যাকসিন চুক্তি করবে ইইউ

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune