X
বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সেকশনস

বিসিএস ক্যাডার: স্বপ্ন নাকি ‘আসক্তি’

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২১, ০৯:৫৬

কাবিল সাদি শিরোনামে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যয় যে অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে সেই ভাবার্থ পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। স্বপ্ন হলো মানুষের মনে বহুল কাঙ্ক্ষিত বিষয়, যা স্বপ্নচারীকে তাড়িয়ে বেড়ায় তা বাস্তবায়নের জন্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার উদ্দেশ্য থাকে উদার ও ইতিবাচক। অন্যদিকে, আসক্তি হলো নেশার মতো। যেখানে ভালো-মন্দ বিবেচনার থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় তা যেকোনও উপায়ে বাস্তবায়ন করা। এক্ষেত্রে ব্যক্তির নিজস্ব কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না বললেই চলে, ভালো বা মন্দ লাগাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় না; বরং ঘোর কাটাতে অনিবার্য হিসেবেই গ্রহণ করা হয় এবং ফলাফল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক হতে দেখা যায়। সমাজে এমন বহু আসক্তিই আমাদের চোখে পড়ে, কারও টাকায় আসক্তি, কারও খ্যাতির আসক্তি, কারও ক্ষমতা বা পদমর্যাদার আসক্তি, আবার বখাটের মাদকাসক্তি এসবের অন্তর্ভুক্ত। তবে এই আসক্তি উপশমে ব্যক্তি সাময়িক প্রশান্তি লাভ করলেও সুদূরপ্রসারী কোনও ভালো ফলাফল নিয়ে আসে না ব্যক্তির পরিবার, সমাজ বা নাগরিক হিসেবে তার দেশের জন্য।
গত এক দশকে আমাদের মেধাবী সমাজের পেশাগত রুচির ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষণীয়। তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীদের রুচি ও চাহিদার একমাত্র জায়গা যেন এক জায়গাতে আবদ্ধ, আর তা হলো বিসিএস ক্যাডার হওয়া। আরও স্পষ্টভাবে বললে কথিত প্রথম সারির ক্যাডার হওয়া। যেমন, পররাষ্ট্র, প্রশাসন, পুলিশ, ট্যাক্স ইত্যাদি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পড়াশোনার গ্রুপগুলোতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুও এটাই। জাতির জন্য উদ্বেগ ও আশঙ্কার বিষয় হলো, এসব গ্রুপে নবম দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও পরামর্শ চেয়ে পোস্ট দেন, কীভাবে এখন থেকেই তারা বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারে। একই প্রভাব লক্ষ করা যায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্লাসেও। বিসিএস প্রস্তুতির বই নিয়ে শিক্ষার্থীরা ডুবে থাকেন অগ্রিম প্রস্তুতির অংশ হিসেবে। তারা যতটা না তার পঠিত বিষয়ের টেক্সটবুক পড়তে আগ্রহী, তার থেকেও বেশি আগ্রহী বাজারের নানা রঙের মোড়কে বিসিএস প্রস্তুতির গাইড বইগুলো পড়তে। সামাজিকভাবে মেধার মানদণ্ডও আজকাল হয়ে উঠেছে বিসিএস ক্যাডার হওয়া না হওয়ার ভিত্তিতে। এখন শিক্ষার্থীরা যে বিষয়েই উচ্চতর পড়াশোনা করুক না কেন, তাদের মাঝে ভালো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, গবেষক, বিজ্ঞানী বা সাংবাদিক হওয়ার ইচ্ছের কথা খুব একটা শোনা যায় না। সব দিক ভুলে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর একটাই চাওয়া, তারা প্রথম সারির নির্দিষ্ট কিছু ক্যাডার হবেন। কেউ যদি এই ক্যাডারগুলো প্রথম ধাপে না পেয়ে অন্যান্য ক্যাডার বা তার পেশাগত (টেকনিক্যাল) ক্যাডার পান তাহলে পরবর্তী বিসিএসের মাধ্যমে পরীক্ষা দিয়ে তার মেধা অনুযায়ী এ ক্যাডারগুলোতে চলে আসেন দুই তিন বছর চাকরি করার পরেও, অথচ সরকার সব ক্যাডারকেই নবম গ্রেডে একই বেতন কাঠামোতে নিয়োগ দিয়ে থাকেন। বিসিএসের বাইরেও ব্যাংক-সহ যেসব চাকরি নবম গ্রেডে আছে সেগুলো থেকেও চাকরি পরিবর্তন করে এসব চাকরিতে আসা বর্তমান নিয়োগের ক্ষেত্রে খুব সাধারণ ঘটনা। এমনকি এককালে চাকরি রুচির প্রথম সারির ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সামাজিকভাবে অভিজাত পেশা ছেড়ে আসাও আজকাল সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাকরির স্থিতিশীলতা ও নিশ্চয়তার চিন্তা করলে বেসরকারি সংস্থায় বেশি বেতনের চাকরি ছেড়েও সরকারি চাকরিতে আসার প্রবণতা সাধারণভাবেই নেওয়া যায়, কিন্তু সরকারি এবং সামাজিক মর্যাদা, মানব ও সমাজসেবার সুযোগ, একই বেতন কাঠামো থাকা সত্ত্বেও আমাদের এই মেধাবী সমাজের রুচির পরিবর্তন কি শুধুই স্বপ্ন নাকি ‘আসক্তি’?
পৃথিবীর বেশিরভাগ উন্নত দেশগুলোতে বিসিএস ক্যাডার সমপর্যায়ের চাকরির জন্য এতটা স্বপ্ন বা আসক্তি মানুষের মাঝে খুব বেশি লক্ষ করা যায় না, যা আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশ আরও স্পষ্ট করে বললে বাংলাদেশের মতো দেশে বেশি দেখা যায়। সম্ভবত এটা হওয়ার বড় কারণ এখানে ক্ষমতা ও সুযোগ সুবিধার চর্চা বেশি হয়। এখানে সবকিছুর ঊর্ধ্বে হলো ক্ষমতার চর্চা। কেউ যখন তার কাছের কাউকে এ ক্ষমতা চর্চা করতে দেখেন তখন তার মধ্যেও তা অর্জনের আসক্তি জেগে ওঠে অথবা নিজের সন্তানের মধ্য দিয়ে তা অর্জন করতে সন্তানের ওপর তাদের ইচ্ছাশক্তি চাপিয়ে দেন।
সম্প্রতি এমন উদাহরণ এ দেশেই সৃষ্টি হয়েছে বহুবার। সন্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চাইলেও মা-বাবা বা আত্মীয়দের চাপ থাকে তাকে পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেট হতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে তারাও এ বাস্তবতা মেনে নেন। এজন্য অন্যান্য পেশায় সমান সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এই গুটিকয়েক ক্যাডারেই ‘আসক্তি’।
‘আসক্তি’ বলার কারণ হলো, কোনও ছেলের স্বপ্ন ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবেন এবং হয়তো তার স্বপ্ন পূরণও হয়েছে কিন্তু কিছু দিন পর লক্ষ করলেন তার ক্ষমতার চেয়েও একজন পুলিশ কর্মকর্তার বেশি ক্ষমতা। একইভাবে একজন ডাক্তার মানবসেবার স্বপ্ন নিয়ে তুমুল প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হয়ে ডাক্তারি পাস করে বিসিএসে প্রথম পছন্দ দিয়ে থাকেন পররাষ্ট্র, পুলিশ বা প্রশাসন। একই অবস্থা ইঞ্জিনিয়ার পাস করা মেধাবী শিক্ষার্থীও করেন। যখন তারা ভর্তি হন তখন তাদের স্বপ্ন ছিল তিনি ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবেন, কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন একজন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার একজন প্রশাসন ক্যাডারের আওতায় চাকরি করতে হয়। সারা জীবন ক্লাসে ফার্স্ট সেকেন্ড হয়ে তুলনামূলক ভালো রেজাল্ট করে বুয়েট, মেডিক্যালে ভর্তি হলেও তার থেকে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী যারা সেখানে ভর্তির সুযোগ পাননি তারাই পুলিশ বা প্রশাসন ক্যাডারে থেকে তার ওপর ক্ষমতার চর্চা করেন।
দেশের পলিসি নির্ধারণ ও ভবিষ্যতে বড় ধরনের সাচিবিক দায়িত্বও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্তরা হয়ে থাকেন। একই বেতন কাঠামো এবং পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচিত প্রার্থীরা যখন দিন দিন এ ধরনের বৈষম্যের শিকার হন তখন তারা ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করতে তাদের লালিত স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে এসব ক্যাডারে আসতে ‘আসক্ত’ হয়ে পড়েন।
একজন ডাক্তার যখন ভাইভা বোর্ডে একটি কমন প্রশ্নের উত্তর দেন যে, আমি জনগণের সেবা করতে প্রথম পছন্দ প্রশাসন ক্যাডার দিয়েছি তখন একজন অল্প শিক্ষিত লোকও বুঝবেন উত্তরটা কতটা হাস্যকর, যা চিকিৎসা সেবার মতো মহৎ সেবাকে পিছে ফেলতে পারে। এটা আমার ব্যক্তিগত মত।
একই চিত্র শিক্ষাসহ অন্যান্য ক্যাডারে। যারা এত যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে লাখ লাখ শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে ভাইভা বোর্ডে উত্তীর্ণ হন তাদের ক্যাডারভেদে সম্মিলিত মেধা স্কোরে পার্থক্য খুব বেশি নয়; বরং প্রায় বলতে গেলে সমান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে কথিত প্রথম সারির ক্যাডারগুলো অন্য ক্যাডারদের 'রাজা-প্রজা' শ্রেণিতে বিন্যাস করতে সচেষ্ট থাকেন। ফলে এই কথিত দ্বিতীয় সারির ক্যাডাররা দুই বছর লস করেও একই বেতনের চাকরি ছেড়ে পরের বিসিএসে এই ক্যাডারে চলে আসেন বা আসার চেষ্টা করেন। এসব আন্তক্যাডার বৈষম্যের কারণে তারা একদিকে যেমন হীনম্মন্যতায় ভোগেন অন্যদিকে তার আসক্তি চরম পর্যায়ে চলে গেলে তার নিয়োগপ্রাপ্ত চাকরিতে দেশের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতেও ব্যর্থ হন।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, তখন তাদের স্বপ্নের থেকে বেশি শক্তিশালী কাঠামো হিসেবে কাজ করে তাদের এই আসক্তি। আর আসক্তির ফলাফল আমরা সবাই জানি। আর এই ফলাফল সাধারণভাবেই জনগণ বেশি ভোগ করে থাকেন। কারণ, তাদের সেবার নিমিত্তেই এই আসক্তদের সরকার নিয়োগ দিয়ে থাকেন আর আসক্ত কর্মচারী থেকে আশানুরূপ সেবা পাওয়া অসম্ভব।
একসময় প্রশাসন ক্যাডার ছেড়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অথবা সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন এমন উদাহরণ এক দশক আগে থাকলেও এখন এমন ভাবাটা পাগলের প্রলাপ মনে হবে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা নেই, বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার নেই, প্রকৌশলী বা ডাক্তারদের তেমন কোনও বড় অর্জনও এখন আমাদের চোখে পড়ছে না। যদিও কিছু স্বপ্নবাজ মেধাবী ভালো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক বা শিক্ষক হিসেবে তার ক্যারিয়ারকে বেছে নেয় তাহলে তাদের নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয় পদে পদে ক্ষমতাচর্চার বলি হয়ে। ফলে গবেষণা বা সৃজনশীল সুন্দরের চর্চাও গতিহীন হয়ে আসক্তির কাছে পরাজিত হয়।
আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো চাইলেও সবাইকে চাকরি দিতে পারে না, অথচ একশ্রেণির মেধাবী শুধু ‘আসক্তি’র কারণে চাকরি পরিবর্তন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে বিসিএস ক্যাডার তথাকথিত প্রথম সারির ক্যাডার নিয়ে যতটা তৎপর ততটা প্রচারণা কোনও বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক বা সৃজনশীল গবেষকদের নিয়ে করে না। ফলে সমাজের মেধার ও সম্মানজনক চাকরির একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে বিসিএস ক্যাডার বা কথিত প্রথম সারির ক্যাডার।
বিয়ে থেকে প্রেম- এখন এমন অনেক সম্পর্কও এই মানদণ্ডতে মাপা হয়। সেখানে থাকে না সততা-নিষ্ঠা কিংবা সুখ শান্তির বিচার। এসব সামাজিক বাস্তবতা যেকোনও দেশের ক্ষতির কারণ হয়। তাই আমাদের সময় এসেছে আন্তক্যাডার বৈষম্য রোধ, অন্যান্য চাকরিতে যথাসম্ভব সম-সুবিধা নিশ্চিতসহ দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করে চাকরির ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা বজায় রেখে সাধারণ মানুষের নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা। দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবেসে আমরা আবারও আমাদের স্বপ্ন দেখতে চাই, ‘আসক্ত’ হতে চাই না। আর এজন্য প্রচলিত ক্ষমতা কাঠামোর সংস্কার ও অন্য সব চাকরিজীবীর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে সংশ্লিষ্টদের এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা
[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

সম্পর্কিত

সরকারি চাকরিতে বয়স ছাড়: সুবিচার না অবিচার?

সরকারি চাকরিতে বয়স ছাড়: সুবিচার না অবিচার?

পুরুষ নির্যাতন ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়

পুরুষ নির্যাতন ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়

কবে হবে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও চেতনার উন্নয়ন

কবে হবে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও চেতনার উন্নয়ন

ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি কি বেকারদের নিয়ে ভাববে?

ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি কি বেকারদের নিয়ে ভাববে?

অভিবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি জরুরি

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৭:৩০

মো. আখতার হোসেন জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতি বছর বিশ্বের অগণিত মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান বিভিন্ন দেশে। বিশ্ব অর্থনীতিতে অভিবাসন তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেও অভিবাসনের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আশির দশকের শুরু থেকেই দেশের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় ও দারিদ্র্য বিমোচনে অভিবাসন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কোভিড-১৯ ও লকডাউনের প্রভাবে সারা বিশ্বের অর্থনীতি যখন চরম সংকটের মুখোমুখি, তখন অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা ভর করেছে দেশের অভিবাসন খাতেও।  

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’র (বিএমইটি) তথ্যমতে, গত বছর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়ায় ২১,৭৫২.২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মার্চ-মে মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও জুন থেকে এর ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, যা করোনাভাইরাসের অভিঘাত থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। প্রবাসী শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশসহ প্রায় মোট ১৬৮টি দেশে বসবাস করছেন। তারা মূলত বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে কাজ করেন এবং চুক্তি শেষে দেশে ফিরে আসেন।

প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের তথ্য সংরক্ষণের কোনও যথাযথ প্রক্রিয়া নেই বলে প্রতি বছর কতজন দেশে ফিরছেন এর সঠিক সংখ্যা বের করা বেশ কঠিন।

তবে, করোনা বৈশ্বিক মহামারি উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে অন্য যেকোনও বছরের তুলনায় গত বছর দেশে ফেরত আসা প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। আইওএম’র হিসাব অনুসারে, গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর মাসে প্রায় চার লাখ প্রবাসী শ্রমিক কোভিড-১৯ এর কারণে দেশে ফেরত আসেন। কোভিড-১৯-এর বিস্তার ঠেকাতে বেশিরভাগ দেশে লকডাউন ঘোষণা করায় এবং জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ অভিবাসী শ্রমিকদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

এই প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ঋণদায়গ্রস্ত এবং দেশে তারা বেকার অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। তাই, বিদেশে যেমন তারা কষ্টে দিনযাপন করছিলেন, দেশে এসেও তারা পড়েছেন এক দুর্দশাপূর্ণ পরিস্থিতিতে। আইওএম’র গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ফেরত আসা ৭৫ শতাংশ প্রবাস শ্রমিক করোনাভাইরাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার বিদেশে ফেরত যেতে আগ্রহী।

সেক্ষেত্রে আমাদের দরকার প্রবাস ফেরত এই শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য একটি কাঠামোভিত্তিক রি-স্কিলিং ও আপস্কিলিং প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত করা, যেটি পরবর্তীতে দক্ষতার বিচারের মাপকাঠিতে প্রবাসে চাকরি নিশ্চিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।

দক্ষতার বিচারে বাংলাদেশ থেকে সাধারণত তিন রকমের অভিবাসন হয়– দক্ষ, স্বল্প দক্ষ এবং অদক্ষ। সাধারণত আমাদের দেশের প্রবাসী শ্রমিকরা অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, পরিবহন, হোটেল-রেস্টুরেন্টের কাজ, স্বাস্থ্য সেবা, ঘরের কাজসহ স্বল্প দক্ষ ও নিম্ন উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত থাকায় যেকোনও ধরনের অর্থনৈতিক অভিঘাতে তারা সমস্যার সম্মুখীন হন। করোনায় বেশিরভাগ দেশে এসব কাজের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক প্রবাসী শ্রমিকই চাকরি হারিয়েছেন।

বিদেশ গমন করা অধিকাংশ শ্রমিকই কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়া বিদেশে যান। অথচ ছয় মাস কিংবা এক বছরের একটি প্রশিক্ষণ বিদেশে তাদের পারিশ্রমিক দুই থেকে তিনগুণ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। তাই দেশে ফেরত আসা শ্রমিকরা যাতে ফের বিদেশ গমনের পর অধিক উপার্জন করতে পারেন, সেজন্য বহির্বিশ্বের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী যেসব খাতে দক্ষ জনবল প্রয়োজন, সেসব খাতে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, করোনা পরিস্থিতি শ্রমবাজারের রূপ অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি নির্ভরতা ও উদ্ভাবন এবং নতুন দক্ষতার সুযোগ সৃষ্টি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কোভিড-১৯ যেমন কাজের ক্ষেত্রকে বিভিন্নভাবে পরিবর্তন করেছে, একইসাথে অনেক নতুন সুযোগও সৃষ্টি করেছে। দেশের অভিবাসী শ্রমিকদের বেশিরভাগেরই ভাষাগত দক্ষতা ও প্রযুক্তি জ্ঞান কম থাকায় তারা বিদেশে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হন।

এসব ক্ষেত্রে বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শ্রম পরিস্থিতি আরও সুসংহত করা যেতে পারে। এছাড়া, অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, অটোমোবাইল ও ডিজিটাল খাতের কাজে বিদেশে অধিক চাহিদা থাকায়, তাদের এসব কাজ সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রদান করার ব্যাপারে নজর দেওয়া যেতে পারে। আমাদের নারী প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশই বিদেশে ঘরের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের যদি ভারতের কেরালা, ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো নার্সিং কোর্স করানো হয়, অথবা দক্ষভাবে গৃহপরিচালনা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে তা তাদের জন্য যেমন মঙ্গলজনক হবে, তেমনি আমাদের সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোও সুনিশ্চিত হবে।

অভিবাসীদের জন্য বৈশ্বিক মহামারি সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সরকার কয়েক ধাপে নগদ সহায়তাসহ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও এর মাত্র পাঁচ শতাংশ প্রবাস ফেরত শ্রমিকরা কাজে লাগিয়েছেন। প্রবাসীদের সহায়তার প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনায় সুফল পেতে তাই নীতিনির্ধারকদের নতুন করে চিন্তাভাবনা করা জরুরি।  আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরির ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কাকে উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব দেশ, বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ তাদের দক্ষ করে তুলতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে এগিয়ে আসতে পারে।

করোনাকালীন ও পরবর্তী দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। তাই, দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি ও নতুন সম্ভাবনাময় বাজার অনুসন্ধান একসঙ্গে দুটোই চালিয়ে যেতে হবে। আর এটা করা সম্ভব হবে বহুমুখী অংশীদারিত্বের মাধ্যমেই।

লেখক: সিনিয়র সচিব, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ‎গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

মধ্যরাতে দুই কাভার্ডভ্যানের সংঘর্ষে এক চালকের মৃত্যু

মধ্যরাতে দুই কাভার্ডভ্যানের সংঘর্ষে এক চালকের মৃত্যু

উড়োজাহাজে বোমার ভুয়া তথ্যটি আসে মালয়েশিয়ান নম্বরের ফোন কলে

উড়োজাহাজে বোমার ভুয়া তথ্যটি আসে মালয়েশিয়ান নম্বরের ফোন কলে

‘জরুরি অবতরণ করা’ বিদেশি উড়োজাহাজটিতে বোমা পাওয়া যায়নি

‘জরুরি অবতরণ করা’ বিদেশি উড়োজাহাজটিতে বোমা পাওয়া যায়নি

খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক হবে

২৩ নাগরিকের বিবৃতিখালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক হবে

বোমা সন্দেহে শাহজালালে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের ‘জরুরি অবতরণ’

বোমা সন্দেহে শাহজালালে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের ‘জরুরি অবতরণ’

ভারত থেকে এলো ৪৫ লাখ ডোজ টিকা

ভারত থেকে এলো ৪৫ লাখ ডোজ টিকা

খিলগাঁওয়ে নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু

খিলগাঁওয়ে নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু

দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ান: ব্যবসায়ীদের প্রধানমন্ত্রী

দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ান: ব্যবসায়ীদের প্রধানমন্ত্রী

'ওমিক্রন সন্দেহে বাড়িতে লাল পতাকা অমানবিক, অনৈতিক'

'ওমিক্রন সন্দেহে বাড়িতে লাল পতাকা অমানবিক, অনৈতিক'

জানুয়ারির মধ্যেই প্রাপ্তবয়স্ক সবাইকে বুস্টার ডোজ দেবে যুক্তরাজ্য

জানুয়ারির মধ্যেই প্রাপ্তবয়স্ক সবাইকে বুস্টার ডোজ দেবে যুক্তরাজ্য

২৪ দিনে কোটি টাকা নিয়ে উধাও

২৪ দিনে কোটি টাকা নিয়ে উধাও

জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের কথা বলে ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা, কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে মামলা

জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের কথা বলে ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা, কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে মামলা

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune