X
শুক্রবার, ০৮ অক্টোবর ২০২১, ২২ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

দূর-সম্পর্কীয়া || ওরহান পামুক

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৫, ১৩:৩১

“একটা চাবির সঠিক দেখভাল করার চেয়ে জীবনে গভীর এবং প্রতারণাপূর্ণ বিপদ থাকতে পারে যা আগে কখনও সন্দেহের আওতায় আনাই হয়নি।”

nnnn ১৯৭৫ সালের ২৭ এপ্রিল। এই দিনটিতেই আমার সারাজীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার মত ঘটনা এবং কাকতালীয় ব্যাপারগুলোর শুরু। ভালিকোনাজি এভিনিউতে সিবেল আর আমি বসন্ত সন্ধ্যার মৃদু হাওয়া গায়ে মাখিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। হঠাৎ সিবেলের চোখে পড়ে যায় দোকানের জানালায়: বিখ্যাত জেনি কোলনের ডিজাইন করা একটা পার্স ঝুলছে। আমাদের আনুষ্ঠানিক বাগদান খুব দূরে নয় তখন। ফুরফুরে আর একটুখানি বেসামাল মেজাজে ছিলাম আমরা। আমরা গিয়েছিলাম অভিজাত নিসান্তাসি এলাকার রেস্তেরা ফুয়েতে। আমার বাবা মায়ের সঙ্গে ডিনার সেরে আমরা শেষে বাগদান অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ ঠিক করতে আলোচনায় বসেছিলাম। জুনের মাঝামাঝিতে ঠিক করা হল বাগদান অনুষ্ঠানের দিন। কারণ লিসি নটরডেম দ্য সিঁওতে পড়াশোনার সময়কার সিবেলের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী নুরসিহান প্যারিস থেকে ওই সময়টাতে আসতে পারবে আমাদের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। সিবেল অনেক আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে বাগদান অনুষ্ঠানের জন্য তার পোষাক তৈরি করবে সিল্কি ইসমেতের কাছ থেকে। ইস্তাম্বুলে তখন তার মত ব্যয়বহুল আর চাহিদাসম্পন্ন পোষাক তৈরিকারক আর নেই। আমার মা সিবেলকে তার ওই পোষাকটির জন্য আগেই মুক্তোর দানা উপহার দিয়েছিলেন। সেদিন সন্ধ্যায় আমার মায়ের সঙ্গে সিবেল আলাপ করছিল কিভাবে মুক্তোর দানাগুলো পোশাকটার ওপরে সেলাই করবে। আমার হবু শ্বশুরের ইচ্ছে ছিল তার একমাত্র মেয়ের বাগদান অনুষ্ঠান হবে বিয়ের মূল অনুষ্ঠানের মতই জাঁকজমকপূর্ণ। তার ইচ্ছে পূরণের ব্যাপারে আমার মায়ের সর্বাত্বক চেষ্টা ছিল। আমার বাবার পুলকিত হওয়ার বিষয়টা ছিল অন্য রকম: তার হবু পুত্রবধু হতে যাচ্ছে সোরবনে পড়া একটা মেয়ে। পড়াশোনার জন্য ফ্রান্সে গিয়েছে এমন মেয়ের খুব কদর ছিল তখনকার দিনের ইস্তাম্বুলের বুর্জোয়া সমাজে।সেদিন সিবেলকে বাড়ি পৌঁছে দিতে যাওয়ার সময় তার পুরু কাধের ওপর আদরের হাতে পেচিয়ে ধরে হাঁটছিলাম আর ভাবছিলাম আমার সৌভাগ্য আর সুখের কথা। ঠিক তখনই সিবেল বলে উঠল, আহ্ কী সুন্দর পার্স!যদিও নেশার ঘোরে আমার মাথাটা একটু আনমনা ছিল তবু আমি পার্সটার চেহারা আর দোকানের নাম লিখে রাখলাম। পরের দিন আবার সেই দোকানটাতে গেলাম। আসলে আমি কোনোদিন ওই রকমের আপাত্লগ্ধি, শালীন এবং আত্মতৃপ্তি অন্বেষী মানুষ ছিলাম না। মেয়েদেরকে কোনো উপহার কিনে দেয়া কিংবা ফুল উপহার দেয়া— এসবের জন্য সামান্যতম অজুহাত বা সুযোগের ব্যবহার করিনি কখনও। অবশ্য মনে মনে তাদেরকে কিছু দেয়ার মত ইচ্ছে একদমই যে ছিল না তাও নয়। তখনকার দিনে সিসলি, নিসান্তাসি এবং বেবেক এলাকার পশ্চিমা রুচি-ঘেঁষা কাজহীন একঘেঁয়ে জীবন-যাপনকারী গৃহিনীরা আর্ট গ্যালারি খোলা শুরু করেনি; করেছে অনেক পরে। তারা তখন বুটিকের দোকান চালাত। সেখানে মজুদ করে রাখত মহিলাদের ব্যবহার্য যাবতীয় মনোহারি দ্রব্য। এলি কিংবা ভোগ ম্যাগাজিনে প্রদর্শিত লেটেস্ট মডেলের পোশাকাদি ব্যাগে ভরে নিয়ে আসত প্যারিস কিংবা মিলান থেকে আসার সময়। সেগুলোও রাখত তাদের দোকানে। হাস্যকর রকমের চড়া দামে ওই সকল দ্রব্য তারা বিক্রি করত তাদেরই মত একঘেঁয়ে জীবন-যাপনকারী ধনী গৃহিনীদের কাছে।


শারীরিক সৌন্দর্য, খাটো স্কার্ট এবং আরো কিছু বিষয় তার সামনে মনে হল আমাকে কিছুটা অস্থির করে ফেলেছে। আমি স্বাভাবিক হতে পারছিলাম না।

প্যারিসের বিখ্যাত সেনে হানিমের নাম অনুসরন করে রাখা সানজেলিজে নামের দোকানটির মালিক ছিলেন আমার মায়ের দিককার দূর-সম্পর্কের আত্মীয়া। তবে সেদিন বেলা বারোটার দিকে আমি যখন গেলাম তিনি ওখানে ছিলেন না। পিতলের তৈরি ডাবল নবের উটমার্কা বেলে যে বিকট শব্দ হল সেটা মনে পড়লে এখনও আমার হৃদপিণ্ড লাফিয়ে ওঠে। বাইরে গরম একটু থাকলেও ভেতরে ঢুকে বুঝতে পারলাম খুব ঠান্ডা আর একটু বেশিই অন্ধকার। প্রথমে মনে হল ভেতরে কেউ নেই। দুপুরের রোদের আলো থেকে ভেতরে ঢুকে দৃষ্টি সহনীয় হতে একটু সময় লাগল। এরপর বুঝতে পারলাম সজোরে তীরে আছড়ে পড়ার শক্তি নিয়ে আমার হৃদপিণ্ড জায়গামত এসে যাচ্ছে।
দৃষ্টির সামনে তাকে দেখতে পেয়ে তোতলাতে তোতলাতে কোনো রকমে বলতে পারলাম, ‘জানালায় ঝুলিয়ে রাখা ম্যানিকিনের ওপরের ওই হাতব্যাগটা কিনতে চাই।’
আপনি কি ক্রিম রঙের জেনি কোলনটার কথা বলছেন?
তার চোখে চোখ পড়তেই চিনে ফেললাম।
জানালার পাশে ম্যানিকিনের সাথে ঝোলানো হাত ব্যাগটা, প্রায় স্বপ্নের ঘোরের মধ্য থেকে বললাম।
ও আচ্ছা, ঠিক আছে, বলেই সে ব্যাগটার দিকে এগিয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে হাইহিল স্যান্ডেল জোড়ার ভেতর থেকে পা বের করে ডিসপ্লে এলাকার দিকে হাঁটা দিল সে। নগ্ন পায়ের নখের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম সে নখগুলোকে সযত্নে লাল নেইপলিশে রাঙিয়েছে। আমার দৃষ্টি চলে গেল তার খালি স্যান্ডেল জোড়া থেকে এগিয়ে যাওয়া পা পর্যন্ত। মে মাস তখনও শুরু হয়নি। তবে তার পা জোড়া দেখলাম তামাটে বর্ণ ধারন করেছে।
তার পায়ের দৈর্ঘের কারণে ফিতাঅলা স্কার্টটাকে কিছুটা খাটো মনে হচ্ছিল। একটা কাঠির মাথায় পেঁচিয়ে ব্যাগটা নিয়ে সে চলে এল কাউন্টারে। সরু এবং দক্ষ আগুলে ব্যাগের গা থেকে টিস্যু পেপারের দলাগুলো ছড়িয়ে ফেলে জিপার আঁটা পকেটগুলো দেখাল আমাকে। ছোট পকেট দুটো শুন্য। আরেকটা গোপন কুঠুরির মত পকেট দেখাল। সেখান থেকে একটা কার্ড বের করল: লেখা আছে ‘জেনি কোলন’। তার সমস্ত অঙ্গভঙ্গি আর কার্যকলাপ দেখে মনে হল সে খুব রহস্যজনক আর একান্ত ব্যক্তিগত কিছু দেখাচ্ছে আমাকে।
আমি বলে উঠলাম, ‘আরে ফুসুন, তুমি তো দেখি অনেক বড় হয়ে গেছ! সম্ভবত আমাকে চিনতে পারোনি।’
অবশ্যই চিনেছি, কামাল স্যার। তবে মনে হল আপনি আমাকে চিনতে পারেননি। তাই ভাবলাম আপনাকে বিরক্ত করার দরকার কী।
কিছুক্ষণ নীরবে কাটল। ব্যাগের মধ্যে আরো একটা পকেট দেখাল সে। তার শারীরিক সৌন্দর্য, খাটো স্কার্ট এবং আরো কিছু বিষয় তার সামনে মনে হল আমাকে কিছুটা অস্থির করে ফেলেছে। আমি স্বাভাবিক হতে পারছিলাম না।
ইয়ে, আচ্ছা ইদানিং কী করছ তুমি?
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য পড়াশেনা করছি। আর এখানে আসি প্রতিদিনই। এই দোকানটাতে এলে নতুন নতুন মানুষের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হয়।
বেশ তো, চমৎকার। আচ্ছা, এখন বলো দেখি ব্যাগটার দাম কত?
ভুরুতে ভাজ ফেলে হাতে লেখা মূল্য-চিরকুটটার দিকে তাকিয়ে বলল, এক হাজার পাঁচশো লিরা। (তখনকার দিনের ছোটখাটো সরকারি কর্মকর্তার ছয় মাসের বেতনের সমান।) তবে আমি নিশ্চিত, সেনে হানিম আপনার জন্য কোনো বিশেষ অফার দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তো দুপুরের খাবার খেতে বাড়িতে গেছেন। সম্ভবত খাবারের পরে এতক্ষণ ঘুমিয়েও পড়েছেন। এখন অবশ্য তাকে ফোন করতেও পারছি না। তবে আপনি যদি আজকে সন্ধ্যার দিকে একটু আসতেন....।
তার আর দরকার নেই, বলে আমি আমার ওয়ালেটটা খুলে জবুথবু হাতে ন্যাতানো নোটগুলো গুণতে লাগলাম। আমার মত জবুথবু হাতে এবং অনভিজ্ঞতার ছাপ রেখে ফুসুন হাতব্যাগটা একটা কাগজে মুড়িয়ে আরেকটা প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে দিল। কাজটা করার পুরোটা সময় ধরেই ফুসুন বুঝতে পারল আমি তার মধুরঙা বাহু আর সুদর্শনা অঙ্গভঙ্গি উপভোগ করছি। ফুসুন বেশ বিনয়ের সঙ্গেই আমার হাতে ধরিয়ে দিল ব্যাগটা। আমি ওকে ধন্যবাদ দিয়ে বললাম, নেসিবে খালা আর তোমার বাবাকে আমার শুভেচ্ছা পৌঁছে দিও।
ওই সময় আমি ওর বাবার নামটা মনে করতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ স্থবির হয়ে রইলাম যেন আমার আত্মা আমার শরীরটাকে ফেলে স্বর্গের কোনো এক কোণে গিয়ে ফুসুনকে চুম্বনে আলিঙ্গন করছে। তারপর দরজা খুলে দ্রুত বের হয়ে এলাম। দরজার বেলটা এমন সুরে বেজে উঠল যেন ক্যানারি পাখির ডাক শুনতে পেলাম। রাস্তায় বের হয়ে বাইরের গরম হাওয়া উপভোগ করতে করতে মনে হল হাত ব্যাগটা কিনে ভালই হয়েছে: আমার ভালোবাসা সিবেলের জন্য ব্যাগটা সত্যিই কিনে ফেললাম। ওই দোকানের কথা আর ফুসুনের কথা ভুলে যেতে চাই।
তারপরও রাতের খাবারের সময় মাকে বললাম সিবেলের জন্য হাতব্যাগ কিনতে গিয়ে আমাদের দূর-সম্পর্কের আত্মীয়া ফুসুনের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে গেছে।
মা বললেন, ও হ্যাঁ, নেসিবের মেয়ে সেনের দোকানে কাজ করে। কী লজ্জার কথা! ওরা ছুটির দিনেও আর বেড়াতে আসে না। বিউটি কনটেস্টের বিষয়টা ওদেরকে কী এক বেকায়দা অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। আমি প্রতিদিনই দোকানটার পাশ দিয়ে যাই। কিন্তু ভেতরে গিয়ে মেয়েটাকে একটু হাই হ্যালো বলার মত কাজেও মন টানে না। তারপরও মনের ভেতরে একটু খারাপ লাগবে— তাও না। কিন্তু মেয়েটা যখন ছোট ছিল তখন আমি ওর জন্য পাগল ছিলাম। নেসিবে যখন সেলাইয়ের কাজ করার জন্য আমাদের বাড়িতে আসত মেয়েটাও মাঝে মাঝে আসত। কাবার্ড থেকে তোর খেলনা বের করে দিতাম। ওর মা যতক্ষণ সেলাই করত ও আপন মনে খেলা করত। নেসিবের মা মানে মিহরিভার খালা খুব চমৎকার মানুষ ছিলেন।
ওদের সাথে আমাদের আত্মীয়তার সম্পর্কটা আসলে কেমন?
বাবা টেলিভিশন দেখায় ব্যস্ত ছিলেন বলে মা তার বাবার পরিবাবের ওই অধ্যায় সম্পর্কে বিস্তারিত বলা শুরু করলেন। প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা কামাল আতাতুর্কের জন্ম যে বছর আমার নানার জন্মও সেই বছর। তিনিও সেমসি এফেন্দে স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। আমার নানা এথেম কামাল আমার নানিকে বিয়ে করার আগে আরো একটা বিয়ে করেছিলেন। মাত্র তেইশ বছর বয়সে নানার সেই বিয়েটা খুব তাড়াহুড়ো করেই হয়েছিল বলে মনে হয়। নানার সেই প্রথম স্ত্রী ছিলেন ফুসুনের নানির মা। তার পূর্ব-পুরুষদের আদি বসবাস ছিল লেবাননে। বলকান যুদ্ধে এদির্নের বিতারণের সময় তিনি মারা যান। যদিও ওই মহিলার গর্ভে আমার নানার কোনো সন্তান হয়নি। তার আগের স্বামীর পক্ষের এক মেয়ে ছিল। তার আগের স্বামী ছিল একজন শেখ। আগের স্বামীর সাথে বিয়ের সময় মহিলার বয়স ছিল একেবারেই অল্প। ফুসুনের নানি আমার নানা জানের হাতে মানুষ হয়েছিলেন। সুতরাং তার সাথে এবং ফুসুনের মায়ের সাথে আমাদের সরাসরি আত্মীয়তার সম্পর্ক তেমন একটা ছিল না। তবু আমার মা ফুসুনের মাকে আত্মীয়তার সেই দূর-সম্পর্কের সূতোর বলেই আমার খালা বলে পরিচয় করিয়েছেন। তাদের বাড়ি তেসভিকিয়ের পেছনের একটা রাস্তায়। ছুটির দিন উপলক্ষে তারা শেষবারের মত যখন এসেছিল মা তখন তাদেরকে খুব একটা ঊষ্ণতায় বরণ করেননি। কারণ তার দু’বছর আগে মাকে কিছু না বলে নেসিবে খালা তার ষোল বছর বয়সী মেয়েকে বিউটি কনটেস্টে পাঠিয়েছিলেন। ফুসুন তখন মেয়েদের স্কুল নিসান্তাসিলিসিতে পড়াশোনা করছিল। পরে মা জেনেছিলেন নেসিবে খালা ফুসুনকে ওই কাজে লজ্জা পাওয়া কিংবা বাধা দেয়ার বদলে বরং উৎসাহ দিয়েছিলেন। মা এক সময় নেসিবে খালাকে খুব ভাল জানতেন এবং সাধ্যমত বিপদে আপদে রক্ষা করার চেষ্টা করতেন। কিন্তু কথাটা শোনার পরে নেসিবে খালার প্রতি মায়ের মন কঠোর হয়ে যায়।
অন্যদিকে নেসিবে খালা আমার মায়ের প্রতি সব সময়ই শ্রদ্ধাবোধ পোষণ করতেন। বয়সে আমার মা তার চেয়ে বিশ বছরের বড়। আর নেসিবে খালা যখন সেলাইয়ের কাজের খোঁজে ইস্তাম্বুলের অভিজাত মহলের বাড়ি বাড়ি ঘুরতেন তখন মা তাকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করতেন।
ওরা বেপরোয়া রকমের গরিব ছিল, মা বললেন। তার কথা অতিরঞ্জনের মত শোনাবে বলে মা আরো বললেন, জানিস বাছা, তখনকার দিনে শুধু ওরাই গরিব ছিল তা নয়। তুরস্কের প্রায় সবাই গরিব ছিল তখন।
নেসিবে খালার জন্য পরিচিত বা ঘনিষ্ঠজনদের অনেকের কাছেই সুপারিশ করে দিতেন মা। আর একবার কিংবা কোনো কোনো বছর দু’বারও আমাদের বাড়িতে ডাকতেন তাকে। তাকে দিয়ে বিয়ে শাদী কিংবা অন্য কোনো অনুষ্ঠানের জন্য পোশাক তৈরি করে নিতেন মা। তাদের ওই সেলাইকর্ম আমার স্কুল টাইমের মধ্যে চলত বলে তার সাথে আমার খুব একটা দেখা হয়নি। তবে ১৯৫৭ সালে একটা বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য জরুরী ভিত্তিতে পোশাক দরকার হওয়ায় মা নেসিবে খালাকে সুয়াদিয়েতে আমাদের গ্রীষ্মকালীন বাড়িতে ডেকেছিলেন। তৃতীয় তলার পেছনের রুম থেকে সমুদ্র দেখা যেত। ওই রুমের জানালার পাশে বসে মা এবং নেসিবে খালা তালগাছের পাতার ফাক দিয়ে বৈঠাচালিত আর মোটরচালিত নৌকো এবং পিয়ারের ওপর থেকে ছোট ছোট বাচ্চাদের পানিতে লাফিয়ে পড়ার দৃশ্য দেখেছেন। ইস্তাম্বুলের দৃশ্য আঁকানো সেলাইয়ের বাস্ক খুলেছেন নেসিবে খালা। আর তাদের দু’জনের চারপাশে তখন নেসিবে খালার কাঁচি, সুঁচ, গজফিতা, শিস্তি, ফিতার তৈরি ক্ষুদ্রাকৃতির পোশাকের নমুনা এবং আরো সব জিনিসপত্র থাকত। কাজের ফাঁকে তাদের মুখে উচ্চারিত হতো তখনকার গরম আবহাওয়া আর মশাদের উৎপাতের কথা এবং এরূপ বৈরি পরিবেশে সেলাইয়ের কষ্টের কথা। দু’জন তখন দু’বোনের মতই হাস্যকৌতুকেও মেতেছেন। রাতের প্রায় অর্ধেক প্রহর জুড়ে তারা কাজ করেছেন আমার মায়ের সিঙ্গার সেলাই মেশিনে। আমার মনে আছে, আমাদের বাবুর্চি বেকরি ওই রুমে গ্লাসের পর গ্লাস লেবুর শরবত নিয়ে আসত। নেসিবে খালার বয়স তখন বিশ বছর; পেটে বাচ্চা। এটা ওটা খেতে মন চাইত। দুপুরের খাবারের সময় মা হালকা হাসির সুরে বেকরিকে বলতেন, বাচ্চা-পেটে মায়ের যখন যা খেতে মন চায় তা-ই দিতে হবে। নইলে পেটের বাচ্চাটা দেখতে কুৎসিত হবে।
তখন আমি উৎসাহ নিয়ে তার ছোটখাটো পেটের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ফুসুনের প্রতি সেটাই ছিল আমার প্রথম আগ্রহের সময়। অবশ্য তখন আমরা কেউই জানি না নেসিবে খালার পেটের মধ্যে ছেলে আছে না মেয়ে আছে।

আমরা অফিসের ভেতরে রতি মিলনের সুখানুভূতিতে ডুবে গেছি তখন আমরা দু’জনই খুব উপভোগ করেছি। মনে আছে অফিসের আবছা অন্ধকার রুমে আমার বাহুডোরে তাকে জড়িয়ে আমি মনে মনে বলছি, আমি কত সুখি।

মনে হল মা ফুসুনের বিষয়টা আরেকটু ফাপিয়ে বললেন, নেসিবে ওর মেয়ের বিউটি কনটেস্টে পাঠানোর কথা মেয়ের বাবাকেও বলেনি। মেয়ের বয়স সম্পর্কে মিথ্যে তথ্য দিয়ে কনটেস্টে পাঠিয়েছিল। ভাগ্যিস মেয়েটা জিততে পারেনি। তা না হলে বাইরে ওর বদনামের অন্ত থাকত না। স্কুল কর্তৃপক্ষ এখনও আভাস পায়নি। খবর পেয়ে গেলে মেয়েটাকে স্কুল থেকে বের করে দিত। লিসি স্কুলের পড়াশোনা এতদিন হয়তো শেষ করে ফেলেছে মেয়েটা। ও সম্ভবত আর পড়াশোনার মধ্যে নেই। অবশ্য ওর বিষয়ে সঠিক কিছু জানি না। ছুটির দিনগুলোতে এখন আর ওরা বেড়াতেও আসে না। কোন ধরনের মেয়েরা, কোন ধরনের মহিলারা বিউটি কনটেস্টে যায় সেটা জানে না এমন মানুষ কি দেশে আছে না কি? তোর সাথে কেমন আচরণ করল ফুসুন?
মা এভাবেই হয়তো ইঙ্গিত দিলেন ফুসুন হয়তো অন্য পুরুষদের সাথে বিছানায় যাওয়া শুরু করেছে। মিলিয়েত পত্রিকায় অন্যান্য প্রতিযোগীর সঙ্গে ফুসুনের ফটোগ্রাফ ছাপা হওয়ার সময় নিসান্তাসি স্কুলের আমার এক সময়কার বন্ধুরাও এরকমই মন্তব্য করেছে। তবে পুরো বিষয়টা আমার কাছে বিব্রতকর মনে হওয়াতে আমি আর আগ্রহ দেখাইনি। মায়ের সামনে আমি নীরব থাকলাম।
কিছুক্ষণ পর মা আমার দিকে আঙ্গুল তুলে সতর্ক করে দিয়ে বললেন, সাবধান থাকিস। একটা চমৎকার, শুদর্শনা আর গুণবতী মেয়ের সাথে তোর বাগদান হতে যাচ্ছে। সিবেলের জন্য যে পার্সটা কিনেছিস সেটা আমাকে দেখাচ্ছিস না কেন?

তারপর বাবাকে ডেকে বললেন, মমতাজ, দেখো, কামাল সিবেলের জন্য একটা পার্স কিনে এনেছে।
বাবা টিভির পর্দা থেকে চোখ না তুলেই ছেলে এবং ছেলের প্রিয়তমা কতটা সুখি সে ব্যাপারে নিজের সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেন, সত্যি?
আমি আমেরিকার একটা বিজনেস স্কুল থেকে গ্রাজুয়েট করেছি। আমার সামরিক সার্ভিসও শেষ করে ফেলেছি। স্বাভাবিকভাবেই বাবা চাইলেন আমি যেন আমার ভাইয়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তার ব্যবসায়ের ম্যানেজার পদে যোগদান করি। বাবার ব্যবসায় তখন লাফিয়ে লাফিয়ে উঁচুতে উঠছে। আমার বয়স খুব অল্প হলেও আমাকে বাবা তার পণ্য বিতরণ এবং রপ্তানি বিষয়ক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান সাতসাতের জেনারেল ম্যানেজার করে দিলেন। সাতসাত পরিচালনার বাজেটে দ্রুতগতির মুনাফার কারণে অতি তাড়াতাড়িই বেড়ে গেল এর পসার। এর কারণ অবশ্য আমার দক্ষতা নয়, বরং বাবার অন্যান্য কারখানা এবং ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের হিসাব রক্ষণের কৌশল। ওইসব প্রতিষ্ঠান থেকে সাতসাতে মুনাফা স্থানান্তর করা হতো। সাতসাত মানে ইংরেজিতে সেলসেল। আমার প্রতিষ্ঠানে বয়সে আমার চেয়ে বিশ ত্রিশ বছরের বড়, প্রায় আমার মায়ের বয়সী উন্নত বক্ষবিশিষ্ট বেশ ক’জন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ছিলেন। তাদের ক্ষয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যবসায় সংক্রান্ত নতুন নতুন এবং জুতসই বুদ্ধি বের করার কাজে দিন পার করতে লাগলাম। মালিকের ছেলে না হলে আমি অবশ্য তাদের সাথে ওই কাজে মনোনিবেশ করতাম না। আমার আচরণে মাঝে মধ্যে নমনীয়তাও দেখাতাম।
আশাপাশের ভবনগুলোর ভিত কাঁপিয়ে রাস্তা দিয়ে যখন সাতসাতের কেরানিদের সমবয়সী ব্যস্ত গাড়িঘোড়া চলত তখন আমার প্রণয়িণী সিবেল চলে আসত আমার সাথে দেখা করতে। কাজের অবসরে অফিসেই আমরা শারীরিক মিলনের স্বর্গীয় স্বাদ নিতাম। ইউরোপ থেকে সিবেল আধুনিক এবং নারীবাদী ধরণা নিয়ে এলেও সেক্রেটারিদের সম্পর্কে তার মতামত ছিল আমার মায়ের মতামতের মতই। মাঝে মাঝে বলে ফেলত, অফিসে এসব করতে আমার মন চায় না। নিজেকে তোমার একজন সেক্রেটারির মতই মনে হয়।
কিন্তু তার কথায় কান না দিয়ে তাকে সোফার দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় পরিষ্কার বুঝতে পারতাম সে আসলে তখনকার দিনের তুরস্কের অন্য মেয়েদের মতই আছে— বিয়ের আগে যৌন মিলনে তার ভয়।
পশ্চিমা ধাচের ধনী পরিবারের যে সব মেয়ে ইউরোপে সময় কাটিয়ে এসেছে তারা এই নিষেধের বেড়াজাল থেকে আস্তে আস্তে বের হয়ে আসার চেষ্টা করে এবং বিয়ের আগে তাদের ছেলে-বন্ধুদের সাথে যৌন মিলনের অভিজ্ঞতা অর্জন করে। সিবেল নিজেও মাঝে মধ্যে নিজেকে ওই সব সাহসী মেয়েদের অন্যতম বলে মনে করত। আমার সাথে তার শারীরিক মিলন ঘটেছিল এগারো মাস আগে। তার নিজের পক্ষে যুক্তিটা ছিল— আমাদের বিয়ের পাকা কথা অনেক আগেই ঠিক হয়ে গেছে এবং আমাদের বিয়ের খুব বেশি দেরি নেই। অবশ্য সিবেলের সাহসকে আমি বাড়িয়ে দেখানোর চেষ্টা করছি না। সে যখন বুঝতে পেরেছিল আমি বিয়ের সিদ্ধান্তে সত্যিই সিরিয়াস, আমার মত মানুষকে বিশ্বাস করা যায় বলে যখন তার আত্মবিশ্বাস তৈরি হল, কিংবা অন্য কথায়— সে যখন বুঝতে পারল আমাদের বিয়েটা সত্যিই হবে তখনই কেবল সে নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ করেছে। নিজেকে ভদ্র এবং দায়িত্ববান মনে করতাম বলেই তাকে বিয়ে করার সব ইচ্ছেই আমার ছিল। কিন্তু যদি ইচ্ছে না থাকত তাহলে সে আমার কাছে তার কুমারীত্ব বিকিয়ে দিয়েছে বলে কোনো রকম দায়বদ্ধতা থাকত না আমার। খোলা মনের এবং আধুনিক হওয়ার মত যে সাধারণ বিষয়টা আমাদের মধ্যে ছিল তার ওপরে একটা দায়বদ্ধতা তৈরি করেছিল আমাদের এই বিয়ে-পূর্ব মেলামেশার ব্যাপারটা। তার কারণে আমরা একে অন্যের সাথে আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলাম।
সিবেল মাঝে মধ্যে খুব গুরুত্বসহকারে আমাদের বিয়ের একটা দিন তারিখ ঠিক করার কথা বলত। সে কারণেও দায়বদ্ধতাটা আরো বেশি করে চেপে বসত। তবে অন্যান্য সময় যখন হালাস্কারগাজি এভিনিউতে গম গম শব্দে গাড়িঘোড়া চলাচল করছে, লোকজনের ব্যস্ততায় আরো সব কোলাহল চলছে আর আমরা অফিসের ভেতরে রতি মিলনের সুখানুভূতিতে ডুবে গেছি তখন আমরা দু’জনই খুব উপভোগ করেছি। মনে আছে অফিসের আবছা অন্ধকার রুমে আমার বাহুডোরে তাকে জড়িয়ে আমি মনে মনে বলছি, আমি কত সুখি; বাকি জীবনও তাকে নিয়ে আমার কত সুখে কাটবে। একদিন আমাদের ওই রকম সুখের অভিজ্ঞতার পরে সাতসাতের লোগো সংবলিত একটা ছাইদানিতে সিগারেটের শেষ অংশটা গুজে দিচ্ছিলাম। আমার সেক্রেটারির চেয়ারে বসে সিবেল টাইপরাইটারে আঙ্গুল দিয়ে খটাখট করে যাচ্ছিল আর তখনকার দিনের একটা হাস্যরসের ম্যাগাজিনে উপস্থাপিত এক নারীর সুস্পষ্ট শরীরি আবেদন দেখে জোরে জোরে হাসছিল।
যেদিন তাকে ওই পার্সটা কিনে দিলাম সেদিন সন্ধ্যায় ফুয়ে রেস্তোরায় ডিনারের পর সিবেলকে জিজ্ঞেস করলাম, মেরহামেত অ্যাপার্টমেন্টে আমার মায়ের যে ফ্ল্যাটটা আছে এরপর থেকে ওখানে আমাদের দেখা সাক্ষাতের ব্যবস্থা করলে ভালো হয় না? বাড়িটার পেছনে কী চমৎকার একটা বাগান।
সিবেল জিজ্ঞেস করল, বিয়ের পর আমাদের দু’জনের নতুন বাড়িতে ওঠার ব্যাপারটা কি আরো পিছিয়ে দিতে চাও?
না, ডার্লিং, সেরকম কিছু বুঝাচ্ছি না আমি।
আমি তোমার সাথে গোপনে লুকিয়ে চুরিয়ে আর এরকম করতে পারব না। তাতে মনে হয় আমি তোমার ভাড়া করা কোনো মহিলা।
ঠিকই বলেছ।
ওই ফ্ল্যাটে দেখা করার বুদ্ধিটা কোথা থেকে পেলে তুমি?
বাদ দাও ওসব, বলে প্লাস্টিক ব্যাগে মোড়ানো পার্সটা বের করছিলাম আর আমার চারপাশের মানুষজনের হৈচৈ, আনন্দ দেখছিলাম।
কোনো উপহার হতে পারে অনুমান করেই সিবেল জিজ্ঞেস করল, কী এটা?
একটা সারপ্রাইজ, খুলে দেখো।
সত্যি? প্লাস্টিক ব্যাগটা খুলে পার্সটা বের করার সময় তার সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল শিশু সুলভ হাসি। পর মুহূর্তেই হতাশায় হাসিটা উবে গেল। সিবেল অবশ্য হতাশাকে ঢাকার চেষ্টাও করল।
তোমার কি মনে আছে গতরাতে তোমোকে যখন বাড়ি পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলাম তুমি ওই দোকানটাতে পার্সটা দেখে পছন্দ করেছিলে?
ও, হ্যাঁ। তোমার দেখি সব মনে আছে!
তোমার পছন্দ হয়েছে দেখে আমি খুব খুশি। আমাদের বাগদান অনুষ্ঠানে তোমার বাহুতে এর সৌন্দর্য দেখার মত হবে।

বলতে আমার মন চাইছে না তবু বলতে হচ্ছে আমাদের বাগদান অনুষ্ঠানের পার্স তো অনেক আগেই পছন্দ করা হয়েছে। মন খারাপ করো না সোনা। তুমি এত কষ্ট করে আমার জন্য এই উপহারটা কিনেছ সেটা কি কম নাকি? ঠিক আছে, তবে ভেবো না আমি তোমার প্রতি নির্দয় হচ্ছি: আমাদের বাগদান অনুষ্ঠানে এই পার্সটা হাতে নিতে পারব না। কারণ এটা নকল।
কী?
কামাল, জান আমার, এটা তো আসল জেনি কোলন নয়। এটা নকল।
তুমি চিনলে কী করে?
তুমি ভালো করে দেখো না। লেবেলটা কিভাবে চামড়ার সাথে সেলাই করেছে দেখেছ? আমি প্যারিস থেকে এই আসল জেনি কোলনটা কিনেছিলাম— এবার এটার দিকে ভালো করে তাকাও। এমনি এমনি তো ফ্রান্স আর সারা পৃথিবীতে এটার এত কদর না। সবখানেই এটা একটা ভিন্নধর্মী ব্র্যান্ড বলেই পরিচিত। জেনি কোলনে এরকম সস্তা সূতা কখনও-ই ব্যবহার করবে না।
আসল সেলাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তের জন্য আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার হবু বধু এরকম বিজয়িনীর সুরে কথা বলছে কেন। অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতের মেয়ে সিবেল। তার বাবা তার দাদার সূত্রে পাওয়া সব সম্পত্তি বিক্রি করে দিয়ে এখন কপর্দকশূন্য। তার মানে সিবেল আসলে সরকারী কর্মকর্তার মেয়ে। এই বোধটাই তাকে অস্থির করেছে, অসহায়ত্বে ফেলে দিয়েছে। এরকম অসহায়বোধ করলে সিবেল তার দাদির কথা বলত। তার দাদি পিয়ানো বাজাতেন। কিংবা দাদার কথা বলত। দাদা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিংবা বলত, তার দাদার খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল সুলতান আব্দুল হামিদের সাথে। তবে সিবেলের এই নাজুক ভাবটা আমাকে তার আরো কাছে টানত। তার প্রতি আরো ঘনিষ্ঠ ভালোবাসা জেগে উঠত আমার ভেতরে।
সত্তরের দশকের শুরুর দিকে টেক্সটাইল এবং রপ্তানি বাণিজ্যের প্রসারের সাথে এবং এই প্রসারের ফলস্বরূপ ইস্তাম্বুলের জনসংখ্যা তিনগুণ হয়ে যাওয়াতে শহরাঞ্চলে এবং আমাদের নিকটবর্তী এলাকায় জমির দাম বাড়তে থাকে রকেটের গতিতে। এই স্রোতের মুখে আমার বাবার সম্পত্তি বিগত দশকে প্রায় পাঁচগুণ বেড়ে গেছে। তথাপি আমাদের বংশীয় নামের (বাসমাসি বা কাপড় উৎপাদনকারী) ওপর কোনো রকম সন্দেহ পড়তেই পারে না, আমাদের সম্পদের কৃতিত্ব কয়েক প্রজন্মের কাপড় উৎপাদনের পেশার ওপরেই প্রতিষ্ঠিত। পরিবারের ক্রমবর্ধমান সম্পদের ব্যাখ্যাতেও নিজেকে প্রবোধ দিতে পারলাম না সেদিন: কারণ আমার কেনা পার্সটা ছিল নকল।
আমার ক্রমশ ডুবে যাওয়া মানসিক অবস্থা দেখে সিবেল আমার হাতটা আদর করে ধরে জিজ্ঞেস করল, পার্সটার দাম কত দিয়েছ?
পনেরশো লিরা, আমি বললাম। তুমি যদি না চাও এটা তাহলে আগামীকাল আমি বদলে নিয়ে আসতে পারবো।
তোমাকে এটা বদলে আনতে হবে না সোনা। তুমি বরং ওদেরকে টাকা ফেরত দিতে বলো। কারণ ওরা তোমাকে আসলেই ঠকিয়েছে।
দোকানের মালিক সেনে হানিম আমার দূর-সম্পকীয় আত্মীয়া হন, হতাশায় ভ্রু কুঞ্চিত করে বললাম।
পার্সেলের ভেতরটা দেখছিলাম আমি। তখনই সিবেল আমার হাত থেকে নিতে নিতে বলল, তুমি কত কিছু বোঝো সোনা! কত বুদ্ধি তোমার; কতটা সংস্কৃতিমনা তুমি। কিন্তু কোনো নারী তোমাকে কত সহজে ঠকিয়ে দিতে পারে সে সম্পর্কে তোমার মোটেও ধারণা নেই।
পরের দিন দুপুরে সেই একই প্লাস্টিক ব্যাগে মুড়িয়ে পার্সটা হাতে নিয়ে আমি সানজেলিজে বুটিকে আবার গেলাম। আমি ভেতরে পা বাড়াতেই বেলটা বেজে উঠল। কিন্তু আবারো সেই আবছা অন্ধকার। প্রথমে মনে হল ভেতরে কেউ নেই। স্বল্প আলোর দোকানটার অদ্ভূত নীরবতা ভেঙে ক্যানারি পাখিটা চিক চিক চিক করে ডেকে উঠল। তারপর একটা টবের সাইক্লামেন গাছের বিশাল পাতার ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলাম ফুসুনের ছায়া। ফিটিং রুমে এক মহিলা পোশাক ট্রাই করে দেখছিল তার মাপমত হয় কি না। সেই মহিলাকে সাহায্য করার জন্যই ফুসুন তার সামনে দাঁড়িয়েছিল। ফুসুন এবার পরেছে খুব চমৎকার এবং নয়ন ভোলানো একটা ব্লাউজ। কচুরিপানা রঙের একটা প্রিন্টের কাপড়ে তৈরি ব্লাউজটা। জায়গায় জায়গায় সবুজ পাতা আর বুনো ফুলের ছাপ। চারপাশে তাকিয়ে আমাকে দেখতে পেয়ে ফুসুন মিষ্টি করে হাসল।
চোখের ইশারায় ফিটিং রুম দেখিয়ে আমি বললাম, খুব ব্যস্ত আছো মনে হচ্ছে।
আমার কথার জবাব দিতে গিয়ে ফুসুন বলল, এই তো আমাদের হয়ে গেল আর কী। যেন অলস ভঙ্গিতে সে তার ওই ক্রেতার সাথেই কথা বলছে।

ফুসুন ঠোটে হালকা গোলাপী রঙের লিপস্টিক লাগিয়েছে। লিপস্টিকটার নাম মিসলিন। যদিও লিপস্টিকটা তুরস্কে সে সময় খুব পরিচিত হয়ে উঠেছে তবু ফুসুনের ঠোটে সেটা খুব ব্যতিক্রমী আর আকর্ষণীয় মনে হচ্ছিল।

এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে পেলাম ক্যানারি পাখিটা ওপরে নিচে পাখা ঝাপটাচ্ছে; এক কোণায় একগাদা ফ্যাশন ম্যাগাজিন পড়ে আছে; অন্যদিকে ইউরোপ থেকে আমদানি করা বিভিন্ন জিনিস। কোনো কিছুতেই দৃষ্টি স্থির রাখতে পারলাম না। অতি সাধারণ একটা অনুভূতি বলে যতই উড়িয়ে দিতে চাই না কেন, যখনই ফুসুনের দিকে তাকিয়েছি তাকে খুব পরিচিত এবং আপন মনে হয়েছে— এই চমকে দেয়া সত্যটাকে কখনও-ই অস্বীকার করতে পারিনি। তাকে দেখতে আমারই মত: ছোটবেলায় মাথায় হালকা কোকড়ানো চুল ছিল, বড় হতে হতে অনেকটা সোজা হয়ে গেছে। ফুসুনের চুলের ওপর যেন আরোপিত সোনালি রঙ যোগ হয়েছে তার পরিষ্কার ত্বক আর গাঢ় প্রিন্টের ব্লাউজের কারণে। আমার মনে হল তার জায়গায় নিজেকে স্থাপন করলে খুব সহজেই তাকে আমি গভীরভাবে বুঝতে পারব। কিন্তু তখনই আবার বেদনার্ত স্মৃতিও হানা দিল। তার সম্পর্কে অন্যদের মন্তব্য মনের ওপর ভর করতে লাগল: আমার বন্ধুরা তার কথা উল্লেখ করে বলেছে সে যেন ‘প্লেবয় পত্রিকার সামগ্রী।’ ফুসুনের কি সত্যিই অন্য পুরুষদের শয্যা-সঙ্গ উপভোগের অভিজ্ঞতা আছে? আমি নিজেকে বুঝিয়ে বললাম, পার্সটা ফেরত দিয়ে টাকা নিয়ে তাড়াতাড়ি কেটে পড়ো। তুমি তো চমৎকার একটা মেয়ের সাথে বাগদানে আবদ্ধ হতে যাচ্ছো। আমি বাইরে নিসান্তাসি স্কোয়ারের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে চাইলাম। ঠিক তখনই ধোয়াটে কাঁচের ভেতর ফুসুনের ভুতুরে অবয়বটা প্রতিফলিত হলো।
ফিটিং রুমের মহিলা স্কার্টের ভেতর থেকে নিজেকে বের করে তাড়াহুড়ো করে দোকানের বাইরে চলে গেল। ফুসুন স্কার্টগুলো জায়গামত গুছিয়ে রাখল। আকর্ষণীয় ঠোট দুটো আমার দৃষ্টির সামনে মেলে দিয়ে ফুসুন বলল, গতকাল সন্ধ্যায় আপনাকে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছি।
ফুসুন ঠোটে হালকা গোলাপী রঙের লিপস্টিক লাগিয়েছে। লিপস্টিকটার নাম মিসলিন। যদিও লিপস্টিকটা তুরস্কে সে সময় খুব পরিচিত হয়ে উঠেছে তবু ফুসুনের ঠোটে সেটা খুব ব্যতিক্রমী আর আকর্ষণীয় মনে হচ্ছিল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, কখন দেখেছ আমাকে?
সন্ধ্যার একেবারে শুরুতেই। আপনার সাথে ছিলেন সিবেল হানিম। রাস্তার অন্যপাশের ফুটপাথ দিয়ে যাচ্ছিলাম আমি। কোথাও একসাথে খেতে যাচ্ছিলেন মনে হয়?
হ্যাঁ।
আপনাদের দু’জনকে খুব চমৎকার মানিয়েছে। সুখি অল্পবয়স্কদের দেখে খুশি হলে বয়স্ক মানুষেরা যেমন করে বলে থাকেন ফুসুনের কথা বলার ভঙ্গিটা সেরকম মনে হল।
সিবেলকে সে কিভাবে চেনে তা আর জিজ্ঞেস করলাম না। আমি বললাম, তোমার একটু সাহায্য দরকার আমার।
ব্যাগটা খোলার সময় বিব্রতকর আর আতঙ্কগ্রস্ত মনে হচ্ছিল আমাকে। বললাম, এই পার্সটা ফেরত দিতে চাই।
অবশ্যই, আমি সানন্দচিত্তে বদলে দিতে পারি ওটা। আপনি বরং এর বদলে এই মার্জিত হাতমোজা জোড়া নিতে পারেন। কিংবা এই যে হ্যাট দেখছেন, এগুলোও নিতে পারেন। প্যারিস থেকে নতুন আনা হয়েছে এগুলো। সম্ভবত সিবেল হানিম এই পার্সটা পছন্দ করেননি, তাই না?
লজ্জিত ভঙ্গিতে বললাম, আমি পার্সটা বদলে নিতে চাচ্ছি না। আমি বরং টাকাটাই ফেরত চাই।
ফুসুনের মুখের ওপর হতাশা আর ভয়ের ছাপ দেখতে পেলাম। সে জিজ্ঞেস করলো, কেন?
আমি কিছুটা ফিসফিসিয়ে বললাম, এটা আসল জেনি কোলন নয় মনে হচ্ছে। মনে হয় এটা নকল।
কী বলছেন?
আমি অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বললাম, আমি আসলে এসব জিনিস ভালো করে চিনি না।
সে কিছুটা কর্কশ ভঙ্গিতে বলল, এখানে এরকমটি কখনও ঘটেনি। আপনি টাকাটা এখনই ফেরত চান?
হ্যাঁ, আমি বোকার মত বলে ফেললাম।
বেদনায় মুখখানা তার কালো হয়ে গেল। নিজের বোকামিতে জর্জরিত হয়ে বিকল্প চিন্তাটা এল, হায় খোদা ব্যাগটা রেখে চলে গেলেই তো হতো; সিবেলকে বললে হতো টাকা ফেরত নিয়ে এসেছি। ফুসুনকে বললাম, দেখো ফুসুন, এখানে তোমার কিংবা সেনের কোনো হাত নেই। আমরা তুরস্কবাসী খোদাভক্তি দেখিয়ে থাকি: ইউরোপের ফ্যাশনের সবকিছু নকল করতে অভ্যস্ত আমরা।
বলার সময় মুখে একটুখানি হাসি নিয়ে আসার চেষ্টা করলাম। বললাম, আমাদের ক্ষেত্রে একটা হাত ব্যাগের যে ভূমিকা সেটা হয়ে গেলেই হলো: কোনো নারীর হাতে শোভা বর্ধন করলেই হলো। কোন ব্রান্ডের তৈরি, কে তৈরি করল কিংবা এটা আসল কিনা— এসব বিষয় বড় কথা নয়।
তবে আমার নিজের মতই ফুসুনও বিশ্বাস করল বলে মনে হলো না।
সে ওই একই রকম কর্কশ ভঙ্গিতে বলল, না, আমি আপনার টাকা ফেরত দিয়ে দিচ্ছি।
আমি নিচের দিকে তাকিয়ে নীরব হয়ে রইলাম। আমার মূর্খতার জন্য লজ্জিত হয়ে সামনে যা আছে মেনে নেয়ার জন্য মনে মনে প্রস্তুত হলাম।
ফুসুনের দৃঢ়তা দেখে আমার মনে হল সে যা করতে চাচ্ছে তা করতে পারবে না। প্রচণ্ড বিব্রতকর মুহূর্তটার মধ্যে কিছু একটা আছে। সে এক দৃষ্টিতে দেরাজের দিকে তাকিয়ে রইল। মনে হল ওটার ওপরে কোনো যাদুমন্ত্র দেয়া আছে; কোনো দৈত্য যেন দেরাজটার দখল নিয়ে বসে আছে। সে ওটা ছোঁয়ার মত সাহস আনতেই পারছে না। তার মুখখানা লাল হয়ে গেছে এবং দু’চোখ জলে ভরে গেছে দেখে দু’কদম এগিয়ে গেলাম।
ফুসুন নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করল। কী এত আবেগ চলে এল বুঝে উঠতে পারিনি। তবে আমি দু’হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরতেই সে আমার বুকে মাথা রেখে কাঁদতেই লাগল। আমি ফিসফিস করে বললাম, ফুসুন, কেঁদো না প্লিজ, আই এম সরি। তার নরম চুলে আর কপালে আদর করে দিয়ে বললাম, এরকম কিছু হয়েছে ভুলে যাও প্লিজ। হাতব্যাগটা যে নকল শুধু এইটুকু সত্য। এর পেছনে আর তো কিছু নেই।
শিশুর মত লম্বা শ্বাস নিয়ে দুয়েকবার ফুপিয়ে উঠল। এরপর আবারও সজোরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল ফুসুন। ওর শরীর, সুন্দর বাহুর ছোঁয়া, আমার বুকের সাথে ওর বুক লেগে থাকার অনুভূতি, খুব স্বল্প সময়ের জন্য হলেও ওকে ওইভাবে ধরে থাকার কারণে আমার মাথাটা কেমন করে উঠল। সম্ভবত প্রতিবার ওকে স্পর্শ করার ফলে আমার কামনা বাসনা জেগে ওঠার কারণে সেটাকে আমি দমন করার চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম বলেই ওরকমটি হয়ে থাকতে পারে। আমি স্মৃতি থেকে মায়াবী সেই অনুভূতিটা ফিরিয়ে অানার চেষ্টা করলাম: আমরা একে অন্যকে দীর্ঘদিন ধরে চিনি এবং এতক্ষণ একে অন্যের খুব ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আছি। তবে মুহূর্তের জন্য হলেও মনে পড়ে গেল সে আমার কান্নাজর্জর মিষ্টি বোন। আর সম্ভবত যেহেতু আমি জানতাম দূর-সম্পর্কের হলেও তার সাথে আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে— লম্বা লম্বা হাত পা কোমল হাড্ডি আর নরম কোমল কাঁধ আমার নিজের কথাই মনে করিয়ে দিল। আমি মেয়ে হলে, আমার বয়স বারো বছর কম হলে যা হতাম সে তো এই। আমি ওর সোনালী চুলে আদর করতে করতে বললাম, ভেঙ্গে পড়ার কিছু নেই।
ব্যাখ্যা করার ভঙ্গিতে ফুসুন বলল, দেরাজটা খুলে আপনার টাকাটা দিতে পারছি না। সেনে হানিম দুপুরের খাবারের জন্য বাড়িতে যাওয়ার সময় তালা দিয়ে ওটার চাবি নিয়ে যান। কী করব, বলতে লজ্জাও লাগছে।
আবার আমার বুকে মাথা ঠেকিয়ে কান্না শুরু করল ফুসুন। আমি আদুরে আবেগে ওর চুলের ওপর হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। ফুপিয়ে ফুপিয়ে ফুসুন বলতে লাগল, আমি সময় কাটানোর জন্য, লোকজনের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করার জন্য এখানে কাজ করি! আমি টাকা পয়সার জন্য এখানে কাজ করি না!
বোকার মত হৃদয়হীনভাবে বললাম, টাকার জন্য কাজ করাটা বিব্রত হওয়ার মত কিছু নয়।
অবোধ বিষণ্ন শিশুর মত বলে উঠল ফুসুন, হ্যাঁ, আমার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক.....। দু’সপ্তাহ আগে আমার বয়স আঠরো হয়েছে। আমি বাবা মায়ের বোঝা হয়ে থাকতে চাইনি।
আমার ভেতরে যৌনপশুটা মাথা বের করার চেষ্টা করছে আশঙ্কায় আমি ওর চুলের ওপর থেকে আমার হাত সরিয়ে নিলাম। ফুসুন সম্ভবত বিষয়টা খুব তাড়াতাড়িই বুঝতে পারল। সেও নিজেকে সামলে নিল। আমরা দু’জনই পিছিয়ে দাঁড়ালাম।
চোখ মুছতে মুছতে ফুসুন বলল, আমি যে কান্নাকাটি করেছি একথা কাউকে বলবেন না প্লিজ।
ঠিক আছে, বলব না। আমি প্রমিজ করছি ফুসুন। এটা দু’বন্ধুর মধ্যে পবিত্র প্রতিজ্ঞা হয়ে থাকবে। আমাদের দু’জনের গোপন বিষয়ে একে অন্যকে বিশ্বাস করতে পারি।
ওর মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। আমি বললাম, পার্সটা এখানেই রেখে যাচ্ছি। টাকা নিতে পরে আসব।
ঠিক আছে, রেখে যেতে পারেন। তবে টাকা নিতে আপনার নিজের আসার দরকার নেই। সেনে হানিম জোর দিয়ে বলতে থাকবে এটা নকল নয়। শেষে আপনার আফসোস হবে।
তাহলে অন্য কিছুর সাথে বদল করে নেয়া যেতে পারে।
না না, সেটা আর করার দরকার নেই, ফুসুন আন্তরিক হয়ে কপট রাগ দেখিয়ে বলল।
আমি সম্মত হয়ে বললাম, ঠিক আছে। তার আর দরকার নেই।
দৃঢ়তার সাথে ফুসুন বলল, না, একেবারে বাদ দিয়ে যেতে হবে না। সেনে হানিম আসলে আমি তার কাছ থেকে আপনার টাকা নিয়ে রাখব।
উত্তরে আমি বললাম, আমি চাই না তুমি আবার ওই মহিলার কাছেও বিব্রত হও।
আপনি ভাববেন না। কী করে টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে আমি জানি, হালকা করে হাসার চেষ্টা করে ফুসুন বলল। আমি বলতে চাচ্ছি সিবেল হানিমের এই রকম হাতব্যাগ একটা আছে। সে জন্যই সে এটা ফেরত দেয়ার চেষ্টা করছে। ঠিক আছে?
আমি বললাম, চমৎকার আইডিয়া। তবে ওই কথাই সেনে হানিমকে আমি নিজে বললে অসুবিধা কোথায়?
না, আপনি বলবেন সেটা আমি চাই না, ফুসুন জোর দিয়ে বলল। কারণ তিনি আপনাকে বেকায়দায় ফেলে ব্যক্তিগত কথা বের করার চেষ্টা করবেন। দোকানে আসবেন না। দরকার হলে আপনার টাকা আমি ভেসিহে খালার কাছে রেখে আসব।
না না, মাকে এর মধ্যে জড়িও না। মা আরো বেশি খুতখুতে।
ফুসুন ভুরু কুচকে জিজ্ঞেস করল, তাহলে আপনার টাকা কোথায় রেখে আসবো?
আমি বললাম, ১৩১ তেসভিকিয়ে এভিনিউয়ের মেহরামেত অ্যাপার্টমেন্টে মা’র একটা ফ্ল্যাট আছে। আমেরিকা যাওয়ার আগে ওই ফ্ল্যাটটা আমার লোকচক্ষুর অন্তরাল হওয়ার জায়গা ছিল। ওখানে গিয়ে পড়াশোনা করতাম, গান শুনতাম। পেছনে বাগানঅলা চমৎকার একটা বাড়ি। দুপুরের খাবার খেতে, কাগজপত্রের কাজকর্ম সারতে এখনও ওখানে যাই। সাধারণত দুটো থেকে চারটার মধ্যে— এই সময়টা ওখানে কাটাই।
অবশ্যই আমি আপনার টাকা ওখানে দিয়ে আসতে পারব। অ্যাপার্টমেন্টের নম্বরটা কত?
চার, ফিসফিসিয়ে বললাম যেন বাকি তিনটা শব্দ বের হচ্ছিল না, আমার গলার ভেতরেই লীন হয়ে যাচ্ছিল— তৃতীয় তলা, বিদায়!
গোটা চিত্র আমার হৃদয়ে পরিষ্কার হয়ে ফুটে উঠল আর আমার হৃদস্পন্দন ঘন হয়ে এল। বাইরে বের হয়ে আসার আগে শক্তি সঞ্চয় করে যেন কিছুই ঘটেনি এমনভাবে ওর দিকে শেষবারের মত তাকালাম। বাইরে আমার সব লজ্জা আর দোষ এপ্রিলের বাতাসের অকারণ ঊষ্ণতার সকল স্বর্গীয় চিত্রকল্পের সাথে মিশে গেল। নিসান্তাসির ফুটপাথগুলো যেন রহস্যময় কোনো হলুদবর্ণে রঞ্জিত হয়ে গেছে।
সামনে এগুনোর সময় ছায়ার নিচ দিয়ে চলার চেষ্টা করলাম, বিশেষ করে বিল্ডিংগুলোর ছায়া এবং দোকানগুলোর জানালার পাশের চাঁদোয়ার নিচ দিয়ে। ওই দোকানগুলোর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চোখ পড়ে গেল একটা হলুদ রঙের জগের দিকে। মন থেকে জোর তাগিদ অনুভব করলাম ভেতরে ঢুকে জগটা কেনার। বিভিন্ন জায়গা থেকে হঠাৎ করে কেনা অন্য কোনো বস্তু যতটা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে ওই জগটা বিগত বিশ বছরে ততটা মন্তব্য আকর্ষণ করেনি কারো কাছ থেকেই। জগটা আমাদের খাবার টেবিলে রাখা ছিল অনেক দিন। প্রথমে আমার বাবা এবং মা, পরে মা এবং আমি ওই টেবিলে এক সাথে খাবার খেয়েছি। জগটার হাতল ছোঁয়ার সময় প্রতিবারই আমার ওই সময়ের দুর্দশার কথা মনে পড়েছে। ওই সময়ের দুদর্শার কারণে আমি বাইরের মানুষদের সঙ্গ ত্যাগ করে নিজেকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছি। জগটার হাতলে হাত দিয়ে আমি যখন স্মৃতির অতলে ডুবে গেছি, দেখেছি মা আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন: তার চোখ ভরা দুঃখবোধ আর ভর্ৎসনা।
সেই দুপুরে বাড়ি পৌঁছে মাকে চুমু খেয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলাম। আগে আগে বাড়ি ফেরা দেখে মা খুশি হয়েছিলেন ঠিকই। তবে বিস্মিতও হয়েছিলেন। মাকে বললাম জগটা কিনেছি খেয়ালের বশে। আরো বললাম, মেরহামেত অ্যাপার্টমেন্টের চাবিটা দেবে মা? অফিস মাঝে মাঝে বড্ড বেশি হৈহল্লাপূর্ণ হয়ে যায়; আমি কোনো কাজে মানোযোগ দিতে পারি না। ভাবছিলাম অ্যাপার্টমেন্টে গেলে একটু নিরিবিলি কাজ করার সুযোগ পেতাম। আমি ছোট থাকতে ওখানে গিয়ে কাজ করে দেখেছি, ভালোই হয়।
মা বললেন, এতদিনে নিশ্চয়ই এক ইঞ্চি পুরু ধূলো জমে আছে।
অবশ্য মা দেরি না করে তার রুমে চাবিটা আনতেও গেলেন। চাবিটা একটা লাল ফিতের সাথে বাঁধা ছিল। চাবিটা আমার হাতে দিয়ে মা জিজ্ঞেস করলেন, লাল ফুলের কুতাহিয়া ফুলদানিটার কথা তোর মনে আছে? বাড়িতে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। দেখিস তো ওখানে ফেলে এসেছি কি না। আর অতো বেশি কাজ নিয়ে পড়ে থাকিস না তো। তোদের বাবা সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম করেছেন যাতে তোরা একটু আনন্দে থাকতে পারিস। হাসি আনন্দে থাকাটা তোদের প্রাপ্য। বসন্তের এই সুন্দর আলো হাওয়া। সিবেলকে নিয়ে বাইরে একটু ঘুরতেও তো পারিস।
আমার হাতের মুঠোয় চাবিটা পুরে দিয়ে একটা অদ্ভূত চাহনিতে তাকিয়ে মা বললেন, সাবধানে থাকিস।
আমরা ছোট থাকতে কোনো বিষয়ে সতর্ক করে দিতে মা ওইভাবে তাকাতেন। তার চাহনির অর্থ দাঁড়ায়— একটা চাবির সঠিক দেখভাল করার চেয়ে জীবনে গভীর এবং প্রতারণাপূর্ণ বিপদ থাকতে পারে যা আগে কখনও সন্দেহের আওতায় আনাই হয়নি।

সম্পর্কিত

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ২০:২০

এবছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন ৭৩ বছর বয়সী তানজানিয়ার ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ। তিনি ১০টি উপন্যাস লিখেছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য : প্যারাডাইস (১৯৯৪), বাই দ্য সি (২০০১) এবং ডেজারশন (২০০৫)। ইতোপূর্বে তার উপন্যাস ‘প্যারাডাইস’ বুকার প্রাইজের শর্টলিস্টে এবং ‘বাই দ্য সি’ লংলিস্টে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গুরনাহর লেখায় ঔপনিবেশিকতার দুঃখ-দুর্দশা এবং শরণার্থীর কষ্টকর জীবনধারার গল্প উঠে এসেছে। ২০১৬ সালের ২১ জানুয়ারি, ফ্রাঙ্কফুটে তার এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন ফেবিয়ান রোথ, মারা হোলজেনথল, লিসা জিংগেল। 


প্রশ্ন : বিশ্বসাহিত্য, উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য এবং গ্লোবাল সাউথের মতো সাহিত্যের লেবেল সম্পর্কে আপনি কী ভাবছেন? আপনি কি মনে করেন এগুলো সাহিত্য বা একইসঙ্গে আপনার লেখা বিচারে উপযোগী কিছু? আপনি কি লেখক হিসেবে নিজেকে বিবেচনা করার সময় এই মানদণ্ডে বিচার করেন কিনা?
আবদুলরাজাক গুরনাহ : লেবেল অবশ্যই দরকারি, প্রথমত, তা প্রাতিষ্ঠানিক কারণেই। কেউ তাদের বিদ্যায়তনে তুলনা করতে, বাণিজ্যিক কারণে বা প্রকাশনার স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। আপনি মানুষকে বোঝাতে পারেন এটি এমন একটি বিশেষ কিছু, যাতে তারা আগ্রহী হয়ে উঠবে। যাই হোক, আমি নিশ্চিত নই তাদের সাংগঠনিক উদ্দেশ্য ছাড়াও এগুলোর দরকার কতটুকু। নিজেকে বর্ণনা করার জন্য আমি এই মানদণ্ড ব্যবহার করবো না, এগুলো সংস্কৃতি উৎপাদনের প্রক্রিয়া নয়। এইসব লেবেল সাহিত্যকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে, উত্তর-ঔপনিবেশিক রীতি-নির্ভর সমালোচনা করে এবং কিছু বলতে ও কিছু শনাক্ত করতে সহায়তা করে। অন্যদিকে এইসব লেবেল সাহিত্যের ব্যাখ্যাকে একপ্রকার সীমাবদ্ধই করে। কারণ সাহিত্যে বর্ণনার চেয়েও বেশি কিছু রয়েছে।

প্রশ্ন : তাহলে আপনি কি নিজেকে উত্তর-ঔপনিবেশিক বা বিশ্বসাহিত্যের লেখক মনে করেন? 
আবদুলরাজাক : আমি এইসব প্রপঞ্চের কোনোটিই ব্যবহার করব না। আমি নিজেকে কোনো ধরনের লেখক বলিও না। আসলেই আমি নিশ্চিত নই যে, আমি আমার নাম ছাড়া অন্য আর কী বলার আছে। আমি অনুমান করি, যদি কেউ আমাকে চ্যালেঞ্জ করে—‘আপনি কি একজন ...এর মধ্যে একটি ...?’ আমি সম্ভবত ‘না’ বলব। আমি চাই না আমার সঙ্গে কিছু জুড়ে থাকুক। অন্যদিকে এটি নির্ভর করে কিভাবে এই প্রশ্ন উত্থাপন করা হবে—উদাহরণ স্বরূপ যদি একজন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেন ‘আপনি কি একজন বিশ্বসাহিত্যের লেখক’, তখন তিনি প্রশ্নের উত্তরে তিনি কী লিখবেন? কিন্তু আমি তা নই। আমি এরমধ্যেরও জটিল একটা কিছু।

প্রশ্ন : এই বর্ণনা কি অপরিহার্য?
আবদুলরাজাক : এটি এমন কোনো অপরিহার্য পদ্ধতি নয়, যা আমি নিজে মনে করি, কিন্তু সাংবাদিকের জন্য এই জিজ্ঞাসা অপরিহার্য হতে পারে। তিনি আমাকে তার বোর্ডে তর্জনী তুলে বলতে পারেন, উনি একজন বিশ্বসাহিত্যের লেখক। আমি ধারণাকে এভাবেই দেখি। এই ধরনের গোষ্ঠীগুলোকে প্রতিহত করার একপ্রকার প্রাকৃতিক প্রবণতা রয়েছে, যেমন আমি আপনাকে এখন একটু জটিল করে উত্তর দিচ্ছি।

প্রশ্ন : আমাদের পরবর্তী প্রশ্ন পূর্ববর্তী প্রশ্নের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত—বিশ্বসংস্কৃতি প্রায়শই দক্ষিণ এবং উত্তর গোলার্ধের সংস্কৃতি থেকে আলাদা। আপনি এই লেবেলগুলোকে কীভাবে দেখেন, বিশেষ করে সাহিত্যের ক্ষেত্রে?
আবদুলরাজাক : পৃথিবী সত্যিই উত্তর এবং দক্ষিণ হিসেবে তৈরি করা হয়নি। তবে এটিকে এমন করে বর্ণনা করা ফ্যাশনেবল মনে হচ্ছে। ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড’ বা ‘অনুন্নত বিশ্ব’-এর মতো বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করার প্রচেষ্টা ছিল, কিন্তু উত্তর এবং দক্ষিণ শব্দ দুটি অন্যান্য শব্দের তুলনায় আরো চলনসই বলে মনে হচ্ছে। যাইহোক, এটিই বাস্তবতাকে বর্ণনা করে, ঐতিহাসিক পার্থক্য বর্ণনা করে এবং অবশেষে এটি অন্য আরেকটি কুৎসিত শব্দ ‘উপনিবেশবাদ’ থেকে পরিত্রাণ দেয়। তাই এই বিষয়গুলি সম্পর্কে কথা বলার জন্য উত্তর-দক্ষিণ শব্দ ব্যবহার করা ভালো। ঐতিহাসিক সাম্রাজ্যবাদ তথাকথিত উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যকার এই পার্থক্যগুলো একীভূত করেছে এবং উপনিবেশিকতার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং সংহত সমস্ত ধ্যানধারণার কারণে আমি মনে করি এসব এখনও অব্যাহত আছে। তাই আমি বলতে চাই যে, হ্যাঁ, পার্থক্য আছে এবং উত্তর ও দক্ষিণ শব্দদুটি পুরোপুরি যথার্থ না হলেও, এই পার্থক্যগুলোর বর্ণনা করার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে নিরপেক্ষ উপায় এই শব্দদুটির মধ্যে রয়েছে। আপনার এই শব্দদুটিকে স্থান হিসাবে বিবেচনা করা উচিত নয় : এগুলো মনোভাব, বোঝাপড়া, প্রত্যাশা প্রভৃতির সাথে সম্পর্কযুক্ত। তাই চীনের এমন কিছু অংশ থাকতে পারে যা পশ্চিমের মতো সমৃদ্ধ এবং কিছু অংশ সমৃদ্ধ নয়। এটা আসলে জায়গার বিষয় নয়। যখন আপনি নিরপেক্ষ বা মধ্যবর্তী থাকার চেষ্টা করেন, তখন এটি স্থানের দিক থেকে কিছুটা বিবেচনা করে। যখন ‘মধ্যবর্তী’ সত্যিই উত্তর এবং দক্ষিণের মধ্যে নয়, কিন্তু এই দুটি লেবেলের মধ্যে এক ধরনের মধ্যবর্তী বা অনির্দিষ্টতা আছে। সেখানেই আমি মনে করি, আপনি নিজেকে উদার মানুষ হিসেবে ভাবেন, নিজেকে বিশ্বের মানুষ হিসেবে এবং সর্বোপরি মানুষ হিসেবে দেখার চেষ্টা করেন। যাইহোক, এখানে আসল পার্থক্য আছে—আসুন আমরা বলি আপনার জীবনের ধরন—আপনি যেই হন না কেন, আপনি উত্তর দিকেরই হন বা দক্ষিণ দিকেরই হন আমাদের জীবন ভিন্ন হবে, আপনি চান বা না চান। এই সংস্কৃতিতে রাষ্ট্র আপনাকে হাসপাতাল, স্কুলসহ নানান সেবা ও সুবিধা দিয়ে থাকে। কিন্তু অন্যান্য দেশে [অনুন্নত দেশ] তাদের কাছে এরকম কিছুই নেই, তাই এই জায়গাগুলির মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য রয়েছে। যার ফলে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক ঘটনা বিভিন্ন সমাজে ঘটেছে।

প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন ‘শরণার্থী সংকট’ অনেক পরিবর্তন এনেছে? যদি তথাকথিত দক্ষিণ দেশগুলোর লোকেরা জার্মানিতে আসে—উদাহরণ স্বরূপ, তারাও জার্মানির পরিবর্তন করে—যেমন অন্যান্য অনেক দেশ পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। 
আবদুলরাজাক : ঠিক আছে, আমি বলছি না যে সবকিছু চিরকালের মতো একই থাকবে; অবশ্যই সবকিছুর পরিবর্তন ঘটছে। অন্যদিকে, কী বা কারা পরিবর্তিত হবে বলে আপনি মনে করেন? যদি বলা যায়, এক মিলিয়ন শরণার্থী জার্মানিতে আসলো, কাদের বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি—জার্মানির নাকি শরণার্থীর? সুতরাং এই প্রশ্নে আমার মত হলো, কিছুটা হলেও এটি একটি পার্থক্য তৈরি করবে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ভবিষ্যতে যেকোনও প্রত্যাবাসনের একটি শর্ত : তারা সরাসরি ইংরেজি শিখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদিও এতে কোনো সমস্যা নেই, তবে এটাকে ইতোমধ্যে একটি শর্ত হিসেবে তৈরি করাই বলে দেয় যে, অন্যরা যখন এখানে আসবে তাদেরকে আমাদের মতোই হতে হবে। চলবে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ১৭:২৭

১৯৬৯ সাল। গণঅভ্যুত্থান চলছে। এমন সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র লিখে ফেললেন ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ নামে একটি কবিতা, যার প্রথম দুটি লাইন স্লোগানের মতো মানুষের মুখে মুখে—‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’
কবিতাটি তখনকার কোনো পত্রিকা প্রকাশ করার সাহস না পেলেও আহমদ ছফা’র কল্যাণে রাতারাতি এ-দুটি লাইনে ছেয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব দেয়াল। এ দুটি লাইন গণঅভ্যুত্থানকে যেন বারুদের মতো উসকে দেয়। ফলশ্রুতিতে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে যান এই কবিতার স্রষ্টা, কবি হেলাল হাফিজ। সিক্ত হতে থাকেন অজস্র মানুষের ভালোবাসায়। এবং অবিশ্বাস্যভাবে, এর পরপরই তিনি হয়ে যান নীরব। ১৯৬৯ থেকে ’৮৬, দীর্ঘ ১৭ বছরের অপেক্ষা শেষে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তার ১ম কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে। বাংলা কাব্যগ্রন্থের ইতিহাসে সর্বাধিক বিক্রিত এই বইয়ের তুমুল জনপ্রিয়তার জোয়ারে ভেসে না-গিয়ে বরং আবারো নীরবতা এবং তার প্রিয় আলস্যকেই প্রশ্রয় দিলেন কবি। কাটিয়ে দিলেন গুনে গুনে আরো ৩৪ টি বছর। ১ম বই প্রকাশের জন্য যা সময় নিয়েছিলেন, ২য় বইয়ের ক্ষেত্রে নিলেন তার দ্বিগুণ! অবশেষে নীরবতার অবসান ঘটিয়ে ২০১৯ সালের শেষে, ৩৪ বছর পর ঠিক ৩৪ টি কবিতা নিয়েই হাজির হলেন তিনি।
গত ৫ ও ২৪ জানুয়ারি ‘বাংলা ট্রিবিউন’-এর সঙ্গে জাতীয় প্রেসক্লাবের অতিথি-কক্ষে চলা দীর্ঘ এক আলাপে কবি হেলাল হাফিজ খোলাসা করেন তার জীবনের নানা বিষয়াদি। বলেছেন বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ নিয়ে বিস্তারিত আলাপের পাশাপাশি নিজের জীবনের দর্শন ও নানান অভিজ্ঞতার কথাও।
'বাংলা ট্রিবিউন'-এর হয়ে এই আলাপ চালিয়েছেন তরুণ চলচ্চিত্রকর্মী, নির্মাতা শাহনেওয়াজ খান সিজু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আই.ই.আর. বিভাগের শিক্ষার্থী, তরুণ লেখক রেজওয়ান হাবিব রাফসান এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাদিরা ভাবনা


শাহনেওয়াজ খান সিজু : বিয়ে তো আর করলেনই না, এখন যদি কেউ প্রস্তাব দেয়, কী করবেন?
হেলাল হাফিজ : এখন? এখন বিয়ে-টিয়ে করাটা যে খুব অন্যায় হবে তা নয়। কিন্তু বিয়ে বলতে আমাদের মনে প্রথম যে ধারণা আসে, সে বয়স তো আর নাই।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : একজন সঙ্গী হিসেবে?
হেলাল হাফিজ : এই পড়ন্ত বেলায় মন তো চায় একজন বন্ধু পাশে থাকুক। যতটা না শারীরিক কারণে তার চেয়ে বেশি মানসিক।
 
নাদিরা ভাবনা : যেমন?
হেলাল হাফিজ : এই মনে করো চোখের সামনে একজন মানুষ আছে। ঔষধ খাবো, প্যাকেটটি এগিয়ে দিলো। পানি খাবো, গেলাসটি নিয়ে এলো। এই যা।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : বিকেলে চায়ে একসাথে চুমুক দেওয়া…
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, হ্যাঁ।
 
নাদিরা ভাবনা : এখন কি তার জন্য অনুতাপ হয়?
হেলাল হাফিজ : অনুতাপ না ঠিক, তবে এখন প্রয়োজনীয়তা বোধ করি খানিকটা। একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো। কিন্তু আমি, আমি তো আমার একাজীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি একদম শৈশব থেকেই। মা চলে যাওয়ার পর থেকে।
 
নাদিরা ভাবনা : মানে একদম ছোটবেলা থেকেই?
হেলাল হাফিজ : An Outsider!
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : মায়ের শাসন না পাওয়াটা কি আপনার বোহেমিয়ান জীবনের মূল কারণ?
হেলাল হাফিজ : না, না, না—আমার ক্ষেত্রে যা হয়েছে সেটা বাধ্যতামূলক। এইভাবে জীবনযাপনে আমি বাধ্য, আর কোনো উপায় ছিলো না আমার।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : জীবনানন্দ দাশের কবি হয়ে ওঠার পেছনে তার মা কুসুমকুমারি দাশের সান্নিধ্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তেমনি হেলাল হাফিজের কবি হয়ে ওঠার মূল কারণ কি তার মাতৃবিয়োগ?
হেলাল হাফিজ : আমার মনে হয় বিষয়টা এরকমই, মাতৃহীনতা। তোমাদের আমি খুব স্পষ্টভাবেই বলে দিচ্ছি যে, আমার কবি হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ এই মাতৃহীনতার বেদনা। এটা আমাকে প্রতিনিয়ত পুড়িয়েছে। আজকে যে হেলাল হাফিজকে দেখছো তোমরা, তার এই অবস্থানে আসা এবং তাকে তৈরি করার রাস্তাটা মাতৃহীনতার বেদনাই পরিষ্কার করে গেছে।
 
নাদিরা ভাবনা : আমাদের জীবনে এরকম হয় যে, আমরা যখন কারো দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হই, তখন বেদনা নতুন করে জেগে ওঠে।
হেলাল হাফিজ : আমি তো অনেক মেয়ের দ্বারাই প্রত্যাখ্যাত হয়েছি, নিজেও করেছি অনেককে। অনেকের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। কী রকম? আমি ভেবেছি মেয়েটি বোধহয় আমাকে ভালোবাসে। আসলে তা নয়, সে আমার কবিতাকে ভালোবাসে। আমি সেটাকে মনে করেছি হয়তো আমাকে ভালোবাসে! ফলে এই মুগ্ধতার দেয়ালটা যখন উঠে গেছে তখন বিরহ ছাড়া আর কোনো উপায় আসলে থাকেনি।
আবার এর উল্টাও হয়েছে। মেয়েটি হয়তো আমাকেই ভালোবাসে। কিন্তু আমি ভাবছি, ও আমাকে আর কি ভালোবাসবে? ও তো আমার কবিতাই বোঝে না, কিংবা বুঝতে চেষ্টাও করে না। যে রকম হয়েছে রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর ক্ষমতাই ছিলো না যে তাকে বুঝবে।
খুব প্রতিভাবান মানুষ সে নারী হোক বা পুরুষ—প্রেমহীন সে থাকে কী করে! একজন লেখিকা আছেন না, সুইসাইড করলো?
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : সিলভিয়া প্লাথ?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, সিলভিয়া প্লাথ। কত সুন্দর মহিলা ছিলেন, ফুলের মতো। সে তো পুরুষকে ভালোবাসতেই চেয়েছিলো। প্রত্যাখ্যাত না হলেও হয়তো বনিবনা হয়নি এমন বেদনা থেকে একটি মেয়ে সুইসাইড করতে পারে? ভাবা যায়! ওর ছবি দেখলেই তো ইচ্ছে হয় প্রেম করি! প্রেম আসলে নারী-পুরুষের ব্যাপার না, মানুষের ব্যাপার। এটা আসার হলে এমনিই আসবে। জোর করে আর যাই হোক ভালোবাসা হয় না।
 
নাদিরা ভাবনা : আচ্ছা, আপনার কবিতা নিয়ে যদি কেউ গান করতে চায়?
হেলাল হাফিজ : হয়েছে তো।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : না মানে, আপনার কি কখনো শুধু গানের কথা ভেবে কিছু লিখতে ইচ্ছে করেনি? যে রকমটা বব ডিলান, গুলজার বা শ্রীজাত করছেন?
হেলাল হাফিজ : না না না। আমি শুধু কবিতা নিয়েই থাকতে চেয়েছি আজীবন।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্ত্বিক ঘটক বলেছিলেন, তার নিজের বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য যদি সিনেমার চাইতে ভালো কোনো মাধ্যম তিনি পেতেন তবে সেই মাধ্যমকেই তিনি বেছে নিতেন। আপনি কেন কবিতার বাইরে গল্প, উপন্যাস, চিত্রনাট্য কিংবা অন্য কোনো শিল্প-মাধ্যমের দিকে ঝুঁকলেন না? সব ছেড়ে কেন শুধু কবিতা নিয়েই থাকছেন?
হেলাল হাফিজ : কবিতা ছাড়া অন্য কোনো কিছু আসলে টানেনি তেমনভাবে। আমার মনে হয়েছে যে, জীবনে আমার অল্প কিছু যদি করার থাকে তাহলে হয়তো এই মাধ্যমটিতেই আমি পারবো। আর আমি সত্যিই খুব কম প্রতিভাবান, নিজের সম্পর্কে আমি উচ্চ কোনো ধারণা আসলে পোষণই করি না। সুতরাং আমি নিজের লাগাম নিজে টেনে ধরার এই অভ্যাসটা খুব ভালোভাবেই আত্মস্থ করেছি।
 
নাদিরা ভাবনা : এটাকে পরিমিতিবোধ বলবেন?
হেলাল হাফিজ : পরিমিতিবোধ, Exactly এই শব্দটা। পরিমিতিবোধ এবং কোথায় কখন কতটুকু থামতে হবে, অধিকাংশ বাঙালিই এটা জানে না। এখানে তোমরা বলতে পারো যে, আপনি কি একটু বেশিই থেমে গেছেন? উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ। আমি একটু বেশিই থেমে গেছি। এটার কারণ আমি কম প্রতিভাবান এবং আলস্য আমার অসম্ভব প্রিয়। এই দুটো মিলে এবং ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র প্রবাদপ্রতিম খ্যাতি ও মানুষের ভালোবাসা আমাকে অস্থির করে ফেলেছে একদম। আনন্দ যেমন দিয়েছে তেমনি আতঙ্কিতও করেছে যথেষ্ট। রাতের পর রাত আমার ঘুম হয়নি।
 
নাদিরা ভাবনা : নতুন বই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই তো দ্বিতীয় সংস্করণ চলে এসেছে। এই যে এত খ্যাতি, আপনার কথায় মানুষের ভালোবাসা…
হেলাল হাফিজ : এটা অসম্ভব বিক্রি হচ্ছে। অসম্ভব ভালো বিক্রি হচ্ছে।
 
নাদিরা ভাবনা : আমি কিন্তু আপনার বই দুটোর মধ্যে এক ধরনের যোগসূত্র দেখতে পাই। প্রথমটা ছিলো আমি জ্বলছি, ‘যে জলে আগুন জ্বলে।’ আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে আমি এখন নিজেকেই সান্ত্বনা দিচ্ছি কিংবা আমি এখন কিছুটা স্তিমিত কিছুটা শান্ত, তাই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’। ঠিক আছে না ব্যাখ্যাটা?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, ঠিক আছে।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : বইটা প্রকাশ করতে এত সময় নিলেন কেন?
হেলাল হাফিজ : ভেতরে ভেতরে একটা ভয় কাজ করেছে যে, আরেকটা বই যদি প্রকাশ করি সেটা প্রথম বইয়ের ধার-কাছেও যেতে পারবে কি না। ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’র জন্য প্রায় ২০০ কবিতা থেকে ৩৪ টি কবিতা আমি বেছে নিয়েছি।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : বইটা পড়েছি আমি। এক লাইনের কবিতাও আছে এতে। একরকম experiment-ই করলেন বোধহয়!
হেলাল হাফিজ : এই বইয়ে আমি দুটো বিষয়ে কাজ করতে চেয়েছি—একটা হলো বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যে নেশা…
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : স্মার্টফোন?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ। সেই স্মার্টফোনকে কাব্যাকারে মলাটবন্দি করতে চেয়েছি। এই বইটা পড়তে কারো ২০ মিনিটের বেশি সময় লাগবে না, কিন্তু পড়ে সে আর বেরুতে পারবে না। একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে যাবে। এবং একটু পরেই আবার সে প্রথম থেকে পড়তে শুরু করবে—এই হলো এক। আর একটা বিষয় যা করতে চেয়েছি—এই যে আমরা একটা অস্থির সময় পার করছি, সমাজে হানাহানি—দুর্নীতি, একটা মেয়ে ঘর থেকে একা বের হতে পারছে না, অসহনশীলতা, রাজনীতি বিপথে চলে গেছে, সেইখানে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমি ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’-তে কেবলই প্রেমের কথা বলেছি, কেবলই বিরহের কথা বলেছি, কেবলই ভালোবাসার কথা বলেছি। আমি বোঝাতে চেয়েছি যে, প্রেমও প্রতিবাদের একটা ভাষা, প্রেম দিয়েও জয় করা যায়। আমার এই কোমলতায় কিছু মানুষও অনুপ্রাণিত বা প্রভাবিত হয় সেখানেই আমার সার্থকতা। চলমান সময়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে অনবরত আমি প্রেমের জয়গান গেয়েছি, বিরহের কথা বলেছি। বিরহ কিন্তু প্রেমেরই বড় অংশ, বিরহ মানুষকে নষ্টও করতে পারে আবার তৈরিও করতে পারে। বিরহ উপভোগের বিষয়।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : বইটির আর কোনো বিশেষত্বের কথা কি জানতে পারি?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ। একটা কবিতা আমার বাবার। কবিতাটির নাম পিতার পত্র—‘রেটিনার লোনাজলে তোমার সাঁতার/পিতৃদত্ত সে মহান উত্তরাধিকার।’
একটি চিঠিতে এই কবিতাটি লেখার পর বাবা আরও লিখেছিলেন, ‘এই কষ্ট, এই বেদনা তুমি লালন করবে, শুশ্রূষা করবে এদের, এবং চেষ্টা করবে এই বেদনাকে শিল্পে রূপান্তরিত করতে।’ আমি সেই চেষ্টাটাই করেছি, আর কিছু না। আব্বাকে সম্মান জানানোর জন্য ওনার এই কবিতাটি আমি ইনভার্টেড কমার ভেতরে আমার বইয়ে স্থান দিয়েছি। যেন একশো বছর পরে পাঁচজন লোকের হাতেও যদি এই বইটা থাকে, তারা যেন আমার পাশাপাশি আমার বাবাকেও পান।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : বাহ্, চমৎকার! আরেকটা প্রশ্ন করি?
হেলাল হাফিজ : নিশ্চয়ই। 
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : কবিতা অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের সাথে কীভাবে সম্পর্কিত বলে আপনি মনে করেন?
হেলাল হাফিজ : শুধু সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মধ্যেই নয় বরং সমস্ত শিল্প মাধ্যমের মধ্যে—যেমন গান, চলচ্চিত্র, নাটক, উপন্যাস—সবচেয়ে উঁচু স্তরের শাখা হলো কবিতা। এখন ধরো একজন ঔপন্যাসিক তার কোনো বিষয় বোঝাতে, কোনো সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে উনি ৭ পৃষ্ঠা লিখে ফেলতে পারেন। কিন্তু একজন কবির জন্য তা বোঝাতে দুটি পঙক্তিই যথেষ্ট। এজন্যই তুমি দেখবে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি স্বরণীয় হয়ে আছেন প্রথমত কবিরা, তারপরে বিজ্ঞানী-সহ অন্য সবাই।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : Visual Poetry’র ব্যাপারে আপনার কী ধারণা?
হেলাল হাফিজ : বুঝিনি। আবার বলো।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : আন্দ্রেই তারকোভস্কির মতো অনেক চলচ্চিত্রকারই তাদের সিনেমাতে Seen-এর পর Seen সাজিয়ে কবিতা বলে গেছেন, সেই Visual Poetry-কে আপনি কীভাবে দেখেন? আপনি যা লিখে প্রকাশ করছেন ওনারা তা Visually বলছেন। আপনার কবিতা বোঝার জন্য পাঠকের নির্দিষ্ট একটা ভাষায় পারদর্শী হওয়া আবশ্যক, কিন্তু সিনেমার ক্ষেত্রে বিষয়টা আলাদা। একেবারে বর্ণজ্ঞানহীন কোনো দর্শকের সঙ্গেও সিনেমা খুব সহজে Communicate করতে পারে।
হেলাল হাফিজ : আমি তো সেটাই বললাম, কবিতা হচ্ছে সবচেয়ে উঁচুস্তরের শিল্পমাধ্যম। কবিতা না লিখেও একজন কবি হতে পারে। ভালো ছবি এঁকে, ছবি তুলে, ভালো রাজনীতি কিংবা সিনেমা করেও কবি হওয়া যায়। কবিতা লেখার চাইতে Poetic হওয়াটা বেশি জরুরি। আর কবিতার ব্যাপারটা কি, ধরো প্রথমত বর্ণজ্ঞান থাকতে হবে। তারপর শুধু বর্ণজ্ঞান থাকলেই হবে না, ভালো লেখাপড়াও জানতে হবে। শুধু লেখাপড়া জানলেই হবে না, আগ্রহ থাকতে হবে কবিতার প্রতি। এ কারণেই পাঠককেও অনেকটা তৈরি হয়েই নামতে হবে যে আমি কবিতা পড়বো। কবিতাকে বোধগম্য করা কবির একার কাজ নয় পাঠকেরও কিছু কাজ আছে।
 
নাদিরা ভাবনা : আপনার কথা শুনে এখন মনে হচ্ছে যে, ‘Poetry is the mirror, where we can see the whole sky!’
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ এবং সেটা এতই সংক্ষেপিত যে তোমাকে বারবার ঘোরে ফেলে দেবে।
 
নাদিরা ভাবনা : আমি নিজেও যখন লিখতে যাই তখন মনে হয় যে ‘এটা সম্ভবত বুঝবে না কেউ।’ একারণেই Elaboration হয়ে যায়। অথচ আপনার কবিতা এক লাইন পড়লেই বুঝে যাই তার Background-টা কী বা কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা।
হেলাল হাফিজ : এটা হচ্ছে মুন্সিয়ানা এবং এটা আমার কবিতার একটা বড় Plus Point. তুমি রবীন্দ্রনাথের গীতবিতান ধরো, এতবড় গানের বইটা নিয়ে যদি বসো এবং প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ৩০০০ বা ৩৫০০ গান তুমি করলে। তুমি দেখবে একটি গানও তোমার বোধের অগম্য নয়। সবকটা গান মনে হবে যে, আরে এটা তো আমিও লিখতে পারি!
 
নাদিরা ভাবনা : আমারই কথা…
হেলাল হাফিজ : আমার কথা তো পরে, ওনার লেখা পড়ে মনে হবে যে আমি তো নিজেও এমন লিখতে পারি। একটা কঠিন শব্দ নাই, যুক্তাক্ষর যথাসম্ভব কম। তোমাকে খুঁজে খুঁজে যুক্তাক্ষর বের করতে হবে। মানে কতবড় প্রতিভাবান হলে এটা সম্ভব! বুঝতেই পারছো ব্যাপারটা। উনি নিজেই তো বলেছেন, ‘সহজ কথা কইতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায় না বলা সহজে।’ সহজ কথা বলাই তো সবচেয়ে কঠিন কাজ।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : আপনার সম্বন্ধে আমরা যতটুকু জানি, একজন আবুল হাসান হতে চেয়ে আপনি হেলাল হাফিজ হয়ে উঠেছেন, একজন কবির স্বাতন্ত্র্য গড়ে ওঠার প্রথম ধাপ কি তবে অনুসরণ, অনুপ্রাণিত কিংবা ঈর্ষান্বিত হওয়া?
হেলাল হাফিজ : যেকোনো শিল্পীরই শৈল্পিক ঈর্ষা থাকতে হবে। নোংরা ঈর্ষা হলে হবে না।
 
নাদিরা ভাবনা : অনুকরণ না, তাইতো?
হেলাল হাফিজ : অনুকরণ, অনুসরণ কোনোটাই না। আমি তো বলেছিই যে, আমার সমসাময়িক কবিদের মধ্যে একমাত্র আবুল হাসানকেই আমি ঈর্ষা করি। আর কাউকে ঈর্ষা করি না। তার মানে কী? সবচেয়ে বেশি ভালোওবাসি তাকে।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : শিল্প তো মনুষ্যত্বের জয়গান গায়, পৃথিবীর দুঃখের অবসান চায়। কিন্তু তারপরেও এই সমগ্র পৃথিবীর এত এত মহান সব শিল্পী, শিল্পকর্ম, বিশ্বমোড়লদের প্রভাবিত করতে পারেনি বা পারছে না কেন? কেন পৃথিবীর সর্বত্র এখনো অন্ধকারের জয়?
হেলাল হাফিজ : না, এইখানে তোমার পুঁজিবাদের প্রভাব আছে। কারণ পুঁজিবাদ তো শিল্পের বিকাশ ঘটতে দেবে না।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : না, মানে ঠিক কী কারণে বব ডিলান বা জন লেননের গান কিংবা পৃথিবীর এত এত মহান শিল্পীদের শিল্পকর্মগুলোর মূলভাষ্য বিশ্বনেতাদের প্রভাবিত করতে পারছে না? ডোনাল্ড ট্রাম্পও তো দিনশেষে একজন মানুষ, কেন তাকে ডিলান কিংবা বব মার্লে ছুঁয়ে যায় না?
হেলাল হাফিজ : সব মানুষ আলাদা, সবার শিল্পবোধ এক নয়।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : সমসাময়িক কবিদের মধ্যে কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের সাথে সম্ভবত পরিচিত আপনি। ওনার কবিতা নিয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাই।
হেলাল হাফিজ : ইমতিয়াজ মাহমুদ আমার ভক্ত, আমিও তার ভক্ত। ওর লেখার মধ্যে আলাদা একটা ব্যাপার আছে।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে কোনো স্মৃতি কি মনে পড়ে?
হেলাল হাফিজ : পারিবারিকভাবে তসলিমার সঙ্গে আমার খুবই অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিলো, একে তো মাটির টান, তার ওপরে অনুজ রুদ্র’র প্রেমিকা। ওদের মধ্যে এটা-সেটা নিয়ে সাংসারিক ঝামেলা লেগেই থাকতো, তখন আমিই যেতাম সেসব মেটাতে। এবং এই করতে করতেই আমি তসলিমার প্রেমে পড়ে যাই, তবে ব্যাপারটা একপাক্ষিক ছিলো। এইখানে তোমাদের বলে রাখি, আমার 'বেদনাকে বলেছি কেঁদো না'র প্রথম যে কবিতা, ‘ব্রক্ষ্মপুত্রের মেয়ে’, সেটা কিন্তু তসলিমাকে ভেবেই লেখা। ওকে আমি ‘তনা’ নামে ডেকেছি।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : আপনি বরাবরই বলেছেন যে, একজন প্রকৃত শিল্পী যদি হতে হয় তবে ক্ষমতা থেকে তার দূরে থাকাই ভালো।
হেলাল হাফিজ : আমি এটা সবসময়েই বলি। পাওয়ারের সঙ্গে কবির মেশা কখনো ঠিক না। কবি হলো একটা সার্বভৌম সত্তা Sovereign identity. একটা সমাজ বা জনগোষ্ঠী কী অবস্থায় আছে, এটা সেই সমাজের কবিদেরকে দেখে বোঝা যায়। কবি হলো একটি সমাজের ব্যারোমিটার, সমাজটা কি নষ্ট-ভ্রষ্ট না কি ভালো, কতটুকু সভ্য আর উন্নত তা কবিদের আচরণ দেখলেই বোঝা যায়। সমাজের কবিরা যদি পোষা পাখি হয়ে যায়, তাহলে ধরে নিতে হবে সে সমাজ দ্রুত গতিতে অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে। কবি একটি জনগোষ্ঠীকে স্বপ্ন যেমন দেখাবে, তেমনি সেই জনগোষ্ঠীর স্বপ্নভঙ্গের বেদনাকেও সে চিহ্নিত করে দেবে। কোথায় ভুল-ত্রুটি হচ্ছে তা দেখিয়ে দেয়াও কবির দায়িত্ব। এর অর্থ এই না যে কেউ রাজনীতি করতে পারবে না। নিশ্চয়ই পারবে। একজন কবির একটি রাজনৈতিক সংগঠন করার যাবতীয় অধিকার অবশ্যই আছে। নিশ্চয়ই করবে সে। কিন্তু আমার ধারণা যে, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হলে একধরনের চিন্তাগত সীমাবদ্ধতা Automatically-ই আরোপিত হয়ে যায়।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : সক্রিয় রাজনীতিতে একধরনের সহিংস, কঠোর মনোভাব আছে যার প্রতি একজন শিল্পীর নরম মন সহজে সায় দিতে চায় না।
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, ঠিক এই কারণেই একজন কবির রাজনীতি থেকে একটু দূরে থাকতে পারাই ভালো। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে তার রাজনৈতিক সংগঠন করারও সম্পূর্ণ অধিকার আছে। অবশ্যই আছে। সুকান্ত করেছে না? তারপরে ঐ যে ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত’ যিনি লিখলেন?
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : সুভাষ মুখোপাধ্যায়?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়। উনি তো সক্রিয় রাজনীতিই করতেন। সুকান্ত করতেন। এমনকি কাজী নজরুল ইসলামও। আমি এই যে বারবার বলছি, আমি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য না। তুমি দশজন কবির বই নিয়ে বসো, সবচাইতে বেশি রাজনৈতিক কবিতা পাবে আমার লেখায়।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : প্রয়াত কবি মাহবুবুল হক শাকিল, আপনার ঘনিষ্ঠজন বলেই চিনি আমরা। উনিও কিন্তু সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন।
হেলাল হাফিজ : মাহবুবুল হক শাকিল—ও তো আমার কবিতা অসম্ভব পছন্দ করতো। এবং ময়মনসিংহ গেলে বাড়িতে যাওয়া-আসা ছিলো। এবং শাকিলই আমার চোখের চিকিৎসার সময়ে শেখ হাসিনার সাথে আলাপ করে পুরো বিষয়টা নিজে একক দায়িত্বে সামলিয়েছিলো। আমাকে সে বলেছে যে, আপা মানে নেত্রী তো আপনাকে খুব পছন্দ করে কিন্তু আপনি এত দূরে দূরে থাকেন কেন? আমি তখন বলেছি যে, ভাই দূরে-কাছে তো ব্যাপার না। আমি আমার কাজ করছি, উনি ওনার কাজ করছেন।
তো আমি যখন বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলাম ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তখন ৪৫ বছর পর শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার মুখোমুখি দেখা।
 
নাদিরা ভাবনা : নতুন কবি বা লেখকদের লেখা কি পড়েন?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, সেটাই তো বেশি জরুরি। আমার সময়কে আমি কীভাবে ধরবো? আমার তো ৭২ বছর বয়স। তুমি আমার কবিতা পছন্দ করো বলে তোমার হয়তো আমাকে একটু কাছে বসতে দিয়েছো, নাহলে তো আমাকে কেউ ধারে কাছেও বসতে দেবে না। তাই না? আমি তোমাকে না পড়লে বুঝবো কীভাবে? কাছাকাছি থাকলে হয়তো একটু বন্ধুত্ব হতে পারে। কিন্তু এর বেশি তো আর সম্ভব না। তাহলে আমি আমার সময়কে বুঝবো কীভাবে? তোমার কবিতা পড়ে, গান শুনে কিংবা পেইন্টিং দেখেই তো বুঝতে হবে তোমাকে, তাই না?
 
নাদিরা ভাবনা : তার মানে নতুনদের ভালো লাগে। অনুপ্রাণিতও হন তাদের দ্বারা?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। হবো না কেন? কোনো ভালো লেখা পড়লে দারুণ লাগে। এইতো কিছুদিন আগে একটা মেয়ের লেখা দেখলাম Facebook-এ। তার সঙ্গে আমার পরিচয় নাই সেভাবে। আমিই তাকে Friend Request পাঠিয়ে বন্ধু হয়েছি। তাকে বলেছি যে আমার Inbox-এ কিছু লেখা দাও তোমার। আমি হাতের কাছে তরুণদের যত লেখা পাই, পড়ি। এখন হয়েছে কী! একটা কাল্ট বা ঘরানা মানে একটা স্বতন্ত্র ধারা জন্ম নিয়েছে, যা কিনা বছরে বছরে হবে না এমনকি যুগে যুগেও না। যেমন জীবনানন্দ দাশ একটা ঘরানা। রবীন্দ্রনাথ একটা ঘরানা।
 
নাদিরা ভাবনা : নজরুল?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, নজরুলও একটা ঘরানা। কিছুটা ঘরানা আবুল হাসানও। আবুল হাসানের কবিতার কোনো নাম-টাম না থাকলেও বোঝা যাবে যে এটা আবুল হাসান।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : Signature?
হেলাল হাফিজ : Exactly, একজন কবির যে স্বাতন্ত্র্য, কবিসত্তা, এটা থাকা জরুরি।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : স্যার, জীবনে তো অনেক অনেক রূপসী নারীরই সান্নিধ্য পেলেন। একটা বিষয় জানতে চাই যে, একজন নারীর রূপ নাকি ব্যক্তিত্ব, কোনটা আপনাকে বেশি টানে?
হেলাল হাফিজ : দুটোই, আমি মনে করি যে দুটোই জরুরি। শুধু বাহ্যিক রূপ দিয়ে তো কোনোকিছু চিরস্থায়ী হবে না। এটার সঙ্গে যদি ভেতরের ভালো সংমিশ্রণ ঘটে তাহলে ব্যাপারটা জমে আরকি। এটা কেবল নারী নয় বরং পুরুষদের ক্ষেত্রেও একই।
 
নাদিরা ভাবনা : কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে বোধহয় রূপের বিষয়টা একটু বেশিই জরুরি?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ এটাও সত্য। কিন্তু এটাই সর্বেসর্বা না। এটাই সবকিছু না। আমি নিজেই তো একসময় সুদর্শন ছিলাম, কিন্তু এখন? তুমি আমার কবিতা ভালোবাসো বলেই আমার পাশে বসেছো, আমি যদি না লিখতাম তাহলে কেউই আমাকে এই বয়সে এতটা গুরুত্ব দিতো না। যাই হোক, কিছুদিন আগে ‘প্রথম আলো’ জিজ্ঞাসা করেছিলো যে, আপনার এত এত নারী ভক্ত। তারা আপনাকে উপহার হিসেবে কী দেয়? উত্তর দিলাম, সবচেয়ে বেশি পেয়েছি চুমু। একসময় প্রচুর পেতাম। এখন তো পড়ন্ত বেলা, এখন মালা পাই, ব্রেসলেট পাই, ফুল পাই।
 
নাদিরা ভাবনা : চুমুও পান?
হেলাল হাফিজ : একেবারে যে পাই না তা না, তবে পাই। পাবার একটা জায়গা তো হলোই এখন! (ভাবনাকে ইঙ্গিত করে)
 
নাদিরা ভাবনা : তা তো বটেই।
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : এখন একজন মহান মানুষকে নিয়ে আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে যাচ্ছি, যাকে শুধু রাজনীতির ফ্রেমে আমরা আবদ্ধ রাখতে পারি না। উনি সার্বজনীন, উনি সবার। অন্তত একজন বাঙালি যদি হয়ে থাকি আমরা। বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ, এ দুটো আপনার কাছে সমার্থক কিনা স্যার?
হেলাল হাফিজ : বাঙালি জাতির জন্য একজন মানুষ, কেবল একজন মানুষই স্বতন্ত্র, স্বাধীন এবং সার্বভৌম একটি ভূখণ্ডের স্বপ্ন দেখেছেন, তার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। আর কোনো বাঙালি বাঙালির জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমির কথা চিন্তা করেনি। কোনো কবি করেনি, কোনো রাজনীতিবিদ করেনি, কেউ করেনি।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : একমাত্র বাঙালি...
হেলাল হাফিজ : একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানই বাঙালির জন্য একটি স্বতন্ত্র, স্বাধীন, সার্বভৌম আবাসভূমির স্বপ্ন দেখেছেন এবং তা শুধু দেখেনই নয় বরং সারাজীবনের সংগ্রাম দিয়ে সেটা বাস্তবায়িত করেছেন।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : বারবার জেল খেটেছেন…
হেলাল হাফিজ : তার সমকক্ষ আর কেউ নাই। কেউ নাই। এটা একদম বিনা বাক্যব্যয়ে মানে এই শব্দকে কোনোভাবেই Ignore করা সম্ভব না। এটা যদি কেউ অস্বীকার করতে চায় সে হয়তো বাঙালিই না। করেনি যে তা নয়, অনেকেই করছে। কিন্তু সেটা খুবই অযৌক্তিক, খুবই অপরিশীলিত মনের পরিচয়। তার রাজনীতির বিরুদ্ধতা হতে পারে কিন্তু তার যে অবদান, কাজ…
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : তার বিরোধীতা করা সম্ভব না।
হেলাল হাফিজ : একদম।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : আপনার গুরুই বলা যায়—আহমদ ছফা—তার প্রভাব কেমন আপনার ওপরে?
হেলাল হাফিজ : ছফা ভাই অনেক অনেক আদর করতেন আমাকে। এবং আমার ঐ যে কবিতাটা যখন বেরুলো ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’, তখন হুমায়ুন কবির নামে একজন কবি ছিলেন, বরিশাল বাড়ি তার। আমাকে নিয়ে ছফা ভাই আর হুমায়ুন ভাই গিয়েছিলেন দৈনিক পাকিস্তানের সম্পাদক আহসান হাবীবের কাছে। তখনকার দৈনিক পাকিস্তান পরে দৈনিক বাংলা হয়। হাবীব ভাইয়ের কাছে গিয়ে ছফা ভাই বললেন, এই যে হেলাল হাফিজ আর এই তার কবিতা। হাবীব ভাই কবিতাটি পড়ে আর আমার দিকে তাকান।
 
নাদিরা ভাবনা : বাচ্চা এই ছেলেটা করেছেটা কী?
হেলাল হাফিজ : যাইহোক, পরে হাবীব ভাই বললেন, ছফা ও তো বাচ্চা ছেলে কষ্ট পাবে, কিন্তু কবিতাটি আমি ছাপতে পারবো না। আমার চাকরি থাকবে না, এমনকি কাগজও বন্ধ করে দিতে পারে। সরকারি কাগজ তখন পাকিস্তানের। তবে এরপরেই বলেন তিনি যে, হেলালের আর কবিতা না লিখলেও চলবে, তার অমরত্ব নিশ্চিত হয়ে গেছে। এইতো এখনও কানে বাজে কথাটা। তখন ছফা ভাই এসে হুমায়ুন কবিরকে সাথে নিয়ে, ওনারা তখন লেখক-শিবির করতেন, বাম ঘরানার Underground সশস্ত্র বিপ্লবী ছিলেন। দুই রাতে সমস্ত ক্যাম্পাসের দেয়াল ভরে গেলো এই কবিতার পঙক্তিতে।
‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’
মাঝরাতে চিকা মেরে মেরে করেছিলো এসব। পুরো ক্যাম্পাস। কার্জন হল, আর্টস বিল্ডিং। তখন তো এতকিছু ছিলো না ক্যাম্পাসে। এই দুটিই বড়, মূল বিল্ডিং। সমস্ত দেয়ালে চিকা মারার এই কাজের নেতৃত্বে ছিলেন ছফা ভাই। উনি ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক স্যারের শিষ্য।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : আব্দুর রাজ্জাক স্যারকে নিয়ে তো উনি একটা বইও লিখেছিলেন, ‘যদ্যপি আমার গুরু’।
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ। আচ্ছা শোনো, আমি আর কথা বলতে পারবো না, এই যে আমার কাশি হচ্ছে বারবার। তোমরা ৩ জন মিলে এটা গুছিয়ে লিখো আর কোনো তথ্যের যদি ঘাটতি পড়ে কিংবা কিছু নিয়ে কোনো দ্বিধা যদি হয় তবে আমাকে ফোন করো।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : স্যার, একটা শেষ প্রশ্ন করি?
হেলাল হাফিজ : আচ্ছা করো।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : পিডিএফ বনাম কাগুজে বই, কার পক্ষে আপনি?
হেলাল হাফিজ : অনেকের ধারণা যে বই বোধ হয় উঠে যাবে, বই থাকবে না। কিন্তু আমার মনে হয় বই থাকবে। কারণ বইয়ের কাগজের যে গন্ধটা লাগে নাকে এটা কিন্তু খুবই হৃদয়গ্রাহী একটা ব্যাপার। এবং তুমি যতই অনলাইন পড়ো না কেন, এই যে বাইন্ডিং করা বই, এটা হাতে নিলে মনে হয় যেন লেখককেই ধরে আছো। এই স্পর্শ, আবেদনটা তুমি অন্য কোথাও পাবে না। আমাকে তো কত ছেলে-মেয়েই বলেছে যে, ঘুমানোর সময় ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ তাদের বালিশের নিচে থাকে।
 
নাদিরা ভাবনা : আমারও তো থাকে।
হেলাল হাফিজ : এই যে দেখো জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। চিন্তা করো কেমন লাগে তখন? কথাটা কত মানুষ যে বলেছে আমাকে!
 
নাদিরা ভাবনা : ব্যাপারটা এমন না যে শুধু পড়েই রেখে দিলাম, একটা ঘোরের বিষয় আছে।
হেলাল হাফিজ : এজন্যই আমি ১৭ বছর অপেক্ষা করেছিলাম বইটার জন্য আর এই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ এটার জন্য ৩৪ বছর। এটা এমন না যে বেশি সময় নিয়ে বের করেছি বলে এটা সমকক্ষ তার, বরং আমি স্বীকারই করি যে এটা দূর্বল খানিকটা। ৩-৪ টা টিভি অনুষ্ঠান করেছি বইটা বেরুবার পরে এবং প্রতিটাতেই স্বীকার করেছি।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : প্রথম বই সবসময়েই প্রিয়।
হেলাল হাফিজ : না না, যেটা বাস্তব সেটা তো বলতেই হবে। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ যখন আমি লিখেছি, তখনকার সময় আর এখন কি এক? ঐ সময় আমি কোথায় পাবো? কবিতা তো আর হাওয়ায় হাওয়ায় হয়ে ওঠে না।
 
নাদিরা ভাবনা : এবার চা খাব।
হেলাল হাফিজ : শুধু চা কেন? তার আগে কাবাব-নান খাবো এবং আমি খাওয়াবো। চলো, এতক্ষণে ক্যান্টিন খুলে গেছে...

/জেডএস/

সম্পর্কিত

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ১৭:৪৩

২০২১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জিতে নিলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ। ৭ অক্টোবর বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় বিকেল পাঁচটায় এই পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে রয়েল সুইডিশ অ্যাকাডেমি।

তানজানিয়ার নাগরিক আবদুলরাজাক গুরনাহ যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। তিনি মূলত ইংরেজিতে লেখেন। তার  বিখ্যাত কয়েকটি উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে প্যারাডাইস (১৯৯৪), বাই দ্য সি (২০০১), এবং ডেজারশন (২০০৫)।

১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন আবদুলরাজাক গুরনাহ। তানজানিয়ায় বেড়ে উঠলেও ১৯৬০ সালের পর শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাজ্যে যান এই সাহিত্যিক। অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ক্যান্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। সুইডিশ একাডেমি বলেছে, আবদুলরাজাক গুরনাহের আপোষহীন ও দরদী লেখায় উপনিবেশিকতার দুর্দশা আর শরণার্থীদের জীবনের নানা কষ্ট-ব্যাঞ্জনার গল্প ফুটে উঠেছে।

২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জিতে নেন আমেরিকান কবি লুইস গ্লাক। সুইডিশ অ্যাকাডেমির পক্ষ থেকে বলা হয়, গ্লাককে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে তার নিরাভরণ সৌন্দর্যের ভ্রান্তিহীন কাব্যকণ্ঠের কারণে, যা ব্যক্তিসত্তাকে সার্বজনীন করে তোলে। ২০১৯ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন অস্ট্রিয়ান লেখক পিটার হান্দক। তার বিরুদ্ধে সার্বিয়ার নেতা স্লোবোদান মিলোসেভিচের বলকান যুদ্ধ সমর্থনের অভিযোগ রয়েছে।

২০১৮ সালে নোবেল কমিটির এক সদস্যের স্বামী ও জনপ্রিয় আলোকচিত্রী জ্যঁ ক্লদ আর্নোর বিরুদ্ধে যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগ আনা হয়। পরে ওই ঘটনায় তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে আদালত। যৌন কেলেঙ্কারির পাশাপাশি বিজয়ীর নাম ফাঁস করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিতর্কের মুখে স্থগিত করা হয় ২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেল প্রদান।

কেলেঙ্কারির কারণে ২০১৯ সাল থেকে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে শুরু করে রয়েল সুইডিশ একাডেমি। পাল্টে যায় নোবেল কমিটির কাঠামোও। সে বছর ২০১৯ সালের বিজয়ীর পাশাপাশি ঘোষণা করা হয় ২০১৮ সালের স্থগিতকৃত বিজয়ীয় নামও। ২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান পোলিশ লেখক ওলগা তোকারজুক।

সরাসরি নোবেল ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৮ সালেই প্রথমবারের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা বাতিল করা হয়। এর আগে দ্বিতীয় ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ও এ বিভাগে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। তবে ওই সময় যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে দেওয়া হয়নি।

২০১৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জিতে নেন জাপানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক কাজু ইশিগুরো। ২০১৬ সালে অ্যাকাডেমি আমেরিকান রক সংগীতের কিংবদন্তি বব ডিলানকে এই পুরষ্কার দেওয়া হয়।

এর আগে ১৪ জন নারী সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন। প্রয়াত টনি মরিসন একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ নারী যিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন।

প্রসঙ্গত, ১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসে আলফ্রেড নোবেল নিজের মোট উপার্জনের ৯৪% (৩ কোটি সুইডিশ ক্রোনার) দিয়ে তার উইলের মাধ্যমে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করেন। এই বিপুল অর্থ দিয়েই শুরু হয় পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান।

১৯৬৮ সালে তালিকায় যুক্ত হয় অর্থনীতি। সে বছর পুরস্কার ঘোষণার আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন আলফ্রেড নোবেল। আইনসভার অনুমোদন শেষে তার উইল অনুযায়ী নোবেল ফাউন্ডেশন গঠিত হয়। তাদের ওপর দায়িত্ব বর্তায় আলফ্রেড নোবেলের রেখে যাওয়া অর্থের সার্বিক তত্ত্বাবধান করা এবং নোবেল পুরস্কারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা করা। বিজয়ী নির্বাচনের দায়িত্ব সুইডিশ অ্যাকাডেমি আর নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটিকে ভাগ করে দেওয়া হয়।

/জেজে/

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ২০:৪৮

শিশুরা খেলবে
এই তো নিয়ম
বুড়োরা দেখবে
তাই বুঝি কম
হঠাৎ দেখছি
হলদিয়া মাঠে
বদলিয়ে গেছে
আগম নিয়ম :

বুড়োরা খেলছে
শিশুরা দেখছে

(আগম-নিয়ম/ লঘু সংগীত ভোরের হাওয়ার মুখে)

আমাদের জীবন যে সব সময় শৈশবকে বহন করে চলেছে, এই কবিতার মধ্যে সেই বার্তা পাই। বয়স্ক মাত্রই একদিন শিশু ছিল, কিন্তু বুড়ো হয়ে অনেকে ভুলে যান সে-কথা। কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ভোলেননি! সে-জন্যই বোধ হয় আমাদের মনোজগতের 'আগম-নিয়ম' বদলে দিতে চেয়েছিলেন তিনি! 'হলদিয়া'র ঠিক পরের লাইনে 'বদলিয়ে' শব্দটি কী মাধুর্য এনেছে! তাঁর মনের বয়স যে বাড়েনি, কাছে গেলেই সে-কথা টের পাওয়া যেত। মধুর-আনন্দে ভরিয়ে দিতেন আমাদের ছেলেবেলা!

কখনও মজার গল্প বলতেন। একবার তাঁর বাড়িতে গিয়ে মুখোমুখি বসেছি, ওমনি তাঁর পায়ে এসে বসল একটা মশা! 'ঠাস' শব্দে মশাটাকে মেরে অলোকরঞ্জন বললেন :
—আমাদের বন্ধু তারাপদকে চেনো?
—তারাপদ রায়? বহু কবিতা পড়েছি তাঁর।
—আমাদের শৈশবে ওর একটা ডেরা ছিল কলকাতায়। রাতে মশার বাড়বাড়ন্ত। মশারি টাঙিয়ে ঘুমোত তারপদ।
—তাই?
—রাত দু'টোর মধ্যে ঘরের সমস্ত মশা ঢুকে পড়ত ওর মশারির ভেতর।
—সেকি! তারপর?
—তারাপদ তখন আলত করে মশারি থেকে বেরিয়ে এসে খোলা মেঝেতে ঘুমিয়ে দিব্যি কাটিয়ে দিত বাকি রাতটা!

কী আশ্চর্য! ১৭ নভেম্বর অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর চলে যাওয়ার দিনটিতেই তারাপদ রায়ের জন্মদিন। কীরকম তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গিয়েছে দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু। আজ অলোকদার জন্মদিনে তাঁর কথাগুলো কানের কাছে বেজে উঠছে পিয়ানোর সুরের মতো। আর ভাবনার অতল মিলিয়ে যাচ্ছে জলের গভীরে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে নবনীতা দেবসেনের মৃত্যুর পর তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, বুদ্ধদেব বসুর চলে যাওয়ার দিনটিতে নবনীতা ঘটনাচক্রে ছিলেন অলোকরঞ্জনের জার্মানি বাড়িতে। সেদিন সারা রাত তাঁরা শুধু বুদ্ধদেবের স্মৃতিচারণ করেছিলেন, তারপর এক সময় জানালা দিয়ে আলো আসতে শুরু করে, ভোর হয়ে যায়।

বাজে রে গুপীযন্ত্র বাজে মহাঅন্ধকারে

চটকা ভেঙে সংসারীরা গণপিটুনি দিতে
আছিলা চোর খুঁজে বেড়ায়, নাগরদোলা থেকে
দুঁদে সয়তান ধার্য করে কোনজন সজ্জন,
বাকিরা প্রাণ খোয়ায় তার একটি ইঙ্গিতে,
নবারুণের বদলে দেখি শুধুই রাত বাড়ে—

তবুও গুপীযন্ত্র বাজে মহাঅন্ধকারে

(গুপীযন্ত্র বাজে/ শুনে এলাম সত্যপীরের হাটে)

তখন কি ভেবেছিলাম ঠিক তার পরের বছর নভেম্বরে তিনিও চলে যাবেন আমাদের ছেড়ে! কবি আলোকরঞ্জন দশগুপ্তর প্রয়াণ আমাদের কাছে রাত বাড়ার মতোই 'মহাঅন্ধকার' এনে দিয়েছে। প্রয়াণের পর এই তাঁর প্রথম জন্মদিন। কাছের মানুষকে হারালে, কেন জানি না, তাঁর সঙ্গে যাপনের দিনগুলোই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বারবার। পর্দায় দেখা সিনেমার দৃশ্যের মতোই, একের পর এক। যদবপুরে শক্তিগড়ের মাঠের কাছে তাঁর ফ্ল্যাটে আমাদের আড্ডা হয়েছে বহুবার। টের পেতাম শব্দ প্রবাহের রূপান্তর। শক্তিগড় শব্দটির মধ্যে একটা স্পেস দিয়ে উচ্চারণ করতেন তিনি। শক্তি (স্পেস) গড়ের মাঠ! কিন্তু কেন? একটা স্পেসের মধ্যে দাঁড়িয়ে কি তিনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কোনও মেধাবী-মজা করতেন? তা ধরার সাধ্য আমার নেই। তবে তিনি শক্তির কবিতার কাছে বারবার যেতে বলতেন, সেকথা মনে আছে। যখন তাঁর কাছে 'বৈষব পদাবলি' বুঝতে গিয়েছি, তখনও তিনি বলেছিলেন-- 'শক্তির কবিতা বৈষ্ণব পদাবলির জঙ্গম উত্তরাধিকার বহন করেছে'। এই নিয়ে তাঁর একটি লেখাও রয়েছে। সেই লেখা পাওয়া যায় 'যা হয়েছে যা হতেছে এখুনি যা হবে' বইয়ে।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির আয়োজনে লিটল ম্যাগাজিন মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল শিলিগুড়ির বাঘাযতীন পার্কে। সেখানে কবিতা পড়তে যাব জেনে অলোকদা বললেন, 'আমার বন্ধু অশ্রুকুমার সিকদার শিলিগুড়িতে থাকেন। ওঁর সঙ্গে দেখা করে এসো। বলবে আমি পাঠিয়েছি।' সেই মতো ফোন করে অশ্রুবাবুর বাড়িতে গেলাম। তাঁর 'আধুনিক কবিতার দিগবলয়' কত ছোটবেলায় পড়েছিলাম। বইটা আমার বাবার সংগ্রহে ছিল। এবার অশ্রুবাবু উপহার দিলেন 'গাংচিল' থেকে প্রকাশিত তাঁর 'এক কুড়ি প্রবন্ধ'। বইটা পড়ে কী ভীষণ ঋদ্ধ হই এখনও! শেষ দিন পর্যন্ত অশ্রুবাবুর সঙ্গে সুযোগাযোগ থেকে গিয়েছিল একমাত্র অলোকঞ্জনের সৌজন্যেই!

এর কিছুদিন পর নন্দন চত্বরে লিটল ম্যাগাজিন মেলায় অলোকরঞ্জন দশগুপ্তর কবিতাপাঠ শুনেছিলাম :

প্রজাপতির পরনে ছিল হলুদ টাই,
তুমি কিন্তু দেখলে শুধু হলুদটাই।

যেদিকে চাও এখন শুধু ঘূর্ণিঝড়,
উড়তে গিয়ে গাছগুলিও দূর-শিকড়।

বরণডালায় কেউ রেখেছে বিষবারুদ,
যজ্ঞের চাল নষ্ট-করা কপিশ দুধ

খেতের মধ্যে ছলকে  যায়, এমন সময়
ভয় সাহস এবং কিনা সাহস ভয়।

এর ভিতরে ছোট্ট বুকে সাহসভরে
একটুখানি রং-বদলের আড়ম্বরে

পাড়ার প্রজাপতি আঁচল হলুদ টাই,
তুমি কিন্তু দেখলে শুধু হলুদটাই!

'হলুদ টাই'-এর সঙ্গে 'হলুদটাই'-এর আশ্চর্য অন্তমিল ভাবা যায়! কিংবা 'ঘূর্ণিঝড়' এর সঙ্গে দূর-শিকড়-এর? আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত তাঁর 'তুষার জুড়ে ত্রিশূলচিহ্ন' বইয়ে আছে এই কবিতা। নিজেকে 'আড় ভাবুক' বলতেন তিনি। একবার এর মানে জানতে চেয়েছিলাম তাঁর কাছেই। বলেছিলেন, যেকোনো বিষয়কে আড়াআড়ি ভাবা। অলোকরঞ্জনের সঙ্গ না-পেলে মনে হয় জীবনটাই বিবর্ণ থেকে যেত।

২০১৮ সালে অক্টোরব মাসে দিল্লি থেকে ফোন করে বললেন : 'দেশ পত্রিকায় তোমার কবিতাটা ভালো লেগেছে। আমার বোনের বাড়িতে বসে লেখাটা পড়লাম।' একজন তরুণের কাছে এর চেয়ে বেশি পাওয়া আর কী হতে পারে! আজ, তাঁর 'পদ্ধতি ও খণ্ড খণ্ড মেঘ' আবার খুলে বসেছি। বইটা এক সময় তাঁর সংগ্রহে ছিল না। কলেজ স্ট্রিট বাটার তিন তলায় 'বিকল্প' প্রকাশনা থেকে একটা কপি সংগ্রহ করে আমি দিয়েছিলাম তাঁকে। এই বই আমার চোখের সামনে খুলে দিয়েছিল জার্মান সাহিত্যের জানলা। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত আমার কাছে খোলা জানালার মতোই। যে-জানালা দিয়ে আমার ঘরে সব সময় আলো-বাতাস আসছে...।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:৪৭

এ বছর ‘দ্য বুকার প্রাইজ’-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে শ্রীলঙ্কার ৩৩ বছর বয়সী লেখক অনুক অরুদপ্রাগাসামের উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’। বইটি চলতি বছরের ১৩ জুলাই যৌথভাবে প্রকাশ করেছে আমেরিকার হোগার্থ প্রেস এবং হামিশ হ্যামিল্টন। আমেরিকার পাশাপাশি ইংল্যান্ডের গ্রান্টা বুকস থেকেও ১৫ জুলাই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়।

উপন্যাসের বিষয়বস্তু গৃহযুদ্ধোত্তর শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি।

‘২০২১ বুকার প্রাইজ’-এর সংক্ষিপ্ত তালিকা ঘোষণা করা হয় ১৪ সেপ্টেম্বর।

উপন্যাসর মূল চরিত্র কৃষ্ণ, যাকে কেন্দ্র করেও গল্প গড়ে ওঠে। দেখানো হয়, কৃষ্ণ বর্তমান সময়ের কলম্বোর একটি এনজিওতে চাকরি করে। যে এক সময় শ্রীলঙ্কার উত্তরে যাত্রা করে– যেখানে গৃহযুদ্ধের কুরুক্ষেত্র ছিলো– সেখানে সে তার দাদীর তত্ত্বাবধায়কের শ্মশান যাত্রায় যোগ দেয়।

‘এ প্যাসেজ নর্থ’ একটি গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন দার্শনিক উপন্যাস। কাহিনিটি প্রাথমিকভাবে গড়ে উঠেছে দীর্ঘ বাক্য ও পার্টিসিপেল ফ্রেইজ ও সাবঅডিনেট ক্লজ দিয়ে। সংলাপ গঠিত হয়েছে সরাসরি প্রশ্ন না করে পাস্ট পারফেক্ট টেনস দিয়ে।

অনুক অরুদপ্রাগাসাম এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি চেয়েছেন কৃষ্ণর সঙ্গে তার দাদীর আবেগমথিত সম্পর্কের স্বরূপ তুলে ধরতে।

যাই হোক, উপন্যাসের শেষে দেখা যায় দাদী-নাতির সম্পর্ক প্রাসঙ্গিক থাকলেও কৃষ্ণ আছন্ন হয়ে পড়ে রানীর বিষণ্নতায়, যিনি তার দুটি সন্তান হারিয়েছেন এমনকি আঞ্জুমের সঙ্গে সম্পর্কও তার অতীত।

উপন্যাসটি একই সঙ্গে রাজনৈতিকও, সংলাপের ভেতরে প্রকাশ পেয়েছে তামিল জনগণের উপর শ্রীলঙ্কার সরকারের অত্যাচারের বিষয়ে নিন্দা।

অনুক অরুদপ্রাগাসাম শ্রীলঙ্কার তামিল লেখক, তিনি ইংরেজি ও তামিল ভাষায় লেখেন। 

তার প্রথম উপন্যাস ‘এ স্টোরি অব এ ব্রিফ ম্যারেজ’ প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে, অনূদিত হয় ফরাসি, জার্মান, চেক, মান্দারিন, ডাচ এবং ইতালিয় ভাষায়। এই উপন্যাসটি ২০০৯ সালের গৃহযুদ্ধের চূড়ান্ত অবস্থা নিয়ে লেখা, যা দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যের জন্য লাভ করে ডিএসসি প্রাইজ এবং ডিলান টমাস পুরস্কার। এছাড়া জার্মান আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পায়। 

অরুদপ্রাগাসাম ১৯৮৮ সালে শ্রীলঙ্কার কলোম্বোর একটি তামিল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়তে ১৮ বছর বয়সে তিনি আমেরিকা গমন করেন। লেখাপড়া শেষ করে তিনি ভারতের তামিল নাড়ুতে বসবাস করছেন। এছাড়াও তিনি কলোম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেছেন।

অরুদপ্রাগাসামের প্রথম উপন্যাস ‘এ স্টোরি অব এ ব্রিফ ম্যারেজ’ ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের সময়কালে লেখেন। এতে দীনেশ ও গঙ্গার একটি দিন ও রাতের বর্ণনা করা হয়, যারা শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর উত্তর-পূর্ব উপকূলের ক্যাম্পে বোমা বর্ষণের কারণে বিয়েতে বাধ্য হয়।

অনুক এখন তার তৃতীয় উপন্যাস লিখছেন, এর কাহিনি গড়ে উঠেছে মা ও তার মেয়ের তামিল ডায়াসপোরা নিয়ে, যার কিছুটা নিউইয়র্কে ও কিছুটা টরেন্টোতে।

২০২১ বুকার প্রাইজ-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া বাকি ৫টি বই হলো : দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক ড্যামন গালগুটের ‘দ্য প্রমিজ’; যুক্তরাষ্ট্রে প্যাট্রিসিয়া লকউডের ‘নো ওয়ান ইজ টকিং অ্যাবাউট দিস’; সোমালিয়ান/যুক্তরাজ্যের নাদিফা মোহাম্মাদের ‘দ্য ফরচুন মেন’; যুক্তরাষ্ট্রের রিচার্ড পাওয়ার্সের ‘বিউইলপডারমেন্ট’ এবং ম্যাগি শিপস্টেডের ‘গ্রেড সার্কেল’ উপন্যাসটি।

আগামী ৩ নভেম্বর ‘২০২১ বুকার প্রাইজ’-এর বিজয়ীর নাম প্রকাশ করা হবে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

সেন্ট লুইস লিটারারি অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন অরুন্ধতী রায়

সেন্ট লুইস লিটারারি অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন অরুন্ধতী রায়

দোলা যে রাতে সেলিমের ফ্লাটে যায়

দোলা যে রাতে সেলিমের ফ্লাটে যায়

জব্দ করো নোবেল

জব্দ করো নোবেল

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—পাঁচসাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

কে পাচ্ছেন সাহিত্যে নোবেল?

কে পাচ্ছেন সাহিত্যে নোবেল?

সর্বশেষ

৫ গোলের ম্যাচে বেলজিয়ামকে হারিয়ে ফ্রান্স ফাইনালে

৫ গোলের ম্যাচে বেলজিয়ামকে হারিয়ে ফ্রান্স ফাইনালে

আফগানিস্তানে বিক্রি হচ্ছে অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্র

আফগানিস্তানে বিক্রি হচ্ছে অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্র

ফাইনালে খেলার আশা ছাড়ছেন না বাংলাদেশ কোচ

ফাইনালে খেলার আশা ছাড়ছেন না বাংলাদেশ কোচ

শিগগিরই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার ঘোষণা তালেবানের

শিগগিরই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার ঘোষণা তালেবানের

মধ্যরাতে ভূমিকম্পে কেঁপে উঠলো দেশ

মধ্যরাতে ভূমিকম্পে কেঁপে উঠলো দেশ

© 2021 Bangla Tribune