X
রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ৭ কার্তিক ১৪২৮

সেকশনস

মহামানবের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২০, ২২:৫৬

তোফায়েল আহমেদ ইতিহাসের মহামানব, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৫তম শাহাদতাবার্ষিকীতে সেদিনের সেই কালরাতে জাতির পিতার পরিবারের সদস্যসহ যারা ঘাতকের নির্মম বুলেটে প্রাণ হারিয়েছিলেন তাদের সকলকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি।
শোকাবহ এই দিনটি জাতীয় শোক দিবস রূপে দেশ-বিদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় ভাবগম্ভীর পরিবেশে প্রতি বছর পালিত হয়। কিন্তু এবার ‘করোনাভাইরাস’ মহামারি আকারে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশও আক্রান্ত। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সতর্কতার অংশ হিসেবে ‘জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ’ তথা ‘মুজিববর্ষ’, ‘গণহত্যা দিবস’, ‘স্বাধীনতা দিবস’, ‘বাংলা নববর্ষ’, ‘মুজিবনগর দিবস’, ‘শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস’, ‘৬ দফা দিবস’, ‘আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী’ এবং ‘শেখ কামাল ও বঙ্গমাতার জন্মদিন’ পালন উপলক্ষে গৃহীত রাষ্ট্রীয় ও দলীয় অনুষ্ঠানাদি সীমিতকরণ বা স্থগিত করা হয়েছে। আশা করি সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশাবলি সরকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন এবং দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণ দায়িত্বশীল আচরণের মধ্য দিয়ে এই ভয়াবহ দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

শোকের মাস আগস্টের ১৫ তারিখে দুনিয়ার নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু জাতির জনককে আমরা হারিয়েছি, যার জন্ম না হলে এই দেশ স্বাধীন হতো না এবং আজও আমরা পাকিস্তানের দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ থাকতাম। বছর ঘুরে এবারের শোক দিবস আমাদের জাতীয় জীবনে ফিরে এসেছে ভিন্নরূপে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ তথা ‘মুজিববর্ষ’ উপলক্ষে গৃহীত পদক্ষেপের ফলে জাতির জনকের জীবন ও কর্মের গবেষণালব্ধ বহুবিধ দিক উন্মোচিত হওয়ায় তিনি আজ স্বমহিমায় প্রকাশিত। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর থেকে ‘৯৬-এর আগে পর্যন্ত স্বৈরশাসকেরা দেশে সর্বব্যাপী ভয়ের সংস্কৃতি বলবৎ করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ রুদ্ধ করেছিল। সেসব অন্যায় ইতিহাসের সত্যের স্রোতে ভেসে গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে ‘আওয়ামী লীগ’, ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘বাংলাদেশ’ যে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত ও সমার্থক, আজ তা সকলের কাছে সুস্পষ্ট। বঙ্গবন্ধু রচিত দু’টি গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’

জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল। অমূল্য এই গ্রন্থদ্বয় প্রকাশ করায় বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট আমরা কৃতজ্ঞ। ইতিহাসের অনেক অজানা কথা এই বই দুটো থেকে আমরা জানতে পেরেছি।

বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছি, এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয় নাই। একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদেরই হতে হবে।’ সেই লক্ষ্য সামনে নিয়ে ’৪৮-এর ৪ জানুয়ারি প্রথমে ছাত্রলীগ, পরে ’৪৯-এর ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। ’৪৮ ও ’৫২-এর মহান ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট, ’৫৬-এর শাসনতন্ত্র, ’৬২-এর শিক্ষা ও ’৬৪-তে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করেন। ’৬৬-তে স্বায়ত্তশাসন-স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় বাঙালির মুক্তিসনদ ৬ দফা দাবির ভিত্তিতে দেশব্যাপী তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলেন। যা পরবর্তীতে ১১ দফা দাবির ভিত্তিতে ’৬৯-এ দেশব্যাপী প্রবল গণআন্দোলন-গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করে সংগ্রামী ছাত্র-জনতা জাতির জনককে ফাঁসির মঞ্চ থেকে মুক্ত করে এবং কোটি মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন। এভাবেই  মহান জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে ‘৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ভূমিধস বিজয় অর্জন করে বিশ্ববাসীর নিকট প্রমাণ করেন তিনিই বাঙালির একমাত্র বৈধ রাজনৈতিক নেতা। নির্বাচনের পর সামরিক শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে টালবাহানা শুরু করলে সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগ দলীয় জনপ্রতিনিধিদের আসন্ন সংগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি পর্ব শুরু করেন। এর অংশ হিসেবে ’৭১-এর ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে ১০ লক্ষাধিক লোকের সামনে জনপ্রতিনিধিদের শপথ অনুষ্ঠান; ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে পার্লামেন্টারি পার্টি গঠন ও ২১ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে শহীদ মিনারের পবিত্র বেদিতে দাঁড়িয়ে জনসাধারণকে ষড়যন্ত্র মোকাবিলা ও আসন্ন সংগ্রামের প্রস্তুতির নির্দেশনা প্রদান করেন। ৩ মার্চ আহূত জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে ১ মার্চ হোটেল পূর্বাণীতে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন প্রশ্নে যখন আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির সভা চলছিল, তখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের আকস্মিক বেতার ভাষণে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন একতরফা স্থগিত ঘোষণা করলে বঙ্গবন্ধু সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা করেন। আসে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। যেদিন তিনি ভুবনবিখ্যাত ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। যে ভাষণ আজ বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে আসীন। এরপর থেকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ পরিচালিত হতে থাকে এবং নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করে জাতীয় মুক্তির মোহনায় দাঁড় করান। ২৫ মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নীলনকশা অনুযায়ী পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করলে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করে বলেন, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।’ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে হাতিয়ার তুলে নিয়ে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর আমরা মহত্তর বিজয় অর্জন করি এবং ’৭২-এর ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বিজয়ী বীরের বেশে বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। লন্ডন হয়ে দেশে ফেরার প্রাক্কালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিদেশি সাংবাদিকরা তাঁকে প্রশ্নে করেছিল, ‘আপনার দেশ তো ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।’ উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার দেশের মানুষ যদি থাকে, মাটি যদি থাকে, তাহলে এই ধ্বংসস্তূপ থেকেই একদিন সুজলা, সুফলা, শস্যশ্যামলা সোনার বাংলা গড়ে উঠবে।’ দুটি লক্ষ্য নিয়ে তিনি রাজনীতি করেছেন।

এক, বাংলাদেশের স্বাধীনতা। দুই, বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা।

গর্ব করে বলতেন, ‘আমার বাংলা হবে রূপসী বাংলা, আমার বাংলাদেশ হবে সোনার বাংলা, আমার বাংলাদেশ হবে প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড।’ আজ তিনি টুঙ্গিপাড়ার কবরে শায়িত। আর কোনোদিন তিনি আসবেন না। সেই দরদী কণ্ঠে বাঙালি জাতিকে ডাকবেন না ‘ভায়েরা আমার’ বলে।

আমি বঙ্গবন্ধুর কাছে ছিলাম। সবসময় বলি আমি ভাগ্যবান মানুষ। যে নেতার জন্ম না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না, সেরকম একজন মহান নেতার সান্নিধ্য, ভালোবাসা, স্নেহ, আদর পাওয়া, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম পাওয়া। মনে পড়ে, ’৭০-এ বরিশাল-পটুয়াখালী-ভোলা অঞ্চলে নির্বাচনি সফরের কথা। ২৪ ফেব্রুয়ারি ছিল ভোলায় নির্বাচনি জনসভা। এদিন ভোলার ইতিহাসে সর্ববৃহৎ গণসমাবেশে বঙ্গবন্ধু আমাকে আমি যা না, তার চেয়ে অনেক বড় করে তুলে ধরে বক্তৃতা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু নেতাকর্মীদের এভাবে সম্বোধন করতেন। তিনি ছোটকে বড় করে তুলতেন। যেসব জায়গায় সফর করতেন, সেখানকার নেতাকর্মীদের গুণবাচক বিশেষণ ঊর্ধ্বে তুলে ধরতেন। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতাকে থানা, থানা আওয়ামী লীগের নেতাকে জেলা এবং জেলা আওয়ামী লীগের নেতাকে জাতীয় নেতায় রূপান্তরিত করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হয়েছেন। সহজেই পরকে আপন করেছেন। যারা বিরোধী ছিলেন, ভুবন-ভোলানো আচরণে তাদের কাছে টেনেছেন। যখন বলতেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না’, মানুষ তাই বিশ্বাস করতো। ক্ষমতার জন্য, ক্ষমতায় থাকার জন্য, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য রাজনীতি করেননি। প্রিয় মাতৃভূমিকে শোষণ-বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা করে, বাঙালিরা যাতে বাংলাদেশের ভাগ্যনিয়ন্তা হতে পারে সেজন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতেই তিনি রাজনীতি করেছেন। সারা জীবন জেল-জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন। জীবনের-যৌবনের ১২টি বছর কারান্তরালে কাটিয়েছেন। কোনোদিন মাথানত করেননি। মনে পড়ে ’৭১-এর রক্তঝরা মার্চের ১৭ তারিখের কথা। সেদিন ছিল বঙ্গবন্ধুর ৫২তম জন্মদিন। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনা শেষে দুপুরে ধানমন্ডির বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘরোয়া আলোচনাকালে একজন সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেন, ‘আপনার ৫২তম জন্মদিনে আপনার সবচাইতে বড় ও পবিত্র কামনা কী?’ উত্তরে বঞ্চিত বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা স্বভাবসিদ্ধ কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘জনগণের সার্বিক মুক্তি।‘ এরপর সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপনকালে তিনি ব্যথাভরাতুর কণ্ঠে বেদনার্ত স্বরে বলেছিলেন, ‘আমি জন্মদিন পালন করি না, আমার জন্মদিনে মোমের বাতি জ্বালি না, কেকও কাটি না। এ দেশে মানুষের নিরাপত্তা নাই। আপনারা আমাদের জনগণের অবস্থা জানেন। অন্যের খেয়ালে যেকোনও মুহূর্তে তাদের মৃত্যু হতে পারে। আমি জনগণেরই একজন, আমার জন্মদিনই কি, আর মৃত্যুদিনই কি? আমার জনগণের জন্য আমার জীবন ও মৃত্যু।’ স্বাধীনতার পর বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘And when you see them digging a grave and you think of everything you will have to leave behind you, do you think of your country or, for instance, of your wife and children first?’ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘I Feel for my country and my people and then my family. I love my people more. I suffered for my people and you have seen how my people love me’. সাগর-মহাসাগরের গভীরতা পরিমাপ করা যায়, কিন্তু দেশের মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসা অপরিমেয়।

দেশ স্বাধীনের পর শূন্য হাতে যাত্রা শুরু করেন। গোলাঘরে চাল নেই, ব্যাংকে টাকা নেই, বৈদেশিক মুদ্রা নেই। রাস্তা-ঘাট-পুল-কালভার্ট, রেল, প্লেন, স্টিমার কিছুই নেই। যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত। কিন্তু অতি তাড়াতাড়ি তিনি যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করেন। ভৈরব ব্রিজ, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ যেগুলো ধ্বংস করেছিল সেগুলো পুনর্নির্মাণ করেন। বঙ্গবন্ধুর একক প্রচেষ্টায় ভারতীয় সেনাবাহিনী ’৭২-এর ১২ মার্চ বাংলাদেশ ত্যাগ করে। ’৭২-এর ৭-৮ এপ্রিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের বর্ণাঢ্য কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু পুনরায় সভাপতি ও জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ’৭২-এর ৪ নভেম্বর মাত্র ৭ মাসে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান প্রণয়ন করেন। জাতীয় সংসদের সফল নির্বাচন করে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেন। আজ যে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপিত হয়েছে, তারও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন ’৭৫-এ বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে। সেদিন আমি বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী ছিলাম। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন দু’ভাগে। প্রথম ভাগে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন এবং দ্বিতীয় ভাগে আর্থসামাজিক উন্নয়ন। ’৭৪-’৭৫-এ বোরো মৌসুমে ২২ লাখ ৪৯ হাজার টন চাল উৎপাদিত হয়, যা ’৭৩-’৭৪-এর চেয়ে ২৯ হাজার টন বেশি। বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ডিসেম্বরে ঘোষণা দেবেন দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। যে মুহূর্তে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে স্বাভাবিক করলেন, অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি দিলেন, ঠিক তখনই ঘাতকের নির্মম বুলেটে একাত্তরের পরাজিত শক্তি, বাংলার মীরজাফর বেইমানরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। ওই সময় তাঁর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রবাসে থাকায় ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পান।

বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বাংলাদেশ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের স্বীকৃতি লাভ করে। বিশ্বসভায় বঙ্গবন্ধু শ্রদ্ধার আসনে সমাসীন হন। সে সময় বাংলাদেশ যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে তন্মধ্যে অন্যতম-‘কমনওয়েলথ অব নেশনস’, ‘জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন’, ‘ইসলামিক সম্মেলন সংস্থা’ ও ‘জাতিসংঘ’। এই ৪টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সম্মেলন ও অধিবেশনগুলোতে বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। প্রতিটি সম্মেলন ও অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু ছিলেন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ’৭২-এর ৬ ফেব্রুয়ারি ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রথম বিদেশ সফর। মুক্তিযুদ্ধের পরমমিত্র প্রতিবেশী ভারতের কলকাতা মহানগরীর ব্রিগেড ময়দানে ২০ লক্ষাধিক মানুষের গণমহাসমুদ্রে তিনি বক্তৃতা করেছিলেন। কলকাতার মানুষ সেদিন বাড়িঘর ছেড়ে জনসভায় ছুটে এসেছিল। সভাশেষে রাজভবনে যখন দ্বিপাক্ষিক আলোচনা হয়, তখন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার জন্মদিন ১৭ মার্চ। আপনি সেদিন বাংলাদেশ সফরে আসবেন। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার সফরের আগেই আমি চাই আপনার সেনাবাহিনী বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেবেন। শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী সম্মতি জানিয়েছিলেন। একই বছরের ১ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের আরেক মিত্রদেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের সার্বিক সমর্থন জুগিয়েছিল। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে ‘ভেটো’ ক্ষমতা প্রয়োগ করেছিল। সেদিন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই কোসিগিন বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন এবং ক্রেমলিনে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নি, সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল লিওনিদ ইলিচ ব্রেজনেভ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী আন্দ্রে গ্রোমিকো বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। এটি ছিল এক বিরল ঘটনা। ’৭৩-এর ৩ আগস্ট কানাডার রাজধানী অটোয়ায় ৩২টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় কমনওয়েলথ সম্মেলন। সকল নেতার মাঝে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেদিনের সেই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডো। বঙ্গবন্ধু সেদিন বক্তৃতায় বৃহৎ শক্তিবর্গের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘হোয়েন এলিফ্যান্ট প্লেস গ্রাস সাফারস।’ তাঁর এই বক্তৃতা উপস্থিত সকলকে মুগ্ধ করেছিল। সেই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডোয়ার্ড হিথ, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী এডোয়ার্ড হুইটলাম, তাঞ্জানিয়ার প্রেসিডেন্ট জুলিয়াস নায়ারে, জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট কেনেথ কাউন্ডা, কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট জোমো কেনিয়াত্তা, সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান, শ্রীলঙ্কার শ্রীমাভো বন্দরনায়েকেসহ বিশ্বের বরেণ্য সব নেতৃবৃন্দ। ’৭৩-এর ৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে আলজেরিয়ার মঞ্চে দাঁড়িয়েই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছিলেন, ‘বিশ্ব আজ দু’ভাগে বিভক্ত। শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ ’৭৪-এর ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের পরদিন তিনি ইসলামিক সম্মেলনে যান। লাহোর বিমানবন্দরে পাকিস্তানের  রাষ্ট্রপতি চৌধুরী ফজলে এলাহী ও প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। সেদিন দেখেছি, যে দেশ মুক্তিযুদ্ধে আমার দেশের নিরীহ-নিরপরাধ মানুষের ওপর গণহত্যা চালিয়ে ৩০ লক্ষাধিক মানুষ হত্যা করেছে, সেই দেশের মানুষ রাস্তার দুইপাশে দাঁড়িয়ে স্লোগান তুলেছে ‘জিয়ে মুজিব জিয়ে মুজিব’, অর্থাৎ মুজিব জিন্দাবাদ মুজিব জিন্দাবাদ বলে। লাহোরে এই সম্মেলনের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। এমনকি যতক্ষণ তিনি লাহোরে না পৌঁছেছেন, ততক্ষণ সম্মেলন শুরু হয়নি। বঙ্গবন্ধুর জন্য সম্মেলন একদিন স্থগিত ছিল। সালিমার গার্ডেনে যখন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়, সেখানেও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। বঙ্গবন্ধু এমন আত্মমর্যাদাবান নেতা ছিলেন যে, সেদিন সৌদি বাদশাহের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে বলেছিলেন, ‘ইউর ম্যাজেস্ট্রি, আপনি আমাকে স্বীকৃতি না দিয়েও আমার দেশের মানুষকে হজব্রত পালনের সুযোগ দিয়েছেন বলে আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ।’ যুগোস্লাভিয়ায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়েছিলাম। যুগোস্লাভিয়ার রাষ্ট্রনায়ক মার্শাল টিটো ও প্রধানমন্ত্রী জামান বিয়েদিস বিমানবন্দরে তাঁকে বীরোচিত অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। সেই দৃশ্য আজও আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। জাপান সফরে দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কাকুই তানাকা বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন। সম্রাটের প্রাসাদে সম্রাট হিরোহিতো বঙ্গবন্ধুকে বিশেষ সম্মানের সাথে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। মিসরের রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাত বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানান। বিশেষভাবে মনে পড়ে, ’৭৪-এর ২৫ সেপ্টেম্বর যেদিন জাতির জনক জাতিসংঘে মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অনন্য ও মহত্তর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ করা হয়েছিল ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ইংরেজিতে বক্তৃতা করবেন।’ কিন্তু বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করতে চাই।’ যখন বক্তৃতা প্রদানের জন্য বঙ্গবন্ধুর নাম ঘোষিত হয়, তখন বিশ্বনেতৃবৃন্দের মুহুর্মুহু করতালিতে চারদিক মুখরিত হয়ে ওঠে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে চতুর্দিকে তাকিয়ে পরিষদে সমাগত বিশ্বনেতৃবৃন্দকে বিনম্র সম্বোধন জ্ঞাপন করে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সর্বোচ্চ সংস্থা জাতিসংঘকে ‘মানব জাতির মহান পার্লামেন্ট’ উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তৃতা শুরু করেন। জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুই প্রথম রাষ্ট্রনায়ক যিনি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করেন। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘শান্তি ও ন্যায়ের জন্য পৃথিবীর সকল মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার বিমূর্ত হয়ে উঠবে এমন এক নয়া বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশ আজ পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ। জাতিসংঘের সনদে যেসব মহান আদর্শ উৎকীর্ণ রয়েছে তারই জন্যে আমাদের দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ চরম ত্যাগ স্বীকার করেছে।’ পিনপতন নিস্তব্ধতার মধ্যে বঙ্গবন্ধু ৪৫ মিনিট বক্তৃতা করেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিশ্বনেতৃবৃন্দের ছিল গভীর শ্রদ্ধা। আন্তর্জাতিক রাজনীতির হিমালয়সম উচ্চতায় আসীন ছিলেন তিনি। অধিবেশনে আগত বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি দলের সদস্যবৃন্দ আমাদের কাছে এসে বলেছিলেন, ‘সত্যিই তোমরা গর্বিত জাতি। তোমরা এমন এক নেতার জন্ম দিয়েছো, যিনি শুধু বাংলাদেশের নেতা নন, এশিয়ার নেতা নন, তিনি সমগ্র বিশ্বের নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা।’ আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে কিউবার রাষ্ট্রনায়ক ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি।’ বঙ্গবন্ধুর মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ বিশ্বে বিরল। যেখানেই গিয়েছেন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয় ’৭৫-এর ১৪ আগস্ট। প্রতিদিনের মতো সকালবেলা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর যাই, সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গণভবনে যাই। দিনের কাজ শেষে দুপুরবেলা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একই টেবিলে বসে একসাথে খেয়েছি। বাসা থেকে বঙ্গবন্ধুর খাবার যেত। পরম শ্রদ্ধেয়া বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, যিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর জীবনসঙ্গী। সুখে-দুখে, আপদে-বিপদে যিনি বঙ্গবন্ধুকে যত্ন করে রাখতেন। নিজ হাতে রান্না করে বঙ্গবন্ধুকে খাওয়াতেন। খাবার শেষে বঙ্গবন্ধু বিশ্রাম নিলেন। এরপর গণভবনে নিজ কক্ষে বসলেন। বঙ্গবন্ধু প্রায় প্রতিদিন বিকেলে মন্ত্রিসভার সহকর্মীদের সঙ্গে দৈনন্দিন রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করতেন। একসাথে চা পান করতেন। এরপর রাত ৯টায় স্বীয় বাসভবনে ফিরতেন। বঙ্গবন্ধুকে পৌঁছে দিয়ে আমি বাসায় ফিরতাম। যেতামও একসাথে ফিরতামও একসাথে। সেদিন বঙ্গবন্ধু আমাকে কাছে ডেকে বলেছিলেন, ‘কাল সকালে আমার বাসায় আসবি। আমার সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবি।’ আমার আর প্রিয় নেতার সঙ্গে প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাওয়া হয়নি।

লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বঙ্গবন্ধুর চেতনা চলার পথের প্রেরণা

বঙ্গবন্ধুর চেতনা চলার পথের প্রেরণা

বঙ্গমাতার জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

বঙ্গমাতার জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

নির্লোভ নিরহংকারী প্রতিভাবান শেখ কামাল

নির্লোভ নিরহংকারী প্রতিভাবান শেখ কামাল

আমার জীবনে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ

আমার জীবনে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ

ভাইরাল লেগ স্পিনার এবং দু’চার কথা

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২১, ১৬:৩৪

জনি হক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, টুইটার ও ইনস্টাগ্রামে ভারতের ক্রিকেট গ্রেট শচীন টেন্ডুলকারের একটি পোস্ট বেশ কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চলছে বলেই যে আগ্রহটা তৈরি হয়েছে তা নয়। গত ১৪ অক্টোবর তার শেয়ার করা একটি ভিডিও ক্লিপে রয়েছে বাংলাদেশি ক্ষুদে বালকের ক্রিকেট প্রতিভা। সেজন্যই এ নিয়ে এত আলোচনা। এটি এক বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। সেই ভিডিওতে সবাই দেখেছে বরিশালের ক্ষুদে লেগ স্পিনারের বোলিংয়ে সতীর্থদের অসহায়ত্ব। কখনও গুগলিতে, কখনও ফ্লিপারে বা লেগ স্পিনের মায়াজালে কুপোকাত করেছে সে। ক্রিকেটের প্রতি ছোট্ট ছেলেটির আবেগ ও ভালোবাসায় মুগ্ধ ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার।

অনেকে ভেবেছিলেন, শচীনের শেয়ার করা ভিডিওতে বল হাতে কারিকুরি দেখানো ক্ষুদে ক্রিকেটার ভারতেরই কেউ হবে! ভারতীয় নেটিজেনদের অনেকে তো এই দক্ষতা দেখে বিস্মিত। শচীনের পোস্টটির মন্তব্যের ঘরে আফগানিস্তানের তারকা লেগ স্পিনার রশিদ খান প্রশংসা করেছেন বাংলাদেশি ছেলেটির।কিংবদন্তি লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্ন মুগ্ধ হয়ে নিজের টুইটার অ্যাকাউন্টে একই ভিডিও শেয়ার করেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, ক্ষুদে বালকটি কে?

ছেলেটির নাম আসাদুজ্জামান সাদিদ। ক্ষুদে এই লেগ স্পিনারের বয়স এখন ৬ বছর। এটুকু বয়সেই লেগ স্পিন ও গুগলিতে অসামান্য পারদর্শিতা তার। ভাগ্নের বোলিং নৈপুণ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট করেন মামা। এরপর দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভিডিওটি শচীনের হাতে যাওয়ার পর ভাইরাল ক্ষুদে লেগি। এখন অস্ট্রেলিয়া অবধি তার দক্ষতার তারিফ চলছে।

শচীন টেন্ডুলকার কিংবা শেন ওয়ার্নের পোস্ট থেকে আমরা আসলে কী বার্তা পেলাম? ভারতে কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় এমন প্রতিভা তাদের চোখে পড়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। তবুও দুই কিংবদন্তির কাছে ভিডিওটি আলাদা মনে হলো কেন? কারণ বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে এমন প্রতিভা ছড়িয়ে থাকার পরও জাতীয় দলে লেগ স্পিনার সংকট কাটেনি। দু’জনই যেন লেগ স্পিনার অন্বেষণে আমাদের ব্যর্থতা বা সদিচ্ছার অভাবকে চিমটি কেটে ধরিয়ে দিলেন! ভিডিওটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো- লেগ স্পিনের প্রতিভা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকার পরও আমরা নিজেরাই নিজেদের দরিদ্র করে রেখেছি।

অথচ টি-টোয়েন্টিতে এখন জিততে হলে লেগ স্পিনারের বিকল্প যেন নেই। ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত ফরম্যাট শাসন করছেন এই কব্জির মোচড় ঘোরানো বোলাররা। যেকোনও দলের অধিনায়কের কাছে সবচেয়ে কার্যকরি হাতিয়ার লেগিরা। তারা রান আটকান, উইকেটও এনে দেন। তাই ক্রিকেট বিশ্বে চলছে ব্যাটারদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরানো লেগ স্পিনারদের দাপট। এক্ষেত্রে অস্বাভাবিক ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। এ কারণেই হয়তো মাঠে প্রতিপক্ষের লেগ স্পিন জাদুতে ভড়কে যায় টাইগাররা।

টি-টোয়েন্টিতে সত্যিই বাংলাদেশ দলের ব্যাটাররা থাকেন বাড়তি চিন্তায়। বাংলাদেশে ভালো মানের লেগ স্পিনার নেই বলেই হয়তো ক্রিকেটাররা এই শিল্পকে অতো ভালো সামলাতে পারেন না। ঘরোয়া লিগে লেগ স্পিনার বিরল। জাতীয় ক্রিকেটে নিয়মিত লেগিদের মুখোমুখি না হওয়ার কারণে অন্য দলের লেগ স্পিনারের সামনে নাকানি-চুবানি খেতে হয় টাইগারদের।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশকে কম-বেশি বিশ্বের সব লেগ স্পিনারই ভুগিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ঘূর্ণিবলের গোলকধাঁধায় পড়ে ব্যাটারদের খাবি খেতে দেখা যায় হরহামেশা। কব্জির মোচড়ে বল ঘোরানো ক্রিকেটারদের কাছে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসেন টাইগাররা। এই তো সেদিন বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে স্কটল্যান্ডের কাছে ৬ রানের হতাশাজনক হারের অন্যতম কারণ লেগ স্পিনে ধরাশায়ী হওয়া। স্কটিশ লেগ স্পিনার ক্রিস গ্রিভস তার ঘূর্ণিতে সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিমকে প্যাভিলিয়নে পাঠিয়ে জয়টা নিশ্চিত করে ফেলেন।

বড় দলের কথা পরে বলি, স্কটল্যান্ডের মতো ছোট দলগুলোতেও কমপক্ষে একজন করে লেগ স্পিনার আছে যাদের বোলিংয়ের টার্ন দেখে মাথা ঘোরায়! বলা চলে লেগিরাই তাদের তুরুপের তাস। আরেক ছোট দল নেপালের লেগ স্পিনার সন্দীপ লামিচান চলতি মাসে আইসিসির ‘প্লেয়ার অব দ্য মান্থ’ নির্বাচিত হয়েছেন। আইপিএলে তিন বছর ধরে দল পান তিনি। আইপিএলে সব দলই কব্জির মোচড় ঘোরানো লেগিদের দলে ভেড়াতে চায়। সেখানে তাদের চাহিদা বেশ রমরমা। টি-টোয়েন্টি অলরাউন্ডার র‌্যাংকিংয়ে ছোট দলের তিনজন লেগ স্পিনার আছেন। ওমানের খাওয়ার আলি ৪ নম্বরে, আয়ারল্যান্ডের গারেথ ডেলানি ১২ নম্বরে এবং পাপুয়া নিউগিনির চার্লস আমিনির অবস্থান এখন ১৯ নম্বরে।

আগেই বলেছি, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে এখন লেগি বোলাররা সাফল্য পাচ্ছেন বেশি। লেগ স্পিনে বাইশ গজ কাঁপাচ্ছেন তারাই। টি-টোয়েন্টি বোলার র‌্যাংকিংয়ের দিকে চোখ রাখলেই তা বোঝা যায়। ২ থেকে ৪ নম্বরে থাকা সবাই লেগ স্পিনার। দুই নম্বরে শ্রীলঙ্কার ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা ডি সিলভা, তিনে আফগানিস্তানের রশিদ খান এবং চার নম্বরে আছে ইংল্যান্ডের আদিল রশিদের নাম। সাত নম্বরে আছেন আরেক লেগ স্পিনার অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডাম জাম্পা। শীর্ষে থাকা তাব্রেইজ শামসি বাঁ-হাতি রিস্ট স্পিনার, সেক্ষেত্রে তিনিও একঅর্থে লেগ স্পিনারই! আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তারা সবাই নিজ নিজ দলের মূল স্কোয়াডের সদস্য। অন্য দলগুলোর মূল স্কোয়াডে কমপক্ষে একজন দক্ষ লেগি আছে।

টি-টোয়েন্টি র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ দল ইংল্যান্ড দিয়ে শুরু করি। গত একবছরে দলটির হয়ে সবচেয়ে বেশি (১৬) উইকেট নিয়েছেন আদিল রশিদ। তাদের মারকুটে দুই ব্যাটার ডেভিড মালান ও লিয়াম লিভিংস্টোন লেগ স্পিনার হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারেন। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টি-টোয়েন্টিতে গত একবছরে সবচেয়ে বেশি (১৭) উইকেট নিয়েছেন অ্যাডাম জাম্পা। অজিদের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে আছেন আরেক স্বীকৃত লেগ স্পিনার মিচেল সোয়েপসন। এছাড়া দলটির অন্যতম দুই ব্যাটার ডেভিড ওয়ার্নার ও স্টিভেন স্মিথ গুগলি দিতে পারেন ভালো। দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটার রাসি ভ্যান ডার ডুসেন লেগব্রেক করতে পারেন।

অন্য দলগুলোর মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হেডেন ওয়ালশ (গত একবছরে দেশের হয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী), পাকিস্তানের সহ-অধিনায়ক শাদাব খান, নিউজিল্যান্ডের ইশ সোধি (গত একবছরে দেশের হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০ উইকেট) ও টড অ্যাসেল আছেন লেগি হিসেবে। পাকিস্তানের হয়ে গত একবছরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০ উইকেট শিকারী উসমান কাদির আছেন রিজার্ভ। ভারতের মূল স্কোয়াডের দুই সদস্য রাহুল চাহার ও বরুণ চক্রবর্তী কার্যকরি দুই লেগ স্পিনার। দলটির স্ট্যান্ডবাই তালিকায় অন্যতম আরেক লেগি যুজবেন্দ্র চাহাল।

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে রিজার্ভ হিসেবে একজন স্বীকৃত লেগ স্পিনার (আমিনুল ইসলাম বিপ্লব) ছিলেন। কিন্তু তাকে ওমান নিয়ে যাওয়ার কয়েকদিন পর ফেরত নিয়ে এসেছে বিসিবি। এ কারণে কর্তাব্যক্তিরা সমালোচিত হয়েছেন। অথচ তিনি দলের সঙ্গে থাকলে ব্যাটাররা অনুশীলনে সুবিধাই পেতেন। লেগ স্পিনারদের আলোয় নিয়ে আসতে জাতীয় ক্রিকেট লিগের ম্যাচে ও বিপিএলে প্রতি দলের একাদশে একজন করে লেগ স্পিনার রাখার নিয়ম বাধ্যতামূলক রেখেছে বিসিবি। বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাই বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে লেগ স্পিনার রাখেনি! তাহলে কি সব নিয়ম-কানুন লোক দেখানো? লেগ স্পিনারদের জন্য আত্মবিশ্বাস খুব দরকারি। টানা ম্যাচ খেলার সুযোগ না পেলে তাদের আত্মবিশ্বাস আসবে কোত্থেকে? বিসিবি সেটা কতটা নিশ্চিত করতে পারে?

প্রায় সব দেশে যখন ভালো মানের লেগিদের জয়জয়কার, সেখানে বাংলাদেশের শূন্য। জাতীয় ক্রিকেট দলে লেগ স্পিন বহু বছর ধরেই সবচেয়ে আক্ষেপের নাম। আমাদের দেশে ঠিক কতজন লেগ স্পিনার ছিলেন তা বের করতে গলদঘর্ম হয়ে যেতে হয়। বাইনোকুলার দিয়ে খোঁজার পর টেনেটুনে কয়েকটা নাম হয়তো বলা যাবে। হাতেগোনা সেই কয়েকজন হারিকেনের মতো মৃদু আলো ছড়ালেও সেই অর্থে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের জাত চেনাতে পারেননি। তাদের মধ্যে অন্যতম অলক কাপালি। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম হ্যাটট্রিক এই লেগ স্পিনারের। তার পাশাপাশি মোহাম্মদ আশরাফুল মাঝে মধ্যে ভেলকি দেখাতেন। কেউ কেউ কালেভদ্রে দলে জায়গা পেলেও আসন পাকা হয়নি। যেমন লেগ স্পিনার জুবায়ের হোসেন লিখন। অল্প বয়সে ২০১৪-২০১৫ সালে ছয়টি টেস্ট, তিনটি ওয়ানডে ও একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পান তিনি। এরপর আর জায়গাটা ধরে রাখতে পারেননি। সম্প্রতি রিশাদ হোসেন ও মিনহাজুল আবেদিন আফ্রিদি লেগ স্পিন করেন বলেই কিছুটা আলোচনায় এসেছেন। কিন্তু লেগ স্পিনারের সংকট আদৌ দূর হবে কিনা সংশয় থেকেই যায়।

দেশে লেগ স্পিনারের অভাব যায়নি বলেই লেগি পাওয়া যায় না! ভালো আইডল না থাকায় উঠতি খেলোয়াড়রা অনুপ্রেরণা খুঁজে পাবে কীভাবে। কাকে সামনে রেখে এগোবে তারা? কব্জির মোচড়ে ভেলকি দেখানো লেগ স্পিনারের তালিকায় কেউই যে নেই! লেগ স্পিনারদের বরাবরই বেশ পরিকল্পনামাফিক বল করতে হয়। সেই অনুশীলন হয় জাতীয় ক্রিকেট ম্যাচে। লেগ স্পিনের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করা ঘরোয়া লিগের ক্লাবগুলো কব্জি ঘোরানো বোলারদের গুরুত্ব দেয় না। খেলার সুযোগ না পেলে তারা হাত পাকাবেন কোথায়? একজন লেগ স্পিনার বছরের পর বছর অনুশীলনের মাধ্যমে পরিপক্কতা পায়। অনেক ছোট বয়স থেকেই এই শিল্পের চর্চা করলে সুফল আসে বেশি। আসাদুজ্জামান সাদিদের মতো ক্ষুদে ক্রিকেটারদের আরও ভালো বোলার হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা প্রদানে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বিসিবির। শচীন ও ওয়ার্নের শেয়ার করা ভিডিওটি বুঝিয়ে দিয়েছে, মানসম্পন্ন লেগ স্পিনার পেতে হলে তৃণমূল পর্যায় থেকে খুঁজতে হবে। আসাদুজ্জামান সাদিদের মতো আরও অনেকে নিশ্চয়ই আছে যাদের কথা আমরা এখনও হয়তো জানি না।

বিসিবিকে এ নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে হবে। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে শুধুই লেগ স্পিন নিয়ে কাজ করবেন এমন কিছু কোচ নিয়োগ দেওয়া যায়। জাতীয় একাডেমির ছায়াতলে স্বনামধন্য কোচের মাধ্যমে অনুশীলন করানো যেতে পারে এই বোলারদের। চোখে পড়ার মতো লেগ স্পিনার পেলে তাকে ঘরোয়া লিগে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার দায়িত্ব কাঁধে নিতে হবে বোর্ডকেই। লেগ স্পিনারের জন্য বাংলাদেশের হাহাকার ঘুচিয়ে ফেলতে বিসিবিকে আরও মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। আমাদের সাবেক ক্রিকেটাররাও পরামর্শ দিতে পারেন। অন্য দেশের ক্রিকেটারদের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সঠিক মানুষের সহায়তা পেলে এই ক্ষুদে বালকরা আগামীতে উদ্ভাসিত হয়ে রাঙিয়ে দেবে দেশের ক্রিকেট। 

শুধু টি-টোয়েন্টিই নয়; ক্রিকেটের অন্য ফরম্যাটেও লেগ স্পিনের কার্যকারিতা শেন ওয়ার্ন, অনিল কুম্বলে, মুশতাক আহমেদ, শহিদ আফ্রিদিরা দেখিয়ে গেছেন। তাদের মুগ্ধকর বোলিংয়ে লেগ স্পিন পেয়ে এসেছে শিল্পের মর্যাদা। লেগ স্পিন সত্যিই একটি শিল্প। কিন্তু বাংলাদেশে এই শিল্প কবে প্রাণ পাবে কে জানে! ক্রিকেটের এই সৌন্দর্য বাংলাদেশিদের হাতে দেখতে তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে থাকতে হবে আর কতদিন? এ নিয়ে কেবলই যে দীর্ঘশ্বাস বাড়ে।

 

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/

সম্পর্কিত

বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার

বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার

সাম্প্রদায়িকতা ও মনোজগৎ

সাম্প্রদায়িকতা ও মনোজগৎ

ধর্মীয় উগ্রবাদ ঠেকাতে ফিরতে হবে ৭২-এর সংবিধানে

ধর্মীয় উগ্রবাদ ঠেকাতে ফিরতে হবে ৭২-এর সংবিধানে

দায় ও ব্যর্থতা কার?

দায় ও ব্যর্থতা কার?

বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২১, ১৫:৫৮

তুষার আবদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) দুলে উঠেছে। সেই দুলুনি দূরে থেকেও অনুভূত হয়েছে। যে গানের দল সুর তৈরি করেছে, কণ্ঠ ছেড়েছে জোরে, তারা আমার চেনা। টেলিভিশনে তাদের সঙ্গে ঢাকার কাছে এক কাশবনে আড্ডা হয়েছিল। তখন আকাশে ছিল শরতের মেঘ। আড্ডা দিয়েছি মেঘদলের সঙ্গে। গতকাল শুক্রবার সেই মেঘদলই টিএসসি এলাকায় সুরের মূর্ছনা ছড়িয়েছিল। আওয়াজ ছিল প্রতিবাদের। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের। প্রতিবাদের এই ভাষা আমার পছন্দের। আমি বিশ্বাস করি- মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাজিত ও নির্মূল করতে সাংস্কৃতিক অস্ত্রই উপযুক্ত। এই অস্ত্র প্রতিরোধ ও মোকাবিলার শক্তি তাদের নেই।

যে টিএসসিতে গানে গানে শুক্রবার প্রতিবাদ জানানো হলো, সেই টিএসসি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম তীর্থভূমি। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ রাষ্ট্রের যেকোনও বিপন্নতা ও দুর্যোগে এখান থেকে নবীন-প্রবীণের সম্মিলনে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছে। সেই প্রতিরোধ কোনও অপশক্তি কখনও ডিঙাতে পারেনি।

আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চা ও আন্দোলনে জোয়ার প্রবাহমান থাকেনি। রাজধানীতে চিন্তক শ্রেণি, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও কর্মীরা রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত হয়ে আছে। তাদের কাছে একাত্তর ও বাংলাদেশের চেয়ে ব্যক্তিগত লাভ-লোকসান মিটিয়ে নেওয়াটাই যেন জরুরি বিষয় এখন। পদ-পদবি আর তারকা ইমেজের একটা ঘোরের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে সবাই।

সাংস্কৃতিক চর্চার ভাটাকালকে অপচয় করতে চায়নি মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। তারা সমাজ, পরিবার ও রাজনীতিতে চিন্তার মেরুকরণ ঘটিয়ে ফেলে। আমাদের জীবনযাপন, শিক্ষায় ধর্মীয় অন্ধত্ব, কট্টর লু’হাওয়া বইয়ে দিতে শুরু করে, যা সমাজ ও রাজনীতিকে অসহিষ্ণু করে তোলে। আমরা ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের দুই নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের সঙ্গে ২০০১ পরবর্তী বাংলাদেশের মিল খুঁজে পাবো না। এ সময়টায় ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহারে মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির বদলে একটি পরগাছা সংস্কৃতিতে নিজেদের জড়িয়ে ফেলতে শুরু করি। দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো- রাজনীতিবিদরা না হয় ভোট ও ক্ষমতার লোভে পরগাছা তুলে নিলো, কিন্তু দেশের চিন্তক শ্রেণিরাও কেন সেই সুবাসে মোহিত হতে চাইলেন? তাহলে কি আমাদের চিন্তক শ্রেণির কোনও টেকসই বা শক্তিশালী মনন তৈরি হয়নি? পুরোটাই ছিল ভেসে বেড়ানো জলজ উদ্ভিদ?

স্রোতের প্ররোচনায় এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ানো অভ্যাস আমাদের চিন্তক শ্রেণির আগেও ছিল, এখনও আছে। সংশয়ে ডুব দিয়ে তাদের নীরব থাকাটা একাত্তর ও নব্বইতে যেমন দেখেছি, এখনও একই চিত্র। যখন গণজোয়ার ওঠে, সেই গণজোয়ার কোনও স্বর্ণদ্বীপ আবিষ্কার করলে তারা সেই দ্বীপের নকশাকার কিংবা পূর্বাভাস দাতা হয়ে যান চট করেই। আমরাও যেন কোন মন্ত্রে সেই বচন বিশ্বাস করতে শুরু করি। এমন মন্ত্র বসে কতো চিন্তককে যে রাষ্ট্রের বিধাতা করে তুলেছি‍! অবশ্য নিজ গুণে তাদের পতনও হয়েছে।

তাই কোনও চিন্তক বা রাজনীতির বাঁশিতে মোহিত হতে চাই না। বরাবরই কান পেতে রাখি কখন কোন তরুণদল হাঁক দিয়ে বলবে– ‘জাগো বাহে কোনঠে সবাই’। তখন বজ্রমুঠি নিয়ে মিছিলে নেমে পড়তে রাজি যেকোনও বয়সেই। কারণ প্রতিরোধ আর প্রতিবাদের কোনও বয়স নেই। মাতৃভূমির বিরুদ্ধে যেকোনও ষড়যন্ত্র প্রতিরোধের সব কণ্ঠস্বরের বয়স এক। সমবয়সী। এমন সমবয়সীদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে আবারও জড়ো করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে এই সুরের মূর্ছনা ছড়িয়ে পড়ুক আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, রংপুর হয়ে এই জনপদের দোঁয়াশ, এঁটেল, প্রতিটি ধূলিকোনায়। জয়তু বাংলাদেশ। তুমি জাগ্রত জনতার।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

/এসএএস/জেএইচ/

সম্পর্কিত

সবার ভেতরেই পোশাকি বচন

সবার ভেতরেই পোশাকি বচন

আমরা ‘নোবেল’ পেশাতেই আছি

আমরা ‘নোবেল’ পেশাতেই আছি

দৃশ্যমাধ্যম আপন শক্তিতে আলোকিত হোক

দৃশ্যমাধ্যম আপন শক্তিতে আলোকিত হোক

গ্রামীণ সুদের অস্বাস্থ্যকর অর্থনীতি!

গ্রামীণ সুদের অস্বাস্থ্যকর অর্থনীতি!

সাম্প্রদায়িকতা ও মনোজগৎ

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ২২:৫২
স্বদেশ রায় আলেকজান্ডারকে তার বাবা ছোটবেলায় যেমন যুদ্ধবিদ্যা শেখার ব্যবস্থা করেছিলেন তেমনই তার মনোজগৎ গড়ে তোলার জন্যে এরিস্টটলের মতো শিক্ষকের কাছেও তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের একটি সভ্যতায় মনোজগৎ গড়ে তোলার গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। আর এরিস্টটল কখনোই আলেকজান্ডারের মনোজগৎ কোনও অন্ধ বিশ্বাস দিয়ে গড়ে তোলেননি। তিনি বাস্তবতা ও প্রকৃতির আচরণ থেকে আলেকজান্ডার যাতে শিক্ষা নিতে পারে সে চেষ্টাই করেছিলেন। উদার এবং অসম্ভবকে জয় করার একটি মনোজগৎ তাঁর ভেতর তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন।

এখন যেমন ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের ভেদবুদ্ধি ও নানান সংকীর্ণতা মানুষের মনোজগৎকে সংকীর্ণ করে; অতীতের ওই সভ্যতাগুলোতেও দেখা যায়, নানান কুসংস্কার সমাজ ও মানুষের মনকে সংকীর্ণ করতো। আর এর বিপরীতেই ছিল উদার চিন্তার একটি যাত্রা। আবার ইতিহাসে এর পরের সময়ে দেখা যায়, ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও ধর্মের একাধিপত্য বা ধর্মের নামে রাষ্ট্র ও সমাজকে বেঁধে ফেলার এক ভয়াবহ যুগ। এর আগে নানান কুসংস্কারে রাষ্ট্র ও সমাজকে যতটা না আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে পেরেছিল, তার থেকে অনেক বেশি আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে ধর্মের একাধিপত্য। বাস্তবে রাজতন্ত্রের বদলে পুরোহিততন্ত্র ও চার্চতন্ত্রই তখন চালু হয়। ধর্মীয় নেতা পেছনে থাকলেও তারাই রাজাকে বা রাষ্ট্র ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। সেই নিয়ন্ত্রণের বাঁধন এতই শক্ত হয় যে ধর্মের তথাকথিত বিধানের বলে রাষ্ট্র নরহত্যার যেমন একক অধিকার পায়, তেমনি নারীকে বেঁধে ফেলা হয় নানান শেকলে। যে নারীর হাত ধরে গৃহসভ্যতা ও কৃষিসভ্যতার জন্ম সেই নারীকে পরাধীনও অসহায় করে সমাজকে একটি অন্ধকার যুগে নিয়ে যাওয়া হয়। যা থেকে আজও  সমাজ বের হয়ে আসতে পারেনি। ধর্ম সাম্প্রদায়িকতার নামে আমরা মাঝে মাঝে পৃথিবীর নানান দেশে ধর্মীয় হামলা, মানুষের ওপর হামলা ও সম্পদ দখলের নগ্নতা দেখি। কিন্তু প্রতিদিন ধর্মের নামে নারী’র ওপরে যে আঘাত এখনও পৃথিবীর নানান রাষ্ট্রে ও সমাজে করা হচ্ছে, তা আমরা সঠিক দেখতে পাই না। কারণ, এটা আমাদের সহজাত হয়ে গেছে। আমরা এই অন্ধকারকে স্বাভাবিক অন্ধকার মনে করি বা বুঝতেই পারি না এটা অন্ধকার। যেমন, যে রাতকানা রোগে ভোগে তার চোখে রাতের আকাশ তারাহীন। কিন্তু সে সেটা বোঝে না।

রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর ধর্মের নামে এই ছোবলকে বাঁচানোর জন্যে পনের শতকে ইউরোপের অনেক বুদ্ধিনায়করা আন্দোলন শুরু করেন। তাদের এই আন্দোলনের ফলে তখন পাশ্চাত্যের দেশগুলো ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে অনেকটা আলাদা করা শুরু করে। কিন্তু শতভাগ তারা এখনও করতে পারেনি। গণতন্ত্রের অন্যতম জন্মভূমি ব্রিটেনে ব্লাসফেমি আইন তুলে দেওয়া হয়েছে ২০০৮ সালে। আর প্রকৃতপক্ষে এটা নর্দান আয়ারল্যান্ড ছাড়া সর্বত্র তাদের কমন ল’ থেকে বাদ যায় ২০২১-এর মার্চে।  তবে শুধু পার্থক্য ছিল আধুনিক যুগে এসে তারা পাকিস্তানের মতো হয়তো কথায় কথায় এই ব্লাসফেমি আইন ব্যবহার করতো না। রাষ্ট্র পরিচালকদের শিক্ষাদীক্ষা কিছুটা হলেও তাদের সংযত করে রেখেছে এ ক্ষেত্রে। তারপরেও ক্যামেরুনের মতো তরুণ নেতাও চার্চ শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনিও বোঝেননি, শিক্ষাকে হতে হয় ইহজাগতিক ও আধুনিক। এই ইহজাগতিক ও আধুনিক শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের দায় ব্যক্তির নিজের। এ দায়ভার যখনই আধুনিক রাষ্ট্র নিজ হাতে তুলে নেয় তখনই বৈপরীত্য দেখা যায়। এবং ক্যামেরুনকে কিন্তু তার ফল ভোগ করতে হয়েছে। তার সমাজ পরোক্ষভাবে উগ্র হয়েছে। যে উগ্রতার কারণে তাকে ব্রেক্সিটে হারতে হয়েছে। ক্যামেরুন ব্রেক্সিটের পক্ষের জয়ে নিশ্চিত ছিলেন বলেই তিনি ব্রেক্সিটের পক্ষে-বিপক্ষে গণভোট দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন না তার সমাজে এখন উগ্রবাদীরা সংখ্যায় বেশি। যেকোনও উগ্রবাদ, তাই সে উগ্র জাতীয়তাবাদ হোক না, সেটাও কিন্তু ভয়াবহ এক সাম্প্রদায়িকতা। পৃথিবীতে এই উগ্র জাতীয়তাবাদের নামেও কম ধ্বংসযজ্ঞ, কম নরহত্যা হয়নি। পার্থক্য শুধু এখানে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা থেকে মানবতাবাদে পৌঁছাতে একটি রাষ্ট্র বা সমাজকে যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকে মানবতাবাদে পৌঁছাতে তার থেকে সামান্য কিছু কম পথ পাড়ি দিলে হয়তো চলে।

এ কারণে যেকোনও আধুনিক রাষ্ট্রকে প্রথমেই তার শিক্ষাকে আধুনিক করতে হয়। সেখানে কোনোভাবে ধর্মীয় শিক্ষার যোগ থাকলে চলে না। যে রাষ্ট্র তার শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষা রাখে ওই রাষ্ট্রকে পশ্চাৎপদ রাষ্ট্র হিসেবেই ধরতে হবে। ওই রাষ্ট্রকে আর যাই হোক আধুনিক রাষ্ট্র বলা যাবে না। কারণ, শিক্ষা সম্পূর্ণরূপে ইহজাগতিক ও আধুনিক বিষয়। এর সঙ্গে ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা থেকে শুরু করে অনেক দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু কিছু শিক্ষার ভেতর দিয়ে যে অবৈধ পুঁজি সৃষ্টি বা সম্পদ দখলের একটা তাড়না শুরু হয়েছে, এটাও কিন্তু শিক্ষার অঙ্গ নয়। কারণ, অবৈধ সম্পদ দখল ও দখলের তাড়নাও একটি রাষ্ট্র ও সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। ধর্মীয় উগ্রতা যেমন মানুষের মানবতা ধ্বংস করে তাকে রাষ্ট্রের ও সমাজের ক্ষতিকর কাজের দিকে ঠেলে দেয়, এই অবৈধ সম্পদ দখলের মানসিকতাও রাষ্ট্র ও সমাজকে সমান ক্ষতি করে। এবং একটা অদ্ভুত যোগাযোগ এখানে দেখা যায়, কোনও সমাজে উগ্র ধর্মীয়বাদ যেমন অবৈধ সম্পদ দখলের দিকে ছুটিয়ে নিয়ে যায় মানুষের মানসিকতাকে বা সেই সুযোগ করে দেয়, উগ্র-জাতীয়তাবাদও একই কাজ করে। ধর্মীয় মৌলবাদে যেমন রাষ্ট্রীয় ও সমাজের সম্পদ দখলের একটা তাড়না আছে, উগ্র জাতীয়তাবাদেও সেই একই বিষয় দেখা যায়। উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদে যেমন মানুষের সহজাত নৈতিকতা নষ্ট করে, অন্যের মানসিকতার ওপর, অন্যের সম্পদের ওপর অবৈধ দখলদারিত্ব সৃষ্টি করার একটা তাড়না দেখা যায়, উগ্র জাতীয়তাবাদেও তেমনই। পার্থক্য শুধু উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদের বয়স দুই হাজার বছরের বেশি, তার শেকড় অনেক গভীরে আর উগ্র জাতীয়তাবাদের বয়স কয়েকশ’ বছর ছুঁতে চলেছে, তার শেকড় অতটা গভীরে নয়।

পনের শতকের পর থেকে ধীরে ধীরে রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে ধর্মকে অনেকটা দূরে ঠেলে দিতে পেরেছিল পাশ্চাত্যের দেশগুলো। কিন্তু গত একশ’ বছরে সেখানেও উগ্র জাতীয়তাবাদের নামে প্রচ্ছন্নভাবে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণ সাম্প্রদায়িকতা বাড়ছে। যেমন, আমেরিকায় ট্রাম্পের বিজয়ের কারণ শুধু ডেমোক্র্যাটদের দুর্বল প্রার্থীই ছিল না, ধর্মীয় ও বর্ণ সাম্প্রদায়িকতাও কাজ করেছিল। যদিও ওবামা বলেছিলেন, তিনি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হলে ট্রাম্প জিততে পারতো না। তবে তারপরেও বাস্তবতা হলো, ট্রাম্প যে ভোট পান ওই ভোটের একটি অংশে কিন্তু এই ধর্ম ও বর্ণ সাম্প্রদায়িকতার ভোট ছিল। সেখানে সামনে আনা হয়েছিল উগ্র জাতীয়তাবাদকে। এবং সেটা এখনও আমেরিকায় আছে। এমনিভাবে পাশ্চাত্যের অধিকাংশ দেশগুলোর রাজনীতি লক্ষ করলে দেখা যাবে, সেখানে একটা ধর্ম ও বর্ণ সাম্প্রদায়িকতার ভোট জন্ম নিচ্ছে প্রতিদিন। আর এশিয়া ও আফ্রিকার পশ্চাৎপদ দেশগুলোতে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা অনেক বেশি উগ্রভাবে বাড়ছে।

এই ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িকতা জন্ম নেয় মানুষের ভেতর যে সহজাত ভালো গুণগুলো অর্থাৎ উদারতা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা, পবিত্রতা ও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা এগুলো নষ্ট হওয়ার ফলে। মানুষের সমাজের ও চরিত্রের বিবর্তনের ইতিহাস বলে, মানুষ সহজাতভাবে তার এই ভালো গুণগুলো নিয়ে সংঘবদ্ধ হতে শিখেছে। এবং সংঘবদ্ধ মানুষ তাদের এই ভালো গুণগুলো দিয়েই সমাজ থেকে, মানুষের মন থেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থপরতা ও অন্ধত্বকে পরাজিত করেই এগিয়েছে। আবার পাশাপাশি মানুষের সমাজের চলার পথে দেখা যায়, স্বার্থপর হিপোক্রেটরা তাদের প্রতারণা দিয়ে মানুষের এই সহজাত ভালো গুণগুলো নষ্ট করে চলেছে। মানুষের ভেতর যে সহজাতভাবে ফুলের মধু আহরণের একটা গুণ থাকে, এটা ওই স্বার্থপর হিপোক্রেটরা নষ্ট করে দিচ্ছে। মানুষের ভেতর পশুত্ব জাগাচ্ছে।

মানুষের ভেতর যারা স্বার্থপর হিপোক্রেট তারা এই কাজটি করছে মোটা দাগে দুটো বিষয়কে আশ্রয় করে।

এক. ‘ধর্ম’, দুই, ‘রাজনীতি’। এবং এখানে এই ‘ধর্ম’ ও ‘রাজনীতির’ এক অদ্ভুত মিল দেখা যায়। এই ‘ধর্ম’ ও ‘রাজনীতি’ বর্তমানের এ সময়ে মানুষকে মানুষ না রেখে ভোটারে পরিণত করার বা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার ক্যাডারে পরিণত করার যন্ত্র বানানোর চেষ্টা করছে প্রতি মুহূর্তে। যে কারণে তারা রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের ভেতরকার ভালো গুণগুলো নষ্ট হওয়ার সবকিছুকে উৎসাহিত করছে পৃথিবীর নানান ভূখণ্ডে। তারা সমাজে আধুনিক শিক্ষার বদলে অজ্ঞতাকে, মূঢ়তাকে উৎসাহিত করছে। সমাজে যোগ্যতার অর্জনের বিপরীতে অবৈধ দখলকে উৎসাহিত করছে। রাষ্ট্র ও সমাজে নিয়মতান্ত্রিকতার বদলে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। রাষ্ট্র ও সমাজের জ্ঞান বিস্তারের প্রতিটি অঙ্গকে মূঢ়দের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। এবং সাধারণ মানুষ যাতে রাষ্ট্র ও মূঢ়চিন্তার দাস হয় সেদিকেই তারা রাষ্ট্র ও সমাজকে নিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নেতাদের একটি বড় অংশ আধুনিক মানুষগোষ্ঠী তৈরি হওয়ার বদলে এক ধরনের মানসিক প্রতিবন্দ্বী দাসগোষ্ঠী বা সমাজ সৃষ্টির কাজ করছে। তাদের চেষ্টার উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্র ও সমাজের আধুনিক ও উদার চিন্তার মানুষগোষ্ঠীর বিপরীতে এই দাসগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ানো। যে কারণে সমাজের একটি বড় অংশে উদার চিন্তা ও বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা প্রবেশের সব পথ তারা বন্ধ করতে সমর্থ হচ্ছে। ধর্ম ও রাজনীতির নানান কৌশলে তারা সমাজের বহুমুখী চিন্তাকে নষ্ট করছে।

কোনও রাষ্ট্রে ও সমাজে যখন এই চিন্তা চেতনায় দাসশ্রেণি গড়ে ওঠা শুরু হয় তখন ওই সমাজের মানুষ শুধু পেছন দিকে হাঁটতে শুরু করে না, সমাজের সব ধরনের সভ্যতা ও শৃঙ্খলাও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। এমন একটি সময়ে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনা খুবই কঠিন। কারণ, তখন অবচেতনভাবেও অনেক দায়িত্বশীল মানুষের মনোজগতের শুভ গুণগুলো নষ্ট হওয়া শুরু হয়ে যায়। রাষ্ট্র ও সমাজের নানান অঙ্গে এই দাসরাই বসে যায়। তারা সব সময়ই নানানভাবে মূঢ়তাকে সাহায্য করে। রাষ্ট্র ও সমাজকে পেছন দিকে ঠেলতে শুরু করে। তখন অতি সহজে রাষ্ট্র ও সমাজে যেকোনও ধরনের উগ্রবাদীরা সামনে চলে আসতে থাকে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এটা ছোঁয়াচে। কখনোই কোনও নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না।

এ মুহূর্তে গোটা পৃথিবীতে কম-বেশি নানান ধরনের উগ্রতা দেখা যাচ্ছে। আরও ছোট পরিসরে নিয়ে এলে দেখা যাবে, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর অধিকাংশ দেশে ধর্মীয় উগ্রতা। দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের ভেতর আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশে বেশি ও কম আকারে হলেও ধর্মীয় উগ্রতার ‘লাঠি’ দেখা যাচ্ছে। যা রাষ্ট্র ও সমাজের মানুষকে ধীরে ধীরে ধর্মীয় উগ্রতার দাস বানানোর চেষ্টা করছে। আবার রাজনীতিরও বড় অংশ ওই উগ্রতাকে ব্যবহার করে মানুষকে ‘দাস-ভোটার’ বানানোর চেষ্টা করছে। আর এর কুফলগুলো মাঝে মাঝেই এই দেশগুলোতে দেখা যাচ্ছে। এই দেশগুলোতে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করবে যে রাজনীতি ওই রাজনীতি থেকে উদারনীতি, পবিত্রতা, সহনশীলতা, বহুত্বকে গ্রহণ করার ক্ষমতা বিদায় নিয়ে সেখানে উগ্রতা, মূঢ়তার দাসতন্ত্র স্থান নিচ্ছে ধীরে ধীরে।

আর এ অবস্থার কুফল হয়তো দুই একটা জায়গায় মোটা দাগে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে এর কুফল অনেক গভীরে। এর কুফলে প্রতি মুহূর্তে রাষ্ট্র ও সমাজ অযোগ্য ও মূঢ়দের হাতে চলে যায়। সমাজের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে আধুনিকতার বদলে পশ্চাৎপদ চিন্তাচেতনা। একটা বিরাট অংশ মানুষ ভুলে যায় তার একটি মনোজগৎ আছে। যা তাকে প্রতি মুহূর্তে বিকশিত করতে হয়। এবং এই বিকাশ হবার ভেতর দিয়েই মানব সমাজ ও প্রগতি এগিয়ে চলে। মানুষের মনোজগৎ বিকশিত না হলে কখনোই কোনও রাষ্ট্র ও সমাজের কোনও স্তরেই শৃঙ্খলা আনা যায় না। ধীরে ধীরে ওই রাষ্ট্র ও সমাজের সব অর্জন নষ্ট হতে থাকে। কারণ, মানুষের  আধুনিক শিক্ষা, মানুষের উন্নত মনোজগৎই রাষ্ট্র ও সমাজের সব উন্নয়নকে ধরে রাখে এবং সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। পৃথিবী থেকে ডাইনোসররা হারিয়ে গেছে খাদ্যাভাবে, বিপরীতে মানুষের বহু সভ্যতা, বহু অর্জন নষ্ট হয়েছে মনোজগৎ ধ্বংস হওয়ার ফলে।       

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মিডিয়ার স্বাধীনতার সপক্ষে নোবেল

উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মিডিয়ার স্বাধীনতার সপক্ষে নোবেল

ধর্মীয় উগ্রবাদ ঠেকাতে ফিরতে হবে ৭২-এর সংবিধানে

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ১৬:১৮

লীনা পারভীন ‘আফগানিস্তানের শিয়া মসজিদে হামলায় ৪৭ জন মুসলিম নিহত হয়েছে। দায় স্বীকার করেছে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস’– এমন সংবাদ অহরহই আসছে। দু’দিন পর পর এমন হামলা হচ্ছে এবং মুসলমানরা মারা যাচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশে অনেক মানুষ আছেন, যারা সরাসরি কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে ধারণ করেন, ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে অন্য কোনও ধর্মের লোক থাকতে পারবে না। হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর ঘরবাড়ি, মন্দির ভেঙে দিচ্ছে, লুটপাট করছে। এবারের দুর্গাপূজায় যা ঘটে গেলো এরপর বাংলাদেশ আর অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের দাবিকে শক্তভাবে সামনে আনতে পারবে না।

কুমিল্লার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হলো পূজামণ্ডপ ভাঙা, লুটপাট। এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়লো সারাদেশে। চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, রংপুরসহ দেশের অন্যান্য জায়গায় শুরু হলো মন্দির, মণ্ডপ ভাঙা। হামলায় নিহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন।

কেন? এর পেছনের কারণ কি শুধুই ধর্মীয় বিদ্বেষ? তারা কোন ইসলাম ধর্মকে ধারণ করে এ হামলা করলো? ইসলামের কোথায় বলা আছে দুনিয়ার মাটিতে কেবল ইসলাম ধর্মের লোকেরাই থাকতে পারবে?

তর্কের খাতিরে ধরেই নিলাম যে মুসলমানেরা কেবল নিজেদের একটি পৃথিবী চায়। তাহলে আফগানিস্তানে তো হিন্দু নেই, পূজা নেই, মণ্ডপ নেই, সেখানে হামলা হয় কেন? মসজিদ তো মুসলমানদের পবিত্রতম স্থান, যেখানে গিয়ে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করা হয়। সেই মসজিদে হামলা করলো কারা? হামলাকারীর পরিচয় তো মুসলিম। এর কী ব্যাখ্যা আছে?

এর ব্যাখ্যা আসলে একটাই। এরা কেউই কোনও ধর্মকে বিশ্বাস করে না। এদের মগজে আছে কেবল হিংসা আর বিদ্বেষ। এরা মানবতা কাকে বলে জানে না। এদের পরিচয় জঙ্গি। জঙ্গিদের কোনও ধর্ম হয় না। এর প্রমাণ আমরা আফগানিস্তানের ঘটনাতেই পাচ্ছি।

তার মানে বাংলাদেশেও যারা সাম্প্রদায়িক হামলা চালাচ্ছে তারা কেউই ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে কিছু করছে না। দেশে যদি একজন হিন্দু বা অন্য ধর্মের লোকও না থাকে তাহলে দেখা যাবে এরা মুসলমানদের ওপর হামলা করছে। তখন ইস্যু আসবে কেবল মুসলমান হলেই হবে না, কে কোন বিশ্বাসের অনুসারী সেই হিসাব। ঠিক আফগানিস্তানে যা ঘটছে।

অর্থাৎ, এখানে পেশিশক্তিই হচ্ছে প্রধান হাতিয়ার। নিজেদের সংখ্যাগুরু ঘোষণা দিয়ে চলবে এসব হামলা।

তাই বলছি, জঙ্গিদের যেমন কোনও ধর্ম নেই, ঠিক তেমন তাদের কোনও নির্দিষ্ট রাষ্ট্রও নেই। রাষ্ট্র নেই, তাই রাষ্ট্রীয় নীতিকেও তারা তোয়াক্কা করে না। এরা একটি রাষ্ট্রে বসবাস করবে কিন্তু রাষ্ট্রের নিয়মনীতি বা বিশ্বাসকে পরোয়া করে না। এদের কাছে নিজেরটাই সেরা। গোটা পৃথিবীজুড়ে এখন এমন জঙ্গিবাদের জোয়ার চলছে। সেই ধাক্কায় দুলছে বাংলাদেশও।

আমি জানি না আমাদের সরকার, প্রশাসনের কর্তারা কী ভাবছেন? কেন এই জঙ্গিদের রুখে দেওয়া গেলো না। কুমিল্লার ঘটনার পর আরও হামলা হতে পারে এমন ইঙ্গিত কিন্তু ছিলই। আমরা সাধারণ মানুষও বুঝতে পারছিলাম বিষয়টি। তাহলে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন কেন সচেতন হলো না?

জানা যায়, নোয়াখালীতে হামলার সময় পুলিশকে কাছে পাওয়া যায়নি, স্থানীয় প্রশাসন এগিয়ে আসেনি ঘটনা থামাতে। নির্বিচারে হামলা চালিয়ে চলে গেলো জঙ্গিগুলো। এর দায় কার? রাষ্ট্র কি নেবে এই দায়? নিতে তো হবেই। কারণ, এ ব্যর্থতা যে রাষ্ট্রেরই।

একটি রাষ্ট্র তৈরি হয় সব মানুষের অবদানে। এখানে কে কোন ধর্ম বা জাত, সে নারী না পুরুষ সে বিবেচনা আসে না। রাষ্ট্রের আইন তাই সবার জন্য সমান। সকল সুযোগ-সুবিধা সবার জন্য সমান থাকে। সংবিধান হচ্ছে একটি রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি। সেই সংবিধানেই বলা আছে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা। তাহলে সরকার কেন সেই বিধান মানতে পারবে না? সরকার কেন একজন হিন্দুকে নিরাপত্তা দিতে পারবে না? শপথ নেওয়ার সময় তো সবার দায়িত্ব নেবে এমনটাই কথা ছিল।

প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, ধর্ম যার যার উৎসব সবার। তখন এরা কারা যখন বলে বেড়ায়, ধর্ম যার যার, উৎসবও তার তার। কাদের এত বড় সাহস যারা প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানকে উপেক্ষা করে দেশে সন্ত্রাসী হামলা চালায়? প্রশাসনের ভেতরে কারা আছে যারা নিজেদের মুসলিম দাবি করলেও জঙ্গি মানসিকতাকে ধারণ করে? কারা তারা যারা বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চায়?

জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশ অত্যন্ত সফলতার পরিচয় দিয়ে এসেছে। কোথায় সেই সফলতার ফসল? তলে তলে এত জঙ্গি কেমন করে জন্ম নিচ্ছে। কেবল প্রকাশ্যে এলেই আমরা দেখতে পারি কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে জঙ্গি মানসিকতার চাষ হচ্ছে তাকে রুখবে কারা? কেমন করে?

এর সমাধান একটাই। রাষ্ট্রের গা থেকে মুসলমানের তকমা সরিয়ে দেওয়া।

রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনও ধর্ম থাকতেই পারে না। রাষ্ট্র হবে উদার, গণতান্ত্রিক, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার সংরক্ষণ করতে বাধ্য রাষ্ট্র। সংবিধানকে সংশোধন করে অবিলম্বে ৭২-এর সংবিধান প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

লাল তারকার বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউজিসির দায়

লাল তারকার বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউজিসির দায়

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে ভালোবাসি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে ভালোবাসি

ফেসবুকের পক্ষপাতমূলক আচরণ কেন?

ফেসবুকের পক্ষপাতমূলক আচরণ কেন?

ঝুমন দাসের মুক্তি চাই

ঝুমন দাসের মুক্তি চাই

দায় ও ব্যর্থতা কার?

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২১, ১৯:৩৭
প্রভাষ আমিন আমাদের দেশে কোনও একটা ঘটনা ঘটলে রাজনীতিবিদদের প্রথম কাজ দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানো। তদন্ত শুরুর আগেই তারা বলে দিতে পারেন, ঘটনাটি কে ঘটিয়েছে। এবার শারদীয় দুর্গোৎসবের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক তাণ্ডবের পরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। যথারীতি আওয়ামী লীগ এই ঘটনার জন্য দায়ী করেছে বিএনপি-জামায়াতকে। আর বিএনপি নেতারা বলছেন, জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে সরকারই এই হামলা করিয়েছে।

কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগ এবং তার প্রতিক্রিয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় পুলিশ অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে, অনেককে গ্রেফতার করেছে। আমি পুলিশের তদন্তে আস্থা রাখতে চাই। তাই রাজনীতিবিদদের মতো চট করে কাউকে দায় দিতে চাই না। এমনিতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িক ধারার নেতৃত্ব দেয় আওয়ামী লীগ। আর সাম্প্রদায়িক ধারার মূল নেতৃত্ব বিএনপির কাঁধে। কিন্তু সবসময় সবকিছু এমন সরল হিসাবে চলে না। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার উদাহরণও আমাদের সমাজে কম নয়।

পুলিশের তদন্তের ওপর আস্থা রাখার কথা আগেই বলেছিল। সেই আস্থার প্রতিদান তারা দিয়েছে। কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে কোনও সিসিটিভি ছিল না। কিন্তু আশপাশের একাধিক সিসিটিভির ফুটেজ মিলিয়ে ঘটনার ধারাক্রম তৈরি করেছে পুলিশ। তাতে ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করা গেছে। তাতে একটা বিষয় স্পষ্ট, পুরো ঘটনাটিই পরিকল্পিত এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্যই এটা করা হয়েছে। গভীর রাতে ইকবাল হোসেন নামে এক যুবক পাশের মসজিদ থেকে একটি পবিত্র কোরআন শরিফ নিয়ে পূজামণ্ডপে ঢোকে এবং হনুমানের হাতের গদাটি কাঁধে করে বেরিয়ে আসে। তার মানে এই দুর্বৃত্ত কোরআন শরিফটি হনুমানের পায়ে রেখে সেখান থেকে গদাটি নিয়ে বেরিয়ে আসে। ভোরে ইকরাম নামে একজন পূজামণ্ডপে গিয়ে কোরআন শরিফ দেখে ৯৯৯-এ ফোন করে। পুলিশ আসার পর ফয়েজ নামের একজন ফেসবুকে লাইভ করে উত্তেজনা ছড়ায়।

পুলিশ ইকরাম আর ফয়েজকে আগেই গ্রেফতার করেছে। তবে ইকবালকে এখনও ধরা যায়নি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, আপাতত যে তিন জন এই ষড়যন্ত্রের সামনে আছে, তারা তিন জনই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। ইকবালের মা আমেনা বিবি দাবি করেছেন, তার ছেলে মানসিক ভারসাম্যহীন। তবে স্রেফ মানসিক ভারসাম্যহীন বলে তার অপরাধকে খাটো করে দেখার কোনও সুযোগ নেই। ইকবাল উন্মাদ, তবে ধর্মোন্মাদ।

ইকবালের মতো ধর্মোন্মাদরাই বারবার বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করছে। ছেলেকে মানসিক ভারসাম্যহীন বললেও আমেনা বিবি তার শাস্তি চেয়েছেন, ধরে তাকে মেরে ফেলার দাবি করেছেন। এমনকি মা হয়ে ছেলের লাশও নেবেন না বলে জানিয়েছেন। তার ছেলের কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গার সহিংসতার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। এমন কুলাঙ্গার ছেলে জন্ম দিয়েছেন বলে নিজেকেই নিজে অভিশাপ দিয়েছেন।

‘অশিক্ষিত’ আমেনা বিবি তার সন্তানের অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হলেও আমাদের দেশের একটি মহল পুরো ঘটনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। তারা জজ মিয়া নাটকের কথা বলছেন। সিসিটিভির ফুটেজ নিয়ে সন্দেহের কথা বলছেন। তাদের এই সন্দেহের কারণ, অপরাধের দায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো যাচ্ছে না। ঘুরেফিরে মুসলিম নামধারী দুর্বৃত্তদের কাঁধেই চলে আসছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে আরও বেশি চাপে ফেলা গেলো না বলে অনেকের খুব আফসোস। আমি আগেও লিখেছি, কোনও ধর্মপ্রাণ মুসলমান এই কাজ করতে পারে না। কারণ, একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমানের পক্ষে কোনোভাবেই কোরআন অবমাননা করা সম্ভব নয়। আবার কোনও ধর্মপ্রাণ হিন্দুর পক্ষেও এটা করা সম্ভব নয়। কেউ চাইবে না নিজের বছরের সবচেয়ে বড় উৎসবটি মাটি হয়ে যাক। বিষয়টি পরিষ্কার, কিছু ধর্মোন্মাদ দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্য, হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ছুতো খোঁজার জন্য এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে। এক দু’জন ব্যক্তির অপরাধের দায় আমি কখনোই কোনও সম্প্রদায়ের ওপর দিতে চাই না। সেটা হিন্দু হলেও না, মুসলমান হলেও না। ইকবাল, ইকরাম, ফয়েজ মুসলিম ঘরের সন্তান হলেও তারা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা পায়নি। তারা কোরআন অবমাননা করেছে, ইসলামকে খাটো করেছে। এরা দুর্বৃত্ত, এরা ধর্মোন্মাদ; এদের কঠিন শাস্তিই পারে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে।

পর্দার সামনের তিন কুশীলবকে চিহ্নিত করা গেলো। তাদের দু’জনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, পর্দার পেছনে আরও বড় কুশীলবরা রয়েছে। এই তিন যুবকের পক্ষেই এত বড় ঘটনার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই পেছনের কুশীলবদেরও চিহ্নিত করতে হবে, ধরতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে কেউ ধর্মের নামে সন্ত্রাস করার সাহস না পায়।

ঘটনার ধারাক্রম জানা গেলো। সামনের দায়ীদেরও পাওয়া গেলো। কিন্তু আমি ভাবছি, কুমিল্লার এই ঘটনা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বছরের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবটি যে পণ্ড হয়ে গেলো; চাঁদপুর, চৌমুহনী, চট্টগ্রাম, পীরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মণ্ডপ-মন্দির ভাঙচুর, হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা হলো, লুটপাট হলো, অগ্নিসংযোগ হলো, নারীদের নির্যাতন করা হলো; তার দায় কে নেবে? হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের হৃদয়ে যে নিরাপত্তাহীনতার গভীর ক্ষত তৈরি হলো, তার উপশম হবে কোন উপায়ে?

মুসলমান ভাইদের প্রতি আমার জিজ্ঞাসা, কুমিল্লার ঘটনার জন্য দায়ী কে সেটা না জেনেই আপনার চিলের পেছনে দৌড়ালেন, মন্দিরে হামলা করলেন, লুটপাট করলেন; এটা কি আপনার ধর্ম অনুমোদন করে, ইসলাম ধর্ম কি কখনও অন্য ধর্মের ওপর আঘাত করাকে সমর্থন করে? আপনারা যে না জেনে না বুঝে হামলা করলেন তার জন্য কি এখন আপনাদের মনে কোনও অনুশোচনা হচ্ছে, গ্লানি হচ্ছে?

আপনারা যে ধর্মের নামে অধর্ম করে পাপ করলেন, সেটা কি আপনারা বুঝতে পারছেন? তবে পরকালের পাপ হবে, এটুকু বলেই এই ধর্মোন্মাদদের ছেড়ে দেওয়া যাবে না। যারা ফেসবুকে উসকানি দিয়েছে, যারা হামলা করেছে; তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

কুমিল্লার ঘটনার তিন দায়ীকে চিহ্নিত করা গেলেও দায় কিন্তু সরকারকেও নিতে হবে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ সহজাতভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থক। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়ার অপরাধে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দেশজুড়ে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে সংখ্যালঘুরা নিরাপদে থাকে, এমন ধারণা প্রচলিত আছে। কিন্তু রামু, নাসিরনগর, ভোলা, অভয়নগর, সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং সর্বশেষ শারদীয় দুর্গোৎসবের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর যে হামলা হয়েছে; তাতে সেই ধারণা অনেক দুর্বল হয়ে গেছে। প্রবল পরাক্রমশালী সরকারও সংখ্যালঘুদের পুরোপুরি নিরাপত্তা দিতে পারছে না। তাই শৈথিল্য, গোয়েন্দা ব্যর্থতার দায় সরকার এড়াতে পারবে না। কুমিল্লার ঘটনা না হয় সরকার টের পায়নি, কিন্তু কুমিল্লার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে যা হলো, সেটা প্রশাসন ঠেকাতে পারলো না কেন?

বিএনপি-জামায়াতকে সরকার রাস্তায়ই নামতে দেয় না। সেখানে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি কীভাবে মাইকে ঘোষণা দিয়ে, ফেসবুকে উত্তেজনা ছড়িয়ে হামলা চালালো? পুলিশ তাদের ঠেকাতে পারলো না কেন? কেন কুমিল্লার ঘটনার চার দিন পর রংপুরের পীরগঞ্জে হিন্দু গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া সম্ভব হলো?

সরকারি দল হিসেবে যেমন আওয়ামী লীগের দায় আছে, তেমনি সংগঠন হিসেবেও আওয়ামী লীগকে দায় নিতে হবে। এখন তো দেশে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্য। কোথাও তাদের মুখের ওপর কথা বলার মতো কেউ নেই। ছাত্রলীগ-যুবলীগের ভয়ে সবাই অস্থির। কুমিল্লা, হাজীগঞ্জ, চৌমুহনী, পীরগঞ্জ– যেসব জায়গায় হামলা হয়েছে, সব জায়গায় আওয়ামী লীগের একক আধিপত্য। তাহলে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ সেখানে প্রতিরোধ গড়তে পারলো না কেন? ঘটনা সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগের সম্প্রীতি সমাবেশ আসলে সান্ত্বনা পুরস্কারের মতো।

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। ভোটের হিসাব-নিকাশ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগকে অবশ্যই সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়তে হবে। সরকারকে জিরো টলারেন্সে সব সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিচার করতে হবে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ তো বটেই, সব মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
 
লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগারের ঘাটতি!

আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগারের ঘাটতি!

মানুষ কেন বিএনপিকে ভোট দেবে?

মানুষ কেন বিএনপিকে ভোট দেবে?

ক্ষোভের আগুনে পুড়ুক সব অনিয়ম

ক্ষোভের আগুনে পুড়ুক সব অনিয়ম

২১ হাজার কোটি টাকা ‘জানের সদকা’!

২১ হাজার কোটি টাকা ‘জানের সদকা’!

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

ক্যাম্পে ৬ রোহিঙ্গা হত্যার ঘটনায় মামলা

ক্যাম্পে ৬ রোহিঙ্গা হত্যার ঘটনায় মামলা

উগ্রবাদের স্থান বাংলাদেশে হবে না: হানিফ

উগ্রবাদের স্থান বাংলাদেশে হবে না: হানিফ

মালদ্বীপে আকর্ষণীয় হলিডে প্যাকেজ ঘোষণা ইউএস-বাংলার

মালদ্বীপে আকর্ষণীয় হলিডে প্যাকেজ ঘোষণা ইউএস-বাংলার

‘ইলেকট্রনিক্স শিল্প গার্মেন্টসকে ওভারটেক করবে’

সালমান এফ রহমানের ওয়ালটন কারখানা পরিদর্শন‘ইলেকট্রনিক্স শিল্প গার্মেন্টসকে ওভারটেক করবে’

এসডিজি অর্জনে ভূমিকা রাখবে উম্মুক্ত ডেটা

এসডিজি অর্জনে ভূমিকা রাখবে উম্মুক্ত ডেটা

নৌকা পেলেন ‘রাজাকার পরিবারের’ দুই সন্তান, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষোভ

নৌকা পেলেন ‘রাজাকার পরিবারের’ দুই সন্তান, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষোভ

পরীমণির জন্মদিনে বোর্ডিং পাস ও ভিউকার্ড সংস্কৃতি!

পরীমণির জন্মদিনে বোর্ডিং পাস ও ভিউকার্ড সংস্কৃতি!

ইউপি নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্বে যুবক খুন

ইউপি নির্বাচন নিয়ে দ্বন্দ্বে যুবক খুন

বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন: গুতেরেস

বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন: গুতেরেস

এটা প্রযোজনা সংস্থা নয়, অনন্যাকে তিরস্কার এনসিবির

এটা প্রযোজনা সংস্থা নয়, অনন্যাকে তিরস্কার এনসিবির

বাড্ডার আগুন নিয়ন্ত্রণে

বাড্ডার আগুন নিয়ন্ত্রণে

জাতিসংঘ দিবস আজ

জাতিসংঘ দিবস আজ

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune