X
শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১, ৩ আষাঢ় ১৪২৮

সেকশনস

গীতিকবি সংঘের মুখোমুখি কপিরাইট রেজিস্ট্রার

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২০, ০২:০৮

অন্তর্জাল বৈঠকের একটি দৃশ্যে আলোচকদের একাংশ গীতিকবিদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য সম্প্রতি গঠিত গীতিকবি সংঘ বেশ সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে। তারই ধারাবাহিকতায় সংগঠনটির সংবিধান তৈরি ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালানোর পাশাপাশি সংঘের নেতারা কাজ করে যাচ্ছেন নিরলস। চলমান কপিরাইট জটিলতা নিরসনের লক্ষ্যে গীতিকবি সংঘ কার্যকর ভূমিকা রাখতে চায়। এর অংশ হিসেবে ২০২০ সালে তৈরি খসড়া কপিরাইট আইনে গীতিকবিদের স্বার্থ কতটা রক্ষিত আছে সেটাও বুঝতে চান সংগঠনের সদস্যরা।
গীতিকবি সংঘের উদ্যোগে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সন্ধ্যায় অন্তর্জালের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয় একটি দীর্ঘ বৈঠক। এতে গীতিকবি সংঘের শীর্ষনেতারা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের শীর্ষ তিন গীতিকবি গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান ও মনিরুজ্জামান মনির। অন্যদিকে এই আয়োজনের প্রধান অতিথি তথা মূল বক্তা হিসেবে যুক্ত হন বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের রেজিস্ট্রার অব কপিরাইটস (যুগ্ম সচিব) জাফর রাজা চৌধুরী।
গীতিকবি সংঘের অন্যতম উদ্যোক্তা জুলফিকার রাসেলের সঞ্চালনায় এই অন্তর্জাল বৈঠক চলে টানা তিন ঘণ্টা। এ সময় গীতিকবি সংঘ থেকে উত্থাপন করা হয় মূলত পাঁচটি প্রশ্ন, ছিল সম্পূরক প্রশ্নও। একইসঙ্গে উঠে এসেছে আরও বেশকিছু প্রসঙ্গ। এর আলোকে কপিরাইট রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরী বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন এবং আশ্বস্ত করেন, গীতিকবিদের স্বার্থ সমুন্নত রাখার জন্য নতুন আইনে যা যা করা দরকার তিনি সেই চেষ্টা করবেন। তার আহ্বান, দ্রুত সময়ের মধ্যে যেন গীতিকবিদের পক্ষ থেকে প্রস্তাবনা দেওয়া হয় কপিরাইট অফিসে।
আলোচনার শুরুটা হয় গীতিকবি সংঘের সমন্বয়ক শহীদ মাহমুদ জঙ্গীর সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে। অগ্রজ গীতিকবি গাজী মাজহারুল আনোয়ার, মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান ও মনিরুজ্জামান মনির এই আয়োজনে যুক্ত হওয়ায় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। পাশাপাশি কপিরাইট রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরীকে ধন্যবাদ জানান। সূচনা বক্তব্যে জঙ্গী বলেন, ‘‌আজকের আয়োজনে আমাদের সংঘের সবাইকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। কারণ সবার কথা শুনলে সমাধান করা হবে না। তবে আজকের আয়োজন থেকে যে ফল পাবো সেটা সব গীতিকবির সঙ্গে আমরা নিজেদের বৈঠকে ভাগাভাগি করবো। প্রয়োজনে সবার পরামর্শ নিয়েই একটি প্রস্তাবনা তৈরি করবো। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমাদের আজকের বৈঠক। আমাদের অন্যতম সংগঠক জুলফিকার রাসেলকে অনুরোধ করছি শুরু করার জন্য।’


শুরুতেই জুলফিকার রাসেল জানান, নতুন কপিরাইট আইন পেতে যাচ্ছে সংগীতশিল্প। এটি হবে ১৯৫৭ সালের আইন থেকে সংশোধিত। তিনি বলেন, ‘এটা সুখবর বটে। তবে আমরা জানতে পেরেছি, সংশোধিত আইনের খসড়া কপিতে যা আছে, তাতে গীতিকবিরা কিছুটা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অথবা তাদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যাঘাত ঘটবে। এজন্য আমরা একটি প্যানেল করেছি, যেখান থেকে পাঁচটি প্রশ্ন আমরা রেজিস্ট্রার মহোদয়ের কাছে তুলে ধরবো।’
এরপর জুলফিকার রাসেলের আহ্বানে রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরীর কাছে প্রথম প্রশ্ন করেন গীতিকবি সংঘের আরেক উদ্যোক্তা কবির বকুল। তার প্রশ্নটি ছিল এমন– ২০২০-এর সংশোধনীতে দেখতে পাচ্ছি, গীতিকারের কোনও লেখা যখন গানে রূপান্তরিত হচ্ছে বা সুরকার সুর দিচ্ছেন তখন গানটির সব অধিকার শুধু সুরকারের কাছে চলে যাচ্ছে। কিন্তু একজন গীতিকবির তো ওই সৃষ্টির ওপর সমান অধিকার থাকার কথা। এটা ঠিক হচ্ছে কিনা?



জবাবে জাফর রাজা চৌধুরী বলেন, ‘গানের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে প্রণেতা হচ্ছেন সুরকার বা রচয়িতা। আরেকটা জায়গায় আছে সংগীত মানে সুর সংবলিত কর্ম। এসব নিয়ে আশঙ্কার কারণ নেই। পশ্চিমা বিশ্বে ‘সংরাইটার’ বলে একটা পদ আছে, যেখানে মূলত বেশিরভাগ গান সুরকারই নিজে লেখেন, গেয়েও থাকেন। যেটা আমাদের দেশে বেশ কম। ভারতীয় কপিরাইট-২০১২ অনুযায়ী, গানের প্রণেতা হিসেবে সুরকারকে রাখা হয়েছে। সেটা আমরা করিনি।’
রেজিস্ট্রার আরও বলেন, ‘এখন লা-লা-লা করে তো গান হয় না। এটা সম্ভব নয়। আমাদের এই সংশোধনে প্রণেতা হিসেবে সুরকার ও রচয়িতা দুটোই থাকছে। তবে চলমান আইনে রয়েছে, গানের স্টাফ নোটেশনকে ধরা হবে প্রণেতা হিসেবে, কথাকে নয়। এটাই সমস্যা। কিন্তু কথা বাদ দিয়ে তো গান কল্পনাই করা যায় না। নতুন খসড়ায় গীতিকবিদের বঞ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। সবচেয়ে বড় কথা এই করোনাকালে গীতিকবি ও সুরস্রষ্টাদের দুটো সংগঠন হয়েছে। যেটা এ পর্যন্ত ছিল না। এটা ইতিবাচক দিক। এখন এসব বিষয়ে কথা বলার প্রতিনিধি পাবো আমরা। কপিরাইট অফিসে বসেই আমরা এসব সমস্যা চূড়ান্ত করতে পারি।’

গীতিকবি সংঘ’র আত্মপ্রকাশ

 




কবির বকুল গীতিকবিদের উত্তরাধিকারের স্বার্থ নিয়ে আরেকটি সম্পূরক প্রশ্ন করেন। সেটা এমন– একজন গীতিকবি বা শিল্পী মারা গেলে তার উত্তরাধিকাররা কীভাবে সেই গানের রয়্যালটি পাবেন। নাকি পাবেই না?

কপিরাইট রেজিস্ট্রারের উত্তর, ‘যেদিন গানটা প্রকাশিত হলো, সেদিন থেকে ৬০ বছর এটার কপিরাইট বা বাণিজ্যিক বিষয়টা থাকে। যেমন আলাউদ্দীন আলী ভাইয়ের অনেক গান আছে। কিন্তু সেগুলোর কপিরাইট বা অ্যাগ্রিমেন্ট নেই। ফলে তার উত্তরাধিকাররা সেটার ফল পাবেন না। আরেকটা ভালো উদাহরণ দিচ্ছি। আইয়ুব বাচ্চু ভাইয়ের ছেলে ও মেয়ে সম্প্রতি বিদেশ থেকে আমাকে ইমেইল করে জানান, তাদের বাবার গানগুলো সবখানে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। সেগুলো বন্ধ করা বা রেভিনিউ চার্জ করার সুযোগ রয়েছে কিনা। আমি তখন দ্রুত চেক করলাম। মুগ্ধ হয়ে লক্ষ্য করলাম বাচ্চু ভাই তার বেশিরভাগ গানেরই কপিরাইট করে গেছেন। ফলে সেই গানগুলোর বাণিজ্যিক প্রচার বন্ধ করা বা রেভিনিউ সংগ্রহ করার বিষয়ে কোনও বাধা থাকলো না। সেই রেভিনিউ বাচ্চু ভাইয়ের ছেলেমেয়েই পাবেন। ফলে নিজ নিজ গানের কপিরাইট করে রাখার গুরুত্ব অসীম।’

পরের প্রশ্ন করেন সংঘের আরেক সদস্য প্রীতম আহমেদ– যেহেতু এটি একটি সৃষ্টিশীল কর্ম সেহেতু আমরা মনে করি, চুক্তিবদ্ধ হয়ে প্রকাশিত শিল্পকর্মের সময়ের বা যুগের সঙ্গে ওই কর্মের বাণিজ্যিক ও পরিবেষণ সংক্রান্ত পরিমার্জন, পরিবর্ধন, সংযোজনসহ নানামুখী বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেখা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কপিরাইট আইন ১৯৫৭-এর এনেক্স ৪-এ উল্লেখিত ১৮/১৯/১৯এ/২০এ কিছুটা পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। বিশেষ করে ১৯ এবং ১৯এ ২০০০/২০০৫-এর আইনে থাকলেও ২০২০-এর প্রস্তাবনায় প্রায় নেই বললেই চলে। আমরা মনে করি, এই অংশটি এভাবে পরিবর্তন হলে আমাদের অধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এ নিয়ে আপনার মতামত ও ব্যাখ্যা কী?

জাফর রাজা আশ্বাস দিয়েছেন, ‘শঙ্কার কোনও কারণ নেই। আইন বাস্তবায়নের জন্য রেজোল্যুশন আছে। রেজোল্যুশনে সবই লিপিবদ্ধ আছে। আইনটা পাস হওয়ার আগ পর্যন্ত আগেরটাই বলবৎ থাকবে। এরপরও যদি আপনাদের কোনও শঙ্কা থাকে আপনারা আসবেন, জানাবেন। সমাধান হবে। এগুলো সমাধানের জন্যই কপিরাইট অফিসের সৃষ্টি।’
এরপর সংঘের আরেক শীর্ষ সদস্য আসিফ ইকবাল প্রশ্ন করেন রেভিনিউ শেয়ারিং নিয়ে। তার আগে গীতিকবিদের সম্মানী বিষয়ে সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন তিনি, ‘একটা পণ্য বা সার্ভিস যখন তৈরি হয় তখন সেটি উৎপাদন খরচের চেয়ে বিতরণের খরচ বেশি হতে পারে না। একটা গান বানানোর যে খরচ তার সিংহভাগ চলে যায় বিতরণ যারা করছে তাদের কাছে। প্রায় একটা গানের ৮৭ ভাগ টাকা চলে যাচ্ছে বিতরণ ব্যবস্থাপকদের কাছে। বিপরীতে একজন গীতিকবি ১০০ টাকা আয় থেকে মাত্র ৩ টাকা পাচ্ছে! যে নবীন একটা গান লিখেছে সে গরিব হলেও আর্থিক স্বার্থের কথা ভাবে না। তার চিন্তা থাকে গানটা বের হবে। সে সৃষ্টির আনন্দটা খোঁজে। এটা আমাদের প্রত্যেক গীতিকবির ক্ষেত্রে নির্মম সত্য। আর এর সুবিধা নেন অনেক সুরকার, শিল্পী, প্রযোজক। সবার কথা বলছি না, যেটা ঘটে সাধারণত তাই বলছি। এটা আমাদের গীতিকবিদের নিয়মিত অভিজ্ঞতা।’
গীতিকবি সংঘের সমন্বয় কমিটির সদস্য (বাঁ থেকে) শহীদ মাহমুদ জঙ্গী, লিটন অধিকারী রিন্টু, সালাউদ্দিন সজল, হাসান মতিউর রহমান, গোলাম মোরশেদ, আসিফ ইকবাল, কবির বকুল, জুলফিকার রাসেল, প্রীতম আহমেদ, জাহিদ আকবর, জয় শাহরিয়ার ও সোমেশ্বর অলি আসিফ ইকবাল আরও বলেন, ‘একজন কণ্ঠশিল্পী বা সংগীতশিল্পী চাইলেই টাকা আয় করতে পারেন। গানটা লেখার পর গীতিকবির আসলে পারফর্মের আর সুযোগ নেই। মূলত সবার আগে দুস্থ হয়ে পড়ে গীতিকবিরাই। এটাকে আজও পেশা হিসেবে নেওয়া যায়নি, গানের জন্য তাকে বেছে নিতে হয় অন্য কোনও চাকরি। এর দায় আমাদেরই নিতে হবে।’
আসিফ ইকবালের মূল প্রশ্নটি ছিল, গীতিকবিদের রেভিনিউ বা রয়্যালিটির বিষয়ে কপিরাইট অফিস চলমান খসড়া আইনে শক্ত কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে কিনা।
জবাবে রেজিস্ট্রারের মন্তব্য, ‘প্রশ্নটা বেশ জটিল। পৃথিবীতে এমন কোনও কপিরাইট আইন নেই যেখানে গীতিকবিকে শক্তভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত ও বাংলাদেশের কপিরাইট নিয়ে গবেষণা করেছি। কোনও দেশে গীতিকবিদের রয়্যালটি পরিবেশনের বিষয়ে আলাদা করে উল্লেখ নেই। সবখানে একই বক্তব্য– এটি যৌথ প্রচেষ্টার ফসল। একজন তবলা বাদকেরও অবদান থাকে একটি গানে। তাহলে তাদের সমন্বয় করবো কীভাবে? এজন্যই এসব বিষয়ে আলাদা রয়্যালিটির বিষয়ে ভাগ করা হয়নি।’
জাফর রাজা আরও বলেন, ‘রয়্যালটি ডিস্ট্রিবিউশন খুবই জটিল বিষয়। এখানে ইগোর বিষয়ও চলে আসে। আপনি গান লিখবেন, সুর করবেন কিন্তু গানটা যদি অসাধারণ কণ্ঠে গাওয়া না হয় তাহলে হবে না। ফলে শিল্পীরা গান গাওয়ার পরেও আজীবন একটা সুবিধা পান। এরপরেও এটা নিয়ে আমরা বসতে চাই। সব জটিলতারই সমাধান সম্ভব। এক টেবিলে বসলেই হবে।’
সংঘের আরেক জ্যেষ্ঠ সদস্য হাসান মতিউর রহমান প্রশ্ন তোলেন একই আদলে। তার কথায়, ‘গান রচনাকে আজ পর্যন্ত কেউ পেশা হিসেবে নিতে পারেনি। আমাদের গান গেয়ে বাড়ি-গাড়ি, দেশে-বিদেশে রাজকীয় জীবন ধারণ করছেন অনেক কণ্ঠশিল্পী। গান লেখার পর একজন গীতিকবির আর কিছুই পাওয়ার থাকে না। এ বিষয়ে ভাববার অবকাশ রয়েছে।’
হাসান মতিউর রহমান প্রশ্ন করেন, আমি একটা গান লিখেছি। একজন সুর করেছেন। একসময় মনে হলো গানটার সুর ভালো লাগছে না, কণ্ঠ ভালো লাগছে না। আমি চাইলে কি সেই গানটির আরেকটা সংস্করণ করতে পারবো?
জবাবে জাফর রাজা চৌধুরী বলেন, ‘গানটির মূল স্রষ্টা মূলত গীতিকার ও সুরকার। এ নিয়ে বিভেদ নেই। নতুনভাবে করতে কোনও অনুমতির দরকার নেই। কিন্তু নৈতিক দায় আছে অনুমোদন নেওয়ার। আর একটা গান প্রকাশের পর অন্তত পাঁচ বছর সময় দেওয়া দরকার বলে আমার ব্যক্তিগত অভিমত। আইনে এমন কোনও সময় বাঁধা নেই। চাইলে আজকে প্রকাশিত গান কালও রিঅ্যারেঞ্জ করতে পারেন।’
সংগীত শিল্পের চলমান সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় সিএমও (কালেক্টিভ ম্যানেজমেন্ট অর্গানাইজেশন) অনুমোদনের প্রসঙ্গটি তোলেন গীতিকবি আসিফ ইকবাল। তার ভাষ্যে, ‘আমাদের বাজার খুব ছোট। ফিজিক্যাল ডিস্ট্রিবিউশন নেই। সিংগহভাগ নিয়ে যায় মোবাইল অপারেটরগুলো। এমন অবস্থায় একটা গান থেকে আয়ের পরিমাণ খুবই কম। ফলে সিএমও আমাদের এই সময়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটি অনুমোদনও পেয়েছে। কিন্তু সেখানে আমাদের গীতিকবিদের কোনও প্রতিনিধি আছে বলে আমার জানা নেই। একটি বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীকে সিএমও দেওয়ার অর্থ খুঁজে পাই না। এটা কেমন করে সম্ভব?
জাফর রাজা চৌধুরীর জবাব, ‘বাজার আসলেই সীমিত। এই ডিজিটাল মার্কেট না হলে গান নিয়ে এত কথা হতো না। এখন সারাবিশ্বে ছড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের সৃষ্টি। সেজন্যই এ নিয়ে এত জল্পনা। ২০১৪ সালে বিএলসিপিএস নামের প্রতিষ্ঠানটিকে সংগীতের ক্ষেত্রে সিএমও অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর সদস্য হিসেবে অনেক স্বনামধন্য শিল্পী আছেন, ছিলেন। যেমন নাম বলতে পারি শেখ সাদী খান, হামিন আহমেদ, সুজিত মোস্তফা, সাবিনা ইয়াসমিন, প্রয়াত এন্ড্রু কিশোর ও আলাউদ্দীন আলীসহ আরও অনেকে। এখন আপনাদের একটা পদক্ষেপ নিতে হবে। তাদের সঙ্গে আলাপ করে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। আমরা কপিরাইট অফিস কিছু করতে পারবো না। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এই পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন সরকার চাইলেই আপনার বাড়ি অধিগ্রহণ করতে পারবে, কিন্তু মেধাস্বত্ব নিতে পারবে না। ফলে নিজেদের স্বার্থ দেখার জন্য এখন আপনাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। সিএমও তো আপনার স্বার্থ রক্ষার জন্য তৈরি। স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য নয়।’
এমন জবাবের বিপরীতে জুলফিকার রাসেল প্রশ্ন তোলেন এই বলে, ‘সংগীতের জন্য এত বড় একটি সিদ্ধান্ত হলো, সরকার অনুমোদন দিলো, সিএমও তৈরি হলো। যেখানে গীতিকবিরাই নেই! গীতিকবিদের মধ্য থেকে কাউকে ডাকা হয়েছে বলেও আমার জানা নেই। এটা কেমন করে সম্ভব?
কপিরাইট রেজিস্ট্রারের দাবি, ‘কেউ না কেউ একজন গীতিকবি ছিলেন নিশ্চয়ই। কিংবা এখনও আছেন হয়তো। বিষয়টি ২০১৪ সালে হয়েছে, যেটা এখনও সক্রিয় হতে পারেনি। তাই এখনও সময় আছে, বসে এটা সমাধান করা সম্ভব।’
বৈঠকের শেষ প্রশ্ন ছিল জয় শাহরিয়ারের, ‘আমাদের ব্যান্ড বা রক মিউজিকের বড় একটা জায়গা রয়েছে সংগীতাঙ্গনে। জানতে পেরেছি, সম্প্রতি বামবার সঙ্গে কপিরাইট অফিসের সঙ্গে একটা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ব্যান্ডের গানের স্বত্ব ব্যান্ড পাবে। কিন্তু ব্যান্ডের গান তো  আসিফ ভাই, জঙ্গি ভাই, রাসেল ভাইসহ প্রায় সবাই লিখেছেন। অথবা ব্যান্ড থেকে কোনও সদস্য যদি বেরিয়ে যান তাহলে কি তার কোনও অধিকার থাকবে না সৃষ্টির প্রতি?

জাফর রাজা চৌধুরী উল্লেখ করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কপিরাইট ছাড়া কোথাও ব্যান্ডের ধারণা নেই। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, যখন ব্যান্ড তৈরি হয় তখন সব সদস্য ধরে নেয়– আমি থাকি আর না থাকি ব্যান্ডটা যেন টিকে থাকে। ব্যান্ডকে আমি একটা গাছের সঙ্গে তুলনা করি। স্বাভাবিক মৃত্যু পর্যন্ত আমি প্রত্যাশা করি গাছটি বেঁচে থাক। কেউ কেটে ফেলুক সেটা চাই না। শ্রদ্ধেয় নকীব খানের সঙ্গে এই জটিলতা নিয়ে কথা বলেছি। তার অনেক বিখ্যাত গান আছে সোলসে। উনি যখন ব্যান্ড থেকে চলে আসেন, গান নিয়ে আসেননি। তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বোঝাপড়া হয়েছে। নকীব খান অভ্যন্তরীণ রয়্যালটি পান। পার্থ বড়ুয়া অনেক শ্রদ্ধা করেন নকীব ভাইকে। এটাই হচ্ছে একটা ব্যান্ডের বা ইন্ডাস্ট্রির বা শিল্পীর সত্যিকারের সৌন্দর্য। তবুও বলেছি, এ বিষয়ে একটা অ্যাগ্রিমেন্ট করে নেন। তারা জানিয়েছেন করবেন। তাই আমি বলছি, ব্যান্ডের বিষয়টি নিজেদের মধ্যে আলাদা চুক্তি বা বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমাধান করাই শ্রেয়। কারণ এখন আর এজন্য নতুনভাবে আইন করার সুযোগ নেই।’

অন্তর্জাল বৈঠকে আলোচকদের একাংশ প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে কিংবদন্তি গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, ‘যেভাবে মঙ্গল হয় সেভাবেই সমাধান হোক। সব বিভেদ মুছে যাক। আমার ভাই যারা আছেন, তাদের সুন্দর পরিবেশের জন্য যা যা করা দরকার আমি আছি। আমি এই আলাপে এসে খুব আশান্বিত হয়েছি।’

এরপর আরেক নন্দিত গীতিকবি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান বলেন, ‘আমার জীবনে কখনও সুরের ওপরে গান লিখিনি। গান লেখা শব্দটা পছন্দ করি না। গানের কবিতা বলতে পছন্দ করি। আমরা যারা গানের কবিতা লিখি বা সুর সৃষ্টি করি বা গান গাই, তারা সবাই আবেগপ্রবণ। মনের তাড়নায় এসেছি, জীবিকার তাড়নায় নয়। প্রায় সারা পৃথিবীতেই আছে– একজন গীতিকবির লেখা একটি গান যদি চূড়ান্তভাবে হিট হয় তাহলে তার আর সারাজীবন কিছু করার প্রয়োজন পড়ে না। একটি গানের রয়্যালটি থেকেই রাজার হালে জীবন কেটে যায় তার। এটা সারা পৃথিবীতে আছে, কিন্তু বাংলাদেশে নেই। এখানে সেটা পেতে হলে এখন দেখছি মামলা করতে হয়! মামলা করতে হলে তো আইনজ্ঞ হতে হবে। আইনজ্ঞ হলে তো আর গান সৃষ্টি হবে না। ফলে বিষয়টি সাংঘর্ষিক। এখানে আমার উত্তরাধিকারদের কথা শুনে খুব আশ্বস্ত হয়েছি। মনে হলো তারা এই বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করছে। আমার ধারণা, এই ভাবনাগুলো কপিরাইট অফিসে যদি দেওয়া যায় এবং রাজা সাহেবের যে কথা আর আন্তরিকতা দেখলাম তাতে ফলপ্রসূ হবে।’
দেশের আরেক অন্যতম গীতিকবি মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘এখনও গীতিকবি সংঘের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। জন্ম হলো একমাসেরও কম সময়। এখনই গীতিকবিদের স্বার্থ নিয়ে যেভাবে বসেছেন আমার অনুজরা, এটা দেখতে পারাও আমার জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। জাফর রাজা যখন কপিরাইট অফিসের দায়িত্বে এসেছেন, তখন থেকেই শিল্পীদের অধিকার নিয়ে তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। যেটা আগে দেখা যায়নি। আমি ইতোমধ্যে তার সহযোগিতায় আমার কিছু গানের কপিরাইট করেছি। এতক্ষণ যে আলোচনা করলেন সবাই, সেটা দ্রুত সমাধানযোগ্য নয়। এগুলো লিখিতভাবে কপিরাইট অফিসে দিলে নিশ্চয়ই সমাধান হবে। কারণ রেজিস্ট্রার সাহেব আমাদের বিষয়ে সত্যিই আন্তরিক। সেটার প্রমাণ আগেও পেয়েছি, আজও পেলাম।’
সবশেষে কপিরাইট রেজিস্ট্রার জাফর রাজা চৌধুরীকে অনুরোধ করে সভা সঞ্চালক জুলফিকার রাসেল বলেন, ‘সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে গীতিকবি সংঘের নিবন্ধন করতে ইচ্ছুক আমরা। এ বিষয়ে আপনার সহযোগিতা চাই।’
জাফর রাজা চৌধুরী আশ্বাস দিয়েছেন, ‘সম্পূর্ণ সহযোগিতা করবো। কারণ এমন একটি সংগঠন এই শিল্পের জন্য খুবই দরকার।’

সভায় আরও ছিলেন লিটন অধিকারী রিন্টু, গোলাম মোর্শেদ, সালাউদ্দিন সজল, প্রিন্স মাহমুদ, তরুন মুন্সী, জনি হক, জাহিদ আকবর, মাহমুদ মানজুর, রবিউল ইসলাম জীবন, সোমেশ্বর অলি প্রমুখ।

/এমএম/জেএইচ/

সর্বশেষ

অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে নক আউট পর্বে নেদারল্যান্ডস

অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে নক আউট পর্বে নেদারল্যান্ডস

নীল জল থেকে উঠে জড়ালেন অন্তর্জালে!

নীল জল থেকে উঠে জড়ালেন অন্তর্জালে!

ব্রাজিলের অলিম্পিক দলে নেই নেইমার!

ব্রাজিলের অলিম্পিক দলে নেই নেইমার!

নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর জয়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আদালতে মমতা

নন্দীগ্রামে শুভেন্দুর জয়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আদালতে মমতা

যানবাহন উৎপাদন ও বিপণনে ট্রেডমার্ক সনদ পেলো ওয়ালটন

যানবাহন উৎপাদন ও বিপণনে ট্রেডমার্ক সনদ পেলো ওয়ালটন

প্রথম ব্যাচের তৃতীয় লিঙ্গের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিলো ফুডপ্যান্ডা

প্রথম ব্যাচের তৃতীয় লিঙ্গের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিলো ফুডপ্যান্ডা

সিলেটের নতুন কারাগারে প্রথম ফাঁসি কার্যকর

সিলেটের নতুন কারাগারে প্রথম ফাঁসি কার্যকর

ঢাকায় ৬০ নমুনার ৬৮ শতাংশ ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট!

ঢাকায় ৬০ নমুনার ৬৮ শতাংশ ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট!

মাঠে নেমেই বেলজিয়ামকে বদলে দিলেন ডি ব্রুইনে

মাঠে নেমেই বেলজিয়ামকে বদলে দিলেন ডি ব্রুইনে

কুড়িগ্রামে দ্রুত বাড়ছে সংক্রমণ

কুড়িগ্রামে দ্রুত বাড়ছে সংক্রমণ

হাজী দানেশে দ্রুত উপাচার্য নিয়োগের আহ্বান

হাজী দানেশে দ্রুত উপাচার্য নিয়োগের আহ্বান

যাত্রাবাড়ীতে ১৫২ বোতল ফেন্সিডিলসহ যুবক গ্রেফতার

যাত্রাবাড়ীতে ১৫২ বোতল ফেন্সিডিলসহ যুবক গ্রেফতার

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

নীল জল থেকে উঠে জড়ালেন অন্তর্জালে!

নীল জল থেকে উঠে জড়ালেন অন্তর্জালে!

পরীমণিকে নিয়ে ওপার বাংলাতেও তোলপাড়!

পরীমণিকে নিয়ে ওপার বাংলাতেও তোলপাড়!

বক্স অফিস মাতানো দুই ছবি ঢাকায় (ভিডিও)

বক্স অফিস মাতানো দুই ছবি ঢাকায় (ভিডিও)

আসছে প্রামাণ্যচিত্র ‘ব্ল্যাকপিংক দ্য মুভি’

আসছে প্রামাণ্যচিত্র ‘ব্ল্যাকপিংক দ্য মুভি’

অংশুর কথা-সুরে তানভীর তারেক (ভিডিও)

অংশুর কথা-সুরে তানভীর তারেক (ভিডিও)

বলিউডের এ তথ্যগুলো জানেন কি?

বলিউডের এ তথ্যগুলো জানেন কি?

ড্রাগ ট্রাফিকিং নিয়ে থ্রিলার সিরিজ

ড্রাগ ট্রাফিকিং নিয়ে থ্রিলার সিরিজ

পরী থাকে আসমানে...

পরী থাকে আসমানে...

গুলশানের ক্লাবে গিয়েছিলাম কিন্তু অপ্রীতিকর কিছু ঘটাইনি: পরীমণি

গুলশানের ক্লাবে গিয়েছিলাম কিন্তু অপ্রীতিকর কিছু ঘটাইনি: পরীমণি

মহামারিতেই বিয়েটা সেরে ফেললেন তারা

মহামারিতেই বিয়েটা সেরে ফেললেন তারা

© 2021 Bangla Tribune