সেকশনস

কোভিড-১৯: আমরা কি হাল ছেড়ে দিয়েছি?

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২০, ১৩:০৩

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা যুক্তরাজ্যের প্রধান চিকিৎসা উপদেষ্টা অধ্যাপক ক্রিস হুইট্টি সম্প্রতি বলেছেন, করোনাভাইরাসে শিশুরা যে ক্ষতির মুখে পড়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না খোলায় তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে। শিশুরা করোনায় কম আক্রান্ত হয় দাবি করে তিনি বলেছেন, এই ভাইরাস অনেকদিন থাকবে এবং সেই চ্যালেঞ্জটা নিয়েই শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে।
এই মহামারির মধ্যেও ডেনমার্কে স্কুল বন্ধ হয়নি। একই পথে হেঁটেছে সুইজারল্যান্ড। বাংলাদেশ ব্রিটেন, ডেনমার্ক বা সুইজারল্যান্ড নয়। ছোট একখণ্ড ভূমিতে ১৬ কোটি মানুষ গাদাগাদি করে বাস করে। আমাদের দেশের যত সংখ্যক শিশু স্কুলে যায়, ইউরোপের বহু দেশেরই মোট জনসংখ্যা তার থেকে কম। সামাজিক মাধ্যমে অনেক অভিভাবকই বলেছেন, স্কুল খুললেও সন্তানদের তারা স্কুলে যেতে দেবেন না।   
বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে গত ৮ মার্চ আর ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। এতে শিক্ষার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। কী করা হবে না হবে ভাবতে ভাবতে সংক্রমণের সময় বাড়তে থাকলে অতি সম্প্রতি বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইন ও মোবাইলে পাঠদান চালু হয়। কিন্তু সেটাও খুব বেশি কার্যকর হয়নি। শিক্ষার্থীদের অর্ধেকই এ পাঠদান প্রক্রিয়ার বাইরে ছিল। এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারেনি। দেরিতে হলেও মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে সরকার জানিয়েছে, এ বছর পিইসি পরীক্ষা হবে না। কিন্তু পিইসি ডিগ্রিটা এত কি বড় প্রয়োজন যে এটা শিক্ষা ব্যবস্থায় থাকতেই হবে, সেটা অজানাই থাকছে বরাবর। 

পড়ালেখা নেই, খেলা নেই, সাংস্কৃতিক কর্মে কোনও সংযোগ নেই। সন্তানের গৃহবন্দি জীবন নিয়ে শঙ্কিত অভিভাবকরা। কিন্তু সাহসও পাচ্ছে না জোর করে বলতে যে স্কুলে খুলে দাও, কারণ করোনার দাপট। শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে সেপ্টেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হতে পারে। সরকারকে একই সঙ্গে ভাবতে হচ্ছে বকেয়া থাকা এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠানের কথাও। যদি স্কুল খোলে, কীভাবে গোটা প্রক্রিয়াটা সামাল দেওয়া হবে? কীভাবে স্কুলে, ক্লাসে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা যাবে? স্কুল কলেজগুলো কীভাবে সবসময় জীবাণুমুক্ত রাখা যাবে?

আসলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলার ব্যাপারে ভাবনাটা আলাদা মনে হলেও, এটি আলাদা নয়। সামগ্রিকভাবেই করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির দিকে নজর না দিলে এই বিচ্ছিন্ন ভাবনা কোনও কাজে আসবে না। মহামারির মধ্যে স্কুল খোলার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু ঝুঁকিতো আমরা নিয়েছি এবং নিয়েছি যেনতেনভাবে। সংক্রমণ যখন বেড়ে চলেছে, শুধু পজিটিভ টেস্টের প্রেক্ষিতে সরকারি হিসেবে যখন প্রতি ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুহার গড়ে প্রায় ৪০ জন, তখন লাগামহীনভাবে সব আমরা খুলেছি। মাস্ক পরা বাধ্যবাধকতার কথা বলা হলেও মানুষের মাঝে সেই সচেতনতাও অনেক কম। 

বলতে গেলে একদম শুরু থেকেই করোনাভাইরাসকে আমরা ঠিক পদ্ধতিতে মোকাবিলা করিনি। আমাদের এখানে দেশব্যাপী একদিনের জন্য লকডাউন হয়নি। সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার দুই পথ খোলা রেখেছিল যেন লোকজন কম বাইরে যায়, আবার যেন যেতেও পারে। ছুটির কারণে অফিস আদালত কল কারখানা বন্ধ থেকেছে। আবার ‘ছুটি’ শব্দটা থাকায় মানুষের চলাচলের ওপর কোনও নিয়ন্ত্রণও আরোপ করা যায়নি। এতে করে রোগের বিস্তার আটকানো সম্ভব হয়নি। 

সেই সাধারণ ছুটিও উঠে গেছে, লাল, নীল, কমলা জোন করার বর্ণিল আয়োজনও এখন চোখে পড়ছে না। এখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলছেন, করোনা এমনি এমনি চলে যাবে, ভ্যাকসিনেরও প্রয়োজন হবে না। অথচ আমরা দেখছি, ভ্যাকসিন পেতে ধনী দেশগুলো পর্যন্ত কীভাবে দৌড়ঝাঁপ করছে। 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও তার মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতরসহ নীতি নির্ধারণী জায়গা থেকে এমনসব আচরণে অসচেতন মানুষের ‘ডোন্ট-কেয়ার’ ভাবটা চাঙ্গা হয়েছে, সঙ্গে চাঙ্গা ভাব আছে ভাইরাসেরও। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) বলছে গত এক মাসে রাজধানীতে করোনা আক্রান্ত রোগী বেড়েছে ৫৬ শতাংশ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেবল বন্ধ, রাজধানীর জীবনযাত্রা মহামারি শুরুর আগের অবস্থায় চলে এসেছে। 

রাস্তায় মানুষের ঢল আর যানজট অনেকটা যেন জানান দেয়, মন্ত্রীর কথাই সত্যি, করোনার বিদায় বেলা চলছে। চিকিৎসা ব্যবস্থার নাভিশ্বাস উঠেছে, মানুষ হাসপাতাল এড়িয়ে চলছে আস্থার অভাবে। নাক-মুখ ঢাকা মাস্কই যে একমাত্র মোক্ষম প্রতিষেধক, সেটাও কম মানছে মানুষ। পুরো সময়টাতে বাংলাদেশের যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে তা হলো করোনা পরীক্ষার অপ্রতুলতা। শুরু থেকেই করোনা টেস্ট কম করার একটা প্রবণতা লক্ষ করা গেছে, যা আজও  অব্যাহত আছে। শুধু তাই না, পরীক্ষা বেশি হচ্ছে, এই অজুহাতে করোনা পরীক্ষার ওপর ফি বসিয়ে মানুষকে দূরে রাখার মতো কাজও সরকার করেছে। 

মৃত্যুহার কম এ নিয়ে একটা সন্তুষ্টি থাকলেও আক্রান্তের হার যে ২০ শতাংশ বা তার চেয়ে বেশি থাকছে, সে নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই সরকারি তরফে। কিছুদিন আগে আইইডিসিআর ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) যৌথভাবে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাসিন্দাদের ৯ শতাংশ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। এর অর্থ হচ্ছে, দুই কোটি মানুষের এই ঢাকা শহরে ১৬ লাখের বেশি মানুষের দেহে করোনাভাইরাস রয়েছে। আর সরকারি হিসাবে বলা হচ্ছে, পুরো দেশে গত পাঁচ মাসে সব মিলিয়ে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৫৯ জনের দেহে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। 

এই স্বল্প পরীক্ষার পরও আমাদের দেশের করোনা পরিস্থিতির কোনও উন্নতি নেই আসলে। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় বলছে, পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বে ১৫তম। মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে ২৯তম। 

বাস্তবতা হলো সরকার জীবিকাকে প্রাধান্য দিয়েছে, ফলে সবকিছু খুলে দিয়েছে যাতে মানুষের আয়ের পথ খুলতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে যে বিষয়গুলো বড় করে দেখা দরকার ছিল যেমন, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা, রাস্তায় বের হয়ে মানুষ মাস্ক পরছে কিনা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখছে কিনা, সেসব বিষয়ে তদারকিটা সেভাবে হয়নি। সবই ছেড়েছি, কিন্তু একেবারে হাল ছেড়ে না দিয়ে অন্তত এটুকু মানুষকে বলি, মাস্ক পরা, হাত ধোয়া আর ন্যূনতম শারীরিক দূরত্ববিধি মানলেও করোনা থেকে কিছুটা হলেও দূরে থাকা যাবে। 

লেখক: সাংবাদিক 



/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

পাপুল কাণ্ড

পাপুল কাণ্ড

আবিরন হত্যার বিচারে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই

আবিরন হত্যার বিচারে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই

বহুমাত্রিক দুর্নীতির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা

বহুমাত্রিক দুর্নীতির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা

সু চি’র বিদায় ও রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ

সু চি’র বিদায় ও রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ

কারাগারে গেলে টাকায় সব মেলে

কারাগারে গেলে টাকায় সব মেলে

মির্জা কাদেরের 'ভোকাল টনিক'

মির্জা কাদেরের 'ভোকাল টনিক'

অপরাধের সঙ্গে দুর্নীতির যোগ

অপরাধের সঙ্গে দুর্নীতির যোগ

ঐতিহ্য ভুলিয়ে

ঐতিহ্য ভুলিয়ে

নতুন বছরে জাগুক নতুন উপলব্ধি

নতুন বছরে জাগুক নতুন উপলব্ধি

আরব বসন্তের সূর্য উঠেই ডুবে গেলো

আরব বসন্তের সূর্য উঠেই ডুবে গেলো

বিজয়ের রাজনীতি

বিজয়ের রাজনীতি

আবার বঙ্গবন্ধু

আবার বঙ্গবন্ধু

সর্বশেষ

বরইয়ের পুষ্টিগুণ

বরইয়ের পুষ্টিগুণ

এবার গল্পকার

অভিনয়, গান, কবিতা পেরিয়ে এবার তিনি গল্পকার...

নড়াইলে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন

নড়াইলে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের ৮৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন

তিন মাসে ভ্যাকসিন পাসপোর্ট চালু করতে চায় ইইউ

তিন মাসে ভ্যাকসিন পাসপোর্ট চালু করতে চায় ইইউ

জুমার নামাজ পড়া হলো না ২ চাচাতো ভাইয়ের

জুমার নামাজ পড়া হলো না ২ চাচাতো ভাইয়ের

শাবিতে ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু

শাবিতে ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু

মুক্তিযোদ্ধা বাছাইয়ে বাদ পড়লেন ১৩ বছর ভাতা নেওয়া আ.লীগ নেতা

মুক্তিযোদ্ধা বাছাইয়ে বাদ পড়লেন ১৩ বছর ভাতা নেওয়া আ.লীগ নেতা

লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুতে রাবিতে প্রতিবাদ

লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুতে রাবিতে প্রতিবাদ

সুনামগঞ্জের ঘুংঘিয়ারগাঁওয়ে ১৪৪ ধারা

সুনামগঞ্জের ঘুংঘিয়ারগাঁওয়ে ১৪৪ ধারা

‘করোনার ১০ মাসে তথ্যপ্রযুক্তিতে ১০ বছর এগিয়েছি’

‘করোনার ১০ মাসে তথ্যপ্রযুক্তিতে ১০ বছর এগিয়েছি’

২৪ সেকেন্ডে গোল করেও জিততে পারেনি মুক্তিযোদ্ধা

২৪ সেকেন্ডে গোল করেও জিততে পারেনি মুক্তিযোদ্ধা

তিন মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ৪

তিন মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ৪

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ


[email protected]
© 2021 Bangla Tribune
Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.