X
সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

২০২০ ইন্টারন্যাশনাল বুকার প্রাইজ

মারাইকে লুকাশ রাইনেফেল্টের ‘দ্য ডিসকমফোর্ট অফ ইভিনিং’

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২০, ১৭:২৩

গত ২৬ আগস্ট ঘোষণা করা হয়েছে ২০২০ সালের বুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ বিজয়ীর নাম। ‘দ্য ডিসকমফোর্ট অফ ইভিনিং’ উপন্যাসের জন্য এবার এ পুরস্কার পেলেন ২৯ বছর বয়সী ডাচ লেখক মারাইকে লুকাশ রাইনেফেল্ট । বইটি মূল ডাচ থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন মিশেলা হাচিসন, প্রকাশক ফেবার অ্যান্ড ফেবার। ‘একজন ডাচ খামারের মেয়ে এবং তার ধর্মীয়-রক্ষণশীল পরিবারকে ঘিরে অবিচ্ছিন্ন ও বিরক্তিকর ঘটনা নিয়ে নতুন লেখকের আকর্ষণীয় উপন্যাস।'

অস্বস্তিটাই একে হালকা করে দিয়েছে। বুকার পুরষ্কারের জন্য মনোনীত, মারাইকে লুকাশ রাইনেফেল্টের প্রথম উপন্যাস এক পর্যায়ে বিরক্তির দিকে পাঠকদের নিয়ে যায়। রাইনেফেল্ট ২৯ বছর বয়সেই নেডারল্যান্ডে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন।

উপন্যাসটির কাহিনি শুরু ১০ বছর বয়সী ইয়াস নামের একটি মেয়েকে দিয়ে। তার ভাই মাথিসের সঙ্গে আইস স্কেটিং-এ যাওয়ার অনুমতি না-পাওয়া তার মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দেয়, ফলশ্রুতিতে সে অভিশাপ দিতে থাকে, যেন তার খরগোশের বদলে তার ভাই মারা যায় (সে ভয় পেত, বাবা রাতের খাবার হিসেবে তার পোষা খরগোশটার ওপর হয়তো নজর দিয়েছে)।

এবং পরে দেখা যায় সেটাই ঘটেছে, তার ভাই বরফে চাপা পড়ে মারা যায়।

মারাইকে লুকাশ রাইনেফেল্ট (২০১৬) ছবি, উইকিপিডিয়া এরপরের ঘটনা আরও করুণ। পরিবারে নেমে আসে শোকের উন্মাদনা। পরিবারটি ভেঙে পড়ে। সেই ছেলেবেলার বেদনা বাড়তে বাড়তে এরকম একটি ভয়াবহ পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়িয়েছে যেন, ইয়াসের এরকম মনে হতে থাকে। ক্রমে পরিবারের অন্য সবার আচার-আচরণও তার জন্য পীড়াদায়ক হয়ে ওঠে। এরকম ঝুট-ঝামেলার মধ্যে টেস্টে তাদের খামারের অনেক গরুর পা ও মুখে রোগ ধরা পড়ে। [উপন্যাসটি ২০০১ সালের মহামারির সময়কে ঘিরে লেখা] যার কারণে তাদেরকে খামারের সব গরু হত্যা করতে হয়।
উপন্যাসে ইয়াসের পরিবারকে ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল দেখানো হয়, যেন লেখক নিজের জীবনকেই লিখছেন। এমনকি পেশায় রাইনেফেল্ট নিজেও একজন খামারি। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ছোটবেলা থেকে তিনি ‘নিষ্ঠুর ঈশ্বরের’ ধারণা নিয়ে বড় হয়েছেন, এমনকি নিজেও অল্প বয়সে তার ভাইকে হারান—যদিও সেসব নিয়ে পরিবারের কাছ থেকে খুব একটা জানতে পারেননি। তার জীবনের মতো নীরবে বুকের ভেতর যন্ত্রণা পুষে রাখাটা উপন্যাসের কল্পিত পরিবারের মধ্যেও আমরা দেখতে পাই, আর সেটাই যেন সকল প্রশ্নের উত্তর। ইয়াসের কথায়, ‘ক্ষেত থেকে যে ফসল উৎপন্ন হয়, সেটা আমরা জানি। কিন্তু আমাদের নিজেদের মধ্যে যা বেড়ে উঠছে তা সম্পর্কে আমরা জানি না।’
মাথিসের মৃত্যুর আগেও অভিভাবকরা পাপ-পরবর্তী শাস্তির প্রতি গাহ্য করতো; বলতো, শারীরিক ক্রিয়াকলাপও লজ্জার উৎস। মাথিসের মৃত্যুর পর, পাপ, পরিতাপ এবং বস্তুগত যেসব শিক্ষা তাদের ছিলো বা যেসব নিয়ম-কানুন তারা মানতো সেগুলোও পরিবারের সবার বেদনার মধ্যে হারিয়ে যায়। পরে তারা সেই শিক্ষা রপ্ত করার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে।

মনস্তাত্ত্বিকভাবে পরিবারটি এতো সমস্যায় পড়ে যে, সেগুলোর ছাপ পরিবারের সদস্যদের দিকে দৃষ্টি দিলে খুঁজে পাওয়া যাবে। ইয়াস তার প্রচণ্ড ময়লা লাল কোট খুলতে চায় না, তার নাভিতে ড্রয়িং পিন আটকে রাখে এবং তার দেহে দীর্ঘস্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য বাসা বাঁধে [বলে রাখা ভালো যে, ‘স্ক্যাটোলজিক্যাল উপন্যাস’ খুঁতখুঁতে স্বভাবের লোকদের জন্য নয়]।

তার আরেক ভাই ওবে বিছানার ফ্রেমে নিজের মাথা আঘাত করে এবং প্রাণি হত্যা শুরু করে। অন্যদিকে, তার মা অনেক খাবার তার খাদ্য তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেন।

‘দ্য ডিসকমফোর্ট অফ ইভিনিং’ উপন্যাসে দেখা যায় চরিত্রগুলো নিজেদের এবং অন্যদের শারীরিক সীমানার সীমাবদ্ধতার পরীক্ষা করছে। ইয়াসের কোষ্ঠকাঠিন্য নির্মূল করার জন্য উদ্ভট চেষ্টা করা হয়—ইয়াসের বোন তার মুখে জিহ্বা ঢুকিয়ে দেয়, পড়তে গিয়ে মনে হবে তা যেন ‘মাইক্রোওয়েভে গরম করে ফেলে রাখা স্টেকের টুকরা’।

এসব ছাড়াও উপন্যাসটিতে অনেক বিরক্তিকর দৃশ্য রয়েছে।

রাইনেফেল্ট এতকিছু লেখার পর দমে যাননি। বয়ঃসন্ধিকালে মানুষের নানা রকমের কল্পনা ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বের স্মৃতিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করেছেন উপন্যাসে দেখিয়েছেন। উপন্যাসটি প্রাপ্ত-বয়স্কদের জগৎ সম্পর্কে জানার জন্য সাধারণের যে কৌতূহলী উদ্দীপনা এবং ধাঁধাঁ রয়েছে সেসব তুলে এনেছে। একদিকে ভাইয়ের অবর্ণনীয় [সব দিক বিবেচনায়] করুণ মৃত্যু এবং অন্যদিকে উগ্র ধর্মীয় বিশ্বাসের চাপ, দুইটাই যেন পিছন দিকে পরিবারটিকে প্রচণ্ড রকমের আঘাত দেয়।

রাইনেফেল্টের কাঁচা এবং নিরানন্দময় শব্দমালার মধ্যেও ঘটনাগুলো অদ্ভুতভাবে বর্ণিত হয়েছে।

রোগা আঙুলের গিটগুলো দেখতে ‘বিচ্ছিন্ন হওয়া চিংড়ির মাথার’ মতো লাগে; সুইমিং পুলে পড়ে থাকা ভেজা চিপসগুলো ‘তোমার পায়ে ফোস্কার মতো লেগে থাকবে’। ইয়াসের নিজেরও কল্পনার বর্ণনা রয়েছে : সে তার মৃত দাদীকে কল্পনা করে, ‘চোখের মণি যেন ডিমের কুসুমের মত লিকলিক করে’, মনে হয় চোখের কোটর থেকে বের হয়ে যাবে।

উপন্যাসের শেষে এসে বোধ হয়, রাইনেফেল্ট মনে হয় গল্পটাকে শেষ করার পথ খুঁজছিলেন—ইয়াস বিশ্বাস করে যে, তার মা বেজমেন্টে ইহুদিদের লুকিয়ে রেখেছিলো। যা কিনা অন্যান্য ভ্রান্তির থেকে কম বিশ্বাসযোগ্য এবং দুর্বল। [এখানে, ডাচ সংষ্করণটিতে একটি কৌতুক আছে, তবে ব্রিটিশ প্রকাশনার জন্য প্রচণ্ড আপত্তিকর হওয়ায় ইংরেজিতে ওই অংশটুকু ছাটাই করে প্রকাশ করা হয়। ব্যাপারটি রাইনেফেল্টের কাছে জ্বলন্ত কল্পনাকে পুড়িয়ে অঙ্গার করার মতো ছিলো।]

//জেডএস//

সম্পর্কিত

খেলারাম খেলে যা ও পাঠকের স্থানচ্যুতি

খেলারাম খেলে যা ও পাঠকের স্থানচ্যুতি

মৃত্যুকল্প ও কল্পমৃত্যুর অমীমাংসিত সন্দর্ভ

মৃত্যুকল্প ও কল্পমৃত্যুর অমীমাংসিত সন্দর্ভ

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

খেলারাম খেলে যা ও পাঠকের স্থানচ্যুতি

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:৩১

‘খেলারাম খেলে যা’ (১৯৭৩) উপন্যাসটি প্রকাশের প্রায় পঞ্চাশ বছর পাড়ি দিতে চলেছে। উপন্যাসটি এখনও পাঠকের আগ্রহ ধরে রেখেছে। এটি একটি বিশেষ ধরনের জনপ্রিয়তা এবং বলতে কী এটিই সত্যিকারের জনপ্রিয়তা। তথাকথিত জনপ্রিয় উপন্যাস (আদতে সেসব তো উপন্যাস পদবাচ্যই নয়) পড়েই ভুলে যায় পাঠক। পড়ার কিছুদিন পরে লেখকের নামটা হয়তো মনে থাকে, কিন্তু দেখা যায় উপন্যাসের নামটাই ভুলে গেছেন এবং ওই বই পড়ে তিনি সেই আগের মানুষটিই রয়ে যান। তাকে কোনো প্রতিস্থান বা কাউন্টার স্পেস তৈরি করে দেয় না—মিশেল ফুকো যেটাকে বলেছিলেন ‘হেতাত্রপিয়া’, যাতে চেতনা আগের স্থান থেকে নিজেকে সরিয়ে এনে নতুন একটা স্থানে গিয়ে দাঁড়ায়।

সত্যিকারের সাহিত্য মানুষকে স্থানচ্যুত করে—সৈয়দ হক নানান সময়ে কথাটি বলেছেন। তাঁর কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ তার প্রায় সব লেখা পাঠের পর রুচির নতুন নির্মাণ ঘটে। বোধের জগৎ আলোড়িত হয়। জন্ম নেয় নানান জিজ্ঞাসা।

কে কত বড় পুরুষ তার পরিমাপ তার শিশ্নের মাপেও হয় না, হয় না কত নারীতে সে গমন করছে তার বিচারেও। তাহলে রন জেরেমি বা জন হোমসরা তথা পৃথিবীর তাবৎ নীলছবির নায়করা হতেন সর্বকালের সেরা পৌরুষদীপ্ত পুরুষ। জন আপডাইকের একটি গল্পে তার একটি চরিত্র নীলছবির নায়কদের বিশেষ অর্থে পৌরুষহীন, নপুংসক পুরুষ বলেই মনে করে। সৈয়দ হক ‘খেলারাম খেলে যা’তে বাবরের মাধ্যমে যে যৌন-পরিস্থিতির নির্মাণ করেন তাতে শেষ পর্যন্ত মূলত এক ধরনের অপ্রেম আর বিবমিষারই প্রমাণ মেলে।

‘খেলারাম’ বলতে আমরা কি রতিদক্ষ পুরুষকে বুঝব, তাকে কি প্লে-বয় বলব? উপন্যাসটি নিবিড় পাঠের পর এর নায়ককে কি আর তা মনে হয়? কারণ তারচেয়ে বড় এক খেলা এর কালের করাল আঙুলের সুতোর টানে চলতে থাকে। ব্যক্তির লোভ রিরংসার বিস্তৃত প্রকাশ ঘটে সমাজ ও রাজনীতির হাত ধরে। তারও আগে দেশভাগ হয়। আপন হয়ে যায় পর। ভারতবর্ষের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জে হেরে গিয়ে পালিয়ে আসে আত্মোদরপরায়ণ মানুষেরা। বাবর তাদেরই প্রতিনিধি। বাবর আমাদের স্বার্থসচেতনতরা গভীরে থাকা ‘পাশবিক আমি’র প্রতিনিধি, যার অন্যপিঠে আছে মানবিক মানুষ হতে না পারার আর্তি ও দহন, ক্ষয় ও ক্ষরণ।

রাজনীতি, ইতিহাসের মার খাওয়া বাবরের পিঠ। এই পিঠ তার অতীতের পিঠ। তার ব্যর্থতা ও কাপুরুষতার পিঠ। সেই মারের দাগ তৈরি করেছে অমোচনীয় এক কালশিটে দাগ। দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িকতার গ্লানি, রক্তপাত কেবল সেই সময়টার ভেতরে সেঁধিয়ে যায়নি, সময়ের সীমা ছেড়ে তা বেরিয়ে পড়েছে, জন্ম দিয়েছে দাঙ্গার মতো আরো আরো কাপুরুষচিত ঘটনার। নিজের বোন হাসনুকে দাঙ্গাকারীদের হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি বাবর। সেই স্মৃতি তার পিছু ছাড়ে না। উপন্যাসের শেষে ধর্ষণকারীদের হাত থেকে জাহেদা বাঁচাতে তার উদ্যোগ দেখি সেখানেই তার প্রকৃত পৌরুষ প্রথম ও শেষ পরিচয় পাওয়া যায়।

টেলিভিশনের জনপ্রিয় উপস্থাপক বাবর আলী খান। আমরা তাকে আপাতদৃষ্টিতে লম্পট হিসেবেই দেখি। সে অবিবাহিত কিন্তু বয়স্ক পুরুষ। কিন্তু ‘খেলারাম খেলে যা’ কি অল্পবয়সি মেয়েদের সঙ্গে বাবরের শারীরিক সম্পর্কের ধারবাহিক কাহিনি? লতিফা, মিসেস নাফিস, বাবলি, জাহেদার মতো নারীদের কাছে বাবর আলী খান কেন যায়? কীসের জন্য যায়? শুধু কামনা নয়, তার পেছনে থাকে আত্মক্ষরণের সেই ইতিকথা যা গোটা ‘খেলারাম খেলা যা’ উপন্যাসটিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে গহিনগোপনভাবে। নারীশরীরের উত্তাপে নিজেকে শীতল করে করে বেঁচে থাকার সত্যিকারের দহন সে মিটিয়ে নিতে চায়। কিন্তু কতটা পারে? এ উপন্যাসে মূলস্রোতটিতে এতটা সার্থকভাবে সৈয়দ হক আড়ালে রেখেছেন যে অপরিণত পাঠকের কাছে সেটি ধরা পড়বে না, তাদের কাছে ‘খেলারাম খেলে যা’ মানে বাবরের যৌন-অভিযান। তাই পাঠক পরিণত কি অপরিণত এই উপন্যাসে পাঠে এর পরীক্ষাটি সম্পন্ন হয়।

অথচ বলাবাহুল্য, ‘খেলারাম খেলা যা’ একটি অস্বস্তিকর উপন্যাস। এক তীব্র-তীক্ষ্ম বেদনা এর ভেতরে কিছুক্ষণ পরপর শিস দিয়ে যায়। অপরিণত পাঠকের কান সেই শব্দ শোনার মতো তৈরি নয়। হেনরি মিলারের উপন্যাসের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটে থাকে। ঘটেছিল সেই মার্কুয়েস দ্য সাদের উপন্যাসের ক্ষেত্রেও। যৌনতার ভেতর দিয়ে জীবনের গভীরতর দর্শন ও প্রতিবাদ সাদকে অমর করে দিয়েছে। মিলারের ‘ট্রপিক অব ক্যান্সার’ বা ‘ট্রপিক অব ক্যাপ্রিকর্ণ’ বা তার ‘দ্য রোজি ক্রুসিফিকেশন ট্রিলজি’র ‘সেক্সাস‘, ‘প্লেক্সাস’ ও ‘নেক্সাস’-এ অপরিণত পাঠক এর নায়কের যৌন-অভিযানকে বড় করে দেখে, কিন্তু তার প্রত্যাখ্যান ও তীব্র ক্রোধী দৃষ্টির ওপর চোখ রাখতে পারে না। একই ঘটনা ঘটতে পারে ফিলিপ রথের ‘পোর্টনয়েস কমপ্লেইন্ট’ বা ‘দ্য প্রফেসর অব ডিজায়ার’-এ পাঠের সময়। ‘খেলারাম খেলে যা’র ক্ষেত্রে প্রায় সেই ঘটনাই ঘটেছে। সৈয়দ হকের এই উপন্যাসটিকে হাসান আজিজুল হক বলেছিলেন ‘রাগী উপন্যাস’ (কথাসাহিত্যের কথকতা, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪, সাহিত্য প্রকাশ, পৃ. ২৩)। গুন্টার গ্রাসের ‘দ্য টিন ড্রাম’ উপন্যাসটির নানান অংশ কোনো অংশে কম যৌন-উদ্দীপক নয়। যৌন-উদ্দীপক তকমা সাঁটানো আছে জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’-এর গায়েও। কোথাও কোথাও তার রগরগে পর্যায়ে গেলেও তার শৈল্পিকদীপ্তি ততটাই অটুট থেকেছে। ‘ললিটা’তে ভ্লাদিমির নবকভ কি শুধু যৌনতাকে এঁকেছিলেন? যৌনতা বারবার জন আপডাইকের মতো কত লেখকের লেখার অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। কুন্দেরার প্রায় সব উপন্যাসই কমবেশি যৌনতার মিশেলে নির্মিত।

সেদিক থেকে বাংলা উপন্যাসে যৌনবিষয়গুলো তুলে আনতে লেখকদের সংকোচ কোনো কালেই কাটেনি। অমিয়ভূষণ তো বলেছিলেন, এটা গায়নোকলজির বিষয়, লেখকের কারবার একে ঘিরে হতে পারে না। তাকেও ‘বিশ্ব মিত্তিরের পৃথিবী’ লিখতে হয়েছে। সমরেশ বসুর ‘বিবর’ ও ‘প্রজাপতি’ তো এনিয়ে বাংলাসাহিত্যকে ঝাঁকিয়ে গেছে। পরবর্তীকালে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এতে এনেছেন অস্তিত্বের নতুনদীপ্তি ও দ্বিধা। তারপরও বাংলা সাহিত্যে যৌন বিষয়আশয়ের উপস্থিতি স্বস্তিকর হিসেবে কেউ দেখেন না। সন্দীপন তো বলেইছেন, ‘খুন : পৃথিবীর নির্বোধতম অপরাধ। খুনে অনুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে লেখা হয় ক্রাইম স্টোরি। কেউ বাধা দেয় না। উল্টোদিকে, যৌনতা অপরাধ তো নয়ই, জীবনের অপরিহার্য আনন্দের বিষয়। অথচ, শুধু যৌনতা নিয়ে বই লিখলেই মহাভারত পাপবিদ্ধ হয়।’ (গদ্যসংগ্রহ ১, মার্চ ২০০৩, প্রতিভাস, পৃ. ২২৪)। অনেক উপন্যাসের গায়ে এমন তকমা লাগানো—যেগুলো পরবর্তীকালে সাহিত্যে ক্ল্যাসিক হিসেবে টিকে আছে।

‘খেলারাম খেলে যা’ তো কেবল যৌনতা নিয়ে লেখা উপন্যাস নয়। যৌনতাকে সৈয়দ হক উপন্যাসের ‘টুলস’ হিসেবে স্রেফ ব্যবহার করেছেন। কারণ যৌনতা সেখানে একটা অনুষঙ্গমাত্র, এর মূলে আছে সেই মানব পরিস্থিতি—যেখানে সে ইতিহাস রাজনীতির কূটকৌশলের হাতে মানুষ প্রচণ্ড পীড়নের শিকার। আলবার্তো মোরাভিয়ার উপন্যাসগুলো কি পরবর্তীকালে কুন্দেরার ‘দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অব বিংস’-এর মতো উপন্যাসগুলো সেই ধরনের ‘দেয়াল লিখনে’র মতোই, যাতে মানুষের তীব্র ক্রোধ স্ল্যাংয়ের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, যাকে আমরা গ্রাফিত্তি বলে থাকি; তবে তা কেবল স্ল্যাংনির্ভরই নয়। এতে থাকে জীবনের চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য, কেবল যিনি লিখেন তিনি তার নামটা এর তলে যোগ করে দেন না। এ যেন নিজেকে আড়াল করে সত্য বলার একটা পদ্ধতি। তার সে গ্রাফিত্তি পড়ে অনেকেই মনে মনে বলেন, এ তো দেখি আমরাই নিজের কথা। ‘খেলারাম খেলে যা’র একটি অংশে সৈয়দ হক এরই পরিচয় দিয়েছেন এবং সেখান থেকেই ‘খেলারাম খেলে যা’- নামটি এই উপন্যাসের শিরোনাম হয়ে ওঠে। কারণ তার মনে হয়েছে মানবের এই পরিস্থিতিকে এর চেয়ে জুতসই নামে অভিহিত করা যায় না।—

“বাবর কিছুতেই মনে করতে পারল না সেই ভদ্রলোকের নাম যিনি লন্ডনের বিভিন্ন শৌচাগার আর দেয়ালের ছবি তুলে ‘দেয়াল লিখন’ নামের একটা অ্যালবাম বের করেছিলেন। তাতে কতরকম মন্তব্য! রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত, দাম্পত্য, যৌন-বিকার সম্পর্কিত—কি না বাদ গেছে। ও রকম একাকী জায়গায় মানুষ তার ভেতরের সত্তাটিকে বের করে আনে। গা শিরশির করে। হাত নিসপিস করে। লেখা হয়ে গেলে এমন একটা তৃপ্তি হয় যেন পরম আকাঙ্ক্ষিত কোন গন্তব্যে পৌঁছুনো গেছে।

বাবর নিজেও তো এরকম করেছে। দেয়ালে লিখেছে। একবার সেক্রেটারিয়েটের বাথরুমে গিয়ে দেখে ‘বাঞ্চোৎ লেখা। সিগারেট টানছিল বাবর। প্রথমে সিগারেটের ছাই দিয়ে চেষ্টা করল, কিন্তু লেখা গেল না। তখন চাবি দিয়ে সে ‘বাঞ্চোতের’ পাশে একটা বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন আঁকল। নিচে লিখল, কে তুমি, না তোমার বাবা? আরেকবার এয়ারপোর্টের বাথরুমে দেকে কে লিখে রেখেছে লাল পেন্সিল দিয়ে বড় বড় হরফে—‘খেলারাম খেলে যা’।

বাক্যটা আজ পর্যন্ত ভুলতে পারেনি বাবর। যে লিখেছে জগৎ সে চেনে। যে লিখেছে সে নিজে প্রতারিত। পৃথিবী সম্পর্কে তার একটি মন্তব্য বাথরুমের দেয়ালে সে উৎকীর্ণ করে রেখেছে—খেলারাম খেলে যা।

কতদিন বাবর কানে স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে কথাটা।” (খেলারাম খেলে যা, অক্টোবর ১৯৭৩, সন্ধানী প্রকাশনী, পৃ. ৭৮-৭৯)

যখন মানুষ নিজেকে খুঁজে পায় তখন এটা ঘটতে পারে, আর ঘটতে পারে তার নিঃসঙ্গতা থেকে। আমাদের অনেকেরই জানা যে, যেকোনো মানুষের একাকিত্বের অহায়ত্বই নাকি তার ঈশ্বর, সাহিত্যও তাই। সাহিত্য মানুষের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ বৃত্তির নাম। গ্রাফিত্তি যারা লেখে তারা সাহিত্যিক নয়। কিন্তু এর সঙ্গে নাগরিক তথাকথিত নিচুতলার অভদ্র জীবনের নানান মাত্রা উঠে আসে। পাওয়া যায় সমকালের পাঠ, যা অনেক সময় ঢাউস বই পড়েও গড়ে ওঠে না।

গ্রাফিত্তিরই বড় আকারে প্রকাশ হয়ে দেখা দেয় তেমনি প্রতিবাদী উপন্যাসে। জে. পি ডনলেভি-র ‘দ্য জিনযার ম্যান’ বা হুবার্ট সেলবি জেআর-এর ‘লাস্ট এক্সিট টু ব্রুকলিন’-এর কথাও আমরা স্মরণ করতে পারি। রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত, দাম্পত্য, যৌন-বিকার সম্পর্কিত বিষয়গুলো মিলেমিশে ওই উপন্যাসগুলোকে সমকালে জনপ্রিয় করে তোলে। বির্তকিতও কম করে না। কিন্তু এগুলো চিরকালের হয়ে ওঠে এর অন্তর্গত বিষাদ, ক্ষয় ও ক্ষরণের দলিল হিসেবে। ‘খেলারাম খেলে যা’-র ক্ষেত্রেও ঠিক একই বিষয় ঘটেছে। এ উপন্যাস নিয়েও বিতর্ক কম নেই। তবু এখনও নিষিদ্ধ পাঠের মতো দুর্মর আকর্ষণে পূর্ণ এর প্রতিটি পৃষ্ঠা। যৌনতা একে জনপ্রিয় করেছে, কিন্তু এর বিষাদ-ক্রোধ-অস্তিত্বের অসহায়ত্বের বয়ান একে দিয়েছে সময়কে উতরে গিয়ে টিকে থাকার সামর্থ্য।

অনেকেই একমত হবেন, এখন যখন যৌনতাকে শিল্পের পর্যায়ে নিতে যে দক্ষতা ও সাহস নিয়ে বহু লেখকের সংশয় দেখা যায়, প্রায় চল্লিশ বছর আগে সৈয়দ হক তা কেচে দিয়ে গেছেন। কি আধুনিকতায় কি আবেদনে তার এই লেখা তাকে তথাকথিত জনপ্রিয়তার গণ্ডি ছাড়িয়ে সত্যিকারের জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মৃত্যুকল্প ও কল্পমৃত্যুর অমীমাংসিত সন্দর্ভ

মৃত্যুকল্প ও কল্পমৃত্যুর অমীমাংসিত সন্দর্ভ

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

মৃত্যুকল্প ও কল্পমৃত্যুর অমীমাংসিত সন্দর্ভ

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৩:০৮

[বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক কাজী আনিস আহমেদ-এর ৫১তম জন্মদিন আজ রোববার। তার লেখালেখির সূচনা কৈশোরেই, বাংলা ও ইরেজি ভাষায়। ‘চল্লিশ কদম’ উপন্যাসিকা প্রথম প্রকাশিত হয় আমেরিকার মিনেসোটা রিভিউ-এ, ২০০০ সালে। গল্পগ্রন্থ ‘গুড নাইট মি. কিসিঞ্জার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ বাংলাদেশে প্রকাশ করে ইউপিএল, ২০১২ সালে এবং যুক্তরাষ্ট্রে দ্যা আননেমড প্রেস, ২০১৪ সালে। উপন্যাস ‘দ্যা ওয়ার্ল্ড ইন মাই হ্যান্ডস’ প্রকাশ করেছে ভিনটেজ/র‌্যানডম হাউজ, ২০১৩ সালে। তার সবগুলো বই কাগজ প্রকাশন থেকে বাংলায় অনূদিত হয়েছে। কাজী আনিস আহমেদের জন্ম এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা ঢাকাতেই, সেন্ট জোসেফ ও নটরডেম কলেজে। উচ্চতর শিক্ষা আমেরিকায়-ব্রাউন, ওয়াশিংটন ও নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে যথাক্রমে সাহিত্যে ব্যাচেলর, মাস্টার্স ও ডক্টরেট। তিনি ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ঢাকা ট্রিবিউন-বাংলা ট্রিবিউনের প্রকাশক।]

‘আমি যদি কোনোদিন চলে যাই এই আলো অন্ধকার ছেড়ে,
চলে যাই যদি আমি অন্য এক অন্ধকার-আলোর আকাশে,
পায়ের অক্ষর যদি মুছে যায় যদি এই ধুলোমাটিঘাসে,
ওগো পথ,-একজন চলে যাবে তবে শুধু,-...’
(জীবনানন্দ দাশ)
এভাবে তো প্রায় সকলেই ভাবে। ভাবে না? উদাস ধানখেতের ওপরের শূন্যতাকে দুলিয়ে যাওয়া বাতাস ছুঁয়ে গেলে বুকটা হু-হু করে বলে তখন কি দীর্ঘশ্বাস পড়ে না? পড়েই তো! তারপর নিজেকে সান্ত্বনা দেয়া, এই আলো-আঁধারির বেঁচে থাকা, এত যে সঞ্চয়, বিশ্বাস, ভালোবাসা, সাফল্য ফেলে অন্য কোনো অজানার কাছে চলে যাব-ভাবতে ভাবতে উদাস নীরবতা নিশ্চয়ই কারও পদচারণে ভেঙে যায়। ঘোর কাটে, আর মৃত্যুকল্পনার বিস্তৃত আকাশ মুছে যায়, মুছে যায় বাস্তবের পদক্ষেপে। এ তো গেল আমাদের মৃত্যুকল্পনা। মৃত্যুকল্প। কিন্তু যদি কল্পিত মৃত্যুর কথা বলি? যাকে মৃত্যুকল্প নয়, বলব কল্পমৃত্যু? 
হ্যাঁ। চিত্রকল্প আর কল্পচিত্রের সূক্ষ্ম বিভেদের মতো, ভেবে দেখলে মৃত্যুকল্প আর কল্পমৃত্যুর মধ্যেও বিস্তর চলাচল। চিত্রকল্পে যেমন একটা অদেখা চিত্রকে কল্পনা করতে করতে ক্রমশ বুননমায়ায় গড়ে ওঠে এক অন্য জগৎ, যে চিত্রকে কল্পনা করি, এমনটা ঘটবে কি না জানি না...আর অন্যদিকে কল্পচিত্র, কল্পনার সমস্তটা চিত্রিত হতে হতে ক্রমশ গ্রাস করে চেতনাকে, যখন আর অনুভবের সামান্যকে নিয়ে বিস্ময়ঘোর কাটে না, কল্পনার কোন অবচেতন এমন চিত্রিত ভুবন গড়তে চলেছে...চিত্রকল্পের এই কল্পিত চিত্রটির বাস্তব ভিত্তি-আশ্রয় নিয়ে তর্ক-প্রতর্ক সন্দেহের অবকাশ থাকতে পারে, তার বাস্তবায়নের দায় নেই, তা কেবল যেমন নান্দনিক সৌন্দর্য পরিস্ফুটনের মাধ্যম হিসেবেই কল্পিত, কল্পচিত্রের ক্ষেত্রে ততটা নয়। যেন কল্পচিত্রের বাস্তবতা এক অতিবাস্তবিক বাস্তব ভিত্তিতে রচিত। তার বাস্তবায়নের সম্ভাবনার দায়টুকু স্বীকার করেই যেন অবচেতন কল্পনার এমন চিত্রটি সূক্ষ্ম অনুভূতির স্পর্শে ক্রমে ক্রমে পূর্ণ হতে থাকে। তার বাস্তবায়নের অতিসম্ভাবনাই কল্পচিত্রকে চিত্রকল্প থেকে দূর স্বতন্ত্র করে রাখে। মৃত্যুকল্প আর কল্পমৃত্যুও খানিকটা সে রকম। খানিকটা কেন, বেশ অনেকটাই।
আমাদের মৃত্যুকল্পের অতিবাস্তব সম্ভাবনাকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করে, অনেকাংশে আপন অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, বিশ্বাসের নানা চেতনশিখায় আলোকিত করে গড়ে তুলি। কালক্রমে কখনো সে কল্পনাকে নিয়ে মেতে উঠে তার রদবদল ঘটাই। ভাবি, যদি এমন না-হয়ে আর একটু অন্য রকম হতো আমাদের মৃত্যুকল্পনাটি। ভাবি, ভাবি আর উদাস দেখতে থাকি সে কল্পনার অতিরঞ্জিত নানান শাখা-প্রশাখাকে। তার সমস্তটা কেন, কণামাত্রও বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের তেমন মাথাব্যথা থাকে না।
কিন্তু কে জানে, আমাদের চেতনার গভীরে, কোন অন্ধকারে ওত পেতে থাকা মৃত্যু নিজেই কল্পনা করতে করতে গ্রাস করে অবচেতনের সমস্তকে, আর চেতন-অবচেতন, বাস্তব-অবাস্তব-অতিবাস্তবের সব সীমানা ভেদ করে এক অসতর্ক মুহূর্তে আমাদের সমগ্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে আরম্ভ করবে সে। তখন বাস্তব কী, পরাবাস্তব কোথায়? আর অবাস্তবই-বা কী? মৃত্যুর কল্পিত বাস্তবতার সেই অনঘ-তিমির যদি বাস্তব হয়, যদি অবাস্তবের মৃত্যুকল্পের সামান্যকে চুরমার করে দিতে দিতে এক ঘোর সংশয়চিহ্নের মুখোমুখি হয়ে হয়রান হয়ে যেতে হয়, এই মৃত্যু যদি বাস্তব হয়, তবে কল্পনা কী? আর যদি এই মৃত্যু কল্পনাই হয়, তবে বাস্তব কোথায়-সেদিন, সেদিন যে ঘোর অসহায়তার উদ্বেগে আপনার, আমার, সবার হৃদ্ধ্বনির অতিবিস্তার গ্রাস করবে আমাদের হাহাকার, একবার সেই কল্পচিত্রটি নিজের সম্মুখে রেখে, আসুন আজ পুনরায় পাঠ করি কাজী আনিস আহমেদের ‘চল্লিশ কদম’।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দেবযান’-এ যেমন, যতীন মৃত্যুর পরেও প্রথমে বুঝতে পারছে না, সে মৃত, ‘খাটের দিকে একবার চাইতেই বিস্ময়ে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। খাটের ওপর তার মতো একটা দেহ নির্জীব অবস্থায় পড়ে। ঠিক তার মতো চোখ-মুখ-সবই তার।’ ‘চল্লিশ কদম’-এর শুরুটাও কতকটা সে রকম। শুধু ওইটুকুই সামঞ্জস্য। কেননা, ‘দেবযান’-এর প্রতিপাদ্য বিষয় বা কাহিনির আশ্রয় মৃত্যুপরবর্তী জীবন, আত্মার উপস্থিতি এবং তার অনশ্বরতা। কারণ, লেখক বিভূতিভূষণের বিশ্বাস ছিল মৃত্যুপরবর্তী জীবন বিষয়ে, তার মৃত্যুকল্পের সীমানা নির্ধারণ অন্যত্র করা যাবে। আনিস আহমেদের লেখার ‘বিষয়’ অবশ্যই তা নয়। শুধু শিকদার সাহেব যে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে ভুগতে অপেক্ষা করছেন আসমস্ত বিশ্বাসকে বাজিয়ে দেখার জন্য, সত্যই তার মৃত্যু হলো কি না, তার সপক্ষে দাঁড় করাচ্ছেন এতকাল ধরে শুনে আসা রীতিকে, নিজের অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে তিনি উৎকর্ণ হয়ে কবরের নিদ্রিত নীরবতায় অপেক্ষা করছেন শেষ দাফনকারীর কবর ত্যাগের পর চল্লিশ কদম পদক্ষেপ শব্দ মহাশূন্যতায় বিলীন হতে না-হতেই মুনকার আর নাকির এসে যদি হাজির হয়, যদি তাকে জেরা করে লিখতে বসে তার আজীবনের ভালো-মন্দের, পাপ-পুণ্যের খতিয়ান, একমাত্র তবেই শিকদার বিশ্বাস করতে পারবেন তার মৃত্যু হয়েছে। 
এভাবেই ‘চল্লিশ কদম’ আরম্ভ হলো। আরম্ভ হলো মাটির নিচে অন্ধকারে একাকী উৎকণ্ঠার পদক্ষেপ গণনা। কাঠের পাদুকার যে শব্দ ধীরে ধীরে কবরের কাছ থেকে ক্রমে মুছে মুছে যাচ্ছে অপেক্ষাজীবনের সমস্তকে, সেই শব্দ নিয়েই কাহিনির আরম্ভ। এবং শেষও। অবশ্য প্রকৃতপ্রস্তাবে এই কাহিনির আরম্ভ বা সমাপ্তি নেই। এই কাহিনি যে চিরকালীন মানবজীবনের অপেক্ষার। এই কাহিনি বাস্তবের মুখোমুখি হতে না-পারা অবাস্তবের বাস্তবতা। নাকি কোনো অতিবাস্তবের বাস্তব হয়ে উঠতে না-পারার বাস্তবতা? মৃত্যুকল্পের মায়াময় আবহকে ছাড়িয়ে কালক্রমে চেতনার সমস্তটুকু জুড়ে কল্পমৃত্যুর বিস্তারের কাহিনি।   
অবশ্য কাহিনি বলতে যদি ওই পদক্ষেপের এক থেকে চল্লিশ অবধি গণনার মধ্যেকার অপেক্ষাপ্রহরে, সত্যিই মরে গেছি কি না ভাবতে ভাবতে জীবনের বিবিধ মাইলফলকের দিকে চোখ তুলে তাকানোর অবসরে যেসব খণ্ডচিত্র মনে আসে, যে সামান্য স্মৃতিরেখায় মনে পড়ে ‘যাকে ওরা মৃত্যু বলে’, তার সামান্য আগের মুহূর্ত দু-এক ঝলক, তবে হ্যাঁ, এই গ্রন্থের কাহিনি রয়েছে। শিকদার সাহেবের সেই কাহিনি আপাত-নিরিখে অবশ্যই মুনকার, নাকিরের সামনে পেশ করার সৎ-অসৎ কাজের ফিরিস্তি মনে করা নয়, বরং নাস্তিক্যময় সংশয়বাদের পথে চলতে চলতে জীবনের প্রায় সব অর্থে ব্যর্থ এক মানুষের অবিকল্প স্মৃতি-উদ্ভাসের সংকেত। যে মানুষ অনেক স্বপ্ন নিয়ে শুরু করা জীবনের সমস্ত পথ জুড়ে কেবল স্বপ্নভঙ্গের হাহাকারে নিজেকে ভুল বোঝাতে বোঝাতে বেঁচে থাকা এক উদ্দেশ্যহীনের জীবনকথা ছাড়া আর কী-বা মনে করবে? সে তো কবেই মরে গেছে, কতবার মরেছে; কতভাবে বিশ্বাসের অপমৃত্যু, স্বপ্নের অকালপ্রয়াণ নিয়ে আরও একটু ভালো থাকার চেষ্টায়, প্রতিবেশীদের নজর এড়াতে বাড়ির চারদিকে উঁচু পাঁচিল তোলা একাকিত্বের তাড়নায়, দীর্ঘ চব্বিশ বছর আলাদা কামরায় থাকা, স্ত্রী-সঙ্গের দূর নিজের বিশ্বাসের গলা টিপে হত্যা করতে করতে বাইরের সবার নজরে সুখী দাম্পত্যের নামভূমিকায় অভিনয় করে করে ক্লান্ত কেবল চেতনার অলক্ষ্যে অপেক্ষা করছে মৃত্যুর ওত পেতে থাকার কল্পনা নিয়ে। আর এখন সেই অপেক্ষার বাস্তবতাকে অতিবাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করাতে যেটুকু অবসর, কাহিনির সেখানেই শুরু, সেখানেই শেষ।
স্বল্পপরিসরের এই কাহিনিটি অবশ্য সামান্য নয়। জামশেদপুরের অনুন্নত বসতি ছেড়ে শহরে ডাক্তারি পড়তে গিয়ে শিকদারের শিল্প-সাহিত্যের প্রতি জন্মানো অনুরাগ আর ডসন সাহেবের সঙ্গে যে কোনো অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়লেন শিকদার, আর আজীবন সেই বন্ধন তাকে তাড়িয়ে বেড়াল। জীবনের সমস্ত ভালো-খারাপের মধ্যে ঢুকে পড়ল ওই দুটি অতীত অর্জন-ডসন আর তার কারণে গড়ে ওঠা শিল্প-সাহিত্যপ্রীতি। হবু শ্বশুরকে মোহিত করার মতো শিল্পবোধ তার ছিল না, ছিল শিল্পী হয়ে উঠতে না-পারার ব্যর্থতা এবং অবশ্যই, ওই আর পাঁচজনের মতো নিজেকে বোঝানোর অর্জন। 
না, তাই বলে শিকদার সাহিত্যশাস্ত্রীদের বিচারে খুব যে সৎ একজন মানুষ বা চরিত্র, তা নয়। অন্তত গল্পে তো তার আভাস সে রকমই। দলিল জাল করে কালোটাকা অর্জনে মোল্লার সহকারী হতে তিনি প্রথমে চাননি বটে, তবে আরও একটু ভালো থাকার, আরও স্বাচ্ছন্দ্যের জীবনের হাতছানি তো তিনি সহজেই প্রত্যাখ্যান করতে পারতেন। পারতেন সামান্য পসার আর লাল-নীল-সোনালি তরলে বিভাজিত রোগীদের অর্থনৈতিক ক্রমাবলম্বনে দাওয়াই বরাতের ছলনাটুকু নিয়ে, এ তল্লাটের নামজাদা ধাত্রীবিদ হয়ে, তরুণ বয়সের সঞ্চিত শিল্প-সাহিত্যের বোধ নিয়ে বেঁচে থাকতে। হয়তো তার পাঁচিলঘেরা বড় বাড়ি হতো না, আব্বার বানানো বাড়ির সঙ্গে এই বিরাট অংশ, শানবাঁধানো উঠোন, আর মনখারাপের চৌকো সবুজ জমি, সেখানের তালগাছ হয়তো হতো না, বৈভবের এসব ছোটখাটো নিদর্শন নিয়ে সমাজচোখের দূরে চাপতে হতো না এত একাকিত্বের দীর্ঘশ্বাস। 
প্রত্যেক মানুষের যেমন একটা বাইরের আর গোপন অন্তর্জীবন থাকে, শিকদারেরও তেমনই ছিল। তার বাইরের বৈভব, সুন্দর সুখী দাম্পত্য, ডসনের সঙ্গে সৌহার্দ্য, গরিবগুর্বোদের উপশমের তৃপ্তি, সন্তান প্রসবের পসারের আড়ালে এক রহস্যাবৃত জীবনও রয়েছে। পৃথিবীর সব মানুষের, সব কাহিনির যেমন, জামশেদপুরে সমস্ত কাহিনিরও তেমনই দুটো ভাষ্য আছে। শিকদারের বিয়ের পরে পরে বউকে ইংরেজি শেখানোর হুজুগ, সেই শহরজীবনের বন্ধু ডসনের প্রত্নতাত্ত্বিক দলের সঙ্গে জামশেদপুরের মসজিদের ভাঙা খিলানে হিন্দু মন্দিরের কোনো অতীত জীবনের সংযোগের ক্ষীণ সম্ভাবনার কথা প্রচারে দেশময় বেধে যাওয়া ঝামেলার মধ্যে অসুস্থ ডসনের দেখভালের জন্য শিকদারের এগিয়ে আসা, সমস্ত জনপদে আন্ত্রিকের মড়কের মধ্যে ডসনকে নববিবাহিতা নূরজাহানের জিম্মায় রেখে শিকদারের ওষুধ আনতে শহরে যাত্রা আর সেই অবসরে সাহেবের সঙ্গে নূরজাহানের ইংরেজির অতিরিক্ত আরও আরও কত ভাষার সলিলে ভাসাভাসির ফলে একদিন শেষ রাত্রে বেগম শিকদারের সোনালি চুলের এক মেয়ের জন্ম দেয়ার পরদিন বাড়ির মাটিতে নরম কবরের গল্প...এ সমস্তের দ্বিবিধ অর্থ থেকে থাকবে। চিমনির ধোঁয়ার মতো মুখে মুখে শিকদারের ভূমিষ্ঠ সন্তানের মৃত্যু নিয়ে কথা উঠবে দুরকম। কথা উঠবে বাচ্চার কান্না শোনা, না-শোনা নিয়ে। শিকদারের এমন বিপদে ডসনের তড়িঘড়ি শহরে চলে যাওয়া, এসব নিয়ে ওই দুরকমের পরস্পরবিরোধী ধোঁয়াও উঠবে। আর তারপর দেখব, ‘এমনিতে সাধারণ ধোঁয়া হয় ধূসর, আজ তাদের রং হলো বিদঘুটে অসুখে ভোগা, সবুজ, কিংবা হয়তো বাদল মেঘই দিনের আলোকে আশ্চর্য সব রঙে প্রসারিত করে দিয়েছে। ধোঁয়ার কুণ্ডলী কিন্তু আকাশে উঠছে বলে মনে হচ্ছিল না, বরং তারা নিচু হয়ে বাড়িঘরের উপর ঝুলে রইল, আর সামান্য চিমনির ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে গেল, অন্য কোনো রান্নাঘরে সুড়ুৎ করে ঢুকে পড়ার আগে।’ আগুনের সন্ধান তবু থামবে না। আর সমস্ত ঘটনার আড়ালে কেবল ধোঁয়ার মতো বিস্মৃত হতে থাকবে এই লেখার বিষয়টি, কল্পমৃত্যু ও বাস্তবতা।
আমার মনে হয়েছে, মৃত্যু ও বাস্তবতাই এই লেখার বিষয় (বিষয়>বি-সি{বন্ধন}+অ; ব্যুৎপত্তিগতভাবে যার অর্থ বন্ধন)। এখানে মৃত্যু কেবল মানবজীবনের শেষ নয়, জীবনব্যাপী তার ক্রমবিস্তার আর তার সেই কল্পিত বিস্তারপথ আমাদের সামান্যকে কীভাবে এনে ফেলেছে বাস্তবের মুখোমুখি-এটুকুই বেঁধে রেখেছে কাহিনির পূর্বাপর। আর তা করতে গিয়ে আনিস আহমেদ আশ্রয় (এখানে অবলম্বন করে) নিয়েছেন যে কাহিনির, যে জীবনের, যে নাস্তিক্যসংশয় ও অনন্ত অপেক্ষার, সেটুকুই শিকদারের কাহিনিকে অবলম্বন করে এগিয়ে চলেছে ছিন্ন-বিচ্ছিন্নভাবে, ঘটমানতার পূর্বাপর অনুসরণ না করেই। 
অবশ্য অনেক কিছুই, যা প্রথাগত, কাহিনির বুননে বা বিষয়ে-আশ্রয়ে, কোথাও অনুসরণ করেননি আনিস আহমেদ। বহু অসমাপ্ত প্রতর্ক, অস্পষ্ট ইঙ্গিত, অবাধ্য কাহিনিপথ বয়ন করতে করতে মানুষের সমাজের থেকে দূরে চলে যেতে থাকা বিচ্ছিন্ন একাকিত্বের প্রচলিতকেও অনুসরণ করেননি তিনি। পরকীয়ার সন্দেহ, অন্ধ দাইবুড়ির দোহাই দিয়ে চাপা দিতে চাওয়া সম্পর্কের নানা অলিগলি, প্রতিজীবনের অভ্যাস, চলমান বাংলার ঐতিহ্যের অবলুপ্তপ্রায় বহুলকে ঘিরে গড়ে উঠতে থাকা কাহিনির অভ্যাসকেও যথাসম্ভব এড়িয়ে তিনি বারংবার ফিরতে চেয়েছেন তাঁর কাহিনির বিষয়-আশ্রয়ে। 
এই যে মৃত্যুর কোটরে অন্ধকার অপেক্ষায় শুয়ে শুয়ে শিকদার ভাবছেন, তার বিশ্বাস সত্যি হবে কি না, সেই যে মধ্যযুগের শাস্ত্র ঘেঁটে ইয়াকুব মোল্লা, তার বহু কালোকারবারের সঙ্গী নিশ্চিন্ত করে বলেছেন, শেষ দাফনকারীর বিলীয়মান চল্লিশতম পদক্ষেপের কথা, এতকাল ভেবেছেন, ‘চল্লিশ সংখ্যাটাই বা এমন গুরুত্বপূর্ণ কেন? ঊনচল্লিশ পা যাওয়ার পরেই কি কোনোদিনও ফেরেশতাদের আবির্ভাব ঘটেনি? সবসময় চারপাশে এত লোক অক্কা পাচ্ছে যে, কী করে তারা এমন নিখুঁতভাবে তাদের কাজ সেরে ফেলতে পারে?’-এক আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে চিরবিশ্বাসের এক মহাসংঘাতক্ষণ তৈরি করেছেন লেখক, আর পড়তে পড়তে সংশয়ের এক বাতাবরণ, কী হয়, কী হয় ভাবতে ভাবতে পাঠকও এগিয়ে চলেছে এক বিস্ময়ের আকাশি পথে...সমস্ত গল্পজুড়েই এর টান টান বিস্তার। বারংবার মৃত্যুর ছায়া চেতনার অবকাশে উঁকি দিয়েছে, আর উঁকি দিয়েছে পায়ের অনুষঙ্গ, চপ্পল, খড়ম এবং সেই কবে প্রথমবার দেখা একটি মেয়ের ধবধবে সাদা পায়ের স্মৃতি। ডসনের কাঠের খড়ম পায়ে শানের ওপর নাচার ‘খটখটাখট’ শব্দ আজীবন রয়ে গেল শিকদারের মননে, যেমন রয়ে গেল সেই ফরসা পা, যার দিকে তাকিয়ে শিকদার সেই কবে, ‘ভেবেছিলেন, যদি সেই পায়ের মালকিন কোনো মরুভূমির মধ্যে দিয়ে হেঁটে যায়, একটিও ধূলির কণা তাঁর জুতোর তলিতে লেপ্টে থাকবে না।’ মেয়েটিকে আঁকতে পারেনি শিকদার। ‘শুধু বেওকুফ এক পা-ই আটকে আছে তার মগজে।’...একইভাবে মগজে রয়ে গেল চব্বিশতম বিবাহবার্ষিকীতে বেগমের বুনে দেয়া একজোড়া চপ্পল আর তাদের সম্পর্কের হিমশীতল অন্তর্জীবনের বাইরে লোকদেখানো ‘খটখটাখট’ চলমানতা। এই শব্দটিই বরং বেশি বেজেছে, ডসনের নাচের সময়ের শব্দের চেয়ে, এমনকি শেষ দাফনকারী ডসনের প্রত্যাবর্তনের নরম মাটির ওপর দিয়ে বিলীন হতে থাকার রুদ্ধশ্বাস চলশব্দের চেয়েও বেশি বেজেছে পাঠকের কানে।
এই যে দুটো প্রত্যক্ষ আর পরোক্ষ পা, ডসনের কাঠের খড়ম, বেগমের বুনে দেয়া চপ্পলের অতিরিক্ত সেই কোন অতীতে দেখা মেয়েটার ফরসা পায়ে গাড়ি থেকে নেমে আসা, যার পরনে সেদিন কী ছিল খেয়াল করা হয়নি, যার মুখও মনে পড়বে না আজ, এত বছরের ব্যবধানে, এবং অবশ্যই বেগমের সঙ্গে সম্পর্কের চুপচাপ বেড়ে যাওয়া দূরত্বজুড়ে লোকদেখানো কাছাকাছি আসার অসহ্য পদধ্বনি-সমস্ত লেখাটিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সে আচ্ছন্নতা আমাদের চেতনার সমগ্রকে বিস্তার করে বসে থাকা কল্পমৃত্যুর। ধীরে ধীরে যার পদক্ষেপ আমরা শুনতে পাব জীবনে।
জীবন যখন এল, তখন স্বভাবতই কৌতূহল হয়, কেমন ছিল শিকদারের জীবন? লেখক যতটা ধরেছেন এ লেখায়, তার অতিরিক্ত যেটুকু ধরেননি, সেই অব্যক্ত, অবচেতনের কোথাও কি তার বিষাদ ছিল জীবনের প্রতি মুহূর্তে? ডাক্তার হতে চেয়ে শহরযাত্রা, শিল্প-সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ, বিদেশি শিল্পীদের আঁকা নগ্ন নারীশরীর দেখতে দেখতে সেই যে, শিকদার ডসনকে বলবেন, ‘...তোমার জানা উচিত, ইসলামে কারও তসবির বা প্রাণীর ছবি আঁকা নিষিদ্ধ।’ আর ডসনের ‘আমি যে মুসলমান নই, তাতে আমার খুশিই লাগছে’, আর বলেও ‘ধর্মভীরু মনের সংশয় সত্ত্বেও’ শিল্পে আগ্রহী একটা মন ক্রমে রোগীদের স্পর্শ করতে করতে নিজেই এক স্পর্শ-অনুভূতিহীন জড়, রোগশরীরে পরিণত হয়ে ওঠার জীবন, সেই যে ফরসা পায়ের মেয়েটির স্মৃতিজুড়ে অব্যক্ত ‘তুমি কি কখনো মরুভূমিতে হেঁটে গিয়েছিলে নাকি?’ বলতে চাওয়ার আকুলতাভর্তি এত স্পষ্ট, এত জীবন্ত একটা অবর্ণনীয় পায়ের সৌন্দর্য, যাকে স্পর্শ করতে না-পারার ব্যর্থতায় ‘কেমন কান্না’ পেয়ে যাওয়ার খোয়াবনামা...সেই জীবনটুকু পাঠকের অনুভবের দুয়ারে ঠেলে দিলেন লেখক। কেবল লেখকের ভাষায়, ‘একমাত্র যেভাবে তিনি তাঁর পিছুটানের এই বিষম ভাবালুতা ঝেড়ে ফেলতে পারতেন, তা হলো যদি তিনি এখনকার বাস্তব জলজ্যান্ত কিছু আঁকড়ে ধরতে পারেন; কোনো ভাবনা (মোল্লা আর তার সাত বিঘে জমি), সত্যিকার কোনো শরীরী অনুভূতি (বুকের মধ্যে ওই ব্যথাটা), স্পষ্টগ্রাহ্য কোনো বস্তু (রুবাইয়াতের খোলা পাতা) অথবা কোনো জ্যান্ত মানুষ (বেতের চেয়ারে বসে থাকা তাঁর বিবি)।’-যেটুকু, আর ধানখেতের মধ্যে জেগে ওঠা শূন্যতার বিমূঢ় বিহ্বলতা নিয়ে যন্ত্রণায় চেতনহীন হয়ে পড়ার যাত্রাটুকুই জেগে রইল যেন সমগ্রতার আভাস নিয়ে।
শিকদার জেগে উঠলেন যখন, শুয়ে শুয়ে যখন অনুভব করছেন একটা জংধরা কোদাল দিয়ে কারা গর্ত খুঁড়ছে আর শিকদার নিজের গা থেকে ‘মৃদু ঝিমধরানো কর্পূরের গন্ধ ছড়িয়ে’ অপেক্ষা করতে করতে দেখছেন তার কবরের তৈয়ারি, বাঁশ দিয়ে সাজানো কবরের মুখে গড়ে তোলা শূন্যতার ছাদ, তখন নিশ্চয়ই পাঠকের বিস্ময় তার নিজের মৃত্যুকল্পনার সমগ্রকে পার হতে হতে এক পরাবাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে পাঠকালীন বাস্তবতাকে। যেন পাঠকও মনে মনে ভাবছেন, শিকদারের মতো, ‘হয়তো তাঁর বিবিসাহেবা তাঁর ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে যে কোনো মুহূর্তে জাগিয়ে দেবেন,’ আর সত্যি যদি তা হয়, এবং আমার বিশ্বাস, তা হবেই, তবে, সেই মুহূর্তেই লেখকের নির্মিত বাস্তবটি, যা কিনা তথাকথিত অতিবাস্তবের মুখোমুখি হতে থাকা বাস্তবকে নির্মাণের চেষ্টায় এত বিষয়-আশ্রয়, মৃত্যুকল্প-কল্পমৃত্যুর চলাচলে ক্রমে বিপর্যস্ত হতে শুরু করেছিল, তা অবশেষে মুক্ত হতে পারবে এক অলীক নান্দনিক বোধের আকাশে।
আনিস আহমেদের গল্পে একজন মানুষের মৃত্যুর কথাই এসেছে। মৃত্যু বা কল্পমৃত্যু যা-ই হোক, বাস্তব বা অবাস্তব যা-ই হোক, মোদ্দা কথাটা হলো একটা জীবনের মৃত্যু। কিন্তু প্রত্যেক জীবনই তার সমগ্রকে নিয়ে, মানবসভ্যতার সমগ্র যাত্রাপথে এক-একটা ইতিহাসের অধ্যায় হয়ে থাকতে পারে, সে যত সামান্যই তার জীবন হোক না কেন! শিকদারের সামান্য জীবনও বহু ইতিহাসের সাক্ষ্য রেখে এগিয়েছে। তার জীবন সে গড়েছে নিজের খেয়ালে, অন্যের ভাষায়, অনেকের চাহিদায়, দোয়া-দরুদে। কেবল মৃত্যুকল্পনার ছায়া সে কখনো পড়তে দেয়নি নিজের জীবনে। হ্যাঁ, একটা কাহিনির ধোঁয়া উঠেছিল, তার শেষ রাতে জন্মানো শিশুর জন্ম-মৃত্যুর রহস্য নিয়ে, কিন্তু তার ছায়া কখনো আসতে দেননি তিনি। মৃত্যুর আগের দিন বর্ষার প্রথম ইলিশের স্বাদ আর পেঁয়াজকুচি ভাজা ছড়ানো খিচুড়ি খেতে খেতে রোগী দেখার চাপে ক্লান্ত হওয়ার আগেও মোল্লার সঙ্গে দখল করা জমির হিসাবে মেতেছেন। ভাবেননি, মৃত্যুই তার চেতনার দূরে আপন কল্পিত মায়াজাল গড়তে গড়তে বিস্তৃত হচ্ছে ক্রমে। তার ধানখেতের আলপথে বর্তিকাহীন চলার অন্ধকারে বাস্তবায়িত হবে মৃত্যুর কল্পিত আবরণ। সে শুনতেও পায়নি।
এখন কবরের অতলান্তে শুয়ে তার উৎকর্ণ অপেক্ষা-সিদ্ধান্তের সমস্তটুকু আসলে লেখক আমাদের হাতেই অর্পণ করে দিয়েছেন। শিকদারের সঙ্গে আমরাই গুনতে বসেছি শেষ দাফনকারীর পদশব্দ। চল্লিশ গুনতে চাইছি। আর গুনতে গুনতে হঠাৎ আমাদের অতিবাস্তবতার মায়ামোহ ভেঙে যাচ্ছে লেখার শেষ অবধি এসে। না, চল্লিশের আগেই লেখক থেমেছেন। এবার আমাদের, পাঠকের গণনার কাল শুরু। আমাদেরই শুনতে হবে বিশ্বাসের একাকিত্ব ভেঙে ওই বিশ্বস্ত বন্ধুটি যখন আমাদের ছেড়ে দূর, আরও দূর হয়ে যাচ্ছে, যাকে বিশ্বাস করে আজীবনের দাম্পত্যের মাঝে কাঠের মতো নীরস, ‘খটখটাখট’ শব্দ তোলা অসহায়তা পেয়েছেন শিকদার, আর আজ অপেক্ষা করছেন কীভাবে তার পায়ের শব্দে ভেঙে যাবে একজীবনের মৃত্যুঘোর। তার চল্লিশতম পদক্ষেপের পর শিকদারের নতুন জীবনের আরম্ভ। আজীবন যে বিশ্বাস, স্বপ্ন, কল্পনা তাকে তাড়িত করেনি, সেই মৃত্যু দিয়ে, মৃত্যু নিয়ে কল্পিত এক জীবন। সেখানে মৃত্যুকল্পের অবাস্তবতার চেয়ে কল্পমৃত্যুর বাস্তবতাই বিরাজমান। শিকদারের ওই কল্পমৃত্যুর চেতনায় জেগে ওঠা বাকি রয়ে গেল যে! 

/জেডএস/

সম্পর্কিত

খেলারাম খেলে যা ও পাঠকের স্থানচ্যুতি

খেলারাম খেলে যা ও পাঠকের স্থানচ্যুতি

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

পর্ব—চার

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:১৬

পূর্বপ্রকাশের পর
লঞ্জাইনাসের সাবলাইম তত্ত্ব

গ্রিক পণ্ডিতদের কাছ থেকে আমরা সাহিত্য বিষয়ে পেয়েছি ‘মাইমেসিস’ তত্ত্ব আর রোমান যুগ থেকে পেয়েছি ‘সাবলাইম’ তত্ত্ব। সাবলাইম তত্ত্বও সাহিত্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। মাইমেসিস তত্ত্বের বিষয়বস্তু হলো সাহিত্যের কার্যধারা আর সাবলাইম তত্ত্বের বিষয়বস্তু হলো সাহিত্যের শৈলী। সাবলাইম তত্ত্বটি যে গ্রন্থ থেকে আমরা গ্রহণ করেছি সে গ্রন্থটিও গ্রিক ভাষায় লিখিত এবং লেখার সময়কাল খ্রিষ্টীয় প্রথম শতক। বইটির গ্রিক নাম ‘পেরি হিপসুস’ (Peri Hypsous) ইংরেজিতে ‘On Sublime’। বইটির নাম আমরা জানলেও এটির লেখক কে তা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না। ১৫৫৪ সালে এটি প্রথম মুদ্রিত হয় এবং সে মুদ্রণে লেখকের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল ডায়োনিসিয়াস লঞ্জাইনাস (Dionysius Longinus)। কিন্তু পরে দেখা যায় যে, পাণ্ডুলিপিতে লেখকের নাম লেখা ছিল Dionysius Or Longinus; Dionysius Longinus নয়। এই আবিষ্কারের পর থেকে অনেক ইতিহাস খোঁড়াখুঁড়ি হয় আসল লেখকের নাম উদ্ধারের জন্য। অনেক নাম আসে। অনেক বিতণ্ডা হয়। শেষে রেগে গিয়ে স্থির করা হয় এর লেখক হলেন Pseudo-Longinus, অর্থাৎ জনৈক ‘ভুয়া’ লঞ্জাইনাস। 
সাবলাইম সম্পর্কে প্রথম কথায়ই লঞ্জাইনাস বলছেন যে এটি হলো ভাষার উচ্চতা আর চমৎকারিত্ব (loftiness and excellence of language)। মহান লেখকরা তাঁদের লেখার এই গুণের ভিত্তিতে অত্যুচ্চ খ্যাতি আর অমরত্ব অর্জন করে থাকেন। ভাষার এই উচ্চতা আর চমৎকারিত্ব অর্জিত হলো কিনা তা নির্ভর করে ভাষাটি পাঠকের উপর কী প্রভাব ফেলল তার ওপর। দেখতে হবে ভাষাটি পাঠককে তার ভিতর থেকে বের আনল কিনা। ভাষাটি যদি যুক্তিপ্রধান হয় তাহলে তার কাজ হবে পাঠককে কোনো সিদ্ধান্তের দিকে প্ররোচিত করা। এক্ষেত্রে পাঠকের নিজস্ব যুক্তিবুদ্ধি সেই প্ররোচনার বিরুদ্ধে তাকে দাঁড়াতে শক্তি জোগাবে। পাঠক নিজের যুক্তিবুদ্ধির জোর দ্বারা সেই ভাষার শক্তিকে দমিত করতে সমর্থও হতে পারে। এই প্রকার ভাষা সাবলাইম নয়; এই ভাষা পাঠককে তার অবস্থান থেকে, তার কোটর থেকে নাড়িয়ে দিতে সমর্থ হয় না। ফলে যুক্তিতর্কের প্ররোচনাময় ভাষা সাহিত্যের ‘সাবলাইম’ ভাষার মর্যাদা অর্জন করতে পারে না। সাহিত্যের ভাষা হবে সেই ভাষা যার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো পাঠকের কোনো শক্তি থাকবে না। আরব্য একটি ধ্রুপদী কথা আছে কবিতার ব্যাপারে যা লঞ্জাইনাসের এই সাবলাইম ধারণাকে প্রতিধ্বনিত করে। আরব্য সেই ধ্রুপদী সংজ্ঞায় বলা হয়েছে কবিতা হলো সেই ভাষা যা শ্রোতার কানের অনুমতি ছাড়া হৃদয়ে প্রবেশ করে। লঞ্জাইনাসও সাহিত্যের সেই ভাষাকে সাবলাইম বলেছেন যা অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পাঠককে নাড়িয়ে দেয়, পাঠককে তার ভিতর থেকে এমন শক্তিতে বের করে আনে যে পাঠক ইচ্ছে করলেও সে শক্তির বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ গড়তে পারে না। এই ভাষা যখন পাঠককে আন্দোলিত করে পাঠক তখন বিমূঢ় হয়ে যায়। লঞ্জাইনাসের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, সাহিত্যগত ভাবনা বিষয়ে লঞ্জাইনাস অনেকটাই প্লেটোপন্থি, এরিস্টটলপন্থি নন। প্লেটো বলেছেন সাহিত্য যুক্তিবুদ্ধিকে নষ্ট করে এবং আবেগের উপদ্রবকে বাড়িয়ে তোলে। লঞ্জাইনাস সেই সুরেই বলেছেন যে, মহৎ সাহিত্যের ভাষা মানুষের যুক্তিবুদ্ধিকে বজ্রাঘাতে আহতের মতো থ’ বানিয়ে দেয় এবং পাঠককে তার আবেগের ও অনুভবের স্রোতে ভাসিয়ে নেয়। 
অবশ্য প্লেটোর অনুসরণে লঞ্জাইনাস সাহিত্যের ভাষার এই শক্তিকে অভিযুক্ত করেননি এবং সাহিত্যকে নিষিদ্ধ করার কথাও বলেননি। উপরন্তু, বইয়ের ৭ম অধ্যায়ে এসে, মনে হচ্ছে, তিনি বুঝতে পারলেন যে তিনি যা বলছেন তার মধ্যদিয়ে সাহিত্যের ভাষার একটি ক্ষতিকর দিকের কথা তিনি বলে ফেলেছেন। তাই এবারে সেই ক্ষতি পোষাতে গিয়ে তিনি একটু স্ববিরোধী হয়েই বললেন—‘সাহিত্যের সাবলাইম ভাষা পাঠকের আত্মার জন্য উচ্চভাবনার খোরাক জোগায়’ (dispose[s] the soul to high thoughts . . . leave[s] in the mind more food for reflection than the words seem to convey)। লঞ্জাইনাসের টেক্সটের বিশ্লেষণে স্টিফেন হ্যালিওয়েল এর নাম দিয়েছেন ‘অর্থের অতিরিক্ত’ বা ‘অর্থের উদ্বৃত্ত’ (surplus of meaning)। তিনি মনে করেন সাহিত্যের সাবলাইম ভাষা এভাবে অর্থের অতিরিক্ততা সৃষ্টির মাধ্যমে পাঠককে এক গভীরতর বাস্তবতার দিকে নিয়ে যায়। যুক্তিবুদ্ধির সাধারণ চর্চার মাধ্যমে উপলব্ধির সে গভীরতায় কখনো পৌঁছা সম্ভব নয়।
সাহিত্যের এই মহীয়ান অর্থাৎ সাবলাইম ভাষা কীভাবে তৈরি হবে, এর উপাদান কী কী—এ বিষয়েও লঞ্জাইনাস তাঁর বইয়ে আলোচনা করেছেন। লঞ্জাইনাসের মতে সাহিত্যের সাবলাইম ভাষার উপাদান বা উপকরণ হলো পাঁচটি : ১. মহৎ ভাব ধারণের ক্ষমতা, ২. প্রচণ্ড আবেগ জাগানোর ক্ষমতা, ৩. ভাষার অলংকার (figures of speech), ৪. উচ্চমার্গীয় শব্দ, ও ৫. শব্দের মহৎ বিন্যাস। প্রথম দুটি উপাদান বিষয়ে লেখকের কিছু করণীয় নেই। মহৎ ভাব ও উচ্চ আবেগের বিষয় হলো লেখার বিষয়বস্তু সংশ্লিষ্ট। লেখার বিষয়বস্তুর এই মহিমা না থাকলে শুধু লেখকের কারিগরি যোগ্যতার জোরে সাহিত্যকে সাবলাইম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলেই লঞ্জাইনাসের ধারণা। সাবলিমিটি অর্জনের বাকি তিনটি উপাদান সম্পূর্ণই লেখকের কারিগরি যোগ্যতার অংশ। লেখককে জানতে হবে কীভাবে ভাষায় চমৎকার ও মনোহর অলংকার সৃষ্টি করতে হয়, কীভাবে উচ্চমার্গীয় শব্দ খুঁজে পেতে হয় এবং কীভাবে সে শব্দমালা মহৎ শৈল্পিক বিন্যাসে বাঁধতে হয়। 
লঞ্জাইনাসের মতে মহৎ ভাব ও উচ্চ ভাব তিনভাবে অর্জিত হতে পারে। প্রথমত, এটি ঈশ্বরের দান হিসেবে লেখকের মনে আপনা-আপনি জন্ম নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, মহৎ লেখকরে লেখা অনুকরণ করার মাধ্যমে এটি অর্জিত হতে পারে। তৃতীয়ত, কল্পনার জোরেও এটি অর্জিত হতে পারে বলে লঞ্জাইনাসের বিশ্বাস। লক্ষণীয় যে, সাহিত্যতাত্ত্বিকদের মধ্যে লঞ্জাইনাসই প্রথম কল্পনার ব্যাপারটি সাহিত্যে গুরুত্বের সাথে দেখেছেন। লঞ্জাইনাসের এই কথা একটু ভিন্নভাবে রোম্যান্টিক যুগে প্রবলভাবে আবার ফিরে এসেছে। তবে তার পূর্বে ইংরেজি তথা ইউরোপীয় সাহিত্যে পুরো গ্রিক ও রোমান ভাবনাকে পাথেয় ধরে রেনেসাঁস যুগে নির্মিত হয়েছিল সাহিত্যের তাবৎ নমুনা ও আদর্শ। গ্রিক ও রোমান ভাবনায় উজ্জীবিত হয়ে; প্লেটো, এরিস্টটল ও লঞ্জাইনাসের চিন্তার অনুসারী হয়ে সাহিত্যের সেই নমুনা ও আদর্শকে ঘিরে যে তত্ত্বের উদ্ভব ঘটেছিল তার সুপরিচিত নাম হলো নিওক্লাসিসিজম বা নব্যধ্রুপদীবাদ। আমাদের পরের আলোচনা এই নিওক্লাসিসিজম নিয়ে।   


নিওক্লাসিসিজম

সাহিত্যতত্ত্বে নিওক্লাসিসিজম বিষয়টি এক এক দেশের জন্য এক এক রকমের। দেশভেদে ও সাহিত্যভেদে এর সময়কাল এবং বিষয়বস্তুতে স্পষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। আমরা এখানে যে শুধু ব্রিটেনভিত্তিক ইংরেজি সাহিত্যের নিরিখে নিওক্লাসিসিজম বিষয়ে আলোচনা করতে যাচ্ছি। নিওক্লাসিসিজম শব্দটি ইংরেজিতে ব্যবহৃত হলেও এর খাঁটি ইংরেজি হলো নিউক্লাসিসিজম। বাংলা করলে দাঁড়ায় নব্য ক্লাসিসিজম। ক্লাসিসিজম মানে হলে ক্লাসিকসের ভিত্তিতে দাঁড় করানো সাহিত্য ভাবনা। ইংরেজ তথা ইউরোপীয় ভাবনায় ক্লাসিক হলো গ্রিক ও রোমান সাহিত্য। সোজা করলে নিওক্লাসিসিজমের অর্থ দাঁড়ায় গ্রিক ও রোমান সাহিত্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সাহিত্যভাবনা বা সাহিত্যতত্ত্ব।  
শব্দের ব্যুৎপত্তি থেকে আহরিত এই অর্থের সাথে নিওক্লাসিসিজমের ব্যবহারিক অর্থ খুব একটা আলাদা নয়। সারা ইউরোপ জুড়ে রেনেসাঁস পরবর্তী শিক্ষিত মহল তাদের সাহিত্যের দিকনির্দেশনা সংগ্রহ করতে শুরু করলো গ্রিক ও রোমান ক্লাসিকস থেকে তারই ফসল হিসেবে তৈরি হলো নিওক্লাসিক সাহিত্য মতবাদ। ইংরেজ দেশে এই সময়টা হলো মোটামুটি ১৬৬০ থেকে ১৭৯০ পর্যন্ত, অর্থাৎ ইংরেজ পিউরিটান আন্দোলনের নেতা অলিভার ক্রমওয়েলকে হত্যার পর থেকে ফরাসি সম্রাট ষোড়শ লুইয়ের হত্যার আগ পর্যন্ত সময়কাল। রেনেসাঁসের পর থেকে রোম্যান্টিকের শুরু পর্যন্ত সময়কাল।
নিওক্লাসিসিজমের সময়কালটাকে সাহিত্যবিষয়ক ফতোয়ার কালও বলা যেতে পারে। এসময় কোনটা সাহিত্য হলো আর কোনটা সাহিত্য হলো না তা গ্রিক ও রোমান ক্লাসিকসে যাঁরা পণ্ডিত ও জ্ঞানী ছিলেন তাঁদের ফতোয়ার ওপর নির্ভর করত। কবিতাটির ফর্ম কী হবে, তার ছন্দ কী হবে, তার অলঙ্কার কী হবে সব ক্ষেত্রেই তখন ক্লাসিকস থেকে নির্দেশনা আহরণ করতে হতো। আর সে নির্দেশনা শুধু কবিতার জন্য নয়, সাহিত্যের সব শাখার জন্যই এসময় ক্লাসিক সাহিত্য থেকে ফতোয়া আর কানুন আহরণ করতে হতো। সেসব ফতোয়া দিয়ে আলক্সান্ডার পোপ দুখানা গ্রন্থও লিখে ফেলেছিলেন : একখানা ‘An Essay on Criticism’, অপরখানা ‘Essay on Man’। দুখানাই কবিতায় লেখা প্রবন্ধ। শেষোক্ত প্রবন্ধখানায় গ্রিক-রোমানদের সাহিত্যের এইসব ফতোয়া বা কানুনের মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে পোপ সোজা বলে দিয়েছিলেন যে, এসব নিয়মকানুন কোনো মানুষের তৈরি জিনিস নয়, এগুলো খোদ ভগবানের তৈরি। ভগবান যেমন প্রকৃতি বানিয়ে আমাদেরকে দিয়েছেন, তেমনি এগুলোও আমাদের জন্য বানিয়ে দিয়েছেন। মানুষ খালি এগুলোকে প্রকৃতি থেকে খুঁজে নিয়ে একটু সাজিয়েছে মাত্র। পোপের ভাষায়— Those rules of old discover’d, not devis’d/ Are Nature still, but Nature methodis’d। 
ক্লাসিক সাহিত্যের নিয়মকানুন দিয়ে সাহিত্যকে শাসনের যুগ হিসেবে নিওক্লাসিকাল যুগ মৌলিকভাবে পরিচিত হলেও সাহিত্যবিষয়ক ভাবনা ও চর্চায় এর আরো কিছু ভিন্নতর অনুষঙ্গও রয়েছে। রেনেসাঁস যুগে ঈশ্বরকে সরিয়ে দিয়ে মানবের জয়গানের যে সূচনা হয়েছিল নিওক্লাসিকাল যুগে এসে সে জয়গানের একটু লাগাম টেনে ধরা হলো। নিওক্লাসিকাল যুগের সাহিত্য তার বিষয়বস্তুতে মানবের জয়গান না গেয়ে বরং মানবের ত্রুটি ও স্খলনের জায়গাগুলো ব্যাপকভাবে তুলে আনতে শুরু করল। ক্লাসিক গ্রিক সাহিত্যে ভালো মানুষ নিয়ে ছিল মহাকাব্য আর ট্র্যাজেডি, এবং খারাপ মানুষ নিয়ে ছিল স্যাটায়ার আর কমেডি। নিওক্লাসিকাল যুগ ক্লাসিকাল যুগের সেই ভালো মানুষের সাহিত্য রচনায় নামল না, বরং উঠে পড়ে নামল খারাপ মানুষের সাহিত্য রচনায়। ফলে এই যুগে ক্লাসিকাল ধারায় মহাকাব্য আর ট্র্যাজেডি তেমন আসলো না, আসলো হরেক জাতের কমেডি, আর আসলো হরেক জাতের স্যাটায়ার। এমনকি মহাকাব্যের রূপকেও তারা মক-এপিক নামের নতুন ধারায় স্যাটায়ার রচনার কাজে ব্যবহার শুরু করল। 
আরো একটা বিষয়ে নিওক্লাসিকাল যুগ ইংরেজি তথা ইউরোপীয় সাহিত্যকে পিছিয়ে দিলো। ক্লাসিকসের অন্ধ অনুকরণের মাধ্যমে নিওক্লাসিকাল যুগ কল্পনার জায়গা সাহিত্যে ব্যাপকভাবে সংকুচিত করে ফেলল। সে সংকোচন এমনভাবে চলতে থাকল যে শেষ পর্যন্ত কল্পনার বিপুল শক্তিধারী মানুষদেরকে এই চর্চার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নামতে হলো। সেই বিদ্রোহ থেকেই জন্ম নিলো রোম্যান্টিসিজম নামের নতুন সাহিত্যভাবনা বা সাহিত্যতত্ত্ব। আমাদের পরের আলোচনা এই রোম্যান্টিসিজম নিয়ে। চলবে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

খেলারাম খেলে যা ও পাঠকের স্থানচ্যুতি

খেলারাম খেলে যা ও পাঠকের স্থানচ্যুতি

মৃত্যুকল্প ও কল্পমৃত্যুর অমীমাংসিত সন্দর্ভ

মৃত্যুকল্প ও কল্পমৃত্যুর অমীমাংসিত সন্দর্ভ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৪:৫১

যুক্তরাজ্যের লিডস শহরের সেভেন আর্টস থিয়েটারে উদযাপিত হতে যাচ্ছে কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'বিদ্রোহী' এবং টি এস এলিয়ট রচিত কবিতা 'ওয়েস্টল্যান্ড'র গৌরবময় শতবর্ষ। আগামী ২ অক্টোবর শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে এ অনুষ্ঠান হবে।
ভারতীয় মার্গসঙ্গীত ও দক্ষিণ এশীয় শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীতের শীর্ষ সংস্থা সৌধ সোসাইটি অব পোয়েট্রি অ্যান্ড ইন্ডিয়ান মিউজিকের ব্যবস্থাপনায় এই বিশেষ উদযাপনে মঞ্চায়িত হবে কবি টি এম আহমেদ কায়সার পরিচালিত বিশেষ কাব্য-আলেখ্য দ্য রেবেল অ্যান্ড দ্য ওয়েস্টল্যান্ড। এতে এলিয়টের চরিত্র রূপায়ন করছেন কবি ও নাট্যকার জন ফার্নডন এবং নজরুলের চরিত্রে থাকছেন আবৃত্তিকার মানস চৌধুরী। এলিয়টের সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী অধ্যাপক শিব কে কুমারের চরিত্রে অভিনয় করবেন শান্তনু গোস্বামী। মূল কবিতা দুটির নাটকীয় পাঠ ও অভিনয়ে থাকছেন কবি বেকি চেরিম্যান, কবি এরিক শিলান্ডার, কবি মাইলস সল্টার, শ্রী গাঙ্গুলি, কানিজ ফাতেমা চৌধুরী, এহসান আহমাদ রাজ, মোহাম্মদ সাদিফ, মিলি বসু, অভ্র ভৌমিক প্রমুখ। সঙ্গীত ব্যবস্থাপনায় থাকছেন প্রীতম সাহা। আলোক প্রক্ষেপণ ও ব্যবস্থাপনায় পাবলো খালেদ।
এই কবিতা দুটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত এবং বিশ্ব-কবিতায় এর প্রভাব নিয়ে বক্তব্য রাখবেন লিডস ট্রিনিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক কবি ওজ হার্ডউইক।
বাংলা ও ইংরেজি দুই সমৃদ্ধ কাব্য-ঐতিহ্যের প্রখ্যাত দুই কবিতার শতবর্ষ উদযাপনে দ্য রেবেল এবং দ্য ওয়েস্টল্যান্ড মঞ্চায়িত হবে ১৪ মার্চ লন্ডনের রিচমিপ থিয়েটারে এবং পরবর্তীতে ম্যানচেস্টার মিউজিয়াম, হাউজ অব কমন্স, ব্রিটিশ লাইব্রেরিসহ ব্রিটেনের বিভিন্ন শিল্পমঞ্চে, কয়েকটি শহরে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

খেলারাম খেলে যা ও পাঠকের স্থানচ্যুতি

খেলারাম খেলে যা ও পাঠকের স্থানচ্যুতি

মৃত্যুকল্প ও কল্পমৃত্যুর অমীমাংসিত সন্দর্ভ

মৃত্যুকল্প ও কল্পমৃত্যুর অমীমাংসিত সন্দর্ভ

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:২১

কিশোর বয়স থেকে রাজনীতি করেছেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৪৭-এর পর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক-শোষকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে সকল ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত রেখেছে, তা তিনি নিজের জীবনেই অনুভব করেছেন। ক্ষমতায় যাবেন কি না তা নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা না থাকলেও দেশের মানুষের জন্য কোন কোন কাজ করা দরকার সেই ভাবনা সব দক্ষ রাজনীতিবিদেরই থাকে। বঙ্গবন্ধুর আরো বেশি ছিল। কারণ তিনি নিজে ছিলেন স্বাপ্নিক এবং স্বপ্নদ্রষ্টা। বিরোধী রাজনীতি করার সময় দেশের অর্থনীতি কীভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত তা যেমন ভাবতেন, তেমনই ভাবতেন জনগণের স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য কোন পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হওয়া উচিত। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কর্মসংস্থান—সবকিছু নিয়েই গভীরভাবে ভাবতেন। জানতেন ঔপনিবেশিক আমলের নীতি এবং অবকাঠামো দিয়ে জনগণের জীবনের মূল চাহিদাগুলো পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই ক্ষমতায় গেলে কী করবেন, সে বিষয়ে প্রায় পূর্ণাঙ্গ ধারণা ছিল তাঁর। ছিল হয়তো লিখিত পরিকল্পনার ছকও। তাই তো দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের শেষে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ দেশের মাটিতে পা দিয়েই তিনি কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এবং প্রথমেই হাত দিয়েছেন দেশের মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করার ক্ষেত্রেগুলিতে। স্বাস্থ্য তেমনই একটি মৌলিক প্রয়োজন এবং অধিকার। সীমিত সংখ্যক সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবাকে বন্দি না রেখে দেশের সাত কোটি জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নির্মিত হয়েছে তাঁর হাত ধরে। 
          এই বইয়ের লেখক অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক পাঠকদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দেশে ফেরার ২১ দিনের মাথায় বঙ্গবন্ধু গঠন করলেন পরিকল্পনা কমিশন। হাত দিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজে।
          কেমন ছিল সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য-অবকাঠামো? লেখক হারিসুল হকের বই থেকে জানা যাচ্ছে, সারা দেশে সাত কোটি মানুষের জন্য হাসপাতালে শয্যা ছিল মাত্র ১২৩১১টি। দেশে ডাক্তারের সংখ্যা মাত্র ৭০০ জন। তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন ৭০ জন। বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ২৫৯ জন। তাদের সবার অবস্থান ছিল রাজধানী ঢাকাতে এবং মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলিতে। তার মানে, ঢাকার বাইরে কোনো রোগীর বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সেবা পাওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না।
          চিকিৎসাব্যবস্থা মানে কেবল ডাক্তার নয়। নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ান, ওয়ার্ড বয়, প্যারামেডিক, অ্যাম্বুলেন্সচালক, হেলথ ভিজিটর, সেনিটারি ইন্সপেক্টর, ফার্মাসিস্টসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যসেবাদানকারীদের নিয়ে গড়ে ওঠে একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা। সেইসব টেকনিক্যাল মানুষের সংখ্যাও ছিল নিতান্তই অপ্রতুল। সারা দেশে নার্স ছিলেন ৭০০ জন, মিডওয়াইভস ছিলেন ২৫০ জন, স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা ২৫০ জন। কমপাউন্ডার ছিলেন ১০০০ জনেরও কম। সারাদেশে নামমাত্র রুরাল হেলথ সেন্টার ছিল ১৫০টি। নামমাত্র বলা হচ্ছে এইজন্য যে সেগুলোতে কোনো ডাক্তার তো দূরের কথা, প্যারামেডিকেরও পদায়ন ছিল না।  এই সংখ্যাগুলোই বলে দেয় এই দেশের মানুষের জন্য কার্যত কোনো স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ইচ্ছাই ছিল না পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর। তাদের জীবন পুরোটাই ছিল নিয়তির ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় হাতুড়ে, কবিরাজ, হেকিমদের ওপর নির্ভর করতে হতো সর্বাংশে।
          এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা করলেন বঙ্গবন্ধু। রাতারাতি তো একটা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত করা সম্ভব নয়। তাই কিছু ছিল আশু লক্ষ্য, কিছু মধ্যম মেয়াদী, এবং কিছু সুদূরপ্রসারী। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কিউরেটিভ এবং প্রিভেনটিভ চিকিৎসাকে সমন্বিত করা হয়েছিল। বিশুদ্ধ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, এনভায়রনমেন্টাল হেলথ, গর্ভবতী মা ও প্রসূতি পরিচর্যা, জনগণকে স্বাস্থ্যশিক্ষা দেওয়া, বিভিন্ন রোগের টিকা ছিল প্রিভেনটিভ চিকিৎসার অন্তর্গত। এছাড়া যেহেতু স্বাস্থ্যখাত অনেককিছুর সাথে সমন্বিত একটি বিষয়, তাই স্বাস্থ্যের সাথে পরিবার পরিকল্পনা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে একীভূত করা হয়েছিল।
          স্বাস্থ্যখাতে জরুরি ভিত্তিতে কিছু ক্রাশ প্রোগ্রাম নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭২ সালে ৪৫০ জন ছাত্রীকে রির্বাচন করে দ্রুত নার্সিং ট্রেনিং সেন্টারে পাঠানো হলো। একটিমাত্র নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিউট ছিল ঢাকাতে। জরুরি ভিত্তিতে রাজশাহীতে খোলা হলো আরেকটি ট্রেনিং সেন্টার। ডাক্তার-সংখ্যা তো রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। একজন ছাত্রের এমবিবিএস কোর্স সম্পন্ন করার জন্য ছয় বৎসর সময় লাগে। তাই অন্তত জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য কিউবার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে একবছর মেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে প্যারামেডিক তৈরির ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
          বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিকল্পনা কমিশন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এমনভাবে পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছিল, যাতে করে দেশের যেকোনো অঞ্চলের প্রতিটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কের আওতায় আসতে পারে। বেসিক হেলথ ওয়ার্কার বা মৌলিক স্বাস্থ্যকর্মী নামে একটি পদ সৃষ্টি করা হয়। এরাই জনগণের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত স্বাস্থ্যসেবক। লেখক তার বইতে তুলে ধরেছেন মৌলিক স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের বিবরণ—‘৪০০ মানুষের স্বাস্থ্যের দেখভালের দায়িত্বে থাকবেন একজন মৌলিক স্বাস্থ্যকর্মী। তাঁরা সিডিউল অনুযায়ী মাসে অন্তত একবার প্রতিটি বাড়ি পরিদর্শন করবেন। পরিদর্শনকালে তাঁরা টিকাদান কর্মসূচি (গুটি বসন্ত, কলেরা, টাইফয়েড এবং যক্ষ্মা)-তে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করবেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যশিক্ষা (সঠিক পয়ঃনিষ্কাশন, পানীয় জল বিশুদ্ধকরণ, পরিবার পরিকল্পনা) সম্বন্ধে জনগণকে অবহিত করবেন, তাঁরা ম্যালেরিয়া শনাক্ত করার জন্য রোগীদের রক্ত ও সম্ভাব্য যক্ষ্মা আক্রান্তদের কফের নমুনা সংগ্রহ করে রুরাল হেলথ সেন্টারের ল্যাবরেটরিতে জমা দেবেন। তাঁরা ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা ও কুষ্ঠরোগীদের ঔষধ রোগীদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবেন। তাঁরা ম্যালেরিয়া নির্মূল অভিযানে সম্পৃক্ত থাকবেন এবং মহামারিকালে সরকার গৃহীত বিবিধ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হবেন। তাঁরা পারিবারিক স্বাস্থ্যকার্ড ও পরিবার পরিকল্পনা গ্রহীতাদের কার্ড যথাযথভাবে পূরণ এবং সংরক্ষণ করবেন—পরবর্তীকালে সেখান থেকে পরিসংখ্যানের জন্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা যাবে।’ [পৃষ্ঠা ৩৬]
          এই ধরনের পরিকল্পনাকে বলা যায় গণমুখী স্বাস্থ্য পরিকল্পনা। শিক্ষার মতো স্বাস্থ্যও কারো সুযোগ নয়, বরং অধিকার। এই ধারণাতেই বিশ্বাসী এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেজন্য স্বাস্থ্যখাতে যেসব পরিকল্পনা তিনি গ্রহণ করেছিলেন সেগুলির বর্ণনা পাওয়া যাবে ডা. হারিসুল হকের লেখা এই গ্রন্থে।
          বঙ্গবন্ধু সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন। কারণ, তাঁর বিশ্বাস ছিল একমাত্র সমাজতন্ত্রেই সকল মানুষের মুক্তি সম্ভব। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, অশিক্ষা থেকে মুক্তি, স্বাস্থ্যহীনতা থেকে মুক্তি। সেই লক্ষ্যেই এই ধরনের স্বাস্থ্য পরিকল্পনা। সমাজতন্ত্র গড়ে না উঠলেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অন্তত একটি কল্যাণরাষ্ট্র পেতে যাচ্ছিল বাংলাদেশের মানুষ। 
          এখন পৃথিবীতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য ভাবনায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। ঔষধ, রোগনির্ণয়, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, জটিল স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত হয়েছে অনেক নতুন নতুন আবিষ্কার। সেগুলি বয়ে এনেছে মানুষের রোগমুক্তি এবং দীর্ঘ জীবনের আশ্বাস। কিন্তু মুক্তবাজার পুঁজিবাদ এখন কেবল ধনীদের জন্যই নিশ্চিত করেছে উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী এখন আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। বিশাল বিশাল সরকারি স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। তবু সেখানে চিকিৎসা পায় দেশের মাত্র শতকরা ৩০ ভাগ মানুষ। বাকি ৭০ ভাগ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা কিনতে হয় বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, নার্সিং হোম থেকে। মুক্তবাজার পুঁজিবাদের নিয়ম অনুসারে স্বাস্থ্যখাতে গড়ে উঠেছে প্রতিযোগিতা। তবে সেই প্রতিযোগিতা রোগীদের জন্য সহায়ক হয়নি। হয়েছে উদ্যোক্তা এবং দালাল শ্রেণির জন্য। টাকার অঙ্কে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বরাদ্দ বেড়েছে। তবে অন্যখাতের তুলনায় বেদনাদায়করূপে কম। বঙ্গবন্ধুর সময়ে যেখানে বাজেটের প্রায় ৫% বরাদ্দ ছিল স্বাস্থ্যখাতে, এখন সেখানে বরাদ্দ ২%-এরও কম। বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনায় সরকারকে জনগণের স্বাস্থ্য প্রতিদিন বেশি বেশি করে ছেড়ে দিতে হচ্ছে বেসরকারি খাতে। এই প্রবণতা বঙ্গবন্ধুর চিন্তা এবং আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক।
          আমরা কৃতজ্ঞ ডা. হারিসুল হকের কাছে এমন একটি গ্রন্থ প্রণয়নের জন্য। তার এই গ্রন্থের মাধ্যমে আমরা অন্তত এটুকু বুঝতে পারছি যে স্বাস্থ্যখাতে আমাদের কোনদিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, আর এখন আমরা হাঁটছি তাঁর নির্দেশিত পথের বিপরীত দিকে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের একমাত্র উপায় হচ্ছে বর্তমানের ভুলযাত্রা থেকে বিরত হয়ে তাঁর আদর্শের পথকে অনুসরণ করা।

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা। অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক। প্রকাশক : কবিতাসংক্রান্তি, ঢাকা। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। পৃষ্ঠা : ৮৮। মূল্য :  ৩০০ টাকা।

 

/জেডএস/

সম্পর্কিত

খেলারাম খেলে যা ও পাঠকের স্থানচ্যুতি

খেলারাম খেলে যা ও পাঠকের স্থানচ্যুতি

মৃত্যুকল্প ও কল্পমৃত্যুর অমীমাংসিত সন্দর্ভ

মৃত্যুকল্প ও কল্পমৃত্যুর অমীমাংসিত সন্দর্ভ

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

খেলারাম খেলে যা ও পাঠকের স্থানচ্যুতি

খেলারাম খেলে যা ও পাঠকের স্থানচ্যুতি

মৃত্যুকল্প ও কল্পমৃত্যুর অমীমাংসিত সন্দর্ভ

মৃত্যুকল্প ও কল্পমৃত্যুর অমীমাংসিত সন্দর্ভ

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—চারসাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

সর্বশেষ

নির্বাচন কমিশনের জন্য কি মঙ্গল গ্রহ থেকে লোক আনবেন: কৃষিমন্ত্রী

নির্বাচন কমিশনের জন্য কি মঙ্গল গ্রহ থেকে লোক আনবেন: কৃষিমন্ত্রী

সৌরভের ‘বন্ধু’ ইফতেখার বিসিবি নির্বাচনে

সৌরভের ‘বন্ধু’ ইফতেখার বিসিবি নির্বাচনে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বল্পমেয়াদী উদ্ভাবনীর ট্রেন্ড চারটি: গার্টনার

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বল্পমেয়াদী উদ্ভাবনীর ট্রেন্ড চারটি: গার্টনার

নমুনা পরীক্ষার আড়াই কোটি টাকা আত্মসাৎ করলেন টেকনোলজিস্ট

নমুনা পরীক্ষার আড়াই কোটি টাকা আত্মসাৎ করলেন টেকনোলজিস্ট

পদোন্নতিপ্রাপ্ত  ১৫৭ পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলি

পদোন্নতিপ্রাপ্ত ১৫৭ পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলি

© 2021 Bangla Tribune