X
সোমবার, ১৯ এপ্রিল ২০২১, ৬ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

করোনার অর্থনীতি ও শেখ হাসিনা

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২০, ১৭:১০

লীনা পারভীন জীবন আগে না জীবিকা আগে? গোটা দেশ তখন এই আলোচনায় মত্ত্ব। কারণ, বিশ্বের অন্যান্য দেশ জীবনের পেছনে ছুটছে। না, আমি কোনও নীতিকথার আলোচনায় আসিনি। এই একটি প্রশ্ন তখন টকশো, কলাম, রাস্তাঘাট সব জায়গায় আলাপের ইস্যু। বলছিলাম করোনা আসার পর থেকে চলতে থাকা আলাপ প্রসঙ্গে। মার্চের শুরুতে যখন প্রথম আমাদের দেশে করোনা শনাক্ত হলো, সারাদেশে লকডাউন শুরু হলো ২৬ তারিখ থেকে। নতুন এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের একমাত্র কৌশল হিসাবে তখন লকডাউনেই ভরসা সবার। বিশ্বের সকল দেশ চলে গেলো লম্বা লকডাউনে। আমরাও শুরু করলাম লকডাউন জীবন। পাশের দেশ ভারতও তখন লকডাউনকেই বেছে নিয়েছিল। কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক বা সামাজিক কাঠামো তো আর অন্যান্য দেশের মতো নয়। ১৭ কোটি মানুষের দেশে সবাইকে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ বা অর্থনৈতিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া মুখের কথা নয়। তারপরও আমাদের সরকার তার সাধ্যমতো বিভিন্ন স্তরে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এগিয়ে এসেছিল বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের লোকেরা। সহায়তার হাত বাড়িয়েছে ব্যক্তি পর্যায়ের অনেকেই।
কিন্তু এভাবে আর কতদিন? এর মধ্যেই নিম্নবিত্তের মানুষের মধ্যে শুরু হয়েছিল অনিরাপত্তার হাতছানি। করোনার থেকেও একটা সময় পেটের ক্ষুধাই যেন হয়ে উঠছিল বড় শত্রু। মানুষ যেন না খেয়ে মারা যায় সেই লক্ষ্যেই একটি বাস্তব সিদ্ধান্ত নিলেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তিনি উপলব্ধি করলেন, জীবন ও জীবিকা কোনোটিই কোনোটির থেকে আলাদা কিছু নয়। জীবনের জন্য জীবিকা যেমন দরকার, আবার ঠিক তেমনি জীবিকার জন্যও জীবনের দরকার। তিনি কিছুটা বুঝে নিলেন করোনার পালস। বুঝতে চাইলেন অর্থনীতির পালসও। নিজ দেশের জনগণের পালস তিনি ঠিকঠাক পড়তে পারেন এ বিষয়টি এর আগেও তাঁর অনেক কর্মকাণ্ডে বোঝা গেছে। অসুস্থ হলে সুস্থ হওয়ার একটা উপায় বের হয়ে যায় কিন্তু ক্ষুধার্ত হয়ে মরতে বসলে সেখানে উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব। ক্ষুধা মানুষকে টেনে নিয়ে যায় অন্য পথে। কারণ, পেট শান্ত রাখাই প্রধান টার্গেট থাকে মানুষের। ন্যায়-অন্যায় বিবেচনাবোধ কাজ করে না সেখানে। মানুষের হাতে যদি সামর্থ্য থাকে তবে সে প্রাপ্য সুবিধাগুলো অর্জনের চেষ্টা করে। আর সেই সামর্থ্যের অন্যতম রাস্তা হচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মে নিজেকে যুক্ত রাখা।
দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে বন্ধ রেখে সরকারইবা সহায়তা দেবে কতদিন? তুমুল সমালোচনা ও তর্কের মাঝেই মারাত্মক স্রোতের বিপরীতে গিয়ে একটি সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। গোটা বিশ্ব একদিকে চলেছে আর তিনি একা চলেছেন আরেক দিকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, যারা বিশ্বের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তারাও আশঙ্কার কথাই বলেছে সেদিন। আমরা জনগণও যুক্ত ছিলাম তাঁর সমালোচনায়। কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে আবার কেউ ভয়ে বা না বুঝেই মিশেছিলাম এই ‘জীবন ও জীবিকার’ তর্কে। সেদিন না বুঝলেও আজ আমরা যথেষ্ট বুঝতে পারছি তিনি সঠিক ছিলেন। তাঁর সাহস আজ  স্বীকৃতি পেতে শুরু করেছে।
একজন নেতার মধ্যে যদি সাহস না থাকে, ঝুঁকিকে মাথায় রেখেই কৌশল নির্ধারণ করতে ব্যর্থ যে নেতা তিনি আসলে নেতাই নন। জীবনে ঝুঁকি থাকবেই, তাই বলে কি বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায়? ২% চান্স থাকলেও অনেক সময় শেষ মুহূর্তে থাকা রোগীকে বাঁচাতেও ডাক্তাররা শেষ চেষ্টা হিসাবে অনেক শক্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। করোনাকে না চিনলেও দেশ ও দেশের মানুষের কথা বিবেচনায় রেখে শেখ হাসিনা সেদিন যে বিরাট সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন সেটিই ধীরে ধীরে আদর্শ হতে চলেছে। নেতা যদি উদ্দেশ্যে অবিচল থাকে তাহলে সেটিকে অর্জনের জন্য ঠিক কোনও না কোনও রাস্তা বের করে নেন।
ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিক করে দিয়ে অর্থনীতির চাকাকে সচল হতে দিয়েছিলেন তিনি। মানুষ আবার প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করলো। কারও দয়ার ওপর নির্ভর করে নয়, নিজের শ্রমেই আয় রোজগার করে বাঁচা শুরু করলো আমাদের শ্রমজীবীরা। অফিস আদালত সবকিছুই খুলে গেলো। স্থবির হতে চলা দেশ যেন আবারও ফিরে পেতে থাকলো ইমিউনিটি পাওয়ার। বলা হয়ে থাকে, করোনার বিরুদ্ধে লড়তে হলে চাই শারীরিক সক্ষমতা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। ইমিউনিটি পাওয়ার নির্ভর করে আপনি কতটা সচল আছেন তার ওপর। কেবল পুষ্টিকর খাবার খেলেই হয় না, মানসিকভাবেও প্রফুল্ল থাকা লাগে। নির্ভার থাকা লাগে লড়াইয়ের ময়দানে। ঠিক একই উপায়ে গোটা বাংলাদেশ মানসিকভাবে আবার চাঙা হয়ে উঠলো সবদিক থেকে। মাসের পর মাস লকডাউনে থেকেও যেখানে অন্যান্য দেশ করোনায় মৃতের সংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, সেখানে সবকিছু খোলা রেখেও বাংলাদেশে মৃত্যুর হার অনেক কম। অথচ আশঙ্কা করা হয়েছিল আমাদের দেশে মৃত্যুর হার হবে অনেক বেশি। ঘন বসতিপূর্ণ একটি দেশে যেখানে সামাজিক দূরত্ব টিকিয়ে রাখাই প্রায় মুশকিলের একটি কাজ, সেখানে সবকিছু খুলে দিয়ে কেমন করে করোনা ঠেকানো যাবে সেটি নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন আমাদের বিশেষজ্ঞরাও। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের দুর্বল চিত্রও ছিল এই চিন্তার অন্যতম কারণ। দুশ্চিন্তা বা সমালোচনাকে আমি অবাস্তব বলছি না। কারণ, করোনার কোনও প্রতিষেধক যেখানে নেই, নেই কোনও নির্দিষ্ট চিকিৎসা বা প্রতিরোধক কোনও উপায়, সেখানে এমন সিদ্ধান্তকে অবাস্তব বা অবিবেচনাপ্রসূত ভাবাই স্বাভাবিক। এখানেই হয়তো একজন নেতার সঙ্গে অন্যদের পার্থক্য। একজন নেতা যে দৃষ্টি থেকে কোনও বিষয়কে বিবেচনা করেন বা দেখার চেষ্টা করেন, সাধারণেরা সেখানে পৌঁছাতেই পারে না অনেক সময়। শেখ হাসিনা একজন ট্র্যাডিশনাল লিডার নয়, আধুনিক বিশ্বে ‘সিচুয়েশনাল লিডারশিপ’ বলে এক ধরনের লিডারশিপ স্টাইল অধিক আলোচিত। এই ধরনের নেতৃত্ব বাস্তবতার নিরিখে পরিস্থিতিকে বিবেচনায় রেখে কৌশল নির্ধারণ করেন। এক্ষেত্রে তারা কোনও সেট ফর্মুলাকে মাথায় না রেখে সমস্যার নানাদিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সময়ের বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেন। শেখ হাসিনাকে তাই আমি মনে করি একজন সিচুয়েশনাল লিডার, যিনি ট্র্যাডিশন এবং বাস্তবতা দুটোর সংমিশ্রণে একদম নিজস্ব একটি কৌশলে করোনাকে মোকাবিলায় নেমেছিলেন। এমন সিদ্ধান্ত শর্ট টার্মে সমালোচিত হলেও ফলাফল বলে এটিই সঠিক নীতি।
করোনা মোকাবিলায় আজ যখন অন্যান্য দেশের অর্থনৈতিক চাকা থমকে গেছে সেখানে বাংলাদেশ চলছে ঈর্ষণীয় গতিতে। আমার বিশ্বাস, শেখ হাসিনার এই মডেল খুব দ্রুত তাঁকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে, যার প্রকাশ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।

লেখক: কলামিস্ট

 
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়মের আওতায় আনা জরুরি

মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়মের আওতায় আনা জরুরি

শতবর্ষে আমার প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়কে যেমন দেখতে চাই

শতবর্ষে আমার প্রাণের বিশ্ববিদ্যালয়কে যেমন দেখতে চাই

বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা কেন বাড়ছে?

বিবাহ বিচ্ছেদের সংখ্যা কেন বাড়ছে?

নতুন বছরের প্রত্যাশা

নতুন বছরের প্রত্যাশা

বুদ্ধিজীবী দিবসের চেতনা

বুদ্ধিজীবী দিবসের চেতনা

মানসিক স্বাস্থ্যকে আর অবহেলা নয়

মানসিক স্বাস্থ্যকে আর অবহেলা নয়

বঙ্গবন্ধু ছড়িয়ে যাক গোটা বাংলায়

বঙ্গবন্ধু ছড়িয়ে যাক গোটা বাংলায়

অর্থনৈতিক উন্নয়ন বনাম আগামীর বাংলাদেশ

অর্থনৈতিক উন্নয়ন বনাম আগামীর বাংলাদেশ

কতটা প্রতিবাদ হলে বিচার পাওয়া যায়?

কতটা প্রতিবাদ হলে বিচার পাওয়া যায়?

করোনাও থামাতে পারেনি নারী নির্যাতন

করোনাও থামাতে পারেনি নারী নির্যাতন

সর্বশেষ

ভারতে খোলা বাজারে পাওয়া যাবে করোনা ভ্যাকসিন

ভারতে খোলা বাজারে পাওয়া যাবে করোনা ভ্যাকসিন

নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধরতে বললেন বাবুনগরী

নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধরতে বললেন বাবুনগরী

ঈদ আয়োজন নিয়ে এসেছে ফেইসরঙ

ঈদ আয়োজন নিয়ে এসেছে ফেইসরঙ

সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টায় হেফাজত

সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টায় হেফাজত

‘চিকিৎসককে হয়রানি করায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহতের শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে’

‘চিকিৎসককে হয়রানি করায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহতের শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে’

‘চিকিৎসকের সঙ্গে পুলিশের এমন আচরণ কাম্য নয়’

‘চিকিৎসকের সঙ্গে পুলিশের এমন আচরণ কাম্য নয়’

৩৬ দল, গ্রুপ পর্ব নেই, বৃহস্পতিবারে ম্যাচ... আর কী পাল্টালো চ্যাম্পিয়নস লিগে?

৩৬ দল, গ্রুপ পর্ব নেই, বৃহস্পতিবারে ম্যাচ... আর কী পাল্টালো চ্যাম্পিয়নস লিগে?

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্নাতক ভর্তি পরীক্ষার তারিখ চূড়ান্ত

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্নাতক ভর্তি পরীক্ষার তারিখ চূড়ান্ত

কোথায় লকডাউন?

কোথায় লকডাউন?

২ ডোজ টিকা নিয়েও করোনায় আক্রান্ত ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং

২ ডোজ টিকা নিয়েও করোনায় আক্রান্ত ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং

খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করতে কৃষকদের সহায়তা দিচ্ছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করতে কৃষকদের সহায়তা দিচ্ছে সরকার: প্রধানমন্ত্রী

কালবৈশাখী ঝড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ লণ্ডভণ্ড

কালবৈশাখী ঝড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ লণ্ডভণ্ড

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune