X
সোমবার, ০২ আগস্ট ২০২১, ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

মুরাকামির লেখক হয়ে ওঠার গল্প: পর্ব-১

দৌড়বিদ-ঔপন্যাসিক || হারুকি মুরাকামি

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০১৫, ১৪:৩২

[খ্যাতনামা জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির আত্মজৈবনিক গ্রন্থের নাম ‘হোয়াট আই টক অ্যাবাউট হোয়েন আই টক অ্যাবাউট রানিং’। কিছুদিন আগে ‘দ্য নিউইয়র্কার’ পত্রিকায় ‘রানিং নভেলিস্ট’ নামে একটা আত্মজীবনীমূলক লেখাও বের হয়। এই লেখাটি ঐ বইয়ের অংশ কিনা পত্রিকাটিতে তার উল্লেখ নেই। লেখাটাতে দৌড়ের প্রসঙ্গ জোড়ালভাবে এলেও এটি আসলে মুরাকামির লেখক হয়ে ওঠারই গল্প। মূল জাপানি থেকে লেখাটা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ফিলিপ গ্যাব্রিয়েল। সেখান থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন দিলওয়ার হাসান।]

প্রতিদিন দৌড়ানোর কার্যক্রম শুরু করার পর থেকে বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হয়েছে। সুনির্দিষ্ট করে ১৯৮১ সালের শরতের কথা বলা যায় যখন আমার বয়স ৩৩।

এর বেশিদিন আগের কথা নয় যখন টোকিওর সেন্দাগায়া স্টেশনের কাছে আমার একটা জাজ ক্লাব ছিল। তখন পার্ট-টাইম চাকরি নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম যে, গ্রাজুয়েশন লাভের জন্যে প্রয়োজনীয় অনেকগুলো ‘ক্রেডিট’ তখনও বাকি। বস্তুত তখনও আমি একজন ছাত্র। সেই সময় কাকুবুঞ্জি স্টেশনের দক্ষিণের প্রবেশ দ্বারের পাশে ক্লাবটি খোলা হয়। ক্লাবটা ওখানে প্রায় তিন বছর ছিল। তারপর যখন ওখানকার ভবনটিতে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শুরু হয় তখন টেকিও শহরের কেন্দ্রের কাছাকাছি চলে যাই। নতুন জায়গাটা বেশি বড় ছিল না। আমরা একটা গ্রান্ড-পিয়ানো জোগাড় করেছিলাম তবে পঞ্চ বাদ্যযন্ত্রের উপযোগী যৌথ সঙ্গীত পরিবেশন করবার মতো যথেষ্ট জায়গা ওখানে ছিল না। দিনের বেলায় এটা ছিল কফিখানা আর রাতে বার। আমরা বেশ ভাল খাবার-দাবাড় পরিশেন করতাম গ্রাহকদের, আর সপ্তাহের শেষে লাইভ পারফরম্যান্স থাকতো। তখনও টোকিও শহরে এ-ধরনের ক্লাব দুর্লভ ছিল, ফলে আমরা বেশ ভাল রকমের গ্রাহক ধরতে সক্ষম হয়েছিলাম, আর জায়গাটা আর্থিক দিক থেকেও ছিল ভাল।
আমার অধিকাংশ বন্ধুর ধারণা ছিল ক্লাবটি সফলতা লাভ করতে পারবে না। তারা হিসাব করেছিল এইভাবে সখের বশে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান সাফল্যের মুখ দেখতে পারবে না। তারা সন্দেহ করেছিল, আমার মতো সাদাসিধে আর কৌশলবর্জিত মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি সামান্যই আগ্রহ থাকে, ফলে এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান গুটিয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। বেশ, তাদের অনুমান ছিল অসার। সত্যি কথা বলতে কী, ব্যবসায় আমার তেমন একটা আগ্রহ ছিল না একথা ঠিক। আমি শুধু একটা হিসবাই করেছিলাম, তা হচ্ছে ব্যর্থতার কোনো অপশন ছিল না, আমার যথাসর্বস্ব ওখানে ঢেলে দিয়েছিলাম। শক্তির জায়গাটা ছিল আমার পরিশ্রম আর সবকিছু কায়িক পরিশ্রম দিয়ে মোকাবিলা করতে পারি। রেসের-ঘোড়া ছিল না, ছিলাম কর্মপাগল ঘোড়া। নিত্যদিন পরিশ্রমে অভ্যস্ত নয় এমন পরিবারে থেকে এসেছিলাম বলে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে বেশি ধারণা ছিল না; কিন্তু সৌভাগ্যবশত আমার স্ত্রীর পরিবার ব্যবসা চালিয়ে অভ্যস্ত ছিল, ফলে তার স্বতলব্ধ জ্ঞান আমাদের খুব কাজে লেগেছিল।

কাজকর্ম সত্যিই খুব কঠিন ছিল। সকাল থেকে রাত অবধি ওখানে থাকতাম আর পরিশ্রান্ত হয়ে পড়তাম। সব রকমের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা আমার ছিল আর ছিল ভূরি ভূরি হতাশা। তবে কিছুদিন পর লাভের মাত্রা এত বাড়ল যে, লোকজন নিয়োগ করতে সক্ষম হলাম। শেষ পর্যন্ত সাময়িক বিশ্রাম গ্রহণের সুযোগ এলো। ভালভাবে শুরু করার জন্য যতদূর সম্ভব ব্যাংক থেকে ঋণ নিলাম আর এতদিনে সেই ঋণ পরিশোধের সক্ষম হলাম। সব কিছুই ঠিকঠাক হয়ে আসছিল। ওই পর্যায়ে এসে সাংঘাতিক রকমের অস্তিত্ব সংকট দেখা দিল। আর কিছু নিয়ে ভাববার অবকাশ ছিল না। এখন মনে হয় অনেক চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করে শীর্ষে পৌঁছেছি আর একটা মুক্ত এলাকা খুঁজে পেয়েছি। এখন আমার মধ্যে এই আত্মবিশ্বাস জন্মেছে যে, যেকোনো রকমের নতুন সমস্যা সামলাতে পারব। আমি দীর্ঘ একটা শ্বাস নেই, যে সিঁড়ি এইমাত্র অতিক্রম করেছি তার নিচে তাকাই আর এরপর কী করণীয় তা নিয়ে ভাবতে বসি। তখন বয়স ত্রিশ ছুঁইছুঁই। সেই বয়সে এসে উপনীত হচ্ছি যখন কাউকে আর যুবক বলে গণ্য করা যায় না। একদিন আকস্মিকভাবেই আমার ভেতর উপন্যাস রচনার প্রেরণা এল।

সেই মুহূর্তটির কথা একেবারে নির্দিষ্ট করে বলতে পারব। সেটা ছিল ১৯৭৮ সালের ১লা এপ্রিল বেলা ১টা ৩০ মিনিট। জিংঘু স্টেডিয়ামে বসে বেসবল খেলা দেখছিলাম। সেই সময় স্টেডিয়ামটা ছিল আমার বাসা থেকে হাঁটা-পথ। আমি ছিলাম ইয়াকুল্ট সোয়ালো দলের একজন ঘোরতর সমর্থক। বসন্তের চমৎকার একটা দিন ছিল সেই সেটি, মেঘমুক্ত আকাশ, উষ্ণ বাতাস বইছিল। সে সময় বহির্মাঠের বসবার জায়গায় কোনো বেঞ্চ-টেন্স ছিল না, ঘাসের একটা ঢালু জায়গা ছিল মাত্র। ঘাসের উপর শুয়েছিলাম, ঠাণ্ডা বিয়ার খেতে খেতে মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকাচ্ছিলাম আর খুব করে উপভোগ করছিলাম খেলাটা। অন্যদিনের মতোই স্টেডিয়ামে তেমন একটা ভিড় ছিল না। সিজনের প্রথম খেলা ছিল সেটা। সোয়ালো হিরোশিমা কার্পের মুখোমুখি হয়েছিল। সোয়ালোর পক্ষে বল নিক্ষেপ করেছিল তাকেশি ইয়েসুদা। বেঁটে খাটো খেলোয়াড়। চাতুর্যপূর্ণ বাঁকা বল করে। প্রথম ইনিংসের শীর্ষ খেলা সে অনায়াসে সম্পন্ন করল। স্বল্প দূরত্ব থেকে ব্যাট করে এমন ব্যাটসম্যান ছিল সেয়ালো দলের ডেভ হিলটন, দলে নতুন এসেছে এমন একজন মার্কিন খেলোয়াড়। হিলটন ব্যাট বলে লাগিয়ে মাঠের বাম প্রান্তে পাঠিয়ে দেয়। ব্যাট-বলের সংঘর্ষের শব্দ সারা মাঠে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। হিলটন খুব সহজেই প্রথমে পৌঁছে গিয়েছিল আর দ্বিতীয় বারের জন্যে অবস্থান আরও উন্নতি ঘটিয়েছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে একটা চিন্তা আমার মাথায় এসে বিদ্ধ হয় : ‘তুকি জান কি’? আমি একটা উপন্যাস লেখার চেষ্টা করতে পারি। এখনও স্পষ্ট স্মরণ করতে পারি সেই উদার আকাশ, অনুভব করতে পারি নতুন ঘাস, মন ভোলানো ব্যাটের শব্দ। মনে হয়েছিল আকাশ থেকে কোনো কিছু উড়ে এসেছে, সেটা যা-ই হোক না কেন, আমি গ্রহণ করেছিলাম।
“ঔপন্যাসিক” হওয়ার কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমার ছিল না। কেবলমাত্র একটা উপন্যাস লেখার তীব্র ইচ্ছা আমার মধ্যে বাসা বেঁধেছিল। কী লিখতে চাই তার বাস্তব কোনো ইমেজও আমার সামনে ছিল না, শুধু এইটুকু দৃঢ়তা মনের মধ্যে ছিল, আমি এমন কিছু নিয়ে হাজির হতে চাই যা দৃঢ়-প্রত্যয়ের জন্ম দেয়। যখন টেবিলে গিয়ে বসে লিখতে শুরু করলাম টের পেলাম আমার কাছে কোনো ভাল কলমও নেই। অতএব, সিঞ্জুকির কিনোকুনিয়া স্টোর থেকে কিছু লেখার কাগজ আর পাঁচ ডলার মূল্যের একটা কলম কিনে নিয়ে এলাম। লেখালেখি বাবদ আমার যৎকিঞ্চিৎ বিনিয়োগ।
ওই বছরের শরতের মধ্যে ২শ’ পৃষ্ঠা হাতে লিখে শেষ করলাম। ওটা দিয়ে কী করব সে বিষয়ে আমার কোনো ধারণা ছিল না; ক্ষণিকের প্রেরণার বসে লেখাটা সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘গুঞ্জোর’ নতুন লেখকদের প্রতিযোগিতার জন্যে জমা দিয়ে দিলাম। ওটার জন্যে তেমন কোনো যত্ন-আত্মিও নিলাম না, ভাবখানা আমার এমন ছিল— নির্বাচিত হলে হবে, না-হলে না হবে, কিংবা ওটা হাওয়া হয়ে গেলেও আমার কিছু যায় আসে না। লেখাটা আলোর মুখ দেখল কিনা তা নিয়ে মাথা ব্যথা ছিল না, কোনো মতে বইটা লিখে শেষ করার ব্যাপারে আমার বেশি আগ্রহ ছিল।
সেই বছর নিয়ত লাঞ্ছিত দল ইয়াকাল্ট সোয়ালোজ বিজয়ের পতাকা পেল আর জাপান সিরিজে হানকাইয়ু ব্রেডসকে পরাজিত করতে উদ্যত হলো। এতে আমি সাংঘাতিক রকমের উত্তেজনার মধ্যে ছিলাম আর কারাকুয়েন স্টেডিয়ামের বেশ কয়েকটা খেলা দেখেছিলাম। (সত্যিকারভাবে, কেউ ভাবতেও পারেনি সেয়ালো জিতবে, তাদের নিজেদের ভেনু, জিংসু স্টেডিয়ামে কলেজ বেস বলে কর্তৃত্ব গ্রহণ করেছিল)। বিশেষভাবে ওই শরৎকালটা ছিল জাঁকজমকপূর্ণ। আকাশ ছিল পরিস্কার, আর মেইজি মেমোরিয়াল গ্যালারির সামনে গিংকৌ গাছগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি সোনালি মনে হয়েছিল, আগে তাদেরকে এত সোনালি রং ধারণ করতে দেখা যায়নি। ওটা ছিল আমার কুড়ির কোঠার যুবক-বয়সের শেষ শরৎ।
পরের বসন্তের মধ্যেই গুঞ্জো পত্রিকার সম্পাদকের কাছ থেকে এই মর্মে একটা ফোন কল পাই যে, আমার উপন্যাসটি পুরস্কারের জন্যে হ্রষ্য তালিকাভূক্ত হয়েছে; ততদিনে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম ওই প্রতিযোগিতার জন্য নাম অন্তর্ভূক্ত করেছি। এর কারণ, অন্যান্য বিষয় নিয়ে খুব ব্যস্ততার ভেতর ছিলাম। তবে উপন্যাসটি বিজয়ের মুখ দেখে ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’ নামে প্রকাশ হয়েছিল। লেখাটিকে সবাই স্বাগত জানিয়েছিল। কী ঘটতে যাচ্ছে তা না জেনেই হঠাৎ আবিস্কার করেছিলাম, আমাকে সম্ভাবনাময় নতুন লেখক বলে অভিহিত করা হয়েছে। অবাক হয়েছিলাম। আমার চেয়েও বেশি অবাক হয়েছিল আমার পরিচিত লোকজন।
এর পরে জাজ ক্লাব চালাতে-চালাতে আর একটা মাঝারি আকারের উপন্যাস লিখে শেষ করতে পেরেছিলাম যার নাম ছিল ‘পিনবল, ১৯৭৩’। তখন কয়েকটা ছোটগল্প লেখা হয়ে উঠেছিল। আর স্কট ফিটজেরাল্ড থেকে খানিকটা অনুবাদ করেছিলাম। ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’ ও ‘পিনবল, ১৯৭৩’ সম্ভ্রান্ত পুরস্কার ‘আকুতাগাওয়া’র জন্যে মনোনীত হয়েছিল; কিন্তু কোনোটিই পুরস্কারটা পায়নি শেষ পর্যন্ত। এ জন্যে অবশ্য আমার কোনো পরোয়া ছিল না। পুরস্কারটা পেয়ে গেলে অনেক সাক্ষাৎকার আর লেখার আমন্ত্রণ পাওয়া যেত। আমার ভয় ছিল তাতে করে আমার জাজ ক্লাবের কাজে অনেক বিঘ্ন ঘটত।
তিন বছর আমি জাজ ক্লাবটি পরিচালনা করি— হিসাবপত্র ঠিকঠাক মতো রাখি, মালামালের হিসেব নিকেশ নেই, কর্মচারিদের দায়-দায়িত্ব পুণর্বণ্টন করি আর কাউন্টারের পেছনে দাঁড়িয়ে ককটেল বানাই, রান্নার কাজ দেখি, ভোর বেলা ক্লাব বন্ধ করি। আর তখনই কেবল বাড়িতে গিয়ে কিচেন টেবিলে বসে লিখবার একটুখানি ফুসরত পাই; ঘুমে ঢুলু ঢুলু না হওয়া পর্যন্ত লেখার কাজটা চালাতে পারি। মনে হয় আমার মধ্যে দু’জন লোক বসবাস করছে। ধীরে-ধীরে উপলব্ধি করি আরও বিস্তৃত আকারের উপন্যাস লিখতে চাই। প্রথম দু’খানি বই লেখার সময় লেখার পদ্ধতিটি উপভোগ করেছি। তবে দুটোরই অংশ বিশেষ লিখবার সময় খুশি হতে পারিনি। তখন শুধু একটুখানি সময় ছিনিয়ে নিয়ে মাথায় নতুন আসা ভাবনা চিন্তাগুলো মাত্র লিপিবদ্ধ করতে পারতাম। এখন আধাঘণ্টা, অন্য সময় আধাঘণ্টা এমনি করে সময় বের করতাম, কারণ সব সময় ক্লান্ত থাকতাম; মনে হতো সারাক্ষণ যেন ঘড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চলেছি। কখনোই খুব ভালভাবে মনোনিবেশ করতে পারিনি। এই ধরনের বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার মাধ্যমে কিছু কৌতুহলোদ্দীপক ও তরতাজা জিনিস রচনা করতে সক্ষম হই; কিন্তু তাতে ভাল কোনো ফল আসে না। উপলব্ধি করি ঔপন্যাসিক হওয়ার জন্যে এই সুযোগ যতটা সম্ভব বেশি গ্রহণের সাধারণ ইচ্ছা আমার আছে। অতএব, অনেক চিন্তা ভাবনার পর ব্যবসা বন্ধ করে আমার সব প্রচেষ্টা লেখালিখিতে নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। ওই পর্যায়ে ঔপন্যাসিক হিসেবে আমার আয়ের চেয়ে জাজ ক্লাবের আয় অনেক বেশি ছিল, এটা এমন একটা বাস্তবতা যা থেকে নিজেকে অব্যহতি দেই।
আমার অধিকাংশ বন্ধু-বান্ধব আমার এই সিদ্ধান্তের ঘোরতর বিরোধী ছিল, না হয় তারা এ বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করেছিল। তারা বলেছিল, ‘তোমার ব্যবসা তো বেশ ভাল চলছে, উপন্যাস লেখার কাজে যখন ব্যস্ত থাক তখন অন্য লোকদের ব্যবসা দেখার দায়িত্ব দাও।’ কিন্তু তাদের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারিনি। আমি এমন ধরনের মানুষ যখন যা করি সে বিষয়ে আমার সবটুকু অঙ্গীকার থাকতে হয়। অঙ্গীকার থাকার পরও তা ব্যর্থ হলে তা মেনে নিতে পারি। জানতাম যদি কোনো জিনিস আধাখেচড়াভাবে করি আর তা যদি ঠিকঠাক মতো না হয় তাহলে দুঃখের অবধি থাকবে না।
অতএব, সবার আপত্তি উপেক্ষা করে ক্লাবটা বিক্রি করে দিয়ে খানিকটা অস্বস্তির সঙ্গে নিজেকে ঔপন্যাসিক বলে ঘোষণা করি। আমার স্ত্রীকে বলি, ‘কেবলমাত্র দু’বছরের জন্যে লেখালিখির জন্যে অবকাশ পেতে চাই। এই প্রক্রিয়া কাজ না করলে অন্য কোনোখানে আর একটা ক্লাব খুলব। এখনও যুবক বয়স আমার, শুরু করার জন্যে নিশ্চয়ই সময় পেরিয়ে যাবে না।’ ওটা ছিল ১৯৮১ সাল, তখনও বেশকিছু ঋণ কাঁধে ছিল। তবে হিসেব করে দেখেছিলাম, ভালই করতে পারব, দেখাই যাক না কী হয়।
অতপর, উপন্যাস রচনা করতে মনস্থির করি আর সেই শরতেই গবেষণা কর্মে হোক্কাইডো সফরে যাই। পরের এপ্রিলের মধ্যেই ‘অ্যা ওয়াইল্ড শিপ চেজ’ রচনা শেষ করি। আগের দুটোর চেয়ে এটি আকারের দিক থেকে বড় ও আরো বেশি গল্প নির্ভর। লেখাটি শেষ হওয়ার পর বেশ ভাল অনুভূতির সৃষ্টি হয় আমার ভেতর— একটা নিজস্ব শৈলি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি। এখন ঔপন্যাসিক হিসেবে আয় রোজগার করার জন্যে নিজেকে তুলে ধরতে পারব।
গুঞ্জোর সম্পাদক মূলধারার লেখার চেয়ে বেশি কিছু প্রত্যাশা করছিলেন। ‘অ্যা ওয়াল্ড শিপ চেজ’ নিয়ে তাদের খুব একটা মাথা ব্যথা ছিল না। তবে মনে হয়েছিল পাঠকরা বইটা পছন্দ করেছিল, যা কিনা আমার সুখের কারণ হয়। ঔপন্যাসিক হিসেবে ওটাই ছিল আমার চলার আরম্ভ।
(চলবে)

শেষ পর্ব পড়তে ক্লিক করুন—

মুরাকামির লেখক হয়ে ওঠার গল্প: শেষ পর্ব

সম্পর্কিত

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২১, ০০:০০

এল্ রেতিরো খামারবাড়ি

উঠোনে গুটিহীন শতরঞ্জ খেলে
সময়। গাছের একটি ডালের ক্যাঁচক্যাঁচ 
শব্দ ছিন্ন করে রাতকে। প্রান্তর যদি হত 
ধূলোর লীগ আর পোড়ো স্বপ্ন। 
দুই ছায়া, আমরা অনুলিপি করি যা উচ্চারণ করে
অপর ছায়ারা: হেরাক্লাইটাস্ ও গৌতম।  

(রোসা প্রোফুন্দা, ১৯৭৫; কাব্যগ্রন্থ থেকে)


বৃষ্টি

আচমকা সন্ধ্যা হল সারা
কেননা এখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি
ঝরছে বা ঝরছিল। একটা কিছু এই বৃষ্টি
নিঃসন্দেহে যা ঘটে অতীতে।

যে শোনে এই বৃষ্টির শব্দ তার মনে পড়ে 
সেই সময় যখন সুপ্রসন্ন নিয়তি
তাকে ফিরিয়ে এনেছিল এক ফুলের কাছে যার নাম গোলাপ
আর বিহ্বল-করা লালিমার লাল। 

এই বৃষ্টি যা ঢেকে দেয় জানালার শার্সিকে
বিভা ছড়াবে হারিয়ে যাওয়া শহরতলিতে
আঙুরগাছের কালো আঙুর কোনো এক

উঠোনজুড়ে যা আর নেই আজ। বৃষ্টিভেজা 
সন্ধ্যা আমাকে এনে দেয় স্বর, প্রিয় আকাঙ্ক্ষিত স্বর,
আমার বাবার, যিনি ফিরেছেন এবং মারা যাননি। 

(এল আসেদোর, ১৯৬০; প্যারাবল্ ও কবিতার গ্রন্থ থেকে)


হেরাক্লাইটাস্

দ্বিতীয় গোধূলি।
ঘুমে ঢলে পড়া রাত। 
শোধন আর বিস্মৃতি। 
প্রথম গোধূলি।
সকাল যা ছিল প্রভাত।
বহুল দিন যা হবে ক্লান্ত বিকেল।
দ্বিতীয় গোধূলি।
সময়ের অন্য স্বভাব, রাত।
শোধন আর বিস্মৃতি। 
প্রথম গোধূলি...
চোরা প্রভাত, আর প্রভাতে
গ্রীকের আশঙ্কা।
কী জাল এটা
ভবিষ্যত, বর্তমান আর অতীতের?
কী নদী এটা
যা দিয়ে বয়ে যায় গঙ্গা?
কী নদী এটা যার উৎসটা অচিন্তনীয়?
কী নদী এটা
যা বয়ে নেয় পুরাণ আর তলোয়ার?
তার কাছে ঘুমিয়ে থাকা নিরর্থক। 
দৌড়ায় ঘুমে, মরুভূমিতে, ভূভাণ্ডারে।
নদী আমাকে ধারণ করে এবং আমি ওই নদী।
এক সস্তা সারবস্তু, রহস্যময় সময় দিয়ে তৈরি আমি।
হয়তো উৎসটা আমার মাঝে। 
হয়তো আমার ছায়া থেকে 
উদ্ভুত, সর্বনাশা ও অলীক, দিনগুলি। 

(এলোহিয়ো দে লা সোমব্রা, ১৯৬৯; কাব্যগ্রন্থ থেকে)
 

/জেডেএস/

সম্পর্কিত

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

বোকা দুপুরের নাম

বোকা দুপুরের নাম

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২১, ২৩:১৩

[তৌহিন হাসানের প্রথম উপন্যাস ‘উড়ালপঙ্খী’ বইমেলা ২০২১-এ পেন্সিল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইটি পড়ার ইচ্ছে হয়েছিল প্রচ্ছদ দেখে। নিজের দেশ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মাইল দূরে বসে স্পর্শ করে, দেখেশুনে বই কেনার সুযোগ কোথায়! কিন্তু ‘উড়ালপঙ্খী’ আমাকে একবিন্দুও নিরাশ করেনি। সহজ, সাবলীল গদ্যশৈলীর সাথে কাব্যময়তার পাশাপাশি ভালো লেগেছে উপন্যাসের বুনন। এক্ষেত্রে লেখকের স্বাতন্ত্র্যের ছাপ সুস্পষ্ট। কোনো টাইমলাইন বা ক্রনোলোজি না মেনে একেবারে ভিন্ন আঙ্গিকে ঘটনাগুলোকে উপস্থাপন করেছেন। মূল চরিত্র পঙ্খীর জীবনের নানা ঘটনাকে ঘিরেই পুরো কাহিনি আবর্তিত হয়েছে।
একটা গল্প বা উপন্যাস পড়ার পর সেটা নিয়ে স্বয়ং লেখকের সাথে কথা বলা বা মত বিনিময়ের সুযোগ পাওয়াটা এক অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরা হয়েছে।]


প্রশ্ন : এটি আপনার প্রথম উপন্যাস। কবে, কখন এই উপন্যাস লেখার ভাবনা মাথায় এলো?
উত্তর : ‘উড়ালপঙ্খী’ আমার প্রথম উপন্যাস। এটি লেখার পরিকল্পনা প্রথম মাথায় আসে আজ থেকে পাঁচ-ছয় বছর আগে। গল্পের কাঠামোটা তখনই ভেবে রেখেছি। কিন্তু লেখা শুরু করেছি অনেক দেরিতে, ২০২০ সালের নভেম্বরে।

প্রশ্ন : উপন্যাসের বিষয়বস্তু গতানুগতিকতার বাইরে এবং বেশ অপ্রচলিত। মনস্তত্ত্ব জটিল একটা বিষয়। প্রেম, বিরহ এসব নিয়ে না লিখে এই কনসেপ্টটাই কেন বেছে নিলেন?
উত্তর : আসলে গতানুগতিকতার বাইরে কি না জানি না! আমার ভেতর থেকে যেভাবে এসেছে, যেভাবে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেছি, সেভাবেই লিখে গেছি৷ আর উপন্যাসের ঘটনা বা চরিত্রগুলো যে কল্পনাপ্রসূত তা-ও কিন্তু না! এই চরিত্রগুলোকে আমি বাস্তব জীবনে বিভিন্নভাবে দেখেছি, জেনেছি, বিশ্লেষণ করেছি। চেনা চৌহদ্দির মধ্যে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা থেকে তুলে এনে উপন্যাসে সন্নিবেশ করেছি৷

প্রশ্ন : বইটির প্রচ্ছদ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার ভাবনা শুনতে চাই।
উত্তর : আমি যেহেতু প্রফেশনালি বইয়ের প্রচ্ছদ করি, নিজের বইয়ের প্রচ্ছদ করাটা আমার জন্য বেশ কঠিন। একটা দ্বিধা কাজ করে। উপন্যাস লেখার মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রচ্ছদে ছবি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেই৷ যেহেতু মূল চরিত্রের আবেগটাকে আমি খুব ভালো করে জানি, তার চেহারার নির্লিপ্ততাকে প্রচ্ছদে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি। বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী অনেকেই বলেছে কাভারে কেন একটা মেয়ের মুখ! প্রচ্ছদ তো এবস্ট্রাকট হয়, তাতে নানা রকমের আর্টিস্টিক মোটিফ থাকে! কিন্তু আমার মনে হয়েছে একজন পাঠক যখন বইটা পড়ে মূল চরিত্রটাকে অনুধাবন করবে তখন বুঝতে পারবে কেন এই প্রচ্ছদ ব্যবহার করেছি। বই না পড়ে আগে থেকে সেটা বোঝা যাবে না।
একজন পাঠক হিসেবে আমারও কিন্তু একই অনুভূতি হয়েছে৷ ‘উড়ালপঙ্খী’ পড়ে শেষ করার পর প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে এই বইয়ের এরচেয়ে উত্তম প্রচ্ছদ আর হতে পারে না!

প্রশ্ন : পঙ্খী প্রথা ভাঙায় বিশ্বাসী। সমাজ-সংসারের প্রচলিত নিয়মগুলো তাকে বেঁধে রাখতে পারেনি। সে জায়গা থেকে ‘উড়ালপঙ্খী’ নামটা আমার কাছে যথার্থ মনে হয়েছে। আপনারও কি নামকরণের ক্ষেত্রে এরকম ভাবনা ছিল?
উত্তর : নামকরণের ক্ষেত্রে আমার ভাবনাটা খুবই সরল ছিল। যেহেতু মেয়েটার নাম উড়ালপঙ্খী, নামটা তার বাবার দেওয়া এবং গল্পটা তাকে ঘিরেই, তাই উপন্যাসের নামও উড়ালপঙ্খী। তাছাড়া সে সব সময় মুক্ত থাকতে চাইত, কারো কথা শুনত না। সামাজিক বিধিনিষেধ মানেনি। নিজের যেটা ভালো লাগে তাই করে। এসব কারণেই উড়ালপঙ্খী নামটা বেছে নেওয়া।

প্রশ্ন : উপন্যাসের বুনন সম্পর্কে কিছু বলুন।
উত্তর : ব্যক্তিগত জীবনে আমি প্রচুর কথা বলতে পছন্দ করি। একটা বিষয়ে কথা বলার মাঝখানে বিভিন্ন উদাহরণ, সাবক্যাটাগরি, ক্রস-রেফারেন্স চলে আসে৷ এটা আমার কথা বলার ধরন বা অভ্যাস। লেখার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে৷ উপন্যাসের সংজ্ঞা এখনও আমার কাছে দুর্বোধ্য। ঔপন্যাসিক, কবি, সাহিত্যিক—এই শব্দগুলো পছন্দ করি না। নিজেকে স্টোরি টেলার ভাবতে ভালোবাসি। আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই৷ গল্পের তো শাখা থাকে, ঘটনা একটা হতে পারে কিন্তু তাকে বর্ণনা করার সময় অনেক ডালপালার বিস্তার হয়। পঙ্খীর গল্পটা বলার সময় টুকরো টুকরোভাবে নানা গল্প প্রাসংঙ্গিকভাবেই চারপাশ থেকে চলে এসেছে। হয়তো অন্যভাবে বলতে পারতাম! কিন্তু আমার কাছে যেভাবে কমফোর্টেবল মনে হয়েছে, আমি সেভাবেই বলে গেছি। 

প্রশ্ন : কতদিনে উপন্যাসটা শেষ করেছেন? নির্মাণের  সময়ের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা শুনতে চাই।
উত্তর : খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেষ করতে হয়েছে, প্রায় আড়াই মাসের মতো। যেহেতু পাঁচ বছর ধরে গল্পটা মাথায় ছিল অনেকটা প্রি-প্রোডাকশনের মতো, তাই লেখার সময় খুব একটা ভাবতে হয়নি৷ পার্শ্বচরিত্র, বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা আগে থেকেই মাথায় ছিল। ব্যাপারটা আসলে অনেকটা রান্না করার মতো! উপকরণগুলো আগে থেকে প্রস্তুত থাকলে রান্নায় বেশি সময় লাগে না।
আর অভিজ্ঞতা বলতে যেটা হয়েছে কখনো একটানা লিখতে পারিনি। আবার লেখার নির্দিষ্ট কোনো সময়ও ছিল না৷ রাত-দিন এক হয়ে গিয়েছিল। জীবনযাপনে একটু ব্যাঘাত হয়েছে৷ খানিকটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল সবকিছু।

প্রশ্ন : পড়া শেষ হবার পরেও একটা অদ্ভুত বিষণ্নতা আর ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম। পঙ্খীর মনোজগতের যে টানাপড়েন, তার জীবন পরিক্রমায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে—আমার মনে হয়েছে এর মাধ্যমে পাঠকের মনে প্রভাব বিস্তার করতে চান। এটা কী সচেতনভাবে করেছেন নাকি অবচেতনে ঘটেছে?
উত্তর : শুধু আমার ক্ষেত্রে না, যেকোনো লেখকের ক্ষেত্রেই এটা সত্য যে তারা সচেতনভাবে পাঠকের মনে প্রভাব বিস্তার করতে  চান না। আমি শুধু আমার  মতো করে নিজের ভাষায় একটা চরিত্র সম্পর্কে লিখে যেতে চেয়েছিলাম। পাঠকের মনোজগতে এর কী প্রভাব পড়বে সেটা পাঠকের মস্তিষ্কপ্রসূত। একজন পাঠক কিভাবে পঙ্খীকে গ্রহণ করেছে সেটা একান্তই তার ব্যাপার। অনেক পাঠক হয়তো বিষণ্ন চরিত্রই পছন্দ করেন না। আবার অনেকেই পঙ্খীর জীবনের বিভিন্ন ঘটনার সাথে নিজের মিল খুঁজে পাবেন। 
 
প্রশ্ন : আজকাল যেটা দেখা যাচ্ছে অনেক লেখকই উপন্যাস প্রকাশের আগে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সেটা লিখছেন যা পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশ হচ্ছে। লেখার সময় কোনো চরিত্রকে রাখবেন, কার কি পরিণতি হবে সেটা পাঠকদেরই জিজ্ঞেস করছেন। এটা কেন হচ্ছে?
উত্তর : মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভাব বিনিময় করা। লেখক, কবি, সাহিত্যিকরা যেকোনো শিল্প-মাধ্যমের দ্বারা নিজের দর্শন প্রকাশ করেন। শিল্প তো চর্চার ব্যাপার। চিন্তা ও চর্চা—এই দুটোর সমন্বয়ে শিল্পের বিকাশ ঘটে। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়টা খুব অস্থির। এখন ভাব বিনিময়ের অসংখ্য মাধ্যম। সব সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় প্র‍্যাকটিসটা পাল্টে গেছে। যার ফলে ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে লেখকরা হোঁচট খাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে তখন পাঠকের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। অনেকে দেখা যাচ্ছে প্রচ্ছদ আপলোড করছেন তিনটা। পাঠককে বাছাই করার অপশন দেওয়া হচ্ছে। এটা খুবই আশঙ্কার বিষয়। এটা কারোর দোষ না, শুধুই চর্চার অভাব।

প্রশ্ন : তিমির একজন বিপ্লবী হতে চেয়েছিল, কর্পোরেট কালচারের অংশ হতে চায়নি। ছাত্রজীবনে তাকে দেখা গেছে যথেষ্ট দায়িত্বহীন। আবার পঙ্খীর স্বামী হিসেবে সে যথেষ্ট দায়িত্বশীল ছিল। এই চরিত্র নিয়ে আপনার ভাবনা শুনতে চাই।
উত্তর : বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা ক্লাসে ৪০-৪৫ জন ছাত্রের মধ্যে কেউ থাকে বিপ্লবী, কেউ খুব সিরিয়াস, কেউ কবি অথবা শিল্পী, আবার দু-চারজন থাকে খুব বোকাসোকা যাদের নিয়ে সবাই স্যাটায়ার করে। আজকাল কোনো সামাজিক সমস্যা হলে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী টিএসসিতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তিমির তাদেরই একজন, কোনো কল্পিত চরিত্র না। সে অন্যায় সহ্য করতে পারত না। বামপন্থি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। ছাত্রজীবনে তিমির প্রেমবন্ধন এসবে আস্থা রাখত না। কিন্তু একটা সময় হোঁচট খায়। সামাজিক, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে তার ভাবনায় পরিবর্তন আসে। তখন পঙ্খীকে বিয়ে করে সংসারী হয়। এমনকি কর্পোরেট কালচারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একটা প্রাইভেট ফার্মের জন্য বিজ্ঞাপন লেখা শুরু করে। তিমির আসলে বাইরের কেউ না, আমাদের সমাজেরই একজন।

প্রশ্ন : ‘উড়ালপঙ্খী’ পড়ে মনে হয়েছে জেনেটিক সায়েন্স, সাইকোলজি, নারীদের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারগুলো সম্পর্কে আপনার বেশ ভালো দখল আছে। এই বিষয়গুলোতে কী আগে থেকেই আগ্রহ ছিল?
উত্তর : এই বিষয়গুলোতে আমার আলাদা আগ্রহ ছিল। বিভিন্ন বিষয়ে আমার পড়াশোনা শুরু হয় ক্লাস নাইন থেকে। তখন প্রথম মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে পড়া শুরু করি। সে সময় নিজে টেলিস্কোপ বানাই। ধর্ম সম্পর্কে বিভিন্ন বই, জেনেটিক সায়েন্স ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ জাগে। এরপর ধীরে ধীরে পরিচিত হই সিগমন ফ্রয়েড, সিমন দ্য বোভোয়ারের সাথে।
আমি তখন সরকারি স্কুলের ছাত্র। প্রাইভেটে ইংরেজি পড়তাম অঞ্জন ভদ্র নামে পাশের স্কুলের একজন শিক্ষকের কাছে। পড়া শেষে স্যার আধা ঘণ্টার একটা বাড়তি ক্লাস নিতেন অন্যান্য বিষয়ে। এর সাথে সিলেবাসের পড়ার কোনো সম্পর্ক ছিল না। আমি জানার আগ্রহ থেকে সেই ক্লাসে থাকতাম। এরিস্টটল, জ্যোতির্বিজ্ঞান, শারীরতত্ত্ব, জেনেটিক সায়েন্স, মনস্তত্ত্ব, রবীন্দ্রনাথ, লালনসহ বিভিন্ন বিষয়ে স্যার কথা বলতেন যার আশিভাগই বুঝতাম না। স্যার বলতেন—শুধু শুনে যাও, কোনো প্রশ্ন করবে না। এখন না বুঝলেও আজ থেকে ১০ বছর পরে আমার কথাগুলো ঠিকই বুঝবে। যারা বুঝতে পারবে তারা কেউ লেখক হবে, কেউ-বা দার্শনিক'। তখন এসব বিষয় নিয়ে বেশি বেশি পড়া শুরু করি। এই বাড়তি  জানার আগ্রহের কারণে আমার পড়াশোনায় কোনো ক্ষতি হয়নি বরং সব সময় ভালো রেজাল্ট করেছি। আর ১০ বছর পর স্যারের কথাগুলোর মানেও আমি ঠিকই বুঝতে পেরেছি।

প্রশ্ন : ‘উড়ালপঙ্খী’কে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন? যে ভাবনাটা আপনার মাথায় ছিল কাগজে-কলমে কী সেটাকে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন?
উত্তর : আমার বিশ্বাস নিজের ভাবনাটাকে কাগজে-কলমে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি। এ বিষয়ে আমার আত্মতৃপ্তি আছে। কোনো আক্ষেপ নেই। যদিও অনেকে বলেন লেখকের আত্মতৃপ্তি বলে কিছু নেই। কিন্তু এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে আমার মনে হয় আমি সব ঘটনা এবং চরিত্রকে ভাবনা অনুযায়ী ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি।
আর নিজস্ব মূল্যায়নের কথা যদি বলি তবে বলব এখানে পাঠকরা নিজের আশপাশের নানা ঘটনাকেই খুঁজে পাবেন। চিরচেনা সমাজের বিভিন্ন বিষয়, জেনেটিক্স, মনোজাগতিক টানাপড়েন, সোশ্যাল ট্যাবুসহ নানা ঘটনা এখানে উঠে এসেছে। অনেক চরিত্রের সাথে পাঠকরা নিজেদের রিলেট করতে পারবেন। আমার বিশ্বাস অনেক পাঠক নিজেকে তিমির ভাববেন। তিমিরের মতো চরিত্র বা সিকদার চাচার মতো যৌন নির্যাতকরা আমাদের সমাজে বাস করে। আবার অনেক মেয়ের জীবনের অভিজ্ঞতা হয়তো পঙ্খীর সাথে মিলে যাবে। হিন্দু-মুসলিম বিয়ে কিংবা হুট করে বিয়ে করে ফেলা—এসব ঘটনাও তো আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে!

প্রশ্ন : শেষটা হয়েছে একটা ধোঁয়াশার মাঝে। এমন একটা সমাপ্তিই কী চেয়েছিলেন?
উত্তর : হ্যাঁ, এমন একটা সমাপ্তিই চেয়েছিলাম। এমন বেশকিছু ঘটনা আমার চেনাজগতেই ঘটে গেছে। আমাদের সমাজে বহুগামিতা বেড়েছে—এটা একটা বড় সামাজিক সংকট। আমি সচেতনভাবেই উপন্যাসের শেষে তিমির এবং ফরহাদকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছি। শেষটা হয়েছে ক্লিফহ্যাঙ্গারের মতো যা পাঠককে অপেক্ষায় রাখবে। এর আরেকটা কারণ হচ্ছে আগামীতে ‘উড়ালপঙ্খী'র পরবর্তী খণ্ড আসবে।
 
[একজন পাঠক হিসেবে পরবর্তী খণ্ডটি পড়ার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করব। ‘উড়ালপঙ্খী’ আমাকে এক বিষণ্ণ-সুন্দর অনুভূতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। পড়া শেষ হবার বহুদিন পরও এর রেশটুকু মনে থেকে গেছে। 'রামের সুমতি', 'পরিনীতা', 'পথের পাঁচালী' কিংবা 'পুঁইমাচা'—এসব গল্প-উপন্যাস পড়ে যেমন মনে হয়েছিল যতবার পড়ব ততবারই চোখ ভিজে যাবে, ‘উড়ালপঙ্খী’ও একইভাবে আমার মন ছুঁয়ে গেছে। একজন শক্তিশালী লেখকই কেবল পারেন পাঠককে এই অনুভূতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে।
মনস্তাত্ত্বিক ঘরানার উপন্যাস ‘উড়ালপঙ্খী’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারে একটি চমৎকার সংযোজন। যারা গতানুগতিকতার বাইরে ভিন্ন স্বাদের কিছু পড়তে চান তাদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে সুখপাঠ্য হবে। পঙ্খীর জীবনের অন্ধকার চোরাগলিগুলোতে ভ্রমণ করতে করতে পাঠকের মনে সমাজের ভয়ানক কিছু অসঙ্গতির চিত্র ফুটে উঠবে। শিশু-কিশোরদের যৌন নির্যাতন, ভিক্টিম ব্লেমিং, স্টেরিওটাইপস, ট্যাবু, পুঁজিবাদসহ নানা রকমের সামাজিক সমস্যা সচেতন পাঠকমাত্রের মনে ভাবনার উদ্রেক করবে। আমাদের সমাজে 'সিকদার' রূপী মামা, চাচা, ভাই অনেক মেয়েরই থাকে। অথচ নির্ভয়ে এসব বলার মতো জায়গা থাকে না বলেই পঙ্খীদের জীবন এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন! 'আলোয় আলোয় মুক্তি' চেয়েও পঙ্খীরা অন্ধগলিতে হারিয়ে যায় বারবার। পঙ্খীর মনোজগতের সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। একজন মানু্ষের জীবনের ভিত তৈরিতে তার শৈশব এবং কৈশোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম।
তিমির চরিত্রটি আমাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে। তিমিরের বয়ানে জীবন ও সমাজ নিয়ে যেসব ভাবনা ও দর্শন লেখক তুলে ধরেছেন তার বেশিরভাগের সাথেই একাত্ব হতে পেরেছি। খুব মন খারাপ হয়েছে, কিছুটা রাগও—যখন তিমির আর পঙ্খীর পথ আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু এটাও মনে হয়েছে এমনটা না করলে হয়তো একটা গতানুগতিক সমাপ্তিই ঘটত।
প্রাঞ্জল বর্ণনায় প্রতিটি চরিত্র চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। জেনেটিক সায়েন্স, সাইকোলজির পাশাপাশি মেয়েদের মনোজগৎ সম্পর্কে লেখকের জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটেছে পুরো উপন্যাসজুড়ে। পঙ্খী স্রোতের বিপরীতে চলা এক অসীম সাহসী তরুণী। সে চেয়েছিল কন্যা মুক্তি অপরিসীমার জন্য চার দেয়ালের ভেতরে একটা আলোকময় জগৎ গড়ে তুলতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কতটুকু পেরেছিল! সেটা খোঁজার দায়টুকু আগ্রহী পাঠকদেরই থাকুক!—শা. মি.]

/জেডেএস/

সম্পর্কিত

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১২:৫১

মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬) লেখক পরিবার থেকেই এসেছিলেন। পিতৃমাতৃ—দুকূলই লেখক ছিলেন। এমনকি শ্বশুরকূলও। পুরুষানুক্রমেই এঁরা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মহাশ্বেতা দেবীর জীবনটা সাহিত্যের কাছেই সঁপে দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন দুহাত খুলে। ‘হাজার চুরাশির মা’ (১৯৭৪) তার অন্যতম আলোচিত উপন্যাস। গ্রন্থখানির পাঠপরিক্রমায় কিছুটা সাবধানী মনে এগুতে হয়। মাঝেমধ্যেই নিত্যনতুন চরিত্রের দেখাসাক্ষাৎ ঘটে। সিংহভাগ চরিত্রই দিব্যনাথ-সুজাতা পরিবারের। উপন্যাসখানি বুঝে নিতে চাইলে এদের মধ্যকার পারষ্পারিক সম্পর্ক স্মরণে রাখা খুবই জরুরি। পরিবারটি অনেকটা উনিশ শতকের ক্লাব-কালচারের ন্যায় সামন্তধারায় গড়ে ওঠে। ভোগবাদী প্রবৃত্তি এদের মধ্যে তীব্রতর। দিব্যনাথের নিজস্ব ‘চার্টার্ড অ্যাকাউনটেনসির আফিস।’ প্রতিনিয়ত মোটা টাকা আসে। জ্যোতি, নীপা অথবা তুলির স্বামীরাও কর্পোরেট কর্পোরেশনে হাই সেলারির জব করে। সবাই ভোগবিলাসে মত্ত। এদের চারিত্রিক স্খলনও কম নয়। অফিসের টাইপিস্ট মেয়েকে নিয়ে দিব্যনাথের ঢলাঢলি, মাঝেমধ্যেই রক্ষিতা নিয়ে বাইরে সান্ধ্য কাটানো। ঢেকেঢুকে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে সর্বসম্মুখে সহাস্যে এসব ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়। এসব সে পৌরুষ-অধিকার বলেই জানত। কেবল বর্তমান নয়, চিরকালই দিব্যনাথ নারী নিয়ে নোংরামি করে আসছে। শাশুড়িও কম প্রশ্রয় দেয়নি। ছেলে তার ‘পুরুষ বাচ্চা’, স্ত্রৈণ নয় বলে অহংকারও করত। দিব্যনাথের পিতাও নাকি যৌবনকালে এমনই ছিল। প্রায়শই সন্ধ্যাবেলা নারী নিয়ে বাইরে কাটাত। পরপর দুই পুরুষের নৈতিক অধঃপতন তৃতীয় পুরুষ জ্যোতি অথবা নিপাদের কাছেও সমভাবেই সমর্থন পায়। সামন্ত প্রভুর ন্যায় দিব্যনাথ নিজেকে পরিবারের ‘বস’ বলে বিবেচনা করত। সন্তানেরা অনেকেই ইনিয়েবিনিয়ে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে বাবাকে ‘বস’ বলেই সম্বোধন করত। এমনকি কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতীও। তবে এই সন্তানের মেজাজটা ছিল খানিকটা ভিন্ন ধার ও ধারার।

২.
অর্থবিত্তে স্বচ্ছল হলেও পরনারীতে অভ্যস্থ হওয়ায় দিব্যনাথ-সুজাতার দাম্পত্য-সম্পর্ক সুখের ছিল না। দিব্যনাথ সুজাতাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতো না। বরং যৌন পার্টনার হিসেবেই বিবেচনা করত। অসুখবিসুখ হলে খোঁজখবর নিত না। নবজাতকের কান্না থেকে বাঁচার জন্য তেতলায় ঘুমাত। প্রসূতি স্ত্রী থেকে দূরে অবস্থান করত। শাশুড়িমাও ছিল নারীবিদ্বেষী মহিলা। সুজাতার সন্তান জন্মদান সইতে পারত না। প্রসবকাল দেখলেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেত। তীব্র প্রসবযন্ত্রণা নিয়ে সুজাতাকে একা একাই নার্সিং হোমে যেতে হতো। দিব্যনাথের নজর কেবল একদিকে—‘আবার মা হবার যোগ্য শরীর হচ্ছে কি না সুজাতার।’ দুবছর পরপর সুজাতার চার সন্তান জন্মে। জ্যোতি, নীপা, তুলি। সর্বশেষ ব্রতী। প্রথম ও শেষে পুত্রসন্তান, মাঝখানে দুটি কন্যাসন্তান। ব্রতীর দুবছর বয়সকালে সুজাতা লম্পট দিব্যনাথের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেছিল। লেখকের ভাষায়—দিব্যনাথ কিছুতেই ওঁকে পঞ্চমবার ‘মা’ হতে বাধ্য করতে পারেনি। দিব্যনাথ সুজাতাকে ফার্মের কাজ ছেড়ে দিতে বলেছিল। সুজাতা মানেনি। ‘কাজ না-ছাড়া সুজাতার দ্বিতীয় বিদ্রোহ।’ 
বাবামায়ের মধ্যকার এই টানাপড়েন ব্রতী খানিকটা বুঝতে পারত। বুঝতে পারত মাতৃবক্ষের সুগভীরে লুকানো তীব্র গোপন ব্যথা। ব্রতীর মনটা কম্পাসের কাটার ন্যায় মমতাময়ী মাতা জগজ্জননী সুজাতার দিকে হেলে থাকত। ব্রতী সর্বদা মায়ের ওপর চোখদুটো সুস্থির রাখত। দশ বছর বয়সেও খেলাধুলা ফেলে বাড়ি চলে আসত। শিয়রে বসে মায়ের মাথায় বাতাস করত। এজন্য দিব্যনাথ ব্রতীকে সইতে পারত না। কনিষ্ঠ সন্তান হলেও শত্রু বিবেচনা করত। ব্রতীকে টিপ্পনি কেটে দিব্যনাথ কখনো বলত ‘মাদার্স চাইল্ড’ কখনো বলত ‘মেয়েমার্কা ছেলে। নো ম্যানলিনেস।’                 
মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে এই পুঁজিবাদী পরিবারের চরিত্রগুলো দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে পারিবারিক ‘বস’ দিব্যনাথ ও জ্যেষ্ঠ তিন সন্তান জ্যোতি, নীপা, তুলি। সেইসঙ্গে এদের পূর্বপ্রজন্ম ঠাকুরমাও। অপরদিকে সুজাতা ও তার কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতী। এই দ্বন্দ্ব কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমসাময়িক সমাজ অথবা রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব। এমনকি বৈশ্বিকও। বিশ্বজগৎ সংসার তখন ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দুধারায় দ্বিধাবিভক্ত। দ্বন্দ্বটা এতই জটিল ছিল যে, ভাই-বোন, পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীর সমুদয় সামাজিক ও আত্মিক বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। এমনকি রক্তের বন্ধনও।
 
৩.
দিব্যনাথপুত্র ব্রতী পিতার পুঁজিবাদী আদর্শে আস্থা হারিয়েছিল। আস্থা হারিয়েছিল সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থাপনায়। আস্থা হারিয়েছিল মুনাফাখোর ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্ধ নেতাদের ওপর। পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থার স্বপ্ন লালন করত। সমতাভিত্তিক একটি সুন্দর সুষম সমাজ বিনির্মাণের লক্ষে হৃদয় তার জেগে উঠেছিল। লেখকের ভাষায়, তখন সত্তর দশক। মুক্তির কাল। মুক্তির দশকে জনমুক্তির আন্দোলনে অনেকটা সংগোপনেই সংযুক্ত হয়েছিল ব্রতীরা। তখন সাম্রাজ্যবাদী শোষক সরকার ক্ষমতায়। জেলের পাঁচিল উঁচু করে। নতুন নতুন ওয়াচ টাওয়ার বসায়। বন্দিদের জন্য ফটকঅবন্দি খোলে না। সুগভীর রাতে ভ্যানভর্তি বন্দি এলে লেখকের ভাষায়—‘ওপর থেকে ক্রেন নামে। জন্তুর মত বন্দীকে যন্ত্রের নখে আঁকড়ে ক্রেন উঠে যায়, জেলের ভেতর নামিয়ে দেয়।’ জন্তুর মতো হলেও যারা জেলে যায়, তারা অন্তত প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু বাইরের ব্রতীরা নিদারুণভাবে প্রাণটা হারায়। রাষ্ট্রযন্ত্র নানা উপায়ে নির্মম নির্যাতন অব্যাহত রাখে। নির্জন সলিটারি সেলে নির্যাতন চালায়। লেখকের ভাষায়—‘সাউন্ডপ্রুফ। দরজা-জানালায় ফেলটমোড়ানো ফাঁপা রবারের নল বসিয়ে সাউন্ডপ্রুফ করা। ঘরের আর্তনাদ, গোঙানি, মারের আওয়াজ, জেরাকারীর গর্জন, সব শব্দ ঐ নলের জন্য ঘরের ভেতরেই বন্দী থাকে।’

৪.
বিজিত, প্রার্থ, লালটু, সমু ব্রতীর বিপ্লবী বন্ধু। এরাও চেয়েছিল স্বসমাজটিকে বদলে দিতে। সহযোদ্ধা বন্ধুদের বাঁচাতেই সেদিন ব্রতী গিয়েছিল সমুদের বাড়িতে। কিন্তু বাঁচাতে পারেননি। নিজেও বাঁচতে পারেনি। গভীর রাতে সমুদের বাড়ি ঘেরাও করে গুন্ডারা। হিংস্র গলায় বলে—‘বের করে দিন, লয়তো ঘরে আগুন দিমু!’ ব্রতীর কণ্ঠ শুনে কেউ একজন বলে ওঠে—‘হালায় আরেক মালটারে জুটাইছে। বাইর হ ঘটির পোলা।’ হাতে হাত রেখে স্লোগান দিতে দিতে ব্রতীরা বেরিয়ে আসে। বাইরে অন্ধকার। ঘুটঘুটে আধার মুখ হাসি-উল্লাসে ফেটে পড়ে। ভয়ংকর গন্ডগোল। ‘বাড়ী বাড়ী আলো নিভে যাচ্ছে, দরজা জানালা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চমকে সরে যাচ্ছে ভয়চকিম মুখ।’ সহসা স্লোগান থেমে যায়। সমবেত ঘাতকেরা খটখট গুলির শব্দ করতে করতে চলে যায়। সমুর দরিদ্র বাবা থানায় গেলে আততীয়দের নাম শুনে ধমকে ওঠে পুলিশ। পুলিশভ্যান আসতে আসতে সরে যায় ঘাতকেরা। নিতু ওরফে দীপুর মতো ভদ্রছেলেকে তো থানার সামনেই পিটিয়ে হত্যা করে। ‘প্রকৃত খুনি কখনো বন্দুক ধরে না।’ ব্রতী-সমুদের হত্যা-পরিকল্পনাকারীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এমনকি প্রত্যক্ষ ঘাতকদেরও বিচার হয় না। বুক ফুলিয়ে এরা নির্বিবাদে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। সমুর দিদিকে দেখে নির্মম ব্যঙ্গ করে, হাহা করে হাসে আর বলে—‘তর ভাইয়ের ছাদ্দ করলি না ক্যান? ভাল কইরা খাইতাম!’ সুজাতার মনে কত প্রশ্ন—যে শহরে এমন সব জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়, সেখানে পরপর কী করে সংস্কৃতিমেলা, রবীন্দ্রমেলা অনুষ্ঠিত হয়?

৫.
সুজাতা টেলিফোনেই ব্রতী হত্যার খবর পায়। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে—‘কাটাপুকুরে আসুন।’ পিতা দিব্যনাথ কাটাপুকুরে না গিয়ে দৌড়ায় পত্রিকা-অফিসে। পুত্রহত্যার খবর ধামাচাপা দিতে দিব্যনাথ ‘দড়ি টানাটানি করে বেড়াচ্ছিলেন।’ সফলও হয়েছিলেন। লেখক বলছেন—‘দিব্যনাথের ছোটাছুটি দড়ি টানাটানি সফল হয়েছিল। পরদিন খবরের কাগজে চারটি ছেলের হত্যার খবর বেরোয়। নাম বেরোয়। ব্রতীর নাম কোন কাগজে ছিল না।’ পত্রিকাপাতা থেকে ব্রতীকে মুছে দিয়েছিল দিব্যনাথ। মুছতে পারেনি মর্গ থেকে। সেখানে  ব্রতীর অবস্থান ‘হাজার চুরাশি’ নম্বরে। সেদিন ব্রতীর মৃত্যু পিতার কাছে কলঙ্কজনক মৃত্যুরূপে বিবেচিত হয়েছিল। মমতাময়ী মা সুজাতা সুস্থির থাকতে পারেননি। ছুটে গিয়েছিলেন কাটাপুকুরের লাশ ঘরে। প্রাণধন পুত্র ব্রতীর মৃত্যু নিয়ে কোথাও একটু সংশয় ছিল। তাই মুখটুকু দেখতে চেয়েছিলেন। অসীম করুণায় ডোম জানিয়েছিল—‘কি আর দেখবেন মাইজী? মুখ কি আর আছে কিছু?’ সীমাহীন মমতায় সুজাতা সবলে ব্রতীর মুখের আবরণ সরিয়ে দেয়। ‘শানিত ও ভারী অস্ত্রের উলটো পিট দিয়ে ঘা মেরে থেঁতলানো, পিষ্ট, ব্রতীর মুখ।’ আঙুল বোলানোর মতো ইঞ্চি পরিমাণ জায়গাও মসৃণ ছিল না। সবই দলিত, মোথিত, থেঁতলানো। তবু সুজাতা ব্রতী! ব্রতী! বলে আঙুল বোলায়। 
ব্রতীদের অপরাধ, ওরা দেয়ালে দেয়ালে বয়ান লিখত। ওরা লাল অক্ষরে লাল শব্দে দেয়াল রঙিন করে তুলত। কেবল মুক্তকণ্ঠে সমবেত স্লোগানই ধারণ করত না, প্রাণভরে বিশ্বাসও করত। দেবীর ভাষায়—‘ব্রতীরা এই এক নতুন জাতের ছেলে। স্লোগান লিখলে বুলেট ছুটে আসে জেনেও ব্রতীরা স্লোগান লেখে। কাটাপুকুর যাবার জন্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয়।’ ব্রতীরা এতটাই সমাজবিরোধী যে, দিব্যনাথের ন্যায় পিতারা মুখাগ্নিও করতে আসে না। ব্রতীদের লাশ কাটাপুকুরের মর্গে পড়ে থাকে। রাতে পুলিশ গাদাগাদি করে শ্মশানে বয়ে আনে। এরপর আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। শ্রাদ্ধে বিশ্বাসীজনও যথানিয়মে শ্রাদ্ধ করার সুযোগটুকুও পায় না। স্ফীত লাল চোখে বসে থাকতে হয় সারাটা দিন।

৬.
নকশাল আন্দোলনকে (১৯৭০) কেন্দ্র করে মহাশ্বেতা দেবী উপন্যাসটির আখ্যানভাগ সাজিয়েছেন। কল্পনার সঙ্গে সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতার দরকারি সমন্বয় ঘটয়েছেন। সেই সঙ্গে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তির সংগ্রামে (১৯৭১) কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা ‘বাংলাদেশের সহায় ও সমর্থনকল্পে পশ্চিমবঙ্গ তোলপাড় করে ফেলেছিল।’ কিন্তু নকশাল আন্দোলনের হত্যাকাণ্ড তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি অথবা এরমধ্যে পৈশাচিকতা খুঁজে পাননি। যদি পেতেন, ‘তাহলে ত কলকাতার কবি ও লেখক ওপারের পৈশাচিকতার সঙ্গে এপারের পৈশাচিকতার কথাও বলতেন।’ কিন্তু বলেননি। মূলত প্রান্তজনের বেঁচে থাকার লড়াই, লড়াই শেষে নিদারুণ পরিণতিই তুলে আনতে চেয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী। দেবীর গদ্যশেলীতে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও অসীম মমতায় সেটি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। উপন্যাস হয়ে উঠছে উপভোগ্য সেইসঙ্গে সাব-অলটার্ন হিস্ট্রির দরকারি দালিলিক শিল্পকর্ম। ২৮ জুলাই প্রয়াণদিবসে লেখকের প্রতি অশেষ প্রণতি।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১৮:৩৬

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা। কাঁটাবনে অবস্থিত প্রকাশনা সংস্থা ‘উজান’ এমন ঘোষণা দিয়েছে তাদের প্রকাশিত ‘কোরিয়ার কবিতা’ ও ‘কোরিয়ার গল্প’ নিয়ে আলোচনার জন্য।
এই বই দুটিতে রয়েছে কোরিয়ার বিশ ও একুশ শতকের উল্লেখযোগ্য কবিদের কবিতা এবং একই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিকদের ছোটগল্প। 
উজানের এই আয়োজনে সহযোগিতা করছে লিটারেচার ট্রান্সলেশন ইনস্টিটিউট অব কোরিয়া। 
বই আলোচনার সর্বোচ্চ পুরস্কার ২০ হাজার টাকা। এছাড়া দ্বিতীয় পুরস্কার ১৫ হাজার এবং তৃতীয় পুরস্কার ১০ হাজার টাকা। এই প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত সর্বোচ্চ ১০ আলোচকের প্রত্যেককে দেওয়া হবে ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের বই। 
আলোচনাগুলো বাছাই করবেন দেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও অনুবাদকদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারক কমিটি। একজন একটি বই নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন। আলোচনা বাংলাভাষায় লিখিত বা ভিডিও মাধ্যমে হতে হবে। 
অংশগ্রহণে ইচ্ছুক অনলাইনে ফরম পূরণ করতে করতে পারবেন এসব লিংকে www.ujaninfo.com, www.porospor.info। ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আলোচনা জমা দিতে হবে [email protected] এ।
বিস্তারিত জানতে এবং বই সংগ্রহ করতে পারবেন www.ujaninfo.com, www.facebook.com/UjanPrakashan, https://www.facebook.com/UjanBooks থেকে।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২১, ১৯:৪৪

কিছু ছবি এখনও আছে বলে কথা বলার দু-একটা মানুষ পাওয়া যায়>প্রতিবার মেঘ হলে মেঘমল্লার শুনে বৃষ্টি ভোলা যায় না>নিহত পশুররক্ত আর মাংস বাতাসে>দুঃখ আছে বলে কয়েকটা কবিতা এরপরও লেখা হবে>সকালগুলো ঘুমিয়ে কাটে বলে আর অপরাধবোধ জাগে না>রাত পেয়ে যাই>বাতাস কিন্তু ঘুরে যাচ্ছে>সময়ে সব বদলায় এ তত্ত্ব এখনও প্রমাণের চেষ্টা চলে>ঘরের মধ্যেও এক নেশা আসে বাইরেও এক নেশা যায়>নেশা>হেই হ্যালো, আমি হাস্নাহেনার গন্ধও পাচ্ছি>মাংসের গন্ধের সাথে>ছবি কিন্তু সব কথার উত্তর দেয়>হুহু করে উত্তর>থেকে বাতাস আসবে দুমাস পরেই>যদি বলি ছবিকে, কী, সে পাল্টা প্রশ্ন করে না>যদি বলি, কেন ও ইত্যাদি, পাল্টা প্রশ্ন করে না>যার যা উত্তর তা বুঝিয়ে দেয় আজকাল প্রতি রাতেই প্রায়>উত্তর পেতে পেতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে…>চরাচরে পাখি থাকলে বলে দিয়ো তাদের পাখায় আর কোনো শব্দ নেই>তাদের ওড়ায় আর কোনো নীরবতা নেই<

/জেডএস/

সম্পর্কিত

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

বোকা দুপুরের নাম

বোকা দুপুরের নাম

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

সর্বশেষ

খুলনায় জুনের চেয়ে জুলাইয়ে তিন গুণ বেশি মৃত্যু

খুলনায় জুনের চেয়ে জুলাইয়ে তিন গুণ বেশি মৃত্যু

ট্যাংকারে হামলা নিয়ে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা

ট্যাংকারে হামলা নিয়ে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা

পর্নোগ্রাফিতে রাজি না হওয়ায় স্ত্রীকে নির্যাতন, স্বামীর কারাদণ্ড

পর্নোগ্রাফিতে রাজি না হওয়ায় স্ত্রীকে নির্যাতন, স্বামীর কারাদণ্ড

মাইকে ঘোষণা দিয়ে দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষ, আহত অর্ধশতাধিক

মাইকে ঘোষণা দিয়ে দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষ, আহত অর্ধশতাধিক

সিআরবিতে নলকূপ স্থাপন বন্ধে ওয়াসার এমডির কাছে অভিযোগ

সিআরবিতে নলকূপ স্থাপন বন্ধে ওয়াসার এমডির কাছে অভিযোগ

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মা-মেয়ে নিহত, গুরুতর আহত ১

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মা-মেয়ে নিহত, গুরুতর আহত ১

ফের হামাস প্রধান নির্বাচিত হলেন ইসমাইল হানিয়া

ফের হামাস প্রধান নির্বাচিত হলেন ইসমাইল হানিয়া

ডিএনসিসি করোনা হাসপাতালের ৫০০ বেডে যুক্ত হচ্ছে সেন্ট্রাল অক্সিজেন

ডিএনসিসি করোনা হাসপাতালের ৫০০ বেডে যুক্ত হচ্ছে সেন্ট্রাল অক্সিজেন

ছেলের হাতে বাবা খুন, ২২ ঘণ্টায় আদালতে অভিযোগপত্র

ছেলের হাতে বাবা খুন, ২২ ঘণ্টায় আদালতে অভিযোগপত্র

ভোলার ঢাকাগামী নৌযানে অতিরিক্ত যাত্রী

ভোলার ঢাকাগামী নৌযানে অতিরিক্ত যাত্রী

সেই পিয়াসা আটক 

সেই পিয়াসা আটক 

মানবপাচারবিরোধী ক্যাম্পেইনে মোশাররফ-তিশা

মানবপাচারবিরোধী ক্যাম্পেইনে মোশাররফ-তিশা

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

থিয়েটার

থিয়েটার

গহন
© 2021 Bangla Tribune