X
বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সেকশনস

ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি কি বেকারদের নিয়ে ভাববে?

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০২০, ১৮:২৭

কাবিল সাদি ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে বিশ্বের মানচিত্রে যে দেশটি অর্থনৈতিক ক্রমাগত উন্নয়নে রোল মডেলের পতাকা উড়াচ্ছে সেই দেশটি বাংলাদেশ। নানা প্রতিবন্ধকতার দেয়াল টপকে নানা খাতে ছাপ রেখেছে উন্নয়নের। করোনার মতো এই বৈশ্বিক মহামারিতে অন্যান্য উন্নত দেশ যেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সেখানে নিজ দেশে সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়েছে। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার মতো এই ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে অর্থনীতির চাকাকে সচল ও অর্থনীতিকে স্বাভাবিক রাখতে ভূমিকা রেখেছে নানা সেবা খাত। এসব সেবা খাতে অন্যতম ভূমিকা ছিল ব্যাংক খাত। শুধু এখানেই ব্যাংক খাত থেমে নেই বরং গত এক দশকে যে পরিমাণ বেকারের কর্মসংস্থান হয়েছে তার সিংহভাগ অবদান রেখেছে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো।
শিক্ষার হার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এদেশে বৃদ্ধি পেয়েছে বেকারত্বের হার। আগের তুলনায় চাকরির বাজারে বেড়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা। বেকারত্বের এই হার কামানো ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান তৈরি করে দিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে সরকারি  ও বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের নিয়মিত নিয়োগ প্রক্রিয়া। তবে একটা সময় স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও ব্যাংক ভেদে নিয়োগ প্রক্রিয়া আলাদা থাকায় বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকগুলো তাদের আলাদা আলাদা নিয়োগ প্রক্রিয়া গ্রহণ করায় একদিকে যেমন নিয়োগ প্রক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ী হতো অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের প্রভাবশালী অসৎ কর্তাব্যক্তিদের হস্তক্ষেপসহ নানা অনিয়ম চোখে পড়া ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তাই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাট রোধে সৎ যোগ্য, মেধাবী কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে এ ধরনের একটি কমিটি গঠন করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহী ও সৎ কর্মকর্তারা।

সেই দাবির যৌক্তিকতা বিবেচনায় নিয়ে কর্মঠ, মেধাবী ও উপযুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে ২০১৫ সালে সরকার এক অভিনব নিয়োগ কমিটি গঠন করে যা ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি তথা বিএসসি নামে সুপরিচিত। ইতোমধ্যে এই কমিটির নিয়োগ প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা সকলের প্রশংসা যেমন কুড়িয়েছে একই সঙ্গে বহু বেকারের মুখে সাফল্যের হাসি এনে দিয়েছে। সেই সঙ্গে ব্যাংকগুলো পেয়েছে দক্ষ, মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তা। তাই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ব্যাংকার সিলেকশন কমিটি তথা বিএসসির এই কার্যক্রম শুধু প্রশংসার দাবিদারই নয় বরং অন্যান্য চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতারও উদাহরণ ও পথপ্রদর্শকও বটে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর বেকার বান্ধব ড. আতিউর রহমান বেকারদের কথা চিন্তা করে বিনা ফি-তে আবেদন প্রক্রিয়া চালু করেন, এ সিদ্ধান্ত ছিল ‘মেঘ না চাইতেই জলে’র মতো বেকারদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। শুধু তাই-ই নয় বরং একবার সিভি তথা বায়োডাটা বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে উপস্থাপন করলে ওই প্রার্থীকে আর আলাদা সিভি বা বায়োডাটা দিয়ে নতুন সার্কুলারে আবেদন করতে হয় না বরং ক্ষেত্র বিশেষ আপডেট করে নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে। শুধু সিভি আইডি ও নির্ধারিত পাসওয়ার্ড দিয়েই খুব সহজেই দু/তিন মিনিট ব্যয় করে স্মার্টফোনের মাধ্যমেই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। এতে করে চাকরির প্রার্থীদের একদিকে সময় ও অর্থ সাশ্রয় হয়েছে অন্যদিকে কাগজপত্র প্রেরণের মতো সনাতন পদ্ধতির হয়রানি ও ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু এদেশে কোনও কিছুই ভালোভাবে নেওয়ার মতো মানসিকতা এখনও আমাদের মাঝে গড়ে উঠেনি। ফলে ব্যাংক আবেদন ফ্রি থাকায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও শুধু পদ্ধতিগত সুবিধে হওয়ায় বহু প্রার্থী এক মিনিট বা এক চাপে আবেদন করলেও পরীক্ষা দিতেন না। বিএসসি কর্তৃক আবেদনকৃত প্রার্থীদের জন্য বেশি কেন্দ্র ও ব্যবস্থাপনায় অর্থ ব্যয় করলেও অনপুস্থিতির হার কোনও কোনও ক্ষেত্রে অর্ধেকে নেমে আসে। তাই আর্থিক অপচয় ও সময় সংক্ষেপের নিমিত্তে প্রবেশপত্র উত্তোলনের সময় সীমিত করা হলো যেন প্রয়োজনীয় ও পরীক্ষা দিতে ইচ্ছুক প্রার্থীরাই প্রবেশপত্র উত্তোলন করে এবং বিএসসিও নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঠিক ব্যবস্থাপনা নিতে পারে কিন্তু তারপরেও অনপুস্থিতির হার কমাতে এই প্রক্রিয়া ততোটা সফল হয়নি। তাই আবেদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয় আগের প্রক্রিয়ার মতো ফি নির্ধারণ এবং প্রত্যেক বিজ্ঞপ্তির আওতায় দুইশত টাকা ফি প্রযোজ্য হয়। অন্যান্য চাকরির আবেদন প্রক্রিয়ার ফী হিসেবের তুলনায় এই টাকা সহনীয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না, তাছাড়া সমন্বিত পরীক্ষাতেও একই ফি প্রযোজ্য। এই প্রক্রিয়া অবলম্বনে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে শুধু পরীক্ষা দিতে ইচ্ছুক প্রার্থীই ফি দিয়ে আবেদন করছেন এ ক্ষেত্রে বিএসসি সফলতার পরিচয় দিলেও কিছু ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে নতুন বিড়ম্বনা। আবেদন প্রক্রিয়ায় নতুনভাবে যুক্ত হয়েছে পেমেন্ট ভেরিফিকেশন ও নির্ধারিত ও সংক্ষিপ্ত সময়ে প্রবেশপত্র উত্তোলন, যে তথ্য শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নোটিশ/বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানা সম্ভব। অন্যান্য চাকরির ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি ছাড়াও যেখানে মোবাইলে এসএসএসের মাধ্যমে প্রার্থীকে জানিয়ে দেওয়া হয় প্রার্থীর ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড সহ পরীক্ষার তারিখ এবং প্রবেশ পত্র উত্তোলনের নানা তথ্য এমন কি প্রবেশপত্র উত্তোলনের সময় পরীক্ষার দিন পর্যন্তও রাখা হয়, সেখানে ফি নেওয়া সত্ত্বেও এই তথ্য থেকে বঞ্চিত হন বিএসসিতে আবেদন করা প্রার্থীরা। ফলে অনেকেই টাকা তথা ফি দেওয়া সত্ত্বেও শুধু ওয়েবসাইট বা ফেসবুকের মাধ্যমে তথ্য জানতে না পারায় মহামূল্যবান জীবিকার এই চাকরির পরীক্ষা দেওয়া থেকে বঞ্চিত হন ভালো প্রস্তুতি ও ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এবং বাস্তবতার নিরিখে যখন টাকা দিয়ে আবেদন হচ্ছে তখন দুয়েকজন ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশই পরীক্ষা দেওয়ার মানসিকতা নিয়েই টাকা দিয়ে আবেদন করছে। কিন্তু সেখানে আগের মতোই প্রবেশপত্র উত্তোলনের সময় সীমিত করে দেওয়া কতটা যৌক্তিক? তাছাড়া এই ফি পাওয়া সত্ত্বেও কেন অন্যান্য চাকরির মতো সামান্য অর্থ খরচ করে এসএমএস দিয়ে প্রার্থীকে প্রবেশপত্র উত্তোলনের সময় বা পরীক্ষার তারিখ জানানো হবে না। কেউ যদি ইন্টারনেট এক্সেসে না থাকে তাহলে কি সে পরীক্ষা দেওয়ার অধিকার রাখবে না?

বরং এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ওই প্রার্থী তথ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যদিও বিজ্ঞপ্তিতে ওয়েবসাইটে দেখার কথা উল্লেখ থাকে কিন্তু এটা অন্যান্য চাকরির ক্ষেত্রেও দেখা যায় তারপরেও তারা এসএমএসের মাধ্যমে জানিয়ে থাকে এমনকি বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন বিপিএসসিও এই পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে। সম্প্রতি ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি ঘোষিত ‘নয় ব্যাংকের ব্যাংক অফিসার’ এবং ‘সাত ব্যাংক সিনিয়র অফিসার’ পদের সমন্বিত নিয়োগের প্রক্রিয়ায় অনেকেই স্বল্পকালীন সময়ে প্রবেশপত্র উত্তোনে ব্যর্থ হলে এই বিষয়ে নানা অভিযোগ দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের ‘চাকরির প্রস্তুতি ও পড়াশোনা’ বিষয়ক নানা অনলাইন গ্রুপে। তারা তুলে ধরছেন এই পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে বঞ্চিত হতে যাচ্ছে ফি দিয়ে আবেদন সম্পন্ন করা প্রার্থীদের একটি বড় অংশ। ফলে অনেক প্রার্থীকে ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির কাছে নানাভাবে অনুরোধ করে আসছেন যেন তাদের এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত না করা হয়, বিশেষ করে করোনা বিস্তার মোকাবিলায় ‘সাত ব্যাংক সিনিয়র অফিসার’ পরীক্ষার তারিখ নির্ধারিত ৫ ডিসেম্বর স্থগিত হওয়ায় এই দাবি আরও জোরালো হচ্ছে যেন নতুন তারিখ দেওয়ার আগেই আবার প্রবেশপত্র উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হয়, বিশেষ করে এই করোনাকালে অনেকেই গ্রামে থেকে সমহারে শহরের মতো নেটওয়ার্ক এক্সেসে না থাকায় বা কারও মাধ্যমে জানতে না পারার ফলে সাময়িক সময়ে ভেরিফিকেশন এবং প্রবেশপত্র উত্তোলনে ব্যর্থ হয়েছেন অথচ হতে পারে এটাই তার জীবনের শেষ চাকরির পরীক্ষার সুযোগ ও প্রস্তুতিও কিন্তু এই পদ্ধতিগত কারণে তাকেই হয়তো দেওয়া হচ্ছে সারাজীবনের মাশুল, এটা কাম্য নয়। তাই বঞ্চিতদের পুনরায় পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি চলমান ও ভবিষ্যতে অপেক্ষমাণ বিএসসি কর্তৃক চাকরির পরীক্ষাতেও যেন এই ধরনের বিড়ম্বনায় না পড়তে হয় সে জন্য বিএসসিসহ সংশ্লিষ্টদের এখনই ভাবতে হবে। আর এটা বাস্তবায়িত হলে বেকারবান্ধব এই সংস্থার প্রতি চাকরি প্রার্থীদের ভালোবাসা ও আস্থা যেমন বাড়বে অন্যদিকে বিএসসির মাধ্যমে সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পাবে যোগ্য, দক্ষ ও স্বচ্ছ কর্মকর্তা।

লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা।

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

সম্পর্কিত

সরকারি চাকরিতে বয়স ছাড়: সুবিচার না অবিচার?

সরকারি চাকরিতে বয়স ছাড়: সুবিচার না অবিচার?

পুরুষ নির্যাতন ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়

পুরুষ নির্যাতন ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়

কবে হবে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও চেতনার উন্নয়ন

কবে হবে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও চেতনার উন্নয়ন

অভিবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি জরুরি

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৭:৩০

মো. আখতার হোসেন জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতি বছর বিশ্বের অগণিত মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান বিভিন্ন দেশে। বিশ্ব অর্থনীতিতে অভিবাসন তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেও অভিবাসনের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আশির দশকের শুরু থেকেই দেশের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় ও দারিদ্র্য বিমোচনে অভিবাসন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কোভিড-১৯ ও লকডাউনের প্রভাবে সারা বিশ্বের অর্থনীতি যখন চরম সংকটের মুখোমুখি, তখন অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা ভর করেছে দেশের অভিবাসন খাতেও।  

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’র (বিএমইটি) তথ্যমতে, গত বছর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়ায় ২১,৭৫২.২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মার্চ-মে মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও জুন থেকে এর ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, যা করোনাভাইরাসের অভিঘাত থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। প্রবাসী শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশসহ প্রায় মোট ১৬৮টি দেশে বসবাস করছেন। তারা মূলত বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে কাজ করেন এবং চুক্তি শেষে দেশে ফিরে আসেন।

প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের তথ্য সংরক্ষণের কোনও যথাযথ প্রক্রিয়া নেই বলে প্রতি বছর কতজন দেশে ফিরছেন এর সঠিক সংখ্যা বের করা বেশ কঠিন।

তবে, করোনা বৈশ্বিক মহামারি উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে অন্য যেকোনও বছরের তুলনায় গত বছর দেশে ফেরত আসা প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। আইওএম’র হিসাব অনুসারে, গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর মাসে প্রায় চার লাখ প্রবাসী শ্রমিক কোভিড-১৯ এর কারণে দেশে ফেরত আসেন। কোভিড-১৯-এর বিস্তার ঠেকাতে বেশিরভাগ দেশে লকডাউন ঘোষণা করায় এবং জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ অভিবাসী শ্রমিকদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

এই প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ঋণদায়গ্রস্ত এবং দেশে তারা বেকার অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। তাই, বিদেশে যেমন তারা কষ্টে দিনযাপন করছিলেন, দেশে এসেও তারা পড়েছেন এক দুর্দশাপূর্ণ পরিস্থিতিতে। আইওএম’র গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ফেরত আসা ৭৫ শতাংশ প্রবাস শ্রমিক করোনাভাইরাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার বিদেশে ফেরত যেতে আগ্রহী।

সেক্ষেত্রে আমাদের দরকার প্রবাস ফেরত এই শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য একটি কাঠামোভিত্তিক রি-স্কিলিং ও আপস্কিলিং প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত করা, যেটি পরবর্তীতে দক্ষতার বিচারের মাপকাঠিতে প্রবাসে চাকরি নিশ্চিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।

দক্ষতার বিচারে বাংলাদেশ থেকে সাধারণত তিন রকমের অভিবাসন হয়– দক্ষ, স্বল্প দক্ষ এবং অদক্ষ। সাধারণত আমাদের দেশের প্রবাসী শ্রমিকরা অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, পরিবহন, হোটেল-রেস্টুরেন্টের কাজ, স্বাস্থ্য সেবা, ঘরের কাজসহ স্বল্প দক্ষ ও নিম্ন উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত থাকায় যেকোনও ধরনের অর্থনৈতিক অভিঘাতে তারা সমস্যার সম্মুখীন হন। করোনায় বেশিরভাগ দেশে এসব কাজের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক প্রবাসী শ্রমিকই চাকরি হারিয়েছেন।

বিদেশ গমন করা অধিকাংশ শ্রমিকই কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়া বিদেশে যান। অথচ ছয় মাস কিংবা এক বছরের একটি প্রশিক্ষণ বিদেশে তাদের পারিশ্রমিক দুই থেকে তিনগুণ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। তাই দেশে ফেরত আসা শ্রমিকরা যাতে ফের বিদেশ গমনের পর অধিক উপার্জন করতে পারেন, সেজন্য বহির্বিশ্বের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী যেসব খাতে দক্ষ জনবল প্রয়োজন, সেসব খাতে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, করোনা পরিস্থিতি শ্রমবাজারের রূপ অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি নির্ভরতা ও উদ্ভাবন এবং নতুন দক্ষতার সুযোগ সৃষ্টি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কোভিড-১৯ যেমন কাজের ক্ষেত্রকে বিভিন্নভাবে পরিবর্তন করেছে, একইসাথে অনেক নতুন সুযোগও সৃষ্টি করেছে। দেশের অভিবাসী শ্রমিকদের বেশিরভাগেরই ভাষাগত দক্ষতা ও প্রযুক্তি জ্ঞান কম থাকায় তারা বিদেশে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হন।

এসব ক্ষেত্রে বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শ্রম পরিস্থিতি আরও সুসংহত করা যেতে পারে। এছাড়া, অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, অটোমোবাইল ও ডিজিটাল খাতের কাজে বিদেশে অধিক চাহিদা থাকায়, তাদের এসব কাজ সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রদান করার ব্যাপারে নজর দেওয়া যেতে পারে। আমাদের নারী প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশই বিদেশে ঘরের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের যদি ভারতের কেরালা, ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো নার্সিং কোর্স করানো হয়, অথবা দক্ষভাবে গৃহপরিচালনা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে তা তাদের জন্য যেমন মঙ্গলজনক হবে, তেমনি আমাদের সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোও সুনিশ্চিত হবে।

অভিবাসীদের জন্য বৈশ্বিক মহামারি সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সরকার কয়েক ধাপে নগদ সহায়তাসহ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও এর মাত্র পাঁচ শতাংশ প্রবাস ফেরত শ্রমিকরা কাজে লাগিয়েছেন। প্রবাসীদের সহায়তার প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনায় সুফল পেতে তাই নীতিনির্ধারকদের নতুন করে চিন্তাভাবনা করা জরুরি।  আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরির ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কাকে উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব দেশ, বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ তাদের দক্ষ করে তুলতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে এগিয়ে আসতে পারে।

করোনাকালীন ও পরবর্তী দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। তাই, দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি ও নতুন সম্ভাবনাময় বাজার অনুসন্ধান একসঙ্গে দুটোই চালিয়ে যেতে হবে। আর এটা করা সম্ভব হবে বহুমুখী অংশীদারিত্বের মাধ্যমেই।

লেখক: সিনিয়র সচিব, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ‎গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

মধ্যরাতে দুই কাভার্ডভ্যানের সংঘর্ষে এক চালকের মৃত্যু

মধ্যরাতে দুই কাভার্ডভ্যানের সংঘর্ষে এক চালকের মৃত্যু

উড়োজাহাজে বোমার ভুয়া তথ্যটি আসে মালয়েশিয়ান নম্বরের ফোন কলে

উড়োজাহাজে বোমার ভুয়া তথ্যটি আসে মালয়েশিয়ান নম্বরের ফোন কলে

‘জরুরি অবতরণ করা’ বিদেশি উড়োজাহাজটিতে বোমা পাওয়া যায়নি

‘জরুরি অবতরণ করা’ বিদেশি উড়োজাহাজটিতে বোমা পাওয়া যায়নি

চিকিৎসার সুযোগ ‘উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি’র জন্য ইতিবাচক হবে

২৩ নাগরিকের বিবৃতিচিকিৎসার সুযোগ ‘উন্নত রাজনৈতিক সংস্কৃতি’র জন্য ইতিবাচক হবে

বোমা সন্দেহে শাহজালালে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের ‘জরুরি অবতরণ’

বোমা সন্দেহে শাহজালালে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের ‘জরুরি অবতরণ’

ভারত থেকে এলো ৪৫ লাখ ডোজ টিকা

ভারত থেকে এলো ৪৫ লাখ ডোজ টিকা

খিলগাঁওয়ে নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু

খিলগাঁওয়ে নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু

দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ান: ব্যবসায়ীদের প্রধানমন্ত্রী

দরিদ্রদের পাশে দাঁড়ান: ব্যবসায়ীদের প্রধানমন্ত্রী

'ওমিক্রন সন্দেহে বাড়িতে লাল পতাকা অমানবিক, অনৈতিক'

'ওমিক্রন সন্দেহে বাড়িতে লাল পতাকা অমানবিক, অনৈতিক'

জানুয়ারির মধ্যেই প্রাপ্তবয়স্ক সবাইকে বুস্টার ডোজ দেবে যুক্তরাজ্য

জানুয়ারির মধ্যেই প্রাপ্তবয়স্ক সবাইকে বুস্টার ডোজ দেবে যুক্তরাজ্য

২৪ দিনে কোটি টাকা নিয়ে উধাও

২৪ দিনে কোটি টাকা নিয়ে উধাও

জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের কথা বলে ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা, কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে মামলা

জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের কথা বলে ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা, কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে মামলা

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune