X
শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ১০ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

তিস্তা জার্নাল | পর্ব তিন

আপডেট : ১৫ ডিসেম্বর ২০২০, ১৪:৫২


পূর্বপ্রকাশের পর

আমার এবারের গন্তব্য মহীপুর থেকে পাঁচ-ছয় কিলোমিটার উজানে ধামুরের চর। গঙ্গাচড়া বাজারের উত্তর প্রান্তে গঙ্গাচড়া-বরাইবাড়ি সড়কের পাশেই একটা প্রাচীন বটগাছ। সড়কটা আজ প্রশস্ত মসৃণ পিচঢালা। কিন্তু চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছর আগে এটা ছিল কাঁচা, খানাখন্দে ভরা, আর এই বটগাছের কাছটায় শ’চারেক গজ জুড়ে ধুলোর স্তর এমনই গভীর ছিল যে তাতে পায়ে-হাঁটা মানুষজনের হাঁটুর নিচে পায়ের প্রায় অর্ধেকটা পর্যন্ত ডুবে যেত। রাস্তাটার সমান্তরালে যে নিচু জমিটা উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে গেছে, শোনা যায় সেটা আসলে ছিল গঙ্গা নদীর একটা ‘ছড়া’ বা শাখানদী, আর তার থেকে ‘গঙ্গাছড়া’ হয়ে জায়গাটার নাম হয়েছে গঙ্গাচড়া। বোধহয় এ কথার সত্যতা আছে। গঙ্গা নদী না হোক, তিস্তা বা অন্য কোনও নদীর শাখানদী এটা হয়তো ছিল। তাই হয়তো এই জায়গাটার রাস্তার ধুলোর মধ্যে বালির মিশেল ছিল অনেক বেশি। বটগাছটা থেকে কিছুটা উত্তরদিকে রাস্তার পাশেই নিচু জমিটার ধার ঘেঁষে একটা মোটা অচেনা গাছ দেখেছি ছোটবেলায়, তার কোমর বরাবর চারদিকে ঘিরে একটা গভীর দাগ ছিল; লোকে বলত, চাঁদ সদাগর এই গাছে নৌকা বেঁধেছিলেন, দাগটা সেই নোঙর বাঁধা শিকলের। গাছটা এখনও আছে কিনা জানি না। তবে কাছাকাছি একটা দোকানের সাইনবোর্ডে সংলগ্ন জায়গাটার নাম দেখলাম ‘অচিনগাছ’। এই নাম আমার ছোটবেলায় ছিল বলে মনে পড়ে না।

রিকশা তখন ছিল না বললেই চলে। ধুলোভর্তি জায়গাটুকু পেরোতে গরুর গাড়ির গরুগুলোর মুখে পরিশ্রমের গাঁজলা উঠতো; গাড়ির বোঝা বেশি হলে কাঁধের ওপরে জোয়াল নিয়ে প্রাণীগুলোর হাল হতো ভয়ানক; শরীরটা হয়ে উঠতো কোনাকুনি টানটান করে বাঁধা একটা সুতোর মতো, আর চোখগুলো যেন ঠিকরে বেরিয়ে যেতে চাইত।

তিস্তার চরের কৃষক : পটভূমিতে নদীর বর্তমান ধারার পাড়ে নতুন গড়ে ওঠা বাড়িঘর; আরও দূরে দিগন্তে নদীর ওপাড়ের বৃক্ষশ্রেণী বা ‘ময়াল’। ছবি: লেখক আমার যাত্রাপথ অবশ্য এবার চাঁদ সদাগরের অচিনগাছের দিকে নয়। প্রাচীন বটগাছটাকে মাঝখানে রেখে গঙ্গাচড়া-বরাইবাড়ি সড়ক থেকে ডানদিকে নেমে গেছে পুরনো গঙ্গাচড়া-কাকিনা ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা। কাকিনার রাজা এই সড়কটা তৈরি করেছিলেন ষাট ফুট চওড়া করে। আজ সেটা সময়ের ভাঙা-গড়ায় সংকীর্ণ হয়ে ফুট ছয়েকে নেমে এসেছে। এককালে এই পথটাই ছিল নদীতীরের গ্রামগুলো থেকে গঙ্গাচড়া আর রংপুর শহরে যাতায়াতের প্রধান মহাসড়ক। আজ বিস্তার-নির্মাণ-গুরুত্বের বিচারে এটাকে গঙ্গাচড়া-বরাইবাড়ি সড়ক থেকে গ্রামের দিকে নেমে যাওয়া একটা সামান্য শাখাপথ মনে হয়।
এই পথ ধরে আড়াই কিলোমিটার গেলে তিস্তার তীর ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ। রাস্তাটা আর বাঁধটা যেখানে নব্বই ডিগ্রি কোণে মিলেছে সে জায়গাটার নাম বোল্লার পাড়, মৌজা—ধামুর, ইউনিয়ন—গঙ্গাচড়া। বড় রাস্তাটার উল্টোদিকে একটা সুবিধাজনক জায়গা থেকে পটাপট বটগাছসহ ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তাটার কয়েকটা ছবি তুলে রাস্তাটার মাথায় এসে দাঁড়িয়ে রিকশার খোঁজে ইতি-উতি তাকাতেই বটগাছটার তলার একটা ঝুপড়ি দোকান থেকে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি-টুপি পরা সাদা দাড়িঅলা বছর পঞ্চাশের এক লোক আচমকা বেরিয়ে এসে প্রায় গায়ের ওপর পড়ে জানতে চাইলেন, ‘কী ব্যাপার তোমার? ছবি কিসের বাবা?’ ‘এই দেখতে আসা আরকি’, কিছুটা ভড়কে গিয়ে উত্তর দিতেই পানভর্তি মুখে হাসি এনে ‘ও আচ্ছা আচ্ছা, বুজতে পারসি, বুজতে পারসি’ বলে রাস্তা পেরিয়ে যেমন এসেছিলেন তেমনি নিঃশব্দে চলে গেলেন।
রিকশা কিন্তু কোথাও দেখতে পেলাম না একটাও। ভাবলাম দুপাশ দেখতে দেখতে হেঁটেই যাব এটুকু পথ। এখন শেষ অঘ্রানে উত্তরের গ্রামাঞ্চলে শীত পড়লেও জাঁকিয়ে বসেনি। মাঝ দুপুরের পরিষ্কার নীল আকাশের নিচে মিঠে রোদ ছড়ানো। পাতলা কুয়াশা পড়তে শুরু করবে আরও ঘণ্টাচারেক পরে। দুই স্তরের পোশাক পরে মিনিট পাঁচেক হাঁটতেই বুঝে গেলাম, হাঁটতে হাঁটতে দৃশ্যদর্শন সম্ভব নয়—বাহন চাই। রাস্তার পাশের একটা বাড়ির সামনে দুটো ছেলে কথা বলছিলো, তাদের জিজ্ঞেস করতে বললো, ‘রিকশা পাবেন না, ভ্যানে যান।’ ওদের কথায় মনে পড়লো এখন পর্যন্ত এই পথে একটা রিকশাও চোখে পড়েনি। ডানদিকে তাকাতে দেখলাম দূরে একটা ভ্যান আসছে, তাতে কয়েকজন যাত্রী বসা। ইশারা করতেই ভ্যান থামলো, উঠে বসতেই তারা সমস্বরে সাবধান করল, ‘ওপাশে পা দিয়েন না, এদিকে বসেন।’ মুহূর্তে খেয়াল হলো, তড়িঘড়িতে ভ্যানের একপাশে রাস্তার দিকটায় যেভাবে পা ঝুলিয়ে বসেছি তাতে উল্টোদিক থেকে আসা যে-কোনও গাড়িতে আমার পা ঠুকে যেতে পারত। কয়েক জায়গায় যাত্রী নামিয়ে ব্যাটারিচালিত ভ্যান মিনিট পনেরোর মধ্যে বোল্লার পাড়ে বাঁধের ওপর এসে থামল।

এই জায়গাটার তেমন কোনও পরিবর্তন হয়নি; শুধু বেশ কয়েক বছর আগে বাঁধটা এখানে যতটা উঁচু দেখেছিলাম এখন ততটা নেই। বিশেষ করে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তাটা যে বিন্দুটাতে এসে বাঁধটার সাথে সমকোণে মিলেছে সেখানটা প্রায় রাস্তাটার সাথে মিশে গেছে, তারপর দুদিকে প্রায় ১৫-২০ ডিগ্রি কোণের ঢাল তৈরি করে উঠে গিয়ে বাঁধের স্বাভাবিক উচ্চতার সাথে মিলে গেছে। বাঁধের উপর আর রাস্তাটার সংলগ্ন অংশে ধানের খড় রোদে মেলে দেওয়া; একজন কৃষাণী একটা ‘কাড়াইল’ দিয়ে সেগুলো উল্টে দিচ্ছেন। উল্টো দিকে বাঁধের কিনার ঘেঁষে দুতিনটা দোকান, সেগুলোর দুপাশে সিমেন্টের বেঞ্চি, একটা-দুটো অনুচ্চ বুনো ঝোপ। দুটো দোকানের মাঝখানটায় একটা টিউবওয়েল, তার মাথাটা এখন নেই—হয়তো চুরি হবার ভয়ে, অথবা এই মুহূর্তে হয়তো ওটার প্রয়োজন নেই। টিউবওয়েলের আর দোকনঘরগুলোর ঠিক পেছনে বাঁধের ঢাল নেমে গেছে প্রায় ১২-১৪ ফুট নিচে নদীর স্তর পর্যন্ত, তবে নদী এখন দূরে—আপতত বাঁধের সংলগ্ন অংশটায় দুচারটে পুকুর, সবজি ক্ষেত, ধান কিংবা খড়ের গাদা, কৃষাণীর ফসল মাড়াই, ঝাড়া আর শুকানোর আয়োজন। দুই দোকনঘরের মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটা সামনে রেখে দাঁড়িয়ে টিউবওয়েলের মাথার উপর দিয়ে তাকালে দেখা যায় চরে চাষের জমি, ফসলের ক্ষেত, আর দূরে চরের সাদা বালুর রেখা ধরে এ বছরেই বানানো বাড়িঘর—জায়গাটা শংকরদহ। আরও দূরে অদৃশ্য নদীর ওপাড়ে ময়ালের ঝাপসা গাঢ় সবুজ রেখা। 

ভ্যান থেকে নেমেই চোখে পড়েছিল সামনের সিমেন্টের বেঞ্চিটায় এক বৃদ্ধ বসা। এখন ভালো করে তাকাতে খেয়াল করলাম, তিনি একদৃষ্টে আমার গতিবিধি অনুসরণ করছেন। অঘ্রানের দুপুরের নাতিশীতোষ্ণ রোদে বৃদ্ধ দিব্যি খালি গা খালি পায়ে সিমেন্টের ঠাণ্ডা বেঞ্চে বসে আছেন। চিমসানো পেটের নিচটায় লুঙ্গির বাঁধন পোঁটলার আকার নিয়েছে, হাতদুটো কোলের ওপর জড়ো করে রাখা। বয়েসি কোঁচকানো চামড়ায় এককালের ফরসা রঙের আভাস, এখন কালচে বাদামি, একহারা লম্বাটে গড়ন, লম্বা চোখা নাক, ব্যাকব্রাশ করা কাঁচাপাকা চুল আর সাদা দাড়ি। ‘কেমন আছেন চাচা’ বলে পাশে গিয়ে বসতেই এতক্ষণ আটকে রাখা আলাপ আর প্রশ্নগুলো যেন তিস্তার স্রোতের ধারায় বেরিয়ে আসতে লাগল।   

কেন যে বৃদ্ধের মনে জগতের নারীজাতির প্রতি চরম বিতৃষ্ণা, আর দুচার কথায় কুশল জানানোর পর দেশজুড়ে মহিলাদের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে অনর্গল উষ্মা প্রকাশ করতে শুরু করলেন জানি না। তাঁদের বয়সে তো রংপুর শহরে কিছু ইরানি আর জাঁতা পেষা মেয়েদের ছাড়া আর কোনও মেয়েকে এমন পথে-ঘাটে দেখা যেত না! এখন যে কী দিন হয়েছে! সবখানে মেয়েদের দাপাদাপি! এসব পাপ! পাপের দিন পড়েছে! এই যে মড়ক, এসব এই পাপের ফল। আগে কি এমন হতো! আগে মড়ক লাগতো একটা কি দুইটা গ্রামে। তারপর দশটা কি বারোটা লোক মরল, পনেরো দিনের মধ্যে মড়ক শেষ। এখন দেখেন, সেই যে আর-বছর মড়ক লেগেছে, এখনও কি তার শেষ আছে! বোধহয় আমার মুখের মাস্কটা লক্ষ করেই বলতে লাগলেন, কী সব পরে! মাস্ (মাস্ক) না কী কয়। তিনি ওসব পরেন না। এই তো কিছুদিন আগে পীরেরহাটের হুজুরের জানাজায় যাবার সময় আর্মি আটকে দিল—মুখে ‘মাস্’ ছিল না বলে। ‘আমাক বলে, তোমার মাস্ কই? মাস্ ছাড়া যাওয়া যাবে না। আমি ভাবনো একনা শয়তানি করি। দুইটা ডাং (মার) খাইলে খামো। কইনো, মাস্ (‘মাছ’ অর্থে—ভাবখানা যেন বুঝতে পারেননি) কোটে পামো। মাস্ তো এখন বাজারে নাই। তারা বলে, এই ব্যাটা, মাস্ চেনো না, মাস্? মুখে মাস্ পরতে হয় জানো না? তখন বললাম, ও আচ্ছা, মাস্? এখনও কিনি নাই, কিনব। তারপর বুড়া মানুষ দেখি ‘যাও যাও’ বলি ছাড়ি দিসে।’ বৃদ্ধ বয়সেও তাঁর দুঃসাহসী দুষ্টুমির গল্প আর নারীবিদ্বেষী বয়ান শুনতে শুনতে আমি ভাবছিলাম, তাঁর চোখের সামনেই ঐ যে শাড়ি-পরা কৃষাণী বাঁধের ওপর রোদে খড় মেলে দিচ্ছেন, এই দৃশ্য তো তাঁর আশৈশব চেনা। তাহলে কোন নারীর প্রতি তাঁর এত ক্ষোভ? কেনই বা?  

বাঁধের উপর বসে থেকে আর বাজারে লোকজনের সাথে গল্প করে অবসর জীবন কাটে পঁচাশি বছরের বৃদ্ধের। ছবি : লেখক বয়স পঁচাশি হয়েছে, সেই কোনকালে প্রথমে কোলকোন্দের পীরের বাড়ির প্রাইমারি স্কুল আর তারপর মহীপুরের হাইস্কুলে গিয়ে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। এখন বাড়ি এই ধামুর বোল্লার পাড় বাঁধের পাশেই হলেও আদি বাড়ি ছিল ঐ যে টিউবওয়েলের মাথার উপর দিয়ে ধামুরের দিগন্ত পেরিয়ে বহুদূরে মৌজার সীমানার লাল নিশান দেখা যায়, তার পরে বিনবিনার চর পেরিয়ে উত্তর-পশ্চিম কোণে আরও দূরে আবুলিয়ায়। বাবা ছিলেন জমিদারের পেয়াদা, তিনি নিজে হয়েছিলেন আনসার কমান্ডার। মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, কিন্তু বহুবারের নদীভাঙনে সার্টিফিকেটটা যে কোন বাড়ি ফেলে আসার সময় হারিয়ে ফেলেছেন, জানেন না। একবার মুক্তিযোদ্ধার লিস্ট বানানোর কাজে লোকও এসেছিল গ্রামে, কিন্তু সবাই সুপারিশ করলেও কাগজের অভাবে তাঁর দাবি নাকচ হয়ে যায়। সেই দুঃখ আর ক্ষোভ যে বেশ প্রবল হয়েই বৃদ্ধের মনে বর্তমান, তা বোঝা যায়। এখন আর কোনও কাজ করেন না। ছেলে ঢাকায় কোনও মেজরের গাড়ি চালায়। সারাদিন এই বাঁধের উপরে বসে কাটিয়ে দেন। আর প্রায় প্রতি বিকেলবেলা আড়াই কিলোমিটার হেঁটে গঙ্গাচড়া বাজারে যান চেনা লোকজনের সাথে গল্প করতে। সবাই চেনে। কেউ কেউ সালাম দেয়। কিছুটা উঁচু দাঁতের কয়েকটা হারানোয় কথা কিছুটা ফোকলা শোনাচ্ছিল, ঠোঁটের কিনার আর মুখের কোণে থুথুও জমছিল। এসব ছাপিয়ে আমাকে অবাক করছিল পঁচাশি বছর বয়সেও তাঁর প্রখর দৃষ্টিশক্তি, দৃষ্টিভঙ্গির তীব্রতা—তা সে যেমনই হোক—আর খুব সম্ভবত এখনও বাকি রয়ে যাওয়া তাঁর অনেকখানি জীবন।

কিন্তু আমার জন্য বিস্ময় তখনও বাকি ছিল। সে বিস্ময় এমনই ব্যক্তিগত যে আমার কাছে তিস্তা ভ্রমণ সেই মুহূর্তের পর একেবারে নতুন অর্থ নিয়ে হাজির হলো।
বালকবয়সে আবুলিয়ার আদি বাড়ি থেকে কয়েক মাইল পায়ে হেঁটে বৃদ্ধ আসতেন কোলকোন্দের পীরের বাড়ির প্রাইমারি স্কুলে পড়তে। সেই সময়ের কথা সব তাঁর মনে নেই, তবে স্কুল যাতায়াতের কথা মনে আছে। সকালে ভাত খেয়ে দীর্ঘ পথে আর স্কুলের বিরতিতে পেটে দেবার জন্যে চালভাজার গুঁড়ো বা ওপরকম কিছু হালকা খাবার কাপড়ের পুঁটলিতে বেঁধে নিয়ে রওয়ানা দিতেন। সহপাঠীদের নাম তেমন মনে নেই, তবে স্কুলে তাঁর ‘ওস্তাদের’ বড় ছেলে তাঁর সাথেই পড়ত, এটুকু মনে আছে। ওস্তাদের নাম ছিল আবদুল আলী পণ্ডিত। আমার বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা লাফিয়ে ওঠে নামটা শুনে।

জ্ঞান হবার পর থেকে এই নামটা আর সেই নামের লোকটা সম্বন্ধে কেবল শুনে এসেছি। বড় হয়ে যেখানে যখন সুযোগ পেয়েছি, তাঁর সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করেছি। সামান্য যেটুকু জেনেছি তাতে মনের ভেতরে বাস্তবের চেয়ে আরও বেশি মিথ হয়ে উঠেছে নামটা। স্কুলে বাংলা আর সংস্কৃত পড়াতেন, তাই নামের শেষে ‘পণ্ডিত’ আখ্যা যুক্ত হয়েছিল। পীর বাবার আট সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। বড় ভাই রেওয়াজ অনুযায়ী বাবার উত্তরাধিকার সূত্রে পীরত্ব পেয়েছিলেন। অন্য ভাইদের কেউ ডাক্তারি, কেউ ওকালতি, কেউ মাওলানা হয়ে মাদ্রাসার শিক্ষকতা জীবিকা করেছিলেন। কেউ কেউ স্রেফ কিছু না করে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। নিজেদের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত স্কুল ছাড়াও রংপুর শহর ঘিরে আরও কিছু স্কুলে শিক্ষকতা করেছিলেন আবদুল আলী। হাতের লেখা ছিল মুক্তোর মতো। শুনেছি চায়ের নেশা ছিল সাংঘাতিক; এমনই যে একবার একটা আধুলি নিয়ে বড় ছেলেকে চা পাতা আনতে পাঠিয়ে যখন তার ফেরার অপেক্ষা করছেন, তখন ছেলেকে খালি হাতে ফিরতে দেখে আর চা না-আনার কারণ শুনে হাতে থাকা দা নিয়ে তাকে তাড়া করেছিলেন মেরে ফেলবেন বলে; ছেলে নাকি জমির আল ধরে দোকানে যেতে যেতে বালকসুলভ চপলতায় পয়সাটা শূন্যে ছুড়ে লোফালুফি করছিল, আর তাতে সেটা পাশের চষা জমির মধ্যে পড়ে হারিয়ে যায়। লম্বা কৃষ্ণবর্ণ শক্তপোক্ত শরীরে ছিল চণ্ড রাগ। আর ছিল মাছ ধরার নেশা। লোকটা কি অলস, অবিবেচক, বাস্তববুদ্ধিহীন, নিরুদ্যম আর খেয়ালি ছিলেন? তা না হলে অন্য সব ভাই যখন ক্রমাগত ভাঙনের মুখে নদীতীরবর্তী স্বর্গের মতো আদি আবাসের মায়া ছেড়ে স্থায়ীভাবে কয়েক মাইল দূরে পীরেরহাটে বা উত্তরে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে, কিংবা রংপুর শহরে চলে যান, কেবল তিনিই কেন নদী আঁকড়ে পড়ে ছিলেন আমৃত্যু? চুয়ান্ন বছর বয়সে মৃত্যুর পরেই কেবল তিনি নদীর মায়া ছেড়েছিলেন। সম্পূর্ণ অসহায় তাঁর স্ত্রী স্বামীর লাশ আর ছয়টি সন্তান নিয়ে নদীর গ্রাসে হারানো বাড়ি আর সর্বস্ব পিছনে ফেলে চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে কেবল আত্মীয়দের সম্ভাব্য সাহায্য সম্বল করে পীরেরহাটে চলে যান।    

তাঁর বড় পুত্র আমার বাবা তখন সবে মেট্রিকুলেশন শেষ করেছেন। অনেক বছর পরে এই পীরেরহাটেই আমার জন্ম। চলবে

 

//জেডএস//

সম্পর্কিত

শূন্য প্রান্তরে একা

শূন্য প্রান্তরে একা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

ঐশী গল্প

ঐশী গল্প

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

সর্বশেষ

শূন্য প্রান্তরে একা

শূন্য প্রান্তরে একা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

ঐশী গল্প

ঐশী গল্প

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune