X
শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ৬ কার্তিক ১৪২৮

সেকশনস

আমার মা

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২০, ১১:১৯

তোফায়েল আহমেদ আজ মায়ের চতুর্দশতম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৬-এর ২৫ ডিসেম্বর ৯২ বছর বয়সে সকলের মায়া ত্যাগ করে তিনি এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। পৃথিবীতে প্রতিটি সন্তানের নিকট মা পরম আরাধ্য। আমার জীবনেও মা প্রিয় মানুষ, শ্রেষ্ঠ সম্পদ। মায়ের স্নেহ-আদরে বড় হয়েছি। মায়ের পবিত্র মুখখানি যখনই চোখের সামনে ভেসে ওঠে মনে হয় এখনই মায়ের কাছে ছুটে যাই। জন্ম থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মা যত্ন করে আমায় গড়ে তুলেছেন। মা ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারতাম না। শৈশব আর কৈশোরের সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে দু’চোখ ভিজে আসে। প্রতিবার নির্বাচনি জনসংযোগে যাবার প্রাক্কালে কাছে টেনে পরমাদরে কপালে চুমু খেয়ে সার্বিক সাফল্য কামনায় প্রাণভরে দোয়া করতেন মা। মমতাময়ী মায়ের কোমল স্মৃতি খুব মনে পড়ে। আমার বাবা ১৯৭০-এর ২৫ এপ্রিল ৬২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। সেদিন জনসভা ছিল চট্টগ্রামের মিরসরাইতে। বাবার মৃত্যুর সংবাদ আমার আগে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু পেয়েছিলেন। তিনি চট্টগ্রামে আমাদের প্রিয় নেতা এমএ আজিজকে জানিয়েছিলেন, ‘তোফায়েলের বাবা মৃত্যুবরণ করেছে।’ সভা শেষে চাঁদপুর হয়ে ২৬ এপ্রিল সকালে গ্রামের বাড়ি পৌঁছাই। ততক্ষণে বাবার দাফন হয়ে গেছে। বাবার সঙ্গে শেষ দেখা হয় ’৭০-এর ১৭ এপ্রিল। প্রতি বছর ভোলায় গ্রামের বাড়িতে বাবা-মায়ের মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে তাদের স্মরণ করি। কিন্তু এবার করোনা মহামারির কারণে সেটি সম্ভবপর হচ্ছে না।


মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আমি। বাবা-মায়ের সুখের সংসার। তিন ভাই চার বোনের মধ্যে আমার অবস্থান পঞ্চম। বিদ্যালয় জীবনের সূচনাতে নিজ বাড়িতে থেকে গ্রামের স্কুল কোড়ালিয়া ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে লেখাপড়ায় হাতেখড়ি। এরপর বাড়িতে থেকে খায়েরহাট জুনিয়র হাইস্কুল হতে ষষ্ঠ শ্রেণি পাস করে বোরহানউদ্দিন হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হই। আজকাল গ্রামে উপজেলায় অনেক হাইস্কুল হয়েছে। তখনকার দিনে এত হাইস্কুল ছিল না। আমাদের এলাকা বোরহানউদ্দিনে একটি মাত্র হাইস্কুল ছিল, সেখানে ভর্তি হই। বোরহানউদ্দিন হাইস্কুলে আমাকে কষ্ট করে লেখাপড়া করতে হয়েছে। স্কুলে তখন কোন হোস্টেল ছিল না। সেই ছোট্টকালেই যখন আমার বয়স মাত্র ১৩, তখন আত্মীয়-স্বজন এবং শুভানুধ্যায়ীর বাড়িতে থেকে পড়ালেখা করতে হয়েছে। কষ্ট হলেও মা আমাকে আদর করে লেখাপড়ায় নিয়মিত উৎসাহ জোগাতেন। সপ্তম শ্রেণির পরীক্ষা শেষে শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মান্নান স্যার (যিনি এখনও বেঁচে আছেন) বললেন, ‘তুমি ভালো ছাত্র। ভোলা সরকারি হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে চারটি আসন খালি আছে, পরীক্ষা দাও।’ শ’খানেক ছাত্র ভর্তি প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। আমি কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হই। ১৯৫৭’র জানুয়ারি মাসে ভোলা সরকারি স্কুলে ভর্তি হয়ে স্কুল হোস্টেলে থাকতে শুরু করি। শুরু হয় হোস্টেলে থেকে লেখাপড়ার পালা। স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে মোট চৌদ্দটি বছর হোস্টেলে ছিলাম। মা আমাকে আদর করে ‘মনু’ বলে ডাকতেন। সব সময় বলতেন, ‘মনু, মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করো।’ মায়ের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতাম। মাকে ছেড়ে জীবনের প্রথম হোস্টেল জীবন। মন পড়ে থাকতো মায়ের কাছে। অপেক্ষায় থাকতাম কখন মায়ের কাছে যাবো। প্রতি সপ্তাহে ছুটির আগের দিন মায়ের কাছে চলে যেতাম। পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি ছিল অপার আগ্রহ। বাবা-মায়ের আদরের ছিলাম। কখনোই কাছ ছাড়া করতে চাইতেন না। স্কুলের শিক্ষকরা স্নেহ করতেন। মনে পড়ে, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী, রাজনৈতিক সচিব হিসেবে বরিশালে তাঁর সফরসঙ্গী হয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য জেলা প্রশাসক থেকে শুরু করে সকল গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো। প্রেজেন্টেশন লাইনে আমার স্কুলের শিক্ষক তসীর আহমেদ স্যার দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি তখন বরিশাল জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক। বঙ্গবন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে বললাম, বঙ্গবন্ধু, আমার স্যার। বঙ্গবন্ধু সাথে সাথে বললেন, ‘তুমি এখনও সালাম করো নাই।’ আমি দ্রুত তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করলাম। পরিবার, বিশেষ করে মা, শিক্ষালয় এবং বঙ্গবন্ধুর থেকে অর্জিত মূল্যবোধ দিয়েই গড়ে উঠেছে আমার জীবন ও আচরণ।



১৯৬০-এ ম্যাট্রিক পাস করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হই। কিন্তু মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে এটা বেদনাদায়ক। তখন ছোট্ট একতলা কাঠের লঞ্চে গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকা আসতে ২৪ ঘণ্টা লাগতো। সেজন্য ঢাকা কলেজ ছেড়ে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে ভর্তি হই। কলেজ থেকে সাপ্তাহিক ছুটিতে লঞ্চযোগে ভোলায় মায়ের কাছে একদিন থেকে ফিরে আসতাম। কলেজে ছাত্র অবস্থায় ছাত্রলীগের সদস্য হয়ে রাজনৈতিক জীবনের শুরু। তারপর ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়ে ইকবাল হলের (বর্তমানে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ভিপি, ডাকসুর ভিপি, ছাত্রলীগ সভাপতি। ’৭০-এর ৩ জুন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগে যোগদান। ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু ভোলা-দৌলতখাঁ-তজুমুদ্দী-মনপুরা আসনে আমাকে মনোনয়ন দেন। মাত্র ২৭ বছর ১ মাস ১৫ দিন বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হই। মনে পড়ে, ’৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের কথা। ৯ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে জীবনের প্রথম জনসভা। সেদিন ছিল ‘শপথ দিবস’। স্লোগান তুলেছিলাম, ‘শপথ নিলাম শপথ নিলাম মুজিব তোমায় মুক্ত করবো; শপথ নিলাম শপথ নিলাম মাগো তোমায় মুক্ত করবো।’ আমরা সেই শপথ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করেছি। ’৬৯-এর গণআন্দোলনে আসাদ-মকবুল-মতিউর-রুস্তম-আলমগীর শহীদ হয়। সেই দিনগুলোতে মা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাতেন, প্রাণভরে আমার জন্য দোয়া করতেন। ’৭০-এর ১২ নভেম্বরের ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের প্রাক্কালে ভোলার দাসের হাটে আমার নির্বাচনি জনসভা ছিল। সকলের নিষেধ উপেক্ষা করে যখন রওনা করেছি, তখন মা কঠোরভাবে নিষেধ করে বলেছিলেন, ‘এই দুর্যোগের মধ্যে তুমি আজ যেও না।’ মায়ের কথা রেখেছিলাম। নয়তো সেদিন ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ভোলার ৫ লক্ষাধিক লোকের সাথে আমিও মৃত্যুবরণ করতাম। মা এবং মাতৃভূমি আমার কাছে সমার্থক। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের দেরাদুনে মুজিব বাহিনীর ট্রেনিং ক্যাম্পে বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে বলতাম, ‘প্রিয় নেতা, আপনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন জানি না! যতদিন আমরা প্রিয় মাতৃভূমি আপনার স্বপ্নের বাংলাদেশকে হানাদারমুক্ত করতে না পারবো, ততদিন মায়ের কোলে ফিরে যাবো না।’ সেদিনের সেই শপথও আমরা জীবনবাজি রেখে বাস্তবায়ন করে দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করেছি। যুদ্ধ শেষে বিজয়ীর বেশে আমি ও রাজ্জাক ভাই ১৮ ডিসেম্বর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে ২৮ ডিসেম্বর ভোলায় গ্রামের বাড়িতে অবস্থানরত মায়ের কোলে ফিরে আসি।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জাতীয় চার নেতাসহ আমরা ছিলাম গৃহবন্দি। ১৫ আগস্টের দু’দিন পর ১৮ আগস্ট আমার বাসভবনে এসে খুনিদের অন্যতম মেজর শাহরিয়ার (যার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে) এবং ক্যাপ্টেন মাজেদ (তারও ফাঁসি হয়েছে) বলপ্রয়োগে আমাকে রেডিও স্টেশনে নিয়ে যায়। সেখানে আমার ওপর অকথ্য নির্যাতন করা হয়। আমাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার সময় মা বেহুঁশ হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। মায়ের শরীরের ওপর দিয়েই আমায় টেনে নিয়েছিল ঘাতকের দল। ২৩ আগস্ট গৃহবন্দি অবস্থা থেকে জনাব ইএ চৌধুরী আমাকে এবং জিল্লুর রহমানকে বঙ্গভবনে খুনি মোশতাকের কাছে নিয়ে যায়। সেখানে অবস্থানরত খুনিচক্র আমাকে নানাবিধ প্রস্তাব ও মৃত্যুভীতি প্রদর্শন করা সত্ত্বেও সেসব প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছি। ’৭৫-এর পর চরম দুঃসময়। আমি তখন কারাগারে। সারা দেশজুড়ে কারফিউ, হত্যা, গুম, গ্রেফতার আর ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা। দিনের পর দিন অবর্ণনীয় অবস্থায় কেটেছে। আমার স্ত্রীকে কেউ বাড়ি ভাড়া দেয়নি। তোফায়েল আহমেদের স্ত্রীকে বাড়ি ভাড়া দিলে আর্মি ধরে নিয়ে যাবে। আমার ভাগ্নি-জামাই নজরুলের নামে বাড়ি ভাড়া নিয়ে পরিচয় গোপন করে সেই বাড়িতে আমার স্ত্রী থেকেছেন। তিনি এক বছর ছিলেন কলাবাগানে। মা এই বাসায় থেকেছেন এবং সেই কঠিন দিনগুলোতে কষ্টকর জীবনযাপন করেছেন। সে সময় করুণ অবস্থা গেছে আমার পরিবারের। আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সামান্য টাকা ছিল। জিয়াউর রহমান অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করেছিল। আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দেওয়ার বহু চেষ্টা করেছে। কোনও দুর্নীতি আবিষ্কার করে মামলা দিতে পারেনি। আমার বনানীর বাড়ি, এই বাড়ির জমি বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন-’৭৫-এর ৩০ জুলাই, বরাদ্দ হয় আমার স্ত্রীর নামে। আমার বড় ভাই ’৭৫-এর ১১ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। বড় ভাই যখন হলিফ্যামিলি হাসপাতালে মা তখন অসুস্থ। আমাকে বলেছিলেন মাকে দেখতে চাইলে তাড়াতাড়ি চলে এসো। আমি গিয়েছিলাম। মা বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু বড় ভাই মায়ের আগেই মৃত্যুবরণ করেন। সংবাদ পেয়ে বঙ্গবন্ধু আমার তৎকালীন সরকারি বাসভবনে এসে আমাকে আদর করে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। আমার ভাইয়ের জানাজায় অংশগ্রহণ করে মৃতদেহ হেলিপ্যাডে নিয়ে হেলিকপ্টারে করে ভোলায় প্রেরণের ব্যবস্থা করেন। সে সময় যতদিন ভোলায় ছিলাম ১২ থেকে ৩০ জুলাই। প্রতিদিন বঙ্গবন্ধু আমার খবর নিতেন।
আমার এপিএস ছিল শফিকুল ইসলাম মিন্টু। ১৫ আগস্টের পর আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য খুনি ক্যাপ্টেন মাজেদের নেতৃত্বে কতিপয় সেনা সদস্য তাকে ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে রাজি না হওয়ায় মিন্টুকে হত্যা করে। তার মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। আমার মেজ ভাইকে গ্রামের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে ’৭৫-এর ৫ অক্টোবর খুনি ক্যাপ্টেন মাজেদের নির্দেশে গুলি করে হত্যা করা হয়। আমি তখন ময়মনসিংহ কারাগারে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে বন্দি। তিন ছেলের দু’জন মৃত, একজন কারাগারে। মায়ের তখন করুণ অবস্থা। এ অসহায় অবস্থায় মা জীবন কাটিয়েছেন। আমার মেয়ে ডা. তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতো বড় হয়ে ডাক্তার হবে। তার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। মা ওকে ভীষণ আদর করতেন। মায়ের স্মৃতি আমার মেয়ে ধরে রেখেছে। মা যখন চিকিৎসাধীন, আমার মেয়ে ও জামাতা উভয়েই মায়ের সেবা-যত্ন করেছে।
’৭৫-এ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর আমি ৩৩ মাস ময়মনসিংহ ও কুষ্টিয়া কারাগারে বন্দি ছিলাম। জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এলে ’৮৩-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি আমাকে গ্রেফতার করে প্রথমে সেনানিবাসে, পরে সিলেট কারাগারে প্রেরণ করে। সিলেট কারাগারে গিয়ে মা আমার সাথে দেখা করেছেন। সেদিন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আমাদের ৪০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তারপর ’৮৪-এর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে সাভার স্মৃতিসৌধে গ্রেফতার করা হয়। ’৮৫তে আমাকে গ্রেফতার করে ১৫ দিন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রেখে পরে কুমিল্লা কারাগারে পাঠানো হয়। ’৮৭-তে ভোলা থেকে গ্রেফতার করা হয়। আমি তখন সংসদ সদস্য। গ্রেফতার সংবাদে বিক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে এলে আমাকে একঘণ্টার মধ্যে বরিশাল কারাগারের নির্জন কক্ষে বন্দি করে রাখা হয়। ’৯৬-এ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে আমাকে গ্রেফতার করে রাজশাহী কারাগারে পাঠানো হয়। ২০০১-এর নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত ভোলায় গ্রামের বাড়িতে তাণ্ডব চালায়, আমার গাড়ি ভাংচুর করে। বৃদ্ধ বয়সে আমার মাকে এসব দেখতে হয়েছে। ২০০২-এ সিঙ্গাপুর থেকে চিকিৎসা শেষে ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণের পর আমাকে গ্রেফতার করে কাশিমপুর কারাগারে ফাঁসির আসামির কনডেম সেলে রাখে। পরে কুষ্টিয়া কারাগারে প্রেরণ করে। ২০০২-এ মায়ের বয়স তখন ৮৮ বছর। অসুস্থ শরীরে তিনি আমাকে দেখতে কুষ্টিয়া কারাগারে ছুটে গিয়েছেন। এক নজর মায়ের মুখখানি দেখে মনে অনাবিল শান্তি অনুভব করেছি। স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বমোট ৭ বার আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং প্রত্যেকটি কারাগারে আমার বৃদ্ধা মা ছেলেকে দেখার জন্য ছুটে গিয়েছেন। সে কি কষ্ট! জেলগেটে যখন মা আমার সঙ্গে দেখা করতেন সর্বক্ষণ আমার মাথা মায়ের বুকে থাকতো। যখন তিনি আমাকে রেখে বিদায় নিতেন, তখন তাঁর দুই চোখে অশ্রুর নদী। দুই ছেলে মৃত্যুবরণ করেছে, এক ছেলে কারান্তরালে। কি নিঃস্ব রিক্ত আমার মা!
সেই দুঃসময়ের কথা স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে। ’৯৬-এ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারে আমি শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী। বেইলি রোডে অবস্থিত বাসভবন ‘তন্ময়’-এ থাকি। মা আমার সঙ্গে থাকতেন। প্রতিদিন মায়ের আদর নিয়ে দিনের কাজ শুরু করতাম। বনানীর বাড়িতে আমার শয়ন কক্ষের পাশেই মায়ের ঘর। সকালে ঘুম ভাঙার পর মায়ের স্নেহের আলিঙ্গন ছিল নিত্য দিনের পাথেয়। মাকে চুমু দিয়ে সকালে বের হতাম, না ফেরা পর্যন্ত জানালার কাছে তসবিহ হাতে নিয়ে মা পথের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। ঘরে প্রবেশ করেই মাকে চুমু দিয়ে শয়নকক্ষে যেতাম। আমার বন্ধুবান্ধব-স্বজন প্রত্যেককেই মা অন্তর থেকে ভালোবাসতেন। মা যখন অসুস্থ প্রত্যেকেই তাঁর সেবা-শুশ্রূষা করেছেন। গুলশানস্থ শিকদার হাসপাতালে মায়ের শেষ জীবনের চিকিৎসাদি চলে। প্রায় দু’বছর তিনি বাসা এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মৃত্যুর দু’দিন আগে আমি যখন নিজ হাতে মাকে খাওয়াচ্ছি তখন তিনি ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছিলেন। যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় মা বলেছিলেন, ‘তুমি কী আমাকে মরতে দেবে না?’ আমি বলেছিলাম, মা আপনি যদি মৃত্যুবরণ করেন তখন আমাকে দোয়া করবে কে? মা বলেছিলেন, ‘তোমাকে আমি আল্লাহর কাছে রেখে গেলাম। আল্লাহই তোমাকে হেফাজত করবেন।’ এটাই ছিল মায়ের সাথে আমার শেষ কথা। মা চিকিৎসাধীন থাকাকালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ফোনে খবরাখবর নিয়েছেন, মায়ের মৃত্যুর দিনে বনানীর বাড়িতে এসে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। আমি তার কাছে কৃতজ্ঞ।
বঙ্গবন্ধুর চেতনায় গড়ে উঠেছে আমার রাজনৈতিক জীবন আর মায়ের মানবিক গুণাবলিতে বিকশিত হয়েছে ব্যক্তি জীবন। ’৭৩-এ ভোলার বাংলা বাজারে মায়ের নামে প্রতিষ্ঠা করেছি ‘ফাতেমা খানম গার্লস হাইস্কুল’। সেখানে আজ ৬০ বিঘা জমির ওপর মায়ের নামে ‘ফাতেমা খানম ডিগ্রি কলেজ’, ‘ফাতেমা খানম মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র’, ‘ফাতেমা খানম এতিমখানা’, ‘ফাতেমা খানম জামে মসজিদ’, ‘ফাতেমা খানম বৃদ্ধাশ্রম’সহ গড়ে উঠেছে সুবিশাল ‘ফাতেমা খানম কমপ্লেক্স’। এই কমপ্লেক্সে গরিব-দুঃখীর চিকিৎসা সেবায় পিতা-মাতার নামে ‘আজহার-ফাতেমা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এর পাশেই নির্মিত হয়েছে অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন ‘স্বাধীনতা জাদুঘর’। ২০১৮’র ১৭ জানুয়ারি মহামান্য রাষ্ট্রপতি উদ্বোধন করেন। এখানে সংরক্ষিত আছে বাঙালির জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে জাতির জনকের ঐতিহাসিক অবদানের স্মৃতি-নিদর্শনসমূহ। মায়ের নামে ‘বৃদ্ধাশ্রম’ করার মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে বঞ্চিত মায়েদের সেবাপ্রদান। ভোলা গেলে বৃদ্ধাশ্রমে অবস্থানরত মায়েদের সঙ্গে দেখা করি। এখানে এমন মা আছেন, যার পুত্র এবং পুত্রবধূ উভয়েই ডাক্তার, এমন মা আছেন যিনি অনার্স পাস। কিন্তু তাঁরা এই বৃদ্ধাশ্রমে থাকতেই পছন্দ করেন। যখন সেখানে যাই আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নেন। তাদের মাধ্যমে মায়ের ভালোবাসা-আদর অনুভব করি। মায়ের শূন্যস্থান পূরণ হবার নয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মায়ের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। সকলের মতো আমিও মনে করি আমার মা-ই শ্রেষ্ঠ। ঘুম ভাঙার পর যখন লাইব্রেরি কক্ষে আসি তখন বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার ছবি, তার পাশে মায়ের সঙ্গে আমার ছবিটির নিচে দাঁড়াই। বঙ্গবন্ধু এবং মায়ের সান্নিধ্য পেয়ে জীবন আমার ধন্য। মা সর্বদা অপরের কল্যাণের কথা ভাবতেন। আমার প্রতি মায়ের নির্দেশ ছিল, ‘বাবা, কেউ যদি তোমার কাছে হাত পাতে, কাউকে খালি হাতে ফেরত দিও না।’ যখন ভোলা যাই যতটুকু পারি মায়ের নির্দেশ পালনের চেষ্টা করি। এমন মমতাময়ী মায়ের সন্তান হতে পেরে আমি গর্বিত, ধন্য!
ভোলায় গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে আমার পরম শ্রদ্ধেয় মা-বাবা যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত, সেখানে কবর-ফলকে হৃদয়ের শ্রদ্ধাঞ্জলি উৎকীর্ণ আছে এভাবে-
‘মা, বাবা চলে গেছেন অনেক আগে
চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তোমারই পাশে
তুমিও চলে গেলে আমাদের
সকলকে কাঁদিয়ে,
তবু তোমরা আছো সর্বক্ষণ
আমাদের হৃদয়জুড়ে।
মা, প্রতি মুহূর্ত তোমাদের অভাব
অনুভব করি।’
তোমার মনু (তোফায়েল)।

লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় সংসদ।
[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বঙ্গবন্ধুর চেতনা চলার পথের প্রেরণা

বঙ্গবন্ধুর চেতনা চলার পথের প্রেরণা

বঙ্গমাতার জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

বঙ্গমাতার জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

নির্লোভ নিরহংকারী প্রতিভাবান শেখ কামাল

নির্লোভ নিরহংকারী প্রতিভাবান শেখ কামাল

আমার জীবনে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ

আমার জীবনে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ

সাম্প্রদায়িকতা ও মনোজগৎ

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ১৮:০৪
স্বদেশ রায় আলেকজান্ডারকে তার বাবা ছোটবেলায় যেমন যুদ্ধবিদ্যা শেখার ব্যবস্থা করেছিলেন তেমনই তার মনোজগৎ গড়ে তোলার জন্যে এরিস্টটলের মতো শিক্ষকের কাছেও তাঁর শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের একটি সভ্যতায় মনোজগৎ গড়ে তোলার গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি। আর এরিস্টটল কখনোই আলেকজান্ডারের মনোজগৎ কোনও অন্ধ বিশ্বাস দিয়ে গড়ে তোলেননি। তিনি বাস্তবতা ও প্রকৃতির আচরণ থেকে আলেকজান্ডার যাতে শিক্ষা নিতে পারে সে চেষ্টাই করেছিলেন। উদার এবং অসম্ভবকে জয় করার একটি মনোজগৎ তাঁর ভেতর তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন।

এখন যেমন ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের ভেদবুদ্ধি ও নানান সংকীর্ণতা মানুষের মনোজগৎকে সংকীর্ণ করে; অতীতের ওই সভ্যতাগুলোতেও দেখা যায়, নানান কুসংস্কার সমাজ ও মানুষের মনকে সংকীর্ণ করতো। আর এর বিপরীতেই ছিল উদার চিন্তার একটি যাত্রা। আবার ইতিহাসে এর পরের সময়ে দেখা যায়, ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও ধর্মের একাধিপত্য বা ধর্মের নামে রাষ্ট্র ও সমাজকে বেঁধে ফেলার এক ভয়াবহ যুগ। এর আগে নানান কুসংস্কারে রাষ্ট্র ও সমাজকে যতটা না আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধতে পেরেছিল, তার থেকে অনেক বেশি আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে ধর্মের একাধিপত্য। বাস্তবে রাজতন্ত্রের বদলে পুরোহিততন্ত্র ও চার্চতন্ত্রই তখন চালু হয়। ধর্মীয় নেতা পেছনে থাকলেও তারাই রাজাকে বা রাষ্ট্র ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। সেই নিয়ন্ত্রণের বাঁধন এতই শক্ত হয় যে ধর্মের তথাকথিত বিধানের বলে রাষ্ট্র নরহত্যার যেমন একক অধিকার পায়, তেমনি নারীকে বেঁধে ফেলা হয় নানান শেকলে। যে নারীর হাত ধরে গৃহসভ্যতা ও কৃষিসভ্যতার জন্ম সেই নারীকে পরাধীনও অসহায় করে সমাজকে একটি অন্ধকার যুগে নিয়ে যাওয়া হয়। যা থেকে আজও  সমাজ বের হয়ে আসতে পারেনি। ধর্ম সাম্প্রদায়িকতার নামে আমরা মাঝে মাঝে পৃথিবীর নানান দেশে ধর্মীয় হামলা, মানুষের ওপর হামলা ও সম্পদ দখলের নগ্নতা দেখি। কিন্তু প্রতিদিন ধর্মের নামে নারী’র ওপরে যে আঘাত এখনও পৃথিবীর নানান রাষ্ট্রে ও সমাজে করা হচ্ছে, তা আমরা সঠিক দেখতে পাই না। কারণ, এটা আমাদের সহজাত হয়ে গেছে। আমরা এই অন্ধকারকে স্বাভাবিক অন্ধকার মনে করি বা বুঝতেই পারি না এটা অন্ধকার। যেমন, যে রাতকানা রোগে ভোগে তার চোখে রাতের আকাশ তারাহীন। কিন্তু সে সেটা বোঝে না।

রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর ধর্মের নামে এই ছোবলকে বাঁচানোর জন্যে পনের শতকে ইউরোপের অনেক বুদ্ধিনায়করা আন্দোলন শুরু করেন। তাদের এই আন্দোলনের ফলে তখন পাশ্চাত্যের দেশগুলো ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে অনেকটা আলাদা করা শুরু করে। কিন্তু শতভাগ তারা এখনও করতে পারেনি। গণতন্ত্রের অন্যতম জন্মভূমি ব্রিটেনে ব্লাসফেমি আইন তুলে দেওয়া হয়েছে ২০০৮ সালে। আর প্রকৃতপক্ষে এটা নর্দান আয়ারল্যান্ড ছাড়া সর্বত্র তাদের কমন ল’ থেকে বাদ যায় ২০২১-এর মার্চে।  তবে শুধু পার্থক্য ছিল আধুনিক যুগে এসে তারা পাকিস্তানের মতো হয়তো কথায় কথায় এই ব্লাসফেমি আইন ব্যবহার করতো না। রাষ্ট্র পরিচালকদের শিক্ষাদীক্ষা কিছুটা হলেও তাদের সংযত করে রেখেছে এ ক্ষেত্রে। তারপরেও ক্যামেরুনের মতো তরুণ নেতাও চার্চ শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনিও বোঝেননি, শিক্ষাকে হতে হয় ইহজাগতিক ও আধুনিক। এই ইহজাগতিক ও আধুনিক শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের দায় ব্যক্তির নিজের। এ দায়ভার যখনই আধুনিক রাষ্ট্র নিজ হাতে তুলে নেয় তখনই বৈপরীত্য দেখা যায়। এবং ক্যামেরুনকে কিন্তু তার ফল ভোগ করতে হয়েছে। তার সমাজ পরোক্ষভাবে উগ্র হয়েছে। যে উগ্রতার কারণে তাকে ব্রেক্সিটে হারতে হয়েছে। ক্যামেরুন ব্রেক্সিটের পক্ষের জয়ে নিশ্চিত ছিলেন বলেই তিনি ব্রেক্সিটের পক্ষে-বিপক্ষে গণভোট দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন না তার সমাজে এখন উগ্রবাদীরা সংখ্যায় বেশি। যেকোনও উগ্রবাদ, তাই সে উগ্র জাতীয়তাবাদ হোক না, সেটাও কিন্তু ভয়াবহ এক সাম্প্রদায়িকতা। পৃথিবীতে এই উগ্র জাতীয়তাবাদের নামেও কম ধ্বংসযজ্ঞ, কম নরহত্যা হয়নি। পার্থক্য শুধু এখানে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা থেকে মানবতাবাদে পৌঁছাতে একটি রাষ্ট্র বা সমাজকে যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকে মানবতাবাদে পৌঁছাতে তার থেকে সামান্য কিছু কম পথ পাড়ি দিলে হয়তো চলে।

এ কারণে যেকোনও আধুনিক রাষ্ট্রকে প্রথমেই তার শিক্ষাকে আধুনিক করতে হয়। সেখানে কোনোভাবে ধর্মীয় শিক্ষার যোগ থাকলে চলে না। যে রাষ্ট্র তার শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষা রাখে ওই রাষ্ট্রকে পশ্চাৎপদ রাষ্ট্র হিসেবেই ধরতে হবে। ওই রাষ্ট্রকে আর যাই হোক আধুনিক রাষ্ট্র বলা যাবে না। কারণ, শিক্ষা সম্পূর্ণরূপে ইহজাগতিক ও আধুনিক বিষয়। এর সঙ্গে ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা থেকে শুরু করে অনেক দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু কিছু শিক্ষার ভেতর দিয়ে যে অবৈধ পুঁজি সৃষ্টি বা সম্পদ দখলের একটা তাড়না শুরু হয়েছে, এটাও কিন্তু শিক্ষার অঙ্গ নয়। কারণ, অবৈধ সম্পদ দখল ও দখলের তাড়নাও একটি রাষ্ট্র ও সমাজকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। ধর্মীয় উগ্রতা যেমন মানুষের মানবতা ধ্বংস করে তাকে রাষ্ট্রের ও সমাজের ক্ষতিকর কাজের দিকে ঠেলে দেয়, এই অবৈধ সম্পদ দখলের মানসিকতাও রাষ্ট্র ও সমাজকে সমান ক্ষতি করে। এবং একটা অদ্ভুত যোগাযোগ এখানে দেখা যায়, কোনও সমাজে উগ্র ধর্মীয়বাদ যেমন অবৈধ সম্পদ দখলের দিকে ছুটিয়ে নিয়ে যায় মানুষের মানসিকতাকে বা সেই সুযোগ করে দেয়, উগ্র-জাতীয়তাবাদও একই কাজ করে। ধর্মীয় মৌলবাদে যেমন রাষ্ট্রীয় ও সমাজের সম্পদ দখলের একটা তাড়না আছে, উগ্র জাতীয়তাবাদেও সেই একই বিষয় দেখা যায়। উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদে যেমন মানুষের সহজাত নৈতিকতা নষ্ট করে, অন্যের মানসিকতার ওপর, অন্যের সম্পদের ওপর অবৈধ দখলদারিত্ব সৃষ্টি করার একটা তাড়না দেখা যায়, উগ্র জাতীয়তাবাদেও তেমনই। পার্থক্য শুধু উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদের বয়স দুই হাজার বছরের বেশি, তার শেকড় অনেক গভীরে আর উগ্র জাতীয়তাবাদের বয়স কয়েকশ’ বছর ছুঁতে চলেছে, তার শেকড় অতটা গভীরে নয়।

পনের শতকের পর থেকে ধীরে ধীরে রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে ধর্মকে অনেকটা দূরে ঠেলে দিতে পেরেছিল পাশ্চাত্যের দেশগুলো। কিন্তু গত একশ’ বছরে সেখানেও উগ্র জাতীয়তাবাদের নামে প্রচ্ছন্নভাবে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণ সাম্প্রদায়িকতা বাড়ছে। যেমন, আমেরিকায় ট্রাম্পের বিজয়ের কারণ শুধু ডেমোক্র্যাটদের দুর্বল প্রার্থীই ছিল না, ধর্মীয় ও বর্ণ সাম্প্রদায়িকতাও কাজ করেছিল। যদিও ওবামা বলেছিলেন, তিনি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হলে ট্রাম্প জিততে পারতো না। তবে তারপরেও বাস্তবতা হলো, ট্রাম্প যে ভোট পান ওই ভোটের একটি অংশে কিন্তু এই ধর্ম ও বর্ণ সাম্প্রদায়িকতার ভোট ছিল। সেখানে সামনে আনা হয়েছিল উগ্র জাতীয়তাবাদকে। এবং সেটা এখনও আমেরিকায় আছে। এমনিভাবে পাশ্চাত্যের অধিকাংশ দেশগুলোর রাজনীতি লক্ষ করলে দেখা যাবে, সেখানে একটা ধর্ম ও বর্ণ সাম্প্রদায়িকতার ভোট জন্ম নিচ্ছে প্রতিদিন। আর এশিয়া ও আফ্রিকার পশ্চাৎপদ দেশগুলোতে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা অনেক বেশি উগ্রভাবে বাড়ছে।

এই ধর্ম, বর্ণ ও গোষ্ঠী সাম্প্রদায়িকতা জন্ম নেয় মানুষের ভেতর যে সহজাত ভালো গুণগুলো অর্থাৎ উদারতা, সহমর্মিতা, সহযোগিতা, পবিত্রতা ও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা এগুলো নষ্ট হওয়ার ফলে। মানুষের সমাজের ও চরিত্রের বিবর্তনের ইতিহাস বলে, মানুষ সহজাতভাবে তার এই ভালো গুণগুলো নিয়ে সংঘবদ্ধ হতে শিখেছে। এবং সংঘবদ্ধ মানুষ তাদের এই ভালো গুণগুলো দিয়েই সমাজ থেকে, মানুষের মন থেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থপরতা ও অন্ধত্বকে পরাজিত করেই এগিয়েছে। আবার পাশাপাশি মানুষের সমাজের চলার পথে দেখা যায়, স্বার্থপর হিপোক্রেটরা তাদের প্রতারণা দিয়ে মানুষের এই সহজাত ভালো গুণগুলো নষ্ট করে চলেছে। মানুষের ভেতর যে সহজাতভাবে ফুলের মধু আহরণের একটা গুণ থাকে, এটা ওই স্বার্থপর হিপোক্রেটরা নষ্ট করে দিচ্ছে। মানুষের ভেতর পশুত্ব জাগাচ্ছে।

মানুষের ভেতর যারা স্বার্থপর হিপোক্রেট তারা এই কাজটি করছে মোটা দাগে দুটো বিষয়কে আশ্রয় করে।

এক. ‘ধর্ম’, দুই, ‘রাজনীতি’। এবং এখানে এই ‘ধর্ম’ ও ‘রাজনীতির’ এক অদ্ভুত মিল দেখা যায়। এই ‘ধর্ম’ ও ‘রাজনীতি’ বর্তমানের এ সময়ে মানুষকে মানুষ না রেখে ভোটারে পরিণত করার বা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার ক্যাডারে পরিণত করার যন্ত্র বানানোর চেষ্টা করছে প্রতি মুহূর্তে। যে কারণে তারা রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের ভেতরকার ভালো গুণগুলো নষ্ট হওয়ার সবকিছুকে উৎসাহিত করছে পৃথিবীর নানান ভূখণ্ডে। তারা সমাজে আধুনিক শিক্ষার বদলে অজ্ঞতাকে, মূঢ়তাকে উৎসাহিত করছে। সমাজে যোগ্যতা অর্জনের বিপরীতে অবৈধ দখলকে উৎসাহিত করছে। রাষ্ট্র ও সমাজে নিয়মতান্ত্রিকতার বদলে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। রাষ্ট্র ও সমাজের জ্ঞান বিস্তারের প্রতিটি অঙ্গকে মূঢ়দের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করছে। এবং সাধারণ মানুষ যাতে রাষ্ট্র ও মূঢ়চিন্তার দাস হয় সেদিকেই তারা রাষ্ট্র ও সমাজকে নিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নেতাদের একটি বড় অংশ আধুনিক মানুষগোষ্ঠী তৈরি হওয়ার বদলে এক ধরনের মানসিক প্রতিবন্দ্বী দাসগোষ্ঠী বা সমাজ সৃষ্টির কাজ করছে। তাদের চেষ্টার উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্র ও সমাজের আধুনিক ও উদার চিন্তার মানুষগোষ্ঠীর বিপরীতে এই দাসগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ানো। যে কারণে সমাজের একটি বড় অংশে উদার চিন্তা ও বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা প্রবেশের সব পথ তারা বন্ধ করতে সমর্থ হচ্ছে। ধর্ম ও রাজনীতির নানান কৌশলে তারা সমাজের বহুমুখী চিন্তাকে নষ্ট করছে।

কোনও রাষ্ট্রে ও সমাজে যখন এই চিন্তা চেতনায় দাসশ্রেণি গড়ে ওঠা শুরু হয় তখন ওই সমাজের মানুষ শুধু পেছন দিকে হাঁটতে শুরু করে না, সমাজের সব ধরনের সভ্যতা ও শৃঙ্খলাও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। এমন একটি সময়ে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনা খুবই কঠিন। কারণ, তখন অবচেতনভাবেও অনেক দায়িত্বশীল মানুষের মনোজগতের শুভ গুণগুলো নষ্ট হওয়া শুরু হয়ে যায়। রাষ্ট্র ও সমাজের নানান অঙ্গে এই দাসরাই বসে যায়। তারা সব সময়ই নানানভাবে মূঢ়তাকে সাহায্য করে। রাষ্ট্র ও সমাজকে পেছন দিকে ঠেলতে শুরু করে। তখন অতি সহজে রাষ্ট্র ও সমাজে যেকোনও ধরনের উগ্রবাদীরা সামনে চলে আসতে থাকে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এটা ছোঁয়াচে। কখনোই কোনও নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকে না।

এ মুহূর্তে গোটা পৃথিবীতে কম-বেশি নানান ধরনের উগ্রতা দেখা যাচ্ছে। আরও ছোট পরিসরে নিয়ে এলে দেখা যাবে, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর অধিকাংশ দেশে ধর্মীয় উগ্রতা। দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের ভেতর আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশে বেশি ও কম আকারে হলেও ধর্মীয় উগ্রতার ‘লাঠি’ দেখা যাচ্ছে। যা রাষ্ট্র ও সমাজের মানুষকে ধীরে ধীরে ধর্মীয় উগ্রতার দাস বানানোর চেষ্টা করছে। আবার রাজনীতিরও বড় অংশ ওই উগ্রতাকে ব্যবহার করে মানুষকে ‘দাস-ভোটার’ বানানোর চেষ্টা করছে। আর এর কুফলগুলো মাঝে মাঝেই এই দেশগুলোতে দেখা যাচ্ছে। এই দেশগুলোতে রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করবে যে রাজনীতি ওই রাজনীতি থেকে উদারনীতি, পবিত্রতা, সহনশীলতা, বহুত্বকে গ্রহণ করার ক্ষমতা বিদায় নিয়ে সেখানে উগ্রতা, মূঢ়তার দাসতন্ত্র স্থান নিচ্ছে ধীরে ধীরে।

আর এ অবস্থার কুফল হয়তো দুই একটা জায়গায় মোটা দাগে দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে এর কুফল অনেক গভীরে। এর কুফলে প্রতি মুহূর্তে রাষ্ট্র ও সমাজ অযোগ্য ও মূঢ়দের হাতে চলে যায়। সমাজের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে আধুনিকতার বদলে পশ্চাৎপদ চিন্তাচেতনা। একটা বিরাট অংশ মানুষ ভুলে যায় তার একটি মনোজগৎ আছে। যা তাকে প্রতি মুহূর্তে বিকশিত করতে হয়। এবং এই বিকাশ হবার ভেতর দিয়েই মানব সমাজ ও প্রগতি এগিয়ে চলে। মানুষের মনোজগৎ বিকশিত না হলে কখনোই কোনও রাষ্ট্র ও সমাজের কোনও স্তরেই শৃঙ্খলা আনা যায় না। ধীরে ধীরে ওই রাষ্ট্র ও সমাজের সব অর্জন নষ্ট হতে থাকে। কারণ, মানুষের  আধুনিক শিক্ষা, মানুষের উন্নত মনোজগৎই রাষ্ট্র ও সমাজের সব উন্নয়নকে ধরে রাখে এবং সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। পৃথিবী থেকে ডাইনোসররা হারিয়ে গেছে খাদ্যাভাবে, বিপরীতে মানুষের বহু সভ্যতা, বহু অর্জন নষ্ট হয়েছে মনোজগৎ ধ্বংস হওয়ার ফলে।       

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মিডিয়ার স্বাধীনতার সপক্ষে নোবেল

উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও মিডিয়ার স্বাধীনতার সপক্ষে নোবেল

ধর্মীয় উগ্রবাদ ঠেকাতে ফিরতে হবে ৭২-এর সংবিধানে

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২১, ১৬:১৮

লীনা পারভীন ‘আফগানিস্তানের শিয়া মসজিদে হামলায় ৪৭ জন মুসলিম নিহত হয়েছে। দায় স্বীকার করেছে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস’– এমন সংবাদ অহরহই আসছে। দু’দিন পর পর এমন হামলা হচ্ছে এবং মুসলমানরা মারা যাচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশে অনেক মানুষ আছেন, যারা সরাসরি কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে ধারণ করেন, ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে অন্য কোনও ধর্মের লোক থাকতে পারবে না। হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর ঘরবাড়ি, মন্দির ভেঙে দিচ্ছে, লুটপাট করছে। এবারের দুর্গাপূজায় যা ঘটে গেলো এরপর বাংলাদেশ আর অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের দাবিকে শক্তভাবে সামনে আনতে পারবে না।

কুমিল্লার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হলো পূজামণ্ডপ ভাঙা, লুটপাট। এ ঘটনা ছড়িয়ে পড়লো সারাদেশে। চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী, রংপুরসহ দেশের অন্যান্য জায়গায় শুরু হলো মন্দির, মণ্ডপ ভাঙা। হামলায় নিহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন।

কেন? এর পেছনের কারণ কি শুধুই ধর্মীয় বিদ্বেষ? তারা কোন ইসলাম ধর্মকে ধারণ করে এ হামলা করলো? ইসলামের কোথায় বলা আছে দুনিয়ার মাটিতে কেবল ইসলাম ধর্মের লোকেরাই থাকতে পারবে?

তর্কের খাতিরে ধরেই নিলাম যে মুসলমানেরা কেবল নিজেদের একটি পৃথিবী চায়। তাহলে আফগানিস্তানে তো হিন্দু নেই, পূজা নেই, মণ্ডপ নেই, সেখানে হামলা হয় কেন? মসজিদ তো মুসলমানদের পবিত্রতম স্থান, যেখানে গিয়ে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করা হয়। সেই মসজিদে হামলা করলো কারা? হামলাকারীর পরিচয় তো মুসলিম। এর কী ব্যাখ্যা আছে?

এর ব্যাখ্যা আসলে একটাই। এরা কেউই কোনও ধর্মকে বিশ্বাস করে না। এদের মগজে আছে কেবল হিংসা আর বিদ্বেষ। এরা মানবতা কাকে বলে জানে না। এদের পরিচয় জঙ্গি। জঙ্গিদের কোনও ধর্ম হয় না। এর প্রমাণ আমরা আফগানিস্তানের ঘটনাতেই পাচ্ছি।

তার মানে বাংলাদেশেও যারা সাম্প্রদায়িক হামলা চালাচ্ছে তারা কেউই ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে কিছু করছে না। দেশে যদি একজন হিন্দু বা অন্য ধর্মের লোকও না থাকে তাহলে দেখা যাবে এরা মুসলমানদের ওপর হামলা করছে। তখন ইস্যু আসবে কেবল মুসলমান হলেই হবে না, কে কোন বিশ্বাসের অনুসারী সেই হিসাব। ঠিক আফগানিস্তানে যা ঘটছে।

অর্থাৎ, এখানে পেশিশক্তিই হচ্ছে প্রধান হাতিয়ার। নিজেদের সংখ্যাগুরু ঘোষণা দিয়ে চলবে এসব হামলা।

তাই বলছি, জঙ্গিদের যেমন কোনও ধর্ম নেই, ঠিক তেমন তাদের কোনও নির্দিষ্ট রাষ্ট্রও নেই। রাষ্ট্র নেই, তাই রাষ্ট্রীয় নীতিকেও তারা তোয়াক্কা করে না। এরা একটি রাষ্ট্রে বসবাস করবে কিন্তু রাষ্ট্রের নিয়মনীতি বা বিশ্বাসকে পরোয়া করে না। এদের কাছে নিজেরটাই সেরা। গোটা পৃথিবীজুড়ে এখন এমন জঙ্গিবাদের জোয়ার চলছে। সেই ধাক্কায় দুলছে বাংলাদেশও।

আমি জানি না আমাদের সরকার, প্রশাসনের কর্তারা কী ভাবছেন? কেন এই জঙ্গিদের রুখে দেওয়া গেলো না। কুমিল্লার ঘটনার পর আরও হামলা হতে পারে এমন ইঙ্গিত কিন্তু ছিলই। আমরা সাধারণ মানুষও বুঝতে পারছিলাম বিষয়টি। তাহলে আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন কেন সচেতন হলো না?

জানা যায়, নোয়াখালীতে হামলার সময় পুলিশকে কাছে পাওয়া যায়নি, স্থানীয় প্রশাসন এগিয়ে আসেনি ঘটনা থামাতে। নির্বিচারে হামলা চালিয়ে চলে গেলো জঙ্গিগুলো। এর দায় কার? রাষ্ট্র কি নেবে এই দায়? নিতে তো হবেই। কারণ, এ ব্যর্থতা যে রাষ্ট্রেরই।

একটি রাষ্ট্র তৈরি হয় সব মানুষের অবদানে। এখানে কে কোন ধর্ম বা জাত, সে নারী না পুরুষ সে বিবেচনা আসে না। রাষ্ট্রের আইন তাই সবার জন্য সমান। সকল সুযোগ-সুবিধা সবার জন্য সমান থাকে। সংবিধান হচ্ছে একটি রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি। সেই সংবিধানেই বলা আছে সব নাগরিকের সমান অধিকারের কথা। তাহলে সরকার কেন সেই বিধান মানতে পারবে না? সরকার কেন একজন হিন্দুকে নিরাপত্তা দিতে পারবে না? শপথ নেওয়ার সময় তো সবার দায়িত্ব নেবে এমনটাই কথা ছিল।

প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, ধর্ম যার যার উৎসব সবার। তখন এরা কারা যখন বলে বেড়ায়, ধর্ম যার যার, উৎসবও তার তার। কাদের এত বড় সাহস যারা প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানকে উপেক্ষা করে দেশে সন্ত্রাসী হামলা চালায়? প্রশাসনের ভেতরে কারা আছে যারা নিজেদের মুসলিম দাবি করলেও জঙ্গি মানসিকতাকে ধারণ করে? কারা তারা যারা বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চায়?

জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাংলাদেশ অত্যন্ত সফলতার পরিচয় দিয়ে এসেছে। কোথায় সেই সফলতার ফসল? তলে তলে এত জঙ্গি কেমন করে জন্ম নিচ্ছে। কেবল প্রকাশ্যে এলেই আমরা দেখতে পারি কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে জঙ্গি মানসিকতার চাষ হচ্ছে তাকে রুখবে কারা? কেমন করে?

এর সমাধান একটাই। রাষ্ট্রের গা থেকে মুসলমানের তকমা সরিয়ে দেওয়া।

রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনও ধর্ম থাকতেই পারে না। রাষ্ট্র হবে উদার, গণতান্ত্রিক, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার সংরক্ষণ করতে বাধ্য রাষ্ট্র। সংবিধানকে সংশোধন করে অবিলম্বে ৭২-এর সংবিধান প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

লাল তারকার বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউজিসির দায়

লাল তারকার বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউজিসির দায়

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে ভালোবাসি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে ভালোবাসি

ফেসবুকের পক্ষপাতমূলক আচরণ কেন?

ফেসবুকের পক্ষপাতমূলক আচরণ কেন?

ঝুমন দাসের মুক্তি চাই

ঝুমন দাসের মুক্তি চাই

দায় ও ব্যর্থতা কার?

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২১, ১৯:৩৭
প্রভাষ আমিন আমাদের দেশে কোনও একটা ঘটনা ঘটলে রাজনীতিবিদদের প্রথম কাজ দায় অন্যের ঘাড়ে চাপানো। তদন্ত শুরুর আগেই তারা বলে দিতে পারেন, ঘটনাটি কে ঘটিয়েছে। এবার শারদীয় দুর্গোৎসবের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক তাণ্ডবের পরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। যথারীতি আওয়ামী লীগ এই ঘটনার জন্য দায়ী করেছে বিএনপি-জামায়াতকে। আর বিএনপি নেতারা বলছেন, জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে সরকারই এই হামলা করিয়েছে।

কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননার অভিযোগ এবং তার প্রতিক্রিয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনায় পুলিশ অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে, অনেককে গ্রেফতার করেছে। আমি পুলিশের তদন্তে আস্থা রাখতে চাই। তাই রাজনীতিবিদদের মতো চট করে কাউকে দায় দিতে চাই না। এমনিতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িক ধারার নেতৃত্ব দেয় আওয়ামী লীগ। আর সাম্প্রদায়িক ধারার মূল নেতৃত্ব বিএনপির কাঁধে। কিন্তু সবসময় সবকিছু এমন সরল হিসাবে চলে না। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করার উদাহরণও আমাদের সমাজে কম নয়।

পুলিশের তদন্তের ওপর আস্থা রাখার কথা আগেই বলেছিল। সেই আস্থার প্রতিদান তারা দিয়েছে। কুমিল্লার নানুয়ার দিঘির পাড়ের পূজামণ্ডপে কোনও সিসিটিভি ছিল না। কিন্তু আশপাশের একাধিক সিসিটিভির ফুটেজ মিলিয়ে ঘটনার ধারাক্রম তৈরি করেছে পুলিশ। তাতে ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করা গেছে। তাতে একটা বিষয় স্পষ্ট, পুরো ঘটনাটিই পরিকল্পিত এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্যই এটা করা হয়েছে। গভীর রাতে ইকবাল হোসেন নামে এক যুবক পাশের মসজিদ থেকে একটি পবিত্র কোরআন শরিফ নিয়ে পূজামণ্ডপে ঢোকে এবং হনুমানের হাতের গদাটি কাঁধে করে বেরিয়ে আসে। তার মানে এই দুর্বৃত্ত কোরআন শরিফটি হনুমানের পায়ে রেখে সেখান থেকে গদাটি নিয়ে বেরিয়ে আসে। ভোরে ইকরাম নামে একজন পূজামণ্ডপে গিয়ে কোরআন শরিফ দেখে ৯৯৯-এ ফোন করে। পুলিশ আসার পর ফয়েজ নামের একজন ফেসবুকে লাইভ করে উত্তেজনা ছড়ায়।

পুলিশ ইকরাম আর ফয়েজকে আগেই গ্রেফতার করেছে। তবে ইকবালকে এখনও ধরা যায়নি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো, আপাতত যে তিন জন এই ষড়যন্ত্রের সামনে আছে, তারা তিন জনই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। ইকবালের মা আমেনা বিবি দাবি করেছেন, তার ছেলে মানসিক ভারসাম্যহীন। তবে স্রেফ মানসিক ভারসাম্যহীন বলে তার অপরাধকে খাটো করে দেখার কোনও সুযোগ নেই। ইকবাল উন্মাদ, তবে ধর্মোন্মাদ।

ইকবালের মতো ধর্মোন্মাদরাই বারবার বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করছে। ছেলেকে মানসিক ভারসাম্যহীন বললেও আমেনা বিবি তার শাস্তি চেয়েছেন, ধরে তাকে মেরে ফেলার দাবি করেছেন। এমনকি মা হয়ে ছেলের লাশও নেবেন না বলে জানিয়েছেন। তার ছেলের কারণে দেশের বিভিন্ন জায়গার সহিংসতার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। এমন কুলাঙ্গার ছেলে জন্ম দিয়েছেন বলে নিজেকেই নিজে অভিশাপ দিয়েছেন।

‘অশিক্ষিত’ আমেনা বিবি তার সন্তানের অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হলেও আমাদের দেশের একটি মহল পুরো ঘটনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। তারা জজ মিয়া নাটকের কথা বলছেন। সিসিটিভির ফুটেজ নিয়ে সন্দেহের কথা বলছেন। তাদের এই সন্দেহের কারণ, অপরাধের দায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো যাচ্ছে না। ঘুরেফিরে মুসলিম নামধারী দুর্বৃত্তদের কাঁধেই চলে আসছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে আরও বেশি চাপে ফেলা গেলো না বলে অনেকের খুব আফসোস। আমি আগেও লিখেছি, কোনও ধর্মপ্রাণ মুসলমান এই কাজ করতে পারে না। কারণ, একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমানের পক্ষে কোনোভাবেই কোরআন অবমাননা করা সম্ভব নয়। আবার কোনও ধর্মপ্রাণ হিন্দুর পক্ষেও এটা করা সম্ভব নয়। কেউ চাইবে না নিজের বছরের সবচেয়ে বড় উৎসবটি মাটি হয়ে যাক। বিষয়টি পরিষ্কার, কিছু ধর্মোন্মাদ দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার জন্য, হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ছুতো খোঁজার জন্য এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে। এক দু’জন ব্যক্তির অপরাধের দায় আমি কখনোই কোনও সম্প্রদায়ের ওপর দিতে চাই না। সেটা হিন্দু হলেও না, মুসলমান হলেও না। ইকবাল, ইকরাম, ফয়েজ মুসলিম ঘরের সন্তান হলেও তারা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা পায়নি। তারা কোরআন অবমাননা করেছে, ইসলামকে খাটো করেছে। এরা দুর্বৃত্ত, এরা ধর্মোন্মাদ; এদের কঠিন শাস্তিই পারে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে।

পর্দার সামনের তিন কুশীলবকে চিহ্নিত করা গেলো। তাদের দু’জনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, পর্দার পেছনে আরও বড় কুশীলবরা রয়েছে। এই তিন যুবকের পক্ষেই এত বড় ঘটনার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই পেছনের কুশীলবদেরও চিহ্নিত করতে হবে, ধরতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে কেউ ধর্মের নামে সন্ত্রাস করার সাহস না পায়।

ঘটনার ধারাক্রম জানা গেলো। সামনের দায়ীদেরও পাওয়া গেলো। কিন্তু আমি ভাবছি, কুমিল্লার এই ঘটনা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের বছরের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবটি যে পণ্ড হয়ে গেলো; চাঁদপুর, চৌমুহনী, চট্টগ্রাম, পীরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মণ্ডপ-মন্দির ভাঙচুর, হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা হলো, লুটপাট হলো, অগ্নিসংযোগ হলো, নারীদের নির্যাতন করা হলো; তার দায় কে নেবে? হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের হৃদয়ে যে নিরাপত্তাহীনতার গভীর ক্ষত তৈরি হলো, তার উপশম হবে কোন উপায়ে?

মুসলমান ভাইদের প্রতি আমার জিজ্ঞাসা, কুমিল্লার ঘটনার জন্য দায়ী কে সেটা না জেনেই আপনার চিলের পেছনে দৌড়ালেন, মন্দিরে হামলা করলেন, লুটপাট করলেন; এটা কি আপনার ধর্ম অনুমোদন করে, ইসলাম ধর্ম কি কখনও অন্য ধর্মের ওপর আঘাত করাকে সমর্থন করে? আপনারা যে না জেনে না বুঝে হামলা করলেন তার জন্য কি এখন আপনাদের মনে কোনও অনুশোচনা হচ্ছে, গ্লানি হচ্ছে?

আপনারা যে ধর্মের নামে অধর্ম করে পাপ করলেন, সেটা কি আপনারা বুঝতে পারছেন? তবে পরকালের পাপ হবে, এটুকু বলেই এই ধর্মোন্মাদদের ছেড়ে দেওয়া যাবে না। যারা ফেসবুকে উসকানি দিয়েছে, যারা হামলা করেছে; তাদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করে ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

কুমিল্লার ঘটনার তিন দায়ীকে চিহ্নিত করা গেলেও দায় কিন্তু সরকারকেও নিতে হবে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ সহজাতভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থক। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়ার অপরাধে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দেশজুড়ে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে সংখ্যালঘুরা নিরাপদে থাকে, এমন ধারণা প্রচলিত আছে। কিন্তু রামু, নাসিরনগর, ভোলা, অভয়নগর, সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং সর্বশেষ শারদীয় দুর্গোৎসবের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর যে হামলা হয়েছে; তাতে সেই ধারণা অনেক দুর্বল হয়ে গেছে। প্রবল পরাক্রমশালী সরকারও সংখ্যালঘুদের পুরোপুরি নিরাপত্তা দিতে পারছে না। তাই শৈথিল্য, গোয়েন্দা ব্যর্থতার দায় সরকার এড়াতে পারবে না। কুমিল্লার ঘটনা না হয় সরকার টের পায়নি, কিন্তু কুমিল্লার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে যা হলো, সেটা প্রশাসন ঠেকাতে পারলো না কেন?

বিএনপি-জামায়াতকে সরকার রাস্তায়ই নামতে দেয় না। সেখানে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি কীভাবে মাইকে ঘোষণা দিয়ে, ফেসবুকে উত্তেজনা ছড়িয়ে হামলা চালালো? পুলিশ তাদের ঠেকাতে পারলো না কেন? কেন কুমিল্লার ঘটনার চার দিন পর রংপুরের পীরগঞ্জে হিন্দু গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া সম্ভব হলো?

সরকারি দল হিসেবে যেমন আওয়ামী লীগের দায় আছে, তেমনি সংগঠন হিসেবেও আওয়ামী লীগকে দায় নিতে হবে। এখন তো দেশে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্য। কোথাও তাদের মুখের ওপর কথা বলার মতো কেউ নেই। ছাত্রলীগ-যুবলীগের ভয়ে সবাই অস্থির। কুমিল্লা, হাজীগঞ্জ, চৌমুহনী, পীরগঞ্জ– যেসব জায়গায় হামলা হয়েছে, সব জায়গায় আওয়ামী লীগের একক আধিপত্য। তাহলে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ সেখানে প্রতিরোধ গড়তে পারলো না কেন? ঘটনা সব শেষ হয়ে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগের সম্প্রীতি সমাবেশ আসলে সান্ত্বনা পুরস্কারের মতো।

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। ভোটের হিসাব-নিকাশ বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগকে অবশ্যই সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়তে হবে। সরকারকে জিরো টলারেন্সে সব সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিচার করতে হবে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ তো বটেই, সব মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
 
লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগারের ঘাটতি!

আওয়ামী লীগে আওয়ামী লীগারের ঘাটতি!

মানুষ কেন বিএনপিকে ভোট দেবে?

মানুষ কেন বিএনপিকে ভোট দেবে?

ক্ষোভের আগুনে পুড়ুক সব অনিয়ম

ক্ষোভের আগুনে পুড়ুক সব অনিয়ম

২১ হাজার কোটি টাকা ‘জানের সদকা’!

২১ হাজার কোটি টাকা ‘জানের সদকা’!

রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২১, ১৭:১৫

আবদুল মান্নান বুধবার এই লেখাটি যখন লিখতে বসেছি তখন বাংলাদেশে তিনটি প্রধান ধর্মের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিন। মুসলমানের ঈদে মিলাদুন্নবী (ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মদিন), সনাতন ধর্মাবলম্বীদের লক্ষ্মীপূজা আর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের প্রবারণা পূর্ণিমা। সাধারণত, এমনটি সব সময় হয় না। দুই-একদিন আগে পিছে হয়। এবার এমন একসময় এই তিন ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান একই দিনে হলো, যখন গত কয়েক দিনে শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কিছু সহিংস ঘটনা ঘটে গেছে। এই সহিংস ঘটনায় কয়েকটি স্থানে সাধারণ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সম্পদ নষ্ট হয়েছে, দিনে আনে দিনে খায় এমন কিছু মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছে, আর দেশের অনেক স্থানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মনে ভয় ঢুকে গেছে। মাঝে মধ্যে ছোটখাটো বিচ্ছিন্ন দু’একটা ঘটনা ঘটলেও তা সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্কতার কারণে তেমন একটা বেশিদূর গড়ায়নি। এবার তার কিছু ব্যতিক্রম দেখা গেলো। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসন  যদি আরও একটু সচেতন হতো তাহলে এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা ছিল না। তারা হয়তো বুঝতে পারেনি এমন একটি ঘটনা ঘটানোর জন্য একটি মহল দীর্ঘদিন পরিকল্পনা করেছে এবং শারদীয় দুর্গোৎসব শুরু হলে তাদের এই ধরনের অমানবিক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করেছে। টার্গেট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর তাঁর সরকারকে বিতর্কিত করা এবং আরও সুস্পষ্টভাবে বলতে গেলে বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে যে সুসম্পর্ক বর্তমানে আছে তা প্রশ্নবিদ্ধ করা। তারা ভুলে গেছে ভারতে প্রায় ২১ কোটি মুসলমান বাস করে এবং এই দুর্বৃত্তদের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের কারণে ভারতে বসবাসরত মুসলমানরা বিপদে পড়তে পারে।  ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন এসব সহিংস ঘটনার পেছনে যারাই আছে বা যারা ঘটিয়েছে তাদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচারের মাধ্যমে শাস্তির বিধান করার জন্য।

সরকারি হিসাব মতে, বাংলাদেশে এই বছর ৩২ হাজার ১১৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছিল, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দুই হাজারটি বেশি। কোনও কোনও সূত্রমতে এবার মোট দুর্গাপূজার সংখ্যা প্রায় ৩৮ হাজার। বিভিন্ন স্থানে মন্দিরে এই পূজার ব্যবস্থা তো হয়েছিলই, তবে তার চেয়ে বেশি হয়েছে অস্থায়ী মণ্ডপে। প্রধানমন্ত্রী নিজ তহবিল হতে তিন কোটি টাকা দিয়ে এসব পূজায় অর্থ সহায়তা দিয়েছেন। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে শত শত বছর ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করেছে, একে অপরের অনুষ্ঠানের আনন্দ উপভোগ করেছে। একসঙ্গে দেশকে মুক্ত করার জন্য একাত্তরে যুদ্ধ করে রক্ত ঝরিয়েছে।  কে হিন্দু আর কে মুসলমান তা কখনও বিচার্য ছিল না।

১৯৬৪ সালে যখন ভারতের কাশ্মিরের হজরত বাল মসজিদ হতে হজরত মুহাম্মদ(সা.)-এর কেশগুচ্ছ চুরি হয়ে গিয়েছিল বলে খবর রটে, তখন এই দেশে কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ তাকে কেন্দ্র করে অশান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তারা সফল হয়নি। ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’ এই ব্যানার নিয়ে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল এবং তার নেতৃত্ব দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। বাবরি মসজিদ ভাঙার পরও এই মহলটি আবার অশান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছিল, তবে জনগণের প্রতিরোধের মুখে তারা তেমন সফল হয়নি।

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে। দেশটির ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রের যে চারটি মৌলিক স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল তার অন্যতম ছিল ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’। দেশটির প্রবাদ পুরুষ ও যার নেতৃত্বে দেশটি স্বাধীন হয়েছিল সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সাড়ে তিন বছরের শাসনকালে বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ করে মানুষকে বুঝিয়েছিলেন ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র অর্থ ‘ধর্মহীনতা’ নয়। এর অর্থ যার যার ধর্ম সে সে শান্তিতে পালন করবে, রাষ্ট্র সেখানে কোনও হস্তক্ষেপ করবে না আর রাষ্ট্র কোনও ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতাও করবে না। শেখ মুজিবকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করার পর কয়েক সপ্তাহের মাথায় সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান জেনারেল জিয়া ক্ষমতায় আসেন। তিনি প্রথমে যে কাজটি করেন তা হচ্ছে সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র ধারাটি তুলে দেন। বলেন, একটি মুসলমান প্রধান দেশে এটি বেমানান। ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মাশ্রিত দলগুলো, যেমন- মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, পিডিপি প্রভৃতি দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। কারণ, এই দলগুলো মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছে। জিয়া বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চার দোহায় দিয়ে এসব দলকে আবার রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। নিজে গঠন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। সেখানে এসব একসময়ের নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীদের আশ্রয় দেন। বিএনপি’র রাজনীতির প্রধান মূলধন ছিল ভারত বিরোধিতা আর সাম্প্রদায়িকতা।

১৯৮১ সালে জেনারেল জিয়া এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হলে দলটির হাল ধরেন তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি তাঁর স্বামীর চেয়েও বেশি উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও ভারত বিরোধিতার আশ্রয় নেন। নির্বাচন এলেই বলতেন আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে মসজিদে আজানের পরিবর্তে উলুধ্বনি পড়বে।

২০০১ সালে নির্বাচনে জিতে তিনি তাঁর মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দিয়েছিলেন একাত্তর সালে যারা সরাসরি পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল সেই জামায়াতে ইসলামের দুই শীর্ষ নেতাকে। বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী (বর্তমানে প্রয়াত) সংসদে বলেছিলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা করা বাংলাদেশের নৈতিক দায়িত্ব। বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির অভিযোগে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তাঁর স্থলে বর্তমানে লন্ডনে পলাতক বেগম জিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তিনি শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টা ও ভারতে অস্ত্র পাচারের অভিযোগে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত। লন্ডনে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন।

শারদীয় দুর্গোৎসবকে নিয়ে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সহিংসতাটি ছিল সম্পূর্ণভাবে পূর্ব পরিকল্পিত। ঘটনার সূত্রপাত সপ্তমীর দিন। কুমিল্লায় একটি অস্থায়ী পূজামণ্ডপের বাইরে স্থাপিত একটি ছোট প্রতিমার কোলের ওপর ভোরের আলো ফোটার আগেই কে বা কারা মুসলমানদের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কোরআন রেখে মোবাইলে তার ছবি ধারণ করে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয় আর বলে ‘শেখ হাসিনার শাসনকালে এই দেশে ইসলাম ধর্মও এখন নিরাপদ নয়’। অথচ কোনও পাগলও বিশ্বাস করবে না এই কাজ কোনও সনাতন ধর্মাবলম্বী করতে পারে। ভোরের আলো ফোটার পরপরই সেখানে জড়ো হয় কয়েকশ’ জামায়াত কর্মী আর ছিন্নমূল বস্তিবাসী। যদিও খবর পেয়েই স্থানীয় পুলিশ সেই কোরআনের কপি নিজেদের হেফাজতে নিয়ে নিয়েছিল। বিএনপি গত কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নাশকতা কার্য পরিচালনা করার জন্য জামায়াতের সন্ত্রাসী বাহিনী ছাত্রশিবিরকে ব্যবহার করে। এই ঘটনার দু’দিন পর শুক্রবার মুসলমানদের পবিত্র জুমার দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুমিল্লার ঘটনা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া হলো। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে  অনেক জায়গায় ভুয়া ছবিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করা হয়েছে এই অজুহাতে এর ফলে বেশ কয়েক জায়গায় পূজামণ্ডপ আর মন্দিরে হামলা করে ভাঙচুর করা হয়। এমনকি পূজার দুই-তিন দিন পরেও অনেক স্থানে দোকানপাট ও বসতবাড়িতে হামলা করা হয় এবং কোনও কোনও স্থানে অগ্নিসংযোগ করা হয়।  শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে এমন ঘটনা বাংলাদেশে এই প্রথম। দুর্ভাগ্যবশত প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা অথবা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী সময় মতো বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেনি। পারলে যে ঘটনা কুমিল্লায় শুরু হয়েছিল তা সেখানেই শেষ হয়ে যেত।

এটি ধারণা করার যথেষ্ট কারণ আছে ষড়যন্ত্রটা শুরু হয় বেশ কয়েক দিন আগে। এর আগে বিএনপি সাংগঠনিক সভার আড়ালে ছয় দিন রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছে, যেখানে লন্ডন থেকে তাদের ভারপ্রাপ্ত পলাতক চেয়ারম্যান তারেক রহমানও ভার্চুয়ালি যোগ দিয়েছিল। সপ্তম দিনে তাদের মতাদর্শে দীক্ষিত কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গেও তারেক সভা করেছে। এটি এখন পরিষ্কার যে, যদিও বলা হচ্ছে এটি ছিল সাংগঠনিক সভা, আসলে এটি ছিল ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনে জেতার কর্মকৌশল নির্ধারণ করা এবং তার আগে বর্তমান সরকার ও শেখ হাসিনাকে বিব্রত করা। এটি বুঝতে প্রশাসনের সময় লেগেছে। সাধারণত, কোনও রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক সভা সাত দিনব্যাপী হয় না।

গত কয়েক দিন সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক সংগঠন, ছাত্র জনতা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক,আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, প্রগতিশীল সুশীল সমাজ রাস্তায় নেমেছে, ঘটনার প্রতিবাদ করেছে। বলেছে রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ।  মিছিল ও সমাবেশ করেছে, ইতোমধ্যে প্রায় চারশত পঞ্চাশ জনকে বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যারা এই সন্ত্রাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার  জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। মন্দিরসহ যেসব স্থাপনায় ভাঙচুর করা হয়েছে তা মেরামত করার জন্যও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এটা ঠিক, বিএনপি বা তার সমমনা দলগুলো আগামীতেও এই ধরনের নাশকতা চালাতে পারে। কারণ, সামনের নির্বাচনে তাদের ক্ষমতায় যাওয়া চাই। পাঠকদের মনে আছে, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে বিএনপি ও জামায়াত মিলে দেশে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল তাতে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। পেট্রোলবোমায় প্রায় ১৬৬ জন  নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল,সরকারি সম্পদের ক্ষতি হয়েছিল কমপক্ষে তিনশ’ কোটি টাকার। এই সহিংসতা পরিচালনা করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন স্বয়ং বিএনপি প্রধান বেগম জিয়া। নব্বই দিন তিনি গুলশানের নিজ দফতরে থেকে এই সহিংসতা পরিচালনা করেছিলেন।

এখনও সেই ধারাবাহিকতায় বিএনপি’র কর্মকাণ্ড চলছে। দৃষ্টি ২০২৩ সালের সাধারণ সংসদ নির্বাচন।  যদিও এই মুহূর্তে নেতৃত্ববিহীন এই দলটির ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ, বিশেষ করে যখন দেশটির অর্থনীতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবার চেয়ে এগিয়ে আর বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। যখন দুর্বৃত্তরা দেশের কোনও কোনও জায়গায় এই ধরনের সহিংসতায় লিপ্ত তখন উত্তরবঙ্গের লালমনিরহাটে একই প্রাঙ্গণে মসজিদ আর মন্দিরের সহ-অবস্থানের ছবি দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। মন্দিরে বেশ নির্বিঘ্নে দুর্গোৎসবও হয়েছে।  বাস্তবে সত্তরটির মতো পূজামণ্ডপে সহিংসতা হয়েছে বাকি পূজামণ্ডপগুলোতে পূজা যথাযথভাবে চলেছে, সময় মতো বিসর্জন হয়েছে। অনেক স্থানে এলাকার মানুষ রাত জেগে মন্দির, পূজামণ্ডপ পাহারা দিয়েছে। এটাই তো মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ।

শেখ হাসিনা প্রায় বলেন ‘ধর্ম যার যার উৎসব সভার’। এর চেয়ে সম্প্রীতির স্লোগান আর কী হতে পারে। সব শেষে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি বাণী দিয়ে লেখাটি শেষ করি। তিনি তাঁর বিদায় হজের ভাষণে বলেছিলেন, ‘সাবধান! ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ির ফলেই অতীতে বহু জাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে’।  এর আগে সংগঠিত এমন সহিংস ঘটনাগুলোর বিচার হলে হয়তো এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতো না। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, গত কুড়ি বছরে এ ধরনের কোনও সহিংস ঘটনার এখন পর্যন্ত বিচার হয়নি।  এবার হবে আশা করি।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বিএনপি’র ক্ষমতায় যাওয়া না যাওয়া

বিএনপি’র ক্ষমতায় যাওয়া না যাওয়া

আবার ঘণ্টা বাজবে স্কুলে, ক্লাসে ফিরবে শিক্ষার্থীরা

আবার ঘণ্টা বাজবে স্কুলে, ক্লাসে ফিরবে শিক্ষার্থীরা

তালেবানের আফগানিস্তান পুনর্দখল ও নতুন আতঙ্ক

তালেবানের আফগানিস্তান পুনর্দখল ও নতুন আতঙ্ক

বাংলাদেশ কি করোনা যুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের কাছেও হেরে যাচ্ছে?

বাংলাদেশ কি করোনা যুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের কাছেও হেরে যাচ্ছে?

এই দুঃখ কোথায় রাখি?

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২১, ০০:০০

মুহম্মদ জাফর ইকবাল ১.
কয়দিন থেকে আমার নিজেকে অশুচি মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি বুঝি আকণ্ঠ ক্লেদে নিমজ্জিত হয়ে আছি। শুধু আমি নই, এই দেশে আমার মতো অসংখ্য মানুষের একই অনুভূতি, মনে হচ্ছে জাতির একটি বড় একটি অংশ বিষণ্ণতায় ডুবে আছে।

কারণটি নিশ্চয়ই সবাই বুঝতে পারছেন। যে দুর্গাপূজাটি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় আনন্দোৎসব হওয়ার কথা সেটি এবারে সবচেয়ে বড় তাণ্ডবের কেন্দ্রস্থল। আমি যে এটিকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে নিজেকে সান্ত্বনা দেবো সেটিও করতে পারছি না। কুমিল্লা থেকে শুরু হয়ে এটি শুধু কুমিল্লায় থেমে থাকেনি, বলতে গেলে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। যার অর্থ সারা দেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক মানুষ রয়েছে, তারা লুকিয়ে নেই, তারা প্রকাশ্যে আছে, বুক ফুলিয়ে আছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ বছরে এই দেশে ৩৬৮৯ বার হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পর হামলা হয়েছে। যারা সংখ্যাটি কত ভয়ানক অনুভব করতে পারছেন না তাদের অন্যভাবে বলা সম্ভব, এই দেশে গড়ে প্রতিদিন একবার কিংবা তার বেশি দেশের কোথাও না কোথাও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা হয়েছে! এটি হচ্ছে প্রকাশিত তথ্যের কথা, প্রকৃত সংখ্যা আসলে আরও বেশি। এই দেশটি আমরা যেভাবে গড়ে তুলবো বলে স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা সেভাবে গড়ে ওঠেনি। এই দেশের শতকরা দশভাগ হিন্দু ধর্মাবলম্বী, যদি তাদের জিজ্ঞেস করা হয় তারা কেমন আছেন, তাদের কেউ কী বলবেন ভালো আছেন? একটা দেশ কেমন চলছে সেটা বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে সেই দেশের সংখ্যালঘুদের জিজ্ঞেস করা তারা কেমন আছে। তারা যদি বলে ভালো নেই তাহলে বুঝতে হবে দেশটি ভালো নেই।

সেজন্য আসলে আমরাও ভালো নেই। আমি ক’দিন থেকে আমার হিন্দু ধর্মাবলম্বী বন্ধুদের সাথে কথা বলতে সাহস পাচ্ছি না। তীব্র এক ধরনের লজ্জা এবং অপরাধবোধে ভুগছি। সাম্প্রতিক ঘটনার কারণে এই বিষয়টি নতুন করে সবার সামনে এসেছে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে এটি প্রথমবার হয়েছে, কিংবা এটি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিংবা কেউ কেউ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এটি হঠাৎ করে ফেলেছে। এই ভয়ংকর সাম্প্রদায়িকতা এখানে বহুদিন থেকে শিকড় গেড়েছে, আমরা কেউ কেউ নিজেদের মিথ্যা সান্ত্বনা দিয়ে এর অস্তিত্ব অস্বীকার করার চেষ্টা করছি, কেউ কেউ এটাকে খাটো করে দেখার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমরা যে আসলে আকণ্ঠ ক্লেদে নিমজ্জিত, কেন আমরা সেই সত্য অস্বীকার করার চেষ্টা করি? কেন ভাণ করি সবকিছু ঠিক ঠিক চলছে? বিষয়টির একটু গভীরে গেলেই আমরা টের পাই সবকিছু ঠিক ঠিক চলছে না। যে দুর্গাপূজায় একটি হিন্দু শিশুর আনন্দে আত্মহারা থাকার কথা, কেন সেই দুর্গাপূজায় শিশুটির বুকে ভয়ের কাঁপুনি? আমরা কেন এই শিশুদের বুকে আগলে রক্ষা করতে পারি না?

২.

যখন পূজার সময় আসে, সারা দেশে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু হয়, তখন থেকে আমি নিজের ভেতর এক ধরনের চাপা অশান্তি অনুভব করি। অবধারিতভাবে খবর পাই দেশের এখানে সেখানে সেই প্রতিমা ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। যখন পূজা শুরু হয় তখন আমি নিশ্বাস বন্ধ করে থাকি, যারা শোলাকিয়া ঈদের জামাতেও বোমা মারতে প্রস্তুত তারা পূজার অনুষ্ঠানে না জানি কী করার চেষ্টা করে। যখন সবকিছু শেষ হয় আমি শান্তির নিশ্বাস ফেলি।

আমার মতো অতি সাধারণ একজন নাগরিকের ভেতর যদি পুরো ব্যাপারটা নিয়ে এক ধরনের চাপা অশান্তি থাকে তাহলে কী এই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই সময়টিতে ঘুম নষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা নয়? দুঃখটা আমার এখানে, আমি জানি তারা চাইলেই একটা তাণ্ডব থামাতে পারে। আজকাল এই দেশের পুলিশ বাহিনী অনেক করিৎকর্মা, আমার হিসাবে এই বিষয়গুলো তারা আমাদের থেকে আরও অনেক ভালো করে জানে। তাই কুমিল্লার অবাস্তব ষড়যন্ত্রটির খবর ভোর সাতটার সময় পাওয়ার পরও বেলা ১১টায় তাণ্ডব শুরু হতে দেওয়ার ঘটনাটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। বিশেষ করে যখন আমরা জানতে পেরেছি ভোরবেলা থেকে ওসি স্বয়ং সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এই দেশে আগে অনেকবার এরকম ঘটনা ঘটেছে। কাজেই বিষয়গুলো কীভাবে দানা বাঁধে তা এখন আর কারও জানতে বাকি নেই। আফগানিস্তানে তালেবানদের বিজয়ের পর এই দেশের ধর্মান্ধ গোষ্ঠী যে নতুন করে উজ্জীবিত হয়ে আছে সেটি তো কারও অজানা নয়। পাকিস্তান, আফগানিস্তানে শুক্রবারে জুমার নামাজে বোমা হামলা প্রায় নিয়মিত ঘটনা। আমাদের দেশেও কোনও একটা ধর্মান্ধ ষড়যন্ত্র দানা বাঁধলেও যে শুক্রবার জুমার নামাজের পর তার একটা শোডাউন হয় সেটাও তো আমরা বহুকাল থেকে দেখে এসেছি। কমন সেন্সের এতগুলো বিষয় আমরা সবাই জানি কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানে না, এবং সেভাবে প্রস্তুতি নিতে পারে না, এটা আমরা কীভাবে বিশ্বাস করি? হতদরিদ্র একজন জেলের সহায় সম্পদ সবকিছু পুড়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্র যদি নতুন করে তার ঘরবাড়ি তৈরি করেও দেয়, তারপরেও কী তার বুকের ভেতরের যে আতঙ্ক, হতাশা, দুঃখ, কষ্ট এবং অসহায় অভিমানের জন্ম হয়, আমরা কী তার এক বিন্দুও দূর করতে পারবো? এই দেশের নাগরিক হয়ে শুধু নিজের ধর্মের কারণে তাদের একটি অসহায় আতঙ্কে জীবন কাটাতে হবে, সেটি কেমন করে মেনে নেওয়া যায়?

এখানে রাষ্ট্রের অনেক বড় দায়িত্ব, কিন্তু আমরা যখন রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত বড় বড় রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য শুনি তখন এক ধরনের হতাশা অনুভব করি। কিছু একটা ঘটলেই তারা চোখ বন্ধ করে মুহূর্তের মাঝে বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর দোষ চাপিয়ে ঝাড়া হাত-পা হয়ে যান। যদি এর মাঝে সত্যতা থাকেও তাদের এই ঢালাও রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে সেটি তার নিজের দলের মানুষও আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে বলে মনে হয় না। সাধারণ মানুষ তখন অনুমান করে নেয় রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রনেতারা এই সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তরিক নয়, হয়তো তারা এটাকে একটা রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে দেখিয়ে তার থেকে কোনও একটা সুবিধা নিতে চান। অথচ মূল কথাটি খুবই সহজ, কেন এটি ঘটেছে তার খুব ভালো একটা ব্যাখ্যা জেনে কোনও লাভ নেই, ঘটনাটি না ঘটলে অনেক লাভ আছে।

একটা সমস্যা সমাধান করতে হলে সবার আগে মেনে নিতে হয় যে, সমস্যাটা আছে। তারপর সমস্যাটা বুঝতে হয় তাহলে নিজ থেকেই সমস্যা সমাধানের পথ বের হয়ে যায়। আমরা যদি সমস্যাটাই অস্বীকার করি তাহলে সেটা সমাধান করবো কেমন করে? কিছু দুর্বৃত্ত হঠাৎ এটা করে ফেলেছে বললে সমস্যাটাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়। সেই দুর্বৃত্তরা যে এখানে তাদের কাজকর্মের জন্য একটা অভয়ারণ্য পেয়েছে সেটি তো সবার আগে স্বীকার করে নিতে হবে।

এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার, স্বাভাবিকভাবেই তাদের ওপর আমাদের দাবি অনেক বেশি। হেফাজতের হুমকি শুনে পাঠ্যবইয়ের সাম্প্রদায়িক পরিবর্তন আমাদের চরমভাবে হতাশ করেছিল, কাজেই দেশের এই সাম্প্রদায়িক রূপটিকে ঠিক করার ব্যাপারে তাদের কতটুকু সদিচ্ছা আছে সেটা নিয়ে আমাদের কারও কারও ভেতরে যদি এক ধরনের দুর্ভাবনা থাকে, কে আমাদের দোষ দিতে পারবে?

৩.

আমি আজন্ম আশাবাদী মানুষ। জীবনের চরম দুঃসময়েও আশায় বুক বেঁধে অপেক্ষা করেছি এবং দেখেছি একদিন আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। কাজেই এবারও আমি আশাবাদী থাকতে চাই, স্বপ্ন দেখতে চাই যে এই দেশটি থেকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ একদিন শিকড়সহ উৎপাটন করে ফেলা হবে। তবে এটি এমনি এমনি শুধু মুখের কথায় হবে না, তার জন্য কাজ করতে হবে। আমার হিসাবে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন এটি।

আমি আমার জীবনে যে কয়টি সত্য আবিষ্কার করেছি তার একটি হচ্ছে পৃথিবীর সৌন্দর্য  হচ্ছে বৈচিত্র্যে। একটি দেশে যখন নানা বর্ণের, নানা কালচারের, নানা ধর্মের, নানা ভাষার মানুষ পাশাপাশি থাকে, একে অন্যের সাহচর্যে সুখে দুঃখে বড় হয়, সেটি হচ্ছে সত্যিকারের সৌন্দর্যময় জীবন। আমাদের দেশের মানুষের মাঝে বৈচিত্র্য খুব কম, কাজেই আমাদের জীবনধারায় যেটুকু বৈচিত্র্য আছে সেটাই আমাদের বুক আগলে রক্ষা করতে হবে, আমাদের শিশুদের সেটা শিখাতে হবে। নিজ ধর্মের বিধিবিধান শেখার আগে তাদের অন্য ধর্মের সৌন্দর্যের কথা জানতে হবে, যেন তারা সব ধর্মের জন্য এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে বড় হয়।

এই দেশের মানুষ ঐতিহ্যগতভাবে উগ্র মানসিকতার নয়, জীবনের কোনও ক্ষেত্রেই তারা বাড়াবাড়ি পছন্দ করে না। সারা পৃথিবীর ধর্মান্ধতার উত্থানের ঢেউ এখানেও এসেছে এবং কিছু মানুষ সেটি ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। ফেসবুক নামে ‘মানসিক বর্জ্য ক্লেদ সংরক্ষণ ও বিতরণ’-এর যে পদ্ধতি বের হয়েছে সেটি ব্যবহার করে যেটি আগে কখনও সম্ভব হয়নি এখন সেটিও করে ফেলা যাচ্ছে। যে মানুষটির কথাকে আগে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ ছিল না, এখন সেই মানুষটি তার ভয়ানক আপত্তিকর বক্তব্য সবাইকে শোনাতে পারছে, শুধু তা-ই নয়, দ্রুততম সময়ে দুর্বৃত্তদের একত্র করে একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলছে। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই এটি অনেক বড় একটি সমস্যা। পৃথিবীর অন্য দেশ কী করবে জানি না, কিন্তু আমাদের দেশে আমাদের প্রয়োজনে এর একটা সমাধান এখন খুব দরকার। শুধু তা-ই নয়, একসময় যেকোনও সাম্প্রদায়িক সমস্যা হলে সব রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক সংগঠন, ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষক পথে নেমে আসতো, এখন সবাই ফেসবুকে একটা বক্তব্য দিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করে ফেলতে চায়।

আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন এ দেশের গ্রামে গ্রামে যেটুকু সংস্কৃতির চর্চা ছিল এখন সেটি নেই। বাসায় বাসায় হারমোনিয়ামে শিশুর গলায় গান শোনা যায় না, রাত জেগে কেউ যাত্রা কিংবা পালাগান শুনতে যায় না। মাঝ নদী থেকে মাঝির গলায় ভাটিয়ালি গান শুনি না, স্কুলে স্কুলে কিংবা পাড়ার ছেলেমেয়েরা হ্যাজাক লাইটের আলোতে জরির কাপড় পরে সিরাজদ্দৌলার নাটক করে না। মাঠে রঙিন জার্সি পরে তুমুল উত্তেজনায় ফুটবল খেলা হয় না। নদীতে নৌকা বাইচ হয় না। বাউল হওয়া এখন অনেক সময় অপরাধ, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এক কথায় আমরা আগে যেটুকু বাঙালি ছিলাম এখন আমরা আর সেই বাঙালি নেই। আমাদের সংস্কৃতির জগতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে সেই তা দ্রুত পূরণ করতে আসছে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী।

কাজেই এখন ভাবনা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিয়ে আবার আমাদের বাঙালি হওয়ার সময় এসেছে। একসময় বাঙালি হয়ে আমরা আমাদের ভাষাটিকে পেয়েছিলাম, তারপর আবার বাঙালি হয়ে দেশটিকে পেয়েছিলাম। এখন আবার বাঙালি হয়ে সেই দেশকে অসাম্প্রদায়িক করার সময় এসেছে।

লেখক: শিক্ষাবিদ ও লেখক।

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

‘টিকা’ টিপ্পনী

‘টিকা’ টিপ্পনী

শুভ জন্মদিন, নির্মূল কমিটি

শুভ জন্মদিন, নির্মূল কমিটি

আমাদের আয়শা আপা

আমাদের আয়শা আপা

২০২০, আমাদের মুক্তি দাও

২০২০, আমাদের মুক্তি দাও

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

প্লে-স্টোরের সাবস্ক্রিপশন ফি অর্ধেক করছে গুগল

প্লে-স্টোরের সাবস্ক্রিপশন ফি অর্ধেক করছে গুগল

ফের বাড়লো চালের দাম

ফের বাড়লো চালের দাম

প্রায় দুই বছর পর তেহরানে জুমার নামাজ

প্রায় দুই বছর পর তেহরানে জুমার নামাজ

চট্টগ্রামে গ্রেফতার আমাদের নেতাকর্মীরা পূজামণ্ডপে হামলায় জড়িত নয়: নুর

চট্টগ্রামে গ্রেফতার আমাদের নেতাকর্মীরা পূজামণ্ডপে হামলায় জড়িত নয়: নুর

শিশির নয়, অজিদের মনোযোগ পাওয়ার প্লেতে

শিশির নয়, অজিদের মনোযোগ পাওয়ার প্লেতে

বিদেশি শ্রমিকদের ওপর আংশিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার মালয়েশিয়ার

বিদেশি শ্রমিকদের ওপর আংশিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার মালয়েশিয়ার

৩১ জেলায় শনাক্ত হয়নি কেউ

৩১ জেলায় শনাক্ত হয়নি কেউ

সালিশে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে সিএনজিচালক নিহত

সালিশে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে সিএনজিচালক নিহত

পানি কমলেও দুর্ভোগ কমেনি বানভাসি মানুষের

পানি কমলেও দুর্ভোগ কমেনি বানভাসি মানুষের

জনগণকে প্রতিমুহূর্তে বিভ্রান্ত-বিভাজনের চেষ্টা করছে সরকার: ফখরুল 

জনগণকে প্রতিমুহূর্তে বিভ্রান্ত-বিভাজনের চেষ্টা করছে সরকার: ফখরুল 

আসামে রকেট সিস্টেম বসাচ্ছে ভারত

আসামে রকেট সিস্টেম বসাচ্ছে ভারত

১৪ বছর পর প্রথম বিজ্ঞাপন!

১৪ বছর পর প্রথম বিজ্ঞাপন!

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune