X
মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১, ৬ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

সম্পর্ক; আপন-পর

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২১, ০৬:০৩

কিসের কাউয়্যা ক্যাচাল বউ, ঐ যে—ওটি; দেকিস ন্যা, তামান মানুষ খালি জড়ো হতিচে! অ্যালা মাইঁ, বিয়ানা থাকি খালি মা-নু-ষ আর মানুষ। কথাগুলো বলতে বলতে হরিপদর মা জটলার দিকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকে। সকাল থেকে কালীপ্রসন্নের উঠানে যে জটলাটি পেকেছে তার কারণ জানতে হরিপদর মায়ের চোখ যেন আর সরতে চায় না। একজোড়া চোখ সকাল থেকে চাতক পাখির মতো তাকিয়ে আছে জটলাটির দিকে। অথচ, দুবাড়ি পরেই জটলাটি, চাইলেই কয়েক কদম হেঁটে যাওয়া যায়। তবুও কাছে যেতে মন চায় না মধুবালার; ভয়ে। ঘর পোড়া গরু বলে কথা, সিঁদুরে মেঘ তো ভয়ের জন্ম দেবেই দেবে!

গেল বছরের কথা।। মনে আছে তার। মনে আছে সবটুকু, এতটুকুও ভোলেনি মধুবালা। কই আর বেশি দিন! আজ আষাঢ়ের আঠারো দিন যায়, গেল আষাঢ় ঠিক না... ভাদরের মাঝামাঝিই হবে, সামাদ মোল্লা যেদিন মার্ডার হয়—ঐ দিন। সেদিনও এরকম একটি জটলা পেকেছিল সামাদ মোল্লার উঠানে। চারদিক থেকে সেকি মানুষের ঢল, মানুষ আর মানুষ! এর-ওর মুখ হয়ে চারদিকে যেন শোরগোল পড়ে যায় ‘সামাদ মোল্লা মাডার হচে গো হায় হায় হায়।’

জটলায় উপস্থিত ছেলে-বুড়ো, আবাল-বনিতারা কানা-ঘুষা করে! কেউ কেউ আবার বিস্তারিত জানার আশায় এর-ওর কাছে প্রশ্ন করেও চলে একের পর এক, ক্যাংকা করি হলো বাহে?... কেটা.. কেটা মাল্লো বাহে?... অ’রে ছোটোটা! ...অ্যালা অ্যালা এটা ক্যাংকা কতা... হাতির নাকান এটা মাইনষোক্ বলে এক বাড়ি দিয়্যাই মারি ফ্যালাচে!—এরকম আরও অনেক কথা যখন আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হতে থাকে ঠিক তখনই হরিপদ এসে উপস্থিত হয় সামাদ মোল্লার উঠানে। কারও সাথে কোনো কথা বলেনি হরিপদ। তার অতি উৎসাহী চোখদুটি মানুষের ভিড় ঠেলে যখন সোজা গিয়ে উপস্থিত হয়েছে বাড়ির ভিতর, তখন সামাদ মোল্লার সটান পড়ে থাকা রক্তমাখা শরীর দেখে হরিপদও শিউরে উঠেছে। শত শত মানুষের ভিড়ে বারবার আঁতকে উঠেছে হরিপদর শরীর-মন। ভয়ে শক্ত হয়েছে তার শরীরের সমস্ত মাংশপেশি; ক্রমাগত অসহায়ও হয়েছে হরিপদর বোধ। অথচ, সেই সময় নিজের ভয় কাটাতে কোনো ব্রহ্মা কিংবা ভোলানাথের কথা স্মরণ করেনি হরিপদ। শুধু নিকটে মায়ের অনুপস্থিতিটুকুই উপলব্ধি করেছে বারংবার। চৌদ্দ-পনেরো বছরের বালকের কাছেও যে ঈশ্বর অপেক্ষা মায়ের অনুপস্থিতি অধিক দুর্ভোগের জন্ম দেয়!

২.

হরিপদ যখন শক্ত মাংশপেশি নিয়ে লাশের পাশে দাঁড়ানো, তখন মধুবালা ছিলো বাড়িতে। প্রতিদিনের মতো দুপুরের ধোয়া-মোছা আর রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলো মধুবালা; সেদিন তার মুড়ি ভাজা এবং মোয়া বানানোর মতো কাজ-বাজও তেমন ছিলো না। অন্য সবার মতো মধুবালাও শুনেছে সামাদ মোল্লা মার্ডার হওয়ার খবর। একলা সংসার, বাড়ির কাজের কথা ভেবে যেতে পারেনি মধুবালা। তবে ঠিক করে রেখেছে কাজ-বাজ শেষ করে একপাক ঘুরে আসবে সামাদ মোল্লার বাড়ি থেকে। গ্রামে এত বড় একটি লঙ্কাকাণ্ড ঘটে যাবে আর মধুবালা দেখতে যাবে না, তা তো হয় না! মধুবালা যাবেই যাবে। এমন লঙ্কাকাণ্ডে না গেলে, দু-চার কথার জাবর না কাটলে, মধুবালাদের তো বড়সড় অপরাধী মনে হয় নিজের কাছে!

সেদিন দ্রুত কাজ-বাজ শেষ করেছিলো মধুবালা। ঘরের দরজায় ছিটকানি আটকিয়ে সামাদ মোল্লাকে দেখতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে যখন বাড়ির বাইরে আসছিলো মধুবালা, এমন সময়, কালীপ্রসন্নের ছোট ভাই নগেনের বউ মালতি, চিৎকার করে মধুবালাকে ডাকতে ডাকতে বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়। কিছু বলবার আকুতি নিয়ে অনেকটা পথ দৌড়ে এসেছিলো মালতি, উত্তেজনার সাথে হাঁপিয়েও উঠেছিলো খুব। মধুবালা মালতিকে আঙিনায় পিঁড়ি পেতে দিয়ে স্থির হতে বলে। কল থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এনে দিয়ে মনে আগ্রহ জমিয়ে মালতির পাশে বসে মধুবালা। গ্লাসের সবটুকু পানি এক নিশাসে খেয়েও মালতির শরীরের উত্তেজনা তবু কমেনি। শরীরের উত্তেজনার সাথে চোখে-মুখে চাপা আতঙ্ক জড়ো করে মালতি চিৎকার দিয়ে ওঠে, ও দিদি গো, তোর হরিক্ পুলিশ ধরি নিয়্যা গেচে গো-ও... ও দি-দি গো। মালতির চিৎকার শুনে মনে হয় তারা পাশাপাশি বসে নেই, তাদের মধ্যে অন্তত দের-দুই কিলোমিটারের ব্যবধান! মালতির চিৎকার শুনে মধুবালাও চিৎকার দিয়ে উঠেছিলো আহাজারির ঢঙে, ও হরি গো কী হলো গো-ও হায় হায় হায়! মধুবালার চিৎকারের আকুতিতে বাতাসে যেন ভারী ঢেউয়ের জন্ম হয়েছিলো সেদিন। বেলা গড়ানোর সাথে সাথে সেই ঢেউ আর্তনাদ হয়ে আছড়েও পড়েছিলো উঠানে উঠানে।।

সেদিন খবরটি শোনার পর মনের মাধুরী মিশিয়ে নির্দিষ্ট সুর তালে ঘণ্টা খানেক শুধু চিৎকার করেই কেঁদেছিলো মধুবালা। এরপর দীর্ঘ কান্নার ক্লান্তিতে শরীর যখন একটু স্থির হয়েছিল, তখন মধুবালার মনে হয়েছিলো হরিপদকে ছাড়িয়ে আনার কথা। সেদিন থানায় যাওয়ার জন্য কতজনার যে হাতেপায়ে ধরেছে এ অভাগি, তা আজ মনে হলেও গা পা কেমন শিউরে ওঠে! অবশেষে কালীপ্রসন্নের ভাই নগেন পরম মিত্র হয়ে বাড়িয়েছিলো সাহায্যের হাত। এর পরের খবর তো গ্রামের কারোরই অজানা নয়। সেদিন নগেনসহ থানায় গিয়ে খুনি বুলু মোল্লার সাথে নিজের ছেলেকে একই হাজতে দেখার পর ভিতরটা কেমন যেন দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছিলো মধুবালার। কিন্তু তার কিছুই করার ছিলো না। ছেলেকে ছাড়াতে দারোগা সাহেবের হাতে পায়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদেও কোনো লাভ হয়নি সেদিন। বিধবা মায়ের একমাত্র সম্বল বাঁচানো সেদিনের সেই আহাজারি দারোগা সাহেবের মন গলাতে পারেনি। উপায় খুঁজতে এর-ওর কানকথা শুনে মধুবালাও বুঝেছিলো; শুধু বুঝেছিলো নয়, চন্দন ছাড়া যে ও চিতাও জ্বলবার নয় সেসত্য সেদিন মধুবালা হাড়ে হাড়েই বুঝেছে। ‘অদৃষ্টের লিখন, না যায় বলে খণ্ডন— উপায়হীন হয়ে বিড়বিড় করে নিজেকে শুধু এই সান্ত্বনাটুকুই দিয়েছে মধুবালা! অবশেষে মেম্বার-চেয়ারমেনের বাড়ি-উঠান এক করে, এক বিঘা জমি পানির দামে বেঁচে দিয়ে অনেকগুলো টাকা জোগাড় করেছিলো মধুবালা। জমি বেচা টাকাগুলো মেম্বার-চেয়ারমেনের হাত হয়ে অবশেষে পৌঁছেছিলো দারোগা সাহেবের হাতে। চেয়ারে পা মেলে বসে দারোগা সাহেব পইপই করে টাকার হিসাব মেলানোর পর তবেই হয়েছিলো হরিপদর মুক্তি—এ তো চাট্টিখানি কথা নয়! এ তো কিছুর পর জটলা দেখলে কার মন চায় যে একটু কাছে যাই!

৩.

মধুবালা চাতক পাখির মতোই তাকিয়ে থাকে জটলাটির দিকে। কোনো কথা নেই, চোখে মুখে শুধু গাদা খানেক কৌতূহল। মধুবালার পাশ দিয়ে দু-একজন কৌতূহলী মানুষ দ্রুত হেঁটে চলে যায়, মধুবালা খেয়াল করে না। দু-একজন হাঁটা মানুষের মাঝে পেছনের গ্রামের সাজেদা পথে যেতে যেতে মধুবালাকে প্রশ্ন করে, কি হোচে গো হরির মাও—ওটি? মধুবালা ভেঞ্চি কেটে উত্তর দেয়, ইহ্, মুইঁ গেচোম নাকি ওটি, তুইঁ ত যাবানাকচিস—যায়া দ্যেক! কথা শেষ করেই মধুবালা যেন ভোল পাল্টায়। নিয়ন্ত্রিত কণ্ঠে বিনয় মিশিয়ে গলা বাড়িয়ে বলে ওঠে, ঘুরি আসি মোক অ্যানা কোস গো অঞ্জুর মাও। সাজেদা যেতে যেতে মাথা দুলিয়ে উত্তর দেয়, আচ্চা। সাজেদা চলে যাওয়ার পরও মধুবালা বিড়বিড় করে একা একাই বকে, মোর বাবা ভয় নাগে খুউব, মুইঁ যাম না ওল্ল্যা জঞ্জালোৎ...। বিড়বিড় করে কথা বলতেই থাকে মধুবালা। অবশ্য তার কথা শোনার জন্য আশপাশে কোনো মানুষের নাম গন্ধটুকুও খুঁজে পাওয়া যায় না! 

কালীপ্রসন্নের উঠানে মানুষের জটলাটি ক্রমাগত বড় হতে থাকে। জটলা বড় হওয়ার মাত্রা মাফিক আহাজারির তীব্রতাও বাড়ে উঠানে। জটলার ভিড় ঠেলে একজোড়া চোখ ঘটনার কাছে যাওয়ার জন্য তোড়জোর করে, পারে না। অবশেষে জোর খাটিয়ে এর-ওর শরীরে ধাক্কা খেয়ে ঘটনার কাছে যেয়ে স্থির হয় চোখ দুটি। মাটিতে পড়ে থাকা কালীপ্রসন্নের ছয় বছরের ছেলে গণেশের কালো হয়ে যাওয়া মুখখানি দেখে আঁতকে ওঠে সাজেদার শরীর। সাজেদা মুখে আঁচল চেপে বিলাপ করে ওঠে, অ্যালা মাইঁ, এটা ক্যাংকা করি হলো গো? কালীর ব্যাটা ত সতার পারব্যার পায়! এমনিতেই পানিতে ডুবে গণেশের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুরু থেকেই আশ্নি-জক্নিসহ নানান জাতের ভূত-প্রেতের চর্চা হয়েছে উঠানে, তার ওপর এত পরে এসেও সাজেদার অপ্রাসঙ্গিক বিলাপ উপস্থিত স্বজনদের কাছে অশোভনই মনে হয়। গণেশের মাথার কাছে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকা নিখিল অচমকা চেঁচিয়ে ওঠে, অ্যাটি আর অন্যাশ্যার প্যাঁচাল পারিস ন্যা তো দিদি... তুই যা তো এটি থাকি! নিখিলের কথা শুনে সাজেদা বিড়বিড় করে কী যেন বলে। সাজেদা হয় তো কথা দিয়ে নিখিলকে আক্রমণ করতে চায় কিন্তু পরিস্থিতি তার অনুকূলে নেই বলে পারে না। সাজেদার মুখে বিরক্তির সাথে ক্রমাগত অসহায়ত্বের ছাপও দানা বাঁধে। সাজেদা আর অপেক্ষা করে না; কিঞ্চিৎ বিরক্তি দেখিয়ে, মানুষের ভিড় ঠেলে দ্রুত জটলার বাইরে বেরিয়ে আসে। নিজের অসহায়ত্ব দূর করতে মলিন মুখে আকাশের দিকেই তাকায়। বিশাল আকাশের ভিতর সাজেদার অপলক দুটি চোখ কী যেন খুঁজে ফেরে বিরামহীন। কী আছে আকাশে? হয়তো কিছু আছে, অথবা নেই; বিশালতার কাছে ক্ষুদ্রের আশ্রয় প্রত্যাশা তো নতুনত্বের কিছু নয়! যেমন মিশে যেতে চায় ও-নদী দূরের কোনো এক সাগরে, সাগরেও গর্জন ওঠে, আর অবিরাম ঢেউ আছড়ে পড়ে কিনারে; হয়তো এতেই ও-নদী খুঁজে পায় পূর্ণতার সুখ। বৃহত্তরের কাছে আশ্রয় নেবে ক্ষুদ্র—এই তো কালের নিয়ম। আর? আর জটলার অন্যপাশে, কেউ একজন ‘পুলিশ পুলিশ’ বলে চিৎকার দিয়ে দৌড়ে জটলার কাছে আসে। চিৎকারের শব্দ কানে যেতে না যেতেই জটলার উৎসুক মানুষগুলো দিকবিদিক ছোটাছুটি শুরু করে দেয়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে কালীপ্রসন্নের উঠানটি একেবারে প্রায় খালি হয়ে যায়। দেখতে দেখতে উঠানটি খালি হওয়ার পরও, উঠানে তখনও পুলিশ এসে পৌঁছাতে পারেনি! উঠানের এককোণে, মাটির ছোট্ট ঢিবির কাছে, গণেশের নিথর দেহের পাশে বসে কালীপ্রসন্ন আর তার স্ত্রী সরলা শুধু নীরবে চখের পানি ফেলে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

সর্বশেষ

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

বসন্তের লঘু হাওয়া

বসন্তের লঘু হাওয়া

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

বইমেলায় নভেরা হোসেনের ‘অন্তর্গত করবী’

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

অমিয় চক্রবর্তীর কবিতা : বিষয়বিন্যাস

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune