X
শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ১০ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৬

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০৫

পূর্বপ্রকাশের পর

এই রহস্য আর ভয় মেশানো কুরা-র ওপর দিয়ে একবার অবশ্য হেঁটে যাবার সুযোগ হয়েছিল। আমার বয়স তখন ছয় কি সাত। বয়সে-বড় তিন-চারজন প্রতিবেশি ছেলের সাথে বাড়িতে না বলে মন্থনার হাটে যাবার দুঃসাহসী ষড়যন্ত্রটা হয়েছিল বোধহয় খেলতে খেলতেই। হাটবারে দুপুরের পর থেকেই কাছের গ্রামগুলো থেকে গৃহস্থ, চাষী-জেলে আর দোকানিরা কাঁধের বাঁক কিংবা মাথায় ডালিতে করে মাছ-মুরগি, আনাজপত্র, চাল-ডাল-নুন থেকে শুরু করে বাঁশ, কাশের আঁটি, ধানের খড়, ধান আর নানারকম শস্য নিয়ে অস্থায়ী দোকানে সাজাতে শুরু করত। বিকেলের মধ্যে হাট জমজমাট হয়ে উঠত, তারপর সন্ধ্যে নামতে আরম্ভ করলে সবগুলো দোকানের সামনে বড় কুপির মোটা সলতে থেকে কেরোসিনের কালো ধোঁয়া আধা-অন্ধকারে আকাশে পাক খেয়ে উঠতে শুরু করত। আলো-আঁধারি, বিচিত্ররকম মানুষজন আর অন্তহীন পসরার আকর্ষণে হাট তখন এক রূপকথার জগত হয়ে উঠত। 

মন্থনার হাটে নিজের আঁকা ছবি দেখাচ্ছেন মানসিক ভারসাম্য হারানো যুবক।tছবি : লেখক নব-র কুরা থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে সেই মন্থনার হাট। খানিকটা এগিয়ে সেটা একবার দেখে আসার ইচ্ছে হলো। কিন্তু এখনকার পাকা রাস্তা, তাতে অনবরত চলতে-থাকা অটোরিকশা, মটরসাইকেল আর ট্রাকের শব্দ, আর হাটের বদলে-যাওয়া চেহারার মধ্যে বাল্যের সেই রূপকথার রাজ্যের চিহ্নমাত্র নেই। বাংলাদেশের যে-কোনও প্রান্তের গঞ্জের মতোই এলোমেলোভাবে গড়ে ওঠা পাকা-আধাপাকা স্থায়ী দোকানপাট, বিকাশ-নগদ-ফ্লেক্সি লোডের সাইনবোর্ড, এজেন্ট ব্যাংকিং-এর অফিস, বিদ্যুতের আলো, আর চার দশক আগের সাধারণ গ্রামীণ মানুষের মুখে পড়া আধুনিক শহুরে ভাঁজ-ভ্রূকুটি—সবকিছু মিলিয়ে আমার দেখার উৎসাহটা নিভিয়ে দিল। ফিরে আসার আগে একটু বিশ্রাম নেব বলে রাস্তার পাশের একটা চায়ের দোকানে ঢুকে অবশ্য যে বিচিত্র অভিজ্ঞতা হলো তাতে অতীত দেখার অসম্ভব ইচ্ছেটার মরে যাওয়ার অনেকটা ক্ষতিপূরণ হলো।
কালো কোঁকড়ানো বাবরি চুল আর কালো গোঁফ-দাড়িঅলা এক যুবক প্রায়ান্ধকার দোকানঘরটার ভেতরে দেয়ালঘেঁষা একটা বেঞ্চিতে বসে একমনে ছবি আঁকছে। ভেতরের নকশাকরা গোল গলার গেঞ্জি, তার ওপর চাপানো জ্যাকেট, প্যান্ট, চুলে গুঁজে রাখা নীল ডাঁটির চশমা, এমনকি পায়ের কেডসজোড়া পর্যন্ত কালো। “কী করছেন” জিজ্ঞেস করার সাথে সাথে মুখ তুলে চটজলদি উত্তর দেন, “ছবি আঁকতেসি।” যেন প্রশ্নটা করা হবে আগে থেকেই জানতেন। দেখলাম, বেঞ্চির ওপর স্ট্যাপলার দিয়ে গাঁথা লম্বা সাদা কাগজের তাড়া, তাতে একটা বলপেন দিয়ে কাঁচা হাতে একটা মানুষের ঊর্ধ্বাঙ্গ আঁকা হচ্ছে। গলা থেকে বুক পর্যন্ত ‘আউটলাইন’ দেওয়া হয়েছে, চোখ-নাক-মুখও মোটামুটি ফুটেছে, এখন চুলের কাজ চলছে। অন্য একতাড়া কাগজে সম্পূর্ণ হওয়া অনেকগুলো ছবি। সেগুলো দেখতে চাইতে সোৎসাহে নিজেই একটা একটা করে দেখাতে লাগলেন আর সেগুলোর বর্ণনা দিতে লাগলেন। সেসব ছবিতে যেন এক পরাবাস্তব জগত; মানুষ, সাপ, গরু, ফুল-ফল-সবজি, নৌকা, বন্দুক, পরী, বঙ্গবন্ধু, পাকসেনা, ফেরেশতা, কাফের, লম্বা জিভ বের করা একচোখঅলা দজ্জাল, নবী-রসুল—কী নেই সেখানে! সুকুমার রায়ের হাঁস আর সজারু জোড়া দিয়ে আঁকা ‘হাঁসজারু’র মতো একটা ফিগার দেখলাম, চশমাপরা বঙ্গবন্ধু সেটার দিকে তর্জনি উঁচিয়ে কী যেন বলছেন—মাঝখানে একটা খুঁটিতে বাঁধা নৌকা। একটা লম্বা বেগুনের আড়াল থেকে একটা সাপের মাথা উঁকি দিচ্ছে। একটা সবুজ খেজুরগাছের নিচে দুটো বিরাট বাঁটঅলা গাইগরু গলাগলি করে দাঁড়িয়ে আছে, আর দুটো সাপ সেই বাঁট থেকে দুধ খাচ্ছে। গরু দুটোর রং বেগুনি আর সবুজ। একটা গরুর কান কলার কাঁদির মতো। দুধপানরত দুটো সাপের একটা আবার উড়ন্ত অবস্থায় রয়েছে।

এসব ছবি আঁকা কোথায় শিখলেন জানতে চাইলে যুবক তর্জনিটা আকাশের দিকে তাক করে জানালেন, “ঐখান থাকি”। মানে? মানে হলো বাতাসের ওপর ভেসে ভেসে আকাশে কারও কাছ থেকে তিনি ছবি আঁকা শিখেছেন। কার কাছে তা বলতে মানা আছে। আরও জানালেন, দিল্লিতে পাকসেনারা তাঁকে সমুদ্রে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল, বঙ্গবন্ধু সেখান থেকে তুলে তাঁকে বাঁচিয়েছেন—এই ঘটনার ভিডিও-ও তাঁর কাছে আছে। যুবকের সাথে আমাকে কথা বলতে দেখে দু’য়েকজন ক্রেতা আর দোকানি নিজে এগিয়ে এসে জানালেন, উত্তরাধিকারসূত্রে বিপুল পরিমাণ জমি পেয়েছিলেন যুবকটি। পরে কোনও কারণে তাঁর মস্তিষ্কবিকৃতি দেখা দেয়। তারপর তার বউ সন্তানসহ চলে যায়। জমিও তিনি ভাইদের ফেরত দিয়েছেন। এখন বাজারের কাছে একটা ভাঙা দোকানঘরে একা থাকেন। যে যা দেয় তা-ই খান। কেউ একজন সন্দেহ জানালেন যে, হয়তো শরিকরাই জমির জন্যে কিছু খাইয়ে তাঁকে পাগল করেছে। যদিও যুবকের কটা চোখে ভ্রূকুটি, তবু মুখের নিখুঁত লম্বাটে গড়ন, প্রশস্ত কপাল, ময়লা জমে কালচে হয়ে যাওয়া একদা-ফরসা মসৃণ ত্বক, মাথাভর্তি কুচকুচে কালো চমৎকার চুল আর কথা বলার স্বতঃস্ফূর্ত আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গির সাথে তার অর্ধেক কল্পজগতে বসবাসের এই অবস্থা কিছুতেই মেলানো যায় না। ‘অর্ধেক’, কেননা বাস্তবের সাথে তার সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ ঘটেনি। চারপাশ সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন, সম্পত্তি-সম্পর্কিত বৃত্তান্ত নিজেই ব্যাখ্যা করলেন, বউ-বাচ্চা তাঁকে ছেড়ে চলে গেছে তাও নিজেই জানালেন। আরও জানালেন যে তিনি কারও কাছে কিছু চেয়ে খান না। মানুষের জীবন আর তার সম্ভাবনা যে ভাগ্যের কোন চোরাবালি কখন গিলে খাবে, কিংবা অর্ধেক গিলে তিলে তিলে মারবে—কে তা বলতে পারে। অনেক অনেক বছর পর স্মৃতির মন্থনার হাট দর্শনের অভিজ্ঞতা আরও বড় কোনও দুঃস্বপ্নে ঢেকে যাবার আগে বিশ্রামের কথা ভুলে একটা অটোরিকশায় উঠে মরিয়ম সিল্লানির মাজারের দিকে রওনা দিলাম। ওখান থেকে গোডাউনের হাট। এবার নদীর বুকে নামব। 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধের লাগোয়া এই গোডাউনের হাট। বাঁধ পেরোলে কিছুটা গ্রাম্যপথ, দুপাশে বাড়ি। তারপর নদী। এখানে ঠিক তীরের উপরেই কোলকোন্দ ইউনিয়ন পরিষদের দপ্তর, একটা চা-বিস্কুটের দোকান। তার পাশে একটা টিউবয়েল। জায়গাটা থেকে নদীর স্তর পর্যন্ত ঢালটা বোল্ডারের গাঁথুনিতে বাঁধা। ঢালের নিচে খানিকটা বালিময় ফাঁকা জায়গা, পুকুরের মতো পানি জমে আছে কয়েকটা জায়গায়। কানিবকেরা সেখানে মাছের সন্ধানে গভীর মনোযোগে দাঁড়িয়ে আছে এক পায়ে। সামনে ধু ধু বালি, তারপর নদীটা কিছুটা তেরছাভাবে বাম থেকে ডানে চলে গেছে। বামদিকে ঘাট, ডানে বোধহয় দেড় কিলোমিটার দূরে সাদা বালির বিস্তারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সেই ন্যাংটা টিনের ঘরটা, ধামুরের চর থেকে যে-ঘর দেখেছিলাম উত্তর-পশ্চিম দিগন্তের ওপর। ওখানে আরেকটা ঘাট। ঘরটা আসলে নৌকার জন্য অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের মাথার ওপরের আচ্ছাদন।  

অবশেষে তিস্তার বিপুল বিস্তারের মধ্যে বসানো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাঠামোগুলো আর তাদের দিকের একটা পরিপ্রেক্ষিত পেলাম। সেদিন ধামুরের চরের কৃষাণরা বলেছিলেন, এই টিনের ঘরটার কিছুটা উত্তরেই আমার বাবার সেই ‘পুরান বাড়ি’—বাঁধের ওপরে দোকানের বেঞ্চিতে বসা বাবার সহপাঠী সেই বৃদ্ধের কথায় সেটা আমারও বাড়ি। কিন্তু এই শুকনো ধু ধু সাদা বালির চর, নদীর ধারা আর তার মাঝে মাঝে দু-এক রাতের জন্য জেগে ওঠা ভেজা বালির ছোট ছোট দ্বীপের মতো ভূখণ্ডগুলোর মধ্যে ‘আমার বাড়ি’টা কোথায় খুঁজে পাব? চরে নামার আগে একজন শুধু বুঝিয়ে দিলেন যে ঐ টিনের ঘরটা থেকে সামান্য উত্তর-পশ্চিমে যে ভেজা চরের মতো জায়গাটা দেখা যাচ্ছে, ওটাই সেই জায়গা। ওটার কাছাকাছি গেলেই কাউকে না কাউকে পেয়ে যাব যে নির্দিষ্ট করে জায়গাটা চিনিয়ে দেবে। অথবা ঘাটে নৌকা ভিড়লে মাঝিকে বললেই সে জায়গাটা দেখিয়ে দেবে। এইটুকু মাত্র দিকনির্দেশনা নিয়ে পৌনে এক শতাব্দী আগে নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া আমার কখনও-না-দেখা বাড়ির খোঁজে চরের বালিতে নেমে পড়লাম।

এই চরের নিচেই চাপা পড়ে আছে আমার পিতৃপুরুষের ভিটা, কাছেই নৌকায় লালু দাস। ছবি: লেখক বাড়িটা খুঁজে পাওয়া আসলে ততটা কঠিন নয়, কারণ নদীপাড়ের মানুষ পুরান বাড়ির অবস্থান কখনও ভোলে না—তা সেটা নিজের বাড়ি হোক, কিংবা প্রতিবেশির। তাছাড়া জায়গাটা খুঁজে পাবার আরও স্পষ্ট কারণ আছে। আদি পীর সাহেব গউস উদ্দিন মাওলানার আট ছেলের মধ্যে বড় ছেলে মোহাম্মদ আলী রীতি অনুযায়ী বাবার উত্তরাধিকার তথা খেলাফত পেয়েছিলেন, এবং পীর হিসেবে বাবার চেয়ে বেশি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। আট ভাই পরিবারসহ অনেককাল একই প্রাচীরের ভেতর একই বাড়িতে বসবাস করলেও স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষক, উকিল, ডাক্তার ভাইদের তুলনায় তাঁর প্রতিপত্তি ছিল অনেক বেশি, এবং ‘পুরান বাড়ি’ মূলত তাঁর খ্যাতিতেই খ্যাতিমান ছিল। এই পুরান বাড়িতেই ছিল তাঁর মাজার এবং সেই মাজারের শিথানে ছিল এক বিশাল বটগাছ। আমার বাবার মুখে শুনেছি, সেই গাছ এতই বিশাল ছিল যে তাঁরা ছেলেবেলায় তার ডালে উঠে খেলতেন। সেই বিরাট বাড়ির সাথে সেই মাজার আর বটগাছও একদিন কালান্তক স্রোতের ঝাপটায় নদীর অতল জল আর বিপুল বালির নিচে সমাধি পায়। ষাট-পয়ষট্টি বছর পরে, এই বছর দশেক আগে খেয়ালি তিস্তার ধারা আর বালি সরে গিয়ে এই জায়গাতেই সেই নদীতলশায়িত বটগাছের ডালপালার অনেকখানি বেরিয়ে পড়লে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষের ঢল নামে। গাছের ছাল আর ডালের টুকরো, কাছাকাছি জায়গা থেকে নদীর পানি সংগ্রহ করার উন্মাদনা ছড়ায়। মানত হয়। মেলা জমে। পরের বছর ভয়াল বিপুল তিস্তা তার জলের রহস্যের চাদরে আরেক রহস্যের মতো সেই বটগাছটাকে আবার ঢেকে নেয়। লুকিয়ে ফেলে ঠিক যেমন এক দক্ষ জাদুকর অসংখ্য দর্শকের বিস্ফারিত সন্ধানী দৃষ্টির সামনে চোখের নিমেষে তার হাতের তালুতে অদৃশ্য করে নেয় একটা আস্ত ফুলের তোড়া কিংবা একটা কবুতর। তারপর থেকে সব সুনসান। এখন শীতের শুরুতে নদীর মাঝ বরাবর সেই জায়গাটায় রাতের বেলা অগভীর শান্ত জল তিরতির করে, দিনে উত্তরে ডালিয়ার তিস্তা ব্যারাজে পানির প্রবাহ কমিয়ে দিলে সেখানে ভিজে বালির একটা ছোটো চর জাগে, সেই বালিতে ঢেউয়ের স্পষ্ট ছাপ; যেন বালি নয়—চারদিক ঘিরে বইতে থাকা পানির ধারারই জমাট বাঁধা অংশ ওটা। এখন তাই জায়গাটার দিশা কেউ আর হারায় না।

কিন্তু চারপাশের পানির প্রবাহ পেরিয়ে দ্বীপের মতো সেই ছোট চরটাতে কীভাবে যাব? সামনে তাকিয়ে দেখলাম টিনের ঘরের ছাউনির নিচে কোনও যাত্রী খেয়ার অপেক্ষায় নেই। ওপাড় পর্যন্ত যতদূর চোখ যায় নদীতে কোনও নৌকার চিহ্নও চোখে পড়ে না। উপায় ভাবতে ভাবতে নদীর কিনার ধরে হাঁটছিলাম আর দেখছিলাম এখানে-ওখানে পানিতে পা ডুবিয়ে বকেরা ধ্যানস্থ হয়ে মাছের জন্য অপেক্ষা করছে। আমার একটু পিছনে খানিকটা দূরে লুঙ্গি আর হলুদ গেঞ্জির ওপর ফুলঅলা হাফশার্ট পরা একজন একই দিকে যাচ্ছিল। ডেকে আলাপ করে জানলাম, পুরুষানুক্রমে তিনি তিস্তার জেলে, নাম ‘নালু দাস’ ওরফে লালু দাস। রাতে ছোট ফাঁসের জাল ফেলে তিস্তার বিখ্যাত বৈরালি মাছ ধরেন—সাথে ছোট আইড়, ট্যাংরা, বেলেও ধরা পড়ে কিছু কিছু। সামনেই নদীর কিনারে বাঁশের লম্বা খুঁটিতে একটা ডিঙি নৌকা বাঁধা—ওটা তাঁরই। পীরের বটগাছের কথা জিজ্ঞেস করতেই নদীর মাঝখানে ভেজা চরটাকেই দেখিয়ে দিলেন নিশ্চিত ভঙ্গিতে। এখন দুপুর—মাছ ধরার উপযুক্ত সময় এটা নয়, তাই আমাকে চরটাতে নিয়ে যেতে রাজি হলেন তিনি। 

নদীর ধারার কিনার থেকে চরটা খুব বেশি দূরে নয়, কিন্তু পানির গভীরতা কোথাও কোথাও খুবই কম। তাই এদিক-ওদিক এঁকেবেঁকে মিনিট দশেক পর যখন চরের কিনারে পৌঁছালাম, বিষাদ আর উত্তেজনার মিশ্র টানে আমার মন তখন তিস্তার অনির্দিষ্ট স্রোতে ভাসমান। আসতে আসতে লালু দাসের কৌতূহল মেটাতে তাকে আমার চরযাত্রার কারণটা বলে দিয়েছি। এখন সে হাতের লম্বা লগিটা দিয়ে ভেজা বালির ওপর নৌকাটা ঠেলে দিয়ে আমাকে বলল, “আপনি নামেন, এইটাই আপনাদের বাড়ি।” স্যান্ডেলজোড়া হাতে নিয়ে চরের বালির ওপর পা বাড়াতে গিয়ে বুঝলাম সেই পা-সহ আমার সমস্ত শরীরটা কাঁপছে। বালিময় ত্রিকোণ ভূখণ্ডটুকু জুড়ে রাতের রেখে যাওয়া ঢেউয়ের প্যাটার্ন। জানি, যে-‘বাড়ি’র ওপর এই মুহূর্তে হাঁটছি, তার অস্তিত্ব ভূ-পৃষ্ঠের এই অতি ক্ষুদ্র খণ্ডটুকুর নিচে কোনও এক অনির্দিষ্ট স্তরে কোনও এক অজানা রূপে নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু তার সাথে আমার বাবা কিংবা ধামুরের বাঁধের সেই বৃদ্ধের মুখে শোনা বর্ণনার বাড়িটার আজ আর কোনও মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবু সেই বয়ানের নির্মাণশিল্পে আমার মনে গড়ে-ওঠা বিশাল জমজমাট অক্ষত বাড়িটাই ‘আমার বাড়ি’—তিস্তার নির্মম হাতসাফাই যে-বাড়িটাকে এই বালির চর আর তাকে ঘিরে ঘুরতে থাকা নদীর ধারার নিচে বহুকাল অদৃশ্য করে রেখেছে, সে-বাড়িটা নয়। 

সাদা বালির চর, সেখানে জীবনের স্পন্দন—আবার হয়তো সামনের বর্ষাতেই হারিয়ে যাবে তিস্তার খামখেয়ালিতে। ছবি: লেখক কিন্তু তিস্তার দৃশ্যাবলি ঘরহারানো মানুষের মনের এমন অবুঝ দাবি নাকচ করে দিতে থাকে সারাক্ষণ। ফেরার পথে দেখলাম অদূরেই শুকনো বালির বিরাট চর—তাতে ফসলের স্তূপ, মানুষজন, আর খেয়াঘাটের ছাউনির নিচে অপেক্ষমাণ যাত্রীর দল। “চরটা খুব বেশি পুরানা হয় নাই”, লালু দাস জানালেন। “কিনারগুলা সারাক্ষণ ভাঙি ভাঙি পড়ে। সামনের বর্ষার পরেই দেখবেন এটার চিহ্নও নাই। আবার হয়তো পরের বছর একটু দূরত ভাসি ওটপে। এবারও আশেপাশের চরগুলা ডুবি যায়া অনেক লোকের অনেক ধান নষ্ট হইসে। এইরকমই চলে। শুনতেসি নদীটা খুঁড়বে, তাইলে হয়তো নদীর ভাঙন বন্ধ হইবে। কী জানি!”

চিরকাল এই নদীপাড়ের মানুষ লালু দাস। তার ঐ সংক্ষিপ্ত বয়ানে তিস্তাতীরের চিরন্তন বিষণ্ন বাস্তবতা, আশাবাদ আর অনিশ্চয়তার যে মিশ্র সুর শুনলাম, শীতের আসন্ন সন্ধ্যায় গ্রামের প্রান্তে আর চরের বালির ওপরে জমে উঠতে থাকা ঝুলন্ত কুয়াশার মতো সে সুরটা আমার মনে ভেসে রইল। চলবে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

শূন্য প্রান্তরে একা

শূন্য প্রান্তরে একা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

ঐশী গল্প

ঐশী গল্প

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

সর্বশেষ

শূন্য প্রান্তরে একা

শূন্য প্রান্তরে একা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

ঐশী গল্প

ঐশী গল্প

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune