X
শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ১০ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

তিস্তা জার্নাল । পর্ব ৭

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২১, ১১:০৮

পুর্বপ্রকাশের পর

বছর সাতেক আগে একবার গোডাউনের হাট পয়েন্টে তিস্তা দেখতে এসেছিলাম। বাঁধের ধারেই ছোট্ট বাজারটা—কিছু স্থায়ী দোকানপাট, এক প্রান্তে ভ্যান আর অটোরিকশাগুলো দাঁড়িয়ে থাকে যাত্রীর অপেক্ষায়। বাঁধ ধরে পুব দিকে এগোলে দুধারে চোখে পড়ে নদীভাঙা মানুষের বাড়িঘর—অগোছালো শ্রীহীন কুটিরগুলো যেন বাঁধের ঢালে কিংবা ঢালের নিচে কোনওরকমে ঝুলে আছে। একের পর এক বাঁশঝাড় ছাড়া অন্য গাছপালা তেমন নেই; সেগুলো একই সঙ্গে বাড়িগুলোকে ছায়া আর আব্রু দিচ্ছে, আবার বাঁধটাকেও কিছুটা শক্তি জোগাচ্ছে। তিস্তার আগ্রাসী ভাঙনের মুখে বেশ কয়েক বছর আগে দুটো গ্রোইন বানানো হয়েছে। মূল বাঁধের সাথে নব্বই ডিগ্রি কোণে নদীর ভেতরের দিকে কয়েকশ মিটার মাটির লম্বা একটা একটা বাঁধ বা রাস্তা চলে গেছে, তার মাথায় কংক্রিটের গ্রোইন। দ্বিতীয় গ্রোইনটা যেখানে শুরু হয়েছে তার লাগোয়া জমিটায় টিনের চালের ছোট্ট একটা দালান দেখেছিলাম, তার মাথায় লেখা “আবুলিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়”, অথচ জায়গাটার নাম আবুলিয়া নয়। আদি আবুলিয়া এখন তিস্তার চরের ভেতরে—বোল্লার পাড় থেকে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তাটা ধরে নদীর দিকে বেশ কয়েক কিলোমিটার এগোলে ওখানে পৌঁছানো যায়। তিস্তার গ্রাসে হারিয়ে যাওয়া পুরনো রাস্তার অবশেষ, দুধারে নদীভাঙা মানুষের বাড়িঘর। ছবি : লেখক বর্তমান আবুলিয়াও নয় স্কুলের সেই জায়গাটা, কারণ আবুলিয়া এখন নদীর ওপাড়ে, বিস্তৃত বিনবিনার চরের পাশে। নদীর এপাড় থেকে ওপাড়ে কিছুটা উত্তর-পূর্ব দিকে তাকালে যে রাস্তাটা পশ্চিম থেকে পুবে চলে গেছে দেখা যায়, সেই রাস্তার সংলগ্ন এলাকাটাই এখনকার আবুলিয়া। কয়েক বছর আগে সেখানে আবুলিয়া বাজারও দেখে এসেছিলাম। নদী যদি সামনের দু-চার বছরে ঐ রাস্তা কিংবা বাজারটাকে খেয়ে ফেলে তাহলে আবুলিয়াও হয়তো সরে যাবে অন্য কোথাও, যেখানে অন্তত অল্প কয়েক বছরের স্থায়িত্বের নিশ্চয়তা মিলবে। একইরকম পুনর্জন্ম দেখেছি গান্নার পাড় জামে মসজিদের—কয়েক বছর আগে যেটা ছিল বাঁধের ভেতরের দিকে, চরের ঠিক প্রান্তে কোনওরকমে টিকে থাকা গ্রামটার এক কোণে, এবং নদী তখন একটু একটু করে কেটে খুবলে নিচ্ছিল সেই গ্রামের অবশিষ্ট ভিটেমাটি, জমিজমা। দুতিন বছর পরই সেখানে গিয়ে বাঁধের প্রান্ত পর্যন্ত এগিয়ে আসা তিস্তার ক্ষুধার্ত জলরাশির মধ্যে সেই গ্রামটাকে আর খুঁজে পাইনি, কিন্তু মসজিদটাকে পেয়েছিলাম তার আদি অবস্থান থেকে বেশ খানিকটা পশ্চিমে চত্রার বিলের কাছাকাছি গ্রামটায়, বাঁধের অন্য দিকের নিরাপত্তার মধ্যে—গান্নার পাড় জামে মসজিদ নামেই। 

তিস্তা অববাহিকায় নাম কখনও হারায় না, তার নিরন্তর স্থানান্তর হয় মাত্র। কোনও এক অন্ধকার রাতে নদীর গহ্বরে আচমকা ভেঙে পড়া ঘর, এমনকি কখনও কখনও আসবাব তৈজসপত্র পর্যন্ত সাথে নিয়ে পালাতে পারে না তিস্তাতীরের মানুষজন। কিন্তু স্থান অনিশ্চিত ভঙ্গুর হলেও তাদের নামগুলোর নাগাল নদীর স্রোত কখনোই পায় না। সেগুলোকে অতল জলতলে হারাতে দেয় না মানুষ। কেননা নামই বয়ে বেড়ায় ‘পুরান বাড়ি’র স্মৃতি আর সংজ্ঞা—আর ‘পুরান বাড়ি’ই হলো তিস্তাপাড়ের নদীভাঙা মানুষের একমাত্র বাড়ি বা ঘর, তার বাকি জীবনের সব আবাসই হলো সেই হারিয়ে যাওয়া ঘরের নিরুপায় প্রতিধ্বনি মাত্র।

গোডাউনের হাটের কাছে সেই পুরান বাড়ির দিশা খুঁজে পাবার পর আমার কাজ হলো গান্নার পাড় থেকে চরের ওপর দিয়ে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তাটা ধরে পায়ে হেঁটে সেখানে পৌঁছানো। কেননা আমি যে শুধু কালের গভীরে পোঁতা আদি হৃৎপিণ্ডটাই খুঁজে পেতে চাইছিলাম তা নয়, তাতে রক্ত সঞ্চালন করেছিল যে ধমনীগুলো, সেগুলোরও অস্তিত্ব অনুভব করতে চাইছিলাম। সেইমতো গান্নার পাড়ের বাঁধের যে জায়গাটায় আমার বাবার সহপাঠীর দেখা পেয়েছিলাম, সেখানে আবার এসে পৌঁছুলাম বেশ সকাল সকালই। ভ্যানঅলা যথারীতি আমার উদ্দেশ্য শুনে আমাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং উপদেশ দিতে লাগলেন। আর তাঁর উপদেশ মানতে গিয়েই একটা বিপত্তি ঘটে গেল। আবার সেটাকে বিপত্তি না বলে একটা অপ্রত্যাশিত উপরি-পাওনাও বলা যেতে পারে।

চরের ‘ম্যাদ’ (পলি)-পড়া স্থানে পিঁয়াজ ফলানোর চেষ্টা, সংলগ্ন বালিময় টুকরোগুলোয় আবার অন্য ফসল। ছবি : লেখক বোল্লার পাড়ের বাঁধের ওপর থেকে উত্তর-পশ্চিম কোণে গোডাউনের হাটের দিকে তাকালে দূরে দিগন্তের কাছে গ্রোইনদুটো দেখা যায়। দ্বিতীয় গ্রোইনটা থেকে উত্তর-পশ্চিমে চরের উপর দিয়ে আধা কিলোমিটার হাঁটলেই লালু দাসের দেখানো সেই ভেজা চরটা পাওয়া যাবে যার নিচে আমার পুরান বাড়ি চাপা পড়ে আছে। আমি সেখানেই পৌঁছাতে চাইছি শুনে ভ্যানঅলা আমাকে আমার পরিকল্পিত পথের চেয়ে আরও সংক্ষিপ্ত পথের হদিস দিলেন। ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তাটা থেকে বাঁধ ধরে বেশ খানিকটা পশ্চিমে এগিয়ে বাঁধের ওপর বসে-থাকা আরও দুচার জনের পরামর্শ নিয়ে তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন অন্য একটা রাস্তার মাথায়—সেটা ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তাটার সমান্তরালে বাঁধ থেকে নেমে চরের উপর দিয়ে সোজা উত্তরে চলে গেছে। “এটাও রেকর্ডের রাস্তা”—ভ্যানঅলা আশ্বস্ত করলেন। এটা ধরে গ্রোইন লক্ষ্য করে এগোলেই আমি গন্তব্যে পৌঁছে যাব ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। চোখের সামনে গন্তব্য দেখে আর পথ-সংক্ষেপের সুযোগের লোভে আমি আমার আসল উদ্দেশ্য ভুলে গেলাম। বাঁধ থেকে নামার মুখেই রাস্তাটার দুপাশে টিনের দুচারটে হতশ্রী বাড়িঘর, কয়েকটা ধুলিমলিন ফলের গাছ। একটা চিকন মেহগনি আকাশের দিকে খানিকটা বেশি উঠে গিয়ে পাতাগুলোকে চারপাশের ধুলা আর বালির আগ্রাসন থেকে কিছুটা বাঁচাতে পেরেছে, তাই ওটার গাঢ় এবং কচি হলুদাভ সবুজ পাতাগুলোতে খোলা প্রান্তরের অবাধ সূর্যালোক পড়ে সেগুলোর নিজস্ব চকচকে ভাবটাকে অনেকটা বজায় রেখেছে। টিনের বেড়ায় ঠেস দিয়ে গোবরের শলা শুকাতে দেওয়া। সামনে শুষ্ক ধূসর ধুলার বিছানায় সকালের রোদে শুকাচ্ছে কিছু ডালপাতা—রান্নার জ্বালানী হবে ওগুলো। এর মধ্যেও আধুনিক সুবিধার অন্তত একটা আয়োজন উপস্থিত; একটা ঘরের কোনায় বাঁধা একটা চিকন বাঁশের মাথায় খাঁজ কেটে আটকানো ইলেকট্রিকের তার।

সেই পথ ধরেই আবার নেমে পড়লাম তিস্তার চরের বুকে। গন্তব্য দৃষ্টিসীমায় হলেও বহুদূর। শুরুতে পথটার দুপাশের দৃশ্যাবলি পরিচিত। নানান রকম শাক-সবজি, তামাক আর আলুর ক্ষেত। লোকজন সেখানে কাজে ব্যস্ত। সবুজ ক্ষেত, এখানে-ওখানে পলি আর ভেজা মাটির কালচে বিস্তার, ধু ধু বিস্তৃত রুপালি জমির খণ্ডগুলোতে রোদ পড়ে বালির কণাগুলো চিকচিক করছে, মাঝে মাঝে তামাক বা আলুর ক্ষেতের পাশে সেচের পাম্পগুলোর টানা ঘটঘট আওয়াজ বিশাল চরটার অটুট নিস্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছে। বোল্লার পাড় থেকে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের রাস্তা ধরে যেদিন এগিয়েছিলাম, সেদিন অনেকটা দূর পর্যন্ত রাস্তাটার অস্তিত্ব লক্ষ করেছিলাম। কিন্তু এই রাস্তাটা শ’দুয়েক গজের মধ্যেই ক্ষেতের আল কিংবা এক-দেড় ফুট চওড়া সেচের সরু নালার রূপ নিয়েছে। সেই পথরেখা ধরে এঁকেবেঁকে এগিয়ে একটা তামাক ক্ষেতে পৌঁছুলাম। এক বৃদ্ধা সেখানে কাজ করছেন। ক্ষেতের চেহারা বিস্ময়কর—খসখসে চিকচিকে বালির জমি, সামান্য পলি বা ভেজা মাটির চিহ্ন পর্যন্ত নেই, তার উপর তামাকের চারাগুলো সার করে বসানো, আর সারা ক্ষেতটায় কিছুটা দূরে দূরে একইরকম বালির ছোট ছোট ঢিবি। বৃদ্ধা একমনে সেই ঢিবিগুলো ভেঙে ভেঙে তামাকের চারাগুলোর গোড়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ভেবেছিলাম ঐ বালির ঢিবিগুলোতে নিশ্চয়ই সার মেশানো আছে। কিন্তু বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করতেই ভুল ভাঙলো, “না বাবা, এইগ্লা খালি বালা, সার নাই।” তবে? এগুলো গাছের গোড়ায় দিচ্ছেন কেন! আসলে এই জমিতে তো কোনও ‘ম্যাদ’ বা পলি নেই, শুধু বালি। গাছের গোড়ায় একেবারে নিচের দিকে সামান্য পলি আছে, আর সেটুকুকে আশ্রয় করেই গাছগুলো বেঁচে আছে। এই বালির অতিরিক্ত আস্তরণটুুকু সেই পলিকে আর্দ্র রাখবে, রক্ষা করবে। নইলে চরের খোলা রোদে পলিটুকু শুকিয়ে গিয়ে চারাগাছগুলোর বেঁচে থাকা অসম্ভব করে তুলবে। ক্ষেতে সার বা পানি দিলেও এই বালির আস্তরণের ভেতর দিয়েই তা গাছের গোড়ায় পৌঁছাবে। ভাবলাম, চাষের এমন অদ্ভুত পদ্ধতি শুধু চরেই মিলবে—পলিমাটির বাংলাদেশের বিশাল বিস্তৃত সমতলের কোথাও নয়। “ভালো জমি নাই আপনার?”—এমন প্রশ্নে বৃদ্ধা জানালেন নদীতে ভেঙে যাওয়া পিতৃপুরুষের জমিজিরাতের মধ্যে এইটুকুই কেবল তিনি ভাইদের কাছে পেয়েছেন; বাকিটা হয় প্রবল ক্ষমতাবান পিতৃতন্ত্রের থাবার অধিকারে, নয়তো প্রবলতর তিস্তার ছুরির মতো ধারালো দাঁতে সাজানো চোয়ালের দখলে রয়ে গেছে। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া নিজের বালিময় এক টুকরো জমিতে তামাকের ক্ষেতের পরিচর্যা করছেন বৃদ্ধা। ছবি : লেখক

তবে তিস্তার চরে জমির মালিকানা আর চাষের পদ্ধতির আরও বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন আমার তখনও বাকি।                        

বৃদ্ধাকে বিদায় জানিয়ে খানিকটা এগিয়ে লক্ষ করলাম, পথ থেকে বেশ কিছুটা বাঁয়ে এক চিলতে ভেজা মাটির খণ্ডে কয়েকজন নারী-পুরুষ বসে কাজ করছেন। আমার আর তাদের মাঝখানে মরুভূমির মতো শুষ্ক সাদা চিকচিকে বালির বিস্তার। অংশত কৌতূহলে, অংশত আমার যাত্রাপথ ঠিক আছে কিনা নিশ্চিত হয়ে নিতে বালি ঠেলে তাঁদের কাছে পৌঁছুলাম। মাত্র কয়েক বিঘত লম্বা এক টুকরো ‘ম্যাদ’ জমি, তাতে চারজন নারী-পুরুষ ভীষণ সরু স্বাস্থ্যহীন কতকগুলো পিঁয়াজের চারা পুঁতছেন। তাঁদের চারপাশ ঘিরে শুধু বালি আর বালি। অনেকটা দূরে দূরে আরও ছোটো কয়েকটা ভেজা জমির টুকরো। জানা গেল, এই ‘ম্যাদ’ বা পলি দূর থেকে এনে বালির সাথে মিশিয়ে জমির টুকরোগুলো তৈরি করা হয়েছে মাস তিনেক পর বৈশাখের ঝড় আর বৃষ্টির তাণ্ডব শুরু হবার আগেই চটজলদি কিছু পেঁয়াজ-রসুন বা মিষ্টি আলু ঘরে তোলার আশায়। আবার খেয়ালি তিস্তা নিজেও এরকম ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পলিজমির টুকরো সুবিস্তৃত বালির চরের এখানে-ওখানে ফেলে যায় প্রতি বর্ষায়; সেগুলো যে যেমন পারে দখল করে আবাদ করে। প্রতিবার বর্ষা বা বন্যা চলে গেলে চর যে রূপ পায়, সেই অনুযায়ী জমির মালিকানা নিয়ে তৎপরতা চলে। ‘ম্যাদ’ বা পলি বিশাল এলাকা জুড়ে পড়লে সেই জমির মালিকেরা দখল বুঝে নেবার জন্য আমিন এনে মাপজোকের আয়োজন করে, ঝগড়া বাধায়, মারামারি পর্যন্ত করে। আর বালি পড়লে ভ্রূক্ষেপও করে না। অনেক জমির মালিক রংপুর, ঢাকা কিংবা বিদেশে থাকে—জমির খোঁজ নিতে আসার গরজই বোধ করে না।

নদীর ঘাট থেকে রাস্তা পর্যন্ত পণ্য পরিবহনের নিজস্ব সহজ লাগসই উপায়—শুকনো কচুরিপানার রেখা-মহাসড়ক। ছবি : লেখক এরকম বেওয়ারিশ বেশ কিছু জমির দেখা পেলাম সামনে এগোতে এগোতে। সেসব জমিতে লোকেরা এমন নিবিড় মনোযোগে সবজি, আলু কিংবা তামাকের পরিচর্যা করছেন যে দেখে মনেই হয় না এ জমি তাঁদের নয়, কিংবা যে-কোনও সময় জমির মালিক এসে সব কেড়ে নিতে পারে। অবশ্য তেমন কখনওই হয় না বলে ক্ষেতে কাজ করতে থাকা গৃহস্থেরা জানালেন। গ্রামের কাছ ঘেঁষে চরের যে দিকটা সেখানে আর্দ্রতা বেশি, চাষ ভাল হয়। তবু সেচের পানির সংকট, যদিও নদী খুব বেশি দূরে নয়। জায়গায় জায়গায় বালির মধ্যে কুয়ার মতো গর্ত করে আপাতত পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে মাঘের মাঝামাঝি থেকে চৈত্র-বৈশাখ পর্যন্ত এই পানিটুকুও চরের গর্ভের আরও গভীরে চলে যাবে—তখন পাম্প ছাড়া সেচের আর কোনও উপায় থাকবে না। এখনই চরের আরও ভেতরে বালিময় জমিগুলোতে তামাক কিংবা আলুর ক্ষেতে শ্যালো পাম্প দিয়ে সেচের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। তুলনামূলকভাবে আর্দ্র জায়গাগুলোতে শাক-সবজি, আলু লাগানো হয়েছে। বালি আর শুষ্কতা যেখানে বেশি, সেখানে বসানো হয়েছে চালকুমড়োর চারা। কোথায় আবার একটু বেশি ‘রস’ বা আর্দ্রতা পেতে চারাগুলোকে বসানো হয়েছে বালিজমির ওপর বিঘতখানেক গর্ত করে। স্রেফ শুকনো সাদা খসখসে বালির ওপরে লতানো চালকুমড়োর গাছ দেখলে সেগুলোকে কেমন রূপকথার ড্রাগনের মতো কোনও প্রাণী বলে মনে হয়। 

তিস্তার চরের আরেক অদ্ভুত নিজস্ব দৃশ্য চোখে পড়লো আরও খানিকটা এগিয়ে। সামনে দূরে সবুজ দিগন্তরেখা, সেখানে নদীর বর্তমান ধারা। ওপাড়ে গাছপালা, ক্ষেত, গ্রামের ঘরবাড়ি আর ময়াল দেখা যায়। সেই দিক থেকে শুকনো কচুরিপানার একটা রেখা বালির প্রান্তরের মাঝখান দিয়ে বিরাট একটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলে এসেছে ক্ষেতগুলোর কাছাকাছি। দূর থেকে চোখে পড়ল, একটা সাইকেলের দুটো হ্যান্ডেল দুহাতে ধরে একজন এগিয়ে আসছেন—ওটার চাকাদুটো চলছে কচুরিপানার সাপটার ঠিক পেট বা পিঠ বরাবর। সাইকেলের ফ্রেমের ফাঁকটাতে আর পেছনের ক্যারিয়ারে বড় প্লাস্টিকের ভর্তি বস্তা। বাহক কাছে আসতে আমাকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখে নিজে থেকেই হাসিমুখে বললেন, চরের বালির মধ্যে এ ছাড়া আর উপায় কি! দারুণ ব্যবস্থা—আমাকে স্বীকার করতেই হলো। সামান্য একটু উদ্ভাবনী কাজ অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছে। কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ পুরু বালির স্তরের উপর দিয়ে অত ভারি বোঝা নদীর ঘাট থেকে চরের যান চলাচলের উপযোগী অংশে বয়ে আনা অসম্ভব হতো এইটুকু আয়োজন ছাড়া। আর তিস্তার চরের এই অনিশ্চিত, মায়াবীর দেশের মতো থাকা-না-থাকার ভূখণ্ডে কে বানাবে আধুনিক রাস্তাঘাট! তিস্তার চরের মানুষ তাই অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে নিজেরাই নিজেদের একান্ত নিজস্ব জীবনযাত্রা চালিয়ে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করেছে।

আমার চোখের সামনে কিছুটা দূরে প্রথম গ্রোইনটার কাঠামো স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। দ্বিতীয়টা এখনও অস্পষ্ট ছায়ার মতো দিগন্তে নেমে পড়া গাঢ় নীল আকাশ, সেখানে ভাসতে থাকা ছোট ছোট পাতলা সাদা মেঘের টুকরো আর ময়ালের সবুজের সাথে একাকার। সূর্য পশ্চিমে হেলতে শুরু করেছে, কিন্তু চরের আবহাওয়ায় এখনও আরামদায়ক উষ্ণতা ছড়ানো। সে উষ্ণতায় পেছনে ফেলে আসা সদ্যপরিচিত কিন্তু যেন বহুকালের আত্মীয় মানুষগুলোর কুটিলতাহীন হাসিভরা মুখের আলো আর অমল অকৃত্রিম হৃদ্যতা মেশানো। চলবে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

শূন্য প্রান্তরে একা

শূন্য প্রান্তরে একা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

ঐশী গল্প

ঐশী গল্প

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

সর্বশেষ

শূন্য প্রান্তরে একা

শূন্য প্রান্তরে একা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

ঐশী গল্প

ঐশী গল্প

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune