X
বুধবার, ২১ এপ্রিল ২০২১, ৮ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

সলঙ্গা দিবস, মাওলানা তর্কবাগীশ ও আমাদের সংগ্রামী অতীত

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ২০:০০

সালেক উদ্দিন
২৭ জানুয়ারি সলঙ্গা দিবস। ১৯২২ সালের এই দিনে সংঘটিত হয়েছিল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অংশ ঐতিহাসিক সলঙ্গা বিদ্রোহ- সলঙ্গা গণহত্যা। সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা হাটে সেদিন ব্রিটিশ পুলিশের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হয়েছিলেন হাজার হাজার মুক্তিকামী জনতা। মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ সেই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আর তাই তো ব্রিটিশবিরোধী মুক্তিকামী মানুষের জীবন বিলানোর তেজস্বী সংগ্রামের আখ্যান সলঙ্গা বিদ্রোহ এবং মাওলানা তর্কবাগীশ এক ও অবিচ্ছিন্ন একটি বিষয়।

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে প্রত্যক্ষ বিচরণ ছিল মাওলানা তর্কবাগীশের। পরবর্তীতে তিনি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, এমনকি আশির দশকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অবধি দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন । তার নেতৃত্বেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে সলঙ্গা আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল।

তখন ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা অসহযোগ আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলনের সময়। উপমহাদেশের মাটি থেকে ব্রিটিশদের তাড়ানোর তাগিদে দেশপ্রেমে উজ্জীবিত এ দেশের জনতা দল-মত নির্বিশেষে এ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ১৯২২ সালের ২৭ জানুয়ারি। দিনটি ছিল শুক্রবার। তৎকালীন পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে সিরাজগঞ্জ জেলার) ব্যবসায়িক জনপদ সলঙ্গায় বড় হাটবার ছিল সেদিন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে তরুণ জননেতা মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের নেতৃত্বে অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের কর্মীরা হাটে নেমেছিলেন। উদ্দেশ্য ব্রিটিশদের পণ্য ক্রয় বিক্রয় বন্ধ করা। সলঙ্গার হাটে বিলেতি পণ্য বেচাকেনা চলবে না। সলঙ্গার হাট হবে কেবল স্বদেশি পণ্যের হাট- এই ছিল স্লোগান।

এই স্বদেশি আন্দোলনের কর্মীদের দমন করতে ৪০ জন সশস্ত্র পুলিশের একটি দল নিয়ে ছুটে আসে সে সময়ের পাবনা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ সুপার ও সিরাজগঞ্জ মহকুমা প্রশাসক। সলঙ্গার গোহাটিতে বিপ্লবী স্বদেশি কর্মীদের কংগ্রেস কার্যালয় ঘেরাও করে তারা। সেখান থেকে নেতৃত্বদানকারী মাওলানা তর্কবাগীশকে গ্রেফতার করে। তাঁকে মুক্ত করতে জনতার বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। ইতিহাস বলে, ৪০ জন সশস্ত্র ব্রিটিশ পুলিশের মধ্যে একজন বাঙালি ব্রাহ্মণ পুলিশ ছাড়া ৩৯ জন পুলিশই সেই মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায়। অল্পক্ষণের মধ্যেই তাজা রক্ত আর নিথর লাশের স্তূপ জমে যায় সেখানে। সেই গণহত্যায় সাড়ে চার হাজার সংগ্রামী জনতা হতাহত হয়েছিল। ব্রিটিশদের হাতে তাঁদের গণকবর রচিত হয়েছিল। ব্রিটিশদের ভারত ছেড়ে যাওয়ার পেছনে সলঙ্গার আন্দোলন একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকার দাবি রাখে। এই আন্দোলন ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামের 'রক্তসিঁড়ি' হিসেবে পরিচিত।

সলঙ্গা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী মাওলানা খন্দকার আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ সম্পর্কে অতি সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়, তিনি ১৯০০ সালের ২৭ নভেম্বর বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার তারুটিয়া গ্রামে জন্মেছিলেন। ছেলেবেলা থেকে ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সারা জীবন তিনি শোষকের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন। মানুষের অধিকার আদায়ের, অকল্যাণের বিরুদ্ধে কল্যাণের রাজনীতি করে গেছেন। ১৩ বছর বয়সে তিনি দরিদ্র দুধ বিক্রেতাদের সংগঠিত করে দুধের ন্যায্যমূল্য প্রদানে মহাজনদের বাধ্য করেছিলেন‌। তিনি ১৯৩৩ সালে রাজশাহী চাঁটকৈড়ে নিখিল বঙ্গ রায়ত খাতক সম্মেলন আহ্বান করে ঋণ সালিশি বোর্ড আইন প্রণয়নের প্রস্তাব রাখেন। ১৯৩৭ সালে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে নাটোরে কৃষক সম্মেলন আহ্বান করেন। ১৯৩৮ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে বাংলা, আসাম ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। ১৯৪৬ সালে তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি যখন ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন সেই সংগঠনের সভাপতি। পূর্ব পাকিস্তান কৃষক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মাওলানা তর্কবাগীশ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি প্রাদেশিক পরিষদ থেকে বেরিয়ে এসে মহান ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। সে বছর ২২ ফেব্রুয়ারি মুসলিম লীগ থেকে বের হয়ে প্রাদেশিক পরিষদে বিরোধী দল গঠন করেন তিনি। আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্য হিসেবে পাকিস্তান গণপরিষদে ১৯৫৫ সালের ১২ আগস্ট তিনি প্রথম বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৬৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভূমি নির্মাণে যেসব মনীষী কালজয়ী অবদান রেখেছেন, মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ ছিলেন অন্যতম।

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় সলঙ্গা আন্দোলন-সলঙ্গা গণহত্যা এবং এই আন্দোলনের মূল উদ্যোক্তা মাওলানা তর্কবাগীশের রাজনৈতিক ইতিহাস এত অল্প পরিসরে জানানো সম্ভব নয়। তবে এই ইতিহাসে সে সময়ের রাজনীতির একটি চিত্র ফুটে উঠেছে। ফুটে উঠেছে ভারতবর্ষে বীরের জাতি বাঙালির নির্ভীক রাজনৈতিক প্রচারণার কথা। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মাওলানা তর্কবাগীশ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- এরা ছিলেন সে সময়ে রাজনীতির প্রতিকৃতি। তাঁরা মানুষের কল্যাণের জন্য, দেশের জন্য রাজনীতি করতেন বলেই হবে হয়তো মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ সলঙ্গা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামের 'রক্তসিঁড়ি' রচনা করতে পেরেছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিতে পেরেছিলেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটানো সম্ভব হয়েছিল। তাঁরা স্বার্থের রাজনীতি করেননি, জীবনের মায়া করেননি, নিজের জন্যে ভাবেননি। ভেবেছেন দেশের জন্য। দেশের মানুষের রাজনীতি করেছেন তারা।

প্রতিবারের মতো এবারও জানুয়ারির ২৭ তারিখে ‘সলঙ্গা দিবস’ উদযাপিত হয়েছে বলে ধারণা করছি। করোনাকাল বলেই ধারণা শব্দটি বললাম। এই দিন নিশ্চয়ই ১৯২২ সালের সেই দিনের কথা বলা হবে। আমাদের গৌরবোজ্জ্বল পূর্ব পুরুষদের সংগ্রামের কথা বলা হবে। বলা হবে তাঁদের সাফল্যের কথা। সলঙ্গা আন্দোলনের বীর নেতা মাওলানা তর্কবাগীশের রাজনীতির বীরত্বগাথা ইতিহাসের সিজার লিস্ট করা হবে। স্বাভাবিকভাবেই সে সময়ের ইতিহাসের অংশ হিসেবে আমাদের পূর্ব পুরুষ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা আসবে। আসতেই হবে। কারণ, তখনকার রাজনীতির লক্ষ্য ছিল একটিই। তা হলো মানুষের অধিকার ও কল্যাণ। এই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে গিয়ে জীবন বাজি রেখে রাজনীতি করেছেন তাঁরা। লক্ষ্য অর্জনে তাঁদের সাফল্য ছিল আকাশচুম্বী।

আমার বড় ইচ্ছা করছে তখনকার রাজনীতি ও রাজনীতিবিদের সঙ্গে আমাদের দেশের এখনকার রাজনীতি ও রাজনীতিবিদের একটু মিলিয়ে দেখতে। অনেক ইচ্ছা যেমন ইচ্ছাই থেকে যায়, আমার এই ইচ্ছাটিও হয়তো তা-ই হবে। আমার এই ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক এই মিল অমিলের অঙ্ক মিলাতে পারবে না। তবে অনুরোধ করবো, বাংলাদেশের রাজনীতির ধারক, বাহক, নিয়ন্ত্রকরা একটু মিলিয়ে দেখবেন। অনুরোধটি রাখুন আর না রাখুন, আমরা সাদা চোখে যা দেখছি তা হলো, এই দুইয়ের মধ্যে ফারাক বহুদূর।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

করোনা নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্সের বিকল্প নেই

করোনা নিয়ন্ত্রণে জিরো টলারেন্সের বিকল্প নেই

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বীর বাঙালির অহংকার

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বীর বাঙালির অহংকার

স্বার্থহীন ভালোবাসার দিন হোক প্রতিদিন

স্বার্থহীন ভালোবাসার দিন হোক প্রতিদিন

শহীদ আসাদ দিবস

শহীদ আসাদ দিবস

২০২০-এর সঙ্গেই বিদায় হোক করোনার বিষ

২০২০-এর সঙ্গেই বিদায় হোক করোনার বিষ

‘ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই’

‘ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই’

বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস

বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস

তবে কি শুরু হলো করোনার সেকেন্ড ওয়েভ!

তবে কি শুরু হলো করোনার সেকেন্ড ওয়েভ!

‘তবু চোর ধরতে হবে’

‘তবু চোর ধরতে হবে’

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের অলস টাকা

সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের অলস টাকা

করোনার পিক-টাইম এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত

করোনার পিক-টাইম এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত

সর্বশেষ

কোনও কিছু প্রমাণ করতে শান্তর এই সেঞ্চুরি নয়

কোনও কিছু প্রমাণ করতে শান্তর এই সেঞ্চুরি নয়

পুরনো ভিডিও ফেসবুকে লাইভ করে বিভ্রান্তি, নজরদারিতে অনেকে

পুরনো ভিডিও ফেসবুকে লাইভ করে বিভ্রান্তি, নজরদারিতে অনেকে

ভারতে কোভিশিল্ড-এর দাম ঘোষণা করলো সেরাম

ভারতে কোভিশিল্ড-এর দাম ঘোষণা করলো সেরাম

এনআইডি’র কাজ চালু রাখার নির্দেশ ইসির

এনআইডি’র কাজ চালু রাখার নির্দেশ ইসির

মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টকে উত্ত্যক্ত ও মারধরের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ

মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্টকে উত্ত্যক্ত ও মারধরের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ

নুরের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে মামলা

নুরের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে মামলা

তিন পার্বত্য জেলায় নিয়োগ তত্ত্বাবধান করবে মন্ত্রণালয়

তিন পার্বত্য জেলায় নিয়োগ তত্ত্বাবধান করবে মন্ত্রণালয়

কপাল পুড়লো সাকিবের

কপাল পুড়লো সাকিবের

রাস্তায় যানবাহনের চাপ, দুর্বল চেকপোস্ট

রাস্তায় যানবাহনের চাপ, দুর্বল চেকপোস্ট

মেডিক্যালে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটায় সাধারণ শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধের দাবি

মেডিক্যালে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটায় সাধারণ শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধের দাবি

হ্যাকারদের কবলে মেসেঞ্জার ব্যবহারকারীরা, সতর্ক থাকুন আপনিও

হ্যাকারদের কবলে মেসেঞ্জার ব্যবহারকারীরা, সতর্ক থাকুন আপনিও

বিড়ম্বনা যখন তেলতেলে নাক

বিড়ম্বনা যখন তেলতেলে নাক

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune