X
বুধবার, ২১ এপ্রিল ২০২১, ৮ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

সু চি’র বিদায় ও রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৫:৪৮

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
‘Myanmar’s military coup is no surprise’ – ঠিক এমন একটা শিরোনাম করেছেন ব্রিটিশ লেখক টম ফউদি। তার কথায়, এটিকে অং সান সু চি’র ক্ষমতা হারানো গণতন্ত্রের পরাজয় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ, কার্যত সেনাবাহিনী দেশ শাসন করছিল সুচিকে সামনে রেখে। এবার নিজেরাই সামনে চলে এলো।

বলা হচ্ছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করবে– এ তথ্য পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে আগে থেকেই ছিল। খোদ জাতিসংঘ ছাড়াও আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আরও অন্তত ১২টি দেশ গত শুক্রবারই বিবৃতি দিয়ে ক্ষমতা দখল না করার জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু সেনাবাহিনী সেই আহ্বান আর উদ্বেগকে উড়িয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখল করেছে, এক বছরের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করেছে এবং সু চি-কে বন্দি করেছে।

বিশ্বনেতৃবৃন্দ বিবৃতি দিয়েছেন। পশ্চিমা দেশগুলো এটিকে ‘গণতন্ত্রের ওপর হামলা’ হিসেবে দেখতে চাইলেও মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় আশ্রয়দাতা চীন শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপরই জোর দিয়েছে। জো বাইডেনের আমেরিকা প্রশাসন বলে দিয়েছে, পরিস্থিতি স্থিতি অবস্থায় ফিরিয়ে না দিলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের প্রতিক্রিয়া এসেছে রোহিঙ্গা সমস্যাকে মাথায় রেখে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, বাংলাদেশ মিয়ানমার পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ আশা করছে এই কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা মনে করেন, ক্ষমতায় আসার পর সু চি রোহিঙ্গা নিপীড়নে মদত দেন। সু চির জন্যই তারা জন্মভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। অং সান সু চিকে হটানোর ঘটনায় রোহিঙ্গারা খুশি বলেই মনে হচ্ছে। তবে এই প্রতিক্রিয়াকে নিশ্চিতভাবেই দেখতে হবে আবেগের প্রকাশ হিসেবে।

মিয়ানমারে আবার সামরিক জান্তা ক্ষমতায় আসায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলেই বেশিরভাগ বিশ্লেষক মনে করছেন। এক বছর যেহেতু জরুরি অবস্থা চলবে, তাই বলা যায়, এই এক বছরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে সামরিক সরকার কথা বলতে চাইবে না। সামরিক বাহিনীর লোকজন সব প্রশাসনিক ও আইনি বিষয়গুলো দখলে নিতে আর বুঝতেই এক বছর চলে যাবে। অং সান সু চি যা যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সবই তারা পাল্টেও ফেলতে পারেন।

এগুলো সবই ধারণা। কী করবে সেটা সেনা কর্তারাই জানেন। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের হাতে নির্বাহী বিভাগ, বিচার ও আইন বিভাগ। তিনি এবং তার সেনাবাহিনী তাই সেনাবাহিনী নিজেদের ঘটানো হত্যা, নিধনের সমাধান চাইবে বলে মনে হয় না। এমনিতেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি এগুচ্ছিল না, এখন আরও বড় ধরনের হোঁচট খেলো কিনা সেটা সময়ই বলবে। ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ে যৌথ পরামর্শ সভা হওয়ার কথা ছিল, তা স্থগিত হয়ে গেছে।

এক বছরের কথা বলা হলেও এই সামরিক শাসন আরও দীর্ঘায়িতও হতে পারে। সাধারণত মিয়ানমারে সামরিক শাসক একবার ক্ষমতায় বসলে তারা ছাড়তে চায় না। প্রায় ৪০ বছর মিয়ানমার সামরিক শাসকদের হাতেই ছিল। মিয়ানমারের সংবিধানেই আছে, যেকোনও সময় সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করতে পারে।

দীর্ঘ সংগ্রাম আর লড়াই করে সু চি নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু আসলে ক্ষমতা তার হাতে কখনও তেমনভাবে ছিল না। বলতে গেলে গত পাঁচ বছরে দুই ধরনের সরকার ছিল। এর একটি সু চি দ্বারা পরিচালিত বেসামরিক প্রশাসনের কিছু অংশ আর পেছন থেকে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ ছিল সামরিক বাহিনীর হাতে।

চীনের সম্পর্কটাও এই সামরিক বাহিনীর সাথেই, সু চি’র সঙ্গে নয়। সু চি-কে সামরিক বাহিনী সামনে নিয়ে এসে রোহিঙ্গা নিধনকে হালাল করার চেষ্টা করেছে। মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের হলেও এখনই কোনও উপসংহারে যাওয়া যাবে না যে কিছুই হবে না।

আমেরিকায় নতুন প্রশাসন যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতে পারে বাংলাদেশ। চীন ছাড়া প্রায় সব দেশ কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বাংলাদেশ এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারে কিনা সেটা ভাবার বিষয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নতুন করে কঠোর চাপ এড়াতে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুত শুরু করার একটা উদ্যোগই নিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন। দরকার বাংলাদেশের উদ্যোগ এবং সেটা অবশ্যই চীনা ফাঁদের বাইরে গিয়ে।
এর আগেও যে দুবার রোহিঙ্গারা এসেছিল তখনও এর পেছনে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ছিল। সে সময়ও দেশটির সামরিক বাহিনীর সঙ্গেই আলোচনা করতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। কাজেই এবারও তাদের সঙ্গেই কথা বলতে হবে। বরং বলা যায় তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয়েছে সু চি না থাকায়। বাংলাদেশের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করা আর এজন্য দেশটিতে যারা সবকিছুর নিয়ন্ত্রক তাদের সঙ্গেই আলোচনাটা ফলপ্রসূ হওয়ার সুযোগ থাকে।

লেখক: সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

কে বড়, কে ছোট

কে বড়, কে ছোট

নিজের হাতেই নেই নির্ভরতার চাবি

নিজের হাতেই নেই নির্ভরতার চাবি

লকডাউনের বাংলাদেশ ‘ভার্সন’

লকডাউনের বাংলাদেশ ‘ভার্সন’

ছবিটা পরিষ্কার হলো কি?

ছবিটা পরিষ্কার হলো কি?

জনতা চায় মারমুখী সংবাদ প্রতিনিধি?

জনতা চায় মারমুখী সংবাদ প্রতিনিধি?

বাঙালির আত্মা

বাঙালির আত্মা

‘কী একটা অবস্থা!’

‘কী একটা অবস্থা!’

কিছু কিছু ঘটনা পুলিশের নীতি-নৈতিকতার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে

কিছু কিছু ঘটনা পুলিশের নীতি-নৈতিকতার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে

পাপুল কাণ্ড

পাপুল কাণ্ড

আবিরন হত্যার বিচারে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই

আবিরন হত্যার বিচারে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই

বহুমাত্রিক দুর্নীতির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা

বহুমাত্রিক দুর্নীতির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা

কারাগারে গেলে টাকায় সব মেলে

কারাগারে গেলে টাকায় সব মেলে

সর্বশেষ

বিড়ম্বনা যখন তেলতেলে নাক

বিড়ম্বনা যখন তেলতেলে নাক

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্যদ্রব্য তৈরি, চার প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্যদ্রব্য তৈরি, চার প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা

নিউমার্কেটে গৃহকর্মী হত্যা, সেই শিক্ষিকা কারাগারে

নিউমার্কেটে গৃহকর্মী হত্যা, সেই শিক্ষিকা কারাগারে

স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বেতার যোগাযোগ পুলিশের

স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বেতার যোগাযোগ পুলিশের

সঙ্গীর মৃত্যুতে আত্মহত্যা করেছিল স্ত্রী তিমি!

সঙ্গীর মৃত্যুতে আত্মহত্যা করেছিল স্ত্রী তিমি!

হাসপাতাল থেকে বৃদ্ধাকে রেখে আসা হলো ভুল বাড়িতে অন্যের বিছানায়

হাসপাতাল থেকে বৃদ্ধাকে রেখে আসা হলো ভুল বাড়িতে অন্যের বিছানায়

২ লাখ মিটার অবৈধ জালে অগ্নিসংযোগ

২ লাখ মিটার অবৈধ জালে অগ্নিসংযোগ

করোনায় খালেদা জিয়ার সময় কাটছে যেভাবে

করোনায় খালেদা জিয়ার সময় কাটছে যেভাবে

মৌমাছির কামড়ে প্রাণ গেলো কৃষকের

মৌমাছির কামড়ে প্রাণ গেলো কৃষকের

হাত ছেড়ে দিলো মিলান-ইন্টার-আতলেতিকোও

হাত ছেড়ে দিলো মিলান-ইন্টার-আতলেতিকোও

‘তৈরি পোশাক খাতের সংকট নিরসনে ত্রিপক্ষীয় সংলাপ করা উচিত’

‘তৈরি পোশাক খাতের সংকট নিরসনে ত্রিপক্ষীয় সংলাপ করা উচিত’

তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে

তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune