X
বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

শো-অফ করতে গিয়েই মানুষ আর্টের প্রেমে পড়ে : জামাল আহমেদ

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:৩৯

শিল্পী ও অধ্যাপক জামাল আহমেদ। উজ্জ্বল রং ও আলো-ছায়ার খেলায় ফুটিয়ে তোলেন জীবনের বিরহ, বেদনা ও আনন্দকাব্য। দেশের ফিগারেটিভিসম ধারার শিল্পীদের মধ্যে অগ্রজ তিনি। ১৯৫৫ সালে জন্ম নেওয়া এ শিল্পী চারুকলায় বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৯ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। সম্প্রতি তার মুখোমুখি হয়েছেন বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক গীতিকবি জুলফিকার রাসেল।

 

জুলফিকার রাসেল : প্রথম কোন ছবিটা এঁকেছিলেন, যেটা আঁকার পর মনে হলো—এই ছবিটা আমার আঁকা!

জামাল আহমেদ : যখন থ্রি-ফোরে পড়ি তখন—কী এঁকেছি তা মনে নেই। তবে মনে আছে, লাল সূর্য উঠছে এমন একটা ছবি এঁকেছিলাম। যা একটা আবছা স্মৃতি হয়ে আছে।

 

জুলফিকার রাসেল : ছবিটি কাউকে দেখিয়েছিলেন? নাকি নিজের খাতাতেই ছিল?

জামাল আহমেদ : নিজের কাছেই ছিল। ওই আমলে তো কেউ দেখলেই বলতো, ওহ! পড়া বাদ দিয়ে ছবি আঁকছো! তখন তো সবাই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবে, এসবই বলতো। আমি পড়তাম গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলে। যেটা দেখতাম সেটাই আঁকতাম। মন থেকেও আঁকতাম। এসবের মধ্যে আব্বা সিদ্ধান্ত দিলেন, তুই মেট্রিক পাস কর, তোকে আর্ট কলেজে ভর্তি করাবো।

 

জুলফিকার রাসেল : আপনি ভালো ছাত্র ছিলেন না?

জামাল আহমেদ : এভারেজ ছাত্র ছিলাম। ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড কিংবা দশজনের মধ্যে থাকতাম না। আঁকার মধ্যে থাকতাম। আমি জানতাম, আব্বা আবেদীন স্যারকে (জয়নুল আবেদীন) চিনতেন। আর্টিস্টদের সম্মান করে সবাই, এটা তিনি সামনাসামনি দেখেছেন। তাই ভেবেছেন, নাহ, এটা তো খারাপ না। আমি মেট্রিক দেই বাহাত্তরে। বলছি, তারও আগের কথা। তখন কোনো বাবা-মা চাইতেন না তার ছেলে আর্টিস্ট হোক।

 

জুলফিকার রাসেল : বাবা চেয়েছিলেন, কিন্তু মা?

জামাল আহমেদ : বাবা চাইতেন। তাই মা-ও আপত্তি করেননি। তিনি নিজেও টুকটাক ছবি আঁকতেন।

 

জুলফিকার রাসেল : বাবা যখন বললেন তখন সেভাবে প্রস্তুতি নিলেন?

জামাল আহমেদ : আব্বা ভর্তি করালেন আর্ট স্কুলে। এটা চারুকলার ভেতরেই। এখনো আছে স্কুলটা। ওখানেই শাহাবুদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়। তিনি আমার সিনিয়র ছিলেন। তিনি নাইন-টেনে পড়তেন, আমি ফাইভে। শাহবুদ্দিন ভাই আসার সময় আমাকে নিয়ে আসতেন। শাহাবুদ্দিন ভাই যেভাবে আঁকতেন আমিও সেভাবে আঁকতাম।

 

জুলফিকার রাসেল : অনেকে তো বলে এটা ঈশ্বরপ্রদত্ত। চারুকলায় গিয়ে কী শিখলেন?

জামাল আহমেদ : না, কিছু তো মনের ইচ্ছে থাকতে হবে। চর্চাও করতে হবে। আল্লাহ দিয়ে দিলো, কিন্তু চর্চা করলাম না, তা হলে তো হলো না। যেমন গায়কদের রেওয়াজ করতেই হবে। গলা ভালো কিন্তু রেওয়াজ না করলে তো হবে না। আমাদের এক বন্ধু আছে আর্কিটেক্ট। ওর নাম পলাশ। খুব সুন্দর গলা। কিন্তু ও তো গানের চর্চা করে না। সে তো নামকরা আর্কিটেক্ট। কিন্তু গান গাইলেও নাম করতো।

 

জুলফিকার রাসেল : গানে যেমন ক্লাসিক্যাল বেইজ থাকতে হয়, তেমনি আর্টেরও বেসিক থাকতে হবে?

জামাল আহমেদ : গান কোথা থেকে আসে? গান কিন্তু মুখ থেকে আসে না, ভেতর থেকে আসে। ছবিটাও কিন্তু হাত থেকে আসে না, ভেতর থেকে আসে। একই বিষয়। ওটা গাওয়া, এটা হাতে করা। এখন ধরো হাতের কনুই থেকে যদি আসে তাহলে সেটা ক্রাফটসম্যান হয়ে যাবে। টেবিল-চেয়ার বানায় না? খুব সুন্দর ফিনিশিং—কিন্তু ওটা আর্ট হলো না। ওটা হবে ভালো টেবিল বা ভালো চেয়ার। ফিনিশিং দেয় না? জাপানিরা ভালো ফিনিশিং দেয়। আমি কিন্তু জাপানি জিনিস ধরলেই বুঝতে পারি। 

আমার মনে আছে একবার এক বন্ধু ড্রাইভ করে প্যারিস থেকে গাড়ি করে নিয়ে গিয়েছিল জার্মানিতে। প্যারিসে অনেক হোটেলে খেয়েছি। সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার। পরের দিন যেতে দেরি হয়েছে, তখনো সে বলেনি আমরা জার্মানি যাচ্ছি। বলল, চল আমরা লাঞ্চ করি। লাঞ্চ করার সময় কিছু বলেনি। সেই রেস্টুরেন্টের দরজার হাতল ধরেই বললাম, কি-রে আমরা জার্মানি এসেছি নাকি? সে তখন বলল, কীভাবে বুঝলি! বললাম, দরজার হাতল ধরেই বুঝে গেছি আমরা জার্মানিতে। কারণ ওটা ছিল বেশ পিচ্ছিল এবং যার ফিনিশিং সুন্দর। এমনটা পৃথিবীর আর কোনো দেশে হবে না। তো, এটা হলো ক্রাফটম্যানশিপ।

জামাল আহমেদ জুলফিকার রাসেল : কিন্তু আর্ট ছাড়া ক্রাফটস হবে?

জামাল আহমেদ : আমি বলছি, আমি একটা লাইন দিলাম, সেটার ভেতরে একটা লাইট থাকতে হবে। একটা শৈল্পিক বিষয় থাকবে। দপ করে বাতি জ্বললে তো হবে না। সুন্দর লাইন দিলেও হবে না। ওটার মধ্যে রিদম থাকতে হবে।

 

জুলফিকার রাসেল : আপনি তো বেসিক আর্ট জানতেনই। আত্মা থেকে সেটা তো আসতোই। তো, চারুকলা আপনাকে বাড়তি কী শেখালো?

জামাল আহমেদ : চারুকলায় ওই যে আমরা একসঙ্গে কাজ করলাম, শিক্ষকরা শেখালো। অনেক কিছুই শিখেছি। জিজ্ঞেস করলে বলতে পারবো না কী শিখেছি কিন্তু শিখেছি তো অবশ্যই। প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষার চেয়ে আমি কিন্তু বেশি শিখেছি আড্ডা মেরে। যেমন, কিবরিয়া স্যারের সঙ্গে কথা বলতাম। তিনি বলতেন আমি শুনতাম। তিনি বলতেন, ছেলেপুলে ফটোগ্রাফ দিয়ে যে ছবি আঁকে, এর থেকে আউটডোরে গেলে খারাপ ছবিটাও ভালো ছবি হবে। আর ফটোগ্রাফ দিয়ে খুব ভালো ছবি আঁকছে দেখে দেখে, এটা আসলে ভালো না। ভালো হলেও ভালো না, কারণ ওটার মধ্যে ফিলিংস নাই। হয়তো পারফেক্ট হয়েছে কিন্তু ওটার ভেতর প্রাণ নেই। আর তুমি আউটডোরে যদি আঁকো, ওটা খারাপ হলেও ভালো ছবি। এগুলো তো শিখেছি, এসব তো বুঝতাম না। মনে করতাম ফিনিশিং দিলেই বেশি ভালো।

 

জুলফিকার রাসেল : আপনি তো অনেক শিক্ষক পেয়েছেন। যেমন, কিবরিয়া স্যারের কথা বললেন। এমন অন্য শিক্ষকদের কাছ থেকে কী কী শিখেছেন?

জামাল আহমেদ : যখন থার্ড ইয়ারে পড়ি যখন তখন কী আঁকবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এক স্যার ছিলেন শহীদ কবির। তরুণ শিক্ষক। তাকে একদিন বললাম, স্যার কী আঁকবো বুঝতে পারছি না। তিনি বললেন, মানে? তোমার চোখের সামনেই তো কতকিছু। যা দেখবা সেটাই আঁকবা। সাবজেক্ট চয়েজ করা শিখেছি স্কুলের স্যারের কাছ থেকে। যেমন, সামনে কল ছিল পিতলের, সেটা ভাঙা। টুপ টুপ করে পানি পড়ছে। পানি পড়তে পড়তে নিচের ইটটা দেখা যাচ্ছে। ওটা কোনোদিন হয়তো আঁকতাম না। ভাবতাম এটা আবার সাবজেক্ট হলো? আঁকবো সুন্দর গাছ, সুন্দর নদী এসব। স্যার বললেন, আরে ওটা আঁকো। আঁকলাম, চমৎকার ছবি হলো। পিতলের কলটা ঝিলিক দিচ্ছে আর সঙ্গে শেওলা পড়া দেয়াল।

কিবরিয়া স্যারের কাছে শিখেছি আবেগ। আরেকজন ছিলেন কাজী গিয়াস স্যার। তিনি ওয়াটার-কালার শেখাতেন। হালকা লেয়ারের ওপর লেয়ার। আমরা দেখতাম পাশে দাঁড়িয়ে।

 

জুলফিকার রাসেল : আপনার কাজের মধ্যে কোন শিক্ষকের প্রভাব বেশি?

জামাল আহমেদ : আমি ছোটবেলায় শাহাবুদ্দিনকে বেশি ফলো করতাম। শিক্ষক না হলেও তাঁর প্রভাবটাই সবচেয়ে বেশি। তিনি শক্তিশালী আর্টিস্ট। শিক্ষক হলেই যে ভালো আর্টিস্ট হবেন, এমন নয়। অনেক ভালো শিক্ষক আছেন কিন্তু ছবি আঁকতে পারেন না। আমি যখন জাপানে গেলাম তখন শাহাবুদ্দিন এবং জাপানিজ শিক্ষা আর আমার নিজস্বতা মিলিয়ে একটা টেকনিক পেয়ে গেলাম। যেমন, যারা বেশি ওয়াটার-কালার করে তারা বেশ পাতলা রঙের বা বেশি ওয়াশ দিয়ে কাজ করে। কিন্তু তেলরঙে তো ওয়াশ দিয়ে কাজ করা মুশকিল। এত তারপিন, লিনসিড অয়েল পাওয়া মুশকিল। এমন সময় ১৯৮৫ সালে প্রথম দেখলাম অ্যাক্রিলিক কালার। দেখলাম, এতে তো শুধু পানি হলেই হয়। আমি প্রথম বাংলাদেশে এই কালার নিয়ে আসলাম। এখন কিন্তু সবাই অ্যাক্রিলিক ব্যবহার করে। তখন বাংলাদেশে এটা কেউ চিনতো না। আবিষ্কার হয়েছে ১৯৪৩ সালে, ঘরের কালার হিসেবে। ১৯৫৫ সালে কিছু আর্টিস্ট এটা নিয়ে শুরু করলেন ছবি আঁকা। তারপর আস্তে আস্তে আর্টিস্টরা সবাই ব্যবহার করলেন।

 

জুলফিকার রাসেল : কিন্তু টেকনিকটা কী? আপনি তো ম্যাটেরিয়ালের কথা বললেন।

জামাল আহমেদ : তেলরং আর অ্যাক্রিলিকের টেকনিক একই। একটায় তেল লাগে, আরেকটায় পানি।

 

জুলফিকার রাসেল : আপনি যে বললেন নিজস্ব একটা টেকনিক আনলেন?

জামাল আহমেদ : সবাই তো পেইন্টিংয়ের মতো করে। যেভাবে অয়েল-কালার করে, রঙ লাগিয়ে লাগিয়ে পেস্ট করে। আমি এটা ওয়াটার-কালারের মতো করে করলাম। ওয়াটার-কালার যেভাবে করে সেভাবেই ওয়াশ দিয়ে অ্যাক্রিলিক দিয়ে করলাম। মনে হবে ওয়াটার-কালার দিয়ে করেছি। যেমন, ইংল্যান্ডের কয়েকজন আর্টিস্ট আসলেন। ইন্ডিয়াতে একটা আর্ট ক্যাম্প হয়েছিল। ওয়াটার-কালার আর্ট ক্যাম্প। আমি অ্যাক্রিলিক নিয়ে গেলাম। এটাও তো ওয়াটার মিডিয়াম। ওরা বলতো, তুমি এটা কীভাবে করো? এটা তো ওয়াটার-কালারও না, অয়েল-কালারও না। ওরা অ্যাক্রিলিক চেনে, কিন্তু জানতে চাইল স্টাইলটা এমন কেন? আমি তাদের দেখালাম কীভাবে করি।

 

জুলফিকার রাসেল : জাপানের আর্ট কেমন দেখলেন?

জামাল আহমেদ : জাপানিজ শিল্পীদের যারা জাপানে থাকে ওদের কাজ একরকম। আবার যেসব জাপানিজ বাইরে থাকে যেমন, প্যারিস কিংবা আমেরিকা থাকে ওদের কাজ অন্যরকম। জাপানে যারা আছে তারা খুব কনজারভেটিভ। লাইনের বাইরে যাবে না। যে নিয়মে করতে হবে সেই নিয়মেই করবে। মেথড বা টেকনিক যেটা করতে হবে সেটার মধ্যে থেকেই করতে হবে। এর বাইরে যাবে না।

 

জুলফিকার রাসেল : তার মানে আবেগ নেই?

জামাল আহমেদ : ইমোশনটা কম। তুমি দেখো জাপানিজ কত কিছুর নাম বলতে পারবে—গাড়ি, ক্যামেরা। কিন্তু একজন জাপানিজ আর্টিস্টের নাম বলো দেখি! পারবে না। আর্টিস্টরাও পারে না অনেকে। যারা পারবে তাদেরও চিন্তা করতে হবে। আমিও এক-দুইজনকে চিনি।

 

জুলফিকার রাসেল : তা হলে জাপানে গেলেন কেন?

জামাল আহমেদ : স্কলারশিপ পেয়েছিলাম। আর জাপানে কাজ করতে সুবিধা। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি গলফ মাঠ জাপানে, কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হয় ইন্ডিয়া। মাঠ থাকলেই তো হবে না, মানুষও থাকতে হবে। তেমন, জাপানের টেকনিক থাকলেই হবে না, ইমোশনটাও লাগবে। যার কারণে তারা নাম করতে পারছে না। তবে নামকরা কিছু স্টাইল আছে। যেমন, নিহঙ্গা স্টাইল। এটা চাইনিজ স্টাইলে করা। ওটাতে ওরা খুব ভালো করে। পেইন্টিংয়ে তেমন নেই। তবে যারা আছে তারা জাপানের বাইরে থাকে। তবে ওখানে ম্যাটেরিয়াল সস্তা, স্কলারশিপও পেয়েছি—এজন্য গিয়েছিলাম।

 

জুলফিকার রাসেল : আপনার প্রিয় ম্যাটেরিয়ালস কী?

জামাল আহমেদ : এখন তো অ্যাক্রিলিক আর চারকোল।

 

জুলফিকার রাসেল : দেখলাম একটা ছবি আঁকছেন, সব মিক্সড।

জামাল আহমেদ : মিক্সড করি। যখন যেটা লাগে আর কী। যেখানে আমি ফিল করি এটা দিলে ভালো হবে তখন ওইটাই দেই। অ্যাক্রিলিক দেই, চারকোল দেই। তেলরংও দেই। যা থাকে তাই দেই। তবে জিনিসটাতে রসবোধ থাকতে হবে।

 

জুলফিকার রাসেল : আপনার কিছু কমন সাবজেক্ট আছে। যেমন, এখন দেখছি ঘোড়া, মাঝে দেখতাম পায়রা—এর কারণ কী?

জামাল আহমেদ : একেক সময় একেকটা ভালো লাগে। ঘোড়া কিন্তু আমাদের সঙ্গে যায় না। ঘোড়ার একটা ফোর্স সৌন্দর্য আছে, ডায়নামিক পাওয়ার আছে। শাহাবুদ্দিন ভাই বলেন, পাওয়ার।

 

জুলফিকার রাসেল : শাহাবুদ্দিন ভাইয়ের কাজে আপনি বেশ অনুপ্রাণিত?

জামাল আহমেদ : হ্যাঁ। শাহাবুদ্দিন ভাই আঁকেন ঘোড়া। ইন্ডিয়ার সুনীলও আঁকেন। তারটা আবার সুন্দর ঘোড়া। আর শাহাবুদ্দিন ভাই বা আমি যেটা আঁকি সেটা হলো পাওয়ার। ঘোড়া দৌড়াচ্ছে কিংবা একটা মোশন আছে। এটা করতে চাই। হয় কিনা জানি না।

 

জুলফিকার রাসেল : আপনার কি মনে হয় বাংলাদেশের মানুষ আর্ট বুঝতে শিখেছে? আগে তো অনেকেই বলতো, আর্টের কোনো চাহিদা নেই। এখন কি চাহিদা তৈরি হয়েছে?

জামাল আহমেদ : সব দেশের মানুষই আর্ট বোঝে কম। আমেরিকা, জাপান, ইউরোপ এবং বাংলাদেশেও বোঝার মতো মানুষ কম। অল্প মানুষই বোঝে, কঠিন বিষয় তো।

 

জুলফিকার রাসেল : কিন্তু ধনীরাই কেন আর্ট কেনে বেশি?

জামাল আহমেদ : ধনীদের তো টাকা আছে। একটা ছবি কেনার পর কেউ দেখে যদি বলে ওয়াও এটা তো দারুণ ছবি, তখন তারা আবার কেনে। এমন আমার বেলায় অনেক হয়েছে। যেমন, একজন ভদ্রলোকের স্ত্রীর খুব ইচ্ছে ছবি কেনার। ভদ্রলোক কিনতে চান না। পরে একটা কিনলেন। তারপর বাসায় ছবিটা যখন ঝোলালেন, তখন সবাই বাহবা দিতে শুরু করলো। তখন উনিই ছবি কেনা শুরু করলেন। মানুষের বাহবা পেতে কিন্তু ভালোই লাগে। তোমাকে যদি কেউ বলে, তোমার শার্টটা খুব সুন্দর, তুমি কিন্তু খুশি হবে।

আর দেয়াল তো কেউ খালি রাখতে পারে না। এত সুন্দর সুন্দর বাড়ি হচ্ছে। ঢাকা শহরের এই সুন্দর সুন্দর বাড়ির দেয়ালগুলোতে শুধু ক্যালেন্ডার লাগাবে না কেউ। তুমি সুন্দর গাড়ি কিনছো, সুন্দর পোশাক পরছো—তো তোমার দেয়াল খালি থাকবে কেন? অবশ্য প্রথমে মানুষ উল্টা-পাল্টা ছবি কেনে। কেনার পরে বুঝতে শুরু করে আরে এটার রঙটা তো কাঁচা। ড্রয়িংটা ভালো লাগছে না। তখন নামিয়ে ফেলে। পরে আস্তে আস্তে যখন চোখ তৈরি হয় তখনই একজন মানুষ ভালো শিল্পীদের ছবি কেনা শুরু করে। প্রথমেই তো কামরুল হাসান কেউ নেবে না। মানে রুচি বদলালেই মানুষ খুঁজে খুঁজে শিল্পীদের ছবি বের করে। ১৯৮৭ সালের দিকে তো শাহাবুদ্দিনের একটা ছবি, একটা মোবাইল আর একটা পাজেরো না থাকলে তুমি ধনীই না। আমি বলছি না এটা আহামরি কিছু, কিন্তু এমন মানসিকতা ছিল। শো-অফ করতে গিয়েই মানুষ আর্টের প্রেমে পড়ে যায়।

 

জুলফিকার রাসেল :  আপনার কি মনে হয় বাংলাদেশে ছবির দাম বেশি?

জামাল আহমেদ : আমাদের দেশে বেশি। মধ্যবিত্তরাও ছবি চায়। তাই মনে হয়, আর্টিস্টদের কিছু ছবি প্রিন্ট করলে ভালো হয়। যেমন, হোসেনের ছবি অনেক প্রিন্ট হয়েছে। শাহাবুদ্দিনও করেছেন। তারও অনেক ছবি কম দামের মধ্যে আছে। এমন হলে সবাই কিনতে পারে। ছবি এমনিতে সবার জন্যও নয়। তবে আমি চাই সবার জন্য হোক। কিন্তু সবার সাধ্যের নাগালে থাকে না।

গতবার একটা শো করেছিলাম। তখন আমার ছবিগুলা বড় বড় ছিল। দামও বেশি ছিল। পাঁচ লাখ, তিন লাখ, দুই লাখ টাকা, এমন। অনেককেই দেখেছি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছেন, জামাল ভাই একটা ক্যাটালগ দেবেন? আমার তখন খুব খারাপ লাগতো। আমার মনে হতো, আহারে এই ছবিটার দাম এত যে নিতে পারলো না। এবার কিন্তু আমি একটা এক্সিবিশন করেছি। সেখানে প্রায় পঞ্চাশটার মতো ছবি ছিল। ছবিগুলোর সাইজও ছিল ছোট। ২০-২৫ হাজার টাকার ছবি ছিল। অনেকেই কিনেছে। এটা আর্টিস্টদের বোঝা উচিত।

জামাল আহমেদ জুলফিকার রাসেল : আপনি একজন অধ্যাপক। অনেক শিক্ষার্থী আসে। আপনার কি মনে হয় এখনকার তরুণ শিল্পীরা দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে?

জামাল আহমেদ : কিছু আছে খুব তাড়াতাড়ি জনপ্রিয় হতে চায়। ছবির দাম বাড়িয়ে দেয়। আমি তাদের বলি, আমরা তো খুব তাড়াতাড়ি হইনি, তোমরাও ধীরে ধীরে হও। এখন তোমার ছবি আর আমার ছবি যদি এক দাম হয়, মানুষ তোমারটা নেবে না, আমারটা নেবে। অনেকেই তখন দাম কমায়। আমাকে কেউ যদি বলে, এই ছবিটা এত টাকায় দিন, আমি বলি ঠিকাছে নিন। আমার কাছে মনে হয়, এই গরিব দেশে মানুষ যে ছবির জন্য অর্থ দেয় এটাও তো কম না। হয়তো অনেকে বলবে, আমি বাজার নষ্ট করি। আমি এসব নিয়ে ভাবি না। এতে আমার কোনো ক্ষতি নেই। কারণ এতে করে তো ঘরে ঘরে আমার ছবি যাচ্ছে। ঢাকা শহরের অনেকের বাসাতেই আমার ছবি আছে। আমি তো একটা ব্র্যান্ড হয়ে গেছি। এখন দেখো মেয়র সাহেব বললেন, জামাল ভাই আমার একটা ছবি দরকার, পুরান ঢাকার হতে হবে। তো, আমি কি বলবো নাকি যে এত টাকা দিতে হবে? এটা কি বলা যায়? আরে উনি ছবি ভালোবাসেন এটাই তো অনেক। আমি তো জানি তিনি টাকা দেবেন। আমি তোমাকে চিনি, এখন তুমিও যদি বলো আমাকে একটা ছবি দিতে হবে। আমি জানি তুমি জানো আর্টিস্টের দাম আছে। তারপরও আমি কি বলতে পারি, আমাকে এত টাকা দিতে হবে? কখনই বলবো না। তবে অনেকেই বলেন।

 

জুলফিকার রাসেল : আপনার কি মনে হয় দেশে ছবি এঁকে জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব?

জামাল আহমেদ : হ্যাঁ সম্ভব। অনেক আর্টিস্ট তো করছে।

 

জুলফিকার রাসেল : এমন কয়জন আছে?

জামাল আহমেদ : আমার ছাত্রদের অনেকের চাকরি নাই। তারা তো করছে। অনেকে তো গাড়ি-বাড়িও করে ফেলেছে। এটা সম্ভব।

 

জুলফিকার রাসেল : তার মানে তো আর্টের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল?

জামাল আহমেদ : অবশ্যই উজ্জ্বল। মানুষের রুচি বদলাচ্ছে, নতুন নতুন বাড়ি হচ্ছে। আমার মনে আছে, একবার আমার এক বন্ধুর মেয়েকে তার বিয়েতে আমার একটা ছবি দিয়েছিলাম। আমেরিকায় নিয়ে গেছে যাওয়ার সময়। সে ফোন দিয়ে বলল, আঙ্কেল আমি এত গিফট পেয়েছি কিন্তু কিছুই আনিনি। শুধু আপনার ছবিটা এনেছি। আমেরিকায় সে কী নিয়ে যাবে? ওভেন, ফ্রিজ এসব? নিলে আর্টই নিয়ে যাবে। ২৫-৩০ বছর আগের কথা। একবার আমার বাসায় এসেছেন পরিচিত এক ভদ্রলোক। তার গার্মেন্ট আছে। এসেছেন এক স্প্যানিশ নিয়ে। সে বলল, আই নো ইউ, আই হ্যাভ সিন ইউর পেইন্টংস। তোমার কাছে ছবি আছে কিনা? আমি তখন দেখালাম। সে দামের কথা জিজ্ঞেস করলো আমি দুটো ছবি ১৫ হাজার করে ৩০ হাজার টাকার কথা বললাম। সে দিয়ে দিলো। যে নিয়ে আসলো সে আবার বিরাট ধনী। তিনি বললেন, এটা কি হলো জামাল? আমি তো দুই টাকা দিয়েও নেব না। আমি বললাম, দিস ইজ নট ফর ইউ। যার বোঝার সে ঠিকই বুঝেছে। এরপর তারা চলে গেলো।

ছয়-সাত মাস পর ওই ভদ্রলোক ফোন দিলেন। স্পেনে গিয়ে ডিনার পার্টিতে গিয়ে দেখলেন দেয়ালে সেই ছবি দুটো। এত সুন্দর ফ্রেম করেছে যে তিনি দেখে আঁতকে উঠেছেন। তিনি তখন বললেন, আরে এটা তো জামালের ছবি! পার্টিতে যারা ছিল সবাই তখন খুব প্রশংসা করছিল। এরপর ঢাকা এসেই আমাকে ফোন দিলেন। বললেন, জামাল আমার ছবি লাগবে। দুইটা ছবি দাও। আমি বললাম, আপনি তো দুই টাকা দিয়েও ছবি নেবেন না, ছবি দিয়ে কী করবেন। তিনি বললেন, আরে মিয়া ফাইজলামি করো নাকি। আমার লাগবে। তারপর তাকে ঘোড়ার ছবি দিলাম। আমাকে ৫০ হাজার টাকা দিলেন। এখন তার ছেলেও আমার ছবি কেনে। অথচ দেখো এর আগে সে দুই টাকা দিয়েও ছবি কিনবে না বলেছিল। ওই যে বিদেশ গেছে ছবি, সেখানে দেশ সম্পর্কে এপ্রিসিয়েশন পেয়েছে।

 

জুলফিকার রাসেল : করোনাকালে দেশের আর্টিস্টদের অবস্থা কেমন ছিল?

জামাল আহমেদ : করোনাকালে যেসব আর্টিস্টরা ভালো ছবি আঁকে, তারা কিন্তু ছবি ডোনেট করেছে। আমি নিজেও ১৫টা ছবি আর্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশনকে ডোনেট করেছি। ছোট ছোট ছবি। ২০ হাজার কিংবা ৩০ হাজার টাকা দামের ছবি। এরমধ্যে ৮-৯টা বিক্রি হয়ে গেছে। ওই টাকা আমি নেইনি। যেসব আর্টিস্টদের চাকরি ছিল না বা যাদের এই সময়ে আয় ছিল না তাদের দেওয়া হয়েছে। আমি একা দেইনি। অনেকেই দিয়েছেন।

 

জুলফিকার রাসেল : রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল?

জামাল আহমেদ : হ্যাঁ, সরকার থেকেও আর্টিস্টদের অর্থ সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। শিল্পকলা একাডেমি অনেক আর্টিস্টকে সহযোগিতা করেছে।

 

জুলফিকার রাসেল : শিল্পকলা একাডেমি তো আমাদের সংস্কৃতিকর্মীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। আপনার কি মনে হয় শিল্পকলা একাডেমি যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে?

জামাল আহমেদ : আমার তো মনে হয় আগের চেয়ে শিল্পকলা একাডেমির তৎপরতা এখন বেশি। একদিকে নাটক হচ্ছে, একদিকে গান হচ্ছে, আরেকদিকে নাচ। জমজমাট থাকে। পাঁচ-দশ বছর আগে এসব দেখিনি।     

 

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১২:৫১

মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬) লেখক পরিবার থেকেই এসেছিলেন। পিতৃমাতৃ—দুকূলই লেখক ছিলেন। এমনকি শ্বশুরকূলও। পুরুষানুক্রমেই এঁরা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মহাশ্বেতা দেবীর জীবনটা সাহিত্যের কাছেই সঁপে দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন দুহাত খুলে। ‘হাজার চুরাশির মা’ (১৯৭৪) তার অন্যতম আলোচিত উপন্যাস। গ্রন্থখানির পাঠপরিক্রমায় কিছুটা সাবধানী মনে এগুতে হয়। মাঝেমধ্যেই নিত্যনতুন চরিত্রের দেখাসাক্ষাৎ ঘটে। সিংহভাগ চরিত্রই দিব্যনাথ-সুজাতা পরিবারের। উপন্যাসখানি বুঝে নিতে চাইলে এদের মধ্যকার পারষ্পারিক সম্পর্ক স্মরণে রাখা খুবই জরুরি। পরিবারটি অনেকটা উনিশ শতকের ক্লাব-কালচারের ন্যায় সামন্তধারায় গড়ে ওঠে। ভোগবাদী প্রবৃত্তি এদের মধ্যে তীব্রতর। দিব্যনাথের নিজস্ব ‘চার্টার্ড অ্যাকাউনটেনসির আফিস।’ প্রতিনিয়ত মোটা টাকা আসে। জ্যোতি, নীপা অথবা তুলির স্বামীরাও কর্পোরেট কর্পোরেশনে হাই সেলারির জব করে। সবাই ভোগবিলাসে মত্ত। এদের চারিত্রিক স্খলনও কম নয়। অফিসের টাইপিস্ট মেয়েকে নিয়ে দিব্যনাথের ঢলাঢলি, মাঝেমধ্যেই রক্ষিতা নিয়ে বাইরে সান্ধ্য কাটানো। ঢেকেঢুকে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে সর্বসম্মুখে সহাস্যে এসব ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়। এসব সে পৌরুষ-অধিকার বলেই জানত। কেবল বর্তমান নয়, চিরকালই দিব্যনাথ নারী নিয়ে নোংরামি করে আসছে। শাশুড়িও কম প্রশ্রয় দেয়নি। ছেলে তার ‘পুরুষ বাচ্চা’, স্ত্রৈণ নয় বলে অহংকারও করত। দিব্যনাথের পিতাও নাকি যৌবনকালে এমনই ছিল। প্রায়শই সন্ধ্যাবেলা নারী নিয়ে বাইরে কাটাত। পরপর দুই পুরুষের নৈতিক অধঃপতন তৃতীয় পুরুষ জ্যোতি অথবা নিপাদের কাছেও সমভাবেই সমর্থন পায়। সামন্ত প্রভুর ন্যায় দিব্যনাথ নিজেকে পরিবারের ‘বস’ বলে বিবেচনা করত। সন্তানেরা অনেকেই ইনিয়েবিনিয়ে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে বাবাকে ‘বস’ বলেই সম্বোধন করত। এমনকি কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতীও। তবে এই সন্তানের মেজাজটা ছিল খানিকটা ভিন্ন ধার ও ধারার।

২.
অর্থবিত্তে স্বচ্ছল হলেও পরনারীতে অভ্যস্থ হওয়ায় দিব্যনাথ-সুজাতার দাম্পত্য-সম্পর্ক সুখের ছিল না। দিব্যনাথ সুজাতাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতো না। বরং যৌন পার্টনার হিসেবেই বিবেচনা করত। অসুখবিসুখ হলে খোঁজখবর নিত না। নবজাতকের কান্না থেকে বাঁচার জন্য তেতলায় ঘুমাত। প্রসূতি স্ত্রী থেকে দূরে অবস্থান করত। শাশুড়িমাও ছিল নারীবিদ্বেষী মহিলা। সুজাতার সন্তান জন্মদান সইতে পারত না। প্রসবকাল দেখলেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেত। তীব্র প্রসবযন্ত্রণা নিয়ে সুজাতাকে একা একাই নার্সিং হোমে যেতে হতো। দিব্যনাথের নজর কেবল একদিকে—‘আবার মা হবার যোগ্য শরীর হচ্ছে কি না সুজাতার।’ দুবছর পরপর সুজাতার চার সন্তান জন্মে। জ্যোতি, নীপা, তুলি। সর্বশেষ ব্রতী। প্রথম ও শেষে পুত্রসন্তান, মাঝখানে দুটি কন্যাসন্তান। ব্রতীর দুবছর বয়সকালে সুজাতা লম্পট দিব্যনাথের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেছিল। লেখকের ভাষায়—দিব্যনাথ কিছুতেই ওঁকে পঞ্চমবার ‘মা’ হতে বাধ্য করতে পারেনি। দিব্যনাথ সুজাতাকে ফার্মের কাজ ছেড়ে দিতে বলেছিল। সুজাতা মানেনি। ‘কাজ না-ছাড়া সুজাতার দ্বিতীয় বিদ্রোহ।’ 
বাবামায়ের মধ্যকার এই টানাপড়েন ব্রতী খানিকটা বুঝতে পারত। বুঝতে পারত মাতৃবক্ষের সুগভীরে লুকানো তীব্র গোপন ব্যথা। ব্রতীর মনটা কম্পাসের কাটার ন্যায় মমতাময়ী মাতা জগজ্জননী সুজাতার দিকে হেলে থাকত। ব্রতী সর্বদা মায়ের ওপর চোখদুটো সুস্থির রাখত। দশ বছর বয়সেও খেলাধুলা ফেলে বাড়ি চলে আসত। শিয়রে বসে মায়ের মাথায় বাতাস করত। এজন্য দিব্যনাথ ব্রতীকে সইতে পারত না। কনিষ্ঠ সন্তান হলেও শত্রু বিবেচনা করত। ব্রতীকে টিপ্পনি কেটে দিব্যনাথ কখনো বলত ‘মাদার্স চাইল্ড’ কখনো বলত ‘মেয়েমার্কা ছেলে। নো ম্যানলিনেস।’                 
মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে এই পুঁজিবাদী পরিবারের চরিত্রগুলো দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে পারিবারিক ‘বস’ দিব্যনাথ ও জ্যেষ্ঠ তিন সন্তান জ্যোতি, নীপা, তুলি। সেইসঙ্গে এদের পূর্বপ্রজন্ম ঠাকুরমাও। অপরদিকে সুজাতা ও তার কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতী। এই দ্বন্দ্ব কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমসাময়িক সমাজ অথবা রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব। এমনকি বৈশ্বিকও। বিশ্বজগৎ সংসার তখন ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দুধারায় দ্বিধাবিভক্ত। দ্বন্দ্বটা এতই জটিল ছিল যে, ভাই-বোন, পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীর সমুদয় সামাজিক ও আত্মিক বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। এমনকি রক্তের বন্ধনও।
 
৩.
দিব্যনাথপুত্র ব্রতী পিতার পুঁজিবাদী আদর্শে আস্থা হারিয়েছিল। আস্থা হারিয়েছিল সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থাপনায়। আস্থা হারিয়েছিল মুনাফাখোর ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্ধ নেতাদের ওপর। পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থার স্বপ্ন লালন করত। সমতাভিত্তিক একটি সুন্দর সুষম সমাজ বিনির্মাণের লক্ষে হৃদয় তার জেগে উঠেছিল। লেখকের ভাষায়, তখন সত্তর দশক। মুক্তির কাল। মুক্তির দশকে জনমুক্তির আন্দোলনে অনেকটা সংগোপনেই সংযুক্ত হয়েছিল ব্রতীরা। তখন সাম্রাজ্যবাদী শোষক সরকার ক্ষমতায়। জেলের পাঁচিল উঁচু করে। নতুন নতুন ওয়াচ টাওয়ার বসায়। বন্দিদের জন্য ফটকঅবন্দি খোলে না। সুগভীর রাতে ভ্যানভর্তি বন্দি এলে লেখকের ভাষায়—‘ওপর থেকে ক্রেন নামে। জন্তুর মত বন্দীকে যন্ত্রের নখে আঁকড়ে ক্রেন উঠে যায়, জেলের ভেতর নামিয়ে দেয়।’ জন্তুর মতো হলেও যারা জেলে যায়, তারা অন্তত প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু বাইরের ব্রতীরা নিদারুণভাবে প্রাণটা হারায়। রাষ্ট্রযন্ত্র নানা উপায়ে নির্মম নির্যাতন অব্যাহত রাখে। নির্জন সলিটারি সেলে নির্যাতন চালায়। লেখকের ভাষায়—‘সাউন্ডপ্রুফ। দরজা-জানালায় ফেলটমোড়ানো ফাঁপা রবারের নল বসিয়ে সাউন্ডপ্রুফ করা। ঘরের আর্তনাদ, গোঙানি, মারের আওয়াজ, জেরাকারীর গর্জন, সব শব্দ ঐ নলের জন্য ঘরের ভেতরেই বন্দী থাকে।’

৪.
বিজিত, প্রার্থ, লালটু, সমু ব্রতীর বিপ্লবী বন্ধু। এরাও চেয়েছিল স্বসমাজটিকে বদলে দিতে। সহযোদ্ধা বন্ধুদের বাঁচাতেই সেদিন ব্রতী গিয়েছিল সমুদের বাড়িতে। কিন্তু বাঁচাতে পারেননি। নিজেও বাঁচতে পারেনি। গভীর রাতে সমুদের বাড়ি ঘেরাও করে গুন্ডারা। হিংস্র গলায় বলে—‘বের করে দিন, লয়তো ঘরে আগুন দিমু!’ ব্রতীর কণ্ঠ শুনে কেউ একজন বলে ওঠে—‘হালায় আরেক মালটারে জুটাইছে। বাইর হ ঘটির পোলা।’ হাতে হাত রেখে স্লোগান দিতে দিতে ব্রতীরা বেরিয়ে আসে। বাইরে অন্ধকার। ঘুটঘুটে আধার মুখ হাসি-উল্লাসে ফেটে পড়ে। ভয়ংকর গন্ডগোল। ‘বাড়ী বাড়ী আলো নিভে যাচ্ছে, দরজা জানালা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চমকে সরে যাচ্ছে ভয়চকিম মুখ।’ সহসা স্লোগান থেমে যায়। সমবেত ঘাতকেরা খটখট গুলির শব্দ করতে করতে চলে যায়। সমুর দরিদ্র বাবা থানায় গেলে আততীয়দের নাম শুনে ধমকে ওঠে পুলিশ। পুলিশভ্যান আসতে আসতে সরে যায় ঘাতকেরা। নিতু ওরফে দীপুর মতো ভদ্রছেলেকে তো থানার সামনেই পিটিয়ে হত্যা করে। ‘প্রকৃত খুনি কখনো বন্দুক ধরে না।’ ব্রতী-সমুদের হত্যা-পরিকল্পনাকারীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এমনকি প্রত্যক্ষ ঘাতকদেরও বিচার হয় না। বুক ফুলিয়ে এরা নির্বিবাদে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। সমুর দিদিকে দেখে নির্মম ব্যঙ্গ করে, হাহা করে হাসে আর বলে—‘তর ভাইয়ের ছাদ্দ করলি না ক্যান? ভাল কইরা খাইতাম!’ সুজাতার মনে কত প্রশ্ন—যে শহরে এমন সব জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়, সেখানে পরপর কী করে সংস্কৃতিমেলা, রবীন্দ্রমেলা অনুষ্ঠিত হয়?

৫.
সুজাতা টেলিফোনেই ব্রতী হত্যার খবর পায়। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে—‘কাটাপুকুরে আসুন।’ পিতা দিব্যনাথ কাটাপুকুরে না গিয়ে দৌড়ায় পত্রিকা-অফিসে। পুত্রহত্যার খবর ধামাচাপা দিতে দিব্যনাথ ‘দড়ি টানাটানি করে বেড়াচ্ছিলেন।’ সফলও হয়েছিলেন। লেখক বলছেন—‘দিব্যনাথের ছোটাছুটি দড়ি টানাটানি সফল হয়েছিল। পরদিন খবরের কাগজে চারটি ছেলের হত্যার খবর বেরোয়। নাম বেরোয়। ব্রতীর নাম কোন কাগজে ছিল না।’ পত্রিকাপাতা থেকে ব্রতীকে মুছে দিয়েছিল দিব্যনাথ। মুছতে পারেনি মর্গ থেকে। সেখানে  ব্রতীর অবস্থান ‘হাজার চুরাশি’ নম্বরে। সেদিন ব্রতীর মৃত্যু পিতার কাছে কলঙ্কজনক মৃত্যুরূপে বিবেচিত হয়েছিল। মমতাময়ী মা সুজাতা সুস্থির থাকতে পারেননি। ছুটে গিয়েছিলেন কাটাপুকুরের লাশ ঘরে। প্রাণধন পুত্র ব্রতীর মৃত্যু নিয়ে কোথাও একটু সংশয় ছিল। তাই মুখটুকু দেখতে চেয়েছিলেন। অসীম করুণায় ডোম জানিয়েছিল—‘কি আর দেখবেন মাইজী? মুখ কি আর আছে কিছু?’ সীমাহীন মমতায় সুজাতা সবলে ব্রতীর মুখের আবরণ সরিয়ে দেয়। ‘শানিত ও ভারী অস্ত্রের উলটো পিট দিয়ে ঘা মেরে থেঁতলানো, পিষ্ট, ব্রতীর মুখ।’ আঙুল বোলানোর মতো ইঞ্চি পরিমাণ জায়গাও মসৃণ ছিল না। সবই দলিত, মোথিত, থেঁতলানো। তবু সুজাতা ব্রতী! ব্রতী! বলে আঙুল বোলায়। 
ব্রতীদের অপরাধ, ওরা দেয়ালে দেয়ালে বয়ান লিখত। ওরা লাল অক্ষরে লাল শব্দে দেয়াল রঙিন করে তুলত। কেবল মুক্তকণ্ঠে সমবেত স্লোগানই ধারণ করত না, প্রাণভরে বিশ্বাসও করত। দেবীর ভাষায়—‘ব্রতীরা এই এক নতুন জাতের ছেলে। স্লোগান লিখলে বুলেট ছুটে আসে জেনেও ব্রতীরা স্লোগান লেখে। কাটাপুকুর যাবার জন্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয়।’ ব্রতীরা এতটাই সমাজবিরোধী যে, দিব্যনাথের ন্যায় পিতারা মুখাগ্নিও করতে আসে না। ব্রতীদের লাশ কাটাপুকুরের মর্গে পড়ে থাকে। রাতে পুলিশ গাদাগাদি করে শ্মশানে বয়ে আনে। এরপর আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। শ্রাদ্ধে বিশ্বাসীজনও যথানিয়মে শ্রাদ্ধ করার সুযোগটুকুও পায় না। স্ফীত লাল চোখে বসে থাকতে হয় সারাটা দিন।

৬.
নকশাল আন্দোলনকে (১৯৭০) কেন্দ্র করে মহাশ্বেতা দেবী উপন্যাসটির আখ্যানভাগ সাজিয়েছেন। কল্পনার সঙ্গে সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতার দরকারি সমন্বয় ঘটয়েছেন। সেই সঙ্গে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তির সংগ্রামে (১৯৭১) কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা ‘বাংলাদেশের সহায় ও সমর্থনকল্পে পশ্চিমবঙ্গ তোলপাড় করে ফেলেছিল।’ কিন্তু নকশাল আন্দোলনের হত্যাকাণ্ড তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি অথবা এরমধ্যে পৈশাচিকতা খুঁজে পাননি। যদি পেতেন, ‘তাহলে ত কলকাতার কবি ও লেখক ওপারের পৈশাচিকতার সঙ্গে এপারের পৈশাচিকতার কথাও বলতেন।’ কিন্তু বলেননি। মূলত প্রান্তজনের বেঁচে থাকার লড়াই, লড়াই শেষে নিদারুণ পরিণতিই তুলে আনতে চেয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী। দেবীর গদ্যশেলীতে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও অসীম মমতায় সেটি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। উপন্যাস হয়ে উঠছে উপভোগ্য সেইসঙ্গে সাব-অলটার্ন হিস্ট্রির দরকারি দালিলিক শিল্পকর্ম। ২৮ জুলাই প্রয়াণদিবসে লেখকের প্রতি অশেষ প্রণতি।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১৮:৩৬

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা। কাঁটাবনে অবস্থিত প্রকাশনা সংস্থা ‘উজান’ এমন ঘোষণা দিয়েছে তাদের প্রকাশিত ‘কোরিয়ার কবিতা’ ও ‘কোরিয়ার গল্প’ নিয়ে আলোচনার জন্য।
এই বই দুটিতে রয়েছে কোরিয়ার বিশ ও একুশ শতকের উল্লেখযোগ্য কবিদের কবিতা এবং একই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিকদের ছোটগল্প। 
উজানের এই আয়োজনে সহযোগিতা করছে লিটারেচার ট্রান্সলেশন ইনস্টিটিউট অব কোরিয়া। 
বই আলোচনার সর্বোচ্চ পুরস্কার ২০ হাজার টাকা। এছাড়া দ্বিতীয় পুরস্কার ১৫ হাজার এবং তৃতীয় পুরস্কার ১০ হাজার টাকা। এই প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত সর্বোচ্চ ১০ আলোচকের প্রত্যেককে দেওয়া হবে ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের বই। 
আলোচনাগুলো বাছাই করবেন দেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও অনুবাদকদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারক কমিটি। একজন একটি বই নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন। আলোচনা বাংলাভাষায় লিখিত বা ভিডিও মাধ্যমে হতে হবে। 
অংশগ্রহণে ইচ্ছুক অনলাইনে ফরম পূরণ করতে করতে পারবেন এসব লিংকে www.ujaninfo.com, www.porospor.info। ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আলোচনা জমা দিতে হবে [email protected] এ।
বিস্তারিত জানতে এবং বই সংগ্রহ করতে পারবেন www.ujaninfo.com, www.facebook.com/UjanPrakashan, https://www.facebook.com/UjanBooks থেকে।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

কথা হয় জানি না 

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২১, ১৯:৪৪

কিছু ছবি এখনও আছে বলে কথা বলার দু-একটা মানুষ পাওয়া যায়>প্রতিবার মেঘ হলে মেঘমল্লার শুনে বৃষ্টি ভোলা যায় না>নিহত পশুররক্ত আর মাংস বাতাসে>দুঃখ আছে বলে কয়েকটা কবিতা এরপরও লেখা হবে>সকালগুলো ঘুমিয়ে কাটে বলে আর অপরাধবোধ জাগে না>রাত পেয়ে যাই>বাতাস কিন্তু ঘুরে যাচ্ছে>সময়ে সব বদলায় এ তত্ত্ব এখনও প্রমাণের চেষ্টা চলে>ঘরের মধ্যেও এক নেশা আসে বাইরেও এক নেশা যায়>নেশা>হেই হ্যালো, আমি হাস্নাহেনার গন্ধও পাচ্ছি>মাংসের গন্ধের সাথে>ছবি কিন্তু সব কথার উত্তর দেয়>হুহু করে উত্তর>থেকে বাতাস আসবে দুমাস পরেই>যদি বলি ছবিকে, কী, সে পাল্টা প্রশ্ন করে না>যদি বলি, কেন ও ইত্যাদি, পাল্টা প্রশ্ন করে না>যার যা উত্তর তা বুঝিয়ে দেয় আজকাল প্রতি রাতেই প্রায়>উত্তর পেতে পেতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে…>চরাচরে পাখি থাকলে বলে দিয়ো তাদের পাখায় আর কোনো শব্দ নেই>তাদের ওড়ায় আর কোনো নীরবতা নেই<

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বোকা দুপুরের নাম

বোকা দুপুরের নাম

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২১, ১২:১৮

বিকালের মেঘ ভেদ করে ঠোঁটজুড়ে আসে স্নিগ্ধ জলধারা। বহমান শান্ত জীবনের স্তুতি। তিনি হেসে চলেন, মন মাতানো মুগ্ধতা ছড়ায় চারপাশে। কংক্রিট শহরের মিহি আলোর অডিটোরিয়ামে মানুষ মানুষের বিশ্বস্ত চোখ খোঁজে। স্বপ্ন দেখে সরল বৈভবহীন জীবনের। যে স্বপ্নের স্পন্দন এখন ছড়িয়ে গেছে সমস্ত বাংলাদেশে। মঞ্চে যিনি অনর্গল কথা বলছেন সেই ‘আলোকিত মানুষ’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। বাগ্মী এ মানুষটির জীবন বহু কাজে বহু সৃষ্টিতে উদ্ভাসিত।

তাঁকে বুঝতে হলে তাকাতে হবে তাঁর অজস্র সৃষ্টিশীল বইয়ের দিকে, পাঠ নিতে হবে তাঁর আত্মজৈবনিক বইয়ের সরস বয়ান। জানতে হবে তাঁর ব্যাপক কর্মজীবন সম্পর্কে। চোখ খোলা রেখে আমাদের নিবিষ্ট হতে হবে সবুজ নিসর্গ, মানুষের কাছাকাছি বাংলার শ্যামল প্রান্তরে, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যে। সেই প্রকৃত সত্য খুঁজতে গিয়ে যন্ত্র বা নাগরিকতার ছোবলে যেখানে তাঁর হৃদয়ও আশাহত হয়েছে।

তিনি কবিতায় উচ্চারণ করেছেন―

একা একা টের পাই চারপাশে―আকাশে ও নিচে―
অবিশ্রান্ত আর্তনাদে ভেঙে যায় বহুদিনকার
ধানভানানীর গান এদেশের, পাটক্ষেত, বেহুলার ঘর―
ঢেঁকির পুরনো গল্প, সাপ, ঝোপ, দোয়েলের দেশ―
বাংলাদেশের আবহমানের।
(শাব্দিত কলঘর, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ২০)

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, জন্ম ২৫ জুলাই ১৯৩৯ সালে। অবিভক্ত ভারতে কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায়। পিতা সেময়কার স্বনামধন্য অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও নাট্যকার আযীম উদ্দীন আহমেদ, মাতা করিমউন্নেসা বেগম। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলায়। দেশভাগের পর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ পরিবারের সাথে চলে আসেন তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে। পিতার চাকরি সূত্রেই তার শৈশবের কিছু সময় কাটে টাঙ্গাইলের করটিয়ায়। সেখানকার বংশী নদী তাঁর শৈশবের মনোহর চিন্তায় দারুণভাবে গেঁথে আছে। তাঁর আত্মজৈবনিক বই বহে জলবতী ধারা প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, নিষ্ফলা মাঠের কৃষক ইত্যাদি তাঁর বহমান জীবনের নানান অভিজ্ঞতা, জীবন গল্পের সুনিপুণ বৃত্তান্ত। পিতার নাট্যচর্চা ও কবিতার খেয়াল তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করত। কলেজে পড়া অবস্থায় বুঁদ হয়েছেন কবিতায় ও সরল জীবনের দর্শনে। মূলত তার ব্যাপ্তিময় জীবনের ভিতটা সেসময়ই রচিত হয়েছিল। কলেজজীবনে তার কিছু শিক্ষকের অবদানও এক্ষেত্রে স্বীকার্য। কলেজজীবনেই তিনি ভ্রমণ করেন ইংরেজি কবিতা ও বাংলা কবিতার অপার সৌন্দর্যের ভূমিতে। যা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৬১ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে যোগদানের মধ্যদিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়। যা অব্যাহত ছিলো ১৯৯২ সাল পর্যন্ত। হরগঙ্গা কলেজ ছাড়াও শিক্ষকতা করেছে সিলেট মহিলা কলেজ, রাজশাহী কলেজ, ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজ (বর্তমানে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ) এবং সর্বশেষ ঢাকা কলেজে দীর্ঘসময় অধ্যাপনার পর অবসর গ্রহণ করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে বাংলা পড়াতেন। অধ্যাপক হিসেবে তার সফলতা ও জনপ্রিয়তা ছিল গগনচুম্বী। মূলত তাঁর সকল কাজের মাধ্যমেই তিনি মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। উজাড় করে দিয়েছেন সবটুকু। শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিজের কথায়―

আমি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলাম। সাহিত্যের স্বপ্ন ও সৌন্দর্য আজীবন আমার চেতনা-জগতে যে-হীরের দীপ্তি ছড়িয়েছে আমি সেই উজ্জ্বলতাকে ছাত্রদের ভেতরে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছি। তাদের সেই আনন্দে উজ্জীবিত করতে চেয়েছি। পরীক্ষায় ছাত্রদের বেশি নম্বর পাওয়াবার জন্যে পরিশ্রম করে জীবন নিঃশেষ করাকে আমার কাছে ‘দুর্লভ মানবজন্মে’র অপচয় বলেই মনে হয়েছে। জীবন কত দীপান্বিত ও জ্যোতির্ময় তা একজন ছাত্র সবচেয়ে ভালো করে জানতে পারে তার জীবনে দীপান্বিত শিক্ষকদের কাছ থেকে। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১১)

বর্তমান সময়ের শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে স্পষ্ট কথা বলতেও এ সফল অধ্যাপক দ্বিধা করেননি। প্রসঙ্গক্রমেই তিনি লিখেছেন―

আজ দেশের স্কুল-কলেজগুলোয় কার্যত লেখাপড়া হচ্ছেই না। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ লক্ষ শিক্ষকের অধিকাংশই শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নন, যাঁরা যোগ্য তাঁরা ছাত্রদের দেন অতি সামান্য। ফলে অভিভাবকরা কেউই বিদ্যালয়কে আজ তাঁদের সন্তানদের বিকাশের অঙ্গন হিসেবে মনে করেন না। ফলে বাণিজ্যিক উদ্যমসম্পন্ন গৃহশিক্ষকরা আজ হয়ে উঠেছেন ছাত্রসমাজের মূল আশ্রয়। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১৭৬)

বাংলাদেশের ষাটের দশকে নতুনধারার সাহিত্য সৃষ্টির আন্দোলনের পুরোধা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। প্রায় একযুগ ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা সম্পাদনা করার মাধ্যমে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলা সাহিত্য বাঁকবদলের ধারায়, প্রগতিশীল সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াসে। নিশ্চিত আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন সেসময়কার তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনালগ্ন হতে যুক্ত হন উপস্থাপনায়। রুচিশীল ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, উপস্থাপনায় তার নিজস্ব ধরন ইত্যাদি কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় উপস্থাপক খ্যাতিতে ও ব্যক্তিত্বে। তাঁর হাত ধরেই অনেক মেধাবী তরুণ উঠে আসে। তাঁর ‘আমার উপস্থাপক জীবন’ বইটিতে তিনি তুলে ধরছেন তাঁর উপস্থাপক জীবনের নানান দ্বন্দ্ব ও প্রতিকূলতা। বর্ণনা করছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে যাত্রা আর সমৃদ্ধির বিভিন্ন দিক। আমাদের মহান মুত্তিযুদ্ধে পাকসেনাদের হাতে আটক হয়েছিলেন তিনি। উপস্থাপক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচিয়ে ছিল বলে তিনি বইটিতে বলেছেন নির্দ্বিধায়। তাঁর ‘সংগঠন ও বাঙালি’ বই পাঠকের কাছে খুবই জনপ্রিয়। জাতীয় জীবনে সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা, বাঙালির সংগঠনের দুর্বলতা এবং তা কীভাবে আমাদের জাতীয় জীবনে উন্নতির মূলবাধা হয়ে দাঁড়ায় তার স্পষ্ট বয়ান রয়েছে বইটিতে। সংগঠনের অভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রায় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, ব্যক্তি ডুবে থাকে তা আত্মকেন্দ্রিকতায় এসবের সত্য উপলব্ধি উঠে এসেছে তাঁর লেখায়।

১৯৭৮ সালে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। তিনি কবিতায় লিখেছেন―

রাত্রিকে বাসে না ভালো কেউ সম্প্রতি। কেননা এ
রাত্রি সব এক করে দেয়। রাত্রির নির্বাক কাফন
জামার পৃথক রঙ, স্বতন্ত্র চুলছাঁটা, আস্তিনে মাপ
মুছে দিয়ে সবাইকে আদ্যোপান্ত এক পাতলুনের ভেতর
নিয়ে আসে।
(মৃত্যুময়ের জন্য, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ৫৬)

হ্যাঁ, তিনি এমন রাত্রিকেই দূর করতে চেয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন সংস্কৃতিমান, মুক্ত চেতনার সৃজনশীল মানুষ না হলে আগামী বাংলাদেশ হবে অনুর্বর, অন্ধকার। তিনি বইয়ের সোনালি অক্ষরে, জ্ঞানের অমৃতবাণীতে বদলাতে চেয়েছেন সমাজকে, তরুণদের। বই পড়া আন্দোলন ও নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লক্ষ হচ্ছে―আগামী দিনের অর্থাৎ তরুণদের বড় করে তোলা ও তাদের সংঘবদ্ধ জাতীয় শক্তিতে পরিণত করা। প্রায় বিয়াল্লিশ বছর ধরে তাঁর নেতৃত্বে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বিভিন্নভাবে কাজ করে চলেছে অবিরাম। এগুলো মধ্যে রয়েছে―দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রম, পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি, আলোর ইশকুল, কেন্দ্রের লাইব্রেরি, আলোকচিত্র চক্র, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি। সারা দেশে প্রায় ২৪ লাখ ছাত্র/ছাত্রী বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কার্যক্রমের সাথে যুক্ত। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন―

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবনের সর্বাধিক কীর্তি হিসেবে দেখা দেয়। যেখানে আমরা অনেকে মিলে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারি না, সেখানে একক প্রচেষ্টায় এত বড় একটা প্রতিষ্ঠান গড়া যে তাঁর বিশেষ যোগ্যতার প্রকাশ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর ব্যাপ্তি সারা দেশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের সীমানা ছাড়িয়েও।…সায়ীদ লিখেছেন প্রচুর। কবিতা ও ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও ভাষণ, স্মৃতিকথা ও জার্নাল, নাটক ও অনুবাদ।…তাঁর মধ্যে মিলিত হয়েছে শিল্পী ও কর্মী, ভাবুক ও উদযোগী। তাঁর চিন্তা ও সাধনায় দেশ ক্রমাগত উপকৃত হোক। (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, পৃ. ৩৫, ৩৬)

সত্যিকারভাবেই বহুমুখী কাজের মাধ্যমে তিনি উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩২টি। গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতায় সাহিত্যে বিভিন্ন শাখায় তিনি অবদান রেখেছেন ও রেখে চলেছেন। সামাজিক নানা কাজেই তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। যেমন ডেঙ্গু প্রতিরোধ আন্দোলন, পরিবেশ দূষণবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি। তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন সম্মাননা ও পুরস্কার। এগুলোর মধ্যে আছে―জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার (১৯৭৭), র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার (২০০৪), একুশে পদক (২০০৫), পরিবেশ পদক (২০০৮), বাংলা একাডেমি পদক (২০১২) ইত্যাদি।

‘আলোকিত মানুষ চাই’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের দেখানো পথেই আগামী দিনের তরুণদের মধ্যে ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’ বই পড়ার মাধ্যমে এমন অনুভূতির প্রবহমানতায়, চর্চায় হয়তো আমরা পাব সংঘবদ্ধ, প্রগতিশীল, আত্মকেন্দ্রিক জীবনকে পেছনে ফেলে আসা দেশপ্রেমিক বুদ্ধিদীপ্ত এক প্রজন্ম। যা বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।

এ মহীরুহের জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা।

সহায়ক গ্রন্থ

১. বহে জলবতী ধারা (প্রথম খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
২. বহে জলবতী ধারা (দ্বিতীয় খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০১১।
৩. মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৮৮।
৪. নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৫. বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৬. আমার উপস্থাপক জীবন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৫।
৭, সংগঠন ও বাঙালি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
৮. আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, সম্পাদনা―আতাউর রহমান, ঢাকা, ২০১৫।
৯. ইন্টারনেট।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২১, ০৯:০০

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (২৩ জুলাই, ১৮৯৮-সেপ্টেম্বর ১৪, ১৯৭১) বিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি কথাসাহিত্যিক। তার সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি গল্পগ্রন্থ, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধের বই, ৪টি আত্মজীবনী, ২টি ভ্রমণ কাহিনী, ১টি কাব্যগ্রন্থ এবং ১টি প্রহসন। তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, পদ্মশ্রী এবং পদ্মভূষণ পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন।

 

যা খুব ছোট, তাকে খুব কাছ থেকে না দেখলে ভালো করে চেনা যায় না। দূর থেকে তা অস্পষ্ট দেখায়। কিন্তু যা খুব বড়, একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে তাকে না দেখলে, তার ব্যাপ্তিটা অধরা থেকে যায়। প্রথম হিমালয় দর্শনে ঠিক এই রকমই একটা সম্ভ্রম জাগানো অনুভূতি হয় যেকোনো মানুষের। কিন্তু আস্বাদন পরিপূর্ণ হয়, শুধু দূর থেকে নয়, যখন কাছে গিয়েও তাকে দেখি।
কিন্তু আমার তারাশঙ্করের দর্শন ঘটেছিল এর ঠিক বিপরীত ক্রমে। তাঁকে প্রথমে দেখেছিলাম খুব কাছ থেকে, পরম স্নেহের নৈকট্যে। সে প্রথম যে ঠিক কবে তা আজ আর বলতে পারি না—তবে স্মৃতির ভেতরে প্রথম যে ছবিটি দেখি তা সম্ভবত ১৯৪৮ এর, এবং স্থান কলকাতারই বাগবাজারের ১/১ আনন্দ চ্যাটার্জি লেনের একটি বাড়ির দোতলার ঘরে। একটি সাবেকী আমলের খাটের ওপর চড়ে আমরা তিনটি শিশু খেলছি, লাফাচ্ছি, কখনো বা নাচছি—আর অদূরেই কৃষ্ণবর্ণ ধ্যানমগ্ন এক প্রৌঢ় ছোট্ট একটি কাঠের ডেস্কের ওপর গভীর নিবিষ্ট হয়ে লিখে চলেছেন পাতার পর পাতা। মুক্তোর মতো অক্ষরে একে একে ফুটে উঠছে বাংলা কথাসাহিত্যের উজ্জ্বলতম রত্নখনি। তবু সে সান্নিধ্য এত সহজ ছিল বলেই হয়তো আজও সমানভাবে স্পষ্ট। তিনি লিখছেন আর আমরা—তাঁর নাতিনাতনিরা খেলছি। খেলা যখন ছিল তোমার সনে/তখন কে তুমি তা কে জানতো? জানতে পারিনি ঐ নৈকট্যের জন্যই হয়তো-বা। ফলে আমাদের খেলাটা ছিল অবাধ। কখনো ঘরে কখনো ঘর ছাড়িয়ে বারান্দায়—সরু লম্বা বারান্দার ওপাশে আরেকটা বারান্দায় কখনো কখনো দেখা দিতেন লং ক্লথের পাঞ্জাবি পরা, সাদা চুল এক বৃদ্ধ। দাদুর যামিনী দা—শিল্পী যামিনী রায়। মাঝে মাঝে দুই জ্যোতিষ্কের বার্তাবিনিময় হতো এপার ওপার।
ইতিমধ্যে দাদুর সাহিত্যিক খ্যাতি বাড়ছিল। বাড়ি তৈরির কাজও চলছিল। ১৯৪৯ এ বাগবাজার ছেড়ে তিনি উঠে গেলেন টানাপার্কে তাঁর নিজস্ব বাড়িতে। তার কিছুকাল পরেই আমরাও চলে এলাম পাইকপাড়ায় গোয়েল্কা গার্ডেন্স-এর একটি আশ্চর্য সুন্দর ফুটফুটে ফ্ল্যাটে। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। খুব কাছেই দাদুর বাড়ি। রোজ বিকেলে খেলতে যেতাম ওবাড়ির পাশের মাঠে। বাড়ির সামনেই বোগেনভেলিয়ার ছায়অর নিচে দুপাশে রোয়াক, মাঝে বেতের চেয়ার পাতা। দাদু বসে আছেন। তাঁকে ঘিরে আরো কতজন। কথা হতো কত বিষয়ে। মাঝে মাঝেই শৈল দাদু এসে উপস্থিত হতেন। সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। দাদুর বাড়ির ঠিক বিপরীতে আর্মড পুলিশের ক্যাম্প। তার ওপাশে ইন্দ্রবিশ্বাস রোডের ওপর বাড়ি করেছিলেন শৈল দাদু। প্রতিদিন সকালে বন্ধু সন্দর্শনে তাঁর আসাটা ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। দাদুও যেতেন।
কিন্তু সে অনেক পরের ঘটনা। ১৯৬০-৬১ নাগাদ তখনো সজনীকান্ত দাস বেঁচে। শনিবারের চিঠি প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত রমরমিয়ে। শৈলজানন্দের বাড়ি থেকে পূবদিকে আরেকটু এগোলেই সজনীকান্তের বাড়ি। নিচে বিশাল অফিস, প্রেস আর সেখানেই বাংলার তাবড় তাবড় সাহিত্যিকদের আড্ডা। সে আড্ডায় তারাশঙ্করকে, শুনেছি বড়বাবু বলেই চিহ্নিত করা হতো।
দেখতে দেখতে আমাদের টালা-পাইকপাড়া অঞ্চলটা একসময় সাহিত্যিকদের তীর্থস্থান হয়ে উঠল। মন্মথ দত্ত রোডের একটি ফ্ল্যাটে কাজী নজরুল ইসলাম; কিন্তু তাঁর চৈতন্য তখন মহামগ্ন। আরেকটু এগিয়ে সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্র। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীও এলেন কিছুকাল পরে, শৈলজানন্দের বাড়ির একতলায়। পাইকপাড়ায় আমাদের বাড়িরই কাছে হাউসিং স্টেটে থাকতেন গৌরকিশোর ঘোষ।
চাঁদের শোভা থাকে, সূর্যের রামধনু। বিদ্রোহী কবি তখন ফুলের জলসায় নীরব। তাঁকে বাদ দিলে, বাকিরা ছিলেন তারাশঙ্করের...। তাঁর সভার নিত্য অতিথি।
কিন্তু আরো দুজন ছিলেন, তাঁরা শুধু তাঁর... ছিলেন না, তাঁর ভাবের অংশীদারও ছিলেন। একজন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র, আমার বড়মামা সনৎকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরেকজন আমার বাবা, তারাশঙ্করের জ্যেষ্ঠ জামাতা শান্তিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়। শুধু আত্মীয় নয়, এঁরাও ছিলেন তাঁর সভার...।
আরো কতজন, কত গুণীজন, কত কবি সাহিত্যিক শিল্পী যে তাঁর বাড়িতে পদচিহ্ন রেখে গেছেন তার হিসাব দেওয়া অসম্ভব। এসেছেন বনফুল, অচিন্ত্যসেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, প্রবোধ সান্যাল, আশাপূর্ণা দেবী, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী—এমনি আরো কত যে গুণীজন। আর এঁদের... আর ফুলের গন্ধে—টালাপার্কের বাড়ি ভরে উঠত প্রতিবছর ৮ই শ্রাবণ—তারাশঙ্করের জন্মদিন। বাড়িতে মানুষ ধরত না। তাই ম্যারান বেঁধে—সে এক বিপুল আয়োজন। ফুলের গন্ধের সঙ্গে যোগ দিত খাবারের মন মাতানো গন্ধ।
বছরে দুটি দিনের জন্য আমাদের ছিল একমাত্র প্রতীক্ষা দুর্গা পুজো আর আটই শ্রাবণ। আমাদের মধ্যে আবার আমার দিদি, শকুন্তলার প্রতীক্ষা ছিল সবচাইতে ব্যাকুল। কারণ, কি সৌভাগ্য ওরও জন্মদিন ঠিক ওই ৮ই শ্রাবণ। একে বড় নাতনি, তার জন্মদিনের ঐ একসূত্রতা। দাদুর কাছে ওর ছিল একটু বিশেষ সমাদর। ওকে নিয়ে কবিতাও লিখেছিলেন তিনি—
তুমি যখন হবে পঞ্চদশী
আমি হব ষাট বছরের বুড়ো
তুমি খাবে কড়মড়িয়ে মেঠাই
আমি খাব চেটে চেটে ঝুরো।

দাদুর বয়স যখন পঁয়তাল্লিশ, তখন দিদির জন্ম। অতএব দাদুর যখন ষাট, দিদি তখন পঞ্চদশী। টীকা আরো একটু হয়তো অপ্রায়োগিক হবে না। বীরভূমে মিঠাইকে বলে মেঠাই, মেটাই, কিংবা আরো সঠিকভাবে বললে ‘মিটিই’। মনে হতে পারে মিঠাই কি তবে কড়মড়িয়ে খাওয়া যাবে? আসল কথা হলো, মেঠাই মানে বীরভূমে সন্দেশ নয়—গুড় আর বেসনের লম্বা লম্বা কাঠিভাজা, ওখানে বলে সিড়িভাজা—তার নাড়ু—বেশ শক্ত, কড়া পাকেঢ়। কড়মড়িয়েই খেতে হয়। প্রতিবছর পুজোর সময় ঘরে ঘরে এইসব মেঠাই, নারকেল খণ্ড, খই বিনু—এমনি আরো কত কি তৈরি হতো। আর ঝুরো হলো শুকনো বালিগুড়। এও বীরভূমেরই শব্দ।
সে তো আসবেই। তারাশঙ্করের কবিতায় বীরভূম আসবে না, লাভপুর আসবে না—তাই হয়! কোনো না কোনোভাবে আসবেই আসবে। তাঁর শেকড় যে ঐ মাটিতেই। আর জীবনের শেষ মুহূর্তেই তাঁর ভ্রুযোগ ছিন্ন হয়নি। প্রায়ই যেতেন গ্রামের বাড়িতে। তাঁদের যে সাবেক বৈঠকখানা বাড়ি—খড়ের চাল, এপাশ ওপাশ বারান্দা, সামনে বাগান—আর এই বাগানেই তিনি রোয়াক বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন, ভারী সুন্দর একটা গোলঘর বানিয়ে ছিলেন। সামনে নানান ফুলের গাছ। রোয়াকের পাশে চেয়ার পাতা—এখানেই বসতেন বন্ধুবান্ধব পরিচিতজনের সঙ্গে। গল্প হতো। কখনো অন্ত্যজ শ্রেণির বহু মানুষ আসতেন। তাঁর কাছে তাঁরাও ছিল আপনজন। পুজোর সময় সবাইকে কাপড় দিতেন। অর্থ সাহায্য দিতেন সাধ্যমতো।
লাভপুরকে তিনি ভোলেননি। আর লাভপুরও আজও ভোলেনি তাঁকে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

সর্বশেষ

‘৩ ডোজ টিকা নেওয়া’ সেই সৌদি প্রবাসী কোথায়?`

‘৩ ডোজ টিকা নেওয়া’ সেই সৌদি প্রবাসী কোথায়?`

বাগেরহাটে পানিবন্দি হাজারো পরিবার, টর্নেডোতে বিধ্বস্ত বাড়িঘর

বাগেরহাটে পানিবন্দি হাজারো পরিবার, টর্নেডোতে বিধ্বস্ত বাড়িঘর

ক্যাম্প থেকে পালিয়ে কুড়িগ্রামে আটক ৯ রোহিঙ্গা

ক্যাম্প থেকে পালিয়ে কুড়িগ্রামে আটক ৯ রোহিঙ্গা

করোনায় আটকে আছে ত্রিদেশীয় বৈঠক

করোনায় আটকে আছে ত্রিদেশীয় বৈঠক

কিউকম ও রানার এর মধ্যে ব্যবসায়িক চুক্তি

কিউকম ও রানার এর মধ্যে ব্যবসায়িক চুক্তি

বলপূর্বক কাবুল দখল করলে তালেবান স্বীকৃতি পাবে না: যুক্তরাষ্ট্র

বলপূর্বক কাবুল দখল করলে তালেবান স্বীকৃতি পাবে না: যুক্তরাষ্ট্র

বিলের মাঝখানে উপহারের ঘর, ডুবলো পানিতে

বিলের মাঝখানে উপহারের ঘর, ডুবলো পানিতে

নতুন রূপে ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের’ পথ চলা

নতুন রূপে ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের’ পথ চলা

পাকিস্তান-ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৯ ওভারের ম্যাচটিও শেষ হলো না

পাকিস্তান-ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৯ ওভারের ম্যাচটিও শেষ হলো না

দেয়ালেও করোনাভাইরাস, সাতক্ষীরা মেডিক্যালের ল্যাব বন্ধ

দেয়ালেও করোনাভাইরাস, সাতক্ষীরা মেডিক্যালের ল্যাব বন্ধ

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় পরিবেশমন্ত্রীর

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় পরিবেশমন্ত্রীর

সেই লাকী আক্তারের কণ্ঠে কন্যা ও কান্নার গল্প (ভিডিও)

সেই লাকী আক্তারের কণ্ঠে কন্যা ও কান্নার গল্প (ভিডিও)

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

থিয়েটার

থিয়েটার

গহন
শীতের অপেক্ষা করছি না

শীতের অপেক্ষা করছি না

মন্তাজের নিজের জমি

মন্তাজের নিজের জমি

© 2021 Bangla Tribune