X
বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

আল মাহমুদের মুখোমুখি মোহাম্মদ সাদিক এবং শামীম রেজা

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৩:০০

আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি। কবিতা ছাড়াও তিনি উপন্যাস, ছোটগল্প ও শিশুসাহিত্যে বিশিষ্টতা অর্জন করেছেন। ১৯৩০-এর কবিদের হাতে বাংলা কবিতায় যে আধুনিকতার উন্মেষ, তার সোনালি শস্য আল মাহমুদ বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ব্যবহার করে চলেছেন। তবে তা ইউরোপীয় বন্দর থেকে বাংলার লোকজ জীবনের দিকে চোখ রেখে। তিনি জন্মেছেন ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোড়াইল গ্রামে। আজ তার মৃত্যুদিন। তিনি ২০১৯ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। এ উপলক্ষ্যে কবি আল মাহমুদের সঙ্গে কবি মোহাম্মদ সাদিক এবং কবি শামীম রেজার আপচারিতার নির্বাচিত অংশ পুনর্মুদ্রণ করা হলো।

 

মোহাম্মদ সাদিক : মাহমুদ ভাই, আপনার শরীর কেমন আছে?

আল মাহমুদ : মোটামুটি ভালোই, তবে...

মোহাম্মদ সাদিক : গোল্ডলিফ সিগারেট খান যখন—তখন তো শরীর ভালোই আছে!

আল মাহমুদ : কথা হলো—বয়স হলো তো।

মোহাম্মদ সাদিক : কই বয়স হলো আপনার?

শামীম রেজা : কোথায় বয়স হয়েছে? আপনাকে তো সেই তরুণই লাগছে!

মোহাম্মদ সাদিক : আপনার এই শার্টটা দেখে তো মনে হচ্ছে আপনার মতো খুব তরুণ বয়সের নাসিরুদ্দিন (সম্পাদক : সওগাত) স্যারকে আমি একবার হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামাবার চেষ্টা করেছিলাম। উনি আমাকে বলেছেন, “তুমি আমার হাত ধরো কেন? আমি কি বুড়ো হয়ে গেছি?” আপনি তো সেই প্রজাতির লোক। আপনি তো কখনো বুড়ো হতে পারেন না।

শামীম রেজা : আপনি ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ লিখেছিলেন তারপরে ওরকম করে আত্মজৈবনিক লেখা অনেক পেয়েছি আপনার টুকরা টুকরা- এখানে ‘আমি ও আমরা’ এরকম করে- ওরকমের কোন আত্মজৈবনিক লেখা লিখেছেন এরপরে?

আল মাহমুদ : একটা লেখা বোধহয় লিখেছিলাম। ‘বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ’।

শামীম রেজা : হ্যাঁ। সে কথা অবশ্য ওরকম করে আসে নাই।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনার মনে আছে বোধকরি আশির দশকের ফরিদ কবির, আমি আসতাম আপনার কাছে, আপনার পঞ্চাশ বছরের প্রেমের কবিতা, ছবি, আপনার হাতের লেখা এগুলোও ছেপেছিলাম। তখন আপনি খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন, তার আবার অনুবাদও বেরিয়েছিলো।

আল মাহমুদ : হ্যাঁ।

মোহাম্মদ সাদিক : তখন বেশ সময় আমরা কাটিয়েছিলাম আর আপনি বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রে একবার বলেছিলেন “পঞ্চাশের দশকে যখন লিখতে শুরু করি তখন বারো কিংবা তেরো নম্বরে ছিলো আমার সিরিয়াল। বুঝতে পারছ, তোমাদের ঐ শামসু মিয়া এক নম্বরে ছিলো। যুদ্ধ যখন শুরু হলো তখন দেখলাম একে একে সব বীরেরা ধরাশায়ী হয়ে গেছে। মঞ্চে রক্তাক্ত তরবারি হাতে দাঁড়িয়ে আছি আমি আর শামসুর রাহমান। কই একটা দামি সিগারেট দাও দেখি”-মনে আছে?

এখন আমাদের জানতে খুব ইচ্ছে, এই প্রশ্নের আপনি সহস্রবার উত্তর দিয়েছেন যে আপনি কেন কবিতা লেখেন? অন্য কিছু করলেন না কেন?

আল মাহমুদ : এটা তো খুব জটিল প্রশ্ন। সংজ্ঞা নাই। কারণ কবিতা যারা লেখে তারা কিন্তু অল্প বয়স থেকেই এই ইচ্ছাটা ধারণ করে “কবি হব”। তা আমারও এই রকম ইচ্ছা ছিলো যে কবি হব।

মোহাম্মদ সাদিক : সেটা কোন বয়সে?

আল মাহমুদ : কথা হলো যে কবির কাজ কী? এই প্রশ্নটা উঠে যে কবি কি করে? কবির কাজ হলো— আমার ধারণা- তার জাতিকে স্বপ্ন দেখানো। সুখের স্বপ্ন। মানে স্বপ্নের মধ্যে রাখা। এটা হলো কবির প্রধান কাজ। কম-বেশি এই কাজটিই আমি আমার জীবনে করে গেছি। এখন কথা হলো আমাদের দেশে মূল্যায়নটা হয় ঠিকই, কিন্তু বিলম্বে হয়। তা আমার কবিতা আমি লিখেছি এবং কবিতার পক্ষে বলেছি। এর একটা মূল্যায়ন আমি আশা করতাম, তা আমাকে পে করতে হবে বা দিতে হবে আশা করি।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি কি মনে করেন আপনার মূল্যায়ন করতে এ জাতি দেরি করেছে?

আল মাহমুদ : সেটা ঠিক বলা যাবে না। কারণ প্রতিদিনই তো দেখছি, টিভিতে দেখছি, ইয়েতে দেখছি আমাকে নিয়ে কথাবার্তা হয়, কমবেশি কিন্তু হয়, এটা তো এক ধরনের...

মোহাম্মদ সাদিক : হ্যাঁ, আপনি যখন কবিতা দেন তখন তো তা লিড কবিতা হিসেবে যায়, সব সংকলনে।

শামীম রেজা : কিন্তু আপনার কি মনে হয়নি কখনো যে— আপনি মূল্যায়নের কথা বলছেন—যে লেখাটা আপনি লিখতে চেয়েছেন, তা লিখতে পেরেছেন? বা এখনো লিখতে পারেন নাই, চেষ্টা করছেন?

আল মাহমুদ : প্রশ্নটা হলো...

মোহাম্মদ সাদিক : খুবই জটিল।

আল মাহমুদ : শুধু জটিলই না প্রশ্নটা, যিনি প্রশ্নটা করলেন...

শামীম রেজা : তুমি বলেন।

আল মাহমুদ : তুমিই বললাম তোমাকে। প্রশ্নটার মধ্যে কিন্তু এটার জবাব লুকিয়ে আছে। এটা আমি মনে করি যে প্রথম জানতে হবে কবি কাকে বলে। কবি হলো, কবি সেই ব্যক্তি যিনি অন্যকে কিছু বলেন। অন্যকে নির্ভুল ও সত্য যিনি বলেন, যদিও আমরা কবিদের বলি কল্পনার মধ্যে থাকে। এই সেই...

শামীম রেজা : সত্যদ্রষ্টা।

আল মাহমুদ : কিন্তু কবিরা কি সত্যিই শুধু স্বপ্নের মধ্যে থাকে, কল্পনার মধ্যে থাকে? না, কবিরা বাস্তবের মধ্যেও থাকে। বাস্তবের পথেও চলতে হয়, পড়ে যায় না। একটু জটিল হয়ে যায় কিন্তু ইশারায় বুঝানো যাবে না।

মোহাম্মদ সাদিক : কবে, কখন, কোথায়, কার কবিতা পড়ে বা কোন আবেগময় মুহূর্তে আপনি ধরে নিলেন যে কবিতাই আপনাকে লিখতে হবে? অথবা আপনি মনে করলেন কবিতা ছাড়া আপনি নিজেকে প্রকাশ করতে পারছেন না। সেই লগ্নটা কবে?

আল মাহমুদ : আমি যখন নিচের ক্লাসে পড়ি তখনই আমার মধ্যে এই বোধ সৃষ্টি হয় যে আমি কবি হব। এটা কিন্তু হয়। আর এখন তো দেখছি লোকে আমাকে কবি বলে।

শামীম রেজা : আপনি লিখেছেন, আপনার দাদা মর্সিয়া সাহিত্য, জারি-সারি গান লিখতেন এবং গাইতেন। আপনি কি মনে করেন জিনের ধারাবাহিকতার প্রভাব পড়েছে আপনার মধ্যে?

আল মাহমুদ : হতে পারে, হতে পারে, আমার দাদা খুব পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন, অসাধারণ পড়াশোনাও ছিলো।

শামীম রেজা : ফারসি সাহিত্যে?

আল মাহমুদ : ফারসি সাহিত্য... গভীর পড়াশোনা করতেন এবং এর মধ্য দিয়ে জীবন কাটিয়েছেন।

শামীম রেজা : দাদাকে দেখেছেন?

আল মাহমুদ : আবছা মনে পড়ে।

শামীম রেজা : তার কোন পাণ্ডুলিপি বা কোন লেখা?

আল মাহমুদ : সেটা তো আমি পাইনি।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি একটা কথা বলেছেন মাহমুদ ভাই, সেটা হচ্ছে আপনাদের পরিবারে এইসব কাসিদাসহ বাংলা সাহিত্যও পঠন-পাঠন বা গাওয়া হয়। আপনার কি মনে পড়ে, কি ধরণের বা কোন পর্বের- এটি কি কোনো মর্সিয়া সাহিত্য, পদাবলী বা মঙ্গলকাব্য, মানে বাংলা সাহিত্যের বা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কোন ধারাটি প্রচলিত ছিলো?

আল মাহমুদ : বাংলা সাহিত্যের শুরু হয়েছে তো...

শামীম রেজা : চর্যাপদ থেকে। তবে মধ্যযুগ থেকেই বৈষ্ণব পদাবলী, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকে।

আল মাহমুদ : চর্যাপদ থেকে।

মোহাম্মদ সাদিক : হ্যাঁ, আমরা চর্যাপদ থেকেই বলবো। তারপর মধ্যযুগ থেকে ‘লাইলি মজনু’, ‘বৈষ্ণব পদাবলী’, ‘মঙ্গলকাব্য’ এগুলো?

আল মাহমুদ : এরকম ভাষা ছিলো— “সসুরা নিদ গেল বহুড়ী জাগঅ।/কানেট চোরে নিল কাগই মাগঅ”।

মোহাম্মদ সাদিক : চর্যাপদ?

আল মাহমুদ : এটা হলো বাংলা ভাষার আদি রূপ।

শামীম রেজা : মর্সিয়া সাহিত্য নিয়ে কথা হচ্ছিলো।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনার পরিবারে কোন ধরনের বা কোন ধারাটা আপনি শুনেছেন? মর্সিয়া, জারি কোন ধরনের?

আল মাহমুদ : সবগুলো মিলিয়ে।

মোহাম্মদ সাদিক : মুসলমান পরিবারে তখন যে রকম থাকে আর কি?

শামীম রেজা : মর্সিয়া সাহিত্যে কিন্তু দেখতে পাই সিয়া এবং সুন্নির একটা ব্যাপার আছে। আপনার পরিবারের পূর্বপুরুষ

সিয়া সম্প্রদায়ের ছিলেন কি না?

আল মাহমুদ : না, জানা নেই। আমরা মধ্যবর্তী সুন্নি মুসলমান।

মোহাম্মদ সাদিক : এটি বিভিন্ন কারণে প্রচলিত ছিলো। আপনার কি মনে হয় আপনি যদি কবিতা না লিখতেন বাংলা সাহিত্যে...

শামীম রেজা : একটা অপূর্ণ জায়গা থাকতো?

মোহাম্মদ সাদিক : বাংলা সাহিত্যে কী ক্ষতি হতো?

আল মাহমুদ : কোনোই ক্ষতি হতো না।

শামীম রেজা : এটা আপনি বলছেন কিন্তু আমি আমার জায়গা থেকে বলছি যে রোমান্টিকতার...

মোহাম্মদ সাদিক : যাই হোক, আপনার কি মনে হয় না বাংলা সাহিত্যে...

শামীম রেজা : একটা জায়গা সংযোজন করেছেন?

মোহাম্মদ সাদিক : যেটি আপনি মনে করেন বাংলা সাহিত্যে অনুপস্থিত ছিলো?

আল মাহমুদ : যে কাজটা আমি করি... আমি একটু গীতিময়তার পক্ষে। সে জন্য আমি প্রেমের কবিতা পছন্দ করি। প্রেমের কবিতাই লিখেছি। সেটা অবশ্য সবসময় ঠিক থাকেনি। প্রেম, হৃদয়বৃত্তি, আত্মার আকুতি- এইসব মিলিয়েই যে রসবোধ তৈরি হয়, সেটাই—

মোহাম্মদ সাদিক : আপনাদের সময় তো আগ্রাসী কবি জীবনানন্দ দাশ। তার কাছ থেকে আপনি বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করেছেন?

আল মাহমুদ : এটা বলা ঠিক না যে তিনি আগ্রাসী কবি ছিলেন। তার প্রভাব ছিলো অত্যন্ত বেশি। তাহলেও জীবনানন্দ দাশের প্রতিভার বিশেষ বিষয় আছে। যাতে জীবনানন্দ দাশকে আমাদের সাথে সম্পর্কের সেতুবন্ধন করে। সেটা হলো যে, জীবনানন্দ দাশ চিত্ররূপময়তার কবি, তিনি যে উপমা দিতেন তা সাথে সাথে আমাদের মধ্যে, মনে ধারণক্ষমতায় এসে যেতো, কবি হিসেবে তিনি আমার বিশ্বাস খুব বেশি ইংরেজি সাহিত্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন।

শামীম রেজা : কিন্তু মাহমুদ ভাই, ‘রূপসী বাংলা’য় কিন্তু আমরা ঐ প্রবণতা ছাড়িয়ে আঞ্চলিকতা দিয়ে আন্তর্জাতিকতা ছুঁইতে দেখি। এরকমের একখানা সনেটের বই আলাদা একটা তর্ক, আপনি ধরুন আপনার চৌদ্দটা সনেট ‘সোনালী কাবিন’-এ লিখেছেন। জীবনানন্দ ওখানে একাত্তর থেকে একশটা ছেপেছেন। ‘রূপসী বাংলা’ তো নাম ছিলো না মূলত। তো আপনার এর পরে ‘দ্বিতীয় ভাঙ্গনে’ কিছু সনেট আছে। পরম্পরা কমবেশি বেশ কিছু বইতে দু-চারটা সনেট আছে। জীবনানন্দ যে কাজটা করলেন ‘রূপসী বাংলা’য় সেই কাজটা দেখি ইন্দ্রের রাজসভায় আমাদের বেহুলাকে নাচাচ্ছে। আর বেহুলার পায়ের সাথে বাংলার নদীমাতৃককে তুলে ধরেছেন। এখানে কিন্তু ইউরোপের ছোঁয়া পাই না। শুধুমাত্র সনেটের গড়ন ছাড়া।

মোহাম্মদ সাদিক : কেন জীবনানন্দকে বলা হয়েছে ইংরেজি সাহিত্যের?

আল মাহমুদ : যে ভাষাতেই আপনি কবিতা পড়েন কবিতার কিন্তু জাতটা বদল হয় না, ভাষা বদল হয়। কবিতা বুকের ভিতর ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে দেয়।

শামীম রেজা : আপনি যে ফারসি অনুবাদ সাহিত্যের কথা বলছেন এতে কবিতা হারায়?

আল মাহমুদ : বাদ তো হয়ই, কমিউনিকেশন তো লাগবে, আমি ব্যক্তিগতভাবে ইয়েটস্-এর কবিতা পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। একসময় পড়তাম। জানতাম তো দুটো মাত্র ভাষা—একে তো বাংলা জানতাম। খুব যে ভালো ইংরেজি জানতাম তা না। তবে পড়তে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেছি। কবিতার সারাৎসার, সারমর্ম হলো আমার যেটা কবিকাব্য এটা ছায়ার মতো। যেটাকে বলে ছায়ার মতো। ছায়ানট। ঘুঙ্গুর পায়ে পায়ে চলতে থাকে নৃত্যমিল আছে, ছন্দ আছে, গদ্য আছে। কবিতার সারাৎসার বর্ণনা করা তো কবির পক্ষে সম্ভব নয়। কবিতা পড়তে হয়। কবিকে জানতে হয় কবিতা কী। আপনার মন চাইছে আপনি কবিতার বই নিয়ে বিছানায় শুয়ে আস্তে আস্তে পড়লেন। এই যে কাজটা কবিতা করে, বাধ্য করে, টানে, টান তৈরি করে। সব মিলিয়ে কবিতা হলো কবিদের কাজ। কবির সততা, বুদ্ধিবৃত্তি, তিনি কিছু বলেন অন্যরা শোনেন।

মোহাম্মদ সাদিক : তাহলে ‘রূপসী বাংলা’র কবি বলে যাকে চিহ্নিত করা হয় তারও মূল অনুপ্রেরণা ছিলো ইংরেজি সাহিত্য—যেটি আপনি উপলব্ধি করেছেন। এটি যদি আমাদের বলতেন তিরিশের কবিদের থেকে পঞ্চাশের কবিরা কীভাবে পৃথক হলেন?

আল মাহমুদ : পঞ্চাশের কবি হলাম আমরা। আমাদের গোড়ার দিকে আমরা ত্রিশের কবিদের খুব পছন্দ করতাম মানে আপন মনে করতাম। কিন্তু পঞ্চাশ দশকে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে কবিতার ধারাটা, আধুনিক কবিতার ধারাটা বদলে ফেলতে হবে।

শামীম রেজা : জীবনানন্দ থেকে মুক্তি পেতে হবে?

আল মাহমুদ : আমরা এটা চেষ্টাও করেছিলাম। চেষ্টা করিনি তা না। তার প্রমাণ আমাদের কবিতা।

মোহাম্মদ সাদিক : আমরা বলতে কারা কারা?

আল মাহমুদ : আমি, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, ফজল শাহাবুদ্দিনের নামও বলা যায়। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ অবশ্য খুব বেশি কাজ করেননি। তবে তার নামও বলা যায়।...

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি কি পশ্চিম বাংলার কারো কথা বলবেন?

আল মাহমুদ : আমি পশ্চিম বাংলা খুব ভালো করে পড়েছি। খুব সূক্ষ্ম জিনিসটি—আমাদের আর ঐ কবিদের মধ্যে ভাষাগত, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, শব্দ পৃথক, একেবারেই পৃথক নয় তবে পৃথক হয়।

শামীম রেজা : পশ্চিম বাংলায় আপনার যারা বন্ধু ছিলেন?

মোহাম্মদ সাদিক : শক্তি চট্টোপাধ্যায় তো আপনার ভালো বন্ধু ছিলেন।

আল মাহমুদ : হ্যাঁ।

মোহাম্মদ সাদিক : তার সাথে কখনো এসব শেয়ার করেছেন?

আল মাহমুদ : দুঃখের কথা বলতে হয়— আমার বন্ধু ছিলেন তবে এসব মুহূর্ত নিয়ে কথা হয় নাই। যে সময়ের কথা বলছেন শক্তির মধ্যে সেন্স অব প্রপোরশন ছিলো না। মদ্যপান করতে করতে এমন একটা পরিস্থিতি হয়ে গিয়েছিলো যে সবসময় কাঁপতো।

শামীম রেজা : সেটা কি কবিতায় প্রভাব ফেলেছে?

আল মাহমুদ : না। এটা তার ব্যক্তিগত কিছু দোষ। মদ্যপান করে নিজেকে নষ্ট করে দিলো। কিছুদিনের মধ্যেই মরে গেল।

মোহাম্মদ সাদিক : কিন্তু কবিতা, মদ্যপান না করেও তো যে কোনো সময় মরতে পারে। কিন্তু কবিতার জন্য তো তিনি নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। আপনার কী মনে হয়?

আল মাহমুদ : এটা তো আপনি বলছেন। কিন্তু তিনি হিউম্যান বিং। অতিরিক্ত মদ্যপান এবং বিশৃঙ্খল জীবনের জন্য এতবড় এ্কজন কবি শেষ হয়ে গেল। আপনি দেখেন শক্তির কবিতা বের করে, দেখেন সংখ্যায় খুব অল্প। একজন মেজর পয়েট যাকে বলি তার কাজ তো পরিপূর্ণ থাকতে হবে।

মোহাম্মদ সাদিক : কিন্তু পৃথিবীর অনেক বড় কবিই তো সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করতে পারেননি। আপনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাছে তা আশা করছেন কেন?

আল মাহমুদ : শক্তির তো প্রতিশ্রুতি ছিলো।

মোহাম্মদ সাদিক : মাইকেল মধুসূদন দত্তেরও তো প্রতিশ্রুতি ছিলো। মাত্র আটচল্লিশ বয়সে মারা গেলেন।

আল মাহমুদ : অনেক তর্ক এসে যাবে। ইংরেজি শিক্ষিত ভদ্ররা বলেন— মাইকেল মধুসূদন দত্ত। আপনি বলেন, মাইকেল কখনো নিজেকে মাইকেল বলে পরিচয় দিয়েছিলো?

মোহাম্মদ সাদিক : নাম তো নিয়েছিলেন।

আল মাহমুদ : শ্রী মধুসূদন দত্ত বলতেন। মাইকেল দত্ত বলতেন। (সম্ভবত হবে—'মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলতেন না'- জা. সো.)

শামীম রেজা : পঞ্চাশ দশক নিয়ে কথা হচ্ছিলো। শক্তি আপনার বন্ধু। কখনো শঙ্খ ঘোষ, বিনয় মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়—এদের সাথে আপনার সম্পর্ক হয়েছিলো কি না? বা এদের কবিতা আপনার ভালো লাগে কি না?

আল মাহমুদ : এরা তো আমার সমসাময়িক বন্ধু ছিলো। কবিতা তো মনে নাই। নিত্য পড়ি না। তবে এরা খুব কাছের ছিলো।

শামীম রেজা : শক্তি বাদে এদের মধ্যে কার কবিতা ভালো লাগত আপনার?

আল মাহমুদ : আমার শক্তিকেই ভালো লাগতো।

শামীম রেজা : শক্তি কিন্তু আপনার কথাই বলতো। ‘মাহমুদ আর আমি’। এজন্যই কি ভালো লাগে? নাকি সত্যিই কবিতা ভালো লাগে তার?

আল মাহমুদ : কী সে বলেছিলো তা মনে নাই। কারণ তার দুষ্টুমির কোনো সীমা ছিলো না। কোনো কথা নাই বার্তা নাই ঐ আনন্দবাজারের অফিসের নিচে প্যান্টের জিপার খুলে পেসাব করে দিতো। এগুলো তো করেছে সে। জীবনটাতো অসহনীয় করে চলেছে। আমি বলতে চাই না কিন্তু আমি জানি অনেক কিছুই। বলা যাবে না, ক্যামেরার সামনে তো নয়ই। সভ্য মানুষ হিসেবে এদের মাঝে মাঝে চিনতে অসুবিধে হয়।

মোহাম্মদ সাদিক : এরকম দু'একটি ঘটনা থাকতেই পারে। মানুষ নানা রকম। এখন যা বলতে চাই পঞ্চাশের কবিরা কী করে আলাদা হলো, তিরিশ থেকে বাইরে আসার পর্বগুলো কী?

শামীম রেজা : কীভাবে আমরা আপনাদের চিহ্নিত করতে পারি?

আল মাহমুদ : গোড়ার দিকেই আমরা একটা জিনিস ধরতে পেরেছিলাম যে আধুনিক সাহিত্য বলতে কবিতাকে বলা হচ্ছে। আমাদের স্টাডি ছিলো— আধুনিক সাহিত্য বলতে আধুনিক গদ্য সাহিত্যকে বলতে হবে। বাংলাদেশে অন্যরকম হবে কারণ ঐ সময়ের কয়েকজন কবি কবিতাকে নিয়ে এমনভাবে মেতেছিলেন যে একটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। কবিতায় আধুনিক সাহিত্যের ভাষা। আমি বিতর্ক করেছিলাম। কিন্তু আমাকে কেউ ছেড়ে কথা বলেনি।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি কিন্তু নিজেও কথাসাহিত্যের চর্চা করেছেন। আপনার কি মনে হয়েছে আপনি যা বলতে চান তা শুধু কবিতায় বলে মুক্তি পাচ্ছেন না? এজন্যই কি আপনি কথাসাহিত্য রচনা করেছেন? আপনার কথাসাহিত্য সমৃদ্ধ কথাসাহিত্য।

শামীম রেজা : ‘পানকৌড়ির রক্ত’, ‘জলবেশ্যা’ আপনার প্রথম...

মোহাম্মদ সাদিক : ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ বা আরো কিছু গল্প। আপনার কি মনে হয়েছে কবিতায় আপনি এ জিনিসগুলো বলতে পারছেন না, কথাসাহিত্যে বলতে হবে। যেটা আপনি বলছিলেন আধুনিক ভাষা কবিতার হবে না কথাসাহিত্যের হবে।

আল মাহমুদ : আমি কবি মাত্র। আমি কিন্তু নিজেকে সবসময় কবি হিসেবেই...। আমি কিন্তু অসাধারণ না হলেও অনেক সুন্দর গদ্যও লিখেছি। সেটা বাংলাদেশে অস্বীকৃত হয়নি। তো যাই হোক আমার মনে হয় যে পঞ্চাশ দশকের কবিরা...

শামীম রেজা : এমন গল্প লেখেননি। আবুল হোসেন লিখেছেন আপনার উপর। যেহেতু গদ্যের মধ্যেই চলে এলাম, আপনি যে শৈশবের ‘জলবেশ্যা’র মধ্যে আবিদের শৈশবের প্রতিমূর্তির কথা বলেছেন—নারীর কথা—নৌকায় উঠে বেহুলা লক্ষীন্দরের স্মৃতিচারণ করছেন—এটা অভিজ্ঞতা বা কল্পনার ঢঙেই লেখা—এ ধরনের কোনো স্মৃতি গল্প লেখার—যেটা আপনি কবিতায় লিখতে না পেরে গল্পে লিখেছেন?

আল মাহমুদ : আমাদের দেশে সেই সময়ে হাটের দিনে লোকসমাবেশ হতো কিন্তু সন্ধ্যার পরে নৌকার ঐ পাড়ে ছোট ভাসমান গ্রাম থাকতো। তারা বাতি জ্বালিয়ে আহ্বান করতো টাকাওয়ালা দালালদের। এটাই আমি ঐ জলবেশ্যায় লিখেছি।

শামীম রেজা : আমি আপনাকে ধরিয়ে দিই ‘কেমন কাবিন মেঘনার পানিৎ লোহার ঢেউয়ের কাবিন নেহি’— এই যে ভাষাটা এটা তো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভাষা। আর এই যে ভাসমান বাইদানিদের কথা বলছেন এরা তো বিভিন্ন জায়গার, নাকি ওখানকার লোকাল?

আল মাহমুদ : না।

শামীম রেজা : তাহলে তো ভাষাটা নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। আরো অনেক কথা আছে। যেমন গর্ভবতীর গান, নারীর স্তনের বর্ণনা দিচ্ছেন—যে বর্ণনা আবিদের মুখ দিয়ে করেছেন সে ভাষা কি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আঞ্চলিক ভাষা না অন্য?

আল মাহমুদ : আমার তো মনে নাই।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনার ‘পানকৌড়ির রক্ত’ তো খুব আলোচিত গল্প। এবং আপনার বর্তমানে যে সব কবিতার মধ্যে যেসব পঙ্ক্তি আবেগ উচ্চারিত হচ্ছে, পানকৌড়ির রক্ত থেকে তা অনেকসময় বিচ্ছিন্ন করা যায়— এ তারুণ্যকে আপনি কীভাবে বহন করেছেন?

আল মাহমুদ : পানকৌড়ির রক্তে বিচিত্র গল্প আছে। আমার ধারণা আমাদের সাহিত্যে আমিই প্রথম আই ক্রিয়েট মানে আমি সৃষ্টি করেছি। এছাড়া কালার বা রংয়ের বিবর্তনে যে প্রভাবিত হয় সেটা আমি দেখানোর জন্য পানকৌড়ির হত্যাটাকে দেখাতে চেষ্টা করেছি। এটা পেইন্টারের কাজ। যেহেতু আমি কবি আমি সাধ্যমত সাজাতে চেষ্টা করেছি। আমার বক্তব্য হলো—এরকম একটি রচনা আমার সমসাময়িক কালের লেখার মধ্যে আর হয়তো নাই।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনার এই যে ‘পানকৌড়ির রক্ত’, ‘জলবেশ্যা’ এসব লেখার সাথে পরবর্তীকালের লেখা মিলিয়ে দেখলে এগুলো অনেক উচ্চ হয়ে ওঠে। এতে কী আপনি কখনো নিজেকে যাচাই করেছেন যে এ ধারাকে কেনো আপনি এগিয়ে নেন নাই, নাকি অন্য নতুন কিছু করতে চেয়েছেন?

আল মাহমুদ : আমি তো আসলে কবি। তবে আমি সাহিত্যের ভাষা যেটা—আমি যে ভাষায় লিখেছি এর মধ্যে অনেক কাজ আছে—সাধারণ কবি সেটা পারে না।

মোহাম্মদ সাদিক : গল্পগুচ্ছ সম্পর্কে একটা অভিযোগ আছে কোনো কোনো সমালোচকের— যদিও আমি এটাকে বড় করে দেখছি না—গল্পগুচ্ছের গল্পগুলো গীতিধর্মী একটু। এখন কথাসাহিত্যে যখন কবির প্রভাব বড় হয়ে ওঠে তখন কথাসাহিত্য কোনোভাবে আহত হয় কি না?

আল মাহমুদ : আমার মনে হয় না।

শামীম রেজা : আরো বেশি সমৃদ্ধ হয়। কবিতা নিয়ে বারবার আপনার ইন্টারভিউয়ে, লেখায়, স্মৃতিতে বলেছেন, ''আমার কবিতার প্রধান বিষয় নারী এবং প্রকৃতি— এ দুটোই''। আমি আপনার কবিতায় শুরু থেকেই যেমন জীবননান্দকে টানি যে ‘ঝরা পালক’ তারপর ১৯৩৪-এ ‘রূপসী বাংলা’ ১৯৩৬-এ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ বের হয়। ‘রূপসী বাংলা’ বের হয় অনেক পরে। তো তার প্রত্যেকটা ধরনই আলাদা, ‘রূপসী বাংলা’ থেকে আলাদা ‘বনলতা সেন’ একটা সাধারণ নারীকে পদবীধারী করে 'সেন' দিয়ে মহাকাব্য পরে ‘মহাপৃথিবী’-তে অন্যজগত, ‘বেলা অবেলা কালবেলা’-তে আরেকটা ভুবন, আপনার মধ্যে দেখতে পাই যে প্রথম ‘কালের কলস’ আপনার ‘লোক লোকান্তর’ তেষট্টিতে প্রকাশিত। এরপর তেষট্টিতে ‘কালের কলস’, ‘সোনালী কাবিন’ ১৯৭৩-এ এই যে তিনখানা কাব্যগ্রন্থ। আমি যদি বলি এ ট্রিলোজি ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত ফসল ‘সোনালী কাবিন’। পরে কিছুটা এক্সটেনশন পাই আপনার ‘দ্বিতীয় ভাঙ্গন’-এ। এই সদ্য ৯০-তে এসে। এই তিন কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আমরা দেখতে পাই যে আপনার নারী এবং প্রকৃতি সমানভাবে সমন্বিত হয়েছে। কিন্তু এখানে একটা অভিযোগ আছে— সেটা আমাদের তরুণদের— সেই অভিযোগে কিছুই আসে যায় না— তবে আপনার ঐ মহান কবিতাগুলো অন্যরকমের একটি জায়গা— সেটা হচ্ছে যে এখানে শরীরপ্রধান— যেটা আমরা ফেরদৌসির শাহনামা, আলাওল, ভারতচন্দ্র আমি একটু পারস্যে যাই কারণ প্রচুর ফারসি এবং আরবি শব্দের ব্যবহার আছে এই তিনখানা কাব্যগ্রন্থের মধ্যে— এখানে শরীরপ্রধান বলছি কারণ মনটাকে খুব খুঁজতে হয়। আপনার কী মনে হয় এ নিয়ে?

আল মাহমুদ : সাহিত্য যত ছদ্মবেশই ধারণ করুক আমি শরীর খুঁজি।

শামীম রেজা : না, শরীর না হলে মন কোথায় যাবে?

আল মাহমুদ : আর এটা অবয়ব। লবণ ছাড়া ডিম খাওয়া যেমন যায় না। আপনি লবণ ছাড়া ডিম খেতে পারবেন না- একটু লবণ লাগবে। সাহিত্য যত ছদ্মবেশই ধারণ করুক শরীরটা হলো প্রধান। শরীরের সাথে কাম আছে। কামের সাথে নানারকম কামজ উপাদান জড়িয়ে আছে। এটাতো আমি বললে হবে না। মানুষের প্রবৃত্তি— 'তুমি তাই তাই গো আমার পরাণ যাহা চায়'।

শামীম রেজা : আমি একটু বিস্তারিত করি। ‘লোক লোকান্তর’-এ আমরা যখন দেখতে পাই যে, “আমার চেতনা যেন সাদা এক সত্যিকারের পাখি, বসে আছে সবুজ অরণ্যে এক চন্দনের ডালে।” পরে আরেকটু রোমান্টিকতার সম্প্রসারণ দেখি ‘কালের কলস’-এ “এই দল কলসের ঝোঁপে আমার কাফন পরে আমি কতকাল কাত হয়ে শুয়ে থেকে দেখে যাবো সোনার কলস” এরপরে পূর্ণতা আসে ‘সোনালী কাবিন’-এ “বধূ বরণের গান গাহিয়াছে মহামাতৃকুল, গাঙের ঢেউয়ের মত কবুল কবুল”। এখানে একই সাথে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আসছে যেটা খুব স্পষ্ট। যেটা আমি বলতে চাই যে জীবনানন্দে আড়াল আছে একটা। দেহটাকে যখন বিস্তার করছেন—সাধারণ নয়—অসাধারণ কবিতাবোধের কথা বলছি।

মোহাম্মদ সাদিক : আড়াল কী? জীবনানন্দ দাশে কোনো আড়াল আছে?

শামীম রেজা : আছে। যেমন “মানুষ কাউকে চায় তার নিহত উজ্জ্বল ঈশ্বরের পরিবর্তে অন্য কোনো সাধনার ফল’। এই যে জগতে নিয়ে যাচ্ছে কিংবা “আমি সব দেবতারে ছেড়ে আমার প্রাণের কাছে চলে আসি” এই প্রশ্নটা আপনাকেও যে আপনি যখন বলেন যে 'আমাদের ধর্ম ফসলের সুষম বণ্টন' ঠিক জীবনানন্দেরা আগে বলেন “আমি সব দেবতারে ছেড়ে আমার প্রাণের কাছে চলে আসি” এ প্রাণের কাছে চলে আসা মানে সুফিজম। যা বলে আমার ভেতরে ঈশ্বর। এ কারণেই আমি মর্সিয়া সাহিত্য নিয়ে কথা তুলেছিলাম যে আপনার পূর্বপুরুষ সুফিবাদী বা সিয়া কি না। তো জীবনানন্দ যে কথা বলেন আপনি সে কথা আরো অসাম্প্রদায়িকভাবে বলেন “আমাদের ধর্ম ফসলের সুষম বন্টন” একথা যখন বলেন সেই কথা কি আবার কৌম ধর্মের কথা বলছেন? আমরা যে লোকজধর্মের মধ্য থেকে আসছি তারপর না আমাদের এখান থেকে অন্য ধর্ম বিস্তার করেছে। সুফিবাদ মতে যে জায়গাটা ঈশ্বর বা আল্লা মনের মধ্যে থাকে আপনার এই বিশ্বাস আপনার লেখায় পাই ‘সোনালী কাবিন’-এ। পরবর্তীকালে পাই না।

মোহাম্মদ সাদিক : ‘সোনালী কাবিন’-এ আবহমান বাংলার সামাজিক সাংস্কৃতিক যে চেতনা তার একটি অসাধারণ চেতনা পাই। মুকুন্দরামের রক্ত লেগে আছে মাটির গায়ে। আপনি শেষ পর্যন্ত সোনালী কাবিনের চেতনাকে সম্প্রসারিত করেছেন বা চেষ্টা করেছেন না কি সেখান থেকে সরে এসেছেন?

আল মাহমুদ : করেছি, গদ্যে করেছি, পদ্যে করেছি।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি এখনও বিশ্বাস করেন “আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বন্টন”?

আল মাহমুদ : কবিতার ভেতরেই কবির বিশ্বাস।

শামীম রেজা : আপনি যেমন ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’-তে লিখেছেন আরব্য রজনী নাজায়েয। আমরা আপনার দুটো পার্ট এই যে ট্রিলোজির কথা বললাম (লোক লোকান্তর থেকে সোনালী কাবিন) ঠিক এরকম বখতিয়ারের ঘোড়া থেকে ‘দ্বিতীয় ভাঙ্গন’ এর আগ পর্যন্ত যেটা মানে ‘দোয়েল ও দয়িতা’, ‘আমি দূরগামী’ সেখানে ধর্মীয়বোধ মনে হয় আরোপ করা- মানে যা আপনার কবিতা বলে মনে হয়— আবার মনে হয় না। কারণ অনেক কিছু আরোপ করা মনে হচ্ছে। এটাকে আপনি কীভাবে খণ্ডণ করবেন?

আল মাহমুদ : এটা কেনো আপনার মনে হলো বোঝা দরকার।

শামীম রেজা : সেটা আমি উদাহরণ দিচ্ছি।

আল মাহমুদ : আমি কাব্যে রহস্য রাখলেও ঠিকমতো কমিউনিকেট করি। আমি খোলাখুলি বলেছি।

মোহাম্মদ সাদিক : একাত্তরে আপনি কোথায় ছিলেন?

আল মাহমুদ : আমি কলকাতায় ছিলাম।

মোহাম্মদ সাদিক : কবে কীভাবে আপনি কলকাতায় গিয়েছিলেন? যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই গিয়েছিলেন না যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর?

আল মাহমুদ : আমার যতটুকু মনে আছে দেশে তো থাকতে পারছিলাম না। আমি গোহাটি হয়ে...

মোহাম্মদ সাদিক : আগরতলা হয়ে। আপনি ঢাকা থেকে বের হয়েছিলেন নাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে?

আল মাহমুদ : এতটা মনে নাই। এটুকু মনে আছে আমি ট্রেনে করে গোহাটি হয়ে কলকাতা যাই। আমার ভগ্নিপতি ছিলেন। তৌফিক ইমাম আমার বোনজামাই। আমি তার সাথে যাই।

মোহাম্মদ সাদিক : ঐ সময়ের আগে কখনো কলকাতায় গিয়েছিলেন?

আল মাহমুদ : হ্যাঁ গিয়েছিলাম।

মোহাম্মদ সাদিক : তখন কলকাতার কবিদের সাথে দেখা হয়নি আপনার?

আল মাহমুদ : হ্যাঁ।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনার তো সংকলনও বের হয়েছিলো কলকাতা থেকে। শ্রেষ্ঠ কবিতা তো আপনার ওখান থেকেই বের হয়।

শামীম রেজা : শিবনারায়ণ রায় আপনার একটা বইয়ে ভূমিকা লিখেছিলেন। মনে পড়ে আপনার? একাত্তর নিয়ে বলি- তাজউদ্দিন সরকারের তো একজন কর্মকর্তা ছিলেন আপনি। তিনি আপনাকে একটা দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বিভিন্ন লেখায় পড়েছি। কোন ডিপার্টমেন্টের?

আল মাহমুদ : একটা চাকরি দেওয়া হয়েছিলো। মোটিভেশন। বাংলাদেশের যে উত্থান তার পক্ষে কথা বলার জন্য। আই অ্যাম অলসো মোটিভেটেড। আমি কাজ করতাম। মাইনে বেতন ছয়শো টাকার মতো। কিন্তু মাইনে দেবার সময় অর্ধেকটা কেটে রেখে দিতো। ত্রাণের জন্য। তিনশো টাকা আমাকে দেওয়া হতো। এই টাকা সম্বল করে চলতাম। কলকাতায় খুব চ্যালেঞ্জিং দিন ছিলো। কষ্ট ছিলো।

মোহাম্মদ সাদিক : সেই সময়টার কোন স্মৃতিকথা লেখেন নাই কেন?

আল মাহমুদ : আমি তো লিখেই যাচ্ছি দিনরাত।

শামীম রেজা : লিখছেন কিন্তু ওইরকম করে। একাত্তরের ডায়রি নামে তো লেখা লিখতে পারেন।

আল মাহমুদ : মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি।

শামীম রেজা : আপনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। সার্টিফিকেট নিয়েছেন?

আল মাহমুদ : আনন্যাচারাল টকিং।

মোহাম্মদ সাদিক : কিন্তু এটা তো একটা গৌরবের সময়। আপনি যে জাতিকে স্বপ্ন দেখালেন যে জাতি শৌর্যবীর্য নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো সেই সময় আপনি যখন ছিলেন, তার স্মৃতিকথা নিয়ে তো লিখতে পারতেন।

আল মাহমুদ : আমি তো লিখেছি। আমার যখন মনে পড়ে আমার সব লেখা মনে হয় পড়েননি। আমি কিন্তু বলেছি।

মোহাম্মদ সাদিক : এবার একটু বলবেন কি— জাস্ট আপনার কাছ থেকে শুনে রাখার জন্য— প্রাচীনকালের চর্যাপদ থেকে আল মাহমুদ বা শামীম রেজা কারা কারা প্রধান কাজ করেছেন বা কারা কারা গুরুত্বপূর্ণ?

আল মাহমুদ : প্রথম কথা হলো, সবচেয়ে বড় কাজ যিনি করেছেন তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ পড়লে তিনি যে কত বড় ছিলেন জানা যায়। তারপরে অবশ্য গুছিয়ে বলতে পারবো না। তারপর মডার্ন তিরিশের কবিরা— চোখ ধাঁধিয়ে দেয়া আধুনিক স্বাদ, তারা বহুবিচরণশীল ছিলেন ব্রহ্মাণ্ডের। তারপর চল্লিশের কবিরা ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব দুজনেরই কিন্তু খুব সুন্দর কবিতা আছে। এরা যে কত উজ্জ্বল কাজ করেছেন আধুনিকতার!

মোহাম্মদ সাদিক : যাক, আপনি আহসান হাবীবের কথা বলেছেন। আমরা একটা জিনিস লক্ষ করি আমাদের কবিরা তাদের অনুজ কবিদের সম্পর্কে তেমন বেশি কিছু বলতে চান না। সংগত কারণেই হয়তো বলতে চান না। কিন্তু আপনি কিছু বলেছেন। আপনার এটি কি মনে হয় আপনি তো অগ্রজদেরও অগ্রজ এখন। কেনো তারা অনুজদের সাহিত্য মূল্যায়নে খুব বেশি আগ্রহী হন না? এটা তো একটা স্বাভাবিক প্রবণতা। অনুজ কবিদের নিয়ে বলবেন এটাই স্বাভাবিক।

আল মাহমুদ : কথা হলো যে এটা ঘটে যায়। কেনো যে ঘটে যায়!

মোহাম্মদ সাদিক : আচ্ছা আপনি কাজী নজরুল ইসলামের কথা একবারও উচ্চারণ করেননি বাংলা সাহিত্যধারা আলোচনায়। এটি স্মৃতির কারণে নাকি?

আল মাহমুদ : কাজী সাহেবের কথা আমি বলি— একজন অসাধারণ কবিপ্রতিভা। তার বিদ্রোহী কবিতার মতো ওমন একটি কবিতা বাংলা সাহিত্যে নাই। সমস্ত বাংলা সাহিত্যে নাই।

মোহাম্মদ সাদিক : তার প্রেমের কবিতাগুলো?

আল মাহমুদ : তার যে গান আছে, প্রেমের গান। অসাধারণ। গানের ভাষাপদ্ধতি, গানের যে মর্মবাণী সেটা উনি কিন্তু ক্লাসিক্যাল থেকে সব নিয়েছেন।

মোহাম্মদ সাদিক : উনি বলেছেন আর কোথাও কিছু না দিতে পারলেও গানের রাজ্যে আমি বিচরণ করি।

শামীম রেজা : রাগ এবং রাগিনী নিজে তৈরিও করেছেন।

মোহাম্মদ সাদিক : একটা জিনিস আপনার কবিতায় লক্ষ করি আপনি চলে যাওয়ার কথা বলেন, চলে যাওয়ার সময় হয়েছে ইত্যাদি, ইত্যাদি। কানা মাহমুদ, আল মাহমুদ এরকম নিজেকে নিয়ে স্যাটায়ার করেন এটা ভালো, অসাধারণ। কিন্তু আপনার কবিতায় মৃত্যুচেতনা কিন্তু সেভাবে আমাদের চোখে পড়ে না।

শামীম রেজা : শুরুর দিকে ছিলো।

আল মাহমুদ : সবচেয়ে বেশি চিন্তা করি মৃত্যুর।

শামীম রেজা : কিন্তু কবিতায় আসে জীবনের কথা, কামের কথা, ভালোবাসার কথা, প্রেমের কথা।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি কখনো কখনো খুব প্রবলভাবে সামাজিক অঙ্গীকারের কথা বলেছেন।

আল মাহমুদ : হ্যাঁ।

মোহাম্মদ সাদিক : কিন্তু কখনো কখনো আপনার লেখা পড়ে মনে হয়েছে যে সাহিত্য সামাজিক অঙ্গীকারের বিষয় নয়। সাহিত্য তার বাইরের কিছু। এ সম্পর্কে আপনি একটু বলেন।

আল মাহমুদ : আসলে আমি ঐ ধারার কবি যে ভালোবাসা প্রেম...

শামীম রেজা : মাহমুদ ভাই, বিশ বছর আগে আপনার মগবাজারের বাসায় গিয়েছিলাম। তখন আপনি আপনার অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। প্রেমের কথা বলেছিলেন, আপনার জীবন অভিজ্ঞতা, প্রেমের কথা বলেছিলেন খুব মজা করে।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনার নিজের বেড়ে ওঠা বা প্রথম স্পন্দন কোন চরিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরলেন? আলকির কথা মনে পড়ে? এই জীবন্ত...

আল মাহমুদ : ওর সম্পূর্ণ নাম হলো আলেকজান বিবি।

শামীম রেজা : কলকাতায় আপনি একাত্তরে যখন অবস্থান করছিলেন তখন আপনার কবিতার প্রেমে আপনার অনেক বান্ধবী ছিলো। আপনার মনে পড়ে?

আল মাহমুদ : কত মিশেছি টিশেছি। এখন...। তখন কিন্তু মনটা খুবই ক্ষতবিক্ষত ছিলো। যুদ্ধ যে কি জিনিস!

মোহাম্মদ সাদিক : ধর্মের বিষয় আপনার লেখায় আসে। আমাদের এই যে...

আল মাহমুদ : ভাই আমি ধর্মে বিশ্বাস করি।

শামীম রেজা : এটা তো ভালো। এটা নিয়ে আপত্তি নাই।

মোহাম্মদ সাদিক : আমি বলছি সুফি তো ভালো।

আল মাহমুদ : সুফিজম ?

মোহাম্মদ সাদিক : সুফি, ফকির দরবেশ এদের একটি ব্যাপক ভূমিকা আছে এই বাঙালি মুসলমানের উপর। আপনি তাদেরকে বা তাদের অবদানকে কীভাবে বিচার করেন?

আল মাহমুদ : মওলানা রুমির একটা দল ছিলো। তাদের বলা হতো ড্যান্সিং মওলানা, যারা নাচতো। নাচতে নাচতে...

শামীম রেজা : ফানাবিল্লাহ বাকাবিল্লাহ?

আল মাহমুদ : ঐগুলো আমি কখনো লিখিনি। যদি লিখি তবে অনেক কথাই লিখতে হবে। আমি লিখবো। হোয়েন দ্য টাইম কাম।

মোহাম্মদ সাদিক : ধন্যবাদ মাহমুদ ভাই যে আপনি বিষয়টা লিখবেন।

আল মাহমুদ : এই যে মওলানাস ওহ হো...

মোহাম্মদ সাদিক : ইশক্ এর যে বর্ণনা

আল মাহমুদ : অসাধারণ কিছু আছে।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি আপনার আগামী লেখার পরিকল্পনা যে করছেন কী লিখবেন বলে? একটা তো সুফিবাদ।

আল মাহমুদ : একটা আপাতত, আমার খুঁটিনাটি অনেক কিছু উল্লেখ করে যতটুকু মনে পড়ে আত্মজীবনী লিখবো।

শামীম রেজা : কাউকে কি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন?

মোহাম্মদ সাদিক : সেটা কি শৈশব থেকে শুরু করবেন আপনি?

আল মাহমুদ : না, আমি শৈশব তো লিখে ফেলেছি।

মোহাম্মদ সাদিক : ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’র মধ্যে আপনি ঢাকায় যখন আসলেন সেখানে এসে কিন্তু শেষ করে ফেললেন, ঢাকার জীবন আর ওরকম লেখেননি। আপনি যে আত্মজৈবনিক লিখবেন তা পূর্ণাঙ্গ হবে?

আল মাহমুদ : না না পূর্ণাঙ্গ হবে।

শামীম রেজা : ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’র পরের পার্ট না একদম শুরু থেকে?

আল মাহমুদ : শুরু থেকেই। প্রতিশ্রুতি না দিলেও আমি এটি কোথাও কোথাও বলেছি।

শামীম রেজা : আমরা আপনাকে সর্বোচ্চ সম্মানী দিয়ে এটি নিতে চাই।

মোহাম্মদ সাদিক : কবি শামসুর রাহমান সম্পর্কে আপনার কাছে জানতে চাই। আপনার বন্ধু এবং আপনার সঙ্গে শামসুর রাহমানের নাম সবসময় উচ্চারিত হয়েছে। আপনার এখানে আপনার এবং শামসুর রাহমানের ছবিও আছে। পিএটিসিতে সর্বশেষ আপনি এবং শামসুর রাহমান একসঙ্গে কবিতা পড়তে গিয়েছিলেন এবং তার পাশাপাশি সময়ে কুমিল্লায় যখন ডি. সি. আমিনুর রহমান সাহেব দাওয়াত দিয়েছিলেন তখন আপনি ও শামসুর রাহমান একসঙ্গে গিয়েছিলেন। অনেক রাত অব্দি কবিতা পড়েছিলেন। তারপর আপনাদের একসাথে দেখিনি। এটা পঁচাশি-ছিয়াশি সালের পর।

আল মাহমুদ : অনেকে মনে করে যে শামসুর রাহমানের সাথে আমার বোধহয় কোন দ্বন্দ্ব ছিলো। এসব কিছুই ছিলো না। খুবই ভালো বন্ধু ছিলাম। শামসুর রাহমান চুপচাপ ছিলো। আমার বাসায় নীরব একটি জায়গায় চুপচাপ বসতো। আমি বলতাম, কী ব্যাপার? বলতেন, আমি বসছি, ভালো লাগছে না। উনি তো আবার সিগারেট খেতেন না। আমি সিগারেট ধরিয়ে কাছে বসতাম। চোখ বন্ধ করে বসে থাকতেন। কী যেন ভাবতেন। আমার জানা ছিলো যে শামসুর রাহমানের ভেতরে একটা দ্বন্দ্ব ছিলো। এটা হলো তার বিশ্বাসের ব্যপার।

শামীম রেজা : ধর্মের বিশ্বাস?

মোহাম্মদ সাদিক : না ধর্ম না।

আল মাহমুদ : ছিলো এটা। এটা তাকে খুব কষ্ট দিয়েছে। তিনি আমার বন্ধু ছিলেন।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনারা দুজনেই তো সুদর্শন।

শামীম রেজা : আপনি মদীনায় কবি হাসান ইবনে সাবিদের কবর খুঁজতে গিয়েছিলেন। মনে কি আছে আপনার? অনেক লোককে জিজ্ঞেস করেছেন। আপনার লেখায় পড়েছি তার সাথে মহানবী (সঃ) এর কাছে উপঢৌকন হিসেবে মিশরের দুই নারীকে পাঠানো হয়েছিলো। একজনকে বিয়ে দেওয়া হয়েছিলো এই কবির সাথে। হাসান ইবনে সাবিদ।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি খুঁজেছিলেন, মনে পড়ে আপনার?

আল মাহমুদ : মনে পড়ছে না।

শামীম রেজা : আপনি তো ইংল্যান্ডে গেছেন, আয়ারল্যান্ডে গেছেন? ইয়েটস্ এর বাড়ি খোঁজা কিংবা অন্য কারো?

আল মাহমুদ : আয়ারল্যান্ডে আমি যাইনি।

শামীম রেজা : ইংল্যান্ডে শেকসপীয়ার?

আল মাহমুদ : এখন খুব আফসোস হয়।

মোহাম্মদ সাদিক : লন্ডনে তো গেছেন?

আল মাহমুদ : হ্যাঁ।

মোহাম্মদ সাদিক : শেকসপীয়ারের বাড়ি তো গেছেন?

আল মাহমুদ : গেছি মানে কি! ঘণ্টার পর ঘণ্টা খুব ভোরবেলা লন্ডনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে ফিরে আসছি। মনে মনে বলছি এই তো বিলাত। এখানে আসার জন্য কি না করেছে আমাদের দেশের লোক।

মোহাম্মদ সাদিক : আমাদের দেশের কোনো কবির সমাধিতে যেতে ইচ্ছে করে কি না আপনার?

আল মাহমুদ : এরকম নাম তেমন মনে পড়ছে না।

শামীম রেজা : যেমন কাজী নজরুল ইসলাম। তার সমাধিতে তো বিভিন্ন অকেশনে গিয়েছেন। আত্মার টানে যেতে ইচ্ছে করে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তিনি বলতেন হাফিজ, আমরা বলি হাফেজ। তিনি হাফিজের কবরের পাশে গেলেন এরকম আপনার কাউকে ধরা যাক রুমির কবরের পাশে, হাফিজের কবরের পাশে যাওয়ার কোন আগ্রহ বা গিয়েছেন কি না?

আল মাহমুদ : না যেতে পারিনি তো। আসলে আগ্রহ তো আছেই।

মোহাম্মদ সাদিক : সাধারণভাবে কবির কাছে সব লেখাই মূল্যবান। আপনার সব লেখাই মূল্যবান। আমরা বাংলাদেশে জীবননানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’ যেমন, তেমন আপনার ‘সোনালী কাবিন’ এর কথা সবাই বলি— এখন আপনার বিচারে কাব্যগ্রন্থ বা কথাসাহিত্য বা গল্পগ্রন্থে- আপনার কোন সন্তান বেশি আদরের? এরকম কোন কাব্যগ্রন্থের নাম বলবেন, এরকম কোন কবিতার নাম।

আল মাহমুদ : সোনালী কাবিন, নিঃসন্দেহে।

শামীম রেজা : আনন্দের সন্তান।

আল মাহমুদ : ইচ্ছা করলেও আমি ওরকম আর...

শামীম রেজা : আপনার কবর নিয়ে একটা কবিতা আছে- “ফররুখের কবরে কালো শেয়াল”।

আল মাহমুদ : ওটা তো একটা টাইমকে বুঝানোর জন্য।

শামীম রেজা : বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় আপনার কবিতা ছাপা হলো । আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মরণীয় ঘটনার মধ্যে একটি।

আল মাহমুদ : যখন ‘কবিতা’ পত্রিকার একটা চিঠি আসছিল আমার এখানে—চিঠিটা হলো “তোমার একটি বা দুটি কবিতা ছাপা যাবে মনে হচ্ছে।”

মোহাম্মদ সাদিক : তাতেই আনন্দিত?

আল মাহমুদ : বুদ্ধদেব বসু! ভাবা যায়!

শামীম রেজা : এ-রকমের আরো কোনো আনন্দের অনুভূতির কথা বলতে পারেন?

আল মাহমুদ : না, এ আনন্দ আর কোনো সময় হয় নাই।

শামীম রেজা : কোনো প্রেমিকার সাথের অনুভূতিও কি?

মোহাম্মদ সাদিক : আধুনিক কবিতা লিখতে গিয়ে লালমাটিয়ায় বাংলা পড়ান। এটি লিখেছেন সরাসরি কবিতায়, আধুনিক কবিতা লালমাটিয়ার বাংলা বিভাগে কেনো আবদ্ধ হয়ে গেল আর কোথাও যেতে পারছে না কেনো? আপনার কবিতায় আয়েশা আক্তার জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বনলতা সেন এসব চরিত্রগুলো কি বাস্তব না?

আল মাহমুদ : আয়েশা বাস্তব

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি যদি কবি না হতেন আপনি আর কি হতে চাইতেন?

আল মাহমুদ : যদি আমি কবি না হতাম তবে আমি সঙ্গীতজ্ঞ হতাম।

মোহাম্মদ সাদিক : যদি আপনাকে আপনার গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়, যদি আপনার বয়স ফিরিয়ে দেয়া হয়, যে বয়সে আপনি গ্রামে ছিলেন, আপনি কাকে খুঁজবেন?

আল মাহমুদ : কিন্তু এটা আমি বলতে চাই না।

মোহাম্মদ সাদিক : ঢাকা শহরে বিউটি বর্ডিং-এর আড্ডার সময় সেই বয়স আপনাকে দেওয়া হলে আপনি আগে কাকে ডাকবেন? কার ঘরে টোকা দেবেন?

আল মাহমুদ : নামটা নাই বললাম।

শামীম রেজা : আপনার জীবন-অভিজ্ঞতা আপনার লেখার মধ্যেই পেতে চাই। সেটা কি আপনি সহজ করে লিখবেন?

আল মাহমুদ : আমি চেষ্টা করবো।

 

শ্রুতিলিখন : আমিনুল ইসলাম

 

 

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১২:৫১

মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬) লেখক পরিবার থেকেই এসেছিলেন। পিতৃমাতৃ—দুকূলই লেখক ছিলেন। এমনকি শ্বশুরকূলও। পুরুষানুক্রমেই এঁরা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মহাশ্বেতা দেবীর জীবনটা সাহিত্যের কাছেই সঁপে দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন দুহাত খুলে। ‘হাজার চুরাশির মা’ (১৯৭৪) তার অন্যতম আলোচিত উপন্যাস। গ্রন্থখানির পাঠপরিক্রমায় কিছুটা সাবধানী মনে এগুতে হয়। মাঝেমধ্যেই নিত্যনতুন চরিত্রের দেখাসাক্ষাৎ ঘটে। সিংহভাগ চরিত্রই দিব্যনাথ-সুজাতা পরিবারের। উপন্যাসখানি বুঝে নিতে চাইলে এদের মধ্যকার পারষ্পারিক সম্পর্ক স্মরণে রাখা খুবই জরুরি। পরিবারটি অনেকটা উনিশ শতকের ক্লাব-কালচারের ন্যায় সামন্তধারায় গড়ে ওঠে। ভোগবাদী প্রবৃত্তি এদের মধ্যে তীব্রতর। দিব্যনাথের নিজস্ব ‘চার্টার্ড অ্যাকাউনটেনসির আফিস।’ প্রতিনিয়ত মোটা টাকা আসে। জ্যোতি, নীপা অথবা তুলির স্বামীরাও কর্পোরেট কর্পোরেশনে হাই সেলারির জব করে। সবাই ভোগবিলাসে মত্ত। এদের চারিত্রিক স্খলনও কম নয়। অফিসের টাইপিস্ট মেয়েকে নিয়ে দিব্যনাথের ঢলাঢলি, মাঝেমধ্যেই রক্ষিতা নিয়ে বাইরে সান্ধ্য কাটানো। ঢেকেঢুকে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে সর্বসম্মুখে সহাস্যে এসব ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়। এসব সে পৌরুষ-অধিকার বলেই জানত। কেবল বর্তমান নয়, চিরকালই দিব্যনাথ নারী নিয়ে নোংরামি করে আসছে। শাশুড়িও কম প্রশ্রয় দেয়নি। ছেলে তার ‘পুরুষ বাচ্চা’, স্ত্রৈণ নয় বলে অহংকারও করত। দিব্যনাথের পিতাও নাকি যৌবনকালে এমনই ছিল। প্রায়শই সন্ধ্যাবেলা নারী নিয়ে বাইরে কাটাত। পরপর দুই পুরুষের নৈতিক অধঃপতন তৃতীয় পুরুষ জ্যোতি অথবা নিপাদের কাছেও সমভাবেই সমর্থন পায়। সামন্ত প্রভুর ন্যায় দিব্যনাথ নিজেকে পরিবারের ‘বস’ বলে বিবেচনা করত। সন্তানেরা অনেকেই ইনিয়েবিনিয়ে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে বাবাকে ‘বস’ বলেই সম্বোধন করত। এমনকি কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতীও। তবে এই সন্তানের মেজাজটা ছিল খানিকটা ভিন্ন ধার ও ধারার।

২.
অর্থবিত্তে স্বচ্ছল হলেও পরনারীতে অভ্যস্থ হওয়ায় দিব্যনাথ-সুজাতার দাম্পত্য-সম্পর্ক সুখের ছিল না। দিব্যনাথ সুজাতাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতো না। বরং যৌন পার্টনার হিসেবেই বিবেচনা করত। অসুখবিসুখ হলে খোঁজখবর নিত না। নবজাতকের কান্না থেকে বাঁচার জন্য তেতলায় ঘুমাত। প্রসূতি স্ত্রী থেকে দূরে অবস্থান করত। শাশুড়িমাও ছিল নারীবিদ্বেষী মহিলা। সুজাতার সন্তান জন্মদান সইতে পারত না। প্রসবকাল দেখলেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেত। তীব্র প্রসবযন্ত্রণা নিয়ে সুজাতাকে একা একাই নার্সিং হোমে যেতে হতো। দিব্যনাথের নজর কেবল একদিকে—‘আবার মা হবার যোগ্য শরীর হচ্ছে কি না সুজাতার।’ দুবছর পরপর সুজাতার চার সন্তান জন্মে। জ্যোতি, নীপা, তুলি। সর্বশেষ ব্রতী। প্রথম ও শেষে পুত্রসন্তান, মাঝখানে দুটি কন্যাসন্তান। ব্রতীর দুবছর বয়সকালে সুজাতা লম্পট দিব্যনাথের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেছিল। লেখকের ভাষায়—দিব্যনাথ কিছুতেই ওঁকে পঞ্চমবার ‘মা’ হতে বাধ্য করতে পারেনি। দিব্যনাথ সুজাতাকে ফার্মের কাজ ছেড়ে দিতে বলেছিল। সুজাতা মানেনি। ‘কাজ না-ছাড়া সুজাতার দ্বিতীয় বিদ্রোহ।’ 
বাবামায়ের মধ্যকার এই টানাপড়েন ব্রতী খানিকটা বুঝতে পারত। বুঝতে পারত মাতৃবক্ষের সুগভীরে লুকানো তীব্র গোপন ব্যথা। ব্রতীর মনটা কম্পাসের কাটার ন্যায় মমতাময়ী মাতা জগজ্জননী সুজাতার দিকে হেলে থাকত। ব্রতী সর্বদা মায়ের ওপর চোখদুটো সুস্থির রাখত। দশ বছর বয়সেও খেলাধুলা ফেলে বাড়ি চলে আসত। শিয়রে বসে মায়ের মাথায় বাতাস করত। এজন্য দিব্যনাথ ব্রতীকে সইতে পারত না। কনিষ্ঠ সন্তান হলেও শত্রু বিবেচনা করত। ব্রতীকে টিপ্পনি কেটে দিব্যনাথ কখনো বলত ‘মাদার্স চাইল্ড’ কখনো বলত ‘মেয়েমার্কা ছেলে। নো ম্যানলিনেস।’                 
মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে এই পুঁজিবাদী পরিবারের চরিত্রগুলো দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে পারিবারিক ‘বস’ দিব্যনাথ ও জ্যেষ্ঠ তিন সন্তান জ্যোতি, নীপা, তুলি। সেইসঙ্গে এদের পূর্বপ্রজন্ম ঠাকুরমাও। অপরদিকে সুজাতা ও তার কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতী। এই দ্বন্দ্ব কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমসাময়িক সমাজ অথবা রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব। এমনকি বৈশ্বিকও। বিশ্বজগৎ সংসার তখন ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দুধারায় দ্বিধাবিভক্ত। দ্বন্দ্বটা এতই জটিল ছিল যে, ভাই-বোন, পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীর সমুদয় সামাজিক ও আত্মিক বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। এমনকি রক্তের বন্ধনও।
 
৩.
দিব্যনাথপুত্র ব্রতী পিতার পুঁজিবাদী আদর্শে আস্থা হারিয়েছিল। আস্থা হারিয়েছিল সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থাপনায়। আস্থা হারিয়েছিল মুনাফাখোর ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্ধ নেতাদের ওপর। পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থার স্বপ্ন লালন করত। সমতাভিত্তিক একটি সুন্দর সুষম সমাজ বিনির্মাণের লক্ষে হৃদয় তার জেগে উঠেছিল। লেখকের ভাষায়, তখন সত্তর দশক। মুক্তির কাল। মুক্তির দশকে জনমুক্তির আন্দোলনে অনেকটা সংগোপনেই সংযুক্ত হয়েছিল ব্রতীরা। তখন সাম্রাজ্যবাদী শোষক সরকার ক্ষমতায়। জেলের পাঁচিল উঁচু করে। নতুন নতুন ওয়াচ টাওয়ার বসায়। বন্দিদের জন্য ফটকঅবন্দি খোলে না। সুগভীর রাতে ভ্যানভর্তি বন্দি এলে লেখকের ভাষায়—‘ওপর থেকে ক্রেন নামে। জন্তুর মত বন্দীকে যন্ত্রের নখে আঁকড়ে ক্রেন উঠে যায়, জেলের ভেতর নামিয়ে দেয়।’ জন্তুর মতো হলেও যারা জেলে যায়, তারা অন্তত প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু বাইরের ব্রতীরা নিদারুণভাবে প্রাণটা হারায়। রাষ্ট্রযন্ত্র নানা উপায়ে নির্মম নির্যাতন অব্যাহত রাখে। নির্জন সলিটারি সেলে নির্যাতন চালায়। লেখকের ভাষায়—‘সাউন্ডপ্রুফ। দরজা-জানালায় ফেলটমোড়ানো ফাঁপা রবারের নল বসিয়ে সাউন্ডপ্রুফ করা। ঘরের আর্তনাদ, গোঙানি, মারের আওয়াজ, জেরাকারীর গর্জন, সব শব্দ ঐ নলের জন্য ঘরের ভেতরেই বন্দী থাকে।’

৪.
বিজিত, প্রার্থ, লালটু, সমু ব্রতীর বিপ্লবী বন্ধু। এরাও চেয়েছিল স্বসমাজটিকে বদলে দিতে। সহযোদ্ধা বন্ধুদের বাঁচাতেই সেদিন ব্রতী গিয়েছিল সমুদের বাড়িতে। কিন্তু বাঁচাতে পারেননি। নিজেও বাঁচতে পারেনি। গভীর রাতে সমুদের বাড়ি ঘেরাও করে গুন্ডারা। হিংস্র গলায় বলে—‘বের করে দিন, লয়তো ঘরে আগুন দিমু!’ ব্রতীর কণ্ঠ শুনে কেউ একজন বলে ওঠে—‘হালায় আরেক মালটারে জুটাইছে। বাইর হ ঘটির পোলা।’ হাতে হাত রেখে স্লোগান দিতে দিতে ব্রতীরা বেরিয়ে আসে। বাইরে অন্ধকার। ঘুটঘুটে আধার মুখ হাসি-উল্লাসে ফেটে পড়ে। ভয়ংকর গন্ডগোল। ‘বাড়ী বাড়ী আলো নিভে যাচ্ছে, দরজা জানালা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চমকে সরে যাচ্ছে ভয়চকিম মুখ।’ সহসা স্লোগান থেমে যায়। সমবেত ঘাতকেরা খটখট গুলির শব্দ করতে করতে চলে যায়। সমুর দরিদ্র বাবা থানায় গেলে আততীয়দের নাম শুনে ধমকে ওঠে পুলিশ। পুলিশভ্যান আসতে আসতে সরে যায় ঘাতকেরা। নিতু ওরফে দীপুর মতো ভদ্রছেলেকে তো থানার সামনেই পিটিয়ে হত্যা করে। ‘প্রকৃত খুনি কখনো বন্দুক ধরে না।’ ব্রতী-সমুদের হত্যা-পরিকল্পনাকারীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এমনকি প্রত্যক্ষ ঘাতকদেরও বিচার হয় না। বুক ফুলিয়ে এরা নির্বিবাদে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। সমুর দিদিকে দেখে নির্মম ব্যঙ্গ করে, হাহা করে হাসে আর বলে—‘তর ভাইয়ের ছাদ্দ করলি না ক্যান? ভাল কইরা খাইতাম!’ সুজাতার মনে কত প্রশ্ন—যে শহরে এমন সব জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়, সেখানে পরপর কী করে সংস্কৃতিমেলা, রবীন্দ্রমেলা অনুষ্ঠিত হয়?

৫.
সুজাতা টেলিফোনেই ব্রতী হত্যার খবর পায়। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে—‘কাটাপুকুরে আসুন।’ পিতা দিব্যনাথ কাটাপুকুরে না গিয়ে দৌড়ায় পত্রিকা-অফিসে। পুত্রহত্যার খবর ধামাচাপা দিতে দিব্যনাথ ‘দড়ি টানাটানি করে বেড়াচ্ছিলেন।’ সফলও হয়েছিলেন। লেখক বলছেন—‘দিব্যনাথের ছোটাছুটি দড়ি টানাটানি সফল হয়েছিল। পরদিন খবরের কাগজে চারটি ছেলের হত্যার খবর বেরোয়। নাম বেরোয়। ব্রতীর নাম কোন কাগজে ছিল না।’ পত্রিকাপাতা থেকে ব্রতীকে মুছে দিয়েছিল দিব্যনাথ। মুছতে পারেনি মর্গ থেকে। সেখানে  ব্রতীর অবস্থান ‘হাজার চুরাশি’ নম্বরে। সেদিন ব্রতীর মৃত্যু পিতার কাছে কলঙ্কজনক মৃত্যুরূপে বিবেচিত হয়েছিল। মমতাময়ী মা সুজাতা সুস্থির থাকতে পারেননি। ছুটে গিয়েছিলেন কাটাপুকুরের লাশ ঘরে। প্রাণধন পুত্র ব্রতীর মৃত্যু নিয়ে কোথাও একটু সংশয় ছিল। তাই মুখটুকু দেখতে চেয়েছিলেন। অসীম করুণায় ডোম জানিয়েছিল—‘কি আর দেখবেন মাইজী? মুখ কি আর আছে কিছু?’ সীমাহীন মমতায় সুজাতা সবলে ব্রতীর মুখের আবরণ সরিয়ে দেয়। ‘শানিত ও ভারী অস্ত্রের উলটো পিট দিয়ে ঘা মেরে থেঁতলানো, পিষ্ট, ব্রতীর মুখ।’ আঙুল বোলানোর মতো ইঞ্চি পরিমাণ জায়গাও মসৃণ ছিল না। সবই দলিত, মোথিত, থেঁতলানো। তবু সুজাতা ব্রতী! ব্রতী! বলে আঙুল বোলায়। 
ব্রতীদের অপরাধ, ওরা দেয়ালে দেয়ালে বয়ান লিখত। ওরা লাল অক্ষরে লাল শব্দে দেয়াল রঙিন করে তুলত। কেবল মুক্তকণ্ঠে সমবেত স্লোগানই ধারণ করত না, প্রাণভরে বিশ্বাসও করত। দেবীর ভাষায়—‘ব্রতীরা এই এক নতুন জাতের ছেলে। স্লোগান লিখলে বুলেট ছুটে আসে জেনেও ব্রতীরা স্লোগান লেখে। কাটাপুকুর যাবার জন্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয়।’ ব্রতীরা এতটাই সমাজবিরোধী যে, দিব্যনাথের ন্যায় পিতারা মুখাগ্নিও করতে আসে না। ব্রতীদের লাশ কাটাপুকুরের মর্গে পড়ে থাকে। রাতে পুলিশ গাদাগাদি করে শ্মশানে বয়ে আনে। এরপর আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। শ্রাদ্ধে বিশ্বাসীজনও যথানিয়মে শ্রাদ্ধ করার সুযোগটুকুও পায় না। স্ফীত লাল চোখে বসে থাকতে হয় সারাটা দিন।

৬.
নকশাল আন্দোলনকে (১৯৭০) কেন্দ্র করে মহাশ্বেতা দেবী উপন্যাসটির আখ্যানভাগ সাজিয়েছেন। কল্পনার সঙ্গে সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতার দরকারি সমন্বয় ঘটয়েছেন। সেই সঙ্গে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তির সংগ্রামে (১৯৭১) কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা ‘বাংলাদেশের সহায় ও সমর্থনকল্পে পশ্চিমবঙ্গ তোলপাড় করে ফেলেছিল।’ কিন্তু নকশাল আন্দোলনের হত্যাকাণ্ড তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি অথবা এরমধ্যে পৈশাচিকতা খুঁজে পাননি। যদি পেতেন, ‘তাহলে ত কলকাতার কবি ও লেখক ওপারের পৈশাচিকতার সঙ্গে এপারের পৈশাচিকতার কথাও বলতেন।’ কিন্তু বলেননি। মূলত প্রান্তজনের বেঁচে থাকার লড়াই, লড়াই শেষে নিদারুণ পরিণতিই তুলে আনতে চেয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী। দেবীর গদ্যশেলীতে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও অসীম মমতায় সেটি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। উপন্যাস হয়ে উঠছে উপভোগ্য সেইসঙ্গে সাব-অলটার্ন হিস্ট্রির দরকারি দালিলিক শিল্পকর্ম। ২৮ জুলাই প্রয়াণদিবসে লেখকের প্রতি অশেষ প্রণতি।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১৮:৩৬

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা। কাঁটাবনে অবস্থিত প্রকাশনা সংস্থা ‘উজান’ এমন ঘোষণা দিয়েছে তাদের প্রকাশিত ‘কোরিয়ার কবিতা’ ও ‘কোরিয়ার গল্প’ নিয়ে আলোচনার জন্য।
এই বই দুটিতে রয়েছে কোরিয়ার বিশ ও একুশ শতকের উল্লেখযোগ্য কবিদের কবিতা এবং একই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিকদের ছোটগল্প। 
উজানের এই আয়োজনে সহযোগিতা করছে লিটারেচার ট্রান্সলেশন ইনস্টিটিউট অব কোরিয়া। 
বই আলোচনার সর্বোচ্চ পুরস্কার ২০ হাজার টাকা। এছাড়া দ্বিতীয় পুরস্কার ১৫ হাজার এবং তৃতীয় পুরস্কার ১০ হাজার টাকা। এই প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত সর্বোচ্চ ১০ আলোচকের প্রত্যেককে দেওয়া হবে ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের বই। 
আলোচনাগুলো বাছাই করবেন দেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও অনুবাদকদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারক কমিটি। একজন একটি বই নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন। আলোচনা বাংলাভাষায় লিখিত বা ভিডিও মাধ্যমে হতে হবে। 
অংশগ্রহণে ইচ্ছুক অনলাইনে ফরম পূরণ করতে করতে পারবেন এসব লিংকে www.ujaninfo.com, www.porospor.info। ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আলোচনা জমা দিতে হবে [email protected] এ।
বিস্তারিত জানতে এবং বই সংগ্রহ করতে পারবেন www.ujaninfo.com, www.facebook.com/UjanPrakashan, https://www.facebook.com/UjanBooks থেকে।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

কথা হয় জানি না 

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২১, ১৯:৪৪

কিছু ছবি এখনও আছে বলে কথা বলার দু-একটা মানুষ পাওয়া যায়>প্রতিবার মেঘ হলে মেঘমল্লার শুনে বৃষ্টি ভোলা যায় না>নিহত পশুররক্ত আর মাংস বাতাসে>দুঃখ আছে বলে কয়েকটা কবিতা এরপরও লেখা হবে>সকালগুলো ঘুমিয়ে কাটে বলে আর অপরাধবোধ জাগে না>রাত পেয়ে যাই>বাতাস কিন্তু ঘুরে যাচ্ছে>সময়ে সব বদলায় এ তত্ত্ব এখনও প্রমাণের চেষ্টা চলে>ঘরের মধ্যেও এক নেশা আসে বাইরেও এক নেশা যায়>নেশা>হেই হ্যালো, আমি হাস্নাহেনার গন্ধও পাচ্ছি>মাংসের গন্ধের সাথে>ছবি কিন্তু সব কথার উত্তর দেয়>হুহু করে উত্তর>থেকে বাতাস আসবে দুমাস পরেই>যদি বলি ছবিকে, কী, সে পাল্টা প্রশ্ন করে না>যদি বলি, কেন ও ইত্যাদি, পাল্টা প্রশ্ন করে না>যার যা উত্তর তা বুঝিয়ে দেয় আজকাল প্রতি রাতেই প্রায়>উত্তর পেতে পেতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে…>চরাচরে পাখি থাকলে বলে দিয়ো তাদের পাখায় আর কোনো শব্দ নেই>তাদের ওড়ায় আর কোনো নীরবতা নেই<

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বোকা দুপুরের নাম

বোকা দুপুরের নাম

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২১, ১২:১৮

বিকালের মেঘ ভেদ করে ঠোঁটজুড়ে আসে স্নিগ্ধ জলধারা। বহমান শান্ত জীবনের স্তুতি। তিনি হেসে চলেন, মন মাতানো মুগ্ধতা ছড়ায় চারপাশে। কংক্রিট শহরের মিহি আলোর অডিটোরিয়ামে মানুষ মানুষের বিশ্বস্ত চোখ খোঁজে। স্বপ্ন দেখে সরল বৈভবহীন জীবনের। যে স্বপ্নের স্পন্দন এখন ছড়িয়ে গেছে সমস্ত বাংলাদেশে। মঞ্চে যিনি অনর্গল কথা বলছেন সেই ‘আলোকিত মানুষ’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। বাগ্মী এ মানুষটির জীবন বহু কাজে বহু সৃষ্টিতে উদ্ভাসিত।

তাঁকে বুঝতে হলে তাকাতে হবে তাঁর অজস্র সৃষ্টিশীল বইয়ের দিকে, পাঠ নিতে হবে তাঁর আত্মজৈবনিক বইয়ের সরস বয়ান। জানতে হবে তাঁর ব্যাপক কর্মজীবন সম্পর্কে। চোখ খোলা রেখে আমাদের নিবিষ্ট হতে হবে সবুজ নিসর্গ, মানুষের কাছাকাছি বাংলার শ্যামল প্রান্তরে, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যে। সেই প্রকৃত সত্য খুঁজতে গিয়ে যন্ত্র বা নাগরিকতার ছোবলে যেখানে তাঁর হৃদয়ও আশাহত হয়েছে।

তিনি কবিতায় উচ্চারণ করেছেন―

একা একা টের পাই চারপাশে―আকাশে ও নিচে―
অবিশ্রান্ত আর্তনাদে ভেঙে যায় বহুদিনকার
ধানভানানীর গান এদেশের, পাটক্ষেত, বেহুলার ঘর―
ঢেঁকির পুরনো গল্প, সাপ, ঝোপ, দোয়েলের দেশ―
বাংলাদেশের আবহমানের।
(শাব্দিত কলঘর, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ২০)

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, জন্ম ২৫ জুলাই ১৯৩৯ সালে। অবিভক্ত ভারতে কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায়। পিতা সেময়কার স্বনামধন্য অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও নাট্যকার আযীম উদ্দীন আহমেদ, মাতা করিমউন্নেসা বেগম। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলায়। দেশভাগের পর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ পরিবারের সাথে চলে আসেন তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে। পিতার চাকরি সূত্রেই তার শৈশবের কিছু সময় কাটে টাঙ্গাইলের করটিয়ায়। সেখানকার বংশী নদী তাঁর শৈশবের মনোহর চিন্তায় দারুণভাবে গেঁথে আছে। তাঁর আত্মজৈবনিক বই বহে জলবতী ধারা প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, নিষ্ফলা মাঠের কৃষক ইত্যাদি তাঁর বহমান জীবনের নানান অভিজ্ঞতা, জীবন গল্পের সুনিপুণ বৃত্তান্ত। পিতার নাট্যচর্চা ও কবিতার খেয়াল তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করত। কলেজে পড়া অবস্থায় বুঁদ হয়েছেন কবিতায় ও সরল জীবনের দর্শনে। মূলত তার ব্যাপ্তিময় জীবনের ভিতটা সেসময়ই রচিত হয়েছিল। কলেজজীবনে তার কিছু শিক্ষকের অবদানও এক্ষেত্রে স্বীকার্য। কলেজজীবনেই তিনি ভ্রমণ করেন ইংরেজি কবিতা ও বাংলা কবিতার অপার সৌন্দর্যের ভূমিতে। যা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৬১ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে যোগদানের মধ্যদিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়। যা অব্যাহত ছিলো ১৯৯২ সাল পর্যন্ত। হরগঙ্গা কলেজ ছাড়াও শিক্ষকতা করেছে সিলেট মহিলা কলেজ, রাজশাহী কলেজ, ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজ (বর্তমানে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ) এবং সর্বশেষ ঢাকা কলেজে দীর্ঘসময় অধ্যাপনার পর অবসর গ্রহণ করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে বাংলা পড়াতেন। অধ্যাপক হিসেবে তার সফলতা ও জনপ্রিয়তা ছিল গগনচুম্বী। মূলত তাঁর সকল কাজের মাধ্যমেই তিনি মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। উজাড় করে দিয়েছেন সবটুকু। শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিজের কথায়―

আমি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলাম। সাহিত্যের স্বপ্ন ও সৌন্দর্য আজীবন আমার চেতনা-জগতে যে-হীরের দীপ্তি ছড়িয়েছে আমি সেই উজ্জ্বলতাকে ছাত্রদের ভেতরে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছি। তাদের সেই আনন্দে উজ্জীবিত করতে চেয়েছি। পরীক্ষায় ছাত্রদের বেশি নম্বর পাওয়াবার জন্যে পরিশ্রম করে জীবন নিঃশেষ করাকে আমার কাছে ‘দুর্লভ মানবজন্মে’র অপচয় বলেই মনে হয়েছে। জীবন কত দীপান্বিত ও জ্যোতির্ময় তা একজন ছাত্র সবচেয়ে ভালো করে জানতে পারে তার জীবনে দীপান্বিত শিক্ষকদের কাছ থেকে। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১১)

বর্তমান সময়ের শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে স্পষ্ট কথা বলতেও এ সফল অধ্যাপক দ্বিধা করেননি। প্রসঙ্গক্রমেই তিনি লিখেছেন―

আজ দেশের স্কুল-কলেজগুলোয় কার্যত লেখাপড়া হচ্ছেই না। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ লক্ষ শিক্ষকের অধিকাংশই শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নন, যাঁরা যোগ্য তাঁরা ছাত্রদের দেন অতি সামান্য। ফলে অভিভাবকরা কেউই বিদ্যালয়কে আজ তাঁদের সন্তানদের বিকাশের অঙ্গন হিসেবে মনে করেন না। ফলে বাণিজ্যিক উদ্যমসম্পন্ন গৃহশিক্ষকরা আজ হয়ে উঠেছেন ছাত্রসমাজের মূল আশ্রয়। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১৭৬)

বাংলাদেশের ষাটের দশকে নতুনধারার সাহিত্য সৃষ্টির আন্দোলনের পুরোধা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। প্রায় একযুগ ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা সম্পাদনা করার মাধ্যমে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলা সাহিত্য বাঁকবদলের ধারায়, প্রগতিশীল সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াসে। নিশ্চিত আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন সেসময়কার তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনালগ্ন হতে যুক্ত হন উপস্থাপনায়। রুচিশীল ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, উপস্থাপনায় তার নিজস্ব ধরন ইত্যাদি কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় উপস্থাপক খ্যাতিতে ও ব্যক্তিত্বে। তাঁর হাত ধরেই অনেক মেধাবী তরুণ উঠে আসে। তাঁর ‘আমার উপস্থাপক জীবন’ বইটিতে তিনি তুলে ধরছেন তাঁর উপস্থাপক জীবনের নানান দ্বন্দ্ব ও প্রতিকূলতা। বর্ণনা করছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে যাত্রা আর সমৃদ্ধির বিভিন্ন দিক। আমাদের মহান মুত্তিযুদ্ধে পাকসেনাদের হাতে আটক হয়েছিলেন তিনি। উপস্থাপক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচিয়ে ছিল বলে তিনি বইটিতে বলেছেন নির্দ্বিধায়। তাঁর ‘সংগঠন ও বাঙালি’ বই পাঠকের কাছে খুবই জনপ্রিয়। জাতীয় জীবনে সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা, বাঙালির সংগঠনের দুর্বলতা এবং তা কীভাবে আমাদের জাতীয় জীবনে উন্নতির মূলবাধা হয়ে দাঁড়ায় তার স্পষ্ট বয়ান রয়েছে বইটিতে। সংগঠনের অভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রায় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, ব্যক্তি ডুবে থাকে তা আত্মকেন্দ্রিকতায় এসবের সত্য উপলব্ধি উঠে এসেছে তাঁর লেখায়।

১৯৭৮ সালে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। তিনি কবিতায় লিখেছেন―

রাত্রিকে বাসে না ভালো কেউ সম্প্রতি। কেননা এ
রাত্রি সব এক করে দেয়। রাত্রির নির্বাক কাফন
জামার পৃথক রঙ, স্বতন্ত্র চুলছাঁটা, আস্তিনে মাপ
মুছে দিয়ে সবাইকে আদ্যোপান্ত এক পাতলুনের ভেতর
নিয়ে আসে।
(মৃত্যুময়ের জন্য, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ৫৬)

হ্যাঁ, তিনি এমন রাত্রিকেই দূর করতে চেয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন সংস্কৃতিমান, মুক্ত চেতনার সৃজনশীল মানুষ না হলে আগামী বাংলাদেশ হবে অনুর্বর, অন্ধকার। তিনি বইয়ের সোনালি অক্ষরে, জ্ঞানের অমৃতবাণীতে বদলাতে চেয়েছেন সমাজকে, তরুণদের। বই পড়া আন্দোলন ও নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লক্ষ হচ্ছে―আগামী দিনের অর্থাৎ তরুণদের বড় করে তোলা ও তাদের সংঘবদ্ধ জাতীয় শক্তিতে পরিণত করা। প্রায় বিয়াল্লিশ বছর ধরে তাঁর নেতৃত্বে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বিভিন্নভাবে কাজ করে চলেছে অবিরাম। এগুলো মধ্যে রয়েছে―দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রম, পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি, আলোর ইশকুল, কেন্দ্রের লাইব্রেরি, আলোকচিত্র চক্র, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি। সারা দেশে প্রায় ২৪ লাখ ছাত্র/ছাত্রী বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কার্যক্রমের সাথে যুক্ত। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন―

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবনের সর্বাধিক কীর্তি হিসেবে দেখা দেয়। যেখানে আমরা অনেকে মিলে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারি না, সেখানে একক প্রচেষ্টায় এত বড় একটা প্রতিষ্ঠান গড়া যে তাঁর বিশেষ যোগ্যতার প্রকাশ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর ব্যাপ্তি সারা দেশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের সীমানা ছাড়িয়েও।…সায়ীদ লিখেছেন প্রচুর। কবিতা ও ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও ভাষণ, স্মৃতিকথা ও জার্নাল, নাটক ও অনুবাদ।…তাঁর মধ্যে মিলিত হয়েছে শিল্পী ও কর্মী, ভাবুক ও উদযোগী। তাঁর চিন্তা ও সাধনায় দেশ ক্রমাগত উপকৃত হোক। (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, পৃ. ৩৫, ৩৬)

সত্যিকারভাবেই বহুমুখী কাজের মাধ্যমে তিনি উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩২টি। গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতায় সাহিত্যে বিভিন্ন শাখায় তিনি অবদান রেখেছেন ও রেখে চলেছেন। সামাজিক নানা কাজেই তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। যেমন ডেঙ্গু প্রতিরোধ আন্দোলন, পরিবেশ দূষণবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি। তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন সম্মাননা ও পুরস্কার। এগুলোর মধ্যে আছে―জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার (১৯৭৭), র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার (২০০৪), একুশে পদক (২০০৫), পরিবেশ পদক (২০০৮), বাংলা একাডেমি পদক (২০১২) ইত্যাদি।

‘আলোকিত মানুষ চাই’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের দেখানো পথেই আগামী দিনের তরুণদের মধ্যে ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’ বই পড়ার মাধ্যমে এমন অনুভূতির প্রবহমানতায়, চর্চায় হয়তো আমরা পাব সংঘবদ্ধ, প্রগতিশীল, আত্মকেন্দ্রিক জীবনকে পেছনে ফেলে আসা দেশপ্রেমিক বুদ্ধিদীপ্ত এক প্রজন্ম। যা বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।

এ মহীরুহের জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা।

সহায়ক গ্রন্থ

১. বহে জলবতী ধারা (প্রথম খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
২. বহে জলবতী ধারা (দ্বিতীয় খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০১১।
৩. মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৮৮।
৪. নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৫. বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৬. আমার উপস্থাপক জীবন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৫।
৭, সংগঠন ও বাঙালি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
৮. আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, সম্পাদনা―আতাউর রহমান, ঢাকা, ২০১৫।
৯. ইন্টারনেট।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২১, ০৯:০০

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (২৩ জুলাই, ১৮৯৮-সেপ্টেম্বর ১৪, ১৯৭১) বিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি কথাসাহিত্যিক। তার সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি গল্পগ্রন্থ, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধের বই, ৪টি আত্মজীবনী, ২টি ভ্রমণ কাহিনী, ১টি কাব্যগ্রন্থ এবং ১টি প্রহসন। তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, পদ্মশ্রী এবং পদ্মভূষণ পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন।

 

যা খুব ছোট, তাকে খুব কাছ থেকে না দেখলে ভালো করে চেনা যায় না। দূর থেকে তা অস্পষ্ট দেখায়। কিন্তু যা খুব বড়, একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে তাকে না দেখলে, তার ব্যাপ্তিটা অধরা থেকে যায়। প্রথম হিমালয় দর্শনে ঠিক এই রকমই একটা সম্ভ্রম জাগানো অনুভূতি হয় যেকোনো মানুষের। কিন্তু আস্বাদন পরিপূর্ণ হয়, শুধু দূর থেকে নয়, যখন কাছে গিয়েও তাকে দেখি।
কিন্তু আমার তারাশঙ্করের দর্শন ঘটেছিল এর ঠিক বিপরীত ক্রমে। তাঁকে প্রথমে দেখেছিলাম খুব কাছ থেকে, পরম স্নেহের নৈকট্যে। সে প্রথম যে ঠিক কবে তা আজ আর বলতে পারি না—তবে স্মৃতির ভেতরে প্রথম যে ছবিটি দেখি তা সম্ভবত ১৯৪৮ এর, এবং স্থান কলকাতারই বাগবাজারের ১/১ আনন্দ চ্যাটার্জি লেনের একটি বাড়ির দোতলার ঘরে। একটি সাবেকী আমলের খাটের ওপর চড়ে আমরা তিনটি শিশু খেলছি, লাফাচ্ছি, কখনো বা নাচছি—আর অদূরেই কৃষ্ণবর্ণ ধ্যানমগ্ন এক প্রৌঢ় ছোট্ট একটি কাঠের ডেস্কের ওপর গভীর নিবিষ্ট হয়ে লিখে চলেছেন পাতার পর পাতা। মুক্তোর মতো অক্ষরে একে একে ফুটে উঠছে বাংলা কথাসাহিত্যের উজ্জ্বলতম রত্নখনি। তবু সে সান্নিধ্য এত সহজ ছিল বলেই হয়তো আজও সমানভাবে স্পষ্ট। তিনি লিখছেন আর আমরা—তাঁর নাতিনাতনিরা খেলছি। খেলা যখন ছিল তোমার সনে/তখন কে তুমি তা কে জানতো? জানতে পারিনি ঐ নৈকট্যের জন্যই হয়তো-বা। ফলে আমাদের খেলাটা ছিল অবাধ। কখনো ঘরে কখনো ঘর ছাড়িয়ে বারান্দায়—সরু লম্বা বারান্দার ওপাশে আরেকটা বারান্দায় কখনো কখনো দেখা দিতেন লং ক্লথের পাঞ্জাবি পরা, সাদা চুল এক বৃদ্ধ। দাদুর যামিনী দা—শিল্পী যামিনী রায়। মাঝে মাঝে দুই জ্যোতিষ্কের বার্তাবিনিময় হতো এপার ওপার।
ইতিমধ্যে দাদুর সাহিত্যিক খ্যাতি বাড়ছিল। বাড়ি তৈরির কাজও চলছিল। ১৯৪৯ এ বাগবাজার ছেড়ে তিনি উঠে গেলেন টানাপার্কে তাঁর নিজস্ব বাড়িতে। তার কিছুকাল পরেই আমরাও চলে এলাম পাইকপাড়ায় গোয়েল্কা গার্ডেন্স-এর একটি আশ্চর্য সুন্দর ফুটফুটে ফ্ল্যাটে। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। খুব কাছেই দাদুর বাড়ি। রোজ বিকেলে খেলতে যেতাম ওবাড়ির পাশের মাঠে। বাড়ির সামনেই বোগেনভেলিয়ার ছায়অর নিচে দুপাশে রোয়াক, মাঝে বেতের চেয়ার পাতা। দাদু বসে আছেন। তাঁকে ঘিরে আরো কতজন। কথা হতো কত বিষয়ে। মাঝে মাঝেই শৈল দাদু এসে উপস্থিত হতেন। সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। দাদুর বাড়ির ঠিক বিপরীতে আর্মড পুলিশের ক্যাম্প। তার ওপাশে ইন্দ্রবিশ্বাস রোডের ওপর বাড়ি করেছিলেন শৈল দাদু। প্রতিদিন সকালে বন্ধু সন্দর্শনে তাঁর আসাটা ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। দাদুও যেতেন।
কিন্তু সে অনেক পরের ঘটনা। ১৯৬০-৬১ নাগাদ তখনো সজনীকান্ত দাস বেঁচে। শনিবারের চিঠি প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত রমরমিয়ে। শৈলজানন্দের বাড়ি থেকে পূবদিকে আরেকটু এগোলেই সজনীকান্তের বাড়ি। নিচে বিশাল অফিস, প্রেস আর সেখানেই বাংলার তাবড় তাবড় সাহিত্যিকদের আড্ডা। সে আড্ডায় তারাশঙ্করকে, শুনেছি বড়বাবু বলেই চিহ্নিত করা হতো।
দেখতে দেখতে আমাদের টালা-পাইকপাড়া অঞ্চলটা একসময় সাহিত্যিকদের তীর্থস্থান হয়ে উঠল। মন্মথ দত্ত রোডের একটি ফ্ল্যাটে কাজী নজরুল ইসলাম; কিন্তু তাঁর চৈতন্য তখন মহামগ্ন। আরেকটু এগিয়ে সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্র। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীও এলেন কিছুকাল পরে, শৈলজানন্দের বাড়ির একতলায়। পাইকপাড়ায় আমাদের বাড়িরই কাছে হাউসিং স্টেটে থাকতেন গৌরকিশোর ঘোষ।
চাঁদের শোভা থাকে, সূর্যের রামধনু। বিদ্রোহী কবি তখন ফুলের জলসায় নীরব। তাঁকে বাদ দিলে, বাকিরা ছিলেন তারাশঙ্করের...। তাঁর সভার নিত্য অতিথি।
কিন্তু আরো দুজন ছিলেন, তাঁরা শুধু তাঁর... ছিলেন না, তাঁর ভাবের অংশীদারও ছিলেন। একজন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র, আমার বড়মামা সনৎকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরেকজন আমার বাবা, তারাশঙ্করের জ্যেষ্ঠ জামাতা শান্তিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়। শুধু আত্মীয় নয়, এঁরাও ছিলেন তাঁর সভার...।
আরো কতজন, কত গুণীজন, কত কবি সাহিত্যিক শিল্পী যে তাঁর বাড়িতে পদচিহ্ন রেখে গেছেন তার হিসাব দেওয়া অসম্ভব। এসেছেন বনফুল, অচিন্ত্যসেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, প্রবোধ সান্যাল, আশাপূর্ণা দেবী, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী—এমনি আরো কত যে গুণীজন। আর এঁদের... আর ফুলের গন্ধে—টালাপার্কের বাড়ি ভরে উঠত প্রতিবছর ৮ই শ্রাবণ—তারাশঙ্করের জন্মদিন। বাড়িতে মানুষ ধরত না। তাই ম্যারান বেঁধে—সে এক বিপুল আয়োজন। ফুলের গন্ধের সঙ্গে যোগ দিত খাবারের মন মাতানো গন্ধ।
বছরে দুটি দিনের জন্য আমাদের ছিল একমাত্র প্রতীক্ষা দুর্গা পুজো আর আটই শ্রাবণ। আমাদের মধ্যে আবার আমার দিদি, শকুন্তলার প্রতীক্ষা ছিল সবচাইতে ব্যাকুল। কারণ, কি সৌভাগ্য ওরও জন্মদিন ঠিক ওই ৮ই শ্রাবণ। একে বড় নাতনি, তার জন্মদিনের ঐ একসূত্রতা। দাদুর কাছে ওর ছিল একটু বিশেষ সমাদর। ওকে নিয়ে কবিতাও লিখেছিলেন তিনি—
তুমি যখন হবে পঞ্চদশী
আমি হব ষাট বছরের বুড়ো
তুমি খাবে কড়মড়িয়ে মেঠাই
আমি খাব চেটে চেটে ঝুরো।

দাদুর বয়স যখন পঁয়তাল্লিশ, তখন দিদির জন্ম। অতএব দাদুর যখন ষাট, দিদি তখন পঞ্চদশী। টীকা আরো একটু হয়তো অপ্রায়োগিক হবে না। বীরভূমে মিঠাইকে বলে মেঠাই, মেটাই, কিংবা আরো সঠিকভাবে বললে ‘মিটিই’। মনে হতে পারে মিঠাই কি তবে কড়মড়িয়ে খাওয়া যাবে? আসল কথা হলো, মেঠাই মানে বীরভূমে সন্দেশ নয়—গুড় আর বেসনের লম্বা লম্বা কাঠিভাজা, ওখানে বলে সিড়িভাজা—তার নাড়ু—বেশ শক্ত, কড়া পাকেঢ়। কড়মড়িয়েই খেতে হয়। প্রতিবছর পুজোর সময় ঘরে ঘরে এইসব মেঠাই, নারকেল খণ্ড, খই বিনু—এমনি আরো কত কি তৈরি হতো। আর ঝুরো হলো শুকনো বালিগুড়। এও বীরভূমেরই শব্দ।
সে তো আসবেই। তারাশঙ্করের কবিতায় বীরভূম আসবে না, লাভপুর আসবে না—তাই হয়! কোনো না কোনোভাবে আসবেই আসবে। তাঁর শেকড় যে ঐ মাটিতেই। আর জীবনের শেষ মুহূর্তেই তাঁর ভ্রুযোগ ছিন্ন হয়নি। প্রায়ই যেতেন গ্রামের বাড়িতে। তাঁদের যে সাবেক বৈঠকখানা বাড়ি—খড়ের চাল, এপাশ ওপাশ বারান্দা, সামনে বাগান—আর এই বাগানেই তিনি রোয়াক বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন, ভারী সুন্দর একটা গোলঘর বানিয়ে ছিলেন। সামনে নানান ফুলের গাছ। রোয়াকের পাশে চেয়ার পাতা—এখানেই বসতেন বন্ধুবান্ধব পরিচিতজনের সঙ্গে। গল্প হতো। কখনো অন্ত্যজ শ্রেণির বহু মানুষ আসতেন। তাঁর কাছে তাঁরাও ছিল আপনজন। পুজোর সময় সবাইকে কাপড় দিতেন। অর্থ সাহায্য দিতেন সাধ্যমতো।
লাভপুরকে তিনি ভোলেননি। আর লাভপুরও আজও ভোলেনি তাঁকে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

সর্বশেষ

‘৩ ডোজ টিকা নেওয়া’ সেই সৌদি প্রবাসী কোথায়?`

‘৩ ডোজ টিকা নেওয়া’ সেই সৌদি প্রবাসী কোথায়?`

বাগেরহাটে পানিবন্দি হাজারো পরিবার, টর্নেডোতে বিধ্বস্ত বাড়িঘর

বাগেরহাটে পানিবন্দি হাজারো পরিবার, টর্নেডোতে বিধ্বস্ত বাড়িঘর

ক্যাম্প থেকে পালিয়ে কুড়িগ্রামে আটক ৯ রোহিঙ্গা

ক্যাম্প থেকে পালিয়ে কুড়িগ্রামে আটক ৯ রোহিঙ্গা

করোনায় আটকে আছে ত্রিদেশীয় বৈঠক

করোনায় আটকে আছে ত্রিদেশীয় বৈঠক

কিউকম ও রানার এর মধ্যে ব্যবসায়িক চুক্তি

কিউকম ও রানার এর মধ্যে ব্যবসায়িক চুক্তি

বলপূর্বক কাবুল দখল করলে তালেবান স্বীকৃতি পাবে না: যুক্তরাষ্ট্র

বলপূর্বক কাবুল দখল করলে তালেবান স্বীকৃতি পাবে না: যুক্তরাষ্ট্র

বিলের মাঝখানে উপহারের ঘর, ডুবলো পানিতে

বিলের মাঝখানে উপহারের ঘর, ডুবলো পানিতে

নতুন রূপে ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের’ পথ চলা

নতুন রূপে ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্সের’ পথ চলা

পাকিস্তান-ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৯ ওভারের ম্যাচটিও শেষ হলো না

পাকিস্তান-ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৯ ওভারের ম্যাচটিও শেষ হলো না

দেয়ালেও করোনাভাইরাস, সাতক্ষীরা মেডিক্যালের ল্যাব বন্ধ

দেয়ালেও করোনাভাইরাস, সাতক্ষীরা মেডিক্যালের ল্যাব বন্ধ

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় পরিবেশমন্ত্রীর

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় পরিবেশমন্ত্রীর

সেই লাকী আক্তারের কণ্ঠে কন্যা ও কান্নার গল্প (ভিডিও)

সেই লাকী আক্তারের কণ্ঠে কন্যা ও কান্নার গল্প (ভিডিও)

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

থিয়েটার

থিয়েটার

গহন
শীতের অপেক্ষা করছি না

শীতের অপেক্ষা করছি না

মন্তাজের নিজের জমি

মন্তাজের নিজের জমি

© 2021 Bangla Tribune