X
শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ১০ বৈশাখ ১৪২৮

সেকশনস

তিস্তা জার্নাল । শেষ পর্ব

আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:১১

পূর্বপ্রকাশের পর

বেলা পড়ে গিয়েছিল। গোডাউনের হাটের পাশে দাঁড়ানো ভ্যানগুলোর কাছে হেঁটে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শরীরে শীত অনুভব করতে শুরু করেছি। হাট থেকে মরিয়ম সিল্লানির মাজার পর্যন্ত রাস্তাটা ছবির মতো। এই শীতের মৌসুমে চারদিকের প্র্রকৃতি থেকে সবুজের গাঢ় সতেজতা উধাও। গাছের পাতায় পাতায় ধূসর ধূলার আস্তরণ। মাথার উপরে আকাশও ধূসর নীল। সরলরেখার মতো সোজা উঠে যাওয়া শিমুল আর ইউক্যালিপটাস, রাস্তার পিচ, দুপাশের ক্ষেতে তুলির একেকটা স্ট্রোকের মতো সোনালি সবুজে মেশানো ধানের নাড়া, ঘাস—সবকিছুতেই সেই ধূসরতার প্রতিফলন মাখানো।

ভ্যান চলতে শুরু করলে শীতের অনুভূতিটা আরও জোরালো হলো। মন ভারাক্রান্ত। ভাবছিলাম, ‘বাড়ি’র ধারণার সাথে মানুষের অস্তিত্বের বোধ কতখানি জড়িয়ে থাকে। উন্মূল মানুষের মনে ঘুমিয়ে থাকা জীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলো কীভাবে এক মুহূর্তের মধ্যে হঠাৎ চাবুক-খাওয়া একটা আদুরে ঘোড়ার মতো যন্ত্রণায় জেগে উঠতে পারে। আর, হারানো বাড়ি একটা অপ্রশমিত ব্যথার মতো তাকে পৃথিবীময় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় সেইসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য। তার প্রশ্ন থেকে উত্তরে পৌঁছানোর এই অভিযাত্রাকে অন্য মানুষদের দর্শকের চোখ দেখে প্রচেষ্টা হিসেবে, তার সাফল্যকে নাম দেয় ‘সার্থকতা’।   

মরিয়ম সিল্লানির মাজার থেকে গোডাউনের হাটের রাস্তা—কিছুদূর এগোলেই নদী। ছবি : লেখক পীর সাহেব মোহাম্মদ আলীর বাবা গউস উদ্দিন যখন মহীপুরের ভূস্বামী পিতার সম্পত্তি থেকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত হয়ে তরুণ বয়সে মা আর একমাত্র ভাইয়ের হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, তখন তাঁর হারানো কিংবা ছেড়ে-আসা ‘বাড়ি’ হয়ে উঠেছিল তাঁর সারা জীবনের উপশমহীন ব্যথার উৎস। তাঁর মা ছিলেন ভূস্বামী পিতার তৃতীয় স্ত্রী—রূপকথার দুয়োরানির চেয়েও বেশি অবহেলার। নিজের দুর্ভাগ্যের চেয়েও তরুণের মনে আঘাত করেছিল মায়ের প্রতি তাঁর বাবার অবহেলা, অপমান। শুধু বাড়ি নয়, পিতার পদবিও তিনি বর্জন করেছিলেন। নতুন পরিচয়ে, নতুন ঠিকানায় নিজেকে জন্ম দেবেন বলে পুরনো পরিচয়ের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে দিয়েছিলেন। কিন্তু এই আত্মপ্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল—ন্যায়বিচার কি পৃথিবীতে আছে? কোথা থেকে আসে সেই বিচার? তেমন কোনও উৎস কি সত্যিই আছে? কীভাবে তার অস্তিত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যাবে? কোন পথে মিলবে সেই বিচার?

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সেই সময়ে গউস উদ্দিন তাঁর প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছিলেন রাজনীতি, ক্ষমতা, আইন, বিজ্ঞান বা দর্শনের পথে নয়—আধ্যাত্মিকতার পথে। কেন তিনি তা করেছিলেন এবং কেনই-বা তাঁর অভিমানজাত সাময়িক সন্দেহ শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসে স্থির হয়েছিল, তার বৃত্তান্ত অজানা। তবে ছেড়ে আসা বাড়িতে তিনি আর ফিরে যাননি—আত্মীয়দের অনুরোধ সত্ত্বেও। কারণ, অবিচার তাঁর চেতন মনে যে স্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল তা হলো, তাঁর কাছে ‘বাড়ি’র সংজ্ঞা বদলে গিয়েছিল। মহীপুরে তাঁর ছেড়ে আসা বাড়ি থেকে মাত্র কয়েক মাইল উজানে কোলকোন্দ আর আবুলিয়ার সীমান্তে তিনি নিজেই তাঁর বাড়ি তৈরি করেছিলেন। তবু এই তথ্যও অজানা যে, গউস উদ্দিন তিস্তার ভাঙনের মুখে তখনও টিকে থাকা তাঁর ‘পুরান বাড়ি’র প্রতি টানকে কোন ক্রোধ কিংবা অপার্থিব বিচারের প্রতিশ্রুতির জোরে অগ্রাহ্য করতে পেরেছিলেন।

অবশ্য এ প্রশ্নও মনে জাগে: বাড়ির মানুষের নির্মমতম আঘাত সত্ত্বেও গউস উদ্দিন কি সত্যিই বাড়ির টান এড়াতে পেরেছিলেন? বাড়ি ছেড়ে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া শেষ করে উন্মূল যুবক গউস উদ্দিন তাঁর প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে সারা ভারতের পীর-দরবেশদের আস্তানায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। বড় অদ্ভুত পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি: ‘বাড়ি’ নামের ক্ষুদ্রায়তন, ব্যক্তিগত এবং জাগতিক একটা নির্মাণসামগ্রীর কাঠামো যাঁদের কাছে অর্থহীন, যাঁরা বাড়ি থাকা-না-থাকার পার্থিব যন্ত্রণার পরম সমাধান হিসেবে বাড়ির বাঁধন ছেড়ে মুক্ত পৃথিবীকে নিজেদের আবাস বানিয়েছেন, তাঁদের কাছেই তিনি বাড়ি হারানোর ব্যথার উপশম খুঁজেছিলেন। তাঁদের উত্তর হয়তো তাঁর মন গ্রহণ করেনি। হয়তো সে কারণেই ‘বাড়ি’র মায়া থেকে গউস উদ্দিন মুক্তি পাননি কোনওদিন।

চরে সবজির ক্ষেত—বোল্লার পাড়ের বাঁধ থেকে নেমে এগোতেই উপচে পড়া জীবন। ছবি : লেখক তবে সে মায়া কাটানো সত্যিই সহজ নয়। তিস্তার তীরে ভাঙাগড়ার অনিশ্চয়তা আর ব্যথার মধ্যেও জীবন সুন্দর। বোল্লার পাড়ে বাঁধ থেকে নেমেই বালি আর শুষ্কতার মধ্যেও সবুজের সম্ভার দেখে প্রাণ জুড়িয়ে গিয়েছিল। সবজি ক্ষেতে জীবন যেন উপচে পড়ছে—সবুজ লাল হলুদে চারদিক রঙিন। শান্ত তিস্তার শরীর জুড়ে আকাশের প্রতিফলিত নীল। সেই নীল জলের উপরে সাদা ধবধবে সুতোয় চিকন বুননের একটা চটকা জাল বাঁশের খুঁটি থেকে অলসভাবে ঝুলছে। এই দৃশ্যটি দেখে আমার মনে হয়েছিল, মাছ ধরা শুধুই একটা খাদ্য সংগ্রহের কাজ নয়—একটা শিল্পও বটে। একটা সুন্দর অবসরযাপন। গউস উদ্দিনের তৃতীয় পুত্র আমার পিতামহ আব্দুল আলী পণ্ডিত সেই সুন্দরের নেশায় মেতেছিলেন। তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র আমার বাবারও ছিল একই নেশা। কল্পনা করতে পারি, পৌনে দু’শ বছর আগে গউস উদ্দিন নিজের তরুণ মন জুড়ে বাবার দেওয়া অবহেলা, বঞ্চনা আর মায়ের অপমানের জ্বলন্ত ক্ষত নিয়ে যখন এই তিস্তার তীরের বাড়ি ছেড়ে সারাজীবনের জন্য বেরিয়ে পড়েছিলেন, তখনও এই ভূদৃশ্য নিশ্চয়ই এরকমই ছিল। আত্মনির্বাসনের অনেকগুলো বছর বাড়ির সেই ছবি তাঁর মনে হয়তো শান্তি আর আশ্রয় নয়, একটা যন্ত্রণার মতো গেঁথে ছিল। তবু, অথবা সেই কারণেই, হারানো বাড়ি ফিরে পাওয়ার প্রয়োজন ছিল তাঁর, অন্তত একটা বিকল্প বাড়ি—আর সেটা হওয়া চাই এই তিস্তার তীরেই। গউস উদ্দিন মাওলানার প্রতিষ্ঠিত সেই বাড়িই তাঁর নাতি, অর্থাৎ আমার বাবার ‘পুরান বাড়ি’।

আমার বাবার মন থেকে পুরান বাড়ি কখনও ‘পুরান’ হয়ে যায়নি। খুব ছোটবেলায়, যখন পীরের বাড়ির বেশির ভাগ সদস্যই তিস্তা থেকে পাঁচ-ছয় মাইল দক্ষিণে পীরেরহাটে স্থায়ী হয়েছে, আমি আর আমার ভাই আমার বাবার সাথে ঈদের নামাজ পড়তে যেতাম তিস্তার পাড়ের ঈদের মাঠে। মনে আছে, পীর সাহেব গউস উদ্দিন মাওলানার আরেক নাতি শামসুল হুদা পীর সাহেবের পিছনে কয়েকশ’ লোক দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ পড়ছে। সুরা পড়ার নিঃশব্দ সময়টায় অদূরেই পানির ছলাৎ ছলাৎ শুনতে পাচ্ছিলাম। ঈমাম সাহেবের মুখ থেকে বেরনো ‘আল্লাহু আকবর’ কাতারে কাতারে প্রতিধ্বনিত হয়ে অদ্ভুত গম্ভীর কিন্তু রোমাঞ্চকর একটা আবহ তৈরি করছিল। সেই আবহ আর নামাজ পড়তে আসা লোকজনের নানান রঙের জামায় বহুবর্ণিল মাঠটার চেয়ে শিশুর মনকে বেশি টানছিল তিনদিকে ঘিরে থাকা ঘোলা পানির প্রবাহ, কারণ নদীটা ভাঙছিল। সেজদায় যাওয়া নামাজিদের পিঠের সমুদ্রের ওপর দিয়ে বারবার চারদিকে তাকাচ্ছিলাম আর দেখতে পাচ্ছিলাম সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠটার প্রান্তগুলো থেকে বিরাট বিরাট চাঙড় ভেঙে ভেঙে পড়ছে। সে মাঠটা ছিল আমার কখনও-না-দেখা ‘পুরান বাড়ি’র কাছেই। কয়েক মাইল ভাঙাচোরা কাঁচা রাস্তা ঠেঙিয়ে নদীপাড়ের কাদাপানি ভেঙে দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে আমার বাবার সেই মাঠেই নামাজ পড়তে যেতে হতো। সেই বছরেই সেই মাঠ তিস্তায় সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যায়। তার আগে পর্যন্ত অন্য কোনও মাঠে ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়ার কথা আমার বাবা ভাবতেও পারেননি।   

হারানো বাড়ির প্রতি এই যুক্তিহীন নাছোড় টান দেখেছি তিস্তার তীরে মাইলের পর মাইল জুড়ে মানুষের বসতিগুলোয়। মহীপুর থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ ধরে পশ্চিমে কোলকোন্দের দিকে হাঁটতে থাকলে চোখে পড়ে নদীর ঠিক উল্টো দিকে বাঁধের ধার ঘেঁষে বানানো বাড়িঘর, পুকুর। ধুলোভরা এবড়ো-খেবড়ো উঠানে খড়ের স্তূপ। তিন-চারটি করে ঘর যেনতেনভাবে মুখোমুখি বসিয়ে একটা স্থায়ী কাঠামো দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে—তবু যেন ওগুলো স্থায়ী বাড়ি নয়। যেন কোনওদিন নদী তার ক্রোধ ভুলে একটা গভীর শান্ত কল্যাণী রূপ পেলে এই বাড়িগুলো আবার ফিরে যাবে বাঁধের ওপাড়ে, চরে—হারানো ভিটায়।  

ধামুর আর কোলকোন্দের সীমানায় বাঁধের পাশেই নদীভাঙা মানুষের বাড়িঘর। ছবি : লেখক        কিন্তু তা হয় না সব সময়—মস্তিষ্কে হারানো বাড়ির স্মৃতি গেঁথে নিয়ে দূরে সরে যেতে হয় চিরকালের মতো। যায়ও অনেকেই, আর বাড়ির স্মৃতি একটা ব্যথার মতো তাদের মস্তিষ্কে গেঁথে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।      গউস উদ্দিন মাওলানা তাঁর হারানো বাড়ির ছায়ার নির্মাণ করেছিলেন তাঁর নতুন বাড়ি, সেখানে সার্থক জীবন শেষে মৃত্যু হয় তাঁর। কিন্তু তাঁর আট সন্তানের মধ্যে সাতজনকেই সেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল তিস্তার তীর থেকে দূরে। সেই চলে যাওয়া ছিল নিতান্ত অনিচ্ছায়, বাধ্য হয়ে—আর সেই ‘বাড়ি’ তাঁরা নাছোড়বান্দার মতো তাঁদের মনের ভেতরে বহন করেই নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের আবেগ আর দৈনন্দিনতার প্রতিটা গলিতে সেই বাড়ি আর বাড়ির সাথে যুক্ত মানুষজনের স্মৃতি ছায়ার মতো, প্রতিধ্বনির মতো ঘুরে বেড়াতো।

পীরেরহাটের বাস তুলে বুড়িরহাটে চলে আসার পরেও আমার বাবার মনে তাঁর ‘পুরান বাড়ি’র প্রতি মমতা মরে যায়নি। বাবার ছেলেবেলার প্রতিবেশি ‘হারমনি বসির’ আসতেন প্রতি শুক্রবার আমাদের বাড়িতে। আশির ওপর বয়স, কোমর থেকে শরীরের উপরের অংশ মাটির সমান্তরালে নব্বই ডিগ্রি কোণে বাঁকানো, কণ্ঠ চিকন আর ক্ষীণ। প্রায় একই রকম একটা পুরনো ভিডিও ইউটিউবে দেখেছি রবীন্দ্রনাথের। কিন্তু হায়! রবীন্দ্রনাথ আর হারমনি বসিরের মধ্যে কত তফাত! হারমনি বসির আসতেন সপ্তাহে একদিন এক বেলা একটু ভালো করে খেতে। ভিক্ষা করতে করতে কয়েক মাইল হেঁটে বৃদ্ধ আসতেন দুপুরের কিছু আগে। আমাদের অনতিসচ্ছল সংসারে সব দিন খুব ভালো খাবারের ব্যবস্থা থাকতো তা নয়। কিন্তু আমার বাবা নিজে তাঁকে যত্ন করে খাওয়াতেন, প্রয়োজন হলে নতুন বা পুরনো একটা-দুটো লুঙ্গি বা পাঞ্জাবি, আর সাথে করে বেশ কিছুটা চাল দিয়ে বিদায় করতেন। 

মাছ ধরা শুধুই একটা খাদ্য সংগ্রহের কাজ নয়—একটা শিল্পও বটে। ছবি : লেখক এই বৃদ্ধের প্রতি আমার বাবার এই মমতা আর মনোযোগ শুরুতে আমার কিশোর মনে কৌতূহল তৈরি করেছিল। বাবা নিজেই একদিন তার নিবৃত্তি করেছিলেন। হারমনি বসির ছিলেন তাঁর শৈশবের অন্তরঙ্গ প্রতিবেশি, আত্মীয়তুল্য—তাঁর কোলে-পিঠে তাঁর শৈশবের প্রচুর সময় কেটেছে। বয়সে বাবার প্রায় তিরিশ বছরের বড় ছিলেন তিনি। প্রচুর জমিজমা ছিল, সচ্ছল গৃহস্থ বসির উদ্দিনের গৃহস্থালিতে মন ছিল কম; বেশির ভাগ সময় একটা হারমনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতেন। হারমোনিয়ামটা ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী। প্রতিবেশিরা তাই তাঁর বাবার দেওয়া নামের সাথে তাঁর প্রিয় যন্ত্রটাকে জুড়ে দিয়েছিলেন। বাচ্চাদের সাথে খেলা করে সময় কাটানো ছিল তাঁর আরেক প্রিয় কাজ, আর বিশাল পীরের বাড়িতে শিশুর অভাব ছিল না।

তিস্তার ভাঙনে একদিন পীরের বাড়ি আর সংলগ্ন অঞ্চল নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে সেই স্বর্গোদ্যানের অনাহত শান্তির সমাপ্তি ঘটে। তারপর অনেক বছর পর তিস্তার খামখেয়ালের মতোই হঠাৎ ভাগ্যের কোন মর্জিতে তাঁদের দেখা হয়। খুব সম্ভবত একদিন জুমার নামাজ পড়তে বাড়ি থেকে বেরিয়েই দুয়ারে কাঁঠাল গাছটার ছায়ায় চৈত্রের রোদে ধুঁকতে থাকা বৃদ্ধকে লক্ষ করেন বাবা। বয়স আর ভাগ্যের মারে বেঁকে যাওয়া বৃদ্ধের শীর্ণ ভগ্নপ্রায় শরীর, দুর্বল হয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বর আর ছানি পড়া নিভন্ত চোখের আতুর দৃষ্টির মধ্যে তাঁর শৈশবের সেই প্রাণবান, শিশুবৎসল, গানপাগল যুবকটিকে আবিষ্কার করে বাবার মনে যে ঝড় বয়ে গিয়েছিল তা কেবল কল্পনাই করতে পারি। কিন্তু সেই কৈশোরে বৃদ্ধের প্রতি বাবার সেই মমতার সম্পূর্ণ তাৎপর্য আমার কাছে ধরা দেয়নি। ধীরে ধীরে বুঝেছি, বাবার সেই আচরণে সেই ভাগ্যহত বৃদ্ধের প্রতি মমতাই শুধু ছিল না, ছিল তাঁর হারিয়ে যাওয়া ‘পুরান বাড়ি’র একটা টুকরো ফিরে পাবার আবেগও—নিঃসন্দেহে সেই আবেগই ছিল ভিক্ষুক বৃদ্ধের প্রতি তাঁর পরম মমতার কেন্দ্রে।

“নদী না যাইও রে বৈদো, নদী না যাইও। নদীরও না ঘোলা ঘোলা রে পানি।” ছবি : লেখক গউস উদ্দিনের নাতি শামসুল হুদা পীর সাহেবকেও দেখেছি একই রকম মমতায় যত্নে এক পাগলকে আগলে রাখতে। হারমনি বসিরের মতো সেই পাগলেরও ছিল তিস্তার তীরে বাস—অনেক জমিজমা, সচ্ছল সংসার। সব হারিয়ে শেষে নিজের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণও হারিয়ে ফেলেন তিনি। পীরেরহাটে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বেসুরো সুরে চিৎকার করে গাইতেন আব্বাসউদ্দিনের গান: “নদী না যাইও রে বৈদো, নদী না যাইও/নদীরও না ঘোলা ঘোলা রে পানি।” ছেলের দল পিছনে লাগতো তাঁর, ভ্যাঙাতো, ঢিল ছুড়তো। পা থেকে কাঠের খড়ম খুলে ছেলেদের দিকে ছুড়ে মারতেন শামসুল হুদা। ছেলেরা পালিয়ে গেলে পাগলকে হাত ধরে নিজের খানকায় এনে বসিয়ে খাওয়াতেন, ঘুমাতে দিতেন।

‘পুরান বাড়ি’ পিছনে ফেলে ভ্যান মরিয়ম সিল্লানির প্রাচীন মলিন হলুদ কবরের কাছে থামলে চালকের কাছে বিদায় নিলাম। অটোরিকশায় কিছুদূর এগোলেই পীরেরহাট—পীরের বাড়ি এখন সেখানে। পুরান বাড়ির মসজিদ, ঈদের মাঠ সবই যথারীতি স্থানান্তরিত হয়েছে সেখানে। প্রাচীন বিরাট পরিবারটির অনেকেই সেখানে সমাহিত, জীবিত অনেকেই। এটাই আমার জন্মভূমি, আমার শৈশবের আবাস। বহুকাল আগে ছেড়ে যাওয়া আমার জন্মভূমির পাশ দিয়ে আমার বর্তমান ‘বাড়ি’ বুড়িরহাটের দিকে অটোরিকশাটা ছুটছিল। রাস্তার পাশের ঘরবাড়ি, বাঁশঝাড়, গাছপালা যেন চল্লিশ বছর আগের মতোই আছে। আমার মনের একটা অংশ পড়ে আছে ঢাকায়, আমার পরিবারের কাছে। বাংলাদেশের উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত এই সড়কের ধার ধরে আমার অনেকগুলো বাড়ি। তার একেকটা আমার মনের একেকটা কোণ দখল করে আছে। সেই পথ ধরে ছুটতে ছুটতে আমার মন বারবার ধন্দে পড়ছিল—কোনটা আমার বাড়ি? হয়তো সবগুলোই। তার প্রত্যেকটাতে এখন হয়তো আমার বসবাসের উপায় নেই, কিন্তু সময়ের আর বাস্তবতার হাত তাদের উপর থেকে আমার অস্তিত্বের অধিকার কেড়ে নিতে পারেনি একটুও।   

/জেডএস/

সম্পর্কিত

শূন্য প্রান্তরে একা

শূন্য প্রান্তরে একা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

ঐশী গল্প

ঐশী গল্প

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

সর্বশেষ

শূন্য প্রান্তরে একা

শূন্য প্রান্তরে একা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

শঙ্খ ঘোষের পাঁচটি কবিতা

ঐশী গল্প

ঐশী গল্প

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

অন্যমনস্কতার ভেতর বয়ে যাওয়া নিঃশব্দ মর্মর

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

মজিদ মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

শামসুজ্জামান খান : বাঙালি সংস্কৃতির অতন্দ্র প্রহরী

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

Bangla Tribune is one of the most revered online newspapers in Bangladesh, due to its reputation of neutral coverage and incisive analysis.
© 2021 Bangla Tribune