X
শুক্রবার, ০৮ অক্টোবর ২০২১, ২২ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

সামসুল হক : আমাদের বিপন্নতা, ভেসে যাওয়া || রফিক উল ইসলাম

আপডেট : ০৪ জানুয়ারি ২০১৬, ১৬:৩৫

সামসুল হকএই নীল অন্ধকার, এই অফুরন্ত কোলাহল পার হয়ে কোথায় আছেন তিনি! আছেন কোথাও। কারণ কবির মৃত্যু নেই। সামান্য অগোচরে, আমি তাঁর সদাজাগ্রত চোখ দুটি স্পষ্ট দেখতে পাই। গভীর লেন্সের আড়াল ভেদ করে এই পৃথিবীর আলো-অন্ধকারে অন্য অনেক পৃথিবীর কথা বলছেন। তুলে আনছেন এমন সব বুদবুদের বিচ্ছুরণ, যা আমাদের চমকে দেয়, ঝলসে দেয় কখনো কখনো।
মূল রাস্তা ছেড়ে গলিপথের ব্যবধান পার হলে আঁধার-বিলাসী সিঁড়ি, দোতলায় ওঠার। কখনো ম্লান বাল্বের আলো, দিনের বেলাতেও। আমাদের যাবার খবর আগে ভাগে পেলেই জ্বালিয়ে রাখতেন। দরজায় বোর্ড আটকানো, যার তাৎপর্য এরকম— পূর্ব অনুমতি ছাড়া কবির সঙ্গে দেখা করার বিধি নেই। পরোয়া করতুম না। ভালবাসার জোর, বিশ্বাসের জোর, ঐ আপাত-কঠিন মানুষটিকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে ফেলেছিল। দোতলায় ছোট্ট একটি বাসস্থান, অনেকটাই অগোছালো, ছড়ানো-ছিটোনো, সেসব পেরিয়ে তাঁর পাশে জায়গা করে নেওয়া। কবে প্রথম, মনে নেই, প্রায় কুড়ি-বাইশ বছর, সেই ছোট্ট জায়গাটি আগলে রাখতে পেরেছিলুম। অসম্ভব ভালবাসাবাসি, তুমুল দ্বন্দ্ব, রেষারেষি, আবার বুকে জড়িয়ে ধরা— একটি প্রকৃত সম্পর্কের মতোই, আমরা ছিলুম খুবই কাছাকাছি। বলতেন, ‘সিগারেট কোম্পানি ছাড়া আমি আর কারো কাছেই ঋণী নই।’ তখন বুঝিনি, একজন প্রকৃত কবিকে শুধুই দিয়ে যেতে হয়; চাওয়ার অপেক্ষা না করেই। এভাবে নিঃশেষিত হতে হতে, এভাবে আত্মবিসর্জিত হতে হতে, আমাদের সঙ্গে পথ চলা। কাঠিন্যের আস্তরণ ভেঙে, আমরা তখন ভেতরের নরম মোমের মতন মানুষটিকে খুঁজে পেয়েছি। পাণ্ডিত্যের বোঝা সরিয়ে আমরা তাঁর শিশুর-সারল্যে-বোনা হৃদয়টিকে আবিষ্কার করেছি। সে ছিল বড়ো সুখের সময়, সে ছিল বড়ো দুঃখের সময়। আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে বৌদির দেওয়া লিকার-চা (কখনো দুধ-চা খেয়েছি মনে পড়ে না!) এবং রবীন্দ্রগান, সে কি ভোলার কখনো। সাংসারিক প্রয়োজনে বৌদি গান শেখাতেন, আর আমরা মুগ্ধতায় সেই অমৃতধারায় সিক্ত হয়ে উঠতুম।
অসম্ভব খুঁতখুঁতে, জেদী, তেজদীপ্ত এবং একাগ্র এই মানুষটি আমার কাছে ছিলেন বিস্ময়কর। তাই বারবার ছুটে গেছি ছাত্রের মতন। চরম আর্থিক অনটন, অসুস্থতা, অসহযোগিতার উর্দ্ধে অবস্থান করতেন স্বেচ্ছাচারী সম্রাটের মতন। মনে পড়ে ‘ত্রসরেণু’ ( একটি কাব্যগ্রন্থ / আমাদের কবিতাপত্র ‘গ্রামনগর’ থেকে প্রকাশিত) প্রকাশের পর, নানা কারণে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। পরে, উনি নিজে ডেকে পাঠিয়ে সমস্ত বিরোধের অবসান ঘটিয়েছিলেন। এতখানি উদারতা ছিল তাঁর, এতখানি আশ্রয় ছিল আমাদের। মনে পড়ে, একবার ওঁর বাড়িতে রাত্রিবাস কালে, গভীর রাতে নিজে আমাদের মশারী গুঁজে তবেই স্বস্তি পেয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমার ঘরে একটি বিদেশি বোতল আছে। যদি সকালে উঠে দেখি— খানিকটা কমে গেছে, কিছু মনে করবো না। কিংবা আমার টেবিলে সিগারেট-এর প্যাকেট আর দেশলাই আছে। ইচ্ছে হলে রাত্রে ব্যবহার করতে পারো।’ এমন যত্ন জানতেন উনি। কবিতার পংক্তির পর পংক্তি লিখে যাওয়ার মধ্যে যে যত্ন, যে অনুশীলন, যে ছন্দের দোলন, ভালবাসার মধ্যেও যে সেসব উপকরণ ছড়িয়ে দিতে হয়। এ-সব ওঁর কাছেই শেখা। অনেক পাহাড় ডিঙিয়ে, অনেক গণ্ডী ভেঙে এসব শিখতে হয়েছিল আমাদের। আজ বুঝি, কোন শেখাই ব্যর্থ হবার নয়।
‘নির্বাচিত কবিতা’ দেখে যেতে পারলেন না তিনি— এ ক্ষোভ আর যন্ত্রণা কোনোদিন মুছে যাবার নয়। আর সবটুকুর জন্যেই দায়ী আমাদের আর্থিক সীমাবদ্ধতা। এ ব্যাপারে প্রথম যেদিন ওঁর কাছে যাই, আমাদের আগ্রহে সাড়া দিয়ে শিশুর মতন ঝরঝরে হয়ে উঠেছিলেন। দীর্ঘ অসুস্থতা মুছে গিয়ে সে এক অন্য মানুষ যেন, তুমুল আড্ডা আর ইয়ার্কিতে মেতে উঠেছিলেন। প্রথমে গিয়েই যে জীর্ণ কবিকে বিছানায় লেপটে থাকতে দেখেছিলুম, ফেরার আগে অন্য এক উৎফুল্ল চনমনে যুবককে যেন ছেড়ে চলে এসেছিলুম। বারংবার বলতেন, ‘আমার কবরের জন্যে জায়গা নেই কোথাও।’ না, সত্যিই ছিল না কোথাও। তাঁর জানাজার ( শেষ প্রার্থনা ) সময় নিজেকে সামলে রাখা তাই দায় হয়ে উঠেছিল আমার পক্ষে। না, তাঁর কবরেও মাটি দিতে পারিনি আমি; দেওয়ার মত মনের জোর এই অস্পষ্ট পৃথিবীর আয়ুকণা থেকে কুড়িয়ে নিতে পারিনি। এই অক্ষমতা আমি আজীবন বয়ে বেড়াবো। জেনে-বুঝেই বয়ে বেড়াবো।
আর যে মহিয়সী এরকম একজন ব্যতিক্রমী দামাল চরিত্রের পুরুষকে আজীবন সঙ্গ দিয়ে গেলেন, লালন করে গেলেন, আমাদের সমস্ত অত্যাচার হাসিমুখে উড়িয়ে দিয়ে গেলেন, তিনি আমার কাছে দেবী। গাদাগাদা বই-পত্তর ব্যাগে করে বয়ে বয়ে বইমেলায় পৌঁছে দিচ্ছেন প্রকাশকের ঘরে ঘরে, প্রকাশকদের কাছ থেকে কবির প্রাপ্য পুস্তক আদায় করে আনছেন, বাড়িতে ফিরে খাতার মলাট জ্বালিয়ে আমাদের চা করে দিচ্ছেন, টেবিলের সিগারেট প্যাকেট কমে গেলে প্রচণ্ড বকুনি খাচ্ছেন, অবসরে রবীন্দ্রগান শেখাচ্ছেন ছাত্রীদের— এরকম দেবীর জন্যে অন্তত এই পংক্তিগুলি না লেখা হলে এই অনুভব অসম্পূর্ণ থেকে যেত। সেই দেবী কবিপত্নী করবী হক, যাঁর স্মৃতি কোনোদিনই মলিন হবার নয়।

 

‘ওই দুটো মেঘ শারীরিক-খেলা-শেষে

ঝরবে তখন শুরু শিশুদের ভেলা

দুটো বুড়ো-বুড়ি চোখের পিচুটি ঊর্ধ্বে

ছুঁড়লে এখন আবার মেঘের ভ্রুণ’

                                           ( তুরপুন )

 

এভাবেই সামসুল হক ভাঙেন। ভাঙতে জানেন। অন্ধকার চিরে দেখা আলোকবিন্দুর মতন ভেসে যান জীবন থেকে মহাজীবনের দিকে। তাঁর এই চলা থেকে টুকরো টুকরো দ্যুতি আমাদের গ্রাস করে। শূন্যতার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা অপার রহস্যকে সাপখেলানো বাঁশির সুরে বাজায়। এই চলা চেতন থেকে অবচেতনের দিকে। কখনো অবচেতন থেকে আবার চেতনার পথে।
তাঁর ঘরের জানালাগুলি আজ আমাদের কাছে স্পষ্ট। ঘরের নুড়ি-পাথর, কারুকাজ,জলছবি সবই মিশে থাকে প্রবাহের ভেতর। টোকা দিলে অতলে ফিসফিস করে। বহির্জগতের স্পন্দন জানলার গরাদ গলে পুরু লেন্সের ওপর বিচ্ছুরিত হয়। রঙে রঙে ঘোর লাগে। এই আলোছায়ায় মিশে যায় অন্তর্গত ব্যাধি। আর ভিত কেঁপে যায়। টুপটাপ পাতা ঝরার নৈঃশব্দের মতন দশ দিক শুন্য থেকে শুন্যতর হয়ে ওঠে। প্রাসাদ ধ্বসে পড়ে। কবি সামসুল হকের ধুলো ওড়ে বাতাসে। ওড়ে, আর আমাদের যাবতীয় শ্মশানভূমির ওপর বৃষ্টি নেমে আসে।

 

‘ব্যাধির কারণে আমি খুদে পদ্য লিখি

আধির কারণে ক্ষুদ্রতম

ভয়হেতু দীপার নিবিড় দেখে আমি ত্রসরেণু’

                                                         ( অরূপরেণুর কাঙ্ক্ষায় )

 

সামসুল হককে আজ এভাবেই চিনতে চাইছি। মাটি থেকে শেকড় তুলে। শুন্যে লোফালুফি করে। এ-জীবনের ওপর দাঁড়িয়ে, আরেক জীবনের কথকথা শোনাবেন তিনি। হে বিপন্ন সকাল, আমাকে কুয়াশা দান করো। যেন শরীর মুছে শুদ্ধতর আত্মার মুখোমুখি দাঁড়াতে পারি। যেন ভাঙা-ভাঙির এই খেলায় নিজেকেও টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দিতে পারি। কবি আর আগুন তো সমার্থক। শুধুই পোড়ায়। চিতা উঠে আসে ঘুমের ভেতর। সমস্ত বর্ণ ধ্বংস করে নতুন এক বর্ণমালায় জীবনকে সাজিয়ে তোলে।

 

‘সব চিতার আগুন কিন্তু সমান অপাপবৃতা

এসো তবে চক্রে বসো মিতা’

                                                      ( অর্বাচীন অগ্নিপুরাণ )

 

চিতার আগুন পেরিয়ে আমরা যাবো কবিতার জন্মকথায়। গার্হস্থ্য ভেঙে যে মানুষটি আজ একা একা শবযাত্রায়, তার কাঁধে কি রক্তের দাগ লেগে থাকে? এই প্রশ্ন থেকেই কবিতার জন্ম। কবি এখানে আবাহক কিংবা অনুবাদক। নিয়ন্ত্রণহীন শুন্য সত্ত্বা থেকে মাথা তুলে অখণ্ড ব্রহ্মের অনুকম্পা স্পর্শ করেন। দ্রবীভূত হন। মহাকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মতন স্রোত নেমে আসে পৃথিবীর দিকে। সুখহীন শোকহীন অন্ধকারহীন আলোহীন এক মধ্যভূমির ভেতর কবির ইচ্ছামৃত্যু ঘটে। তখনই কবিতার জন্মকথা উৎসববাহিত হয়। এক একটি মৃত্যুর ভেতর এক একটি জন্ম প্রস্ফুটিত হতে থাকে।

‘ওরা না— জেনেই আজ গায়ত্রীমন্ত্রের সঙ্গে জবাকুসুমের মতো

সুখহীন দুঃখহীন লাল মদ খায়

 

এই তো সৃষ্টির কথা এই তো দ্বন্দ্বের কথা মিলনের কথা

কবির মৃত্যুর কথা কবিতার জন্মকথা এই’

                                                                      ( কবিতার জন্মকথা-১ )

 

অথবা—
‘টেবিলে পায়েস ছিলো সুজাতার কোন বেড়ালটা

তা নিয়ে পিরের শুন্য দরগায় গিয়েছে আজ তা জানার জন্যে

এই সত্যমহাশ্রম

আর স্বর্গ নরকের সঙ্গে চোখ-টেপাটেপি হয় খেলা খেলা

যে-কোনো সুধার সঙ্গে কোনো পরিত্যক্ত ডাকঘরের পিছনে

 

খেলা খেলা মাদারির খেলা আহা

কবির মৃত্যুর কথা কবির জন্মকথা এই’

                                                             ( কবিতার জন্মকথা ২ )

 

এই খেলাতেই কবির সূচি-সমর্পণ। দৃশ্য থেকে অ-দৃশ্যে ফেরা। নিপুণ সূক্ষ্মতায় ক্রমাগত না-এর দিকে যাত্রা। ভার ভেঙে ভেঙে নৈঃশব্দের ওপর নিজেকে সমর্পিত করা। সে এক অলীক অবগাহন। ডুব দিলেই চতুর্দিকে আলো। কবিও আলো হয়ে উঠেছেন। প্রবাহিত হচ্ছেন। নিভে যেতে মন চায় না। যে কোনো শর্তে, সমস্ত বৈভবকে বিসর্জন দিয়েও কবি ধরে রাখতে চান সময়ের সেই অনন্তকে। ছত্রে ছত্রে তারই প্রাণান্ত আকুতি।

 

‘তুমি আমার বোধিবিন্দু নিলে

বোধি থাকুক দাও ফিরিয়ে বিন্দু’

                                                               ( চুরি করেছি ওই বিন্দু যোলায় )

 

তবুও নেই নেই করে কোথাও থাকেন তিনি। থাকতে বাধ্য হন। মুক্ত হয়েও বদ্ধ থাকেন মানুষের আবহমান উচ্চতায়। এখানেই যোগীর সাথে তফাৎ তাঁর। খাঁচা ভাঙতে গিয়ে অন্য এক নন্দিত খাঁচায় অলক্ষ্যে বন্দী হয়ে যান। তবুও ওড়াউড়ি থামে না। ভাসতে ভাসতে এই পৃথিবীর মায়া তাঁকে স্পর্শ করে। টেনে ধরতে চায় শিকড়ের অভিমুখে।

‘বাতাস শরীর হও মানুষের উচ্চতায় এসো

মানুষ তোমার সঙ্গে ট্যুরিস্টের মতো

এই শীতে ঈশ্বরকে কিছুক্ষণ বুঝে আসতে চায়
ভেবে দ্যাখো

এটাই তো গার্হস্থ্য যা বন্ধুতাসম্মত

অভিমান ভুলে প্রিয় এসো মানুষের ক্ষুদ্রতায়’

                                                          ( স্বাভাবিক গার্হস্থ্য )

 

ঝরে পড়ার আগে সুদূরের গান থামে। তার কিছু রেশ থেকে যায়। ফাঁকা হলঘর ঝমঝম বাজতে থাকে। কবি একবার চোখ রাখেন নক্ষত্রমালার ভেতর, একবার কান পাতেন মাটিতে। পারাপারের গল্প শোনা যায়। অচেনা জগৎ থেকে আলো এনে কবি সমর্পণ করতে চান মানুষেরই হাতে। তখনই পায়ে কাদা লেগে যায়। যাবতীয় মুর্ছণা আর হাহাকার তাঁকে ছিন্ন ভিন্ন করে। দু‘চোখ বন্ধ হবার আগে আর-এক-সামসুল ক্রমাগত তাঁর কণ্ঠস্বর দখল করে নেয়। এ যেন পূর্ব নির্ধারিত। নিয়তির মতো ঐ বাঁধা ঘাটে কবিকে টেনে টেনে আনে।

 

‘ভাষার ভিতর দিয়ে ছুটে যায় মুণ্ডুহীন লোক

ভাষার ভিতর দিয়ে তীব্র উড়ে যায় ডানাহীন পাখি

কবিতায় লেখা হতে পারতো না কি এই সব শ্লোক

ধর্মগ্রন্থ প্রণেতাই প্রশ্ন করে যখন চায়ের জল ছাঁকি’

                                                              ( যখন চায়ের জল ছাঁকি )

 

নামতে তো হবেই তাঁকে। এই আকণ্ঠ-কলহাস্য বিস্তৃত মাটিতে। জানু পাততে হবে। আরোহন আর অবরোহনের সন্ধিস্থলের দিকে দু‘হাতের যাবতীয় ফুল অঞ্জলি দিতে হবে। কিন্তু পা রাখবেন কোথায়? পাথরেরা তাঁকে নিয়ে লোফালুফি করে। দাম্ভিক রথের চাকাগুলি বুকের ওপর সমুদ্রের গান গায়। নির্বাক স্বদেশ কিছু চতুর থাবার নিচে শরীর পেতেছে। আমরা যেন মাতৃহীন। পরিচয় খুঁড়তে খুঁড়তে একসময় কঙ্কাল উঠে আসে। ঘুণধরা। পাট-কাঠির মতন প্রতিরোধহীন। তারা বিদ্রুপ করে। ভুরু কোঁচকায়। হৃৎপিণ্ড টেনে এনে তার ওপর গোত্রহীন লেবেল সেঁটে দেয়। বংশলতিকা হারিয়ে আমরা দূরের শূন্য মাঠে শুকনো তৃণভূমির ওপর ছটপট করতে থাকি।

 

‘খান্ কি মানে কি মেনকাও নাকি শকুন্তলা কি খান্ কির মেয়ে

শকুন্তলার ছেলে তো ভরত অর্ধজারজ ভরত আমার ভারত আমার ভারতবর্ষ’

                                                                                          ( জারজের গান )

 

শুরু হয় বহুমুখী ক্ষরণ। এড়িয়ে যেতে পারেন না কবি। মানুষের স্পর্ধার দিকে কিংবা মাথা-নিচু-করা সকালগুলির দিকে মুখ ফেরাতে হয় তাঁকে। যে আঙুলে কবি বন্দি রেখেছিলেন রাধিকামোহন মৈত্রকে, সেইসব আঙুলগুলির ক্রমশ ‘সুমনের গান’- এর দিকে ভেসে যায়। মানুষের অন্তর্গত সাপগুলি তাঁকে দংশন করে, নেশা ধরায়। কখনো গৃহহীন করে। কখনো বাতাসে আছড়ায়। সহস্র বর্ষার চুম্বনে একাকার কবি ঘুরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। তাঁর কণ্ঠস্বরও ঘুরে দাঁড়ায়। ঝোড়ো প্রকৃতির উদ্দামতা ছাপিয়ে সেই কণ্ঠস্বর এক সময় আমাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। যেমন, বহুদিন পর হঠাৎ আত্মীয় এলে, ধুম লাগে।

 

‘লিঙ্গের ডগায় ব্যথা হলে তা কি ভুলে থাকা যায়

প্রকৃতিকে প্রশ্ন করি স্মৃতি ও স্বপ্নকে

আমাদের ধর্ম যদি এই প্রশ্নে তেড়ে আসে কামড়াতে আসে’

                                                                           ( কবিতার প্রত্যাশা )

 

আর আছে, সর্বগ্রাসী খিদে। পরিত্যক্ত কুটিরের জন্যে খিদে। পিচের রাস্তা থেকে মুছে যাওয়া হাসমীর রক্তের জন্যে খিদে। ভাঙা ডানায় লেগে থাকা বিকেলের শেষ আলোটুকুর জন্যে খিদেও কবিকে একান্তে চিবোয়। আর কিশোরীর বুকের ভাঁজে লুকানো চিরকুট, অল্প ঘামে ভেজা; সেই ঘামটুকুর জন্যে খিদে? সে তো আবহমান। রক্তে তার অনুরণন বেজে চলে। দিগন্ত থেকে দিগন্তের ওপারে, পৃথিবীর সব শিউলিগাছ সে খবর জানে। চুম্বন আর অশ্রুপাতের মাঝামাঝি কোন পংক্তিতে সেসব লিপিবদ্ধ হয়! এ পৃথিবী শ্রাব্যও নয়, পাঠ্যও নয়। কিশোরীর প্রথম আঁচল নীল ভোরের আলোছায়ায় দুলে দুলে ওঠে।
ধরা যাক, উনুনে হাঁড়ি চাপানো। অল্পসল্প ভাপ উঠছে। বুকের পাঁজর বেরোনো কিছু কিশোর চাকপাক দিয়ে বসে। কোটর ঠেলে বেরিয়ে আসছে চোখ। আহা, ভাত নামবে। মুক্তোর দানার চেয়েও উজ্জ্বল ভাত। ভাতের গন্ধের ভেতর স্নেহময়ীর আঁচল ছড়ানো। কবি সেই ভাতের গন্ধ ধরে উড়ে যাচ্ছেন অন্য জন্মের কাহিনিতে।

 

ক. ‘এসো গাঢ় এসো আধফোটা এসো সূচি-সমর্পণ

ঘাসে এসো ফড়িঙের চোখে এসো মানুষের বুক ও গলার মাঝখানে

কেন থমকে আছো তীক্ষ্ম শতচক্ষু পুস্তিকামালায়

আজ তো গানের দিন ছায়াকে ঈর্ষার দিন বিকেলের নারী হাত ধরো

                                                                              ( ছায়াকে ঈর্ষার দিন )

 

খ. ‘শুধু জানি ঠা-ঠা সত্য খিদে খুবই জন্মান্তরবাদী’

                                                                       ( ঠা-ঠা সত্য )

 

জন্মান্তরের কথা এলো যখন, তীব্রজল নদীটির কথা বলি। এপারে জীবন আর আলো। ওপারে কুয়াশামাখা বিস্তীর্ণ বনভূমি। কিংবা ঠিক বনভূমিও নয়। আবছা অস্বচ্ছ কিছু, ছায়া ছায়া। মায়ায় গাঁথা। অনুভব করা যায়; স্পষ্ট ছোঁয়া যায় না। মাঝখানে কুলুকুলু প্রবাহিত নদী। শুধু বয়ে যায় অনন্তকাল। কোন্ পাহাড় থেকে নেমে আসে, কোন্ মোহনায় গিয়ে মিশে যায়, বোঝা যায় না। কবিও ভাসেন নদীতে। ভাসতে ভাসতে ওপারের রহস্যে গিয়ে ওঠেন। আবার ফিরে আসেন এপারে। স্রোত কি ফেরাতে চায় তাঁকে, এতই সহজে। কবি জানেন ডুবসাঁতার। দু-পারের লবণাক্ত বালি শরীরে মেখে একা স্থির কিভাবে জ্বলে উঠতে হয়, সেসব মন্ত্র তাঁর হাতের মুঠোয়। ধাবমান নদী তেজী ঘোড়াটির মতন এই উন্মত্ত সহিসের চাবুকের নিচে ল্যাজ নাড়তে থাকে। দর্শক গ্যালারী থেকে মুহুর্মুহু কলরোল ওড়ে। অবিরাম কুয়াশার ভেতর এই পরিক্রমা, ভেসে যাওয়া, শবদেহগুলির চোখে নতুন আলো ফেলে। নদীটির কুলুকুলু ধ্বনি থেকে প্রবাদ মুছে যায়। জন্ম আর মৃত্যু মাঝখানের দেওয়াল ভেঙে ভেঙে কনে দেখা আলোয় পরস্পরকে চুম্বন করে।

 

‘আমার কোনো স্বপ্ন নেই জন্মভস্ম আছে

গান শোনাবার ছলে গর্ভবতীর পেটে ছড়াই

সরাইখানার জাবপাত্রে জন্মানো কি ভালো

ভস্ম মেখে রাত্রে ওরা জন্মাবে দেয়ালে’

                                              ( আমার কোনো )

 

কতকালের এইসব আলো! কবির মুঠোয় পোষা বিড়ালের মতন ধরা দেয়। সেই আলোয় পথ দেখেন কবি; পথ দেখান। একসময়, গাঢ় অন্ধকারে, বুদ্ধের মতন কেউ তাঁকে বোধিবৃক্ষটিকে চিনিয়ে দেয়। ভোরের পাখিরা সেই খবর নিয়ে আসে লোকালয়ের দিকে। এভাবে জীবন থেকে মৃত্যু কিংবা মৃত্যু থেকে পুনর্জীবনের পক্ষে আবর্তিত হতে থাকেন কবি। বারংবার। অন্যান্য পৃথিবীর শুধু গড়িয়ে যায়; গড়িয়ে যেতে থাকে নিজস্ব কক্ষপথে।

 

‘আমি ভিখিরির আদেশ মেনেই কাঁপতে কাঁপতে শুয়েছি তোমার পাপোশে

তবু কি দৈবী সত্যে তোমার ওষ্ঠ চিরিনি খড়্গে

চিরেছি কেননা সেটাই টরম ছন্দ’

 

এখান থেকেই, এই বোধ থেকেই একজন কবির জয়, কবিতার জয়গাঁথার সূচনা।

( নিবন্ধে ব্যবহৃত কবিতাংশ ত্রসরেণু কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত )

সামসুল হকের কাব্যগ্রন্থ :

১. হৃদয়ের গন্ধ [ দ্বিতীয় সংস্করণ ‘চন্দনবিল’ (১৯৭৯) নামে ] /১৯৬৪

২. নিজের বিপক্ষে / ১৯৬৪

৩. প্রটোপ্লাজম / ১৯৬৬

৪. বাংলাদেশের জন্য / ১৯৭১

৫. চলচ্চিত্র / ১৯৭২

৬. ডায়েরি / ১৯৭৩

৭. মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় : এই পৃথিবী / ১৯৭৪

৮. নিভন্ত মোমবাতির তলায় শাদা ঘোড়া / ১৯৭৫

৯. সোনার ত্রিশূল / ১৯৭৮

১০. পাপপূণ্য / ১৯৮০

১১. খোকা ভাত খাবি আয় / ১৯৮২

১২. কবির ভ্রমণ / ১৯৮৫

১৩. তিনি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় / ১৯৮৫

১৪. ইডেনের তৃণমূল / ১৯৮৬

১৫. গ্রুপ থেরাপি / ১৯৮৮

১৬. চড়ুইপাখির বিচার / ১৯৮৯

১৭. ত্রসরেণু / ১৯৯০

১৮. স্যুটকেসের উপর বসে আছি / ১৯৯১

১৯. প্রক্ষিপ্ত প্রহর / ১৯৯২

২০. আবহাওয়ার মুদ্রাদোষ / ১৯৯৪

২১. নিঃস্বপ্ন পার্বনে যাবো না /১৯৯৭

 

সম্পর্কিত

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ২০:২০

এবছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন ৭৩ বছর বয়সী তানজানিয়ার ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ। তিনি ১০টি উপন্যাস লিখেছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য : প্যারাডাইস (১৯৯৪), বাই দ্য সি (২০০১) এবং ডেজারশন (২০০৫)। ইতোপূর্বে তার উপন্যাস ‘প্যারাডাইস’ বুকার প্রাইজের শর্টলিস্টে এবং ‘বাই দ্য সি’ লংলিস্টে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গুরনাহর লেখায় ঔপনিবেশিকতার দুঃখ-দুর্দশা এবং শরণার্থীর কষ্টকর জীবনধারার গল্প উঠে এসেছে। ২০১৬ সালের ২১ জানুয়ারি, ফ্রাঙ্কফুটে তার এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন ফেবিয়ান রোথ, মারা হোলজেনথল, লিসা জিংগেল। 


প্রশ্ন : বিশ্বসাহিত্য, উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য এবং গ্লোবাল সাউথের মতো সাহিত্যের লেবেল সম্পর্কে আপনি কী ভাবছেন? আপনি কি মনে করেন এগুলো সাহিত্য বা একইসঙ্গে আপনার লেখা বিচারে উপযোগী কিছু? আপনি কি লেখক হিসেবে নিজেকে বিবেচনা করার সময় এই মানদণ্ডে বিচার করেন কিনা?
আবদুলরাজাক গুরনাহ : লেবেল অবশ্যই দরকারি, প্রথমত, তা প্রাতিষ্ঠানিক কারণেই। কেউ তাদের বিদ্যায়তনে তুলনা করতে, বাণিজ্যিক কারণে বা প্রকাশনার স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। আপনি মানুষকে বোঝাতে পারেন এটি এমন একটি বিশেষ কিছু, যাতে তারা আগ্রহী হয়ে উঠবে। যাই হোক, আমি নিশ্চিত নই তাদের সাংগঠনিক উদ্দেশ্য ছাড়াও এগুলোর দরকার কতটুকু। নিজেকে বর্ণনা করার জন্য আমি এই মানদণ্ড ব্যবহার করবো না, এগুলো সংস্কৃতি উৎপাদনের প্রক্রিয়া নয়। এইসব লেবেল সাহিত্যকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে, উত্তর-ঔপনিবেশিক রীতি-নির্ভর সমালোচনা করে এবং কিছু বলতে ও কিছু শনাক্ত করতে সহায়তা করে। অন্যদিকে এইসব লেবেল সাহিত্যের ব্যাখ্যাকে একপ্রকার সীমাবদ্ধই করে। কারণ সাহিত্যে বর্ণনার চেয়েও বেশি কিছু রয়েছে।

প্রশ্ন : তাহলে আপনি কি নিজেকে উত্তর-ঔপনিবেশিক বা বিশ্বসাহিত্যের লেখক মনে করেন? 
আবদুলরাজাক : আমি এইসব প্রপঞ্চের কোনোটিই ব্যবহার করব না। আমি নিজেকে কোনো ধরনের লেখক বলিও না। আসলেই আমি নিশ্চিত নই যে, আমি আমার নাম ছাড়া অন্য আর কী বলার আছে। আমি অনুমান করি, যদি কেউ আমাকে চ্যালেঞ্জ করে—‘আপনি কি একজন ...এর মধ্যে একটি ...?’ আমি সম্ভবত ‘না’ বলব। আমি চাই না আমার সঙ্গে কিছু জুড়ে থাকুক। অন্যদিকে এটি নির্ভর করে কিভাবে এই প্রশ্ন উত্থাপন করা হবে—উদাহরণ স্বরূপ যদি একজন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেন ‘আপনি কি একজন বিশ্বসাহিত্যের লেখক’, তখন তিনি প্রশ্নের উত্তরে তিনি কী লিখবেন? কিন্তু আমি তা নই। আমি এরমধ্যেরও জটিল একটা কিছু।

প্রশ্ন : এই বর্ণনা কি অপরিহার্য?
আবদুলরাজাক : এটি এমন কোনো অপরিহার্য পদ্ধতি নয়, যা আমি নিজে মনে করি, কিন্তু সাংবাদিকের জন্য এই জিজ্ঞাসা অপরিহার্য হতে পারে। তিনি আমাকে তার বোর্ডে তর্জনী তুলে বলতে পারেন, উনি একজন বিশ্বসাহিত্যের লেখক। আমি ধারণাকে এভাবেই দেখি। এই ধরনের গোষ্ঠীগুলোকে প্রতিহত করার একপ্রকার প্রাকৃতিক প্রবণতা রয়েছে, যেমন আমি আপনাকে এখন একটু জটিল করে উত্তর দিচ্ছি।

প্রশ্ন : আমাদের পরবর্তী প্রশ্ন পূর্ববর্তী প্রশ্নের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত—বিশ্বসংস্কৃতি প্রায়শই দক্ষিণ এবং উত্তর গোলার্ধের সংস্কৃতি থেকে আলাদা। আপনি এই লেবেলগুলোকে কীভাবে দেখেন, বিশেষ করে সাহিত্যের ক্ষেত্রে?
আবদুলরাজাক : পৃথিবী সত্যিই উত্তর এবং দক্ষিণ হিসেবে তৈরি করা হয়নি। তবে এটিকে এমন করে বর্ণনা করা ফ্যাশনেবল মনে হচ্ছে। ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড’ বা ‘অনুন্নত বিশ্ব’-এর মতো বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করার প্রচেষ্টা ছিল, কিন্তু উত্তর এবং দক্ষিণ শব্দ দুটি অন্যান্য শব্দের তুলনায় আরো চলনসই বলে মনে হচ্ছে। যাইহোক, এটিই বাস্তবতাকে বর্ণনা করে, ঐতিহাসিক পার্থক্য বর্ণনা করে এবং অবশেষে এটি অন্য আরেকটি কুৎসিত শব্দ ‘উপনিবেশবাদ’ থেকে পরিত্রাণ দেয়। তাই এই বিষয়গুলি সম্পর্কে কথা বলার জন্য উত্তর-দক্ষিণ শব্দ ব্যবহার করা ভালো। ঐতিহাসিক সাম্রাজ্যবাদ তথাকথিত উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যকার এই পার্থক্যগুলো একীভূত করেছে এবং উপনিবেশিকতার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং সংহত সমস্ত ধ্যানধারণার কারণে আমি মনে করি এসব এখনও অব্যাহত আছে। তাই আমি বলতে চাই যে, হ্যাঁ, পার্থক্য আছে এবং উত্তর ও দক্ষিণ শব্দদুটি পুরোপুরি যথার্থ না হলেও, এই পার্থক্যগুলোর বর্ণনা করার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে নিরপেক্ষ উপায় এই শব্দদুটির মধ্যে রয়েছে। আপনার এই শব্দদুটিকে স্থান হিসাবে বিবেচনা করা উচিত নয় : এগুলো মনোভাব, বোঝাপড়া, প্রত্যাশা প্রভৃতির সাথে সম্পর্কযুক্ত। তাই চীনের এমন কিছু অংশ থাকতে পারে যা পশ্চিমের মতো সমৃদ্ধ এবং কিছু অংশ সমৃদ্ধ নয়। এটা আসলে জায়গার বিষয় নয়। যখন আপনি নিরপেক্ষ বা মধ্যবর্তী থাকার চেষ্টা করেন, তখন এটি স্থানের দিক থেকে কিছুটা বিবেচনা করে। যখন ‘মধ্যবর্তী’ সত্যিই উত্তর এবং দক্ষিণের মধ্যে নয়, কিন্তু এই দুটি লেবেলের মধ্যে এক ধরনের মধ্যবর্তী বা অনির্দিষ্টতা আছে। সেখানেই আমি মনে করি, আপনি নিজেকে উদার মানুষ হিসেবে ভাবেন, নিজেকে বিশ্বের মানুষ হিসেবে এবং সর্বোপরি মানুষ হিসেবে দেখার চেষ্টা করেন। যাইহোক, এখানে আসল পার্থক্য আছে—আসুন আমরা বলি আপনার জীবনের ধরন—আপনি যেই হন না কেন, আপনি উত্তর দিকেরই হন বা দক্ষিণ দিকেরই হন আমাদের জীবন ভিন্ন হবে, আপনি চান বা না চান। এই সংস্কৃতিতে রাষ্ট্র আপনাকে হাসপাতাল, স্কুলসহ নানান সেবা ও সুবিধা দিয়ে থাকে। কিন্তু অন্যান্য দেশে [অনুন্নত দেশ] তাদের কাছে এরকম কিছুই নেই, তাই এই জায়গাগুলির মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য রয়েছে। যার ফলে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক ঘটনা বিভিন্ন সমাজে ঘটেছে।

প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন ‘শরণার্থী সংকট’ অনেক পরিবর্তন এনেছে? যদি তথাকথিত দক্ষিণ দেশগুলোর লোকেরা জার্মানিতে আসে—উদাহরণ স্বরূপ, তারাও জার্মানির পরিবর্তন করে—যেমন অন্যান্য অনেক দেশ পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। 
আবদুলরাজাক : ঠিক আছে, আমি বলছি না যে সবকিছু চিরকালের মতো একই থাকবে; অবশ্যই সবকিছুর পরিবর্তন ঘটছে। অন্যদিকে, কী বা কারা পরিবর্তিত হবে বলে আপনি মনে করেন? যদি বলা যায়, এক মিলিয়ন শরণার্থী জার্মানিতে আসলো, কাদের বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি—জার্মানির নাকি শরণার্থীর? সুতরাং এই প্রশ্নে আমার মত হলো, কিছুটা হলেও এটি একটি পার্থক্য তৈরি করবে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ভবিষ্যতে যেকোনও প্রত্যাবাসনের একটি শর্ত : তারা সরাসরি ইংরেজি শিখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদিও এতে কোনো সমস্যা নেই, তবে এটাকে ইতোমধ্যে একটি শর্ত হিসেবে তৈরি করাই বলে দেয় যে, অন্যরা যখন এখানে আসবে তাদেরকে আমাদের মতোই হতে হবে। চলবে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ১৭:২৭

১৯৬৯ সাল। গণঅভ্যুত্থান চলছে। এমন সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র লিখে ফেললেন ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ নামে একটি কবিতা, যার প্রথম দুটি লাইন স্লোগানের মতো মানুষের মুখে মুখে—‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’
কবিতাটি তখনকার কোনো পত্রিকা প্রকাশ করার সাহস না পেলেও আহমদ ছফা’র কল্যাণে রাতারাতি এ-দুটি লাইনে ছেয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব দেয়াল। এ দুটি লাইন গণঅভ্যুত্থানকে যেন বারুদের মতো উসকে দেয়। ফলশ্রুতিতে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে যান এই কবিতার স্রষ্টা, কবি হেলাল হাফিজ। সিক্ত হতে থাকেন অজস্র মানুষের ভালোবাসায়। এবং অবিশ্বাস্যভাবে, এর পরপরই তিনি হয়ে যান নীরব। ১৯৬৯ থেকে ’৮৬, দীর্ঘ ১৭ বছরের অপেক্ষা শেষে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তার ১ম কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে। বাংলা কাব্যগ্রন্থের ইতিহাসে সর্বাধিক বিক্রিত এই বইয়ের তুমুল জনপ্রিয়তার জোয়ারে ভেসে না-গিয়ে বরং আবারো নীরবতা এবং তার প্রিয় আলস্যকেই প্রশ্রয় দিলেন কবি। কাটিয়ে দিলেন গুনে গুনে আরো ৩৪ টি বছর। ১ম বই প্রকাশের জন্য যা সময় নিয়েছিলেন, ২য় বইয়ের ক্ষেত্রে নিলেন তার দ্বিগুণ! অবশেষে নীরবতার অবসান ঘটিয়ে ২০১৯ সালের শেষে, ৩৪ বছর পর ঠিক ৩৪ টি কবিতা নিয়েই হাজির হলেন তিনি।
গত ৫ ও ২৪ জানুয়ারি ‘বাংলা ট্রিবিউন’-এর সঙ্গে জাতীয় প্রেসক্লাবের অতিথি-কক্ষে চলা দীর্ঘ এক আলাপে কবি হেলাল হাফিজ খোলাসা করেন তার জীবনের নানা বিষয়াদি। বলেছেন বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ নিয়ে বিস্তারিত আলাপের পাশাপাশি নিজের জীবনের দর্শন ও নানান অভিজ্ঞতার কথাও।
'বাংলা ট্রিবিউন'-এর হয়ে এই আলাপ চালিয়েছেন তরুণ চলচ্চিত্রকর্মী, নির্মাতা শাহনেওয়াজ খান সিজু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আই.ই.আর. বিভাগের শিক্ষার্থী, তরুণ লেখক রেজওয়ান হাবিব রাফসান এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাদিরা ভাবনা


শাহনেওয়াজ খান সিজু : বিয়ে তো আর করলেনই না, এখন যদি কেউ প্রস্তাব দেয়, কী করবেন?
হেলাল হাফিজ : এখন? এখন বিয়ে-টিয়ে করাটা যে খুব অন্যায় হবে তা নয়। কিন্তু বিয়ে বলতে আমাদের মনে প্রথম যে ধারণা আসে, সে বয়স তো আর নাই।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : একজন সঙ্গী হিসেবে?
হেলাল হাফিজ : এই পড়ন্ত বেলায় মন তো চায় একজন বন্ধু পাশে থাকুক। যতটা না শারীরিক কারণে তার চেয়ে বেশি মানসিক।
 
নাদিরা ভাবনা : যেমন?
হেলাল হাফিজ : এই মনে করো চোখের সামনে একজন মানুষ আছে। ঔষধ খাবো, প্যাকেটটি এগিয়ে দিলো। পানি খাবো, গেলাসটি নিয়ে এলো। এই যা।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : বিকেলে চায়ে একসাথে চুমুক দেওয়া…
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, হ্যাঁ।
 
নাদিরা ভাবনা : এখন কি তার জন্য অনুতাপ হয়?
হেলাল হাফিজ : অনুতাপ না ঠিক, তবে এখন প্রয়োজনীয়তা বোধ করি খানিকটা। একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো। কিন্তু আমি, আমি তো আমার একাজীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি একদম শৈশব থেকেই। মা চলে যাওয়ার পর থেকে।
 
নাদিরা ভাবনা : মানে একদম ছোটবেলা থেকেই?
হেলাল হাফিজ : An Outsider!
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : মায়ের শাসন না পাওয়াটা কি আপনার বোহেমিয়ান জীবনের মূল কারণ?
হেলাল হাফিজ : না, না, না—আমার ক্ষেত্রে যা হয়েছে সেটা বাধ্যতামূলক। এইভাবে জীবনযাপনে আমি বাধ্য, আর কোনো উপায় ছিলো না আমার।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : জীবনানন্দ দাশের কবি হয়ে ওঠার পেছনে তার মা কুসুমকুমারি দাশের সান্নিধ্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তেমনি হেলাল হাফিজের কবি হয়ে ওঠার মূল কারণ কি তার মাতৃবিয়োগ?
হেলাল হাফিজ : আমার মনে হয় বিষয়টা এরকমই, মাতৃহীনতা। তোমাদের আমি খুব স্পষ্টভাবেই বলে দিচ্ছি যে, আমার কবি হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ এই মাতৃহীনতার বেদনা। এটা আমাকে প্রতিনিয়ত পুড়িয়েছে। আজকে যে হেলাল হাফিজকে দেখছো তোমরা, তার এই অবস্থানে আসা এবং তাকে তৈরি করার রাস্তাটা মাতৃহীনতার বেদনাই পরিষ্কার করে গেছে।
 
নাদিরা ভাবনা : আমাদের জীবনে এরকম হয় যে, আমরা যখন কারো দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হই, তখন বেদনা নতুন করে জেগে ওঠে।
হেলাল হাফিজ : আমি তো অনেক মেয়ের দ্বারাই প্রত্যাখ্যাত হয়েছি, নিজেও করেছি অনেককে। অনেকের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। কী রকম? আমি ভেবেছি মেয়েটি বোধহয় আমাকে ভালোবাসে। আসলে তা নয়, সে আমার কবিতাকে ভালোবাসে। আমি সেটাকে মনে করেছি হয়তো আমাকে ভালোবাসে! ফলে এই মুগ্ধতার দেয়ালটা যখন উঠে গেছে তখন বিরহ ছাড়া আর কোনো উপায় আসলে থাকেনি।
আবার এর উল্টাও হয়েছে। মেয়েটি হয়তো আমাকেই ভালোবাসে। কিন্তু আমি ভাবছি, ও আমাকে আর কি ভালোবাসবে? ও তো আমার কবিতাই বোঝে না, কিংবা বুঝতে চেষ্টাও করে না। যে রকম হয়েছে রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর ক্ষমতাই ছিলো না যে তাকে বুঝবে।
খুব প্রতিভাবান মানুষ সে নারী হোক বা পুরুষ—প্রেমহীন সে থাকে কী করে! একজন লেখিকা আছেন না, সুইসাইড করলো?
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : সিলভিয়া প্লাথ?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, সিলভিয়া প্লাথ। কত সুন্দর মহিলা ছিলেন, ফুলের মতো। সে তো পুরুষকে ভালোবাসতেই চেয়েছিলো। প্রত্যাখ্যাত না হলেও হয়তো বনিবনা হয়নি এমন বেদনা থেকে একটি মেয়ে সুইসাইড করতে পারে? ভাবা যায়! ওর ছবি দেখলেই তো ইচ্ছে হয় প্রেম করি! প্রেম আসলে নারী-পুরুষের ব্যাপার না, মানুষের ব্যাপার। এটা আসার হলে এমনিই আসবে। জোর করে আর যাই হোক ভালোবাসা হয় না।
 
নাদিরা ভাবনা : আচ্ছা, আপনার কবিতা নিয়ে যদি কেউ গান করতে চায়?
হেলাল হাফিজ : হয়েছে তো।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : না মানে, আপনার কি কখনো শুধু গানের কথা ভেবে কিছু লিখতে ইচ্ছে করেনি? যে রকমটা বব ডিলান, গুলজার বা শ্রীজাত করছেন?
হেলাল হাফিজ : না না না। আমি শুধু কবিতা নিয়েই থাকতে চেয়েছি আজীবন।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্ত্বিক ঘটক বলেছিলেন, তার নিজের বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য যদি সিনেমার চাইতে ভালো কোনো মাধ্যম তিনি পেতেন তবে সেই মাধ্যমকেই তিনি বেছে নিতেন। আপনি কেন কবিতার বাইরে গল্প, উপন্যাস, চিত্রনাট্য কিংবা অন্য কোনো শিল্প-মাধ্যমের দিকে ঝুঁকলেন না? সব ছেড়ে কেন শুধু কবিতা নিয়েই থাকছেন?
হেলাল হাফিজ : কবিতা ছাড়া অন্য কোনো কিছু আসলে টানেনি তেমনভাবে। আমার মনে হয়েছে যে, জীবনে আমার অল্প কিছু যদি করার থাকে তাহলে হয়তো এই মাধ্যমটিতেই আমি পারবো। আর আমি সত্যিই খুব কম প্রতিভাবান, নিজের সম্পর্কে আমি উচ্চ কোনো ধারণা আসলে পোষণই করি না। সুতরাং আমি নিজের লাগাম নিজে টেনে ধরার এই অভ্যাসটা খুব ভালোভাবেই আত্মস্থ করেছি।
 
নাদিরা ভাবনা : এটাকে পরিমিতিবোধ বলবেন?
হেলাল হাফিজ : পরিমিতিবোধ, Exactly এই শব্দটা। পরিমিতিবোধ এবং কোথায় কখন কতটুকু থামতে হবে, অধিকাংশ বাঙালিই এটা জানে না। এখানে তোমরা বলতে পারো যে, আপনি কি একটু বেশিই থেমে গেছেন? উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ। আমি একটু বেশিই থেমে গেছি। এটার কারণ আমি কম প্রতিভাবান এবং আলস্য আমার অসম্ভব প্রিয়। এই দুটো মিলে এবং ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র প্রবাদপ্রতিম খ্যাতি ও মানুষের ভালোবাসা আমাকে অস্থির করে ফেলেছে একদম। আনন্দ যেমন দিয়েছে তেমনি আতঙ্কিতও করেছে যথেষ্ট। রাতের পর রাত আমার ঘুম হয়নি।
 
নাদিরা ভাবনা : নতুন বই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই তো দ্বিতীয় সংস্করণ চলে এসেছে। এই যে এত খ্যাতি, আপনার কথায় মানুষের ভালোবাসা…
হেলাল হাফিজ : এটা অসম্ভব বিক্রি হচ্ছে। অসম্ভব ভালো বিক্রি হচ্ছে।
 
নাদিরা ভাবনা : আমি কিন্তু আপনার বই দুটোর মধ্যে এক ধরনের যোগসূত্র দেখতে পাই। প্রথমটা ছিলো আমি জ্বলছি, ‘যে জলে আগুন জ্বলে।’ আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে আমি এখন নিজেকেই সান্ত্বনা দিচ্ছি কিংবা আমি এখন কিছুটা স্তিমিত কিছুটা শান্ত, তাই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’। ঠিক আছে না ব্যাখ্যাটা?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, ঠিক আছে।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : বইটা প্রকাশ করতে এত সময় নিলেন কেন?
হেলাল হাফিজ : ভেতরে ভেতরে একটা ভয় কাজ করেছে যে, আরেকটা বই যদি প্রকাশ করি সেটা প্রথম বইয়ের ধার-কাছেও যেতে পারবে কি না। ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’র জন্য প্রায় ২০০ কবিতা থেকে ৩৪ টি কবিতা আমি বেছে নিয়েছি।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : বইটা পড়েছি আমি। এক লাইনের কবিতাও আছে এতে। একরকম experiment-ই করলেন বোধহয়!
হেলাল হাফিজ : এই বইয়ে আমি দুটো বিষয়ে কাজ করতে চেয়েছি—একটা হলো বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যে নেশা…
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : স্মার্টফোন?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ। সেই স্মার্টফোনকে কাব্যাকারে মলাটবন্দি করতে চেয়েছি। এই বইটা পড়তে কারো ২০ মিনিটের বেশি সময় লাগবে না, কিন্তু পড়ে সে আর বেরুতে পারবে না। একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে যাবে। এবং একটু পরেই আবার সে প্রথম থেকে পড়তে শুরু করবে—এই হলো এক। আর একটা বিষয় যা করতে চেয়েছি—এই যে আমরা একটা অস্থির সময় পার করছি, সমাজে হানাহানি—দুর্নীতি, একটা মেয়ে ঘর থেকে একা বের হতে পারছে না, অসহনশীলতা, রাজনীতি বিপথে চলে গেছে, সেইখানে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমি ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’-তে কেবলই প্রেমের কথা বলেছি, কেবলই বিরহের কথা বলেছি, কেবলই ভালোবাসার কথা বলেছি। আমি বোঝাতে চেয়েছি যে, প্রেমও প্রতিবাদের একটা ভাষা, প্রেম দিয়েও জয় করা যায়। আমার এই কোমলতায় কিছু মানুষও অনুপ্রাণিত বা প্রভাবিত হয় সেখানেই আমার সার্থকতা। চলমান সময়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে অনবরত আমি প্রেমের জয়গান গেয়েছি, বিরহের কথা বলেছি। বিরহ কিন্তু প্রেমেরই বড় অংশ, বিরহ মানুষকে নষ্টও করতে পারে আবার তৈরিও করতে পারে। বিরহ উপভোগের বিষয়।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : বইটির আর কোনো বিশেষত্বের কথা কি জানতে পারি?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ। একটা কবিতা আমার বাবার। কবিতাটির নাম পিতার পত্র—‘রেটিনার লোনাজলে তোমার সাঁতার/পিতৃদত্ত সে মহান উত্তরাধিকার।’
একটি চিঠিতে এই কবিতাটি লেখার পর বাবা আরও লিখেছিলেন, ‘এই কষ্ট, এই বেদনা তুমি লালন করবে, শুশ্রূষা করবে এদের, এবং চেষ্টা করবে এই বেদনাকে শিল্পে রূপান্তরিত করতে।’ আমি সেই চেষ্টাটাই করেছি, আর কিছু না। আব্বাকে সম্মান জানানোর জন্য ওনার এই কবিতাটি আমি ইনভার্টেড কমার ভেতরে আমার বইয়ে স্থান দিয়েছি। যেন একশো বছর পরে পাঁচজন লোকের হাতেও যদি এই বইটা থাকে, তারা যেন আমার পাশাপাশি আমার বাবাকেও পান।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : বাহ্, চমৎকার! আরেকটা প্রশ্ন করি?
হেলাল হাফিজ : নিশ্চয়ই। 
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : কবিতা অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের সাথে কীভাবে সম্পর্কিত বলে আপনি মনে করেন?
হেলাল হাফিজ : শুধু সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মধ্যেই নয় বরং সমস্ত শিল্প মাধ্যমের মধ্যে—যেমন গান, চলচ্চিত্র, নাটক, উপন্যাস—সবচেয়ে উঁচু স্তরের শাখা হলো কবিতা। এখন ধরো একজন ঔপন্যাসিক তার কোনো বিষয় বোঝাতে, কোনো সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে উনি ৭ পৃষ্ঠা লিখে ফেলতে পারেন। কিন্তু একজন কবির জন্য তা বোঝাতে দুটি পঙক্তিই যথেষ্ট। এজন্যই তুমি দেখবে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি স্বরণীয় হয়ে আছেন প্রথমত কবিরা, তারপরে বিজ্ঞানী-সহ অন্য সবাই।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : Visual Poetry’র ব্যাপারে আপনার কী ধারণা?
হেলাল হাফিজ : বুঝিনি। আবার বলো।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : আন্দ্রেই তারকোভস্কির মতো অনেক চলচ্চিত্রকারই তাদের সিনেমাতে Seen-এর পর Seen সাজিয়ে কবিতা বলে গেছেন, সেই Visual Poetry-কে আপনি কীভাবে দেখেন? আপনি যা লিখে প্রকাশ করছেন ওনারা তা Visually বলছেন। আপনার কবিতা বোঝার জন্য পাঠকের নির্দিষ্ট একটা ভাষায় পারদর্শী হওয়া আবশ্যক, কিন্তু সিনেমার ক্ষেত্রে বিষয়টা আলাদা। একেবারে বর্ণজ্ঞানহীন কোনো দর্শকের সঙ্গেও সিনেমা খুব সহজে Communicate করতে পারে।
হেলাল হাফিজ : আমি তো সেটাই বললাম, কবিতা হচ্ছে সবচেয়ে উঁচুস্তরের শিল্পমাধ্যম। কবিতা না লিখেও একজন কবি হতে পারে। ভালো ছবি এঁকে, ছবি তুলে, ভালো রাজনীতি কিংবা সিনেমা করেও কবি হওয়া যায়। কবিতা লেখার চাইতে Poetic হওয়াটা বেশি জরুরি। আর কবিতার ব্যাপারটা কি, ধরো প্রথমত বর্ণজ্ঞান থাকতে হবে। তারপর শুধু বর্ণজ্ঞান থাকলেই হবে না, ভালো লেখাপড়াও জানতে হবে। শুধু লেখাপড়া জানলেই হবে না, আগ্রহ থাকতে হবে কবিতার প্রতি। এ কারণেই পাঠককেও অনেকটা তৈরি হয়েই নামতে হবে যে আমি কবিতা পড়বো। কবিতাকে বোধগম্য করা কবির একার কাজ নয় পাঠকেরও কিছু কাজ আছে।
 
নাদিরা ভাবনা : আপনার কথা শুনে এখন মনে হচ্ছে যে, ‘Poetry is the mirror, where we can see the whole sky!’
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ এবং সেটা এতই সংক্ষেপিত যে তোমাকে বারবার ঘোরে ফেলে দেবে।
 
নাদিরা ভাবনা : আমি নিজেও যখন লিখতে যাই তখন মনে হয় যে ‘এটা সম্ভবত বুঝবে না কেউ।’ একারণেই Elaboration হয়ে যায়। অথচ আপনার কবিতা এক লাইন পড়লেই বুঝে যাই তার Background-টা কী বা কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা।
হেলাল হাফিজ : এটা হচ্ছে মুন্সিয়ানা এবং এটা আমার কবিতার একটা বড় Plus Point. তুমি রবীন্দ্রনাথের গীতবিতান ধরো, এতবড় গানের বইটা নিয়ে যদি বসো এবং প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ৩০০০ বা ৩৫০০ গান তুমি করলে। তুমি দেখবে একটি গানও তোমার বোধের অগম্য নয়। সবকটা গান মনে হবে যে, আরে এটা তো আমিও লিখতে পারি!
 
নাদিরা ভাবনা : আমারই কথা…
হেলাল হাফিজ : আমার কথা তো পরে, ওনার লেখা পড়ে মনে হবে যে আমি তো নিজেও এমন লিখতে পারি। একটা কঠিন শব্দ নাই, যুক্তাক্ষর যথাসম্ভব কম। তোমাকে খুঁজে খুঁজে যুক্তাক্ষর বের করতে হবে। মানে কতবড় প্রতিভাবান হলে এটা সম্ভব! বুঝতেই পারছো ব্যাপারটা। উনি নিজেই তো বলেছেন, ‘সহজ কথা কইতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায় না বলা সহজে।’ সহজ কথা বলাই তো সবচেয়ে কঠিন কাজ।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : আপনার সম্বন্ধে আমরা যতটুকু জানি, একজন আবুল হাসান হতে চেয়ে আপনি হেলাল হাফিজ হয়ে উঠেছেন, একজন কবির স্বাতন্ত্র্য গড়ে ওঠার প্রথম ধাপ কি তবে অনুসরণ, অনুপ্রাণিত কিংবা ঈর্ষান্বিত হওয়া?
হেলাল হাফিজ : যেকোনো শিল্পীরই শৈল্পিক ঈর্ষা থাকতে হবে। নোংরা ঈর্ষা হলে হবে না।
 
নাদিরা ভাবনা : অনুকরণ না, তাইতো?
হেলাল হাফিজ : অনুকরণ, অনুসরণ কোনোটাই না। আমি তো বলেছিই যে, আমার সমসাময়িক কবিদের মধ্যে একমাত্র আবুল হাসানকেই আমি ঈর্ষা করি। আর কাউকে ঈর্ষা করি না। তার মানে কী? সবচেয়ে বেশি ভালোওবাসি তাকে।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : শিল্প তো মনুষ্যত্বের জয়গান গায়, পৃথিবীর দুঃখের অবসান চায়। কিন্তু তারপরেও এই সমগ্র পৃথিবীর এত এত মহান সব শিল্পী, শিল্পকর্ম, বিশ্বমোড়লদের প্রভাবিত করতে পারেনি বা পারছে না কেন? কেন পৃথিবীর সর্বত্র এখনো অন্ধকারের জয়?
হেলাল হাফিজ : না, এইখানে তোমার পুঁজিবাদের প্রভাব আছে। কারণ পুঁজিবাদ তো শিল্পের বিকাশ ঘটতে দেবে না।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : না, মানে ঠিক কী কারণে বব ডিলান বা জন লেননের গান কিংবা পৃথিবীর এত এত মহান শিল্পীদের শিল্পকর্মগুলোর মূলভাষ্য বিশ্বনেতাদের প্রভাবিত করতে পারছে না? ডোনাল্ড ট্রাম্পও তো দিনশেষে একজন মানুষ, কেন তাকে ডিলান কিংবা বব মার্লে ছুঁয়ে যায় না?
হেলাল হাফিজ : সব মানুষ আলাদা, সবার শিল্পবোধ এক নয়।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : সমসাময়িক কবিদের মধ্যে কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের সাথে সম্ভবত পরিচিত আপনি। ওনার কবিতা নিয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাই।
হেলাল হাফিজ : ইমতিয়াজ মাহমুদ আমার ভক্ত, আমিও তার ভক্ত। ওর লেখার মধ্যে আলাদা একটা ব্যাপার আছে।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে কোনো স্মৃতি কি মনে পড়ে?
হেলাল হাফিজ : পারিবারিকভাবে তসলিমার সঙ্গে আমার খুবই অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিলো, একে তো মাটির টান, তার ওপরে অনুজ রুদ্র’র প্রেমিকা। ওদের মধ্যে এটা-সেটা নিয়ে সাংসারিক ঝামেলা লেগেই থাকতো, তখন আমিই যেতাম সেসব মেটাতে। এবং এই করতে করতেই আমি তসলিমার প্রেমে পড়ে যাই, তবে ব্যাপারটা একপাক্ষিক ছিলো। এইখানে তোমাদের বলে রাখি, আমার 'বেদনাকে বলেছি কেঁদো না'র প্রথম যে কবিতা, ‘ব্রক্ষ্মপুত্রের মেয়ে’, সেটা কিন্তু তসলিমাকে ভেবেই লেখা। ওকে আমি ‘তনা’ নামে ডেকেছি।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : আপনি বরাবরই বলেছেন যে, একজন প্রকৃত শিল্পী যদি হতে হয় তবে ক্ষমতা থেকে তার দূরে থাকাই ভালো।
হেলাল হাফিজ : আমি এটা সবসময়েই বলি। পাওয়ারের সঙ্গে কবির মেশা কখনো ঠিক না। কবি হলো একটা সার্বভৌম সত্তা Sovereign identity. একটা সমাজ বা জনগোষ্ঠী কী অবস্থায় আছে, এটা সেই সমাজের কবিদেরকে দেখে বোঝা যায়। কবি হলো একটি সমাজের ব্যারোমিটার, সমাজটা কি নষ্ট-ভ্রষ্ট না কি ভালো, কতটুকু সভ্য আর উন্নত তা কবিদের আচরণ দেখলেই বোঝা যায়। সমাজের কবিরা যদি পোষা পাখি হয়ে যায়, তাহলে ধরে নিতে হবে সে সমাজ দ্রুত গতিতে অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে। কবি একটি জনগোষ্ঠীকে স্বপ্ন যেমন দেখাবে, তেমনি সেই জনগোষ্ঠীর স্বপ্নভঙ্গের বেদনাকেও সে চিহ্নিত করে দেবে। কোথায় ভুল-ত্রুটি হচ্ছে তা দেখিয়ে দেয়াও কবির দায়িত্ব। এর অর্থ এই না যে কেউ রাজনীতি করতে পারবে না। নিশ্চয়ই পারবে। একজন কবির একটি রাজনৈতিক সংগঠন করার যাবতীয় অধিকার অবশ্যই আছে। নিশ্চয়ই করবে সে। কিন্তু আমার ধারণা যে, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হলে একধরনের চিন্তাগত সীমাবদ্ধতা Automatically-ই আরোপিত হয়ে যায়।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : সক্রিয় রাজনীতিতে একধরনের সহিংস, কঠোর মনোভাব আছে যার প্রতি একজন শিল্পীর নরম মন সহজে সায় দিতে চায় না।
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, ঠিক এই কারণেই একজন কবির রাজনীতি থেকে একটু দূরে থাকতে পারাই ভালো। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে তার রাজনৈতিক সংগঠন করারও সম্পূর্ণ অধিকার আছে। অবশ্যই আছে। সুকান্ত করেছে না? তারপরে ঐ যে ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত’ যিনি লিখলেন?
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : সুভাষ মুখোপাধ্যায়?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়। উনি তো সক্রিয় রাজনীতিই করতেন। সুকান্ত করতেন। এমনকি কাজী নজরুল ইসলামও। আমি এই যে বারবার বলছি, আমি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য না। তুমি দশজন কবির বই নিয়ে বসো, সবচাইতে বেশি রাজনৈতিক কবিতা পাবে আমার লেখায়।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : প্রয়াত কবি মাহবুবুল হক শাকিল, আপনার ঘনিষ্ঠজন বলেই চিনি আমরা। উনিও কিন্তু সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন।
হেলাল হাফিজ : মাহবুবুল হক শাকিল—ও তো আমার কবিতা অসম্ভব পছন্দ করতো। এবং ময়মনসিংহ গেলে বাড়িতে যাওয়া-আসা ছিলো। এবং শাকিলই আমার চোখের চিকিৎসার সময়ে শেখ হাসিনার সাথে আলাপ করে পুরো বিষয়টা নিজে একক দায়িত্বে সামলিয়েছিলো। আমাকে সে বলেছে যে, আপা মানে নেত্রী তো আপনাকে খুব পছন্দ করে কিন্তু আপনি এত দূরে দূরে থাকেন কেন? আমি তখন বলেছি যে, ভাই দূরে-কাছে তো ব্যাপার না। আমি আমার কাজ করছি, উনি ওনার কাজ করছেন।
তো আমি যখন বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলাম ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তখন ৪৫ বছর পর শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার মুখোমুখি দেখা।
 
নাদিরা ভাবনা : নতুন কবি বা লেখকদের লেখা কি পড়েন?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, সেটাই তো বেশি জরুরি। আমার সময়কে আমি কীভাবে ধরবো? আমার তো ৭২ বছর বয়স। তুমি আমার কবিতা পছন্দ করো বলে তোমার হয়তো আমাকে একটু কাছে বসতে দিয়েছো, নাহলে তো আমাকে কেউ ধারে কাছেও বসতে দেবে না। তাই না? আমি তোমাকে না পড়লে বুঝবো কীভাবে? কাছাকাছি থাকলে হয়তো একটু বন্ধুত্ব হতে পারে। কিন্তু এর বেশি তো আর সম্ভব না। তাহলে আমি আমার সময়কে বুঝবো কীভাবে? তোমার কবিতা পড়ে, গান শুনে কিংবা পেইন্টিং দেখেই তো বুঝতে হবে তোমাকে, তাই না?
 
নাদিরা ভাবনা : তার মানে নতুনদের ভালো লাগে। অনুপ্রাণিতও হন তাদের দ্বারা?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। হবো না কেন? কোনো ভালো লেখা পড়লে দারুণ লাগে। এইতো কিছুদিন আগে একটা মেয়ের লেখা দেখলাম Facebook-এ। তার সঙ্গে আমার পরিচয় নাই সেভাবে। আমিই তাকে Friend Request পাঠিয়ে বন্ধু হয়েছি। তাকে বলেছি যে আমার Inbox-এ কিছু লেখা দাও তোমার। আমি হাতের কাছে তরুণদের যত লেখা পাই, পড়ি। এখন হয়েছে কী! একটা কাল্ট বা ঘরানা মানে একটা স্বতন্ত্র ধারা জন্ম নিয়েছে, যা কিনা বছরে বছরে হবে না এমনকি যুগে যুগেও না। যেমন জীবনানন্দ দাশ একটা ঘরানা। রবীন্দ্রনাথ একটা ঘরানা।
 
নাদিরা ভাবনা : নজরুল?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, নজরুলও একটা ঘরানা। কিছুটা ঘরানা আবুল হাসানও। আবুল হাসানের কবিতার কোনো নাম-টাম না থাকলেও বোঝা যাবে যে এটা আবুল হাসান।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : Signature?
হেলাল হাফিজ : Exactly, একজন কবির যে স্বাতন্ত্র্য, কবিসত্তা, এটা থাকা জরুরি।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : স্যার, জীবনে তো অনেক অনেক রূপসী নারীরই সান্নিধ্য পেলেন। একটা বিষয় জানতে চাই যে, একজন নারীর রূপ নাকি ব্যক্তিত্ব, কোনটা আপনাকে বেশি টানে?
হেলাল হাফিজ : দুটোই, আমি মনে করি যে দুটোই জরুরি। শুধু বাহ্যিক রূপ দিয়ে তো কোনোকিছু চিরস্থায়ী হবে না। এটার সঙ্গে যদি ভেতরের ভালো সংমিশ্রণ ঘটে তাহলে ব্যাপারটা জমে আরকি। এটা কেবল নারী নয় বরং পুরুষদের ক্ষেত্রেও একই।
 
নাদিরা ভাবনা : কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে বোধহয় রূপের বিষয়টা একটু বেশিই জরুরি?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ এটাও সত্য। কিন্তু এটাই সর্বেসর্বা না। এটাই সবকিছু না। আমি নিজেই তো একসময় সুদর্শন ছিলাম, কিন্তু এখন? তুমি আমার কবিতা ভালোবাসো বলেই আমার পাশে বসেছো, আমি যদি না লিখতাম তাহলে কেউই আমাকে এই বয়সে এতটা গুরুত্ব দিতো না। যাই হোক, কিছুদিন আগে ‘প্রথম আলো’ জিজ্ঞাসা করেছিলো যে, আপনার এত এত নারী ভক্ত। তারা আপনাকে উপহার হিসেবে কী দেয়? উত্তর দিলাম, সবচেয়ে বেশি পেয়েছি চুমু। একসময় প্রচুর পেতাম। এখন তো পড়ন্ত বেলা, এখন মালা পাই, ব্রেসলেট পাই, ফুল পাই।
 
নাদিরা ভাবনা : চুমুও পান?
হেলাল হাফিজ : একেবারে যে পাই না তা না, তবে পাই। পাবার একটা জায়গা তো হলোই এখন! (ভাবনাকে ইঙ্গিত করে)
 
নাদিরা ভাবনা : তা তো বটেই।
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : এখন একজন মহান মানুষকে নিয়ে আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে যাচ্ছি, যাকে শুধু রাজনীতির ফ্রেমে আমরা আবদ্ধ রাখতে পারি না। উনি সার্বজনীন, উনি সবার। অন্তত একজন বাঙালি যদি হয়ে থাকি আমরা। বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ, এ দুটো আপনার কাছে সমার্থক কিনা স্যার?
হেলাল হাফিজ : বাঙালি জাতির জন্য একজন মানুষ, কেবল একজন মানুষই স্বতন্ত্র, স্বাধীন এবং সার্বভৌম একটি ভূখণ্ডের স্বপ্ন দেখেছেন, তার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। আর কোনো বাঙালি বাঙালির জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমির কথা চিন্তা করেনি। কোনো কবি করেনি, কোনো রাজনীতিবিদ করেনি, কেউ করেনি।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : একমাত্র বাঙালি...
হেলাল হাফিজ : একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানই বাঙালির জন্য একটি স্বতন্ত্র, স্বাধীন, সার্বভৌম আবাসভূমির স্বপ্ন দেখেছেন এবং তা শুধু দেখেনই নয় বরং সারাজীবনের সংগ্রাম দিয়ে সেটা বাস্তবায়িত করেছেন।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : বারবার জেল খেটেছেন…
হেলাল হাফিজ : তার সমকক্ষ আর কেউ নাই। কেউ নাই। এটা একদম বিনা বাক্যব্যয়ে মানে এই শব্দকে কোনোভাবেই Ignore করা সম্ভব না। এটা যদি কেউ অস্বীকার করতে চায় সে হয়তো বাঙালিই না। করেনি যে তা নয়, অনেকেই করছে। কিন্তু সেটা খুবই অযৌক্তিক, খুবই অপরিশীলিত মনের পরিচয়। তার রাজনীতির বিরুদ্ধতা হতে পারে কিন্তু তার যে অবদান, কাজ…
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : তার বিরোধীতা করা সম্ভব না।
হেলাল হাফিজ : একদম।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : আপনার গুরুই বলা যায়—আহমদ ছফা—তার প্রভাব কেমন আপনার ওপরে?
হেলাল হাফিজ : ছফা ভাই অনেক অনেক আদর করতেন আমাকে। এবং আমার ঐ যে কবিতাটা যখন বেরুলো ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’, তখন হুমায়ুন কবির নামে একজন কবি ছিলেন, বরিশাল বাড়ি তার। আমাকে নিয়ে ছফা ভাই আর হুমায়ুন ভাই গিয়েছিলেন দৈনিক পাকিস্তানের সম্পাদক আহসান হাবীবের কাছে। তখনকার দৈনিক পাকিস্তান পরে দৈনিক বাংলা হয়। হাবীব ভাইয়ের কাছে গিয়ে ছফা ভাই বললেন, এই যে হেলাল হাফিজ আর এই তার কবিতা। হাবীব ভাই কবিতাটি পড়ে আর আমার দিকে তাকান।
 
নাদিরা ভাবনা : বাচ্চা এই ছেলেটা করেছেটা কী?
হেলাল হাফিজ : যাইহোক, পরে হাবীব ভাই বললেন, ছফা ও তো বাচ্চা ছেলে কষ্ট পাবে, কিন্তু কবিতাটি আমি ছাপতে পারবো না। আমার চাকরি থাকবে না, এমনকি কাগজও বন্ধ করে দিতে পারে। সরকারি কাগজ তখন পাকিস্তানের। তবে এরপরেই বলেন তিনি যে, হেলালের আর কবিতা না লিখলেও চলবে, তার অমরত্ব নিশ্চিত হয়ে গেছে। এইতো এখনও কানে বাজে কথাটা। তখন ছফা ভাই এসে হুমায়ুন কবিরকে সাথে নিয়ে, ওনারা তখন লেখক-শিবির করতেন, বাম ঘরানার Underground সশস্ত্র বিপ্লবী ছিলেন। দুই রাতে সমস্ত ক্যাম্পাসের দেয়াল ভরে গেলো এই কবিতার পঙক্তিতে।
‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’
মাঝরাতে চিকা মেরে মেরে করেছিলো এসব। পুরো ক্যাম্পাস। কার্জন হল, আর্টস বিল্ডিং। তখন তো এতকিছু ছিলো না ক্যাম্পাসে। এই দুটিই বড়, মূল বিল্ডিং। সমস্ত দেয়ালে চিকা মারার এই কাজের নেতৃত্বে ছিলেন ছফা ভাই। উনি ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক স্যারের শিষ্য।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : আব্দুর রাজ্জাক স্যারকে নিয়ে তো উনি একটা বইও লিখেছিলেন, ‘যদ্যপি আমার গুরু’।
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ। আচ্ছা শোনো, আমি আর কথা বলতে পারবো না, এই যে আমার কাশি হচ্ছে বারবার। তোমরা ৩ জন মিলে এটা গুছিয়ে লিখো আর কোনো তথ্যের যদি ঘাটতি পড়ে কিংবা কিছু নিয়ে কোনো দ্বিধা যদি হয় তবে আমাকে ফোন করো।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : স্যার, একটা শেষ প্রশ্ন করি?
হেলাল হাফিজ : আচ্ছা করো।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : পিডিএফ বনাম কাগুজে বই, কার পক্ষে আপনি?
হেলাল হাফিজ : অনেকের ধারণা যে বই বোধ হয় উঠে যাবে, বই থাকবে না। কিন্তু আমার মনে হয় বই থাকবে। কারণ বইয়ের কাগজের যে গন্ধটা লাগে নাকে এটা কিন্তু খুবই হৃদয়গ্রাহী একটা ব্যাপার। এবং তুমি যতই অনলাইন পড়ো না কেন, এই যে বাইন্ডিং করা বই, এটা হাতে নিলে মনে হয় যেন লেখককেই ধরে আছো। এই স্পর্শ, আবেদনটা তুমি অন্য কোথাও পাবে না। আমাকে তো কত ছেলে-মেয়েই বলেছে যে, ঘুমানোর সময় ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ তাদের বালিশের নিচে থাকে।
 
নাদিরা ভাবনা : আমারও তো থাকে।
হেলাল হাফিজ : এই যে দেখো জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। চিন্তা করো কেমন লাগে তখন? কথাটা কত মানুষ যে বলেছে আমাকে!
 
নাদিরা ভাবনা : ব্যাপারটা এমন না যে শুধু পড়েই রেখে দিলাম, একটা ঘোরের বিষয় আছে।
হেলাল হাফিজ : এজন্যই আমি ১৭ বছর অপেক্ষা করেছিলাম বইটার জন্য আর এই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ এটার জন্য ৩৪ বছর। এটা এমন না যে বেশি সময় নিয়ে বের করেছি বলে এটা সমকক্ষ তার, বরং আমি স্বীকারই করি যে এটা দূর্বল খানিকটা। ৩-৪ টা টিভি অনুষ্ঠান করেছি বইটা বেরুবার পরে এবং প্রতিটাতেই স্বীকার করেছি।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : প্রথম বই সবসময়েই প্রিয়।
হেলাল হাফিজ : না না, যেটা বাস্তব সেটা তো বলতেই হবে। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ যখন আমি লিখেছি, তখনকার সময় আর এখন কি এক? ঐ সময় আমি কোথায় পাবো? কবিতা তো আর হাওয়ায় হাওয়ায় হয়ে ওঠে না।
 
নাদিরা ভাবনা : এবার চা খাব।
হেলাল হাফিজ : শুধু চা কেন? তার আগে কাবাব-নান খাবো এবং আমি খাওয়াবো। চলো, এতক্ষণে ক্যান্টিন খুলে গেছে...

/জেডএস/

সম্পর্কিত

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ১৭:৪৩

২০২১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জিতে নিলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ। ৭ অক্টোবর বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় বিকেল পাঁচটায় এই পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে রয়েল সুইডিশ অ্যাকাডেমি।

তানজানিয়ার নাগরিক আবদুলরাজাক গুরনাহ যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। তিনি মূলত ইংরেজিতে লেখেন। তার  বিখ্যাত কয়েকটি উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে প্যারাডাইস (১৯৯৪), বাই দ্য সি (২০০১), এবং ডেজারশন (২০০৫)।

১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন আবদুলরাজাক গুরনাহ। তানজানিয়ায় বেড়ে উঠলেও ১৯৬০ সালের পর শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাজ্যে যান এই সাহিত্যিক। অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ক্যান্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। সুইডিশ একাডেমি বলেছে, আবদুলরাজাক গুরনাহের আপোষহীন ও দরদী লেখায় উপনিবেশিকতার দুর্দশা আর শরণার্থীদের জীবনের নানা কষ্ট-ব্যাঞ্জনার গল্প ফুটে উঠেছে।

২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জিতে নেন আমেরিকান কবি লুইস গ্লাক। সুইডিশ অ্যাকাডেমির পক্ষ থেকে বলা হয়, গ্লাককে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে তার নিরাভরণ সৌন্দর্যের ভ্রান্তিহীন কাব্যকণ্ঠের কারণে, যা ব্যক্তিসত্তাকে সার্বজনীন করে তোলে। ২০১৯ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন অস্ট্রিয়ান লেখক পিটার হান্দক। তার বিরুদ্ধে সার্বিয়ার নেতা স্লোবোদান মিলোসেভিচের বলকান যুদ্ধ সমর্থনের অভিযোগ রয়েছে।

২০১৮ সালে নোবেল কমিটির এক সদস্যের স্বামী ও জনপ্রিয় আলোকচিত্রী জ্যঁ ক্লদ আর্নোর বিরুদ্ধে যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগ আনা হয়। পরে ওই ঘটনায় তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে আদালত। যৌন কেলেঙ্কারির পাশাপাশি বিজয়ীর নাম ফাঁস করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিতর্কের মুখে স্থগিত করা হয় ২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেল প্রদান।

কেলেঙ্কারির কারণে ২০১৯ সাল থেকে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে শুরু করে রয়েল সুইডিশ একাডেমি। পাল্টে যায় নোবেল কমিটির কাঠামোও। সে বছর ২০১৯ সালের বিজয়ীর পাশাপাশি ঘোষণা করা হয় ২০১৮ সালের স্থগিতকৃত বিজয়ীয় নামও। ২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান পোলিশ লেখক ওলগা তোকারজুক।

সরাসরি নোবেল ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৮ সালেই প্রথমবারের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা বাতিল করা হয়। এর আগে দ্বিতীয় ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ও এ বিভাগে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। তবে ওই সময় যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে দেওয়া হয়নি।

২০১৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জিতে নেন জাপানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক কাজু ইশিগুরো। ২০১৬ সালে অ্যাকাডেমি আমেরিকান রক সংগীতের কিংবদন্তি বব ডিলানকে এই পুরষ্কার দেওয়া হয়।

এর আগে ১৪ জন নারী সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন। প্রয়াত টনি মরিসন একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ নারী যিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন।

প্রসঙ্গত, ১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসে আলফ্রেড নোবেল নিজের মোট উপার্জনের ৯৪% (৩ কোটি সুইডিশ ক্রোনার) দিয়ে তার উইলের মাধ্যমে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করেন। এই বিপুল অর্থ দিয়েই শুরু হয় পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান।

১৯৬৮ সালে তালিকায় যুক্ত হয় অর্থনীতি। সে বছর পুরস্কার ঘোষণার আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন আলফ্রেড নোবেল। আইনসভার অনুমোদন শেষে তার উইল অনুযায়ী নোবেল ফাউন্ডেশন গঠিত হয়। তাদের ওপর দায়িত্ব বর্তায় আলফ্রেড নোবেলের রেখে যাওয়া অর্থের সার্বিক তত্ত্বাবধান করা এবং নোবেল পুরস্কারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা করা। বিজয়ী নির্বাচনের দায়িত্ব সুইডিশ অ্যাকাডেমি আর নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটিকে ভাগ করে দেওয়া হয়।

/জেজে/

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ২০:৪৮

শিশুরা খেলবে
এই তো নিয়ম
বুড়োরা দেখবে
তাই বুঝি কম
হঠাৎ দেখছি
হলদিয়া মাঠে
বদলিয়ে গেছে
আগম নিয়ম :

বুড়োরা খেলছে
শিশুরা দেখছে

(আগম-নিয়ম/ লঘু সংগীত ভোরের হাওয়ার মুখে)

আমাদের জীবন যে সব সময় শৈশবকে বহন করে চলেছে, এই কবিতার মধ্যে সেই বার্তা পাই। বয়স্ক মাত্রই একদিন শিশু ছিল, কিন্তু বুড়ো হয়ে অনেকে ভুলে যান সে-কথা। কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ভোলেননি! সে-জন্যই বোধ হয় আমাদের মনোজগতের 'আগম-নিয়ম' বদলে দিতে চেয়েছিলেন তিনি! 'হলদিয়া'র ঠিক পরের লাইনে 'বদলিয়ে' শব্দটি কী মাধুর্য এনেছে! তাঁর মনের বয়স যে বাড়েনি, কাছে গেলেই সে-কথা টের পাওয়া যেত। মধুর-আনন্দে ভরিয়ে দিতেন আমাদের ছেলেবেলা!

কখনও মজার গল্প বলতেন। একবার তাঁর বাড়িতে গিয়ে মুখোমুখি বসেছি, ওমনি তাঁর পায়ে এসে বসল একটা মশা! 'ঠাস' শব্দে মশাটাকে মেরে অলোকরঞ্জন বললেন :
—আমাদের বন্ধু তারাপদকে চেনো?
—তারাপদ রায়? বহু কবিতা পড়েছি তাঁর।
—আমাদের শৈশবে ওর একটা ডেরা ছিল কলকাতায়। রাতে মশার বাড়বাড়ন্ত। মশারি টাঙিয়ে ঘুমোত তারপদ।
—তাই?
—রাত দু'টোর মধ্যে ঘরের সমস্ত মশা ঢুকে পড়ত ওর মশারির ভেতর।
—সেকি! তারপর?
—তারাপদ তখন আলত করে মশারি থেকে বেরিয়ে এসে খোলা মেঝেতে ঘুমিয়ে দিব্যি কাটিয়ে দিত বাকি রাতটা!

কী আশ্চর্য! ১৭ নভেম্বর অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর চলে যাওয়ার দিনটিতেই তারাপদ রায়ের জন্মদিন। কীরকম তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গিয়েছে দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু। আজ অলোকদার জন্মদিনে তাঁর কথাগুলো কানের কাছে বেজে উঠছে পিয়ানোর সুরের মতো। আর ভাবনার অতল মিলিয়ে যাচ্ছে জলের গভীরে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে নবনীতা দেবসেনের মৃত্যুর পর তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, বুদ্ধদেব বসুর চলে যাওয়ার দিনটিতে নবনীতা ঘটনাচক্রে ছিলেন অলোকরঞ্জনের জার্মানি বাড়িতে। সেদিন সারা রাত তাঁরা শুধু বুদ্ধদেবের স্মৃতিচারণ করেছিলেন, তারপর এক সময় জানালা দিয়ে আলো আসতে শুরু করে, ভোর হয়ে যায়।

বাজে রে গুপীযন্ত্র বাজে মহাঅন্ধকারে

চটকা ভেঙে সংসারীরা গণপিটুনি দিতে
আছিলা চোর খুঁজে বেড়ায়, নাগরদোলা থেকে
দুঁদে সয়তান ধার্য করে কোনজন সজ্জন,
বাকিরা প্রাণ খোয়ায় তার একটি ইঙ্গিতে,
নবারুণের বদলে দেখি শুধুই রাত বাড়ে—

তবুও গুপীযন্ত্র বাজে মহাঅন্ধকারে

(গুপীযন্ত্র বাজে/ শুনে এলাম সত্যপীরের হাটে)

তখন কি ভেবেছিলাম ঠিক তার পরের বছর নভেম্বরে তিনিও চলে যাবেন আমাদের ছেড়ে! কবি আলোকরঞ্জন দশগুপ্তর প্রয়াণ আমাদের কাছে রাত বাড়ার মতোই 'মহাঅন্ধকার' এনে দিয়েছে। প্রয়াণের পর এই তাঁর প্রথম জন্মদিন। কাছের মানুষকে হারালে, কেন জানি না, তাঁর সঙ্গে যাপনের দিনগুলোই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বারবার। পর্দায় দেখা সিনেমার দৃশ্যের মতোই, একের পর এক। যদবপুরে শক্তিগড়ের মাঠের কাছে তাঁর ফ্ল্যাটে আমাদের আড্ডা হয়েছে বহুবার। টের পেতাম শব্দ প্রবাহের রূপান্তর। শক্তিগড় শব্দটির মধ্যে একটা স্পেস দিয়ে উচ্চারণ করতেন তিনি। শক্তি (স্পেস) গড়ের মাঠ! কিন্তু কেন? একটা স্পেসের মধ্যে দাঁড়িয়ে কি তিনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কোনও মেধাবী-মজা করতেন? তা ধরার সাধ্য আমার নেই। তবে তিনি শক্তির কবিতার কাছে বারবার যেতে বলতেন, সেকথা মনে আছে। যখন তাঁর কাছে 'বৈষব পদাবলি' বুঝতে গিয়েছি, তখনও তিনি বলেছিলেন-- 'শক্তির কবিতা বৈষ্ণব পদাবলির জঙ্গম উত্তরাধিকার বহন করেছে'। এই নিয়ে তাঁর একটি লেখাও রয়েছে। সেই লেখা পাওয়া যায় 'যা হয়েছে যা হতেছে এখুনি যা হবে' বইয়ে।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির আয়োজনে লিটল ম্যাগাজিন মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল শিলিগুড়ির বাঘাযতীন পার্কে। সেখানে কবিতা পড়তে যাব জেনে অলোকদা বললেন, 'আমার বন্ধু অশ্রুকুমার সিকদার শিলিগুড়িতে থাকেন। ওঁর সঙ্গে দেখা করে এসো। বলবে আমি পাঠিয়েছি।' সেই মতো ফোন করে অশ্রুবাবুর বাড়িতে গেলাম। তাঁর 'আধুনিক কবিতার দিগবলয়' কত ছোটবেলায় পড়েছিলাম। বইটা আমার বাবার সংগ্রহে ছিল। এবার অশ্রুবাবু উপহার দিলেন 'গাংচিল' থেকে প্রকাশিত তাঁর 'এক কুড়ি প্রবন্ধ'। বইটা পড়ে কী ভীষণ ঋদ্ধ হই এখনও! শেষ দিন পর্যন্ত অশ্রুবাবুর সঙ্গে সুযোগাযোগ থেকে গিয়েছিল একমাত্র অলোকঞ্জনের সৌজন্যেই!

এর কিছুদিন পর নন্দন চত্বরে লিটল ম্যাগাজিন মেলায় অলোকরঞ্জন দশগুপ্তর কবিতাপাঠ শুনেছিলাম :

প্রজাপতির পরনে ছিল হলুদ টাই,
তুমি কিন্তু দেখলে শুধু হলুদটাই।

যেদিকে চাও এখন শুধু ঘূর্ণিঝড়,
উড়তে গিয়ে গাছগুলিও দূর-শিকড়।

বরণডালায় কেউ রেখেছে বিষবারুদ,
যজ্ঞের চাল নষ্ট-করা কপিশ দুধ

খেতের মধ্যে ছলকে  যায়, এমন সময়
ভয় সাহস এবং কিনা সাহস ভয়।

এর ভিতরে ছোট্ট বুকে সাহসভরে
একটুখানি রং-বদলের আড়ম্বরে

পাড়ার প্রজাপতি আঁচল হলুদ টাই,
তুমি কিন্তু দেখলে শুধু হলুদটাই!

'হলুদ টাই'-এর সঙ্গে 'হলুদটাই'-এর আশ্চর্য অন্তমিল ভাবা যায়! কিংবা 'ঘূর্ণিঝড়' এর সঙ্গে দূর-শিকড়-এর? আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত তাঁর 'তুষার জুড়ে ত্রিশূলচিহ্ন' বইয়ে আছে এই কবিতা। নিজেকে 'আড় ভাবুক' বলতেন তিনি। একবার এর মানে জানতে চেয়েছিলাম তাঁর কাছেই। বলেছিলেন, যেকোনো বিষয়কে আড়াআড়ি ভাবা। অলোকরঞ্জনের সঙ্গ না-পেলে মনে হয় জীবনটাই বিবর্ণ থেকে যেত।

২০১৮ সালে অক্টোরব মাসে দিল্লি থেকে ফোন করে বললেন : 'দেশ পত্রিকায় তোমার কবিতাটা ভালো লেগেছে। আমার বোনের বাড়িতে বসে লেখাটা পড়লাম।' একজন তরুণের কাছে এর চেয়ে বেশি পাওয়া আর কী হতে পারে! আজ, তাঁর 'পদ্ধতি ও খণ্ড খণ্ড মেঘ' আবার খুলে বসেছি। বইটা এক সময় তাঁর সংগ্রহে ছিল না। কলেজ স্ট্রিট বাটার তিন তলায় 'বিকল্প' প্রকাশনা থেকে একটা কপি সংগ্রহ করে আমি দিয়েছিলাম তাঁকে। এই বই আমার চোখের সামনে খুলে দিয়েছিল জার্মান সাহিত্যের জানলা। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত আমার কাছে খোলা জানালার মতোই। যে-জানালা দিয়ে আমার ঘরে সব সময় আলো-বাতাস আসছে...।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:৪৭

এ বছর ‘দ্য বুকার প্রাইজ’-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে শ্রীলঙ্কার ৩৩ বছর বয়সী লেখক অনুক অরুদপ্রাগাসামের উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’। বইটি চলতি বছরের ১৩ জুলাই যৌথভাবে প্রকাশ করেছে আমেরিকার হোগার্থ প্রেস এবং হামিশ হ্যামিল্টন। আমেরিকার পাশাপাশি ইংল্যান্ডের গ্রান্টা বুকস থেকেও ১৫ জুলাই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়।

উপন্যাসের বিষয়বস্তু গৃহযুদ্ধোত্তর শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি।

‘২০২১ বুকার প্রাইজ’-এর সংক্ষিপ্ত তালিকা ঘোষণা করা হয় ১৪ সেপ্টেম্বর।

উপন্যাসর মূল চরিত্র কৃষ্ণ, যাকে কেন্দ্র করেও গল্প গড়ে ওঠে। দেখানো হয়, কৃষ্ণ বর্তমান সময়ের কলম্বোর একটি এনজিওতে চাকরি করে। যে এক সময় শ্রীলঙ্কার উত্তরে যাত্রা করে– যেখানে গৃহযুদ্ধের কুরুক্ষেত্র ছিলো– সেখানে সে তার দাদীর তত্ত্বাবধায়কের শ্মশান যাত্রায় যোগ দেয়।

‘এ প্যাসেজ নর্থ’ একটি গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন দার্শনিক উপন্যাস। কাহিনিটি প্রাথমিকভাবে গড়ে উঠেছে দীর্ঘ বাক্য ও পার্টিসিপেল ফ্রেইজ ও সাবঅডিনেট ক্লজ দিয়ে। সংলাপ গঠিত হয়েছে সরাসরি প্রশ্ন না করে পাস্ট পারফেক্ট টেনস দিয়ে।

অনুক অরুদপ্রাগাসাম এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি চেয়েছেন কৃষ্ণর সঙ্গে তার দাদীর আবেগমথিত সম্পর্কের স্বরূপ তুলে ধরতে।

যাই হোক, উপন্যাসের শেষে দেখা যায় দাদী-নাতির সম্পর্ক প্রাসঙ্গিক থাকলেও কৃষ্ণ আছন্ন হয়ে পড়ে রানীর বিষণ্নতায়, যিনি তার দুটি সন্তান হারিয়েছেন এমনকি আঞ্জুমের সঙ্গে সম্পর্কও তার অতীত।

উপন্যাসটি একই সঙ্গে রাজনৈতিকও, সংলাপের ভেতরে প্রকাশ পেয়েছে তামিল জনগণের উপর শ্রীলঙ্কার সরকারের অত্যাচারের বিষয়ে নিন্দা।

অনুক অরুদপ্রাগাসাম শ্রীলঙ্কার তামিল লেখক, তিনি ইংরেজি ও তামিল ভাষায় লেখেন। 

তার প্রথম উপন্যাস ‘এ স্টোরি অব এ ব্রিফ ম্যারেজ’ প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে, অনূদিত হয় ফরাসি, জার্মান, চেক, মান্দারিন, ডাচ এবং ইতালিয় ভাষায়। এই উপন্যাসটি ২০০৯ সালের গৃহযুদ্ধের চূড়ান্ত অবস্থা নিয়ে লেখা, যা দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যের জন্য লাভ করে ডিএসসি প্রাইজ এবং ডিলান টমাস পুরস্কার। এছাড়া জার্মান আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পায়। 

অরুদপ্রাগাসাম ১৯৮৮ সালে শ্রীলঙ্কার কলোম্বোর একটি তামিল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়তে ১৮ বছর বয়সে তিনি আমেরিকা গমন করেন। লেখাপড়া শেষ করে তিনি ভারতের তামিল নাড়ুতে বসবাস করছেন। এছাড়াও তিনি কলোম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেছেন।

অরুদপ্রাগাসামের প্রথম উপন্যাস ‘এ স্টোরি অব এ ব্রিফ ম্যারেজ’ ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের সময়কালে লেখেন। এতে দীনেশ ও গঙ্গার একটি দিন ও রাতের বর্ণনা করা হয়, যারা শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর উত্তর-পূর্ব উপকূলের ক্যাম্পে বোমা বর্ষণের কারণে বিয়েতে বাধ্য হয়।

অনুক এখন তার তৃতীয় উপন্যাস লিখছেন, এর কাহিনি গড়ে উঠেছে মা ও তার মেয়ের তামিল ডায়াসপোরা নিয়ে, যার কিছুটা নিউইয়র্কে ও কিছুটা টরেন্টোতে।

২০২১ বুকার প্রাইজ-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া বাকি ৫টি বই হলো : দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক ড্যামন গালগুটের ‘দ্য প্রমিজ’; যুক্তরাষ্ট্রে প্যাট্রিসিয়া লকউডের ‘নো ওয়ান ইজ টকিং অ্যাবাউট দিস’; সোমালিয়ান/যুক্তরাজ্যের নাদিফা মোহাম্মাদের ‘দ্য ফরচুন মেন’; যুক্তরাষ্ট্রের রিচার্ড পাওয়ার্সের ‘বিউইলপডারমেন্ট’ এবং ম্যাগি শিপস্টেডের ‘গ্রেড সার্কেল’ উপন্যাসটি।

আগামী ৩ নভেম্বর ‘২০২১ বুকার প্রাইজ’-এর বিজয়ীর নাম প্রকাশ করা হবে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

সেন্ট লুইস লিটারারি অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন অরুন্ধতী রায়

সেন্ট লুইস লিটারারি অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন অরুন্ধতী রায়

দোলা যে রাতে সেলিমের ফ্লাটে যায়

দোলা যে রাতে সেলিমের ফ্লাটে যায়

জব্দ করো নোবেল

জব্দ করো নোবেল

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—পাঁচসাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

কে পাচ্ছেন সাহিত্যে নোবেল?

কে পাচ্ছেন সাহিত্যে নোবেল?

সর্বশেষ

৫ গোলের ম্যাচে বেলজিয়ামকে হারিয়ে ফ্রান্স ফাইনালে

৫ গোলের ম্যাচে বেলজিয়ামকে হারিয়ে ফ্রান্স ফাইনালে

আফগানিস্তানে বিক্রি হচ্ছে অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্র

আফগানিস্তানে বিক্রি হচ্ছে অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্র

ফাইনালে খেলার আশা ছাড়ছেন না বাংলাদেশ কোচ

ফাইনালে খেলার আশা ছাড়ছেন না বাংলাদেশ কোচ

শিগগিরই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার ঘোষণা তালেবানের

শিগগিরই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার ঘোষণা তালেবানের

মধ্যরাতে ভূমিকম্পে কেঁপে উঠলো দেশ

মধ্যরাতে ভূমিকম্পে কেঁপে উঠলো দেশ

© 2021 Bangla Tribune