X
মঙ্গলবার, ২২ জুন ২০২১, ৮ আষাঢ় ১৪২৮

সেকশনস

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই : মামুনুর রশীদ

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২১, ০০:৫০

মামুনুর রশীদ। বাংলাদেশের নাট্যচর্চার এক কিংবদন্তি নাম। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে অদ্যাবদি বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনে যে কজন মানুষ নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের অন্যতম তিনি। অংশগ্রহণ করেছেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। তিনি একাধারে নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা ও সংগঠক। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর উপলক্ষ্যে নানা প্রসঙ্গ নিয়ে এই বরেণ্যজনের সাথে। 

 

অপু মেহেদী : মহান মুক্তিযুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে শুভেচ্ছা। আপনি তো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন।
মামুনুর রশীদ : আমার বাড়ি টাঙ্গাইলে। লতিফ সিদ্দিকীর সাথে আগে পরিচয় ছিল। শুনতাম তাঁর এক ভাই আর্মিতে আছে। পরে চলে এসে রাজনীতিতে জড়িত হয়। আমরা দেখতাম যে, সে একটা ছোট বন্দুক নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। পরে পাশের গ্রামের কুম্ভকাররা এসে আমাদেরকে অস্ত্রের সন্ধান দিলো। আমরা অস্ত্রগুলো এনে কাদের সিদ্দিকীকে দিলাম, ওর সাথে কিছুদিন ছিলামও। কালিহাতিতে একটা যুদ্ধ হয়েছিল। সেই যুদ্ধের পর আমাদের আর্মিরা কিছু অস্ত্র ফেলে যায়। ওই অস্ত্রগুলো পালরা ওদের পুনে ঢুকিয়ে মাটি দিয়ে লেপে দিয়েছিল। তখন আমাকে এসে খবর দিলো যে,—এই এই অবস্থা, এখন আমরা কি করি? কাদের সিদ্দিকীকে খবর দিলাম। গ্রামবাসীদের নিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করে তাঁকে দিলাম। দুয়েকটা অপারেশনেও ছিলাম। পরে অবশ্য ওই গ্রামেও থাকতে পারিনি। কারণ, কাদের সিদ্দিকীর যুদ্ধকৌশলের সঙ্গে আমার মিল ছিল না। পরে আগরতলা হয়ে কলকাতায় চলে যাই এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেই। সেখানে গিয়ে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার, সৈয়দ হাসান ইমাম, আশরাফুল আলম, শহীদুল ইসলাম, মুস্তাফা আনোয়ার, আবদুল্লাহ আল ফারুক, আবদুল জব্বার, জামিল চৌধুরী, বাদল রহমানসহ অনেককেই পেলাম। মুস্তাফা মনোয়ার বললেন—চলো নাটক করি। বললাম—চলেন করি। তো নাটক লেখা হলো। সেই নাটকে একটা পাকিস্তানি জেনারেলের চরিত্র ছিল, বললেন—এটা কে কবে? তো একদিন ট্রামে যাচ্ছি, দেখি উল্টোদিক থেকে আলী যাকের আসছে। তখন আমি এসে বললাম যে রোলটা আলী যাকেরকে দিয়ে করান। কলকাতায় উদয়ন ছাত্রাবাসে নরেন বিশ্বাস, আহমদ ছফা আর আমি থাকতাম। নরেন দাই আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন সেখানে। দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশে চলে আসি।


অপু মেহেদী : একটা আদর্শ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। দেশ কি সেই আদর্শের দিকে গেল? পঞ্চাশ বছর পর এসে কী মনে হয়?
মামুনুর রশীদ : না, দেশ সেই আদর্শের দিকে যায়নি। যে মৌল আদর্শগুলো নিয়ে আমরা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলাম, সেটার মধ্যে একটা ছিল ধর্ম নিরপেক্ষতা। এটা ঘটলই না। সমাজতন্ত্র ছিল, সেটাও গেল। গণতন্ত্র ছিল আমাদের প্রত্যাশা। অথচ, পনেরোটি বছর থাকলাম আমরা মিলিটারির শাসনে। পঁচাত্তরের বর্বর হত্যাকাণ্ডের পর থেকে আমরা বারবার মিলিটারির বুটের তলায় থাকলাম। এই দেশের যারা আদিবাসী আছে, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো না। এ বিষয়গুলো খুবই দুঃখজনক, বেদনাদায়ক। এ দেশে যা কিছু হয়েছে, সবকিছু হয়েছে ব্যক্তি উদ্যোগে। যেমন গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি এত বড় হয়েছে কিন্তু ব্যক্তি উদ্যোগেই। আমরা নাটক করেছি ব্যক্তি উদ্যোগেই। আজকে হয়তো কিছুটা পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে কিন্তু আমরা একটা সংগ্রামের মধ্য দিয়েই থিয়েটার করেছি। বাঙালি জাতিটার সমস্যা আছে। ১৯৭১ সালের যে বাঙালি জাতি, সেই জাতি খুব বীর জাতি। কিন্তু ক্রমান্বয়ে দলাদলিতে, নিজেদের মধ্যে হানাহানিতে, পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে লেগে থাকায়, সঠিক কাজ না করে অকাজে জড়িয়ে থাকা—এসব ব্যাপারে পিছিয়ে গেছে এই জাতি। একটা ঝোঁক আমাদের এখানে তৈরি হয়েছে যে, রাষ্ট্রকে ধর্মরাষ্ট্র করা, এটাকে তো রুখতে হবে। যদি আমরা অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের যে সংস্কৃতি থাকা দরকার, সেই সংস্কৃতির দিকে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। তাহলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভালো হবে। বাঙালিদের মধ্যে জয় করার টেন্ডেন্সি আছে কিন্তু। এটাকে কাজে লাগতে হবে।


অপু মেহেদী : দেশ স্বাধীনের পরপরই ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘আরণ্যক নাট্যদল’।
মামুনুর রশীদ : কলকাতায় নিয়মিত নাট্যচর্চা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ এ ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ মঞ্চস্থ করলাম। আমি অভিনয়ও করেছিলাম ‘কবর’ নাটকে। তখন বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক নাট্যচর্চা শুরু হয়েছে। ‘পশ্চিমে সিঁড়ি’ করলাম ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর, রেসকোর্সের বিজয় দিবসের মঞ্চে। ১৯৭২ সালে আমরা বেশকিছু নাট্য অভিযাত্রা করেছিলাম, সেসময় তা ছিল বেশ দুঃসাহসিক। কিন্তু ১৯৭৩ সালে থেকে নানা কারণে ভাটা পড়ে। এরপর ১৯৭৬ সালে ‘ওরা কদম আলী’ দিয়ে আবার মঞ্চে জায়গা তৈরি হলো। তারপর থেকে কখনো মঞ্চ থেকে বিচ্যুত হইনি।


অপু মেহেদী : গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন আন্দোলনে আপনার অনন্য ভূমিকা, সে বিষয়ে বলুন।
মামুনুর রশীদ : ১৯৮১ সালে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন গঠিত হলো, আমি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। প্রথম প্রেসিডেন্ট রামেন্দু মজুমদার, আমি সবচেয়ে সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি চার বছর ছিলেন, তারপর আমি প্রেসিডেন্ট হলাম। সেবার এক টার্ম ছিলাম, ২০০৫ সালে আবার প্রেসিডেন্ট হয়েছি। এটি সারা দেশের নাট্যকর্মীদের প্ল্যাটফর্ম। প্রতিটি দল থেকে একজন সদস্য নিয়ে ফেডারেশন গঠিত হয়েছে। আমরা অনেক কাজ করতে পেরেছি। নাটকের ওপর সেন্সরশিপ ছিল, আন্দোলন করে ২০০১ সালে সেটি ওঠাতে পেরেছি। এই যে শিল্পকলা একাডেমির ভবন হয়েছে, এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগ চালু হয়েছে—এসব আমাদের আন্দোলনের ফসল।


অপু মেহেদী : বিশ্ববিদ্যালয়ে এই নাট্যকলা বিভাগগুলো কতখানি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে?
মামুনুর রশীদ : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে শুরু হয়েছিল প্রাতিষ্ঠানিক নাট্যচর্চা। বিভাগটি আবার চালু হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক বিভাগ চালু আছে। কিন্তু কোথায় যেন প্র্যাকটিশনাদের সাথে যোগসূত্র গড়ে উঠছে না। আমি বহু আগে ইন্টারনিশিপ চালু করার কথা বলেছিলাম। সেটাও কেন যেন চালু হলো না। থিয়েটারের কাজটাও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। কোর্সগুলো এমনভাবে সাজানো দরকার যাতে গ্রাজুয়েটরা বের হয়ে যেন নানা ধরনের কাজে যুক্ত হতে পারে।


অপু মেহেদী : বাংলাদেশে রেপার্টরি থিয়েটার চর্চা শুরু করলেন আপনি ‘বাঙলা থিয়েটার’ দিয়ে। শুরুতে নিয়মিত প্রযোজনা করলেও এখন অনিয়মিত। যে ভাবনা নিয়ে শুরু করলেন পরে কি ধরনের সংকটের কারণে নিয়মিত করতে পারলেন না?
মামুনুর রশীদ : ঢাকা শহরে ১০-১২টার বেশি রেপার্টরি রয়েছে। কিন্তু আমি যে সময় শুরু করেছিলাম তখন আমার গলা টিপে ধরা অবস্থা। কিন্তু সেপথে এখন অনেকেই হাঁটছে। আগামী ৫-৭ বছররে মধ্যে রেপার্টরি ও গ্রুপ থিয়েটার প্যারালাল জায়গায় থাকবে। রেপার্টরি ভালো গল্প নিয়ে প্রযোজনা মঞ্চে আনে। আর গ্রুপ থিয়েটারের তো নানা প্রসেস থাকে। দলের সিনিয়রদের ভালো একটা চরিত্র দিতে হবে, মাথায় কিছু না থাকলেও তাদের নেতৃত্বে রাখতে হবে। কিন্তু রেপার্টরিতে ভালো নাটক করার জন্য প্রসেসটা একটু সহজ।


অপু মেহেদী : বাংলাদেশের নাট্য আন্দোলনের ইতিহাসে মুক্তনাটক আন্দোলন একটা মাইলফলক। আপনার জীবনে এবং আরণ্যকের একটি শক্ত জায়গা হয়ে উঠেছিল মুক্তনাটক। কিন্তু একটা সময় এসে সেটা বন্ধ করে দিলেন বা বন্ধ হয়ে গেল। কেন
মামুনুর রশীদ : এনজিওরা মুক্তনাটককে পপুলার থিয়েটার নাম দিয়ে করা শুরু করেছিল। তাদের সঙ্গে তখন অর্থেবিত্তে পেরে উঠিনি। এমনকি আমার অনেক ভালো ভালো কর্মীদের প্রচুর ভালো বেতন দিয়ে নিয়ে যায়। অনেক মেধাবী ছেলেকে প্রচুর টাকা দিয়ে নিয়ে গিয়েছে। তবে মুক্তনাটক থেকে আমাদের প্রাপ্তি অনেক। শত শত গ্রামে আমরা মুক্তনাটক করেছি। অনেক মানুষের সঙ্গে মিশতে পেরেছি, তাদের কাছ থেকে সত্যকে জেনেছি। এটা একটা বড় ব্যাপার। ইতিহাসের একটা পর্যায়ে আমার কাজটা করতে পেরেছি এটা একটা জীবন্ত ব্যাপার। তবে মুক্তনাটক এখনো শেষ হয় নাই। অনেক জায়গায় এর চর্চা হচ্ছে। আবার যদি তারা দলবদ্ধ হয়ে কাজ শুরু করে, আমরা থাকব।


অপু মেহেদী : মুক্তনাটককে নতুন আঙ্গিক হিসেবে বেছে নেবার ক্ষেত্রে আপনার অনুপ্রেরণা কি ছিল?
মামুনুর রশীদ : চীনে মাও-সে তুঙ-এর লংমার্চের সময় সঙ্গে সঙ্গে থাকতে। একটি করে সাংস্কৃতিক দল। এরা প্রতিদিনের প্রতিটি উল্লেখযোগ্য ঘটনাকে নাটকের আঙ্গিকে তুলে ধরত। তাদেরই ভাষায় এবং তাদেরই অভিনয়ের মাধ্যমে। এ থেকে মুক্তনাটকের কনসেপ্ট আমার মাথায় আসে। পরবর্তীতে মানিকগঞ্জে গিয়ে মাটিকাটার শ্রমিকদের নিয়ে, তাদেরই একটি বাস্তব ঘটনাকে অবলম্বন করে তাদেরকে দিয়ে, এ ধরনের একটি পরীক্ষা চালাই। বলাবাহুল্য, নয়া আঙ্গিকের এ নাটক অধিকতর জীবন ও সমস্যা ঘনিষ্ঠ হবার কারণে বিপুল নিরক্ষর মানুষের মধ্যে সাড়া জাগায়। এগুলো অবশ্যই অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। আর একটি তাগিদ ছিল। আমাদের জাতীয় ইতিহাস নেই; অন্তত লিখিত। যেটুকু রয়েছে তা রাজা-উজিরের সিংহাসন কাহিনিতে সীমাবদ্ধ। টুকরো টুকরো বিদ্রোহ, আন্দোলন, বিশাল জনগোষ্ঠীর শোষকের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রামের বহু খণ্ড খণ্ড ঘটনা বেঁচে আছে মুখে মুখে। একে বলা যেতে পারে আমাদের কথা ঐতিহ্য। যথা ঐ তথ্যগুলোতেও আমি মুক্তনাটকের উপাদান প্রত্যক্ষ করি। একটু সচেতনতা গ্রহণ করলে মুখে মুখে বেঁচে থাকা এ গল্পগুলো থেকে গ্রামজীবনের তীব্র সংগ্রামের ইতিহাসটুকু ছেঁকে আনা সম্ভব। এরকম সম্ভাবনাও আমার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।


অপু মেহেদী : মুক্তনাটক আন্দোলনের পরীক্ষা চালাতে গিয়ে, গ্রাম পর্যায়ে আপনি কি ধরনের বাধার সম্মুখীন হয়েছেন?
মামুনুর রশীদ : প্রধান অসুবিধা ছিল সত্যিকার ঘটনাটিকে আবিষ্কার করা; অর্থাৎ কোন ঘটনার মূল সত্যটি কি তাকে আবিষ্কার করা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নাটক করার, নাটককে উৎসাহিত করার জন্যে আমাদের কাছে এগিয়ে এসেছেন গ্রামপ্রধানরা। তাদের বর্ণিত ঘটনাটি অবশ্যই তাদের স্বপক্ষে; ভিন্ন করে বললে শোষক শ্রেণির পক্ষে। কিন্তু, সত্যিকারভাবে কখনোই তা নয়। সুতরাং, মূল সত্যটির জন্য যেতে হয়েছে গ্রামসমাজের গভীরে; ব্যাপক সে অংশটি নিঃশেষিত তাদের কাছে। আর এখানেই এসেছে বাধা। কোনো কোনো গ্রামে আমাদের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। তবে সেসব ক্ষেত্রে সচেতন মানুষ হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধও গড়ে তুলেছে। এসব অসুবিধা ছাড়াও অধিকাংশ মানুষই নিরক্ষর থাকার কারণে অন্যান্য একাধিক বাধা তো ছিলই।


অপু মেহেদী : টেলিভিশনের শুরু থেকে আপনি নাটক লিখছেন, সে অভিজ্ঞতা জানাবেন?
মামুনুর রশীদ : ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পিটিভি (বর্তমানে বাংলাদেশ টেলিভিশন বা বিটিভি) এলো, ৬৫ সালে আমি সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র। মনে মনে স্বপ্ন দেখতাম, যদি বিটিভিতে নাটক লিখতে পারতাম। ১৯৬৬-৬৭ সালে বিটিভিতে ঘোরাঘুরি শুরু করলাম। ১৯৬৭ সালে আবদুল্লাহ আল মামুনের পেছনে ঘুরি। তিনি সুযোগ দেন না। শেষে আবদুল্লাহ ইউছুফ ইমাম—টিভির প্রযোজক, ফিল্মেও কাজ করেছেন—তিনি বললেন, নাটক লেখো। তাঁর থেকেই আমার শুরু। যে নাটকটি লিখে দিলাম, তাঁর পছন্দ হলো না। বাসায় ডাকলেন। কিভাবে স্ক্রিপ্ট লিখতে হয় শেখালেন। তারপর লিখলাম নাটক ‘চেনা মুখ’। ‘চেনা মুখ’ দেখে অন্য প্রযোজকরাও আকৃষ্ট হলেন। তারপর তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি হয়ে চলে গেলেন। তখন আবদুল্লাহ আল মামুন আমাকে ডাকলেন। তারপর শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সংশপ্তক’ নাট্যরূপ দিলাম, এটি ১৯৬৯ সাল, আমার বয়স তখন একুশ। নাটকটি বেশ আলোচিত হয়েছিল


অপু মেহেদী : সার্বিকভাবে আমাদের টেলিভিশন নাটকের অবস্থা এখন কেমন?
মামুনুর রশীদ : সব চ্যানেলেই চায় হাসির নাটক প্রচার করতে। তার মানে মজার নাটক। এই মজা খুঁজতে গিয়ে আমাদের সমস্যা বাড়ছে। আমরা একটি নাটক করব নাটকে কি দেখতে চাই ভালো গল্প, ভালো ফটোগ্রাফি, ভালো মিউজিক এই তো চাওয়া। মিউজিক আজকাল হয় না। একটা সময় সারা রাত জেগে নাটকের মিউজিক করতাম মিউজিক ডিরেক্টরের সঙ্গে বসে। এখন নাটকের এডিটরই এখান ওখান থেকে ধারকর্জ করে নাটকে মিউজিক জুড়ে দেয়। মিউজিক ডিরেক্টরের কোনো প্রয়োজন হয় না। তাই সমস্ত জায়গায় একটা হুড়াহুড়ি। এর মধ্যে কি ভালো কোনো কাজ হয়? ঐতিহ্যগতভাবে জাপান থেকে বহু দেশ পর্যন্ত ধীরে ধীরে সৃজনশীল কাজ করা এবং কথা বলার একটা অভ্যাস গড়ে উঠেছে। কোনো হুড়াহুড়ি ছিল না কখনো। কিন্তু এই হুড়াহুড়িটা কি করে যে আমদানি হয়ে গেল বিশ্বায়নের বদৌলতে বুঝতে পারলাম না এবং হঠাৎ করে আমরা ওয়েস্টার্ন হয়ে গেলাম। সামনের বাসায় কি হচ্ছে আমরা জানি না, খবরও রাখি না। এপার্টমেন্ট কালচার শুরু হওয়ার পর দুচোখ মেলে মানুষ দেখতে পাই না আমরা। আগে একটা ভাঙা বাড়িতে থাকতাম, সেখানে কত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হতো। এখন তো মানুষই দেখি না। এখন শত সিকিউরিটির মধ্যে হাজারও সমস্যা। টেলিভিশন মিডিয়ায় যারা কাজ করে তারা তো মহা ব্যস্ত। সারা দিন, রাতে অবসর নেই। একেক জন তিন-চারটি সিরিয়ালের কাজ করেন প্রতিদিন। এই ব্যস্ত শিল্পীদের মাস হয় চল্লিশ দিনে।


অপু মেহেদী : মঞ্চনাটক, টেলিভিশন নাটকের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও আপনি অভিনয় করেছেন। চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা কেমন
মামুনুর রশীদ : চলচ্চিত্রের একটা সময় স্বর্ণযুগ ছিল। তখন হিন্দি, উর্দু, কলকাতার বাংলা ছবি আসত। তার মধ্যে থেকে একজন জহির রায়হান, ফতেহ লোহানী, মহিউদ্দিন ভাইয়ের জন্ম। তারপর নারায়ণ ঘোষ মিতা, খান আতাউর রহমান এলেন। খান আতার নবাব সিরাজউদ্দৌলা তো ওই সময় পশ্চিম পাকিস্তান, পূর্ব পাকিস্তান ও ভারতে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। শধু এই ধরনের সৃজনশীল শিক্ষিত পরিচালকেরই জন্ম হয়নি একের পর এক অভিনেতা তৈরি হয়েছে। টেকনিশিয়ান তৈরি হয়েছে। বেবী ইসলাম, আব্দুস সামাদ, সাধন রায়, অরুণ রায়, আব্দুল লতিফ বাচ্চু। এই ধরনের গুণী ক্যামেমরাম্যান চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করেছে। বশির ভাই ও এনামুল হক নামে চলচ্চিত্রের নামকরা এডিটর ছিলেন। তাঁরা অসাধারণ কাজ করেছেন। এই সব অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানদের কারণে আমরা জীবন থেকে নেয়া কাঁদের দেয়াল, কখনো আসিনির মতো অসংখ্য কালজয়ী ছবি পেয়েছি। আশির দশকে এসে চলচ্চিত্রের অধঃপতন শুরু হয়। নকল গল্পের ছবি, কাটপিস, অশ্লীলতা এখন যৌথ প্রোযজনার নামে বিদেশি ছবি আমদানি হচ্ছে। জানি না চলচ্চিত্রের আগামী ভবিষ্যৎ কী?


অপু মেহেদী : সিনেমা হল বন্ধ হচ্ছে। দর্শকও কমে যাচ্ছে।
মামুনুর রশীদ : আমাদের সময় প্রেমের শুরুটা হতো সিনেমা হলে। দুজনে হলে বসে সিনেমা দেখার মধ্য দিয়ে। এই যে একটা রোম্যান্টিক রিলেশনের জায়গা ছিল এখন আর সেই সংস্কৃতিটা নেই, আমরা হারিয়ে ফেলেছি। চলচ্চিত্রের অধঃপতনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সবাই মিলে সপ্তহে অন্তত একদিন সিনেমা দেখে আনন্দ করার উপলক্ষ্য হারিয়ে ফেলেছি আমরা। এর বহুবিধ কারণ আছে। যেমন এখন অনেকগুলো স্ক্রিন সিনেপ্লেক্সের স্ক্রিন, টিভি স্ক্রিন, ইউটিউব স্ক্রিন এবং মোবাইল স্ক্রিন। এত স্ক্রিনের ভিড়ে সিনেমা স্ক্রিন প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।


অপু মেহেদী : অনেক ধন্যবাদ আপনাকে
মামুনুর রশীদ : ধন্যবাদ।

/জেডএস/

সর্বশেষ

ঘু‌রে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ব্রিটে‌নের বাংলা‌দেশিরা

ঘু‌রে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ব্রিটে‌নের বাংলা‌দেশিরা

৬ মিনিটের ঝলকে গ্রুপ সেরা বেলজিয়াম

৬ মিনিটের ঝলকে গ্রুপ সেরা বেলজিয়াম

প্রথমবারের মতো আমিরাত সফরে যাচ্ছেন ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রথমবারের মতো আমিরাত সফরে যাচ্ছেন ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী

আজ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে রাজধানী

আজ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে রাজধানী

বাংলাদেশের ফেসবুক লাইভে যুক্ত হচ্ছেন নোম চমস্কি

বাংলাদেশের ফেসবুক লাইভে যুক্ত হচ্ছেন নোম চমস্কি

দুবাইয়ের সেই রাজকন্যাকে স্পেনে দেখা গেছে

দুবাইয়ের সেই রাজকন্যাকে স্পেনে দেখা গেছে

পিরোজপুরে ১৮ ইউপিতে নৌকা, ১১টিতে স্বতন্ত্র জয়ী

পিরোজপুরে ১৮ ইউপিতে নৌকা, ১১টিতে স্বতন্ত্র জয়ী

জ্যামিতি বক্সে ইয়াবা বহন করতেন বাবা-ছেলে

জ্যামিতি বক্সে ইয়াবা বহন করতেন বাবা-ছেলে

‘আমরা ১০-১১ গোল খেতাম, এখন ৫-৬টা খাই’

‘আমরা ১০-১১ গোল খেতাম, এখন ৫-৬টা খাই’

চাঁদপুর-ঢাকা-নারায়ণগঞ্জেও লঞ্চ বন্ধ ঘোষণা

চাঁদপুর-ঢাকা-নারায়ণগঞ্জেও লঞ্চ বন্ধ ঘোষণা

কাতালোনিয়ার স্বাধীনতাপন্থীদের ক্ষমা করে দেবে স্পেন

কাতালোনিয়ার স্বাধীনতাপন্থীদের ক্ষমা করে দেবে স্পেন

মাঠ থেকে সরানো হবে পিলার, জবি প্রশাসনকে ডিএসসিসির আশ্বাস

মাঠ থেকে সরানো হবে পিলার, জবি প্রশাসনকে ডিএসসিসির আশ্বাস

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

আমার গুণ
আমার প্রিয়-অপ্রিয়

আমার প্রিয়-অপ্রিয়

প্রেমের কবি

প্রেমের কবি

আমার চেতনার কবি

আমার চেতনার কবি

সুফিয়া কামালের কবিতা

সুফিয়া কামালের কবিতা

অশ্রুবিন্দুর মতো স্পষ্ট ও নিঃসঙ্গ

পাখিদের নির্মিত সাঁকোঅশ্রুবিন্দুর মতো স্পষ্ট ও নিঃসঙ্গ

দেখা না দেখার বায়োস্কোপ

দেখা না দেখার বায়োস্কোপ

‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ ও হাসান হাফিজুর রহমান

‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ ও হাসান হাফিজুর রহমান

ঈশ্বর ভাবনার ‘বিগ্রহ ও নিরাকার’

ঈশ্বর ভাবনার ‘বিগ্রহ ও নিরাকার’

মলিন জগতের প্রাণ

মলিন জগতের প্রাণ

© 2021 Bangla Tribune