X
মঙ্গলবার, ১৮ মে ২০২১, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

সেকশনস

স্মৃতিতে বোশেখী মেলা

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১২:৩৪

বৈশাখ মানেই পুরাতনের বিদায়। বৈশাখ মানেই নতুন বছর। বৈশাখ মানেই মেলা দেখা। আমার জন্ম হয়েছে গ্রামে, মাদারীপুর জেলার রাজৈর থানার কদমবাড়ী গ্রামে। আমার মামাবাড়ি ওটি। নিজের বাড়িও একই জেলার সদর থানার বাহাদুরপুর গ্রামে। গ্রামে তখন রাস্তা নেই, বিদ্যুৎ নেই, বাজার নেই। কেনাকাটার জন্য টেকেরহাট বন্দর কিংবা মাদারীপুর শহর। আর দূরের হাট সাপ্তাহিক হাট। এসব হাটে সাংসারিক পণ্য পাওয়া যায়, শৌখিন পণ্য তো মেলা ছাড়া পাওয়া যায় না। আমরা তাই অপেক্ষা করতাম মেলার। বিশেষত বৈশাখী মেলার জন্য ছিল আমাদের উদগ্র অপেক্ষা।

গ্রামে মেলা তো অনেক উপলক্ষ্যেই হয়। গণেশ পাগলের মেলা, রথের মেলা, মনসাপূজা, বিশ্বকর্মাপূজা, দুর্গাপূজা, কালিপূজা, লক্ষ্মীপূজা, মাঘিপূর্ণিমা, চড়কপূজা, নীলপূজার মেলা ছাড়াও বেশ কিছু উপলক্ষ্যে মেলা বসত আমাদের এলাকায়। বর্ষাকালের মেলা বসত নৌকায়। তাই আমার কাছে প্রিয় ছিল বৈশাখী মেলা। প্রখর রোদের তেজ পড়ে এলে বিকেল থেকে সন্ধে পর্যন্ত মেলা। মেলায় বড় আকর্ষণ ছিল বেত-বাঁশ-মাটির তৈরি জিনিসপত্র। গৃহস্থালির জিনিস কেনার জন্য বড়রা মেলায় যায়। হরেক পসরা থাকে মেলা জুড়ে। কিন্তু ছোটদের নজর থাকে নাগরদোলায় চড়া, মিষ্টিমণ্ডা খাওয়া, নতুন বাঁশিতে ফুঁ দিতে দিতে বাড়ি ফেরা।

কদমবাড়ি এলাকায় গোটা বৈশাখ মাস জুড়ে ছিল মেলা। আজ এপাড়ায়, তো কাল ওপাড়ায়, পরশু ওই গ্রামে তো তরশু সেই গ্রামে। স্কুলের মাঠ, কিংবা উন্মুখ খিলভূমি, কিংবা রাস্তার পাশে খোলা জায়গাতেই শুরু হতো মেলা। প্রতিবছর একই স্থানে মেলা বসবে, এমন কোনো কথা নেই। মেলার স্থান বদলে যেত। এক মেলায় ঢেরা পিটিয়ে ঘোষণা দিলেই হতো, ‘ভাইসব, আগামী ১৪ই বৈশাখ মেলা হবে বইন্যাভিটায়’। আমরা ওই ঘোষণা শুনেই চলে যেতাম বইন্যাভিটার মেলায়। গ্রামের বুনো গাছ, মানে বইন্যাগাছ আছে এমন এক ভিটা আছে, মেলা হবে সেখানেই। গিয়ে দেখি এক-দুইশ অস্থায়ী দোকান। কিছু দোকান তো ভ্রাম্যমাণ। চানাচুর, খিলিপান, সন্দেশ-চমচম, ফিতা-পুতির মালার দোকান থাকলেই তো চলে। আলতা-পাউডার তো পাওয়া যাবেই। বোশেখী মেলায় দেখতাম পুরুষেরা মেয়েদের পেছনে ঘুরত। খিলিপান কিনে দিতে চাইত। পান গ্রহণ করা মানেই হলো ভালোবাসায় সম্মতি দেওয়া। উল্টোও হতে পারত। ওই রামকানাই দাশের গান- ‘একখান পান চাইলাম, পান দিলা না, তোমার সনে কীসের পিরিতি’। পান দেওয়া মানে পিরিতির প্র্রস্তাব পাঠানো। আহা সেই গ্রাম্য সরলতা এখন আর নেই।

বোশেখী মেলায় মাটির পাতিল, থালা-বাসন পাওয়া যেত। মায়েরা তা কিনতে আসতেন। পাওয়া যেত মাটির টেপাপুতুল, মাটির বাঁশি, বাঁশের বাঁশি। বোশেখী মেলার তালপাতার বাঁশি দেখেই তো বাবু গুহঠাকুরতা লিখেছিলেন, ‘আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি/বাঁশি কই আগের মতো বাজে না/মন আমার তেমন যেন সাজে না/তবে কি ছেলেবেলা অনেক দূরে ফেলে এসেছি।’ সে-সময় আমি তো কেবল উচ্চবিদ্যালয়ে ঢুকেছি। সেই ১৯৭৮ সালেই এই গানে সুর দিলেন মৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায় আর প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে তা ছড়িয়ে পড়ল। আমাদের মতো স্কুলবালকদের কানেও সেই গান আলোড়ন তুলেছিল। এখনো বোশেখী মেলার কথা মনে হলেই ওই গান কানে বেজে ওঠে।

চৈত্রমাসের শেষের দিকেই মন টানত বোশেখী মেলার জন্য। চৈত্রসংক্রান্তির আর পয়লা বোশেখ তো একাকার। চৈত্রসংক্রান্তিতে চড়ক পূজা, তারপর পিঠে আর হাঁটুতে বড়শি গেঁথে চড়কগাছের সঙ্গে শূন্যে ঘোরা। যারা না দেখেছেন, তারা বিশ্বাস করতে পারবেন না। ওরকম চড়কগাছে কেবল বুকে গামছা বেঁধেই তো ঘোরার সাহস হবে না, সেখানে গামছা বাঁধা হচ্ছে বড়শিতে, আর বড়শি গাঁথা হচ্ছে কড়া পিঠে, কড়া হাঁটুতে। যাঁরা এইরকম সাহসী ভূমিকায় থাকতেন, তাঁদের পুণ্যবান মনে করে গ্রামের সকলে শ্রদ্ধা জানাত। আগের দিন তাঁরা জিভে বিশাল বড়শি ফুঁড়ে গ্রামের বাড়িবাড়ি ঘুরত। গ্রামের মায়েরা তাঁদের ধান-চাল-টাকা দিত উপহার হিসেবে। এঁরা একধরনের শক্তির উপাসক ছিলেন। এখন তাঁদের দেখা আর পাওয়া যায়। তবু চৈত্রসংক্রান্তি কিংবা বোশেখের মেলার কথা মনে পড়লেই চড়কের কথা আর বড়শি গেঁথে শূন্যে ঘোরার কথা মনে আসে। আমি ফিরে যাই সেই দিনগুলোতে। আমাদের গ্রামে বাহাদুরপুরে ওই চড়কপূজা হতো। চড়কের গাছ আবার রাখা হতো দিঘিতে ডুবিয়ে। বছরে একবার ওই গাছ দিঘি থেকে উঠিয়ে মাঠে পুঁতে রাখা হতো। ওই চড়কগাছের চারদিক দিয়েই হরেক পসরা! আশপাশের গ্রাম থেকে হাজার হাজার মানুষ আসত চড়কঘূর্ণন দেখতে। এই দেখাতে একধরনের পুণ্য হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে। গ্রামের এই যে লোকজীবন, তা দেখে দেখেই বড় হয়েছি। আমার লোকসংস্কৃতির প্রতি আগ্রহের বীজ লুকানো রয়েছে ওই বোশেখী মেলাদর্শনের ভেতরে।

আমাদের গ্রাম বাহাদুরপুর, কমলাপুর, কদমবাড়ি, আড়ুয়াকান্দি ছাড়িয়ে গোপালগঞ্জের সাতপাড় কিংবা পাটিকেলবাড়িতেও ছুটে গিয়েছি মেলা দেখতে। কী এক অমোঘ আকর্ষণ ছিল, ভাবলে অবাক হই। মেলা মানে তো মানুষে-মানুষে মিলন, মনে-মনে মিলন। মিল থেকেই তো মেলা। বৈশাখী মেলায় গিয়ে আমি দেখা-অদেখা মানুষের মিলন দেখতে পাই। মানুষের মিলনের জন্যই মেলা। সেই মেলা রূপ নেয় বিকিকিনির, গ্রামীণ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতেও ওই মেলার ভূমিকা রয়েছে। গ্রামের কুমোর তো সারা বছর মাটির হাঁড়ি-পাতিল বানায় ওই একমাসে বিক্রি করবে বলে। একমাসের মেলার আয় থেকে সে সারা বছর বাঁচার স্বপ্ন দেখে। বৈশাখী মেলার স্মৃতি আমাকে খুবই কাতর করে। সেই কাতরতা থেকে লিখেছিলাম একটি গান—

বসন্ত যায়, তাই শোনা যায় নববর্ষের ডাক–
মুছে যায় সব, শুনি কলরব এসো এসো বৈশাখ॥

তুমি এলে বলে চারদিকে আজ ফুটেছে রোদের খেলা
পাড়ায় পাড়ায় জমেছে দারুণ কত বৈশাখী মেলা
নতুন খুশির উল্লাসে বাজে মন্দিরা-জয়ঢাক॥

বৈশাখ মাসে রোদেলা বাতাসে দিনভর ছোটাছুটি
নতুন বছরে নতুনের গানে তালে তালে নেচে উঠি
সকলেই খুশি, খুঁজে পেয়ে আজ নবজীবনের বাঁক॥

বৈশাখ মানে কালবৈশাখী- রুদ্র ভয়াল হানা
তাকে জয় করে বাঁচার মন্ত্র আমাদের আছে জানা
বৈশাখ জানে দুহাতে সরাতে দৈব দুর্বিপাক।

আমার ছড়া-কবিতা-গানে বোশেখী মেলার অভিজ্ঞতা নানাভাবে চলে আসে। বেশ কিছু ছড়ায় রয়েছে মেলা দেখার অভিজ্ঞতার বিবরণ। নাগরিক ব্যস্ততায় এখন আর মেলায় যাওয়ার সুযোগ পাই না আগের মতন। তবু আমার মন পড়ে থাকে সেই ছোট্টবেলার গ্রামের মেলায়। একদিনের যে ছোট্ট মেলা, তাকে বলা হয় ‘গলুইয়া’। গ্রাম্য মেলার আরেকটি নাম আছে ‘তেহার’। অঞ্চলভেদে আরো নাম হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু মেলার স্বাদে কোনো পরিবর্তন হবে না। আমার স্মৃতিতে ভাস্বর হয়ে আছে কদমবাড়ী গ্রামের বইন্যাভিটার মেলা। চোখ বুঁজলেই দেখতে পাই মেলা থেকে খিলিপান এনে দিদিমার হাতে দিলে তাঁর হাসিতে ভরে ওঠা মুখটা কী উজ্জ্বল হয়ে উঠত!


আরও পড়ুন:

আমাদের মঙ্গল শোভাযাত্রা

/জেডএস/

সর্বশেষ

স্বাস্থ্যের অতিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেছার এত ক্ষমতা!

স্বাস্থ্যের অতিরিক্ত সচিব কাজী জেবুন্নেছার এত ক্ষমতা!

রোজিনাকে হাসপাতালে নিতে চায় পুলিশ, পরিবারের না

রোজিনাকে হাসপাতালে নিতে চায় পুলিশ, পরিবারের না

অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের ভয় দেখানো হলো: বিএনপি

অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের ভয় দেখানো হলো: বিএনপি

রোজিনা ইসলামের মুক্তির দাবি এডিটরস গিল্ডের

রোজিনা ইসলামের মুক্তির দাবি এডিটরস গিল্ডের

মামলা নিয়ে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ যা বললো

মামলা নিয়ে প্রথম আলো কর্তৃপক্ষ যা বললো

সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের

সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের

যুগ্ম পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার পাঁচ কর্মকর্তার পদায়ন

যুগ্ম পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার পাঁচ কর্মকর্তার পদায়ন

রোজিনা ইসলামের মুক্তি দাবি আইন-সালিশ কেন্দ্রের

রোজিনা ইসলামের মুক্তি দাবি আইন-সালিশ কেন্দ্রের

গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ইসলামিক জিহাদ কমান্ডার নিহত

গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ইসলামিক জিহাদ কমান্ডার নিহত

এ কাজগুলো করলে মৃদু কোভিড হয়ে উঠবে সিরিয়াস!

এ কাজগুলো করলে মৃদু কোভিড হয়ে উঠবে সিরিয়াস!

কুষ্টিয়ার নেচে-গেয়ে কিশোরের লাশ দাফন, দেওয়া হয়নি জানাজাও

কুষ্টিয়ার নেচে-গেয়ে কিশোরের লাশ দাফন, দেওয়া হয়নি জানাজাও

রোজিনা ইসলামকে আটকের ঘটনায় জাতীয় পার্টির নিন্দা

রোজিনা ইসলামকে আটকের ঘটনায় জাতীয় পার্টির নিন্দা

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

বাংলা ট্রিবিউন ঈদসংখ্যা ২০২১

বাংলা ট্রিবিউন ঈদসংখ্যা ২০২১

নিজের স্বপ্নপুরুষের সঙ্গে কয়েক জন্মের তফাতে জুলেখার মিলন

নিজের স্বপ্নপুরুষের সঙ্গে কয়েক জন্মের তফাতে জুলেখার মিলন

অবিশ্বাস্য গল্প বলেছি বিশ্বাসযোগ্য ভঙ্গিতে : রাশিদা সুলতানা

অবিশ্বাস্য গল্প বলেছি বিশ্বাসযোগ্য ভঙ্গিতে : রাশিদা সুলতানা

নিঃসঙ্গ জীবনের গল্প

নিঃসঙ্গ জীবনের গল্প

লকডাউন
বাঁকা জলের খেলা

বাঁকা জলের খেলা

কারাগারে বঙ্গবন্ধুর ঈদ

কারাগারে বঙ্গবন্ধুর ঈদ

বড়সায়েব ঘোল খেলেন!

বড়সায়েব ঘোল খেলেন!

শহীদ কাদরীর সঙ্গে, মধ্যরাতের আলাপনে

শহীদ কাদরীর সঙ্গে, মধ্যরাতের আলাপনে

দাফন
© 2021 Bangla Tribune