X
বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন ২০২১, ১০ আষাঢ় ১৪২৮

সেকশনস

যম তো বাড়ি চিনলো!

আপডেট : ০৬ মে ২০২১, ১৫:১১
প্রভাষ আমিন অশুভ মোদি-অমিত জুটি মাত্র ১০ বছরেই অসাম্প্রদায়িক ভারতের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। ভারতের ৭৭ বছরের সব অর্জন ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। বরাবরই বিজেপি সাম্প্রদায়িক দল। তবে আগের বিজেপি আর মোদি-অমিতের বিজেপি এক নয়। ভারতকে তারা চড়িয়ে দিয়েছে সাম্প্রদায়িকতার উল্টোরথে। উগ্র সাম্প্রদায়িকতাকে পুঁজি করে একের পর রাজ্য দখলের খেলায় মেতেছিল বিজেপি। এবার তাদের টার্গেট ছিল পশ্চিমবঙ্গ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাঙালিয়ানার বিপক্ষে মোদি-অমিতের অস্ত্র ছিল বরাবরের মতই উগ্র সাম্প্রদায়িকতা। বাংলা দখলের ব্যাপারে বিজেপি কতটা মরিয়া ছিল, ছোট্ট একটা পরিসংখ্যানেই সেটা পরিষ্কার হবে- নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গ সফর করেছেন ১৫ বার, যা আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এসেছেন ৬২ বার। বলা যায় অমিত শাহ বাংলায়ই পড়ে ছিলেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী-নেতারাও দিনের পর দিন প্রচারণা চালিয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকার নানাভাবে মমতা সরকারকে বিব্রত করার চেষ্টা করেছে। বিজেপি তারকাদের দলে টেনে মাঠে নামিয়েছিল। তৃণমূলের নেতাদের ভাগিয়ে নিয়ে মনোনয়ন দিয়েছিল। এমনকি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে এসে নরেন্দ্র মোদি মতুয়া মন্দির পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। তার আসল লক্ষ্য ছিল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনে মতুয়াদের ভোট বিজেপির বাক্সে টানা। তাদের এবার টার্গেট ছিল বিধানসভায় ২০০ আসন, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা। কিন্তু কিছুতেই কাজ হয়নি। মমতার বাঙালিয়ানাই জয় পেয়েছে। টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেছে তৃণমূল, নন্দীগ্রামে নিজ আসনে একসময়ের ডানহাত শুভেন্দুর কাছে হারলেও মমতার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পথে তা বাধা হতে পারেনি।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের প্রবল আগ্রহ ছিল। তৃণমূলের জয় নিশ্চিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উচ্ছ্বাসের ঢেউ দেখে মনে হতে পারে বাংলাদেশেরই বুঝি জয় হয়েছে। এটা ঠিক বর্তমান বাংলাদেশ একসময় পূর্ববঙ্গ ছিল। বঙ্গভঙ্গের আগে পূর্ববঙ্গ আর পশ্চিমবঙ্গ মিলে বাংলা ছিল। তাই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন নিয়ে আমাদের আগ্রহের একটা নাড়ির টান আছে।  নিকটতম প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গে কে ক্ষমতায় থাকবে, তা বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অমিত শাহ যেভাবে ক্ষমতায় গেলে ‘বাংলাদেশ থেকে একটা পাখিও ঢুকতে দেবেন না’ বলে হুমকি দিয়েছেন, নাগরিকপঞ্জি কার্যকরের অঙ্গীকার করেছেন, কথায় কথায় বাংলাদেশ বিদ্বেষ ছড়িয়েছেন; তাতে বিজেপি নিয়ে উদ্বেগটা বাংলাদেশেও ছিল। তবে বাংলাদেশের উচ্ছ্বাসটা যতটা মমতার জয়ে, তারচেয়ে বেশি বিজেপির পরাজয়ে। কারণ তিস্তা ইস্যুতে অনেক আগে থেকেই মমতা বাংলাদেশে ভিলেন। তবুও তাকে মানুষ স্বাগত জানাচ্ছে, আসলে তার নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িকতা ঠেকানো গেছে বলে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ফলাফল তাই শুভ চিন্তার মানুষদের মধ্যে একধরনের স্বস্তি নিয়ে এসেছে।

কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি বিজেপির পরাজয়ে অত উচ্ছ্বসিত নই। আপাত স্বস্তির আড়ালেই আমি দেখতে পাচ্ছি ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িকতার কালো মেঘ। বিজেপি তাদের এই আপাত পরাজয়কে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে জানি  না। এরই মধ্যে পাল্টাপাল্টি দায় চাপানোর খেলা শুরু হয়েছে। দায় প্রাথমিকভাবে রাজ্য নেতাদেরই নিতে হবে। কিন্তু রাজ্য নেতারা বলছেন, এবারের পুরো নির্বাচন করেছে কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় নেতারা, বাংলা সম্পর্কে যাদের কোনও ধারণাই নেই, তারা নির্বাচন পরিচালনা করেছেন। তবে আমি বিজেপির পরাজয়কে ‘পরাজয়’ হিসেবে দেখতে রাজি নই। ১০ বছর আগে যাদের আসন ছিল শূন্য, পাঁচ বছর আগে যাদের আসন ছিল তিন। এবার তাদের আসন হলো ৭৬। আমি তো বিজেপির পরাজয় নয়, বিশাল জয়ই দেখতে পাচ্ছি। সাড়ে তিন দশক পশ্চিমবঙ্গ শাসন করা বামফ্রন্ট মাত্র ১০ বছরেই রীতিমত হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। একসময়কার বাংলা তথা ভারতশাসক কংগ্রেসের ভাণ্ডারও এবার শূন্য। বিজেপি এখন বিধানসভায় শক্তিশালী বিরোধী দল। এতদিন মাঠে তারা মমতার ঘাম ঝরিয়েছেন, এবার তারা বিধানসভায় তার কাজে বারবার বাগড়া দিতে পারবে। আর কেন্দ্রীয় সরকারের নানা চাপ তো থাকলোই। পাঁচ বছরে যদি ৩ থেকে ৭৬ হতে পারে, আগামী পাঁচ বছরে তারা কোথায় যেতে পারে! ভাবতেই ভয় লাগছে। তাদের হাতে হিন্দুয়ানী কার্যকর অস্ত্র তো থাকলোই।

পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের কৌতূহল অমূলক নয়। ভারত বাংলাদেশে বৃহৎ প্রতিবেশী, আর পশ্চিমবঙ্গ হলো নিকটতম। তাই ভারতে বা পশ্চিমবঙ্গে কারা ক্ষমতায় থাকলো তার ওপর নির্ভর করে দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক। আর বাংলাদেশ-ভারত দুই দেশের স্বার্থেই একটা স্থিতিশীল ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পারস্পরিক সম্পর্ক দরকার। যদিও নানা কারণে এই সম্পর্কে নানা অবিশ্বাস দানা বেধে আছে বাংলাদেশের জন্মের সময় থেকেই। ভারতে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান ঘটলে তার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ে। মোদি-অমিত ভারতে যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াচ্ছেন, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার উত্থানের পেছনে আমি সেটাকে বড় কারণ বলে মানি। তাই পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিজেপির উত্থান হলেও তারা যে এবার ক্ষমতায় আসতে পারেনি, সেটাই আপাতত স্বস্তির। তবে এই স্বস্তি নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই। পশ্চিমবঙ্গের শুভ ইচ্ছার রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে বিজেপির সাম্প্রদায়িকতার ঢেউ ঠেকাতে আগামী দিনগুলোতে অনেক কাজ করতে হবে। ৩ থেকে ৭৬ আসনে উঠে যাওয়া বিজেপি যেন আর বাড়তে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

এক বৃদ্ধ মারা যাওয়ার পর তার ছেলে খুব কাঁদছিল। পড়শী আরেক বৃদ্ধ তা দেখে বলেন, ‘তোমার বাবার বয়স হয়েছে, মারা গেছেন, এ নিয়ে এত দুঃখের বা কান্নাকাটির কী আছে?’ মৃতের ছেলে তখন কাঁদতে কাঁদতে উত্তর দেয়, ‘আমি তো বাবার জন্য কাঁদছি না, আমি কাঁদছি, যম তো বাড়িটি চিনলো!’ পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির পরাজয়ে আমি তাই খুব স্বস্তি পাচ্ছি না। ৩ থেকে ৭৬এর ভয়টা আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পারেনি তো কী হয়েছে, সাম্প্রদায়িকতার যম তো বাড়ি চিনেছে।

গ্লাস অর্ধেক খালি না অর্ধেক ভর্তি- এই তর্ক পুরনো। দুটিই সত্য। তবে আমি সবসময় গ্লাস ভরা দেখি, এমনকি আপাত দৃষ্টিতে খালি বাকি অর্ধেকও আমি বাতাসে ভর্তি দেখি। তাই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির পরাজয় থেকেই দেখতে চাই সাম্প্রদায়িকতার বিনাশ। আসন যতই বাড়ুক, বেপরোয়া চেষ্টার পরও পশ্চিমবঙ্গের মসনদ দখল করার খায়েশ পূর্ণ না হওয়া মোদি-অমিতের আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দেবে। সেই ধাক্কায় যদি তাদের জয়রথ থামে, যদি সাম্প্রদায়িকতার পতন ঘটে তবেই মঙ্গল। পশ্চিমবঙ্গ থেকেই শুরু হোক সাম্প্রদায়িকতার পতন। শুধু ভারত নয়, পৃথিবীর সর্বত্র উগ্রতার, সাম্প্রদায়িকতার, অশুভের বিনাশ হোক। উত্থান হোক শুভ চিন্তার।
 
 
লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

‘রেকমেন্ডেশন অব ডিজঅনার’

‘রেকমেন্ডেশন অব ডিজঅনার’

‘তবু যেন তা মধুতে মাখা’

‘তবু যেন তা মধুতে মাখা’

ইশ, দুর্নীতিটা যদি না থাকতো!

ইশ, দুর্নীতিটা যদি না থাকতো!

সচ্ছলতা কি সাংবাদিকদের অপরাধ?

সচ্ছলতা কি সাংবাদিকদের অপরাধ?

সাংবাদিকরা কি সরকারের শত্রু?

সাংবাদিকরা কি সরকারের শত্রু?

অস্তিত্বের সংকটে গণমাধ্যম

অস্তিত্বের সংকটে গণমাধ্যম

‘যে নালে উৎপত্তি সে নালেই বিনাশ’

‘যে নালে উৎপত্তি সে নালেই বিনাশ’

হেফাজত জুজুর বিদায়

হেফাজত জুজুর বিদায়

মুছে যাক গ্লানি, দূরে যাক করোনা’

মুছে যাক গ্লানি, দূরে যাক করোনা’

মামুনুলের অপরাধসমূহ

মামুনুলের অপরাধসমূহ

করোনার সাপলুডু খেলা

করোনার সাপলুডু খেলা

আটকেপড়া পাকিস্তানি, আটকেপড়া ভারতীয়!

আটকেপড়া পাকিস্তানি, আটকেপড়া ভারতীয়!

সর্বশেষ

সাবরিনাসহ আটজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ ৪ জুলাই

করোনাভাইরাস পরীক্ষায় জালিয়াতিসাবরিনাসহ আটজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ ৪ জুলাই

১০ নম্বর শর্ত থেকে মুক্ত হলো রবি

১০ নম্বর শর্ত থেকে মুক্ত হলো রবি

রেইনট্রিতে দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ ৫ জুলাই

রেইনট্রিতে দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ ৫ জুলাই

রমনা বোমা হামলা মামলার শুনানি: রাষ্ট্রপক্ষকে চূড়ান্ত সময় দিলেন হাইকোর্ট

রমনা বোমা হামলা মামলার শুনানি: রাষ্ট্রপক্ষকে চূড়ান্ত সময় দিলেন হাইকোর্ট

কক্সবাজারে খুলেছে হোটেল-মোটেল

কক্সবাজারে খুলেছে হোটেল-মোটেল

বাংলাদেশে চাকরি দিচ্ছে ডব্লিউএফপি, বেতন ১ লাখ ১৪৬৩৮ টাকা

বাংলাদেশে চাকরি দিচ্ছে ডব্লিউএফপি, বেতন ১ লাখ ১৪৬৩৮ টাকা

ডিআইজি প্রিজনস পার্থ গোপালের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ ১৫ জুলাই

ডিআইজি প্রিজনস পার্থ গোপালের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ ১৫ জুলাই

দুদকের বরখাস্ত পরিচালক বাছিরের জামিন আবেদন খারিজ

দুদকের বরখাস্ত পরিচালক বাছিরের জামিন আবেদন খারিজ

‘পুলিশ ম্যানেজ করা আছে, রংপুর-বগুড়া যেখানেই যান ১৫০০ টাকা’

‘পুলিশ ম্যানেজ করা আছে, রংপুর-বগুড়া যেখানেই যান ১৫০০ টাকা’

ঋণের টাকা দিতে না পেরে ব্যবসায়ীর আত্মহত্যা

ঋণের টাকা দিতে না পেরে ব্যবসায়ীর আত্মহত্যা

পোপের সঙ্গে সাক্ষাৎ স্পাইডারম্যানের

পোপের সঙ্গে সাক্ষাৎ স্পাইডারম্যানের

বিলিয়াতে বঙ্গবন্ধু কর্নার স্থাপন

বিলিয়াতে বঙ্গবন্ধু কর্নার স্থাপন

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune