X
রবিবার, ২৫ জুলাই ২০২১, ৯ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

ঈদে বাড়ি ফেরার পক্ষ-বিপক্ষ

আপডেট : ১১ মে ২০২১, ১৫:২২

আনিস আলমগীর ঈদে বাড়ি ফেরা বাংলাদেশের এক আদি বিড়ম্বনা। ঢাকা-চট্টগ্রাম বা অন্যান্য বড় শহরের মানুষগুলোর বেশিরভাগের এখনও আদি ঠিকানা গ্রাম কিংবা কোনও ছোট শহরে। বছরের দুই ঈদ এলে তাই তাদের বেঁধেও আপনি শহরে রাখতে পারবেন না। যতই বিড়ম্বনা হোক, সড়ক দুর্ঘটনা হোক। এই শহর তাদের টানে না. আবার গ্রাম তাদের কর্মসংস্থানের, সন্তানের শিক্ষা লাভের, চিকিৎসা, নাগরিক সুবিধা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। তাই তারা আসা এবং যাওয়ার মধ্যে আছেন। অনেকে বাধ্য হয়েই তা করছেন। স্বল্প আয়, তবু পরিবার নিয়ে শহরে থাকতে চান।

আবার একটা শ্রেণি আছে ব্যাচেলর জীবনযাপন করে শহরে। মেস জীবনে ঢাকা শহর তাদের কাছে মরুভূমির মতো। আবার বিবাহিত হয়েও ব্যাচেলর জীবনে আছেন অনেকে। তাদের পরিবার থাকে গ্রামে। মা-বাবার সঙ্গে দেখা, স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে দেখা, কিংবা গার্মেন্টসের যে নারী সন্তান রেখে এসেছেন মা কিংবা শাশুড়ির কাছে, তারও ছুটতে হয় ঈদে, আদি গন্তব্যে। সে কারণে আমরা দেখি লঞ্চ, বাস, ট্রেনে উপচে পড়ছে মানুষ। বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো এরা ছোটে। সড়ক-মহাসড়কে ঘরে ফেরা মানুষের স্রোত নামে। কারও সাধ্য নেই এদের আটকানোর। এই তথাকথিত শহুরে জীবন তাদের ছুটি কাটানোর উপায় শেখাতে পারেনি। পিছুটান, দুই জীবন থেকে মুক্তি দেয়নি। তাই ঈদ এলে কোনও প্রতিবন্ধকতা তাদের আটকাতে পারে না গ্রামে ফেরা থেকে।

করোনার মধ্যে এবার তৃতীয় ঈদ উদযাপনেও তা-ই হয়েছে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি উপেক্ষা করে মানুষ বাড়ি ফিরছে। মিডিয়ার খবরে বলা হচ্ছে, দূরপাল্লার বাস, লঞ্চ ও ট্রেন বন্ধ থাকায় বিকল্প উপায়ে মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, সিএনজি অটোরিকশা, পিকআপ, মোটরসাইকেলসহ ছোট ছোট যানবাহনে চড়ে যাচ্ছেন তারা। পথে পথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যারিকেড ও দিনে ফেরি চলাচল সীমিত রেখেও এদের আটকানো যায়নি। উল্টো তাদের উপচে পড়া চাপে ফেরির সংখ্যা বাড়াতে বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন। জরুরি পরিষেবার জন্য চালু রাখা ফেরিতে গাড়ির বদলে গাদাগাদি করে মানুষ যেতে দেখা গেছে।

এই ঘরে ফেরা মানুষদের নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের মধ্যেও গোঁজামিল রয়ে গেছে। দেখা গেছে সিদ্ধান্তহীনতা। করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়ায় দূরপাল্লার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। জেলার অভ্যন্তরে বাস চলাচল করলেও আরেক জেলায় যেতে দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু সবাই দেখছে বারবার যানবাহন পরিবর্তন করে ভেঙে ভেঙে বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছেন ঘরমুখো মানুষ। আবার ফেরি চালু আছে। এর কারণে তাদের যেমন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তেমনি গুনতে হচ্ছে চার পাঁচগুণ বেশি ভাড়া।

আর স্বাস্থ্যবিধির কথা কী বলবো! দেশে করোনাভাইরাসের ভারতীয় ভার্সন চলে এসেছে। আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা এখনও সন্তোষজনক হারে নেমে আসেনি। কিন্তু এই বাড়ি ফেরা মানুষগুলোর যাত্রা যেমন নিরাপদ, দুর্ভোগহীন করার কোনও প্রচেষ্টা নেই তেমনি তাদের স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করতেও দেখা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ঈদের পরে আমাদের দেশের অবস্থাও ভারত ও নেপালের মতোই ভয়াবহ হতে পারে। তিনি বলেছেন, পাশের দেশ ভারতে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্টের কারণে প্রতিদিন হাজারো মানুষ মারা যাচ্ছে। এই ভ্যারিয়েন্ট এখন আমাদের দেশেও চলে এসেছে।

বাড়িফেরা নিয়ে সতর্ক করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপনে গ্রামের বাড়ি যেতে ছোটাছুটি না করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘এতে আপনজনের জীবনই হুমকির মুখে পড়বে। একটা ঈদে কোথাও না গিয়ে নিজের ঘরে থাকলে কী ক্ষতি হয়? আপনারা ছোটাছুটি না করে যে যেখানে আছেন সেখানেই থাকেন। সেখানেই নিজের মতো করে ঈদ উদযাপন করুন। আমি জানি ঈদের সময় মানুষ পাগল হয়ে গ্রামে ছুটছেন। কিন্তু আপনারা যে একসঙ্গে যাচ্ছেন, এই চলার পথে ফেরি বা গাড়ি যেখানে হোক কার যে করোনাভাইরাস আছে আপনি জানেন না। কিন্তু আপনি সেটা বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন আপনার পরিবারের কাছে। মা-বাবা, দাদা-দাদি যেই থাকুক আপনি তাকেও সংক্রমিত করবেন এবং তাদের জীবনও মৃত্যুর ঝুঁকিতে ফেলে দেবেন।’

সবার কথাই যুক্তিযুক্ত। প্রধানমন্ত্রীর কথাও কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্তু ঈদ উৎসবের ঠিক আগে আগে এসব বলে লাভ কী! তাদের ঘরে ফেরা থেকে নিরুৎসাহিত করতে কতটা মানসিকভাবে প্রস্তুত করেছি আমরা। সরকার লকডাউনের মধ্যে দোকানিদের অনুরোধে দোকান খুলে দিয়েছে। কেনাকাটার স্রোত বইছে সেখানে। এর সিংহভাগ ক্রেতাই হচ্ছে ঈদে বাড়ি ফেরার দল। তারা জামা-কাপড় কিনে নিয়েছে, বাজার সওদা করেছে, বাড়ি যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে- সংযমী কীভাবে হতে পারে! ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। পায়ে হেঁটে, পানিতে নেমে হলেও ছুটছে গ্রামের দিকে। আবার দুদিন পর একইভাবে শহরে আসার হাঙ্গামাতে যোগ দিবে তারা।

এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় বয়ে যাচ্ছে এই বাড়ি ফেরার পক্ষে-বিপক্ষে। চলে এসেছে যথারীতি ধনী-গরিবের সস্তা সেন্টিমেন্ট। কারও কারও প্রশ্ন- আপনি ধনীদের প্রাইভেট কারে, বিমানে যাওয়ার ব্যবস্থা করলে গরিব কেন তার প্রিয়জনের সান্নিধ্য পাবে না ঈদে? শুনতে খুবই যৌক্তিক মনে হবে কিন্তু প্রাইভেট কার আর উড়োজাহাজে স্বাস্থ্য সুরক্ষা যেভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে, নিম্ন আয় কিংবা মধ্যবিত্তের ঘরে ফেরার মধ্যে সেটা কি নিশ্চিত করা যাচ্ছে? বলার অপেক্ষা রাখে না, যাচ্ছে না। তাহলে উপায় কী– গণতান্ত্রিক দেশে বাড়ি ফেরার অধিকার তো সবার আছে। ধনী বাড়ি যাবে, তার গাড়ি চলবে কিন্তু এই নগরে যারা রিকশা চালাচ্ছে, বাসা বাড়িতে কাজ করছে, গার্মেন্টস কর্মী কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসা করছে, চাকরি করছে- তারা বাড়ি যাবে কীভাবে! লকডাউনে সবই চলছে, গণপরিবহন চলছে না, ফেরি বন্ধ- এটা কি কেবল গরিবকে বাড়ি যেতে না দেওয়া! ধনীদের ট্রল করছি না কিন্তু গরিবরা গাদাগাদি করে ফেরিতে যাচ্ছে- তাদের নিয়েই শুধু ট্রল চলবে?

এই বিতর্কে দুপক্ষের ঝাঁঝালো যুক্তি আছে। কিন্তু সমাধান কী? তার স্পষ্ট নির্দেশনা এবং বাস্তবায়ন নেই। চলমান লকডাউনের কারণে আক্রমণের তীব্রতা কমে এসেছে, ঈদযাত্রার পরে বুঝা যাবে কতটা নির্বুদ্ধিতা মানুষ দেখিয়েছে নাকি একমাত্র আল্লাহ তাদের সহায় ছিল। ঢাকাতেই সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা। স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিতে হবে এটা ছড়িয়ে যাবে সারা দেশে। যে যত কথাই বলুক, দিনশেষে দায় আসবে সরকারের ঘাড়ে। করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থতার দায় সরকারকেই নিতে হবে। এখন যারা অধিকার, গণতন্ত্র, ধনী-গরিব প্রসঙ্গ তুলেছেন- তারা তখন দেখা দেবেন না। ঈদযাত্রা নিয়ে সরকারের সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দরকার ছিল অনেক আগে থেকে। লকডাউন দিয়ে রাখাই শুধু সমাধান না।

অন্যদিকে, মহামারিতে চলাচল করলে কী পরিণতি হবে সবাই ভয় দেখাচ্ছি আমরা কিন্তু এটি যাদের কাছে পৌঁছানো দরকার, ইতিবাচক ম্যাসেজ হিসেবে প্রচার দরকার– সেই কাজটি সরকারি, বেসরকারি কোনও যন্ত্রই করতে পারেনি বলে আমার ধারণা। আইন না করলে, আইন অমান্যকারীকে সাজা না দিলে যেমন কোনও উদ্যোগের ফল আসে না, তেমনি বিষয়টি যে তাদের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে সেই বার্তাটিও পৌঁছানো দরকার। করোনা আক্রমণের শুরুতে যে সচেতনতার বার্তা প্রচারিত হয়েছে, লক্ষ করা গেছে– এখন তা চোখে পড়ছে না। অথচ সামনে এর ভয়াবহতা আরও তীব্র হবে বলেই সবাই আশঙ্কা করছেন।

সবাইকে ঈদের অগ্রিম শুভেচ্ছা। ঈদ হোক নিরাপদ এবং আনন্দময়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

তালেবান উত্থানে একঘরে ভারত

তালেবান উত্থানে একঘরে ভারত

কারখানার আগুনের দায় তাহলে কার?

কারখানার আগুনের দায় তাহলে কার?

টিকা ছাড়া লকডাউন-শাটডাউনে কাজ হবে না

টিকা ছাড়া লকডাউন-শাটডাউনে কাজ হবে না

তারেক জিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

তারেক জিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

‘ফকির’ করে চলে গেলেন…

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২১, ১৪:২৫

তুষার আবদুল্লাহ ভোরেই চলে গিয়েছিলাম শাহবাগ মোড়ে। তখনও ফোটা ফোটা বৃষ্টি পড়ছিল। সুতোর মতো এসে আমাকে জড়িয়ে ফেলছিল স্মৃতিতে। আমি কানপেতে আছি পূবে। কোন এক কণ্ঠের তৃষ্ণা কণ্ঠের, মনের। চোখ ভিজে যাচ্ছে মেঘের জলে। কিন্তু সেই কণ্ঠ কেন এসে পৌঁছাচ্ছে। ইথার নাকি আমাদের সব উচ্চারণ জমা রাখে ডাকটিকিটের মতো। কই পাতা উল্টে কেন শুনতে পাই না– ‘মোর সখিনার কপালের টিপ মুইছা গেছে ঘামে। তাঁর কণ্ঠস্বর ঠিক এই চৌরাস্তায় আমার কানে এসে উছলে পড়েছিল। তিনি বছরের পয়লা দিন গাইতেন শিশু পার্কের সামনে। তাঁর সংগঠনের জন্য সংরক্ষিত ছিল ওই জায়গাটি। প্রতি বৈশাখে চারুকলায় যাওয়ার পথে, কিংবা মঙ্গলশোভা যাত্রায় থেকেও, কান উঁকি দিতো– নাম তার জন হেনরী, শোনার ব্যাকুলতায়।

শুধু কি বৈশাখ? যখনই রাজনীতি হেরে যাচ্ছিল। সমাজের বৈষম্য তীব্র হওয়াকে মেনে নিতে পারছিলাম না। শোষণে পীড়িত হতে হতে বিপর্যস্ত। রাষ্ট্র ও সমাজ চলে যাচ্ছিল লুটেরাদের হাতে, তখন বুক স্পন্দিত হতো বিপ্লবের প্রতিধ্বনিতে, সেই সময়েই তাঁর কাছে ফিরে যেতাম- কালো কালো মানুষের দেশে ওই কালো মাটিতে, রক্তের স্রোতের শামিল, নেলসন মেন্ডেলা তুমি অমর কবিতার অন্তমিল। তোমার চোখেতে দেখি স্বপ্ন মিছিল।

তাঁর সঙ্গে সরাসরি দেখা ১৯৯৮ সালে। তিনি একুশের পদক পেলেন। ছুটে আসলেন মুক্তকণ্ঠ অফিসে। সবাইকে জড়িয়ে ধরছিলেন। আমি দূরে দাঁড়িয়েছিলাম। তাঁর কাছে, সামনে যাওয়ার মতো সাহস ছিল না। নিজে এগিয়ে এসে প্রশস্ত বুকে চেপে ধরলেন– দূরে দাঁড়ায় আছো কেন? আমার কানে তখন বেজে চলছে- মায়ের একধার দুধের দাম। আমি সদ্য মা হারা। সেই যে তিনি বুকে চেপে ধরলেন আর ছাড়েননি।

কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যের মুখে। কত মুখ আসে, হৃদয়ে ভাসে। কচুরিপানার মতো দূরে চলে যায়। তাদের কাউকে হয়তো মন দেব বলে ভাবছি, কিন্তু সেই মনও যে পদ্মপাতার মতো টলমল। পাওয়া না পাওয়ার বিষন্নতায় নিমজ্জিত হতে হতে আবার তাঁর কাছে গিয়ে প্রণীত আমি-সন্দীপে তার ছিল বাড়ি, স্বপ্নমাখা ঘর, তাকে আমি দিয়েছিলাম আমার এই অন্তর, সেই সখিনা হয়ে গেছে আজকে আমার পর।

তাঁর সঙ্গে সময়তে কাজ হয়েছে। তিন দফা আড্ডা হয়েছে আমার অনুষ্ঠানে। স্টুডিওতে, ধানমন্ডি লেকের পাড়ে, যতবার দেখা হয়েছে, ততবারই মনে হয়েছে, তাঁর কণ্ঠ মিথ্যে নয় মোটেও- জন্মদিনের মতো আজও শিশু থেকে গেলাম! তিনি ব্যবহারে যাপনে শিশুই ছিলেন।

আমরা সদ্য হারিয়েছি তাঁকে। আমাদের তারুণ্যকে জাগরিত রাখা, প্রেম আর দ্রোহে আমাদের আলোড়িত করা মানুষেরা এক এক করে সত্যিই আসমানের নক্ষত্র হয়ে যাচ্ছেন। ফিরোজ সাঁই, আজম খানকে বিদায়ের পর বিদায় জানাতে হলো পপ গানের আরেক সারথী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দীপ্ত কণ্ঠ ফকির আলমগীর। তিনি চলে গেলেন ভালোবাসায় সমৃদ্ধ হয়ে, শূন্যতায় ফকির হয়ে রইলাম আমরাই।

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী

/এসএএস/

সম্পর্কিত

ঘুষি লাগলো কি গণতন্ত্রের বুকে?

ঘুষি লাগলো কি গণতন্ত্রের বুকে?

মৃত্যু কিনি ঘামের দামে

মৃত্যু কিনি ঘামের দামে

রাজনীতির স্বাদ- বিস্বাদ!

রাজনীতির স্বাদ- বিস্বাদ!

কঠোরতায় কেন কোমল ছাড়?

কঠোরতায় কেন কোমল ছাড়?

করোনা মহামারিতে ঈদ ছুটির বিড়ম্বনা

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২১, ১৩:২৫

নাসির আহমেদ ভয়াবহ করোনা সংক্রমণের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষ কোরবানির ঈদ উদযাপন করতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহর নগর ছেড়ে চলে গেছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলে। যেভাবে গেছেন তারা সেই দুর্ভোগের চিত্র লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। যারা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে সেই ঈদযাত্রার চিত্র লাইভ দেখেছেন তারাই কেবল অনুমান করতে পারবেন দুর্ভোগ কাকে বলে এবং তা কত প্রকার ও কী কী। রাজধানীর বাস টার্মিনাল, রেল-স্টেশন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এবং মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের পাটুরিয়া ও শিমুলিয়া ফেরিঘাটে যে চিত্র দেখা গেছে, তা করোনার চেয়ে কম দুর্যোগের নয়। গত ১৫ জুলাই মধ্যরাত থেকে ২৩ জুলাই ভোর পর্যন্ত শিথিল করা লকডাউনের সুযোগ পেয়ে মানুষ যেভাবে ঢাকা ছেড়ে ছিল তাদের ছিল না কোনও শাস্তিবিধি অনুসরণ, ছিল না করোনাভাইরাসের সামান্য আতঙ্ক। বহু লোক জরিমানা গুনেছেন বিধি লংঘন করে। তারপরও উপচে পড়া ভিড়ের এতটুকু ভাটা পড়েনি।

শুধু ফেরিঘাটের যে ভয়াবহ চিত্র সংবাদপত্র শিরোনাম করেছে ‘উপচেপড়া ভিড়ে দুলছে নৌরুট’! কোরবানির পশুবাহী গরু, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, লাশের গাড়িসহ জরুরি যানবাহনও ফেরিতে উঠতে পারেনি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে যাত্রী ভিড়ের চাপে!

গিজগিজ করা ভিড়ের চাপে মানুষের যে দুর্ভোগ হয়েছে, তাতে ঈদের আনন্দ আর আনন্দ থাকেনি, বিড়ম্বনায় পর্যবসিত হয়েছে। ঈদ শেষে ঈদের তিন দিন আগে এই চিত্র তুলে ধরার একটাই কারণ আমাদের দায়িত্ববোধের অভাব কতটা তীব্র তা বোঝানোর জন্য।

সবচেয়ে বড় কথা– যারা ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহর-নগর থেকে গ্রামে ঈদ উদযাপন করতে গেছেন এবং এরই মধ্যে যারা আবার কঠোর লকডাউনের আগেই ফিরে এসেছেন, তারা অনেকেই যে ভয়ংকর ঝুঁকির বাহক, এটা ক’জনই বা জানেন! প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণের যে ঊর্ধ্বগতি, তার মধ্যেই দলবেঁধে মানুষের এই যে ঈদ উপলক্ষে স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই গ্রামে যাওয়া-আসা, তার ফলাফল অচিরেই দেখা যাবে কিন্তু তখন অসহায় আফসোস ছাড়া কিছুই করার থাকবে না।

সুধী পাঠক, হয়তো অনেকেরই স্মরণে আছে ঈদের আগের সপ্তাহে লেখার শিরোনাম করেছিলাম ‘করোনাকালের ঈদ: আনন্দে যখন শঙ্কা’! রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য বিধি লঙ্ঘনের যে ভয়ঙ্কর চিত্র, তা তুলে ধরেছিলাম শুধু কোরবানিতে যেন সেই একই ভুল আমরা না করি, সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল ওই লেখার লক্ষ্য। রোজার ঈদের আগে-পরে লকডাউন ছিল। কিন্তু এবারের ঈদে লকডাউন ছিল না। তারপরও স্বাস্থ্যবিধি পালনে চরম উদাসীনতাই চোখে পড়ছে। কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না কবে আর আমাদের বোধোদয় হবে?

মহামারির কারণে প্রতিদিন মানুষের মৃত্যু আর দুঃখ-শোকের মধ্যেই এসেছিল কোরবানি ঈদ। এই দুর্যোগের বাস্তবতা উপেক্ষা করে কেন লক্ষ লক্ষ মানুষের শহর ছেড়ে গ্রামে যেতেই হবে, কেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এমন হুমড়ি খেয়ে পড়তে হবে। সত্যি তা বোধগম্য হওয়া কঠিন।

সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঈদযাত্রা শেষে এখনও অনেকেই গ্রামে। যেহেতু ৫ আগস্ট অব্দি অফিস-আদালত কল-কারখানা, এমনকি গার্মেন্টস পর্যন্ত বন্ধ, সুতরাং যাদের না শহরে না ফিরলেই নয় এমন কিছু মানুষ ছাড়া অধিকাংশ লোক ছুটি কাটাচ্ছেন নিজ নিজ গ্রামে। কিন্তু তাদের ঝুঁকিপূর্ণভাবে গ্রামে যাওয়া এবং সেখানে দায়িত্বহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো যে চরম সংকট সৃষ্টি করেছে, তার সমাধান কোথায়, সেটাই এ মুহূর্তের বড় দুশ্চিন্তা।

আমাদের সমাজে দায়িত্বহীনতা এবং করোনাকালের উদাসীনতা কত ভয়াবহ হতে পারে তার একটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার উল্লেখ করা প্রয়োজন।

আমার এক উচ্চশিক্ষিত আত্মীয় (পেশায় শিক্ষক), গত ১৯ জুলাই লঞ্চে গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে গেলো। যাওয়ার  আগে অনিবার্য কারণেই আমার কাছে তার আসতে হয়েছিল। তাকে বললাম, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে এই যে মানুষের ঢল, এবার ঈদে গ্রামে না গেলেই কি নয়? সে নানা যুক্তি দিয়ে বলল, যেতেই হবে। তাকে বললাম দেখো, টিভির স্ক্রলে দেখো, আজ সর্বোচ্চ রেকর্ড ২৩১ জন মারা গেছেন, একদিনে আক্রান্তের সংখ্যা ১৩ হাজার ছাড়িয়েছে। কিন্তু সে তার চার বছরের শিশুপুত্র আর বৃদ্ধ বাবা-মাকে দেখতে যাবেই।

আমার বাসা থেকে যখন গেলো, তখনও সে সুস্থই ছিল। বাড়িতে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার জ্বর, গলা ব্যথা, গা ব্যথা কাশি শুরু হয়ে যায়। ফোনে জানালো এই বিপদের কথা। নিশ্চয়ই সদরঘাটের ভিড়ের চাপে সংক্রমিত হয়ে থাকবে। দ্রুত চিকিৎসা নিতে জেলার সদর হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিলাম। কিন্তু সে তো নিজের সর্বনাশই করেনি স্ত্রী-পুত্রকে দেখতে লঞ্চ থেকে সরাসরি আগে শ্বশুর বাড়ি, সেখান থেকে ফিরে নিজের বাড়িতে এবং পাশেই ছোট বোনের বাড়িতে দুপুরের দাওয়াত খেয়েছে। এখন যদি তার সংস্পর্শে আসা বৃদ্ধ বাবা-মাসহ মানুষগুলো সংক্রমিত হয়ে যায় তাহলে উপায়! এমন সর্বনাশা ঘটনা তো হবে হনুমানের লেজের আগুনে যেভাবে রাবনের লঙ্কাপুড়ে ছাই হয়েছিল, এও তো সেভাবে অসচেতন মানুষের ছড়িয়ে দেওয়া ভাইরাসের আগুনে সমাজকে পোড়ানো ছাড়া আর কী। এরকম একজন নয় অসংখ্য মানুষ ভাইরাসের আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছে সমাজের সর্বত্র।

মানুষের উদাসীনতার কারণে ঈদের আনন্দ বিস্বাদে পরিণত হয় তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছুই হতে পারে না। রোজার ঈদ পরবর্তী ভয়াবহ যে অভিজ্ঞতা আমাদের, সেই শঙ্কাই আরও প্রকট করে তুলেছে সদ্য অতিক্রান্ত কোরবানির ঈদের ছুটিতে এই আসা- যাওয়ার উদাসীন যাত্রা।

চিকিৎসকসহ বিশেষজ্ঞরা সবাই প্রায় এক বাক্যে বলছেন, লকডাউন সর্বত্র কঠোরভাবে কার্যকর করা গেলে করোনা সংক্রমণ আর মৃত্যুর দুই-ই কমে। কিন্তু সেই বাস্তবতা জানা সত্ত্বেও মানুষ স্বাস্থ্য বিধি মানছে না। সমাজের অধিকাংশকে স্বাস্থ্যবিধি মানানো যাচ্ছে না। বিশেষ করে এখন যারা গ্রামে আছে তারা এই ভাইরাস গ্রাম থেকে যেমন শহরে নিয়ে আসবে, তেমনি দায়িত্বহীনভাবে এবাড়ি-ওবাড়ি ঘোরাঘুরি করে, হাটবাজার, সিনেমা হলে গিয়ে, চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়ে ভয়ংকরভাবে যে ভাইরাস ছড়াতে পারে এই আশঙ্কায় কিছু তেল উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তাই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞগণ এই মুহূর্তে উদ্বিগ্ন সেই লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য যারা গ্রামে গেছেন এবং নিজেরা করোনার উপসর্গ বয়ে বেড়াচ্ছেন কিংবা ভাইরাস নিয়ে ফিরবেন শহরের কর্মস্থলে। মুখে মাস্ক পরা এবং দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টির ওপরই তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন এই মুহূর্তে। আর এ দুটি বিষয় এখনই নিশ্চিত করতে হলে গ্রাম পর্যায়ে তদারকি বাড়াতে হবে।

এ মন্তব্য শুনে অনেকেরই মনে হতে পারে যে, এত মানুষ গ্রামে গেছে, তাদেরকে কীভাবে চিহ্নিত করা যাবে। এমন ভাবছেন যারা তাদের বলব– গ্রাম কিন্তু শহরের মতো বিচ্ছিন্ন নয়। সেখানে এখনও পারিবারিক এবং সামাজিক বন্ধন টিকে আছে। কোন বাড়িতে কে বা কারা ঈদের ছুটিতে বেড়াতে এসেছে, তা জানার জন্য বাড়ি বাড়ি ঘোরারও দরকার হয় না। পাড়া-মহল্লার সবাই সবাইকে চেনেন। ওয়ার্ড মেম্বার, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌর এলাকার মেয়র- কাউন্সিলরসহ বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিবৃন্দ এবং  রাজনৈতিক দল ও তাদের অঙ্গ সংগঠনসমূহের তৃণমূলের কর্মীরা যদি আন্তরিক হন এবং মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা নিশ্চিত করতে চান, তাহলে তা করা অসম্ভব কিছুই নয়।

কথা হচ্ছে রাজনীতি যদি সমাজের তথা মানুষের কল্যাণে হয়ে থাকে, তাহলে দেশের এই কঠিন ক্রান্তিকালে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করার মতো অতি প্রয়োজনীয় এই কাজটি করা সহজেই সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছার। এ কাজ যে শুধু সরকারি দলের নেতাকর্মীরা করবেন, তাও নয়, সকল রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাই করতে পারেন। তাতে সমাজের কল্যাণে কাজ করার একটা নীরব প্রতিযোগিতাও হয়ে যায়। জনসাধারণও বুঝতে পারবেন তাদের এমন দুঃসময়ে কে বা কারা এগিয়ে এসেছেন। দরিদ্র দুর্গত মানুষদের সাহায্য করারও একটা মোক্ষম সময় এখন। এতে মানব সেবার পাশাপাশি রাজনৈতিক ফায়দা ও ভবিষ্যতের জন্য কিছু হতে পারে। কারণ বিপদে বন্ধুকে মানুষ মনে রাখে। শুধু রাজনৈতিক সংগঠন কেন, গ্রামের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক  নানা সংগঠন আছে, ক্লাব আছে, এনজিওর শাখা আছে– চাইলে সবাই মিলে দুর্গত মানুষকে সাহায্য করার পাশাপাশি সচেতনতা সৃষ্টি আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কাজটিও সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারেন।

এই ধরনের মানবিক সেবামূলক সদিচ্ছার মূল্য কিন্তু সমাজ সবসময়ই দিয়ে থাকে। এই সত্যটি যেন আমরা ভুলে না যাই।

২৩ শে জুন শুক্রবার থেকে আবার কঠোর লকডাউন শুরু হয়েছে। আগামী ৫ আগস্ট পর্যন্ত লকডাউন অব্যাহত থাকবে। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত যারা ফিরেছেন তারা লঞ্চঘাটে, বাস টার্মিনালে, ফেরিঘাটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন, তা কল্পনাও করা যায় না। গ্রামের স্বজনদের সঙ্গে মাত্র তিনদিনের ঈদের আনন্দ পথের এই দুর্ভোগ কি ভুলিয়ে দেয়নি? কী প্রয়োজন ছিল এত দুর্যোগ পোহানোর?

অনেকে বলবেন উৎসবে-পার্বণে স্বজন স্বজনের কাছে তৃণমূলে ফিরবে, এটাই তো স্বাভাবিক। না সব সময় তা স্বাভাবিক নয়। যুদ্বাবস্থায় যেমন জীবনের গতি স্বাভাবিক থাকে না, এখনও স্বাভাবিক নেই। করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ মারণাস্ত্রের যুদ্ধের চেয়ে কম ভয়াবহ নয়।

আর সে কারণেই স্বাভাবিক সময়ের মতো উৎসব-পার্বণ সবকিছু উদযাপন এখন সম্ভব নয়। এই দুর্যোগকালে নিয়ম রক্ষার জন্যই আমাদের ঈদ পালন করতে হয়েছে। কিন্তু আর দশ বছরের ঈদের মতো গত দুই বছরে ঈদ কিন্তু হয়নি। মানুষের অর্থনৈতিক দুর্গতি এখন যে পর্যায়ে তা অতীতের দুটি বিশ্বযুদ্ধের দুর্যোগের চেয়ে কম নয়।

এই পরিস্থিতিতে যারা গ্রাম থেকে ফিরে এসেছেন তাদের বিবেকের কাছে শুধু এই আবেদন করা যায়, দয়া করে মাস্ক পরুন, দূরত্ব বজায় রাখুন। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হবেন না, প্লিজ। আইসোলেশনে থাকা উচিত। না পারলেও অনর্থক কারো সামনে যাবেন না। গ্রামে যারা আছেন তারাও নিজ নিজ বাড়িতে থাকুন। বাইরে যেতেই যদি হয় দয়া করে মাস্ক পরবেন। দূরত্ব রেখে চলবেন।

এ অনুরোধ এই কলাম লেখকের নয়, এ অনুরোধ ভাইরোলজি- বিশেষজ্ঞদের, চিকিৎসকদের। তারা বলছেন,  যদি হাঁচিকাশি হয়, গা ব্যথা করে, জ্বর জ্বর ভাব হয়, সবরকম জনসমাগম থেকে দূরে থাকুন। নিকটবর্তী হাসপাতালে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান। চিকিৎসা নিন। পরীক্ষায় যদি করোনা পজিটিভ হয়, তাহলে যাদের সঙ্গে মেলামেশা করেছেন তাদেরকেও একা থাকতে বলুন। কারও সঙ্গে মিশতে পারবেন না। এই পরামর্শ গত এক সপ্তাহ ধরে সংবাদ ও গণমাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচার করা হয়েছে। তারপরও যদি আমরা সচেতন না হই, তবে তা চরম দুর্ভাগ্যেরই বলতে হবে।

আমরা চাইলে যে অনেক অসাধ্য সাধন করতে পারি তার প্রমাণ তো ভুরিভুরি। রাজধানী ঢাকা নগরীতে কোরবানির পশুর গোবরসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য অপসারণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে এবারের ঈদে। বিশেষ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রদের সদিচ্ছার পাশাপাশি ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ সবার সচেতন প্রয়াসে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ঢাকা উত্তর সিটি শতভাগ বর্জ্যমুক্ত করা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রও বলেছেন, করপোরেশনের বিপুলসংখ্যক পরিচ্ছন্নতা- কর্মীর পাশাপাশি খণ্ডকালীন দৈনিক চুক্তিতে বহু পরিচ্ছন্নতাকর্মী ব্যবহার করা হয়েছে নগরীকে পরিচ্ছন্ন করতে। তারা যে আন্তরিকতা এবং কর্মনিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন, তা অতীতে কখনও এমন ঝটিকা গতিতে দেখা যায়নি। সদিচ্ছা থাকলে অনেক অসাধ্য সাধন করা সম্ভব। অথচ করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং মানানোর মতো কাজটাই আমরা করতে পারছি না। কারণ সম্ভবত ওই একটাই, সচেতনতা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে সম্মিলিত প্রয়াসের অভাব।

মানুষ ঠেকে শিখে কিন্তু কেন যেন একাডেমিক শিক্ষায় অগ্রসর হওয়া সত্ত্বেও মনোজাগতিক ভাবে আমরা পিছিয়ে আছি। ঠেকেও শিখছি না ঈদ সম্মিলনের এই বিশাল জনসমাবেশ করোনার সংক্রমণ আরো বাড়বে জেনেও আমরা দূরত্বে থাকার চেষ্টা করিনি। কবে আর আমাদের বোধোদয় হবে? সবার জন্য ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা ছাড়া আমাদের মনে হয় আর কোনও বিকল্প পথ খোলা নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত সপ্তাহে সেই আশ্বাস দিয়েছেন তিনি সবার জন্য ভ্যাকসিন নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি জানিয়েছেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে।

সবারই গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ টিকা এই নিশ্চয়তা দেয় না যে টিকা নিয়েছেন বলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবেন না।

দু’ সপ্তাহের কঠোর লকডাউন শুরু হলো। এই সময়টা দিন এনে দিন খাওয়া দরিদ্র মানুষের জন্য এক কঠিন সময়। যদি আমাদের এই লকডাউন কঠোরভাবে কার্যকর করতে হয়, তাহলে দরিদ্র মানুষকে খাবারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কী শহর কী গ্রাম– কোথাও কাউকে যেন খাবারের জন্য ঘরের বাইরে আসতে না হয়। সেই ব্যবস্থাটি সরকারি প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও কার্যকর করতে হবে। যত সহজে বললাম তত সহজ নয় কাজটি এর জন্য জরুরিভিত্তিতে উপায় উদ্ভাবন করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

লেখক: কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক; সাবেক পরিচালক (বার্তা), বিটিভি।

/এসএএস/

সম্পর্কিত

করোনাকালের ঈদ: আনন্দে যখন শঙ্কা

করোনাকালের ঈদ: আনন্দে যখন শঙ্কা

জাতীয় লজ্জার সেই কালো স্মৃতিবহ দিন

জাতীয় লজ্জার সেই কালো স্মৃতিবহ দিন

ঐতিহাসিক ২৩ জুন: গৌরবের ৭২ বছরে আওয়ামী লীগ

ঐতিহাসিক ২৩ জুন: গৌরবের ৭২ বছরে আওয়ামী লীগ

স্যালুট তোয়াব খান

স্যালুট তোয়াব খান

মহামারির বিপর্যয় মোকাবিলায় স্থানীয় সরকারের সম্পৃক্ততা জরুরি

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২১, ২০:১৯

ড. প্রণব কুমার পান্ডে একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা অপরিসীম। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে এবং সেগুলো স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে- এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আর এই কারণেই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্প্রসারিত একক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত না করতে পারলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়।

বিকেন্দ্রীকরণের অন্যতম শর্ত হচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা প্রদান করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা প্রদান করা হয় না। তবে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ অন্য দুই প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে। যদিও সরকারের হাতে এই প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করার বেশ কিছু ক্ষমতা রয়েছে।

যেকোনও ধরনের মহামারি, অতিমারি কিংবা দুর্যোগের সময় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দুর্যোগ চলাকালীন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ কী ভূমিকা পালন করবে সেটি আইনে সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এই কারণেই ২০১৯ সালের প্রথম দিক থেকে চলমান করোনা অতিমারির সময় বিভিন্ন দেশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনসাধারণকে রক্ষা করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে স্থানীয় সরকারের প্রত্যেকটি একককে আপৎকালীন কিংবা দুর্যোগকালীন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য আইনের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।  আমরা যদি ইউনিয়ন পরিষদের কথা চিন্তা করি তাহলে দেখা যাবে যে ২০০৯ সালের ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ৬, ৩৫, ৩৬, ৩৮ এবং ৩৮ ধারায় দুর্যোগকালে ইউনিয়ন পরিষদসমূহ কি ভূমিকা পালন করবে তা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে গত প্রায় দেড় বছর ধরে চলমান করোনা অতিমারির সময় আমরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে কতটুকু ব্যবহার করতে পেরেছি? গত দেড় বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায় যে এই প্রতিষ্ঠানসমূহ অতিমারি মোকাবিলায় যে পরিমাণ সহায়তা সরকারকে প্রদান করতে পারে তা এখন পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়নি। এ প্রতিষ্ঠানসমূহকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা জালের অন্তর্ভুক্ত সেবাসমূহ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে গোটা দেশ যখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সেই সময় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করতে পারি? সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা যা প্রত্যক্ষ করেছি তা হলো বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে একটি বড় অংশের করোনা সম্পর্কিত সচেতনতার অভাব রয়েছে। করোনাভাইরাস মানুষের শরীরে বাসা বাঁধলে কতটা ক্ষতি করতে পারে সেই সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা নেই। কিংবা সরকার অথবা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক করোনা সুরক্ষাবিধি সম্পর্কে জনগণের সুস্পষ্ট ধারণা নেই। আরও স্পষ্টভাবে বললে বলা যায় যে কীভাবে মাস্ক পরতে হবে, কেন মাস্ক পরতে হবে, কেন বারবার হাত ধুতে হবে এবং কেন জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে- এই বিষয়গুলো সম্পর্কে জনগণের পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব রয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ যেহেতু জনগণের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে, তাদের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত জনগণকে সচেতন করার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি।

করোনার ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশের গ্রাম অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি গ্রামাঞ্চলে ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনা সম্পর্কে মানুষের কুসংস্কার। ইতোমধ্যে আমরা লক্ষ করেছি, এই কুসংস্কারের কারণে স্বজনরা করোনা আক্রান্ত হলে অনেকেই তাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমরা দেশব্যাপী বেশ কয়েকটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি, যেখানে দেখা গেছে পরিবারের সদস্যরা করোনা আক্রান্ত রোগীর লাশ পর্যন্ত গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কিংবা বাবা-মা করোনা আক্রান্ত হওয়ায় সন্তানরা তাদের খোঁজ নেওয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছে।

এমতাবস্থায়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে কাজে লাগিয়ে জনগণকে যে বিষয়টি বোঝানো দরকার সেটি হলো করোনা আক্রান্ত মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সুস্থ হয়ে যায় এবং করোনা সুরক্ষাবিধি মেনে চললে এই রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এই কাজটি সম্পাদন করা কেন্দ্রীয় সরকার অথবা কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানসমূহের পক্ষে কঠিন হলেও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সম্পাদন করা অনেক সহজ। কারণ, জনপ্রতিনিধি তার এলাকার সবাইকে চেনেন এবং তাদের কথা জনগণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেনে চলেন।

করোনার স্বাস্থ্যগত দিকের পাশাপাশি খেটে খাওয়া মানুষের জীবিকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ দিন আনে দিন খায়। লকডাউন চলাকালীন জীবিকার বিষয়টি তাদের কাছে মুখ্য। এই দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ গ্রামের যুবকদের নিয়ে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গঠন করে তহবিল সংগ্রহ করতে পারে এবং সেই অর্থ দিয়ে খেটে খাওয়া মানুষদের সাহায্য প্রদান করতে পারে। এমনকি যেসব পরিবার করোনা আক্রান্ত হয়েছে, তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিসহ খাবার সরবরাহ করতে পারে। আমাদের একটি কথা মনে রাখা দরকার যে এই অতিমারির সময়ে আমরা সবাই যদি সরকারের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে থাকি তাহলে সরকারের পক্ষে সপ্তাহের পর সপ্তাহ কিংবা মাসের পর মাস সহায়তা প্রদান করা সম্ভব নয়। ফলে অতিমারি থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

এমনকি যেসব কৃষক লকডাউন চলাকালীন কিংবা করোনাকালীন তাদের জমির ফসল তুলতে কষ্ট পাচ্ছেন, তাদেরও সহায়তা প্রদান করতে পারে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে তারা এলাকার যুবকদের সংগঠিত করে কিংবা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে কৃষকদের সাহায্য করতে পারে। আমাদের মনে রাখা উচিত, কৃষি আমাদের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কৃষি ক্ষেত্রে আমাদের উৎপাদন ব্যাহত হলে বিপর্যয় আরও বেড়ে যাবে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত সফলভাবে এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হওয়ার অন্যতম মূল কারণ হচ্ছে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত না হওয়া। ফলে এই বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে আরও বেশি কাজে লাগানো প্রয়োজন।

এছাড়াও সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টিকা প্রদান কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে টিকা প্রদান করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে স্থানীয় পর্যায়ে ক্যাম্প করে আরও অধিক সংখ্যক জনগণকে টিকা প্রদান করার। সেই ক্ষেত্রে ক্যাম্প তৈরিসহ জনগণের মধ্যে টিকা গ্রহণের ক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত দেশের বেশিরভাগ মানুষকে টিকার আওতায় না নিয়ে আসা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত অতিমারি সময়ের ব্যবধানে ব্যাপক আকার ধারণ করবে। আর সরকার যেহেতু প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছে বিভিন্ন উৎস থেকে টিকা সংগ্রহ করে মাধ্যমে দেশের ৮০ শতাংশ জনগণকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার, এই কার্যক্রমকে স্থানীয় পর্যায়ে সফলভাবে সম্পন্ন করতে হলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।

দেশের দুর্যোগকালে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ যে দায়িত্ব পালন করতে পারে, কিংবা আইনের মাধ্যমে তাদের যে দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে, কোভিড-১৯-এর বিপর্যয় মোকাবিলায় তার পরিপূর্ণ ব্যবহার এখন করা হয়নি। আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি যে সরকার স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি গঠনের মাধ্যমে  করোনা মোকাবিলায় তাদের সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তবে এই বিপর্যয় মোকাবিলায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি অন্তর্ভুক্ত করা গেলে সরকারের দায়িত্ব অনেকাংশে লাঘব হতো। বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাপকতা গভীরভাবে উপলব্ধি করে সরকারের উচিত করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে স্থানীয় জনগণের করোনা অতিমারি সম্পর্কে সচেতন বৃদ্ধির মাধ্যমে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটানো।

লেখক: অধ্যাপক, লোক-প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

করোনাকালে জীবন, জীবিকা এবং লকডাউন দ্বন্দ্ব

করোনাকালে জীবন, জীবিকা এবং লকডাউন দ্বন্দ্ব

আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ

উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা ও করণীয়

উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা ও করণীয়

লকডাউন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত যে কারণে যুক্তিযুক্ত

লকডাউন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত যে কারণে যুক্তিযুক্ত

করোনাকালে গণমাধ্যম: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২১, ১৬:৩০
মো. সামসুল ইসলাম এই করোনাকালে আমাদের মিডিয়া জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে কিনা সেটা নিয়ে গণমাধ্যমের শিক্ষক, সমালোচক, ব্যবহারকারীরা প্রশ্ন তুলতে পারেন। তবে এসব প্রশ্নের উদ্দেশ্য কোনও ব্যক্তি সাংবাদিকদের বোধবুদ্ধিকে চ্যালেঞ্জ করা নয়। বরং শিল্প হিসেবে গণমাধ্যম যখন বহুমুখী সমস্যার সম্মুখীন তখন এ ধরনের আলোচনা গণমাধ্যমকে জনগণের প্রকৃত চাহিদা জানানোর প্রয়াস বলা যেতে পারে।

প্রথমেই বলতে চাই, এই করোনাকালে প্রাথমিকভাবে যে কয়েকটি শিল্প খাত অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিল তার মধ্যে গণমাধ্যম নিঃসন্দেহে একটি। শুধু তা-ই নয়, করোনায় অনেক সাংবাদিক আক্রান্ত হয়েছেন, অনেকে মারাও গিয়েছেন। তবে গণমাধ্যমের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা কিন্তু লক্ষণীয়।      

স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন দুর্নীতি উদঘাটনসহ, ভ্যাকসিন ইস্যুতে বাংলাদেশের মিডিয়া কভারেজ যেকোনও বিচারেই প্রশংসনীয় বলা যায়। দেশের পলিটিক্যাল-ইকোনমিক ইস্যুসমূহ আলোচনায় আমাদের গণমাধ্যমের রয়েছে বিশাল অভিজ্ঞতা ও ঐতিহ্য। সমসাময়িক বিভিন্ন ম্যাক্রো ইস্যুতে আমাদের গণমাধ্যম জনমত তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বাস্থ্য খাত, ভ্যাকসিন বা লকডাউনের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা অবশ্যই জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এবং সেখানে গণমাধ্যম তার ভূমিকা বেশ ভালোভাবেই পালন করেছে।

এ পর্যন্ত স্বীকার করতে আমার কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু গণমাধ্যম বিষয়ের একজন শিক্ষক বা সমালোচক হিসেবে নয়, বরং একজন সাধারণ পাঠক বা দর্শক হিসেবে  এই করোনাকালে মূলধারার গণমাধ্যমের আমি খুব একটা উপযোগিতা দেখিনি। পত্রিকার পাঠক সংখ্যা এ সময়ে হ্রাস পায়, রেডিও বা টেলিভিশনও জনগণের বিপদকালের বন্ধু হয়ে উঠতে পারেনি।  তৃতীয় বিশ্বে গণমাধ্যমের কাজতো শুধু জাতীয় ইস্যু আলোচনার মাধ্যমে নীতিনির্ধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করা নয়, বরং বিভিন্ন সংকট মুহূর্তে জনগণের পাশে থেকে সমস্যার বাস্তব সমাধান দেওয়া।

আমাদের কিন্তু এটা প্রথমেই বুঝতে হবে যে দেশের সাধারণ মানুষ এখন একদিকে করোনা ও অপরদিকে অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত। করোনা সংকট এখন দীর্ঘমেয়াদি হয়ে পড়েছে, দেশের গ্রামগঞ্জে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে করোনার প্রভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা ও কর্মসংস্থানে সংকট। শহর ছাড়ছে মানুষ। কিন্তু গ্রামে কর্মসংস্থান যথাযথ চিকিৎসা সেবা পাওয়া যথেষ্ট কঠিন। আবারও লকডাউন শুরু হয়েছে। সরকারি সাহায্য যে অপ্রতুল সেটা তো মিডিয়ায় অহরহই আসছে।

এরকম অবস্থায় গণমাধ্যম যদি তার প্রথাগত সাংবাদিকতার ধারণা থেকে বের হয়ে এসে জনগণের পাশে দাঁড়াতো তাহলে সাধারণ জনগণ নিশ্চয়ই উপকৃত হতো। পত্রিকায় একদিনে খুব বেশি আলোচনার অবকাশ নেই। আমি শুধু দুই একটা উদাহরণ দেই।

যেমন কোরবানি ঈদের আগে আমি দেখছিলাম ফেসবুকে কেউ কেউ জানতে চাইছিলেন যে তাদের কোরবানিটা গরিবদের মাঝে দেওয়ার কোনও ব্যবস্থা আছে কিনা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যদি নিজের নামে কোরবানি দিয়ে সেখানকার গরিবদের মাঝে মাংস বিতরণের কোনও ব্যবস্থা থাকে, আমার বিশ্বাস অনেকেই এগিয়ে আসতেন। আমি দেখেছি আমার পরিচিতদের মধ্যে অনেকেই এরকম চিন্তা করছিলেন।  কিন্তু দুই একটা ছাড়া খুব বেশি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানের আমি নাম দেখলাম না।

গণমাধ্যম তো পারতো মানুষজনকে এতে উদ্বুদ্ধ করতে। আমাদের মূলধারার গণমাধ্যমের দেশব্যাপী যে বিশাল নেটওয়ার্ক, তাদের পক্ষে সহজ ছিল চ্যারিটি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে ভেরিফাই করে শহরবাসীকে তাদের দানের ব্যাপারে আশ্বস্ত করা। ধর্মীয় নিয়ম অনুসারে কোরবানির টাকা মানুষকে সরাসরি দান করা যায় না। আমি এ কারণেই এটা লিখছি যে  এই ঈদে ঢাকায় আমার এলাকায় খুব বেশি ভিক্ষুক দেখি না। লকডাউনের ঘোষণায় অনেকেই ঢাকা ছেড়ে গেছে। করোনায় আক্রান্তদের ডাক্তাররা প্রোটিন খেতে বলছেন। সঠিক ব্যবস্থাপনায় ধনীরা পারতো গ্রামাঞ্চলে গরিবদের প্রোটিনের চাহিদা কিছুটা পূরণ করতে। এ ব্যাপারে মিডিয়া একটা ভূমিকা রাখতে পারতো।

তবে এসব বলার অর্থ এই নয় যে আমি জনগণের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র বা সরকারের দায়িত্বকে অস্বীকার করতে চাইছি। গণমাধ্যম অবশ্যই সরকারকে চাপ দিবে খাদ্য সাহায্য, আর্থিক প্রণোদনা, চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে। কিন্তু আমরা তো বাস্তব অবস্থা দেখছি। জানছি মানুষজনের দুর্দশার অবস্থা, গণমাধ্যমেই পড়ছি বিভিন্ন পরিসংখ্যান। সাহায্য প্রত্যাশী আর সাহায্য প্রাপ্তদের সংখ্যায় রয়েছে বিশাল ফারাক। সর্বোপরি সরকারি নেতারাই তো প্রতিদিন বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে বলছেন।

কোরবানি তো একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, কিন্তু সহায়তা  তো সারা বছরই করা যেতে পারে বা উচিত। একজন নাগরিক তো প্রশ্ন করতেই পারেন যে গণমাধ্যম খবর দিচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের কষ্টের কথা, জানাচ্ছে সন্তানকে খাবার দিতে না পেরে অসহায় পিতার আত্মহত্যার কথা, কিন্তু কার কী কর্তব্য আর বিত্তবানরা কোথায় কীভাবে কাকে সাহায্য করতে পারেন সে তথ্য দিচ্ছে না। অনেক শহুরে মধ্যবিত্তের অনেকেই খুব কষ্ট পান যখন গণমাধ্যমে এ ধরনের খবর দেখেন এবং নিজেকে অপরাধী মনে করেন এটা ভেবে যে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বা কর্মহীন মানুষদের রেখে সবাই তিনবেলা পেটপুরে খাচ্ছেন। আমি দেখেছি অনেকেই চান যে এই ক্রান্তিকালে তাদের সামান্য আয়ের কিছু অংশ প্রকৃত অনাহারীর কাছে যাক। কিন্তু গণমাধ্যমের কাছে এ তথ্য কেউ পাচ্ছে না। কেউ নিশ্চয়তা দিচ্ছে না তার অর্থ প্রকৃত অভাবীরা পাবেন।

বাঙালি দানশীল, আবেগপ্রবণ। তারা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছেন। কিছু দিন আগে আমি দেখলাম যে নির্যাতিত প্যালেস্টাইনিদের নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় টাকা উঠানো হচ্ছে এবং অনেকেই নাকি বিশাল অংক দান করেছে। যদিও পরে এ টাকা আদতে কে পাবে সেটা নিয়েও ফেসবুকে বিতর্ক দেখেছি। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়াকে তো বিশ্বাস করা যায় না। আমার এক পরিচিত ব্যক্তি শুনলাম ফেসবুক দেখে করোনা রোগীদের দাফন কাফনের জন্য নাকি বিশাল অংক দান করেছেন। যেহেতু মূলধারার মিডিয়া এ সংক্রান্ত কোনও তথ্য দেয়নি তার টাকা আসলে কে পেয়েছে, সেটা নিয়ে আমিও সন্দিহান।

যাহোক সঠিকভাবে উপস্থাপনা করতে পারলে গণমাধ্যম কিন্তু মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে। আমি আমার একটা নিজের ঘটনাই বলি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পরপরই আমি একটা ইংরেজি সাপ্তাহিকে সম্পাদনা সহকারী বা এডিটোরিয়াল এসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দেই। সেই সাপ্তাহিকেরই একজন প্রতিনিধি একদিন আমাকে এক রিকশাওয়ালাকে সাহায্যের আবেদন জানিয়ে এক লেখা এনে দেয়, যার দুই মেয়ে থ্যালাসেমিয়ায় ভুগছে। সেই সাংবাদিক আমাকে অনুরোধ করেন লেখাটিকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে সাপ্তাহিকে প্রকাশ করতে। আমি খুব একটা গুরুত্ব না দিয়ে লেখাটিকে ডেস্কে ফেলে রাখি। এরকম কত লেখাই তো পত্রিকায় আসে! তাছাড়া এই দুর্বল বাংলাকে কষ্ট করে ইংরেজি করতে হবে, সেই ঝামেলা তো ছিলই।    

আমি যথারীতি সেই লেখার কথা ভুলে যাই। দুই এক সপ্তাহ পরে সেই সাংবাদিক আবার আমাকে বলেন যে মেয়ে দুইটার অবস্থা ভালো না, অমুক হাসপাতালে তারা ভর্তি আছে, আপনি দেখেন কোনও নিউজ করা যায় কিনা!

আমার মনে হলো যে আমি হুঁশ ফিরে পেলাম। সেদিন ছিল সাপ্তাহিকটি প্রকাশের দিন। সব কাজ ফেলে আমি আগে সেটিকে অনুবাদ করলাম। তারপর সেদিনই সংবাদটি প্রকাশিত হলো।

এরপর যা হলো তা অভাবনীয়! দেশ-বিদেশ থেকে বিভিন্নজন আমাদের ফোন করা শুরু করলো। আমি শুনলাম অনেকে হাসপাতালে ছুটে গিয়েছে তাদের সাহায্য করতে। কিছু দিন পর এক পাঁচতারকা হোটেল তাদের পুরনো ঝাড়বাতি বিক্রির সমস্ত টাকা সেই মেয়ে দুইটাকে দান করে। তারা নিঃসন্দেহে উপকৃত হয়েছেন। আমি এটুকুই জানি। এরপরে কী ঘটেছে তা আমি জানি না।

সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা করলেও এই ঘটনার মাধ্যমে গণমাধ্যম বা সাংবাদিকতার শক্তি সম্পর্কে আমার প্রথম চাক্ষুষ ধারণা হয়। পরবর্তীতে এরকম আরও ঘটনা দেখেছি বা জেনেছি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে গিয়ে সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের আমি প্রায়শই বলি, সঠিক ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য এবং স্টোরিটেলিংয়ের মাধ্যমে একজন সাংবাদিক পারেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের আবেগ, অনুভূতিকে আলোড়িত করতে, আর্ত মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসতে।

এক্ষেত্রে পশ্চিমা সাংবাদিকতার টেক্সট আর তাদের সাংবাদিকতা শিক্ষার হুবহু অনুকরণ আমাদের জন্য ফলদায়ক হবে না। পশ্চিমা দেশগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী আর আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি দুর্বল। সুতরাং সব দেশে একই ধরনের সাংবাদিকতা চলতে পারে না।  একদিকে ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতি অন্যদিকে লকডাউন, এ সময়ে আর্তমানবতার পাশে দাঁড়াতে আমাদের সাংবাদিকতাকে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে হবে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি।

লেখক: কলামিস্ট; প্রধান, সাংবাদিকতা বিভাগ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

ইমেইলঃ [email protected]
 
       
/এসএএস/এমওএফ/

বডি শেমিং ও আমাদের ‘বাজারি মন’

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২১, ১৭:২৪

জোবাইদা নাসরীন স্কুলে সহপাঠীরা, শিক্ষকরা তাকে বুলিং করতো। স্কুলের খেলায় অংশ নিতে চাইলেও শিক্ষকরা তাকে বুলিং করেন। তারপর থেকে সামীন খুব বেশি আপসেট হয়ে পড়ে এবং ওজন কমানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। বাবা-মা প্রথম দফায় তার ওজন কমাতে খুশি হলেও বুঝতে পারেননি তার সন্তান কীভাবে মানসিক এবং শারীরিকভাবে মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে। তারপর আমরা জেনেছি সেই সামীনের মৃত্যুর কথা। আমরা আরও জেনেছি বিরল রোগ অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসায় আক্রান্ত হয়ে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বনশ্রী শাখার দশম শ্রেণির ছাত্র সামীনের মৃত্যুর কথা।

স্কুলের সহপাঠী ও শিক্ষকদের বুলিংয়ের শিকার হয়ে সামীনের এই মর্মান্তিক পরিণতি। সামীনের মৃত্যুর মাধ্যমে আমরা এই রোগ সম্পর্কে তথ্যও জেনেছি। অ্যানোরেক্সিয়া নারভোসা একটি বিরল রোগ, যা ব্যক্তির মনোজগতে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে ভয়াবহ ভীতি ও নানা ধরনের মানসিক সমস্যা তৈরি করে। আক্রান্ত ব্যক্তি অনেক সময়ই না খেয়ে কিংবা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম খেয়ে ওজন কমাতে চান এবং নিজের ওজন নিয়ে সব সময় মানসিক অস্বস্তিতে থাকেন। ওজন বেড়ে যাওয়া নিয়ে সব সময় এক ধরনের ভয়ে থাকেন।  

শুধু সামীন নয়, আশপাশের অনেককেই দেখি মোটা বলে, গায়ের রঙ কালো বলে, খাটো বলে নানা ধরনের বুলিংয়ের শিকার হন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়ে গত দুই বছর আগে একজন ছাত্র আত্মহত্যা করেছিল। সেই ছেলেটির গায়ের রঙ কালো ছিল, দেখতে প্রচলিত ধারায় ‘স্মাট’ ছিল না। সে গ্রাম থেকে আসা– আরও কত কী! সে জন্য সব সময় বুলিংয়ের শিকার হতো।

আমার বিভাগের  এক শিক্ষার্থী বেশ কয়েক মাস ক্লাসে অনুপস্থিত ছিল বলে আমি তখন তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানতে পারি, ওই শিক্ষার্থী তার সহপাঠীদের দ্বারা নানা ধরনের বডি শেমিংয়ের শিকার হন। এমনকি সে যখন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতো তার সহপাঠীরা বলতো সিঁড়ি ভেঙে যাবে, লিফটে উঠলে বলতো লিফট ছিঁড়ে পড়ে যাবে। এরপর সেই শিক্ষার্থী ক্লাসে আসা বন্ধ করে দিলো এবং মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। তার পিতামাতা সচেতন ছিলেন বলে হয়তো বিষয়টি পরবর্তীতে সামাল দেওয়া গেছে এবং মেয়েটি বড় কোনও দুর্ঘটনার শিকার হয়নি।

‘বডি শেমিং’ শব্দটার সঙ্গে এ দেশের মানুষ খুব বেশি পরিচিত ছিল না, বরং আমাদের ছোটবেলায় বাচ্চাদের ক্ষেত্র নাদুস-নুদুস অথবা ‘সুইট ফ্যাট’ শব্দগুলোর প্রচলন ছিল বেশি। কিন্তু তখন বডি শেমিং বা শরীর নিয়ে নানা ধরনের ব্যঙ্গ বিদ্রুপের চল খুব একটা ছিল না। এমনকি আমরা শুনতাম ঢাকাই ছবির নায়িকাদের মানুষের কাছে আরও আদৃত হওয়ার জন্য বাড়তি প্যাড পরিয়ে স্বাস্থ্যবান বানানো হতো। কারণ, তখন পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ এই বডি শেমিংয়ের মধ্যে নিজেদের ঢুকাতে পারেনি।

এখন আমরা যদি দেখি এই বডি শেমিং কী এবং কেন এটি এখন এত বেশি চর্চিত হচ্ছে? বডি শেমিং নামক নিপীড়ন থেকে কোনও বয়সের মানুষই রেহাই পাচ্ছে না। বডি শেমিং হলো কোনও ব্যক্তির শরীর নিয়ে মন্তব্য করে তাকে হেনস্তা করা। পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশে কারও শরীর নিয়ে যেকোনও মন্তব্য করাকে যৌন হয়রানি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ আমাদের দেশে জারি থাকা বডি শেমিংকে অনেক সময় ঠাট্টা-মশকরার বিষয় হিসেবে পাঠ করা হয় এবং এর মধ্য দিয়ে কাউকে তার শরীরের বিষয়ে লজ্জা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিষয়টি যে মোটেও কোনও হাস্যকর কিংবা ঠাট্টার নয়, এটি এত বেশি রাজনৈতিক বিষয়, সামীনের মৃত্যু আমাদের তা দেখিয়ে দিলো।

কবে থেকে এই বডি শেমিং শুরু হলো। মানুষকে দেহের মাপকাঠিতে মাপা এবং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা। বেশ কয়েক বছর আগে একটি ফার্নিচার কোম্পানির বিলবোর্ডে দেওয়া একটি খাটের বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল , ‘স্লিম ইজ বিউটিফুল’। তাহলে কোম্পানিগুলো প্রচার করতে থাকে যে স্লিম হওয়াই কাঙ্ক্ষিত। তখন সমাজ সেটিকেই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে। কিংবা  বিপরীতটাও হতে পারে। খুব মজার বিষয় হলো, আমাদের ছোটবেলায় আমরা বেশ ‘নাদুস-নুদুস’ পুতুল বাজারে দেখতাম। কিন্তু যখন থেকে বার্বিডল বাজারে এলো, সেভাবে নারীর শরীরের স্ট্যান্ডার্ড পরিমাপ নির্ধারণ করা শুরু হলো। শুরুটা নারীকে নিয়ে হলেও এখন বাদ যাচ্ছে না পুরুষও।

শুধু শরীরের বাড়তি ওজন নিয়েই নয়, গায়ের রঙ নিয়ে সবচেয়ে বেশি শেমিং হয় তবে আমাদের সমাজে অনেকটাই গা সওয়া হয়ে গেছে। তবে এটি এখন পৌঁছেছে বিভিন্ন অঙ্গ -প্রত্যঙ্গ পর্যায়ে। বিশ কয়েক বছর আগে আমাদের এক নারী শিক্ষার্থী মুখে নেকাব পরে আসতে। নেকাবের কারণে তার কথা বোঝা যেত না। একদিন তাকে বললাম এখন তো আশপাশে কেউ নেই, তুমি নেকাব খুলে কথা বলতে পারো। মেয়েটি কিছু বললো না, নেকাবও খুললো না। পরে জানতে পারলাম মেয়েটির দাঁত কিছুটা উঁচু বলে তার রুমমেটসহ অন্যরা তাকে নিয়ে খুব হাসাহাসি করতো। এই হাসাহাসির কারণে মেয়েটির মানসিক অবস্থা পরবর্তীতে এমন হয়েছিলে যে সে রাতে ঘুমানোর সময়ও নেকাব পরতো। মানে তার দাঁত যেন কেউ দেখতে না পায়। এর বাইরেও যাদের কথা বলায় একটু জড়তা আছে তাদের ‘তোতলা’ কিংবা অন্য যেকোনও ধরনের শারীরিক অসামর্থ্যতা আছে তাদের নানা কটু ‘পদবি’ দিয়ে হেয় করার প্রবণতা খুবই প্রকট।

শরীর নিয়ে লজ্জা, গায়ের রঙ নিয়ে লজ্জা, দাঁত-চোখ নিয়ে লজ্জা দিয়ে, হেয় করে আমরা একে অপরকে মৃত্যুর দিকে যেমন নিয়ে যাই, তেমনই নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসের পরিবর্তে ঘৃণা করার মনস্কতা তৈরি করাই।

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন বুলিং, শেমিং অহরহ ঘটছে। এটি রোধে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রে ডিসিপ্লিনারি কমিটিগুলোকে জোরালোভাবে কাজ করতে হবে। এই বুলিং এবং শেমিংয়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা অত্যন্ত জরুরি।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: [email protected]gmail.com

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

কয়লা হয়ে বস্তায় ঢোকা জীবন

কয়লা হয়ে বস্তায় ঢোকা জীবন

তদন্ত কমিটির রিপোর্টগুলো কোথায় যায়?

তদন্ত কমিটির রিপোর্টগুলো কোথায় যায়?

মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন ‘কেন গেলো’ প্রশ্নে

মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন ‘কেন গেলো’ প্রশ্নে

কল্পনা চাকমা সব সময়ই জাগরুক

কল্পনা চাকমা সব সময়ই জাগরুক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

তালেবান উত্থানে একঘরে ভারত

তালেবান উত্থানে একঘরে ভারত

কারখানার আগুনের দায় তাহলে কার?

কারখানার আগুনের দায় তাহলে কার?

টিকা ছাড়া লকডাউন-শাটডাউনে কাজ হবে না

টিকা ছাড়া লকডাউন-শাটডাউনে কাজ হবে না

তারেক জিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

তারেক জিয়ার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

গুম না আত্মগোপন: রহস্যভেদের দায়িত্ব কার?

গুম না আত্মগোপন: রহস্যভেদের দায়িত্ব কার?

মার্কিন সেনা প্রত্যাহার কি তালেবানদের ক্ষমতায় ফেরাবে?

মার্কিন সেনা প্রত্যাহার কি তালেবানদের ক্ষমতায় ফেরাবে?

জলাবদ্ধ চট্টগ্রাম নগরবাসী

জলাবদ্ধ চট্টগ্রাম নগরবাসী

ভাসানচরের রোহিঙ্গারা

ভাসানচরের রোহিঙ্গারা

বাংলাদেশের স্পর্শকাতর ইসরায়েল ইস্যু

বাংলাদেশের স্পর্শকাতর ইসরায়েল ইস্যু

সাংবাদিকের গলা চেপে ধরে কার লাভ হচ্ছে!

সাংবাদিকের গলা চেপে ধরে কার লাভ হচ্ছে!

তালেবানদের হাতে বন্দি আমি: বুঝলাম মৃত্যু ভয় কী!

তালেবানদের হাতে বন্দি আমি: বুঝলাম মৃত্যু ভয় কী!

পশ্চিমবঙ্গে মমতার জয়: বাংলাদেশের কী লাভ!

পশ্চিমবঙ্গে মমতার জয়: বাংলাদেশের কী লাভ!

সর্বশেষ

লকডাউন বিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল দেশে দেশে

লকডাউন বিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল দেশে দেশে

ভূমধ্যসাগরে ৫৭৬ অভিবাসন প্রত্যাশী উদ্ধার

ভূমধ্যসাগরে ৫৭৬ অভিবাসন প্রত্যাশী উদ্ধার

অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা

অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা

১৫৫ কিলোমিটার বেগে চীনে আঘাত হানছে টাইফুন 'ইন-ফা'

১৫৫ কিলোমিটার বেগে চীনে আঘাত হানছে টাইফুন 'ইন-ফা'

স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া, পিটিয়ে হত্যার পর ভাসিয়ে দিলেন লাশ

স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া, পিটিয়ে হত্যার পর ভাসিয়ে দিলেন লাশ

লকডাউনের দ্বিতীয় দিনে ময়মনসিংহে ৪৩৫টি মামলা

লকডাউনের দ্বিতীয় দিনে ময়মনসিংহে ৪৩৫টি মামলা

মাছটি বিক্রি হলো সাড়ে ৪ লাখ টাকায়

মাছটি বিক্রি হলো সাড়ে ৪ লাখ টাকায়

শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ৭০ বছরের বৃদ্ধ গ্রেফতার

শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ৭০ বছরের বৃদ্ধ গ্রেফতার

তালেবানের উত্থান, আফগানিস্তানে কারফিউ জারি

তালেবানের উত্থান, আফগানিস্তানে কারফিউ জারি

খেলায় লাল কার্ড দেখানো নিয়ে সংঘর্ষে আহত অর্ধশতাধিক

খেলায় লাল কার্ড দেখানো নিয়ে সংঘর্ষে আহত অর্ধশতাধিক

মাইকে ঘোষণা দিয়ে ২ গ্রামবাসীর সংঘর্ষ

মাইকে ঘোষণা দিয়ে ২ গ্রামবাসীর সংঘর্ষ

অনলাইনে ভিসা সেবা দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ

অনলাইনে ভিসা সেবা দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune