X
সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

অবৈধ ইসরায়েলের আগ্রাসন ও মুসলিম উম্মাহর নেতাদের নীরবতা

আপডেট : ১৫ মে ২০২১, ২৩:১৭
মো. জাকির হোসেন করোনার তাণ্ডবের মাঝে বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা যখন সীমিত পরিসরে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি গ্রহণ করছে, ফিলিস্তিনি মুসলমানরা তখন আগ্রাসী ইসরায়েলের কামান আর বিমান থেকে বোমাবৃষ্টির ভয়ে প্রাণ নিয়ে এদিক-সেদিক দৌড়াচ্ছে। বিশ্বের অন্য মুসলমানরা যখন পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদের দিনের আনন্দ উপভোগ করছেন, ফিলিস্তিনিরা তখন মৃত স্বজনের লাশ দাফন কিংবা বোমা-গুলিতে ক্ষতবিক্ষত স্বজনদের প্রাণ বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। হামাসের কিছু সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা ছাড়া নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর দখলদার ইসরায়েলের আগ্রাসনে মাত্র ১৬০টি জঙ্গি বিমানের পাশাপাশি অত্যাধুনিক ট্যাংক, কামান, ড্রোন, গানবোট থেকে বোমা-গোলা-ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হচ্ছে। ইহুদি আগ্রাসনের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যখন ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের আগ্রাসনকে আত্মরক্ষার অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন মুসলিম উম্মাহ’র নেতারা তখন তাদের ইহুদি-নাসারা প্রভুদের খুশি রাখতে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েলকে দখলদার হিসাবে উল্লেখ করে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক অভিযানকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসাবে অভিহিত করেছেন। নামাজরত মুসল্লি ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ইসরায়েলের আক্রমণকে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের চরম লংঘন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণা করে স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। কেউ কেউ হয়তো বলবেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান তো ইসরায়েলকে কঠিন শাস্তি দেওয়ার কথা বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি নিপীড়নে তুরস্ক চুপ থাকবে না বলে হুমকি দিয়েছেন। তাদের বিনয়ের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম মুসলিম-প্রধান দেশ তুরস্ক। ১৯৪৯ সালে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া তুরস্ক দীর্ঘ ছয় দশক দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিল ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে। ২০০২ সালে এরদোয়ান ক্ষমতায় আসার আগে দেশ দুটি বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা ও পর্যটন খাতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিল। ক্ষমতায় আসার পর এরদোয়ান ২০০৫ সালে শান্তির বার্তা নিয়ে ইসরায়েল সফরও করেছিলেন। ২০১০ সালে খাদ্য-ওষুধ সহায়তা নিয়ে গাজামুখী নৌকা ‘মাভি মারমারা’য় হামলা চালিয়ে ইসরায়েল নয় তুর্কি নাগরিক ও এক আমেরিকান-তুর্কি সহায়তা কর্মীকে হত্যা করায় দুই দেশের দীর্ঘ ৬০ বছরের সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকে। তবে ২০১৮ সালে জেরুসালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে প্রতিবাদ হিসেবে ইসরায়েল থেকে রাষ্ট্রদূত সরিয়ে নেয় তুরস্ক। দেশ দুটিতে একে অপরের দূতাবাস থাকলেও শীর্ষ পর্যায়ের কূটনীতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে তেল আবিব ও আঙ্কারা। তারপরও দেশ দুটির মধ্যে বাণিজ্য চলেছে পুরোদমে।

গত আট বছরে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়েছে দেশ দু’টির মধ্যে। তার মানে প্রতিবছর বাণিজ্য হয়েছে ছয় বিলিয়ন ডলারের মতো। অতি সম্প্রতি তুরস্কের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে ইসরায়েলের হেইমন সংবাদপত্র জানিয়েছে, তেলআবিবে একজন রাষ্ট্রদূত পাঠানোর কথা গত ২৯ মার্চ ইসরায়েলকে জানিয়েছে তুরস্ক। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-মনিটর জানিয়েছে, ‘ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে গবেষক উফুক উলুতাসকে রাষ্ট্রদূত করে তেলআবিবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে তুরস্ক।’ একদিকে ইসরায়েলকে হুমকি অন্যদিকে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুরোদস্তুর চালিয়ে যাওয়ার এ দ্বিচারিতা দিয়ে ইসরায়েলকে কেমনে কঠিন শাস্তি দেওয়া যাবে তা পাঠকরাই বিবেচনা করবেন। যে তুরস্কের এত হম্বিতম্বি, সেই তুরস্ক আসলে কী করছে? তুরস্কের সামরিক বাহিনী ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি।

অনেকে এরদোয়ানকে মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে, মুসলিম বিশ্বের কর্ণধার হিসেবে, মুসলিম বিশ্বের নতুন সালাহউদ্দিন আইয়ুবী হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। তুরস্ক লিবিয়ায়, সিরিয়ায়, ইরাকে, আজারবাইজানে, সোমালিয়ায়, এমনকি ইউক্রেনেও লড়াই করছে বিশ্বের অনেক পরাশক্তির বিরুদ্ধে কিন্তু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনও অ্যাকশন নেই তুরস্কের। এরদোয়ান মুখে হাঁকডাক করলেও তলে তলে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করছেন।

শিরোনামে আমি ইসরায়েলকে অবৈধ বলেছি। এর পেছনে কী যুক্তি আছে? অবশ্যই ইসরায়েল অবৈধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উসমানীয় সাম্রাজ্যের দক্ষিণ সিরিয়া অংশ থেকে আলাদা করা ফিলিস্তিন ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনে পরিচালিত একটি ভৌগোলিক অঞ্চল ছিল। ১৯২০ থেকে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ব্রিটিশ বেসামরিক প্রশাসন ফিলিস্তিন পরিচালনা করে। ব্রিটিশরা ১৯২২ সালের জুন মাসে বিলুপ্ত লীগ অব নেশনস থেকে ফিলিস্তিনের জন্য কর্তৃত্ব লাভ করে। স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে অভ্যুদয়ের পূর্বে অন্তবর্তীকালীন সময়ের জন্য ফিলিস্তিনের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ব্রিটিশ সরকারের অভিবাবকত্বের অধীন করা হয়। লীগ অব নেশনস-এর গঠনতন্ত্রের ২২নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ব্রিটেনকে এই কর্তৃত্ব দেওয়া হয়। সাবেক উসমানীয় সাম্রাজ্যের অধিকৃত অঞ্চলগুলো নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আগ পর্যন্ত পরিচালনার জন্য কর্তৃত্ব প্রদান প্রথা চালু করা হয়েছিল লীগ অব নেশনস-এর গঠনতন্ত্রের ২২নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী। লীগ অব নেশনস-এর গঠনতন্ত্রের ২২নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “To those colonies and territories which as a consequence of the late war have ceased to be under the sovereignty of the States which formerly governed them and which are inhabited by peoples not yet able to stand by themselves under the strenuous conditions of the modern world, there should be applied the principle that the well-being and development of such peoples form a sacred trust of civilisation and that securities for the performance of this trust should be embodied in this Covenant. The best method of giving practical effect to this principle is that the tutelage of such peoples should be entrusted to advanced nations who by reason of their resources, their experience or their geographical position can best undertake this responsibility, and who are willing to accept it, and that this tutelage should be exercised by them as Mandatories on behalf of the League. The character of the mandate must differ according to the stage of the development of the people, the geographical situation of the territory, its economic conditions and other similar circumstances.

Certain communities formerly belonging to the Turkish Empire have reached a stage of development where their existence as independent nations can be provisionally recognized subject to the rendering of administrative advice and assistance by a Mandatory until such time as they are able to stand alone. The wishes of these communities must be a principal consideration in the selection of the Mandatory………..”

লীগ অব নেশনস কর্তৃক ব্রিটেনকে কর্তৃত্ব প্রদত্ত দুটি অঞ্চল ছিল। একটি জর্ডান নদীর পশ্চিম অংশ যা ফিলিস্তিন বলে পরিচিত ছিল। এই অংশ ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আরেকটি অংশ ছিল পূর্ব তীরের ট্রান্সজর্ডান যা আধা স্বায়ত্তশাসিত হিসেবে পরিচালিত হচ্ছিল। ট্রান্সজর্ডান ১৯৪৬ সালে স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৮ সালে নাম বদলে জর্ডান রাখা হয়। কিন্তু ফিলিস্তিনের জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে ব্রিটেন। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকরা ১৯১৭ সালে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। সেই সময়ের ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর-এর নাম অনুসারে এটি বেলফোর ঘোষণা হিসেবে খ্যাত। ইহুদি রাষ্ট্র বাস্তবায়ন করতে ব্রিটিশ শাসকরা বিপুল সংখ্যক ইহুদি ইউরোপ থেকে ফিলিস্তিনে এনে জড়ো করতে থাকে। ১৯০৫ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার। কিন্তু ১৯১৪ সাল থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ১৯১৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশদের সহযোগিতায় ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা ২০ হাজারে উন্নীত হয়। এরপর প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসীদের ধরে এনে জড়ো করা শুরু হলে ১৯১৯ থেকে ১৯২৩ সাল নাগাদ ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা ৩৫ হাজারে পৌঁছে যায়। ১৯৩১ সালে ইহুদিদের এই সংখ্যা প্রায় ৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৮০ হাজারে পৌঁছায়। এভাবে ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে থাকে এবং ১৯৪৮ সালে সেখানে ইহুদিদের সংখ্যা ৬ লাখে উন্নীত হয়। ১৯১৮ সালে ব্রিটেনের সহযোগিতায় গুপ্ত ইহুদি সন্ত্রাসী বাহিনী ‘হাগানাহ’ গঠিত হয়। এ বাহিনী ইহুদিবাদীদের রাষ্ট্র তৈরির কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাগানাহ-র পাশাপাশি ইরগুন ও স্ট্যার্ন গ্যাং হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ আর ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে নিরীহ ফিলিস্তিনদের বাধ্য করে নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যেতে। ফিলিস্তিনিদের জমিজমা ইহুদিরা দখল করে নেয়। ১৯২২ সালে ইসরায়েলে ইহুদি ছিল মাত্র ১২ শতাংশ, ১৯৩১ সালে তা হয় ২৩ শতাংশ, আর ১৯৪৭ এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ শতাংশে। ব্রিটিশদের পর ফিলিস্তিনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ। ফিলিস্তিন বিষয়ে লীগ অব নেশনস কর্তৃক ব্রিটিশ সরকারকে প্রদত্ত কর্তৃত্বের শর্ত ও বিলুপ্ত লীগ অব নেশনসের গঠনতন্ত্রের ২২নং অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে জাতিসংঘ। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডকে দ্বিখণ্ডিত করা সংক্রান্ত ১৮১ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী ৪৫ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের এবং বাকি ৫৫ শতাংশ ভূমি ইহুদিবাদীদের দিয়ে মুসলমান ও ইহুদিদের জন্য দু’টি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। আরব রাষ্ট্রসমূহ জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে বলে যে, কেবল ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপান্তরই ম্যান্ডেটের উদ্দেশ্যের যৌক্তিক পরিণতি লাভ করবে ও জাতিপুঞ্জের সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। আরব রাষ্ট্রসমূহ জাতিসংঘকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে, ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান ব্যতীত সাধারণ পরিষদের আর কোনও সুপারিশ করার এখতিয়ার নেই। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করা জাতিসংঘ সনদের নীতিমালার পরিপন্থী এবং নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টি করার এখতিয়ার জাতিসংঘের নেই। সাধারণ পরিষদ কোনও বৈশ্বিক সরকার নয়, কোনও রাষ্ট্রের জনগণের সম্মতি ব্যতিরেকে ওই রাষ্ট্রকে ভাগ করার, বিধিবিধান তৈরি করার, কোনও চুক্তি চাপিয়ে দেওয়ার এখতিয়ার সাধারণ পরিষদের নেই। এদিকে ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা Arab Higher Committee ১৯৪৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ মহাসচিব বরাবরে এক লিখিত আবেদনে জানায় যে, ফিলিস্তিন বিভাজনের সিদ্ধান্ত জাতিসংঘের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। জাতিসংঘ সনদের কোথাও সাধারণ পরিষদকে কোনও রাষ্ট্র বিভাজন করে নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টির ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি। ফলে সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত আইন ও ক্ষমতা-বহির্ভূত বিধায় বাতিল। Arab Higher Committee ফিলিস্তিন বিষয়ে আইনগত মতামতের জন্য বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে প্রেরণেরও দাবি জানায়। কিন্তু সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক আদালতের মতামত গ্রহণের বিষয়টি কখনোই পরিষদের আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেনি। এমতাবস্থায় Arab Higher Committee জাতিসংঘকে জানিয়ে দেয় ফিলিস্তিনি জনগণের মতামতকে অগ্রাহ্য করে জবরদস্তিমূলক বিভাজন করে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলে Committee তাকে আগ্রাসন বলে বিবেচনা করবে এবং আত্মরক্ষার্থে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও এ অবৈধ সিদ্ধান্ত প্রতিহত করবে। নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি চীনের প্রতিনিধি মত দেন যে, নিরাপত্তা পরিষদ সৃষ্টি করা হয়েছে বিশ্ব শান্তি বজায় রাখার জন্য। এটি খুবই দুঃখজনক হবে, রাষ্ট্রভাগের নাম করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে জাতিসংঘ নিজেই যদি যুদ্ধের কারণ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এমন পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সরকার ১৫ মে ১৯৪৮ তারিখে ফিলিস্তিনের ওপর লীগ অব নেশনস কর্তৃক প্রদত্ত তাদের কর্তৃত্বের (ম্যান্ডেট) অবসানের ঘোষণা দেয়। ব্রিটিশ সরকারের ম্যান্ডেট অবসানের সময়সীমার মধ্যে প্যালেস্টাইন বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত না হলে ব্যাপক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা করা হয়। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি ওয়ারেন অস্টিন প্রস্তাব করে –

এক. ব্রিটিশ ম্যান্ডেট অবসানের পর প্যালেস্টাইনের বিষয়ে তদারকি করার জন্য একটি ট্রাস্টিশিপ গঠন করা হোক যাতে আরব ও ইহুদিরা আরও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মতৈক্যে পৌঁছার সুযোগ পায়।

দুই. উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করে সমাধানের নতুন উদ্যোগ নেওয়া হোক।

তিন. বিশেষ অধিবেশনের সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রভাগের পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে U.N. Palestine Commission কে নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হোক।

অন্যদিকে, কানাডার প্রতিনিধি আরও বিকল্প খোঁজার আহ্বান জানান। এমনকি সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করে এক রাষ্ট্র সমাধানকেও কানাডা সমর্থন করে বলে কানাডার প্রতিনিধি নিরাপত্তা পরিষদের সভায় মত দেন।

এমন পরিস্থিতিতে ইহুদিদের সংগঠন Jewish Agency for Palestine-এর পক্ষ থেকে প্যালেস্টাইনের তদারকির জন্য কোন ট্রাস্টিশিপ গঠনকে সরাসরি নাকচ করে দেওয়া হয় এ মর্মে যে, এটি ইহুদিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাধা। উদ্বেগাকুল এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে ১৪ মে ১৯৪৮ সালে ইহুদিরা একতরফা ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। তাদের ঘোষণার ভিত্তি হিসেবে সাধারণ পরিষদের ১৮১নং সিদ্ধান্তকে উল্লেখ করে যেখানে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের কথা রয়েছে। সাধারণ পরিষদের যে ১৮১ নং সিদ্ধান্তকে ইসরায়েল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে তা নিরাপত্তা পরিষতে অনুমোদিত হয়নি। তদুপরি এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশন আহ্বানের অপেক্ষায় ছিল জাতিসংঘ। আমাদের বাংলাদেশে ভূমিদস্যু বা ভূমিখেকোরা যেমন অন্যের জমি জোর করে দখল করে নিয়ে নিজের নামে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে আবাসিক, বাণিজ্যিক প্লট, ভবন তৈরি করে মালিক বনে যায়, আন্তর্জাতিক ভূমিদস্যু ইসরায়েলও তেমনই ফিলিস্তিনিদের জমি-বাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জোর করে দখল করে নিয়ে নাম দিয়েছে ইসরায়েল। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী একটি রাষ্ট্র গঠনের জন্য ন্যূনতম চারটি উপাদানের উপস্থিতি আবশ্যক। এগুলো হলো- একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী, একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, একটি কার্যকর সরকার ও সার্বভৌমত্ব। ইহুদিদের একটি জনগোষ্ঠী থাকলেও অন্য তিনটি উপাদান অনুপস্থিত ছিল। যে ভূখণ্ডে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষিত হয়েছে তা ছিল ফিলিস্তিনিদের। ১৪ মে ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণা করা হলেও সেই রাষ্ট্রের তখনও কোনও সরকার ছিল না।

ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্মের ৩ দিন পর (১৭ মে ১৯৪৮) ড্যাভিড বেন গুরিয়ন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। সরকারবিহীন ও অন্যের মালিকানাধীন ভূখণ্ডে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন অবান্তর। আশপাশের আরব দেশগুলো ইসরায়েলের এ সিদ্ধান্ত মেনে না নিয়ে হামলা চালালে ইসরায়েল, ফিলিস্তিনের পুরোটাই দখল করে নেয় (শুধু গাজা মিসরের দখলে, এবং পশ্চিম তীর জর্ডানের দখলে ছিল)। আরব এবং ইসরায়েলের মধ্যে ক্রমাগত তিক্ততা এবং সীমান্তে ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ১৯৬৭ সালে আবার আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হয়। পাঁচ দিনের যুদ্ধে মিসর, সিরিয়া এবং জর্ডানের সেনাবাহিনী ইসরায়েলের কাছে পরাস্ত হয়। ইসরায়েল গাজা উপত্যকা, মিসরের সিনাই মরুভূমি, সিরিয়ার গোলান মালভূমি এবং জর্ডানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুসালেম দখল করে। অবৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও ইসরাইল জাতিসংঘের প্রস্তাবিত ৫৬ শতাংশ ভূমির বাইরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রর জন্য প্রস্তাবিত এলাকায় নতুন ইহুদি বসতি নির্মাণ শুরু করে। ইতোমধ্যে সাবেক ফিলিস্তিনের ৮০ শতাংশ দখল করে নিয়েছে। গত ৫০ বছর ধরে ইসরায়েল এসব দখলীকৃত জায়গায় ইহুদি বসতি স্থাপন করে যাচ্ছে। ছয় লাখের বেশি ইহুদি এখন এসব এলাকায় থাকে। ফিলিস্তিনিরা বলছে, আন্তর্জাতিক আইনে এগুলো অবৈধ বসতি এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে অন্তরায়। তবে ইসরায়েল তা মনে করে না। পূর্ব জেরুজালেম, গাজা এবং পশ্চিম তীরে যে ফিলিস্তিনিরা থাকেন, তাদের সঙ্গে ইসরায়েলিদের উত্তেজনা প্রায়শই চরমে ওঠে। সম্প্রতি পূর্ব জেরুসালেম থেকে কিছু ফিলিস্তিনি পরিবারকে উচ্ছেদের হুমকি ফিলিস্তিনিদের আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে। রমজানের শুরু থেকে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। তখন প্রায় প্রতি রাতেই ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলছিল। এরই পরিণতি চলমান ভয়ংকর রক্তক্ষয়ী আগ্রাসন।

বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হলো দখলদার ইসরাইলকে মেনে নেওয়া। তবে শর্ত হলো, জাতিসংঘের ১৮১নং প্রস্তাব অনুযায়ী ৪৫ শতাংশ ভূমিতে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা মেনে নিতে হবে ইসরাইলকে। ইসরাইলের আগ্রাসী মনোভাবের কারণে এই সমাধান সম্ভব হবে বলে প্রতীয়মান হয় না। এর ফলে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ঘরবাড়ি ফেরত দিতে হবে; পশ্চিম তীরের ইহুদি বসতি সরিয়ে নিতে হবে; জেরুসালেম নগরী কারও ভাগে না দিয়ে আন্তর্জাতিক তদারকিতে ছেড়ে দিতে হবে কিংবা উভয়ের মধ্যে ভাগাভাগি করতে হবে; সর্বোপরি ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গত ২৫ বছর ধরেই শান্তি আলোচনা চলছে থেমে থেমে। কিন্তু সংঘাতের কোনও সমাধান এখনও মেলেনি। শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে ইসরায়েলকে ১৮১নং প্রস্তাব মানতে হবে যার সম্ভাবনা একবারেই ক্ষীণ। ইসরায়েলের সঙ্গে রয়েছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এমনকি ভারতও। তাই ইসরায়েল কোনও কিছুই পরোয়া করে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরাইলের দুর্বৃত্তপনা বন্ধে কোনও ব্যবস্থা না নিলেও মুসলমানদের দায়িত্ব রয়েছে রাষ্ট্রহারা ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শরণার্থী হিসেবে অন্য রাষ্ট্রের অনুকম্পায় বেঁচে থাকা ফিলিস্তিনিদের সাহায্য করা। এ বিষয়ে তাদের জবাবদিহি রয়েছে স্বয়ং স্রষ্টার কাছে। পবিত্র কোরআনে এ বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে, “তোমাদের কি হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর পথে এবং অসহায় নরনারী ও শিশুদের (উদ্ধারের) জন্য সংগ্রাম করবে না? যারা বলছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! অত্যাচারী অধিবাসীদের এই নগর থেকে আমাদের বাহির করে অন্যত্র নিয়ে যাও এবং তোমার নিকট হতে কাউকে আমাদের অভিভাবক করো এবং তোমার নিকট হতে কাউকে আমাদের সহায় নিযুক্ত করো।” (সুরা নিসা: ৭৫)। যারা ফিলিস্তিনিদের কয়েক দশকের ভয়ংকর দুর্দশা থেকে মুক্তি দিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে পারতেন সেসব মুসলিম শাসকদের মধ্যে রয়েছে ভয়ংকর অনৈক্য ও অবিশ্বাস। আর অধিকাংশই ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজ ভূখণ্ড থেকে বিতাড়নকারী, নির্যাতনকারী, এমনকি মুসলিমদের প্রথম কিবলা পবিত্র আল আকসা মসজিদে আক্রমণকারী ইসরাইল ও তাদের দোসরদের বন্ধু বানিয়েছেন নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে। তাই ইসরাইলের ভয়ংকর আগ্রাসনে অসহায়, বিপন্ন ফিলিস্তিনিদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে নিরাপদে সাইডলাইনে বসে নীরবতা পালন করছেন।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]
 
/এফএএন/এমওএফ/

সম্পর্কিত

তালেবানবিরোধীদের স্ববিরোধী অবস্থান

তালেবানবিরোধীদের স্ববিরোধী অবস্থান

আমি কেন তালেবানকে সমর্থন করি না?

আমি কেন তালেবানকে সমর্থন করি না?

পরীমণি, ‘সরি মণি’

পরীমণি, ‘সরি মণি’

রাজনীতি ও ইতিহাসের ভুল পাঠ ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা

রাজনীতি ও ইতিহাসের ভুল পাঠ ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শত্রুতা

চীনা ত্রাণের ক্ষমতা

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:১৮

আশিষ বিশ্বাস দক্ষিণ চীন সমুদ্র এবং হিমালয় অঞ্চলে চীনের প্রভাবে বাধ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রভাবিত কোয়াড গ্রুপে যোগ দিতে হয়েছে ভারতকে। কোয়াডে যোগ দিলে সমুদ্রে কিংবা পর্বতের উচ্চতায় ভারতকে আর এককভাবে চীনের অস্ত্রশক্তির বিশালতার মুখোমুখি হতে হবে না, অথচ প্রায়ই বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতে দিল্লিকে এই কাজের মুখোমুখি হতে হয়। যাহোক, আরেক পর্যায়ে দক্ষিণ এশিয়া এবং আশপাশের এলাকায় একটি বিপরীত রাজনৈতিক ধারা উন্মোচিত হচ্ছে। বিপুল প্রভাবের সঙ্গে মৃদু কূটনৈতিক শক্তি ব্যবহার করছে চীন, বিশেষ করে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে মোকাবিলায়। অপেক্ষাকৃত ছোট আঞ্চলিক প্রতিবেশীগুলোকে কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় সহায়তা দিয়েছে। বিপুল আর্থিক সহায়তা এবং সময় মতো প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন দিয়ে দেশটি এখন পর্যন্ত জনবহুল অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের হৃদয় ও মন জয়ের মতো আরও বড় যুদ্ধে প্রভাব বিস্তার করেছে।

এই পরিস্থিতিতে তাদের সবচেয়ে কাছের ও সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত, কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও চীনের পরই ভারতের অবস্থান। দীর্ঘমেয়াদে যেকোনও দুই শক্তিশালী এবং অসম শত্রুতার চেয়ে এটি আলাদা নয়।

তবে দিল্লিভিত্তিক নীতিনির্ধারকদের এটাও বুঝতে পারছেন যে রাজনৈতিকভাবে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে চীনের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে তারা। গত কয়েক বছরে ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার অপেক্ষাকৃত ধীর অগ্রগতি এশিয়ার দুই বড় দেশের একে অপরের বিরোধিতার ক্ষেত্রে তাদের বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উঠে এসেছে। আকার অবশ্যই বিষয়। চীনের অর্থনীতির বর্তমান আকার ভারতের চেয়ে প্রায় পাঁচগুণ বড়, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জের।

কিন্তু ৭০ বছর আগে স্বাধীনতা পাওয়া ভারতের এতে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। যুগ যুগ ধরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং ব্যাপক বহুত্ববাদী মূল্যবোধ টিকিয়ে রেখে বড় আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে উত্থান তাদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক এক যাত্রা।

এছাড়া বিশালাকার নেতিবাচক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের বিরোধেও ভারত খুব একটা খারাপ করেনি। সব সময়ই নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশীদের সহায়তা আর আঞ্চলিক গুরুত্ব ধরে রাখতে তাদের সূক্ষ্ম আর কৌশলগত পদক্ষেপ দেখা গেছে মিয়ানমার থেকে আফগানিস্তানে। সব সময়ই এসব ছিল কঠিন কাজ। চীন কখনোই ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব কিংবা প্রতিবেশীদের কাছে তাদের ইতিবাচক মনোভাবকে পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারেনি।

কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেন, ভারতের উচিত এশিয়া কিংবা আফ্রিকার অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে চীনের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন না করা। হিমালয় সীমান্তে নতুন করে চীনা অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে তাদের সুসংহত প্রতিরোধ আন্তর্জাতিক প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে ভিন্নমতও রয়েছে। কোয়াডের মতো নির্দিষ্ট সামরিক জোটে ভারতের প্রবেশ উচিত কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে বেশিরভাগ ভারতীয় চান না তাদের দেশ অন্য বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে বড় কোনও আঞ্চলিক বিরোধে জড়িয়ে পড়ুক। অনেক মানুষই মনে করেন, কম মনোযোগ আকর্ষণ করে কার্যকর অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারাই ভারতের জন্য সুবিধাজনক।

কিন্তু ভারতের বর্তমান ‘জাতীয়তাবাদী’ নেতাদের কাছে কম মনোযোগ কাড়ার দৃষ্টিভঙ্গিটি দৃশ্যত গ্রহণযোগ্য নয়। পশ্চিমা মূলধারার পর্যবেক্ষকদের পর্যবেক্ষণে হতাশাজনকভাবে তাদের ‘ডানপন্থী’ হিসেবে দেখে থাকে।

তবে এমন নয় যে ভারতের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কোনও উন্নয়নই হয়নি। কিন্তু এই উন্নয়ন এসেছে খুব ধীরে। বর্তমান মহামারি আসার আগেও ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে জগাখিচুড়ি পেকেছিল। ভারতের সরকারপন্থী মূলধারার গণমাধ্যম শেয়ার বাজারের চাঙাভাব, ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধিতে জোর দিতে থাকে। বিশেষ করে নতুন এবং বিশেষত গুজরাটি উদ্যোক্তাদের উত্থান ভারতের প্রচারণাযন্ত্রে উৎসাহ জোগায়। এগুলোর অনেকই বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি প্রতীকী। যেমন প্রয়াত সরদার প্যাটেলের সবচেয়ে বড় মূর্তি কিংবা মুম্বাই-আহমেদাবাদের মধ্যে বুলেট ট্রেন প্রকল্প।

রাফায়েল যুদ্ধবিমান ক্রয় কিংবা কয়েক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের আর্থিক উন্নয়ন নিয়ে, আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া নেই। প্রাথমিক প্রস্তাবিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ দিয়ে ফ্রান্সের কাছ থেকে এগুলো কেনা হয়েছে। কিংবা কয়েকজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর আত্মীয়দের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। নেই বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা ৬০ কোটি মানুষের কথারও কোনও উল্লেখ। চীন ও অন্য দেশগুলোর সঙ্গে এসব নিয়ে কোনও তুলনাই চলে না।

২০২১ সালের প্রথম চার মাসের কঠিন সময়ে ছোট প্রতিবেশীদের দেওয়া ভারত ও চীনের সহায়তার পরিসংখ্যান দেখলেই তাদের উদ্দেশ্য বোঝা যাবে।

ভারত: শ্রীলঙ্কাকে ২৬ টন প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সামগ্রী পাঠিয়েছে। এরসঙ্গে ৪০ কোটি ডলারের মুদ্রা বিনিময় করে দ্বীপরাষ্ট্রটির অর্থনীতিতে সহায়তা করেছে। রফতানি করেছে একশ’ টনের অক্সিজেন উৎপাদন সামগ্রী; ভুটানকে দেড় লাখ ডোজ টিকা, পরে আরও চার লাখ ডোজ, এবং এর সঙ্গে গ্লাভস, মাস্কের মতো অন্যান্য সামগ্রী। এছাড়া নেপালের আরও বড় জনগোষ্ঠীর জন্য আরও বড় সহায়তা দিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য জানুয়ারিতে ২০ লাখ ডোজ কোভিড ১৯ ওষুধ, এরপরে ৩ লাখ টেস্ট কিট, একই পরিমাণ মাস্ক, দেড়লাখ ক্যাপ, ৫০ হাজার গ্লাভস এবং এক হাজার টন হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ওষুধ পাঠিয়েছে।

অন্যদিকে চীনা সহায়তার দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিবেশীদের সহায়তা/ত্রাণ কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি কৌশলী মনোভাব রয়েছে।

চীন: এশিয়া ইনফ্রাসট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)-এর মাধ্যমে প্রতিবেশীদের উদার অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশকে ২৫ কোটি ডলার দিয়েছে, এছাড়া ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তা দিতে ঢাকা সফর করে মেডিক্যাল বিশেষজ্ঞদের একটি টিম। বেইজিংয়ের সূত্র অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে পাঁচশ’ কিট এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠানো হয়। শ্রীলঙ্কায় আর্থিক সহায়তা হিসেবে ৫০ কোটি ডলার পাঠানো ছাড়াও মুদ্রা বিনিময় হিসেবে পাঠানো হয়েছে ১৫৪ কোটি ডলার। নেপাল ও ভুটান প্রাথমিকভাবে যথাক্রমে আট লাখ ও ছয় লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে। এছাড়া ভারতকেও সহায়তা করেছে চীন: পাঁচ হাজার ভেন্টিলেটর, ২১৫৬৯টি অক্সিজেন উৎপাদন যন্ত্র এবং তিন হাজার টন প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল সরঞ্জাম এপ্রিলে পাঠায়। এসব সামগ্রীর বেশিরভাগই চীনের তৈরি, কিন্তু আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে গ্রহণকারী দেশগুলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাদের নিজস্ব বিকল্প গ্রহণ করেছে।

যদিও প্রতিবেশীদের সহায়তার ক্ষেত্রে ভারতের সহায়তা চীনের পরিমাণের তুলনায় অনেক কম হলেও এগুলো অকার্যকর বলে বিবেচনার সুযোগ নেই। চীনের প্রতি ভারত এক ধরনের অবমূল্যায়িত প্রতিযোগিতা আরোপ করতে পেরেছে, বেইজিংকে আরও বেশি মানবিক সহায়তায় ব্যয় করতে বাধ্য করেছে, যাতে উপকৃত হয়েছে সবাই।

ব্যানডং কনফারেন্সের পর থেকেই চীনের পররাষ্ট্র নীতিতে মর্যাদা কিংবা প্রথম অবস্থান লাভ বড় করেই দেখা হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে এশিয়ার শীর্ষ আলোকবর্তিকা বলে প্রশংসা করা হলে চীনের প্রয়াত নেতা চৌ এন লাই ক্ষুব্ধ হন। দিল্লির কূটনৈতিক জয়ের জন্য এরপরে চীন কখনোই ক্ষমা করেনি। কোনও কোনও পর্যবেক্ষকের বিশ্লেষণে সেখানেই নিহিত থাকতে পারে চীনের ছোট প্রতিবেশীদের সর্বোচ্চ সহায়তার নীতির সারবত্তা। চীন জোরালোভাবেই ইঙ্গিত দিচ্ছে তারা এই অঞ্চলের অবিসংবাদিত এক নম্বর অবস্থান চায়। বিদেশে তাদের সহায়তা কেবল এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। সামগ্রিকভাবে তারা এখন পর্যন্ত দেড়শ’ দেশে ১১ হাজার পাঁচশ’ কোটি ডলার সহায়তা দিয়েছে।

তবে ত্রাণ দেওয়ায় ভারতের চেয়ে চীনের এগিয়ে থাকায় বেইজিং কেবল শীর্ষ অবস্থান নয় আরও বেশি কিছু অর্জন করছে। তাদের ব্যাপক সহায়তা কর্মসূচিতে এসব দেশের বহু মানুষ তাদের মানবাধিকার নিপীড়ন ভুলে যাচ্ছে বা অন্ততপক্ষে উপেক্ষা করছে। ফলে রাজনৈতিক বিরোধী/ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে তাদের কঠোর অবস্থান, অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের নিপীড়নমূলক দিক, নিজেদের সীমানায় আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত ঘটনা আড়ালের প্রবণতা, দুর্ভিক্ষে মৃত মানুষের পরিমাণ, কিংবা নিজ দেশের মানুষের দুর্ভোগও আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।

এখন পর্যন্ত চীনের অভ্যন্তরে করোনার বিস্তার, তাদের সরকারি হিসাব নিয়ে পশ্চিমাদের উদ্বেগ রয়েছে। কিন্তু চীন এখানে হাসতে পারে, যে অর্থ এবং চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ে তাদের প্রস্তুতি চীনবিরোধী প্রচারণা থেকে বেশি শক্তিশালী।

চীনের ভাবমূর্তি তৈরিতে এগুলো মারাত্মক সমস্যা, যা খুব সহজে ভোলানো যাবে না। তবে পরিচিত বাংলা প্রবাদ যেমনটা বলে থাকে ‘পেটে খেলে, পিঠে সয়’ সেভাবেই নিপীড়ন সহ্য করে যাচ্ছে অন্যরা।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলকাতা

/জেজে/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

তালেবান ফ্যাক্টর: ভারতে যেভাবে দেখা হচ্ছে

তালেবান ফ্যাক্টর: ভারতে যেভাবে দেখা হচ্ছে

তালেবান ফ্যাক্টর: ভারতের জন্য কঠিন হলেও বিজেপির জন্য ইতিবাচক?

তালেবান ফ্যাক্টর: ভারতের জন্য কঠিন হলেও বিজেপির জন্য ইতিবাচক?

সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় সাধারণ মানুষের ক্ষতি কতটুকু?

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫:৪৯
আমীন আল রশীদ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। আমার ফুপা সরকারি চাকরি করতেন। অবসরে যাওয়ার বছর কয়েক আগে তিনি মারা যান। তার কোনও সন্তান নেই। ফলে স্বামীর মৃত্যুর পরে ফুপু অনেকটা অকূলপাথারে পড়েন। চাকরি বা ব্যবসা করার মতো অবস্থা নেই। কারণ, তিনি নিজেও একটা জটিল রোগে আক্রান্ত। দ্রুততম সময়ে পেনশনের টাকাটা পাওয়া যায় এবং সেই টাকা দিয়ে পরিবার সঞ্চয়পত্র কেনা হয়। এখন ফুপু ওই টাকা দিয়ে চলছেন। এ রকম সঞ্চয়পত্র-নির্ভর মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠও আছে এবং সঞ্চয়পত্রের মুনাফার নামে রাষ্ট্রের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়, সেই আলোচনাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সামগ্রিক বিষয়ের একটা নির্মোহ বিশ্লেষণ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে এই লেখায়। তার আগে দেখা যাক, এই ইস্যুতে সরকার সম্প্রতি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে?  

গত ২১ সেপ্টেম্বর সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানো সংক্রান্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বর্তমানে তিন বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে মুনাফার হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ হলেও সেটি ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কমিয়ে করা হয়েছে ১০ শতাংশ। যাদের বিনিয়োগ ৩০ লাখ টাকার বেশি, তারা মেয়াদ শেষে মুনাফা পাবেন ৯ শতাংশ হারে।

অবসরভোগীদের জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে এত দিন ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ হারে মুনাফা পাওয়া যেত। এখন এই সঞ্চয়পত্রে যাদের বিনিয়োগ ১৫ লাখ টাকার বেশি তারা মেয়াদ শেষে মুনাফা পাবেন ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে। আর ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকলে এই হার হবে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

দেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় যে পরিবার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি এই সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে মুনাফার হার বর্তমানে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। এখন এই সঞ্চয়পত্রে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার কমিয়ে করা হয়েছে সাড়ে ১০ শতাংশ। আর ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই হার সাড়ে ৯ শতাংশ। তবে যারা নতুন করে সঞ্চয়পত্র কিনবেন, শুধু তাদের জন্য পরিবর্তিত এই হার কার্যকর হবে।

এখন পরিবার সঞ্চয়পত্রে কর কেটে নেওয়ার পরে প্রতি লাখে পাওয়া যায় ৮৬৪ টাকা। যার ২০ লাখ টাকা আছে তিনি মাসে পান ১৭ হাজার ২৮০ টাকা। কিন্তু নতুন নিয়মে কেউ ১৫ লাখ টাকার বেশি পরিবার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলে বা চলমান সঞ্চয়পত্র মেয়াদান্তে পুনঃবিনিয়োগ করলে তিনি কর কেটে নেওয়ার পরে প্রতি লাখে পাবেন ৭৮৭.৫০ টাকা। তার মানে ২০ লাখ টাকায় পাবেন ১৫ হাজার ৭৫০ টাকা। অর্থাৎ বর্তমানে যা পান তার চেয়ে ১৫৩০ টাকা কম। যিনি শুধু এই সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপরেই নির্ভরশীল, তার জন্য দেড় হাজার টাকাও কম নয়।

তবে এই মুনাফা কমবে নতুনদের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ এ বছরও যারা ৫ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্র কিনেছেন, আগামী ৫ বছর পর্যন্ত তারা আগের নিয়মেই, অর্থাৎ লাখে ৮৬৪ টাকাই পাবেন। কিন্তু এটার মেয়াদান্তে পুনঃবিনিয়োগ করলে পাবেন ৭৮৭.৫০ টাকা। আবার এখন কেউ যদি ১৫ লাখ টাকার কম মূল্যের সঞ্চয়পত্র কেনেন তাহলে তিনি লাখে ৮৬৪ টাকাই পাবেন। কিন্তু কেউ যদি ১৫ লাখ টাকার বেশি মূল্যের সঞ্চয়পত্র কেনেন, তাহলে লাখে পাবেন ৭৮৭.৫০ টাকা। অর্থাৎ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের মুনাফা কমছে না।

তবে নতুন নিয়মে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন যাদের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বেশি। এটিও বাস্তবতা যে, সঞ্চয়পত্রে যাদের নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের নামে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা আছে, তারা সাধারণ মানুষ নন। তারা উচ্চমধ্যবিত্ত ও ধনী। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, বরং কম লাভবান হবেন।

সরকার বলছে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দিতে গিয়ে সরকারের সুদ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া এতে অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে বলে অর্থনীতিবিদদেরও অনেকে সঞ্চয় কর্মসূচিতে অতিমাত্রায় বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগের ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বগতি রোধ করার তাগিদ দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেছেন, নতুন সিদ্ধান্তে মধ্যবিত্ত বিশেষ করে অবসরভোগীদের আয় কমে গেলেও দেশের সুষ্ঠু অর্থনীতি বজায় রাখার স্বার্থে মুনাফা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সঞ্চয়পত্রে যারা বিনিয়োগ করেন, সেখানে বিরাট অংশ সাধারণ মানুষ এবং প্রকৃত অর্থেই তারা সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দিয়ে সংসার চালান এটি যেমন ঠিক, তেমনি বিপুল অঙ্কের অবৈধ ও কালো টাকা, অসৎ পথে উপার্জিত টাকা অথবা বৈধ পথে উপার্জিত সচ্ছল ব্যক্তিদের টাকাও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা আছে। তারা কোনও না কোনোভাবে আয়ের উৎস দেখিয়েই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কেন এই লোকগুলোকে সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ দিয়ে মাসে মাসে তাদের মোটা অংকের মুনাফা দেবে? যে লোক ভালো চাকরি   করেন, যার ব্যবসা আছে, যার উপার্জনের আরও একাধিক পথ আছে, রাষ্ট্র কেন তাকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে আরও বেশি পয়সা আয়ের সুযোগ দেবে?

বরং সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী এবং যাদের সংসারে উপার্জনকারী নেই; যাদের আয় কম কিন্তু জমিজমা বিক্রি করে কিছু টাকা জোগাড় করেছেন এবং সেই টাকা ব্যাংকে রাখলে যেহেতু ওই অর্থে কোনও লাভ হয় না, তাই তাদের সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ দিতে হবে। অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত বৈধ পথেই কিছু কিছু টাকা সঞ্চয় করে একটা সময় সেই টাকা কোথাও রেখে মাসে মাসে একটা ফিক্সড আয়ের ব্যবস্থা করতে চান। সেসব মানুষকেও সঞ্চয়পত্রের সুবিধা দিতে হবে। কিন্তু সচ্ছল ও ধনী লোকেরা কেন সঞ্চয়পত্র কিনবেন এবং রাষ্ট্র কেন তাদের সেই সুযোগ দেবে?

অনেক সচ্ছল মানুষও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন বছর শেষে কর সুবিধা পাওয়ার জন্য। কারণ, চাকরিজীবীদের (যেকোনও পেশায়) মধ্যে এটা খুব সাধারণ প্রবণতা যে, আয়ের বিপরীতে তাদের ওপরে যে কর ধার্য হয়, তারা সেটি পুরোপুরি দেন না বা দিতে চান না। অর্থাৎ কোনও না কোনোভাবে সেই টাকা তারা কমাতে চান। সেই কমানোর যেসব আইনি তরিকা আছে, তার অন্যতম এই সঞ্চয়পত্র। অর্থাৎ নির্দিষ্ট অংকের টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা থাকলে কর মওকুফ পাওয়া যায়। এখানে প্রশ্ন অন্য। যেমন মানুষ কেন তার ওপর নির্ধারিত করের পুরো টাকাটা রাষ্ট্রকে দিতে চায় না? কারণ, সে মনে করে তার করের টাকা সঠিক পথে খরচ হচ্ছে না। কারণ, সে মনে করে তার করের টাকা সরকারি কর্মকর্তারা লুটপাট করে নিয়ে যায়। সে মনে করে কর দেওয়ার পরেও রাষ্ট্র থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা ও সুবিধা পাচ্ছে না। কর দেওয়ার পরেও সে সরকারি কোনও প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বিনা হয়রানিতে বা বিনা ঘুষে সেবা পায় না। সুতরাং সে কেন কর দেবে?

যেহেতু কর না দিয়ে তার উপায় নেই, অতএব সে কর কমানোর জন্য নানা ফন্দিফিকির করে। তার মানে মানুষের এই যে করভীতি বা করবিরক্তি—তার পেছনে দায়ী রাষ্ট্রের সামগ্রিক সিস্টেম। এসব জায়গা সংস্কার করতে হবে। না হলে শুধু সঞ্চয়পত্রে মুনাফা কমিয়ে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো যাবে না।

মানুষ কেন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে তার আরেকটি বড় কারণ প্রচলিত ব্যাংকিং সিস্টেমে মুনাফা অনেক কম। কিন্তু যাদের বাড়তি টাকা আছে তারা কী করবেন? কোথায় সঞ্চয় করবেন? রাষ্ট্র চায় মানুষ ব্যাংকে টাকা না রেখে অন্য খাতে বিনিয়োগ করুক। কিন্তু সেই জায়গাগুলো কী? শেয়ার বাজার বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ। এটা জুয়ার মতো। সবার পক্ষে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ সম্ভব নয়। দ্বিতীয় উপায় ব্যবসা। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র-মাঝারিসহ যেকোনও ব্যবসা করতে গেলে যে কত ধরনের হয়রানি ও বিপত্তির মধ্যে পড়তে হয়—তা ভুক্তভোগী ছাড়া কারও পক্ষে আন্দাজ করাও সম্ভব নয়। সুতরাং মানুষ কী করবে? বিনা পরিশ্রমে বেশি মুনাফার আশায় ডেসটিনি, ইউনিপে, যুবক এবং সবশেষ এহসান গ্রুপের মতো ফটকা প্রতিষ্ঠানে টাকা রেখে অসংখ্য মানুষ প্রতারিত হয়েছে।

তার মানে একদিকে প্রচলিত ব্যাংকে মুনাফা কম, শেয়ার বাজারে ঝুঁকি, ফটকাবাজ প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্য বাদ দিলে বাকি থাকে সঞ্চয়পত্র। ফলে মানুষ সেখানেই যায়। প্রতিবছর বাজেটে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে যে পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, বছর শেষে তার চেয়ে অনেক বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। তাতে সুদ পরিশোধ বাবদ সরকারের খরচ অনেক বেড়ে যায়—এ কথাও ঠিক। কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠ হলো সঞ্চয়পত্রের সুদ বেশি হওয়ায় ধনীদের একটি বড় অংশ নামে–বেনামে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে রেখেছেন। ফলে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকারের দেওয়া উচ্চ মুনাফার সুবিধা প্রকৃত অর্থে যাদের কাছে যাওয়া উচিত, তার বদলে ধনীদের পকেটে চলে যাচ্ছে।

সুতরাং সঞ্চয়পত্র কারা কিনতে পারবেন, সেটি সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া দরকার এবং এখানে শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রেখে যারা প্রকৃতই সঞ্চয়পত্রনির্ভর, তাদের জন্য মুনাফার পরিমাণ বাড়ানো দরকার। প্রতি লাখে তারা যাতে হাজার দেড়েক টাকা পান, সেই ব্যবস্থা করা দরকার। এটা হলে একটা ইনসাফভিত্তিক অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। না হলে আমাদের অর্থনীতিতে যে বিশাল দুষ্টুচক্র ভর করেছে, লুটেরা-অসৎ-অবৈধ পথে উপার্জনকারী এবং বৈধ-অবৈধ উভয় পথে উপার্জনকারী ধনী লোকেরা যেভাবে আমাদের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন, সেটির কোনও পরিবর্তন হবে না। সবাই যাতে সঞ্চয়পত্র কিনতে না পারে এবং যাতে প্রকৃত চাহিদাসম্পন্ন মানুষেরাই এই সুবিধা পান, রাষ্ট্রকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।
 
 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

ইভ্যালি: গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

ইভ্যালি: গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

ঘুষ খেলে নামাজ হবে না, নাকি চাকরি থাকবে না?

ঘুষ খেলে নামাজ হবে না, নাকি চাকরি থাকবে না?

সাংবাদিকদের এত ভয় কেন?

সাংবাদিকদের এত ভয় কেন?

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে পরিবারেই বুলিং বেশি

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে পরিবারেই বুলিং বেশি

আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত সম্পত্তি প্রদর্শন করুন

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৭:০৭

মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন আমাদের অনেক করদাতা বুঝে না বুঝে নিজের বৈধ সম্পত্তি আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকেন। এটা কত বড় ক্ষতির কারণ, তা বুঝতে পারেন যখন বৈধ সম্পত্তি থেকে কোনও আয় করেন বা বিক্রি করে অন্য কোনও বৈধ কাজ করতে যান।

বর্তমানে সম্পত্তি বিক্রি বা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ১২ ডিজিট ই-টিআইএন প্রদর্শন করার বিধান চলমান। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আয়করের আপডেট সার্টিফিকেট প্রদর্শন করতে হচ্ছে।

করদাতাগণের মধ্যে কিছু ধারণা আছে। যেমন,আয়কর নথিতে বেশি সম্পত্তি দেখালে নাকি আয়কর অফিস থেকে হয়রানি করা হয়। বিষয়টি কতটুকু সত্য তা জানি না, তবে আমার কাছে মনে হয়েছে ওই হয়রানির চেয়েও করদাতা নিজের ক্ষতিই বেশি করছেন। কালো টাকা সাদা করার জন্য সরকার প্রতি বছর কিছু সুযোগ দিয়ে দেয়। অর্থাৎ এটা হলো অবৈধ আয়কে বৈধ করার সুযোগ।  এটা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়। কিন্তু যারা বৈধ সম্পত্তি আয়কর রির্টানে দেখাচ্ছেন না, এটা  যে কত বড় ক্ষতি তা নিয়ে কোনও আলোচনা নেই, নেই কোনও সমালোচনা। নিরবে বিপদগামী হচ্ছেন শত শত করদাতা। আমাদের করদাতাদের যেমন কর পরিশোধ করতে উৎসাহিত করা প্রয়োজন, তেমনই তাদের ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে কোনও ক্ষতির মধ্যে না পড়েন তাও আমলে রাখা দরকার।

বৈধ সম্পত্তি অর্জিত বছরে আয়কর রিটার্নে না দেখালে সেটা অনেকটা অবৈধ সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়ে যায়। যেটাকে আমরা অফিসিয়াল ভাষায় বলি অপ্রদর্শিত সম্পত্তি।  কোনও অবৈধ সম্পত্তি অর্জনকারী যদি অর্ধেক সম্পত্তি সরকারকে কর হিসেবে দিয়ে তার অবশিষ্ট সম্পত্তিকে নিজের জন্য বৈধ করার অধিকার অর্জন করতে পারে,তাতে সে মহাখুশি। কিন্তু মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে বেচারা সারা জীবন কিছু সম্পত্তি অর্জন করলেন শুধুমাত্র সুবুদ্ধির অভাবে বা কোনও কুবুদ্ধির ফাঁদে পড়ে বৈধ আয়কে অবৈধ করে এক মাথা চিন্তা রোগের ব্যবস্থা নিজেই করে বসেন।  তখন আর করার কিছুই থাকে না। এতে বড় অংক কর পরিশোধ বা জরিমানার মুখোমুখি হয়ে যান।

অনেকে বলেন চিন্তার কোনও কারণ নেই। সরকার এ ব্যবস্থাও করে রেখেছেন। সেটা হলো নির্দিষ্ট হারে কর পরিশোধ করে অপ্রদর্শিত সম্পত্তি প্রদর্শন করতে পারবেন। আসুন জেনে নেই সে সুযোগ কী? এ রকম করদাতাদের জন্য অর্থ আইন ২০২১ এ একটি সুযোগ রয়েছে। চলতি বছরের অর্থ আইনে আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর ১৯ ধারায়- ১৯এএএএএ নামে একটি নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে (সূত্র: আয়কর পরিপত্র-২০২১-২০২২)। উক্ত নতুন ধারায় অপ্রদর্শিত সম্পত্তি প্রদর্শন করার জন্য কতিপয় সুযোগ রয়েছে। এতে করদাতা পূর্বের যে কোনও সময়ে আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত সম্পত্তি (জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট, নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ইত্যাদি নির্ধারিত হারে কর পরিশোধ করে এ বছর আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করতে পারবেন। এ সুযোগ সম্পত্তির এলাকা ভেদে বা অবস্থান ভেদে কিছুটা তারতম্য আছে। যেমন:

১. জমির/ভূমির ক্ষেত্রে:

ক) ঢাকার গুলশান মডেল টাউন, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা ও দিলকুশা এলাকার ভূমির জন্য প্রতি বর্গমিটারে বিশ হাজার টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

খ) ঢাকার ধানমন্ডি এলাকা, ডিওএইচএস মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, পূর্বাচল, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, সিদ্ধেশ্বরী কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, ওয়ারী, সেগুনবাগিচা নিকুঞ্জ, এবং চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলশি, আগ্রাবাদ, নাসিরাবাদ এলাকায় অবস্থিত ভূমির জন্য প্রতি বর্গমিটারে পনের হাজার পাঁচ শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

গ) উপরোক্ত ‘ক’ এবং ‘খ’ ক্রমিকে উল্লেখিত এলাকা ব্যতিত সকল সিটি করপোরেশন এলাকার ভূমির জন্য প্রতি বর্গমিটারে পাঁচ হাজার টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঘ) সকল পৌরসভা বা জেলা সদর এলাকায় অবস্থিত ভূমির জন্য প্রতি বর্গমিটারে এক হাজার পাঁচ শত টাকা এবং এর ওপর নির্ধারিত ৫% অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে; টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঙ)  উপরোক্ত ক্রমিক নং ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ এবং ‘ঘ’- তে উল্লেখিত এলাকার ভূমি ব্যতিত অন্য সকল এলাকায় অবস্থিত ভূমির জন্য প্রতি বর্গমিটারে পাঁচ শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

২. বিল্ডিং ও অ্যাপার্টমেন্ট এর ক্ষেত্রে: 

ক) ঢাকার গুলশান মডেল টাউন, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত অনধিক ২ শত বর্গমিটার প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে  চার হাজার টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

খ) ঢাকার গুলশান মডেল টাউন, বনানী, বারিধারা, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা ও দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত ২শত বর্গমিটারের অধিক প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট এর জন্য প্রতি বর্গমিটারে ছয় হাজার টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

গ) ঢাকার ধানমন্ডি এলাকা, ডিওএইচএস মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, পূর্বাচল, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, সিদ্ধেশ্বরী কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, ওয়ারী, সেগুনবাগিচা নিকুঞ্জ, এবং চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলশি, আগ্রাবাদ, নাসিরাবাদ এলাকায় অবস্থিত প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে তিন হাজার টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঘ) ঢাকার ধানমন্ডি এলাকা, ডিওএইচএস মহাখালী, লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি, উত্তরা মডেল টাউন, পূর্বাচল, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, সিদ্ধেশ্বরী কারওয়ান বাজার, বিজয়নগর, ওয়ারী, সেগুনবাগিচা নিকুঞ্জ, এবং চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ, খুলশি, আগ্রাবাদ, নাসিরাবাদ এলাকায় অবস্থিত ২শত বর্গমিটারের অধিক প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে তিন হাজার পাঁচ শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঙ) উপরোক্ত ক্রমিকে উল্লেখিত ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ এবং ‘ঘ’ এলাকা ব্যতিত সিটি করপোরেশন এলাকায় অনধিক ১শত ২০ বর্গমিটারের প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য সাত শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

চ) উপরোক্ত ক্রমিকে উল্লেখিত ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ এবং ‘ঘ’ এলাকা ব্যতিত সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত ১শত ২০ বর্গমিটার তবে অনধিক ২০০ বর্গমিটারের  প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area)  বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য আট শত পঞ্চাশ টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ছ) উপরোক্ত ক্রমিকে উল্লেখিত ‘ক’, ‘খ’, ‘গ’ এবং ‘ঘ’ এলাকা ব্যতিত সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত ২শত বর্গমিটারের অধিক  প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারের জন্য এক হাজার তিন শত শত টাকা এবং এ করের ওপর ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করা;

জ) কোনও জেলা সদরের পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত অনধিক ১শত ২০ বর্গমিটারের অধিক  প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে তিন শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঝ) কোনও জেলা সদরের পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত ১শত ২০ বর্গমিটারের অধিক তবে অনধিক ২০০ বর্গমিটারের  প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে চার শত পঞ্চাশ টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঞ)  কোনও জেলা সদরের পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত ২ শত বর্গমিটারের অধিক  প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে ছয় শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ট) ক্রমিক নং ‘ক থেকে ঞ’   উল্লেখিত এলাকা ব্যতিত অন্য যে কোনও এলাকায় অবস্থিত ১শত ২০ বর্গমিটারের প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে দুই শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

ঠ) ক্রমিক নং ‘ক থেকে ঞ’ উল্লেখিত এলাকা ব্যতিত অন্য যে কোনও এলাকায় অবস্থিত ১শত ২০ বর্গমিটার কিন্তু অনধিক ২শত বর্গমিটারের প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে তিন শত টাকা এবং এ করের উপর ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করা;

ণ) ক্রমিক নং ‘ক থেকে ঞ’ উল্লেখিত এলাকা ব্যতিত অন্য যে কোনও এলাকায় অবস্থিত ২শত বর্গমিটারের অধিক প্লিন্থ এরিয়া (Plinth area) বিশিষ্ট বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টের জন্য প্রতি বর্গমিটারে পাঁচ শত টাকা এবং উক্ত পরিশোধযোগ্য অংকের ৫% হারে অতিরিক্ত কর পরিশোধ করার মাধ্যমে;

৩. অস্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে:

ক) নগদ,ব্যাংকে রক্ষিত অর্থ, আর্থিক স্কিম ও ইন্সট্রুমেন্ট, সকল প্রকার ডিপোজিট বা সেভিং ডিপোজিট, সেভিং ইন্সট্রুমেন্ট বা সার্টিফিকেট (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির স্টক, স্টক শেয়ার, মিউসিয়াল ফান্ড ইউনিট ও অন্যান্য সিকিউরিটিজ, পুঁজিবাজারে ক্রয় বিক্রয়যোগ্য সকল প্রকার সিকিউরিটিজ ও বন্ড এবং যে কোনও প্রকার অগ্রিম ও ঋণ প্রদান আর্থিক ইন্সট্রুমেন্ট হিসেবে প্রদর্শন করা যাবে)। এর  মোট মূল্যের ওপর নির্ধারিত কর ২৫% এবং পরিশোধযোগ্য করের ওপর অতিরিক্ত ৫% হারে কর পরিশোধ করার মাধ্যমে। 

উপরোক্ত ক্ষেত্রসমূহের আওতায় কর পরিশোধ করার ফলে করদাতার অনুকূলে যেসকল সুবিধাদি থাকবে:

ক) নগদ অর্থ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ফরমে (আইটি-১০বি) হাতে নগদ, ব্যাংকে জমা বা ব্যবসায়ের পুঁজি হিসেবে দেখাতে পারবেন;

খ) এক্ষেত্রে নির্ধারিত কর পরিশোধ করে সম্পত্তি প্রদর্শন করার জন্য কোনও প্রকার ঘোষণার প্রয়োজন হবে না। যথানিয়মে সংশ্লিষ্ট ফরমের নির্ধারিত কলামে সম্পত্তির নির্ধারিত মূল্য দেখানো যাবে এবং অন্যান্য প্রাপ্তির ঘরে আয়ের উৎস হিসেবে দেখানো যাবে।

গ) প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ব্যাংক বিবরণী বা দলিলাদি বা প্রমাণাদি দাখিল করা যেতে পারে;

ঘ) এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সকল কর পরিশোধ করে সম্পত্তি প্রদর্শন করলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ এর অন্য কোনও ধারায় কোনও প্রকার কার্যক্রম গ্রহণ করবে না;

পরিশেষে সকল করদাতার প্রতি আকুল আবেদন কোনও প্রকার হয়রানি বা বিপদের সন্দেহ করে বা অনুমান করে আপনার কষ্টে অর্জিত সম্পত্তি আয়কর রিটার্নে দেখানো থেকে বিরত থাকবেন না। এ ব্যাপারে অন্য কারও পরামর্শ শুনবেন না। আপনি আপনার সিদ্ধান্ত নিন এবং আপনার সম্পত্তি প্রদর্শনে আপনার জন্য স্বস্তির ও নিরাপদের হোক এটাই কামনা।

লেখক: আয়কর আইনজীবী

[email protected]

/এসএএস/

সম্পর্কিত

সঠিক ও নির্ভুল আয়কর রিটার্ন করদাতার বড় সম্পদ

সঠিক ও নির্ভুল আয়কর রিটার্ন করদাতার বড় সম্পদ

আয়কর রিটার্ন ইমেইলে জমা নেওয়ার উদ্যোগ যে কারণে জরুরি  

আয়কর রিটার্ন ইমেইলে জমা নেওয়ার উদ্যোগ যে কারণে জরুরি  

ভ্যাট আদায়ে ন্যায্যতার ঘাটতি, নজর দেবে কে?

ভ্যাট আদায়ে ন্যায্যতার ঘাটতি, নজর দেবে কে?

‘ব্লকচেইন প্রযুক্তি’ হতে পারে রাজস্ব আদায়ের নতুন দিগন্ত

‘ব্লকচেইন প্রযুক্তি’ হতে পারে রাজস্ব আদায়ের নতুন দিগন্ত

গ্রামীণ সুদের অস্বাস্থ্যকর অর্থনীতি!

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫:৩২

তুষার আবদুল্লাহ সেদিন এক গ্রামের বাজারে ঘুরছিলাম। কত পণ্যের খুচরা ও পাইকারি পশরা। মাছ, তরিতরকারি এসেছে আশপাশের গ্রাম থেকে। সেদিন ছিল হাটের দিন। ভিড়ের মাঝেই দুই জন মানুষ পেলাম যারা মুঠোতে, লুঙ্গির কোচড়ে টাকা নিয়ে ঘুরছেন। ভাবলাম হাট ঘুরে খুচরো টাকার ব্যবসা করেন তারা। কিন্তু খেয়াল করে দেখলাম পাঁচশ, হাজার টাকার নিচের কোনও নোট নেই তাদের কাছে। সন্দেহ হলো, খুচরা টাকার ব্যবসায়ীর কাছে তো খুচরো টাকা থাকার কথা। 

একজনের পিছু নিলাম, দেখি তিনি কোন দোকানে গিয়ে দাঁড়ান। আমি তাকে অনুসরণ করছি। তিনি একেকটি দোকানে গিয়ে দাঁড়ান আর কারও সঙ্গে ইশারায়, কারও সঙ্গে নিচু কণ্ঠে কথা বলেন। এক দোকানে দেখলাম টাকার একটা বান্ডেল ছুঁড়ে দিলেন। আমি ওই দোকানির পাশে গিয়ে বসলাম। জানতে চাইলাম- খুচরা নিতে কত বেশি দিতে হলো? দোকানি জানালেন, খুচরা না, টাকা কর্জ করলেন। সুদে টাকা নিলেন। হাটে মাল কিনবেন। হাজারে একশ টাকা সুদ দিতে হবে। 

একদিনেই একশ টাকা! মাল বিক্রি করে আজই শোধ দিতে হবে। না দিতে পারলে দ্বিগুণ হয়ে যাবে। জানতে চাই, যদি আরও বেশি দেরি হয়? বললেন- সুদে মাফ নেই। অতি দেরি হলে, এসে দোকানের মাল নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। দোকানির কাছ থেকে সরে এসে চায়ের দোকানে খুঁজে পাই কর্জ দেওয়া বা সুদ ব্যবসায়ীকে। তিনি ৫ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। এখন বাজারে তার পাওনা আট লাখ টাকা। নতুন টাকা বিনিয়োগ করতে হয়নি। সুদের টাকাতেই বিনিয়োগ বাড়ছে। টাকা তোলার জন্য কিছু মাস্তান পালতে হয়। কিছু হাত খরচ। মাসের লাখ টাকা আয়ের কাছে খুব সামান্য এই খরচ। বাজারের দোকানিরা ধীরে ধীরে ৬/৭ জন সুদ ব্যবসায়ীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এককথায় বলা যায় বাজারটির এখন এই সুদ ব্যবসায়ীদের হাতে।

বাজারের নিয়ন্ত্রণ যেমন, তেমনই গ্রামও চলে গেছে সুদ ব্যবসায়ীদের কব্জায়। কৃষক একশ টাকায় ১০ থেকে ২০ টাকা সুদে টাকা নিচ্ছেন। চৈত্র মাসে কৃষক যে টাকা কর্জ নেন, তার সুদ পরিশোধ করেন ধানের বিনিময়ে। কোথাও কোথাও টাকা ও ধান দুটোই দিতে হয়। সময় মতো টাকা দিতে না পারলে, উঠোনে সুদ ব্যবসায়ীরা  এসে ঠিকই ঘুঘু চড়িয়ে যান। শুধু কৃষক নন, কন্যা দায়গ্রস্ত পরিবার, সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের চিকিৎসার জন্যও সুদে টাকা কর্জ করেন গ্রামের মানুষ। জুয়া ও নেশার জন্যেও সুদে টাকা নেওয়ার অভ্যাস আছে। শুধু  ব্যক্তি নয়, সমিতির মাধ্যমেও চলে সুদ বাণিজ্য। গ্রামে গ্রামে সমিতি তৈরি হয়েছে। তারা সমবায়ের নামে টাকা তুলে, সেই টাকা সুদ ব্যবসায় বিনিয়োগ করছে। সমিতির সুদের টাকা না দিতে পারলে, পুরো সমিতিই গ্রহীতার ওপর হামলে পড়ে। সুদের টাকা না দিতে পারার প্রতিশোধ হিসেবে, ধর্ষণ- খুনের মতো ঘটনাও ঘটছে গ্রামে।

করোনাকালে এই সুদ ব্যবসা আরও রমরমা হয়েছে। মানুষের  কাজ শূন্য হওয়া, ব্যবসায় ধস বা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে গেলে কর্জ করে আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, পরিবারের সংকট সামলে নেওয়া। ব্যবসায় পুনঃবিনিয়োগের জন্য মানুষ নিরুপায় হয়ে ব্যক্তি বা সমিতির কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়েছে, নিচ্ছে। যারা ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছেন, তারা চেষ্টা করছেন টাকা ফেরত দেওয়ার। যারা পারেননি, তারা অসহায় হয়ে প্রিয় সম্পদের যেটুকু আছে তাই কর্জদাতার হাতে তুলে দিচ্ছেন। যারা পারছেন না, তাদের কেউ কেউ ঘর ছাড়া। পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

গ্রামীণ সুদের এই অর্থনীতির কথা স্থানীয় প্রশাসনের অজানা নয়। অর্থনীতির চিন্তকদের কাছেও পরিচিত। গ্রামে কৃষি ও শিল্প অর্থনীতির প্রসার ঘটছে। নতুন ফসল যুক্ত হচ্ছে। কৃষি-শিল্প অর্থনীতি তৈরি করেছে নতুন সম্ভাবনা। টেকসই ইঙ্গিতও রয়েছে। কিন্তু  প্রান্তিক কৃষক ও উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণের জোগান নিশ্চিত করা যায়নি। কৃষকদের দশ টাকার একাউন্ট খুলে দেওয়ার পরও তাদের করা যায়নি ব্যাংকমুখী। সরকারি সমবায়ের জটিল আমলাতন্ত্র ও ভোগান্তি সমবায় বান্ধব করতে পারছে না  প্রান্তিকজনদের। তাদের কাছে সুদ ব্যবসায়ীরাই সহজলভ্য। এই সহজলভ্য অর্থের জোগানদারদের সহজ সেবায় কঠিন হচ্ছে প্রান্তিক মানুষের জীবন। নিঃস্ব এবং দেওলিয়া হচ্ছে মানুষ। করোনাকাল সুদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করেছে। সেই চাঙ্গা অর্থনীতি আমাদের প্রান্তিক অর্থনীতির স্বাস্থ্যহানী ঘটাচ্ছে। জানি না অর্থ গবেষক ও সরকার স্বাস্থ্যের এই দিকটি নজরে রেখেছে কিনা।

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী

/এসএএস/

সম্পর্কিত

শিক্ষক ও মর্যাদার সংকট

শিক্ষক ও মর্যাদার সংকট

ভোটের হাওয়া লাগলো মাঠে

ভোটের হাওয়া লাগলো মাঠে

গণমাধ্যমে বিভীষণ

গণমাধ্যমে বিভীষণ

শহর কেন গতিহীন?

শহর কেন গতিহীন?

দুর্বৃত্তরাই আফগানিস্তানে সরকার চালাবে

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৭:০৭
ফারাজী আজমল হোসেন আফগানিস্তানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মন্ত্রীদের নাম ঘোষণার মাধ্যমেই গোটা দুনিয়াকে নিজেদের স্বরূপ চিনিয়ে দিয়েছে তালেবানরা। দুর্বৃত্তরাই যে আফগানিস্তানে সরকার চালাবে এটা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ৩৩ সদস্যের তালেবান মন্ত্রিসভার ১৭ জনই রয়েছেন জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা তালিকায়।

বেশিরভাগ মন্ত্রীকেই আমেরিকা জঙ্গিবাদী বলে মনে করে। নামে সম্মিলিত আফগান সরকার হলেও তালেবান মন্ত্রিসভায় পশতুনদেরই রমরমা। আফগানিস্তানের জনসংখ্যার ৪৮ শতাংশ হচ্ছেন পশতুনরা। কিন্তু মন্ত্রিসভার ৩৩ জনের মধ্যে ৩০ জনই পশতুন। শতাংশের হিসাবে ৯০ শতাংশ। ৪৫ শতাংশ তাজিক এবং উজবেক জনসংখ্যা থাকলেও তাদের প্রতিনিধি মাত্র ৩ জন। ১০ শতাংশ শিয়া, ৪৮ শতাংশ নারী, তুর্কমেন ও বালুচদের ৫-৬ শতাংশ জনসংখ্যা থাকলেও তাদের কোনও প্রতিনিধি নেই। ফলে মন্ত্রিসভায় সব অংশের আফগানদের অন্তর্ভুক্তির দাবি এলে বাস্তব পরিস্থিতির বিপরীত।

তালেবান ও তাদের সমর্থকরাই শুধু মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেয়েছে। বাকিদের দাবি অগ্রাহ্য করা হয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে জঙ্গিবাদী সংগঠন হাক্কানি নেটওয়ার্ককে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মন্ত্রিসভায়। ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন হাক্কানিরাই। আফগানিস্তানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছে সিরাজউদ্দিন হাক্কানিকে। এই সিরাজউদ্দিনের মাথার দাম ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘোষণা করেছিল আমেরিকা। সিরাজউদ্দিন ছাড়াও আবুল বাকী হাক্কানি উচ্চশিক্ষামন্ত্রী, মৌলভী নজিবুল্লাহ হাক্কানি টেলিযোগাযোগমন্ত্রী, খলিল-উর-রেহমান হাক্কানি শরণার্থী মন্ত্রী এবং আবদুল হক ওয়াসেক গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার পেয়েছেন। হাক্কানি গ্রুপের অন্যতম সক্রিয় সদস্য মোল্লা তাজমীর জাওয়াদকে করা হয়েছে গোয়েন্দা বিভাগের উপ-প্রধান।

জঙ্গিবাদী ও মানব সভ্যতার জন্য বিপজ্জনকদের নিয়ে তৈরি সরকারে একজনও নারী সদস্য নেই। অথচ দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশই তালেবান সরকারের একপেশে মন্ত্রিসভা নিয়ে নীরব দর্শক। খুব স্পষ্ট করে বলতে গেলে, পশ্চিমা দুনিয়া, বিশেষ করে আমেরিকা তালেবানদের প্রতি এত কিছুর পরও আস্থাশীল। আমেরিকা মানুষকে বিশ্বাস করাতে চাইছে, তালেবানরা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। ইসলামাবাদ সন্ত্রাসীদের মদত জুগিয়েও গত দু-দশকেরও বেশি সময় ধরে আমেরিকার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল নিয়েছিল, পাকিস্তানেরই হাতের পুতুল তালেবানরাও এখন সেই পথে হাঁটছে। সব সম্প্রদায় ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে সরকার গড়ার মিথ্যা বিভ্রান্তি তৈরিতেও তালেবানদের মদত দিচ্ছে পাকিস্তান।

তালেবানদের কথা ও কাজের মধ্যে অনেক ফারাক। এটা অতীতেও প্রমাণিত। আফগানিস্তান ছাড়ার জন্য ব্যস্ত আমেরিকা গোটা দুনিয়াকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিল, দু-দশকে তালেবানরা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। তারা নাকি সকলকে নিয়েই সরকার গঠন করতে চায়। আগের মতো শরিয়তের নামে জনজীবনকে বিধ্বস্ত করার রাস্তা নাকি পরিত্যাগ করেছে তালেবান। কিন্তু আফগান জয়ের পর তালেবানরাই বুঝিয়ে দিচ্ছে দুদশকে তাদের মানসিকতায় কোনও পরিবর্তন হয়নি। তাই পরাজিত আফগান নাগরিকদের ওপর অত্যাচার থেকে শুরু করে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর আগের মতোই চলছে তালেবানি সন্ত্রাস।

তালেবানরা বুঝিয়ে দিয়েছে, তাদের মনোভাব কিছুতেই বদলাতে পারে না। সবাইকে নিয়ে জাতি গঠনের কোনও চিন্তাভাবনাই নেই তাদের। আসলে তালেবানের ইসলামিক আমিরাতে গণতন্ত্রের কোনও স্থান নেই। ইসলাম ধর্মের নামে হিংসাত্মক, অসহনশীল এবং আধুনিক সভ্যতার বিরোধী কাজকর্মই তাদের পছন্দ। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিলেও আধুনিক চিন্তাধারার প্রতি তাদের বিশ্বাস নেই। পশ্চিমা দুনিয়ার অন্ধবিরোধী তালেবান। কিন্তু পশ্চিমা অস্ত্রের ঝলকানি তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। টেলিভিশনকে তারা শুধু ধর্মীয় প্রচারের হাতিয়ার হিসেবেই দেখতে চায়। সামাজিক গণমাধ্যম তালেবানদের কাছে তাদের কথা প্রচারেরই শুধু হাতিয়ার মাত্র। ইসলাম ধর্মের নামে তারা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকেই একমাত্র পথ বলে মনে করে। অন্য মতের কোনও গুরুত্ব নেই তাদের কাছে।

তাই আফগানিস্তানে মোটেই অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠন হয়নি। সকলকে নিয়ে সরকার গঠনের বিভ্রম ছড়ানোর চেষ্টায় অবশ্য কোনও কার্পণ্য নেই। বাস্তব বলছে, এটা তালেবান ও হাক্কানি জঙ্গিদের সরকার। তালেবানরা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য রাজনৈতিক মতকে মোটেই আমল দিতে রাজি নয়। সম্মিলিত সরকার বলতে তালেবানরা দুই তাজিক ও এক উজবেক প্রতিনিধিকে মন্ত্রিসভায় রেখে বোঝাতে চেয়েছে এটা সবার সম্মিলিত অন্তর্বর্তী সরকার। নারীদের বাদ দিয়ে আজকের দিনে সম্মিলিত সরকার বাস্তবসম্মত নয়, সেটা মানতে নারাজ তালেবানরা। টেলিভিশন ভাষণে তাই তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ সাফ জানিয়েছেন, শুধু সন্তান ধারণ ও পালন করাই নারীদের কাজ। বাইরের কাজ পুরুষরাই করবেন। শুধু তা-ই নয়, নারীর নির্দেশ কোনও পুরুষের নাকি পালন করা উচিত নয়। মুজাহিদের এই বক্তব্যই প্রমাণ করে তালেবানদের আগের মানসিকতা একদম বদলায়নি।

তালেবানরা নারীদের স্বাধীনতায় বিন্দুমাত্র বিশ্বাসী নয়। তাই পশ্চিমা দুনিয়া নারীদের মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্বের দাবি তুললেও লাভ নেই। নারীদের অধিকার দেবে না তারা। তালেবান শাসনে নারীদের যাবতীয় স্বপ্ন ও অধিকার অধরাই থেকে যাবে। চাপে পড়ে দু-একজন নারীকে মন্ত্রিসভায় নিলেও মানসিকতার বদল সম্ভব নয়। নারীদের মতোই অন্যদের কাউকেই এই সরকারে নেবে না তালেবানরা। এমনিতেই পূর্বতন সরকারের প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই বা চিফ এক্সিকিউটিভ ডা. আব্দুল্লাহ আবদুল্লাহর মতো উচ্চপদস্থ নেতারা কম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় সরকারে থাকতে রাজি হবেন না। তাই অন্যদের কথা ভাবতে পারতো তালেবানরা। কিন্তু নিজেদের হাতেই ক্ষমতা ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর তালেবানরা কিছুতেই অন্যদের সঙ্গে রাখতে চায় না।

আসলে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তালেবান নেতারা দুনিয়াকে বোকা বানাতে চাইছে। তারা বোঝাতে চাইছে বিশ বছর আগের সঙ্গে এখনকার তালেবানের পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয়বার সরকার গঠনের পর স্পষ্ট হয়ে ওঠে তালেবান-১ ও তালেবান-২ সরকারের মধ্যে আসলে কোনও পার্থক্য নেই। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে জঙ্গি হামলার সময়কার তালেবান প্রধানকে মন্ত্রিসভার মাথায় বসিয়ে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, সন্ত্রাসই তালেবানদের মূল কর্মসূচি। তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক পাকিস্তানের কাছ থেকে তালেবানরা শিখে নিয়েছে আমেরিকার চোখে ধুলো দেওয়ার কৌশল। আমেরিকাকে তারা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে, কিছু দিনের মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারে অন্যদেরও ঠাঁই মিলবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নিজে দায়িত্ব নিয়ে সবার অন্তর্ভুক্তির বিভ্রম ছড়াচ্ছেন।

মনে রাখা দরকার, ১৯৯০ সালেও তালেবানরা শুধু নিজেদের অ্যাক্টিং বা ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রীদের দিয়েই সরকার চালিয়েছিল। এটাই তালেবান কৌশল। আন্তর্জাতিক দুনিয়া যদি তালেবানদের পরিবর্তন সত্যিই মাপতে চান তবে তার পদ্ধতি ও মাপকাঠি আগে ঠিক করা জরুরি। মানবিক বা অন্যান্য সাহায্য দানের আগে তালেবানদের সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করাটা আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে খুব জরুরি। মনে রাখতে হবে, পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের মদতপুষ্ট হাক্কানি নেটওয়ার্কের মতো সন্ত্রাসীরা রয়েছে তালেবানদের সঙ্গে। তাই আফগানিস্তানে পাঠানো আন্তর্জাতিক সাহায্য জঙ্গিবাদীদের হাত আরও শক্ত করার আশঙ্কা থাকছেই। এমনিতে তালেবান উত্থানে দক্ষিণ এশিয়ায় অশান্তির আশঙ্কা অনেকটাই বেড়ে গেছে। জঙ্গিবাদীরা আফগানিস্তানে ফের সক্রিয় হতে শুরু করেছে। এ অবস্থায় আফগান জনগণকে সাহায্য করা জরুরি হলেও তালেবানকে মদত দেওয়া চলবে না। দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদে লাগাম টানতে হলে তালেবানরা উৎসাহিত হতে পারে এমন কোনও পদক্ষেপ নেওয়া চলবে না।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বঙ্গবন্ধুর জীবনে 'শক্তিঘর' ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব

বঙ্গবন্ধুর জীবনে 'শক্তিঘর' ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব

চীনের বন্ধুত্ব, নাকি আধিপত্য

চীনের বন্ধুত্ব, নাকি আধিপত্য

বাঁধের বাধায় বন্দি চীনের ‘বন্ধুত্ব’

বাঁধের বাধায় বন্দি চীনের ‘বন্ধুত্ব’

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণেও এগিয়ে বাংলাদেশ

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য পূরণেও এগিয়ে বাংলাদেশ

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

রুশ যুদ্ধবিমানের ধাওয়ায় পালালো মার্কিন বোমারু বিমান

রুশ যুদ্ধবিমানের ধাওয়ায় পালালো মার্কিন বোমারু বিমান

ফিফার ছাড়পত্র আসেনি কিংসলের, অপেক্ষায় বাফুফে 

ফিফার ছাড়পত্র আসেনি কিংসলের, অপেক্ষায় বাফুফে 

‘কক্সবাজার হবে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন নগরী’

‘কক্সবাজার হবে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন নগরী’

আন্দোলনে বিএনপির নেতা কে, জানতে চান ওবায়দুল কাদের

আন্দোলনে বিএনপির নেতা কে, জানতে চান ওবায়দুল কাদের

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দারুণ খেলুক শামীম প্রত্যাশা চাঁদপুরবাসীর 

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দারুণ খেলুক শামীম প্রত্যাশা চাঁদপুরবাসীর 

‘করোনাকালে তথ্য অধিকারের সংকোচন ঘটেছে’

‘করোনাকালে তথ্য অধিকারের সংকোচন ঘটেছে’

পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে চাকরি, নেবে ২৫ জন

পরিবেশ বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে চাকরি, নেবে ২৫ জন

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা হবে দেড় ঘণ্টা

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা হবে দেড় ঘণ্টা

কাবুলে বন্ধ হচ্ছে নারীদের ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

কাবুলে বন্ধ হচ্ছে নারীদের ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

যশোর রোডে সুবাতাসের পদযাত্রা শুরু

যশোর রোডে সুবাতাসের পদযাত্রা শুরু

অনিবন্ধিত ঋণ বিতরণকারী সংস্থা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টের নির্দেশ

অনিবন্ধিত ঋণ বিতরণকারী সংস্থা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টের নির্দেশ

পর্যটন কর্মীদের শ্রম অধিকার আদায়ে সাত দফা দাবি

পর্যটন কর্মীদের শ্রম অধিকার আদায়ে সাত দফা দাবি

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune