X
শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

শঙ্খ ঘোষ : নীরব জল, প্রতিবাদের শিখা

আপডেট : ০১ জুন ২০২১, ১১:৪৬

‘আমারই রাতের স্নেহে ফুটেছিল এই গন্ধরাজ
যে কোনো ঘাসের গায়ে আমারই পায়ের স্মৃতি ছিল
আমারই তো পাশে পাশে জেগে ছিল অজয়ের জল
আবারও সে নেমে গেছে আমারই চোখের ছোঁয়া নিয়ে।
...
তোমাদের পায়ে পায়ে আমারও জড়ানো ছিলো পা
তোমরা জানোনি তাকে, ফিরেও চাওনি তার দিকে
দুধারে তাকিয়ে দেখো ভেঙে আছে সবগুলি সাঁকো
কোনখানে যাব আর যদি আজ চলে যেতে বলো।’
[মাটি : শঙ্খ ঘোষ]

সময়টা বাংলার কালবৈশাখীর কাল। আচমকা আকাশ কালো করে আসা প্রবলঝড়ের মুহুর্মুহু আক্রমণের সময়েই সবচেয়ে বড় আঘাতটা এলো, বাংলার বিবেকীস্বর স্তব্ধ হয়ে গেল। মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখানো কবি যখন অন্তিম শ্বাস নিলেন তখন তাঁর বয়সের হিসাবে প্রায় নব্বই, এই ‘চলে যাওয়া’টাকে ‘যথাসময়’-এ বলা যায় হয়তো কিন্তু সময়টা যথাযথ নয় এ কথা নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করা যায়। ২১শে এপ্রিল সকালে দুঃসংবাদটা জানার পরপরই আমার শিক্ষক ড. তপোধীর ভট্টাচার্য মেসেজ করলেন, ‘আজ সকাল ৮টায় ফ্যাসিবাদী শ্মশানচণ্ডাল কবলিত বাঙ্গালী তাঁর অনমনীয় মেরুদণ্ড ও চিরজাগ্রত বিবেক কবি ও পথপ্রদর্শক ভাবুক শঙ্খ ঘোষকে হারাল। পিশাচ-দানব ও তাদের প্রেতসেনার তাণ্ডবে বাংলা যখন আত্মস্মৃতির অন্ধকারে নিমজ্জমান, কোথাও কোনো বাতিঘর রইল না।’
আমাদের সময়, দেশ বহুমুখী বিপর্যয়ের মুখে আজ। আমাদের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমাজ আজ চূড়ান্ত বিপর্যয়ের সামনে। মানবতার দৈনন্দিন মৃত্যুর অভিজ্ঞতা নিয়ে আরো অন্ধকারের দিকে এই মৃত্যুযাত্রা আমাদের। এই সময় সবচেয়ে বিবেকী স্বর, আমাদের একমাত্র ছায়াবৃক্ষটিও অন্তর্হিত হলো। ধ্বংসের প্রান্তরে বসে যার উচ্চারণে ছিল জীবন মন্ত্র:

‘পৃথিবী হয়তো বেঁচে আছে
পৃথিবী হয়তো গেছে মরে
আমাদের কথা কে-বা জানে
আমরা ফিরেছি দোরে দোরে।
কিছুই কোথাও যদি নেই
তবু তো কজন আছি বাকি
আয় আরো হাতে হাত রেখে
আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি।’

কবিতায়, প্রবন্ধে, রবীন্দ্রনাথকে পুনঃপুনঃ আবিষ্কারে, প্রত্যক্ষ সামাজিক সক্রিয়তায় অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে প্রায় নয় দশকের যাপিত জীবনের গোটাটাই তাঁর আমাদের সামনে উদাহরণ, স্থিতধী এক ‘চির প্রণম্য অগ্নি’। পুরাণকে, আদি আখ্যানকে বারংবার পুনর্নিমাণের মধ্যদিয়ে সঞ্জিবনী জিজ্ঞাসা রেখে গেছেন অনুকরণীয় শিক্ষক শঙ্খ ঘোষ। ‘জাবাল-সত্যকাম’এর নির্জন রাখাল সত্যকামের মুখ দিয়ে আমাদের, সমসময়ের পাঠকের সামনে তিনি রাখেন সেই অমোঘ প্রশ্নটি, ‘কী আমার পরিচয় মা?’ এই মা তাঁর ধরিত্রী, এই নির্জনতা তাঁর অভিষ্ঠ সাধনধাম যার কেন্দ্রে রয়েছে একটি ধ্রুব শব্দ ‘সত্য’। এই সত্য বারেবারে তাঁর লেখায়, কথায় এসেছে, যেমন নীরব অনুভবের সাধনার কথা এসেছে, ‘এত বেশি কথা বলো কেন? চুপ করো শব্দহীন হও’। এই সত্যের একান্ত নীরবতার কাছে বিসর্জিত শঙ্খ ঘোষ তাই উন-নব্বই বছরের যাপিত জীবনে রয়ে গেছেন শিরদাঁড়া সোজা রাখা এক আপোষহীন প্রতীক মানুষ, ‘আত্মকেন্দ্রিকতার বাইরে লিপ্ত হওয়ার সন্ন্যাস যাঁর’ তিনিই তো লিখতে পারেন ‘মজ্জার ভিতরে গর্ব কই, উপেক্ষা কই? মুখ ঘুরিয়ে উদাসীন সরে দাঁড়ানো কই? এখন আমরা দাম্ভিক কিন্তু গর্বিত নই, নির্জীব কিন্তু উদাসীন নই, লুপ্ত কিন্তু লিপ্ত নই।’
পরম সুহৃদ অশ্রুকুমার সিকদার বন্ধু শঙ্খকে নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন– “একজন কবির নিজস্ব নিয়তি নির্ধারিত হয়ে যায় একেবারে গোড়া থেকেই। আমাদের অস্তিত্বের একটা দিক আত্মিকতার কেন্দ্রে থাকে, অন্য একটা দিক থাকে বাইরে মুখ-ফেরানো। বিশ্বগত আর ব্যক্তিগত সামনাসামনি এসে দাঁড়ায়, সমন্বিত হয়। সমগ্র সত্তার স্বরূপে তিনি দেখেন বিশ্বকে, সমগ্র সত্তার মধ্যদিয়েই জীবনকে পেতে চান শঙ্খ ঘোষ, তাই স্বার্থের স্থানীয় সমীকরণের গণ্ডি তাঁকে আক্রান্ত করে, ন্যূব্জ করতে পারে না। তিনি আত্মমন্থন জাত উচ্চারণে লিখতে পারেন ‘ঘর যায় পথ যায় প্রিয় যায় পরিচিত যায়/সমস্ত মিলায়/এমন মুহূর্ত আসে যেন তুমি একা/দাঁড়িয়েছ মুহূর্তের টিলার উপরে, আর জল/সব ধারে ধাবমান জল/প্লাবন করেছে সত্তা ঘরহীন পথহীন প্রিয়হীন পরিচিতিহীন/আর, তুমি একা/এত ছোটো দুটি হাত স্তব্ধ করে ধরেছ করোটি/মহাসময়ের শূন্যতলে...।’ এই মহাসময়ে তাঁর প্রয়াণ তাই এক অসীম শূন্যতা এনে দিলো।”

‘ঘুমের মধ্যে হাত বাড়িয়ে রাখে কেবল দূরের
মাটি, আমার বিলীয়মান মাটি।’

পূর্ববঙ্গের বরিশালের বানিয়াপাড়া থেকে দেশভাগের ক্ষত নিয়ে আরো অনেকের সঙ্গে তাঁরা পূর্বপুরুষও চলে আসেন এই পশ্চিম বাংলায়। বাবা ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মণীন্দ্রকুমার ঘোষ, মা অমলা ঘোষ। ১৯৩২এর ৫ ফেব্রুয়ারি পূর্ববঙ্গের চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। প্রকৃত নাম ছিলো চিত্তপ্রিয় ঘোষ, ক্রমশ পরিচিত হয়ে ওঠেন শঙ্খ নামে। বাবার কর্মস্থল পাবনায় শৈশব ও কৈশোর কাটে তাঁর। পাবনার চন্দ্রপ্রভা বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশান পাশ করেন। পরবর্তীকালে শিক্ষার জন্য, পেশার জন্য নগর কলকাতা তাঁর আবাস হলেও পূর্ববঙ্গ বা অবিভক্ত বাংলাদেশ তাঁর স্মৃতি ও সত্তায় জাগরিত ছিলো আজীবন। আত্মপ্রসঙ্গে তিনি তাই লিখেছেন যে, ‘এমন কবিতা কমই লিখেছি যার মধ্যে–শব্দে বা প্রতিমায়–বাংলাদেশই প্রচ্ছন্ন হয়ে নেই।... এ তো সত্যি যে মুহুর্মুহু আমি বেঁচে থাকি বাংলাদেশের মধ্যেই।’ ১৯৫১তে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে কলা বিভাগে বাংলায় স্নাতক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বাবার মতো তিনিও গোটা জীবন শিক্ষকতা করে যান। যাদবপুর, দিল্লি ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপনা করেছেন। এই সময়কালে তাঁর রবীন্দ্রবিষয়কচর্চা বিদগ্ধজনের চর্চায় আসে, তিনি একজন বিশিষ্ট রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। বাংলার আপামর সাহিত্যপ্রেমীর কাছে যদিও কবি পরিচয়েই শঙ্খ ঘোষ ক্রমশ মুখ্য হয়ে ওঠেন। কিন্তু ব্যক্তি মানুষ নয় তাঁর অন্বিষ্ট ছিলো মানবতার সমগ্রতায়, পরিপার্শ্বের প্রতি সংবেদনময় অবস্থান ছিলো তাঁর কাছে গুরুত্ত্বপূর্ণ ও মুখ্য। এই কারণেই সামাজিক মানুষের ওপর যখন কোনো আঘাত এসেছে তিনি সক্রিয় থেকেছেন প্রতিবাদে। সেই প্রতিবাদের উচ্চারণ পঞ্চাশের খাদ্য আন্দোলনের প্রতিবাদীদের ওপর গুলি চালনার প্রতিবাদ থেকে সত্তরের আধা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রতিবাদ থেকে নন্দীগ্রাম বা কামদনি কাণ্ড, নীরব থাকেনি শঙ্খনাদ। তাঁর সংবেদনী ও যন্ত্রণাকাতর অন্তর থেকে উচ্চারিত হয় তিরস্কার:

‘...চুপ করো
শব্দহীন হও
শষ্পমূলে ঘিরে রাখো আদরের সম্পূর্ণ মর্মর
লেখো আয়ু লেখো আয়ু’
[আয়ু : মূর্খ বড় সামাজিক নয়]

শঙ্খ ঘোষের অকৃত্রিম সাথি ছিলেন কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। বন্ধুর সম্পর্কে লিখতে গিয়ে অলোকরঞ্জন লিখেছেন, “যে সমীপসময়ের বিশ্বসাহিত্য ও দেশজ কবিতার কষ্টি পাথরে পরীক্ষিত যেসমস্ত শিল্পকৃতির উদাহরণ তিনি জুগিয়েছেন এবং সেই সূত্রে এই শতাব্দীর কাছে আমাদের ঋদ্ধি ঋণের যে অঙ্গীকার জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন, তা থেকে প্রতিপন্ন হয়, জীবন ও সাহিত্যের সমীকরণের ঐ দুই কিংবা অনুরূপ আরো জনকয়েক পুরোহিতের ব্যাসার্ধ থেকে অনেক দুরূহসাধ্য ক্ষণসাম্প্রতে তাঁর জাগর ঔৎসুক্যের ঠিকানা। এক হিসেবে তিনি ভারতীয় ও ইউরোপিয় সাহিত্য দর্পণে শীলিত মনস্কতা দস্তুরমতো নেপথ্যে রেখে এভাবেই বেরিয়ে পড়েন কালান্তরের অমীমাংসিত আবর্তগুলির দিকে।”
এখানেই সূচিত হয় কবির দ্বিতীয় প্রস্বর, এরই প্রথম স্বননে ‘প্রতিবাদ ও ভালোবাসা’ যেন এক বিন্দুতে মিলে যায় তাঁর কবিতায়।
শিল্পীর স্ববিবেক বাঁচিয়ে রাখার সংকল্পের বীজ তাঁর অন্তরে অঙ্কুরিত হয়েছিল একেবারে গোড়ার দিকেই। সত্তরের ইন্দিরা জামানার জরুরি অবস্থা, নকশাল দমনের নামে রাষ্ট্র কতৃক নামিয়ে আনা দমনের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ প্রতিবাদের উচ্চারণে দ্বিধা করেননি মৃদুভাষী শঙ্খ ঘোষ। শ্রেণিহীন শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন নিয়ে যখন এই বাংলার তারুণ্য নিজেদের বুকের হৃৎপিণ্ডটাকে উৎসর্গ করছে সেই সময় তাঁদের শিক্ষকের কলম নিশ্চুপ থাকতে পারে না, লেখেন:

‘তোমারই সেন্ট্রাল জেলে,
তোমারই কার্জন পার্কে।’

এভাবেই লিখে যান,
‘চিতা যখন জ্বলছে, আমার হৃৎকমলে
ধুম লেগেছে, ঘুম লেগেছে চরাচরে, পাপড়ি জ্বলে
এই তো আমার
এই তো আমার জন্মভূমির আলোর কথা।’

শঙ্খ ঘোষের প্রিয় ছাত্রদের একজন তিমিরবরণ সিংহ। ‘কবিতার মুহূর্তে’তে লিখেছেন, ‘অনার্স ক্লাসে এসে ভর্তি হলো যখন, তরুণ লাবণ্যময় মুখ, উজ্জ্বল চোখ, নম্র আর লাজুক।... তারপর একবছর বিদেশে কাটাবার পর যখন ফিরে এসেছি আবার আটষট্টিতে, তিমিরের মুখের রেখায় অনেক বদল হয়ে গেছে ততদিনে। কেবল তিমিরের নয়, অনেক যুবকেরই তখন পালটে গেছে আদল, অনেকেরই মনে হচ্ছে নকশালবাড়ির পথ দেশের মুক্তির পথ, সেপথে মেতে উঠেছে অনেকের মতো তিমিরও।’ এরপর একদিন বইয়ের একটি তালিকা নিয়ে ছাত্র আসে শিক্ষকের কাছে। ‘ফেরত পেতে দেরি হবে অনেক। এখন তো দেখা হবে না অনেকদিন’। ‘অনেকদিন আর কোথায়? তোমাদের এম.এ. ক্লাস শুরু হতে খুব তো বেশি দেরি নেই আর।’ অল্প খানিকক্ষণ নিচু-মুখে বসে রইল তিমির, বলল তারপর : ‘কিন্তু এম.এ. পড়ছি না আমি। পড়ে কোনো লাভ নেই। কোনো লাভ নেই এইসব পড়াশোনায়। আপনি কি মনে করেন, না-পড়লে কোনো ক্ষতি আছে?... গ্রামে চলে যাচ্ছি আমি। কোথায় থাকব, কবে ফিরব, কিছুই ঠিক নেই। বইগুলো সঙ্গে থাকলে একটু সুবিধা হবে আমার।’ এই তিমির ‘কিন্তু ধরাও পড়ে একদিন। আর তারপর, আবার একদিন, কয়েকজন সহবন্দির সঙ্গে মিলিয়ে তাকে পিটিয়ে মারে পুলিশ―সে খবরও কানে এসে পৌঁছয়।’ তিমিরের মতো আত্মবলিপ্রদত্ত ছাত্রদের ভুলতে পারেননি শিক্ষক শঙ্খ ঘোষ। লিখছেন, ‘কুয়াশাভরা সন্ধ্যায় ময়দানের কাছে গাড়ি বাঁক নিতেই দ্রুত ফুটে উঠল কয়েকটা ছবি। এই সেই ময়দান, যেখানে ভোররাতে পুলিশের হাতে কত হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে অনায়াসে, পড়ে থেকেছে কত রক্তাক্ত শরীর। মনে পড়ল তিমিরকে। মনে পড়ল তাঁর মাকে, যাকে আমি দেখিইনি কখনো।’ কবিতা লিখলেন তিনি―

‘ময়দান ভারি হয়ে নামে কুয়াশায়
দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যায় রুটমার্চ
তার মাঝখানে পথে পড়ে আছে ও কি কৃষ্ণচূড়া?
নিচু হয়ে বসে হাতে তুলে নিই
তোমার ছিন্ন শির, তিমির।’

এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাননি বা মুক্তি চাননি কবি। এর অনেক দিন পরেও নিজের বাসার বারান্দা থেকে দেখতে থাকা বৃষ্টি ও বিদ্যুতের মধ্যেও ফিরে আসে তিমিরেরা।

‘ইন্দ্র ধরেছে কুলিশ
চুরমার ফেটে যায় মেঘ,
দশভাগে দশটানে বিদ্যুৎ
তারপর সব চুপ
এই তোমার মুখ, তিমির
কিন্তু তারপর সব চুপ।’

দেশ ও রাজ্যের রাজনৈতিক চেহারাটা অনেক পাল্টে যাওয়ার পরেও শঙ্খ ঘোষ তাঁর চিন্তা-চেতনা থেকে বিচ্যুত হননি। ‘কলকাতা’ সম্পাদক জ্যোতির্ময় দত্তকে লেখা একটি চিঠির অবতারণা এই প্রসঙ্গে খুব প্রাসঙ্গিক। নব কলেবরে প্রকাশিত ‘কলকাতা দু-হাজার’-এর লেখক পরিচিতিতে দুঁদে পুলিশ অফিসার রঞ্জিত গুপ্ত-এর পরিচিতিতে ব্যবহৃত বাক্যবন্ধের প্রতিবাদে সম্পাদক ‘প্রিয় জ্যোতি’কে চিঠি লেখেন তিনি। লেখক পরিচিতির পাতায় লেখা ছিল : ‘হ্যাঁ, এই সনেট-অনুবাদক রঞ্জিত গুপ্ত’ই হচ্ছেন সেই নকশাল-দমনকারী পুলিশ কমিশনার, পোলো ক্লাবের প্রেসিডেন্ট, নৃতাত্ত্বিক, চাষি এবং ইন্ড্রাস্টিয়ালিস্ট রঞ্জিত গুপ্ত আই পি।’ শঙ্খ ঘোষ লিখলেন, ‘...ভাবনাটা আলোড়িত হলো পরিচয় জানাবার বিশেষ এই পদ্ধতিতে, বিশেষণের এই মর্মান্তিক নির্বাচনে, এই সগৌরব ঘোষণায় যে ইনিই সেই নকশাল-দমনকারী পুলিশ অফিসার।... অনুমান করি যে এ-উল্লেখ আপনি বোঝাতে চেয়েছেন শুধু লেখকের বৈচিত্র্যটুকুই, এমন কী হয়তো আত্মবিরোধটাই, পোলো খেলা এবং নকশাল-দমনের এই চমকপদ সহাবস্থান, বিবরণে সম্পূর্ণতার গরজ ছাড়া ওখানে নিশ্চই আর কোনো রকম অতিরিক্ত অভিপ্রায় কাজ করেনি। অথচ এই কয়েকটি শব্দের প্রয়োগ যে মুহূর্তমধ্যে আমার মতো অনেক পাঠকের সামনে ঝাঁপ দিয়ে ওঠে এক বিষাক্ত ছোবল নিয়ে, সেকথাও সত্যি।... ওই ‘দমন’ শব্দটি শুনবার সঙ্গে সঙ্গে পনেরো বছরের পুরোনো ছবিগুলি আবার জেগে উঠতে থাকে আমাদের চোখের সামনে, জেগে ওঠে কত-না স্বজন বন্ধু ছাত্রছাত্রী অল্পবয়সী ছেলেমেয়ের মুখ, আমার আপনার সকলেরই বেশ চেনাজানা, কিছু-বা সংকল্পে উজ্জ্বল, কিছু–বা নির্যাতনে বধির, যারা অনেকেই হয়তো বিভ্রান্ত ছিল সেদিন, কিন্তু যাঁদের আর্ত কল্পনার সামনে ছিল মস্ত এক সুস্থ দিনের স্বপ্ন।... সভ্যতা আর মানবতার এই শব্দদুটি যখন আজ পড়ি, তখন মনে পড়ে বেলেঘাটার কথা, বরানগরের কথা, দমদম আর বহরমপুর সেন্ট্রাল জেলের অন্তর্গত নৃশংস আর অবাধ হত্যাকাণ্ডের কথা, মানবতাকেই যার প্রধান ভিত্তি বলে বিবেচনা করা শক্তই ছিল সেদিন। দমনের এই বিভীষিকাময় দিনগুলি কি আজও কিছু কিছু মনে পড়ে আপনার?’
এটি নিছক এক বন্ধু সম্পাদককের কাছে এক কবির অন্তর্গত যন্ত্রণার ভাষ্য নয়, সময়ের গভীর তত্ত্বতলাশ। ‘কী হয়েছিলো সেই দমন প্রক্রিয়া, সেটা ভাববার আগে লক্ষ করা দরকার এই বিশৃঙ্খলার চরিত্রটা। নকশালপন্থি রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে, যেকোনো কৌশলেই হোক, মিশে গেল লুম্পেন প্রোলিটারিয়েটরা। আবার লুম্পেন প্রোলিটায়েটদেরই প্রয়োগ করা হলো এদের ধ্বংস করবারও কাজে, এর বিবরণ রঞ্জিত গুপ্ত নিজেই দিয়েছেন। কিন্তু তার বিবরণে তিনি স্পষ্টত বলেননি জেল বা জেলের বাইরে সেই রাজনৈতিক ছেলেমেয়েদের কথা, যারা লুম্পেন নয়, ওই ফাঁদে জড়িয়ে নিয়ে যাদের ওপর পুলিশি মত্ততা চলেছিল উৎকট হিংস্রতায়। উনিশশো সত্তরের জুলাই থেকে পুলিশ কমিশনার হন রঞ্জিত গুপ্ত, আর আমাদের মনে পড়ে সে-বছরেরই নভেম্বরের এক ভোররাতে, যখন বেলেঘাটার পাঁচশো বাড়িতে হানা দিয়ে চুয়াল্লিশটি পুলিশভ্যান টেনে বার করে কিছু স্কুলকলেজের ছাত্রকে, আর প্রমাণহীন বিচারহীনভাবে চারজনকে গুলি করে মেরে ফেলে সেখানেই, প্রকাশ্য অঞ্চলে। শ্যামপুকুর পার্কের কাছে চৌদ্দ বছর বয়সের টাইফয়েড আক্রান্ত একটি ছেলেকে পথে নিয়ে এসে দিনের আলোয় খুন করে পুলিশ, শ্যামপুকুর রোডে ডেপুটি কমিশনার নিজেরই হাতে গুলি করেন দুজনকে, বেলঘরিয়াতেও ঘটে একইরকম ঘটনা।... প্রতিটি মধ্যরাতে পুলিশ শ্মশানঘাটে নিয়ে আসে চৌদ্দ থেকে তিরিশ বছরের অন্তর্গত অসংখ্য যুবাকিশোরের দগ্ধ শরীর, ...অথবা ভাবুন একাত্তর সালের চব্বিশ ফেব্রুয়ারিতে বহরমপুর জেলের কথা। বেয়নেট আর লাঠি দিয়ে চারজনকে পিটিয়ে মারা হয় সেলের অভ্যন্তরে, তিনজনের মৃত্যু হয় হাসপাতালে পৌঁছে আরো একজন পরে। দমদম সেন্ট্রাল জেলে একইভাবে হত্যা করা হলো একদিন ষোলোটি ছেলেকে, আহত আরো অগণ্য। কিংবা ভাবুন বরানগরের-কাশীপুরের সেই হিংস্র আরণ্যক দিনদুটির কথা, বারো আর তেরোই আগস্ট, যখন তালিকাচিহ্নিত করে দেড়শো ছাত্রকে খুন করা হলো বাড়ি বাড়ি ঘুরে, পথের মোড়ে লটকে দেওয়া হলো নাম, সকলের অভিজ্ঞতার সামনে, যেন প্রশাসনহীন জগতে।’
১৯৮৫তে লেখা এই চিঠিতে আমরা যে মানুষটিকে পাই সে গরল পানের স্মৃতিদগ্ধ ক্ষুব্ধ এক কবি, সামাজিক অবদমনের বিরুদ্ধে সমকালের প্রধান সংবেদনশীল ‘এক্টিভিস্ট’।
জরুরি অবস্থার সময় নিজের অবস্থানে অটুট থাকার জন্য খেসারত দিতে হয়েছিলো তাঁকে। ১৯৭৫’এ ১৮ মাসব্যাপী জরুরি অবস্থার অন্ধকার সময়ে শুধু বিরোধী মত ও দলের মানুষদের অবরুদ্ধই করা হয়নি, বহু সংবাদপত্র, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করা হয়েছিলো। ব্যাতিক্রম ঘটেনি শঙ্খ ঘোষের ক্ষেত্রেও। ‘দেশ’ সম্পাদক সাগরময় ঘোষ নিজে চেয়ে নিয়েছিলেন তাঁর কবিতা, কিন্তু ‘সরকারি নিষেধাজ্ঞায়’ ছাপতে পারেননি! সাগরময় ঘোষ সসংকোচে অন্য লেখা দিতে বললেন। উত্তরে শঙ্খ ঘোষ বলেন, ‘অন্য কোনো কবিতা তো পারব না পাঠাতে। কেননা যা কিছু লিখছি এখন, তার সবটাই তো ও-রকম সরকারি হুকুম নিয়ে ফিরে আসতে পারে।’ সেবার আর লেখা দেননি। ইন্দরার সেই সময়ে শঙ্খ বাবুর শর্ত ছিল অবিকৃত ভাবেই তাঁর লেখা ছাপানোর সাহস দেখালেই সম্পাদককে লেখা দেবেন। এই শর্তে অনেক সম্পাদক পিছিয়ে আসলেও বার্ণিক রায়, অরুণ সেনেরা এই শর্তেই লেখা ছাপেন। ‘লা পয়েজি’ ও ‘সাহিত্যপত্র’এ ছাপা হয় ‘রাধাচূড়া’ ও ‘আপাত শান্তিকল্যাণ হয়ে আছে’।
জরুরি অবস্থার সময় রাষ্ট্র শাসকের রক্তচক্ষুকে কুর্ণিশ না জানানো কবি শঙ্খ ঘোষের আরো অনেকগুলো অভিজ্ঞতা আছে। একবার সরকার নিয়ন্ত্রনাধীন দুরদর্শনে রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের দিন আর অবনীন্দ্রনাথের জন্মদিন উপলক্ষ্যে সেখানে ‘জন্মদিন-মৃত্যুদিন’ নামে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়জন করা হয়েছিলো। হঠাৎ অনুষ্ঠান পরিচলক শঙ্খ ঘোষকে জানান যে স্টেশান ডিরেক্টারের আপত্তিতে তাঁকে একটি লাইন পাল্টাতে হবে। লাইনটি হলো, ‘তখন ইন্দ্রের ভয়ে ঘরে কুলুপ দিয়েছেন ব্রহ্মা’। দর্শকের কানে যদি ‘ইন্দ্র’ শব্দটি ‘ইন্দিরা’ হয়ে প্রবেশ করে এই ভয়ে সেই শব্দটি পাল্টাতে বলা হয়। এমনই আরও অভিজ্ঞতা ছিলো তাঁর, একবার ‘আকাশবাণী’তে অনুষ্ঠান করছেন তিনি ও কবিতা সিংহ। সরকারি বেতার কর্তৃপক্ষ কবিতা সিংহের লেখা স্ক্রিপ্ট থেকে রবীন্দ্রনাথের ‘মেঘ ও রৌদ্র’ গল্প থেকে নেওয়া অংশ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। কিন্তু দৃঢ়ভাবে শঙ্খ ঘোষ এই অংশটি বাদ দেওয়ার বিরোধিতা করেন, বলেন যে বাদ দিলে গোটাটাই বাদ দিতে হবে। এই দৃঢ়তা সবাই সেই সময় দেখাতে পারেননি, যেটা শঙ্খ ঘোষ পেরেছিলেন। ‘কবিতার মুহূর্তে’তে লিখেছেন, ‘অপমান বোধ হয়। অপমান বোধ হয়, ভয় দেখিয়ে শাসন করবার এই লজ্জাহীন ফ্যাসিস্ট আয়োজন দেখে। স্ট্রেটেজি হিসাবে অনেকে চুপ থাকতে চান সত্যি, কিন্তু প্রতিবাদে এগিয়ে এসে পুলিশের কাছে তাড়িতও হন অনেকে গোটা দেশজুড়ে। দিল্লির মসনদ কি জানে না যে প্রতিবাদীর এই সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলবে? অনিচ্ছুকের উপর চাপ দিয়ে খুব বেশিদিন যে বাঁচে না ক্ষমতা, ইতিহাস কি তাকে শেখায়নি এটা?’ এই কথাগুলো চিরকালীন সত্য উচ্চারণ হয়ে থাকবে।

এর অনেক আগেই, ১৯৫১, কোচবিহারের খাদ্য আন্দোলনের প্রতিবাদীদের ওপর গুলি চালনায় নিহত কিশোরীর স্মৃতিতে লেখা ‘যমুনাতী’ কবিতা কালের ঘটনাচিহ্নের সীমানা ছাড়িয়ে কাল-উত্তীর্ণ হয়ে উঠেছিল। স্বাধীনতার চার বছর পরেও কেন মানুষকে খাদ্যের দাবিতে পথে নামতে হবে? কেন খাদ্যের দাবিরত মানুষের উপর রাষ্ট্র গুলি চালাবে? এই প্রশ্ন তাকে ক্ষুব্ধ করে, এই ক্ষোভের প্রকাশে লেখেন :

‘নিভন্ত ওই চুল্লিতে মা
একটু আগুন দে
আরেকটু কাল বেঁচেই থাকি
বাঁচার আনন্দে’।

‘কবিতার কথায়’ লিখেছেন তিনি, ‘সকালবেলা একদিন কাগজ খুলে দেখি প্রথম পাতায় বড় বড় হরফে কুচবিহারের খবর, পুলিশের গুলিতে কিশোরীর মৃত্যু। ...সে কিশোরীর বয়স ছিল ষোলো বছর। বিশ্বাস হতে চায় না কথাটা। ক্ষোভে লজ্জায় কাগজ হাতে বসে থাকি এই খবরের সামনে। ... মিছিলের একেবারে সামনে থেকে একটি ষোলো বছরের মেয়েকে কর্ডনের এপারে টেনে নেয় পুলিশ, আর ‘অবৈধ’ এই সীমালঙ্ঘনের অভিযোগে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করে তাকে, পথের ওপরেই মৃত্যু হয় তার।
স্বাধীন দেশের স্বাধীন পুলিশের হাতে স্বাধীন এক কিশোরীর কত অনায়াস সেই মৃত্যু!...’

‘নেকড়ে-ওজর মৃত্যু এল
মৃত্যুরই গান গা―
মায়ের চোখে বাপের চোখে
দু-তিনটে গঙ্গা’।
দূর্বাতে তার রক্ত লেগে
সহস্র সঙ্গী
জাগে ধকধক, যজ্ঞে ঢালে
সহস্র মণ ঘি!...’

‘তুমি দিয়েছিলে ভার, আমি তাই নির্জন রাখাল।
তুমি দিয়েছিলে ভার, আমি তাই এমন সকালসন্ধ্যা
আজানু বসেছি এই উদাসীন মর্যাদায়
চেয়ে আছি নিঃস্ব চোখে চোখে।...’

রবিবারের আড্ডা, উল্টাডাঙার ঈশ্বরচন্দ্র নিবাসের ফ্ল্যাটবাড়ির আড্ডা। বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের এক চর্চিত আড্ডা, যার কেন্দ্রে শঙ্খ ঘোষ। কবির বাসার এই আড্ডা আসলে মিলনের, ভিন্নমতের ও পথের মানুষদের, ভিন প্রজন্মের মানুষদের, অভিজ্ঞ ও বিদগ্ধ পণ্ডিতের পাশের চেয়ারে এসে অনায়াসে বসে থাকেন সদ্য কবিতা লিখতে আসা মফস্বলের তরুণ-তরুণী। বছরের এক-দুবারের বেশি কলকাতা যাওয়া হয়া না আমার, তবুও ৬০০ কিমি দূরের একপ্রান্ত জনপদের আমার মতো অনেকের কাছেই এই নিবাস ও আড্ডা এক তীব্র আকর্ষণবিন্দু হয়ে উঠেছিল। একদিন এই আড্ডা নিয়ে জিজ্ঞাসা রাখলে তিনি তার ‘জাবালা ও সত্যকাম’ কবিতার কথা বলেন। ‘কবিতার মুহূর্ত’তে শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন, ‘শেষ হয়ে আসছে ১৯৬৬ সাল। প্রায় কুড়ি বছর হতে চলল নতুন দেশের, কিন্তু চারদিকে তাকিয়ে ভরসা হয় না যে তৈরি হয়ে উঠবে কোনো ঐক্যময় নতুন সমাজ। ভাঙ্গনে ভাঙ্গনে কি ভরে এল সব? কোনো কি লক্ষ্য আছে আমাদের এই দিশেহারা সংস্কৃতির? কিছু একটা করবার ছিল, কিছু একটা করবার ছিল, মনে হতে থাকে। এইরকম এক সময়ে, বন্ধুবৃত্তে একটা কথা ওঠে : লেখার সঙ্গে শিল্পের জগতের কোনো একাত্মতা নেই কেন, কেন কোনো চলাচল নেই এক সৃষ্টি থেকে অন্য সৃষ্টিতে? যাঁরা ছবি আঁকেন, যারা কবিতা লেখেন, গল্প লেখেন যাঁরা, নিজেদের মধ্যে তাঁদের মেলামেশা আলাপসংলাপ আরো একটু ঘন হলে হয়তো কেটে যেতে পারত এই জড়তা, হয়তো তখন এর কাছে ওর, ওর কাছে এর প্রেরণাও মিলতে পারত কিছু।
তাই ঠিক হলো, এক একজনের বাড়িতে এক-একদিন মিলব আমরা সবাই, নিছক আড্ডারই জন্য, আর সেই সঙ্গে শিল্পবিষয়ে কিছু কথা হতে পারে...।’ কবির বাসার আড্ডার নিভৃতে হয়তো এই কথাগুলোই প্রেরণা হয়ে রয়ে গেছে।
এমনই বন্ধুবৃত্তের আড্ডায় একদিন উঠে এলো ওরিয়েন্টাল আর্টের প্রসঙ্গ। জিজ্ঞাসা এলো, শিল্পের মধ্যে জাতীয়-চিহ্ন খুঁজবার মানে আছে কিছু? শিল্প কি স্বভাবতই আন্তর্জাতিক নয়? ‘আলোচনায় শেষ পর্যন্ত এই মতেরই জোরালো প্রতিষ্ঠা হলো যে ভারতীয়তা একটা অলীক ব্যাপার, তার অস্তিত্ব নেই কোথাও।’ কিন্তু একথাটায় তাঁর মনের সায় ছিলো না একদম। ‘মনে হচ্ছিল কোথাও কোনো ভুল হয়ে যাচ্ছে; আছে, কিছু আছে। সমাবেশের মধ্যে কথাবলার অনভ্যাসে, জড়তায়, বলতে পারিনি সেকথা, ভিতরে ভিতরে তাই জমে উঠছিল একটা অসম্পূর্ণতার কষ্ট।’ কথা বলতে না পারার যন্ত্রণা নিয়ে সেই রাতে কবি ঘুরে বেড়ান পার্কস্ট্রিট থেকে চৌরঙ্গী। ‘আর কিছু দূরে এসে চোখে পড়ে শেয়ালদায় গৃহমুখী মানুষের চলচ্ছবি, কবিতার লাইন ভেসে আসে : death has undone so many! কাদের এ মুখ? কোন দেশের মানুষ এরা?... কোন আন্তর্জাতিক মানুষ তুমি, কী তোমার ভাষা, কী তোমার জীবন, কোনো কি ঘর আছে তোমার?... মনে পড়ছে অনেকদিনের অনেক হাঁটা, সেই-বাংলা থেকে এই-বাংলায়। কোথায় চলেছি? চকিতে মনে পড়ছে আত্মপরিচয়হীন এক সত্যকামের কথা, উপনিষদের কাহিনী, মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথের ‘ব্রাহ্মণ’। জন্মেছিস ভর্তৃহীনা জাবালার ক্রোড়ে! আমরাও কি নই তা-ই? কিছু কি করার নেই আমাদের?’

‘...পরিচয়? কেন পরিচয় চাও প্রভু?
ওই ওরা বসে আছে অন্ধকার বনচ্ছায়াএ সকলেই ঋদ্ধপরিচয়?
বনে ভরে আগুনকুসুম―
আমি যে আমিই এই পরিচয় ভরে না হৃদয়? কেন চাও আত্মপরিচয়?’

‘আমি আড়াল চেয়েছিলাম চার কিনারে
কিন্তু প্রভু ভুল কোরো না রাত্রি সকাল
পথই আমার পথের আড়াল।’

১৪ মার্চ ২০০৭, রাজ্যের রাজনীতিকে টুঁটি ধরে নাড়িয়ে দিলো নন্দীগ্রাম। প্রিয় বন্ধু অশ্রুকুমার সিকদারের সঙ্গে তখন পাহাড়ের নির্জনাবাসে শঙ্খ ঘোষ। পরদিন নেমে এলেন সমতলে, শ্বশুরবাড়ি জলপাইগুড়িতে। আমি সন্ধ্যায় দেখা করতে গেলাম। প্রবল ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ মন তাঁর কিন্তু বাইরে সেই সীমিত প্রকাশের ধ্যানমূর্তি। স্বভাবিকভাবেই আমি নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গ না টেনে অন্যান্য বিষয় নিয়ে কথা বলছিলাম। এই দিনই তিনি পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি থেকে তাঁর পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন। এই সবকিছুর মধ্যেও তিনি স্থির ও মগ্ন চৈতন্যের ঋষিপ্রতিম দৃঢ়। এর আগের বছর ‘দ্যোতনা’র পক্ষ থেকে তাঁকে একটি পেইন্টিং দিয়েছিলাম, চিত্রকলা প্রসঙ্গে তাঁর ভাবনা জানার ইচ্ছা থেকে কিছু জিজ্ঞাসা রাখলাম, যোগেন চৌধুরীর প্রসঙ্গ এলো। কলকাতায় তাঁরা কবি ও চিত্রকরেরা একটা জায়গায় আসার চেষ্টা করছেন সেই কথা জানালেন। সেই ছবিটির চিত্রকর, জলপাইগুড়ির স্বপন দাসের কাজের প্রশংসা করলেন। যখন জানলেন শিল্পী নিজেকে গৃহবন্দি করে রেখেছেন এক অজ্ঞাত অভিমানে তখন আগ্রহ প্রকাশ করলেন। পরদিন বিকালে আমাকে আসতে বললেন। সেদিন ১৬ মার্চ, বিকাল ৫টা নাগাদ বের হলাম আমরা। একটা সাইকেল রিকশায়, শহর থেকে কিছুটা বাইরে। বুঝতে পারছিলাম একটা মুক্ত পরিসর চাইছেন কবি। পাণ্ডাপাড়া কালীবাড়ির আগে ডানদিকে মণ্ডলঘাটের দিকে চললাম, রিকশায়। পরিস্থিতি ও তাঁর ভেতরের যন্ত্রণা অনুভব করে ‘নীরবতার কাছে বিসর্জিত কবি’র নিঃশব্দ সহচর হওয়াটাই বাঞ্ছনীয় মনে হলো। তিনি যতটুকু বলছেন শুধু তার উত্তরটাই দিচ্ছিলাম। তিনিই মণ্ডলঘাট নামটা শুনে ৬৮র বন্যা প্রসঙ্গ আনলেন। উল্লেখ করা দরকার যে ১৯৬৮র ৪ অক্টোবর তিস্তার ভয়াবহ বন্যায় জলপাইগুড়ি ও নিকট এলাকা বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। সেই বিধ্বস্ত একটি জনপদ এই মণ্ডলঘাট।
তিনি চলতে চলতেই বললেন, ‘আমি সেই সময় এখানে ছিলাম, জানো কি?’
‘হ্যাঁ’। আমি উত্তর দিলাম। ‘আপনার আরুণি ও উদ্দালক’ কবিতাটির কথা তো আপনি লিখেছেন:
‘হ্যাঁ, সেই রাতের অভিজ্ঞতা আমি ভুলব না।’
এই রকম নানা কথায় কথায় অনেকটা চলে গিয়েছি বুঝে ফেলার কথা বললাম। আলোটাও কমে আসছিল। ফেরার পথে স্বপন দাসের বাড়ি পড়বে, স্বপন দা-ও চেয়েছেন তিনি যদি সময় পান তবে অবশ্যই যেন তাঁর আঁকা দেখে যান। আমি সেকথা তুলতেই তিনি রাজি হলেন। স্বপন দাস, মফস্বল শহরের এক স্বশিক্ষিত শিল্পী, প্রচারের কোনো রকম আলোর থেকে অনেক দূরে থাকা শিল্পীর আঁকা দেখতে তার বাড়ি যেতে একবাক্যে রাজি হয়ে গেলেন শঙ্খ ঘোষ, এই ঘটনাটা পাঠককে এই মানুষটাকে জানতে সাহায্য করবে। প্রায় ঘণ্টাখানেক তিনি খুঁটে খুঁটে দেখলেন তাঁর আঁকা। চোখমুখে একটা মুগ্ধতা লক্ষ করলাম। উঠবার সময় বললেন, ‘আপনি ছবি নিয়ে কলকাতায় আসুন। আমার বন্ধু যোগেন চৌধুরীকে এই ছবিগুলো দেখাতে পারবেন? আপনার নিজস্বতা ও রঙ আমার ভালো লেগেছে।’
এমন অনেক ছোটছোট ঘটনার স্মৃতি মানুষটাকে ক্রমশ নতুন নতুন করে আমাকে চিনিয়েছে। এর অনেক দিন পরে, যখন কামদোনিতে একটি স্কুলছাত্রীকে পৌশাচিক গণধর্ষণের শিকার হতে হলো, তার কদিন পরে সকালে তাঁর ঈশ্বরচন্দ্র নিবাসে গিয়েছিলাম। কামদোনিতে এক প্রতিবাদী চিকিৎসকের ওপর হামলার খবর দিলেন কেউ একজন। সেই প্রথম ধৈর্য হারাতে দেখলাম তাঁকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে উঠলেন, শুধু একটা কথা উচ্চারণ করলেন, ‘এও তো এক সর্বনাশের সূচনা, শাসকের ও সমাজেরও।’ আরো অনেক কথা হলেও সে কথাগুলো ছিল একান্তই ব্যক্তিগত। আসলে একজন শিল্পী বা স্রষ্টা তো দ্রষ্টাও। যাদবপুরের সহকর্মী ও প্রিয় বন্ধু অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত তাঁর সম্পর্কে লিখেছিলেন যে, ‘আমার ধারণা, দুই বাংলার অবিভক্ত সংস্কৃতির অন্যতম জনপ্রিয় এই মানুষটির স্নায়ব সংবেদন এতই গভীর যে তার রহস্য হৃদয়ঙ্গম করা অনেকেরই সাধ্য নয়। হ্রদের মতন স্বচ্ছ এবং শায়রের মতো ঋজু তাঁর প্রকাশভঙ্গি। ঐ প্রত্যক্ষতার আড়ালে এমন একটি সত্তা লুকিয়ে আছে যার নাগাল পাওয়া ভার।’ এই সত্তা আসলে মানবতার প্রতি উৎসর্গকৃত এক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ স্রষ্টার অন্তরাত্মা:

‘আসলে সকলে মিথ্যা বলে বলুক, দু-চার জনের কাছে আমরা সত্য চাই।
আর সকলে ভ্রান্ত করে করুক, দু-চার জনের কাছে আমরা ব্রত চাই।’

এই ব্রতচারী নির্মাণেই জীবনের প্রায় সম্পূর্ণটা নিয়োজিত করেছিলেন শঙ্খ ঘোষ। সেটা একজন শিক্ষক হিসেবে বিদ্যায়তনে বা একজন সামাজিক মানুষ হিসেবে সচেতন সামাজিক মানুষের খোঁজে। বহরমপুর গার্লস কলেজ, সিটি কলেজ হয়ে ১৯৬০-এর গোড়ায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। যাদপপুরে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন সুকুমার সেনের মতো মানুষেরা, পিএইচডি না করা একজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিযুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সুকুমার সেন নাকি বলেছিলেন, শঙ্খ নিজেই পিএইচডি করাবে!
গোটা জীবন একজন আদর্শ ও ছাত্রপ্রিয় শিক্ষকের মতো পড়ানোর আনন্দেই পড়িয়েছেন তিনি। একজন শৃঙ্খলাবদ্ধ কিন্তু সরস ও প্রাণবন্ত ক্লাস করার অভিজ্ঞতা হতো তাঁর ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের। ক্লাসঘরে ঢুকেই সন্তর্পণে দরজা বন্ধ করে দিতেন। পড়ানোর বিষয়ের প্রয়োজনে বিষয়ান্তরে যেতেন কিন্তু কখনো রেফারেন্স হিসেবে নিজের বইয়ের নাম করতেন না। ঋজু বসু লিখেছেন যে পড়ানোর আনন্দে তিনি শান্তিনিকেতনে ফেলোশিপ পর্বে পাঠভবনের ছোটদের ক্লাসও নিতেন। ১৯৯২-তে যাদবপুর থেকে স্বেচ্ছা অবসর নেন তিনি।
শিক্ষক শঙ্খ ঘোষের ছাত্রছাত্রীদের প্রতি ভালোবাসা ছিল অকৃত্তিম ও অন্তর থেকে উৎসারিত। এই ভালোবাসা তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ছাত্র নির্বিশেষে বহতা ছিলো। সত্তরের রাজনৈতিক ঝঞ্ঝা, নকশাল আন্দোলন, জরুরি অবস্থার সময় তিনি তাঁর আত্মক্ষয় নিবেদিত ছাত্রদের ওপর রাষ্ট্রের আক্রমণে নিজেও রক্তাক্ত হতেন। আগামী প্রজন্মের প্রতি আত্মনিবেদিত থেকেছেন আমৃত্যু। অন্তরের নাভিমূল থেকে উচ্চারণ করেছিলেন:

‘ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।
...
না কি এ শরীরে পাপের বীজাণুতে
কোনোই ত্রাণ নেই ভবিষ্যের
মৃত্যু ডেকে আনি নিজের ঘরে?’

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২১, ২৩:১৩

[তৌহিন হাসানের প্রথম উপন্যাস ‘উড়ালপঙ্খী’ বইমেলা ২০২১-এ পেন্সিল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইটি পড়ার ইচ্ছে হয়েছিল প্রচ্ছদ দেখে। নিজের দেশ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মাইল দূরে বসে স্পর্শ করে, দেখেশুনে বই কেনার সুযোগ কোথায়! কিন্তু ‘উড়ালপঙ্খী’ আমাকে একবিন্দুও নিরাশ করেনি। সহজ, সাবলীল গদ্যশৈলীর সাথে কাব্যময়তার পাশাপাশি ভালো লেগেছে উপন্যাসের বুনন। এক্ষেত্রে লেখকের স্বাতন্ত্র্যের ছাপ সুস্পষ্ট। কোনো টাইমলাইন বা ক্রনোলোজি না মেনে একেবারে ভিন্ন আঙ্গিকে ঘটনাগুলোকে উপস্থাপন করেছেন। মূল চরিত্র পঙ্খীর জীবনের নানা ঘটনাকে ঘিরেই পুরো কাহিনি আবর্তিত হয়েছে।
একটা গল্প বা উপন্যাস পড়ার পর সেটা নিয়ে স্বয়ং লেখকের সাথে কথা বলা বা মত বিনিময়ের সুযোগ পাওয়াটা এক অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরা হয়েছে।]


প্রশ্ন : এটি আপনার প্রথম উপন্যাস। কবে, কখন এই উপন্যাস লেখার ভাবনা মাথায় এলো?
উত্তর : ‘উড়ালপঙ্খী’ আমার প্রথম উপন্যাস। এটি লেখার পরিকল্পনা প্রথম মাথায় আসে আজ থেকে পাঁচ-ছয় বছর আগে। গল্পের কাঠামোটা তখনই ভেবে রেখেছি। কিন্তু লেখা শুরু করেছি অনেক দেরিতে, ২০২০ সালের নভেম্বরে।

প্রশ্ন : উপন্যাসের বিষয়বস্তু গতানুগতিকতার বাইরে এবং বেশ অপ্রচলিত। মনস্তত্ত্ব জটিল একটা বিষয়। প্রেম, বিরহ এসব নিয়ে না লিখে এই কনসেপ্টটাই কেন বেছে নিলেন?
উত্তর : আসলে গতানুগতিকতার বাইরে কি না জানি না! আমার ভেতর থেকে যেভাবে এসেছে, যেভাবে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেছি, সেভাবেই লিখে গেছি৷ আর উপন্যাসের ঘটনা বা চরিত্রগুলো যে কল্পনাপ্রসূত তা-ও কিন্তু না! এই চরিত্রগুলোকে আমি বাস্তব জীবনে বিভিন্নভাবে দেখেছি, জেনেছি, বিশ্লেষণ করেছি। চেনা চৌহদ্দির মধ্যে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা থেকে তুলে এনে উপন্যাসে সন্নিবেশ করেছি৷

প্রশ্ন : বইটির প্রচ্ছদ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার ভাবনা শুনতে চাই।
উত্তর : আমি যেহেতু প্রফেশনালি বইয়ের প্রচ্ছদ করি, নিজের বইয়ের প্রচ্ছদ করাটা আমার জন্য বেশ কঠিন। একটা দ্বিধা কাজ করে। উপন্যাস লেখার মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রচ্ছদে ছবি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেই৷ যেহেতু মূল চরিত্রের আবেগটাকে আমি খুব ভালো করে জানি, তার চেহারার নির্লিপ্ততাকে প্রচ্ছদে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি। বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী অনেকেই বলেছে কাভারে কেন একটা মেয়ের মুখ! প্রচ্ছদ তো এবস্ট্রাকট হয়, তাতে নানা রকমের আর্টিস্টিক মোটিফ থাকে! কিন্তু আমার মনে হয়েছে একজন পাঠক যখন বইটা পড়ে মূল চরিত্রটাকে অনুধাবন করবে তখন বুঝতে পারবে কেন এই প্রচ্ছদ ব্যবহার করেছি। বই না পড়ে আগে থেকে সেটা বোঝা যাবে না।
একজন পাঠক হিসেবে আমারও কিন্তু একই অনুভূতি হয়েছে৷ ‘উড়ালপঙ্খী’ পড়ে শেষ করার পর প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে এই বইয়ের এরচেয়ে উত্তম প্রচ্ছদ আর হতে পারে না!

প্রশ্ন : পঙ্খী প্রথা ভাঙায় বিশ্বাসী। সমাজ-সংসারের প্রচলিত নিয়মগুলো তাকে বেঁধে রাখতে পারেনি। সে জায়গা থেকে ‘উড়ালপঙ্খী’ নামটা আমার কাছে যথার্থ মনে হয়েছে। আপনারও কি নামকরণের ক্ষেত্রে এরকম ভাবনা ছিল?
উত্তর : নামকরণের ক্ষেত্রে আমার ভাবনাটা খুবই সরল ছিল। যেহেতু মেয়েটার নাম উড়ালপঙ্খী, নামটা তার বাবার দেওয়া এবং গল্পটা তাকে ঘিরেই, তাই উপন্যাসের নামও উড়ালপঙ্খী। তাছাড়া সে সব সময় মুক্ত থাকতে চাইত, কারো কথা শুনত না। সামাজিক বিধিনিষেধ মানেনি। নিজের যেটা ভালো লাগে তাই করে। এসব কারণেই উড়ালপঙ্খী নামটা বেছে নেওয়া।

প্রশ্ন : উপন্যাসের বুনন সম্পর্কে কিছু বলুন।
উত্তর : ব্যক্তিগত জীবনে আমি প্রচুর কথা বলতে পছন্দ করি। একটা বিষয়ে কথা বলার মাঝখানে বিভিন্ন উদাহরণ, সাবক্যাটাগরি, ক্রস-রেফারেন্স চলে আসে৷ এটা আমার কথা বলার ধরন বা অভ্যাস। লেখার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে৷ উপন্যাসের সংজ্ঞা এখনও আমার কাছে দুর্বোধ্য। ঔপন্যাসিক, কবি, সাহিত্যিক—এই শব্দগুলো পছন্দ করি না। নিজেকে স্টোরি টেলার ভাবতে ভালোবাসি। আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই৷ গল্পের তো শাখা থাকে, ঘটনা একটা হতে পারে কিন্তু তাকে বর্ণনা করার সময় অনেক ডালপালার বিস্তার হয়। পঙ্খীর গল্পটা বলার সময় টুকরো টুকরোভাবে নানা গল্প প্রাসংঙ্গিকভাবেই চারপাশ থেকে চলে এসেছে। হয়তো অন্যভাবে বলতে পারতাম! কিন্তু আমার কাছে যেভাবে কমফোর্টেবল মনে হয়েছে, আমি সেভাবেই বলে গেছি। 

প্রশ্ন : কতদিনে উপন্যাসটা শেষ করেছেন? নির্মাণের  সময়ের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা শুনতে চাই।
উত্তর : খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেষ করতে হয়েছে, প্রায় আড়াই মাসের মতো। যেহেতু পাঁচ বছর ধরে গল্পটা মাথায় ছিল অনেকটা প্রি-প্রোডাকশনের মতো, তাই লেখার সময় খুব একটা ভাবতে হয়নি৷ পার্শ্বচরিত্র, বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা আগে থেকেই মাথায় ছিল। ব্যাপারটা আসলে অনেকটা রান্না করার মতো! উপকরণগুলো আগে থেকে প্রস্তুত থাকলে রান্নায় বেশি সময় লাগে না।
আর অভিজ্ঞতা বলতে যেটা হয়েছে কখনো একটানা লিখতে পারিনি। আবার লেখার নির্দিষ্ট কোনো সময়ও ছিল না৷ রাত-দিন এক হয়ে গিয়েছিল। জীবনযাপনে একটু ব্যাঘাত হয়েছে৷ খানিকটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল সবকিছু।

প্রশ্ন : পড়া শেষ হবার পরেও একটা অদ্ভুত বিষণ্নতা আর ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম। পঙ্খীর মনোজগতের যে টানাপড়েন, তার জীবন পরিক্রমায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে—আমার মনে হয়েছে এর মাধ্যমে পাঠকের মনে প্রভাব বিস্তার করতে চান। এটা কী সচেতনভাবে করেছেন নাকি অবচেতনে ঘটেছে?
উত্তর : শুধু আমার ক্ষেত্রে না, যেকোনো লেখকের ক্ষেত্রেই এটা সত্য যে তারা সচেতনভাবে পাঠকের মনে প্রভাব বিস্তার করতে  চান না। আমি শুধু আমার  মতো করে নিজের ভাষায় একটা চরিত্র সম্পর্কে লিখে যেতে চেয়েছিলাম। পাঠকের মনোজগতে এর কী প্রভাব পড়বে সেটা পাঠকের মস্তিষ্কপ্রসূত। একজন পাঠক কিভাবে পঙ্খীকে গ্রহণ করেছে সেটা একান্তই তার ব্যাপার। অনেক পাঠক হয়তো বিষণ্ন চরিত্রই পছন্দ করেন না। আবার অনেকেই পঙ্খীর জীবনের বিভিন্ন ঘটনার সাথে নিজের মিল খুঁজে পাবেন। 
 
প্রশ্ন : আজকাল যেটা দেখা যাচ্ছে অনেক লেখকই উপন্যাস প্রকাশের আগে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সেটা লিখছেন যা পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশ হচ্ছে। লেখার সময় কোনো চরিত্রকে রাখবেন, কার কি পরিণতি হবে সেটা পাঠকদেরই জিজ্ঞেস করছেন। এটা কেন হচ্ছে?
উত্তর : মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভাব বিনিময় করা। লেখক, কবি, সাহিত্যিকরা যেকোনো শিল্প-মাধ্যমের দ্বারা নিজের দর্শন প্রকাশ করেন। শিল্প তো চর্চার ব্যাপার। চিন্তা ও চর্চা—এই দুটোর সমন্বয়ে শিল্পের বিকাশ ঘটে। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়টা খুব অস্থির। এখন ভাব বিনিময়ের অসংখ্য মাধ্যম। সব সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় প্র‍্যাকটিসটা পাল্টে গেছে। যার ফলে ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে লেখকরা হোঁচট খাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে তখন পাঠকের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। অনেকে দেখা যাচ্ছে প্রচ্ছদ আপলোড করছেন তিনটা। পাঠককে বাছাই করার অপশন দেওয়া হচ্ছে। এটা খুবই আশঙ্কার বিষয়। এটা কারোর দোষ না, শুধুই চর্চার অভাব।

প্রশ্ন : তিমির একজন বিপ্লবী হতে চেয়েছিল, কর্পোরেট কালচারের অংশ হতে চায়নি। ছাত্রজীবনে তাকে দেখা গেছে যথেষ্ট দায়িত্বহীন। আবার পঙ্খীর স্বামী হিসেবে সে যথেষ্ট দায়িত্বশীল ছিল। এই চরিত্র নিয়ে আপনার ভাবনা শুনতে চাই।
উত্তর : বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা ক্লাসে ৪০-৪৫ জন ছাত্রের মধ্যে কেউ থাকে বিপ্লবী, কেউ খুব সিরিয়াস, কেউ কবি অথবা শিল্পী, আবার দু-চারজন থাকে খুব বোকাসোকা যাদের নিয়ে সবাই স্যাটায়ার করে। আজকাল কোনো সামাজিক সমস্যা হলে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী টিএসসিতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তিমির তাদেরই একজন, কোনো কল্পিত চরিত্র না। সে অন্যায় সহ্য করতে পারত না। বামপন্থি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। ছাত্রজীবনে তিমির প্রেমবন্ধন এসবে আস্থা রাখত না। কিন্তু একটা সময় হোঁচট খায়। সামাজিক, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে তার ভাবনায় পরিবর্তন আসে। তখন পঙ্খীকে বিয়ে করে সংসারী হয়। এমনকি কর্পোরেট কালচারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একটা প্রাইভেট ফার্মের জন্য বিজ্ঞাপন লেখা শুরু করে। তিমির আসলে বাইরের কেউ না, আমাদের সমাজেরই একজন।

প্রশ্ন : ‘উড়ালপঙ্খী’ পড়ে মনে হয়েছে জেনেটিক সায়েন্স, সাইকোলজি, নারীদের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারগুলো সম্পর্কে আপনার বেশ ভালো দখল আছে। এই বিষয়গুলোতে কী আগে থেকেই আগ্রহ ছিল?
উত্তর : এই বিষয়গুলোতে আমার আলাদা আগ্রহ ছিল। বিভিন্ন বিষয়ে আমার পড়াশোনা শুরু হয় ক্লাস নাইন থেকে। তখন প্রথম মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে পড়া শুরু করি। সে সময় নিজে টেলিস্কোপ বানাই। ধর্ম সম্পর্কে বিভিন্ন বই, জেনেটিক সায়েন্স ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ জাগে। এরপর ধীরে ধীরে পরিচিত হই সিগমন ফ্রয়েড, সিমন দ্য বোভোয়ারের সাথে।
আমি তখন সরকারি স্কুলের ছাত্র। প্রাইভেটে ইংরেজি পড়তাম অঞ্জন ভদ্র নামে পাশের স্কুলের একজন শিক্ষকের কাছে। পড়া শেষে স্যার আধা ঘণ্টার একটা বাড়তি ক্লাস নিতেন অন্যান্য বিষয়ে। এর সাথে সিলেবাসের পড়ার কোনো সম্পর্ক ছিল না। আমি জানার আগ্রহ থেকে সেই ক্লাসে থাকতাম। এরিস্টটল, জ্যোতির্বিজ্ঞান, শারীরতত্ত্ব, জেনেটিক সায়েন্স, মনস্তত্ত্ব, রবীন্দ্রনাথ, লালনসহ বিভিন্ন বিষয়ে স্যার কথা বলতেন যার আশিভাগই বুঝতাম না। স্যার বলতেন—শুধু শুনে যাও, কোনো প্রশ্ন করবে না। এখন না বুঝলেও আজ থেকে ১০ বছর পরে আমার কথাগুলো ঠিকই বুঝবে। যারা বুঝতে পারবে তারা কেউ লেখক হবে, কেউ-বা দার্শনিক'। তখন এসব বিষয় নিয়ে বেশি বেশি পড়া শুরু করি। এই বাড়তি  জানার আগ্রহের কারণে আমার পড়াশোনায় কোনো ক্ষতি হয়নি বরং সব সময় ভালো রেজাল্ট করেছি। আর ১০ বছর পর স্যারের কথাগুলোর মানেও আমি ঠিকই বুঝতে পেরেছি।

প্রশ্ন : ‘উড়ালপঙ্খী’কে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন? যে ভাবনাটা আপনার মাথায় ছিল কাগজে-কলমে কী সেটাকে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন?
উত্তর : আমার বিশ্বাস নিজের ভাবনাটাকে কাগজে-কলমে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি। এ বিষয়ে আমার আত্মতৃপ্তি আছে। কোনো আক্ষেপ নেই। যদিও অনেকে বলেন লেখকের আত্মতৃপ্তি বলে কিছু নেই। কিন্তু এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে আমার মনে হয় আমি সব ঘটনা এবং চরিত্রকে ভাবনা অনুযায়ী ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি।
আর নিজস্ব মূল্যায়নের কথা যদি বলি তবে বলব এখানে পাঠকরা নিজের আশপাশের নানা ঘটনাকেই খুঁজে পাবেন। চিরচেনা সমাজের বিভিন্ন বিষয়, জেনেটিক্স, মনোজাগতিক টানাপড়েন, সোশ্যাল ট্যাবুসহ নানা ঘটনা এখানে উঠে এসেছে। অনেক চরিত্রের সাথে পাঠকরা নিজেদের রিলেট করতে পারবেন। আমার বিশ্বাস অনেক পাঠক নিজেকে তিমির ভাববেন। তিমিরের মতো চরিত্র বা সিকদার চাচার মতো যৌন নির্যাতকরা আমাদের সমাজে বাস করে। আবার অনেক মেয়ের জীবনের অভিজ্ঞতা হয়তো পঙ্খীর সাথে মিলে যাবে। হিন্দু-মুসলিম বিয়ে কিংবা হুট করে বিয়ে করে ফেলা—এসব ঘটনাও তো আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে!

প্রশ্ন : শেষটা হয়েছে একটা ধোঁয়াশার মাঝে। এমন একটা সমাপ্তিই কী চেয়েছিলেন?
উত্তর : হ্যাঁ, এমন একটা সমাপ্তিই চেয়েছিলাম। এমন বেশকিছু ঘটনা আমার চেনাজগতেই ঘটে গেছে। আমাদের সমাজে বহুগামিতা বেড়েছে—এটা একটা বড় সামাজিক সংকট। আমি সচেতনভাবেই উপন্যাসের শেষে তিমির এবং ফরহাদকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছি। শেষটা হয়েছে ক্লিফহ্যাঙ্গারের মতো যা পাঠককে অপেক্ষায় রাখবে। এর আরেকটা কারণ হচ্ছে আগামীতে ‘উড়ালপঙ্খী'র পরবর্তী খণ্ড আসবে।
 
[একজন পাঠক হিসেবে পরবর্তী খণ্ডটি পড়ার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করব। ‘উড়ালপঙ্খী’ আমাকে এক বিষণ্ণ-সুন্দর অনুভূতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। পড়া শেষ হবার বহুদিন পরও এর রেশটুকু মনে থেকে গেছে। 'রামের সুমতি', 'পরিনীতা', 'পথের পাঁচালী' কিংবা 'পুঁইমাচা'—এসব গল্প-উপন্যাস পড়ে যেমন মনে হয়েছিল যতবার পড়ব ততবারই চোখ ভিজে যাবে, ‘উড়ালপঙ্খী’ও একইভাবে আমার মন ছুঁয়ে গেছে। একজন শক্তিশালী লেখকই কেবল পারেন পাঠককে এই অনুভূতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে।
মনস্তাত্ত্বিক ঘরানার উপন্যাস ‘উড়ালপঙ্খী’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারে একটি চমৎকার সংযোজন। যারা গতানুগতিকতার বাইরে ভিন্ন স্বাদের কিছু পড়তে চান তাদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে সুখপাঠ্য হবে। পঙ্খীর জীবনের অন্ধকার চোরাগলিগুলোতে ভ্রমণ করতে করতে পাঠকের মনে সমাজের ভয়ানক কিছু অসঙ্গতির চিত্র ফুটে উঠবে। শিশু-কিশোরদের যৌন নির্যাতন, ভিক্টিম ব্লেমিং, স্টেরিওটাইপস, ট্যাবু, পুঁজিবাদসহ নানা রকমের সামাজিক সমস্যা সচেতন পাঠকমাত্রের মনে ভাবনার উদ্রেক করবে। আমাদের সমাজে 'সিকদার' রূপী মামা, চাচা, ভাই অনেক মেয়েরই থাকে। অথচ নির্ভয়ে এসব বলার মতো জায়গা থাকে না বলেই পঙ্খীদের জীবন এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন! 'আলোয় আলোয় মুক্তি' চেয়েও পঙ্খীরা অন্ধগলিতে হারিয়ে যায় বারবার। পঙ্খীর মনোজগতের সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। একজন মানু্ষের জীবনের ভিত তৈরিতে তার শৈশব এবং কৈশোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম।
তিমির চরিত্রটি আমাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে। তিমিরের বয়ানে জীবন ও সমাজ নিয়ে যেসব ভাবনা ও দর্শন লেখক তুলে ধরেছেন তার বেশিরভাগের সাথেই একাত্ব হতে পেরেছি। খুব মন খারাপ হয়েছে, কিছুটা রাগও—যখন তিমির আর পঙ্খীর পথ আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু এটাও মনে হয়েছে এমনটা না করলে হয়তো একটা গতানুগতিক সমাপ্তিই ঘটত।
প্রাঞ্জল বর্ণনায় প্রতিটি চরিত্র চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। জেনেটিক সায়েন্স, সাইকোলজির পাশাপাশি মেয়েদের মনোজগৎ সম্পর্কে লেখকের জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটেছে পুরো উপন্যাসজুড়ে। পঙ্খী স্রোতের বিপরীতে চলা এক অসীম সাহসী তরুণী। সে চেয়েছিল কন্যা মুক্তি অপরিসীমার জন্য চার দেয়ালের ভেতরে একটা আলোকময় জগৎ গড়ে তুলতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কতটুকু পেরেছিল! সেটা খোঁজার দায়টুকু আগ্রহী পাঠকদেরই থাকুক!—শা. মি.]

/জেডেএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১২:৫১

মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬) লেখক পরিবার থেকেই এসেছিলেন। পিতৃমাতৃ—দুকূলই লেখক ছিলেন। এমনকি শ্বশুরকূলও। পুরুষানুক্রমেই এঁরা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মহাশ্বেতা দেবীর জীবনটা সাহিত্যের কাছেই সঁপে দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন দুহাত খুলে। ‘হাজার চুরাশির মা’ (১৯৭৪) তার অন্যতম আলোচিত উপন্যাস। গ্রন্থখানির পাঠপরিক্রমায় কিছুটা সাবধানী মনে এগুতে হয়। মাঝেমধ্যেই নিত্যনতুন চরিত্রের দেখাসাক্ষাৎ ঘটে। সিংহভাগ চরিত্রই দিব্যনাথ-সুজাতা পরিবারের। উপন্যাসখানি বুঝে নিতে চাইলে এদের মধ্যকার পারষ্পারিক সম্পর্ক স্মরণে রাখা খুবই জরুরি। পরিবারটি অনেকটা উনিশ শতকের ক্লাব-কালচারের ন্যায় সামন্তধারায় গড়ে ওঠে। ভোগবাদী প্রবৃত্তি এদের মধ্যে তীব্রতর। দিব্যনাথের নিজস্ব ‘চার্টার্ড অ্যাকাউনটেনসির আফিস।’ প্রতিনিয়ত মোটা টাকা আসে। জ্যোতি, নীপা অথবা তুলির স্বামীরাও কর্পোরেট কর্পোরেশনে হাই সেলারির জব করে। সবাই ভোগবিলাসে মত্ত। এদের চারিত্রিক স্খলনও কম নয়। অফিসের টাইপিস্ট মেয়েকে নিয়ে দিব্যনাথের ঢলাঢলি, মাঝেমধ্যেই রক্ষিতা নিয়ে বাইরে সান্ধ্য কাটানো। ঢেকেঢুকে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে সর্বসম্মুখে সহাস্যে এসব ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়। এসব সে পৌরুষ-অধিকার বলেই জানত। কেবল বর্তমান নয়, চিরকালই দিব্যনাথ নারী নিয়ে নোংরামি করে আসছে। শাশুড়িও কম প্রশ্রয় দেয়নি। ছেলে তার ‘পুরুষ বাচ্চা’, স্ত্রৈণ নয় বলে অহংকারও করত। দিব্যনাথের পিতাও নাকি যৌবনকালে এমনই ছিল। প্রায়শই সন্ধ্যাবেলা নারী নিয়ে বাইরে কাটাত। পরপর দুই পুরুষের নৈতিক অধঃপতন তৃতীয় পুরুষ জ্যোতি অথবা নিপাদের কাছেও সমভাবেই সমর্থন পায়। সামন্ত প্রভুর ন্যায় দিব্যনাথ নিজেকে পরিবারের ‘বস’ বলে বিবেচনা করত। সন্তানেরা অনেকেই ইনিয়েবিনিয়ে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে বাবাকে ‘বস’ বলেই সম্বোধন করত। এমনকি কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতীও। তবে এই সন্তানের মেজাজটা ছিল খানিকটা ভিন্ন ধার ও ধারার।

২.
অর্থবিত্তে স্বচ্ছল হলেও পরনারীতে অভ্যস্থ হওয়ায় দিব্যনাথ-সুজাতার দাম্পত্য-সম্পর্ক সুখের ছিল না। দিব্যনাথ সুজাতাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতো না। বরং যৌন পার্টনার হিসেবেই বিবেচনা করত। অসুখবিসুখ হলে খোঁজখবর নিত না। নবজাতকের কান্না থেকে বাঁচার জন্য তেতলায় ঘুমাত। প্রসূতি স্ত্রী থেকে দূরে অবস্থান করত। শাশুড়িমাও ছিল নারীবিদ্বেষী মহিলা। সুজাতার সন্তান জন্মদান সইতে পারত না। প্রসবকাল দেখলেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেত। তীব্র প্রসবযন্ত্রণা নিয়ে সুজাতাকে একা একাই নার্সিং হোমে যেতে হতো। দিব্যনাথের নজর কেবল একদিকে—‘আবার মা হবার যোগ্য শরীর হচ্ছে কি না সুজাতার।’ দুবছর পরপর সুজাতার চার সন্তান জন্মে। জ্যোতি, নীপা, তুলি। সর্বশেষ ব্রতী। প্রথম ও শেষে পুত্রসন্তান, মাঝখানে দুটি কন্যাসন্তান। ব্রতীর দুবছর বয়সকালে সুজাতা লম্পট দিব্যনাথের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেছিল। লেখকের ভাষায়—দিব্যনাথ কিছুতেই ওঁকে পঞ্চমবার ‘মা’ হতে বাধ্য করতে পারেনি। দিব্যনাথ সুজাতাকে ফার্মের কাজ ছেড়ে দিতে বলেছিল। সুজাতা মানেনি। ‘কাজ না-ছাড়া সুজাতার দ্বিতীয় বিদ্রোহ।’ 
বাবামায়ের মধ্যকার এই টানাপড়েন ব্রতী খানিকটা বুঝতে পারত। বুঝতে পারত মাতৃবক্ষের সুগভীরে লুকানো তীব্র গোপন ব্যথা। ব্রতীর মনটা কম্পাসের কাটার ন্যায় মমতাময়ী মাতা জগজ্জননী সুজাতার দিকে হেলে থাকত। ব্রতী সর্বদা মায়ের ওপর চোখদুটো সুস্থির রাখত। দশ বছর বয়সেও খেলাধুলা ফেলে বাড়ি চলে আসত। শিয়রে বসে মায়ের মাথায় বাতাস করত। এজন্য দিব্যনাথ ব্রতীকে সইতে পারত না। কনিষ্ঠ সন্তান হলেও শত্রু বিবেচনা করত। ব্রতীকে টিপ্পনি কেটে দিব্যনাথ কখনো বলত ‘মাদার্স চাইল্ড’ কখনো বলত ‘মেয়েমার্কা ছেলে। নো ম্যানলিনেস।’                 
মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে এই পুঁজিবাদী পরিবারের চরিত্রগুলো দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে পারিবারিক ‘বস’ দিব্যনাথ ও জ্যেষ্ঠ তিন সন্তান জ্যোতি, নীপা, তুলি। সেইসঙ্গে এদের পূর্বপ্রজন্ম ঠাকুরমাও। অপরদিকে সুজাতা ও তার কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতী। এই দ্বন্দ্ব কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমসাময়িক সমাজ অথবা রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব। এমনকি বৈশ্বিকও। বিশ্বজগৎ সংসার তখন ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দুধারায় দ্বিধাবিভক্ত। দ্বন্দ্বটা এতই জটিল ছিল যে, ভাই-বোন, পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীর সমুদয় সামাজিক ও আত্মিক বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। এমনকি রক্তের বন্ধনও।
 
৩.
দিব্যনাথপুত্র ব্রতী পিতার পুঁজিবাদী আদর্শে আস্থা হারিয়েছিল। আস্থা হারিয়েছিল সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থাপনায়। আস্থা হারিয়েছিল মুনাফাখোর ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্ধ নেতাদের ওপর। পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থার স্বপ্ন লালন করত। সমতাভিত্তিক একটি সুন্দর সুষম সমাজ বিনির্মাণের লক্ষে হৃদয় তার জেগে উঠেছিল। লেখকের ভাষায়, তখন সত্তর দশক। মুক্তির কাল। মুক্তির দশকে জনমুক্তির আন্দোলনে অনেকটা সংগোপনেই সংযুক্ত হয়েছিল ব্রতীরা। তখন সাম্রাজ্যবাদী শোষক সরকার ক্ষমতায়। জেলের পাঁচিল উঁচু করে। নতুন নতুন ওয়াচ টাওয়ার বসায়। বন্দিদের জন্য ফটকঅবন্দি খোলে না। সুগভীর রাতে ভ্যানভর্তি বন্দি এলে লেখকের ভাষায়—‘ওপর থেকে ক্রেন নামে। জন্তুর মত বন্দীকে যন্ত্রের নখে আঁকড়ে ক্রেন উঠে যায়, জেলের ভেতর নামিয়ে দেয়।’ জন্তুর মতো হলেও যারা জেলে যায়, তারা অন্তত প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু বাইরের ব্রতীরা নিদারুণভাবে প্রাণটা হারায়। রাষ্ট্রযন্ত্র নানা উপায়ে নির্মম নির্যাতন অব্যাহত রাখে। নির্জন সলিটারি সেলে নির্যাতন চালায়। লেখকের ভাষায়—‘সাউন্ডপ্রুফ। দরজা-জানালায় ফেলটমোড়ানো ফাঁপা রবারের নল বসিয়ে সাউন্ডপ্রুফ করা। ঘরের আর্তনাদ, গোঙানি, মারের আওয়াজ, জেরাকারীর গর্জন, সব শব্দ ঐ নলের জন্য ঘরের ভেতরেই বন্দী থাকে।’

৪.
বিজিত, প্রার্থ, লালটু, সমু ব্রতীর বিপ্লবী বন্ধু। এরাও চেয়েছিল স্বসমাজটিকে বদলে দিতে। সহযোদ্ধা বন্ধুদের বাঁচাতেই সেদিন ব্রতী গিয়েছিল সমুদের বাড়িতে। কিন্তু বাঁচাতে পারেননি। নিজেও বাঁচতে পারেনি। গভীর রাতে সমুদের বাড়ি ঘেরাও করে গুন্ডারা। হিংস্র গলায় বলে—‘বের করে দিন, লয়তো ঘরে আগুন দিমু!’ ব্রতীর কণ্ঠ শুনে কেউ একজন বলে ওঠে—‘হালায় আরেক মালটারে জুটাইছে। বাইর হ ঘটির পোলা।’ হাতে হাত রেখে স্লোগান দিতে দিতে ব্রতীরা বেরিয়ে আসে। বাইরে অন্ধকার। ঘুটঘুটে আধার মুখ হাসি-উল্লাসে ফেটে পড়ে। ভয়ংকর গন্ডগোল। ‘বাড়ী বাড়ী আলো নিভে যাচ্ছে, দরজা জানালা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চমকে সরে যাচ্ছে ভয়চকিম মুখ।’ সহসা স্লোগান থেমে যায়। সমবেত ঘাতকেরা খটখট গুলির শব্দ করতে করতে চলে যায়। সমুর দরিদ্র বাবা থানায় গেলে আততীয়দের নাম শুনে ধমকে ওঠে পুলিশ। পুলিশভ্যান আসতে আসতে সরে যায় ঘাতকেরা। নিতু ওরফে দীপুর মতো ভদ্রছেলেকে তো থানার সামনেই পিটিয়ে হত্যা করে। ‘প্রকৃত খুনি কখনো বন্দুক ধরে না।’ ব্রতী-সমুদের হত্যা-পরিকল্পনাকারীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এমনকি প্রত্যক্ষ ঘাতকদেরও বিচার হয় না। বুক ফুলিয়ে এরা নির্বিবাদে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। সমুর দিদিকে দেখে নির্মম ব্যঙ্গ করে, হাহা করে হাসে আর বলে—‘তর ভাইয়ের ছাদ্দ করলি না ক্যান? ভাল কইরা খাইতাম!’ সুজাতার মনে কত প্রশ্ন—যে শহরে এমন সব জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়, সেখানে পরপর কী করে সংস্কৃতিমেলা, রবীন্দ্রমেলা অনুষ্ঠিত হয়?

৫.
সুজাতা টেলিফোনেই ব্রতী হত্যার খবর পায়। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে—‘কাটাপুকুরে আসুন।’ পিতা দিব্যনাথ কাটাপুকুরে না গিয়ে দৌড়ায় পত্রিকা-অফিসে। পুত্রহত্যার খবর ধামাচাপা দিতে দিব্যনাথ ‘দড়ি টানাটানি করে বেড়াচ্ছিলেন।’ সফলও হয়েছিলেন। লেখক বলছেন—‘দিব্যনাথের ছোটাছুটি দড়ি টানাটানি সফল হয়েছিল। পরদিন খবরের কাগজে চারটি ছেলের হত্যার খবর বেরোয়। নাম বেরোয়। ব্রতীর নাম কোন কাগজে ছিল না।’ পত্রিকাপাতা থেকে ব্রতীকে মুছে দিয়েছিল দিব্যনাথ। মুছতে পারেনি মর্গ থেকে। সেখানে  ব্রতীর অবস্থান ‘হাজার চুরাশি’ নম্বরে। সেদিন ব্রতীর মৃত্যু পিতার কাছে কলঙ্কজনক মৃত্যুরূপে বিবেচিত হয়েছিল। মমতাময়ী মা সুজাতা সুস্থির থাকতে পারেননি। ছুটে গিয়েছিলেন কাটাপুকুরের লাশ ঘরে। প্রাণধন পুত্র ব্রতীর মৃত্যু নিয়ে কোথাও একটু সংশয় ছিল। তাই মুখটুকু দেখতে চেয়েছিলেন। অসীম করুণায় ডোম জানিয়েছিল—‘কি আর দেখবেন মাইজী? মুখ কি আর আছে কিছু?’ সীমাহীন মমতায় সুজাতা সবলে ব্রতীর মুখের আবরণ সরিয়ে দেয়। ‘শানিত ও ভারী অস্ত্রের উলটো পিট দিয়ে ঘা মেরে থেঁতলানো, পিষ্ট, ব্রতীর মুখ।’ আঙুল বোলানোর মতো ইঞ্চি পরিমাণ জায়গাও মসৃণ ছিল না। সবই দলিত, মোথিত, থেঁতলানো। তবু সুজাতা ব্রতী! ব্রতী! বলে আঙুল বোলায়। 
ব্রতীদের অপরাধ, ওরা দেয়ালে দেয়ালে বয়ান লিখত। ওরা লাল অক্ষরে লাল শব্দে দেয়াল রঙিন করে তুলত। কেবল মুক্তকণ্ঠে সমবেত স্লোগানই ধারণ করত না, প্রাণভরে বিশ্বাসও করত। দেবীর ভাষায়—‘ব্রতীরা এই এক নতুন জাতের ছেলে। স্লোগান লিখলে বুলেট ছুটে আসে জেনেও ব্রতীরা স্লোগান লেখে। কাটাপুকুর যাবার জন্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয়।’ ব্রতীরা এতটাই সমাজবিরোধী যে, দিব্যনাথের ন্যায় পিতারা মুখাগ্নিও করতে আসে না। ব্রতীদের লাশ কাটাপুকুরের মর্গে পড়ে থাকে। রাতে পুলিশ গাদাগাদি করে শ্মশানে বয়ে আনে। এরপর আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। শ্রাদ্ধে বিশ্বাসীজনও যথানিয়মে শ্রাদ্ধ করার সুযোগটুকুও পায় না। স্ফীত লাল চোখে বসে থাকতে হয় সারাটা দিন।

৬.
নকশাল আন্দোলনকে (১৯৭০) কেন্দ্র করে মহাশ্বেতা দেবী উপন্যাসটির আখ্যানভাগ সাজিয়েছেন। কল্পনার সঙ্গে সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতার দরকারি সমন্বয় ঘটয়েছেন। সেই সঙ্গে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তির সংগ্রামে (১৯৭১) কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা ‘বাংলাদেশের সহায় ও সমর্থনকল্পে পশ্চিমবঙ্গ তোলপাড় করে ফেলেছিল।’ কিন্তু নকশাল আন্দোলনের হত্যাকাণ্ড তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি অথবা এরমধ্যে পৈশাচিকতা খুঁজে পাননি। যদি পেতেন, ‘তাহলে ত কলকাতার কবি ও লেখক ওপারের পৈশাচিকতার সঙ্গে এপারের পৈশাচিকতার কথাও বলতেন।’ কিন্তু বলেননি। মূলত প্রান্তজনের বেঁচে থাকার লড়াই, লড়াই শেষে নিদারুণ পরিণতিই তুলে আনতে চেয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী। দেবীর গদ্যশেলীতে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও অসীম মমতায় সেটি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। উপন্যাস হয়ে উঠছে উপভোগ্য সেইসঙ্গে সাব-অলটার্ন হিস্ট্রির দরকারি দালিলিক শিল্পকর্ম। ২৮ জুলাই প্রয়াণদিবসে লেখকের প্রতি অশেষ প্রণতি।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১৮:৩৬

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা। কাঁটাবনে অবস্থিত প্রকাশনা সংস্থা ‘উজান’ এমন ঘোষণা দিয়েছে তাদের প্রকাশিত ‘কোরিয়ার কবিতা’ ও ‘কোরিয়ার গল্প’ নিয়ে আলোচনার জন্য।
এই বই দুটিতে রয়েছে কোরিয়ার বিশ ও একুশ শতকের উল্লেখযোগ্য কবিদের কবিতা এবং একই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিকদের ছোটগল্প। 
উজানের এই আয়োজনে সহযোগিতা করছে লিটারেচার ট্রান্সলেশন ইনস্টিটিউট অব কোরিয়া। 
বই আলোচনার সর্বোচ্চ পুরস্কার ২০ হাজার টাকা। এছাড়া দ্বিতীয় পুরস্কার ১৫ হাজার এবং তৃতীয় পুরস্কার ১০ হাজার টাকা। এই প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত সর্বোচ্চ ১০ আলোচকের প্রত্যেককে দেওয়া হবে ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের বই। 
আলোচনাগুলো বাছাই করবেন দেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও অনুবাদকদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারক কমিটি। একজন একটি বই নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন। আলোচনা বাংলাভাষায় লিখিত বা ভিডিও মাধ্যমে হতে হবে। 
অংশগ্রহণে ইচ্ছুক অনলাইনে ফরম পূরণ করতে করতে পারবেন এসব লিংকে www.ujaninfo.com, www.porospor.info। ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আলোচনা জমা দিতে হবে [email protected] এ।
বিস্তারিত জানতে এবং বই সংগ্রহ করতে পারবেন www.ujaninfo.com, www.facebook.com/UjanPrakashan, https://www.facebook.com/UjanBooks থেকে।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

কথা হয় জানি না 

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২১, ১৯:৪৪

কিছু ছবি এখনও আছে বলে কথা বলার দু-একটা মানুষ পাওয়া যায়>প্রতিবার মেঘ হলে মেঘমল্লার শুনে বৃষ্টি ভোলা যায় না>নিহত পশুররক্ত আর মাংস বাতাসে>দুঃখ আছে বলে কয়েকটা কবিতা এরপরও লেখা হবে>সকালগুলো ঘুমিয়ে কাটে বলে আর অপরাধবোধ জাগে না>রাত পেয়ে যাই>বাতাস কিন্তু ঘুরে যাচ্ছে>সময়ে সব বদলায় এ তত্ত্ব এখনও প্রমাণের চেষ্টা চলে>ঘরের মধ্যেও এক নেশা আসে বাইরেও এক নেশা যায়>নেশা>হেই হ্যালো, আমি হাস্নাহেনার গন্ধও পাচ্ছি>মাংসের গন্ধের সাথে>ছবি কিন্তু সব কথার উত্তর দেয়>হুহু করে উত্তর>থেকে বাতাস আসবে দুমাস পরেই>যদি বলি ছবিকে, কী, সে পাল্টা প্রশ্ন করে না>যদি বলি, কেন ও ইত্যাদি, পাল্টা প্রশ্ন করে না>যার যা উত্তর তা বুঝিয়ে দেয় আজকাল প্রতি রাতেই প্রায়>উত্তর পেতে পেতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে…>চরাচরে পাখি থাকলে বলে দিয়ো তাদের পাখায় আর কোনো শব্দ নেই>তাদের ওড়ায় আর কোনো নীরবতা নেই<

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বোকা দুপুরের নাম

বোকা দুপুরের নাম

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২১, ১২:১৮

বিকালের মেঘ ভেদ করে ঠোঁটজুড়ে আসে স্নিগ্ধ জলধারা। বহমান শান্ত জীবনের স্তুতি। তিনি হেসে চলেন, মন মাতানো মুগ্ধতা ছড়ায় চারপাশে। কংক্রিট শহরের মিহি আলোর অডিটোরিয়ামে মানুষ মানুষের বিশ্বস্ত চোখ খোঁজে। স্বপ্ন দেখে সরল বৈভবহীন জীবনের। যে স্বপ্নের স্পন্দন এখন ছড়িয়ে গেছে সমস্ত বাংলাদেশে। মঞ্চে যিনি অনর্গল কথা বলছেন সেই ‘আলোকিত মানুষ’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। বাগ্মী এ মানুষটির জীবন বহু কাজে বহু সৃষ্টিতে উদ্ভাসিত।

তাঁকে বুঝতে হলে তাকাতে হবে তাঁর অজস্র সৃষ্টিশীল বইয়ের দিকে, পাঠ নিতে হবে তাঁর আত্মজৈবনিক বইয়ের সরস বয়ান। জানতে হবে তাঁর ব্যাপক কর্মজীবন সম্পর্কে। চোখ খোলা রেখে আমাদের নিবিষ্ট হতে হবে সবুজ নিসর্গ, মানুষের কাছাকাছি বাংলার শ্যামল প্রান্তরে, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যে। সেই প্রকৃত সত্য খুঁজতে গিয়ে যন্ত্র বা নাগরিকতার ছোবলে যেখানে তাঁর হৃদয়ও আশাহত হয়েছে।

তিনি কবিতায় উচ্চারণ করেছেন―

একা একা টের পাই চারপাশে―আকাশে ও নিচে―
অবিশ্রান্ত আর্তনাদে ভেঙে যায় বহুদিনকার
ধানভানানীর গান এদেশের, পাটক্ষেত, বেহুলার ঘর―
ঢেঁকির পুরনো গল্প, সাপ, ঝোপ, দোয়েলের দেশ―
বাংলাদেশের আবহমানের।
(শাব্দিত কলঘর, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ২০)

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, জন্ম ২৫ জুলাই ১৯৩৯ সালে। অবিভক্ত ভারতে কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায়। পিতা সেময়কার স্বনামধন্য অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও নাট্যকার আযীম উদ্দীন আহমেদ, মাতা করিমউন্নেসা বেগম। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলায়। দেশভাগের পর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ পরিবারের সাথে চলে আসেন তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে। পিতার চাকরি সূত্রেই তার শৈশবের কিছু সময় কাটে টাঙ্গাইলের করটিয়ায়। সেখানকার বংশী নদী তাঁর শৈশবের মনোহর চিন্তায় দারুণভাবে গেঁথে আছে। তাঁর আত্মজৈবনিক বই বহে জলবতী ধারা প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, নিষ্ফলা মাঠের কৃষক ইত্যাদি তাঁর বহমান জীবনের নানান অভিজ্ঞতা, জীবন গল্পের সুনিপুণ বৃত্তান্ত। পিতার নাট্যচর্চা ও কবিতার খেয়াল তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করত। কলেজে পড়া অবস্থায় বুঁদ হয়েছেন কবিতায় ও সরল জীবনের দর্শনে। মূলত তার ব্যাপ্তিময় জীবনের ভিতটা সেসময়ই রচিত হয়েছিল। কলেজজীবনে তার কিছু শিক্ষকের অবদানও এক্ষেত্রে স্বীকার্য। কলেজজীবনেই তিনি ভ্রমণ করেন ইংরেজি কবিতা ও বাংলা কবিতার অপার সৌন্দর্যের ভূমিতে। যা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৬১ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে যোগদানের মধ্যদিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়। যা অব্যাহত ছিলো ১৯৯২ সাল পর্যন্ত। হরগঙ্গা কলেজ ছাড়াও শিক্ষকতা করেছে সিলেট মহিলা কলেজ, রাজশাহী কলেজ, ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজ (বর্তমানে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ) এবং সর্বশেষ ঢাকা কলেজে দীর্ঘসময় অধ্যাপনার পর অবসর গ্রহণ করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে বাংলা পড়াতেন। অধ্যাপক হিসেবে তার সফলতা ও জনপ্রিয়তা ছিল গগনচুম্বী। মূলত তাঁর সকল কাজের মাধ্যমেই তিনি মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। উজাড় করে দিয়েছেন সবটুকু। শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিজের কথায়―

আমি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলাম। সাহিত্যের স্বপ্ন ও সৌন্দর্য আজীবন আমার চেতনা-জগতে যে-হীরের দীপ্তি ছড়িয়েছে আমি সেই উজ্জ্বলতাকে ছাত্রদের ভেতরে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছি। তাদের সেই আনন্দে উজ্জীবিত করতে চেয়েছি। পরীক্ষায় ছাত্রদের বেশি নম্বর পাওয়াবার জন্যে পরিশ্রম করে জীবন নিঃশেষ করাকে আমার কাছে ‘দুর্লভ মানবজন্মে’র অপচয় বলেই মনে হয়েছে। জীবন কত দীপান্বিত ও জ্যোতির্ময় তা একজন ছাত্র সবচেয়ে ভালো করে জানতে পারে তার জীবনে দীপান্বিত শিক্ষকদের কাছ থেকে। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১১)

বর্তমান সময়ের শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে স্পষ্ট কথা বলতেও এ সফল অধ্যাপক দ্বিধা করেননি। প্রসঙ্গক্রমেই তিনি লিখেছেন―

আজ দেশের স্কুল-কলেজগুলোয় কার্যত লেখাপড়া হচ্ছেই না। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ লক্ষ শিক্ষকের অধিকাংশই শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নন, যাঁরা যোগ্য তাঁরা ছাত্রদের দেন অতি সামান্য। ফলে অভিভাবকরা কেউই বিদ্যালয়কে আজ তাঁদের সন্তানদের বিকাশের অঙ্গন হিসেবে মনে করেন না। ফলে বাণিজ্যিক উদ্যমসম্পন্ন গৃহশিক্ষকরা আজ হয়ে উঠেছেন ছাত্রসমাজের মূল আশ্রয়। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১৭৬)

বাংলাদেশের ষাটের দশকে নতুনধারার সাহিত্য সৃষ্টির আন্দোলনের পুরোধা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। প্রায় একযুগ ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা সম্পাদনা করার মাধ্যমে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলা সাহিত্য বাঁকবদলের ধারায়, প্রগতিশীল সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াসে। নিশ্চিত আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন সেসময়কার তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনালগ্ন হতে যুক্ত হন উপস্থাপনায়। রুচিশীল ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, উপস্থাপনায় তার নিজস্ব ধরন ইত্যাদি কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় উপস্থাপক খ্যাতিতে ও ব্যক্তিত্বে। তাঁর হাত ধরেই অনেক মেধাবী তরুণ উঠে আসে। তাঁর ‘আমার উপস্থাপক জীবন’ বইটিতে তিনি তুলে ধরছেন তাঁর উপস্থাপক জীবনের নানান দ্বন্দ্ব ও প্রতিকূলতা। বর্ণনা করছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে যাত্রা আর সমৃদ্ধির বিভিন্ন দিক। আমাদের মহান মুত্তিযুদ্ধে পাকসেনাদের হাতে আটক হয়েছিলেন তিনি। উপস্থাপক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচিয়ে ছিল বলে তিনি বইটিতে বলেছেন নির্দ্বিধায়। তাঁর ‘সংগঠন ও বাঙালি’ বই পাঠকের কাছে খুবই জনপ্রিয়। জাতীয় জীবনে সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা, বাঙালির সংগঠনের দুর্বলতা এবং তা কীভাবে আমাদের জাতীয় জীবনে উন্নতির মূলবাধা হয়ে দাঁড়ায় তার স্পষ্ট বয়ান রয়েছে বইটিতে। সংগঠনের অভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রায় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, ব্যক্তি ডুবে থাকে তা আত্মকেন্দ্রিকতায় এসবের সত্য উপলব্ধি উঠে এসেছে তাঁর লেখায়।

১৯৭৮ সালে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। তিনি কবিতায় লিখেছেন―

রাত্রিকে বাসে না ভালো কেউ সম্প্রতি। কেননা এ
রাত্রি সব এক করে দেয়। রাত্রির নির্বাক কাফন
জামার পৃথক রঙ, স্বতন্ত্র চুলছাঁটা, আস্তিনে মাপ
মুছে দিয়ে সবাইকে আদ্যোপান্ত এক পাতলুনের ভেতর
নিয়ে আসে।
(মৃত্যুময়ের জন্য, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ৫৬)

হ্যাঁ, তিনি এমন রাত্রিকেই দূর করতে চেয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন সংস্কৃতিমান, মুক্ত চেতনার সৃজনশীল মানুষ না হলে আগামী বাংলাদেশ হবে অনুর্বর, অন্ধকার। তিনি বইয়ের সোনালি অক্ষরে, জ্ঞানের অমৃতবাণীতে বদলাতে চেয়েছেন সমাজকে, তরুণদের। বই পড়া আন্দোলন ও নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লক্ষ হচ্ছে―আগামী দিনের অর্থাৎ তরুণদের বড় করে তোলা ও তাদের সংঘবদ্ধ জাতীয় শক্তিতে পরিণত করা। প্রায় বিয়াল্লিশ বছর ধরে তাঁর নেতৃত্বে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বিভিন্নভাবে কাজ করে চলেছে অবিরাম। এগুলো মধ্যে রয়েছে―দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রম, পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি, আলোর ইশকুল, কেন্দ্রের লাইব্রেরি, আলোকচিত্র চক্র, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি। সারা দেশে প্রায় ২৪ লাখ ছাত্র/ছাত্রী বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কার্যক্রমের সাথে যুক্ত। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন―

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবনের সর্বাধিক কীর্তি হিসেবে দেখা দেয়। যেখানে আমরা অনেকে মিলে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারি না, সেখানে একক প্রচেষ্টায় এত বড় একটা প্রতিষ্ঠান গড়া যে তাঁর বিশেষ যোগ্যতার প্রকাশ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর ব্যাপ্তি সারা দেশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের সীমানা ছাড়িয়েও।…সায়ীদ লিখেছেন প্রচুর। কবিতা ও ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও ভাষণ, স্মৃতিকথা ও জার্নাল, নাটক ও অনুবাদ।…তাঁর মধ্যে মিলিত হয়েছে শিল্পী ও কর্মী, ভাবুক ও উদযোগী। তাঁর চিন্তা ও সাধনায় দেশ ক্রমাগত উপকৃত হোক। (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, পৃ. ৩৫, ৩৬)

সত্যিকারভাবেই বহুমুখী কাজের মাধ্যমে তিনি উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩২টি। গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতায় সাহিত্যে বিভিন্ন শাখায় তিনি অবদান রেখেছেন ও রেখে চলেছেন। সামাজিক নানা কাজেই তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। যেমন ডেঙ্গু প্রতিরোধ আন্দোলন, পরিবেশ দূষণবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি। তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন সম্মাননা ও পুরস্কার। এগুলোর মধ্যে আছে―জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার (১৯৭৭), র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার (২০০৪), একুশে পদক (২০০৫), পরিবেশ পদক (২০০৮), বাংলা একাডেমি পদক (২০১২) ইত্যাদি।

‘আলোকিত মানুষ চাই’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের দেখানো পথেই আগামী দিনের তরুণদের মধ্যে ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’ বই পড়ার মাধ্যমে এমন অনুভূতির প্রবহমানতায়, চর্চায় হয়তো আমরা পাব সংঘবদ্ধ, প্রগতিশীল, আত্মকেন্দ্রিক জীবনকে পেছনে ফেলে আসা দেশপ্রেমিক বুদ্ধিদীপ্ত এক প্রজন্ম। যা বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।

এ মহীরুহের জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা।

সহায়ক গ্রন্থ

১. বহে জলবতী ধারা (প্রথম খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
২. বহে জলবতী ধারা (দ্বিতীয় খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০১১।
৩. মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৮৮।
৪. নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৫. বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৬. আমার উপস্থাপক জীবন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৫।
৭, সংগঠন ও বাঙালি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
৮. আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, সম্পাদনা―আতাউর রহমান, ঢাকা, ২০১৫।
৯. ইন্টারনেট।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

সর্বশেষ

কাতারে খেজুর উৎসবের পর্দা নামছে আজ

কাতারে খেজুর উৎসবের পর্দা নামছে আজ

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ১৯ কোটি ৭২ লাখ ছাড়িয়েছে

করোনা শনাক্তের সংখ্যা ১৯ কোটি ৭২ লাখ ছাড়িয়েছে

কিউবায় আটক বিক্ষোভকারীদের মুক্তি দাবি ইউরোপীয় ইউনিয়নের

কিউবায় আটক বিক্ষোভকারীদের মুক্তি দাবি ইউরোপীয় ইউনিয়নের

তিউনিসিয়াকে গণতান্ত্রিক পথে ফেরার আহ্বান যুক্তরাষ্ট্রের

তিউনিসিয়াকে গণতান্ত্রিক পথে ফেরার আহ্বান যুক্তরাষ্ট্রের

অগ্নিকাণ্ডের ১৫ দিনেও চালু হয়নি আইসিইউ

অগ্নিকাণ্ডের ১৫ দিনেও চালু হয়নি আইসিইউ

মেঘনায় ট্রলারডুবিতে একজনের মৃত্যু, জীবিত উদ্ধার ১১

মেঘনায় ট্রলারডুবিতে একজনের মৃত্যু, জীবিত উদ্ধার ১১

সংঘর্ষে নিহত নন, তালেবানের হাতে ‘খুন’ হয়েছেন দানিশ সিদ্দিকি

সংঘর্ষে নিহত নন, তালেবানের হাতে ‘খুন’ হয়েছেন দানিশ সিদ্দিকি

হেলেনা জাহাঙ্গীর আটক

হেলেনা জাহাঙ্গীর আটক

রামেবির প্রতিষ্ঠাকালীন উপাচার্য মাসুম হাবিব আর নেই

রামেবির প্রতিষ্ঠাকালীন উপাচার্য মাসুম হাবিব আর নেই

গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ৫০০ ঘরের বস্তিটি

গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ৫০০ ঘরের বস্তিটি

অবিবাহিত বড় ভাই, আত্মহত্যা ছোট ভাইয়ের

অবিবাহিত বড় ভাই, আত্মহত্যা ছোট ভাইয়ের

ভারতকে হারিয়ে ওয়ানডে সিরিজের বদলা নিলো শ্রীলঙ্কা

ভারতকে হারিয়ে ওয়ানডে সিরিজের বদলা নিলো শ্রীলঙ্কা

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

থিয়েটার

থিয়েটার

গহন
শীতের অপেক্ষা করছি না

শীতের অপেক্ষা করছি না

© 2021 Bangla Tribune