X
বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর ২০২১, ১২ কার্তিক ১৪২৮

সেকশনস

করোনার করুণ কাহিনি: মহামারির সৌভাগ্য ও ‘খাই খাই’ চিন্তার খোরাক

আপডেট : ০৬ জুন ২০২১, ১৬:৪৮

মাকসুদুল হক ‘যেদিন ভালোবাসার ক্ষমতা, ক্ষমতার ভালোবাসাকে অতিক্রম করে যাবে সেদিনই বিশ্বে শান্তি আসবে’জিমি হেনড্রিক্স (১৯৪২-১৯৭০)।

মানবপ্রাণীকে দয়াল এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে তার পক্ষে পেছনের দিকে হাঁটা সম্ভব না। তার শ্রবণযন্ত্র কান দ্বারা পার্শ্ববর্তী অস্তিত্ব অনুভব করা ছাড়া, মানসিক ও শারীরিক ভারসাম্য ধরে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মাথার পেছনে চোখ নেই বিধায় সকল ক্ষেত্রে আমরা ‘চোখকান খোলা’ রেখেই সৃষ্টিজগৎ অবলোকন করতে পারি। তাই এই মহামারির সময় আমরা কী দেখছি ও কী শুনছি তা হয়ে উঠেছে অতি গুরুত্বপূর্ণ। এরপর, কী করছি বা কী করবো—তা কী ভাবছি’র ওপর নির্ভর করবে বাকিটা দুর্গম পথ আমরা কীভাবে পাড়ি দেবো। 

আমাদের সংস্কৃতিতে এই অনুসন্ধানকে ‘মনতত্ত্ব’ বলা হয়। শুরু করা যাক:

স্মৃতিচারণ বা পেছনের কথা বলা খুবই বোরিং একটা বিষয়—তথাপি অতীত ভুলে যাওয়া কখনোই কাম্য নয়। কারণ, অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষণীয় অনেক উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এও ভুলে গেলে চলবে না যে কোনও জাতি অতীতে আটকে থাকলে তার দৃঢ়তার সঙ্গে ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। অনবরত অতীতের কথা বলে মানুষকে বোর করার চেয়ে মনের গভীরে ভালোবাসায় তা আত্মস্থ করে রাখার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। 

ইতিহাস পাঠ বহু লোক করে, তবে বাংলাদেশের ইতিহাসের ‘সময়ের সাক্ষী’ অনেকের মতো আমিও একজন। সুযোগ পেলেই বলে বসি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। পৃথিবীতে মানবিক যুদ্ধ বলে কোনও যুদ্ধ নেই এবং একাত্তরও তার ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু গণহত্যা, মৃত্যু, ধর্ষণ, ধ্বংসযজ্ঞ, মানবতার চরম অবমাননা এসব প্রত্যক্ষ করা ‘সৌভাগ্য’ হয় কী করে? 

কোন ভাগ্য দ্বারা এই সৌভাগ্য নিয়ন্ত্রিত?

সৌভাগ্য এই জায়গায় যে পৃথিবীর মানচিত্রে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাঙালি বহু যুগ লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। তবে নির্মম বাস্তবতা হলো, আমরা প্রাণরক্ষা পেয়েছিলাম বলেই পেছনের দিনগুলো স্মৃতিমন্থন এখনও করতে পারি এবং তা করে যাচ্ছি। 

মুক্তিযুদ্ধ চলেছিল ৯ মাস ও বিজয় যেভাবে আমরা ছিনিয়ে এনেছিলাম তা অবশ্যই প্রত্যক্ষ করা ‘সৌভাগ্য’ ছাড়া আর কী হতে পারে?

প্রকারান্তরে, এই যে ভয়াবহ করোনা মহামারি আমরা গেলো ১৪ মাসের ঊর্ধ্বে প্রত্যক্ষ করছি, তা কী দুর্ভাগ্যের, নাকি ‘সৌভাগ্যের’? 

একটু ভেবে দেখা যাক। 

ভয়, আতঙ্ক, অসুস্থতা, মৃত্যু, খাদ্যদ্রব্যের ঘাটতি, শহর ছেড়ে গ্রামে পলায়ন, বেকারত্ব ইত্যাদি একাত্তরেও ছিল এবারও আছে। লকডাউন থেকেও ভয়াবহ ‘দেখা মাত্রই গুলি করা হবে’ কারফিউ প্রায়ই বলবৎ থাকতো– যা ‘সৌভাগ্য’ক্রমে এবার নেই। পার্থক্য শুধু একাত্তরের শত্রু ছিল চিরচেনা ও তাদের প্রতিহত করতে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে, প্রতিরোধ করতে সব কৌশলই আমরা নিয়োগ করেছিলাম। অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র–নির্মমতার বিরুদ্ধে নির্মমতা। আগেই বলেছি মানবিক যুদ্ধ বলে কোনও যুদ্ধ নেই।

আগের এক লেখায় বলেছি করোনা মহামারি মানব জাতির ওপরে নিক্ষিপ্ত হওয়া এক ‘মনস্তাত্ত্বিক বিশ্বযুদ্ধ’। এই যুদ্ধে পেশীর থেকে মানসিক শক্তির ওপরে সম্পূর্ণ নির্ভর করবে আমাদের আগামীর দিনগুলো ও তার ইতিহাস কীভাবে রচিত হবে। 

চিন্তার শক্তি, ভাবনার ব্যাপকতা বাঙালি জাতির কখনও কোনও কমতি ছিল না। আজকের ভয়াল সময়গুলো আমরা বা আমাদের উত্তর পুরুষ কীভাবে স্মরণ করবে, তা নিয়ে ভাবনাগুলো এখন থেকেই লিপিবদ্ধ করাটা জরুরি।

তদপুরি, আমাদের ভাবনার জগতের সঙ্গে করুণ বাস্তবতার যে অত্যন্ত সরু বিচ্ছেদরেখা, তা অতিক্রম করে নিজেদের এ-সময়ের চিন্তার সঙ্গে বিশ্বের চিন্তাচেতনার সমন্বয় ঘটানোর প্রয়োজনীয়তার কথা ‘হালকা’ করে বলার কোনও উপায় নেই। 

আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি এই যুদ্ধে আমরা একা নই। সমগ্র মানবজাতি আজ একত্রিত হয়েছে। মোটা দাগে এটাই আমাদের প্রথম ‘সৌভাগ্য’। কারণ, গত একশ বছরে সমগ্র পৃথিবী কেবল এক ইস্যুতে একত্রিত হয়েছে, তার কোনও নজির নেই। আগামীর সবকিছু নির্ভর করবে আজকের সসম্মানে বেঁচে থাকার স্পৃহার ওপরে।

মানবপ্রাণীর ভাবনার ও মনের জগৎ খুবই দুর্বোধ্য। ভালো করার আগ্রহ বা মন্দ করার প্রবণতা সবই অনির্দেশ্য। মন্দ থেকে ভালো করার চেষ্টা মানবপ্রাণীকে সব সময় পথ প্রদর্শন করলেও উভয় ক্ষেত্রেই ভাবনার জগৎ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত হয় আমাদের স্নায়ু কত রকম stimuli বা উদ্দীপক প্রতিদিন প্রকৃতি থেকে গ্রহণ করছে তার ওপরে। ‘নিজে ভালো তো জগৎ ভালো’– এই প্রাচীনতম প্রবাদবাক্য সেদিকেই ইঙ্গিত করে। 

মানবপ্রাণীর সঙ্গে অন্য প্রাণীর অমিল তার আত্মজ্ঞান, চেতনাবোধ বা consciousness ও ভাষা দ্বারা ভাববিনিময়– তথ্য আদান-প্রদান করার ক্ষমতায়। সহজ অর্থে ইহাকে ‘আক্কেল’ও বলা যেতে পারে। তবে যষ্ঠেন্দ্রিয় ও সহজ প্রবৃত্তি দ্বারা আমরা প্রকৃতির ইদানীংকালের প্রেরিত নির্ভুল বার্তাগুলো কি বুঝতে পারছি? ধরিত্রী মায়ের আর্তনাদ কি শুনতে পাচ্ছি? আর যা কিছু দেখেছি ও দেখবো তার থেকে কোনোরকম শিক্ষা কি আমরা নিচ্ছি? 

আমার মনে হয় না। কারণ, মানবপ্রাণী এখনও ভয়ানকভাবে দ্বিধাবিভক্ত এবং প্রাচীন মানবের চেয়ে আমাদের চেতনাবোধও খুব একটা পৃথক না।  

পৃথক শুধু এইটুকু যে আমরা জঙ্গল ছেড়ে এসে নগরীর অশ্লীল কংক্রিট জঙ্গলে বসবাস করছি। তথাকথিত বিশ্বায়ন বা গোলোকায়নের অনেক পরিবর্তন আনতে পারলেও–প্রাচীনতম ‘জংলি’ hunter gatherer ‘শিকারি সংগ্রাহক’ লুণ্ঠনকারী দখলদার স্বভাব থেকে আমাদের মুক্তি দিতে পারেনি।এখনও আমরা একান্ত নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থপর চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠতে ব্যর্থ। সমষ্টিগত চিন্তা খুবই অপ্রতুল এবং কার্যত সমগ্র মানবপ্রাণীর মঙ্গল সাধন করার ‘বৃহৎ স্বপ্ন’ আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে এক utopia.

যেখানে যোগাযোগ ও ভাববিনিময় মানবপ্রাণীর মহাগুণ, অথচ তার এই অসাধারণ দয়াল প্রদত্ত ক্ষমতা দেখা যায় যতসব বাগড়া বাঁধার অন্যতম কারণ।

পৃথিবীর যত সংঘাত, যুদ্ধ এমনকি দুটো মহাযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে একে-অপরের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যর্থতার কারণে।সবাই ‘অসাধারণত্বের অন্বেষণ’ করলেও পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায় অতি সাধারণ সরলপূর্ণ চিন্তাই মানবপ্রাণীর উপকারে এসেছে বেশি। জটিল চিন্তার কারণে ভাবের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে জটিলতা কেবল বেড়েছে, কমেনি। 

কথায় আছে ‘জটিল হওয়া খুবই সহজ, তবে সহজ হওয়া খুবই জটিল’।

মানবপ্রাণী ‘সৃষ্টির সেরা জীব’ প্রকারান্তরে একটি রূপক সংজ্ঞা। এর অস্তিত্ব বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে আছে বলে অনেকেই দাবি করলেও, এর সরাসরি কোনও reference বা উল্লেখ কোথাও পাওয়া যায় না। ধর্মতত্ত্ববিদদের বহু বিতর্কের পরে যা উঠে এসেছে এই ‘শ্রেষ্ঠত্বের’ বিবরণ সবই পরোক্ষভাবে সান্ধ্যভাষায় উল্লেখিত। মূলত এই সংজ্ঞা মানবপ্রাণী তার অহংবোধসহ দাম্ভিকতা চরিতার্থ ও প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই বলিষ্ঠভাবে প্রয়োগ ও ব্যবহার করে এসেছে। 

দাম্ভিকতার উৎস থেকে চলে আসে অনুবর্তী ক্ষতিকর শ্রেষ্ঠত্বের ভান ও ‘ঈশ্বরের মনোনীত একমাত্র প্রিয় জাতি’সহ ধর্মের ভেদাভেদ। সৃষ্টিকর্তা বারবার ‘জীব হত্যা মহাপাপ’-এর সাবধান বাণী সব ধর্মগ্রন্থ দিয়ে এলেও দেখা যায় কিছু মানুষ ধর্মের দোহাই দিয়ে ফ্যাসাদ, ফিতনা ও যুদ্ধ-গণহত্যা করে আসছে। পৃথিবীতে এ ধরনের মানুষের কারণে ধর্মযুদ্ধে মানবমৃত্যু সবচেয়ে বেশি হয়েছে, তবে আজ অবধি তা থামেনি বরং তা উৎকৃষ্টতা সাধন করেছে। ধরিত্রী পৃথিবীসহ মানবপ্রাণী এই মহাপাপ থেকে মুক্ত হতে পারেনি। 

আজকের পৃথিবীতে এই ‘হয় নিষ্পাদন করো বা নিপাত যাও’ অনুচরবৃন্দ সব সুস্থ ও সুষ্ঠু মানবচিন্তার অন্তরায়। সহজ থাকার মতো জটিল কর্মতে আর কেউ উদ্বুদ্ধ নন। জটিলতা কোন প্রান্তে এসে ঠেকেছে, তা এই তথাকথিত যোগাযোগের পৃথিবীতে স্পষ্টত প্রতীয়মান। যা কিছু দেখছি, যা কিছু শুনছি, যা কিছু বলছি, যা কিছু ভাবছি’র সঙ্গে ‘যা কিছু করছি’র নেই কোনও সামঞ্জস্য।

এই ‘শ্রেষ্ঠজীব তত্ত্ব’ বানিয়ে মানবপ্রাণী অন্য সব জীবকে তুচ্ছ করে, গণনায় না-রেখে কেবল ভোগ করতো, তা হয়তো প্রাচীন দিনগুলোতে বেঁচে থাকার অবলম্বন বলে মেনে নেওয়া যায়। তবে অধুনা মানবপ্রাণী অকারণে, কোনও অনুকম্পা ছাড়াই, নির্দ্বিধায় অন্য প্রাণীর ওপরে হত্যাযজ্ঞ থামায়নি– বরং বাড়িয়েছে বহু শতগুণ। তার ঘ্রাণজ চিত্ত, তার চোখের খিদে এতটাই প্রখর যে কোনও কিছু দিয়ে তার পথরোধ করা যাবে না। 

করোনা মহামারিতে মৃত্যুর অন্যতম কারণ বলা হচ্ছে মানবপ্রাণীর ইমিউন সিস্টেম কোভিড-১৯ নির্দ্বিধায় ভেদ করতে পারে। অথচ আমরা যে একটা বিষাক্ত পৃথিবী উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি, তা নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য কোথাও লক্ষ করা যায় না। করোনা থেকে প্রতিকারের জন্য আমরা বেছে নিয়েছি কত প্রকার ক্ষতিকারক বিষ, সেদিকটাও আমরা চুপ করে, চোখ বুজে তামাশা দেখছি। ‘রাসায়নিক বিশ্বযুদ্ধ’ অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে তা কি আমরা ভুলেও স্বীকার করি?

মাছ-মাংসসহ শস্য, শাকসবজির, ফলাদির ইত্যাদির genetic modification-এর কারণে খাদ্যসম্ভারকে বহু যুগ আগে করেছে বিষাক্ত ও সমগ্র মানবপ্রাণীকে রোগ, অসুখ ও অস্বাস্থ্যের ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে কেবল মুনাফার কারণে। বাংলাদেশও এর থেকে রক্ষা পায়নি। বাজারে গেলে কোন খাদ্যে কী chemical আছে বা নেই, সেই দুশ্চিন্তা সবাইকে আঁকড়ে ধরে। বিষ যে প্রতিনিয়ত আমাদের দেহে সঞ্চালিত হচ্ছে তা এখন খুবই ‘স্বাভাবিক’ বিষয় হয়ে গেছে। 

আবার এই মহামারির সুযোগ নিয়ে বহুজাতিক মুনাফাখোর কোম্পানিগুলো সাবান ও স্যানিটাইজারে কী পরিমাণ chemical ব্যবহার করছে ও ভবিষ্যতে কত ধরনের চর্মরোগসহ অন্যান্য রোগ মানবপ্রাণীকে গ্রাস করবে তার নেই কোনও সমীক্ষা।

‘৯৯ ভাগ জার্মমুক্ত’ বলে দাবি করলেও এসব সামগ্রী নিতান্তই কৃত্রিম প্রসাধনী ও যেকোনও কৃত্রিমতা মানবপ্রাণীর জীবন রক্ষা করতে পারে না। আমরা স্বল্পমেয়াদি সমাধান খুঁজতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সব সম্ভাবনা ধূলিসাৎ করছি। 

এবার খাদ্যাভ্যাস যা নিয়ে ইদানীং অনেকের ভেতরে তোড়জোড় দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে তার সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক।

অভিজ্ঞান: স্পষ্ট করা দরকার, বাতাস ও পানির ন্যায় খাদ্য শুধু মানবপ্রাণী নয়, সব প্রাণী ও জীব জগতের জন্য দয়াল প্রদত্ত বিনামূল্যের উপহার এবং তা সুনিশ্চিত করা আছে পৃথিবীর শেষ দিন অবধি।

বাংলাদেশের আদি সংস্কৃতিতে আহার গ্রহণকে ‘সেবা’ বলা হয়—তার মূল কারণ জীবন, মৃত্যু ও আহার আমাদের দয়াল সৃষ্টিকর্তা নিয়ন্ত্রণ করেন—মানবপ্রাণী না। সেবা আমাদের ভাগ্যে কীভাবে, কখন, কোন অবস্থায় জুটবে তা হলফ করে বলা যায় না। ভাবলাম, ঘুম থেকে উঠে বিশাল এক English breakfast গ্রহণ করবো, তবে কপালে জুটলো পান্তাভাত, কাঁচামরিচ ও লবণ— এমনটা অহরহই ঘটে। আবার উল্টোটাও: ভাবলাম অফিসে শুকনো hamburger দিয়ে লাঞ্চ সারবো। হঠাৎ এক বন্ধু এসে বলে ‘দোস্ত চল তরে কাচ্চি বিরিয়ানি খাওয়ামু’।

‘সেবাদান’ করার ক্ষেত্রে মানবপ্রাণী দয়ালের উপলক্ষ বা ‘উছিলা’—আহার বা ‘রিজিক’ সম্পূর্ণ প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে। কীভাবে তা ‘খাদ্যভক্ষণ’ হয়ে উঠলো ও আমরা এই ‘খাই খাই’ স্বভাবের সংস্কৃতিতে উত্তীর্ণ হলাম, তা আমাদের লোভ আর ‘পেটুক’ ভ্রষ্টাচারের কারণেই। খাদ্য সংক্রান্ত বিষয়ে সমাজের এই ভয়াবহ রূপ এখন খুবই পরিষ্কার ও বিস্তৃত। সবকিছুই আমরা ‘খাইয়্যা ফালাইতে চাই’। অন্য মানবপ্রাণীর ধনসম্পদ থেকে শুরু করে চাকরি, সম্মান, সম্পত্তি, আকাঙ্ক্ষা, এমনকি পরের নারীর ওপরও আমাদের ‘নজর পড়ে’।

এসব পুরনো পাপের শাস্তি কি করোনা আমাদের দিচ্ছে? নাকি যারা এই পাপকে যুগ যুগ ধরে মানববিধ্বংসী ব্যবসা/ধান্দা করে সমগ্র বিশ্বে লুটপাটের, মুনাফার স্বর্গরাজ্য গড়েছেন—তাদের সাজার যৌথভাবে আমরাও অংশীদার?

খাদ্যকে যেদিন আমরা অস্ত্রকরণ করে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করি, সেদিনই দয়াল সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে শুরু হলো আমাদের বেইমানি, আমাদের বিশ্বাসঘাতকতা, যার জন্য মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্য কোনও শাস্তি অকল্পনীয়। সেই মৃত্যুদণ্ডই কি এখন আস্তে-ধীরে কার্যকর হচ্ছে? 

হতেও পারে। 

এই করোনার সময়ে বহু ভালো ও অগণিত গুণী মানুষ মারা গেছেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে সবাই চুপ করে সমাজের কিছু ভয়ংকর খারাপ মানুষ—বিশেষত যারা গরিবের ধনসম্পদ লুট করেছে, তাদের নির্বিচারে হত্যা, গুম করেছে, তাদের হক মেরেছে, সেসব ঘৃণ্য লোকের ভয়াল করোনামৃত্যুর খবরে আমরা মনে মনে কি ‘আনন্দ’ অনুভব করেছি? 

একজনের মৃত্যু ‘দুঃখজনক’ হলেও অধিক মৃত্যু কিছু সংখ্যার পরিসংখ্যান মাত্র—এ কি আমাদের চলমান বাস্তবতা? একসঙ্গে এত মৃত্যু দেখতে দেখতে আমাদের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো কি একেবারে ভোঁতা হয়ে গেছে?

ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবার পর আমরা যেমন আনন্দ ও স্বস্তি অনুভব করেছিলাম— একইভাবে অর্থের দাপটে থাকা কিছু ক্ষমতাবান লোকের করোনা মৃত্যুতে, প্রার্থনার সময় দয়ালের কাছে শুকরিয়া আদায় করেছি। এই কৃতজ্ঞতার কারণ? মানবপ্রাণী দ্বারা সব বিচার সম্ভব না। কিছু বিচারের দায়িত্ব প্রকৃতি নিজেই নিয়ে নেয়— যাকে বলা হয় natural justice. 

বেঁচে থাকার যুদ্ধে ফেরত আসা যাক: 

আত্মরক্ষার জন্য এই যুদ্ধে যে-পথ আমরা অনুসরণ করছি তাও রীতিমতো ‘সৌভাগ্য’ বটে। হেলমেট পরে অস্ত্র হাতে লড়াই করতে হচ্ছে না, কিংবা বাংকারে লুকিয়ে গুলিবর্ষণ থেকে বাঁচতে হচ্ছে না। আমাদের মাস্ক আমাদের হেলমেট ও আমাদের নিজ গৃহ শক্তিশালী একেকটা দুর্গ। এই অবধি যুদ্ধটা নিঃসন্দেহে খুব শান্তিপূর্ণভাবে এগোচ্ছে, কিন্তু শঙ্কা রয়েই গেলো। মানবপ্রাণী কি সক্রিয় ‘টাইমবোমা’র ওপরে বসে আছে? 

করোনাকেন্দ্রিক যেকোনও তুচ্ছ ঘটনা জাত-বিজাতে সমরাস্ত্রের সজ্জিত ঝনঝনানিকর খুনখারাবি যেকোনও সময় ঘটে যেতে পারে। ভ্যাকসিন-রাজনীতি ও ধনী দেশগুলোর দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর দিকে নিকুচি, তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও ‘দয়ার’ দৃষ্টিতে দেখার প্রবণতা তার সাক্ষ্য রাখে। এর ওপরে ‘মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘা’ দেখা যাচ্ছে গণতন্ত্রের হত্যা ও বিশ্বজুড়ে একতন্ত্রী শাসকদের ক্রমশ উত্থান। 

ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি ও সংঘাত, স্বজাতিকতা, উগ্র জাতীয়তাবাদ, শ্রেণিগত বিদ্বেষ, দুর্নীতি, পিতৃতন্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে মানসিক সংকীর্ণতা এসব নিয়ে প্রতিনিয়ত খবর আসছে। কিন্তু বলা হচ্ছে সবকিছুর ফয়সালা হবে ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবার পর’। এই অজুহাত, এই চতুরতা আর কতদিন চলবে? পরিস্থিতি যে আদৌ স্বাভাবিক হবে তার কোনও নিশ্চয়তা কেউ কি এই অবধি দিয়েছে? 

‘লকডাউন’-এর বিপরীত শব্দ হলো ‘লকডইন’— আমরা স্বেচ্ছায় কবুতরের খোপতুল্য গৃহে গৃহবন্দি। বিশ্বের যেকোনও রাষ্ট্র, যেকোনও সরকারের জন্য সম্ভাব্য জনরোষ ঠেকানোর এরচেয়ে সুন্দর কৌশল আর কী হতে পারে?

শত্রু যদি আমাদের নির্মূল করতে চায়, তাকে কোনও বেগ পেতে হবে না, কষ্ট করতেও হবে না। গৃহবন্দি অবস্থায় আমরা সবাই sitting duck, শিকারিদের অত্যন্ত প্রিয় দৃশ্যবিবরণী—‘এক গুলিতেই কয়েকটা পাখি শেষ’। এই ভাগ্যও কি আমাদের বরণ করে নিতে হবে নিঃশব্দে? 

পালাবো কোথায় যখন পালানোর কোনও পথ খোলা নেই, যখন তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের অবস্থান, আমাদের ঠিকানা রাষ্ট্র কেবল নয়—যেকোনও মামুলি তৃতীয় বা চতুর্থ পক্ষ সেকেন্ডে-সেকেন্ডে অনুসরণ করতে পারে?

পালাবো কোথায়, যখন এক দেশ থেকে আরেক দেশ তো দূরের কথা, নিজের দেশেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাতায়াতে আছে হাজার রকমের নিষেধাজ্ঞা? আমরা আসলেই trapped! এই ফাঁদ থেকে ছোটখাটো ক্ষত নিয়ে যেন মুক্তি পেতে পারি, এই আশা করা ছাড়া আপাতত কিছুই করার নেই। 

মানবমুক্তির দিন তবে এখনও ফুরিয়ে যায়নি। করোনাকালীন এই নিপীড়নমূলক new world order যদি চলতে থাকে, বিশ্বব্যাপী জনরোষ ও বিদ্রোহ যে ঘটবে তা অবধারিত। আশা করছি, যারা আমাদের ভাগ্যের নেপথ্যের নিয়ন্ত্রক তাদের মস্তিষ্কে সুবুদ্ধিসহ হিতাহিত জ্ঞানের উদয় হোক।

তা না হলে বিশ্বব্যাপী মানবপ্রাণীর রোষানল নির্ঘাত আমাদের পারমাণবিক ‘তৃতীয় মহাযুদ্ধের’ দিকে ঠেলে দেবে। সেই যুদ্ধে কেউ জয়ী হবে, বা ‘বীরের বেশে’ বাড়ি ফিরবে, ও আমরা তাদের পুষ্পমাল্য দিয়ে অভিবাদন জানাব, সেই ‘রোমান্টিক’ সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।

ভুলতে নেই—পারমাণবিক যুদ্ধের মহাপ্রলয়ের পরবর্তী সময়ে পরাজয়ের গ্লানি—অন্য কেউ না: তা ভোগ করবে কেবল মানবপ্রাণী, যদি ‘মানুষ’ নামের এই অতি অদ্ভুত প্রাণীর একটিও বেঁচে থাকে। 

থাকবে তো?

লেখক: সংগীতশিল্পী

 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (২)

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (২)

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (১)

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (১)

করোনার করুণ কাহিনি: গালি, তালি, পরীমণি ও প্রজন্মের বিদ্রোহ

করোনার করুণ কাহিনি: গালি, তালি, পরীমণি ও প্রজন্মের বিদ্রোহ

করোনার করুণ কাহিনি: করোনা কি বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছে?

করোনার করুণ কাহিনি: করোনা কি বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছে?

পাকিস্তানি মদতে তালেবানদের কাবুল দখলে সতর্ক বাংলাদেশ

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২১, ২২:৪২

ফারাজী আজমল হোসেন তালেবান কাবুল দখল করায় বাংলাদেশি মৌলবাদীরা খুবই উল্লসিত। বাংলাদেশি কট্টরবাদীরা তালেবানদের জয়কে ইসলামিক শক্তির আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় হিসেবে দেখছে। গলা ফাটিয়ে তাদের খুশিতে বলতে শোনা গেছে, ‘আলহামদুলিল্লাহ’! কিন্তু তালেবান উত্থানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নয়া সমীকরণ আমাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। দেশের নিরাপত্তার জন্য ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে তালেবানদের কাবুল দখল। কারণ, নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া নজরে থাকা বিভিন্ন জঙ্গিবাদী সংগঠন এখন পাকিস্তানের সহযোগিতায় নতুন করে অস্থিরতা তৈরির মতলব কষছে।

বিএনপির আমলে বাংলাদেশ থেকে অনেকে মুজাহিদিন বা তালেবান কট্টরপন্থীদের মদত জোগাতে আফগানিস্তানে গিয়েছিল। ফিরে এসে জেএমবির সহযোগিতায় বাংলাদেশে প্রচুর সন্ত্রাসী হামলা চালায় তারা। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত কট্টরবাদীরা বাংলাদেশের মাটিতে নিরাপদেই ছিল। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে বহু বাংলাদেশি আফগানিস্তানে তালেবানদের কাছ থেকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেয়। এদের কেউ কেউ ১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানে ইসলামিক আমিরাত প্রতিষ্ঠার পর ফিরে আসে বাংলাদেশে। আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশের মাটিতে শেখ আবদুস সালাম গড়ে তোলে হুজির (বি) মতো জঙ্গিবাদী সংগঠন। ১৯৮৮ সালে মুফতি আব্দুল হান্নান আফগানিস্তান যায় এবং ১৯৯৪ সালে ফিরে এসে হুজির (বি) সংগঠন শক্তিশালী করতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। ১৯৮৮ সালে জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আব্দুর রহমানও তালেবান ও আল-কায়েদার কাজকর্মে অনুপ্রাণিত হয়েছিল।

তাই অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক সরকার। আফগানিস্তানে তালেবান উত্থানে পাকিস্তানপন্থীরা ফের অস্থিরতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মৌলবাদীরা ফের কিছু বাংলাদেশিকে আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণে পাঠাবে। এখনও জেএমবির হাজার দুয়েক সদস্য রয়েছে। এরা আবার আনসার আল ইসলামের হয়েও কাজ করে। কাজের ধরন এক হওয়ায় এরাই আবার কাজ করে ভারতীয় উপমহাদেশে আল কায়েদা (আকিজ) হিসেবেও। ইসলামিক স্টেটে (আইএস) অনুপ্রাণিত নব্য জেএমবি বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বহু এলাকায় তারা বেশ সক্রিয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তালেবানি ভাবধারা প্রচারকদের সতর্ক করে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছেন পাকিস্তানপন্থী মৌলবাদীদের। জঙ্গিবাদী প্রচারের বিরুদ্ধেও দেশবাসীকে সতর্ক করেছেন।  বিএনপির আমলে বাংলাদেশের মাটিতে স্লোগান উঠেছিল,  ‘আমরা সবাই তালেবান/ বাংলা হবে আফগান’। কিন্তু বাংলাদেশ টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দেন, বাংলাদেশ সৃষ্টির মূলনীতির ওপর জোর দিয়ে তালেবান মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন তালেবানদের কাবুল দখলের পর জানান, আফগান-প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসীদের বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে। তাদের চিহ্নিত করে উপড়ে ফেলা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কর্মকর্তারা মনে করেন, জেএমবি এখন আনসার আল ইসলাম এবং নিউ-জেএমবি সংগঠনের মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছে। আনসার আল ইসলাম আকিজ নামেও পরিচিত। তাদের দলে শ-তিনেক নারীও রয়েছে। সদস্য সংখ্যা হাজার দুয়েক। সামাজিক গণমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারণাও চালাচ্ছে তারা। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, ১২টি জেলায় বেশ সক্রিয় শায়খ আব্দুর রহমানের হাতে তৈরি সংগঠনটি। ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আন্তর্জাতিক দুনিয়া রোহিঙ্গা সমস্যার কোনও সমাধান করতে পারেনি।

যুক্তিসঙ্গত কারণেই আফগান শরণার্থীদের আশ্রয়ের প্রশ্নে আমেরিকার অনুরোধ রাখেনি বাংলাদেশ। তাই মৌলবাদীরা রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরও জঙ্গিবাদী কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদীরা বেশ কোণঠাসা। তাদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু সাফল্য এসেছে নিরাপত্তা বাহিনীর। দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জেএমবি, নিউ-জেএমবি, আনসার আল ইসলাম, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি), হেফাজতে ইসলাম এবং অন্যান্য জঙ্গিবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত অনেককেই গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৬ সালে সমকামী অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু মাহবুব তনয়কে কুপিয়ে হত্যার অপরাধে ৩১ আগস্ট ঢাকার একটি আদালত ৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। ৬ সেপ্টেম্বর জামায়াতে ইসলামীর (জেআই) মহাসচিব মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ইয়াছিন আরাফাতকে তাদের ধ্বংসাত্মক কাজের জন্য গ্রেফতার করা হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর সিলেট জেলা থেকে জেআই-নেতা নিজাম উদ্দিন সিদ্দিকীকে গ্রেফতার করা হয়। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) ৪২ কর্মীকে দিনাজপুর থেকে গ্রেফতার করা হয় ১৭ সেপ্টেম্বর। সেদিনই ঢাকা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) বাসাবো থেকে গ্রেফতার করে হেফাজতে ইসলাম নেতা রেজওয়ান রফিককে। সাতক্ষীরা জেলা থেকেও জেআইর ১০ নারী সদস্যকে গ্রেফতার করা হয় একই দিনে।

২০০৫ সালে চট্টগ্রাম আদালতে বোমা হামলার ঘটনায় অক্টোবরের ৩ তারিখে চট্টগ্রাম অ্যান্টি-টেরোরিজম স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল নিষিদ্ধ জেএমবি নেতা জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজানকে মৃত্যুদণ্ড এবং জাবেদ ইকবাল ওরফে মোহাম্মদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। জেএমবির বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ মিজান ওরফে কাউসার ওরফে বোমা মুন্না গত আগস্টে ভারতে গ্রেফতার হয়। ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর বর্ধমান বিস্ফোরণে জড়িত তিনি। বুদ্ধগয়া বিস্ফোরণেও ‘বোমা মুন্না’ জড়িত ছিল। মিয়ানমারে ২০০২ সালে রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে রোহিঙ্গাদেরই জেএমবির হয়ে প্রশিক্ষণ দিতো মুন্না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জঙ্গিবাদের প্রতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি শুধু মুখের কথা নয়। হেফাজতে ইসলাম এবং আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের নিয়ে গড়া তাদের উপ-দল মানহাজির বিরুদ্ধে নেওয়া কড়া ব্যবস্থা নিয়ে সেটা ফের প্রমাণ করেছে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

শেখ হাসিনার হাত ধরে আওয়ামী লীগ প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে আজ প্রতিষ্ঠিত। তার সরকারের প্রধান কাজই হচ্ছে জঙ্গিবাদকে দেশ থেকে নির্মূল করা। দক্ষিণ এশিয়া থেকে জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে ঢাকা দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক এবং বহুমাত্রিক সমঝোতা ও সমন্বয়ে বিশ্বাসী। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনে ভাইস-প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শুধু অর্থনৈতিক বিকাশের হাত ধরেই হয়নি, সন্ত্রাস নির্মূল এবং দক্ষিণ এশীয় ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে স্থিরতা রক্ষায় বাংলাদেশের দায়বদ্ধতাও কাজ করেছে। আফগানিস্তান নিয়ে বাংলাদেশি মৌলবাদীরা যাই বলুন না কেন, হাসিনা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন ৯ সেপ্টেম্বর সাফ জানিয়েছেন, ‘আমরা কিছুতেই সন্ত্রাসীদের মদত দেবো না। আমরা গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল।’

বাংলাদেশেরই শুধু নয়, তালেবানদের উত্থান আঞ্চলিক স্থিরতা ও শান্তির জন্যও বিপজ্জনক। মৌলবাদীরা নতুন করে উৎসাহিত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে অবগত রয়েছে বাংলাদেশ সরকারও। তাই সরকারও চাইছে কড়া হাতে মৌলবাদীদের দমন করে উপমহাদেশ থেকে জঙ্গিবাদকে নির্মূল করতে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

দুর্বৃত্তরাই আফগানিস্তানে সরকার চালাবে

দুর্বৃত্তরাই আফগানিস্তানে সরকার চালাবে

বঙ্গবন্ধুর জীবনে 'শক্তিঘর' ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব

বঙ্গবন্ধুর জীবনে 'শক্তিঘর' ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব

চীনের বন্ধুত্ব, নাকি আধিপত্য

চীনের বন্ধুত্ব, নাকি আধিপত্য

বাঁধের বাধায় বন্দি চীনের ‘বন্ধুত্ব’

বাঁধের বাধায় বন্দি চীনের ‘বন্ধুত্ব’

নিখোঁজ প্রজন্ম: দায় কার?

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২১, ১৬:৫২

রেজানুর রহমান কথায় আছে ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের হাজার ফোঁড়ের সমান’। অর্থাৎ সময় থাকতেই ব্যবস্থা না নিলে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেওয়া খুব কঠিন হয়ে যায়। ধরা যাক, বন্যার পানি বাড়তে শুরু করেছে। বাঁধ না দিলেই কিন্তু গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। তখন যদি আমরা ভাবি, দেখি না কী হয়? তাহলে ভুল হবে। দেখি না কী হয় ভেবে বসে থাকলাম। বন্যার পানির তোড়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলো। তখন কি শত চেষ্টা করেও আদৌ বাঁধ রক্ষা করা যাবে? বোধকরি না।

এত কথা বলার একটি উদ্দেশ্য আছে। দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে রিপোর্ট বেরিয়েছে, শুধু ঢাকার মিরপুর এলাকা থেকে গত ৬ মাসে প্রায় ৩ শতাধিক কিশোর-কিশোরী নিখোঁজ হয়েছে। তাদের প্রায় সবাই ‘বন্ধু’র কাছে যাচ্ছি অথবা একটু কাজ আছে এই কথা বলে নিজ পরিবার থেকে বেরিয়ে গেছে। থানা-পুলিশের সহায়তায় কাউকে কাউকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বাকিরা এখনও নিখোঁজ। পুলিশ সূত্র বলছে, শুধু ঢাকার মিরপুর নয়, গোটা দেশের চিত্র আরও ভয়াবহ।

মোবাইল ফোন নাকি এই সর্বনাশের কারণ। মোবাইল ফোন এখন দেশের মানুষের কাছে অনেকটা খেলনার মতো। যার দরকার নাই সেও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। ছোট ছোট বাচ্চাদের হাতেও দেখা যায় দামি মোবাইল ফোন। আদরের সন্তান আবদার তুলেছে তার একটা দামি মোবাইল ফোন দরকার। ‘একটা মোবাইল ফোনই তো...’– অনেক বাবা-মা গভীর আগ্রহে সন্তানকে দামি মোবাইল কিনে দিচ্ছেন। কিন্তু এর ফলে সন্তানের যে ক্ষতিটা হচ্ছে তা বোধকরি অনেকেই খেয়াল করছেন না। অথবা খেয়াল করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। এই সুযোগে কোমলমতি শিশু-কিশোররাও মোবাইল ফোনের প্রতি অত্যধিক মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। পড়ার টেবিলে মোবাইল ফোন, খাবার টেবিলে মোবাইল ফোন। এক হাতে খায় অন্য হাতে মোবাইল টিপে, ক্লাসেও তার হাতে মোবাইল ফোন। শিক্ষক লেকচার দিচ্ছে, ছাত্রছাত্রী লুকিয়ে লুকিয়ে মোবাইল ফোনে রঙিন দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছে। পুলিশ সূত্র বলছে, যারা নিখোঁজ হয়েছে তাদের প্রায় সবাই মোবাইল ফোনে বন্ধুত্ব গড়েছে। বন্ধু বলেছে, চল বেরিয়ে যাই। ব্যস। বন্ধুর কথায় ঘর ছেড়েছে অনেক কিশোরীও। এই সুযোগ নিয়েছে নারী পাচারকারী চক্রও। যারা এখনও নিখোঁজ, ধারণা করা হচ্ছে তাদের অনেকেই নারী পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়েছে।

একটি ঘটনা বলি। আমার এক আত্মীয়ের পরিবারে সদস্য সংখ্যা পাঁচ। স্বামী-স্ত্রী, দুই ছেলেমেয়ে এবং একটি কাজের মেয়ে। পাঁচ জনের মোবাইল সেট রয়েছে ৭টি। স্বামী-স্ত্রী দুটি করে মোবাইল সেট ব্যবহার করেন। আর বাকিদের আছে একটি করে মোবাইল সেট। পরিবারের কনিষ্ঠতম সদস্য ৯ বছরের একটি ছেলে। স্কুলে পড়ে। তাকেও দেওয়া হয়েছে একটি দামি মোবাইল ফোন। কাজের মেয়েটিও ব্যবহার করে দামি মোবাইল ফোন। এমনও হয়, একঘর থেকে অন্য ঘরে মোবাইল ফোনেই প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সেরে নেয়। একদিন রাতে ওই বাসায় গিয়েছিলাম। খাবার টেবিলে বসা সবাই মোবাইল ফোন টিপছে। ছোট ছেলেটিও মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত। তার মা মৃদু ধমক দিল– ‘অ্যাই, এখন মোবাইল রাখো...’।

কে শোনে কার কথা? মায়ের ধমক খেয়ে সে খাবার টেবিল থেকে উঠে গেলো। ছেলেটির মা তখন আপন মনে বলতে থাকলেন- কী যে করি... ওর হাতে মোবাইল তুলে দেওয়াই ভুল হয়েছে...।

 জিজ্ঞেস করলাম– কেন এই ভুলটা করলেন? মায়ের উত্তর- ওর বয়সী সবার হাতেই তো এখন মোবাইল ফোন আছে। তাই ওর আবদার উপেক্ষা করতে পারিনি।

ছেলে কি স্কুলেও মোবাইল ফোন নিয়ে যায়?

হ্যাঁ।

স্কুল কি এটা এলাউ করে?

মা এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। আমতা আমতা করতে থাকলেন।

বোঝা গেলো স্কুলের নিষেধ আছে, তবু ছেলের ব্যাগে মোবাইল ফোন দিয়ে দেন মা। যুক্তি দেখালেন এভাবে– ওর কাছে মোবাইল থাকলে মাঝে মাঝে খোঁজ নিতে পারি। বোঝেনই তো... চার পাশে কত কিছুই না ঘটছে...।

আরেকজন মায়ের কথা বলি। স্কুল পড়ুয়া একমাত্র ছেলেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন না। আবদার রক্ষা করতে গিয়ে ছেলের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দিয়েছিলেন। একসময় দেখলেন ছেলে মোবাইল ফোন ছাড়া কিছুই বোঝে না। সারা রাত নিজের ঘরে মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকে। সকালে স্কুলে যেতে চায় না। বাবা ছেলের কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নিলেন। তারপর ওই ফোনে যা দেখলেন তা সত্যিকার অর্থে খুবই ভয়াবহ। অশ্লীল দৃশ্যে ভরা ছিল ফোনটি। ছেলের কাছ থেকে ফোন কেড়ে নেওয়া হলো। ফলে বাধলো বিপত্তি। মোবাইল ফোন না দিলে ছেলে নাকি বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেবে...।

এ কথা সত্য, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর এই যুগে মোবাইল ফোন খুবই জরুরি অনুষঙ্গ। মোবাইল ফোন ছাড়া যেন জীবন চলেই না। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। হাতে যদি থাকে একটি মোবাইল ফোন তাহলে পৃথিবীর যেকোনও প্রান্ত থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য করা সম্ভব। এটাই সময়ের দাবি। কিন্তু কোমলমতি শিশু-কিশোরদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেওয়াও কি সময়ের দাবি? পৃথিবীর অনেক দেশে শিশু-কিশোরদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেওয়ার বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট একটি বয়সের আগে কেউ মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবে না– এমন নির্দেশ আছে অনেক দেশে। আমরা কেন এ ব্যাপারে সোচ্চার হচ্ছি না? স্কুল ব্যাগে কেন মোবাইল ফোন থাকবে? কোন যুক্তিতে?

লেখার শুরুতে যে প্রসঙ্গটি তুলে ছিলাম সে প্রসঙ্গেই আবার ফিরে যেতে চাই। এই যে বন্ধুত্বের আহ্বানে যারা নিখোঁজ হয়েছে তারা মোবাইল ফোনেই বন্ধু খুঁজে নিয়েছে। এক্ষেত্রে দোষ কি মোবাইল ফোনের? বোধকরি উত্তরটা হবে- না! এখানে মোবাইল ফোনের দোষ কোথায়? দোষ যদি করে থাকে সেটা করেছে ফোন ব্যবহারকারী ব্যক্তি। দেশে যখন ভিসিআর প্রযুক্তি এসেছিল তখন একটা ‘ছি, ছি’ রব উঠেছিল। কারণ, ভিসিআরে নীল ছবি দেখা যায়। কিন্তু ভিসিআরে যে ভালো ছবিও দেখা যায় সে কথা জোর দিয়ে বলেননি কেউ। আসলে ব্যবহারের মানসিকতার ওপরই সবকিছু নির্ভর করে। মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটছে।

সবকিছুরই একটা বয়স আছে। স্কুলে ভর্তি হওয়ার বয়স আছে। চাকরি পাবার বয়স আছে। বিয়ে করার বয়স আছে। তেমনই দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বয়সের একটি স্তর নির্ধারণ করা উচিত। তা না হলে আরও ভয়াবহ বিপদ আসন্ন। আসুন এখনই সোচ্চার হই।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

যখন না দেখেই অনেক কিছু বলি

যখন না দেখেই অনেক কিছু বলি

সাধে কি কেউ নিজের ঘরে আগুন দেয়?

সাধে কি কেউ নিজের ঘরে আগুন দেয়?

বিষয়টি ‘কথার কথা’ নয়

বিষয়টি ‘কথার কথা’ নয়

স্কুল যেন এবার আনন্দের হয়

স্কুল যেন এবার আনন্দের হয়

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড: আর কত পেছাবে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন?

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২১, ১৫:৩৩

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা আর ১৭ বার পেছালেই ‘সেঞ্চুরি’। সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার-মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন আবার পেছালো। এ নিয়ে মোট ৮৩ বার পেছালো এ মামলার প্রতিবেদন দাখিল। নতুন তারিখ আগামী ২৪ নভেম্বর।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনিকে হত্যা করা হয়। সে সময় তাদের পুত্র মেঘের বয়স ছিল ৫ বছর, এখন ১৪। তার মনোজগতে কী ভাবনা হচ্ছে আমরা জানি না, তবে সে বড় হচ্ছে আর আর দেখছে তার বাবা-মা’র হত্যাকাণ্ড নিয়ে রাষ্ট্রের উদাসীনতা, অদক্ষতা কিংবা অসক্ষমতা।

একটা চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের নয়টি বছর চলে গেলো, অথচ কিছুই করতে পারছে না আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রথমে এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তভার পেয়েছিল শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ। তারপর সেই দায়িত্ব দেওয়া হয় গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি)। দুই মাসের মাথায় ডিবি হাল ছেড়ে দেয়; খোদ আদালতের সামনে ব্যর্থতা স্বীকার করে। তারপর আদালত তদন্তের নির্দেশ দেয় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন – র‌্যাব-কে। র‌্যাব এলিট ফোর্স, একটা চৌকস বাহিনী বলে পরিচিত, অথচ সেই র‌্যাবও তদন্ত কোনোভাবেই শেষ করতে পারছে না। সামগ্রিক বিবেচনায় এখন পর্যন্ত সাংবাদিক-দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনির হত্যাকাণ্ডের রহস্যময়তা বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর বড় ব্যর্থতার নজির হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। এই ব্যর্থতা বিস্ময়কর; কারণ, একটা হত্যাকাণ্ডের তদন্তকাজ দীর্ঘ নয় বছরেও শেষ করা যাচ্ছে না। এটা অস্বাভাবিক এবং একই সঙ্গে অবিশ্বাস্য।

নজির আছে, প্রমাণ আছে, আমাদের পুলিশ, র‌্যাব তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক জটিল অপরাধেরও কিনারা করেছে, করতে পেরেছে। এই হত্যাকাণ্ড কী এমন কোনও হত্যাকাণ্ড যে এখনও নির্দিষ্ট কোনও সূত্র মিললো না? দুষ্কৃতকারীরা কী কোনও সূত্র রেখে যায়নি? আমাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে এটি একটি ক্লু লেস মার্ডার।  

মামলা করেছিল রুনির ভাই। তারা হাল ছাড়েনি এখনও, কিন্তু তাদের হতাশা ব্যাপক। ঘটনার পরপরই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিরা ধরা পড়বে। সেই থেকে কত ৪৮ ঘণ্টা চলে গেলো! তাই এখন প্রশ্ন জাগছে আদৌ কি এই সাংবাদিক দম্পতি খুনের কিনারা হবে? সাংবাদিকরাও আন্দোলন করে একটা সময় হাল ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু জনগণের ক্ষোভের আঁচ টের পাওয়া যায় কান পাতলেই। বারবার মামলার প্রতিবেদন পিছিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন মহলে দাবি উঠতে শুরু করেছে এই ধরনের ঘৃণ্যতম নারকীয় অপরাধের ক্ষেত্রে চটজলদি তদন্ত সম্পন্ন  করা ও  কঠোরতম সাজা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন নতুন পদ্ধতি প্রণয়ন করার।

এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বিচারের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত অর্থে মামলাটি থেমে রয়েছে। একটা সময় মামলার কিছু আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছিল। সেসব পরীক্ষার প্রতিবেদন তাঁদের হাতে আসার পরও হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হলো না। এখন মানুষ ভাবতে শুরু করেছেন, দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে জটিল রহস্য যাতে বের না হয় তার জন্য অদৃশ্য কোনও হাতের কারসাজি রয়েছে।  

কয়েক বছর আগে নিহত সাগর সারোয়ারের মা হতাশা ব্যক্ত করে বলেছিলেন, তদন্তকারীদের ওপর তার আর কোনও ভরসা নেই। সন্তান হত্যার বিচারপ্রার্থী একজন বয়স্ক নাগরিকের এমন হতাশাময় উপলব্ধি আমাদের আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা, সরকার ও খোদ রাষ্ট্রকেই বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। সাগর ও রুনির একমাত্র সন্তান মেঘও বড় হচ্ছে। রাষ্ট্র যদি তার মা-বাবার হত্যার বিচার করতে না পারে, তবে দেশ সম্পর্কে কি চিন্তা জাগবে ছেলেটার মনোজগতে, সেটা কি ভাবছি আমরা?

ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ায় পুলিশের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। সেই পুলিশ যদি রাজধানীর বুকে সংঘটিত এমন একটি বড় খুনের তদন্ত শেষ করতে না পারে তাহলে আইনের শাসন কায়েম হয় না। গোটা দেশে লাখ লাখ মামলা আছে, যেগুলোর পুলিশি তদন্ত শেষ হচ্ছে না। আমরা জানি, প্রক্রিয়াগত কারণেই প্রচুর মামলার তদন্ত বকেয়া থেকে যায়। কিন্তু এমন আলোচিত একটা হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এতবার পেছালে পুলিশের ইচ্ছা ও সক্ষমতা দুটোই প্রশ্নের মুখে পড়ে। এমন একটি মামলার তদন্ত স্থবির হয়ে থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা উন্মোচিত হচ্ছে মানুষের সামনে।

আমরা বলি দেশের প্রতিটি মানুষের বিচার চাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি বিচার না-ই পাওয়া যায়, তবে বিচার চাওয়ার অধিকার থেকে লাভ কী? এই হত্যারহস্য অমীমাংসিত রাখার কোনও সুযোগ নেই; কালক্ষেপণের মাধ্যমে জাতির স্মৃতি থেকে ওই সাংবাদিক দম্পতির স্মৃতি মুছে ফেলাও যাবে না। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই করতে হবে অথবা বলে দিতে হবে বিচার হবে না।

লেখক: সাংবাদিক 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

হিংসাকে হারানোর রাজনীতি

হিংসাকে হারানোর রাজনীতি

উদ্বেগ ও অবসাদ

উদ্বেগ ও অবসাদ

মূল্য ছ্যাঁকা

মূল্য ছ্যাঁকা

আত্মহত্যা

আত্মহত্যা

পুলিশি পাহারায় ধর্মচর্চা!

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১৬:৩৩

আনিস আলমগীর কবি নির্মলেন্দু গুণ ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছেন- ‘পুলিশ প্রটেকশনে নো দুর্গাপূজা।’ এখানে ক্ষান্ত হননি বাংলাদেশের জনপ্রিয় কবি। তিনি যুক্তি হিসেবে বলেছেন, ‘আগামী বছর থেকে হিন্দুরা যদি পুলিশ প্রটেকশন ছাড়া দুর্গাপূজার আয়োজন করে, তবেই শুধু আমি দুর্গামণ্ডপে পূজা দেখতে যাবো। অন্যথায় নয়। পাকিস্তান আমলে, আমার ছোটবেলায় পুলিশ প্রটেকশন ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা হতে দেখেছি। দুর্গাপূজার পবিত্রতা রক্ষার দায়দায়িত্ব বাংলাদেশের সব মানুষের ওপর চোখ বন্ধ করে ছেড়ে দিতে হবে। পুলিশ, মন্ত্রী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীরা চাইলে আসতে পারেন, তাঁরা পূজা দেখার জন্য আসবেন, পূজা পাহারা দেওয়ার জন্য নয় বা পূজারীদের মনে সাহস বাড়ানোর নামে সাহস কমিয়ে দিতে নয়।’

আমি গুণদার এই মনোভাব সমর্থন করি। ধর্মীয় উৎসব যদি পুলিশ প্রটেকশনেই করা হয় তাহলে এখানে উৎসব কোথায়! একে আবার গালভরা বুলিতে কেউ কেউ বলছেন সর্বজনীন উৎসব। সব জনের উৎসবে পুলিশি পাহারার দরকার হবে কেন! মুসলিমরা প্রতিমা ভাঙতে যাবে কেন! পূজা উদযাপন নিয়ে হিন্দুদের ভয় পেতে হবে কেন! তার মানে যা বলা হয়, ধর্মীয় সম্প্রীতি উপচে পড়ছে বলে যে ঢোল বাজানো হচ্ছে- সেসব মিথ্যা এবং ভণ্ডামি।

তাহলে আমাদের পক্ষে কি পুলিশি পাহারা ছাড়া, আশ্রয় ছাড়া পূজা উৎযাপন সম্ভব? আমার দৃষ্টিতে সেটা সব জায়গায় সম্ভব না। গুণদা’র পাকিস্তান আমলের অবস্থায় ফিরে যাওয়াটা বোধহয় দুঃসাহসিক কর্মপ্রচেষ্টা হবে। কারণ, আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্রে এখন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। ক্রমান্বয়ে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের দূরত্ব বাড়ছে। আগে এক গ্রামের ঘটনা অন্য গ্রামে খবর হতো, এখন এক দেশের ধর্মীয় নির্যাতন আরেক দেশে প্রভাব পড়ছে। ইন্টারনেট দুনিয়া সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে সম্প্রীতি বিনষ্টের ঘটনাকে আরও রঙ লাগিয়ে উত্তেজনায় ঘি ঢালছে।

একজন মানুষ যদি ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাসী না হয়, অন্য ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করা বন্ধ না করে, তাহলে ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্নে হবে কী করে! বিশেষ করে বাংলাদেশের হিন্দুদের তাদের ধর্মীয় উৎসবে শামিল হওয়া আরও কঠিন হয়ে যাবে। অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে পুলিশি পাহারা ছাড়া বাংলাদেশে মুসলিমরাও আজকাল ধর্মীয় উৎসব করতে পারছে না। মসজিদে, ঈদগাহে বোমা নিয়ে প্রবেশ করছে ইসলামি জঙ্গিরা। দেখা যাচ্ছে কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানই পুলিশ প্রটেকশন ছাড়া হতে পারছে না। গুণদা’র ছোটকাল বাদ দিলাম, আমাদের ছোটকালেও আমরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পাহারা দিতে কোনও পুলিশ দূরে থাক, চকিদারকেও দেখিনি।

এরমধ্যে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, খুব দ্রুত একটি নতুন আইন করতে যাচ্ছে সরকার, যাতে কোনও মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সাক্ষীর সুরক্ষা এবং তার গোপনীয়তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনার বিচারের জন্য সরকার এই আইনগত উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বলে বলেছেন আইনমন্ত্রী। আমার জানা মতে, মন্দির, বিগ্রহ নষ্ট বা হামলা করার বিরুদ্ধে কঠোর আইন এর আগেই সরকার করেছে। প্রস্তাবিত আইন হয়তো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা কমিয়ে আনবে।

নতুন এই আইন করার পক্ষে আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের যুক্তি হচ্ছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে শেষই করা যায় না সাক্ষীর অভাবে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় অধিকাংশ সময় সাক্ষী হন হয়তো ওই পরিবারের প্রতিবেশী আরেকটি সংখ্যালঘু পরিবারের মানুষ। কিন্তু মামলার বিচার প্রক্রিয়ার সময় সাক্ষী দিতে যাওয়াটা তাদের জন্য ভয়ের, এজন্য তারা সাক্ষ্য দিতে আসেন না।

আইনমন্ত্রী বলেছেন, সাক্ষীদের গোপনীয়তা রক্ষার ব্যবস্থা থাকবে এই আইনে। এটা কতটা বাস্তব হবে ভেবে দেখার বিষয় আছে। আইনের অপব্যবহারের সুযোগ থাকবে হয়তো। বর্তমানে মন্দির ভাঙা এবং বিগ্রহ নষ্ট করার যে আইন আছে সেটাও অপব্যবহারের চেষ্টা হয়। তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, এই ধরনের হামলা রোধ করতে বিশেষ করে মন্দির আর মূর্তি আক্রমণ করার আগে ধর্মীয় উত্তেজনার নামে, তৌহিদি জনতার নামে, দুষ্কৃতকারীদের হামলা থেকে সংখ্যালঘুদের জানমাল রক্ষা করতে হবে।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র তাদের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে বলেছে, ২০১৩ সাল থেকে গত ৯ বছরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাড়ে তিন হাজারের বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে হিন্দুদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং পূজামণ্ডপ, মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ অন্যতম। সংখ্যাটা চোখ বুজে থাকার মতো নয়।

গুণদা’র ‘পুলিশ প্রটেকশনে নো দুর্গাপূজা’ স্ট্যাটাসে আবার ফিরে আসি। সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানোর, অভয়দানের দরকার হচ্ছে এখন। কিন্তু সেটি লাগছে কেন– রাষ্ট্রকে এর মূলে যেতে হবে। অনেকে মনে করেন, হিন্দুদের প্রতি বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তাদের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে দুঃখের কারণ হচ্ছে, যেমনটা পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে ‘মুসলমান তোষণ’-এর অভিযোগ করে আসছে সে দেশের একশ্রেণির মানুষ। তাদের মতে, এতে সংখ্যালঘুদের প্রকৃত কল্যাণের চেয়ে তাদের ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংখ্যাগুরুরা নিজেদের ডিপ্রাইভ ভাবছে কিনা, সরকারবিরোধী ক্ষোভ ভেন্টিলেশনের সুযোগ হিসেবে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে কিনা, এসবও গবেষণার দরকার আছে।

প্রায় ৩২ হাজার মণ্ডপে এবার পূজা হয়েছে, সেটি একটি প্রশংসার দিক। কিন্তু সে তুলনায় সামান্য ক’টি মণ্ডপে হামলার ঘটনা দেশে-বিদেশে সরকারের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কারণ, এক মণ দুধে এক ফোঁটা চনাই যথেষ্ট। পূজামণ্ডপের সংখ্যা ও জৌলুস তাহলে বড় বিষয় নয়, শান্তিপূর্ণভাবে পূজা করতে পারছে কিনা সেটাই বড় বিষয়। মৌলবাদীরা বরং এসব জৌলুসকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হিন্দুদের বাড়বাড়ন্ত হিসেবে দেখছে। বলছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় হিন্দুরা অনেক বেশি দাপট দেখাচ্ছে। এসব কারণে অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগ শাসনামলেও সাম্প্রদায়িকতা কমেছে দাবি করা যাচ্ছে না। পাশের দেশের হিন্দু মৌলবাদী সরকারের শাসন, সোশাল মিডিয়াও এই বিষবাষ্প বাড়ানোর ক্ষেত্রে আগুনের মধ্যে ঘি হিসেবে কাজ করছে। সমাজ বিজ্ঞানীদের এসবও হিসাবে ধরতে হবে।

সংখ্যালঘু বিষয়টি এত সংবেদনশীল যে এক লাইন লিখতে গিয়ে চারবার ভাবতে হয়। সরকারকেও সংখ্যালঘু প্রশ্নে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে হলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া চিন্তা করতে হবে। সংখ্যালঘুদের কল্যাণ চাইলে তাদের সুযোগ-সুবিধা নয় শুধু, সবার আগে দেশের মধ্যে আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই সম্প্রীতি বিনষ্টে সংখ্যালঘুরাও বিপথে যাচ্ছে কিনা সেটাও দেখতে হবে। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ আর হেফাজতে ইসলামের মধ্যে তফাৎ কী দেখতে হবে।

অন্যদিকে রাজধানীতে বসে আমরা যারা প্রগতিশীলতা, অসাম্প্রদায়িকতার যে বুলি দিচ্ছি তার ছিটেফোঁটা কি গ্রামে পৌঁছছে সেটাও দেখতে হবে। আগে গ্রামে সাংস্কৃতিক যে আবহ ছিল, গান-বাজনা, নাটক, চলচ্চিত্র, জারি সারি, যাত্রাপালা ছিল- তার স্থান তো এখন ইউটিউব মোল্লারা দখল করেছে। অন্যদিকে চলছে ভারতীয় সিরিয়ালে বউ-শাশুড়ি প্যাঁচাল এবং সূক্ষ্মভাবে হিন্দুত্ববাদী প্রচারণা। এমন কোনও সিরিয়াল নেই যেখানে ধর্মীয় সুড়সুড়ি নেই। এর মাধ্যমে আমরা একটি ধর্মান্ধ বিশাল অসহিষ্ণু প্রজন্ম তৈরি করছি।

যতদিন এসবের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে আমরা যাবো না ততদিন ধর্মীয় সম্প্রীতি ফিরে আসবে না। সংখ্যালঘুদের নিরাপদে ধর্ম পালন সম্ভব হবে না। যতদিন সব নাগরিককে রাষ্ট্র সমান চোখে দেখবে না, কোথাও সংখ্যালঘুদের অত্যাচার করে, কোথাও আলগা পিরিতি দেখিয়ে নিজেদের ভোটের অঙ্ক ঠিক রাখার চেষ্টা করবে– ততদিন বাংলাদেশে পুলিশ প্রটেকশনে পূজা, ভারতে পুলিশ প্রটেকশনে নামাজ পড়ার দৃশ্য দেখবো আমরা। সবকিছু ভোটের খেলা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া না যাওয়া

৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া না যাওয়া

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে সন্ত্রাস-দুর্নীতি বাড়িয়েছে

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে সন্ত্রাস-দুর্নীতি বাড়িয়েছে

মিডিয়ার সংকট এবং বিদেশি টিভি চ্যানেল

মিডিয়ার সংকট এবং বিদেশি টিভি চ্যানেল

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

‘গেলে জমি থাকলে ভোট, এই চক্র বন্ধ হোক’

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১৫:১৩

রুমিন ফারহানা খুব অস্থির সময় পার করছি আমরা। করোনা-বিভীষিকার রেশ মানুষের শরীর, মন, স্বজন হারানো, চাকরি হারানো সবটা এখনও আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, রাজনীতির মাঠের অস্থিরতা, নির্বাচন কমিশন গঠন বিতর্ক, একতরফা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, সব মিলিয়ে অস্বস্তিকর অস্থির এক সময়। শারদীয় দুর্গোৎসব তাই তার চিরচেনা আনন্দময় রূপে আসবে, তা হয়তো আশা করেনি কেউ। কিন্তু তাই বলে দাবানলের মতো আগুন, ৭০টির বেশি মণ্ডপ-মন্দির ভাঙচুর, সাত জনের প্রাণহানি, হিন্দু বাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুট; এতটা বিভীষিকাময় দুর্গোৎসবও কারও কল্পনায় ছিল না, কিন্তু তা-ই হলো।

পূজার সপ্তমীর দিন কুমিল্লার এক পূজামণ্ডপে কোরআন অবমাননাকে কেন্দ্র করে যে তাণ্ডব শুরু হয়েছিল, মুহূর্তে তা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, রংপুরসহ দেশের অনেক জায়গায়। অথচ ঘটনাটি শেষ হওয়ার কথা ছিল কুমিল্লাতেই। কুমিল্লায় এই ঘটনা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ঠেকানো গেলে দেশের আর কোথাও এমন ঘটনা হয়তো আর ঘটতো না। ঘটনার সূত্রপাত যে ফেসবুক লাইভ থেকে সেটিতে দেখা যায়, যিনি ভিডিও করছেন তিনি ওসির একেবারে সামনে রীতিমতো ধারাবর্ণনা করে ঘটনাটি দেখাচ্ছেন।  

ফেসবুক লাইভ দূরেই থাকুক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ফেসবুক স্ট্যাটাসের জেরে এই দেশের বহু জায়গায় অতীতে যে তাণ্ডব ঘটে গেছে, সেটার ভিত্তিতে ওসির না বোঝার কোনও কারণ নেই এই ঘটনার প্রভাব কী হতে পারে। অথচ ওসি ছিলেন নির্বিকার। এমনকি পরবর্তীতে ভাঙচুর ঠেকানোর ক্ষেত্রে পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা প্রথম আলো কুমিল্লায় সরেজমিন রিপোর্ট করে বলেছে, সেখানকার প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষায়, প্রথমেই পর্যাপ্ত পুলিশ এনে বিক্ষুব্ধ লোকজনকে সরিয়ে দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে পারতো।

প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রাথমিক বয়ানে জানা যায়, ‘এমন অশান্তি গত ৫০ বছরে দেখেননি। সেদিন বিক্ষোভ করতে আসা লোকজনের বেশিরভাগই ছিল বয়সে তরুণ, অচেনা। তাদের মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কী, বোঝা যাচ্ছিল না। একেকজন একেক দাবি করছিল। তাদের শান্ত করতে আশপাশের মসজিদের মাইকে আহ্বান জানানো হয়। এরপরও কীভাবে যেন তা পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে।’

পুলিশ সূত্র বলছে, ‘নানুয়া দিঘির পাড়ে দিনভর উত্তেজনায় একসঙ্গে ৫০০ মানুষের বেশি উপস্থিত ছিল না। শহরের বিভিন্ন স্থানে যেসব মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলা হয়েছে, তাতে বেশি মানুষের অংশগ্রহণ ছিল না। তাদের ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পর্যাপ্ত কঠোর অবস্থান নেয়নি।’ (দৈনিক প্রথম আলো, ২০ অক্টোবর, ২০২১)

একই পত্রিকার আরেকটি প্রতিবেদনে ২০ অক্টোবর বলা হয়, ‘খোঁজ নিয়ে স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা হৃদয় হাসান ওরফে জাহিদ (২০) ওই স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। তিনি হাজীগঞ্জ পৌর ছাত্রলীগের কর্মী। তার মা শাহিদা বেগম ২০১৪-২০১৯ মেয়াদে হাজীগঞ্জ পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর ছিলেন। আওয়ামী লীগের সমর্থনে তিনি নির্বাচনে জিতেছেন।’

প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা অভিযোগ করেছেন, মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া কিশোর ও তরুণেরা পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানের অনুসারী। হাজীগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহবুব-উল-আলমও ওই দৈনিকটিকে বলেন, হামলাকারীদের মধ্যে মেহেদী হাসানের অনুসারীও ছিলেন বলে তিনি শুনেছেন। তবে তিনি নিশ্চিত নন। এই ব্যাপারে জনাব মেহেদির বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি আবার অভিযুক্ত করেন আরেক ছাত্রলীগ নেতাকে। তিনি বলেন, ‘হাজীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি খোকন বলির অনুসারী ও পরিবারের সদস্যরা হামলায় অংশ নিয়েছেন, সেই প্রমাণ আমাদের কাছে আছে।’

একই রকম পরিস্থিতি হয়েছে দেশের অন্যান্য এলাকায়ও। রংপুরের ঘটনার সঙ্গে ছাত্রলীগ কর্মী জড়িত, সরকার নিজেই তা স্বীকার করেছে এবং সেই কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ঘটনাগুলোর পর বাংলাদেশে আর সবসময় যা ঘটে ঠিক তাই ঘটেছে। মামলাগুলোতে হাজার হাজার অজ্ঞাত আসামিকে রাখা হয়েছে। কারণ, এসব মামলায় এরপর যে কারও নাম অন্তর্ভুক্ত করা যায়। অন্তর্ভুক্ত করার ভয় দেখিয়ে কিংবা অন্তর্ভুক্ত নাম বাদ দেওয়ার জন্য টাকা কামানো যায়। পুলিশের ‘গ্রেফতার-বাণিজ্য’ গত কয়েক বছরের খুব পরিচিত ব্যাপার।

এই মামলাগুলোর আরেকটা উদ্দেশ্য হচ্ছে বিরোধী দলকে দমন-পীড়ন করা। প্রতিবারের নাশকতার মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় অসংখ্য বিএনপি কর্মীকে। মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের শুরু করে এসব ক্ষেত্রে ‘হুকুমের আসামি’ হওয়া থেকে বাঁচেন না দলের সর্বোচ্চ পর্যায়, স্থায়ী কমিটির সদস্য, এমনকি দলের মহাসচিবও। এবারও তার ব্যত্যয় হয়নি। বিএনপি’র নেতাকর্মীদের আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে গিয়ে খোঁজ রাখা হয়নি বহু কিছু। বিদেশে অবস্থানরত বিএনপির কর্মী যেমন তালিকায় আছেন তেমনি তালিকায় আছেন ৬ মাস ধরে জেলে থাকা বিএনপি কর্মীও।

চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপে হামলার মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এমন তিন জন বিএনপি কর্মী, যারা গত ছয় মাস থেকে জেলে আছেন। সেগুলোও ছিল নাশকতার মামলা, যখন নরেন্দ্র মোদি দেশে আসার কারণে বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা হয়েছিল। এসব কাজের অসারতা সরকারি আইনজীবী ঠিকই বুঝেছেন। কারাগারে থাকা বন্দিদের ভাঙচুরের মামলায় আসামি করা পুলিশের খামখেয়ালিপনা বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর সরকারি কৌঁসুলি (পিপি)।

এসব মানতে নারাজ মূল হোতা, পুলিশ। মামলার তদন্তকারী এসআই এই ব্যাপারে কথা বলতে না চাইলেও কথা বলেছেন পুলিশ সুপার, যিনি জানান– জেল থেকেও হুকুম দিতে পারে। তবে জেল থেকে কোনও আসামির হুকুম দেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়ে চট্টগ্রাম কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক বলেন, বন্দিরা কড়া নিরাপত্তার মধ্যে থাকেন। বর্তমানে স্বজনদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ বন্ধ রয়েছে।

দেশের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে, ডলারের বিপরীতে টাকা মূল্য হারাচ্ছে প্রতিদিন, সঙ্গে সরকার সমর্থিত সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, চাঁদাবাজি তো আছেই। ফলে সামনের দিনগুলোতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে উঠবে। ওদিকে সামনের নির্বাচন কমিশন গঠনের আলোচনা হচ্ছে সমাজে। একটি সুস্পষ্ট আইন ছাড়া, নির্বাচন কমিশন গঠনে যতই ‘সার্চ কমিটি’ তৈরি করা হোক, সেটা সংবিধানের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক– এটা জেনে গেছে এখন রাজনীতি সচেতন মানুষ। প্রতিটি সংসদ অধিবেশনে বহু আইন পাস হলেও এই আইনটি সরকার কেন পাস করেনি সেই সমালোচনা হচ্ছে। একই সঙ্গে চাপ আছে সামনের চার মাসে এ আইনটি করে ফেলার।

এই আলোচনাগুলো হাওয়ায় উবে গেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর এই হামলাগুলো সরকারকে অসাধারণভাবে সাহায্য করেছে মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে।

স্বল্পমেয়াদে এটা অসাধারণ লাভ ক্ষমতাসীনদের জন্য। মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদেও এই পরিস্থিতি সরকারকে বিরাট সুবিধা দিতে পারে।

নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করার সূত্র আরেকটি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা সামনে আসছে। নানা চাপে সেই নির্বাচন যদি সরকার ২০১৮-এর স্টাইলে করতে ব্যর্থ হয়, সেই আশঙ্কাকে মাথায় রেখে প্রধান বিরোধীদলকে যতটা সম্ভব দুর্বল করে ফেলার চেষ্টা করতে হবে সরকারকে। এই ঘটনাগুলোর মাধ্যমে সরকারের সুবিধামতো, সুবিধাজনক সময়ে বিএনপি’র যেকোনও পর্যায়ের নেতৃত্বকে ফাঁসিয়ে দেওয়া যাবে। এটাই মধ্যমেয়াদে এসব ঘটনার লাভ।

 
বাংলাদেশের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী আছে, জঙ্গিবাদ আছে, এসব আন্তর্জাতিক প্রচারণা দীর্ঘদিন থেকে সরকার করছে। এই প্রচারণার উদ্দেশ্য হচ্ছে, এগুলোকে দেখিয়ে যেকোনও মূল্যে ক্ষমতায় থাকার ন্যারেটিভ আন্তর্জাতিকভাবে তৈরি করা। দেশের মানুষের কাছেও এই বয়ানের ‘বাজারমূল্য’ আছে। এটাই হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতাসীন দলের কাছে এসব ঘটনার উপযোগ।

এই সরকারের আমলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপরে যত হামলা হয়েছে তার একটিরও বিচার তারা করেনি। বিচার অবশ্য না করারই কথা, সরকার যে আসলে এই ঘটনাগুলো ঘটাতে চায়, তার প্রমাণ হলো এসব ঘটনা যারা ঘটায় তাদের ক্ষমতাসীন দল বরং পুরস্কৃত করে।

নাসিরনগরের ঘটনার চার্জশিটভুক্ত তিন আওয়ামী লীগ নেতাকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন দিতে আমরা দেখেছি। মিডিয়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে দুই আসামির মনোনয়ন বাতিল করা হয়।

এখন শুধু বিরোধী দলই না, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংগঠন নির্বিশেষে বলছেন, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই, প্রশাসনের সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণেই এবার এই বীভৎস কাণ্ডগুলো ঘটেছে। তারাই এসব ঘটনা বারবার ঘটার পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দায়ী করছেন। তারাই এখন স্পষ্টভাবে বলছেন, এই সরকারের আশ্বাসে তারা এখন আর কোনও আস্থা রাখেন না।

সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। মোট জনসংখ্যায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ক্রমশ কমে আসা অনুপাত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, এ দেশে তারা ভালো নেই । ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য সবচেয়ে ভালো সরকার হিসেবে দাবি করা আওয়ামী লীগের শাসনামলের গত ৯ বছরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে ৩ হাজার ৬৭৯টি। এই হিসাব বিএনপি করেনি, করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র।

হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রতিক হামলার পর এই সম্প্রদায়ের বহু মানুষ খুব স্পষ্টভাবেই বলেছেন, এই দেশে তারা আর থাকতে পারবেন কিনা সেই চরম অনিশ্চয়তায় তারা পড়েছেন। তারা যাই করুক না কেন, ক্ষমতাসীন দলটির জন্য সেটাই সুবিধাজনক। তারা দেশ ছেড়ে চলে গেলে তাদের জমি দখল করে নেওয়া যাবে প্রভাব খাটিয়ে। আবার তারা যদি দেশে থাকেন, তাহলে এদের সব ভোট পড়বে তাদের বাক্সে, আদৌ যদি কোনও দিন সত্যিকারের ভোট হয় এই দেশে।

শুধু বিরোধীদলীয় কর্মী বলেই নয়, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার চাওয়া একটাই- গেলে জমি, থাকলে ভোট; এই চক্র বন্ধ হোক।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি দলীয় হুইপ

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বাণিজ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাই না যে কারণে

বাণিজ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাই না যে কারণে

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি একাই ব্যর্থ?

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি একাই ব্যর্থ?

‘আমি রাজনীতি করা মেয়ে, আমি কিন্তু ভদ্র না’

‘আমি রাজনীতি করা মেয়ে, আমি কিন্তু ভদ্র না’

আশ্রয়ণ প্রকল্প: দুর্নীতি কি আর্থিক নাকি ‘তেলবাজি’র?

আশ্রয়ণ প্রকল্প: দুর্নীতি কি আর্থিক নাকি ‘তেলবাজি’র?

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুই মাসের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন নেওয়ার নির্দেশনা

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুই মাসের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন নেওয়ার নির্দেশনা

ডিএমপিতে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেলেন বর্তমান কমিশনার

ডিএমপিতে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেলেন বর্তমান কমিশনার

কালো ঝলমলে

কালো ঝলমলে

সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় রাষ্ট্র নিশ্চুপ নেই: হাইকোর্ট

সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় রাষ্ট্র নিশ্চুপ নেই: হাইকোর্ট

মাকে হত্যায় ছেলের মৃত্যুদণ্ড

মাকে হত্যায় ছেলের মৃত্যুদণ্ড

‘প্রতিবাদ’ শব্দটিকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে: রিজভী

‘প্রতিবাদ’ শব্দটিকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে: রিজভী

‘বছরে ৩৫ বার দ্রব্যের দাম বাড়লেও ৭ বছরে শ্রমিকের বেতন বাড়ে না’

‘বছরে ৩৫ বার দ্রব্যের দাম বাড়লেও ৭ বছরে শ্রমিকের বেতন বাড়ে না’

ফিলিস্তিনে এক হাজার হাফেজকে সম্মাননা

ফিলিস্তিনে এক হাজার হাফেজকে সম্মাননা

আবারও মাঠে নামছেন সজল-মাহি!

আবারও মাঠে নামছেন সজল-মাহি!

কুমিল্লার ঘটনায় ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট, যুবক গ্রেফতার

কুমিল্লার ঘটনায় ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্ট, যুবক গ্রেফতার

‘পাকিস্তানের বিজয় উদযাপন রাষ্ট্রদ্রোহিতা’

‘পাকিস্তানের বিজয় উদযাপন রাষ্ট্রদ্রোহিতা’

স্কুল শিক্ষার্থীদের ১ নভেম্বর থেকে টিকা দেওয়া শুরু: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্কুল শিক্ষার্থীদের ১ নভেম্বর থেকে টিকা দেওয়া শুরু: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune