X
মঙ্গলবার, ১৫ জুন ২০২১, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

সেকশনস

করোনার করুণ কাহিনি: মহামারির সৌভাগ্য ও ‘খাই খাই’ চিন্তার খোরাক

আপডেট : ০৬ জুন ২০২১, ১৬:৪৮

মাকসুদুল হক ‘যেদিন ভালোবাসার ক্ষমতা, ক্ষমতার ভালোবাসাকে অতিক্রম করে যাবে সেদিনই বিশ্বে শান্তি আসবে’জিমি হেনড্রিক্স (১৯৪২-১৯৭০)।

মানবপ্রাণীকে দয়াল এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে তার পক্ষে পেছনের দিকে হাঁটা সম্ভব না। তার শ্রবণযন্ত্র কান দ্বারা পার্শ্ববর্তী অস্তিত্ব অনুভব করা ছাড়া, মানসিক ও শারীরিক ভারসাম্য ধরে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। মাথার পেছনে চোখ নেই বিধায় সকল ক্ষেত্রে আমরা ‘চোখকান খোলা’ রেখেই সৃষ্টিজগৎ অবলোকন করতে পারি। তাই এই মহামারির সময় আমরা কী দেখছি ও কী শুনছি তা হয়ে উঠেছে অতি গুরুত্বপূর্ণ। এরপর, কী করছি বা কী করবো—তা কী ভাবছি’র ওপর নির্ভর করবে বাকিটা দুর্গম পথ আমরা কীভাবে পাড়ি দেবো। 

আমাদের সংস্কৃতিতে এই অনুসন্ধানকে ‘মনতত্ত্ব’ বলা হয়। শুরু করা যাক:

স্মৃতিচারণ বা পেছনের কথা বলা খুবই বোরিং একটা বিষয়—তথাপি অতীত ভুলে যাওয়া কখনোই কাম্য নয়। কারণ, অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষণীয় অনেক উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এও ভুলে গেলে চলবে না যে কোনও জাতি অতীতে আটকে থাকলে তার দৃঢ়তার সঙ্গে ভবিষ্যতে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। অনবরত অতীতের কথা বলে মানুষকে বোর করার চেয়ে মনের গভীরে ভালোবাসায় তা আত্মস্থ করে রাখার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। 

ইতিহাস পাঠ বহু লোক করে, তবে বাংলাদেশের ইতিহাসের ‘সময়ের সাক্ষী’ অনেকের মতো আমিও একজন। সুযোগ পেলেই বলে বসি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। পৃথিবীতে মানবিক যুদ্ধ বলে কোনও যুদ্ধ নেই এবং একাত্তরও তার ব্যতিক্রম ছিল না। কিন্তু গণহত্যা, মৃত্যু, ধর্ষণ, ধ্বংসযজ্ঞ, মানবতার চরম অবমাননা এসব প্রত্যক্ষ করা ‘সৌভাগ্য’ হয় কী করে? 

কোন ভাগ্য দ্বারা এই সৌভাগ্য নিয়ন্ত্রিত?

সৌভাগ্য এই জায়গায় যে পৃথিবীর মানচিত্রে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাঙালি বহু যুগ লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। তবে নির্মম বাস্তবতা হলো, আমরা প্রাণরক্ষা পেয়েছিলাম বলেই পেছনের দিনগুলো স্মৃতিমন্থন এখনও করতে পারি এবং তা করে যাচ্ছি। 

মুক্তিযুদ্ধ চলেছিল ৯ মাস ও বিজয় যেভাবে আমরা ছিনিয়ে এনেছিলাম তা অবশ্যই প্রত্যক্ষ করা ‘সৌভাগ্য’ ছাড়া আর কী হতে পারে?

প্রকারান্তরে, এই যে ভয়াবহ করোনা মহামারি আমরা গেলো ১৪ মাসের ঊর্ধ্বে প্রত্যক্ষ করছি, তা কী দুর্ভাগ্যের, নাকি ‘সৌভাগ্যের’? 

একটু ভেবে দেখা যাক। 

ভয়, আতঙ্ক, অসুস্থতা, মৃত্যু, খাদ্যদ্রব্যের ঘাটতি, শহর ছেড়ে গ্রামে পলায়ন, বেকারত্ব ইত্যাদি একাত্তরেও ছিল এবারও আছে। লকডাউন থেকেও ভয়াবহ ‘দেখা মাত্রই গুলি করা হবে’ কারফিউ প্রায়ই বলবৎ থাকতো– যা ‘সৌভাগ্য’ক্রমে এবার নেই। পার্থক্য শুধু একাত্তরের শত্রু ছিল চিরচেনা ও তাদের প্রতিহত করতে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে, প্রতিরোধ করতে সব কৌশলই আমরা নিয়োগ করেছিলাম। অস্ত্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র–নির্মমতার বিরুদ্ধে নির্মমতা। আগেই বলেছি মানবিক যুদ্ধ বলে কোনও যুদ্ধ নেই।

আগের এক লেখায় বলেছি করোনা মহামারি মানব জাতির ওপরে নিক্ষিপ্ত হওয়া এক ‘মনস্তাত্ত্বিক বিশ্বযুদ্ধ’। এই যুদ্ধে পেশীর থেকে মানসিক শক্তির ওপরে সম্পূর্ণ নির্ভর করবে আমাদের আগামীর দিনগুলো ও তার ইতিহাস কীভাবে রচিত হবে। 

চিন্তার শক্তি, ভাবনার ব্যাপকতা বাঙালি জাতির কখনও কোনও কমতি ছিল না। আজকের ভয়াল সময়গুলো আমরা বা আমাদের উত্তর পুরুষ কীভাবে স্মরণ করবে, তা নিয়ে ভাবনাগুলো এখন থেকেই লিপিবদ্ধ করাটা জরুরি।

তদপুরি, আমাদের ভাবনার জগতের সঙ্গে করুণ বাস্তবতার যে অত্যন্ত সরু বিচ্ছেদরেখা, তা অতিক্রম করে নিজেদের এ-সময়ের চিন্তার সঙ্গে বিশ্বের চিন্তাচেতনার সমন্বয় ঘটানোর প্রয়োজনীয়তার কথা ‘হালকা’ করে বলার কোনও উপায় নেই। 

আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি এই যুদ্ধে আমরা একা নই। সমগ্র মানবজাতি আজ একত্রিত হয়েছে। মোটা দাগে এটাই আমাদের প্রথম ‘সৌভাগ্য’। কারণ, গত একশ বছরে সমগ্র পৃথিবী কেবল এক ইস্যুতে একত্রিত হয়েছে, তার কোনও নজির নেই। আগামীর সবকিছু নির্ভর করবে আজকের সসম্মানে বেঁচে থাকার স্পৃহার ওপরে।

মানবপ্রাণীর ভাবনার ও মনের জগৎ খুবই দুর্বোধ্য। ভালো করার আগ্রহ বা মন্দ করার প্রবণতা সবই অনির্দেশ্য। মন্দ থেকে ভালো করার চেষ্টা মানবপ্রাণীকে সব সময় পথ প্রদর্শন করলেও উভয় ক্ষেত্রেই ভাবনার জগৎ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত হয় আমাদের স্নায়ু কত রকম stimuli বা উদ্দীপক প্রতিদিন প্রকৃতি থেকে গ্রহণ করছে তার ওপরে। ‘নিজে ভালো তো জগৎ ভালো’– এই প্রাচীনতম প্রবাদবাক্য সেদিকেই ইঙ্গিত করে। 

মানবপ্রাণীর সঙ্গে অন্য প্রাণীর অমিল তার আত্মজ্ঞান, চেতনাবোধ বা consciousness ও ভাষা দ্বারা ভাববিনিময়– তথ্য আদান-প্রদান করার ক্ষমতায়। সহজ অর্থে ইহাকে ‘আক্কেল’ও বলা যেতে পারে। তবে যষ্ঠেন্দ্রিয় ও সহজ প্রবৃত্তি দ্বারা আমরা প্রকৃতির ইদানীংকালের প্রেরিত নির্ভুল বার্তাগুলো কি বুঝতে পারছি? ধরিত্রী মায়ের আর্তনাদ কি শুনতে পাচ্ছি? আর যা কিছু দেখেছি ও দেখবো তার থেকে কোনোরকম শিক্ষা কি আমরা নিচ্ছি? 

আমার মনে হয় না। কারণ, মানবপ্রাণী এখনও ভয়ানকভাবে দ্বিধাবিভক্ত এবং প্রাচীন মানবের চেয়ে আমাদের চেতনাবোধও খুব একটা পৃথক না।  

পৃথক শুধু এইটুকু যে আমরা জঙ্গল ছেড়ে এসে নগরীর অশ্লীল কংক্রিট জঙ্গলে বসবাস করছি। তথাকথিত বিশ্বায়ন বা গোলোকায়নের অনেক পরিবর্তন আনতে পারলেও–প্রাচীনতম ‘জংলি’ hunter gatherer ‘শিকারি সংগ্রাহক’ লুণ্ঠনকারী দখলদার স্বভাব থেকে আমাদের মুক্তি দিতে পারেনি।এখনও আমরা একান্ত নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থপর চিন্তার ঊর্ধ্বে উঠতে ব্যর্থ। সমষ্টিগত চিন্তা খুবই অপ্রতুল এবং কার্যত সমগ্র মানবপ্রাণীর মঙ্গল সাধন করার ‘বৃহৎ স্বপ্ন’ আজও ধরাছোঁয়ার বাইরে এক utopia.

যেখানে যোগাযোগ ও ভাববিনিময় মানবপ্রাণীর মহাগুণ, অথচ তার এই অসাধারণ দয়াল প্রদত্ত ক্ষমতা দেখা যায় যতসব বাগড়া বাঁধার অন্যতম কারণ।

পৃথিবীর যত সংঘাত, যুদ্ধ এমনকি দুটো মহাযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে একে-অপরের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের ব্যর্থতার কারণে।সবাই ‘অসাধারণত্বের অন্বেষণ’ করলেও পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায় অতি সাধারণ সরলপূর্ণ চিন্তাই মানবপ্রাণীর উপকারে এসেছে বেশি। জটিল চিন্তার কারণে ভাবের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে জটিলতা কেবল বেড়েছে, কমেনি। 

কথায় আছে ‘জটিল হওয়া খুবই সহজ, তবে সহজ হওয়া খুবই জটিল’।

মানবপ্রাণী ‘সৃষ্টির সেরা জীব’ প্রকারান্তরে একটি রূপক সংজ্ঞা। এর অস্তিত্ব বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে আছে বলে অনেকেই দাবি করলেও, এর সরাসরি কোনও reference বা উল্লেখ কোথাও পাওয়া যায় না। ধর্মতত্ত্ববিদদের বহু বিতর্কের পরে যা উঠে এসেছে এই ‘শ্রেষ্ঠত্বের’ বিবরণ সবই পরোক্ষভাবে সান্ধ্যভাষায় উল্লেখিত। মূলত এই সংজ্ঞা মানবপ্রাণী তার অহংবোধসহ দাম্ভিকতা চরিতার্থ ও প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই বলিষ্ঠভাবে প্রয়োগ ও ব্যবহার করে এসেছে। 

দাম্ভিকতার উৎস থেকে চলে আসে অনুবর্তী ক্ষতিকর শ্রেষ্ঠত্বের ভান ও ‘ঈশ্বরের মনোনীত একমাত্র প্রিয় জাতি’সহ ধর্মের ভেদাভেদ। সৃষ্টিকর্তা বারবার ‘জীব হত্যা মহাপাপ’-এর সাবধান বাণী সব ধর্মগ্রন্থ দিয়ে এলেও দেখা যায় কিছু মানুষ ধর্মের দোহাই দিয়ে ফ্যাসাদ, ফিতনা ও যুদ্ধ-গণহত্যা করে আসছে। পৃথিবীতে এ ধরনের মানুষের কারণে ধর্মযুদ্ধে মানবমৃত্যু সবচেয়ে বেশি হয়েছে, তবে আজ অবধি তা থামেনি বরং তা উৎকৃষ্টতা সাধন করেছে। ধরিত্রী পৃথিবীসহ মানবপ্রাণী এই মহাপাপ থেকে মুক্ত হতে পারেনি। 

আজকের পৃথিবীতে এই ‘হয় নিষ্পাদন করো বা নিপাত যাও’ অনুচরবৃন্দ সব সুস্থ ও সুষ্ঠু মানবচিন্তার অন্তরায়। সহজ থাকার মতো জটিল কর্মতে আর কেউ উদ্বুদ্ধ নন। জটিলতা কোন প্রান্তে এসে ঠেকেছে, তা এই তথাকথিত যোগাযোগের পৃথিবীতে স্পষ্টত প্রতীয়মান। যা কিছু দেখছি, যা কিছু শুনছি, যা কিছু বলছি, যা কিছু ভাবছি’র সঙ্গে ‘যা কিছু করছি’র নেই কোনও সামঞ্জস্য।

এই ‘শ্রেষ্ঠজীব তত্ত্ব’ বানিয়ে মানবপ্রাণী অন্য সব জীবকে তুচ্ছ করে, গণনায় না-রেখে কেবল ভোগ করতো, তা হয়তো প্রাচীন দিনগুলোতে বেঁচে থাকার অবলম্বন বলে মেনে নেওয়া যায়। তবে অধুনা মানবপ্রাণী অকারণে, কোনও অনুকম্পা ছাড়াই, নির্দ্বিধায় অন্য প্রাণীর ওপরে হত্যাযজ্ঞ থামায়নি– বরং বাড়িয়েছে বহু শতগুণ। তার ঘ্রাণজ চিত্ত, তার চোখের খিদে এতটাই প্রখর যে কোনও কিছু দিয়ে তার পথরোধ করা যাবে না। 

করোনা মহামারিতে মৃত্যুর অন্যতম কারণ বলা হচ্ছে মানবপ্রাণীর ইমিউন সিস্টেম কোভিড-১৯ নির্দ্বিধায় ভেদ করতে পারে। অথচ আমরা যে একটা বিষাক্ত পৃথিবী উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি, তা নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য কোথাও লক্ষ করা যায় না। করোনা থেকে প্রতিকারের জন্য আমরা বেছে নিয়েছি কত প্রকার ক্ষতিকারক বিষ, সেদিকটাও আমরা চুপ করে, চোখ বুজে তামাশা দেখছি। ‘রাসায়নিক বিশ্বযুদ্ধ’ অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে তা কি আমরা ভুলেও স্বীকার করি?

মাছ-মাংসসহ শস্য, শাকসবজির, ফলাদির ইত্যাদির genetic modification-এর কারণে খাদ্যসম্ভারকে বহু যুগ আগে করেছে বিষাক্ত ও সমগ্র মানবপ্রাণীকে রোগ, অসুখ ও অস্বাস্থ্যের ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে কেবল মুনাফার কারণে। বাংলাদেশও এর থেকে রক্ষা পায়নি। বাজারে গেলে কোন খাদ্যে কী chemical আছে বা নেই, সেই দুশ্চিন্তা সবাইকে আঁকড়ে ধরে। বিষ যে প্রতিনিয়ত আমাদের দেহে সঞ্চালিত হচ্ছে তা এখন খুবই ‘স্বাভাবিক’ বিষয় হয়ে গেছে। 

আবার এই মহামারির সুযোগ নিয়ে বহুজাতিক মুনাফাখোর কোম্পানিগুলো সাবান ও স্যানিটাইজারে কী পরিমাণ chemical ব্যবহার করছে ও ভবিষ্যতে কত ধরনের চর্মরোগসহ অন্যান্য রোগ মানবপ্রাণীকে গ্রাস করবে তার নেই কোনও সমীক্ষা।

‘৯৯ ভাগ জার্মমুক্ত’ বলে দাবি করলেও এসব সামগ্রী নিতান্তই কৃত্রিম প্রসাধনী ও যেকোনও কৃত্রিমতা মানবপ্রাণীর জীবন রক্ষা করতে পারে না। আমরা স্বল্পমেয়াদি সমাধান খুঁজতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সব সম্ভাবনা ধূলিসাৎ করছি। 

এবার খাদ্যাভ্যাস যা নিয়ে ইদানীং অনেকের ভেতরে তোড়জোড় দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে তার সম্পর্কে আলোকপাত করা যাক।

অভিজ্ঞান: স্পষ্ট করা দরকার, বাতাস ও পানির ন্যায় খাদ্য শুধু মানবপ্রাণী নয়, সব প্রাণী ও জীব জগতের জন্য দয়াল প্রদত্ত বিনামূল্যের উপহার এবং তা সুনিশ্চিত করা আছে পৃথিবীর শেষ দিন অবধি।

বাংলাদেশের আদি সংস্কৃতিতে আহার গ্রহণকে ‘সেবা’ বলা হয়—তার মূল কারণ জীবন, মৃত্যু ও আহার আমাদের দয়াল সৃষ্টিকর্তা নিয়ন্ত্রণ করেন—মানবপ্রাণী না। সেবা আমাদের ভাগ্যে কীভাবে, কখন, কোন অবস্থায় জুটবে তা হলফ করে বলা যায় না। ভাবলাম, ঘুম থেকে উঠে বিশাল এক English breakfast গ্রহণ করবো, তবে কপালে জুটলো পান্তাভাত, কাঁচামরিচ ও লবণ— এমনটা অহরহই ঘটে। আবার উল্টোটাও: ভাবলাম অফিসে শুকনো hamburger দিয়ে লাঞ্চ সারবো। হঠাৎ এক বন্ধু এসে বলে ‘দোস্ত চল তরে কাচ্চি বিরিয়ানি খাওয়ামু’।

‘সেবাদান’ করার ক্ষেত্রে মানবপ্রাণী দয়ালের উপলক্ষ বা ‘উছিলা’—আহার বা ‘রিজিক’ সম্পূর্ণ প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে। কীভাবে তা ‘খাদ্যভক্ষণ’ হয়ে উঠলো ও আমরা এই ‘খাই খাই’ স্বভাবের সংস্কৃতিতে উত্তীর্ণ হলাম, তা আমাদের লোভ আর ‘পেটুক’ ভ্রষ্টাচারের কারণেই। খাদ্য সংক্রান্ত বিষয়ে সমাজের এই ভয়াবহ রূপ এখন খুবই পরিষ্কার ও বিস্তৃত। সবকিছুই আমরা ‘খাইয়্যা ফালাইতে চাই’। অন্য মানবপ্রাণীর ধনসম্পদ থেকে শুরু করে চাকরি, সম্মান, সম্পত্তি, আকাঙ্ক্ষা, এমনকি পরের নারীর ওপরও আমাদের ‘নজর পড়ে’।

এসব পুরনো পাপের শাস্তি কি করোনা আমাদের দিচ্ছে? নাকি যারা এই পাপকে যুগ যুগ ধরে মানববিধ্বংসী ব্যবসা/ধান্দা করে সমগ্র বিশ্বে লুটপাটের, মুনাফার স্বর্গরাজ্য গড়েছেন—তাদের সাজার যৌথভাবে আমরাও অংশীদার?

খাদ্যকে যেদিন আমরা অস্ত্রকরণ করে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করি, সেদিনই দয়াল সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে শুরু হলো আমাদের বেইমানি, আমাদের বিশ্বাসঘাতকতা, যার জন্য মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্য কোনও শাস্তি অকল্পনীয়। সেই মৃত্যুদণ্ডই কি এখন আস্তে-ধীরে কার্যকর হচ্ছে? 

হতেও পারে। 

এই করোনার সময়ে বহু ভালো ও অগণিত গুণী মানুষ মারা গেছেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে সবাই চুপ করে সমাজের কিছু ভয়ংকর খারাপ মানুষ—বিশেষত যারা গরিবের ধনসম্পদ লুট করেছে, তাদের নির্বিচারে হত্যা, গুম করেছে, তাদের হক মেরেছে, সেসব ঘৃণ্য লোকের ভয়াল করোনামৃত্যুর খবরে আমরা মনে মনে কি ‘আনন্দ’ অনুভব করেছি? 

একজনের মৃত্যু ‘দুঃখজনক’ হলেও অধিক মৃত্যু কিছু সংখ্যার পরিসংখ্যান মাত্র—এ কি আমাদের চলমান বাস্তবতা? একসঙ্গে এত মৃত্যু দেখতে দেখতে আমাদের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো কি একেবারে ভোঁতা হয়ে গেছে?

ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবার পর আমরা যেমন আনন্দ ও স্বস্তি অনুভব করেছিলাম— একইভাবে অর্থের দাপটে থাকা কিছু ক্ষমতাবান লোকের করোনা মৃত্যুতে, প্রার্থনার সময় দয়ালের কাছে শুকরিয়া আদায় করেছি। এই কৃতজ্ঞতার কারণ? মানবপ্রাণী দ্বারা সব বিচার সম্ভব না। কিছু বিচারের দায়িত্ব প্রকৃতি নিজেই নিয়ে নেয়— যাকে বলা হয় natural justice. 

বেঁচে থাকার যুদ্ধে ফেরত আসা যাক: 

আত্মরক্ষার জন্য এই যুদ্ধে যে-পথ আমরা অনুসরণ করছি তাও রীতিমতো ‘সৌভাগ্য’ বটে। হেলমেট পরে অস্ত্র হাতে লড়াই করতে হচ্ছে না, কিংবা বাংকারে লুকিয়ে গুলিবর্ষণ থেকে বাঁচতে হচ্ছে না। আমাদের মাস্ক আমাদের হেলমেট ও আমাদের নিজ গৃহ শক্তিশালী একেকটা দুর্গ। এই অবধি যুদ্ধটা নিঃসন্দেহে খুব শান্তিপূর্ণভাবে এগোচ্ছে, কিন্তু শঙ্কা রয়েই গেলো। মানবপ্রাণী কি সক্রিয় ‘টাইমবোমা’র ওপরে বসে আছে? 

করোনাকেন্দ্রিক যেকোনও তুচ্ছ ঘটনা জাত-বিজাতে সমরাস্ত্রের সজ্জিত ঝনঝনানিকর খুনখারাবি যেকোনও সময় ঘটে যেতে পারে। ভ্যাকসিন-রাজনীতি ও ধনী দেশগুলোর দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর দিকে নিকুচি, তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও ‘দয়ার’ দৃষ্টিতে দেখার প্রবণতা তার সাক্ষ্য রাখে। এর ওপরে ‘মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘা’ দেখা যাচ্ছে গণতন্ত্রের হত্যা ও বিশ্বজুড়ে একতন্ত্রী শাসকদের ক্রমশ উত্থান। 

ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি ও সংঘাত, স্বজাতিকতা, উগ্র জাতীয়তাবাদ, শ্রেণিগত বিদ্বেষ, দুর্নীতি, পিতৃতন্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে মানসিক সংকীর্ণতা এসব নিয়ে প্রতিনিয়ত খবর আসছে। কিন্তু বলা হচ্ছে সবকিছুর ফয়সালা হবে ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবার পর’। এই অজুহাত, এই চতুরতা আর কতদিন চলবে? পরিস্থিতি যে আদৌ স্বাভাবিক হবে তার কোনও নিশ্চয়তা কেউ কি এই অবধি দিয়েছে? 

‘লকডাউন’-এর বিপরীত শব্দ হলো ‘লকডইন’— আমরা স্বেচ্ছায় কবুতরের খোপতুল্য গৃহে গৃহবন্দি। বিশ্বের যেকোনও রাষ্ট্র, যেকোনও সরকারের জন্য সম্ভাব্য জনরোষ ঠেকানোর এরচেয়ে সুন্দর কৌশল আর কী হতে পারে?

শত্রু যদি আমাদের নির্মূল করতে চায়, তাকে কোনও বেগ পেতে হবে না, কষ্ট করতেও হবে না। গৃহবন্দি অবস্থায় আমরা সবাই sitting duck, শিকারিদের অত্যন্ত প্রিয় দৃশ্যবিবরণী—‘এক গুলিতেই কয়েকটা পাখি শেষ’। এই ভাগ্যও কি আমাদের বরণ করে নিতে হবে নিঃশব্দে? 

পালাবো কোথায় যখন পালানোর কোনও পথ খোলা নেই, যখন তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের অবস্থান, আমাদের ঠিকানা রাষ্ট্র কেবল নয়—যেকোনও মামুলি তৃতীয় বা চতুর্থ পক্ষ সেকেন্ডে-সেকেন্ডে অনুসরণ করতে পারে?

পালাবো কোথায়, যখন এক দেশ থেকে আরেক দেশ তো দূরের কথা, নিজের দেশেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাতায়াতে আছে হাজার রকমের নিষেধাজ্ঞা? আমরা আসলেই trapped! এই ফাঁদ থেকে ছোটখাটো ক্ষত নিয়ে যেন মুক্তি পেতে পারি, এই আশা করা ছাড়া আপাতত কিছুই করার নেই। 

মানবমুক্তির দিন তবে এখনও ফুরিয়ে যায়নি। করোনাকালীন এই নিপীড়নমূলক new world order যদি চলতে থাকে, বিশ্বব্যাপী জনরোষ ও বিদ্রোহ যে ঘটবে তা অবধারিত। আশা করছি, যারা আমাদের ভাগ্যের নেপথ্যের নিয়ন্ত্রক তাদের মস্তিষ্কে সুবুদ্ধিসহ হিতাহিত জ্ঞানের উদয় হোক।

তা না হলে বিশ্বব্যাপী মানবপ্রাণীর রোষানল নির্ঘাত আমাদের পারমাণবিক ‘তৃতীয় মহাযুদ্ধের’ দিকে ঠেলে দেবে। সেই যুদ্ধে কেউ জয়ী হবে, বা ‘বীরের বেশে’ বাড়ি ফিরবে, ও আমরা তাদের পুষ্পমাল্য দিয়ে অভিবাদন জানাব, সেই ‘রোমান্টিক’ সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।

ভুলতে নেই—পারমাণবিক যুদ্ধের মহাপ্রলয়ের পরবর্তী সময়ে পরাজয়ের গ্লানি—অন্য কেউ না: তা ভোগ করবে কেবল মানবপ্রাণী, যদি ‘মানুষ’ নামের এই অতি অদ্ভুত প্রাণীর একটিও বেঁচে থাকে। 

থাকবে তো?

লেখক: সংগীতশিল্পী

 
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সম্পর্কিত

করোনার করুণ কাহিনি: নজরুল, রবি, হিলসা ও কাকলি

করোনার করুণ কাহিনি: নজরুল, রবি, হিলসা ও কাকলি

করোনার করুণ কাহিনি: বাঁচতে হলে জানতে হবে ও সচেতন-অসচেতনতা

করোনার করুণ কাহিনি: বাঁচতে হলে জানতে হবে ও সচেতন-অসচেতনতা

করোনার করুণ কাহিনি: টুকলিফাই ঈদ ও ট্রেন্ডি মৃত্যু আতঙ্ক

করোনার করুণ কাহিনি: টুকলিফাই ঈদ ও ট্রেন্ডি মৃত্যু আতঙ্ক

করোনার করুণ কাহিনি: গানের শিল্পীরা কেমন আছেন?

করোনার করুণ কাহিনি: গানের শিল্পীরা কেমন আছেন?

করোনার করুণ কাহিনি: সেক্যুলার ফতোয়া ও মৃত্যুর শ্রেণিবিন্যাস

করোনার করুণ কাহিনি: সেক্যুলার ফতোয়া ও মৃত্যুর শ্রেণিবিন্যাস

করোনার করুণ কাহিনি: হুকুমের দাস ও মানসিক দাসত্ব

করোনার করুণ কাহিনি: হুকুমের দাস ও মানসিক দাসত্ব

করোনার করুণ কাহিনি: মৃত্যু ও কুরুচির মহাপ্লাবন

করোনার করুণ কাহিনি: মৃত্যু ও কুরুচির মহাপ্লাবন

সর্বশেষ

সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত কানাডার সেই হামলাকারী

সন্ত্রাসবাদে অভিযুক্ত কানাডার সেই হামলাকারী

গোল মিসের মহড়ায় পয়েন্ট হারালো স্পেন

গোল মিসের মহড়ায় পয়েন্ট হারালো স্পেন

ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ঝুঁকি,  যুক্তরাজ্যে লকডাউন প্রত্যাহার হবে দেরিতে

ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের ঝুঁকি, যুক্তরাজ্যে লকডাউন প্রত্যাহার হবে দেরিতে

অবশেষে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ‘তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন’

পরীমণিকে ধর্ষণ-হত্যাচেষ্টাঅবশেষে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ‘তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন’

ইয়াবা-স্বর্ণ ও টাকাসহ তিন রোহিঙ্গা গ্রেফতার

ইয়াবা-স্বর্ণ ও টাকাসহ তিন রোহিঙ্গা গ্রেফতার

বায়ু শক্তিকে উদযাপনের দিন আজ

অপার সম্ভাবনায় গুরুত্ব কমবায়ু শক্তিকে উদযাপনের দিন আজ

স্পর্শকাতর সিদ্ধান্তের মুখে ইসরায়েলের নতুন সরকার

স্পর্শকাতর সিদ্ধান্তের মুখে ইসরায়েলের নতুন সরকার

৩২ লাখ টাকা সহায়তা পেলেন মোংলা বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা

৩২ লাখ টাকা সহায়তা পেলেন মোংলা বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা

ইউরোর ৬১ বছরের ইতিহাস পাল্টে দিলেন পোলিশ গোলকিপার

ইউরোর ৬১ বছরের ইতিহাস পাল্টে দিলেন পোলিশ গোলকিপার

মতিঝিলে ছিনতাই চক্রের দুই সদস্য গ্রেফতার

মতিঝিলে ছিনতাই চক্রের দুই সদস্য গ্রেফতার

সম্মুখ সারির যোদ্ধাদের কাজী এন্টারপ্রাইজ’র সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ

করোনা মোকাবিলাসম্মুখ সারির যোদ্ধাদের কাজী এন্টারপ্রাইজ’র সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ

একসঙ্গে চার মেয়ে সন্তানের জন্ম

একসঙ্গে চার মেয়ে সন্তানের জন্ম

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune