X
মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

জলাবদ্ধ চট্টগ্রাম নগরবাসী

আপডেট : ০৮ জুন ২০২১, ১৮:৩৯

আনিস আলমগীর একটুখানি বৃষ্টি হলে তলিয়ে যায় চট্টগ্রাম শহরের অনেক জায়গা, জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় প্রায় নগরজুড়ে। মেয়ররা তখন নানা মেগা প্রকল্পের গল্প বলেন। সেসব বাস্তবায়ন হলে নাকি জলাবদ্ধতা থাকবে না। কিন্তু বছরের পর বছর যায়, জলাবদ্ধতা যায় না। প্রকল্পও শেষ হয় না। বরং চলমান প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। আর ৫ বছর পর জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে মেয়র প্রার্থীরা ভোট চান। অবশ্য ইদানীং আর ভোট চাওয়ারও দরকার হচ্ছে না। কে জিতবে আগেই জানা যাচ্ছে।

একসময় চাকতাই খাল চট্টগ্রামের দুঃখ শিরোনামে রিপোর্ট প্রকাশিত হতো প্রায় সব দৈনিকে। দুঃখ এখন আর চাকতাই কেন্দ্রিক নেই। চট্টগ্রাম শহরের বিশাল বিশাল জলাধার ভরাট করে আবাসিক এলাকা করা হয়েছে। ডজন ডজন পাহাড় কেটে সড়ক বানানো হয়েছে। শহরে নালার ওপর বিশ্ববিদ্যালয় আর অপরিকল্পিত মার্কেট তৈরি করা হয়েছে। খালগুলো দখল করে সরকারি অফিস বানানো হয়েছে। সবই করেছেন নগর কর্তারা। কিন্তু বৃষ্টি আর জলাবদ্ধতা হলে তারা নিরীহ জনগণের ওপর আঙুল তুলে বলছেন, ওরা চিপসের প্যাকেট আর পলিথিন ফেলে এ অবস্থা করেছে।

জলাবদ্ধতার প্রতিশ্রুতিটা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে যেমনটা বড় ইস্যু, দেশের অন্য কোথাও তেমনটা নেই। বিগত সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন জলাবদ্ধতা ইস্যুটিকে সামনে এনে তাদের নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেছিলেন। ঢাকা থেকে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জন্য একদল তারকা ক্যাম্পেইন করতে গিয়ে চট্টগ্রামের রাস্তাঘাটকে ইউরোপের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। এখন যখন বৃষ্টিতে কোমর পরিমাণ পানি তখন এসব তারকার বক্তব্য নিয়ে ট্রল হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর আমল থেকে সর্বশেষ মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী পর্যন্ত প্রায় তিন দশক ধরে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়টি ইস্যু হিসেবে আছে। আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত প্রয়াত মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী ১৭ বছর, বিএনপি থেকে নির্বাচিত এম মনজুর আলম ৫ বছর, আবার আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ৫ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের ২৭ বছরে চাকতাই খাল খনন, তলা পাকাকরণ প্রকল্প থেকে শুরু করে জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত নানা প্রকল্পে শত শত কোটি টাকা খরচ হয়েছে। অনেকের পকেট ভরেছে। কিন্তু এর সুফল নগরবাসী পায়নি।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বাস্তবায়নাধীন মেগা প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা। প্রকল্পটির কাজ চলছে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়ে ২০২০ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল প্রকল্পটির কাজ। এরপরও কাজ শেষ না হওয়ায় এক বছর সময় বাড়িয়ে ২০২১ সাল পর্যন্ত করা হয় প্রকল্পের মেয়াদ। বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ না হওয়ায় আরও দুই বছর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। বলা যায় না এরমধ্যে প্রকল্প ব্যয় আরও কত বাড়বে।

টেলিভিশনের খবরে দেখলাম আগ্রাবাদের মা ও শিশু হাসপাতালের অভ্যন্তরে পানি ঢুকেছে হাঁটু পরিমাণ। চিকিৎসা নেবে কী! মানুষ নিজেই নর্দমার পানির সংস্পর্শে এসে সেখানে অসুস্থ হচ্ছে। এই দৃশ্য চোখে না দেখলে বোঝানো কঠিন।

অথচ কী অসাধারণ একটি শহর চট্টগ্রাম! বলা হতো প্রাচ্যের রানি। পাহাড়, সমতল, নদী, সমুদ্র মিলে একাকার। পৃথিবীতে এমন কম্বিনেশনের শহর মনে হয় আর একটি কী দুটি আছে। অথচ চট্টগ্রামের সঙ্গে জলাবদ্ধতার সম্পর্ক এমন হয়েছে যে, বর্ষা এলে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। পানি কবে নামবে সে প্রহর গুনতে হয় তাদের। একদিকে জোয়ারের পানি, আরেকদিকে বৃষ্টির পানি- দুটি মিলে নগরজীবনের নাভিশ্বাস।

নগরীর আগ্রাবাদ, সিডিএ আবাসিক এলাকা, হালিশহর, গোসাইলডাঙ্গা, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ষোলশহর, জিইসি মোড়, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় একটু বৃষ্টিতে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি ওঠে। দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ চাকতাই এলাকার ব্যবসায়ীদের জন্য বর্ষা মৌসুম এক অভিশাপের নাম। আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা, বাকলিয়া মৌসুমি আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা বর্ষায় জলাবদ্ধতার সঙ্গে যুদ্ধ করেই মৌসুম পার করেন। জলাবদ্ধতা প্রকল্পের আওতায় অনেক স্থানে নালা-নর্দমার কাজ চলছে। নির্মাণকাজের কারণে নালায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়ে বিভিন্ন স্থানে সড়কে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

সর্বশেষ রবিবারের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকা। হাঁটু থেকে বুক-সমান পানি উঠেছে বিভিন্ন স্থানে। বৃষ্টির সঙ্গে বজ্রপাতে বেড়েছে আতঙ্ক। বৃষ্টির কারণে পাহাড় ধসের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। অনেকে বলছেন, নালা ও খালে প্রতিবন্ধকতা থাকায় এই জলাবদ্ধতা।

পত্রিকায় দেখলাম মেগা প্রকল্পের কাজের জন্য খালের মুখে যে বাঁধ দেওয়া হয়েছে সেগুলো অপসারণ না করলে চট্টগ্রাম নগরীতে বুক-সমান পানি হবে বলে ৩ জুন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, খালে বাঁধ ও স্লুইসগেটের (রেগুলেটর) কাজ শেষ না হওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, বাঁধের কারণে বৃষ্টি হলে খালে পানি নামতে পারে না। আর জোয়ারের কারণে সাগরের পানি যা প্রবেশ করে তাও বন্ধ করতে পারে না।

বাঁধগুলো সরছে না কেন! চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মেগা প্রকল্পের মাত্র ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। যতদিন পর্যন্ত স্লুইসগেট নির্মাণ ও মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ হবে না ততদিন জলাবদ্ধতা থাকবেই। বৃষ্টি মৌসুমে বিশেষ করে মে থেকে জুলাই খালে কাজ না করে অন্যত্র কাজ করলে খালের প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে পানি চলাচলের ব্যবস্থা হতো। কিন্তু ভরা মৌসুমেও রেগুলেটর তৈরির কাজ শেষ না হওয়ায় জোয়ারের পানি প্রবেশ করছে, আবার বৃষ্টির পানি সরতে পারছে না।

সিডিএ বলছে, মেগা প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নকারী সংস্থা সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে খালের মধ্যে যে বাঁধ দেওয়া হয়েছে সেগুলো খুলে দেওয়ার জন্য। এছাড়া পানি দ্রুত নামার জন্য ড্রেন ও নালা দ্রুত পরিষ্কার করতে বলা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে সব বাঁধ খুলে দেওয়ার জন্য ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে সেনাবাহিনী।

দেখা যাক, সিডিএ’র কথা কতটুকু বাস্তবায়িত হয় আর চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা যেতে নগরবাসীকে আরও কত বছর অপেক্ষা করতে হয়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত। 

[email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

দায় এড়াতে পারবে না নতুন তালেবান

দায় এড়াতে পারবে না নতুন তালেবান

ই-কমার্স প্রতারণা থামানোর উপায়

ই-কমার্স প্রতারণা থামানোর উপায়

জিয়ার কবর নিয়ে রাজনীতি

জিয়ার কবর নিয়ে রাজনীতি

তালেবানের আফগান দখলে পাকিস্তানের লাভ-ক্ষতি

তালেবানের আফগান দখলে পাকিস্তানের লাভ-ক্ষতি

শিক্ষকতা কেন ‘ঘটনাক্রমে’ পেশা?

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:৪৪

উমর ফারুক কেএফসি’র প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল হারল্যান্ড ডেভিড স্ট্যান্ডার্সের শীর্ষে ওঠার গল্পটা আমরা জানি। একজন চা বিক্রেতার বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার গল্পটা আমরা জানি। একজন তামাক ও দাস ব্যবসায়ীর বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের জাতির জনক হয়ে ওঠার গল্পটা আমরা জানি। হকার থেকে ধনী হয়ে ওঠা ওয়ারেন বাফেটের জীবনগল্পটা আমরা জানি। টুঙ্গিপাড়ার একজন খোকা বাবুর বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার গল্পটাও আমরা সবাই জানি। এগুলো নিশ্চিতভাবে সংগ্রামের গল্প, ঘটনাক্রমে ঘটে যাওয়া কোনও গল্প নয়।

একই সঙ্গে রাতারাতি ধনী হয়ে ওঠা অসংখ্য মানুষের গল্প আমাদের জানা। একজন ব্যবসায়ীর কোনও রকম রাজনৈতিক চর্চা ছাড়াই রাতারাতি জনপ্রতিনিধি হয়ে ওঠার গল্পটাও আমাদের জানা। সুযোগ বুঝে অনেকের মন্ত্রী হয়ে ওঠার গল্পটাও আমাদের অজানা নয়।

ঘটনাক্রমে ঘটে যাওয়া কদাচিৎ ঘটনা ছাড়া প্রায় সবটাই অপ্রত্যাশিত, অনভিপ্রেত ও নিন্দনীয়। এসব ঘটনা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কোনও সুফল বয়ে আনে না। একজন ব্যবসায়ী যদি রাতারাতি, ঘটনাক্রমে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠেন তাহলে তা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। একজন ডাক্তার যদি ঘটনাক্রমে ডাক্তারি পেশা বেছে নেন তাহলে তা স্বাস্থ্যসেবার জন্য ক্ষতিকর। একজন ইঞ্জিনিয়ার যদি ঘটনাক্রমে তার পেশা বেছে নিয়ে থাকেন তাহলেও তা ক্ষতিকর। একজন বিসিএস ক্যাডার যদি ঘটনাক্রমে পছন্দের তলানি থেকে তার শিক্ষকতা পেশা পেয়ে থাকেন তাহলেও তা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর যখন একজন শিক্ষক ঘটনাক্রমে ‘শিক্ষক’ হয়ে উঠছেন। শিক্ষকতা কোনও পেশা নয়, ব্রত। আর দশটি সাধারণ ব্রতর মতো নয়, একটি অনন্য ব্রত। রাষ্ট্র তাকে যথাযথ সম্মান দেবে না, সমাজ তাকে যথাযথ সম্মান দেবে না, তাকে বিনা বেতনে চাকরি করতে হবে, তাকে এমপিওভুক্তির জন্য লড়তে হবে, তাকে অভাবের সঙ্গে লড়তে হবে, এটা জেনেও তিনি শিক্ষকতাকে ব্রত হিসেবে বেছে নেবেন, এবং সেই ব্রত যথাযথভাবে পালন করে যাবেন, এজন্যই এর নাম শিক্ষকতা! কথাটায় যুক্তি যত কম, হাস্যকরও তত বেশি।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে একটা বড় অংশ ঘটনাচক্রে শিক্ষক। যারা হয়তো অন্য কোনও পেশায় না গিয়ে এই পেশায় এসেছেন। তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন। একই অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রভাবশালীদের তদবিরে শিক্ষক নিয়োগ হয়। যোগ্যতা এখানে মূল ব্যাপার নয়। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে যারা, তারা ছাত্রনেতাদের কথায় ওঠেন-বসেন।

এই দুটো উদ্ধৃতি থেকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মোটাদাগে কয়েকটা সমস্যা চিহ্নিত হয়। এক. ঘটনাক্রমে শিক্ষক। দুই. শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। তিন. প্রভাবশালীদের তদবিরে শিক্ষক নিয়োগ হয়। চার. শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা মূল বিষয় নয়। পাঁচ. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রনেতারা ছড়ি ঘোরান। ছয়. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানরা ছাত্রনেতাদের কথায় ওঠেন ও বসেন।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে দুই মন্ত্রী সাম্প্রতিক এমন মন্তব্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভাবতে অবাক লাগছে, এই দীর্ঘ পথচলায় আজও আমরা শিক্ষাকে ‘ঘটনাক্রমে শিক্ষক’ লজ্জামুক্ত করতে পারলাম না। আজও  আমরা প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ব্যবস্থা করতে পারলাম না। শিক্ষক নিয়োগকে তদবিরমুক্ত করতে পারলাম না! এমন ছাত্রনেতা নির্বাচন করতে পারলাম না, যারা প্রতিষ্ঠান প্রধানকে ওঠাবেন না, বসাবেন না। এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানও নিয়োগ দিতে পারলাম না, যারা ছাত্রনেতাদের কথায় উঠবেন না, বসবেন না।

এখন প্রশ্ন জাগছে, এই ব্যর্থতা কার? রাষ্ট্রের, নাকি শিক্ষকদের? ব্যর্থতার দায় নিয়ে যদি বিতর্কে না জড়াই তাহলে দুই মন্ত্রীর এমন মন্তব্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য নতুন আলোর সূচনা করতে পারে। কারণ, এই প্রথম আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল সংকটকে চিহ্নিত করতে পেরেছি। সমস্যা চিহ্নিত করতে পেরেছি। সমস্যা স্বীকার করে নিয়েছি। ফলে আন্তরিকতা থাকলে এখন শিক্ষা ব্যবস্থাকে সংকটমুক্ত করা সম্ভব। মূলত এই মন্তব্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের মুক্তির এক দুরন্ত সম্ভাবনা।

শিক্ষার মান বিশ্লেষণ বলছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের শিক্ষার মান ২ দশমিক ৮ শতাংশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় শিক্ষার মান ২০ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানের শিক্ষার মান ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু কেন আমাদের শিক্ষার মানের এই বেহাল দশা? তাহলে কি ঘটনাক্রমে শিক্ষকদের জন্যই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এই ভয়াবহতা নেমে এসেছে? কিন্তু কেন শিক্ষকতা আমাদের দেশে পছন্দ না হয়ে ঘটনাক্রমে ঘটে যাওয়া পেশা হলো?

উন্নত দেশের শিক্ষকদের সঙ্গে আমাদের শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য কতটা?

ক’বছর আগেও আমাদের দেশে শিক্ষকতা পেশার জন্য প্রকাশ্য ঘুষ প্রচলন ছিল। সবাই জানতো কিন্তু কেউ কিছু বলতো না। এর নাম ছিল অনুদান। ক’টাকা প্রতিষ্ঠানের খাতে জমা হতো, বাকিটা হতো ভাগবাটোয়ারা। তখন কয়েক লক্ষ টাকা ও একটি ফোনে জুটে যেত শিক্ষকতা পেশা। যাদের কোনও চাকরি হয়নি, বয়স শেষ অথবা প্রায় শেষ– তিনি নেতাদের ধরে কিছু টাকা অনুদান দিয়ে এলাকার স্কুল অথবা কলেজে শিক্ষকতায় যোগদান করতেন।

কী নির্মম একটা গল্প! অপেক্ষাকৃত কম মেধার ও কখনও কখনও বখাটে, সন্ত্রাসীদের হাতে আমরা তুলে দিতাম আমাদের প্রজন্ম বিনির্মাণের দায়িত্ব। একবার ভাবুন তো, একটি শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের জন্য কি আর কোনও পদক্ষেপ দরকার আছে? এখন এই সুযোগ কমেছে। সময়টা এখন খানিকটা বদলে গেছে। এখন নিয়োগ হয় এনটিআরসি’র মাধ্যমে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য কিছু ক্ষেত্র এখনও অযোগ্য শিক্ষকদের নিয়োগের দ্বার পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে শিক্ষকতা পছন্দের পেশা নয়, বরং ঘটনাক্রমে পেশা। সাধারণত কেউ এই পেশায় আসতে চান না। সে জন্য একসময় আমরা সবচেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন অনেক মানুষকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিয়োগ দিয়েছি। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টো। কিন্তু কেন কেউ শিক্ষকতা পেশায় আসতে চান না? খুব সোজাসাপ্টা কথা হলো, এই পেশায় আর্থিক সুযোগ-সুবিধা অত্যন্ত কম। কম মানে শুধু কম নয়, অতি নগণ্য। আমরা এক দুর্ভাগা জাতি, এজন্যই হয়তো শিক্ষকতা পেশার জন্য বরাদ্দ রেখেছি সর্বনিম্ন।

পেশাগত ক্ষেত্রে আমাদের সর্বোচ্চ বরাদ্দ ক্যাডার পেশায়। তাও আবার সব ক্যাডারে নয়, কয়েকটি পেশায়। যেখানেও শিক্ষকতা পেশা অবহেলিত। ফলে প্রতিদিন মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, যা আমাদের পুরো রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থাকে এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

গবেষণা বলছে, আমাদের ৬৬ শতাংশ স্নাতক পাস মানুষ কর্মহীন। এটা দুঃখজনক। যদি আমরা মেধাবী প্রজন্ম তৈরি করতে চাই, যদি আমরা শুধু মেধাবী বিসিএস ক্যাডারও তৈরি করতে চাই, যদি শিক্ষকতাকে পছন্দের তালিকায় আনতে চাই, তবে সবার আগে এই পেশার সামাজিক ও আর্থিক মর্যাদা বাড়াতে হবে। নানান সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে এই পেশাকে গুরুত্বপূর্ণ, লোভনীয় ও গ্রহণযোগ্য করার দায়িত্ব রাষ্ট্ররই। একই সঙ্গে শিক্ষকতা পেশা নির্বাচনকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। তাহলেই প্রথম পছন্দ হিসেবে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় সম্পৃক্ত হবে। তখন আর কেউ ঘটনাক্রমে শিক্ষক হবে না। শেষ পছন্দ হিসেবে শিক্ষকতাকে বেছে নেনে না। বেছে নেবেন প্রথম পছন্দ হিসেবে। তাহলেই বাড়বে শিক্ষকের মান, বাড়বে শিক্ষার মান। মুক্তি পাবে আমাদের শিক্ষা।

লেখক: শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।  

ই-মেইল: [email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

কেন বাংলাদেশ উগ্রবাদের ভূখণ্ড হবে না?

কেন বাংলাদেশ উগ্রবাদের ভূখণ্ড হবে না?

বাবা’রা এমন কেন হয়!

বাবা’রা এমন কেন হয়!

অভিভাবকের আয় আনুপাতিক শিক্ষাব্যয় নির্ধারণ কি সম্ভব?

অভিভাবকের আয় আনুপাতিক শিক্ষাব্যয় নির্ধারণ কি সম্ভব?

বিসিএস, বিসিএস এবং বিসিএস

বিসিএস, বিসিএস এবং বিসিএস

কোভিড-১৯ ও বাংলাদেশের ‘রহস্যময়’ প্রত্যাবর্তন

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:২৫

ডা. মালিহা মান্নান আহমেদ কোভিড-১৯ সামাল দেওয়া নিয়ে আমরা যতটা না ভয় পেয়েছিলাম, বাংলাদেশ তারচেয়ে বেশ ভালোভাবেই এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। মোটামুটি একটা বড় জনগোষ্ঠী টিকার আওতায় না আসা পর্যন্ত নতুন ভ্যারিয়েন্ট ও ব্রেকথ্রু কেইস (টিকা দেওয়ার পরও আক্রান্ত হওয়া)-এর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইটা চলবে। তবে এখন পর্যন্ত গত ১৯ মাসে আমরা যেহেতু তৃতীয় ঢেউ ও তৃতীয় লকডাউনের ধাক্কা সামলে উঠতে পেরেছি সেটার সাপেক্ষে এখন একটি পর্যালোচনামূলক গবেষণা করা জরুরি। কী কী পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে আমরা একটি মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে পেরেছি, সেটা বুঝতে পারলে আমরা আমাদের সক্ষমতা সম্পর্কে বুঝতে পারবো। ‘কোভিড ১৯ ইন সাউথ এশিয়া’ শীর্ষক ব্রাউন ইউনিভার্সিটির একটি প্যানেল আলোচনায় পর্যবেক্ষণটি উপস্থাপন করেছিলেন ভারতীয় প্রতিনিধি বরখা দত্ত ও শ্রীলঙ্কা থেকে আসা ড. পি. সারাভানামুত্তু।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৫ লাখ ৪০ হাজার কোভিড আক্রান্তের ৯৭ দশমিক ২ শতাংশই সেরে উঠেছে। আমাদের মৃত্যুর হারও এখন ১ দশমিক ৭৬ ভাগে রয়েছে। নিঃসন্দেহে আক্রান্তের আসল সংখ্যাটা আরও বেশি হবে— সেটা হতে পারে পরীক্ষার সংখ্যা কম ছিল কিংবা অনেকেই উপসর্গহীন ছিলেন। তার মানে, আমাদের সত্যিকার মৃত্যুর হারও আরও কম?

এমনটা হতে পারে, আবার না-ও পারে। কেননা, কোভিডের মতো উপসর্গ নিয়েও অনেকের মৃত্যু হয়েছে। যেমন, সাতক্ষীরার কথা বলা যায়। সেখানে একপর্যায়ে কোভিডের মতো উপসর্গ নিয়ে ৪৪৬ জনের মৃত্যুর খবর বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা গেলো তাদের মধ্যে কোভিড-১৯ ছিল ৮০ জনের।

ভবিষ্যতের রেফারেন্সের খাতিরে এমন শ্রেণি করে হিসাব রাখলেই ভালো হতো- কোভিড সন্দেহে মৃত্যু, নিশ্চিত কোভিড, লং-কোভিড ও কোভিড-পরবর্তী জটিলতায় মৃত্যু। যাবতীয় বিতর্কের পরও ২০২০ সালে বাংলাদেশের মোট মৃত্যুর হার ছিল ৫.৫৪১। যার মানে হলো প্রতি হাজারে সাড়ে পাঁচ জন মারা গিয়েছিল। ২০১৯ সালেও সংখ্যাটা ছিল ৫.৫৪৫ জন। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে এ সংখ্যাটা ছিল সন্তোষজনক।

ঠিক কোন জিনিসটা এখানে কাজে এসেছে? ২০২০ সালে সবার জন্য এটুআই-তে কাজ করার সুবাদে আমি একটা বিষয় জানি যে আমাদের কোভিড সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো অন্য দেশের মহামারি নিয়ন্ত্রণের সফল কৌশল, লোকজনের চলাফেরা, সম্পদের স্মার্ট ব্যবহার ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে নেওয়া বিজ্ঞানসম্মত মতামতের ওপর ভিত্তি করেই নেওয়া। এটা সরকার, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর এমন এক সমন্বিত প্রচেষ্টা, যা প্রতিটি সময়ই পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে সহায়তা করেছে। তেমনই কিছু সিদ্ধান্তের কথা এখানে বলবো। আর এসব তথ্য থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়ভারটা আপাতত পাঠকের হাতেই ছেড়ে দিচ্ছি।

তিনটি ঢেউ ও তিনটি লকডাউন

এ নিয়ে কোনও বিতর্কের অবকাশ নেই যে লকডাউনই সংক্রমণের চেইনটা ভাঙতে পেরেছিল। যেসব নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো অন্য সব দেশের সঙ্গে ছিল সঙ্গতিপূর্ণ—জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস, কারখানা বন্ধ রাখা, জেলার ভেতর ও আন্তজেলার পরিবহন বন্ধ রাখা, ফ্লাইট বাতিল করা ইত্যাদি।

বিদেশ ফেরত আক্রান্তদের কারণে সৃষ্ট প্রথম ঢেউয়ের সময় পজিটিভ টেস্টের হার ছিল গড়পড়তায় ২৩ শতাংশ। আর সাধারণ লকডাউন তখনই তুলে দেওয়া হয়েছিল, যখন ছোটখাটো অনেক নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে কোভিডের হটস্পটগুলোর ম্যাপিং করা সম্ভব হয়েছিল। ওই সময়কার তুলনামূলক ভালো তিনটি মাসের বলয়টা ভেঙে গিয়েছিল ২০২১ সালের মার্চে—বেটা ভ্যারিয়েন্টের আগমনে। ওই সময় যখন আবার শনাক্তের হার ১৮ শতাংশর কাছাকাছি চলে এলো তখনই আরোপ করা হলো দ্বিতীয় লকডাউন। এরপর খুব তাড়াতাড়িই সীমান্ত এলাকাগুলোতে ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়লে তৃতীয়বারের মতো লকডাউন দেওয়া হয়। তখন রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগের ১৫টি ‘রেড জোন’ জেলা থেকে ঢাকাকে রক্ষা করাই ছিল বড় লক্ষ্য।

তৃতীয় লকডাউনের ৪২ দিনেই ৪ লাখ ৬৫ হাজার ১৮৩ নতুন শনাক্ত হয়, যখন কিনা ২০২০ সালের প্রথম ছয় মাসে শনাক্ত ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার। এ সংখ্যা ও ২৮-৩১ শতাংশ শনাক্তের হার—দুটোই ইয়েল ইউনিভার্সিটির প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলে যায়, যাতে বলা হয়েছিল অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ডেলটায় আক্রান্ত এক ব্যক্তি গড়ে সাড়ে তিন থেকে চার জনকে আক্রান্ত করছে। আগের সার্স কভ-২ ভ্যারিয়েন্টের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা ছিল ২ দশমিক ৫ জন।

স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বেড়েছে

২০২০ সালের এপ্রিলে যেখানে গোটা দেশের জন্য ঢাকায় মাত্র ৫টি টেস্ট সেন্টার ছিল, সেখানে এখন দেশজুড়ে আছে ৮০০টি। মোট পরীক্ষা কেন্দ্রের মধ্যে ৯০ শতাংশই এখন আরটি-পিসিআর। আর ১৪০টি আরটি-পিসিআরের মধ্যে ৮৬টি পরীক্ষা কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারিভাবে। ৫৪৫টি র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন ও ৫১টি জিন এক্সপার্ট টেস্ট সেন্টারে বিনামূল্যে পরীক্ষার সুযোগ দিয়েছে সরকার। সরকারি কেন্দ্রগুলোতে আরটি-পিসিআর পরীক্ষায় লাগছে জনপ্রতি ১০০ টাকা, দরিদ্রদের জন্য তা আবার বিনামূল্যে। বেসরকারি কেন্দ্রগুলোতে খরচ হচ্ছে ৩০০০-৪৫০০ টাকা পর্যন্ত। গত বছরেই আমদানি করা আরটি-পিসিআর টেস্ট কিটের দাম ৩০০০ থেকে কমে ৮০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট ৯৪ লাখ পরীক্ষা করা হয়েছে, যার ৭৪ শতাংশই হয়েছে সরকারি কেন্দ্রগুলোতে। এখন দিনে পরীক্ষা করার সক্ষমতা ৫৫ হাজারের কাছাকাছি। অথচ, মহামারির একদম শুরুর দিকে আইইডিসিআর দিনে মাত্র ৩৩ জনের কোভিড পরীক্ষা করতে পারতো।

২০২০ সালের এপ্রিলে আমাদের কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল ছিল মাত্র ৯টি। এখন ১০০টি সরকারি ও ৩৯টি বেসরকারি হাসপাতাল কোভিড ১৯ রোগীদের সেবা দিচ্ছে। ২০২০ সালের জুনে ২১৮টি সরকারি আইসিইউ বেডের মধ্যে মাত্র ৬৯টি ঠিকঠাক কাজ করতো। দেশজুড়ে তখন এর মোট সংখ্যা ছিল ৩৮১। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে কোভিড ডেডিকেটেড জেনারেল বেড বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজারে, আইসিইউ হয়েছে ১৩২১টি ও এইচডিইউ বেড হয়েছে ৮৫৬টি।

আর ঢাকা যেহেতু দারুণভাবে ঘনবসতিপূর্ণ এবং মোট শনাক্তের ৫৪ শতাংশ ও মোট মৃত্যুর ৪৩ শতাংশই এখানে। আর তাই মোট হাসপাতালের ৪৪ শতাংশই আছে ঢাকায়। কোভিড আক্রান্তদের জন্য হাইফ্লো অক্সিজেন সরবরাহের বিষয়টি শুরু থেকেই জানতে পারি আমরা, আর তাই সেই অনুযায়ী একটি কৌশল গ্রহণ করা হয় ২০২০ সালের জুনে। যে কৌশলের আওতায় কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোর সেন্ট্রাল পাইপলাইনে নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে তরল অক্সিজেনের ট্যাংক স্থাপন করা হয়। সেন্ট্রাল অক্সিজেন ট্যাংক, অক্সিজেন সিলিন্ডার ও অক্সিজেন কনসেনট্রেটর থেকে অক্সিজেন সরবরাহে হাসপাতালগুলোও তাদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়িয়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সরবরাহ করা হয়েছে পিপিই।

আমাদের স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ের বেশিরভাগটা পকেট থেকেই যায়। আর প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে কোভিড রোগীর চিকিৎসায় দিনে ৩৭ হাজার থেকে শুরু করে ৬৮,৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এ পরিমাণ খরচ ও সরকারি হাসপাতালের বেডগুলোর সংখ্যা—এ দুটো বিষয়ই সরকারি হাসপাতালে মৃত্যুর হার (মোট মৃত্যুর ৮৪ শতাংশ) বেশি হওয়ার কারণটা ব্যাখ্যা করতে পারে।

আমাদের ওষুধ শিল্পও এ কৃতিত্বের দাবিদার। দরকারি ওষুধপত্রের ৯৮ শতাংশই এসেছে এ শিল্প থেকে। শুধু টোসিলিজুমাব (অ্যাকটেমরা) ছাড়া। যে ইমিউনোমডিউলেটরটি ব্যবহৃত হয়েছিল সাইটোকাইন স্টর্ম কমানোর জন্য। এর বাইরে কোভিড ১৯ সংক্রমণের যাবতীয় ওষুধই তৈরি করা হয়েছিল দেশে। এমনকি সরকার যাতে ভ্যাকসিন সংরক্ষণ করতে পারে সেজন্য প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সংরক্ষণ ফ্যাসিলিটিও বাড়িয়েছিল।

সরকারের যত প্রণোদনা প্যাকেজ

গত ১৯ মাসে আমাদের প্রধানমন্ত্রী মোট ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। ৭২ হাজার ৭৫০ টাকার প্রথম প্রণোদনা প্যাকেজটি ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২০ সালের এপ্রিলে এবং ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা হয়েছিল ২০২০ সালের নভেম্বরে। এটি আমাদের জিডিপির ৪.৩ শতাংশ এবং এর ৭০ ভাগই বিতরণ হয়েছে ২০২১ সালের এপ্রিলের মধ্যে।

সর্বশেষ ৩২০০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করা হয় ২০২১ সালের জুলাইয়ে। এর লক্ষ্য ছিল সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে লোকজনের কাজের সংস্থান, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, স্বল্পসুদে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে শিল্পকারখানাকে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন নানা খাতে কর্মরত দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে নিয়ে আসতে খাদ্য সহায়তা, নগদ অর্থ ও আবাসনের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো হয়েছে।

একনজরে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এর প্রণোদনা প্যাকেজ

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও এনজিও খাত

মহামারি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউএসএইড যৌথভাবে ৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার দিয়েছে বাংলাদেশকে। যুক্তরাজ্য, বিশ্বব্যাংক ও আরও কিছু দেশও বেশ ভালো অঙ্কের সহায়তা দিয়েছিল। স্থানীয় এনজিওগুলোকে এ ক্ষেত্রে নেতৃত্বে দিয়েছিল ব্র্যাক। এক লাখ মানুষকে নগদ ভর্তুকি দিয়ে সহায়তা করেছে সংস্থাটি। স্বাস্থ্যসেবা খাতে তাদের ৫০ হাজার নারীকর্মী কোভিড দূরীকরণ তথ্য শিক্ষা দিয়েছিলেন প্রায় ৪৭ লাখ মানুষকে। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণাতেও তারা ভূমিকা রেখেছেন।

করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও মানবিক সাহায্য সংস্থা; প্রত্যেকেই কমিউনিটির প্রতি যার যার দায়িত্ব পালনে এগিয়ে এসেছিলেন। সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হাতে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া ও খাবারের রেশন নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসন।

এই সময়ে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১০৬ কর্মকর্তাকে হারিয়েছি। হারিয়েছি কোভিড-১৯ ফ্রন্টলাইনে ডিউটিরত ১৮৬ ডাক্তারকে। সংসদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্য অর্থাৎ প্রায় ১০০ সংসদ সদস্য আক্রান্ত হয়েছিলেন কোভিডে এবং দুঃখজনক যে তাদের চার জনকেও আমরা হারিয়েছি।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার

আমাদের ১১ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী আছে। এদের মধ্যে ১০ কোটি ৭০ লাখের ইন্টারনেট সংযোগ আছে এবং মোবাইল ব্যবহারকারীদের ৪০ শতাংশেরই আছে স্মার্টফোন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার করে সরকারি ও বেসরকারি খাত লকডাউনে টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে কার্যকরভাবে চালু করেছে ই-কমার্স, ই-হেলথ, ই-ব্যাংকিং, ই-গভর্ন্যান্স ও ই-এডুকেশন। আরও অনেক কিছুর মধ্যে মহামারির সময়টাতে আইসিটির সবচেয়ে বড় সেবাটা ছিল ‘সুরক্ষা’ পোর্টালের মাধ্যমে ভ্যাকসিন রেজিস্ট্রেশন, করোনা হেলপলাইন ৩৩৩, ভার্চুয়াল কোর্ট সিস্টেম (মাইকোর্ট), টেলিহেলথ সেবা ও ডিজিটাল ক্লাসরুম। নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক সুবিধাসম্পন্ন অনলাইন অফিস পরিচালনা, মুদিপণ্য কেনা, খাবারের অর্ডার ও ডেলিভারি অ্যাপ, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন ফার্মেসি, বিল পরিশোধ, টেলিমেডিসিন ও বিনোদন পরিচালনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেয়েছিল আইসিটির বিজনেস কনটিনিউইটি প্ল্যান।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার

ভ্যাকসিন সংগ্রহ ও ভ্যাকসিন প্রকল্প

এফডিএ, ইইউ এবং ডব্লিউএইচও কর্তৃক জরুরি অনুমোদনপ্রাপ্ত ভ্যাকসিনগুলোর অনুমোদন দিয়ে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ এবং প্রায় ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৫৬ হাজার মানুষ (জনসংখ্যার ৮০%) বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

এই অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশই সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার সঙ্গে ২০২০ সালের নভেম্বরের প্রথম দিকে ভ্যাকসিন চুক্তি করে প্রশংসিত হয়েছিল। তবে ফেব্রুয়ারিতে এ যাত্রার সফল সূচনা হলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভারত ভ্যাকসিন রফতানি বন্ধ ঘোষণা করলে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত একটি বিপর্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

এদিকে ধাপে ধাপে ৬ কোটি ভ্যাকসিনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কোভ্যাক্স। আর এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র প্রদান করেছে ৬৫ লাখ ফাইজার ও ৫৫ লাখ মডার্নার টিকা। জাপান দিয়েছে ৩০ লাখেরও বেশি অ্যাস্ট্রাজেনেকা, চীন দিয়েছে ৩৪ লাখ সিনোফার্ম ভ্যাকসিন।

বাংলাদেশ এখন বেশিরভাগ টিকা সিনোফার্ম থেকে কিনে স্থানীয়ভাবে প্যাকেটজাত করার প্রস্তাব দিয়েছে।

টিকাদান কার্যক্রমটাকে সহজ করেছে সুরক্ষা অ্যাপ, যা নিবন্ধনের পাশাপাশি টিকার সনদও দিচ্ছে।

সৌদি আরব ও কুয়েতগামী প্রবাসীদের জন্য ফাইজার ও মডার্নার টিকা দিয়ে অযাচিত কোয়ারেন্টিনের খরচ কমাতে সরকার যে কৌশল নিয়েছে সেটাও কিন্তু প্রশংসার দাবি রাখে। স্কুল খোলার এই সময়টাতে ১২-১৮ বছর বয়সীদের ফাইজার ও মডার্নার টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এখন পর্যন্ত মোট জনগোষ্ঠীর ১২ শতাংশ টিকার আওতায় এসেছে। ১৮ শতাংশ পেয়েছে এক ডোজ করে টিকা।

পরিস্থিতির উন্নয়নে আরও যা ভূমিকা রেখেছে

  • সরকারের ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ নীতি ও প্রতিটি ফোন কলে মাস্কের ব্যবহার নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন প্রচার।
  • গত চার দশকে গড়ে ওঠা ইপিআই প্রোগ্রাম, যা কিনা কোভিড-১৯ টিকা কার্যক্রমের ভিত গড়ে দিয়েছিল। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের ছয় দিনের গণটিকা কার্যক্রমে মোট ৫০ লাখ মানুষ পরিপূর্ণভাবে ভ্যাকসিনের আওতায় এসেছিল।
  • জনসংখ্যা সমঘনত্ব ও সমজাতীয়তার কারণে যোগাযোগটা হয়েছিল সহজ। আবার বিভিন্ন সম্প্রদায় ও ধর্মীয় নেতারাও সচেতনতা ছড়াতে অংশ নিয়েছিলেন।
  • ২০২০ সালে রেকর্ড পরিমাণ ১৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছিল। একই বছর জিডিপির প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
  • একটি গবেষণায় স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের দাবির পক্ষে জোরালো প্রমাণ মিলেছে যে, ৬০-৭০ শতাংশ মানুষের শরীরে হয়তো ইতোমধ্যে কোভিড-১৯ অ্যান্ডিবডি তৈরি হয়েছে।
  • যুব সমাজের একটি বড় অংশও এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে বলা যায়। জাতির গঠনে এই যুব সমাজের উৎপাদনমুখী ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিতে পারে।
  • ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে নিরাপত্তা বেষ্টনীতে রাখতে পারা।

আর্থসামাজিক প্রভাব

অনেক সূচকের মধ্যে কোনোটিতে কাঙ্ক্ষিত অর্জন আসতে দশকেরও বেশি সময় লাগলেও মহামারিতে এগুলো বেশ বড় ধাক্কা খেয়েছিল-

  • ২০২১ সালে বাংলাদেশে ‘নতুন দরিদ্র’ হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ।
  • নারীদের মধ্যে বেকারত্বের উচ্চহার চলমান আছে। গত বছরেই চাকরি হারিয়েছিল প্রায় ১০ লাখ গার্মেন্ট কর্মী।
  • ৫৩টি জেলার ৬৫ হাজার নারী ও শিশুর ওপর গবেষণা করে দেখা গেছে, এদের ৩০ শতাংশই মহামারিকালে প্রথমবারের মতো পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
  • স্কুল বন্ধ হওয়া, বেকারত্ব ও দরিদ্রদের ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়ার কারণে বাল্যবিয়ে বেড়েছে কয়েকগুণ।
  • তালিকাভুক্ত প্রায় আট হাজার যৌনকর্মী হয়েছে আশ্রয়হীন।
  • ১৮ মাস স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষায় ক্ষতি হয়েছে অনেক। এ সময়ে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় ১৫ হাজার বেসরকারি কিন্ডার গার্টেন স্কুল।
  • অভিভাবকের আয় কমে যাওয়ার কারণে ৪০ শতাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার হয়েছে।
  • আগের চেয়ে কম হলেও এখনও কোভিড সম্পর্কিত মানসিক অবসাদ কেটে যায়নি।

আমাদের বিজয়, এরপর কী?

এ যুদ্ধে আমাদের বড় জয়টা হলো কোভিডে আমরা যাদেরই হারিয়েছি, আমাদের স্বেচ্ছাসেবী মানবিক সংস্থাগুলোর সুবাদে প্রত্যেকেই সম্মানজনক একটি শেষকৃত্য পেয়েছেন। আমাদের কোনও গণকবর খুঁড়তে হয়নি। এছাড়া, সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো একজোট হয়ে খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক কার্যক্রম চলমান রেখে বেকারত্ব দূর করা, শিল্পগুলোকে বাঁচিয়ে রেখে জিডিপি ধরে রাখা এবং সংক্রমণের চেইন ভেঙে ভারতের মতো ভয়ানক পরিস্থিতির হাত থেকে বাঁচিয়েছে দেশকে। যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এসব উপাত্ত দেখানোর সুযোগ আমি পেয়েছিলাম তখন বিশেষজ্ঞ মডারেটররা কিন্তু বাংলাদেশের এসব সংখ্যাতত্ত্বের প্রতি মনোযোগী ছিলেন। তারা এও বুঝতে পেরেছিলেন যে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো মহামারিতে লাগাম দেওয়ার নেপথ্যে টিকার ভূমিকা ছিল না। এটা সম্ভব হয়েছিল আমাদের সুযোগ্য নেতৃত্বের কারণে, কৌশলের কারণে। এ পরিস্থিতি থেকে নিজেদের আরও শক্তিশালীরূপে বেরিয়ে আসতে আমরা ছিলাম দৃঢ় প্রত্যয়ী। তাই আশা করি, এসব তথ্য-উপাত্ত নিজেদের সক্ষমতার ওপর আমাদের আত্মবিশ্বাস আরও জোরালো করবে। আর হ্যাঁ, এখনও মাস্ক পরতে ভুল করবেন না।

লেখক: অর্গানিকেয়ার-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক। এমবিবিএস, এমবিএ ও হেলথ কেয়ার লিডারশিপ-এ স্নাতকোত্তর।

 

/এফএ/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

অজ্ঞতায় সুখ নেই

অজ্ঞতায় সুখ নেই

টিকা মানেই রক্ষাকবচ নয়

টিকা মানেই রক্ষাকবচ নয়

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন: এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন: এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে

ইভ্যালি: গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২০:২২

আমীন আল রশীদ গত জানুয়ারিতে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ইভ্যালির পৃষ্ঠপোষকতায় ‘অপারেশন সুন্দরবন’ নামে একটি চলচ্চিত্র বানাচ্ছে র‌্যাব ওয়েলফেয়ার কো-অপারেটিভ সোসাইটি। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে র‌্যাবের সাফল্যগাথা ও রোমাঞ্চকর অভিযানই এই সিনেমার প্রতিপাদ্য বলে জানানো হয়। ট্র্যাজেডি হলো, সেই র‌্যাবই ইভ্যালির  প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ রাসেল এবং তার স্ত্রী ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনকে গ্রেফতার করেছে। অভিযোগ, অনলাইন ব্যবসার নামে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাৎ।

প্রশ্ন হলো, র‌্যাবের মতো একটি চৌকস বাহিনী তাদের সিনেমা বানানোর জন্য এই ইভ্যালির কাছ থেকে অর্থ সহায়তা নেওয়ার আগে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্পর্কে কেন বিস্তারিত খোঁজ নিলো না? তারা কি ইভ্যালির বিপুল গ্রাহক ও বিজ্ঞাপনের বাহার দেখে বিস্তারিত খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি? একই কথা দেশের অনেক খ্যাতিমান অভিনেতা ও মডেলের ক্ষেত্রে, যারা এই প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরসহ নানা কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছিলেন। তারাও কি ইভ্যালির প্রতারণার কৌশলগুলো বুঝতে পারেননি, নাকি ইভ্যালি যে মডেলে ব্যবসা করে আসছিল, সেটি এক অর্থে ঠিকই ছিল এবং এর চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহীকে গ্রেফতার না করে তাদের নির্দিষ্ট একটি সময় বেঁধে দিয়ে গ্রাহকদের পণ্য বুঝিয়ে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল?

যুবক, ডেসটিনি বা ইভ্যালির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চোখের সামনেই বেড়ে ওঠে। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়ে সচেতন মহল থেকে সতর্কও করা হয়। ইভ্যালির ব্যবসার মডেল নিয়েও অর্থনীতিবিদ ও আইনজীবীসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ প্রশ্ন তুলছিলেন। কিন্তু বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রতারিত হওয়ার আগে তাদের এসব প্রতিষ্ঠানকে কেন ধরা হয় না বা ধরা যায় না এবং ধরা পড়ার পরে কেন গ্রাহকরা তাদের টাকা ফেরত পান না—সেটিও বিরাট প্রশ্ন।

ইভ্যালির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহীকে গ্রেফতারের পরে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব বলেছে, জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছেন যে তারা একটা পর্যায়ে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্র্যান্ড ভ্যালু কাজে লাগিয়ে বিদেশি কোনও কোম্পানির কাছে বিক্রি অথবা দেউলিয়া ঘোষণার পরিকল্পনা করছিলেন। র‌্যাব জানায়, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে চালু হওয়া ইভ্যালি এখন পর্যন্ত কোনও লাভ করতে পারেনি। অথচ তার অফিস পরিচালনা ও স্টাফদের বেতন বাবদ ব্যয় ছিল প্রায় ৫ কোটি টাকা। যার পুরোটাই গ্রাহকের কষ্টার্জিত বিনিয়োগের অর্থে। সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ইভ্যালির মোট দায় ১ হাজার কোটি টাকার বেশি। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইভ্যালির দেনা দাঁড়িয়েছে ৪০৩ কোটি টাকা। তাদের সম্পদ ছিল ৬৫ কোটি টাকার। নানা পণ্য বাবদ গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম নেওয়া হয়েছে ২১৪ কোটি টাকা। গ্রাহক ও অন্যান্য কোম্পানির কাছে বকেয়া আছে ১৯০ কোটি টাকা।

প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী ও চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় দায়ের করা মামলায় ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাদের রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, আসামিরা তাদের সহযোগী অজ্ঞাতনামা প্রতারকসহ ইভ্যালির পণ্য বিক্রয়ের নামে নানা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে এক গ্রাহকের তিন লাখ ১০ হাজার ৫৯৭ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

সুতরাং, ইভ্যালির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহীকে গ্রেফতার করা হলো কিনা; তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিচার কতদিনে শেষ হবে; সেই বিচারে তাদের কী সাজা হবে—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, যেসব গ্রাহক এরইমধ্যে ইভ্যালির কাছ থেকে পণ্য কিনতে কোটি কোটি টাকা দিয়েছেন কিন্তু এখনও পণ্য বুঝে পাননি, তারা আদৌ সেই পণ্য বা টাকা ফেরত পাবেন কিনা? নাকি এর আগে যুবক ও ডেসটিনির মতো এবারও গ্রাহকরা প্রতারিত হবেন? যদি গ্রাহকরা তাদের টাকা ফেরত না পান, তাহলে ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী বা চেয়ারম্যানের ফাঁসি হলেও তাতে ভুক্তভোগীদের কিছু যায় আসে না।

এ প্রশ্নও অনেকে তুলেছেন যে মানুষ কেন ইভ্যালিতে পণ্য কিনতে গেলো? বাস্তবতা হলো, মানুষ সস্তায় পেলে বা বড় ধরনের ছাড় পেলে সেখানে দৌড় দেয়। আবার সবাই এসব অফারের প্রলোভনে পা দেয়ও না। কিন্তু যারা পা দিয়েছেন এবং প্রতারিত হয়েছেন, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে সেই ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো। গ্রাহকদের টাকা বা পণ্য কীভাবে ফেরত দেওয়া যায়, সেই ব্যবস্থা করা। এর আগে যুবক, ডেসটিনির মতো প্রতিষ্ঠানের কর্তারা গ্রেফতার হলেও গ্রাহকরা টাকা ফেরত পায়নি। যদি তা-ই হয়, তাহলে এসব গ্রেফতারের কোনও অর্থ হয় না। বরং গণমাধ্যমে এমন খবরও বেরিয়েছে, জেলখানায় থাকার নামে হাসপাতালের কেবিনে ডেসনিটির কর্ণধার রফিকুল আমিন ‘রাজার হালে’ আছেন। তার মানে প্রতারকরা রাজার হালে থাকবেন আর বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকরা অর্থের জন্য রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবেন! মাল্টি লেভেল মার্কেটিং বা এমএলএম ব্যবসার নামে যুবক ও ডেসটিনি এবং সবশেষ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালিই শুধু নয়, এরকম আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্তারা গ্রেফতার হয়েছেন; নানা মহল থেকে অস্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু সেসব সচেতনতা উপেক্ষা করে অনেকেই লোভের বশবর্তী হয়ে কিংবা সস্তায় পণ্য কেনার স্বার্থে এসব ফাঁদে পা দিয়েছেন এবং যথারীতি প্রতারিত হয়েছেন।

ইভ্যালি বা এ ধরনের ই-কমার্স সাইটগুলো যা করছিল, তা যে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম নয়, এটি ঠিকই বলা হচ্ছিল এবং সতর্ক ক্রেতারা এদের এড়িয়ে চলেছেন। কিন্তু সব মানুষ সাবধান বা যথেষ্ট বুদ্ধিমান ও সতর্ক নন। ইভ্যালির মতো ই-কমার্স উদ্যোক্তারা হয়তো এই জনগোষ্ঠীকেই টার্গেট করেছিলে। এই কথার অর্থ এই নয় যে যারা ইভ্যালি থেকে পণ্য কিনেছেন তারা বুদ্ধিমান নন। নিশ্চয়ই অনেক বুদ্ধিমান লোকও এসব সাইট থেকে পণ্য কিনেছেন বা পণ্য কেনার জন্য অগ্রিম টাকা দিয়েছেন। তাদের অনেকে পণ্য পেয়েছেন, অনেকেই পাননি। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহীকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে পণ্য অথবা টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা অধিকতর ক্ষীণ হয়ে গেলো কিনা, সে প্রশ্নও গ্রাহকদের মনে আছে।

অস্বীকার করা যাবে না, ডিজিটাল বাংলাদেশ তথা সবার হাতে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে যাওয়া এবং মানুষের ঘরের ভেতরে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশে দ্রুতই জনপ্রিয় হতে থাক ই-কমার্স সাইটগুলো। বিশেষ করে করোনাকালে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় ঘরে সব পণ্য পৌঁছে দেওয়ার সুবিধা কাজে লাগিয়ে আরও বিকশিত হতে থাকে ই-কমার্স সাইটগুলো।

অনেক তরুণ এই ই-কমার্সে ব্যবসা করে, তথা অনলাইনে পণ্য বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। অনেকে বড় উদাহরণও তৈরি করেছেন। বিশেষ করে নারীদের বিরাট অংশ—যারা চাকরির পেছনে না ছুটে এই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কাজে লাগিয়ে নানারকম ব্যবসায় যুক্ত হয়েছেন। কেউ পাইকারি বাজার থেকে কম দামে পোশাক-প্রসাধনীসহ নানারকম ফ্যাশনেবল পণ্য কিনে; কেউ নিজের ঘরে খাবার বানিয়ে বিক্রি করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। অনেকে একত্রে বড় বড় প্ল্যাটফর্মও গড়ে তুলেছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, যেহেতু এটি বাংলাদেশে একেবারেই নতুন একটি ধারণা, ফলে এই শূন্য গোয়ালে অনেক দুষ্ট রাখালও ঢুকে গেছে—যারা মানুষকে অবিশ্বাস্য সব অফার দিয়ে বা চটকদার বিজ্ঞাপনে বিমোহিত করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। প্রতারণার দায়ে অনেকে গ্রেফতারও হয়েছে। কিন্তু তারপরও এই প্রবণতা বন্ধ হচ্ছে না।

গত ১৮ আগস্ট আরেকটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের মূল মালিক সোনিয়া মেহজাবিন ও তার স্বামী মাসুকুর রহমানকে আইনের আওতায় নেওয়া হয়েছে। ই-অরেঞ্জের বিরুদ্ধে ১১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছেন গ্রাহকরা। একইভাবে আলেশা মার্ট, সিরাজগঞ্জ শপ, পেপারফ্লাইসহ বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

এ রকম বাস্তবতায় অনলাইন ব্যবসায় একটি গ্রাহক ও ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা করা জরুরি। শুধু গ্রাহক নয়, বরং যারা সৎভাবে অনলাইনে ব্যবসা করেন, তাদের স্বার্থেও এ রকম একটি নীতিমালা করা জরুরি। না হলে ইকমার্সের নামে প্রতারণা এবং অবিশ্বাস্য ছাড় দিয়ে কিছু লোককে সুবিধা দেওয়া এবং বিনিময়ে বিশাল অংশের মানুষকে প্রতারিত করার প্রবণতা বন্ধ হবে না।

সর্বোপরি, ইভ্যালির গ্রাহকরা যেন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য কোনও কার্যকর উপায় খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু অতীতের যুবক ও ডেসটিনির অভিজ্ঞতা বলছে, সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাছাড়া ইভ্যালির মালিকের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি যা আছে, রাষ্ট্র যদি সেগুলো বিক্রি করেও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে চায়, সেটিও সম্ভব কিনা, তাও নিশ্চিত নয়। তবে মোদ্দা কথা হলো, অফার দেখলেই সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রবণতাও বন্ধ করা দরকার। প্রতারিত হওয়ার পরে হায় হায় করার চেয়ে প্রতারিত যাতে হতে না হয়, সেজন্য লোভটাকেও সংবরণ করা দরকার।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

ঘুষ খেলে নামাজ হবে না, নাকি চাকরি থাকবে না?

ঘুষ খেলে নামাজ হবে না, নাকি চাকরি থাকবে না?

সাংবাদিকদের এত ভয় কেন?

সাংবাদিকদের এত ভয় কেন?

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে পরিবারেই বুলিং বেশি

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে পরিবারেই বুলিং বেশি

‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’

‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (২)

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:০৮

মাকসুদুল হক ‘তোমার এই খেলাঘরে শিশুকাল কাটিল রে,

তোমারি ধুলামাটি অঙ্গে মাখি ধন্য জীবন মানি’– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

১. গেলো সপ্তাহের লেখায় দৃঢ় প্রত্যয়ে বলেছিলাম, বাংলাদেশ নিয়ে কোনও ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব না; ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম এই সপ্তাহে তা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করবো। তবে, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ যখন লিখতে বসেছি, কাকতালীয়ভাবে একটা ‘ভীতিকর’ ভবিষ্যদ্বাণী ফের চোখের সামনে এসেছে।

বিশ্বব্যাংক ১৩ সেপ্টেম্বর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলছে, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০-এর ভেতরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় প্রায় ২ কোটি মানুষ অভিবাসন করবে। একই সময়ে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অর্ধেক জনগোষ্ঠী ওই একই কারণে ‘সম্ভবত’ অভিবাসন করবে।’

বাংলাদেশে সম্ভবত এই ভয়াল চিত্রের মূল কারণ বলা হচ্ছে, নদীমাতৃক দেশটি পানির স্বল্পতা বা অভাব দেখা দেবে, খাদ্যশস্য ফসলের বিনষ্ট বা ধ্বংস হবে, ভূমি হ্রাস হবে ও বঙ্গোপসাগরের পানি অধিক বৃদ্ধি পাওয়াসহ ঝড়, সাইক্লোন, সুনামি ইত্যাদির মতো চরম প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা ঘটবে।

শুধু তা-ই নয়, বলা হচ্ছে, এসব ঘটনার হটস্পট দেশগুলোকে চিহ্নিত করা যাবে ২০৩০ সালে, অর্থাৎ আগামী ৮ বছরের ভেতরে। ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বকোণে ধান চাষাবাদ করা অঞ্চলগুলো থেকে এই অভ্যন্তরীণ অভিবাসন প্রক্রিয়া সূত্রপাত হবে।

উল্লেখ্য, বহু বছর আগেই ভবিষ্যদ্বাণী দেওয়া আছে– ২০৫০ বা ২৯ বছরের ভেতরে বাংলাদেশের মাটির আয়তনের প্রায় অর্ধেক বঙ্গোপসাগরের নিচে তলিয়ে যাবে। তাই আগামী ৮ বছরে বাংলাদেশ যে জলবায়ু পরিবর্তনের হটস্পট হতে যাচ্ছে তা পশ্চিমা ‘বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ’ থেকে বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য বিশ্বাস না করা ছাড়া এই মুহূর্তে আমাদের কি কিছু করার আছে?

২. তবে আশার আলো এক জায়গায়।

বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে হাত গুটিয়ে বসে নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মতো এ নিয়ে আমাদের চলছে শক্তিশালী লবিং ও জাতিসংঘ ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য ফোরামে বাংলাদেশ ও তার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরব উপস্থিতি আমাদের প্রস্তুতি ও দাবি দাওয়া বিষয়ে কোনও রকম ছাড় দিচ্ছে না।

ভবিষ্যতের এই সম্ভাব্য বিপর্যয় রুখে দেওয়ার জন্য যত রকম দেনদরবার করা তা চালিয়ে যাচ্ছে ও বাংলাদেশ অগ্রিম ‘ক্ষতিপূরণ’ দাবি করছে। যেহেতু উন্নত প্রথমা বিশ্বের ধনী দেশগুলোর পরিবেশ সংক্রান্ত দায়িত্বহীন আচরণ, তাদের ভোগবাদী সামাজিক ব্যবস্থা ও যাচ্ছেতাই ব্যবহারের জন্য আমাদের আগামীর দিনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ– এই ক্ষতিপূরণ দাবি করা অবশ্যই যৌক্তিক, মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনসম্মত।

এই বিপর্যয় মোকাবিলা করার জন্য যে পরিমাণ অর্থের জোগান প্রয়োজন, তার তুলনায় প্রাপ্ত অর্থ অপ্রতুল ও স্বল্প হলেও তা নিয়েই মাঠ পর্যায়ের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর ১০০ বিলিয়ন ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি এখনও সুরাহা হয়নি ও এ নিয়ে তাদের গড়িমসি খুবই লজ্জাজনক।

তবে ইতিবাচক বিষয়টা হলো, বাংলাদেশ কারও কাছে কোনও দান-খয়রাত চাচ্ছে না। আবারও বলছি–চাচ্ছে উন্নত দেশগুলোর বেপরোয়া ও প্রকৃতির প্রতি যে কেয়ারলেস এবং বিধ্বংসী আচরণ, যার বলি আমাদের মতো সমুদ্র উপকূলীয় দেশের মানুষেরা তার ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও সেই প্রয়াসে তার স্বচ্ছতা, বুদ্ধিমত্তাসহ বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতির ছাপ রাখে।

৩. যেহেতু বাংলাদেশ পৃথিবীর কোনও দেশ বা জাতিকে স্বেচ্ছায় বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনও ক্ষতিসাধন করেনি– আমাদের স্বকীয় জলবায়ু নীতি ও ভূমিকা ‘রোল মডেল’ হিসেবে সমগ্র বিশ্ব এখন সূক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে অবলোকন করছে ও তা প্রশংসিত হচ্ছে।

তবে মূল বিষয়টা হচ্ছে– যুগ যুগ ধরে ক্ষমতার দাপট, যুদ্ধ ও দাঙ্গা বাঁধিয়ে সমগ্র অনুন্নত ও দরিদ্র দেশগুলোর ওপরে ছড়ি ঘুরিয়ে দাম্ভিকতায় মাতাল উন্নত দেশগুলো আজ প্রকৃতির ভয়াল ছোবল ও প্রতিশোধের সম্মুখীন।

ধরিত্রী মাকে ‘ক্রয়’ করে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করলেও প্রকৃতিকে যে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না ও মানুষ যে ‘প্রকৃতিরই দাস’ এই সত্যের উপলব্ধিতে আজ সমগ্র বিশ্ব শঙ্কিত।

গেলো ১৮ মাসে করোনা ও কোভিড ১৯-এর ভয়াবহতায় যখন পৃথিবী হিমশিম খাচ্ছিলো, আমরা ঠিকই লক্ষ করলাম ধনী দেশগুলোর ওপরে প্রকৃতির নিদারুণ প্রতিশোধ।

সমগ্র ইউরোপসহ অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রাজিলে অপ্রত্যাশিত বনঅরণ্যে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা, বন্যা, চরম তাপ উত্তাপ একদিকে, অপর দিকে শৈত্যপ্রবাহসহ লাগামহীন তুষারপাত ইত্যাদি ছাড়া  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গেলো মাসে ঘটে যাওয়া তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বিভীষিকাময় টর্নেডো ও বন্যা কি প্রমাণ করে না যে প্রকৃতিরও ধৈর্যের ও সহ্যের সীমা আছে, প্রকৃতি তার নিজের নিয়মে চলে, মানুষের নিয়মে না?

পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর এত বুদ্ধি, এত মেধা, এত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, এত প্রযুক্তির নির্ভরতা, এত যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার, এত নিরীহ মানুষ হত্যা করার পর, তাদের এই ‘নব্য উপলব্ধি’ ও প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ সত্যি প্রমাণ করে বিশ্ব আজ এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ে অনুপ্রবেশ করেছে, যা আমাদের পূর্বপুরুষ ও প্রজন্ম কখনোই কল্পনাও করতে পারেনি।

হিতার্থে একটি কথা পরিষ্কার– প্রকৃতি তার প্রতিশোধ অবশ্যই নেবে ও তা নিতে সে ঠিক এই মুহূর্তে বদ্ধপরিকর।

৪. প্রকৃতি প্রতিশোধ কেনই বা নেবে না, যখন পশ্চিমা বিশ্ব প্রযুক্তি দ্বারা দূরবর্তী দেশগুলোতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনা, যেমন- ঘূর্ণিঝড় এমনকি ভূমিকম্প ঘটাবার ক্ষমতা রাখে? প্রকৃতিকে যে  ‘ওয়াপনাইজ’ করা হচ্ছে,  তার যথেষ্ট আলামত থাকা সত্ত্বেও, প্রকাশ্যে তা নিয়ে কোনও আলাপচারিতা নেই কেন?

কোভিড-১৯ ভাইরাস দ্বারা উন্নত দেশগুলোর সমগ্র মানবজাতির ওপরে চলমান জুলুমের প্রতিশোধ যে শুরু হয়ে গেছে তা সন্দেহাতীত। এই কথার সত্যতা পাওয়া যাবে আমার আগের অনেক লেখায়। উন্নত দেশগুলোর করোনার শুধু মৃত্যুর হার অনুন্নত দেশগুলোর সঙ্গে যদি তুলনা করা যায়– তা কি যথেষ্ট প্রমাণ নয়?

বাংলাদেশের মানুষকে খুন করে, আমাদের অর্থনীতি ও হতদরিদ্রের ভাগ্য ধ্বংস করার এই নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রে–(করোনার শহীদদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি) আমাদের ৩০,০০০-এর কিছু বেশি মৃত্যু যে আলবৎ একটা ‘বিশ্ব রেকর্ড’ তা কি ‘থানাটোফোবিয়া’ (মৃত্যু আতঙ্কের মানসিক রোগ) ছড়ানো মিডিয়া স্বীকার করবে–তা নিয়ে দুই লাইন প্রশংসা কোথাও কি কেউ দেখেছেন, শুনেছেন?

৫. তাতে কি এ প্রমাণ হয় না যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘ফলো দ্য সায়েন্স’ বা বিজ্ঞানকে অনুসরণ করো প্রোপাগান্ডামূলক ভবিষ্যদ্বাণী বাংলাদেশের আপামর জনগণ প্রত্যাখ্যান কেবল করেনি, সে তা প্রতিহত করেছে তার আত্মার শক্তি দিয়ে, তার প্রকৃতি ও গরিমা সংস্কৃতি, এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ- তার মাটির খুব কাছাকাছি থেকে?

বাংলাদেশের মাটি কতটা ‘পবিত্র’ তা কি আমরা চিন্তায় রাখি?

এই মাটিতে প্রতি ৫ কিলোমিটার অন্তর অন্তর হাজারও মহামানব, আধ্যাত্মিক সাধক, পীর, গুরু, সন্ন্যাসী, আউলিয়া, কামেল, সাঁই,  ফকির, দরবেশ, ওলামায়ে একরামগণ ‘চিরজাগ্রত নিদ্রায়’ শায়িত আছেন। এই বুজুর্গরা যে আমাদের দরিদ্রের ভাগ্যের ওপর সব সময় কড়া নজর রাখছেন তা আমরা না বিশ্বাস করি, না আছে আমাদের কোনও প্রকার ভক্তি-শ্রদ্ধা।

বলুন দেখি– কোন পশ্চিমা দেশে তাদের নিজস্ব পবিত্র আত্মাগণ তাদের মাটি পবিত্র করেছেন? যা আছে অতি নগণ্য, বা নেই বলা যায়। নেই বিধায় সেই দেশগুলোতে ভারতীয় উপমহাদেশের শত শত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিবর্গ, গুরু, সুফিদের আনাগোনা।

৬. এসব কথা কেবল চিন্তার খোরাক নয়, এ বাস্তব উপলব্ধির দর্শন, যা আমাদের ‘অতি ফ্যাশনেবল’ শহুরে না রাজধানীকেন্দ্রিক মানুষের নেই কোনও জ্ঞান, নেই কোনও জানার আগ্রহ বা প্রচেষ্টা।

সব কিছুই ‘অবৈজ্ঞানিক ও কুসংস্কর’ বলে গরিমা সংস্কৃতিকে তুচ্ছ করে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসকে অবজ্ঞা করে, আজকের সমাজের, আজকের প্রজন্মের কৃত্রিমতায় সৃষ্ট অসংবেদনশীলতা গেলো ১৮ মাসে আমরা দুঃখভারাক্রান্ত চিত্তে নীরবে প্রত্যক্ষ করলাম।

‘মূল্যবোধের অবক্ষয়’– তা নিয়ে না হয় কিছুই বললাম না। নিজেদের জাতি, নিজের মাটি বা নিজেদের মূল্য আসলেই কী, তা যেহেতু জানা, বোঝার ইচ্ছাটুকুই নেই, মূল্যবোধের এসব ‘ফাঁকা বুলি’ আওড়ানোর কোনোই অর্থ হতে পারে না।

৭. আমি বারবার বলেছি, কোভিড-১৯ কোনও ভাইরাস নয়, এ হচ্ছে ‘মনস্তাত্ত্বিক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ এবং তা যে শেষ হয়ে গেছে, তা মনে করা অকালপক্বতা বা ভুল হবে না, তা হবে ক্ষমা অযোগ্য পাপ। শত্রু আমাদের সহজে ছাড়বে না এবং নতুন নতুন ‘প্যাকেজড’ মৃত্যু ও জীবন জীবিকা হারানোর আতঙ্ক ছড়িয়ে আমাদের ‘দৌড়ের ওপরে’ রাখবে।

একই ধারাবাহিকতায় বিশ্বব্যাংকের এই নতুন ভবিষ্যদ্বাণী যে সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে তা বুঝতে নিঃসন্দেহে আমাদের খুব বেশি বেগ পেতে হবে না।

সব ভালোর যেমন শেষ আছে, সব খারাপেরও শেষ আছে– প্রশ্ন হচ্ছে সব সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের হাজার বছরের অধিক দুর্দিনের সমাপ্তি কি ঘটবে না?

তার নিপীড়িত, হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের কি কখনও কোনও দৃশ্যমান ও উপযুক্ত পরিবর্তন আমরা আশা করতে পারবো না?

আমাদের জীবনদশায় স্থায়ী পরিবর্তন আমরা কি দেখে যেতে পারবো, নাকি ‘দারিদ্র্য মোচন’র কথা বলার পর দরিদ্র প্রান্তিক জনগাষ্ঠীর ‘ভিক্ষার থালা’ পেটের ক্ষুধা, ও শিশুদের আর্তনাদ হয়ে থাকবে সব সময়কার জন্য জাতির ‘স্থায়ী প্রতীক’?

আমাদের ধনী গরিবের যে আকাশচুম্বী বৈসাদৃশ্য, যা দেখে আমরা বহুকাল ধরে অভ্যস্ত হয়ে গেছি- বা ‘গরিব তো না খেয়ে মরবেই’র মতো অপবিত্র উচ্চারণ, তা কি হয়ে যাবে আমাদের ‘জাতীয় মুদ্রাদোষ’?

‘সোনার বাংলা’র স্বপ্ন কি জাতীয় সংগীতের ৮ লাইন পর্যন্ত সৌজন্যমূলক সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ থাকবে, নাকি সমগ্র বাঙালি জাতি বিশেষ করে তার ৯০ ভাগ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আরেকবার সব অন্যায়, সব জুলুম, সব অবিচার, সব বৈষম্যের বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দিয়ে ফের জেগে উঠবে তার ন্যায্য হিস্যা বুঝে নিতে?

যে ভবিষ্যদ্বাণী পশ্চিমা বিজ্ঞান আমাদের দিচ্ছে তার উল্লেখযোগ্য ও পরিতৃপ্তির বিষয়টা হলো, ‘যাহা কিছু ঘটিবে তা রাতারাতি ঘটিবে না’– ঘটবে ধীরে বহু ধীরে, বলা হচ্ছে ৮ থেকে ২৪ বছর সময়কাল ধরে।

তা খুবই ভালো কথা, কারণ এর উপসংহার: আজকের, এই মুহূর্তের পৃথিবীর বায়ুদূষণের মাত্রা, তা সত্য হোক আর মিথ্যাই হোক, তা নির্ণয় করেই এসব ফাজুল কথা বলা হচ্ছে।

৯. কিন্তু এমন কোনও গ্যারান্টি কি বিজ্ঞান আমাদের দিতে পারবে যে মানুষসৃষ্ট কোনও ‘আকস্মিক ঘটনা’ যেমন পারমাণবিক বোমা বা কোনও ‘অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার’, আরেকটি প্যান্ডামিক, আরেকটি ছোট মাঝারি বা বড় যুদ্ধের কারণে প্রকৃতির এই ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া ‘ত্বরান্বিত’ হবে না?

প্রথমা বিশ্বের সব কথা, নির্দ্বিধায়, বিনা প্রশ্নে আমরা কি কারণে এতটা ‘অকুণ্ঠ ইমান’ নিয়ে বিশ্বাস করছি, যখন অতীত ও সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে তার কোনও কথাই বিশ্বাসযোগ্য না, এবং এই ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’-এর সবচেয়ে দুর্বিষহ অস্ত্র হলো মিথ্যা?

তাছাড়া রয়েছে মিডিয়া ও হাতের গণনায় অতি নগণ্য তথাপি তোষামোদকারী ‘চামচা শ্রেণি’র ‘ক্ষমতাবান ও প্রতিপত্তিশালী’ মানুষ ও তাদের হীন চক্রান্ত ও ব্যক্তিস্বার্থ, যে শ্রেণির বাংলাদেশেও কোনও কমতি নেই।

আমরা কি এতটাই ‘বেকুব’ যে এও জানি না সমগ্র বিশ্বের অর্ধেক সম্পদের মালিকানা মাত্র ৮ জন ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত? তারা ট্যাক্স ফাঁকি দেয় ও দরিদ্রের মজুরি সর্বনিম্নে নামিয়ে, রক্ত চুষে মুনাফা করে ও ক্ষমতার জোর খাটিয়ে রাজনীতি, রাষ্ট্র ও সমাজকে প্রভাবিত করে– নিয়ন্ত্রণ করে?

বাংলাদেশে যাদের আমরা ‘বহুজাতিক কোম্পানি’ বলি ও তাদের গোলামি করার সুযোগ পেলে নিজেদের ধন্য মনে করে বাহবা দিতে থাকি– তারাও যে ওই একই গরিবের রক্তচোষা যন্ত্রের ‘চালিকাশক্তি’- তা কি আমরা টের পাই?

১০. দয়াল আমাদের ক্ষমা করুক– যদি আসলেই কোনও অভাবনীয় বা অকল্পনীয় ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটে যায়, যদি আক্ষরিক অর্থে বাংলাদেশের অর্ধেক জনগণ বুঝতে পারে তাদের ‘পায়ের নিচে মাটি নেই’ বা জল এসে তার ‘পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে’, তখন সে কি ‘ইয়া নপসি ইয়া নপসি’ জিকির করবে নাকি অন্যত্র, অন্য দেশে পালাবে?

কার সঙ্গে সে তখন যুদ্ধ করবে যখন শত্রু কোভিড-১৯-এর মতো ‘অদৃশ্য’, যখন শত্রু তার একটি মিথ্যা বাঁচিয়ে রাখার জন্য হাজারও নতুন মিথ্যা, ঘণ্টায় ঘণ্টায়, মিনিটে মিনিটে, সেকেন্ডে সেকেন্ডে আবিষ্কার করে প্রয়োগ ও নির্বিচারে ব্যবহার করবে?

আদতে আমাদের পালানোর কোনও পথ কি খোলা আছে, নাকি আমরা ‘এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি’ গাইতে গাইতে চোখ বুজে ‘না ফেরার দেশে’ গমন করবো?

১১. আপনারাই ভেবে বলুন তো– কোন পার্শ্ববর্তী ‘বন্ধুপ্রতিম’ দেশ বা রাষ্ট্র আমাদের ২ কোটি মানুষকে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য জায়গা বা কর্মসংস্থান করে দেবে, যখন সবাই নিজেদের আখের গোছানো নিয়ে থাকবে ব্যস্ত?

উদাহরণস্বরূপ– প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা এসে আমাদের সীমান্তে প্রাণ বাঁচানোর দায়ে পৌঁছানো মাত্রই আমরা দ্বার খুলে দিয়ে ‘মানবিক’ আচরণ করি।

‘ও মা গরিবের ধন যা আছে তাই দিবো চরণ তলে’– আমাদের গরিবের সীমিত সম্পদের চাপ থাকা সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে চলছি বছরের পর বছর।

এই মানুষগুলোকে না মিয়ানমার ফেরত নিচ্ছে, না কোনও পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র, না বিশ্বের অন্য কোনও দেশের আছে মাথা ব্যথা, না কেউ এগিয়ে আসছে তাদের অভিবাসনে সাহায্য করার জন্য।

বলা হচ্ছে, তারা মুসলিম হওয়ার কারণেই তাদের ভিটামাটি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে, তাদের ওপরে চলেছে গণহত্যার মতো জঘন্যতম অপরাধ।

সবই সত্য, সবকিছুই মেনে নিলাম– কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ‘এক দেহ, এক মন, এক ভাগ্য’ দাবিদার বিশ্বভ্রাতৃত্ব, তথাকথিত ‘মুসলিম উম্মাহ’ আজ কোথায়?

১২. কোনও রোহিঙ্গাকে এ পর্যন্ত কি কোনও মুসলিম রাষ্ট্র নিয়ে গেছে? যখন মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশের সম্পদ, বা জমি তাদের চাহিদার অতিরিক্ত আছে, যখন তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষ আবাদ থেকে শুরু করে গৃহপরিচারিকা, ড্রাইভার, মালি, দোকানপাটের সেলসম্যান পর্যন্ত সবই বিদেশি শ্রমিকদের ওপরে ৮০ ভাগ বা তার ঊর্ধ্বে নির্ভরশীল?

যখন সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভিনদেশের অভিবাসীর সংখ্যা তার নিজস্ব নাগরিকের চেয়ে অনেক বেশি।

খুবই দুঃখজনক হলেও কথাটা সত্য; যতই আমরা ইসলাম বা মুসলিমত্ব নিয়ে বড়াই করি না কেন, অঢেল ধন সম্পদ, তেল, স্বর্ণ, হীরা, জহরত এমন কি সুলাইমান নবীর গুপ্তখনি আরব দেশে আবিষ্কার হয়েছে এ গুজব থাকলেও, অন্য মুসলিমের বিপদে এসব মুসলিম সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে, তেমনটা দেখা যায় না।

অতি সম্প্রতি ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান ইত্যাদি দেশগুলোর মুসলিম জনসাধারণ যুদ্ধ থেকে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে পায়ে হেঁটে হলেও হাজার হাজার মাইল পথ ধরে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা তার জাতশত্রু ‘ইহুদি, খ্রিষ্টান, নাসারা’র দেশ তথা ইউরোপ বা আমেরিকাতে ছুটবে। ভুলেও দেখবেন না তার পার্শ্ববর্তী কোনও মুসলিম রাষ্ট্র স্থায়ীভাবে তাদের থাকার কোনও সুবিধা করছে বা তার কষ্টের ভাগ নিচ্ছে।

গেলো মাসেই আমরা দেখলাম ১ লাখ ২০ হাজারের ও বেশি আফগান মুসলিম প্রাণ নিয়ে কাবুল থেকে ইউরোপ ও আমেরিকার বিমানে চড়ে পালিয়েছে– কোনও মুসলিম দেশে নয়।

ধর্ম আজ রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার হচ্ছে, কিন্তু ইসলামসহ প্রতিটি ধর্ম আদতে এসেছে মানব কল্যাণের উদ্দেশ্যে।

ধর্মীয় শিক্ষা, ধর্মীয় অনুভূতি, ধর্মীয় অনুশাসন, ধর্মীয় জিহাদ, এমনকি ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ আমরা মুখে মুখে ঠাওরালেও ধর্মের মূল বাণী থেকে পশ্চিমা প্রহসন, উসকানি ও বেকুবির কারণে আমরা বহু দূর সরে গেছে।

আজ পশ্চিমা দেশগুলোর শক্তির মূল সম্বল ও সম্মান তার জনগণের আর্থিক সচ্ছলতা।

যদিও পবিত্র কোরআন বলছে, ‘সৃষ্টিকর্তা ব্যক্তিদারিদ্র্য বরদাশত করেন না’– এই সমমাত্রিক মূল বাণীটি মুসলিম নয়– অমুসলিম ইউরোপীয় দেশগুলো (কানাডা) কাজে লাগিয়ে - সৃষ্টি করেছে ‘সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার স্টেট’ বা সামাজিক কল্যাণ রাষ্ট্র।

প্রতিটি নাগরিকের জীবন, জীবিকা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা সুনিশ্চিত করে রাষ্ট্র। তার ওপরে আছে বেকারত্বের ভাতা।

তেমন সামাজিক কল্যাণ রাষ্ট্র কোনও মুসলিম দেশে আজ ১৫০০ বছরেও দেখা যায়নি।

মুসলিম প্রধান বাংলাদেশ কি সে রকম একটা রাষ্ট্র সৃষ্টি করে সমগ্র বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিতে পারবে না?

আমি মনে করি, সদিচ্ছা থাকলে ইনশাআল্লাহ পারবে!

(চলবে)

লেখক: সংগীত শিল্পী

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (১)

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (১)

করোনার করুণ কাহিনি: গালি, তালি, পরীমণি ও প্রজন্মের বিদ্রোহ

করোনার করুণ কাহিনি: গালি, তালি, পরীমণি ও প্রজন্মের বিদ্রোহ

করোনার করুণ কাহিনি: করোনা কি বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছে?

করোনার করুণ কাহিনি: করোনা কি বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছে?

করোনার করুণ কাহিনি: তালেবানের কাবুল দখল ও ‘ইয়াঙ্কি জিহাদি’

করোনার করুণ কাহিনি: তালেবানের কাবুল দখল ও ‘ইয়াঙ্কি জিহাদি’

শিক্ষক ও মর্যাদার সংকট

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:৩২

তুষার আবদুল্লাহ কতদিনই তো বলেছি, লিখেছি শিক্ষক খুঁজে বেড়াই। শহর-গ্রাম, প্রাথমিক- বিশ্ববিদ্যালয়, দুর্লভ হয়ে উঠছেন শিক্ষক। যদি ‘পদ’ বিবেচনায় বলি সর্বত্র আছেন তাঁরা। পাঠ্যক্রম অনুসারে পাঠদান করে যাচ্ছেন শ্রেণিকক্ষে এবং শ্রেণিকক্ষের বাইরে। এই পদধারী শিক্ষকদের আমার আর দশটা চাকরিজীবীদের মতোই মনে হয়। শিক্ষক বলতে ছোটবেলা থেকে যাদের দেখেছি, তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিতে হয়নি। দেখেই বুঝে নেওয়া যেত ‘তিনি’ শিক্ষক। শুধু বিদ্যায়তনে নয়, গ্রামে, মহল্লায় যিনি শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁকে আমরা চিনি নিতাম তাঁর নৈতিক আচরণ, কথা বলার ভঙ্গী, চলাচলের ঋজুতা, সর্বোপরি ব্যক্তিত্ব দিয়ে।

আজকাল বিদ্যায়তনে গিয়েও চিনে নেওয়া মুশকিল কে শিক্ষক। আমরা যাদের শিক্ষক বলে জেনে এসেছিলাম, তাদের বেশিরভাগই শিক্ষকতার এসেছিলেন, এই পেশাকে ভালোবেসে। তারা জানতেন এই পেশা সমাজের সর্বোচ্চ মর্যাদাপ্রাপ্ত। একই সঙ্গে তাদের ছিল নিজের জ্ঞানকে অন্যের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার স্পিৃহা। সেই সময়ের শিক্ষকরা আর্থিকভাবে সচ্ছল ছিলেন না। বিশেষ করে স্কুলের শিক্ষকদের নিয়ে নাটক সিনেমায় হেঁয়েলি করেই বলা হতো ‘গরিব স্কুল মাস্টার’। যারা কোচিং, টিউশনিতে বাজিমাত করতে পারেননি, তারা এখনও গরিবের সীমারেখা অতিক্রম করতে পারেননি। আর্থিকভাবে যেমন দারিদ্রের সীমা ডিঙানো যায়নি, তেমনি আবার ধীরে ধীরে শিক্ষকরা সম্মানের জায়গাতে গরিবের সীমানায় ঢুকে পড়েছেন। সমাজের আর্থিক সচ্ছ্লতা যত বেড়েছে, শিক্ষকের সম্মান ও মর্যাদা কমেছে তারচেয়েও বেশি। এর একটি বড় কারণ, শিক্ষকদের একটি বড় অংশের  চাকরি এখন কারখানার শ্রমিকের মতোই মালিকের ইচ্ছের ওপর নির্ভরশীল। শ্রমিক তুল্য পেশায় যোগ্য শিক্ষক দুর্লভ হবেন এটাই স্বাভাবিক।

শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষা দিবসের একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘অন্য কোনও পেশায় কাজ জুটাতে না পেরে অনেকে শিক্ষকতায় এসেছেন।’ কথা সত্য। কিন্ডারগার্টেন, প্রাথমিক, উচ্চ মাধ্যমিক থেকে শুরু থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অবধি একথা নিশ্চিন্তে বলা যেতে পারে।

বিসিএস শিক্ষার বেলাতেও একই কথা। সরকারি স্কুল-কলেজে পড়ার অভিজ্ঞতা আমার নিজেরই আছে। স্কুলের বেলাতে দেখেছি স্কুলটি সরকারি হওয়ার আগে যারা শিক্ষক ছিলেন তাদের সঙ্গে বিসিএস বা সরকারি কোটায় চাকরি প্রাপ্তদের পার্থক্য। এদের শিক্ষক হওয়ার কোনও প্রস্তুতি ছিল না। শিক্ষক হবেন এমন স্বপ্নও ছিল না তাদের। অন্য আর দশটা চাকরি হিসেবে নিয়েছিল এই পেশাকে। তাই তাদের শিক্ষাদান পদ্ধতি, মেধার দ্যুতি ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ‘শিক্ষক’ এর দূরত্ব অনেক। এখানে একথাও স্বীকার করে নিতে হয় সরকারি কোটা ছাড়া যাদের শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি, তাদেরও একটি অংশ নিরুপায় হয়ে এই পেশায় এসেছিলেন। প্রতিষ্ঠাতা, গভর্নিংবডির আত্মীয় পরিজনের কোটায় তারা চাকরি পান। অর্থাৎ জ্ঞানে ও মানসিকতায় তারাও শিক্ষক হবার জন্য তৈরি ছিলেন না। এখনও নেই। পেশাগত ও সাংগঠনিক কাজে বিদ্যায়তনে যেতে হয় নিয়মিত। বেসরকারি ও সরকারি দুই দিকেই দেখেছি বিষয় ভিত্তিক শিক্ষক সংকট। এবং প্রত্যাশিত শিক্ষকের অনুপস্থিতি।

বেসরকারি ও সরকারি দু জায়গাতেই প্রকৃত শিক্ষকদের স্বাগত জানানোর পরিবেশ নেই। গভর্নিংবডি, প্রতিষ্ঠাতারা শিক্ষকদের সঙ্গে ‘ভৃত্য’ তুল্য আচরণ করেন। তাদের খেয়ালে চাকরি হয়, তাদের খেয়ালে চাকরি যায়। আছে রাজনৈতিক প্রভাবও। রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শন না করলে চাকরি ঝুঁকি মধ্যে পড়ে যায়। এমন বেশ কিছু বিদ্যায়তন দেখেছি যেখানে প্রধানশিক্ষক গভর্নিংবডির সদস্যের সন্তানের সামনে বসারও সাহস পান না।

সরকারি, বেসরকারি উভয়ক্ষেত্রেই দেখেছি সরকারি কর্মকর্তারা শিক্ষকদের সঙ্গে গ্রেড অনুসরণ করে ব্যবহার করেন। তাদের সঙ্গে শিক্ষক সুলভ আচরণ করেন না। আচরণ অধস্তনের মতো।

শিক্ষা দিবসে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকও সত্য ভাষণ দিয়েছেন-শিক্ষকরা রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের কথায় উঠ-বস করেন। নিয়োগ টেন্ডার সব কিছুতেই চলেন ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে আঁতাত করে। ফলে শিক্ষক হিসেবে তাদের নৈতিক অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব হয় না। ‘শিক্ষক’-এর দেখা পেতে হলে আমাদের এজন্য বিনিয়োগ করতে হবে। শুরু করতে হবে প্রাথমিক থেকে। উপযুক্ত প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আর্থিক ও সামাজিক সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের রাজনৈতিক ও গর্ভনিং বডি’র প্রভাবমুক্ত করতে হবেই। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও শিক্ষকদের চাকরি নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। সম্মান ও আর্থিক সচ্ছ্লতা নিশ্চিত না করে আমরা এই পেশাকে জীবনের লক্ষ্য বা পথিকৃৎ পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো না। এক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের চেয়ে সরকারের ইচ্ছে ও উদ্যোগ জরুরি।

লেখক: গণমাধ্যম কর্মী

/এসএএস/

সম্পর্কিত

ভোটের হাওয়া লাগলো মাঠে

ভোটের হাওয়া লাগলো মাঠে

গণমাধ্যমে বিভীষণ

গণমাধ্যমে বিভীষণ

শহর কেন গতিহীন?

শহর কেন গতিহীন?

উড়ে যাক অসহিষ্ণু বাষ্প

উড়ে যাক অসহিষ্ণু বাষ্প

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস আজ

আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস আজ

হাবিপ্রবিতে তিন প্রশাসনিক পদে রদবদল 

হাবিপ্রবিতে তিন প্রশাসনিক পদে রদবদল 

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের ম্যাজিক ফিগার: আইজিপি

বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের ম্যাজিক ফিগার: আইজিপি

ব্রাজিল থেকে বাংলাদেশে এসে করলেন ২১ গোল

ব্রাজিল থেকে বাংলাদেশে এসে করলেন ২১ গোল

পশ্চিমবঙ্গে দিলিপ ঘোষকে সরালো বিজেপি

পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিতে রদবদল

করোনায় মারা যাওয়া বেশিরভাগই ডায়াবেটিস আক্রান্ত, সতর্কতায় করণীয়

করোনায় মারা যাওয়া বেশিরভাগই ডায়াবেটিস আক্রান্ত, সতর্কতায় করণীয়

স্বামী ভরণ‌পোষণ না দেওয়ায় স্ত্রীর আত্মহত্যা

স্বামী ভরণ‌পোষণ না দেওয়ায় স্ত্রীর আত্মহত্যা

মহেশখালী ও চকরিয়ায় নৌকার প্রার্থীরা মেয়র নির্বাচিত

মহেশখালী ও চকরিয়ায় নৌকার প্রার্থীরা মেয়র নির্বাচিত

সাকিববিহীন কলকাতার উড়ন্ত জয়

সাকিববিহীন কলকাতার উড়ন্ত জয়

নারায়ণগঞ্জে ১৮ কনস্টেবল নিয়োগে জালিয়াতি হয়েছিল যেভাবে

নারায়ণগঞ্জে ১৮ কনস্টেবল নিয়োগে জালিয়াতি হয়েছিল যেভাবে

প্রেমের ফাঁদে গৃহবধূর নগ্ন ভিডিও ধারণ, যুবক গ্রেফতার

প্রেমের ফাঁদে গৃহবধূর নগ্ন ভিডিও ধারণ, যুবক গ্রেফতার

ভাঙ্গায় আ.লীগের ফয়েজ পুনরায় মেয়র নির্বাচিত

ভাঙ্গায় আ.লীগের ফয়েজ পুনরায় মেয়র নির্বাচিত

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune