X
বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ১৪ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

মলিন জগতের প্রাণ

আপডেট : ১৩ জুন ২০২১, ১৮:৪০

হঠাৎ করেই প্রভাটা মরে গেল। বিষণপুরের বটতলার নির্মম ঝড়ের রাতটাতে তার কিছু হলো না, অথচ এই স্বাভাবিক রোদ্দুরমাখা দুপুরে সবটুকু নিয়া সে চলে গেল। চলে যাক, এরকম একটা মানুষের দুনিয়া, তেমন কারো কিছু হয় না। হওয়ারই-বা কি আছে। কিন্তু এই সময়ের মানুষের জন্য রেখে গেল সে অনেককিছু। কতোই-বা বয়স? বয়স তো কোনো বিষয় নয়। বয়সে কি এসে যায়? যৌবন ছিল তার শরীরজুড়ে। কালো শরীরে কারো সেটা তেমন চোখ পড়ে না কিন্তু শরীরমনে ছিল তার প্রেম। প্রেম? দূর হ!! শালার প্রেম। ওগুলার এখন কি দাম আছে ক! কোত্থাও দাম নাই। গ্রামেশহরে কুনখানেই দাম নাই। সব জায়গায় ঝলমলা করা তামশা নৃত্যাভিনয়। অভিনয় বলাটা ভুল। সবাই তো করে। এ জাউরাকাম ধনীগরিব সবাই করে। চুবালে তার একই রঙ। প্রভাটা তাই একধরনের বেঁচেই গেল। সে রঙটা নিয়েই চলে যায়। কিন্তু সেটা কথা নয়। এখন চৈত্রমাস। পাতাঝরার কাল। নিঃসন্তান প্রভার নিজের বলে কেউ ছিল না। কবেই না মা মরে গেছিল, মনে নাই। বাপ যে কে? থাকা না-থাকাটা ঠিক গল্প বানানো গল্পের মতো। কিছু লাগালেই হলো। লাগিয়ে লাগিয়ে যেথায় যায়। তারপর যা হয় শেষ, তাই তো সব গল্প। গল্পে যা রটে তা সত্য নয় আবার অসত্যও তা নয়। ধম্মপুত্র অযোদ্ধার সত্যের মতো বিশ্বাসে পরিণত হলেই তা শিল্প। প্রভা একা। মরে গিয়েও একা। সবার মুখে সে একা।
এসব প্রতিপাদ্যের বাস্তবিক কারণ, প্রভার গল্পের ওপারে গল্প আছে। কাইয়ূম চৌকিদার বিষণপুরের অন্য মানুষ। বিরাট বটতলার তলে অনেককাল পড়ে থাকা চৌকিদার কোনো এক কারণে পশ্চিম থেকে এ এলাকায় আসছিলেন। তারপর এখানে সেখানে থেকে একদিন দাঁড়ান এই জায়গায়। জায়গাটার কোনো নাম নাই। সক্কলেই এটারে কয় এন্দুরের টং। এই এন্দুরের টঙে যখন দাঁড়ায় তখন সন্ধ্যা কামানো রাত। রাতের গাঢ়তা তখনও নামে নাই। বটগাছের ঝুরিতে ছোপ ছোপ ঠান্ডা অন্ধকার ঝুলতে শুরু করে নাই। চৌকিদার গফুর বিড়ি টানে। কতোই আর বয়স, চব্বিশ। খুকখুকানি কাশির ভেতর চপচপা বিড়ির টান আর কীসের এক কটকটানি আওয়াজ। জনমানুষ কেউ ছিল না। একটু আগেই কসাইয়ের দোকানের বাতি নিভে গেছে। ওপারে দানাদানা ল্যম্পের আলো একে একে নাই হয়া যায়। চিক্কন ছোট রাস্তাটা দমে দমে খালি হয়। খালির পর খালি। উঠনি কিছু লোক এদিক ওদিক তারার আগুনের মতো চাটচাটি করে—তাও আর নাই। একটু সিমসিমা ঠান্ডা আছে। ঠান্ডার ওপারে মৃদুমন্দ ছেঁচড়া ধুলাটানা বাতাস। বাতাসের ওপারে বাতাস। সিক্ত বাতাস ক্যরম্যার করে। ধুরমুর করি এটা ওটা উড়ি যায়। চ্যাগার পড়ি যায়। ইন্দারার পাড়ের ছেঁড়া লুঙি উড়ি আসে। বাঁশের ডাবের শাড়ির মাথা সরাৎ করি পড়ি যায়। আর দড়ি ধরা গরু হামলায়। হাওয়া খোলা গায়ের চামড়া তখন সিউরি ওঠে। ফুলিফুলি ওঠে গায়ের রোম। আর তাতে চৌকিদারের বিড়ির টানে ওই শীত একটু উষ্ণতায় ধরে। সে সুখ টানে চারআনার বিড়ির বিনাশ সাধন হয়। তারপর ওঠার আগেই দেখে কোনার দিকে পড়ি থাকে এক বেজন্মা রক্তাক্ত বাচ্চা। এইডা কি? আন্ধারে পাও দোলায়। আর ঘুরায়। ভারক্যা করে কে যখন শীতবাতাস তাড়ায়া হুঁকা হাতে পুবে যায়—তখন নদীও নাই, নাকি আছে, না স্বর পড়া ছিল নদীর পানি—তাই চিনা যায় নাই, তাতে হুড়হুড়ানি আওয়াজ আসে। আওয়াজের ভেতর হুমহুম বাতাসের মধ্যে একপ্রকার শিরশির রাগী ধ্বনি বেগে বয়। নদীর পানির তাতে কিচ্ছু হয় না। সেই স্বর নিয়া ভেতরে ঢেউ পারানি করে। ঠিক ঢেঁকিতে পা ফেলার মতন। ঢেঁকি যেমন ওঠে-নামে তেমন তা করে। করতে করতে দূরে তার ছন্দ বাড়ে। আরও দোলায়। ঢেঁকির মাথার মতো ঢেউ নীল ডাউন করে না। তাতে বুঝি তরঙ্গের বেগ তৈরি হয়। ঠেলতে ঠেলতে সেই ঢেউ ঢেঁকির তুলনা ছাড়িয়ে দ্রুততর হয়ে দক্ষিণে গমনে ব্যস্ত হয়। কেন হয়? বাতাসের বেগ আর হাহাকার যেমন বাড়ে কিংবা হাহাকারের ভেতরে যে বেগধ্বনি সেটিও বাড়ে আরও বাড়ে কিছু বাইরের শব্দ—সেও শ্মশানের দিকে এগুলে কীসব পাওয়া যায়। বুঝি কালকের মরা পোড়ানোর কিছু কালছে পোড়া দণ্ড, আরও কালো কিছু ভাসে। সে ভাসুক কিন্তু বাতাসে ঠান্ডা বাড়ে। অনুভূত ঠান্ডার বিস্তার ঘটে যখন তখন নিঃসহায় বাচ্চাটা আরও কাঁদে, ঠান্ডায় বা ঠিকানায় বা হতে পারে আশ্রয়ের-প্রশ্রয়ের জন্য। কী করবে সে? পুঁটলির দানা যেন। পুত্তলির পাঙ্খা ওড়ে। জানভরা সে পুত্তলি। বাত্তি নাই কিন্তু সেই বাত্তির দাবি নিয়া অন্ধকারে হাতড়ায়। তড়পায়। অস্বীকার করে পানির ঢেউ বা আন্ধার অচল জনপদের শ্মশানকে। চৌকিদারের বিড়ির আগুন নেভে নাই। কতোক্ষণ চলে তা, কে জানে। দেশ-কাল-সময় ছায়া মাড়ায়। সময় সময় গতি টকটক ক্ষণগণনা দুদ্দাড় গত হয়। কিন্তু পোড়া গফুর বিড়ির ছবিটায় আগুন পৌঁছে না। শুক টানে সুখ আসে কিন্তু আগুন আগায় নাই—নাহ—এইডা তো তিন নম্বর বিড়ি—এরপর চার নম্বর—টানে মনে আসে জোবেদার কথা। কবে ছাড়ছে, সেই বউটা রোগা, কোনো তাল আছিল না। শরীরটা ছিল দায়সারা মতন। ঠিক চিলের ছায়া যেন। চিলচিল করে না তাই বেশিদিন তার ভাল্লাগেনাই। পরে সে ছাইড়া আসে। গোঙানিমার্কা মাইয়া দিয়া সে কি করে। মাইয়া যদি ফড়িং না হয়, তবে কীয়ের কি? জানে নাই আর কিছু। পড়ন্ত দুফুরে সে একহাতে চইলে আসে। তবে কী এক নরম নাদুস শরীরের গন্ধ বুকে করি নিয়া আসে। আসতে আসতে পথে একটা কীয়ের মোড় পড়ে সেহানে যখন দাঁড়ায় তহন দেখে একটা মরা কুত্তা। মরা কুত্তার মুখে রক্ত আর চক্ষু নিমীলিত। কুচকুচা কালা কুত্তার এ মরণ তার মনটাকে হতাশ করে। তখন সে মোড়ের দোকানটায় রেজকি ফালায়া কয়, দুইডা মলা দেও। সে মলা কেনে আর কয়, কুত্তা মারলো কেডা? দোকানি কোনো প্রতিউত্তর করে না। ষাইতের সময় এইটা কী রেজকি দেন? কিন্তু চৌকিদারের তা কানে যায় না। কুত্তার রক্ত তারে কামড়ায়। হঠাৎ সে কুত্তাটার কথা কানে ঢুকলে ঘেউ ঘেউ রবে কী একটা ভয় তার মনের ভেতরে ঢুকে যায়। তখন মৃদু ক্রন্দনরত শিশুটির ছায়া চোখের আগায় নাচে। দূরের কোনো হ্যাজাগ নাকি অন্য কিছু প্রভা সৃষ্টি করে চোখের আগায়। আরও আগায় দুলদুল ঘোড়ার পায়ের লাল রক্ত। লাল রক্তের ভেতর কুত্তার মুখ নাকি কুত্তার মুখে গড়ানো রাস্তায় সেই রক্ত স্রোতে এখানে আসে। আসতেই একপলকে তা দুলে দানা বাঁধে। আরও রক্তের ভেতর সাঁতার দেয় সেই পা দোলানো শিশু। এইটা এত রক্তে কেন পঙ্গর দেয়। পঙ্গর দেওয়া মানুষ এইহানে ক্যা? গফুর বিড়ির ধোঁয়াটা আর আঁশটে রক্তের গন্ধ মিলে কীসব কালছা, গেরুয়া নাকি খয়েরি রঙ দোলায়। হাহাহা—করে চৌকিদার পড়ন্ত শিশুটিকে বাজায়। সে কি নিভন্ত না প্রজ্বলময়? সে কি কোন্ জেন্ডারের? কার পয়দা? এইহানে কেন? একলা মাথায় আউলায়। এন্দুরের টং দোলে। আর হেই শিশু কোলে হাসে। হাসে হাঃহাঃহাঃ—পরিহাসের হাসি। হাসিস ক্যান। আমি তরে লমু না তো! রক্তমোছা শিশুর জন্ম—এই তো জন্ম সেই জন্ম—রক্তমাখা জন্ম, জন্মেছি এই জন্মানো দ্যাশে। জন্মসুখের গন্ধে গন্ধে সুখের সুখটান আর এন্দুরের টং যুৎজাত হয়া তাকে ধরে রাখে। কান্না কানে আসে কিন্তু ঠিক বাজে না। হয়রানি যে করে তাও নয়। তারপর এই বটতালায় তার ঘর হয়। কিন্তু কি জানি অজানা কারণে চৌকিদার আর তার প্রতিবেশীর লগে ছাড়াছাড়ি হইছিলো। বেহুদ্দা চৌকিদার খালি গতর নিয়া চলে আর গফুর বিড়ির ইজ্জত বাঁচায়। প্রভা সেই বটতলার কন্যা আছিল।
প্রভার মৃত্যুতে পাড়ার কেউ যদি না কান্দে সেটা নিয়া কথা নাই। কারণ, তার তো সামাজিক পরিচয় নাই। বরঞ্চ একপ্রকার মুক্তি সে পাইয়াছে। এই মুক্তিতে পৃথিবীর শান্তি-অশান্তির শোধ বা পরিশোধ কিছু নাই। তবে এন্দুরের টং এলাকায় প্রভা সমস্ত মায়া পুষিয়া রাখিয়াছে। যতো মানুষ আসে সকলেই একদিন পুণ্য প্রভার আলোতে চলমান নদী দেখিয়াছে, পাহাড় দেখিয়া স্বপ্নাপ্লুত হইয়াছে, হ্রদ-সমুদ্র-পাখালির মমত্বে ভরিয়া দিয়াছে। কার না আপন আছিল না সে? সুর করিয়া জীবনের জয়গান গাহিয়াছে। অপার সম্ভাবনা নিয়া সকলের সে কাছের আছিল। দায়িত্বে ছিল পূর্ণা। কথায় ছিল নম্র। পরোপকারে সেবায় সকলের হয়া একজন হয়। কতোবার কতোজন কইছে, তর বাপ আহে না? ছুড়িটার মায়ে ক্যা? প্রভা হাসিতে সুর আনিয়াছে। ধরার একজন হয়ে সৃষ্টির সত্যটুকু আওড়াইয়াছে। উপরে উপরে ট্যাংক চলিয়া গেছে, হানাদাররা সবটুকু ধ্বংস করিয়াছে, জনমের সাধ মিটাইয়া শরীরের ক্ষত ক্ষতাক্ত করিয়াছে—তবুও সে একই সত্যে একমানুষের কথা কহিয়া গিয়াছে। হ, মনে আছে, তার জন্মও হইছিল তুমুল প্রেমের ভেতর। কিন্তু আছিল অনেক কষ্ট। যে সমাজে তার নিষিদ্ধ জন্ম কত্তোবচ্ছর প্রচারিত ছিল, কিচ্ছু কেউ মানে নাই, মিলিত হইতে দেয় নাই, মনের আছিল না দাম, প্রেমের আছিল না সুখ—কিন্তু কোন নির্ধারিত সময় বিধির নিয়মে ঘনাইয়া আসে। হঠাৎ সমস্ত সুখে আপ্লুত হইয়া, সমস্ত দেহমন জড়াইয়া তুমুল বৃষ্টিভেজা সুখের দাপটে নামিয়া আসিয়াছিল গর্ভের জীবন। আনচান করা মন। আয়েশে জড়ানো সুখ। বিন্দুমাত্র তিলধারণের কোনো অপবাদ তাহাতে ছিল না। কেন থাকিবে? এ যে সমস্ত পৃথিবীর দাবি। মর্ত্যরে মুখাগ্নি। খচিয়া-পাড়িয়া তাহা বিনষ্ট করিবে কে? তাই তো সকলের দর সে মাপিয়াছিল। বহুদূরের জীবনকে সে দেখিয়াছিল। স্বাধীনতা আর মানবিকতার অনিঃশেষ বিন্দুটি সে আহরণ করিতে চাহিয়াছিল। প্রভার জন্ম হোক যথা তথা সে সবটুকুকেই তুচ্ছ করিয়া দিয়া নিজেই নিজের নাম রাখিয়াছিল। অন্ধকার শরীরকে সর্বদাই আলো করিয়া রাখিয়াছিল। আলো তো অন্ধকার তাড়ায়? অন্ধকার তো সকলকে পেছনে ঠেলে। সে ঠেলাকে সে সংগ্রামে শক্তিতে সম্মুখে আনিয়া ফেলিল। সকলকে সে কালা শরীরের ডাকে কালামেঘের বর্ষণের সংকেত দিয়াছিল। এই সংকেতে কী থাকে? কাহার তর্জনীর বার্তা থাকে? আর সেই বার্তা কী এই বিষণপুরের কারো একার—তাহা নয়। এক একটি বিষণপুর বহুদূর ছাড়াইয়া যায়। ছড়িয়ে পড়ে। সে হানা দিয়া কয়, হে বস্তির পুত তুই বাহির হ, হে স্তন্যবতী তুই শক্ত হইয়া তর নিরাপত্তা ল, হে পুরুষ তুই সাহসী হ, হে পিতা তুই সময়ের ডাক দে—এইরূপে একে একে বিষণপুরের হাওয়া সেই যখন বদলাইয়া দিতে চায়, তহনই একদিন অতৃপ্তির স্বাদ লইয়া জন্মের সুখ ছাড়াইয়া লয়। কীয়ের সুখ? নিজের লয় তো! প্রভা নাম তো তার আছিল না। তার নাম ছিল থ্যালথ্যালি। এ কোল ও কোল করে পুটুলির শরীরটা থ্যালথ্যাল হলে এরকম নাম হয়। সে বড় হয়। গুত্তা খায়। শুকনা হয়। ভারি হয়। কিন্তু থ্যালথ্যাল যায় না। কী কপাল। মনে হয় সুখের নহরে তৈরি নহবতখানায় জীবন ধন্য! কেউ তার খেয়াল করে না। বড় না ছোট, পুষ্টি না অপুষ্টি সেসব দেখার মালিক তো নাই। সবটুকু শুষিয়া নিয়া গেছে মরণ হারানো সময়। কী কারণে এই বিষণপুরের এন্দুরের টঙে কালা-জলপাই রঙা দুএকটা গাড়ি আসি থামে। ওগুলাও কেউ চিনে না। কী যে কারা ক্যাডা জানে। তহন আড়ার ওপার থাকি সেই জঙ্গলার ভেতর থ্যালথ্যালিরে দেখে। সে তহন ডুমুর কুড়ায়। ডুমুর খায় আর টরটর করি তাকায়। কালসিপড়া চোখেমুখে কালা ছাইয়ের শরীরের ছুডু হাড়জ্বালানি কইন্যা দেইখা ওদের জ্বালা জাগে। কেমুন মানুষ? কী কয় বুঝা যায় না। এধার ওধার কয়। সে ভয়ে ফুড়ুৎ করে। তখন ওখানে একটা বড় নালা দিয়া সুড়ুৎ করি তার লোকজনের ঘরোত ঢোকে। কী আর ঘর! পুরানা বাঁশের ডাবের ওপর কলাপাতার হ্যাকনার বেড়া দিয়া এ এলাকাটা ঘেরা। ঘেরার ভেতর আরও ঘেরা। ওই যে ছোট্ট করে চৌকোনা ওটা বাহ্যি করার জায়গা। মোটামুটি প্রত্যেকদিন গোটা পনেরো মানুষের কাম চলে ওতে। তার লাগোয়া ছাপড়া দিয়া ঘর তোলা হয়েছে। এদিক ওদিক অপরিকল্পিত ঘর। ঘরের বাইরেই আকন্দ আর আটাষ্যড়ির জঙ্গল। জঙ্গলের ওদিকটায় তুমুল ঘন ভাঁটফুলের বুনো গাছ। এই ফুলগুলা খালি হাসে আর এদের ন্যাংটা জীবনের দিকে তাকায়। তবুও ভাঁটফুলের গন্ধ যায় না! সে জন্মায় তার নিয়মে। রোদে ঝড়ে গম্ভীরে তার মরণ নেই। ধুমধুম করে যতো ধাওয়াই আসুক সে নিজের স্বরে আকণ্ঠ থাকে। পেছনে তাকায় হাসে স্বভাবে ফেরে এবং দুলতে থাকে—কী এক রং—ঘিয়ের মধ্যে পাতলা আরও কোনো রঙ আছে কি? ভেতরের পরাগ রেণু? খয়েরি অঙ্কন সবটাই এই বিষণপুরের রঙ। এন্দুরের টঙের মানুষের প্রেম আর রঙজ্বলা কণ্ঠের খাওয়া না-খাওয়া পীড়ন। মাঝেমধ্যে থ্যালথ্যালিটা এদিকে আসে আর রঙে রঙে কীসব ভাবে। ভাঁটফুল মরিলে কারো কিছু হয় না। কেউ কান্দে না। সে শুধুই সবটুকু দেখিয়া শুষিয়া যায়। ভাঁটফুলের জঙ্গলের কখনো দাগমারা দুটা কুত্তা শোঁ শোঁ করি দৌড়ায়, মরা শালিকটার গোশত খাওয়ার জন্য। কিন্তু গিয়ে তারা থমকায়। দেখে ফ্যান তোলা গোক্ষুর দাঁড়ায়া আছে। ফোঁস ফোঁস করলে কুত্তা দিশাহারা, কী যে লালাঝরা শখ সেটা—অপরাগ হলো। ফোঁসফোঁসানির জন্য বুক ঘেঁষে সরীসৃপটা এগিয়ে এলে কুত্তা পাল্টা দিকে দৌড় শুরু করে—আরও দৌড়ায় তার পিছু কালারঙের আরও দুটা কুত্তা ভুগতে ভুগতে পিছু নেয়—মরা পাখিটা আর গোক্ষুরটা তখন একে অপরের হয়। খুব সুখে ওটা নিতে চায় কিন্তু কী একটা বুঝে সে ফণা নামিয়ে ঘাড় দুলিয়ে অন্যত্র রওনা দেয়। চকচকা সূর্যের আলোর ছায়া পড়ে, আর ছায়ার ওপারে কায়া—তারপরও ওই মেলেটারির উর্দির রঙ আর সরীসৃপের রঙ একই থাকে। একইভাবে ঘুরে দাঁড়ায়। পথের প্রান্তে না পৌঁছিয়ে এন্দুরের টঙের পাশে বসে আর মরা শালিকের মতোই কী একটা ভক্ষণের গুজব মনের ভিতরে আওড়ায়। কে? হল্ট চেক। বড় কেউ আসামাত্র জনাকয়েক উঠে স্যালুট করে। সব গুজব হারায়া যায় পাতলা মেঘের মতো। তখন ‘ঝুট হ্যায়’—বলে এগিয়ে গেলে সবগুলো বসে পড়ে। এন্দুরের টংটা খুব গরম হয়। গরমের ভেতর আরও গরম। কুণ্ঠা নয় ক্রেজ তৈরি করে। ক্রেজের ঠ্যালায় মরা শলিকের মুখে সরীসৃপের রাগ প্রস্তুত হয়। তখন না-খাওয়া বাহিনীর পেটক্ষুধা আর যৌনক্ষুধা এক হলে—ভিন দিকে তাকায়। চোখ নামায় না। চোখের সম্মুখে বিরাট সামিয়ানা আর ওই কলাপাতার ওপারে কারো হলদ্যা রঙজ্বলা শাড়ি দেখে কাঁপে ছায়ায় দোলে, রোদ ও রঙ শুষে নেয়—শোষণের ছলে শাসন করে। তখন বাহিনীর মন ভর করে তাতে কীসব আঠালো গাঢ় আয়না নাকি পাতকুয়ার পাড়ের জলভরা জোলার পানি দেখে—জোলার পানির কাঁপুনি আর শাড়ির কাঁপুনি আলাদা ভাবে খেললেও সেটি একইরকম হয়। বাহিনীর মনের বারান্দা এন্দুরের টঙ থেকে বহুদূর প্রসারিত হয়ে সেটি নাচতে নাচতে থ্যালথ্যালথেলির পানিরঙা কামিজের বুকের ওপর পড়ে। সেখানে হাতড়ায় আর পনির তেষ্টা মেটানোর বৃথা চেষ্টা করে। এরকম অবস্থার ভেতরেই আবার কমান্ড কানে আসলে সবটাই সরে যায়। থ্যালথ্যালির মুখও থাকে না। মরা শালিক বা সরীসৃপ সরিয়ে তখন কমান্ডই গুরুত্ব পায়। তারপর কী এক তর্জনীর ইঙ্গিতে সব্বাই এন্দুরের টঙ ছাড়ি ফলির বিলের দিকে টার্ন নেয়। অতঃপর আর তাহারা কি করিল জানা কঠিন হয়। কিন্তু থ্যালথ্যালি তখনও প্রভা হয় নাই।
তবে খুব বেশিদিন নয়। পাড়াটা উঠে যাক, তেলাপোকার মতো হেথাহোথা চলা জনসমষ্টি কই যায়, কী হয় কেউ জানে নাই। পাড় ভাঙে পাড় গড়ে। পাখিরা চিলের মতো ওড়ে। চিল আর শকুনের পার্থক্য কেউ করে নাই। কেউ লোভী কেউ বেশি দূর ওড়ে কেউ কমদূর । দূর আবার কী? সেগুলোর পরিসংখ্যান কেউ কখনো করে নাই। কেন করিবে? করার বিশেষ কাম নাই। আর পৃথিবীতে কে কতোজনের খবর নেয়। দিনের তরে রাতের মাঝে গৎবাঁধা কিছু পরিবর্তন আসে। এন্দুরের টঙ ক্রমশ বিলোপ হয়। এর পাশের জায়জঙ্গলে নানারকম নতুন গাছ, পরগাছ বড় হয়। অন্ধকারে নানারকম জন্তু জানোয়ারের উপদ্রব বাড়ে। মানুষগুলা নাই হয়া যায়। ছাপড়া, পাতকুয়া, ভেন্নপাতার ঘর সব উন্মুক্ত। তখন নানা দিকে বায়ু বয়। ঝড়জলে কীসব ঘটে। এন্দুর টং না থাক এন্দুরের উৎপাত বাড়ে। তবে এসব উর্বর ভূমির বাড়ন্ত আগাছার ভেতর সবকিছুই প্রকৃতির নিয়মে পরিত্যক্ত স্তূপ হয়ে বিরান লবণাক্ত রোদপাথারে পরিণত হলে ওরা নাই হয়া যায়। বুঝি কোথায় চলি যায়। নদীর পাড়ে—যেখানে হাগা-খাওয়ার সুবিধা বা আহার উপার্জনের সহজ কাম চলে আর নিরাপদ যৌনতা চলিবে সেখানেই তাহারা আছে। থাকিবে। থ্যালথ্যালির জীবনও একমতো। একই নহবতে সহযোগ। বুঝি সেই মোগল এ আযমের জহরত আর সেই প্রাসাদ আর বিলাসী জীবনের অপার সুখ বা আরও কোনো সুখের দিকে সে চলিয়া যায়। চলতে চলতে কার দেখা হবে এ পথে বা পথের সীমানায় কে জানে? জীবনের গল্প তো দাঁড়ায় না। কোন পথ দিয়া কে চলিবে কোথায় যাইবে কে জানে। থ্যালথ্যালির নাম বদলিয়া গেল। হঠাৎই সে এক সেনাবাক্সে করিয়া বা কোন আদরে পড়িয়া চুমুতে চুমুতে এক অজানা ক্যাম্পে চলিয়া আসে। কীভাবে সে হাতবদল হয়, কাহার সান্নিধ্যে সে এলাকার পর এলাকা ছাড়িয়া আসে সে অন্ধকার রাতের কাহিনি কেউ জানে নাই। তবে কেউ একজন কয়, তুমি সুন্দর, তোমারে কাজে লাগানো হবে। কাজের ক্ষেত্রে তুমিই পারফেক্ট। কাজ কী? এটা কি মরুঅঞ্চল? না, সে আসিয়াছে এক বড় আশ্রমে। সেখানে তার ঘষামাজা হয়। নতুন সাবানে স্নান হয়। কীসব গুলজার কথাবার্তায় তাহার মন ভরে। খাওনের তো অভাব নাই। এইটা আর এক প্যান্ডেল। এখানে কিছু মানুষের সেবা কম্ম চলে। সেই কাজে থ্যালথ্যালির কিছু শেখার আছে। মাদার তাহার মন বুঝে কাজ দেন। মাদার এই বড় ক্যাম্পের প্রধান। তাহার নির্দেশে পুরোটা চলে। এই বন্দিশালার শেষ লক্ষ্য কি থ্যালথ্যালি তা জানিবে কেমনে। সে যখন ধরা পড়ে আর কে একজন নিয়া আসে—তখন সে কিচ্ছু বলে নাই। থ্যালথ্যালির বলিবার কে আছে? সে তো নদীর পুরানা জল। জলের গতি উঁচু হইতে নিচুর দিকে। সে ছায়া নিয়া সে নিচুর দিকে চলে। নাইয়া নাও বায়। সমস্ত ভরা জীবনের সেই ছন্দ কাইয়ূম চৌকিদার, এন্দুরের টং, বিষণপুরের বটতলা কবেই কোথায় চলিয়া গেছে। সব ছেড়ে এ পাড় ওপাড়—সেই দলবদ্ধ হয়া নদীর বাতাত ঠাঁই নেছেলো। তারপর ঘুমের রাইতে কী এক বাঁশির আওয়াজে আবার তাহারা ঘুমভাঙা চক্ষে কোনদিকে তাড়ানো হয়। তাড়াইতে তাড়াইতে চলতে চলতে কোন এক এলাকার খাসজমির দিকে লক্ষ্য আছিল। উদ্বাস্তু তো শুধু বসতিতে নয় জীবনে ও জানেও। ফলে এইরূপ চললেও তার হাগামোতা লাগে। একসময় তাহারা শরীর থেকে মাসান্তরের ঋতু শুরু হয়। কিছুই তো সে জানে নাই। বুঝে ওঠার আগেই এপার ওপার ধাওয়া জীবনের তরে কাক আর শকুনের কল্লোলের ক্রিয়ার এই জালে সে আটকাইয়া যায়। প্রথমে নাকি ওরা কয়, এইডা কামে লাগবো। সত্যিই সে বুঝি কোনো কামে লাগছে। মাদারের আশ্রয়ে সে কামের মধ্যে থাকে। স্বাস্থ্যবতী হয়। সুখী হয়। শন্তি পায়। সবটুকু নিয়া সে বড় হয়। ক্রমশ সে কালোর ওপর আলো পড়ে। আলোর রোশনাই তো এমনিতে নয়। মায়া পাইলে কতোকিছুই আর পুরানা থাহে না। সে স্বভাবে বদলায়। পরিবেশের আনচানে ছায়াপাত করে। ছায়ার মধ্যে উষ্ণতা রচিত হয়। গভীর নিদ্রা প্রসব করে। নৈঃশব্দ্যের রাতে নয়া যৌবনের আবেশ রচিত হয়। কতোরকম প্রসাধনীতে রোদ তার রঙ বদলায়। নির্বিশেষের রদ্দি জীবন ফেলিয়া বিশেষ হয়া ওঠে। শীত সকালের পচা চালকুমড়ার বদলে কচি সবুজ শসার শিরিস গদ্য রচিত হয়। ভোরগুলো নানা আলাপচারিতায় ভরানদীর মতো ডগমগে হয়া ওঠে। কী নাই তার এখন। থ্যালথ্যালিকে রাতের চাদরে গ্রহণ করিয়া মাদার বলে তুমি ‘প্রভা’। যে আলো আর ছায়া তোমার সতেজ স্বাস্থ্য দিয়াছে সেখানে তুমি বন্য নও ধন্য। তাই তুমি তোমার আলোয় এখানে একসময় আমার হয়া অন্যদের ছায়া দিবা। প্রভার প্রচুর আলোকে কতোকিছুই নতুন আলো পাইবে সেটা তুমি বুঝিবে। ছায়া আরও বড় হয়। শিমুল বড় হয়। শিমুলের গোড়াটায় উঁই ধরিয়াছে। সেখানে বুঝি সন্ত্রাস চলে। কীরকম একটা বেপরোয়া গোড়ার অংশটা। উপরের লালে লাল প্রভাময় গুচ্ছ গুচ্ছ করতাল। সে করতালে গভীর রৌদ্রছায়ার নিবেশ নৈতিকতায় থাকে। কিন্তু গোড়াটা চাপে হোক আর নিশ্চাপে থাক—কেমন ঢেউ ঢেউ হয়া ফুটে থাকে। উঁই লাগে। তাতে বস্তির মানুষের পচা মোটা কাপড় শুকানো যায়। কেউ গোবর শুকায়। প্রভার দশা কী সেই শিমুলের। কতোভাবেই তো সে সেবায় চিন্তায় দক্ষ হইয়া রৌদ্র আর জ্যোৎস্নার জীবন গড়ে। কিন্তু গোড়াটা নান্দনিক নয়। সে শুধু কাইয়ূম চৌকিদার আর বিষণপুরের জন্য উন্মুখ হয়া থাকে। তার মুক্তির জায়গা যেন সেটাই।
মাদার যতোই শিক্ষা দিক, আনন্দে রাখুক, জীবনের সবটুকু নক্ষত্রনিষ্ঠা শিখিয়ে দিক তবুও ফিরে ফিরে সে চৌকিদারের কথায় ফিরে যায়। সেই তো তার জীবনদাতা। সেই তো প্রথম ওই বিষণপুরের জমিনে জীবন ফিরিয়া দিয়াছিল। তারপর এখন সে ফিরিয়া চলে শেখে দেশজন্মের কথা কয়, সত্যস্বরূপা হয়া সকলেরে আগলাইয়া রাখে, কী যে সে তর্জনীর দাম, যেজন্য সবটুকু স্বপ্ন দিয়া সে সকলেরে এক কইরা ফেলে। তবে হ, মাদার তার আর একটা জেবন দেছে। এরকম কইরা কইলে তো যে তাতে সেই আন্ধার রাইতে পছন্দ করছিল সেও তো জেবন দেছে। মাঝেমধ্যে তার মনে পড়ে : ‘আসমান জমিন ফারাক কইরা অকাল কুসুম রোও রে বন্ধু... / কাছে আইসা নিবা রে হয় / নিও রে বন্ধু... রে হায় নিও রে বন্ধু’—গুনগুনাইয়া সে গায়—কই পাইলো এই পূন্নিমাসুর, সেই বিষণপুর—বুনোহাওয়ার সেই দিন। ভাবতে ভাবতে সে কাইন্দা দেয়। প্রভা এখন বুইঝা গেছে, সমস্ত সুখ যেন সে কিইনা ফেলাইছে। কীভাবে কে যেন তাকে ডাকে, হুপ পাইড়া কান্দে। এই সুখের জীবন তার তেমন আনন্দ দেয় না। ভেতরে একটা কঠোর জেলখানা তৈরি হইছে। এইটা কী? কেন এমন হয়! এই হাসপাতালের জেবন একসময় তাহাকে বিতাড়িত করে, গুনগুনাইয়া ভজে—নিও রে বন্ধু ... ও হায়—কইতে কইতে সে শুইয়া যায়। সমস্ত শরীরজুড়ে কামনার মানচিত্র ছাইয়া রয়। নিজের সাথে নিজেরে রমণ করতে মন চায়। রমণের সুখ তারে অ্যারেস্ট কইরা ফেলে। নিজের মুখ, বুক, স্তনবৃন্ত, পেট, নাভি, উরু, পদযুগল, অঙ্গুলিগুচ্ছ, নখের ছাদ নিয়ে সে এক অদ্ভুত পুরু পুকুর তৈরি কইরা ফেলে। সেখানে সে ডুবিয়া যায়। আচ্ছন্ন হয়। কম্প্রমান মুখ কাঁপে। ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু বিসর্জিত হয়। বৃত্তাকার বর্ণালি আভায় কার কথা মনে আসে? জোবেদার স্বামী কাইয়ূম চৌকিদার? সে তার বাপ? না—বাপ কেন? তার সুন্দর সোনা মুখ, যে মুখে সে চুমা দিছিল, আদর করছিল, বাসনা দিছিল—সেই বাসনা বুঝি তারে আবার ডাকে—আয় আয় আয়! উপদ্রব নয়, আনন্দ পায়। সে তারে ভালোবাসছে। সে তারে প্রেম দিছে। প্রীতি দিছে। আর আমি তার লগে যামু। প্রভার বৃত্তে কাইয়ূম চৌকিদার ছায়া হয় থাকে। শীতল হাতের স্পর্শ ভুলি যায়। ফুল ফল নীলাকাশ সবটুকু ওই ঘুমের তিমিরে ডুইবা থাকে। এ এক নিরুদ্বেগ রাজশিশু যেন। সে কি তবে জোবেদার হয়া চৌকিদারের কাছে নিজেরে সাজাইছিল। কালো আঁখির মতো এক কবিতার নবীন জাতক হয়া উঠেছিল। পারে না তাই পরির মতো সে হাওয়ায় দোলে। কিন্তু হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে এলে প্রভা অস্থির হয়। অন্য জীবন আর এ জীবন একাকার করিয়া মাদারের আহ্বানে ফিরে যায়। মদির মায়া চুবিয়া যায়। কিন্তু পরিণতি তার যাই হোক—সে এই পূর্ণতর আয়েসের রাজশিশুর জীবন হইতে মুক্তি চায়। সে ফিরিবে ওই বিষণপুরের বটতলায়।
বটতলায় যখন কেউ নাই, এন্দুরের টং যখন হারানো প্রত্নগহ্বরে নিপতিত তখন তিমির গহন রাত্রি। সে সবটুকু নিয়া সেখানেই হাজির। মাদারের শর্ত মাথায় নিয়া সে এখানে আসিয়াছে। এখন সে নতুন দিনে কতো প্রশান্তির চিত্ত মন্থরিত হতে দেখে। তাই তার এ স্থান মাতৃগর্ভের সুখের মতো। এখানেই সে নিজের কাজের বিস্তৃতি যখন ঘটাইবে তখন কুহু-ঝঙ্কারের নেশায় সে অবমুক্ত। এই মুক্তি তাহার প্রাপনীয়। সে প্রাপ্য। আত্মহারা সে এবার। এই ফেরা আর কাইয়ূম চৌকিদারের জীবনে ফেরা যখন একইরকমের তবে—সে কিছুদিন এখানে থাকিয়াই মেল্যা রকমের কাম করিতে পারিবে। মাদারের স্বপ্নের একটা এক্সটেনশন এখানেই গড়িয়া উঠুক। কিন্তু সেটি তো সহজ নয়। এই নিরাকপড়া এলাকায় এসব জীবনকর্ম কেউ মানিবে না। তবে অর্থকড়ি আর অন্তরঙ্গ স্বচ্ছলতা আনিতে পারে নতুন পরিবর্তন। সে পরিবর্তনের জন্যই কাইয়ূম চৌকিদারের স্মৃতিমাখা এই স্থানে তার প্রত্যাবর্তন।
কিন্তু গল্পের প্যার‌্যা আর জীবনের প্যারা যখন বাড়ে সবকিছু সে সামালাইয়া তীরে ওঠারই চেষ্টা করে। সেটা যখন অনুশীলনের বাতাসে জুড়িয়া গভীর আরামে কর্মক্লান্ত তখনই একপ্রকার প্রভা আত্মমাঝে নিজেরে বিলায়। তাতে দেশটা আর দেশের মাটির কৃত্যঋণ সহস্র আকাশে কীসের উত্তর খুঁজিবে কে জানে? হঠাৎ মৃত্যুর পরও হঠাৎ জন্মের মতো সে শুধু সকলের হাহাকাররূপে মধুর নিশায় ব্যাপৃত থাকিল। কাজ আর কিছু পুরাতন কথাই তখন ঘুরিয়া ফিরিয়া আসে কিন্তু তা মাত্র কয়দিন! তারপর এই দণ্ডে পৃথিবী সুন্দর হয়া স্বাভাবিকরূপে চলিতে থাকে আর ক্রমশ তা নিজের মতো বদলাইয়া যায়। তখন উপায় কী? গল্পের তো শেষ নাই! এক চৈত্র—চৈতালি গেলে আবার কোনো চৈতালি আসিবে। পুনর্বার তাহা গল্পের জন্য আর এক তোরণ তুলিবে—মরিবে—আবার তুলিবে...

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১২:৫১

মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬) লেখক পরিবার থেকেই এসেছিলেন। পিতৃমাতৃ—দুকূলই লেখক ছিলেন। এমনকি শ্বশুরকূলও। পুরুষানুক্রমেই এঁরা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মহাশ্বেতা দেবীর জীবনটা সাহিত্যের কাছেই সঁপে দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন দুহাত খুলে। ‘হাজার চুরাশির মা’ (১৯৭৪) তার অন্যতম আলোচিত উপন্যাস। গ্রন্থখানির পাঠপরিক্রমায় কিছুটা সাবধানী মনে এগুতে হয়। মাঝেমধ্যেই নিত্যনতুন চরিত্রের দেখাসাক্ষাৎ ঘটে। সিংহভাগ চরিত্রই দিব্যনাথ-সুজাতা পরিবারের। উপন্যাসখানি বুঝে নিতে চাইলে এদের মধ্যকার পারষ্পারিক সম্পর্ক স্মরণে রাখা খুবই জরুরি। পরিবারটি অনেকটা উনিশ শতকের ক্লাব-কালচারের ন্যায় সামন্তধারায় গড়ে ওঠে। ভোগবাদী প্রবৃত্তি এদের মধ্যে তীব্রতর। দিব্যনাথের নিজস্ব ‘চার্টার্ড অ্যাকাউনটেনসির আফিস।’ প্রতিনিয়ত মোটা টাকা আসে। জ্যোতি, নীপা অথবা তুলির স্বামীরাও কর্পোরেট কর্পোরেশনে হাই সেলারির জব করে। সবাই ভোগবিলাসে মত্ত। এদের চারিত্রিক স্খলনও কম নয়। অফিসের টাইপিস্ট মেয়েকে নিয়ে দিব্যনাথের ঢলাঢলি, মাঝেমধ্যেই রক্ষিতা নিয়ে বাইরে সান্ধ্য কাটানো। ঢেকেঢুকে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে সর্বসম্মুখে সহাস্যে এসব ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়। এসব সে পৌরুষ-অধিকার বলেই জানত। কেবল বর্তমান নয়, চিরকালই দিব্যনাথ নারী নিয়ে নোংরামি করে আসছে। শাশুড়িও কম প্রশ্রয় দেয়নি। ছেলে তার ‘পুরুষ বাচ্চা’, স্ত্রৈণ নয় বলে অহংকারও করত। দিব্যনাথের পিতাও নাকি যৌবনকালে এমনই ছিল। প্রায়শই সন্ধ্যাবেলা নারী নিয়ে বাইরে কাটাত। পরপর দুই পুরুষের নৈতিক অধঃপতন তৃতীয় পুরুষ জ্যোতি অথবা নিপাদের কাছেও সমভাবেই সমর্থন পায়। সামন্ত প্রভুর ন্যায় দিব্যনাথ নিজেকে পরিবারের ‘বস’ বলে বিবেচনা করত। সন্তানেরা অনেকেই ইনিয়েবিনিয়ে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে বাবাকে ‘বস’ বলেই সম্বোধন করত। এমনকি কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতীও। তবে এই সন্তানের মেজাজটা ছিল খানিকটা ভিন্ন ধার ও ধারার।

২.
অর্থবিত্তে স্বচ্ছল হলেও পরনারীতে অভ্যস্থ হওয়ায় দিব্যনাথ-সুজাতার দাম্পত্য-সম্পর্ক সুখের ছিল না। দিব্যনাথ সুজাতাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতো না। বরং যৌন পার্টনার হিসেবেই বিবেচনা করত। অসুখবিসুখ হলে খোঁজখবর নিত না। নবজাতকের কান্না থেকে বাঁচার জন্য তেতলায় ঘুমাত। প্রসূতি স্ত্রী থেকে দূরে অবস্থান করত। শাশুড়িমাও ছিল নারীবিদ্বেষী মহিলা। সুজাতার সন্তান জন্মদান সইতে পারত না। প্রসবকাল দেখলেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেত। তীব্র প্রসবযন্ত্রণা নিয়ে সুজাতাকে একা একাই নার্সিং হোমে যেতে হতো। দিব্যনাথের নজর কেবল একদিকে—‘আবার মা হবার যোগ্য শরীর হচ্ছে কি না সুজাতার।’ দুবছর পরপর সুজাতার চার সন্তান জন্মে। জ্যোতি, নীপা, তুলি। সর্বশেষ ব্রতী। প্রথম ও শেষে পুত্রসন্তান, মাঝখানে দুটি কন্যাসন্তান। ব্রতীর দুবছর বয়সকালে সুজাতা লম্পট দিব্যনাথের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেছিল। লেখকের ভাষায়—দিব্যনাথ কিছুতেই ওঁকে পঞ্চমবার ‘মা’ হতে বাধ্য করতে পারেনি। দিব্যনাথ সুজাতাকে ফার্মের কাজ ছেড়ে দিতে বলেছিল। সুজাতা মানেনি। ‘কাজ না-ছাড়া সুজাতার দ্বিতীয় বিদ্রোহ।’ 
বাবামায়ের মধ্যকার এই টানাপড়েন ব্রতী খানিকটা বুঝতে পারত। বুঝতে পারত মাতৃবক্ষের সুগভীরে লুকানো তীব্র গোপন ব্যথা। ব্রতীর মনটা কম্পাসের কাটার ন্যায় মমতাময়ী মাতা জগজ্জননী সুজাতার দিকে হেলে থাকত। ব্রতী সর্বদা মায়ের ওপর চোখদুটো সুস্থির রাখত। দশ বছর বয়সেও খেলাধুলা ফেলে বাড়ি চলে আসত। শিয়রে বসে মায়ের মাথায় বাতাস করত। এজন্য দিব্যনাথ ব্রতীকে সইতে পারত না। কনিষ্ঠ সন্তান হলেও শত্রু বিবেচনা করত। ব্রতীকে টিপ্পনি কেটে দিব্যনাথ কখনো বলত ‘মাদার্স চাইল্ড’ কখনো বলত ‘মেয়েমার্কা ছেলে। নো ম্যানলিনেস।’                 
মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে এই পুঁজিবাদী পরিবারের চরিত্রগুলো দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে পারিবারিক ‘বস’ দিব্যনাথ ও জ্যেষ্ঠ তিন সন্তান জ্যোতি, নীপা, তুলি। সেইসঙ্গে এদের পূর্বপ্রজন্ম ঠাকুরমাও। অপরদিকে সুজাতা ও তার কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতী। এই দ্বন্দ্ব কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমসাময়িক সমাজ অথবা রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব। এমনকি বৈশ্বিকও। বিশ্বজগৎ সংসার তখন ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দুধারায় দ্বিধাবিভক্ত। দ্বন্দ্বটা এতই জটিল ছিল যে, ভাই-বোন, পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীর সমুদয় সামাজিক ও আত্মিক বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। এমনকি রক্তের বন্ধনও।
 
৩.
দিব্যনাথপুত্র ব্রতী পিতার পুঁজিবাদী আদর্শে আস্থা হারিয়েছিল। আস্থা হারিয়েছিল সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থাপনায়। আস্থা হারিয়েছিল মুনাফাখোর ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্ধ নেতাদের ওপর। পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থার স্বপ্ন লালন করত। সমতাভিত্তিক একটি সুন্দর সুষম সমাজ বিনির্মাণের লক্ষে হৃদয় তার জেগে উঠেছিল। লেখকের ভাষায়, তখন সত্তর দশক। মুক্তির কাল। মুক্তির দশকে জনমুক্তির আন্দোলনে অনেকটা সংগোপনেই সংযুক্ত হয়েছিল ব্রতীরা। তখন সাম্রাজ্যবাদী শোষক সরকার ক্ষমতায়। জেলের পাঁচিল উঁচু করে। নতুন নতুন ওয়াচ টাওয়ার বসায়। বন্দিদের জন্য ফটকঅবন্দি খোলে না। সুগভীর রাতে ভ্যানভর্তি বন্দি এলে লেখকের ভাষায়—‘ওপর থেকে ক্রেন নামে। জন্তুর মত বন্দীকে যন্ত্রের নখে আঁকড়ে ক্রেন উঠে যায়, জেলের ভেতর নামিয়ে দেয়।’ জন্তুর মতো হলেও যারা জেলে যায়, তারা অন্তত প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু বাইরের ব্রতীরা নিদারুণভাবে প্রাণটা হারায়। রাষ্ট্রযন্ত্র নানা উপায়ে নির্মম নির্যাতন অব্যাহত রাখে। নির্জন সলিটারি সেলে নির্যাতন চালায়। লেখকের ভাষায়—‘সাউন্ডপ্রুফ। দরজা-জানালায় ফেলটমোড়ানো ফাঁপা রবারের নল বসিয়ে সাউন্ডপ্রুফ করা। ঘরের আর্তনাদ, গোঙানি, মারের আওয়াজ, জেরাকারীর গর্জন, সব শব্দ ঐ নলের জন্য ঘরের ভেতরেই বন্দী থাকে।’

৪.
বিজিত, প্রার্থ, লালটু, সমু ব্রতীর বিপ্লবী বন্ধু। এরাও চেয়েছিল স্বসমাজটিকে বদলে দিতে। সহযোদ্ধা বন্ধুদের বাঁচাতেই সেদিন ব্রতী গিয়েছিল সমুদের বাড়িতে। কিন্তু বাঁচাতে পারেননি। নিজেও বাঁচতে পারেনি। গভীর রাতে সমুদের বাড়ি ঘেরাও করে গুন্ডারা। হিংস্র গলায় বলে—‘বের করে দিন, লয়তো ঘরে আগুন দিমু!’ ব্রতীর কণ্ঠ শুনে কেউ একজন বলে ওঠে—‘হালায় আরেক মালটারে জুটাইছে। বাইর হ ঘটির পোলা।’ হাতে হাত রেখে স্লোগান দিতে দিতে ব্রতীরা বেরিয়ে আসে। বাইরে অন্ধকার। ঘুটঘুটে আধার মুখ হাসি-উল্লাসে ফেটে পড়ে। ভয়ংকর গন্ডগোল। ‘বাড়ী বাড়ী আলো নিভে যাচ্ছে, দরজা জানালা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চমকে সরে যাচ্ছে ভয়চকিম মুখ।’ সহসা স্লোগান থেমে যায়। সমবেত ঘাতকেরা খটখট গুলির শব্দ করতে করতে চলে যায়। সমুর দরিদ্র বাবা থানায় গেলে আততীয়দের নাম শুনে ধমকে ওঠে পুলিশ। পুলিশভ্যান আসতে আসতে সরে যায় ঘাতকেরা। নিতু ওরফে দীপুর মতো ভদ্রছেলেকে তো থানার সামনেই পিটিয়ে হত্যা করে। ‘প্রকৃত খুনি কখনো বন্দুক ধরে না।’ ব্রতী-সমুদের হত্যা-পরিকল্পনাকারীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এমনকি প্রত্যক্ষ ঘাতকদেরও বিচার হয় না। বুক ফুলিয়ে এরা নির্বিবাদে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। সমুর দিদিকে দেখে নির্মম ব্যঙ্গ করে, হাহা করে হাসে আর বলে—‘তর ভাইয়ের ছাদ্দ করলি না ক্যান? ভাল কইরা খাইতাম!’ সুজাতার মনে কত প্রশ্ন—যে শহরে এমন সব জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়, সেখানে পরপর কী করে সংস্কৃতিমেলা, রবীন্দ্রমেলা অনুষ্ঠিত হয়?

৫.
সুজাতা টেলিফোনেই ব্রতী হত্যার খবর পায়। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে—‘কাটাপুকুরে আসুন।’ পিতা দিব্যনাথ কাটাপুকুরে না গিয়ে দৌড়ায় পত্রিকা-অফিসে। পুত্রহত্যার খবর ধামাচাপা দিতে দিব্যনাথ ‘দড়ি টানাটানি করে বেড়াচ্ছিলেন।’ সফলও হয়েছিলেন। লেখক বলছেন—‘দিব্যনাথের ছোটাছুটি দড়ি টানাটানি সফল হয়েছিল। পরদিন খবরের কাগজে চারটি ছেলের হত্যার খবর বেরোয়। নাম বেরোয়। ব্রতীর নাম কোন কাগজে ছিল না।’ পত্রিকাপাতা থেকে ব্রতীকে মুছে দিয়েছিল দিব্যনাথ। মুছতে পারেনি মর্গ থেকে। সেখানে  ব্রতীর অবস্থান ‘হাজার চুরাশি’ নম্বরে। সেদিন ব্রতীর মৃত্যু পিতার কাছে কলঙ্কজনক মৃত্যুরূপে বিবেচিত হয়েছিল। মমতাময়ী মা সুজাতা সুস্থির থাকতে পারেননি। ছুটে গিয়েছিলেন কাটাপুকুরের লাশ ঘরে। প্রাণধন পুত্র ব্রতীর মৃত্যু নিয়ে কোথাও একটু সংশয় ছিল। তাই মুখটুকু দেখতে চেয়েছিলেন। অসীম করুণায় ডোম জানিয়েছিল—‘কি আর দেখবেন মাইজী? মুখ কি আর আছে কিছু?’ সীমাহীন মমতায় সুজাতা সবলে ব্রতীর মুখের আবরণ সরিয়ে দেয়। ‘শানিত ও ভারী অস্ত্রের উলটো পিট দিয়ে ঘা মেরে থেঁতলানো, পিষ্ট, ব্রতীর মুখ।’ আঙুল বোলানোর মতো ইঞ্চি পরিমাণ জায়গাও মসৃণ ছিল না। সবই দলিত, মোথিত, থেঁতলানো। তবু সুজাতা ব্রতী! ব্রতী! বলে আঙুল বোলায়। 
ব্রতীদের অপরাধ, ওরা দেয়ালে দেয়ালে বয়ান লিখত। ওরা লাল অক্ষরে লাল শব্দে দেয়াল রঙিন করে তুলত। কেবল মুক্তকণ্ঠে সমবেত স্লোগানই ধারণ করত না, প্রাণভরে বিশ্বাসও করত। দেবীর ভাষায়—‘ব্রতীরা এই এক নতুন জাতের ছেলে। স্লোগান লিখলে বুলেট ছুটে আসে জেনেও ব্রতীরা স্লোগান লেখে। কাটাপুকুর যাবার জন্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয়।’ ব্রতীরা এতটাই সমাজবিরোধী যে, দিব্যনাথের ন্যায় পিতারা মুখাগ্নিও করতে আসে না। ব্রতীদের লাশ কাটাপুকুরের মর্গে পড়ে থাকে। রাতে পুলিশ গাদাগাদি করে শ্মশানে বয়ে আনে। এরপর আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। শ্রাদ্ধে বিশ্বাসীজনও যথানিয়মে শ্রাদ্ধ করার সুযোগটুকুও পায় না। স্ফীত লাল চোখে বসে থাকতে হয় সারাটা দিন।

৬.
নকশাল আন্দোলনকে (১৯৭০) কেন্দ্র করে মহাশ্বেতা দেবী উপন্যাসটির আখ্যানভাগ সাজিয়েছেন। কল্পনার সঙ্গে সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতার দরকারি সমন্বয় ঘটয়েছেন। সেই সঙ্গে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তির সংগ্রামে (১৯৭১) কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা ‘বাংলাদেশের সহায় ও সমর্থনকল্পে পশ্চিমবঙ্গ তোলপাড় করে ফেলেছিল।’ কিন্তু নকশাল আন্দোলনের হত্যাকাণ্ড তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি অথবা এরমধ্যে পৈশাচিকতা খুঁজে পাননি। যদি পেতেন, ‘তাহলে ত কলকাতার কবি ও লেখক ওপারের পৈশাচিকতার সঙ্গে এপারের পৈশাচিকতার কথাও বলতেন।’ কিন্তু বলেননি। মূলত প্রান্তজনের বেঁচে থাকার লড়াই, লড়াই শেষে নিদারুণ পরিণতিই তুলে আনতে চেয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী। দেবীর গদ্যশেলীতে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও অসীম মমতায় সেটি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। উপন্যাস হয়ে উঠছে উপভোগ্য সেইসঙ্গে সাব-অলটার্ন হিস্ট্রির দরকারি দালিলিক শিল্পকর্ম। ২৮ জুলাই প্রয়াণদিবসে লেখকের প্রতি অশেষ প্রণতি।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১৮:৩৬

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা। কাঁটাবনে অবস্থিত প্রকাশনা সংস্থা ‘উজান’ এমন ঘোষণা দিয়েছে তাদের প্রকাশিত ‘কোরিয়ার কবিতা’ ও ‘কোরিয়ার গল্প’ নিয়ে আলোচনার জন্য।
এই বই দুটিতে রয়েছে কোরিয়ার বিশ ও একুশ শতকের উল্লেখযোগ্য কবিদের কবিতা এবং একই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিকদের ছোটগল্প। 
উজানের এই আয়োজনে সহযোগিতা করছে লিটারেচার ট্রান্সলেশন ইনস্টিটিউট অব কোরিয়া। 
বই আলোচনার সর্বোচ্চ পুরস্কার ২০ হাজার টাকা। এছাড়া দ্বিতীয় পুরস্কার ১৫ হাজার এবং তৃতীয় পুরস্কার ১০ হাজার টাকা। এই প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত সর্বোচ্চ ১০ আলোচকের প্রত্যেককে দেওয়া হবে ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের বই। 
আলোচনাগুলো বাছাই করবেন দেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও অনুবাদকদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারক কমিটি। একজন একটি বই নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন। আলোচনা বাংলাভাষায় লিখিত বা ভিডিও মাধ্যমে হতে হবে। 
অংশগ্রহণে ইচ্ছুক অনলাইনে ফরম পূরণ করতে করতে পারবেন এসব লিংকে www.ujaninfo.com, www.porospor.info। ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আলোচনা জমা দিতে হবে [email protected] এ।
বিস্তারিত জানতে এবং বই সংগ্রহ করতে পারবেন www.ujaninfo.com, www.facebook.com/UjanPrakashan, https://www.facebook.com/UjanBooks থেকে।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

কথা হয় জানি না 

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২১, ১৯:৪৪

কিছু ছবি এখনও আছে বলে কথা বলার দু-একটা মানুষ পাওয়া যায়>প্রতিবার মেঘ হলে মেঘমল্লার শুনে বৃষ্টি ভোলা যায় না>নিহত পশুররক্ত আর মাংস বাতাসে>দুঃখ আছে বলে কয়েকটা কবিতা এরপরও লেখা হবে>সকালগুলো ঘুমিয়ে কাটে বলে আর অপরাধবোধ জাগে না>রাত পেয়ে যাই>বাতাস কিন্তু ঘুরে যাচ্ছে>সময়ে সব বদলায় এ তত্ত্ব এখনও প্রমাণের চেষ্টা চলে>ঘরের মধ্যেও এক নেশা আসে বাইরেও এক নেশা যায়>নেশা>হেই হ্যালো, আমি হাস্নাহেনার গন্ধও পাচ্ছি>মাংসের গন্ধের সাথে>ছবি কিন্তু সব কথার উত্তর দেয়>হুহু করে উত্তর>থেকে বাতাস আসবে দুমাস পরেই>যদি বলি ছবিকে, কী, সে পাল্টা প্রশ্ন করে না>যদি বলি, কেন ও ইত্যাদি, পাল্টা প্রশ্ন করে না>যার যা উত্তর তা বুঝিয়ে দেয় আজকাল প্রতি রাতেই প্রায়>উত্তর পেতে পেতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে…>চরাচরে পাখি থাকলে বলে দিয়ো তাদের পাখায় আর কোনো শব্দ নেই>তাদের ওড়ায় আর কোনো নীরবতা নেই<

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বোকা দুপুরের নাম

বোকা দুপুরের নাম

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২১, ১২:১৮

বিকালের মেঘ ভেদ করে ঠোঁটজুড়ে আসে স্নিগ্ধ জলধারা। বহমান শান্ত জীবনের স্তুতি। তিনি হেসে চলেন, মন মাতানো মুগ্ধতা ছড়ায় চারপাশে। কংক্রিট শহরের মিহি আলোর অডিটোরিয়ামে মানুষ মানুষের বিশ্বস্ত চোখ খোঁজে। স্বপ্ন দেখে সরল বৈভবহীন জীবনের। যে স্বপ্নের স্পন্দন এখন ছড়িয়ে গেছে সমস্ত বাংলাদেশে। মঞ্চে যিনি অনর্গল কথা বলছেন সেই ‘আলোকিত মানুষ’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। বাগ্মী এ মানুষটির জীবন বহু কাজে বহু সৃষ্টিতে উদ্ভাসিত।

তাঁকে বুঝতে হলে তাকাতে হবে তাঁর অজস্র সৃষ্টিশীল বইয়ের দিকে, পাঠ নিতে হবে তাঁর আত্মজৈবনিক বইয়ের সরস বয়ান। জানতে হবে তাঁর ব্যাপক কর্মজীবন সম্পর্কে। চোখ খোলা রেখে আমাদের নিবিষ্ট হতে হবে সবুজ নিসর্গ, মানুষের কাছাকাছি বাংলার শ্যামল প্রান্তরে, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যে। সেই প্রকৃত সত্য খুঁজতে গিয়ে যন্ত্র বা নাগরিকতার ছোবলে যেখানে তাঁর হৃদয়ও আশাহত হয়েছে।

তিনি কবিতায় উচ্চারণ করেছেন―

একা একা টের পাই চারপাশে―আকাশে ও নিচে―
অবিশ্রান্ত আর্তনাদে ভেঙে যায় বহুদিনকার
ধানভানানীর গান এদেশের, পাটক্ষেত, বেহুলার ঘর―
ঢেঁকির পুরনো গল্প, সাপ, ঝোপ, দোয়েলের দেশ―
বাংলাদেশের আবহমানের।
(শাব্দিত কলঘর, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ২০)

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, জন্ম ২৫ জুলাই ১৯৩৯ সালে। অবিভক্ত ভারতে কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায়। পিতা সেময়কার স্বনামধন্য অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও নাট্যকার আযীম উদ্দীন আহমেদ, মাতা করিমউন্নেসা বেগম। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলায়। দেশভাগের পর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ পরিবারের সাথে চলে আসেন তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে। পিতার চাকরি সূত্রেই তার শৈশবের কিছু সময় কাটে টাঙ্গাইলের করটিয়ায়। সেখানকার বংশী নদী তাঁর শৈশবের মনোহর চিন্তায় দারুণভাবে গেঁথে আছে। তাঁর আত্মজৈবনিক বই বহে জলবতী ধারা প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, নিষ্ফলা মাঠের কৃষক ইত্যাদি তাঁর বহমান জীবনের নানান অভিজ্ঞতা, জীবন গল্পের সুনিপুণ বৃত্তান্ত। পিতার নাট্যচর্চা ও কবিতার খেয়াল তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করত। কলেজে পড়া অবস্থায় বুঁদ হয়েছেন কবিতায় ও সরল জীবনের দর্শনে। মূলত তার ব্যাপ্তিময় জীবনের ভিতটা সেসময়ই রচিত হয়েছিল। কলেজজীবনে তার কিছু শিক্ষকের অবদানও এক্ষেত্রে স্বীকার্য। কলেজজীবনেই তিনি ভ্রমণ করেন ইংরেজি কবিতা ও বাংলা কবিতার অপার সৌন্দর্যের ভূমিতে। যা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৬১ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে যোগদানের মধ্যদিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়। যা অব্যাহত ছিলো ১৯৯২ সাল পর্যন্ত। হরগঙ্গা কলেজ ছাড়াও শিক্ষকতা করেছে সিলেট মহিলা কলেজ, রাজশাহী কলেজ, ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজ (বর্তমানে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ) এবং সর্বশেষ ঢাকা কলেজে দীর্ঘসময় অধ্যাপনার পর অবসর গ্রহণ করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে বাংলা পড়াতেন। অধ্যাপক হিসেবে তার সফলতা ও জনপ্রিয়তা ছিল গগনচুম্বী। মূলত তাঁর সকল কাজের মাধ্যমেই তিনি মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। উজাড় করে দিয়েছেন সবটুকু। শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিজের কথায়―

আমি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলাম। সাহিত্যের স্বপ্ন ও সৌন্দর্য আজীবন আমার চেতনা-জগতে যে-হীরের দীপ্তি ছড়িয়েছে আমি সেই উজ্জ্বলতাকে ছাত্রদের ভেতরে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছি। তাদের সেই আনন্দে উজ্জীবিত করতে চেয়েছি। পরীক্ষায় ছাত্রদের বেশি নম্বর পাওয়াবার জন্যে পরিশ্রম করে জীবন নিঃশেষ করাকে আমার কাছে ‘দুর্লভ মানবজন্মে’র অপচয় বলেই মনে হয়েছে। জীবন কত দীপান্বিত ও জ্যোতির্ময় তা একজন ছাত্র সবচেয়ে ভালো করে জানতে পারে তার জীবনে দীপান্বিত শিক্ষকদের কাছ থেকে। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১১)

বর্তমান সময়ের শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে স্পষ্ট কথা বলতেও এ সফল অধ্যাপক দ্বিধা করেননি। প্রসঙ্গক্রমেই তিনি লিখেছেন―

আজ দেশের স্কুল-কলেজগুলোয় কার্যত লেখাপড়া হচ্ছেই না। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ লক্ষ শিক্ষকের অধিকাংশই শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নন, যাঁরা যোগ্য তাঁরা ছাত্রদের দেন অতি সামান্য। ফলে অভিভাবকরা কেউই বিদ্যালয়কে আজ তাঁদের সন্তানদের বিকাশের অঙ্গন হিসেবে মনে করেন না। ফলে বাণিজ্যিক উদ্যমসম্পন্ন গৃহশিক্ষকরা আজ হয়ে উঠেছেন ছাত্রসমাজের মূল আশ্রয়। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১৭৬)

বাংলাদেশের ষাটের দশকে নতুনধারার সাহিত্য সৃষ্টির আন্দোলনের পুরোধা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। প্রায় একযুগ ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা সম্পাদনা করার মাধ্যমে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলা সাহিত্য বাঁকবদলের ধারায়, প্রগতিশীল সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াসে। নিশ্চিত আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন সেসময়কার তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনালগ্ন হতে যুক্ত হন উপস্থাপনায়। রুচিশীল ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, উপস্থাপনায় তার নিজস্ব ধরন ইত্যাদি কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় উপস্থাপক খ্যাতিতে ও ব্যক্তিত্বে। তাঁর হাত ধরেই অনেক মেধাবী তরুণ উঠে আসে। তাঁর ‘আমার উপস্থাপক জীবন’ বইটিতে তিনি তুলে ধরছেন তাঁর উপস্থাপক জীবনের নানান দ্বন্দ্ব ও প্রতিকূলতা। বর্ণনা করছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে যাত্রা আর সমৃদ্ধির বিভিন্ন দিক। আমাদের মহান মুত্তিযুদ্ধে পাকসেনাদের হাতে আটক হয়েছিলেন তিনি। উপস্থাপক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচিয়ে ছিল বলে তিনি বইটিতে বলেছেন নির্দ্বিধায়। তাঁর ‘সংগঠন ও বাঙালি’ বই পাঠকের কাছে খুবই জনপ্রিয়। জাতীয় জীবনে সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা, বাঙালির সংগঠনের দুর্বলতা এবং তা কীভাবে আমাদের জাতীয় জীবনে উন্নতির মূলবাধা হয়ে দাঁড়ায় তার স্পষ্ট বয়ান রয়েছে বইটিতে। সংগঠনের অভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রায় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, ব্যক্তি ডুবে থাকে তা আত্মকেন্দ্রিকতায় এসবের সত্য উপলব্ধি উঠে এসেছে তাঁর লেখায়।

১৯৭৮ সালে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। তিনি কবিতায় লিখেছেন―

রাত্রিকে বাসে না ভালো কেউ সম্প্রতি। কেননা এ
রাত্রি সব এক করে দেয়। রাত্রির নির্বাক কাফন
জামার পৃথক রঙ, স্বতন্ত্র চুলছাঁটা, আস্তিনে মাপ
মুছে দিয়ে সবাইকে আদ্যোপান্ত এক পাতলুনের ভেতর
নিয়ে আসে।
(মৃত্যুময়ের জন্য, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ৫৬)

হ্যাঁ, তিনি এমন রাত্রিকেই দূর করতে চেয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন সংস্কৃতিমান, মুক্ত চেতনার সৃজনশীল মানুষ না হলে আগামী বাংলাদেশ হবে অনুর্বর, অন্ধকার। তিনি বইয়ের সোনালি অক্ষরে, জ্ঞানের অমৃতবাণীতে বদলাতে চেয়েছেন সমাজকে, তরুণদের। বই পড়া আন্দোলন ও নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লক্ষ হচ্ছে―আগামী দিনের অর্থাৎ তরুণদের বড় করে তোলা ও তাদের সংঘবদ্ধ জাতীয় শক্তিতে পরিণত করা। প্রায় বিয়াল্লিশ বছর ধরে তাঁর নেতৃত্বে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বিভিন্নভাবে কাজ করে চলেছে অবিরাম। এগুলো মধ্যে রয়েছে―দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রম, পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি, আলোর ইশকুল, কেন্দ্রের লাইব্রেরি, আলোকচিত্র চক্র, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি। সারা দেশে প্রায় ২৪ লাখ ছাত্র/ছাত্রী বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কার্যক্রমের সাথে যুক্ত। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন―

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবনের সর্বাধিক কীর্তি হিসেবে দেখা দেয়। যেখানে আমরা অনেকে মিলে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারি না, সেখানে একক প্রচেষ্টায় এত বড় একটা প্রতিষ্ঠান গড়া যে তাঁর বিশেষ যোগ্যতার প্রকাশ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর ব্যাপ্তি সারা দেশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের সীমানা ছাড়িয়েও।…সায়ীদ লিখেছেন প্রচুর। কবিতা ও ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও ভাষণ, স্মৃতিকথা ও জার্নাল, নাটক ও অনুবাদ।…তাঁর মধ্যে মিলিত হয়েছে শিল্পী ও কর্মী, ভাবুক ও উদযোগী। তাঁর চিন্তা ও সাধনায় দেশ ক্রমাগত উপকৃত হোক। (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, পৃ. ৩৫, ৩৬)

সত্যিকারভাবেই বহুমুখী কাজের মাধ্যমে তিনি উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩২টি। গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতায় সাহিত্যে বিভিন্ন শাখায় তিনি অবদান রেখেছেন ও রেখে চলেছেন। সামাজিক নানা কাজেই তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। যেমন ডেঙ্গু প্রতিরোধ আন্দোলন, পরিবেশ দূষণবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি। তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন সম্মাননা ও পুরস্কার। এগুলোর মধ্যে আছে―জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার (১৯৭৭), র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার (২০০৪), একুশে পদক (২০০৫), পরিবেশ পদক (২০০৮), বাংলা একাডেমি পদক (২০১২) ইত্যাদি।

‘আলোকিত মানুষ চাই’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের দেখানো পথেই আগামী দিনের তরুণদের মধ্যে ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’ বই পড়ার মাধ্যমে এমন অনুভূতির প্রবহমানতায়, চর্চায় হয়তো আমরা পাব সংঘবদ্ধ, প্রগতিশীল, আত্মকেন্দ্রিক জীবনকে পেছনে ফেলে আসা দেশপ্রেমিক বুদ্ধিদীপ্ত এক প্রজন্ম। যা বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।

এ মহীরুহের জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা।

সহায়ক গ্রন্থ

১. বহে জলবতী ধারা (প্রথম খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
২. বহে জলবতী ধারা (দ্বিতীয় খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০১১।
৩. মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৮৮।
৪. নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৫. বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৬. আমার উপস্থাপক জীবন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৫।
৭, সংগঠন ও বাঙালি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
৮. আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, সম্পাদনা―আতাউর রহমান, ঢাকা, ২০১৫।
৯. ইন্টারনেট।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২১, ০৯:০০

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (২৩ জুলাই, ১৮৯৮-সেপ্টেম্বর ১৪, ১৯৭১) বিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি কথাসাহিত্যিক। তার সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি গল্পগ্রন্থ, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধের বই, ৪টি আত্মজীবনী, ২টি ভ্রমণ কাহিনী, ১টি কাব্যগ্রন্থ এবং ১টি প্রহসন। তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, পদ্মশ্রী এবং পদ্মভূষণ পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন।

 

যা খুব ছোট, তাকে খুব কাছ থেকে না দেখলে ভালো করে চেনা যায় না। দূর থেকে তা অস্পষ্ট দেখায়। কিন্তু যা খুব বড়, একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে তাকে না দেখলে, তার ব্যাপ্তিটা অধরা থেকে যায়। প্রথম হিমালয় দর্শনে ঠিক এই রকমই একটা সম্ভ্রম জাগানো অনুভূতি হয় যেকোনো মানুষের। কিন্তু আস্বাদন পরিপূর্ণ হয়, শুধু দূর থেকে নয়, যখন কাছে গিয়েও তাকে দেখি।
কিন্তু আমার তারাশঙ্করের দর্শন ঘটেছিল এর ঠিক বিপরীত ক্রমে। তাঁকে প্রথমে দেখেছিলাম খুব কাছ থেকে, পরম স্নেহের নৈকট্যে। সে প্রথম যে ঠিক কবে তা আজ আর বলতে পারি না—তবে স্মৃতির ভেতরে প্রথম যে ছবিটি দেখি তা সম্ভবত ১৯৪৮ এর, এবং স্থান কলকাতারই বাগবাজারের ১/১ আনন্দ চ্যাটার্জি লেনের একটি বাড়ির দোতলার ঘরে। একটি সাবেকী আমলের খাটের ওপর চড়ে আমরা তিনটি শিশু খেলছি, লাফাচ্ছি, কখনো বা নাচছি—আর অদূরেই কৃষ্ণবর্ণ ধ্যানমগ্ন এক প্রৌঢ় ছোট্ট একটি কাঠের ডেস্কের ওপর গভীর নিবিষ্ট হয়ে লিখে চলেছেন পাতার পর পাতা। মুক্তোর মতো অক্ষরে একে একে ফুটে উঠছে বাংলা কথাসাহিত্যের উজ্জ্বলতম রত্নখনি। তবু সে সান্নিধ্য এত সহজ ছিল বলেই হয়তো আজও সমানভাবে স্পষ্ট। তিনি লিখছেন আর আমরা—তাঁর নাতিনাতনিরা খেলছি। খেলা যখন ছিল তোমার সনে/তখন কে তুমি তা কে জানতো? জানতে পারিনি ঐ নৈকট্যের জন্যই হয়তো-বা। ফলে আমাদের খেলাটা ছিল অবাধ। কখনো ঘরে কখনো ঘর ছাড়িয়ে বারান্দায়—সরু লম্বা বারান্দার ওপাশে আরেকটা বারান্দায় কখনো কখনো দেখা দিতেন লং ক্লথের পাঞ্জাবি পরা, সাদা চুল এক বৃদ্ধ। দাদুর যামিনী দা—শিল্পী যামিনী রায়। মাঝে মাঝে দুই জ্যোতিষ্কের বার্তাবিনিময় হতো এপার ওপার।
ইতিমধ্যে দাদুর সাহিত্যিক খ্যাতি বাড়ছিল। বাড়ি তৈরির কাজও চলছিল। ১৯৪৯ এ বাগবাজার ছেড়ে তিনি উঠে গেলেন টানাপার্কে তাঁর নিজস্ব বাড়িতে। তার কিছুকাল পরেই আমরাও চলে এলাম পাইকপাড়ায় গোয়েল্কা গার্ডেন্স-এর একটি আশ্চর্য সুন্দর ফুটফুটে ফ্ল্যাটে। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। খুব কাছেই দাদুর বাড়ি। রোজ বিকেলে খেলতে যেতাম ওবাড়ির পাশের মাঠে। বাড়ির সামনেই বোগেনভেলিয়ার ছায়অর নিচে দুপাশে রোয়াক, মাঝে বেতের চেয়ার পাতা। দাদু বসে আছেন। তাঁকে ঘিরে আরো কতজন। কথা হতো কত বিষয়ে। মাঝে মাঝেই শৈল দাদু এসে উপস্থিত হতেন। সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। দাদুর বাড়ির ঠিক বিপরীতে আর্মড পুলিশের ক্যাম্প। তার ওপাশে ইন্দ্রবিশ্বাস রোডের ওপর বাড়ি করেছিলেন শৈল দাদু। প্রতিদিন সকালে বন্ধু সন্দর্শনে তাঁর আসাটা ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। দাদুও যেতেন।
কিন্তু সে অনেক পরের ঘটনা। ১৯৬০-৬১ নাগাদ তখনো সজনীকান্ত দাস বেঁচে। শনিবারের চিঠি প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত রমরমিয়ে। শৈলজানন্দের বাড়ি থেকে পূবদিকে আরেকটু এগোলেই সজনীকান্তের বাড়ি। নিচে বিশাল অফিস, প্রেস আর সেখানেই বাংলার তাবড় তাবড় সাহিত্যিকদের আড্ডা। সে আড্ডায় তারাশঙ্করকে, শুনেছি বড়বাবু বলেই চিহ্নিত করা হতো।
দেখতে দেখতে আমাদের টালা-পাইকপাড়া অঞ্চলটা একসময় সাহিত্যিকদের তীর্থস্থান হয়ে উঠল। মন্মথ দত্ত রোডের একটি ফ্ল্যাটে কাজী নজরুল ইসলাম; কিন্তু তাঁর চৈতন্য তখন মহামগ্ন। আরেকটু এগিয়ে সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্র। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীও এলেন কিছুকাল পরে, শৈলজানন্দের বাড়ির একতলায়। পাইকপাড়ায় আমাদের বাড়িরই কাছে হাউসিং স্টেটে থাকতেন গৌরকিশোর ঘোষ।
চাঁদের শোভা থাকে, সূর্যের রামধনু। বিদ্রোহী কবি তখন ফুলের জলসায় নীরব। তাঁকে বাদ দিলে, বাকিরা ছিলেন তারাশঙ্করের...। তাঁর সভার নিত্য অতিথি।
কিন্তু আরো দুজন ছিলেন, তাঁরা শুধু তাঁর... ছিলেন না, তাঁর ভাবের অংশীদারও ছিলেন। একজন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র, আমার বড়মামা সনৎকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরেকজন আমার বাবা, তারাশঙ্করের জ্যেষ্ঠ জামাতা শান্তিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়। শুধু আত্মীয় নয়, এঁরাও ছিলেন তাঁর সভার...।
আরো কতজন, কত গুণীজন, কত কবি সাহিত্যিক শিল্পী যে তাঁর বাড়িতে পদচিহ্ন রেখে গেছেন তার হিসাব দেওয়া অসম্ভব। এসেছেন বনফুল, অচিন্ত্যসেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, প্রবোধ সান্যাল, আশাপূর্ণা দেবী, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী—এমনি আরো কত যে গুণীজন। আর এঁদের... আর ফুলের গন্ধে—টালাপার্কের বাড়ি ভরে উঠত প্রতিবছর ৮ই শ্রাবণ—তারাশঙ্করের জন্মদিন। বাড়িতে মানুষ ধরত না। তাই ম্যারান বেঁধে—সে এক বিপুল আয়োজন। ফুলের গন্ধের সঙ্গে যোগ দিত খাবারের মন মাতানো গন্ধ।
বছরে দুটি দিনের জন্য আমাদের ছিল একমাত্র প্রতীক্ষা দুর্গা পুজো আর আটই শ্রাবণ। আমাদের মধ্যে আবার আমার দিদি, শকুন্তলার প্রতীক্ষা ছিল সবচাইতে ব্যাকুল। কারণ, কি সৌভাগ্য ওরও জন্মদিন ঠিক ওই ৮ই শ্রাবণ। একে বড় নাতনি, তার জন্মদিনের ঐ একসূত্রতা। দাদুর কাছে ওর ছিল একটু বিশেষ সমাদর। ওকে নিয়ে কবিতাও লিখেছিলেন তিনি—
তুমি যখন হবে পঞ্চদশী
আমি হব ষাট বছরের বুড়ো
তুমি খাবে কড়মড়িয়ে মেঠাই
আমি খাব চেটে চেটে ঝুরো।

দাদুর বয়স যখন পঁয়তাল্লিশ, তখন দিদির জন্ম। অতএব দাদুর যখন ষাট, দিদি তখন পঞ্চদশী। টীকা আরো একটু হয়তো অপ্রায়োগিক হবে না। বীরভূমে মিঠাইকে বলে মেঠাই, মেটাই, কিংবা আরো সঠিকভাবে বললে ‘মিটিই’। মনে হতে পারে মিঠাই কি তবে কড়মড়িয়ে খাওয়া যাবে? আসল কথা হলো, মেঠাই মানে বীরভূমে সন্দেশ নয়—গুড় আর বেসনের লম্বা লম্বা কাঠিভাজা, ওখানে বলে সিড়িভাজা—তার নাড়ু—বেশ শক্ত, কড়া পাকেঢ়। কড়মড়িয়েই খেতে হয়। প্রতিবছর পুজোর সময় ঘরে ঘরে এইসব মেঠাই, নারকেল খণ্ড, খই বিনু—এমনি আরো কত কি তৈরি হতো। আর ঝুরো হলো শুকনো বালিগুড়। এও বীরভূমেরই শব্দ।
সে তো আসবেই। তারাশঙ্করের কবিতায় বীরভূম আসবে না, লাভপুর আসবে না—তাই হয়! কোনো না কোনোভাবে আসবেই আসবে। তাঁর শেকড় যে ঐ মাটিতেই। আর জীবনের শেষ মুহূর্তেই তাঁর ভ্রুযোগ ছিন্ন হয়নি। প্রায়ই যেতেন গ্রামের বাড়িতে। তাঁদের যে সাবেক বৈঠকখানা বাড়ি—খড়ের চাল, এপাশ ওপাশ বারান্দা, সামনে বাগান—আর এই বাগানেই তিনি রোয়াক বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন, ভারী সুন্দর একটা গোলঘর বানিয়ে ছিলেন। সামনে নানান ফুলের গাছ। রোয়াকের পাশে চেয়ার পাতা—এখানেই বসতেন বন্ধুবান্ধব পরিচিতজনের সঙ্গে। গল্প হতো। কখনো অন্ত্যজ শ্রেণির বহু মানুষ আসতেন। তাঁর কাছে তাঁরাও ছিল আপনজন। পুজোর সময় সবাইকে কাপড় দিতেন। অর্থ সাহায্য দিতেন সাধ্যমতো।
লাভপুরকে তিনি ভোলেননি। আর লাভপুরও আজও ভোলেনি তাঁকে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

সর্বশেষ

বিয়ের চার দিনের মাথায় কিশোরীর ‘আত্মহত্যা’

বিয়ের চার দিনের মাথায় কিশোরীর ‘আত্মহত্যা’

হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাসায় র‌্যাবের অভিযান

হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাসায় র‌্যাবের অভিযান

করোনার 'সুপার স্প্রেডার' রাষ্ট্র হওয়ার পথে মিয়ানমার

করোনার 'সুপার স্প্রেডার' রাষ্ট্র হওয়ার পথে মিয়ানমার

লকডাউনে মায়ের চেহলাম আয়োজন করায় ছেলেকে জরিমানা

লকডাউনে মায়ের চেহলাম আয়োজন করায় ছেলেকে জরিমানা

ফেরি ‘শাহজালাল’ দুর্ঘটনার অনুসন্ধানে চার সদস্যের কমিটি

ফেরি ‘শাহজালাল’ দুর্ঘটনার অনুসন্ধানে চার সদস্যের কমিটি

অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান

অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান

অধস্তন আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কালো ব্যাজ পরিধানের নির্দেশ

অধস্তন আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কালো ব্যাজ পরিধানের নির্দেশ

অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হবে: খাদ্যমন্ত্রী

অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হবে: খাদ্যমন্ত্রী

২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় মৃত্যু ৭৬, শনাক্ত ৬৯৯৬

২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় মৃত্যু ৭৬, শনাক্ত ৬৯৯৬

শ্রমিক ছাঁটাই এবং কারখানা লে-অফ ঘোষণা না করার অনুরোধ

শ্রমিক ছাঁটাই এবং কারখানা লে-অফ ঘোষণা না করার অনুরোধ

বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসের কাছে রকেট হামলা

বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসের কাছে রকেট হামলা

সিনোফার্মের আরও ৩০ লাখ ডোজ টিকা আসছে রাতে

সিনোফার্মের আরও ৩০ লাখ ডোজ টিকা আসছে রাতে

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

থিয়েটার

থিয়েটার

গহন
শীতের অপেক্ষা করছি না

শীতের অপেক্ষা করছি না

মন্তাজের নিজের জমি

মন্তাজের নিজের জমি

© 2021 Bangla Tribune