X
বৃহস্পতিবার, ২৯ জুলাই ২০২১, ১৪ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

দেখা না দেখার বায়োস্কোপ

আপডেট : ১৭ জুন ২০২১, ০৯:২৭

সাত দিন জ্বরে ভুগছেন এহসান আহমেদ।

এত অষুধ, এত ডাক্তার, কোনো কাজ হচ্ছে না। জ্বরটা শরীর থেকে যাচ্ছে না। মুখ তিক্ত লালায় ভরে থাকে সারাক্ষণ। বিছানা থেকে নেমে এহসান আহমেদ বারান্দায় যান। বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই এহসানের মন ও চোখে এক ধরনের রিলিফ অনুভব করেন। কারণ, বাসাটা এগারোতলা ফ্লাটের আটতলায়। বারান্দা থেকে পুরোটা আকাশ দেখতে পান তিনি। সেই আকাশ ঘনকৃষ্ণবর্ণের কালো হোক, রেহনুমার শাড়ির সবুজ রঙের হোক আর কাশবনের মতো সাদা হোক, তিনি মুগ্ধ চোখে দেখেন আকাশ।

মুখের তিক্ত থুতু ফেলার জন্য বারান্দায় এসে দাঁড়ানোর সঙ্গে অবাক এহসান আহমেদ। কি দেখছেন তিনি? নিজের চোখের দৃষ্টিতে কি দেখছেন বলতে পারছেন না কিন্তু দেখছেন। দূরে, অনেক দূরে আকাশে উড়ছে হাজার হাজার ছাইরঙের চিল। উড়তে উড়তে চিলগুলো বাসার খুব কাছে উড়ে আসে। কাছে আসার পর এহসান দেখতে পেলেন, চিলগুলোর শরীরে কেনো পালক নেই। নেংটা চিল। চিলগুলোর শরীর থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত পড়ছে। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত। অবাক দৃষ্টিতে ওইসব দেখতে দেখতে এহসান অনুভব করলেন, আমার চোখ বেয়েও রক্ত নামছে ফোঁটায় ফোঁটায়। তিনি চোখের নিচে হাত দিলেন, ভেজা...। রক্ত নামছে! তেল চিটচিটে রক্ত। এক ধরনের মিষ্টি গন্ধও পাচ্ছেন তিনি। মুখে দিলেন রক্ত, মধুর স্বাধ রক্তের। চোখের কোল বেয়ে নেমে আসা রক্ত নামছে ঠোঁটে, মুখে, জিহ্বায়, গলায়, পেটে। এহসান আহমেদ নিজের রক্ত নিজের পেটেই ধারণ ধরছেন। এহসান দেখছেন আর ভাবছেন কেন দেখছি? কি দেখছি আমি? এই দেখার শেষ কোথায়?

নিচের দিকে শেয়ালদের হল্লাও চলছে! কচানদীর জলে কুমির আর হরিণের লড়াই চলছে, সবই দেখছেন এহসান আহমেদ ঢাকা শহরের এগারোতলা অ্যাপার্টমেন্টের আটতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে। এমন হচ্ছে কেন? আমি কোনো জাদুর দেশে এসেছি? নাকি আমিই একজন জাদুকরে পরিণত হয়েছি? কিভাবে সম্ভব? আমি তো জ্বরে ভুগছি সাত আট দিন ধরে। আমার দেখার মধ্যে এতকিছু ঘটছে অথচ আমি একরত্তি ভয় পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে সবকিছু স্বাভাবিক। সত্যিই কী চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো একেবারেই স্বাভাবিক! অথচ মায়ের বুকের নিরাপদ আশ্রয়ে থেকেও ভয় পেতাম। মনে হতো কে যেন আসছে মাটি ফুঁড়ে, আমাকে নিয়ে যেতে আসমানের জলে! দেখতাম আসছে, আসছে..., আসছে... ধড়হীন, কানহীন, মুখহীন একটা সুন্দর মুখশ্রী। কপালের উপর টকটকে নীল টিপ। দাঁতাল দাঁতে পানের পিক... আমাকে গভীর আবেগে চুম্বন করতে আসে! ইশ কী শীতল কোমল চুম্বন, আমার শরীর, শরীরের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে চুম্বনের তরল শিসা। কাঁপছে লোমকূপ, কাঁপছে শিশ্ন। শরীরের কোষে কোষে ভয়ের সিডর তাণ্ডব নৃত্য।

এইসব রক্তের স্রোতধারায় ভাসতে ভাসতে এহসান দেখছেন, শত শত বাস ট্রাক ও রিকশার মধ্যে একটা লোক অনেক দূর থেকে উড়ে উড়ে আসছে। লোকটার কোনো পাখা নেই কিন্তু উড়ছে স্বাভাবিক গতিতে। না, লোকটার কোনো টাই নেই, প্যান্ট নেই, শার্ট নেই, নিচের দিকের লুঙ্গিটা পতপত পতাকার ঢংয়ে হাওয়াই শাড়ির মতো উড়ছে। উড়তে উড়তে বাস, ট্রাক, রিকশার উপর দিয়ে এহসান আহমেদের দিকে আাসছে...।

উড়তে উড়তে কাছে আসার পর এহসান আহমেদ দেখেন, উড়ে আসা লোকটির বাম পা নেই। উরুর কাছ থেকে বাম পা একেবারে করাত দিয়ে সমানভাবে কাটা। লোকটা উড়ছে প্রায় নিঃশব্দে। মনে হচ্ছে লোকটা হাজার হাজার বছর ধরে আকাশে আকাশে মৌমাছির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। লোকটার দুই হাত সামনে বাড়ানো। তাহলে কি দুই হাতের দোলায় উড়ছে লোকটা? বাতাসেরও আগে, শো শো বাতাসকে এক পায়ে পদাঘাতে পদাঘাতে জর্জরিত করে করে উড়ছে লোকটা? লোকটা আসছে, আসছে... খুব কাছে চলে আসছে। বারান্দা থেকে সরে যেতে চাইছেন এহসান আহমেদ কিন্তু পা সরছে না। মনে হচ্ছে পাজোড়া আটকে গেছে মেঝের সঙ্গে, কেউ নিচ থেকে গাম লাগিয়ে দিয়েছে।

রেহনুমা! এহসান আহমেদ চিৎকার দিয়ে ডাকছেন স্ত্রীকে। কই তুমি? এদিকে এসো...

কী হলো তোমার? দরজায় এসে দাঁড়ায় রেহনুমা। হাতে মাছ কাটার চকচকে বটি, মুখে বারবনিতাদের মাখা রক্ত লাল লিপস্টিক।

বারান্দায় আসার আগে রেহনুমা হাঁসের মাংস মেখে নীল পাকা আঙুর খাচ্ছিল, সেই রেহনুমার হাতে বঁটি এলো কোত্থেকে? আর ঠোঁটে বারবনিতার রক্ত লিপস্টিক! এহসান ভাবছেন, আমি কে? কোথায় এসেছি? আমার বাসায়? আমার সঙ্গের নারী কে? নাকি খাণ্ডবদাহনের ভূমিতে?

তুমি আমাকে ধরো, আমি ভয় পাচ্ছি। এহসান আহমেদ চিৎকার করেন।

কিন্তু রেহনুমা বঁটির ধারে জিহ্বার ধার পরীক্ষা করছে, আমি ব্যস্ত এখন। একটু পরই আমার নাচের অনুষ্ঠান শুরু হবে। তুমি যাবে না আমার নাচ দেখতে? আজকে আমার নাচ দেখতে মঙ্গোলিয়া মহান সম্রাট হালাকু খান আসবেন।

এহসান বুঝতে পারছেন না, আমার স্ত্রী রেহনুমা আখতার কবে নাচ শিখেছিল? রেহনুমা তো উঠোনে চারাপাতি খেলত মাত্র!

ওদিকে বাতাসের মুণ্ডুর উপর পা রেখে রেখে লোকটা আসছে, পদাঘাতে পদাঘাতে সব প্রাসাদ চূর্ণ বিচূর্ণ করে ইট পাথর খসিয়ে খসিয়ে আসছে। মুখ থেকে নেমে আসছে আদনান খাখোসিকে হত্যার রক্ত তরবারি। রেহনুমা আখতার বঁটি মেঝের উপর দাঁড় করিয়ে নাচতে শুরু করেছে, ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে...। অবাক বঁটির ধারের উপর নাচছে রেহনুমা আখতার কিন্তু একটু রক্তপাত হচ্ছে না। এহসান আহমেদের শরীর গুলিয়ে উঠছে, বমি আসছে। তিনি বমি করার জন্য জানালার শার্সি খুলতেই দেখতে পেলেন, লোকটা উড়তে উড়তে বাসার সামনে এসে থেমেছে, তাকিয়ে আছে শীতল দৃষ্টিতে এহসানের বারান্দায়, এহসানের দিকে। বাসাটা ঘিরে কয়েকবার চক্কর দিয়ে আমার থামে মুখোমুখি, লোকটা শীতল দৃষ্টিতে ফুটছে লাল পদ্ম। আর কাটা বাম পা থেকে নামছে পুঁজ, দুর্গন্ধে চারপাশটা পুড়ে যাচ্ছে দাউদাউ।

রেহনুমা আখতার নাচ থামিয়ে লিপস্টিক চর্চিত মুখে হাঁসের মাংস খাচ্ছে আর পটোলচেরা চোখে দেখছে বাতাসে ভাসমান কিম্ভুত লোকটাকে। অবাক ঘটনা, লোকটা চোখ টিপল রেহনুমা আখতারকে। রেহনুমা আখতার মিষ্টি হাসল। বলল আদুরে গলায়, আসতে এত দেরি করলে কেন জান?

গোসলে গিয়েছিলাম, তোমার কাছে আসব, পবিত্র হব না? কিন্তু কোথাও ক্ষমতামাখা একবাটি তাজা রক্ত পেলাম না। শেষে বুড়িগঙ্গার পচা পানিতে গোসল করে এলাম। তাই, দেরি হলো...

রেহনুমা আ্খতার? শরীরের সকল শক্তি দিয়ে চিৎকাকরে ক্রোধ প্রকাশ করতে চাইলেন এহসান আহমেদ। তুমি ওকে চেনো?

হাঁসের মাংস খাওয়া শেষ করে রেহনুমা আখতারের হাতে সাদা তরমুজের ফালি, সাদা তরমুজের ফালি খেতে খেতে রসিক ঢংয়ে উত্তর দেয়, সেই কবে থেকে ওর সঙ্গে আমার...।

ভয়ে থরথর কাঁপছেন এহসান আহমেদ। তিনি অনুভব করতে পারছেন, এতদিন, বিবাহিত জীবনে কালসাপ পুষেছেন। এত আদর, এত আলিঙ্গন, এত খনন, এত শিৎকার, সবই সাপের সঙ্গে! তিনি বিব্রত নিজের উপর, আমি কে? আমিও সাপ? না কি সাপুড়ে? আমি খেলা দেখাই না আমি খেলা দেখি? লোকটা এসে গেছে ব্যালকনির বাইরে, একেবারে হাতের নাগালে। উড়ন্ত লোকটাকে দেখে রেহনুমা আখতার দৌড়ে আসে দরজা থেকে ব্যালকনিতে, শার্সির ফাঁক দিয়ে হাত বাড়ায় রেহনুমা আখতার, লোকটা বিকট বিকৃত মুখে ওর হাতে চুমু খায়। শার্সির ভেতর দিয়ে হাত বাড়িয়ে রেহনুমাকে জড়িয়ে ধরে, রেহনুমার মুখে লাল লিপস্টিক চর্চিত বারবনিতা হাসি, বাড়িয়ে দেয় বুক...।

একটু আদর করো, সোনা!

রেহনুমার খোলা বুকের উপর সুদৃশ্য মখমলের স্তনের ফোটা দাঁতাল দাঁতে ছিঁড়ে খাচ্ছে, ওমা! একবার স্তনের বোঁটা ছিঁড়ে নেয়, সঙ্গে সঙ্গে আবার খয়েরি বোঁটা গজিয়ে যায়। লোকটা আবার ছেঁড়ে, আবার চিবোয়...। উল্লাসে নাচে রেহনুমা!

উড়ন্ত লোকটাকে কেউ দেখছে না! পাশির বাড়ির ছাদে দুটি মেয়ে, একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁট চুষছে পানির ট্যাংকের আড়ালে, ওরাও দেখছে না? বিপরীত দিকের বাড়ির বারান্দায় মাওলানা ছিপাড়া পড়াচ্ছেন নাবালিকাদের, সেও দেখতে পাচ্ছে না উড়ন্ত লোকটার সঙ্গে আমার স্ত্রী রেহনুমা আখতারের নগ্ন সময়ের কলাকৌশল? আমি কি করব? কি করা উচিত আমার? আচ্ছা, রেহনুমা আখতারের হাতে যে বঁটিটা ছিল, সেটা কই?

দূর আকাশে আবার দেখতে পায় এহসান চিলগুলো উড়ে উড়ে আসছে বিউগলের করুণ সুর বাজাতে বাজাতে। চিলের চিৎকারে উড়ন্ত লোকটা ফিরে দেখে আকাশজুড়ে চিলের আগ্রাসন। সঙ্গে সঙ্গে রেহনুমাকে ছেড়ে উড়ন্ত একপাঅলা লোকটা নিচে চলে যায়। আর রেহনুমা আখতারের কোলে একটা সবুজ কালারের বিড়াল এসে বসে। রেহনুমা আখতার বিড়ালের শরীরের উকুন বেছে দেয়, বিড়ালটা বিগৎ লম্বা জিহ্বা বের করে রেহনুমার মিহি গাল চাটে। চিলেরা চলে গেলে এক পাঅলা উড়ন্ত লোকটা দেয়াল বেয়ে বেয়ে তেলতেলে তেলাপোকার গতিতে উঠে আসছে আটতলার দিকে, ব্যালকনিতে। যেখানে দাঁড়িয়ে আমি এহসান আহমেদ।

আমি বুঝতে পারছি না, উড়ন্ত এক পাঅলা লোকটা কী আমাকে মেরে ফেলবে? আমাকে কতজনে কতবার হত্যা করতে চেয়েছে, হিসাব নেই। বলা যায় আমি মৃত এক প্রাণী, নিজের মনে শ্লেটের উপর চকখড়িমাটি দিয়ে লিখছেন এহসান আহমেদ, আমাকে মারতে চেয়েছিল বড় ভাই, তার স্ত্রীর সঙ্গে আমার অবৈধ সম্পর্ক আছে, এই সন্দেহে, কিন্তু আমি জানতাম আমার বড় ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল বাড়ির কাজের লোকটার সঙ্গে। কতভাবে না ভাবিকে ব্যবহার করেছে মকবুল মুন্সি! দিনে রাতে...। ভাই চলে যেতেন গঞ্জে ধান মাড়াইয়ের কলে। এই শূন্যতার মধ্যে ভাবি লুৎফুর নাহার আর মকবুল মুন্সি...। ভুল অংকের শিকার আমি সব সময়ে, এহসান লিখে চলেছেন কালো শ্লেটের উপর কালো খড়িমাটি দিয়ে। আমাকে মারতে চেয়েছিল, অফিসের বড় সাহেব আবদুল হালিম, যখন হালিমের ফাইল আটকে দিয়েছিলাম মিথ্যা বাজেট বাড়ানোর সত্য অভিযোগে। আমাকে মেরে ফেলার জন্য খুনি নিযুক্ত করেছিলেন আবদুল হালিম, আমি পালিয়ে এসেছি চাকরি ছেড়ে। আমাকে খুন করতে চেয়েছিল খান সাহেব, ক্ষমতার চাকুতে, পাঁচ বছরের গ্লানি আর অপমানের পর আমি টিকে গেছি কোনোভাবে, মৃত মাটির গন্দম শোকে। সেই আমাকে আবার খুন করতে চাইছে উড়ন্ত একপাঅলা লোকটা? ভয়ে ভয়ে এহসান নিচে তাকান। দেখতে চান উড়ন্ত একপাঅলা লোকটার হাতে কোনো ছুরি বা চাকু আছে কি না!

এহসান আহমেদ নিচে তাকিয়েই দেখতে পান, চামড়া ছিলা চিলগুলো উড়ন্ত এক পাঅলা লোকটাকে ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে, ঠোঁটে ঠোঁটে ঠোকরাতে ঠোকরাতে। লোকটা চিৎকার করছে। দুহাতে তাড়াতে চাইছে চিলগুলো কিন্তু চিলগুলোর সঙ্গে পেড়ে উঠছে না একপাঅলা উড়ন্ত লোকটা। লোকটাকে ঠোঁটে ঠোঁটে ঠোকরাতে ঠোকরাতে নিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই বাতাসের ওপর তালি বাজাতে বাজাতে। উড়ন্ত এক পাঅলা লোকটার আপাতত পতনে উল্লসিত এসহান, যাক শালা বেঁচে গেলাম। এখন শকুনদের জন্য একটা ভোজের আয়োজন করতে হবে। কোথায় করব, এহসানের ভাবনার মধ্যে রেহুনুমা জবাব দেয়, হোটেল আরশিনগরে করলে ভালো হবে।

এহসান আহমেদ দুহাতে তালি বাজাতে চাইলেন, হুরহে হুয়া কেয়া মজা! শেয়ালে খায় মামুর বাড়ির গরম গজা...। কিন্তু দুটি হাত পেরেক দিয়ে কেউ একজন গেঁথে দিয়েছে দেয়ালের গায়ে। অসহায় আক্রোশে চিৎকার করে ওঠেনÑকে? কে? কে? আমাকে গেঁথে দিয়েছে দেয়ালের সঙ্গে? কেন? কী আমার অপরাধ? কার প্রশ্ন কে দেবে উত্তর? না, এহসান আহমেদ উত্তর পাওয়ার জন্য কাউকে খুঁজে পেলেন না।

রেহনুমা আমাকে দেয়ালে গেঁথে রাখল? এহসান ভাবেন। না, তিনি কষ্ট নেন না। জানেন, প্রিয়জন, কাছের জনই তো হত্যার চাকু তৈরি রাখে বুকের ভেতরে।

দেয়ালে গাঁথা হাত দুটো নিয়ে এহসান আহমেদ তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে, শূন্যতার যাত্রাপালায়। তাকিয়ে কী দেখছেন তিনি? দেখছেন রক্তের নিঃসঙ্গ স্রোতধারা, কাঁদছে আকাশ তিক্ত খেয়ালের সুরে। এইসব দেখতে দেখতে এহসান আহমেদ দেখেতে পান এক পাঅলা লোকটাকে ন্যাংটো চিলগুলো আকাশের পথে শূন্যে দোলাতে দোলাতে টুকরো টুকরো ছিঁড়ে খাচ্ছে, খেতে খেতে দুই এক টুকরো মাংস নিচে পড়ে যাচ্ছে সাৎ করে, এক পাঅলা লোকটা শূন্যে লাফাচ্ছে, কোকাচ্ছে, হাপাচ্ছে। এহসান আহমেদ এমন জীবন্ত বিভৎস চিত্রকল্প দেখে দেখে আনন্দে দিশাহারা হয়ে কাঁদছেন। মরি, মরি এমন দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য কজনার হয়? মনে পড়ে যায় এহসান আহমেদের, এক প্রবল ঝড়ের দিনে আম কুড়াতে গিয়ে আম না কুড়িয়ে পাশের বাড়ির তাসলিমার সঙ্গে দোলনায় চড়ে দোলার দৃশ্য। চারদিকে উথাল পাতাল বাতাস, দিকবিদিক ভেঙে পড়ছে গাছের ডালপালা মড় মড় মড় শব্দে। কিন্তু আমগাছের ডালে বাঁধা দোলনায় ঝুলছেন তিনি আর তাসলিমা। বাতাতে বাতাসে আমেরা এসে লুটোপুটি খাচ্ছে পায়ের নিচে, তাসলিমার স্যালোয়ার কামিজ ভিজে এক সা, বুক চিতিয়ে উঠছে চরের মতো, জড়িয়ে ধরতে পেয়েছেন আকুল সুখ, সেই ঝড়ের দিনেই তাসলিমা বুক ধরতে দিয়েছিল, পরে আর সেই সুযোগ দেয়নি। তাসলিমা রহস্যনারীতে পরিণত হয়েছিল, ওকে কুকুরের লোভে পেছনে পেছনে ঘুরতে দেখলে মিটিমিটি হাসত তাসলিমা। আর অপমানে লজ্জায় মরমে মরে যেতে চাইতে এহসান। কিন্তু মরা আর হয়নি...

সেই মরার সময় কী এসে গেছে দুয়ারে কালো বিড়ালের নিঃশব্দ গতিতে! কি করবেন, না কি কিছু করবেন না, এইভাবে পেরেক গাঁথা হাত নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন এহসান আহমেদ অনন্তকালের পথে? সিদ্ধান্তহীনতারকালে মনে হলো, দেয়াল থেকে হাতজোড়া মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু মুক্তি পাওয়া দুটো ফুটোসহ দুটি হাতে কিন্তু একটুও ব্যথা নেই। এহসান ফুটোসহ দুটো হাতের দিতে তাকিয়ে দেখছেন, মনে হচ্ছে হাতের ফুটোয় ফুটবে লাল গোলাপ!

এহসানের স্ত্রী রেহনুমা আখতার টকটকে লাল শাড়ি পরে পাশে দাঁড়িয়েছে গহিন দরজায়, ঘোমটা মাথায়। জিহ্বা বের হয়েছে দেড় হাত। ঘোমটার মধ্যে একটা শালিকের মুমুর্ষ বাচ্চা চিঁ চিঁ চিঁ ডাকছে। এহসান স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন, তাসলিমা না রেহনুমা আখতার? তাসলিমা? হ্যাঁ, আম কুড়ানো দিনের তাসলিমাই তো! এত বছর পর ধরা দিচ্ছে রক্তলোলুপ দিনে?

এহসান দেখো দেখো... রেহনুমা আখতার চিৎকার দেয়। এহসান আহমেদ স্ত্রীর চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তাকায় আকাশের গায়, যেখানে এক পাঅলা লোকটাকে টুকরো টুকরো করে খাচ্ছিল চামড়াছিলা চিলগুলো, সেইখানে, মাটির দিকে নেমে আসা টুকরো টুকরো মাংসগুলো জোড়া লাগছে বিন্দু বিন্দু উল্লাসে। জোড়া লাগতে লাগতে আবার একজন মানুষের আকৃতি পাচ্ছে। জোড়া লাগা অর্ধেক লোকটাকে ঠোঁটে ঠোঁটে খাবলে খাচ্ছে চামড়াছিলা চিলগুলো কিন্তু খেয়ে শেষ করতে পারছে না। ফলে টুকরো টুকরো মাংসগুলো ধীরে ধীরে একজন মানুষের আকার নিচ্ছে গোল গোল ফুটবলের আকৃতিতে। বিস্ফোরিত চোখে দেখেছেন এহসান। দেখছে রেহনুমা আখতার। কি দেখছে? কেন দেখছে? দেখার কি শেষ আছে মানবসংসারে? যেমন দেখাচ্ছে ট্রাম গণতন্ত্রের দেশে? দেখাচ্ছে ইসরায়েল পবিত্র বেথেলহেমে? যেমন দেখাচ্ছে ভারত কাশ্মিরে? মিয়ানমার দেখাচ্ছে প্রাচীর আরাকানে, রোসাং রাজদরবারের ভূমিপুত্রদের রক্তউৎসবে উৎখাত করে? দেখা ও দেখানোর কি শেষ আছে? দেখতে দেখতে জনাব এহসান দেখতে পান, জোড়া লেগে লেগে সেই মাংসপিণ্ডগুলো একজন আধা কালো আধা ফরসা মানুষের আকার নিয়েছে। মানুষটির বাম হাত অবশ। শরীরের সঙ্গে যুক্ত হাতটি রান্নাঘরের পাতির মোছার টুকরো টুকরো তেনার মতো ঝুলছে ঝুলছে...

এহসানের মুখে চুম্বন করে রেহনুমা আখতার, লোকটাকে চেনা চেনা লাগছে না?

কামাতুর অশ্লীল চুমুতে সমুদ্র লবণের স্বাধ পান এহসান আহমেদ, না তো চিনতে পারছি না। কে লোকটা? দেখেছি কখনো?

হায় হারামজাদা, লোকটা তোমার সর্বনাশের তিথি!

মানে?

রেহনুমা আখতার ঠাস শব্দে চর মারে এহসান আহমদের গালে, শালা কাঁঠালের আমসত্ত! যে লোকটা তোমার জীবনটাকে দুমড়েমুচড়ে অপমানে ছাইয়ের পরিণত করল, সেই তিক্ত ফসিলকে চিনতে পারলে না! ক্রোধে উন্মত্ত রেহনুমা আখতার চলে যায় বারান্দা ছেড়ে, যাবার সময়ে নিয়ে যায় সমুদয় অক্সিজেন।

বারান্দায় অক্সিজেনহীন একলা এহসান কাতরাচ্ছেন অথৈজলের তোড়ে। ঠিক সেই সময়ে দেখতে পান তিনি, লোকটা চামড়াছিলা চিলগুলোর গ্রাস থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে মাটির দিকে নেমে আসছে সা সা...।

ধর ধর ধর... তারস্বরে চিৎকার ভেসে আসছে রাস্তার দিক থেকে। কে কাকে ধরছে? এহসান আহমেদ তাকান রাস্তার দিকে। তিনি দেখতে পান, সেই লোকটা হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটছে রাস্তার ওপরে, দুই পা ও এক হাতে। এক হাত অবশ, লেগে আছে যক্ষ্মার তাবিজের মতো শরীরের সঙ্গে। অবাক কাণ্ড, লোকটার পিছে অজস্র লোক দৌড়ে আসছে পিঁপড়ার সারিতে। দুই পা ও এক হাতঅলা লোকটা ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে চলছে কিন্তু লোকগুলো দৌড়েও হারাতে পারছে না। মৃত্যুর আগে আগে যাচ্ছে লোকটা, এহসান আহমেদ দেখছেন আটতলার বারান্দা থেকে। কতদূর যাবে সে?

আটতলার অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দা থেকে এহসান দেখছেন প্রবল বিম্ময়ে লোকটার মাথাটা শরীর থেকে ছুটে যাচ্ছে ক্রিকেট বলের ছক্কার দ্রুততায়, ধড়সহ শরীরটা দৌড়াচ্ছে রাস্তার ওপর দিয়ে আইলার বিধ্বংসি গতিতে। মাথা? মাথা কোথায়? এহসান কিছু বুঝবার আগেই মাথাটা এসে কামড়ে ধরে মুখজোড়া বিকট দাঁতে, শুয়োরের বাচ্চা! আমার সঙ্গে ইতরামি করো? চেনো নাই আমারে? আমার সঙ্গে ইতরামি করার সাহস তোকে কে দিয়েছে? মনে নাই, পাঁচ বছর ইঁদুরেরর মতো চিঁচিঁ দৌড়েছিলি আমার পাছায় পাছায়?

চিৎকার করতে চান এহসান কিন্তু দাঁতাল লোকটার আক্রমণে দুই পাটি দাঁত ও ঠোঁট আটকে পড়েছে দুই পা ও এক হাতঅলা উড়ন্ত মুখ গহ্বরের বিকট আগ্রাসনের কবলে। গলার স্বরে গরগর আওয়াজ পান তিনি কিন্তু কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারেন না। মুখ এহসানের শরীরের রক্ত শুষে নেয়, শুনতে পাচ্ছেন ছুটে আসা অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ, মুণ্ডুটা খেয়ে যাচ্ছে এহসানের রক্ত, এহসানের লেখা, এহসানের স্বপ্ন, খেয়ে যাচ্ছে, খেতে খেতে এহসানের মাথাটা খেতে শুরু করে মড়মড় শব্দে।

এহসান আহমেদ বুঝতে পেরেছেন, বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাশবিক দৃশ্য দেখার স্বাক্ষী রাখতে চায় না উড়ন্তু মুণ্ডু। মৃত্যু, করুণ মৃত্যু চলে এসেছে আর বেঁচে থাকবার কোনো সম্ভাবনা নেই, মৃত্যুর জন্য যখন তিনি প্রস্তুত ঠিক সেই সময়ে এহসান আহমেদ দেখতে পেলেন, চামড়া ছিলা চিলগুলো আবার ফিরে এসেছে উড়ন্ত মুণ্ডুর কাছে। দরজা জানালা ভেঙে ঢুকে পড়েছে ওরা ডানা পেটাতে পেটাতে। এবং মুখ দিয়ে ঠোকরাতে ঠোকরাতে নিয়ে যায় উড়ন্ত মুণ্ডুটা।

অন্যদিক থেকে চিলগুলো নিয়ে আসে উড়ন্ত মুণ্ডুটার ধড়। মুণ্ডু আর ধড় আকাশের মধ্যেই মিলে একজন মানুষের আকার নেয়। চমকে ওঠেন এহসান, আমার বুঝি মুক্তি নেই!

চামড়া ছেঁড়া চিলগুলোকে ফাঁকি দিয়ে উড়ন্ত কিম্ভূতকিমাকার দুই পা এক হাতঅলার সামনে আসে এবং এক লহমায় উড়িয়ে নিয়ে যায় খোলা আকাশের তা তা থৈ থৈ উঠোনে। আবার ঠোঁটে ঠোঁটে ঠোকরাতে শুরু করে দুই পা ও এক হাতঅলাকে, লোকটা দানবীয় চিৎকারে চামড়া ছিলা চিলদের মুখের গ্রাস থেকে নিচে পড়তে থাকে। ওর পিছুপিছু ছোটে নগ্ন কুৎসিত চিলগুলোও কিন্তু ধরার আগেই লোকটা বাস ট্রাক রিকশা লড়ির নিচে দই চিড়ার সুঁই আর সুতোয় ছিচড়ে ছিচড়ে যেতে থাকে চাকা আর ইট সিমেন্টের কর্কষ স্রোতে।

পিষে যেতে যেতে দুই পা এক হাতঅলা লোকটার মুখ থেকে বের হয়ে আসে, আমি খান সাব, আমি খান সাব, আমারে চেনো না? আমি খান....।

বাতাসে সব যন্ত্রণা আর শব্দ মিশে যায় বন্যার অথৈ জলে গুঁ আর লাশের যাত্রায়।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১২:৫১

মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬) লেখক পরিবার থেকেই এসেছিলেন। পিতৃমাতৃ—দুকূলই লেখক ছিলেন। এমনকি শ্বশুরকূলও। পুরুষানুক্রমেই এঁরা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মহাশ্বেতা দেবীর জীবনটা সাহিত্যের কাছেই সঁপে দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন দুহাত খুলে। ‘হাজার চুরাশির মা’ (১৯৭৪) তার অন্যতম আলোচিত উপন্যাস। গ্রন্থখানির পাঠপরিক্রমায় কিছুটা সাবধানী মনে এগুতে হয়। মাঝেমধ্যেই নিত্যনতুন চরিত্রের দেখাসাক্ষাৎ ঘটে। সিংহভাগ চরিত্রই দিব্যনাথ-সুজাতা পরিবারের। উপন্যাসখানি বুঝে নিতে চাইলে এদের মধ্যকার পারষ্পারিক সম্পর্ক স্মরণে রাখা খুবই জরুরি। পরিবারটি অনেকটা উনিশ শতকের ক্লাব-কালচারের ন্যায় সামন্তধারায় গড়ে ওঠে। ভোগবাদী প্রবৃত্তি এদের মধ্যে তীব্রতর। দিব্যনাথের নিজস্ব ‘চার্টার্ড অ্যাকাউনটেনসির আফিস।’ প্রতিনিয়ত মোটা টাকা আসে। জ্যোতি, নীপা অথবা তুলির স্বামীরাও কর্পোরেট কর্পোরেশনে হাই সেলারির জব করে। সবাই ভোগবিলাসে মত্ত। এদের চারিত্রিক স্খলনও কম নয়। অফিসের টাইপিস্ট মেয়েকে নিয়ে দিব্যনাথের ঢলাঢলি, মাঝেমধ্যেই রক্ষিতা নিয়ে বাইরে সান্ধ্য কাটানো। ঢেকেঢুকে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে সর্বসম্মুখে সহাস্যে এসব ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়। এসব সে পৌরুষ-অধিকার বলেই জানত। কেবল বর্তমান নয়, চিরকালই দিব্যনাথ নারী নিয়ে নোংরামি করে আসছে। শাশুড়িও কম প্রশ্রয় দেয়নি। ছেলে তার ‘পুরুষ বাচ্চা’, স্ত্রৈণ নয় বলে অহংকারও করত। দিব্যনাথের পিতাও নাকি যৌবনকালে এমনই ছিল। প্রায়শই সন্ধ্যাবেলা নারী নিয়ে বাইরে কাটাত। পরপর দুই পুরুষের নৈতিক অধঃপতন তৃতীয় পুরুষ জ্যোতি অথবা নিপাদের কাছেও সমভাবেই সমর্থন পায়। সামন্ত প্রভুর ন্যায় দিব্যনাথ নিজেকে পরিবারের ‘বস’ বলে বিবেচনা করত। সন্তানেরা অনেকেই ইনিয়েবিনিয়ে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে বাবাকে ‘বস’ বলেই সম্বোধন করত। এমনকি কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতীও। তবে এই সন্তানের মেজাজটা ছিল খানিকটা ভিন্ন ধার ও ধারার।

২.
অর্থবিত্তে স্বচ্ছল হলেও পরনারীতে অভ্যস্থ হওয়ায় দিব্যনাথ-সুজাতার দাম্পত্য-সম্পর্ক সুখের ছিল না। দিব্যনাথ সুজাতাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতো না। বরং যৌন পার্টনার হিসেবেই বিবেচনা করত। অসুখবিসুখ হলে খোঁজখবর নিত না। নবজাতকের কান্না থেকে বাঁচার জন্য তেতলায় ঘুমাত। প্রসূতি স্ত্রী থেকে দূরে অবস্থান করত। শাশুড়িমাও ছিল নারীবিদ্বেষী মহিলা। সুজাতার সন্তান জন্মদান সইতে পারত না। প্রসবকাল দেখলেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেত। তীব্র প্রসবযন্ত্রণা নিয়ে সুজাতাকে একা একাই নার্সিং হোমে যেতে হতো। দিব্যনাথের নজর কেবল একদিকে—‘আবার মা হবার যোগ্য শরীর হচ্ছে কি না সুজাতার।’ দুবছর পরপর সুজাতার চার সন্তান জন্মে। জ্যোতি, নীপা, তুলি। সর্বশেষ ব্রতী। প্রথম ও শেষে পুত্রসন্তান, মাঝখানে দুটি কন্যাসন্তান। ব্রতীর দুবছর বয়সকালে সুজাতা লম্পট দিব্যনাথের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেছিল। লেখকের ভাষায়—দিব্যনাথ কিছুতেই ওঁকে পঞ্চমবার ‘মা’ হতে বাধ্য করতে পারেনি। দিব্যনাথ সুজাতাকে ফার্মের কাজ ছেড়ে দিতে বলেছিল। সুজাতা মানেনি। ‘কাজ না-ছাড়া সুজাতার দ্বিতীয় বিদ্রোহ।’ 
বাবামায়ের মধ্যকার এই টানাপড়েন ব্রতী খানিকটা বুঝতে পারত। বুঝতে পারত মাতৃবক্ষের সুগভীরে লুকানো তীব্র গোপন ব্যথা। ব্রতীর মনটা কম্পাসের কাটার ন্যায় মমতাময়ী মাতা জগজ্জননী সুজাতার দিকে হেলে থাকত। ব্রতী সর্বদা মায়ের ওপর চোখদুটো সুস্থির রাখত। দশ বছর বয়সেও খেলাধুলা ফেলে বাড়ি চলে আসত। শিয়রে বসে মায়ের মাথায় বাতাস করত। এজন্য দিব্যনাথ ব্রতীকে সইতে পারত না। কনিষ্ঠ সন্তান হলেও শত্রু বিবেচনা করত। ব্রতীকে টিপ্পনি কেটে দিব্যনাথ কখনো বলত ‘মাদার্স চাইল্ড’ কখনো বলত ‘মেয়েমার্কা ছেলে। নো ম্যানলিনেস।’                 
মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে এই পুঁজিবাদী পরিবারের চরিত্রগুলো দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে পারিবারিক ‘বস’ দিব্যনাথ ও জ্যেষ্ঠ তিন সন্তান জ্যোতি, নীপা, তুলি। সেইসঙ্গে এদের পূর্বপ্রজন্ম ঠাকুরমাও। অপরদিকে সুজাতা ও তার কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতী। এই দ্বন্দ্ব কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমসাময়িক সমাজ অথবা রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব। এমনকি বৈশ্বিকও। বিশ্বজগৎ সংসার তখন ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দুধারায় দ্বিধাবিভক্ত। দ্বন্দ্বটা এতই জটিল ছিল যে, ভাই-বোন, পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীর সমুদয় সামাজিক ও আত্মিক বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। এমনকি রক্তের বন্ধনও।
 
৩.
দিব্যনাথপুত্র ব্রতী পিতার পুঁজিবাদী আদর্শে আস্থা হারিয়েছিল। আস্থা হারিয়েছিল সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থাপনায়। আস্থা হারিয়েছিল মুনাফাখোর ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্ধ নেতাদের ওপর। পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থার স্বপ্ন লালন করত। সমতাভিত্তিক একটি সুন্দর সুষম সমাজ বিনির্মাণের লক্ষে হৃদয় তার জেগে উঠেছিল। লেখকের ভাষায়, তখন সত্তর দশক। মুক্তির কাল। মুক্তির দশকে জনমুক্তির আন্দোলনে অনেকটা সংগোপনেই সংযুক্ত হয়েছিল ব্রতীরা। তখন সাম্রাজ্যবাদী শোষক সরকার ক্ষমতায়। জেলের পাঁচিল উঁচু করে। নতুন নতুন ওয়াচ টাওয়ার বসায়। বন্দিদের জন্য ফটকঅবন্দি খোলে না। সুগভীর রাতে ভ্যানভর্তি বন্দি এলে লেখকের ভাষায়—‘ওপর থেকে ক্রেন নামে। জন্তুর মত বন্দীকে যন্ত্রের নখে আঁকড়ে ক্রেন উঠে যায়, জেলের ভেতর নামিয়ে দেয়।’ জন্তুর মতো হলেও যারা জেলে যায়, তারা অন্তত প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু বাইরের ব্রতীরা নিদারুণভাবে প্রাণটা হারায়। রাষ্ট্রযন্ত্র নানা উপায়ে নির্মম নির্যাতন অব্যাহত রাখে। নির্জন সলিটারি সেলে নির্যাতন চালায়। লেখকের ভাষায়—‘সাউন্ডপ্রুফ। দরজা-জানালায় ফেলটমোড়ানো ফাঁপা রবারের নল বসিয়ে সাউন্ডপ্রুফ করা। ঘরের আর্তনাদ, গোঙানি, মারের আওয়াজ, জেরাকারীর গর্জন, সব শব্দ ঐ নলের জন্য ঘরের ভেতরেই বন্দী থাকে।’

৪.
বিজিত, প্রার্থ, লালটু, সমু ব্রতীর বিপ্লবী বন্ধু। এরাও চেয়েছিল স্বসমাজটিকে বদলে দিতে। সহযোদ্ধা বন্ধুদের বাঁচাতেই সেদিন ব্রতী গিয়েছিল সমুদের বাড়িতে। কিন্তু বাঁচাতে পারেননি। নিজেও বাঁচতে পারেনি। গভীর রাতে সমুদের বাড়ি ঘেরাও করে গুন্ডারা। হিংস্র গলায় বলে—‘বের করে দিন, লয়তো ঘরে আগুন দিমু!’ ব্রতীর কণ্ঠ শুনে কেউ একজন বলে ওঠে—‘হালায় আরেক মালটারে জুটাইছে। বাইর হ ঘটির পোলা।’ হাতে হাত রেখে স্লোগান দিতে দিতে ব্রতীরা বেরিয়ে আসে। বাইরে অন্ধকার। ঘুটঘুটে আধার মুখ হাসি-উল্লাসে ফেটে পড়ে। ভয়ংকর গন্ডগোল। ‘বাড়ী বাড়ী আলো নিভে যাচ্ছে, দরজা জানালা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চমকে সরে যাচ্ছে ভয়চকিম মুখ।’ সহসা স্লোগান থেমে যায়। সমবেত ঘাতকেরা খটখট গুলির শব্দ করতে করতে চলে যায়। সমুর দরিদ্র বাবা থানায় গেলে আততীয়দের নাম শুনে ধমকে ওঠে পুলিশ। পুলিশভ্যান আসতে আসতে সরে যায় ঘাতকেরা। নিতু ওরফে দীপুর মতো ভদ্রছেলেকে তো থানার সামনেই পিটিয়ে হত্যা করে। ‘প্রকৃত খুনি কখনো বন্দুক ধরে না।’ ব্রতী-সমুদের হত্যা-পরিকল্পনাকারীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এমনকি প্রত্যক্ষ ঘাতকদেরও বিচার হয় না। বুক ফুলিয়ে এরা নির্বিবাদে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। সমুর দিদিকে দেখে নির্মম ব্যঙ্গ করে, হাহা করে হাসে আর বলে—‘তর ভাইয়ের ছাদ্দ করলি না ক্যান? ভাল কইরা খাইতাম!’ সুজাতার মনে কত প্রশ্ন—যে শহরে এমন সব জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়, সেখানে পরপর কী করে সংস্কৃতিমেলা, রবীন্দ্রমেলা অনুষ্ঠিত হয়?

৫.
সুজাতা টেলিফোনেই ব্রতী হত্যার খবর পায়। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে—‘কাটাপুকুরে আসুন।’ পিতা দিব্যনাথ কাটাপুকুরে না গিয়ে দৌড়ায় পত্রিকা-অফিসে। পুত্রহত্যার খবর ধামাচাপা দিতে দিব্যনাথ ‘দড়ি টানাটানি করে বেড়াচ্ছিলেন।’ সফলও হয়েছিলেন। লেখক বলছেন—‘দিব্যনাথের ছোটাছুটি দড়ি টানাটানি সফল হয়েছিল। পরদিন খবরের কাগজে চারটি ছেলের হত্যার খবর বেরোয়। নাম বেরোয়। ব্রতীর নাম কোন কাগজে ছিল না।’ পত্রিকাপাতা থেকে ব্রতীকে মুছে দিয়েছিল দিব্যনাথ। মুছতে পারেনি মর্গ থেকে। সেখানে  ব্রতীর অবস্থান ‘হাজার চুরাশি’ নম্বরে। সেদিন ব্রতীর মৃত্যু পিতার কাছে কলঙ্কজনক মৃত্যুরূপে বিবেচিত হয়েছিল। মমতাময়ী মা সুজাতা সুস্থির থাকতে পারেননি। ছুটে গিয়েছিলেন কাটাপুকুরের লাশ ঘরে। প্রাণধন পুত্র ব্রতীর মৃত্যু নিয়ে কোথাও একটু সংশয় ছিল। তাই মুখটুকু দেখতে চেয়েছিলেন। অসীম করুণায় ডোম জানিয়েছিল—‘কি আর দেখবেন মাইজী? মুখ কি আর আছে কিছু?’ সীমাহীন মমতায় সুজাতা সবলে ব্রতীর মুখের আবরণ সরিয়ে দেয়। ‘শানিত ও ভারী অস্ত্রের উলটো পিট দিয়ে ঘা মেরে থেঁতলানো, পিষ্ট, ব্রতীর মুখ।’ আঙুল বোলানোর মতো ইঞ্চি পরিমাণ জায়গাও মসৃণ ছিল না। সবই দলিত, মোথিত, থেঁতলানো। তবু সুজাতা ব্রতী! ব্রতী! বলে আঙুল বোলায়। 
ব্রতীদের অপরাধ, ওরা দেয়ালে দেয়ালে বয়ান লিখত। ওরা লাল অক্ষরে লাল শব্দে দেয়াল রঙিন করে তুলত। কেবল মুক্তকণ্ঠে সমবেত স্লোগানই ধারণ করত না, প্রাণভরে বিশ্বাসও করত। দেবীর ভাষায়—‘ব্রতীরা এই এক নতুন জাতের ছেলে। স্লোগান লিখলে বুলেট ছুটে আসে জেনেও ব্রতীরা স্লোগান লেখে। কাটাপুকুর যাবার জন্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয়।’ ব্রতীরা এতটাই সমাজবিরোধী যে, দিব্যনাথের ন্যায় পিতারা মুখাগ্নিও করতে আসে না। ব্রতীদের লাশ কাটাপুকুরের মর্গে পড়ে থাকে। রাতে পুলিশ গাদাগাদি করে শ্মশানে বয়ে আনে। এরপর আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। শ্রাদ্ধে বিশ্বাসীজনও যথানিয়মে শ্রাদ্ধ করার সুযোগটুকুও পায় না। স্ফীত লাল চোখে বসে থাকতে হয় সারাটা দিন।

৬.
নকশাল আন্দোলনকে (১৯৭০) কেন্দ্র করে মহাশ্বেতা দেবী উপন্যাসটির আখ্যানভাগ সাজিয়েছেন। কল্পনার সঙ্গে সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতার দরকারি সমন্বয় ঘটয়েছেন। সেই সঙ্গে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তির সংগ্রামে (১৯৭১) কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা ‘বাংলাদেশের সহায় ও সমর্থনকল্পে পশ্চিমবঙ্গ তোলপাড় করে ফেলেছিল।’ কিন্তু নকশাল আন্দোলনের হত্যাকাণ্ড তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি অথবা এরমধ্যে পৈশাচিকতা খুঁজে পাননি। যদি পেতেন, ‘তাহলে ত কলকাতার কবি ও লেখক ওপারের পৈশাচিকতার সঙ্গে এপারের পৈশাচিকতার কথাও বলতেন।’ কিন্তু বলেননি। মূলত প্রান্তজনের বেঁচে থাকার লড়াই, লড়াই শেষে নিদারুণ পরিণতিই তুলে আনতে চেয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী। দেবীর গদ্যশেলীতে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও অসীম মমতায় সেটি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। উপন্যাস হয়ে উঠছে উপভোগ্য সেইসঙ্গে সাব-অলটার্ন হিস্ট্রির দরকারি দালিলিক শিল্পকর্ম। ২৮ জুলাই প্রয়াণদিবসে লেখকের প্রতি অশেষ প্রণতি।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১৮:৩৬

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা। কাঁটাবনে অবস্থিত প্রকাশনা সংস্থা ‘উজান’ এমন ঘোষণা দিয়েছে তাদের প্রকাশিত ‘কোরিয়ার কবিতা’ ও ‘কোরিয়ার গল্প’ নিয়ে আলোচনার জন্য।
এই বই দুটিতে রয়েছে কোরিয়ার বিশ ও একুশ শতকের উল্লেখযোগ্য কবিদের কবিতা এবং একই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিকদের ছোটগল্প। 
উজানের এই আয়োজনে সহযোগিতা করছে লিটারেচার ট্রান্সলেশন ইনস্টিটিউট অব কোরিয়া। 
বই আলোচনার সর্বোচ্চ পুরস্কার ২০ হাজার টাকা। এছাড়া দ্বিতীয় পুরস্কার ১৫ হাজার এবং তৃতীয় পুরস্কার ১০ হাজার টাকা। এই প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত সর্বোচ্চ ১০ আলোচকের প্রত্যেককে দেওয়া হবে ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের বই। 
আলোচনাগুলো বাছাই করবেন দেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও অনুবাদকদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারক কমিটি। একজন একটি বই নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন। আলোচনা বাংলাভাষায় লিখিত বা ভিডিও মাধ্যমে হতে হবে। 
অংশগ্রহণে ইচ্ছুক অনলাইনে ফরম পূরণ করতে করতে পারবেন এসব লিংকে www.ujaninfo.com, www.porospor.info। ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আলোচনা জমা দিতে হবে [email protected] এ।
বিস্তারিত জানতে এবং বই সংগ্রহ করতে পারবেন www.ujaninfo.com, www.facebook.com/UjanPrakashan, https://www.facebook.com/UjanBooks থেকে।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

কথা হয় জানি না 

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২১, ১৯:৪৪

কিছু ছবি এখনও আছে বলে কথা বলার দু-একটা মানুষ পাওয়া যায়>প্রতিবার মেঘ হলে মেঘমল্লার শুনে বৃষ্টি ভোলা যায় না>নিহত পশুররক্ত আর মাংস বাতাসে>দুঃখ আছে বলে কয়েকটা কবিতা এরপরও লেখা হবে>সকালগুলো ঘুমিয়ে কাটে বলে আর অপরাধবোধ জাগে না>রাত পেয়ে যাই>বাতাস কিন্তু ঘুরে যাচ্ছে>সময়ে সব বদলায় এ তত্ত্ব এখনও প্রমাণের চেষ্টা চলে>ঘরের মধ্যেও এক নেশা আসে বাইরেও এক নেশা যায়>নেশা>হেই হ্যালো, আমি হাস্নাহেনার গন্ধও পাচ্ছি>মাংসের গন্ধের সাথে>ছবি কিন্তু সব কথার উত্তর দেয়>হুহু করে উত্তর>থেকে বাতাস আসবে দুমাস পরেই>যদি বলি ছবিকে, কী, সে পাল্টা প্রশ্ন করে না>যদি বলি, কেন ও ইত্যাদি, পাল্টা প্রশ্ন করে না>যার যা উত্তর তা বুঝিয়ে দেয় আজকাল প্রতি রাতেই প্রায়>উত্তর পেতে পেতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে…>চরাচরে পাখি থাকলে বলে দিয়ো তাদের পাখায় আর কোনো শব্দ নেই>তাদের ওড়ায় আর কোনো নীরবতা নেই<

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বোকা দুপুরের নাম

বোকা দুপুরের নাম

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২১, ১২:১৮

বিকালের মেঘ ভেদ করে ঠোঁটজুড়ে আসে স্নিগ্ধ জলধারা। বহমান শান্ত জীবনের স্তুতি। তিনি হেসে চলেন, মন মাতানো মুগ্ধতা ছড়ায় চারপাশে। কংক্রিট শহরের মিহি আলোর অডিটোরিয়ামে মানুষ মানুষের বিশ্বস্ত চোখ খোঁজে। স্বপ্ন দেখে সরল বৈভবহীন জীবনের। যে স্বপ্নের স্পন্দন এখন ছড়িয়ে গেছে সমস্ত বাংলাদেশে। মঞ্চে যিনি অনর্গল কথা বলছেন সেই ‘আলোকিত মানুষ’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। বাগ্মী এ মানুষটির জীবন বহু কাজে বহু সৃষ্টিতে উদ্ভাসিত।

তাঁকে বুঝতে হলে তাকাতে হবে তাঁর অজস্র সৃষ্টিশীল বইয়ের দিকে, পাঠ নিতে হবে তাঁর আত্মজৈবনিক বইয়ের সরস বয়ান। জানতে হবে তাঁর ব্যাপক কর্মজীবন সম্পর্কে। চোখ খোলা রেখে আমাদের নিবিষ্ট হতে হবে সবুজ নিসর্গ, মানুষের কাছাকাছি বাংলার শ্যামল প্রান্তরে, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যে। সেই প্রকৃত সত্য খুঁজতে গিয়ে যন্ত্র বা নাগরিকতার ছোবলে যেখানে তাঁর হৃদয়ও আশাহত হয়েছে।

তিনি কবিতায় উচ্চারণ করেছেন―

একা একা টের পাই চারপাশে―আকাশে ও নিচে―
অবিশ্রান্ত আর্তনাদে ভেঙে যায় বহুদিনকার
ধানভানানীর গান এদেশের, পাটক্ষেত, বেহুলার ঘর―
ঢেঁকির পুরনো গল্প, সাপ, ঝোপ, দোয়েলের দেশ―
বাংলাদেশের আবহমানের।
(শাব্দিত কলঘর, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ২০)

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, জন্ম ২৫ জুলাই ১৯৩৯ সালে। অবিভক্ত ভারতে কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায়। পিতা সেময়কার স্বনামধন্য অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও নাট্যকার আযীম উদ্দীন আহমেদ, মাতা করিমউন্নেসা বেগম। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলায়। দেশভাগের পর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ পরিবারের সাথে চলে আসেন তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে। পিতার চাকরি সূত্রেই তার শৈশবের কিছু সময় কাটে টাঙ্গাইলের করটিয়ায়। সেখানকার বংশী নদী তাঁর শৈশবের মনোহর চিন্তায় দারুণভাবে গেঁথে আছে। তাঁর আত্মজৈবনিক বই বহে জলবতী ধারা প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, নিষ্ফলা মাঠের কৃষক ইত্যাদি তাঁর বহমান জীবনের নানান অভিজ্ঞতা, জীবন গল্পের সুনিপুণ বৃত্তান্ত। পিতার নাট্যচর্চা ও কবিতার খেয়াল তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করত। কলেজে পড়া অবস্থায় বুঁদ হয়েছেন কবিতায় ও সরল জীবনের দর্শনে। মূলত তার ব্যাপ্তিময় জীবনের ভিতটা সেসময়ই রচিত হয়েছিল। কলেজজীবনে তার কিছু শিক্ষকের অবদানও এক্ষেত্রে স্বীকার্য। কলেজজীবনেই তিনি ভ্রমণ করেন ইংরেজি কবিতা ও বাংলা কবিতার অপার সৌন্দর্যের ভূমিতে। যা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৬১ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে যোগদানের মধ্যদিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়। যা অব্যাহত ছিলো ১৯৯২ সাল পর্যন্ত। হরগঙ্গা কলেজ ছাড়াও শিক্ষকতা করেছে সিলেট মহিলা কলেজ, রাজশাহী কলেজ, ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজ (বর্তমানে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ) এবং সর্বশেষ ঢাকা কলেজে দীর্ঘসময় অধ্যাপনার পর অবসর গ্রহণ করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে বাংলা পড়াতেন। অধ্যাপক হিসেবে তার সফলতা ও জনপ্রিয়তা ছিল গগনচুম্বী। মূলত তাঁর সকল কাজের মাধ্যমেই তিনি মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। উজাড় করে দিয়েছেন সবটুকু। শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিজের কথায়―

আমি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলাম। সাহিত্যের স্বপ্ন ও সৌন্দর্য আজীবন আমার চেতনা-জগতে যে-হীরের দীপ্তি ছড়িয়েছে আমি সেই উজ্জ্বলতাকে ছাত্রদের ভেতরে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছি। তাদের সেই আনন্দে উজ্জীবিত করতে চেয়েছি। পরীক্ষায় ছাত্রদের বেশি নম্বর পাওয়াবার জন্যে পরিশ্রম করে জীবন নিঃশেষ করাকে আমার কাছে ‘দুর্লভ মানবজন্মে’র অপচয় বলেই মনে হয়েছে। জীবন কত দীপান্বিত ও জ্যোতির্ময় তা একজন ছাত্র সবচেয়ে ভালো করে জানতে পারে তার জীবনে দীপান্বিত শিক্ষকদের কাছ থেকে। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১১)

বর্তমান সময়ের শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে স্পষ্ট কথা বলতেও এ সফল অধ্যাপক দ্বিধা করেননি। প্রসঙ্গক্রমেই তিনি লিখেছেন―

আজ দেশের স্কুল-কলেজগুলোয় কার্যত লেখাপড়া হচ্ছেই না। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ লক্ষ শিক্ষকের অধিকাংশই শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নন, যাঁরা যোগ্য তাঁরা ছাত্রদের দেন অতি সামান্য। ফলে অভিভাবকরা কেউই বিদ্যালয়কে আজ তাঁদের সন্তানদের বিকাশের অঙ্গন হিসেবে মনে করেন না। ফলে বাণিজ্যিক উদ্যমসম্পন্ন গৃহশিক্ষকরা আজ হয়ে উঠেছেন ছাত্রসমাজের মূল আশ্রয়। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১৭৬)

বাংলাদেশের ষাটের দশকে নতুনধারার সাহিত্য সৃষ্টির আন্দোলনের পুরোধা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। প্রায় একযুগ ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা সম্পাদনা করার মাধ্যমে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলা সাহিত্য বাঁকবদলের ধারায়, প্রগতিশীল সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াসে। নিশ্চিত আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন সেসময়কার তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনালগ্ন হতে যুক্ত হন উপস্থাপনায়। রুচিশীল ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, উপস্থাপনায় তার নিজস্ব ধরন ইত্যাদি কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় উপস্থাপক খ্যাতিতে ও ব্যক্তিত্বে। তাঁর হাত ধরেই অনেক মেধাবী তরুণ উঠে আসে। তাঁর ‘আমার উপস্থাপক জীবন’ বইটিতে তিনি তুলে ধরছেন তাঁর উপস্থাপক জীবনের নানান দ্বন্দ্ব ও প্রতিকূলতা। বর্ণনা করছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে যাত্রা আর সমৃদ্ধির বিভিন্ন দিক। আমাদের মহান মুত্তিযুদ্ধে পাকসেনাদের হাতে আটক হয়েছিলেন তিনি। উপস্থাপক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচিয়ে ছিল বলে তিনি বইটিতে বলেছেন নির্দ্বিধায়। তাঁর ‘সংগঠন ও বাঙালি’ বই পাঠকের কাছে খুবই জনপ্রিয়। জাতীয় জীবনে সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা, বাঙালির সংগঠনের দুর্বলতা এবং তা কীভাবে আমাদের জাতীয় জীবনে উন্নতির মূলবাধা হয়ে দাঁড়ায় তার স্পষ্ট বয়ান রয়েছে বইটিতে। সংগঠনের অভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রায় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, ব্যক্তি ডুবে থাকে তা আত্মকেন্দ্রিকতায় এসবের সত্য উপলব্ধি উঠে এসেছে তাঁর লেখায়।

১৯৭৮ সালে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। তিনি কবিতায় লিখেছেন―

রাত্রিকে বাসে না ভালো কেউ সম্প্রতি। কেননা এ
রাত্রি সব এক করে দেয়। রাত্রির নির্বাক কাফন
জামার পৃথক রঙ, স্বতন্ত্র চুলছাঁটা, আস্তিনে মাপ
মুছে দিয়ে সবাইকে আদ্যোপান্ত এক পাতলুনের ভেতর
নিয়ে আসে।
(মৃত্যুময়ের জন্য, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ৫৬)

হ্যাঁ, তিনি এমন রাত্রিকেই দূর করতে চেয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন সংস্কৃতিমান, মুক্ত চেতনার সৃজনশীল মানুষ না হলে আগামী বাংলাদেশ হবে অনুর্বর, অন্ধকার। তিনি বইয়ের সোনালি অক্ষরে, জ্ঞানের অমৃতবাণীতে বদলাতে চেয়েছেন সমাজকে, তরুণদের। বই পড়া আন্দোলন ও নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লক্ষ হচ্ছে―আগামী দিনের অর্থাৎ তরুণদের বড় করে তোলা ও তাদের সংঘবদ্ধ জাতীয় শক্তিতে পরিণত করা। প্রায় বিয়াল্লিশ বছর ধরে তাঁর নেতৃত্বে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বিভিন্নভাবে কাজ করে চলেছে অবিরাম। এগুলো মধ্যে রয়েছে―দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রম, পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি, আলোর ইশকুল, কেন্দ্রের লাইব্রেরি, আলোকচিত্র চক্র, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি। সারা দেশে প্রায় ২৪ লাখ ছাত্র/ছাত্রী বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কার্যক্রমের সাথে যুক্ত। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন―

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবনের সর্বাধিক কীর্তি হিসেবে দেখা দেয়। যেখানে আমরা অনেকে মিলে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারি না, সেখানে একক প্রচেষ্টায় এত বড় একটা প্রতিষ্ঠান গড়া যে তাঁর বিশেষ যোগ্যতার প্রকাশ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর ব্যাপ্তি সারা দেশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের সীমানা ছাড়িয়েও।…সায়ীদ লিখেছেন প্রচুর। কবিতা ও ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও ভাষণ, স্মৃতিকথা ও জার্নাল, নাটক ও অনুবাদ।…তাঁর মধ্যে মিলিত হয়েছে শিল্পী ও কর্মী, ভাবুক ও উদযোগী। তাঁর চিন্তা ও সাধনায় দেশ ক্রমাগত উপকৃত হোক। (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, পৃ. ৩৫, ৩৬)

সত্যিকারভাবেই বহুমুখী কাজের মাধ্যমে তিনি উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩২টি। গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতায় সাহিত্যে বিভিন্ন শাখায় তিনি অবদান রেখেছেন ও রেখে চলেছেন। সামাজিক নানা কাজেই তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। যেমন ডেঙ্গু প্রতিরোধ আন্দোলন, পরিবেশ দূষণবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি। তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন সম্মাননা ও পুরস্কার। এগুলোর মধ্যে আছে―জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার (১৯৭৭), র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার (২০০৪), একুশে পদক (২০০৫), পরিবেশ পদক (২০০৮), বাংলা একাডেমি পদক (২০১২) ইত্যাদি।

‘আলোকিত মানুষ চাই’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের দেখানো পথেই আগামী দিনের তরুণদের মধ্যে ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’ বই পড়ার মাধ্যমে এমন অনুভূতির প্রবহমানতায়, চর্চায় হয়তো আমরা পাব সংঘবদ্ধ, প্রগতিশীল, আত্মকেন্দ্রিক জীবনকে পেছনে ফেলে আসা দেশপ্রেমিক বুদ্ধিদীপ্ত এক প্রজন্ম। যা বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।

এ মহীরুহের জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা।

সহায়ক গ্রন্থ

১. বহে জলবতী ধারা (প্রথম খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
২. বহে জলবতী ধারা (দ্বিতীয় খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০১১।
৩. মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৮৮।
৪. নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৫. বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৬. আমার উপস্থাপক জীবন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৫।
৭, সংগঠন ও বাঙালি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
৮. আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, সম্পাদনা―আতাউর রহমান, ঢাকা, ২০১৫।
৯. ইন্টারনেট।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২১, ০৯:০০

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (২৩ জুলাই, ১৮৯৮-সেপ্টেম্বর ১৪, ১৯৭১) বিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি কথাসাহিত্যিক। তার সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি গল্পগ্রন্থ, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধের বই, ৪টি আত্মজীবনী, ২টি ভ্রমণ কাহিনী, ১টি কাব্যগ্রন্থ এবং ১টি প্রহসন। তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, পদ্মশ্রী এবং পদ্মভূষণ পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন।

 

যা খুব ছোট, তাকে খুব কাছ থেকে না দেখলে ভালো করে চেনা যায় না। দূর থেকে তা অস্পষ্ট দেখায়। কিন্তু যা খুব বড়, একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে তাকে না দেখলে, তার ব্যাপ্তিটা অধরা থেকে যায়। প্রথম হিমালয় দর্শনে ঠিক এই রকমই একটা সম্ভ্রম জাগানো অনুভূতি হয় যেকোনো মানুষের। কিন্তু আস্বাদন পরিপূর্ণ হয়, শুধু দূর থেকে নয়, যখন কাছে গিয়েও তাকে দেখি।
কিন্তু আমার তারাশঙ্করের দর্শন ঘটেছিল এর ঠিক বিপরীত ক্রমে। তাঁকে প্রথমে দেখেছিলাম খুব কাছ থেকে, পরম স্নেহের নৈকট্যে। সে প্রথম যে ঠিক কবে তা আজ আর বলতে পারি না—তবে স্মৃতির ভেতরে প্রথম যে ছবিটি দেখি তা সম্ভবত ১৯৪৮ এর, এবং স্থান কলকাতারই বাগবাজারের ১/১ আনন্দ চ্যাটার্জি লেনের একটি বাড়ির দোতলার ঘরে। একটি সাবেকী আমলের খাটের ওপর চড়ে আমরা তিনটি শিশু খেলছি, লাফাচ্ছি, কখনো বা নাচছি—আর অদূরেই কৃষ্ণবর্ণ ধ্যানমগ্ন এক প্রৌঢ় ছোট্ট একটি কাঠের ডেস্কের ওপর গভীর নিবিষ্ট হয়ে লিখে চলেছেন পাতার পর পাতা। মুক্তোর মতো অক্ষরে একে একে ফুটে উঠছে বাংলা কথাসাহিত্যের উজ্জ্বলতম রত্নখনি। তবু সে সান্নিধ্য এত সহজ ছিল বলেই হয়তো আজও সমানভাবে স্পষ্ট। তিনি লিখছেন আর আমরা—তাঁর নাতিনাতনিরা খেলছি। খেলা যখন ছিল তোমার সনে/তখন কে তুমি তা কে জানতো? জানতে পারিনি ঐ নৈকট্যের জন্যই হয়তো-বা। ফলে আমাদের খেলাটা ছিল অবাধ। কখনো ঘরে কখনো ঘর ছাড়িয়ে বারান্দায়—সরু লম্বা বারান্দার ওপাশে আরেকটা বারান্দায় কখনো কখনো দেখা দিতেন লং ক্লথের পাঞ্জাবি পরা, সাদা চুল এক বৃদ্ধ। দাদুর যামিনী দা—শিল্পী যামিনী রায়। মাঝে মাঝে দুই জ্যোতিষ্কের বার্তাবিনিময় হতো এপার ওপার।
ইতিমধ্যে দাদুর সাহিত্যিক খ্যাতি বাড়ছিল। বাড়ি তৈরির কাজও চলছিল। ১৯৪৯ এ বাগবাজার ছেড়ে তিনি উঠে গেলেন টানাপার্কে তাঁর নিজস্ব বাড়িতে। তার কিছুকাল পরেই আমরাও চলে এলাম পাইকপাড়ায় গোয়েল্কা গার্ডেন্স-এর একটি আশ্চর্য সুন্দর ফুটফুটে ফ্ল্যাটে। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। খুব কাছেই দাদুর বাড়ি। রোজ বিকেলে খেলতে যেতাম ওবাড়ির পাশের মাঠে। বাড়ির সামনেই বোগেনভেলিয়ার ছায়অর নিচে দুপাশে রোয়াক, মাঝে বেতের চেয়ার পাতা। দাদু বসে আছেন। তাঁকে ঘিরে আরো কতজন। কথা হতো কত বিষয়ে। মাঝে মাঝেই শৈল দাদু এসে উপস্থিত হতেন। সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। দাদুর বাড়ির ঠিক বিপরীতে আর্মড পুলিশের ক্যাম্প। তার ওপাশে ইন্দ্রবিশ্বাস রোডের ওপর বাড়ি করেছিলেন শৈল দাদু। প্রতিদিন সকালে বন্ধু সন্দর্শনে তাঁর আসাটা ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। দাদুও যেতেন।
কিন্তু সে অনেক পরের ঘটনা। ১৯৬০-৬১ নাগাদ তখনো সজনীকান্ত দাস বেঁচে। শনিবারের চিঠি প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত রমরমিয়ে। শৈলজানন্দের বাড়ি থেকে পূবদিকে আরেকটু এগোলেই সজনীকান্তের বাড়ি। নিচে বিশাল অফিস, প্রেস আর সেখানেই বাংলার তাবড় তাবড় সাহিত্যিকদের আড্ডা। সে আড্ডায় তারাশঙ্করকে, শুনেছি বড়বাবু বলেই চিহ্নিত করা হতো।
দেখতে দেখতে আমাদের টালা-পাইকপাড়া অঞ্চলটা একসময় সাহিত্যিকদের তীর্থস্থান হয়ে উঠল। মন্মথ দত্ত রোডের একটি ফ্ল্যাটে কাজী নজরুল ইসলাম; কিন্তু তাঁর চৈতন্য তখন মহামগ্ন। আরেকটু এগিয়ে সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্র। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীও এলেন কিছুকাল পরে, শৈলজানন্দের বাড়ির একতলায়। পাইকপাড়ায় আমাদের বাড়িরই কাছে হাউসিং স্টেটে থাকতেন গৌরকিশোর ঘোষ।
চাঁদের শোভা থাকে, সূর্যের রামধনু। বিদ্রোহী কবি তখন ফুলের জলসায় নীরব। তাঁকে বাদ দিলে, বাকিরা ছিলেন তারাশঙ্করের...। তাঁর সভার নিত্য অতিথি।
কিন্তু আরো দুজন ছিলেন, তাঁরা শুধু তাঁর... ছিলেন না, তাঁর ভাবের অংশীদারও ছিলেন। একজন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র, আমার বড়মামা সনৎকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরেকজন আমার বাবা, তারাশঙ্করের জ্যেষ্ঠ জামাতা শান্তিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়। শুধু আত্মীয় নয়, এঁরাও ছিলেন তাঁর সভার...।
আরো কতজন, কত গুণীজন, কত কবি সাহিত্যিক শিল্পী যে তাঁর বাড়িতে পদচিহ্ন রেখে গেছেন তার হিসাব দেওয়া অসম্ভব। এসেছেন বনফুল, অচিন্ত্যসেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, প্রবোধ সান্যাল, আশাপূর্ণা দেবী, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী—এমনি আরো কত যে গুণীজন। আর এঁদের... আর ফুলের গন্ধে—টালাপার্কের বাড়ি ভরে উঠত প্রতিবছর ৮ই শ্রাবণ—তারাশঙ্করের জন্মদিন। বাড়িতে মানুষ ধরত না। তাই ম্যারান বেঁধে—সে এক বিপুল আয়োজন। ফুলের গন্ধের সঙ্গে যোগ দিত খাবারের মন মাতানো গন্ধ।
বছরে দুটি দিনের জন্য আমাদের ছিল একমাত্র প্রতীক্ষা দুর্গা পুজো আর আটই শ্রাবণ। আমাদের মধ্যে আবার আমার দিদি, শকুন্তলার প্রতীক্ষা ছিল সবচাইতে ব্যাকুল। কারণ, কি সৌভাগ্য ওরও জন্মদিন ঠিক ওই ৮ই শ্রাবণ। একে বড় নাতনি, তার জন্মদিনের ঐ একসূত্রতা। দাদুর কাছে ওর ছিল একটু বিশেষ সমাদর। ওকে নিয়ে কবিতাও লিখেছিলেন তিনি—
তুমি যখন হবে পঞ্চদশী
আমি হব ষাট বছরের বুড়ো
তুমি খাবে কড়মড়িয়ে মেঠাই
আমি খাব চেটে চেটে ঝুরো।

দাদুর বয়স যখন পঁয়তাল্লিশ, তখন দিদির জন্ম। অতএব দাদুর যখন ষাট, দিদি তখন পঞ্চদশী। টীকা আরো একটু হয়তো অপ্রায়োগিক হবে না। বীরভূমে মিঠাইকে বলে মেঠাই, মেটাই, কিংবা আরো সঠিকভাবে বললে ‘মিটিই’। মনে হতে পারে মিঠাই কি তবে কড়মড়িয়ে খাওয়া যাবে? আসল কথা হলো, মেঠাই মানে বীরভূমে সন্দেশ নয়—গুড় আর বেসনের লম্বা লম্বা কাঠিভাজা, ওখানে বলে সিড়িভাজা—তার নাড়ু—বেশ শক্ত, কড়া পাকেঢ়। কড়মড়িয়েই খেতে হয়। প্রতিবছর পুজোর সময় ঘরে ঘরে এইসব মেঠাই, নারকেল খণ্ড, খই বিনু—এমনি আরো কত কি তৈরি হতো। আর ঝুরো হলো শুকনো বালিগুড়। এও বীরভূমেরই শব্দ।
সে তো আসবেই। তারাশঙ্করের কবিতায় বীরভূম আসবে না, লাভপুর আসবে না—তাই হয়! কোনো না কোনোভাবে আসবেই আসবে। তাঁর শেকড় যে ঐ মাটিতেই। আর জীবনের শেষ মুহূর্তেই তাঁর ভ্রুযোগ ছিন্ন হয়নি। প্রায়ই যেতেন গ্রামের বাড়িতে। তাঁদের যে সাবেক বৈঠকখানা বাড়ি—খড়ের চাল, এপাশ ওপাশ বারান্দা, সামনে বাগান—আর এই বাগানেই তিনি রোয়াক বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন, ভারী সুন্দর একটা গোলঘর বানিয়ে ছিলেন। সামনে নানান ফুলের গাছ। রোয়াকের পাশে চেয়ার পাতা—এখানেই বসতেন বন্ধুবান্ধব পরিচিতজনের সঙ্গে। গল্প হতো। কখনো অন্ত্যজ শ্রেণির বহু মানুষ আসতেন। তাঁর কাছে তাঁরাও ছিল আপনজন। পুজোর সময় সবাইকে কাপড় দিতেন। অর্থ সাহায্য দিতেন সাধ্যমতো।
লাভপুরকে তিনি ভোলেননি। আর লাভপুরও আজও ভোলেনি তাঁকে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

সর্বশেষ

অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হবে: খাদ্যমন্ত্রী

অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হবে: খাদ্যমন্ত্রী

২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় মৃত্যু ৭৬, শনাক্ত ৬৯৯৬

২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় মৃত্যু ৭৬, শনাক্ত ৬৯৯৬

শ্রমিক ছাঁটাই এবং কারখানা লে-অফ ঘোষণা না করার অনুরোধ

শ্রমিক ছাঁটাই এবং কারখানা লে-অফ ঘোষণা না করার অনুরোধ

বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসের কাছে রকেট হামলা

বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসের কাছে রকেট হামলা

সিনোফার্মের আরও ৩০ লাখ ডোজ টিকা আসছে রাতে

সিনোফার্মের আরও ৩০ লাখ ডোজ টিকা আসছে রাতে

পিপিপি কনসেপ্ট আমরা এখনও ভালোভাবে নিতে পারিনি: অর্থমন্ত্রী

পিপিপি কনসেপ্ট আমরা এখনও ভালোভাবে নিতে পারিনি: অর্থমন্ত্রী

এবার অভিযুক্ত নির্মাতা বান্নাহ, চাইলেন ক্ষমা

এবার অভিযুক্ত নির্মাতা বান্নাহ, চাইলেন ক্ষমা

জনদুর্ভোগ কমাতে এসিল্যান্ডদের নির্দেশ দিয়ে পরিপত্র জারি

জনদুর্ভোগ কমাতে এসিল্যান্ডদের নির্দেশ দিয়ে পরিপত্র জারি

১৯ আগস্টের মধ্যে এসএসসির অ্যাসাইনমেন্টের তথ্য পাঠানোর নির্দেশ

১৯ আগস্টের মধ্যে এসএসসির অ্যাসাইনমেন্টের তথ্য পাঠানোর নির্দেশ

সরকারি ৮ হাসপাতালের আইসিইউতে বেড ফাঁকা নেই

সরকারি ৮ হাসপাতালের আইসিইউতে বেড ফাঁকা নেই

প্রথমবারের মতো কাতারে অনুষ্ঠিত হবে আইনসভার নির্বাচন

প্রথমবারের মতো কাতারে অনুষ্ঠিত হবে আইনসভার নির্বাচন

৭১ বছরের বৃদ্ধের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ায় তরুণীর আত্মহত্যা

৭১ বছরের বৃদ্ধের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ায় তরুণীর আত্মহত্যা

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

থিয়েটার

থিয়েটার

গহন
শীতের অপেক্ষা করছি না

শীতের অপেক্ষা করছি না

মন্তাজের নিজের জমি

মন্তাজের নিজের জমি

© 2021 Bangla Tribune