X
সোমবার, ০২ আগস্ট ২০২১, ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

প্রকাশনা শিল্পকে যেখানে রেখে গেলেন মহিউদ্দিন আহমেদ

আপডেট : ২৬ জুন ২০২১, ১১:৩৯

মহিউদ্দিন আহমেদকে বনানী কবরস্থানে যখন শুইয়ে দেয়া হচ্ছিল, সামান্য কয়েকজন মানুষই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সেটার একমাত্র কারণ তাঁর পরিবারের সদস্যরা এমনই নিভৃতি চেয়েছিলেন কর্মব্যস্ত এই মানুষটির বিদায় মুহূর্তে। কিন্তু এই পথপ্রদর্শক মানুষটিকে নিয়ে গণমাধ্যম ও অন্যত্র যে আলোচনাটি হবার কথা ছিল– নিছক মহিউদ্দিন আহমেদকে স্মরণ করবার জন্য নয়, আমাদের জাতিগত স্বার্থেই– সেটি কতখানি দেখছি আমরা?

১.
আহমদ ছফার জবানিতে অধ্যাপক রাজ্জাকের বহুল উদ্ধৃত কথাটি দিয়েই মহিউদ্দিন আহমেদের স্মরণে একটি লেখার শুরু হতে পারে: ‘একটা কথা খেয়াল রাখন খুব দরকার। যখন একটা নতুন জায়গায় যাবেন, দুইটা বিষয় পয়লা জানার চেষ্টা করবেন। অই জায়গার মানুষ কী খায় আর পড়ালেখা কী করে। কাঁচাবাজারে যাইবেন কী খায় হেইডা দেহনের লাইগ্যা। আর বইয়ের দোকানে যাইবেন পড়াশোনা কী করে হেইডা জাননের লাইগ্যা। ...কী খায় আর কী পড়ে এই দুইডা জিনিস না জানলে একটা জাতির কিছু জানন যায় না।’

বাংলাদেশে কী পড়া হয়, সেই হিসেবে যদি আসতে চাই, ‘আপাতদৃষ্টে’ অন্তত মনে হয় মহিউদ্দিন আহমেদের জীবনের সংগ্রাম সফল হয়নি, যে পদ্ধতিতে এবং যে ধরনের গ্রন্থ প্রকাশে মহিউদ্দিন আহমেদ এবং তার প্রতিষ্ঠান ইউপিএল বলা যায় পথপ্রদর্শক, তার পরিসর বাংলাদেশে ক্রমশ কমে এসেছে। খুব সম্ভবত মহিউদ্দিন আহমেদের জীবদ্দশাতেই এই পিছু হটা ঘটে গেছে। ব্যক্তিগত শিক্ষাদীক্ষায় মহিউদ্দিন আহমেদের যা যোগ্যতা ছিল, তাতে তিনি অনায়াসেই বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা, গবেষণা বা সাংবাদিকতা-সহ অন্য বহু পেশায় অনায়াসে দারুণ সফল হতে পারতেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইউপিএলও অসফল নয়, অন্তত বাণিজ্যিক বিচারে। এর সাথে মহীরূহতুল্য যে খ্যাতি তিনি জীবিত অবস্থাতেই অর্জন করেছেন প্রকাশনাশিল্পে, সেটাও একজীবনের অর্জন হিসেবে বিপুল। কিন্তু যে ‘জ্ঞানভিত্তিক’ সমাজ গড়ার নেশায় প্রকাশনাকেই তিনি পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন, এবং একটা বিশেষ ধরনের প্রকাশনাকে প্রতিষ্ঠিত করার ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিজ্ঞায় আজীবন লিপ্ত ছিলেন, সেটার স্থান সংকুচিত হওয়াকে জীবিত অবস্থাতেই তিনি দেখে গিয়েছেন। জানি না তাঁর জন্য ব্যক্তিগতভাবে এটি কতটা দুঃখের ছিল, তবে আমাদের গোটা জাতির জন্যই এটি একটি মর্মান্তিক বাস্তবতা।

২.
মহিউদ্দিন আহমেদের অর্জন কী? একটা তুলনা করা যাক আরেকজন প্রবাদপ্রতিম প্রকাশকের সাথে, তিনি মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা। বাংলাদেশের অজস্র লেখকের তিনি প্রথম বা দ্বিতীয় গ্রন্থের প্রকাশক। পুঁথিঘর লিমিটেডের নোট বই থেকে চিত্তরঞ্জন সাহা যা আয় করেছেন, তার একটা বড় অংশ ব্যয় করেছেন বাংলাভাষার লেখকদের পেছনে। এটা সন্দেহাতীতভাবেই একটা বড় কৃতিত্ব, নোট বইয়ের হাতে শিক্ষা ধ্বংসের প্রক্রিয়াটি যতই সম্পর্কিত থাক না কেন। নোট বইয়ের বাস্তবতা চিত্তরঞ্জন সাহা তৈরি করেননি, তিনি শুধু ঘাটতিটুকু পূরণ করেছেন। কিন্তু অর্জিত অর্থ অকাতরে খরচ করেছেন বাংলাদেশে বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতায়।
অন্যদিকে বিশেষকরে ১৯৮০ ও ১৯৯০ দশকে প্রকাশিত বাংলাদেশের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সমকালীন ইতিহাস বিষয়ক গবেষণা-গ্রন্থগুলোর দিকে তাকান, প্রায় অধিকাংশ প্রকাশিত হয়েছিল মহিউদ্দিন আহমেদের তৈরি করা প্রতিষ্ঠান থেকে। অন্য কোনো সরকারি/বেসরকারি/আধাসরকারি ‘বৃহৎ’ প্রতিষ্ঠান এই বিষয়ে তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারবে না, বাংলা একাডেমির প্রকাশিত প্রাচীন ইতিহাস ও পুঁথিসাহিত্যের ভাণ্ডারকে বিবেচনা থেকে বাদ দিলে। এ বিষয়ে আমার সাক্ষ্য মূল্যবান, কেননা আমি নিজে তেমন বড় বইয়ের সংগ্রাহক নই, নতুন বই কেনা এড়িয়ে চলি, এবং পারতপক্ষে দামি বই কিনি না, বাধ্য না হলে কোনো বইই না। প্রধানত ইউপিএল-এর বই কিনেছি ফুটপাথ থেকে, সেগুলো দাম হারাবার পরই, কেননা তাদের নতুন বই কেনার সাধ্য আমার ছিলও না। পাঠাগারে যেয়ে কিংবা অন্যের থেকে ধার করেই পড়ার অভ্যাস করেছি। এত কৃপণতার পরও যখনই রাতের বেলা নিজের বইয়ের তাকগুলোর দিকে তাকাই, মনে হয় দেয়ালে ইউপিএল-এর একটা প্রদর্শনী চলছে। এটা কোনো সচেতন বাছাই ছিল না, বলা যায় ফুটপাথে গবেষণামূলক বইপত্রের যা যা আসে চুঁইয়ে চুঁইয়ে, তারই একটা সাধারণ প্রতিফলন মাত্র, বাধ্য হয়ে যেগুলো কিনতে হয়েছিল নানান কাজে। গত চল্লিশ বছরে গবেষণামূলক সাম্প্রতিক গ্রন্থ প্রকাশে ইউপিএল-এর ধারেকাছে যাবার সামর্থ্য বাংলাদেশের বাকি প্রকাশনা সংস্থার একত্রে মিলেও হবে না।

কেনো এমনটা হয়েছে? কারণ সম্ভবত এটা যে, মহিউদ্দিন আহমেদের আগে বই বিষয়ে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষিত ব্যক্তি দেশে ছিলেন না। ফলে প্রকাশনার কাজটি এর আগ পর্যন্ত ছিল প্রধানত একটা স্বতঃস্ফূর্ত বিষয়। প্রশিক্ষণের এই বিষয়টাকে কয়েকটা দিক দিয়ে বোঝার চেষ্টা করা যায়। একটা দিকে আছে পাণ্ডুলিপি বাছাই। আরেকটা দিকে আছে সম্পাদনা।

একটামাত্র উদাহরণে প্রথম বিষয়টা, অর্থাৎ পাণ্ডুলিপি বাছাই বিষয়টা বুঝতে সুবিধা হবে। বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, জলবায়ূ, কৃষি, উন্নয়ন পরিকল্পনা বিষয়ে প্রধানতম গবেষক হিউ ব্রামারের অসাধারণ সব গ্রন্থ কিভাবে প্রকাশিত হলো, মহিউদ্দিন আহমেদের সেই বিষয়ক স্মৃতিচারণে শোনা যাক: “১৯৯৬-এর দিকে তিনি আমার অফিসে এলেন। তত দিনে চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন, কাজ থেকে নয়। মানুষ টায়ার্ড হয়ে রিটায়ার্ড হয়। তিনি হননি। আমাকে বললেন, ‘বাংলাদেশে এত বছর কাজ করেছি। প্রচুর আর্কাইভাল ম্যাটেরিয়াল আছে। এগুলো কী করব বুঝতে পারছি না।’ জিজ্ঞেস করলাম, লেখা-টেখা আছে? বললেন, ‘লেখা মানে কী! আমার কম্পিউটার ভর্তি বাংলাদেশ নিয়ে নানা লেখা।’ কৃষি, মাটি, ভূগোল– পুরো দেশটাই তাঁর নখদর্পণে।” [রানা আব্বাস; ব্রিটিশ গবেষক হিউ ব্রামার: ভালোবাসি বাংলাদেশ, ১৭ অক্টোবর, ২০১৫, দৈনিক প্রথম আলো]

বাংলাদেশে অধিকাংশ প্রকাশক তৈরি হওয়া পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাজ করেন। একজন পণ্ডিত বা বিদ্যৎজনের সাথে আলাপের ভিত্তিতে তাকে পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে বসিয়ে দেয়া, এটি হলো খাঁটি প্রকাশকের প্রধান কাজ, তাতে তার বই লেখার কোনো পূর্বাভিজ্ঞতা না থাকুক।
মাত্র কদিন আগেই পড়ছিলাম ‘দ্যা স্কোয়াটারস অব ঢাকা সিটি’ নামে অধুনালুপ্ত আগারগাঁও বস্তি নিয়ে একটা গবেষণা গ্রন্থ, প্রতিমা পাল-মজুমদার, সিমিন মাহমুদ আর রিতা আফসার এই তিন জন মিলে অসাধারণ গবেষণাটি করেছিলেন। আশি ও নব্বই দশকের বস্তি জীবন, বরিশাল-নোয়াখালী-রংপুর-জামালপুর-কুমিল্লা জেলা থেকে অভিবাসী হয়ে ঢাকায় আসা মানুষগুলোর জীবনের নানান দিক নিয়ে একটা পরিপূর্ণ অথচ ক্ষীণকায় গবেষণাগ্রন্থ– মহিউদ্দিন আহমেদের মতো মানুষ এবং ইউপিএল না থাকলে এমন অজস্র সম্ভাব্য জরুরি বই বিআইডিএস কিংবা সিপিডির গবেষণাপত্র হিসেবেই কিয়ামত তক ঘুমিয়ে থাকতো নানান দস্তাবেজের মাঝে। সত্যি বলতে কী, এই বইটা পঁচিশ বছর আগে পড়া থাকলে কোনো কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়তো অন্য রকম নিতাম, হয়তো অন্য রকম ভাবতাম। এই গবেষণাটিতে তুলনা করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল ১৯৮৩ সালের আরেকটা গবেষণাকে, আজকের নতুন গবেষক চাইলে সেই দুটোকেই তাদের নতুন গবেষণার ছাঁচ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অভিবাসীদের দশকওয়ারী তুলনামূলক অগ্রগতি বুঝবার কাজে। এমনি বহু গবেষণাকর্ম আসলে এখনও ঘুমিয়ে থাকে গবেষণাসংস্থার দেরাজে, কেননা মহিউদ্দিন আহমেদ একজনই ছিলেন, সকল পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাজ করা একার পক্ষে সম্ভব না। এমন আর পাঁচ জন থাকলে আরও অজস্র গবেষণাগ্রন্থ আমরা হাতে পেতাম, গ্রন্থাগারগুলোকে এতটা শূন্য মনে হতো না।

নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সটি প্রেসের সাথে যুক্ততা নিশ্চয়ই এ বিষয়ে তার চোখ খুলে দিতে সাহায্য করেছিল। সকল বিষয়ে একজন প্রকাশক বিশেষজ্ঞ হবেন না, কিন্তু তাকে অন্তত সম্ভাবনাময় গবেষক ও গবেষণাকর্মগুলোকে চিনবার মতো দক্ষতা থাকতে হবে, থাকতে হবে তেমন সহকর্মীও। বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক স্তরে ভ্যান সেনডেল বা জয়া চ্যাটার্জির মতো উল্লেখযোগ্য প্রায় সকল বিশেষজ্ঞই যে একজন প্রকাশকের সাথে নিত্য সংস্পর্শে ছিলেন, তিনি মহিউদ্দিন আহমেদ।

এই বইগুলো প্রকাশের পরিণতি সর্বদা আরামদায়ক ছিল না। ইউপিএল-এর বহু প্রয়োজনীয় গবেষণাগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়নি। এদের কোনো কোনোটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে লেখকের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায়। অনেকগুলোতেই মহিউদ্দিন আহমেদ নিজেই ঝুঁকিটা নিয়েছেন। হিউ ব্রামারের প্রসঙ্গেই রানা আব্বাসের পূর্বোক্ত লেখা থেকে আবারো উদ্ধৃত করা যাক: ‘তবে বইয়ের প্রকাশের কাজটা ছিল ব্যয়সাপেক্ষ। সেটি কলেবরের কারণেই। বইগুলোর বিক্রির সম্ভাবনা ছিল অনিশ্চিত। তবু কেন এ ব্যয়বহুল বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত? মহিউদ্দিন আহমেদের যুক্তি ছিল, ব্রামার যা করছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থাৎ কৃষি খাতের জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে। গবেষকদের জন্যও এমন বই হাতে পাওয়া দুর্লভ ব্যাপার। সরকারে যাঁরা এ বিষয়ে নীতি নির্ধারণ করেন, তাঁদেরও বইগুলো কাজে আসবে।’

বাংলাদেশে পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে শাহাদত চৌধুরী যেমন, প্রকাশক হিসেবে আরও বড় স্থানে, কিংবা একক স্থানে মহিউদ্দিন আহমেদ। বাকি সকল প্রকাশক কম কিংবা বেশি বাণিজ্যিকভাবে সফল বা ব্যর্থ, পাঠককে বিনোদন দেয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি তারা পালন করে আসছেন, এর বাইরে তাদের নিয়ে বলবার তেমন কিছু নেই। মহিউদ্দিন আহমেদকে সেই জায়গা থেকে মাপাই যাবে না। তিনি আসলে এমন ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করেছেন– গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ, এবং প্রধানত বাংলাদেশ নিয়ে করা গবেষণা কর্মকে বই আকারে প্রকাশ– সেই স্থানে তিনি একক এবং অনন্য। শাহাদত চৌধুরীর কথা কেন তুললাম! ৮০ ও ৯০ দশকে তাঁর করা ঈদ সংখ্যাগুলোর দিকে তাকালে দেখবেন, নিশ্চিতভাবেই জনপ্রিয় হবে এমন সব দুর্দান্ত লেখা, যেমন মেকওলের লেখা ক্লাইভের জীবনীর অনুবাদের পাশাপাশি নিশ্চিতভাবেই পাঠক আদৌ খাবে না, তেমনি একটা প্রবন্ধ বদরুদ্দীন উমরের লেখা ‘পূর্বপাকিস্তান যুবলীগ’ হয়তো ছেপে ফেলবেন তিনি। এইখানেই পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্বশীলতা, তিনি পুরোটা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হবেন না, সমাজের প্রতি দায় থেকেও কাজ করবেন। পাঠক তৈরি করা সম্পাদকের কাজ, পাঠককে হাত ধরে এগিয়ে নেয়া সম্পাদকের কাজ। দেখবেন, পাঠক খায় না এই রকম গবেষণালদ্ধ ফলাফলের অজুহাতে বাংলাদেশে সাহিত্য পাতাগুলো কমিয়ে দেয়া হয়েছে। বলি, এই গবেষণাটা করেছে কে বা কারা? জীবনে সাহিত্যের ধারেকাছে দিয়ে না হাঁটা লগ্নিবিদ্যার ছাত্ররা? অজস্র যে সদ্য তরুণ এই সাহিত্যপাতাগুলোর মাধ্যমে অন্তত খানিকটা সাহায্য পান সাহিত্য করতে বা সাহিত্য রুচি গড়ে তুলতে গবেষণার ইশারা পান, তাদের সাথে কি এই লগ্নিবিদ্যার শিক্ষার্থীদের পরিচয় আছে? বরং এই সাহিত্যপাতা গুরুত্বহীন হয়ে যাওয়া পাঠকের সাথে দৈনিকের একটা বিচ্ছিন্নতা তৈরি করেছে, যে অভাব বিনোদন পাতা পূরণ করতে সক্ষম নয়। অন্যদিকে নিশ্চিত লোকসানের মুখেও মহিউদ্দিন আহমেদ বলছেন ব্রামার এর বই নিয়ে: ‘বইগুলো কাজে আসবে।’

মহিউদ্দিন আহমেদ
৩.

গবেষণাগ্রন্থ কাজে লাগে, কিন্তু প্রায়ই তার বাণিজ্যিক মূল্য নাই, লোকসানী কারবার। ফলে মহিউদ্দিন আহমেদকে নানান রকম অভিযোজনের নীতিতে যেতে হয়েছে। আকবর আলী খানের ‘ডিসকভারী অব বাংলাদেশ’ ছাপতে সাহসের প্রয়োজন হয় না, যে কোনো জহুরী প্রকাশকই বুঝবেন এটা বাণিজ্যিকভাবেই সফল হবে। কিন্তু লীলা রশিদের ‘ইনস্টিটিউশনালাইজিং মাইক্রোফিনান্স ইন বাংলাদেশ’ ছাপাটা সম্ভব হবে এভাবে, যদিও বইটা ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ? প্রশ্নই আসে না। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যালোচনামূলক সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, নৃবিজ্ঞান ও আরও নানা বিষয়ক গবেষণামূলক গ্রন্থাদি পাঠ্য হলে, বা পাঠ করাটা শিক্ষাজীবনের অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ হলে এই বইগুলোর দ্বিতীয়বারের প্রকাশ নিয়ে ভাবতে হতো না। ধীরগতিতে হলেও সেগুলো চলে যেতো। সেটা হচ্ছে কী?
অন্যদিকে, দুনিয়ার অধিকাংশ রাষ্ট্রে গ্রন্থাগারগুলো যে পরিমাণ বইপত্র কেনে, সেটাই থাকে প্রকাশকদের প্রধান আয়ের উৎস। ফলে সাধারণ আমপাঠকের জন্য তারা সুলভ সংস্করণ চাইলেই করতে পারেন। বাংলাদেশে এই আশা কি কোনো সুস্থ স্বাভাবিক প্রকাশক করতে পারেন? বাংলাদেশের যে কোনো গণগ্রন্থাগারের তাকগুলোর দিকে তাকালে সেগুলোতে বই নয়, মোসাহেবীপনার জ্বলন্ত স্বাক্ষরগুলো থরে থরে সাজানো দেখা যাবে।
শিশু একাডেমির গ্রন্থাগারে গেলাম চার বছর আগে শেষবার, আশির (বা হয়তো নব্বই) দশক পর্যন্ত কিছু ভালো বইপত্র সংগ্রহে আছে, তারপর পতন। মহিউদ্দিন আহমেদের সেরা সময়টাতে, ৮০’র দশকের স্বৈরাচারি আমলেও গণগ্রন্থাগারগুলোর দশা এখনকার চাইতে স্বাস্থ্যকর ছিল, যদিও তাও প্রকাশনা শিল্পের জন্য যথেষ্ট ছিল না। সম্ভবত এই কারণেই ইউপিএল তার অস্তিত্ব রক্ষার কৌশলে গুরুত্ব দিয়েছিল গবেষণা সংস্থা ও ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলোকে, যাদের গবেষণা, তারা নিজেরাই একটা বড় অংশ কিনে নিয়েছে। এভাবেই ইউপিএল অস্তিত্ব রক্ষা করেছে।

এত দুর্মূল্য বই সাধারণ পাঠকের কেনা দুষ্কর, সত্যি। বাংলাদেশে টাকার হিসেবে বই খুব সস্তা, কিন্তু মানুষের গড় আয়ের হিসেবে যদি বিবেচনা করেন, পৃথিবীর মাঝে হয়তো তা দুর্মূল্য। কিন্তু এরপরও পাঠকের কাছে পৌঁছুতে পারলে টিকে থাকার রসদ আরও খানিকটা মিলতো, তাতেও তো সন্দেহ নাই। অন্তত ব্রামারের বইগুলো, অন্তত গ্রামীণ সমাজ নিয়ে ইউপিএল-এর আর সব গবেষণাগ্রন্থগুলো– ‘ঝগড়াপুর রিভিডিটেড’ কি দশ বছর সময় নিতো সংস্করণ ফুরোতে! আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশের কোনো বইয়ের দোকানে ব্রামারের কোনো বই পাবেন না, যেমন পাবেন না অধিকাংশ ‘অজনপ্রিয়’ গবেষণাগ্রন্থই। অথচ তার বাংলাদেশ: ল্যান্ডস্কেপ, সয়েল ফার্টিলিটি অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ গ্রন্থটির অন্তত পাঠক-নন্দিত হবার সম্ভাবনা ছিল। অন্য আর একটা বইয়ের বেলাতে সাম্প্রতিক তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলি, একজন লেখক যৌক্তিক বিরক্তি নিয়েই একদিন জানালেন, তার রচিত ‘গণিত আমাদের কী কাজে লাগে’ বইটি একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিছু সংখ্যায় কিনতে চেয়েছিল শিক্ষার্থীদের উপহার দেয়ার জন্য, ঢাকার কোনো দোকানে সেটি পাওয়া যায়নি। আনু মুহাম্মদের মতো পাঠকপ্রিয় অর্থনীতিবিদের বইও ঢাকার অধিকাংশ দোকানে মেলে না। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, রীতিমত জনপ্রিয় ধাঁচের বই প্রকাশ করেন, এমন একজন সহপ্রকাশক একদিন দুঃখ করেই বললেন, কলকাতার প্রকাশকরা নিশ্চিন্তে বিজ্ঞাপন দিতে পারেন, ঢাকার দোকানগুলোতে তাদের সব বই মেলে, ঢাকায় বসে আমরা ঢাকার প্রকাশকরা তো এই কথাটা সাহস করে বলতে পারি না! এই কথাটি আহমদ ছফা প্রমাণ করেছিলেন শওকত ওসমানের একটা গালির জবাবে স্বয়ং তাকে নিউমার্কেটে নিয়ে যেয়ে, ‘এরপর একদিন আমি শওকত ওসমানকে সাথে নিয়ে ঢাকার নিউ মার্কেটে গেলাম। নিউ মার্কেটের সব বইয়ের দোকানে শওকত ওসমানের বই চাইলাম, কিন্তু কোনো বইয়ের দোকানই শওকত ওসমানের কোনো বই দিতে পারে না। কিন্তু যখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বই চাইলাম, দেখা গেল মুদির দোকানও তা দিতে পারে। শেষে আমি শওকত ওসমানকে বললাম, সুনীল আপনার বড় না ছোট? তিনি বললেন, ছোট, অনেক ছোট। ওকে আমি জন্মাতে দেখেছি। আর জানবেন শওকত ওসমান লেখক হিসেবে ছোট লেখক নন, তবে অনেক লেখা আছে উৎকর্ষের বিচারে যা বেশ ভালো। এই অবস্থা দেখে আমি শওকত ওসমানকে বললাম, দেশটা কি আমরা ***ছেঁড়ার জন্যে স্বাধীন করেছি?’ [আহমদ ছফা/আহমদ ছফার সাক্ষাৎকারসমগ্র]

জ্ঞানের দুয়ার রুদ্ধ করার কিছু নাই, অন্যদিকে ঢাকার জ্ঞানভিত্তিক বইয়ের বাজারে বিদেশী বইয়ের একটা আধিপত্য নানা সঙ্গত কারণেই ছিল। কিন্তু ক্রমশ সকল উৎস শুকিয়ে আসার গত বিশ বছরের বাস্তবতায় মহিউদ্দিন আহমেদের ওই অভিযোজন নীতিও ভবিষ্যতে আদৌ আর কাজ করবে কি না, এই সামান্য রসদ দিয়ে ইউপিএল-এর মতো মহীরূহ প্রতিষ্ঠান কার্যকর থাকতে পারবে কি না, বলা মুশকিল। কেননা অর্থনীতি সমর্থন না করলে, সময় সমর্থন না করলে যে কোনো ব্যক্তিগত অভিযানই ডন কিহোতের মতো ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, লক্ষ্য থাকুক যতই মহৎ। এই প্রসঙ্গেই অন্য একটি বিষয়ও আসে, গ্রন্থের মান ও উৎকর্ষ যে দেশে সরকারি ক্রয়ে ঠাঁই পাবার বেলায় একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়, সেখানে নীতি বিসর্জন না দিয়ে টিকে থাকার সংগ্রাম এত জটিল ও কষ্টসাধ্য, এত শ্রান্তিকর হবার কথা যে ধরেই নেয়া যায়, এই প্রতিকূল যুদ্ধটা না করতে হলে আরও অজস্র গবেষণাকর্মকে আমরা মহিউদ্দিন আহমেদদের মতো প্রকাশকদের হাতে গ্রন্থাকারেই দেখতে পেতাম। তিনি এমন গ্রন্থের একক ব্যতিক্রম হতেন না, তার অজস্র সহপ্রকাশক থাকতেন।

৪.
বইয়ের অত্যাধিক দাম, বাংলাদেশের অধিকাংশ পাঠকের মতামত এই। এই বক্তব্যের ন্যায্যতা আছে, পাঠক হিসেবে আমিও তাই মনে করি। কিন্তু ওদিকে হিউ ব্রামারকে যিনি চিনতে পারেন, এমন একজন সম্ভাব্য প্রকাশক যদি এই চিনবার যোগ্যতার সুবাদে দিনদিন নিঃস্ব হতে থাকেন আর্থিক দিক দিয়ে, তাহলে ভবিষ্যতের অন্যান্য সম্ভাব্য মহিউদ্দিন আহমেদের কী গতি হবে? নতুন মহিউদ্দিনরা কি হাঁটবেন এই রাস্তায়? উত্তর পেতে হিউ ব্রামারের বইগুলো বিক্রি হলো কেমন, সেই দিকেই একবার তাকাই। হাতের কাছে তার যে দুটো বই দেখতে পাচ্ছি, একটা আমার প্রিয় বইগুলোর মাঝে শীর্ষে, ‘বাংলাদেশ: ল্যান্ডস্কেপ, ফার্টিলিটি অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ’ বইটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৬ সালে। এখনো সেটি শেষ হয়নি, অর্থাৎ গুদাম ভাড়া, মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিলে ইতিমধ্যেই এটি বিপুল লোকসান দিয়েছে। অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ, সি লেভেল রাইজ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ’-এর প্রথম প্রকাশ ২০১৪ সালে, ২০১৯ সালে এটির দ্বিতীয় মুদ্রণ এসেছে। অর্থাৎ এটিও ব্যবসা সফল নয়। ব্রামারের আটটি বা নয়টি গ্রন্থ ইউপিএল প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা বর্ণনা করতে গেলে ইউপিএল প্রকাশিত এরিক কে জনসনের একটি গ্রন্থের কথা মনে পড়ছে, শিরোনামটা যদিও মনে আসছে না। সেখানে এই ভদ্রলোক আরও অনেক কিছুর সাথে ৭০-৮০ দশকের বাংলাদেশের গ্রামীণ সংস্কৃতির একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছিলেন, সীমিত সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটা সংগ্রাম। এটা গ্রামীণ মাতব্বর, ব্যবসায়ী, জমির মালিক, বর্গাদার, দিনমজুর, ভূমিহীন সকলের মাঝে পারস্পরিক সম্পর্কের কাঠামো নির্ধারণ করে। সত্যি বলতে কি, আমার দেখা ৯০ দশক পর্যন্ত গ্রামসমাজকে ব্যাখ্যার অন্যতম একটা সূত্র হতে পারে জনসনের এই ব্যাখ্যার পাটাতন। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প কিন্তু আজও প্রায় সেই দশায় আছে। প্রকাশক-প্রকাশক, লেখক-প্রকাশক, রাষ্ট্র-প্রকাশক, পাঠক-প্রকাশক, দোকানদার-প্রকাশক সকল ক্ষেত্রেই একজন খলনায়কের নাম প্রকাশক। কারণ প্রকাশনা তার প্রধান জীবিকা। বাকিদের আংশিক। প্রকাশনা নামক ঘটনার কেন্দ্রে থাকেন প্রকাশক, এবং সম্পদের সীমিত দশা তার আচরণকেও সংকুচিত, বলতে দ্বিধা নেই ক্ষেত্রবিশেষে চালাকিপূর্ণ এবং শঠ ভাবর্মূর্তিও দেয়। এর মাঝে দুর্নীতিগ্রস্ত হঠাৎ প্রকাশকরা বিপুল টাকা ছড়িয়ে বাজার এলোমেলো করে দেন, নোট বইয়ের প্রকাশকরা টাকার থলে ছড়িয়ে খাঁটি প্রকাশকদের আরেক দফা বিপন্ন করেন। কিন্তু এটাও তো সত্যি কথা, লেখকদের বই রচনা বাবদ আরও বহুগুণ অর্থ পাওনা ছিল।
মহিউদ্দিন আহমেদের জন্য এই বিষয়টা আরও জটিল ছিল। তিনি জনপ্রিয় ধাঁচের সাহিত্য বইয়ের প্রকাশকে লক্ষ্য হিসেবে নেননি, অন্যদিকে স্পষ্টবাদী ও একরোখা চরিত্রের এই মানুষটি নীতি বিসর্জনও কোনোকালে দেননি। প্রকাশক এবং প্রকাশনা সংস্থার কর্মীদের স্বাভাবিক জীবন যাপনের অধিকার নিশ্চিত করা, এবং সেই কাজ করতে গিয়ে লেখককেও কখনো বঞ্চিত না করাটাকে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করা– অসম্ভব একটা কাজের চেষ্টাই তিনি করেছেন। বহু অনভিজ্ঞ মানুষ দূর থেকে বলে থাকেন, বই তো আলু-পটলের মতো পণ্য নয়। মহিউদ্দিন আহমেদ দেখিয়েছেন, বই আলু-পটলের মতোই, এবং আরও গুরুভার পণ্য। এই খাতে রক্তপ্রবাহ যথাযথ থাকলে সেটা শুধু প্রকাশক-লেখক-মুদ্রাকর-শিল্পী ইত্যাদির জন্য ভালো না, জাতির জন্যই মঙ্গলজনক। কোনো দেশে শুধু পাঠকের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশনা শিল্প দাঁড়ায় না, সেটা দাঁড়ায় রাষ্ট্রের ভর্তুকিতে, যেটা আসলে ভবিষ্যতের জন্য সামাজিক বিনিয়োগ। কিন্তু রাষ্ট্রের কাছ থেকে আদায়ের এই লড়াইটা প্রকাশক একা করতে সক্ষম নন। তার সাথে লেখক-পাঠককে যুক্ত করা দরকার যাতে সরকার এমন নীতি গ্রহণে বাধ্য হয় যেখানে প্রকাশনা, অর্থাৎ জ্ঞান পাঠকের কাছে সুলভ থাকে। দুর্ভাগ্যক্রমে বাংলাদেশ সেই পথ থেকে ক্রমশ আরও দূরে সরে যাচ্ছে।
ফলে দেশের প্রকাশনা ক্রমশ মোসাহেবীতে আক্রান্ত, যার প্রধান লক্ষ্য সহজে সরকারি ক্রয়ে, মন্ত্রণালয়ের ক্রয়ে বই গছিয়ে দেয়া, কিংবা আরও নানা অসঙ্গত উপায়ে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রভাবশালীদের আত্মীয়দের লেখা অত্যন্ত ফালতু বই হাজারে হাজারে কিনতে বাধ্য করা। এমন অজস্র ঘটনা এখন নৈমত্তিক। যারা অতটা নীচে নামতে পারেন না, তারা এককভাবে জনপ্রিয় আরামদায়ক বই প্রকাশে মগ্ন। অন্তত এই দ্বিতীয় পথটিকে ভয়াবহ অনৈতিকতা নেই, এটুকু সত্যি। কিন্তু পাঠককে কি আমরা চিরকাল গোয়েন্দা গল্প আর অনুপ্রেরণামূলক বইয়ের পাঠক বানিয়ে রাখবো? আমাদের জাতির পাঠাভ্যাস চিরকাল কিশোর বয়েসে ঠেকে থাকবে? গবেষণামূলক গ্রন্থ, যার পাঠক সীমিত, তার কোনো বিকাশ বাংলাদেশে আর ঘটবে না? মহিউদ্দিন আহমেদ নেই, কিন্তু ভবিষ্যতের প্রকাশকদের এই্ গুরুতর প্রশ্নটার সমাধান ভাবতে হবে।

বইমেলায় ইউপিএল-এর স্টল
৫.

আগেই বলেছি, কখনো কোনো লেখককে বঞ্চিত না করাকে মহিউদ্দিন আহমেদ তার ন্যূনতম পেশাগত অবস্থান হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন। হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ না ছাপার ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কখনো কখনো। কিন্তু সেই দায় প্রধানত পাণ্ডুলিপি পর্যালোচনার দায়িত্বে যারা ছিলেন, তাদেরই। শুধু দেশীয় লেখকদের নন, বিদেশী লেখকদেরও তিনি সর্বদা তাদের পাওনা বুঝিয়ে দিয়েছেন। মহিউদ্দিন আহমেদ সম্ভবত পুরনো প্রকাশকদের মাঝে একমাত্র, যিনি কখনো বিনা অনুমতিতে কোনো বিদেশী গ্রন্থের অনুবাদ প্রকাশ করেননি। এই বিষয়ে যে আন্তর্জাতিক আইন আছে, দেশীয় আইন আছে, এবং তা মান্য করতে চেষ্টা করাটা সঙ্গত, সেটা নিয়ে বাংলাদেশের কোনো প্রকাশক এর আগে ভেবেছেন বা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন, তেমনটা মনে হয় না। আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ত্ব আইনের কিছু অন্তর্নিহিত দার্শনিক দুর্বলতা আছে। জ্ঞানকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য খুব সহায়ক নয় তা। যে কারণে ওষুধের ওপর মেধাস্বত্বের কড়াকড়ি ক্ষতিকর, কিন্তু একইসাথে তা অন্তত বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রয়োজন নতুন আবিষ্কারের প্রণোদনা দেয়ার জন্য, একই কথা হয়তো গ্রন্থস্বত্ত্বের বেলাতেও প্রযোজ্য। ওষুধ এবং এমন জরুরি পণ্যগুলোর মতোই গ্রন্থের অনুবাদস্বত্ব পাবার জন্য প্রদেয় অর্থের পরিমাণ ন্যূনতম হওয়া উচিত। এগুলো আজকের প্রকাশকদের ভাবনার বিষয়, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্তরে তা জোরেশোরে তোলাটা দরকার। বাংলাদেশের প্রকাশনাকে আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যাবারও বিপুল কৃতিত্বটি মহিউদ্দিন আহমেদের, তাঁর অনুপস্থিতিতে এই কথাগুলো তোলা যাবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে? তাঁর সুনাম ও অর্জিত দক্ষতার গুণে খুব সহজেই তিনি ও তার প্রতিষ্ঠান বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের অনুবাদস্বত্ত্ব আদায় করতে পেরেছেন। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে জয়া চ্যাটার্জির ‘বেঙ্গল ডিভাইডেড’-এর কথা, দেশভাগ নিয়ে বলা চলে হাল আমলের গবেষণাগ্রন্থ এটি।
কিন্তু প্রকাশক হিসেবে যে দ্বিতীয় গুণটির কথা মহিউদ্দিন আহমেদের বিষয়ে বলতে চেয়েছিলাম লেখার শুরুতেই, সেটা হলো গ্রন্থের সম্পাদনা। বাংলাদেশের লেখকদের একটা বড় অংশ প্রকাশকদের বাঁধাইকরের চাইতে বেশি কিছু ভাবেন না। তারা পাণ্ডুলিপি এনে দেবেন, প্রকাশক সেটা ছেপে বাঁধাই করে দেবেন, এইটুকুই তাদের কাজ। এজন্য লেখকদের দোষ দেয়ার উপায়ও আসলে নেই। অন্যদিকে, পাণ্ডুলিপি প্রণয়নে প্রকাশকের কাছ থেকে যে সাহায্য ও পরামর্শ লেখকদের প্রাপ্য, সেটাও পুরনো প্রজন্মের খুব কম প্রকাশকই দিতে সক্ষম, নতুনদের মাঝেও হয়তো অল্প কয়েকজনই। মহিউদ্দিন আহমেদ একদম শুরু থেকে পাণ্ডুলিপিগুলোকে পর্যালোচনা ও মতামতের জন্য বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠিয়েছেন, তাদের পরামর্শ অনুযায়ী লেখককে পাণ্ডুলিপির মানোন্নয়নের ফরমায়েশ করেছেন। পৃথিবীব্যাপী এটা খুব চলতি রীতি হলেও, এবং আইজ্যাক আসিমভের মতো মানুষও প্রকাশকের পরামর্শকে গুরুত্ব দিয়ে আসলেও বাংলাদেশে এই বিষয়টা বলা চলে অনুপস্থিতই ছিল মহিউদ্দিন আহমেদের আগে। বড়জোর বানান সম্পাদনা চলতো। একদিকে যেমন এটি তার প্রতিষ্ঠানটিকে আরও ব্যয়বহুলই করেছে। অন্যদিকে, এই ব্যয়টি না করে বহুক্ষেত্রেই একটি পাণ্ডুলিপি গ্রন্থের আকৃতি পায় না, অনাবশ্যক ভারী কিংবা অসামাঞ্জস্যহীন অথবা বহু সঙ্গত প্রশ্নের উত্তরহীন থেকে যায়। একটা গবেষণামূলক বইয়ের দাম কেমন হওয়া উচিত, সেটা বিবেচনা করতে গেলে তাই প্রকাশকের মুনাফা, লেখকের সম্মানীর পাশাপাশি পাণ্ডুলিপি উন্নয়নের খাতটিকেও যে বিবেচনায় রাখতে হবে সেটা মহিউদ্দিন আহমেদই শিখিয়েছেন। আমার তো মনে হয় একজন প্রকাশকের এমন আর্থিক সামর্থ্য থাকা উচিত যে, লাখ টাকা বেতন দিয়ে একজন জার্নাল পাঠককে পুষবেন যার কাজ হবে সম্ভাব্য পাণ্ডুলিপি সেখান থেকে সন্ধান করা।

ইউপিএল-এর বইয়ের দাম অত্যধিক বেশি, আগেই বলেছি এই কথাটার সাথে একমত আমি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, এই দামটা আগে আরও বেশিই ছিল। আশির দশকে তাদের প্রকাশিত বহু জনপ্রিয় বইয়ের দাম দিয়ে তখনকার বাজারদরে দু’দুটো আস্ত ইলিশ মাছ কেনা সম্ভব হতো। বিশ্বাস হচ্ছে না? ফয়েজ আহমেদের ‘মধ্যরাতের অশ্বারোহী’র দ্বিতীয় পর্ব ‘সত্যবাবু মারা গেছেন’ বইটির দাম দেখুন, সম্ভবত ৬৬ টাকা। ১৯৮৮ সালে এই দিয়ে অন্তত দুই বা আড়াই কেজি গোমাংস কেনা যেতো। তখন ‘মধ্যরাতের অশ্বারোহী’র এক একটি সংস্করণ আড়াই হাজার করে প্রকাশিত হতো, ৯০-এর আগেই চারটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। বইয়ের বাজার ও নীতিবান প্রকাশকের পরিসর কতটুকু সংকুচিত হয়েছে, তা আশা করি বোঝা যাচ্ছে খানিকটা।

৬.
গবেষণার ভাষা বিষয়ে আমি একমত নই প্রকাশক মহিউদ্দিন আহমেদের চিন্তার সাথে। এ বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কখনো কিছু বলেননি, কিন্তু অনুমান করা যায় তার প্রকাশিত অধিকাংশ গবেষণাগ্রন্থের ভাষা ইংরেজি। বাংলায় অনুবাদের চেষ্টা করেননি হয়তো তেমন, হয়তো ভেবেছেন শিক্ষিত অংশ ইংরেজি এমনিতেই পড়তে পারে। ইংরেজি ভাষার প্রতি তাঁর দুর্বলতার দুটো সাক্ষ্যও দেখতে পাচ্ছি, অধ্যাপক তানজীম উদ্দীন খান এবং অধ্যাপক আলী রীয়াজ উভয়েই তাদের লেখায় প্রশংসা করেছেন বিষয়টির। আলী রীয়াজ প্রশ্ন করেছেন ‘বাংলাদেশে গবেষণা-ভিত্তিক ইংরেজি বইয়ের প্রকাশনার যে ধারা তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন তা কি অন্য আর কারও হাতে তৈরী হতে পারতো?’ তানজীম উদ্দীন খান লিখেছেন: ‘প্রথম পরিচয়ে জানতে চাইলেন আমরা ইংরেজিতে লেখা পাঠ্যবই পড়ি কিনা। কীভাবে তরুণ শিক্ষার্থীদের ইংরেজিতে পাঠোভ্যাস বাড়ানো যায়, শিক্ষকরা কী ভূমিকা রাখতে পারেন, সেগুলো নিয়ে আলোচনা।’
বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে গবেষণার ভাষা নির্ধারণের একটা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য হলো, ধরে নেয়া হয় বাংলাভাষা জনপ্রিয় বিষয়াদিতে লেখবার ও বলবার জন্য, বড়জোর গবেষণার জনবোধ্য ভাষ্য হবে তাতে। গুরুতর জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা ইংরেজিতেই হবে। এই ঝোঁকটি বাংলাদেশের গবেষককূলের ছিল, এবং আছে। খেয়াল করলেই দেখবেন বাংলাদেশের বস্তুনিষ্ঠ পণ্ডিতদের একটা বড় অংশ বাংলাতে লেখার পরিশ্রমটা করতেই চান না। এই বিষয়ে তাদের শরম দেয়টাই পাঠক হিসেবে কর্তব্য বিবেচনা করি। বরং বাংলাদেশের সাহিত্যকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য যে বিপুল শ্রম ও অর্থ ইউপিএল ৮০ ও ৯০ দশকে ব্যয় করেছে, তাকে আমার পণ্ডশ্রম বলেই মনে হয়। এই মনোযোগ ও অর্থ দিয়ে আরও বহু ইংরেজি বই বাংলায় তর্জমা করা যেতো।

প্রকাশকদের জন্য আর একটা বিব্রতকর প্রাসঙ্গিক বিষয় হলো, বাংলাদেশের প্রকাশনা সংস্থাগুলোকে তাদের আন্তর্জাতিক প্রকাশনার জন্য বিবেচনা না করা। উপনিবেশিক মুগ্ধতার এই বোধের কারণে গবেষক/লেখকের সাথে প্রকাশকের যৌথতায় দেশীয় প্রকাশনা শিল্পটি যে দুনিয়ার অঙ্গনে আরও বেশি জায়গা করে নিতে পারতো, সেই ছাড়টুকু এই লেখকরা বহুক্ষেত্রে দিতে অক্ষম। এই সঙ্কটের মাঝেও যুদ্ধ করে মহিউদ্দিন আহমেদ বরং ক্লারেন্স মেলোনি, তেরেশ ব্লঁশে, ব্রামার, ভ্যান শেনডেলের মতো বিদেশী লেখকদের ইউপিএল-এর লেখকে পরিণত করতে পেরেছেন, বাংলাদেশের কারও কারও কাছ থেকে তা পাননি। একইসাথে এটুকু বলে রাখা ভালো যে, তিনি শুধু গবেষণাগ্রন্থকেই একমাত্র গুরুত্ব দেননি, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ বা শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এর প্রকাশকও ইউপিএল।

৭.
শেষ করা যাক অধ্যাপক আলী রীয়াজের একটা স্মৃতিচারণ থেকে “মহিউদ্দিন ভাই ১৯৯৭/৮ সালে লন্ডনে আমাকে তাঁর জীবনের এই পর্বের কথা বললে আমার স্বতস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া ছিলো যে– ভাগ্যিস আপনি পিএইচডি না করে ওইউপি’র সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর স্বভাবসিদ্ধ হাসিতে উজ্জ্বল মুখে বলেছিলেন– ‘আমিও তাই ভাবি’।”

আমরাও তাই ভাবি। মহিউদ্দিন আহমেদ ‘জ্ঞানভিত্তিক সমাজ’ বলে একটা শব্দবন্ধ নির্মাণ করেছিলেন। সেটা নির্মাণের মহা পাগলামিতে কেউ যদি শরিক হতে চান, এবং সেই জন্য পিএইচডি, সাংবাদিকতা, শিক্ষকতা কিংবা অন্য আর যে কোনো তেজারতি ত্যাগ করার সাহস দেখাতে চান, তার জন্য অত্যাবশ্যকীয় কাজ হবে মহিউদ্দিন আহমেদের প্রয়াণের সময়টিতে বাংলাদেশের গবেষণামূলক গ্রন্থাদি প্রকাশ অব্যাহত রাখতে গেলে– অব্যাহত রাখলে আসলে লাভটা কী? আমরা তাতে বড়জোর আগের মতোই নিন্দনীয় দশায় থাকবো, বরং সাহস করে বলা উচিত প্রকাশনাকে এগিয়ে নিতে হলে– যে প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প এই মুহূর্তে হয়েছে, তার জবাবও খুঁজে বের করা। নতুন অভিযোজনের কৌশল নিয়েই নীতিতে অচল থাকবে হবে।

মহিউদ্দিন আহমেদর জীবনী লেখার চেষ্টা এখানে করিনি, যদিও সেটি কম রোমাঞ্চকর নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতার ছাত্র ছিলেন, ছিলেন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ছাত্র সংসদের নেতা, ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনীর মতো সংস্থার দায়িত্বে, যারা বিস্তারিত জানতে চান, তারা ইউপিএল-এর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেয়া এই লেখাটি পড়তে পারেন: t.ly/U4eH । এছাড়াও পড়তে পারেন অধ্যাপক আলী রীয়াজের চমৎকার স্মৃতিচারণটি, লিঙ্ক t.ly/YqDs ।

প্রচ্ছদে ব্যবহৃত পোর্ট্রেট : মাসুক হেলাল-এর আঁকা

/জেডএস/

সম্পর্কিত

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২১, ০০:০০

এল্ রেতিরো খামারবাড়ি

উঠোনে গুটিহীন শতরঞ্জ খেলে
সময়। গাছের একটি ডালের ক্যাঁচক্যাঁচ 
শব্দ ছিন্ন করে রাতকে। প্রান্তর যদি হত 
ধূলোর লীগ আর পোড়ো স্বপ্ন। 
দুই ছায়া, আমরা অনুলিপি করি যা উচ্চারণ করে
অপর ছায়ারা: হেরাক্লাইটাস্ ও গৌতম।  

(রোসা প্রোফুন্দা, ১৯৭৫; কাব্যগ্রন্থ থেকে)


বৃষ্টি

আচমকা সন্ধ্যা হল সারা
কেননা এখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি
ঝরছে বা ঝরছিল। একটা কিছু এই বৃষ্টি
নিঃসন্দেহে যা ঘটে অতীতে।

যে শোনে এই বৃষ্টির শব্দ তার মনে পড়ে 
সেই সময় যখন সুপ্রসন্ন নিয়তি
তাকে ফিরিয়ে এনেছিল এক ফুলের কাছে যার নাম গোলাপ
আর বিহ্বল-করা লালিমার লাল। 

এই বৃষ্টি যা ঢেকে দেয় জানালার শার্সিকে
বিভা ছড়াবে হারিয়ে যাওয়া শহরতলিতে
আঙুরগাছের কালো আঙুর কোনো এক

উঠোনজুড়ে যা আর নেই আজ। বৃষ্টিভেজা 
সন্ধ্যা আমাকে এনে দেয় স্বর, প্রিয় আকাঙ্ক্ষিত স্বর,
আমার বাবার, যিনি ফিরেছেন এবং মারা যাননি। 

(এল আসেদোর, ১৯৬০; প্যারাবল্ ও কবিতার গ্রন্থ থেকে)


হেরাক্লাইটাস্

দ্বিতীয় গোধূলি।
ঘুমে ঢলে পড়া রাত। 
শোধন আর বিস্মৃতি। 
প্রথম গোধূলি।
সকাল যা ছিল প্রভাত।
বহুল দিন যা হবে ক্লান্ত বিকেল।
দ্বিতীয় গোধূলি।
সময়ের অন্য স্বভাব, রাত।
শোধন আর বিস্মৃতি। 
প্রথম গোধূলি...
চোরা প্রভাত, আর প্রভাতে
গ্রীকের আশঙ্কা।
কী জাল এটা
ভবিষ্যত, বর্তমান আর অতীতের?
কী নদী এটা
যা দিয়ে বয়ে যায় গঙ্গা?
কী নদী এটা যার উৎসটা অচিন্তনীয়?
কী নদী এটা
যা বয়ে নেয় পুরাণ আর তলোয়ার?
তার কাছে ঘুমিয়ে থাকা নিরর্থক। 
দৌড়ায় ঘুমে, মরুভূমিতে, ভূভাণ্ডারে।
নদী আমাকে ধারণ করে এবং আমি ওই নদী।
এক সস্তা সারবস্তু, রহস্যময় সময় দিয়ে তৈরি আমি।
হয়তো উৎসটা আমার মাঝে। 
হয়তো আমার ছায়া থেকে 
উদ্ভুত, সর্বনাশা ও অলীক, দিনগুলি। 

(এলোহিয়ো দে লা সোমব্রা, ১৯৬৯; কাব্যগ্রন্থ থেকে)
 

/জেডেএস/

সম্পর্কিত

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

বোকা দুপুরের নাম

বোকা দুপুরের নাম

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২১, ২৩:১৩

[তৌহিন হাসানের প্রথম উপন্যাস ‘উড়ালপঙ্খী’ বইমেলা ২০২১-এ পেন্সিল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইটি পড়ার ইচ্ছে হয়েছিল প্রচ্ছদ দেখে। নিজের দেশ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মাইল দূরে বসে স্পর্শ করে, দেখেশুনে বই কেনার সুযোগ কোথায়! কিন্তু ‘উড়ালপঙ্খী’ আমাকে একবিন্দুও নিরাশ করেনি। সহজ, সাবলীল গদ্যশৈলীর সাথে কাব্যময়তার পাশাপাশি ভালো লেগেছে উপন্যাসের বুনন। এক্ষেত্রে লেখকের স্বাতন্ত্র্যের ছাপ সুস্পষ্ট। কোনো টাইমলাইন বা ক্রনোলোজি না মেনে একেবারে ভিন্ন আঙ্গিকে ঘটনাগুলোকে উপস্থাপন করেছেন। মূল চরিত্র পঙ্খীর জীবনের নানা ঘটনাকে ঘিরেই পুরো কাহিনি আবর্তিত হয়েছে।
একটা গল্প বা উপন্যাস পড়ার পর সেটা নিয়ে স্বয়ং লেখকের সাথে কথা বলা বা মত বিনিময়ের সুযোগ পাওয়াটা এক অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরা হয়েছে।]


প্রশ্ন : এটি আপনার প্রথম উপন্যাস। কবে, কখন এই উপন্যাস লেখার ভাবনা মাথায় এলো?
উত্তর : ‘উড়ালপঙ্খী’ আমার প্রথম উপন্যাস। এটি লেখার পরিকল্পনা প্রথম মাথায় আসে আজ থেকে পাঁচ-ছয় বছর আগে। গল্পের কাঠামোটা তখনই ভেবে রেখেছি। কিন্তু লেখা শুরু করেছি অনেক দেরিতে, ২০২০ সালের নভেম্বরে।

প্রশ্ন : উপন্যাসের বিষয়বস্তু গতানুগতিকতার বাইরে এবং বেশ অপ্রচলিত। মনস্তত্ত্ব জটিল একটা বিষয়। প্রেম, বিরহ এসব নিয়ে না লিখে এই কনসেপ্টটাই কেন বেছে নিলেন?
উত্তর : আসলে গতানুগতিকতার বাইরে কি না জানি না! আমার ভেতর থেকে যেভাবে এসেছে, যেভাবে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেছি, সেভাবেই লিখে গেছি৷ আর উপন্যাসের ঘটনা বা চরিত্রগুলো যে কল্পনাপ্রসূত তা-ও কিন্তু না! এই চরিত্রগুলোকে আমি বাস্তব জীবনে বিভিন্নভাবে দেখেছি, জেনেছি, বিশ্লেষণ করেছি। চেনা চৌহদ্দির মধ্যে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা থেকে তুলে এনে উপন্যাসে সন্নিবেশ করেছি৷

প্রশ্ন : বইটির প্রচ্ছদ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার ভাবনা শুনতে চাই।
উত্তর : আমি যেহেতু প্রফেশনালি বইয়ের প্রচ্ছদ করি, নিজের বইয়ের প্রচ্ছদ করাটা আমার জন্য বেশ কঠিন। একটা দ্বিধা কাজ করে। উপন্যাস লেখার মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রচ্ছদে ছবি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেই৷ যেহেতু মূল চরিত্রের আবেগটাকে আমি খুব ভালো করে জানি, তার চেহারার নির্লিপ্ততাকে প্রচ্ছদে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি। বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী অনেকেই বলেছে কাভারে কেন একটা মেয়ের মুখ! প্রচ্ছদ তো এবস্ট্রাকট হয়, তাতে নানা রকমের আর্টিস্টিক মোটিফ থাকে! কিন্তু আমার মনে হয়েছে একজন পাঠক যখন বইটা পড়ে মূল চরিত্রটাকে অনুধাবন করবে তখন বুঝতে পারবে কেন এই প্রচ্ছদ ব্যবহার করেছি। বই না পড়ে আগে থেকে সেটা বোঝা যাবে না।
একজন পাঠক হিসেবে আমারও কিন্তু একই অনুভূতি হয়েছে৷ ‘উড়ালপঙ্খী’ পড়ে শেষ করার পর প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে এই বইয়ের এরচেয়ে উত্তম প্রচ্ছদ আর হতে পারে না!

প্রশ্ন : পঙ্খী প্রথা ভাঙায় বিশ্বাসী। সমাজ-সংসারের প্রচলিত নিয়মগুলো তাকে বেঁধে রাখতে পারেনি। সে জায়গা থেকে ‘উড়ালপঙ্খী’ নামটা আমার কাছে যথার্থ মনে হয়েছে। আপনারও কি নামকরণের ক্ষেত্রে এরকম ভাবনা ছিল?
উত্তর : নামকরণের ক্ষেত্রে আমার ভাবনাটা খুবই সরল ছিল। যেহেতু মেয়েটার নাম উড়ালপঙ্খী, নামটা তার বাবার দেওয়া এবং গল্পটা তাকে ঘিরেই, তাই উপন্যাসের নামও উড়ালপঙ্খী। তাছাড়া সে সব সময় মুক্ত থাকতে চাইত, কারো কথা শুনত না। সামাজিক বিধিনিষেধ মানেনি। নিজের যেটা ভালো লাগে তাই করে। এসব কারণেই উড়ালপঙ্খী নামটা বেছে নেওয়া।

প্রশ্ন : উপন্যাসের বুনন সম্পর্কে কিছু বলুন।
উত্তর : ব্যক্তিগত জীবনে আমি প্রচুর কথা বলতে পছন্দ করি। একটা বিষয়ে কথা বলার মাঝখানে বিভিন্ন উদাহরণ, সাবক্যাটাগরি, ক্রস-রেফারেন্স চলে আসে৷ এটা আমার কথা বলার ধরন বা অভ্যাস। লেখার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে৷ উপন্যাসের সংজ্ঞা এখনও আমার কাছে দুর্বোধ্য। ঔপন্যাসিক, কবি, সাহিত্যিক—এই শব্দগুলো পছন্দ করি না। নিজেকে স্টোরি টেলার ভাবতে ভালোবাসি। আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই৷ গল্পের তো শাখা থাকে, ঘটনা একটা হতে পারে কিন্তু তাকে বর্ণনা করার সময় অনেক ডালপালার বিস্তার হয়। পঙ্খীর গল্পটা বলার সময় টুকরো টুকরোভাবে নানা গল্প প্রাসংঙ্গিকভাবেই চারপাশ থেকে চলে এসেছে। হয়তো অন্যভাবে বলতে পারতাম! কিন্তু আমার কাছে যেভাবে কমফোর্টেবল মনে হয়েছে, আমি সেভাবেই বলে গেছি। 

প্রশ্ন : কতদিনে উপন্যাসটা শেষ করেছেন? নির্মাণের  সময়ের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা শুনতে চাই।
উত্তর : খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেষ করতে হয়েছে, প্রায় আড়াই মাসের মতো। যেহেতু পাঁচ বছর ধরে গল্পটা মাথায় ছিল অনেকটা প্রি-প্রোডাকশনের মতো, তাই লেখার সময় খুব একটা ভাবতে হয়নি৷ পার্শ্বচরিত্র, বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা আগে থেকেই মাথায় ছিল। ব্যাপারটা আসলে অনেকটা রান্না করার মতো! উপকরণগুলো আগে থেকে প্রস্তুত থাকলে রান্নায় বেশি সময় লাগে না।
আর অভিজ্ঞতা বলতে যেটা হয়েছে কখনো একটানা লিখতে পারিনি। আবার লেখার নির্দিষ্ট কোনো সময়ও ছিল না৷ রাত-দিন এক হয়ে গিয়েছিল। জীবনযাপনে একটু ব্যাঘাত হয়েছে৷ খানিকটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল সবকিছু।

প্রশ্ন : পড়া শেষ হবার পরেও একটা অদ্ভুত বিষণ্নতা আর ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম। পঙ্খীর মনোজগতের যে টানাপড়েন, তার জীবন পরিক্রমায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে—আমার মনে হয়েছে এর মাধ্যমে পাঠকের মনে প্রভাব বিস্তার করতে চান। এটা কী সচেতনভাবে করেছেন নাকি অবচেতনে ঘটেছে?
উত্তর : শুধু আমার ক্ষেত্রে না, যেকোনো লেখকের ক্ষেত্রেই এটা সত্য যে তারা সচেতনভাবে পাঠকের মনে প্রভাব বিস্তার করতে  চান না। আমি শুধু আমার  মতো করে নিজের ভাষায় একটা চরিত্র সম্পর্কে লিখে যেতে চেয়েছিলাম। পাঠকের মনোজগতে এর কী প্রভাব পড়বে সেটা পাঠকের মস্তিষ্কপ্রসূত। একজন পাঠক কিভাবে পঙ্খীকে গ্রহণ করেছে সেটা একান্তই তার ব্যাপার। অনেক পাঠক হয়তো বিষণ্ন চরিত্রই পছন্দ করেন না। আবার অনেকেই পঙ্খীর জীবনের বিভিন্ন ঘটনার সাথে নিজের মিল খুঁজে পাবেন। 
 
প্রশ্ন : আজকাল যেটা দেখা যাচ্ছে অনেক লেখকই উপন্যাস প্রকাশের আগে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সেটা লিখছেন যা পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশ হচ্ছে। লেখার সময় কোনো চরিত্রকে রাখবেন, কার কি পরিণতি হবে সেটা পাঠকদেরই জিজ্ঞেস করছেন। এটা কেন হচ্ছে?
উত্তর : মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভাব বিনিময় করা। লেখক, কবি, সাহিত্যিকরা যেকোনো শিল্প-মাধ্যমের দ্বারা নিজের দর্শন প্রকাশ করেন। শিল্প তো চর্চার ব্যাপার। চিন্তা ও চর্চা—এই দুটোর সমন্বয়ে শিল্পের বিকাশ ঘটে। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়টা খুব অস্থির। এখন ভাব বিনিময়ের অসংখ্য মাধ্যম। সব সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় প্র‍্যাকটিসটা পাল্টে গেছে। যার ফলে ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে লেখকরা হোঁচট খাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে তখন পাঠকের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। অনেকে দেখা যাচ্ছে প্রচ্ছদ আপলোড করছেন তিনটা। পাঠককে বাছাই করার অপশন দেওয়া হচ্ছে। এটা খুবই আশঙ্কার বিষয়। এটা কারোর দোষ না, শুধুই চর্চার অভাব।

প্রশ্ন : তিমির একজন বিপ্লবী হতে চেয়েছিল, কর্পোরেট কালচারের অংশ হতে চায়নি। ছাত্রজীবনে তাকে দেখা গেছে যথেষ্ট দায়িত্বহীন। আবার পঙ্খীর স্বামী হিসেবে সে যথেষ্ট দায়িত্বশীল ছিল। এই চরিত্র নিয়ে আপনার ভাবনা শুনতে চাই।
উত্তর : বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা ক্লাসে ৪০-৪৫ জন ছাত্রের মধ্যে কেউ থাকে বিপ্লবী, কেউ খুব সিরিয়াস, কেউ কবি অথবা শিল্পী, আবার দু-চারজন থাকে খুব বোকাসোকা যাদের নিয়ে সবাই স্যাটায়ার করে। আজকাল কোনো সামাজিক সমস্যা হলে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী টিএসসিতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তিমির তাদেরই একজন, কোনো কল্পিত চরিত্র না। সে অন্যায় সহ্য করতে পারত না। বামপন্থি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। ছাত্রজীবনে তিমির প্রেমবন্ধন এসবে আস্থা রাখত না। কিন্তু একটা সময় হোঁচট খায়। সামাজিক, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে তার ভাবনায় পরিবর্তন আসে। তখন পঙ্খীকে বিয়ে করে সংসারী হয়। এমনকি কর্পোরেট কালচারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একটা প্রাইভেট ফার্মের জন্য বিজ্ঞাপন লেখা শুরু করে। তিমির আসলে বাইরের কেউ না, আমাদের সমাজেরই একজন।

প্রশ্ন : ‘উড়ালপঙ্খী’ পড়ে মনে হয়েছে জেনেটিক সায়েন্স, সাইকোলজি, নারীদের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারগুলো সম্পর্কে আপনার বেশ ভালো দখল আছে। এই বিষয়গুলোতে কী আগে থেকেই আগ্রহ ছিল?
উত্তর : এই বিষয়গুলোতে আমার আলাদা আগ্রহ ছিল। বিভিন্ন বিষয়ে আমার পড়াশোনা শুরু হয় ক্লাস নাইন থেকে। তখন প্রথম মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে পড়া শুরু করি। সে সময় নিজে টেলিস্কোপ বানাই। ধর্ম সম্পর্কে বিভিন্ন বই, জেনেটিক সায়েন্স ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ জাগে। এরপর ধীরে ধীরে পরিচিত হই সিগমন ফ্রয়েড, সিমন দ্য বোভোয়ারের সাথে।
আমি তখন সরকারি স্কুলের ছাত্র। প্রাইভেটে ইংরেজি পড়তাম অঞ্জন ভদ্র নামে পাশের স্কুলের একজন শিক্ষকের কাছে। পড়া শেষে স্যার আধা ঘণ্টার একটা বাড়তি ক্লাস নিতেন অন্যান্য বিষয়ে। এর সাথে সিলেবাসের পড়ার কোনো সম্পর্ক ছিল না। আমি জানার আগ্রহ থেকে সেই ক্লাসে থাকতাম। এরিস্টটল, জ্যোতির্বিজ্ঞান, শারীরতত্ত্ব, জেনেটিক সায়েন্স, মনস্তত্ত্ব, রবীন্দ্রনাথ, লালনসহ বিভিন্ন বিষয়ে স্যার কথা বলতেন যার আশিভাগই বুঝতাম না। স্যার বলতেন—শুধু শুনে যাও, কোনো প্রশ্ন করবে না। এখন না বুঝলেও আজ থেকে ১০ বছর পরে আমার কথাগুলো ঠিকই বুঝবে। যারা বুঝতে পারবে তারা কেউ লেখক হবে, কেউ-বা দার্শনিক'। তখন এসব বিষয় নিয়ে বেশি বেশি পড়া শুরু করি। এই বাড়তি  জানার আগ্রহের কারণে আমার পড়াশোনায় কোনো ক্ষতি হয়নি বরং সব সময় ভালো রেজাল্ট করেছি। আর ১০ বছর পর স্যারের কথাগুলোর মানেও আমি ঠিকই বুঝতে পেরেছি।

প্রশ্ন : ‘উড়ালপঙ্খী’কে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন? যে ভাবনাটা আপনার মাথায় ছিল কাগজে-কলমে কী সেটাকে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন?
উত্তর : আমার বিশ্বাস নিজের ভাবনাটাকে কাগজে-কলমে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি। এ বিষয়ে আমার আত্মতৃপ্তি আছে। কোনো আক্ষেপ নেই। যদিও অনেকে বলেন লেখকের আত্মতৃপ্তি বলে কিছু নেই। কিন্তু এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে আমার মনে হয় আমি সব ঘটনা এবং চরিত্রকে ভাবনা অনুযায়ী ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি।
আর নিজস্ব মূল্যায়নের কথা যদি বলি তবে বলব এখানে পাঠকরা নিজের আশপাশের নানা ঘটনাকেই খুঁজে পাবেন। চিরচেনা সমাজের বিভিন্ন বিষয়, জেনেটিক্স, মনোজাগতিক টানাপড়েন, সোশ্যাল ট্যাবুসহ নানা ঘটনা এখানে উঠে এসেছে। অনেক চরিত্রের সাথে পাঠকরা নিজেদের রিলেট করতে পারবেন। আমার বিশ্বাস অনেক পাঠক নিজেকে তিমির ভাববেন। তিমিরের মতো চরিত্র বা সিকদার চাচার মতো যৌন নির্যাতকরা আমাদের সমাজে বাস করে। আবার অনেক মেয়ের জীবনের অভিজ্ঞতা হয়তো পঙ্খীর সাথে মিলে যাবে। হিন্দু-মুসলিম বিয়ে কিংবা হুট করে বিয়ে করে ফেলা—এসব ঘটনাও তো আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে!

প্রশ্ন : শেষটা হয়েছে একটা ধোঁয়াশার মাঝে। এমন একটা সমাপ্তিই কী চেয়েছিলেন?
উত্তর : হ্যাঁ, এমন একটা সমাপ্তিই চেয়েছিলাম। এমন বেশকিছু ঘটনা আমার চেনাজগতেই ঘটে গেছে। আমাদের সমাজে বহুগামিতা বেড়েছে—এটা একটা বড় সামাজিক সংকট। আমি সচেতনভাবেই উপন্যাসের শেষে তিমির এবং ফরহাদকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছি। শেষটা হয়েছে ক্লিফহ্যাঙ্গারের মতো যা পাঠককে অপেক্ষায় রাখবে। এর আরেকটা কারণ হচ্ছে আগামীতে ‘উড়ালপঙ্খী'র পরবর্তী খণ্ড আসবে।
 
[একজন পাঠক হিসেবে পরবর্তী খণ্ডটি পড়ার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করব। ‘উড়ালপঙ্খী’ আমাকে এক বিষণ্ণ-সুন্দর অনুভূতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। পড়া শেষ হবার বহুদিন পরও এর রেশটুকু মনে থেকে গেছে। 'রামের সুমতি', 'পরিনীতা', 'পথের পাঁচালী' কিংবা 'পুঁইমাচা'—এসব গল্প-উপন্যাস পড়ে যেমন মনে হয়েছিল যতবার পড়ব ততবারই চোখ ভিজে যাবে, ‘উড়ালপঙ্খী’ও একইভাবে আমার মন ছুঁয়ে গেছে। একজন শক্তিশালী লেখকই কেবল পারেন পাঠককে এই অনুভূতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে।
মনস্তাত্ত্বিক ঘরানার উপন্যাস ‘উড়ালপঙ্খী’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারে একটি চমৎকার সংযোজন। যারা গতানুগতিকতার বাইরে ভিন্ন স্বাদের কিছু পড়তে চান তাদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে সুখপাঠ্য হবে। পঙ্খীর জীবনের অন্ধকার চোরাগলিগুলোতে ভ্রমণ করতে করতে পাঠকের মনে সমাজের ভয়ানক কিছু অসঙ্গতির চিত্র ফুটে উঠবে। শিশু-কিশোরদের যৌন নির্যাতন, ভিক্টিম ব্লেমিং, স্টেরিওটাইপস, ট্যাবু, পুঁজিবাদসহ নানা রকমের সামাজিক সমস্যা সচেতন পাঠকমাত্রের মনে ভাবনার উদ্রেক করবে। আমাদের সমাজে 'সিকদার' রূপী মামা, চাচা, ভাই অনেক মেয়েরই থাকে। অথচ নির্ভয়ে এসব বলার মতো জায়গা থাকে না বলেই পঙ্খীদের জীবন এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন! 'আলোয় আলোয় মুক্তি' চেয়েও পঙ্খীরা অন্ধগলিতে হারিয়ে যায় বারবার। পঙ্খীর মনোজগতের সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। একজন মানু্ষের জীবনের ভিত তৈরিতে তার শৈশব এবং কৈশোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম।
তিমির চরিত্রটি আমাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে। তিমিরের বয়ানে জীবন ও সমাজ নিয়ে যেসব ভাবনা ও দর্শন লেখক তুলে ধরেছেন তার বেশিরভাগের সাথেই একাত্ব হতে পেরেছি। খুব মন খারাপ হয়েছে, কিছুটা রাগও—যখন তিমির আর পঙ্খীর পথ আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু এটাও মনে হয়েছে এমনটা না করলে হয়তো একটা গতানুগতিক সমাপ্তিই ঘটত।
প্রাঞ্জল বর্ণনায় প্রতিটি চরিত্র চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। জেনেটিক সায়েন্স, সাইকোলজির পাশাপাশি মেয়েদের মনোজগৎ সম্পর্কে লেখকের জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটেছে পুরো উপন্যাসজুড়ে। পঙ্খী স্রোতের বিপরীতে চলা এক অসীম সাহসী তরুণী। সে চেয়েছিল কন্যা মুক্তি অপরিসীমার জন্য চার দেয়ালের ভেতরে একটা আলোকময় জগৎ গড়ে তুলতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কতটুকু পেরেছিল! সেটা খোঁজার দায়টুকু আগ্রহী পাঠকদেরই থাকুক!—শা. মি.]

/জেডেএস/

সম্পর্কিত

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১২:৫১

মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬) লেখক পরিবার থেকেই এসেছিলেন। পিতৃমাতৃ—দুকূলই লেখক ছিলেন। এমনকি শ্বশুরকূলও। পুরুষানুক্রমেই এঁরা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মহাশ্বেতা দেবীর জীবনটা সাহিত্যের কাছেই সঁপে দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন দুহাত খুলে। ‘হাজার চুরাশির মা’ (১৯৭৪) তার অন্যতম আলোচিত উপন্যাস। গ্রন্থখানির পাঠপরিক্রমায় কিছুটা সাবধানী মনে এগুতে হয়। মাঝেমধ্যেই নিত্যনতুন চরিত্রের দেখাসাক্ষাৎ ঘটে। সিংহভাগ চরিত্রই দিব্যনাথ-সুজাতা পরিবারের। উপন্যাসখানি বুঝে নিতে চাইলে এদের মধ্যকার পারষ্পারিক সম্পর্ক স্মরণে রাখা খুবই জরুরি। পরিবারটি অনেকটা উনিশ শতকের ক্লাব-কালচারের ন্যায় সামন্তধারায় গড়ে ওঠে। ভোগবাদী প্রবৃত্তি এদের মধ্যে তীব্রতর। দিব্যনাথের নিজস্ব ‘চার্টার্ড অ্যাকাউনটেনসির আফিস।’ প্রতিনিয়ত মোটা টাকা আসে। জ্যোতি, নীপা অথবা তুলির স্বামীরাও কর্পোরেট কর্পোরেশনে হাই সেলারির জব করে। সবাই ভোগবিলাসে মত্ত। এদের চারিত্রিক স্খলনও কম নয়। অফিসের টাইপিস্ট মেয়েকে নিয়ে দিব্যনাথের ঢলাঢলি, মাঝেমধ্যেই রক্ষিতা নিয়ে বাইরে সান্ধ্য কাটানো। ঢেকেঢুকে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে সর্বসম্মুখে সহাস্যে এসব ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়। এসব সে পৌরুষ-অধিকার বলেই জানত। কেবল বর্তমান নয়, চিরকালই দিব্যনাথ নারী নিয়ে নোংরামি করে আসছে। শাশুড়িও কম প্রশ্রয় দেয়নি। ছেলে তার ‘পুরুষ বাচ্চা’, স্ত্রৈণ নয় বলে অহংকারও করত। দিব্যনাথের পিতাও নাকি যৌবনকালে এমনই ছিল। প্রায়শই সন্ধ্যাবেলা নারী নিয়ে বাইরে কাটাত। পরপর দুই পুরুষের নৈতিক অধঃপতন তৃতীয় পুরুষ জ্যোতি অথবা নিপাদের কাছেও সমভাবেই সমর্থন পায়। সামন্ত প্রভুর ন্যায় দিব্যনাথ নিজেকে পরিবারের ‘বস’ বলে বিবেচনা করত। সন্তানেরা অনেকেই ইনিয়েবিনিয়ে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে বাবাকে ‘বস’ বলেই সম্বোধন করত। এমনকি কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতীও। তবে এই সন্তানের মেজাজটা ছিল খানিকটা ভিন্ন ধার ও ধারার।

২.
অর্থবিত্তে স্বচ্ছল হলেও পরনারীতে অভ্যস্থ হওয়ায় দিব্যনাথ-সুজাতার দাম্পত্য-সম্পর্ক সুখের ছিল না। দিব্যনাথ সুজাতাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতো না। বরং যৌন পার্টনার হিসেবেই বিবেচনা করত। অসুখবিসুখ হলে খোঁজখবর নিত না। নবজাতকের কান্না থেকে বাঁচার জন্য তেতলায় ঘুমাত। প্রসূতি স্ত্রী থেকে দূরে অবস্থান করত। শাশুড়িমাও ছিল নারীবিদ্বেষী মহিলা। সুজাতার সন্তান জন্মদান সইতে পারত না। প্রসবকাল দেখলেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেত। তীব্র প্রসবযন্ত্রণা নিয়ে সুজাতাকে একা একাই নার্সিং হোমে যেতে হতো। দিব্যনাথের নজর কেবল একদিকে—‘আবার মা হবার যোগ্য শরীর হচ্ছে কি না সুজাতার।’ দুবছর পরপর সুজাতার চার সন্তান জন্মে। জ্যোতি, নীপা, তুলি। সর্বশেষ ব্রতী। প্রথম ও শেষে পুত্রসন্তান, মাঝখানে দুটি কন্যাসন্তান। ব্রতীর দুবছর বয়সকালে সুজাতা লম্পট দিব্যনাথের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেছিল। লেখকের ভাষায়—দিব্যনাথ কিছুতেই ওঁকে পঞ্চমবার ‘মা’ হতে বাধ্য করতে পারেনি। দিব্যনাথ সুজাতাকে ফার্মের কাজ ছেড়ে দিতে বলেছিল। সুজাতা মানেনি। ‘কাজ না-ছাড়া সুজাতার দ্বিতীয় বিদ্রোহ।’ 
বাবামায়ের মধ্যকার এই টানাপড়েন ব্রতী খানিকটা বুঝতে পারত। বুঝতে পারত মাতৃবক্ষের সুগভীরে লুকানো তীব্র গোপন ব্যথা। ব্রতীর মনটা কম্পাসের কাটার ন্যায় মমতাময়ী মাতা জগজ্জননী সুজাতার দিকে হেলে থাকত। ব্রতী সর্বদা মায়ের ওপর চোখদুটো সুস্থির রাখত। দশ বছর বয়সেও খেলাধুলা ফেলে বাড়ি চলে আসত। শিয়রে বসে মায়ের মাথায় বাতাস করত। এজন্য দিব্যনাথ ব্রতীকে সইতে পারত না। কনিষ্ঠ সন্তান হলেও শত্রু বিবেচনা করত। ব্রতীকে টিপ্পনি কেটে দিব্যনাথ কখনো বলত ‘মাদার্স চাইল্ড’ কখনো বলত ‘মেয়েমার্কা ছেলে। নো ম্যানলিনেস।’                 
মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে এই পুঁজিবাদী পরিবারের চরিত্রগুলো দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে পারিবারিক ‘বস’ দিব্যনাথ ও জ্যেষ্ঠ তিন সন্তান জ্যোতি, নীপা, তুলি। সেইসঙ্গে এদের পূর্বপ্রজন্ম ঠাকুরমাও। অপরদিকে সুজাতা ও তার কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতী। এই দ্বন্দ্ব কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমসাময়িক সমাজ অথবা রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব। এমনকি বৈশ্বিকও। বিশ্বজগৎ সংসার তখন ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দুধারায় দ্বিধাবিভক্ত। দ্বন্দ্বটা এতই জটিল ছিল যে, ভাই-বোন, পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীর সমুদয় সামাজিক ও আত্মিক বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। এমনকি রক্তের বন্ধনও।
 
৩.
দিব্যনাথপুত্র ব্রতী পিতার পুঁজিবাদী আদর্শে আস্থা হারিয়েছিল। আস্থা হারিয়েছিল সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থাপনায়। আস্থা হারিয়েছিল মুনাফাখোর ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্ধ নেতাদের ওপর। পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থার স্বপ্ন লালন করত। সমতাভিত্তিক একটি সুন্দর সুষম সমাজ বিনির্মাণের লক্ষে হৃদয় তার জেগে উঠেছিল। লেখকের ভাষায়, তখন সত্তর দশক। মুক্তির কাল। মুক্তির দশকে জনমুক্তির আন্দোলনে অনেকটা সংগোপনেই সংযুক্ত হয়েছিল ব্রতীরা। তখন সাম্রাজ্যবাদী শোষক সরকার ক্ষমতায়। জেলের পাঁচিল উঁচু করে। নতুন নতুন ওয়াচ টাওয়ার বসায়। বন্দিদের জন্য ফটকঅবন্দি খোলে না। সুগভীর রাতে ভ্যানভর্তি বন্দি এলে লেখকের ভাষায়—‘ওপর থেকে ক্রেন নামে। জন্তুর মত বন্দীকে যন্ত্রের নখে আঁকড়ে ক্রেন উঠে যায়, জেলের ভেতর নামিয়ে দেয়।’ জন্তুর মতো হলেও যারা জেলে যায়, তারা অন্তত প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু বাইরের ব্রতীরা নিদারুণভাবে প্রাণটা হারায়। রাষ্ট্রযন্ত্র নানা উপায়ে নির্মম নির্যাতন অব্যাহত রাখে। নির্জন সলিটারি সেলে নির্যাতন চালায়। লেখকের ভাষায়—‘সাউন্ডপ্রুফ। দরজা-জানালায় ফেলটমোড়ানো ফাঁপা রবারের নল বসিয়ে সাউন্ডপ্রুফ করা। ঘরের আর্তনাদ, গোঙানি, মারের আওয়াজ, জেরাকারীর গর্জন, সব শব্দ ঐ নলের জন্য ঘরের ভেতরেই বন্দী থাকে।’

৪.
বিজিত, প্রার্থ, লালটু, সমু ব্রতীর বিপ্লবী বন্ধু। এরাও চেয়েছিল স্বসমাজটিকে বদলে দিতে। সহযোদ্ধা বন্ধুদের বাঁচাতেই সেদিন ব্রতী গিয়েছিল সমুদের বাড়িতে। কিন্তু বাঁচাতে পারেননি। নিজেও বাঁচতে পারেনি। গভীর রাতে সমুদের বাড়ি ঘেরাও করে গুন্ডারা। হিংস্র গলায় বলে—‘বের করে দিন, লয়তো ঘরে আগুন দিমু!’ ব্রতীর কণ্ঠ শুনে কেউ একজন বলে ওঠে—‘হালায় আরেক মালটারে জুটাইছে। বাইর হ ঘটির পোলা।’ হাতে হাত রেখে স্লোগান দিতে দিতে ব্রতীরা বেরিয়ে আসে। বাইরে অন্ধকার। ঘুটঘুটে আধার মুখ হাসি-উল্লাসে ফেটে পড়ে। ভয়ংকর গন্ডগোল। ‘বাড়ী বাড়ী আলো নিভে যাচ্ছে, দরজা জানালা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চমকে সরে যাচ্ছে ভয়চকিম মুখ।’ সহসা স্লোগান থেমে যায়। সমবেত ঘাতকেরা খটখট গুলির শব্দ করতে করতে চলে যায়। সমুর দরিদ্র বাবা থানায় গেলে আততীয়দের নাম শুনে ধমকে ওঠে পুলিশ। পুলিশভ্যান আসতে আসতে সরে যায় ঘাতকেরা। নিতু ওরফে দীপুর মতো ভদ্রছেলেকে তো থানার সামনেই পিটিয়ে হত্যা করে। ‘প্রকৃত খুনি কখনো বন্দুক ধরে না।’ ব্রতী-সমুদের হত্যা-পরিকল্পনাকারীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এমনকি প্রত্যক্ষ ঘাতকদেরও বিচার হয় না। বুক ফুলিয়ে এরা নির্বিবাদে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। সমুর দিদিকে দেখে নির্মম ব্যঙ্গ করে, হাহা করে হাসে আর বলে—‘তর ভাইয়ের ছাদ্দ করলি না ক্যান? ভাল কইরা খাইতাম!’ সুজাতার মনে কত প্রশ্ন—যে শহরে এমন সব জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়, সেখানে পরপর কী করে সংস্কৃতিমেলা, রবীন্দ্রমেলা অনুষ্ঠিত হয়?

৫.
সুজাতা টেলিফোনেই ব্রতী হত্যার খবর পায়। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে—‘কাটাপুকুরে আসুন।’ পিতা দিব্যনাথ কাটাপুকুরে না গিয়ে দৌড়ায় পত্রিকা-অফিসে। পুত্রহত্যার খবর ধামাচাপা দিতে দিব্যনাথ ‘দড়ি টানাটানি করে বেড়াচ্ছিলেন।’ সফলও হয়েছিলেন। লেখক বলছেন—‘দিব্যনাথের ছোটাছুটি দড়ি টানাটানি সফল হয়েছিল। পরদিন খবরের কাগজে চারটি ছেলের হত্যার খবর বেরোয়। নাম বেরোয়। ব্রতীর নাম কোন কাগজে ছিল না।’ পত্রিকাপাতা থেকে ব্রতীকে মুছে দিয়েছিল দিব্যনাথ। মুছতে পারেনি মর্গ থেকে। সেখানে  ব্রতীর অবস্থান ‘হাজার চুরাশি’ নম্বরে। সেদিন ব্রতীর মৃত্যু পিতার কাছে কলঙ্কজনক মৃত্যুরূপে বিবেচিত হয়েছিল। মমতাময়ী মা সুজাতা সুস্থির থাকতে পারেননি। ছুটে গিয়েছিলেন কাটাপুকুরের লাশ ঘরে। প্রাণধন পুত্র ব্রতীর মৃত্যু নিয়ে কোথাও একটু সংশয় ছিল। তাই মুখটুকু দেখতে চেয়েছিলেন। অসীম করুণায় ডোম জানিয়েছিল—‘কি আর দেখবেন মাইজী? মুখ কি আর আছে কিছু?’ সীমাহীন মমতায় সুজাতা সবলে ব্রতীর মুখের আবরণ সরিয়ে দেয়। ‘শানিত ও ভারী অস্ত্রের উলটো পিট দিয়ে ঘা মেরে থেঁতলানো, পিষ্ট, ব্রতীর মুখ।’ আঙুল বোলানোর মতো ইঞ্চি পরিমাণ জায়গাও মসৃণ ছিল না। সবই দলিত, মোথিত, থেঁতলানো। তবু সুজাতা ব্রতী! ব্রতী! বলে আঙুল বোলায়। 
ব্রতীদের অপরাধ, ওরা দেয়ালে দেয়ালে বয়ান লিখত। ওরা লাল অক্ষরে লাল শব্দে দেয়াল রঙিন করে তুলত। কেবল মুক্তকণ্ঠে সমবেত স্লোগানই ধারণ করত না, প্রাণভরে বিশ্বাসও করত। দেবীর ভাষায়—‘ব্রতীরা এই এক নতুন জাতের ছেলে। স্লোগান লিখলে বুলেট ছুটে আসে জেনেও ব্রতীরা স্লোগান লেখে। কাটাপুকুর যাবার জন্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয়।’ ব্রতীরা এতটাই সমাজবিরোধী যে, দিব্যনাথের ন্যায় পিতারা মুখাগ্নিও করতে আসে না। ব্রতীদের লাশ কাটাপুকুরের মর্গে পড়ে থাকে। রাতে পুলিশ গাদাগাদি করে শ্মশানে বয়ে আনে। এরপর আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। শ্রাদ্ধে বিশ্বাসীজনও যথানিয়মে শ্রাদ্ধ করার সুযোগটুকুও পায় না। স্ফীত লাল চোখে বসে থাকতে হয় সারাটা দিন।

৬.
নকশাল আন্দোলনকে (১৯৭০) কেন্দ্র করে মহাশ্বেতা দেবী উপন্যাসটির আখ্যানভাগ সাজিয়েছেন। কল্পনার সঙ্গে সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতার দরকারি সমন্বয় ঘটয়েছেন। সেই সঙ্গে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তির সংগ্রামে (১৯৭১) কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা ‘বাংলাদেশের সহায় ও সমর্থনকল্পে পশ্চিমবঙ্গ তোলপাড় করে ফেলেছিল।’ কিন্তু নকশাল আন্দোলনের হত্যাকাণ্ড তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি অথবা এরমধ্যে পৈশাচিকতা খুঁজে পাননি। যদি পেতেন, ‘তাহলে ত কলকাতার কবি ও লেখক ওপারের পৈশাচিকতার সঙ্গে এপারের পৈশাচিকতার কথাও বলতেন।’ কিন্তু বলেননি। মূলত প্রান্তজনের বেঁচে থাকার লড়াই, লড়াই শেষে নিদারুণ পরিণতিই তুলে আনতে চেয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী। দেবীর গদ্যশেলীতে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও অসীম মমতায় সেটি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। উপন্যাস হয়ে উঠছে উপভোগ্য সেইসঙ্গে সাব-অলটার্ন হিস্ট্রির দরকারি দালিলিক শিল্পকর্ম। ২৮ জুলাই প্রয়াণদিবসে লেখকের প্রতি অশেষ প্রণতি।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১৮:৩৬

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা। কাঁটাবনে অবস্থিত প্রকাশনা সংস্থা ‘উজান’ এমন ঘোষণা দিয়েছে তাদের প্রকাশিত ‘কোরিয়ার কবিতা’ ও ‘কোরিয়ার গল্প’ নিয়ে আলোচনার জন্য।
এই বই দুটিতে রয়েছে কোরিয়ার বিশ ও একুশ শতকের উল্লেখযোগ্য কবিদের কবিতা এবং একই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিকদের ছোটগল্প। 
উজানের এই আয়োজনে সহযোগিতা করছে লিটারেচার ট্রান্সলেশন ইনস্টিটিউট অব কোরিয়া। 
বই আলোচনার সর্বোচ্চ পুরস্কার ২০ হাজার টাকা। এছাড়া দ্বিতীয় পুরস্কার ১৫ হাজার এবং তৃতীয় পুরস্কার ১০ হাজার টাকা। এই প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত সর্বোচ্চ ১০ আলোচকের প্রত্যেককে দেওয়া হবে ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের বই। 
আলোচনাগুলো বাছাই করবেন দেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও অনুবাদকদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারক কমিটি। একজন একটি বই নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন। আলোচনা বাংলাভাষায় লিখিত বা ভিডিও মাধ্যমে হতে হবে। 
অংশগ্রহণে ইচ্ছুক অনলাইনে ফরম পূরণ করতে করতে পারবেন এসব লিংকে www.ujaninfo.com, www.porospor.info। ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আলোচনা জমা দিতে হবে [email protected] এ।
বিস্তারিত জানতে এবং বই সংগ্রহ করতে পারবেন www.ujaninfo.com, www.facebook.com/UjanPrakashan, https://www.facebook.com/UjanBooks থেকে।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২১, ১৯:৪৪

কিছু ছবি এখনও আছে বলে কথা বলার দু-একটা মানুষ পাওয়া যায়>প্রতিবার মেঘ হলে মেঘমল্লার শুনে বৃষ্টি ভোলা যায় না>নিহত পশুররক্ত আর মাংস বাতাসে>দুঃখ আছে বলে কয়েকটা কবিতা এরপরও লেখা হবে>সকালগুলো ঘুমিয়ে কাটে বলে আর অপরাধবোধ জাগে না>রাত পেয়ে যাই>বাতাস কিন্তু ঘুরে যাচ্ছে>সময়ে সব বদলায় এ তত্ত্ব এখনও প্রমাণের চেষ্টা চলে>ঘরের মধ্যেও এক নেশা আসে বাইরেও এক নেশা যায়>নেশা>হেই হ্যালো, আমি হাস্নাহেনার গন্ধও পাচ্ছি>মাংসের গন্ধের সাথে>ছবি কিন্তু সব কথার উত্তর দেয়>হুহু করে উত্তর>থেকে বাতাস আসবে দুমাস পরেই>যদি বলি ছবিকে, কী, সে পাল্টা প্রশ্ন করে না>যদি বলি, কেন ও ইত্যাদি, পাল্টা প্রশ্ন করে না>যার যা উত্তর তা বুঝিয়ে দেয় আজকাল প্রতি রাতেই প্রায়>উত্তর পেতে পেতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে…>চরাচরে পাখি থাকলে বলে দিয়ো তাদের পাখায় আর কোনো শব্দ নেই>তাদের ওড়ায় আর কোনো নীরবতা নেই<

/জেডএস/

সম্পর্কিত

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

বোকা দুপুরের নাম

বোকা দুপুরের নাম

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

সর্বশেষ

ময়মনসিংহ হাসপাতালে ভর্তি ৪ ডেঙ্গু রোগী

ময়মনসিংহ হাসপাতালে ভর্তি ৪ ডেঙ্গু রোগী

শের-ই বাংলা মেডিক্যালে একদিনে ২৩ মৃত্যু

শের-ই বাংলা মেডিক্যালে একদিনে ২৩ মৃত্যু

যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া, পোশাকশ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধ

যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া, পোশাকশ্রমিকদের মহাসড়ক অবরোধ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাত করে ৬ লাখ টাকা ছিনতাই

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাত করে ৬ লাখ টাকা ছিনতাই

চট্টগ্রামে করোনায় আরও ১১ জনের মৃত্যু

চট্টগ্রামে করোনায় আরও ১১ জনের মৃত্যু

রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে রাজধানীর যে ৪ হাসপাতাল

রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে রাজধানীর যে ৪ হাসপাতাল

স্পারসোতে চাকরির সুযোগ

স্পারসোতে চাকরির সুযোগ

হেলেনা জাহাঙ্গীরের মামলা তদন্ত করবে ডিবি

হেলেনা জাহাঙ্গীরের মামলা তদন্ত করবে ডিবি

শের-ই-বাংলা মেডিক্যালে ২ ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন

শের-ই-বাংলা মেডিক্যালে ২ ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন

বিদেশে নিজের অবস্থান জানান দিলেন বঙ্গবন্ধু

বিদেশে নিজের অবস্থান জানান দিলেন বঙ্গবন্ধু

মাদাগাস্কারে সেনা কর্মকর্তা আটক, প্রেসিডেন্ট হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

মাদাগাস্কারে সেনা কর্মকর্তা আটক, প্রেসিডেন্ট হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

ইরানকেই দুষছে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র

ইরানকেই দুষছে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

থিয়েটার

থিয়েটার

গহন
© 2021 Bangla Tribune