X
শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

ফকনারের কথা

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২১, ১২:০৫

বিশ শতকের ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম লেখক উইলিয়াম ফকনার। তার জন্ম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যে ১৮৯৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর এবং মৃত্যু ১৯৬২ সালের ৬ জুলাই। ১৯৫৬ সালে দ্য প্যারিস রিভিউতে তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে জাঁ স্টাইন। সেই সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য তথ্যের আলোকে তার অন্তর্জগতে প্রবেশের চেষ্টা আমাদের। 
লেখক হিসেবে নিজেকে কীভাবে দেখেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তিনি না থাকলে অন্য কেউ তার লেখাগুলো লিখতেন। প্রমাণ হিসেবে তিনি বলেন শেক্সপিয়ার, বালজাক, হোমার এরা সবাই একই বিষয় নিয়ে লিখেছেন। তারা হাজার বছর বেঁচে থাকলে প্রকাশকদের আর লেখক লাগতো না। তার এই বক্তব্য ক্ল্যাসিক সাহিত্য সম্পর্কে মেনে নেয়া গেলেও আধুনিক কালের লেখকের ক্ষেত্রে বলা যায় না। জাঁ স্টাইনের ওই সাক্ষাৎকারে তিনি তার স্বভাবসুলভ দুষ্টুমি করতেও ছাড়েননি। অপরদিকে তিনি বিশ্বাস করেন ভালো ঔপন্যাসিক হওয়ার জন্য শতকরা নিরানব্বই ভাগ মেধা, নিরানব্বই ভাগ নিয়মানুবর্তিতা, নিরানব্বই ভাগ পরিশ্রম করতে হয়। 
তবে তিনি লেখককে আত্মতুষ্টিতে ভুগতে না করেছেন। তিনি মনে করেন একজন লেখক নিজের কাজ ঠিক মতো করার জন্য অন্যের মূল্যবান রত্ন ছিনিয়ে নেবেন, চুরি করবেন, ধার করবেন কিংবা ভিক্ষা করে নেবেন—তাতে দ্বিধাদ্বন্দ্বের কিছু নেই। এ ক্ষেত্রে তিনি পুরোপুরি নীতিহীন হতেই পারেন। এই রত্ন বলতে তিনি টিএস এলিয়টের মতো সমস্ত শিল্পকলাকেই বুঝিয়েছেন।
লেখকের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে তিনি বলেন, লেখকের দরকার হলো পেন্সিল আর কাগজ। ভালো লেখক সফলতা কিংবা ধন-সম্পদ লাভের চিন্তা করেন না। তিনি মনে করেন একজন ভালো লেখক কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে কিছু চান না, তিনি ব্যস্ত থাকেন তার লেখার কাজে। আপোশহীন এমন লেখককে কেবল টলাতে পারে মৃত্যু। লেখকের দায়বদ্ধতা শুধু তার শিল্পের প্রতি। সুখ-শান্তি আর সন্তুষ্টির সাথে শিল্পের কোনো সম্পর্ক নেই। ‘আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, আমার কাজের জন্য চাই কাগজ, তামাক, খাবার আর অল্প একটু হুইস্কি।’ তিনি শুধু অর্থই নয়, ক্ষমতাবানদের সঙ্গও প্রত্যাখ্যান করতেন। ১৯৬২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি দেশের সব নোবেল বিজয়ীকে হোয়াইট হাউসে নিমন্ত্রণ করেন। প্রায় সবাই সেই ভোজে অংশগ্রহণ করলেও ফকনার যাননি। কেন যাননি এই উত্তরে তিনি বলেন, ‘একবেলা খাওয়ার জন্য ৬০ মাইল পাথ ভাঙা কি ঠিক?’
লেখক কি কৌশল অবলম্বন করবেন? ‘না তাহলে তাকে শল্যবিদ কিংবা রাজমিস্ত্রির কাজ বেছে নিতে দেয়া উচিত।’ কোনো তত্ত্ব অনুসরণ করবেন? ‘করলে তিনি বোকামিই করবেন। নিজেকে পাকাপোক্ত করতে নিজের ভুলের ভেতর দিয়েই যেতে হবে।’ 
লেখার উপাদান কীভাবে সংগ্রহ করতে হয়? ‘লেখকের তিনটি জিনিসের প্রয়োজন : অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ এবং কল্পনা। এগুলোর মধ্যে মাত্র দুটি থাকলে বাকিটার কাজ চলে যেতে পারে। আবার কখনো একটা থাকলেও অন্য দুটোর কাজ চালিয়ে নেয়া যেতে পারে।’
ফকনারের ব্যাপারে দুর্বোধ্যতার কথা তো আছেই। পাঠক তার লেখা বুঝতে না পাড়লে এমনকি দু-তিন প্রয়াসেও বুঝতে না পারলে কী করবেন– এই প্রশ্নের জবাবে তার সোজা সাপ্টা জবাব ‘চার বার পড়ুন।’
লা রোশফুকো যেমন প্রেমকে ভূতের সঙ্গে তুলনা করেছেন, মানে আমরা ভূতকে বিশ্বাস করি কিন্তু বাস্তবে যার অস্তিত্ব নেই। তেমনি ফকনার লেখকের অনুপ্রেরণাকে বলেন ‘আমি অনুপ্রেরণার কথা শুনেছি, কিন্তু দেখিনি।’
লেখালেখি শুরুর গল্পটি বলবেন? ‘আমি তখন নিউ অরলিন্সে থাকতাম। ...তখন দেখা হলো শেরউড এন্ডারসনের সঙ্গে। ...দুপুরের আগে তাঁকে কোনো দিন বাইরে দেখিনি। সে সময়টাতে তিনি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে বাড়িতে বসে লেখালেখি করতেন। ...তাঁর জীবন যাপন দেখে আমার মনে হলো, লেখকের জীবন যদি এমনই হয় তাহলে তো আমিও এ জীবন বেছে নিতে পারি। সুতরাং আমার প্রথম বই লেখার কাজ শুরু করে দিলাম। ...মি. এন্ডারসনের সঙ্গে যে আমার তিন সপ্তাহ দেখা হয় না সে কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। শেষে তিনি নিজেই একদিন চলে এলেন আমার দরজায়। বললেন, ব্যাপার কী? তুমি কি আমার ওপর খেপে আছ? আমি বললাম, আমি একটা বই লেখার কাজ শুরু করেছি। তিনি শুধু বললেন, মাই গড! এ বলেই হাঁটা দিলেন বাইরের দিকে। ...বইটা শেষ করার পর রাস্তায় একদিন মিসেস এন্ডারসনের সাথে দেখা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, বই লেখার কাজ কেমন চলছে? আমি বললাম, লেখা তো শেষ। মিসেস শেরউড আরো বললো, ...তোমার পাণ্ডুলিপি যদি তাকে পড়তে না হয় তাহলে সে তার প্রকাশকের সাথে কথা বলবে তোমার পাণ্ডুলিপি যাতে তিনি গ্রহণ করেন। ...ব্যস, এভাবেই লেখক হয়ে গেলাম।’
লেখকরা তাদের সমসাময়িকদের লেখা পড়েন না, এমন একটি অভিযোগ সবসময়ই উত্থাপিত হয়। উইলিয়াম ফকনার সরাসরিই ‘না’ বলেন। তিনি পড়েন না। তিনি পড়েন সেইসব লেখকদের বই যাদের নাম তিনি ছেলেবেলায় শুনেছেন। তার এই তালিকায় আছে: ওল্ড টেস্টামেন্ট, ডিকেন্স, কনরাড, সারভান্তেস, দোন কিহোতে, ফ্লবেয়ার পড়ি, বালজাক, দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, শেক্সপিয়ার, মেলভিল; কবিদের মধ্যে মার্লো, ক্যামপিওন, জনসন, হেরিক, ডান, কিটস, শেলির কবিতা। 
উইলিয়াম ফকনার নিজের নামের বানান ভুল লিখতেন। এই ভুল ইচ্ছাকৃত ছিলো না। তার পিতা ও প্রপিতামহ Falkner লিখতেন, কিন্তু তিনি লিখতেন Faulkne, শোনা যায় জীবনে প্রথম টাইপ করার সময় নিজেই এই ভুলটি করেছেন, যা আর কোনো দিন ঠিক করেননি। তবে এই ভুলটি পেছনে অন্য রহস্যও আছে, তার প্রপিতামহ কর্নেল ফকনার ইউ যোগ করে আগে লিখতেন, কিন্তু দেখতে খারাপ লাগায় তিনি তা পারিহার করেন। 
ফকনার ছিলেন ধূমপায়ী। সারা জীবন তিনি একই উপহার গ্রহণ করতেন। ধবধবে সাদা পাইপ ক্লিনার ছিল তার অসম্ভব প্রিয়। বড়দিনে ক্রিসমাস ট্রির সঙ্গে ঝুলতো সাদাসহ নানান রঙের পাইপ ক্লিনার। আর অন্যসব উপহার তিনি প্যাকেট খুলেও দেখতেন না। 
ফকনার শিক্ষাজীবনে হাইস্কুলের গণ্ডিও পেরোতে পারেননি। তবে ‘বিশেষ ছাত্র’ হিসেবে মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন, তবে সেখানকার লেখাপড়াও শেষ করতে পারেননি। 
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রয়াল এয়ার ফোর্সের কানাডীয় শাখায় স্বল্প সময়ের জন্য যোগ দেন। এর আগে তিনি মার্কিন সেনাবাহিনী থেকে কম ওজন ও উচ্চতার কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন। তবে যুদ্ধে অংশ নেবার আগেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। যুদ্ধের পর তিনি কেরানিগিরি ও বাড়ি নির্মাণের কাজে নিযুক্ত ছিলেন।
ফকনারের লেখক জীবন শুরু হয় কবিতা দিয়ে। যার কিছু প্রকাশিতও হয়। ১৯২১ সালে তার লেখা একটি নাটক মঞ্চায়িত হয়। ১৯২৪ সালে প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়। ১৯২৫ সালে তার সাথে শেরউড অ্যান্ডারসনের সাক্ষাৎ হয়। অ্যান্ডারসনের প্রভাবে তিনি কল্পকাহিনী লিখতে উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৩০ ও ১৯৪০—এর দশকের শুরুর দিকে ফকনার চিত্রনাট্য লেখক হিসেবে হলিউড গিয়েছিলেন। জীবনের বাকী সময় তিনি অক্সফোর্ডেই গল্প ও উপন্যাস লিখে কাটিয়ে দেন।
ফকনারের পূর্বপুরুষ আঠারো শতকে স্কটল্যান্ড থেকে আমেরিকায় আসেন। প্রপিতামহ উইলিয়াম ক্লার্ক ফকনার ছিলেন তরুণ লেখক ফকনারের প্রেরণার বীজ। উইলিয়াম ক্লার্ক মার্কিন গৃহযুদ্ধের সময় কর্নেল ছিলেন। তিনি রেলপথ নির্মাণ করেন এবং ১৮৮১ সালে ‘দ্য হোয়াইট রোজ অভ মেমফিস’ নামে একটি জনপ্রিয় রোমান্টিক উপন্যাস লেখেন। 
ফকনার মোট ১৯টি উপন্যাস ও বহু ছোট গল্প লেখেন। তার বেশ কিছু কাব্যগ্রন্থও আছে। তার সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাসগুলি হল দ্য সাউন্ড অ্যান্ড দ্য ফিউরি (১৯২৯), অ্যাজ আই লে ডাইং (১৯৩০), লাইট ইন অগাস্ট (১৯৩২), আবসালোম, আবসালোম! (১৯৩৬), এবং দি আনভ্যাংকুইশ্ড (১৯৩৮)। ১৯৪৯ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। ১৯৫৫ সালে ‘আ ফেবল’ নামে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন ফ্রান্সের উপর লেখা উপন্যাসটির জন্য জাতীয় বই পুরস্কার এবং পুলিৎজার পুরস্কার লাভ করেন।
এক পর্যায়ে ফকনারের স্বাস্থ্য ক্রমাগত ভগ্ন হতে থাকে এবং বেশ কয়েকবার ঘোড়া থেকে পড়ে আঘাত পান। এমনই এক আঘাতের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হবার পর হার্ট অ্যাটাকে ১৯৬২ সালের ৬ জুলাই তিনি মারা যান।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

তুমি নামের অচেনা কেউ

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২২:৩৫

তুমি নামের অচেনা কেউ

চার উপাঙ্গ সমানে দোলাও
বিলিয়ে যাও জুরাসিক কালের গান
তুমি কি পাখির মতন?

অথবা মূক বৃক্ষের মতন নির্বিকার
          ফ্যাকাসে ধুলোর সরানে
          ঢেলে দাও মধুর অম্লজান।

সবরমতী এক্সপ্রেসের মতন 
ধেয়ে আসে ঈশান-ঘূর্ণি
পাখিরা পালায়—ভেঙে যায় ডানার অহংকার
শেকড়ের ওজরেও নুয়ে পড়ে বৃক্ষ।

তুমি আসলে বাতাস
ভেঙে দাও প্রকাশরূপ—আলোর সংস্করণ।


জল ছাড়া অন্যকিছু 

শৈশবের নদী
যার ঢেউগুলোকে কুমারীর কুচ ভেবে
লাফিয়ে ওঠে পানকৌড়ি,

মানুষ পানিউড়ি হলে
জেনে যায় কবিতা আসলে উলঙ্গ সমুদ্দুর
যার চিকন ঢেউয়ে যুবতী আঁচলের ভ্রম,

মুহাজির মানুষ ঢেউ সোয়ারি হলে
জেনে যায় কবিতা জল ছাড়া কিছু নয়
যে কেবল তৃষ্ণা মেটায় না—ডুবিয়েও মারে।


নাস্তিকাল

বারবেলা পড়ে আছে
                  নাগরিক উঠোনে
কণ্ঠস্বরগুলোর ওপর 
            সেঁটে আছে লকডাউন 

ও পৌষালি পাখি
গান গাইবার আগে মিলিয়ে নাও
          গ্রহস্ফুটের নক্ষত্র সংখ্যা

পরিযায়ী মেঘের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে—ফলাফল
বাক্য নাস্তি, শ্রুতি নাস্তি, দর্শন নাস্তি।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

শেকড়ে ও সত্তায় শাহাবুদ্দিন

শেকড়ে ও সত্তায় শাহাবুদ্দিন

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:০৬

‘দূরে কাছে কেবলি নগর, ঘর ভাঙ্গে 
গ্রাম পতনের শব্দ হয়;’
                         
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর অস্বাভাবিক নগরায়ণ দেখে কি জীবনানন্দ-কবি ওপরের পঙক্তিদুটি লিখেছিলেন? 
আর পরক্ষণেই আরো ছ-পঙক্তিতে তিনি বিশদ করছেন :
‘মানুষেরা ঢের যুগ কাটিয়ে দিয়েছে পৃথিবীতে, 
দেয়ালে তাদের ছায়া তবু 
ক্ষতি, মৃত্যু, ভয় 
বিহ্বলতা ব’লে মনে হয়।
এসব শূন্যতা ছাড়া কোনোদিকে আজ 
কিছু নেই সময়ের তীরে।’

আজ এই করোনাকরুণ সময়ে দাঁড়িয়ে সত্যিই মনে হয়, মানুষ যদিও ‘ঢের যুগ কাটিয়ে দিয়েছে পৃথিবীতে’ এবং তার অর্জনও অসীম, তবু, তার সেরা উপার্জন মনে হয় কবি-কথিত ‘ক্ষতি, মৃত্যু, ভয়, বিহ্বলতা’ ছাড়া আর কিছুই নয়! আর এত নগর, এত প্রযুক্তি, ভোগ-সুখের এত অপার অপচয়ের সুযোগ, তবু যেন সত্যিই ‘শূন্যতা ছাড়া কোনোদিকে আজ কিছু নেই’। কারণ পৃথিবীর তাবৎ মানুষের দানবীয় শক্তিও এই অদৃশ্য ভাইরাসের কিচ্ছুটি করতে পারছে না, বরং বছরজুড়ে তার হাতে মার খেয়েই চলেছে। মানবজাতির তাবৎ জ্ঞান-বুদ্ধি-বিজ্ঞানের কেরদানিকে সে যেন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছে। অথচ মানবজাতি তার বিপুল ধরিত্রীমাতাকে শতবার বিনাশ করার প্রযুক্তি করায়ত্ত করেছে, প্রতিদিন পৃথিবীর বুক ছিঁড়েখুঁড়ে তার সুখের প্রাসাদ নির্মাণ করছে, সমুদ্র থেকে আকাশ-বাতাস-মাটি-অরণ্য সবকিছুকে দূষিত করে, লক্ষ-লক্ষ প্রাণ ও বৃক্ষলতাকে প্রতিনিয়ত হত্যা করে তার অসীম প্রভুত্ব বিস্তার করেছে। এই আত্মগর্বী, জ্ঞানপাপী মানবকুল এবং তাদের মদমত্ত, বলদর্পী, ক্ষমতা ও ধনলোভী শাসক ও বণিকদল পৃথিবীকে যেন ভোগ আর মুনাফার ভাগাড় বানিয়ে ছেড়েছে। কিন্তু পৃথিবীও তার অদৃশ্য অস্ত্র দিয়ে আমাদের গালে চপেটাঘাত করে দেখিয়ে দিচ্ছে, মানুষ নিজেকে যতটা বড় মনে করে, তত বড় হতে তার ঢের বাকি আছে!

অবশ্য মানুষ যে আদতেই সামান্য, সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া প্রকৃতিরই তুচ্ছ অংশমাত্র, সে-কথাও মানুষই তার জ্ঞান-বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে বুঝেছে এবং চিন্তা-দর্শন-ধর্ম-সংস্কৃতি ও ব্যাবহারিকতার মাধ্যমে তার চর্চা করেছে। তবে কী এক বিপন্ন-বিকারে মানুষ যত ‘সভ্য’ হয়েছে, প্রকৃতির প্রতি তার ‘অসভ্যতা’ মাত্রাহীনতা পেয়েছে। কেবল তা-ই নয়, উনিশ শতক থেকে শুরু হয়েছে উৎকট-নগরায়ণ এবং আজকের এই একুশ শতকে প্রতিদিনই তীব্রগতিতে গ্রামের ভিতর শহর ঢুকে পড়ছে, প্রতিদিনই চলছে বৃক্ষ-নদী-ভূমিহত্যার উৎসব। নগরায়ণের সঙ্গে আছে ক্ষমতা, পুঁজি ও মুনাফার সম্পর্ক। আর তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উদগ্র লোভ-ভোগ-দখলের বিচারবোধহীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কেবল যে প্রকৃতির ভারসাম্যকেই বিনষ্ট করে তা নয়, বরং মানবিক ভারসাম্যকেও ধ্বংস করে দেয়। পরিণামে কেবল মাটিই ইট-পাথরে রূপান্তরিত হয় না, বরং মানুষ নিজেকেও শুষ্ক করে তোলে; তার সজল আত্মা মরুতে পরিণত হয় এবং তা ভেতরে ভেতরে তাকে শিকড়হীন-উন্মূল করে তোলে; নানা ব্যাধি ও বিকার তাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।

এ কথা মনে করেই হয়তো জীবনানন্দ-কবি তাঁর এই ‘পৃথিবীলোক’ কবিতার শেষ চার পঙক্তিতে লেখেন :            
‘তবু ব্যর্থ মানুষের গ্লানি ভুল চিন্তা সংকল্পের 
অবিরল মরুভূমি ঘিরে 
বিচিত্র বৃক্ষের শব্দে স্নিগ্ধ এক দেশ 
এ পৃথিবী, এই প্রেম, জ্ঞান আর হৃদয়ের এই নির্দেশ।’

কী চমৎকারভাবেই না জীবন-কবি বলেছেন, ‘বিচিত্র বৃক্ষের শব্দে স্নিগ্ধ এক দেশ এ পৃথিবী’! তবু মানবজাতি ‘এই প্রেম, জ্ঞান আর হৃদয়ের এই নির্দেশ’ কী অবলীলায় ভুল মেরে বসে আছে। অথচ আর কোনো প্রাণ-প্রজাতি নয়, কেবল মানবপ্রাণির জন্যই কত-না ঊর্ধ্বলোক থেকে কত-না গর্জন-বর্ষণ যুগে যুগে এসেছে বারবার। তবু মানুষ আজও হলো না মানুষ। কবে যে হবে কিংবা হবে কোনো দিন!
এই পৃথিবীলোক তবে কি মানুষের হাতেই হবে শহিদ! একদিন পতন হবে সব নগরের, মিলিয়ে যাবে তার সকল গৌরব!! 

[উৎসর্গ : প্রণম্য প্রকৃতিসাধক দ্বিজেন শর্মা]

/জেডএস/

সম্পর্কিত

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

শেকড়ে ও সত্তায় শাহাবুদ্দিন

শেকড়ে ও সত্তায় শাহাবুদ্দিন

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৪:৪১

‘আমি তোমায় চাই রে বন্ধু
আর আমার দরদি নাই রে॥

না জেনে করেছি কর্ম 
দোষ দিব আর কারে 
সর্পের গায়ে হাত দিয়াছি
বিষে তনু ঝরে রে
আর আমার দরদি নাই রে॥

আমার বুকে আগুন রে বন্ধু
তোমার বুকে পানি
দুই দেশে দুই জনার বাস
কে নিভাইব আগুনি রে 
আর আমার দরদি নাই রে॥

জন্মাবধি কর্মপোড়া
ভাগ্যে না লয় জোড়া 
এ করিম রে করবায় নাকি
দেশের বাতাস ছাড়া
আর আমার দরদি নাই রে॥’

করিম তার গানের মাধ্যমে যে-জায়গায়ই পৌঁছতে চান না কেন, তার মাধ্যম হিসেবে—ভাষা, বিষয় ও সুর গ্রহণে—কতটা সহজ ও স্বাভাবিক থাকা যায় সে-চেষ্টা করে গেছেন আজীবন এবং এ-ক্ষেত্রে তিনি যে পূর্ণমাত্রায় সফল, তার বড় নজির উপরিউক্ত গান : ‘বন্ধু দরদিয়া রে’। 
গানটি যতবারই শুনি, আমার মনে পড়ে যায় গাঁয়ের কোনো-এক রাখাল যুবকের কথা, যে-কিনা প্রেমে পড়ে পথে-পথে গোপাটে-গোপাটে ঘুরছে। এই অবস্থায় কেমন হওয়া উচিত সেই যুবকের মুখের ভাষা? যে কিনা একদমই নিরুপায় এবং এমন কোনো জানা পথও যে যেদিকে কোথাও চলে যেতে পারে সে—সেই অবস্থায়, গানের বাণী-অনুয়ায়ী বিকল্প হতে পারত কোনো ওঝা-বদ্যি? কিন্তু মনে হয় না তার প্রতি কোনো আস্থা আছে, বা, থাকলেও, সে-চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে গেছে প্রেমিক : 

‘না জেনে করেছি কর্ম 
দোষ দিব আর কারে 
সর্পের গায়ে হাত দিয়াছি
বিষে তনু ঝরে রে
আর আমি দরদি নাই রে॥’ 

বোঝা যাচ্ছে এই এই কর্ম অজানিত, জেনে-শুনে বিষ পান করা নয়, ফলে কৌশল অবলম্বন করাও যায়নি, এই অ-জ্ঞান কর্মের সঙ্গে কৃষ্ণের-পরমত্ব-বিষয়ে আপাতজ্ঞানহীন রাধার সমর্পণেরও মিল নেই, তবে বৃন্দাবন ত্যাগের পর রাধার যে একম্মন্যতা, তার সঙ্গে এই ভাবের মিল রয়েছে : ‘আর আমার দরদি নাই রে’—তুমিই আমার ওঝা-বদ্যি—তুমিই আমার সকল নির্ভরতা। এই কারণে সমস্ত সভ্যতা-ভব্যতা ছেড়ে, গানের বাণী তার সকল অলংকার খুলে ফেলে, নিরুপায় প্রেমিককে শেষপর্যন্ত জানিয়ে দিতে হয় : 

‘আমি তোমায় চাই রে বন্ধু
আর আমার দরদি নাই রে॥’
 
প্রেমিক/রাখাল যুবকের মুখে এমন সহজ ও সরাসরি উচ্চারণ এই কারণেই স্বাভাবিক হয়েছে যে, ভাব প্রকাশের নানা সংকেত ও সংবেদন/চেতনা-সংবলিত কোনো অধুনান্তন প্রতীকের ব্যবহার সে শেখেনি, বা হতে পারে, এই বেফানা অবস্থায় কোনোরকমের ঝুঁকি/সময়ও সে নিতে চায় না। এ-বিষয়ে প্রথম অন্তরায় সর্পের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে, এলিয়টকথিত দ্বিতীয় স্বরের কথা উঠতে পারে; এখানে প্রথম স্বর মুখপদ-এর স্বগতোক্তি আর দ্বিতীয় স্বর পাঠকের উদ্দেশে কবির/করিমের ব্যাখ্যা; এ-ছাড়া কিছু-কিছু বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে সর্প যেভাবে নঞর্থ প্রতীক রূপে ব্যবহৃত, তা-ও এখন সবার কাছে বহুপরিচিত প্রতীকেরই দৃষ্টান্ত হয়ে গেছে। বহুপরিচিত প্রতীকের উদাহরণ রয়েছে গানের দ্বিতীয় অন্তরায়ও, সেই প্রতীক দুটি ‘আগুন’ ও ‘পানি’ : দৃশ্যত—এমনকি  কাজের ক্ষেত্রেও—বিপরীতধর্মী, কিন্তু ‘প্রকৃত প্রস্তাবে’ দ্বন্দ্বস্বভাবী। ভাব প্রকাশের জন্য এই দুটি প্রতীক কীভাবে সার্থক হয়ে উঠেছে, তার প্রমাণ ‘আমার’, ‘তোমার’ আর দুই দেশে এই দুই জনের অবস্থান ও দূরত্ব :             

‘আমার বুকে আগুন রে বন্ধু
তোমার বুকে পানি
দুই দেশে দুই জনার বাস
কে নিভাইব আগুনি রে 
আর আমার দরদি নাই রে॥’

বলা নিস্প্রয়োজন, এখানে দুই দেশ মানে দুই অঞ্চল, হতে পারে দুই গ্রাম, যেখানে ‘দুই জনা’র অবস্থান; এরা ঠিক পরস্পরনির্ভরশীল কি না জানি না, কিন্তু আমার/আগুন-এর জন্য তোমার/পানি-র দরকার, এরকম এক অনিবার্যতা রয়ে গেছে বাণীতে, আর তা বোঝানোর জন্য এর চেয়ে সহজ ও লক্ষ্যভেদী প্রতীক পাওয়া কঠিন। 
তবে প্রতীকে এই অনিবার্যতা ফুটে উঠলেও, বাস্তবে—ভণিতা-পদে রয়েছে না-পাওয়ার শংকা, জন্মজীবননিয়তি-বিষয়ে হতাশা এবং সর্বোপরি, দোলাচলতা। গানটি যারা শুনেছেন তারা জানেন যে—করিমের কণ্ঠে শুনে থাকলে তো কথাই নেই—এর মধ্যে বাতাসের মৃদুমন্দ প্রবহমানতা রয়েছে; যারা শোনেননি, তারা পড়ে অন্তত এটুকু কল্পনা করে নিতে পারবেন যে, গাঁয়ের গোপাট ধরে, গায়ে ‘দেশের বাতাস’ লাগিয়ে, বন্ধু দরদিয়া রে...এ বন্ধু দরদিয়া রে...এ গাইতে-গাইতে হেঁটে চলেছে কোনো যুবক : 

‘জন্মাবধি কর্মপোড়া
ভাগ্যে না লয় জোড়া 
এ করিম রে করবায় নাকি
দেশের বাতাস ছাড়া
আর আমার দরদি নাই রে॥’

আগের অন্তরায় অঞ্চল, গ্রাম বা স্থান ব্যবহার না করে, কেন ‘দেশ’ ব্যবহার করা হয়েছিল, তা বোঝা যায় এই অংশটি পড়ে। এখানে ‘এ করিম রে করবায় নাকি/দেশের বাতাস ছাড়া’ গাইবার সময় যে শংকা ও হাহাকারটুকু ঝরে পড়ে, তাতে দূর ‘দেশ’-এর আপাতনিস্তরঙ্গ পানিতে কতটুকু তরঙ্গ জাগবে জানি না, বা তাতে কোনো পারমার্থিক লক্ষ্য পূরণ হয় কি না তাও জানি না, কিন্তু আমরা, করিমের স্বদেশিরা, সঙ্গত করতে করতে তাঁর সঙ্গে, প্রেমিক যুবকের সঙ্গে গাইতে শুরু করি ‘বন্ধু দরদিয়া রে’...       

 

/জেডএস/

সম্পর্কিত

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

শেকড়ে ও সত্তায় শাহাবুদ্দিন

শেকড়ে ও সত্তায় শাহাবুদ্দিন

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:০৮

ভিন ভাষার প্রতি ইংরেজিভাষীর দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা এরকম : চলো, লুট করা যাক; শেখার দরকার নাই।

ইংরেজি ভাষার শব্দভান্ডারের একটা বিপুল অংশ ফরাসি, লাতিন অথবা অন্য কোনো ভাষা থেকে আসা। কিন্তু ইংরেজরা একটা বিদেশি ভাষা পুরোপুরি শেখার ব্যাপারে কখনো তেমন গা করেনি। চার্লস ডিকেন্স তাঁর লিটল ডরিট উপন্যাসে মি. মিগলস-এর মুখ থেকে এই কথা বলিয়েছেন : ‘আমি যেকোনো কিছু সানন্দে করতে রাজি আছি, শুধু ওই ভাষাটি বলা ছাড়া।’ আর, এর দেড়শ বছর পরে ব্রিটিশ কৌতুকাভিনেতা এডি ইযার্ড তাঁর দেশের একভাষিকদের মনের কথা এভাবে প্রকাশ করেছেন : ‘এক মাথায় দুই ভাষা? এই বেগে কেউ বাঁচতে পারে না।’

বলাই বাহুল্য যে, এগুলো ক্যারিকেচার। কিন্তু ভাষার ব্যাপারে ব্রিটিশ সংরাগ বা প্যাশন সুতীব্র হলেও সেটা মুখ্যত কেবল ইংরেজির প্রতি আকর্ষণেই সীমাবদ্ধ। পান (pun) বা শব্দ নিয়ে ক্রীড়া-কৌতুক আর শব্দজব্দ (ক্রসওয়ার্ড) খেলায় ব্রিটিশরা অদম্য, প্রবল উৎসাহী, সেই সঙ্গে তাঁরা তাঁদের দেশি ভাষার ইতিহাস আর বৈচিত্র্য নিয়েও মন্ত্রমুগ্ধ। এবং ব্রিটিশরা খ্যাপাটে ব্যাকরণ আর সঙ্গতিহীন বানান নিয়ে অনুযোগ করতে পছন্দ করে ঠিকই, কিন্তু আমি ভাবি তাদের মধ্যে ঠিক কতজন এর অন্যথা হলে সেটা পছন্দ করতেন। এই সমস্ত উদ্ভটত্ব দুর্দান্ত সব গল্প তৈরি করে। এর চাইতে বেশি কেউ আর কী চাইতে পারে?

তা, অন্য ভাষাগুলোর জীবনের কী অবস্থা? ইউরোপের অসংখ্য ভাষা সেগুলোর ধ্বনিগত আর লিখিত ধরন নিয়ে বেশ ভীতিকর শোনাতে পারে, কিন্তু সেগুলো সম্পর্কে যেসব গল্প-কাহিনি প্রচলিত ছিল সেগুলো বেশ আকর্ষণীয়। এই বইয়ে সেসব গল্পের সেরা ষাটটি বলা হয়েছে। আপনারা দেখতে পাবেন দৃশ্যত পরিণত মনে হলেও কিভাবে ফরাসি ভাষা আসলে মাতৃ-আচ্ছন্নতা দিয়ে পরিচালিত। আবিষ্কার করবেন হিস্পানি ভাষা শুনতে কেন মেশিনগানের গুলির মতো শোনায়। আর যদি আপনার মনে হয়ে থাকে যে, লোকের মাথায় বন্দুক ধরে জর্মন ভাষার বিস্তার ঘটানো হয়েছে তাহলে ভুল করবেন। সেই সঙ্গে আপনি আরো খানিকটা দূরে গিয়ে নরওয়েজীয় ভাষার খাপছাড়া ধরনের গণতান্ত্রিক চরিত্র, ওলন্দাজের জেন্ডার টলিয়ে দেওয়া প্রবণতা, গ্রিক ভাষার জন্য করা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আর বলকান এলাকার ভাষাতাত্ত্বিক অনাথদের আবিষ্কার করবেন। তারপর, ব্যবহার-জীর্ণ রাস্তার আরো সামনে আপনাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে লিথুয়ানীয়র প্রাচীন তাঁত, সর্বীয়র নাকউঁচু ভাব, আর বাস্ক-এর হতবুদ্ধিকর রীতি-নীতির কাছে। এবং বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন, ইউরোপের সবচাইতে অবিশ্বাস্য ভাষাবিষয়ক কাহিনিগুলো ব্রিটেনের দোড়গোড়াতে পাওয়া যাবে–দ্বীপটির কেল্টিক আর ভ্রমণকারীদের ভাষায় যা কিনা একই সঙ্গে ভিনদেশি, উদ্ভট, আবার সনাতনীও বটে।

লিঙ্গো-কে একধরনের গাইড বই বলা যেতে পারে, যদিও সেটাকে কোনো অর্থেই বিশ্বকোষ বলা যাবে না : এ বইয়ের কোনো কোনো অধ্যায় যদি হয় বিশেষ বিশেষ ভাষার ছোটোখাটো প্রতিকৃতি, অন্যগুলোতে রয়েছে কোনো ভাষার কোনো স্বতন্ত্র উদ্ভট বৈশিষ্ট্য। বইটাকে আসলে, ফরাসিরা যাকে খুব চমৎকারভাবে বলে, একটা amuse-bouche বা ক্ষুধাবর্ধক হিসেবে রচনা করা হয়েছে।

ভাষা ও তার পরিবার
ইন্দো-ইউরোপীয় আর ফিনো-উগরিক ইউরোপের দুটো বড় ভাষা পরিবার। ফিনো-উগরিক-এর বংশানুক্রম নিতান্তই সোজাসাপটা; সেটার আধুনিক রূপভেদগুলোরও তাই; অর্থাৎ ফিনিশ, হাঙ্গেরীয়, এবং এস্তোনীয়র। কিন্তু ইন্দো-ইউরোপীয়র কুলপরিচয় বেশ জটাজালবিশিষ্ট—জার্মানিক, রোমান্স (Romance), স্লাভিক ভাষাসমূহ, এবং আরো অনেক দূর অব্দি তার বিস্তার। কোনো কোনো দিকে থেকে সেটার গল্প অন্য যেকোনো পারিবারিক ‘সাগা’-র মতো, যেখানে আছে রক্ষণশীল সব কুলপতি (লিথুয়ানীয়), ঝগড়াটে সন্তান-সন্ততি (রোমানশ, Romansh), একেবারে যমজ ভাই বোন (স্লাভিক ভাষাসমূহ), বিস্মৃত জ্ঞাতি ভাই (ওসেতীয়), অনাথ-এতিম (রুমানীয় ও অন্যান্য বল্কান ভাষাগুলো), আর সেই সব শিশু যারা এখনো মাতৃছায়া থেকে বের হতে পারেনি (ফরাসি)।

পাই (PIE)-এর জীবন
(লিথুয়ানীয়)
একদা—তা সে হাজার হাজার বছর আগে (ঠিক কখন তা কেউ বলতে পারে না)—কোনো এক দূরবর্তী ভূখণ্ডে (কেউ জানে না ঠিক কোথায়) ছিল এক ভাষা। সে ভাষায় আজ আর কেউ কথা বলে না। সেটার নামও সবাই ভুলে গেছে। অবশ্য কোনো নাম সেটার আদৌ ছিল কিনা তা-ও কারো জানা নেই। শিশুরা তাদের বাপ-মায়ের কাছ থেকে ভাষাটা শিখত। ঠিক যেমনটা এই সময়ের বাচ্চারা করে। এবং তারা তাদের সন্তান-সন্ততির মুখে ভাষাটা তুলে দিত। এভাবেই চলত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। এত শত শতাব্দীতে ভাষাটির মধ্যে সারাক্ষণই নানান পরিবর্তন ঘটেছে। ব্যাপারটা অনেকটা সেই ঘটনার মতো যেটাকে ‘চীনা ফিসফিসানি’ খেলা বলে : শেষ খেলোয়াড় এমন কিছু শোনে যা প্রথম খেলোয়াড় তার পাশের জনের কানে যা বলেছিল তা থেকে একবারেই ভিন্ন। এক্ষেত্রে অবশ্য শেষ খেলোয়াড়রা হলাম আমরা। অবশ্য কেবল তারাই নয় যারা ইংরেজি ভাষী। যারা ওলন্দাজ ভাষী তারাও, যা কিনা কার্যত একই জিনিস। আর জর্মন—সেটাও এমন কোনো আলাদা নয়। সেই সঙ্গে, হিস্পানি, পোলিশ, ও গ্রিক—খুব ভালো ক’রে দেখলে খেয়াল করবেন এই ভাষাগুলোও খানিকটা ইংরেজির মতো। আরো দূরে আছে আর্মেনীয়, কুর্দিশ এবং নেপালীয়, যাদের পারিবারিক যোগসূত্র বা সাদৃশ্য খুঁজে পেতে বেশ খানিকটা করসরত করতে হবে। কিন্তু এদের প্রত্যেকটিই এমন একটি ভাষা থেকে উদ্ভূত যে ভাষায় নাম-না-জানা এক জনগোষ্ঠী কথা বলত; সম্ভবত ষাট শতক আগে। আর যেহেতু তাদের ভাষার নাম আমরা কেউ জানি না, সেটার জন্য একটা নাম উদ্ভাবন করা হয়েছে : পাই PIE (Proto-Indo-European, আদি ইন্দো-ইউরোপীয়)…

নামটাকে অবশ্য নিখুঁত বা সঠিক বলা যায় না। শব্দটা এ-কথাই বোঝায় যে এই ভাষার আগে অন্য কোনো ভাষা ছিল না। কিন্তু তা তো আর ঠিক নয়। আবার, ইন্দো-ইউরোপীয় বললে এমন একটি ভাষা-অঞ্চল বোঝায় যা কেবল ভারত আর ইউরোপজুড়েই বিস্তৃত ছিল। কিন্তু সত্যি বলতে, উত্তর আর দক্ষিণ মহাদেশের প্রায় প্রত্যেক মানুষ এমন কোনো ভাষায় কথা বলেন যা পাই PIE (Proto-Indo-European) থেকে এসেছে। ওদিকে, ভারতে বিশ কোটির বেশি মানুষ এমন কিছু ভাষায় কথা বলেন যার সঙ্গে পাই-এর আদৌ কোনো ঐতিহাসিক যোগসূত্র নেই। সেই সঙ্গে একথাও বলতে হয়, ইউরোপীয়দের ৯৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় কথা বলেন, অর্থাৎ, এমন কোনো ভাষায় যা পাই থেকে এসেছে।

পাই (PIE) আর সেই ভাষা ব্যবহারকারীরা সময়ের কুয়াশাবৃত। কিন্তু ভাষাতাত্ত্বিকরা সেই কুয়াশা দূর করার জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন—পাই (PIE) কেমন শোনাতো তা ভাষাটির উত্তরসুরিগুলোর ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণ করার মাধ্যমে। লাতিন, গ্রিক ও সংস্কৃতের মতো প্রাচীন ভাষায় লেখা পুরানো দলিলপত্র এক্ষেত্রে বেশ কাজের। তবে চতুর্থ শতকের আইরিশ ওগাম (ogham) উৎকীর্ণ লিপি আর নবম শতকের দিকে প্রাচীন ইংরেজিতে রচিত বেউলফ থেকে শুরু ক’রে আলবেনীয় ভাষার প্রথম দিকের কিছু লিখিত নমুনার ধ্বংসাবশেষ এবং এমনকি আধুনিক লিথুয়ানীয় উপভাষাগুলোর মতো আরো সাম্প্রতিক উৎসগুলোরও এ-ব্যাপারে একটি ভূমিকা আছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, tongue বা জিহ্বা-র পাই (PIE) শব্দটি কী ছিল তা বের করার জন্য ভাষাতাত্ত্বিকরা লক্ষ করেন পরবর্তী কালের এই ভাষাগুলো tongue বোঝাতে কোন কোন শব্দ ব্যবহার করেন : যেমন, lezu (আর্মেনীয়), liežuvis (লিথুয়ানীয়), tengae (প্রাচীন আইরিশ), tunga (সুইডিশ), dingua (প্রাচীন লাতিন), gjuhë (আলবেনীয়), käntu (তোকারীয় এ), jezykû (প্রাচীন স্লাভিক), jihva (সংস্কৃত)। প্রথমে শব্দগুলোর মধ্যে তেমন কোনো মিল নজরে পড়ে না বললেই চলে। কিন্তু একটা পদ্ধতি বা নিয়ম মেনে যদি এ-ধরনের বেশ কয়েকটি শব্দের সিরিজ তুলনা করা হয় তখন সব ধরনের ছাদ বা প্যাটার্ন বেরিয়ে আসে। ধীরে ধীরে এটা পরিষ্কার হয়ে আসে যে ‘ক’ ভাষাটি হয়তো পাই শব্দগুলোকে একটি বিশেষ রকমে বা সঙ্গতিপূর্ণভাবে বদলে (বা, ইচ্ছে হলে বলতে পারেন ‘বিকৃত’ ক’রে) ফেলেছে; আবার অন্যদিকে, ‘খ’ ভাষাটি সেগুলোকে সঙ্গতিপূর্ণভাবে কিন্তু আরেক রকমে বদলে দিয়েছে। একবার এই প্রক্রিয়াগুলোকে শনাক্ত ক’রে ফেললে আপনি আদি বা আসল শব্দটার কাছে ফিরে যেতে পারবেন।

এ-ধরনের গোয়েন্দাগিরির ফলে প্রচুর তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তার ফলাফল অ-ভাষাতাত্ত্বিকদের জন্য খুব একটা সুখকর নয়, আলোকসম্পাতী নয়। দেখা গেছে, ‘জিহ্বা’ (tongue) শব্দটি ‘পাই’ (PIE) ভাষায় ছিল *dngwéhs। এখানে তারকাচিহ্নটি ‍দিয়ে বোঝানো হয়েছে যে শব্দটি পরবর্তীকালে আসা ভাষাগুলোর সাহায্যে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যান্য হরফ দিয়ে একটি ধ্বনি বোঝানো হয়েছে, কিন্তু কোন ধ্বনি তা কেবল ভাষাবিশারদরাই জানেন (কিন্তু এমনকি তাঁদের কাছেও কিছু কিছু ধ্বনি ধোঁয়াশাই রয়ে গেছে)। সংক্ষেপে বললে, ফলাফলটা বরং বিমূর্ত, এবং অনায়াসে বোধগম্য কিছু নয়।

আমাদের সেই সুদূরপারের পূর্বপুরুষদের ভাষা এবং আমাদের ভাষার মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান তার মধ্যে কি সেতু বাঁধা সম্ভব? ‘পাই’ (PIE)-কে কি আমরা আরো প্রবেশসাধ্য বা অভিগম্য করতে পারি না, সে-ভাষায় যাঁরা কথা বলতেন তাঁদেরকে কি আরো মানবোচিত ক’রে তুলতে পারি না? আমরা কি সেই ভাষা আর সেই সব মানুষের মধ্যে প্রাণসঞ্চার করতে পারি না? এর উত্তর হচ্ছে, পারি, খানিকটা হলেও। এবং কাজটা করার একটি উত্তম তথা উপযুক্ত স্থান হচ্ছে লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াস।

ভিলনিয়াস হচ্ছে ভাষাতাত্ত্বিক মারিজা গিমবুতাস (১৯২১-১৯৯৪)-এর জন্মস্থান। গত শতাব্দীর পাঁচের দশকে তিনি তথাকথিত ‘কুরগান হাইপোথিসিস বা তত্ত্বপ্রকল্প’ হাজির করেন। আর সেই তত্ত্বপ্রকল্প অনুযায়ী ‘পাই’ ভাষীদের বাসস্থান ছিল, ৩৭০০ খৃষ্ট পূর্বাব্দে, কৃষ্ণ ও কাস্পিয়ান সাগরের উত্তরের বিপুল বিস্তৃত স্তেপ অঞ্চলে (আজকের ইউক্রেইন ও দক্ষিণ রাশিয়ায়)। ‘কুরগান’ একটি তুর্কী শব্দ, যার মানে সমাধিস্তূপ। এই এলাকার সবখানে কবরের ওপর যে মাটির ঢিবি দেখা যায় সেগুলোকেই কুরগান বলে। গিমবুতাস বলতে চাইলেন, যে-সংস্কৃতি এসব ঢিবির কিছু কিছু তৈরি করেছে সেটাই ছিল ‘পাই’ ভাষার উৎস। ঘোড়াকে বশ মানানোর মতো, এমনকি অশ্বশকট বা রথ চালানোর মতো যথেষ্ট উন্নত ছিল এই সংস্কৃতি। যদিও ভদ্রমহিলার এইতত্ত্ব অবিসংবাদিত নয়, কিন্তু সেটার সারকথা ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়েছে।

এবং আপনি যদি ‘পাই’-এর সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ হতে চান তাহলে ভিলনিয়াস আপনার জন্য সেরা গন্তব্য। কারণ, পৃথিবীতে এখন যেসব ভাষা ব্যবহৃত হয় তার মধ্যে লিথুয়ানীয় ভাষার সঙ্গে ‘পাই’-এর সাদৃশ্য সবচাইতে বেশি। এই সময়ের লিথুয়ানীয়রা হয়তো সেই আদ্দিকালের ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় আপনার সঙ্গে খোশগল্প করতে পারবেন না, কিন্তু একজন গ্রিক বা নেপালির চাইতে অনেক দ্রুত তারা ভাষাটাকে আত্মস্থ করতে পারবে, ব্রিটিশরা যা একেবারেই পারবে না। কারণ, আগেই বলা হয়েছে, লিথুয়ানীয়র সঙ্গে ‘পাই’-এর প্রচুর মিল।

এই যেমন, ‘son’ বা ‘পুত্র’ লিথুয়িানীয় ভাষায় ‘sunus’, ‘পাই’ ভাষায় ‘suhnus’। ‘পাই’-এ ‘Esmi’ মানে ‘I am’ ‘আমি হই’। কিছু লিথুয়ানীয় উপভাষাতেও তাই (যদিও ভিলনিয়াসের আধুনিক প্রমিত বা মান ভাষা একই অর্থ বোঝাতে ‘esu’ ব্যবহার করে)। লিথুয়ানীয় ভাষাতে ‘পাই’-এর অনেক শব্দের ধ্বনি বজায় রয়েছে, যদিও অন্যান্য ভাষায় তা থাকেনি, বদলে গেছে। এবং ইংরেজি ভাষায় সে-বদল এত জোরালো বা আকস্মিক যে সেটা ‘গ্রেট ভাওয়েল শিফট’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। যেমন, ‘five’ শব্দটার কথাই ধরুন। ইংরেজি শব্দটা আর সেটার সমার্থক লিথুয়ানীয় ‘penki’, এই দুটোই ‘পাই’ ভাষার *penke থেকে এসেছে (আমাদের নিশ্চয়ই বাংলা পঞ্চ বা পাঁচ-এর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে)। কিন্তু একজন ভাষা বিশারদ ছাড়া কারো পক্ষেই বোধহয় *penke আর ইংরেজি ‘five’-এর মধ্যে কোনো মিল খুঁজে পাওয়ার কথা নয়, যদিও লিথুয়ানীয় শব্দটার সঙ্গে সে সাদৃশ্য যে-কেউ দেখতে পাবেন।

সম্ভবত, লিথুয়ানীয় আর ‘পাই’-এর মধ্যে ব্যাকরণগত সাদৃশ্যগুলো আরো আকর্ষণীয়। পাই-এর আটটা কেস বা কারক ছিল। লিথুয়ানীয়তে এখনো সাতটি রয়েছে। অন্য কিছু ভাষাতেও সাতটি, যেমন পোলিশে, কিন্তু একমাত্র লিথুয়ানীয়তেই কারকগুলো অনেকটাই ‘পাই’-এর কারকগুলোর মতো শোনায়। একইভাবে, ‘পাই’-এর মতো কিছু লিথুয়ানীয় উপভাষাতে যে কেবল রেগিউলার একবচন আর বহুবচন আছে তা নয়, বরং একটি একটি বিশেষ ‘dual’-ও আছে : নির্দিষ্ট ক’রে দুটো জিনিস বোঝানোর বহুবচন, বাংলায় যাকে বলে দ্বিবচন। আধুনিক ইন্দো-ইয়োরোপীয় ভাষাগুলোর মধ্যে এটা দেখা যায় না, কেবল স্লোভেনে (Slovene) ভাষাই এক প্রধান ও গর্বিত ব্যতিক্রম।

ক্রিয়ার ধাতুরূপ করা (verb conjugation), পদান্বয় (syntax), ঝোঁকের ছাঁদ (emphasis pattern), বিভক্তি ও প্রত্যয় বা অভিযোজন (suffix)—লিথুয়ানীয়র এসব বহু বৈশিষ্ট্য সাক্ষ্য দেয় যে ভাষাটির উৎস ‘পাই’। এর সবগুলোই দুশো প্রজন্ম ধ‘রে টিকে আছে, এবং তেমন কোনো পরিবর্তন ছাড়াই। কাজেই, লিথুয়ানীয়দেরকে ‘চাইনিজ হুইসপার্স’ খেলার অবিসংবাদিত ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন বলা যেতেই পারে।

লেখক পরিচিতি
গাস্তঁ দোরেন একজন ভাষাতাত্ত্বিক, সাংবাদিক এবং বহুভাষাবিদ। তিনি ওলন্দাজ, লিম্বার্গিশ, ইংরেজি, জর্মন, ফরাসি, এবং হিস্পানিতে কথা বলতে পারেন, পড়তে পারেন আফ্রিকানস, ফ্রিসীয়, পর্তুগিজ, ইতালীয়, কাতালান, ডেনিশ, নরওয়েজীয়, সুইডিশ এবং লুক্সেমবুর্গিশ। ওলন্দাজ ভাষায় তিনি দুটো গ্রন্থ রচনা করেছেন—অভিবাসীদের ভাষা নিয়ে রচিত Nieuwe tongen (New Tongues), এবং Taaltoerisme (Language Tourism), যে-বইয়ের ওপর ভিত্তি ক’রে Lingo : A Language Spotter’s Guide to Europe ইংরেজিতে রচিত হয়েছে; এবং Language Lover’s Guide to Europe নামের একটি অ্যাপ। লেখার অবসরে তিনি গান গাইতে পছন্দ করেন, এবং অবশ্যই তা বহু ভাষায়। নেদারল্যান্ডের আমার্সফুর্ট-এ তিনি সস্ত্রীক বাস করেন।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

শেকড়ে ও সত্তায় শাহাবুদ্দিন

শেকড়ে ও সত্তায় শাহাবুদ্দিন

শেকড়ে ও সত্তায় শাহাবুদ্দিন

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:১৩

শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ ১৯৫০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস নরসিংদী জেলায় হলেও জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকাতেই। জীবনের ধাপে ধাপে শিল্পী নিজেকে নির্মাণ করেছেন প্রতিকূল অবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে, শিল্পকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়। কখনো দেশের প্রয়োজনে নিজেকে নির্ভীক যোদ্ধা হিসেবে প্রমাণ করা হোক আবার কখনো-বা শিল্পের অর্জন দিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দেওয়া হোক, এর সবটাই তিনি করেছেন দেশাত্মবোধ থেকে, দেশ ও শিল্পের প্রতি দায় থেকে। 
          শিল্পী শাহাবুদ্দিন সম্পর্কে যেকোনো আলাপে অবধারিতভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে বাঙালির গৌরবগাথাঁ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট। একজন শিল্পী, যোদ্ধা এবং শিল্পকর্মের বিষয়—একাকার হয়ে যাওয়া; একটি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জনের প্রতীকে রূপান্তরিত হওয়া, ব্যক্তি মানুষের জন্য এ প্রায় অসম্ভব এক অর্জন। শিল্পী শাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে এই ঘটনা বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। ইতিহাসের বাঁক বদলের সময় হয়তো সময়ের নিজস্ব প্রয়োজনেই এমন কিংবদন্তির জন্ম হয়। তা না হলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমাদের প্রধান শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি ক্রিয়াশীল থাকার পরেও শিল্পীদের মধ্যে থেকে শাহাবুদ্দিনের মতো আর তেমন কাউকে কেন পাওয়া গেল না! মুক্তিযুদ্ধের ছবি অনেকেই হয়তো এঁকেছেন, যুদ্ধের নানাবিধ প্রেক্ষাপটকে বিভিন্নভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন আমাদের অনেক শিল্পী, কিন্তু শাহাবুদ্দিনের ছবি, শিল্পী স্বয়ং আর মুক্তিযুদ্ধ যেমন করে পরস্পরের ভেতরে বিলীন হয়ে যায় তেমন করে আর কিছুই হয়নি। 
          মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও কুতার্কিকের অভাব হয় না, বাঙালির এই অর্জনকে মৃত ইতিহাস আখ্যা দিয়ে সামনের দিকে চোখ ফেরানোর তথাকথিত প্রগতিশীলতা বাঙালিকে শুধু বিভ্রান্ত করার ক্ষমতাই রাখে। তবে ভবিষ্যৎকে অতীতের ভিত্তির ওপরেই দাঁড়াতে হয়। গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের বাইরে গিয়ে নতুন নতুন ডিসকোর্স তৈরি করা যায়, কিন্তু সেই ক্রিয়েটিভ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সন্দেহ পোষণ করা সাধারণ দায়িত্বশীলতার অংশ। কারণ সময়ের প্রয়োজনে গড়ে ওঠা এক মনোভঙ্গি, সেই সময়ের তারুণ্যের মধ্যকার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া—বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করাই বরং দায়িত্বশীলতার আচরণ। ব্যতিক্রমের নামে আলাদা হওয়ার উদগ্র বাসনায় অথবা কোনো পরিকল্পিত বিতর্ক তৈরির মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণের মোহে পাশ্চাত্যের কিছু বাতিল থিওরি ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বাড়ছে প্রতিনিয়ত। বাঙালির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনকে বিতর্কিত করার প্রচেষ্টা এখন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে জোড়ালো। 
          কিন্তু শিল্পী শাহাবুদ্দিনের কাজের আলোচনায় সাব-টেক্সট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অবশ্যই এর ইমপ্যাক্টকে বিবেচনায় নিতে হবে। তার কাজ শুধু গতির ক্ষিপ্রতা নয় অথবা শুধু মুক্তিযুদ্ধও নয়; শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ক্ষুধাপীড়িত মানুষ যখন সুলতানের ক্যানভাসে দৃঢ় পদক্ষেপে উঠে দাঁড়াল সেখান থেকেই শাহাবুদ্দিন তাদের দিয়ে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফেললেন। আরাধ্য মুক্তিকে অপ্রতিরোধ্য গতির সাথে মিলিয়ে দিয়ে তিনি গোটা মানুষকেই শক্তিতে রূপান্তরিত করলেন। 
          শাহাবুদ্দিন শিল্পী নন, তিনি আমাদের চেতনার জড়তাকে কাটিয়ে তোলার মন্ত্র পড়তে থাকা নিবেদিত প্রাণ ওঝা, আমরা একদল বিবশ বাঙালি কুঁড়েমির গালি খেতে খেতে যখন সত্যিই অথর্ব হয়ে যাচ্ছিলাম তখন অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় আমাদের শূন্যে ছুড়ে দিলেন তিনি; বর্শার ফলার মতো ধারাল দেহে আমরা ফিরে পেলাম ঝকঝকে আত্মার উদ্ভাসিত সম্ভাবনা। হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো-তাম্রলিপি মহাস্থানগড়-উয়ারি-বটেশ্বর-ভিতরগড়ের সুসভ্য মানুষ যেন দলে দলে উঠে এসেছে শাহাবুদ্দিনের ক্যানভাসে। এখানে বাঙালির চিরন্তন সাদাসিধে চেহারাটি সময়ের প্রয়োজনে আমূল বদলে যাওয়া। মালকোচা দেওয়া লুঙ্গি পরা উদোম শরীরে এদেশের চিরায়ত মানুষগুলো মুহূর্তেই ভয়ংকর চিতার মতো ফুঁসে উঠতে পারে। মাৎসন্যায়-কৈবর্ত বিদ্রোহ-ফকির সন্ন্যাসী-সিপাহী বিদ্রোহ-সাঁওতাল তেভাগা-তিতুমীরের অজস্র উদাহরণ ছড়িয়ে আছে বাংলার আনাচে কানাচে। এদের প্রত্যেকেই শাহাবুদ্দিনের ক্যানভাসে ক্ষিপ্র-যুদ্ধ-তীব্রগতির পুঞ্জীভূত প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে। এদের সাধারণ নাম মুক্তিযোদ্ধা। যারা সর্বশেষ ১৯৭১ সালে বর্বর পাক বাহিনীকে চূড়ান্ত পরাজয় বরণে বাধ্য করেছিল।
          শাহাবুদ্দিন আহমেদের পেইন্টিং মুক্তিযুদ্ধে সঞ্চয় করা সেই অদম্য শক্তিকে শিল্পী শাহাবুদ্দিন ঢেলে দেন তার ক্যানভাসে, ফুটিয়ে তোলেন বীরত্ব, মানব ইতিহাসের সাহসনামা। স্বাধীনতা পদক, নাইট (ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক) সহ আরো অনেক দেশি বিদেশি কিংবা আন্তর্জাতিক পদক প্রাপ্ত এই শিল্পী কাজ করে চলছেন নিজের আপোষহীন বিবেকের সাথে। সমসাময়িক গৎবাঁধা নিয়মে যখন শিল্পীর দম বন্ধ হয়ে পড়ে, তখনই তিনি খুঁজে পান নিজস্বত্তাকে, নিজের শেকড়কে। বলিষ্ঠ তুলির আঁচড়ে—করে যাচ্ছেন সেটাকে সংজ্ঞায়িত। প্রতিবারই সেটা হাজির হয়েছে আরো স্পষ্ট আর শক্তিশালী রূপে। এ যেন নিজেই নিজেকে ছাপিয়ে যাবার যুদ্ধ, নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বি। তার তুলিতে ধরা দেয় সময়, দায়িত্ববোধের গতি কিংবা প্রকৃতির অনন্য উদাহরণ মানুষ। প্রতিকৃতিতে এ পর্যন্ত তার ক্যানভাসে ভেসে উঠেছে বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মহাত্মা গান্ধী কিংবা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো শক্তিশালী চরিত্র, যেগুলো তার ক্যানভাসে প্রতিবারই ফিরে এসেছে পূর্ব অপেক্ষা আরো বেশি শক্তিশালী বক্তব্য নিয়ে। যদিও একটি প্রশ্ন থেকেই যায় তিনি এই একই বিষয়বস্তুর মধ্যে কতটা একঘেঁয়ে হয়ে উঠেছেন! এর উত্তরের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছু দশক। তবে সম্ভবত তিনি রচনা করে চলেছেন বাংলাদেশের সবচেয়ে গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের এক সুদীর্ঘ উপন্যাসের এক একটি বিরচিত অধ্যায়। সুতরাং, কাজের পারম্পর্য রক্ষার দায় এখানে রয়েছে।                 
          বাংলাদেশের শিল্পচর্চার ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়, এই পঞ্চাশ বছরের মধ্যে আমাদের জাতীয় জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশের শিল্পভাষায় এই ঘটনার প্রবল উপস্থিতি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে অনাদিকাল পর্যন্ত বলে যাবে মুক্তিযুদ্ধের শিল্পিত ইতিহাস। শিল্পী শাহাবুদ্দিনের দীর্ঘ কয়েক দশকের প্রবাস জীবন তার শিল্পকর্মে বাঙালির সংগ্রামী ইতিহাস থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারেনি। তিনি স্বাধীন বাংলার জন্ম স্লোগান ‘জয়বাংলা’র মন্ত্রে উজ্জীবিত বাঙালি, শক্তির ধারক হয়ে শিল্পকর্মে উপস্থাপন করে চলেছেন বীরগাঁথা। পাশ্চাত্যের প্রেক্ষিতে আধুনিকতা শিল্পী শাহাবুদ্দিনের মনে আঁচড় কাটতে পারেনি। ক্যানভাসে তার ব্রাশের শক্তিশালী আঁচড় ক্ষিপ্র গতি আর রঙের ঔজ্জ্বল্য অবয়বধর্মী আর ফিগারেটিভ নিরীক্ষায় ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। বলিষ্ঠ পদচিহ্ন, উত্তোলিত দৃঢ় বাহু, বিজয়ের পতাকা হাতে ছুটে চলা অনেক সময় বিমূর্ততার প্রতিভাস নির্মাণ করে। অভিজ্ঞতার এক দুর্লভ সময়কে তিনি আমাদের সামনে বিবৃত করে চলেছেন। সময়কে বেঁধে চলেছেন শক্তির সাথে, যেখানে পূর্ণতা পায় বোধ ও বুদ্ধির স্বাধীনতা।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

শেকড়ে ও সত্তায় শাহাবুদ্দিন

শেকড়ে ও সত্তায় শাহাবুদ্দিন

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—দুইসাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

শহীদুল জহিরের ঘর

শহীদুল জহিরের ঘর

মিলনের জন্য লেখা

মিলনের জন্য লেখা

আমার সুনীল

আমার সুনীল

তাঁর যেটুকু জল আঁজলা ভরে রেখেছি

আবদুল মান্নান সৈয়দতাঁর যেটুকু জল আঁজলা ভরে রেখেছি

সর্বশেষ

কাবুলে রকেট হামলা

কাবুলে রকেট হামলা

ছিনতাইকারীকে ধরতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে আহত দিনমজুরের মৃত্যু

ছিনতাইকারীকে ধরতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে আহত দিনমজুরের মৃত্যু

ইভ্যালিতে প্রতারিতরা কি টাকা ফেরত পাবেন?

ইভ্যালিতে প্রতারিতরা কি টাকা ফেরত পাবেন?

এক দশক পর ভেলভেট উইংস (ভিডিও)

এক দশক পর ভেলভেট উইংস (ভিডিও)

নেতাদের ‘চিন্তা বিনিময়’ থেকে কতটা ‘শিক্ষা’ নেবে বিএনপি?

৩ দিনব্যাপী বৈঠক অনুষ্ঠিতনেতাদের ‘চিন্তা বিনিময়’ থেকে কতটা ‘শিক্ষা’ নেবে বিএনপি?

© 2021 Bangla Tribune