X
মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৩ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

কারখানার আগুনের দায় তাহলে কার?

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২১, ১৭:১৯

আনিস আলমগীর ঢাকার কাছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সেজান জুসের কারাখানায় গত ৮ জুলাই এক অগ্নিকাণ্ডে ৫২ জন শ্রমিক নিহত হয়েছে। এটি সজীব গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান, হাসেম ফুডস। পত্রিকায় এর ফলোআপ রিপোর্ট আমার খুব চোখে পড়ছে না। তবে তাৎক্ষণিক চমকদার খবর হচ্ছে, ভয়াবহ এ ঘটনার পর গ্রেফতার হয়ে রিমান্ডে গিয়েছেন সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল হাসেম, তার চার ছেলে হাসীব বিন হাসেম, তারেক ইব্রাহীম, তাওসীব ইব্রাহীম ও তানজীম ইব্রাহীম। এছাড়া গ্রুপটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শাহান শাহ আজাদ, উপ-মহাব্যবস্থাপক মামুনুর রশিদ ও প্রকৌশলী মো. আলাউদ্দিনও গ্রেফতার হয়ে পুলিশ রিমান্ডে রয়েছেন।

বড়লোকদের রিমান্ডে নিয়েছে শুনতে ভালোই লাগে, কিন্তু তাদের গ্রেফতার আর জেলে যাওয়ার ঘটনা কেমন হয়– অতি সম্প্রতি ডেসটিনি মালিকের হাসপাতালের প্রিজন সেলে বসে জুম মিটিং করার মধ্য দিয়ে জাতি নতুন করে জেনেছে।

আগুন আমাদের ‘হামেশা’ই লাগছে- পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গুদাম আর গার্মেন্টস শিরোনাম হয় বেশি। আর লোকজনের ধারণা হয়েছে কারখানা থাকলে আগুন লাগতেই পারে। কিন্তু বিদেশে কারখানায় আগুন লাগলে তার দায় মালিককে নিতে হয়। কারখানা হলেই সেখানে আগুন লাগে না। তাহলে আমাদের লাগে কেন? লাগে কারণ আমাদের এখানে কারখানার যে আইন আছে তা কাগজে-কলমে। আগুনের দায়ে ভবন মালিকরা সাজা পান না। বনানীর ফারুক রূপায়ণ টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায়, কিংবা তাজরিন গার্মেন্টস অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মালিকরা সাজা পাননি।

২০১২ সালে সাভারের তাজরিন গার্মেন্টস অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক শ্রমিক প্রাণ হারায়। মোট ১১৭ জন পোশাক শ্রমিক নিহত হয় ও ২০০ জনের অধিক আহত হয়। ভয়ানক এই দুর্ঘটনায় ওই পোশাক কারখানার নয়তলা ভবনের ছয়তলা ভস্মীভূত হয়ে যায়। সরাসরি আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান ১০১ জন পোশাক শ্রমিক ও আগুন থেকে রেহাই পেতে ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে মৃত্যু হয় আরও ১০ জনের। ২৭ নভেম্বর ২০১২, মঙ্গলবার বাংলাদেশে শোক দিবস পালিত হয়।

এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে কারখানায় সবচেয়ে মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের কারণে আগুন লেগেছিল বলে ধারণা করা হয়, কিন্তু সংসদের এক আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘এটি কোনও দুর্ঘটনা নয়, এ ঘটনা পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে।’ এই ঘটনা ও পরে অনুরূপ কিছু ঘটনার পর বাংলাদেশের শ্রমিক অধিকার ও নিরাপত্তা আইনগুলোতে বেশ কিছু সংস্কার এসেছে। কারখানার মান উন্নয়নে অনেক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে– ‍কিন্তু বিচারহীনতার দায় থেকে রাষ্ট্র এখনও রেহাই পায়নি।

দুঃখজনক হলেও তাজরিনের ঘটনার বিচার আজও হয়নি। মালিককে দায়ী করে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল কিন্তু পুলিশের খাতায় মালিক এখনও পলাতক। গত বছর তাজরিন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ৪০ জনের মতো শ্রমিক ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দাবিতে ঢাকায় প্রেসক্লাবের সামনে ফুটপাতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। এরা বেশিরভাগই ছিলেন নারী। সেখানে রাতে ফুটপাতেই প্লাস্টিক পেতে ঘুমানো ও খাওয়া দাওয়াও করছিলেন। কিন্তু ৮০ দিনের মাথায় ডিসেম্বরে প্রথম সপ্তাহে ভোর রাতে পুলিশের পিটুনির মধ্য দিয়ে তাদের কর্মসূচি শেষ হয়।

রূপগঞ্জে অগ্নিকাণ্ডেও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা, মৃতদের স্বজনরাও হয়তো পিটুনির শিকার হবেন- বিচার আর পাওনা চাইতে গেলে।

এখন পর্যন্ত ৫২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবুল হাসেম বলেছেন, ‘জীবনে বড় ভুল করেছি ইন্ডাস্ট্রি করে। ইন্ডাস্ট্রি করলে শ্রমিক থাকবে। শ্রমিক থাকলে কাজ হবে। কাজ হলে আগুন লাগতেই পারে। এর দায় কি আমার?’ গ্রেফতার হওয়ার আগে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি তো আর গিয়ে আগুন লাগিয়ে দেইনি। অথবা আমার কোনও ম্যানেজার আগুন লাগায়নি।’

বাহ কী অদ্ভূত যুক্তি! দায়টা তাহলে কার? শ্রমিকদের? যাদের তিনি বন্দি করে রেখেছিলেন গেটের তালা মেরে। শ্রমিক এবং তাদের স্বজন ছাড়াও দমকল বাহিনীর সূত্রে বলা হচ্ছে, আগুন লাগা কারখানা ভবনের চারতলায় ছাদে ওঠার সিঁড়ির মুখের দরজাটি তালাবদ্ধ থাকায় অনেক মানুষ ছাদে উঠে প্রাণরক্ষা করতে পারেননি। কারখানাটির ভবনের চারতলায় তালাবদ্ধ থাকায় এবং অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র না থাকার যে অভিযোগ করেছে ফায়ার সার্ভিস এবং স্থানীয় প্রশাসন, সে ব্যাপারে সজীব গ্রুপের মালিক এম. এ. হাসেমের বক্তব্য নেই। তবে সবকিছু মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন তাদের এক কর্মকর্তা।

আগুন লাগার কারণ হিসেবে কারখানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হচ্ছে, ‘যেহেতু নিচের তলায় কার্টন রাখা ছিল এবং বিভিন্ন ধরনের দাহ্য পদার্থ ছিল, তাই হয়তো আগুনের এই ভয়াবহতা। নিচের তলার কার্টন থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে। ওপরের তলাগুলোতে বিভিন্ন মেশিন ও যন্ত্রপাতি ছিল। যেহেতু খাবারের আইটেম তৈরি হয়, তাই বহু ধরনের দাহ্য পদার্থ ছিল। সেটা হয়তো আগুনের ব্যাপকতা বাড়িয়েছে।’

খাবারের আইটেম তৈরি হয় বলে দাহ্য পদার্থ থাকবে শুধু! জুসের কারখানায় অদাহ্য থাকার কথাতো বেশি। নিচে আগুন বলে নামতে পারছে না। উপরে যাওয়ার গেইট বন্ধ। তাহলে মৃত্যুই কি পাওনা শ্রমিকদের!

যাক, হাসেম সাহেব যে কারখানা করে ভুল করেননি সেটা তার ব্যাংক ঋণ ভাগ্য দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, খুব অল্পদিনেই ব্যাংক ঋণে ফুলেফেঁপে ওঠেছে সজীব গ্রুপ। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে তার ঋণের পরিমাণ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। বণিকবার্তা লিখেছে, ‘পাকিস্তানের সেজান জুস আমদানির মাধ্যমে ব্যবসায় হাতেখড়ি আবুল হাসেমের। পরবর্তী সময়ে এ তালিকায় যোগ হয় নসিলা, কুলসনসহ বিভিন্ন পাকিস্তানি ব্র্যান্ডের খাদ্যপণ্য। নব্বইয়ের দশকে ব্যবসায় শুরুর পর আবুল হাসেমের বাণিজ্যিক পরিধি ছিল মূলত ট্রেডিং নির্ভর। এক দশক আগে সজীব গ্রুপের ব্যাংক ঋণের আকার ছিল ৫০০ কোটি টাকারও কম। কিন্তু গত এক দশকে গ্রুপটির ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকায়।’

দেশের অন্তত এক ডজন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গিয়েছে শিল্প গ্রুপটি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মে মাসে সজীব গ্রুপের ১১টি কোম্পানির নামে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ৯৯৩ কোটি টাকা ঋণ ছিল হাসেম ফুডস লিমিটেডের। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় উৎপাদন হতো ‘সেজান জুস’। যেখানে আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়েছে অর্ধশতাধিক মানুষ।

সবচেয়ে বেশি যে প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন তার শ্রমিকরা বকেয়া বেতনের জন্য কয়েকদিন আগে রাস্তা অবরোধ করেছেন। মাত্র দুটি সিঁড়ি সেই কারখানার, থাকার কথা অন্তত ৬টি। নিয়োজিত ছিল শিশু শ্রমিক। ভবনটিতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র না থাকা থেকে শুরু করে কারখানার লাইসেন্স- সব কিছুতে গরমিলের খবর বের হচ্ছে এখন। হয়তো লাশপ্রতি লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে কিন্তু এতগুলো প্রাণ যে ঝরে গেলো এর দায়দায়িত্ব কে নেবে? হাসেম সাহেব তো বলেই দিয়েছেন, এর দায় কি আমার? আমি তো আর গিয়ে আগুন লাগিয়ে দেইনি। অথবা আমার কোনও ম্যানেজার আগুন লাগায়নি।’

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত। [email protected]

/এসএএস/

সম্পর্কিত

রাজনৈতিক দলের বিদেশি ‘দোকান’ বন্ধ হোক

রাজনৈতিক দলের বিদেশি ‘দোকান’ বন্ধ হোক

দায় এড়াতে পারবে না নতুন তালেবান

দায় এড়াতে পারবে না নতুন তালেবান

ই-কমার্স প্রতারণা থামানোর উপায়

ই-কমার্স প্রতারণা থামানোর উপায়

জিয়ার কবর নিয়ে রাজনীতি

জিয়ার কবর নিয়ে রাজনীতি

শেখ হাসিনা: বাংলার ফিনিক্স পাখি

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:১০

আবু আব্বাস ভূঁইয়া তখনও রাতের আঁধার কাটেনি ব্রাসেলসে। ব্রহ্মাণ্ডের কর্কশতম শব্দে যেন বেজে উঠলো টেলিফোন। কুয়াশায় মোড়া সেই শীতভোরের টেলিফোনে এসেছিলো মর্মান্তিক দুঃসংবাদটি। ২৮ বছর বয়সী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তখনও জানতেন না, সব হারিয়ে নিঃস্ব তিনি।

ফোনটা করেছিলেন জার্মানির বন থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। শেখ হাসিনাকে সরাসরি জানাতে চাইলেন না খবরটি। কথা বললেন তার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে। ভীষণ উৎকণ্ঠা নিয়ে পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন শেখ হাসিনা। মন বলছিলো, খুব খারাপ কিছু একটা ঘটেছে। ওয়াজেদ মিয়া ফোন রেখে যখন জানালেন, বাংলাদেশে ক্যু হয়েছে; তখনই ইলেকট্রিক শকের মতো বেদনার শিহরণ ছড়িয়ে পড়ে রক্তশিরায়।

ঠিক ধরেছিলেন তিনি। আর কেউ-ই বেঁচে নেই। মা-বাবা-তিন ভাইসহ পরিবারের কোনও আপনজনই আর নেই তার। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। বাঙালির ইতিহাসে কলংকময় কালো দিন। স্বাধীনতার স্থপতি বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে সপরিবারে হত্যা করে বিপথগামী সেনাদের একটি দল। 

এই দিন থেকে পাল্টে যায় শেখ হাসিনার জীবনের গতিপথ। পিতা-মাতা সহ পরিবারের সবাইকে হারানোর পথ ধরেই শুরু হয় অচেনা যাত্রা। অমানিশার অন্ধকারময় পথে... 

ব্রাসেলসে ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাড়িতে। অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর, ওইদিন রাতে আনুষ্ঠানিক দাওয়াত স্থগিত করেন। একইসঙ্গে দুই কন্যা ও জামাতাকে কোনও ধরনের সাহায্য করতেও অস্বীকার করলেন হক। শেখ হাসিনার বক্তব্যে ‘আমরা যেন উনার জন্য বোঝা হয়ে গিয়েছিলাম’। দ্রুত তাঁদের চলে যেতে বলেন হক পরিবার। যাওয়ার কথা ছিলো, ফ্রান্সের প্যারিস। ফোন বাজার সাড়ে ৪ ঘণ্টা পর বোন শেখ রেহানা আর দুই ছেলে-মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হন জার্মানির বনের উদ্দেশ্যে। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর বাসায় পৌঁছান তাঁরা। দু’বোনই তখন অঝোরে কাঁদছিলেন। চোখ বেয়ে নামছিলো অপার শূন্যতার অশ্রু। 

মাত্র ১০ দিন জার্মানিতে থাকতে পেরেছিলেন শেখ হাসিনা-শেখ রেহানা। মাত্র ২৫ ডলার হাতে নিয়ে এসেছিলেন দুই বোন। রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদের কাছ থেকে হাজার খানেক জার্মান মুদ্রা নিয়ে চলে তাদের ওইদিনগুলো। নিরাপত্তার কথা ভেবে শুরু থেকেই তাঁদেরকে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। এরই ধারাবাহিকতায় কয়েক দফায় জার্মানিতে ভারতীয় দূতাবাসে যোগযোগ করেন ওয়াজেদ মিয়া।

২৪ আগস্ট দুই সন্তান ও বোন রেহানাকে নিয়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে আসেন শেখ হাসিনা ও তার স্বামী ওয়াজেদ মিয়া। গন্তব্য গোপন রেখে শুরু হয় যাত্রা। পরদিন সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে পৌঁছান তারা। সপরিবারে পিতাকে হারানোর মাত্র ১০ দিনের মাথায় যে জীবন শুরু করেছিলেন, কেমন ছিল তার সেই জীবন?

বিমানবন্দরে নামার পর, সেখানেই প্রায় চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় তাদের। দুপুরের দিকে নয়াদিল্লির ডিফেন্স কলোনিতে ছোট্ট একটা বাসায় জায়গা হয় তাদের। বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ, কারও কাছে পরিচয়ও দেওয়া যাবে না, এমনকি দিল্লিতে কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে না– শেখ হাসিনার ছোট্ট পরিবারকে এমন তিন কড়া পরামর্শ দিয়েছিলো ভারত সরকার। এই সময়টায় জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা ও তার স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়াকে নামও বদলে ফেলতে হয়েছিলো।

ভারতে তখন জরুরি অবস্থা চলছিলো। বাংলাদেশ সম্পর্কে তেমন কোনও খবর ছাপা হতো না দেশটির পত্রপত্রিকায়। তাই ভয়ানক দুশ্চিন্তা নিয়ে দিন পার করছিলেন তারা। দু’সপ্তাহ পর গোপনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাৎ পান শেখ হাসিনা। ১৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য জানান গান্ধী। কষ্টের তীব্রতায় নিজেকে ধরে রাখতে পারছিলেন না শেখ হাসিনা।

১৯৭৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে ওই একবারই সাক্ষাৎ হয়েছিলো শেখ হাসিনার। একপর্যায়ে ডিফেন্স কলোনি থেকে ইন্ডিয়া গেটের কাছে পান্ডারা পার্কে নতুন আবাস হয় শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের। নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত ছিল দু’জন।

নামে মাত্র সরকারি খরচে চলতো তাদের দিন। সে বছর দ্বাদশ শ্রেণিতে পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানার। কিন্তু বাংলাদেশের ঘটনাবলীর জন্য বন্ধ হয়ে যায় তাঁর পড়াশোনা। শান্তি নিকেতনে ভর্তির কথা চললেও নিরাপত্তাজনিত কারণে তাও বাতিল হয়। ৭৬-এ শেখ রেহানার বিয়ে হয় লন্ডন প্রবাসী শফিক সিদ্দিকের সঙ্গে।

৭৭-এ ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচনে হেরে গেলে শেখ হাসিনা ও ওয়াজেদ মিয়ার ওপর চাপ বাড়তে থাকে। প্রথমে ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ বিল বন্ধ করে দেওয়া হয়, এরপর তুলে নেওয়া হয় গাড়ির ব্যবস্থাও। বলতে গেলে, তাদেরকে এক প্রকার ভারত ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য বাধ্যই করে নতুন সরকার। ফেরারী জীবন যেন শেষই হচ্ছিলো না আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। স্বামী, ছেলে-মেয়েকে নিয়ে লন্ডনে যান তারা। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এভাবেই ৬ বছর নির্বাসিত-যাযাবরের জীবন কাটান শেখ হাসিনা।

তবে এরই মাঝে শোকের পাথর বুকে বেঁধে নিজেকে তৈরি করতে শুরু করেছিলেন। ১৯৮১ সালের ১৭ মে। স্বজনহারার যন্ত্রণা নিয়ে সবহারা শেখ হাসিনা পা রাখেন পিতার গড়া স্বাধীন বাংলাদেশে। ঢাকা বিমানবন্দরে সেদিন ১৫ লাখেরও বেশি মানুষ তাঁকে স্বাগত জানাতে হাজির হন। নিষ্পেষিত মানুষের হাহাকার কণ্ঠে ধারণ করে, আকাশের দিকে দুই হাত তুলে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও বাংলার মানুষের কাছে বিচার চান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। পনেরো আগস্টের ন্যাক্কারজনক নৃশংসতায় আতংকিত ক্ষুব্ধ বাংলার মানুষ হয়ে ওঠে তাঁর আপনজন। আর এই ভালোবাসাকেই পুঁজি  করে রাজনৈতিক অঙ্গনে  ও সাধারণ মানুষের অন্তরে স্থান করে নেন জননেত্রী।

১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জন্ম শেখ হাসিনার। প্রায় চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত তার রাজনৈতিক কর্মজীবন। ছাত্রজীবনে ছিলেন তুখোড় নেতা। যার প্রমাণ দিয়েছেন ইডেন কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে, সেসময়কার অগ্নিকন্যাখ্যাত মতিয়া চৌধুরীকে হারিয়ে ভিপি নির্বাচিত হয়ে।

১৯৮১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ইডেন হোটেলে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা ঐক্যের প্রতীক হিসেবে সর্বসম্মতিক্রমে দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। তখনও দেশে আসেননি। পরে ১৭ মে বাংলাদেশে এসেই রাজনৈতিক মঞ্চে নিজেকে ও তার দলকে প্রতিষ্ঠিত করার কাজে লেগে যান শেখ হাসিনা। তবে খুব সহজ ছিল না স্বৈরাচারী জিয়া সরকারের যাঁতাকলে পিষ্ট দেশে, স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর জেষ্ঠ্যকন্যা শেখ হাসিনার শুরুর পথচলা। ছুটে গিয়েছিলেন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের রক্তস্নাত বাড়িতে। কিন্তু জিয়াউর রহমানের সরকারের পেটোয়া বাহিনী বঙ্গবন্ধু ভবনে ঢুকতেই দেয়নি। ১৯৮২’র ফেব্রুয়ারিতে ড. ওয়াজেদ মিয়া বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে যোগ দেওয়ায় মহাখালীতে দুই কামরার একটা বাসা বরাদ্দ পান। শেখ হাসিনা সেই ফ্ল্যাটেই স্বামীর সঙ্গে থেকেছেন।

নতুন জীবনে দলকে পুনর্গঠন আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লেন শেখ হাসিনা। সারাদেশে দলকে পুনর্জীবিত করার সংগ্রামে মনোনিবেশ করেন।

জিয়াউর রহমান ও মুশতাক সরকারের কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি এবং জেলহত্যাকারীদের বিচার করার প্রত্যয় ঘোষণা করেন। দালাল আইন বাতিল করে যুদ্ধাপরাধীদের কারাগার ও অভিযোগ থেকে মুক্তি, চিহ্নিত স্বাধীনতা বিরোধীদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তকরণ এবং স্বাধীনতাবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রাজনীতি করার সুযোগদানের বিরুদ্ধে শুরু করেন সংগ্রাম। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট, ঘুষ-দুর্নীতি এবং অবৈধ ক্ষমতা দখল করে রাজনৈতিক দল গড়ে তোলার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধেও দেশবাসীকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।

১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদের ক্ষমতায় আরোহনকে অবৈধ ঘোষণা করে এরশাদ বিরোধী দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলেন শেখ হাসিনা। ১৯৮৩ সালে তিনি পনেরো দলের একটি জোট গঠন করেন। তার নেতৃত্বে দেশজুড়ে এরশাদ বিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠায় ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সামরিক শাসকের নির্দেশে শেখ হাসিনাসহ ৩১ জন নেতা-কর্মীকে শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে সামরিক গোয়েন্দারা চোখ বেঁধে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায় এবং বিনা কারণে একটানা ১৫ দিন আটকে রাখে।

১৯৮৪-এর ফেব্রুয়ারি ও নভেম্বরে তাকে পুনরায় গৃহবন্দি করা হয়। ১৯৮৫-এর মার্চে তাকে ৩ মাস মাস বিনাবিচারে আটক রাখে। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকা সত্ত্বেও ১৯৮৬-এর ১০ নভেম্বর তিনি যখন সচিবালয় অবরোধ কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তখন পুলিশ তাঁর প্রতি গুলিবর্ষণ করে এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গাড়িতে থাকা অবস্থায় ক্রেন দিয়ে সেই গাড়ি তুলে নেওয়ার চেষ্টা চলে। পরদিন ১১ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে ১ মাসের আটকাদেশ দেওয়া হয়। ১৯৮৮-এর ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে হত্যার উদ্দেশে তাঁর গাড়ি বহরে পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। সেদিন বঙ্গবন্ধুকন্যাকে রক্ষায় প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মী প্রাণ বিসর্জন দেন। ১৯৮৯-এর ১১ আগস্ট রাত ১২টার দিকে ফ্রিডম পার্টির একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবনে হামলা চালায়। বঙ্গবন্ধু কন্যা ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তখন সেখানে ছিলেন। হামলাকারীরা ৭/৮ মিনিট ধরে বঙ্গবন্ধু ভবন লক্ষ্য করে গুলি চালায় ও গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। তবে সেটি বিস্ফোরিত হয় নাই। ১৯৯০-এর ২৭ নভেম্বর স্বৈরাচারী সরকারের জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধু ভবনে অন্তরীণ করা হয়। অবশ্য প্রবল গণরোষের ভয়ে সামরিক সরকার ওইদিনই তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

এরপর আসে- জিয়াউর রহমানের পরম্পরার রাজনীতি নিয়ে খালেদা জিয়ার সরকার। শুরু হয় এবার জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার একের পর এক চেষ্টা। ১৯৯১ এর ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গ্রিনরোডে উপনির্বাচনে ভোটের পরিস্থিতি দেখতে গেলে বিএনপি’র কর্মীরা গুলিবর্ষণ ও বোমা বিস্ফোরণ করে। ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৪ তারিখে ঈশ্বরদী ও নাটোর রেল স্টেশনে প্রবেশের মুখে তাঁকে বহনকারী রেল গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হয়; স্টেশনে সমাবেশ পন্ড করার জন্য আগে থেকে অসংখ্য বোমা ফাটানো হয়। শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। ১৯৯৫ এর ৭ ডিসেম্বর শেখ রাসেল স্কয়ারে সমাবেশে ভাষণ দানরত অবস্থায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সাবেক বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। ১৯৯৬ এর ৭ মার্চ বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে সভানেত্রী শেখ হাসিনার বক্তৃতার পর অকস্মাৎ একটি মাইক্রোবাস হইতে সভামঞ্চ লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ ও বোমা নিক্ষেপ করা হইলে অন্তত ২০ জন আহত হয়। 

জেল-জুলুম, গৃহবন্দিত্ব এমনকি চোখের সামনে মৃত্যুর স্বরূপ বার বার দেখতে হয়েছে তাঁকে। তবে এসব যেন তাঁকে আরো সাহসী ও আরো দৃঢ় করে তোলো। পিতা যেমন ধ্বংসস্তুপ থেকে মাত্র সাড়ে ৩ বছরে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা তেমনই স্বৈরশাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠা করেন ভোট ও ভাতের অধিকার। ৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর জনতার রায় নিয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।

১৯৯৬-২০০১ পাঁচ বছর ছিল স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল সময়। এ’সময়কালের মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের সাথে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি, ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতুর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা, ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করাসহ অনেকগুলো খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়। এসময় দ্রব্যমূল্য ছিল ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে। কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্যে সার, বীজ সরবরাহ এবং সেচ সুবিধা সম্প্রদারণের ফলে দেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। প্রায় ২ হাজার ৬ শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। প্রথম মোবাইল প্রযুক্তির বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং উল্লেখযোগ্য হারে কর সুবিধা প্রদান করা হয়। বেসরকারি খাতে টেলিভিশন চ্যানেল অপারেটর করার অনুমতি প্রদান করে আকাশ সংস্কৃতিকে তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। পিতার সাথে মাতার নাম লেখা বাধ্যতামূলক করা হয়। কম্পিউটার আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক হ্রাসকরণের দ্বারা সাধারণের হাতে হাতে বিশ্বায়নের মাধ্যম পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে এ দফায় মাত্র পাঁচ বছর ক্ষমতা থাকতে পারেন শেখ হাসিনা। দীর্ঘ দুই দশকের ষড়যন্ত্র আর ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার প্রবণতা থেকে বিএনপি-জামায়াত জোটকে হটানো কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা, বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র আর জন-মতামত উপেক্ষা করা নির্বাচনে হারিয়ে দেওয়া হয় আওয়ামী লীগকে। এরপর শুরু হয় বঙ্গবন্ধুকন্যাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার ফর্মুলা বাস্তবায়ন; থেমে থাকে না খালেদা-তারেকের ষড়যন্ত্র ও নীলনকশা। চলে শেখ হাসিনাকে অন্তত ২১ বার হত্যার ষড়যন্ত্র। 

২০০২-এর ৪ মার্চ নওগাঁয়, ২০০২ সালে ২৯ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার কলারোয়ায় সংসদে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর হামলা চালানো হয়। ২০০৪ সালের ২ এপ্রিল বরিশালের গৌরনদীতে শেখ হাসিনার গাড়ি বহরে গুলিবর্ষণ করে জামায়াত-বিএনপির ঘাতক চক্র। এরপর ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা।

বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শান্তি সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। খালেদা-পুত্র তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ মদদে এদিন শেখ হাসিনা-সহ আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা চালানো হয়। কয়েকজন নেতা অল্পের জন্য ভয়াবহ এই হামলা থেকে বেঁচে গেলেও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী ও আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমান এবং আরও ২৩ জন নেতাকর্মী নিহত হন। এছাড়াও ওই হামলায় আরও ৪শ’ জন আহত হন। যাদের অনেকেই চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন। তাদের কেউ কেউ আর স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাননি।

২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর ইয়াজউদ্দিনকে দিয়ে ‘ক্যু’ ঘটিয়েছিল আওয়ামী লীগবিরোধী এবং বিএনপি-জামায়াতের পক্ষের শক্তি। এরপর আসে সেনা সমর্থিত ‘অবৈধ সরকার’। ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই তারিখে অন্যায়ভাবে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার করা হয় জননেত্রী শেখ হাসিনাকে। পরে সাব জেলে খাবারে স্লো পয়জনিং-এর মাধ্যমে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন শেখ হাসিনা।

২০০৮ সালের ১১ জুন এগারো মাস কারাভোগের পর শেখ হাসিনাকে প্যারোলে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের সরকার।

আর শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে ২০০৮ সাল থেকে টানা ৩ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর নেতৃত্বে সরকার পরিচালনা করছে আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা যেন অবিকল পিতা বঙ্গবন্ধুরই প্রতিচ্ছবি। বঙ্গবন্ধু যেমন ধ্বংসস্তুপ থেকে মাত্র সাড়ে ৩ বছরে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়েছিলেন, কন্যা অনুসরণ করছেন পিতারই পদাঙ্ক। রাষ্ট্রদর্শনে প্রাধান্য দেন জনগণ ও দেশের উন্নয়নকে। বিশ্ব পরিমন্ডলে জননেত্রী শেখ হাসিনা আজ গণতন্ত্র, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও শান্তির প্রতীক হয়ে উঠেছেন। পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে বৈষম্যহীন এবং সকলের অংশগ্রহণমূলক ক্ষুধা, দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলা গঠনের কাজ করে যাচ্ছেন নিরলস।

বঙ্গবন্ধু কন্যা ঘুচিয়ে দিয়েছেন পশ্চিমাবিশ্বের তলাবিহীন ঝুঁড়ির গ্লানির অপবাদ। বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক কাঠামোর ধারাবাহিকতায় টেকসই অর্থনীতির ভিত গড়েছেন। ‘মানুষ নিয়েই কল্যাণ রাষ্ট্র’- বঙ্গবন্ধুর এই দর্শনই রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার মূলমন্ত্র।

স্থায়ী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, স্বনির্ভর খাদ্য ব্যবস্থা, নারীর ক্ষমতায়ন, গ্রামীণ জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, অবকাঠামো,  তথ্য-যোগাযোগ ও প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসহ উন্নয়নের  প্রতিটি ক্ষেত্রেই শেখ হাসিনা সরকারের সাফল্যে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল।

স্বাধীনতার পরে ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট এখন ৭২৩ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার ওপরে। সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার জিডিপির আকার হয়েছে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। রফতানির আকার ৩ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ১ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার থেকে ছাড়িয়েছে ১৮০ বিলিয়ে ডলারে।

বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল পাঁচটি অর্থনীতির মধ্যে অন্যতম। জিডিপি-তে আমরা বিশ্বের ৪১তম। গত এক দশকে দারিদ্র্যের হার ৩১ দশমিক ৫ থেকে ২০ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এসময়ে আমাদের মাথাপিছু আয় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২,২২৭ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ সর্বকালের সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে।

মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ,  অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা- তিন সূচকের মানদণ্ড পূরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছেছে।

পদ্মাসেতুর মতো মেগা প্রজেক্ট এখন আর স্বপ্ন নয় বাস্তব। অদম্য সাহসী শেখ হাসিনা বৈশ্বিক ঋণ ও দাতা সংস্থাগুলোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে  নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প দৃশ্যমান করেছেন। আর এক বছর পরই সেতুর ওপর দিয়ে একইসাথে চলবে বাস-ট্রেন।

রাজধানীতে দৃশ্যমান মেট্রোরেলের পথও। যানজট এড়ানো এবং নগরবাসীর ভোগান্তি কমাতে  একাধিক উড়াল সেতু, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও ক্রাইভার নির্মাণ দ্রুতগতিতে অগ্রসরমান।

ঢাকার বাইরে দেশব্যাপী চলমান নানান বড় বড় সব প্রকল্প। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর বহুলেনের কর্ণফুলী টানেল, পাবনায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা সমুদ্র বন্দর, দোহাজারি-রামু-কক্সবাজার ঘুমধুম রেলপথ, মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং চট্টগ্রামে এলএনজি টার্মিনাল। দেশজুড়ে গড়ে উঠছে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল। সময়মত এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা।  উন্নয়নের গতি ধরে রাখতে ১০০ বছরের ডেল্টা প্ল্যানও রয়েছে সরকারের।

দুর্যোগে-মহামারিতেও বিচক্ষণ নেতৃত্বে সংকট কাটিয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ঠিক রেখেছেন শেখ হাসিনা সরকার। করোনা মহামারি মোকাবিলায় বিশ্বের অনেক বড় বড় অর্থনীতির দেশ যেখানে খেই হারিয়ে ফেলেছিল, বাংলাদেশ সেখানে জীবন জীবিকা রক্ষায় মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়ে চলেছে। একদিকে অর্থনীতি সচল রাখতে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন খাতে। আবার ভ্যাকসিন নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিপুল চাহিদার মধ্যেও দ্রুততম সময়ে দেশের মানুষের জন্য তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

প্রায় দেড় বছরের করোনার ধাক্কার পরও বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের ধারণা উড়িয়ে, এশিয়ার সব দেশের মধ্যে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি। এসব কিছুই সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত ও সঠিক নির্দেশনায়।

২০০৮ ক্ষমতায় আসার পর শুরু করা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার মিশন বাস্তবায়নের ফলাফল মহামারিকালীন সময়ে শিক্ষা, চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এনে দেয়  নতুন সফলতা। মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটালাইট স্থাপনও উন্মুক্ত করে প্রযুক্তির আরেক দ্বার।

শুধু অর্থনীতি আর উন্নয়ন নয়, নিজেরাই নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে থেকেও ছোট্ট এই দেশটির প্রধানমন্ত্রী, ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সাড়ে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার জন্য  খুলে দেন মানবতার দ্বার।

এমন মানবিক, দৃঢ়চেতা ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অধিকারী শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রংশসা কুড়িয়েছেন। শেখ হাসিনা পরিণত হয়েছেন বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের একজন। বিশ্বের ক্ষমতাধর ১০০ নারীর তালিকায় বার বার এসেছে তাঁর নাম। বিশ্ব পরিমণ্ডলে তিনি আজ গণতন্ত্র, উন্নয়ন, ন্যায়বিচার ও শান্তির প্রতীক।

জননেত্রীর স্বপ্ন বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি জ্ঞানভিত্তিক উন্নত দেশ ও ২১০০ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ ও টেকসই বদ্বীপে রূপান্তর করা। তার নেতৃত্বেই কল্যাণ রাষ্ট্রের সব উপাদান নিয়ে বাংলাদেশে এখন টেকসই অর্থনীতির দেশ।

আজ বঙ্গবন্ধু কন্যার ৭৫ তম জন্মদিনে মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের প্রিয় আপাকে দীর্ঘায়ু করুন, যেন বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার রুপায়িত করে যেতে পারেন। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয়তু দেশরত্ন শেখ হাসিনা।

লেখক: সাবেক ছাত্রলীগ নেতা

 

/এসএএস/

সম্পর্কিত

শেখ হাসিনা ও আমাদের আইনি ঐতিহ্য

শেখ হাসিনা ও আমাদের আইনি ঐতিহ্য

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে ভালোবাসি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে ভালোবাসি

চীনা ত্রাণের ক্ষমতা

চীনা ত্রাণের ক্ষমতা

সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় সাধারণ মানুষের ক্ষতি কতটুকু?

সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় সাধারণ মানুষের ক্ষতি কতটুকু?

শেখ হাসিনা ও আমাদের আইনি ঐতিহ্য

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:১৮

এস এম মাসুম বিল্লাহ  যারা বঙ্গবন্ধুকে টেলিভিশনের পর্দায় দেখে তাঁর জলদ-ভাব-গম্ভীরভরাট কণ্ঠ শুনে আচমকা থমকে যান এবং নিবিষ্টমনে বলে ওঠেন, ‘ইশ, বঙ্গবন্ধু যদি বেঁচে থাকতেন’– তাঁদের জন্য এই লেখা। যাঁরা জাতির দুঃসময়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব দেখে আনন্দিত বোধ করার ক্ষমতা রাখেন এবং জাতির উদ্দেশ্য প্রদত্ত কোনও ভাষণে সুকান্ত-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল থেকে তাঁর আবৃত্তি করাকে নেহায়েত দুর্ঘটনা মনে করেন না, তাদের জন্যে এই লেখা। 

এই লেখায় আমি বাংলাদেশের আইনি সৌন্দর্যময় মন খুঁজবো। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তাঁর মহোত্তম পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের স্বীকৃতি ও স্বরূপ সম্মুখে আনতে চাইবো। এভাবে শেখ হাসিনার সম্মানে এই নিবন্ধটা উপস্থাপন করে তাঁর জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাবার প্রয়াস পাবো। বলা জরুরি যে, এখানে আইনি ঐতিহ্যের শিল্পীত ডালায় সংবিধান, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের মিতালি– এই তিনটি বিষয় আমি বিশেষ করে বিবেচনায় নেব।

আমি জানি যে, যে কথা বলতে চাচ্ছি তার কিছু গ্রহণযোগ্য, দৃষ্টিগ্রাহ্য সমালোচনামূলক দিক থাকবে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু-শেখ হাসিনা পরম্পরা বলতে গিয়ে খেয়ালিজন একটা ধারা ধরতে পারবেন। এবং হঠাৎ করেই ডাক্তারের নাড়ির স্পন্দন পরীক্ষা করার মতো মাঝে-মাঝে আমাদের আইনি-সংস্কৃতির প্রাণধারা হারিয়ে ফেলবেন। 

আইনি সৌন্দর্যধারার শুরুর বহমান স্রোতকে এই দেশের ৫০ বছরের জীবনকালে কিছু নির্দিষ্ট সময়ে (সামরিক বা সামরিক মানসিকতাসম্পন্ন আমলে) থমকে যেতে দেখা যাবে। ভবিষ্যৎ দু’একটা ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়, কিন্তু সেটা আমি ধরছি না। দীঘির জলের দিকে হেলে থাকা বরই গাছের বড় ডাল কেটে ফেললে সে ডাল পুরো মানুষটাকে নিয়েই জলে পড়ে, ডালে দুই একটা পাকা বরই যে থাকে না, তাতো নয়!

ব্যাপারটা একটু খোলসা করি। বাংলাদেশ নামের এই মায়াময় দেশের জন্মের একটা আইনি দিক রয়েছে। পৃথিবীর যে রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছে তাদের মধ্যে বোধ করি বাংলাদেশ একমাত্র দেশ, যে দেশের মানুষ একদিকে যেমন দিগ্বিদিক দামামা বাজিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে রক্ত দিয়েছে, অন্যদিকে এই রাষ্ট্রের মহত্তম কারিগরেরা এর জন্মের আইনি বৈধতার ব্যাপারটি অতি সুনিপূণভাবে নিশ্চিত করেছেন। স্বাধীনতার অমোঘ ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে আমাদের পূর্বপুরুষেরা আন্তর্জাতিক আইনের নব-নব দিগন্তের ধারা অবমুক্ত করেছেন। বাঙালির জন্যে পৃথক একটি রাষ্ট্র বানানোর প্রক্রিয়া ছিল পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ কর্তৃক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রয়োগের প্রথম উদহারণ। তেমনি করে এই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের বরাতেই আমরা এককভাবে স্বাধীনতা ঘোষণার বৈধতা, আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র-স্বীকৃতির নীতি এবং ন্যায্য সরকার পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। মাত্র তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় মিত্র-সৈন্যদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর মধ্য দিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক আইনের ঈর্ষাকাতর বোধিনীও হয়েছি।

স্বাধীন দেশে হেমন্তের এক মিষ্টি বিকেলে মাত্র নয় মাসে আমরা গেঁথেছিলাম আমাদের রক্ত, ঘাম ও অশ্রুভেজা সংবিধান। আমরা যাতে করে ‘স্বাধীনসত্তায় সমৃদ্ধি লাভ’ করতে পারি, সেই জন্যে ‘মানবজাতির প্রগতিশীল আশা আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সঙ্গতি’ রেখে বৈশ্বিক সংবিধানিকতাবাদ-এর প্রতিচ্ছবি হয়ে আমরা তৎকালীন জমানার অন্যতম প্রাগ্রসর ওই ১৯৭২ সালের সংবিধান নিজেদেরকে দিয়েছিলাম। সেটা ছিল উদার অর্থে আমাদের রাষ্ট্রের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই জাতিকে দিয়ে যাওয়া শ্রেষ্ঠতম উপহার, যার ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে লেখা হয়: ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ… জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন’। 

ইচ্ছে করলে তিনি সেদিন কোনও সংবিধান না দিয়েই, কোনও নির্বাচন না দিয়েই, পাকিস্তানের ভুট্টো-ইয়াহিয়া মডেলে এই রাষ্ট্রকে এককভাবে শাসন করতে পারতেন। আমাদের সংবিধানের ডালায় ও নকশায় রয়েছে শিল্পাচার্যের তুলির আঁচড়, নমস্য বাংলা অধ্যাপকের সৃষ্টিশীল মনন, সাহিত্যিক ও বাংলা ভাষার পণ্ডিতদের প্রজ্ঞার প্রয়োগ, রবীন্দ্রনাথের গানের কলি, মহত্তম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হাতের পরশ ও স্বাক্ষর। শব্দের পিঠে শব্দ বিন্যাসিত হয়ে এক ভাষার শোভাযাত্রা তৈরি করেছে সংবিধানের বাংলা পাঠ। সন্নিবেশিত রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ এবং মৌলিক অধিকারগুলো পড়লে এটা টের পাওয়া যায়। এতে যারা বাঙালিয়ানা খুঁজে পান না তাদেরকে করুণা করা ছাড়া আমরা আর কী করতে পারি? 

১৯৭৩ সালে দেশীয় পর্যায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার করার জন্যে যে আইন জাতির জনক বানিয়েছিলেন, তা ছিল নুরেমবার্গ অথবা টোকিও ট্রায়াল নীতিমালাকে (১৯৪৬-৪৮) ছাপিয়ে বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশজ আইন। জাতির পিতা হিসেবে সুনির্দিষ্ট অপরাধী ছাড়া যে রাজাকারদের তিনি ক্ষমা করেছিলেন, তা বর্তমান যুগের লোকেরা ট্রানজিশনাল জাস্টিস অথবা রেস্টরেটিভ জাস্টিস নাম দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের বাজারে বিলিয়ে বেড়ায়। 

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের তরফে আমরা আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন দুটি আইন দেখতে পাই, শিশু আইন এবং সমুদ্র আইন। শিশু আইনের দর্শন আমরা পরবর্তীতে ১৯৮৯-এর জাতিসংঘ শিশু সনদে দেখি এবং সমুদ্র আইনের একক অর্থনৈতিক অঞ্চলের ধারণা (ইইজেড) ১৯৮২-এর জাতিসংঘ সমুদ্র কনভেনশনে পাই। ওই একই বছরে (১৯৭৪) আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালা প্রতিফলিত করে বাংলাদেশ প্রণয়ন করে বহিঃসমর্পন আইন।

এই হলো আমাদের আইনি ঐতিহ্যের এক চিলতে– লিগ্যাল হেরিটেজ। এর পরের গল্প এক বাক্যেও লেখা যায়, আবার লম্বা করেও বলা যায়। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ ৮ম সংশোধনী মামলায় (১৯৮৯) এর পরের ইতিহাসকে বলেছেন সাংবিধানিকতাবাদের বালিয়াড়ি (Sand Dune), আর আরেকজন বিদগ্ধ বিচারপতি মুহম্মদ হাবিবুর রহমান ওই একই মামলার রায়ে একে আখ্যা দিয়েছেন সংবিধানের ‘সিকস্তি-পয়স্তি’ হিসাবে। 

এরপর এই দেশে স্বদেশী বর্গীরা হানা দিলো। আমাদের স্বপ্ন লুট হয়ে গেলো। আমাদের কণ্ঠ বাজেয়াপ্ত হয়ে গেলো। হালাকু খানরা বাগদাদ যেভাবে দখল করে নিয়েছিলো, স্বঘোষিত জেনারেলরা আমাদের দেশ সেভাবে জয় করে নিলো। পশ্চিম পাকিস্তান হাইকোর্ট-এর প্রধান বিচারপতি জাস্টিস রুস্তাম কায়ানি একবার চট্টগ্রাম সফরে এসে এক বক্তব্যে আইয়ুব খানকে পরিহাস করে বলেছিলেন (১৯৬২): ‘সম্ভবত পাকিস্তান সেনাবাহিনী পৃথিবীর একমাত্র সেনাবাহিনী যারা নিজেদের দেশ নিজেরাই দখল করে নিয়েছে।’ একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো বাংলাদেশে আইয়ুব খান স্টাইলে দেশ চালানো মোশতাক-সায়েম-জিয়া-এরশাদ সময়ে (১৯৭৫-১৯৯০)। 

সংবিধানকে মানুষের হাতে পৌঁছতে দেয়নি সামরিক সরকারগুলো। বিশেষ করে বাংলা সংবিধানের সলতে জীবন পুণ্য করে মানুষের হাতে জ্বলেনি তেমন। তখন আদালতের উঠান, বিচারক-আইনজীবী, ক্ষমতাসীনরা সংবিধানকে নিজেদের একচ্ছত্র সম্পত্তি হিসেবে ভেবেছেন। সংবিধানের ওপর সামরিক ফরমানকে প্রাধান্য দিয়ে তারা নার্সিসাস সিন্ড্রোমে ভুগেছেন। দেবী সার্সির মতো মাথায় টোকা দিয়ে মানুষকে বুঝিয়েছেন যে সামরিক আইনও আইন! 

এমন রাজ্যে মানুষ সংবিধান নিয়ে কথা বলে ঠিকই কিন্তু সংবিধানে কী রাখা হয়েছে, কী জুড়ানো হয়েছে, কেন জুড়ানো হয়েছে তা কেউ তেমন জানার প্রয়োজন মনে করে না। ১৮২৫ এর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ-এর ‘ডিসেম্বর জাগরণ’ এক চুটকি মনে পড়লো। জার আলেক্সন্ডার-এর বিদায়ের পরে তার সন্তান কনস্টান্টাইন এবং নিকোলাস এর মধ্যে ক্ষমতায় আসা  নিয়ে ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’ হয়। কনস্টান্টাইন-এর সমর্থকরা একটা সাংবিধানিক প্রবর্তনা চাচ্ছিলেন। তাই উচ্চ পর্যায় থেকে সিপাহী-জনতাকে ‘কনস্টান্টাইন’ ও ‘কনস্টিটিউশন’ (রাশিয়ান ভাষায় কনস্টিটুটস্যুয়ে)- এর নাম করে স্লোগান দিতে বলা হয়েছিল। তাদের যখন জিজ্ঞেস করা হলো তারা কিসের স্লোগান দিচ্ছেন, জবাবে সিপাহী-জনতা জানালো তারা কনস্টান্টাইন ও তার স্ত্রী ‘কনস্টিটুটস্যুয়ে’ -এর মঙ্গল কামনা করে স্লোগান দিচ্ছেন!

আমাদের মানুষজনকে অনেকটা ওই ধরনের সাংবিধানিক ‘ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি’র মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।  সামরিক শাসককে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা’ হিসাবে ভাবতে শেখানো হয়েছে!   

১৯৭৫-১৯৯০ আমাদের জাতীয় আইনি মানসে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায়। আইনের ছাত্ররা চোখের পলকে, মনের নিমিষে এই সময়ের মধ্যে মানবাধিকার, গণতন্ত্র, কিংবা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আমাদের দেশের প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিতবাহী তেমন বড় কোনও আইন বা বিখ্যাত কোনও মামলার সিদ্ধান্ত পাবেন না। এমনকি দুই একটা ব্যতিক্রম ছাড়া ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৮ সময়কালকেও আপনি এই অন্ধকারের মধ্যে আনতে পারেন। বিশ্বাস না করলে বই না দেখে চোখ বুঁজে ভাবনার সাহসটা করুন, তেমন বলার মতো মানবাধিকার সমভাবাপন্ন ওই সময়ের কোনও আইন আপনি পাবেন না, যেটা আমাদের আইনি সংস্কৃতির পূর্বধারায় মূল্যবান সংযোজন হিসেবে কাজ করেছে বা করতে পারতো, বরং উল্টোটা পাবেন।

আসুন, আমরা ওই আইনি ক্রমধারাটির নাম দেই বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা দায়মুক্তির ধারা (Culture of Impunity)।

জাতির স্থপতিকে সপরিবারে হত্যা করে তাঁর দিয়ে যাওয়া পবিত্র সংবিধানে খুনি জিয়া-মুশতাক ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করে তাঁর বিচারের পথ রুদ্ধ করে দিয়েছিলো। শেখ হাসিনাকে পুরো জাতির সমান্তরালে দাঁড় করিয়ে এই হুজ্জতি-প্রলয় ২১ বছর ধরে সংবিধানে ছিল। কারও কিছু মনে হয়নি! ১৯৯১ সালে দেশ যে সংসদীয় ধারায় ফিরেছিল, সেই প্রস্তাবও এনেছিলেন শেখ হাসিনার পক্ষে তৎকালীন বিরোধী দলীয় সংসদ উপনেতা আব্দুস সামাদ আজাদ। বিএনপি অবস্থার প্রেক্ষিতে সংসদীয় ধারার সরকার প্রবর্তন করেছিলো, কিন্তু ইনডেমনিটি আইন বাতিলের প্রয়োজন মনে করেনি। 

বরং দায়মুক্তির সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় আমরা পাই ১৯৯১ সালে  আব্দুর রহমান বিশ্বাসকে রাষ্ট্রপতি করার জন্য প্রকাশ্য ব্যালট সিস্টেম চালু করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন সংশোধন, ১৯৯৪ সালে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব প্রদান, ২০০৩ সালের অপারেশন ক্লিন হার্টের মাধ্যমে বিনা বিচারে মানুষ হত্যা করে বিচার না করার আইন, ২০০৪ সালে চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অবসরের বয়স ৬৭ বছর করে নিজেদের রাজনৈতিক ভাবধারার বিচারপতি কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করে সুষ্ঠু নির্বাচনের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়ার ব্যবস্থা। নিয়তির কী পরিহাস, বিএনপি কাঙ্ক্ষিত ও আহুত দুটো দায়মুক্তি আইনই (ইনডেমনিটি ১৯৭৫ ও ক্লিনহার্ট ২০০৪) পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে বাতিল হয়ে গেছে [শাহরিয়ার রশিদ খান ১৯৯৬, জেড.আই. খান পান্না  ২০১৭]।

১৯৯৬-এর ১২ জুনের ঐতিহাসিক নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় এসে পিতৃ হত্যার বিচার করার জন্যে আগে ইনডেমনিটি আইন বাতিল করতে হয়, বিএনপি-জামায়াত সেদিন সংসদে অনুপস্থিত থাকে এবং হরতাল ডাকে। খুনি শাহরিয়ার রশিদ ইনডেমনিটি আইন বাতিলকে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করে হেরে যায়। এবং শেখ হাসিনাকে এগুলো চেয়ে চেয়ে দেখতে হয়। ইচ্ছে করলে তো তিনি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে জেনারেল জিয়ার কায়দায় খুনিদেরকে অবলীলায় ফাঁসি দিতে পারতেন। আমরা জানি, জেনারেল জিয়াউর রহমান তাঁর আমলে এগারোশোর বেশি মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের নামে হত্যা করে। 

অথচ প্রচলিত সাধারণ ফৌজদারি আদালতে জাতির পিতা হত্যার বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যে দৃষ্টান্ত শেখ হাসিনা রেখেছেন, শুধু এই কারণেই বাংলাদেশের মানুষের কাছে শেখ হাসিনা নিরন্তর নমস্য হয়ে থাকবেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমেদকে দিয়ে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ না করার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১০ বছরের জন্যে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় কার্যকর স্থগিত করে দেয়। এবং নয় বছর পর ২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনাকে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের কয়েকজনের ফাঁসি নিশ্চিত করতে হয়। তখন আমরা তাঁকে ‘প্রতিশোধপরায়ণ’ হিসেবে আখ্যা দেই! এবং আমরা তাঁকে আইনের শাসনের সবক দিতে থাকি! হায় সেলুকাস! কী বিচিত্র এই দেশ!

১৯৯৬ এর গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তিতে ভারত থেকে পানি আসা শুরু হয়। ১৯৯৭-এর ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির মাধ্যমে জেনারেল জিয়ার সামরিকায়ন নীতির ফলে টালমাটাল হয়ে ওঠা পাহাড়ি-বাঙালি দ্বন্দ্বের হাত ধরে পাহাড়ি অঞ্চলে ৩০ হাজার মানুষের রক্তপাতের ধারা বন্ধ হয়ে যায়। বিএনপি এই শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে হরতাল করে, লংমার্চ করে, কিন্তু আর কিছু করে না। এরা অনেকটা মাথা গুঁজে স্ত্রীর ‘আয় খাওয়া’ অপারগ গৃহকর্তার মতো, যারা ‘স্ত্রী বাইরে কেন গেছে’ এই অভিযোগে রাগে গজ গজ করে। কিন্তু আর কিছু করে না। এরা তথ্য-প্রযুক্তি বিপ্লবকে ধারণ করে না, কিন্তু শেখ হাসিনার নিন্দায় একে ব্যবহার করে। কী এক আত্মপ্রবঞ্চনা! 

১৯৯৬-এর শেখ হাসিনা সরকার আইন কমিশন আইন করে আইন সংস্কারে এর অঙ্গীকার আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে নিয়ে আসে। ১৯৯৭ এর স্থানীয় সরকার আইন, খাস জমি বন্দোবস্ত নীতিমালা, ২০০০ সালের আইনগত সহায়তা আইন, একই বছরের নারী নির্যাতন দমন আইন, ২০০১ এর অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যার্পণ আইন ওই সময়কার শেখ হাসিনা সরকারের ঝুলিতে নতুন অর্জন হিসেবে যুক্ত হয়। এই সময়ে ১৯৬৬-এর দুই যমজ মানবাধিকার দলিল– আইসিসিপিআর এবং আইসিইএসসিআর-এ অনুস্বাক্ষর করে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আমাদের সংবিধানের যে প্রতিশ্রুতি তা শেখ হাসিনা সুউচ্চে তুলে ধরেন। এই সময়ে বাংলাদেশ সমুদ্র বিষয়ক জাতিসংঘের তৃতীয় কনভেনশন (১৯৮২) অনুসমর্থন (Ratification) করে রাখে, যেটা ২০০৯ এসে বাংলাদেশকে ভারত ও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সমুদ্র-বিরোধ নিষ্পত্তিতে আইনি-বাধার দরজা উন্মুক্ত করে দিতে সাহায্য করে।

বাংলাদেশের ৫০ বছরের আইনি ইতিহাসকে যদি দুটো পর্বে ভাগ করি তাহলে বোধ হয় আমরা এভাবে বলতে পারবো– একটা ২০০৯ পূর্ব সময় আর একটা ২০০৯ পরবর্তী সময়। কেননা, এই ২০০৯ সালেই মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন উদ্দীপক কিছু আইন বাংলাদেশ প্রণয়ন করেছে। দেখা যায়, গত দশকে প্রণীত আইনগুলোর প্রস্তাবনায় সংবিধান, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের দোহাই দেওয়া হয়, যেটা আগে থাকতো না। এই ধারা নতুন স্বদেশী আইনবিজ্ঞান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে হয়। এর জন্য অবশ্য আইনি ‘বাতি জালানি’ (Legal Enlightenment) ঘটা দরকার। 

২০০৯-এর ত্রয়ী আইন - জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, তথ্য অধিকার আইন, ভোক্তা অধিকার আইন এই সারিতে অগ্রগামী। সামরিক আদেশের রাহুমুক্ত করে সংবিধানে ২০১১ সালে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে ফিরে আসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ এবং এর চারটি স্থায়ী বুনিয়াদ– বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। সেক্যুলারিজম-এর বাংলা হিসেবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ যথেষ্ট উত্তাপ ছড়িয়েছে আমাদের জাতীয় জীবনে। বিচারপতি গোলাম রাব্বানী সেক্যুলারিজম এর বাংলা ‘লোকায়ত’ লেখেন (বাংলাদেশ সংবিধানের সহজ পাঠ, সমুন্নয়, ২০০৮)। কিছু দৃষ্টিভঙ্গিতে দাবি করা হয় (যেমন, আবুল মনসুর আহমদ, প্রথমা, ২০১৭) যে, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদির মতো তাত্ত্বিক বা দার্শনিক ধারণা সংবিধানে থাকা উচিত নয়। এতে বিতর্ক কমে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি দুটো কারণে গ্রহণযোগ্য নয়– এক. উল্লিখিত ধারণাগুলো ধারণামাত্র নয়, সেগুলো যেমন লক্ষ্য তেমনি অর্জনের উপায়ও;

দুই. সেগুলোর মুগ্ধকর সংজ্ঞা ১৯৭২ সালের সংবিধানে দেওয়া ছিল, যা জেনারেল জিয়া সামরিক কাঁচির খোঁচায় পরবর্তীতে বাদ দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করেন। 

১৫তম সংশোধনীর হাত দিয়ে বেশ কিছু ব্যাপারের সঙ্গে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অথচ কম প্রশংসিত বিষয় সংবিধানে ঠাঁই পায়। এর একটি হলো ‘ক্ষুদ্র-নৃতাত্ত্বিক’ জনগোষ্ঠীর অধিকারের সন্নিবেশের মাধ্যমে আদিবাসী সংস্কৃতির লালন (অনুচ্ছেদ ২৩-এ) এবং প্রজন্মান্তরের অধিকার সন্নিবেশের মাধ্যমে জীব-বৈচিত্র্যের সংরক্ষণের বিধান (অনুচ্ছেদ ১৮-এ)। 

পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতন নিবারণ আইন (২০১২), অভিবাসন আইন (২০১২), ২০১৩ সালের শিশু আইন ও ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য আইন, উদ্ভিদের জাত সংরক্ষণ আইন ২০১৯ ইত্যাদি আইন প্রণয়ন দেশীয় অবস্থানে থেকে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের কাছাকাছি যাবার প্রয়াস বলে ভাবা যেতে পারে।

স্বীকার্য যে, ২০১৮ এর সড়ক পরবিহন আইন ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বেশ কিছু ধারার যৌক্তিক সমালোচনা রয়েছে, রয়েছে ১৬তম সংশোধনীর অস্বস্তি, যা আওয়ামী লীগের আইনি প্রণয়ন ঐতিহ্যের সাথে অসাযুজ্যপূর্ণ।

১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের আলোচনা আমি এই লেখায় ইচ্ছে করেই তুলিনি, কেন না প্রতিটি ক্ষমতাসীন সরকার এর সুবিধা নিয়েছে, এবং এর ধারাবাহিক অপপ্রয়োগ আমাদের আইনি ঐতিহ্যে স্থায়ী অভিঘাত সৃষ্টি করেছে। 

এবার আমি লেখাটা গুটিয়ে আনার সাহসটা করি। ১৯৭৩-এ জাতির জনক যুদ্ধাপরাধের বিচারের আইন করে যান, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বড় পরিসরে সেটা করেছে ১৯৯৮ সালে, রোম সংবিধিতায়। শেখ হাসিনা রোম সংবিধি স্বাক্ষর করেন ১৯৯৯ সালে, আর অনুসমর্থন করেন ২০১০ সালে।

এই কাজগুলো না করলে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকালীন সংঘটিত অপরাধের বিচার আর করা হয়ে উঠতো না। এমনকি রামপাল প্রকল্পে যাদের আপত্তি, তারা যে পরিবেশ বিপর্যয়ের দায়ে শেখ হাসিনাকে জেনেভা নিতে চেয়েছিলেন, সেই আদিখ্যেতাও তারা দেখাতে পারতেন না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনবিজ্ঞানে আজ বাংলাদেশ অন্যতম একটা অধীত নাম।

বঙ্গবন্ধু শিশু আইন করেন ১৯৭৪ সালে, শেখ হাসিনাকে ২০১৩ সালে এসে সেটাকে যুগোপযোগী করতে হয়। বঙ্গবন্ধু সমুদ্র আইন করেন ১৯৭৪ সালে, শেখ হাসিনাকে এখন সেটা যুগোপযোগী করতে হচ্ছে ব্লু ইকোনমির হাতছানি দেওয়া অবারিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগনোর জন্যে।

জাতিসংঘ সমুদ্র কনভেনশন (১৯৮২) অনুসমর্থনের পরে দেশের দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা সমুদ্রভাগ্য নির্ধারণে বাজি ধরতে হয়। বাংলাদেশের আর কোনও রাজনৈতিক নেতা এই সিদ্ধান্ত নিতেন বলে আমার বিশ্বাস হয় না। জনগণের স্বার্থ জড়িত, অথচ শেখ হাসিনা চুপ থাকবেন এমনটি হওয়ার নয়। শেখ হাসিনা এমন এক রাজনীতিক, হতাশা যাকে মানায় না। ভারত-মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক সালিশী এবং সমুদ্র ট্রাইব্যুনালে নিয়ে (২০১২, ২০১৪) সমুদ্র বিরোধ নিষ্পন্ন করে শেখ হাসিনা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা এখন অন্য দেশের নেতারা অবাক বিস্ময়ে অনুসরণ করছেন, আর পৃথিবীর সমুদ্র আইনের মুয়াল্লেম আর তালেবে-এলেমগণ বসে বসে গবেষণা করছেন।

এই সুন্দরতম বিষয়গুলো এমনই এমনই ঘটতে পারে না, ঘটে না। এর পেছনে কিছু মানুষের সুন্দর মন থাকতে হয়, মেধা-মনন, ভাবনা, আকাঙ্ক্ষা-খেয়াল থাকতে হয়। এই ‘খেয়াল’ থাকাটাই শেখ হাসিনার রাজনীতিকে অন্য রাজনীতিকের রাজনীতি থেকে স্বতন্ত্র ও মহিমা উদ্ভাসিত করেছে। অনেক সময় তিনি শ্রুতিপ্রিয় বক্তা নন, কিন্তু ঝানু বিতার্কিক, দক্ষ পার্লিয়ামেন্টারিয়ান। সেটা সংসদে তাঁর সবাক, সাবলীল, স্থিতিপ্রজ্ঞ, অর্থবহ ও সহাস্য-সক্রিয় উপস্থিতি খেয়াল করলে ধরতে পারা যায়।

সংগ্রামে দুর্জয় বাংলার মানুষ হাসিনাপ্রসূত রাজনীতির মূল উপজীব্য। এই মানুষগুলোর প্রতি তাঁর দায়বোধ ও জেদ তাঁর রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও আইনি দর্শনকে স্থায়ী করেছে। এই দায়ভারই তাঁর নিয়তি। এই দায়ভার তাঁর উত্তরাধিকার।

তাঁর জেদ তিনি বাংলাদেশকে হারিয়ে যেতে দেবেন না। তাঁর জেদ তিনি বাংলাদেশকে ভালো রাখবেন। এদিক দিয়ে তিনি তাঁর বাবার সমান। যতবার (কমপক্ষে ২১ বার) তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে, ততবার তিনি মাথা উঁচু করে দু’হাতে মৃত্যুকে ঠেলে অনন্ত আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন। আকাশ তাঁর শিরস্ত্রাণ, মানুষ তাঁর কর্ম।

আমরা আশ্রয় পাই। আমরা ডিজিটাল হয়ে উঠি। আমাদের অর্থনীতির রুপান্তর ঘটে। আমরা ২০৪১ সালকে দেখতে পাই টুকরো টুকরো। আমাদের আলোকায়ন ঘটে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিনে তাই ‘অপমান তব করিব না আজ করিয়া নান্দী পাঠ।’ শুধু বলবো– ‘জয়তু, শেখ হাসিনা!’ আপনি বহু বহু গৌরাবান্বিত অর্জনের মধ্যে আমাদের সমৃদ্ধতর আইনি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। জয় বাংলা। 

লেখক: শিক্ষক, আইন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইল[email protected] 

/এসএএস/

সম্পর্কিত

শেখ হাসিনা: বাংলার ফিনিক্স পাখি

শেখ হাসিনা: বাংলার ফিনিক্স পাখি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে ভালোবাসি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে ভালোবাসি

চীনা ত্রাণের ক্ষমতা

চীনা ত্রাণের ক্ষমতা

সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় সাধারণ মানুষের ক্ষতি কতটুকু?

সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় সাধারণ মানুষের ক্ষতি কতটুকু?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে ভালোবাসি

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:৪৪

লীনা পারভীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ২৮ সেপ্টেম্বর আপনার ৭৫তম জন্মদিনে বাংলাদেশের একজন সামান্য নাগরিক হয়ে ভালোবাসার কথা জানানোর লোভ সামলাতে পারলাম না। অনেক ভালোবাসি আপনাকে। ভাবছেন, কেন এই ভালোবাসা? জেনেছি, ভালোবাসতে নাকি কারণ লাগে না। কিন্তু আপনার প্রতি এই ভালোবাসার পেছনে কারণ আছে।

লিখতে বসে ভাবছিলাম আমি কি একজন ব্যক্তি শেখ হাসিনাকে ভালোবাসি নাকি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভালোবাসি?  অনেক ভেবে উত্তর পেলাম– ব্যক্তি শেখ হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো আসলে একই সত্তা। এখানে বিভেদ খুঁজতে যাওয়া মানেই বোকামি করা। আসলে একজন ব্যক্তির মধ্যে যদি ভালোবাসার উপাদান না থাকে তাহলে একজন প্রধানমন্ত্রী হয়েও সেই গুণাবলীগুলোকে অর্জন করতে পারে না।

একজন ব্যক্তি শেখ হাসিনাকে তো আমি কাছ থেকে দেখিনি, তাই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যা দেখি তা-ই দিয়ে ব্যক্তিকে চিনে নিয়েছি।

আপনি একজন প্রচণ্ড জেদি মানুষ, সেটা কি আপনি জানেন? নিশ্চয়ই জানেন। কারণ একজন ব্যক্তি নিজেই নিজেকে সব থেকে বেশি চেনে। আপনার এই জেদ অনেকের গায়ের জ্বালা ধরায়। এই যে আপনি একরোখাভাবে নিজের মতো করে কাজ করে চলেছেন। কোনও অহেতুক সমালোচনা-ষড়যন্ত্রকে পাত্তা না দিয়ে এই একরোখা শেখ হাসিনাই আমার প্রধান আকর্ষণের কারণ। জেদ ছাড়া অর্জন হয় না। এই জেদ নিশ্চয়ই আপনি পেয়েছেন আপনার পিতার কাছ থেকে কারণ সেই মহান ব্যক্তিটির জেদের কারণেই তো আমরা পেয়েছিলাম আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ।

তাঁর জেদের সামনে অসহায় হয়ে পড়েছিলো প্রবল পরাক্রমশালী পাকিস্তানিরাও। আপনি যখন আমেরিকাকে ভ্রুকুটি করেন তখন আমার কাছে মনে হয়, এই তো আমি আত্মশক্তিতে বলীয়ান হচ্ছি। আপনি যখন মোড়লদের প্রচুর ফোনকে উপেক্ষা করে একের পর এক যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দিচ্ছিলেন, আমার মতো কোটি বাঙালি সেদিন কেঁদেছিলো, জানেন? শহীদের স্বজনেরা সেদিন নিচু করা মাথাকে উঁচু করে গলা ছেড়ে– জয় বাংলা বলেছিলো ঠিক ক্ষুদিরামের মতো।

আমি একজন স্বপ্নবাজ শেখ হাসিনাকে প্রচণ্ড কাছের মনে করি। তিনিই তো প্রথম বুঝিয়েছিলেন আমাদেরও স্বপ্ন দেখার হক আছে। আমরাও পারি নিজের মতো করে বাঁচতে। আমরাও পারি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনকে সাজাতে।

আজকের তরুণরা অনেক ভাগ্যবান। আমার দুটি কিশোর ছেলে আছে যারা জানে না একদিন বাংলাদেশ ছিল অন্ধকারের বাংলাদেশ। যে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা জানতো না কেমন করে নিজেদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হয়। তারা কোনোদিন ভাবেওনি যে ঋণ না করেও কিছু করা যায়। আমার সন্তানেরা জানে না লোডশেডিং কেমন করে হয়। অথচ এক সময় বিদ্যুতের অভাবে মানুষের কারখানা বন্ধ হয়ে যেতো। বাসায় বাসায় বিদ্যুতের বিলের চেয়ে মোমবাতির খরচ হতো বেশি। আমি জানি এর জন্য হয়তো আইপিএস-এর ব্যবসায়ীরা আপনাকে দোষ দেবে কিন্তু এখন আর আমাদের গরমে কষ্ট করতে হয় না।

আমি ভাবিনি আমার জীবদ্দশায় কোনোদিন দেখবো যে বাংলাদেশ নিজের টাকায় সেতু করেছে। একটা রাস্তা সংস্কার করা যেখানে অন্যের দয়ার বিষয় ছিল সেখানে এতবড় একটি সেতু হবে আমাদের টাকায়! ওরে বাবা!

সে যে দুঃস্বপ্নেও আসেনি। কী কাণ্ড! আপনি সেটিও করে দেখালেন। বিশ্বব্যাংক ছিল আমাদের কাছে দারুণ এক ভয়ের নাম। নাটক সিনেমায় দেখতাম দিনের পর দিন কেমন করে বেনিয়ারা গরিবদের সহায়তার নামে ঋণের বোঝা ধরিয়ে দিতো। সেই বিশ্বসেরা বেনিয়াকে আপনি ‘ঝেঁটিয়ে’ বিদায় করে দিলেন। এখন শুনতে পাই তারা আমাদেরকে ঋণ দেওয়ার জন্য তোয়াজ করে চলে।

ওগো বঙ্গবন্ধু কন্যা, মাঝেমাঝে এই একরোখা কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয়  বঙ্গবন্ধুর চেয়েও আপনি আমাদের  বেশি চেনেন-বোঝেন। জাতি হিসেবে তো আমরা খুব একটা সুবিধার না। ‘নিমকহারামি’ আমাদের রক্ত থেকে হারিয়ে যায়নি যে। সেই মীরজাফর থেকে খন্দকার মোশতাকেরা তো রয়ে গেছে যুগে যুগে। এই ‘নিমকহারাম’দের নিয়ে আপনার চলার পথ অনেক কঠিন হয়ে যায়। কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুলে যাওয়া মানুষগুলোকে কতটা অবলীলায় আপনি উপেক্ষা করে এগিয়ে যাচ্ছেন। আপনি বলেছেন কে কী বললো সেটা দেখে আপনি দেশ চালান না। এই যে উপেক্ষা করার ক্ষমতা, আমি এই শেখ হাসিনার কাছ থেকে শিক্ষা নেই,শক্তি নেই।

দলের মাঝে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতালোভীদের সামলে রাখা চাট্টিখানি কথা নয়। তারমধ্যে আপনি যে বাঙালি নারী। যে বাঙালি নারী নাকি জন্মেছে কেবল কোমলমতি কাজ করার জন্য। তারা শাসন ক্ষমতা চালাতে পারবে না।

নারীর হাতে রাষ্ট্র দেখতে অভ্যস্ত নয় যারা, সেই মানুষগুলো অনেক চেষ্টা করেছে আপনাকে দুর্বল করে দিতে। আপনাকে টলাতে পারেনি। পারবে কেন? আপনি যে অনেক আগেই নারী নেতৃত্ব থেকে সাধারণের নেতা হয়ে উঠেছেন আপন মহিমায়। আপনি কেবল নিজেই উঠেননি, উঠাচ্ছেন বাংলার কোটি নারীকেও। তাদের সামনে আজকে আপনি একজন আইডল। আর কেবল দেশেই কেন? বিদেশেও যে আপনার নামে বন্দনা চলছে। আপনি হয়ে উঠেছেন অনেকের কাছে পড়ার বই। আমিও আপনাকে পড়ি। প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে আমি আপনাকে পড়ি। বোঝার চেষ্টা করি। কেমন করে পারেন আপনি?

উত্তর, আপনি নিজেই দিয়েছেন। পারেন, কারণ আপনি দেশকে ভালোবাসেন। আপনার জীবনে বাংলাদেশের উন্নয়ন ছাড়া আর কোনও বিষয় নেই। ঠিক আপনার পিতার মতো। তিনিওতো একই স্বপ্ন দেখেছিলেন। আমিও বাংলাদেশকে ভালোবাসতে শিখি আপনার কাছ থেকে। হয়তো আপনার মতো ত্যাগী হতে পারবো না। কিন্তু সততার সাথে দেশের সাথে থাকার শিক্ষাটা আমি শান দেই আপনাকে দেখে।

তাইতো আমি চাই এই বাংলাদেশের হাল থাকবে আপনার হাতেই। নিম্ন আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল, উন্নত দেশ হবার স্বপ্নতো আপনি এই জাতিকে দেখিয়েছেন। উন্নয়নশীল দেশের নাগরিক হবার মর্যাদাতো আপনি দিয়েছেন আমাদেরকে। ২০৪১ সালে দেশ হিসাবে উন্নত বাংলাদেশ হবার অর্জনেও আমি আপনাকেই চাই। আপনি থাকবেন আমাদের ভালোবাসার সারথী হয়ে। আপনার দীর্ঘজীবন ছাড়া যে আমাদের স্বপ্নটুকু অধরা রয়ে যাবে।

লেখক: কলামিস্ট

/এসএএস/

সম্পর্কিত

ফেসবুকের পক্ষপাতমূলক আচরণ কেন?

ফেসবুকের পক্ষপাতমূলক আচরণ কেন?

ঝুমন দাসের মুক্তি চাই

ঝুমন দাসের মুক্তি চাই

নারীর বস্ত্রহরণের নিকৃষ্ট উল্লাস বন্ধ হোক

নারীর বস্ত্রহরণের নিকৃষ্ট উল্লাস বন্ধ হোক

মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়মের আওতায় আনা জরুরি

মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়মের আওতায় আনা জরুরি

চীনা ত্রাণের ক্ষমতা

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:১৮

আশিষ বিশ্বাস দক্ষিণ চীন সমুদ্র এবং হিমালয় অঞ্চলে চীনের প্রভাবে বাধ্য হয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রভাবিত কোয়াড গ্রুপে যোগ দিতে হয়েছে ভারতকে। কোয়াডে যোগ দিলে সমুদ্রে কিংবা পর্বতের উচ্চতায় ভারতকে আর এককভাবে চীনের অস্ত্রশক্তির বিশালতার মুখোমুখি হতে হবে না, অথচ প্রায়ই বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতে দিল্লিকে এই কাজের মুখোমুখি হতে হয়। যাহোক, আরেক পর্যায়ে দক্ষিণ এশিয়া এবং আশপাশের এলাকায় একটি বিপরীত রাজনৈতিক ধারা উন্মোচিত হচ্ছে। বিপুল প্রভাবের সঙ্গে মৃদু কূটনৈতিক শক্তি ব্যবহার করছে চীন, বিশেষ করে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে মোকাবিলায়। অপেক্ষাকৃত ছোট আঞ্চলিক প্রতিবেশীগুলোকে কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় সহায়তা দিয়েছে। বিপুল আর্থিক সহায়তা এবং সময় মতো প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন দিয়ে দেশটি এখন পর্যন্ত জনবহুল অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের হৃদয় ও মন জয়ের মতো আরও বড় যুদ্ধে প্রভাব বিস্তার করেছে।

এই পরিস্থিতিতে তাদের সবচেয়ে কাছের ও সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত, কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও চীনের পরই ভারতের অবস্থান। দীর্ঘমেয়াদে যেকোনও দুই শক্তিশালী এবং অসম শত্রুতার চেয়ে এটি আলাদা নয়।

তবে দিল্লিভিত্তিক নীতিনির্ধারকদের এটাও বুঝতে পারছেন যে রাজনৈতিকভাবে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে চীনের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে তারা। গত কয়েক বছরে ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার অপেক্ষাকৃত ধীর অগ্রগতি এশিয়ার দুই বড় দেশের একে অপরের বিরোধিতার ক্ষেত্রে তাদের বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উঠে এসেছে। আকার অবশ্যই বিষয়। চীনের অর্থনীতির বর্তমান আকার ভারতের চেয়ে প্রায় পাঁচগুণ বড়, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি চ্যালেঞ্জের।

কিন্তু ৭০ বছর আগে স্বাধীনতা পাওয়া ভারতের এতে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। যুগ যুগ ধরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং ব্যাপক বহুত্ববাদী মূল্যবোধ টিকিয়ে রেখে বড় আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে উত্থান তাদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক এক যাত্রা।

এছাড়া বিশালাকার নেতিবাচক প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের বিরোধেও ভারত খুব একটা খারাপ করেনি। সব সময়ই নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশীদের সহায়তা আর আঞ্চলিক গুরুত্ব ধরে রাখতে তাদের সূক্ষ্ম আর কৌশলগত পদক্ষেপ দেখা গেছে মিয়ানমার থেকে আফগানিস্তানে। সব সময়ই এসব ছিল কঠিন কাজ। চীন কখনোই ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব কিংবা প্রতিবেশীদের কাছে তাদের ইতিবাচক মনোভাবকে পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারেনি।

কিছু পর্যবেক্ষক মনে করেন, ভারতের উচিত এশিয়া কিংবা আফ্রিকার অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে চীনের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন না করা। হিমালয় সীমান্তে নতুন করে চীনা অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে তাদের সুসংহত প্রতিরোধ আন্তর্জাতিক প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে ভিন্নমতও রয়েছে। কোয়াডের মতো নির্দিষ্ট সামরিক জোটে ভারতের প্রবেশ উচিত কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে বেশিরভাগ ভারতীয় চান না তাদের দেশ অন্য বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে বড় কোনও আঞ্চলিক বিরোধে জড়িয়ে পড়ুক। অনেক মানুষই মনে করেন, কম মনোযোগ আকর্ষণ করে কার্যকর অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারাই ভারতের জন্য সুবিধাজনক।

কিন্তু ভারতের বর্তমান ‘জাতীয়তাবাদী’ নেতাদের কাছে কম মনোযোগ কাড়ার দৃষ্টিভঙ্গিটি দৃশ্যত গ্রহণযোগ্য নয়। পশ্চিমা মূলধারার পর্যবেক্ষকদের পর্যবেক্ষণে হতাশাজনকভাবে তাদের ‘ডানপন্থী’ হিসেবে দেখে থাকে।

তবে এমন নয় যে ভারতের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে কোনও উন্নয়নই হয়নি। কিন্তু এই উন্নয়ন এসেছে খুব ধীরে। বর্তমান মহামারি আসার আগেও ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে জগাখিচুড়ি পেকেছিল। ভারতের সরকারপন্থী মূলধারার গণমাধ্যম শেয়ার বাজারের চাঙাভাব, ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধিতে জোর দিতে থাকে। বিশেষ করে নতুন এবং বিশেষত গুজরাটি উদ্যোক্তাদের উত্থান ভারতের প্রচারণাযন্ত্রে উৎসাহ জোগায়। এগুলোর অনেকই বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি প্রতীকী। যেমন প্রয়াত সরদার প্যাটেলের সবচেয়ে বড় মূর্তি কিংবা মুম্বাই-আহমেদাবাদের মধ্যে বুলেট ট্রেন প্রকল্প।

রাফায়েল যুদ্ধবিমান ক্রয় কিংবা কয়েক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের আর্থিক উন্নয়ন নিয়ে, আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনও সরকারি প্রতিক্রিয়া নেই। প্রাথমিক প্রস্তাবিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ দিয়ে ফ্রান্সের কাছ থেকে এগুলো কেনা হয়েছে। কিংবা কয়েকজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর আত্মীয়দের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। নেই বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা ৬০ কোটি মানুষের কথারও কোনও উল্লেখ। চীন ও অন্য দেশগুলোর সঙ্গে এসব নিয়ে কোনও তুলনাই চলে না।

২০২১ সালের প্রথম চার মাসের কঠিন সময়ে ছোট প্রতিবেশীদের দেওয়া ভারত ও চীনের সহায়তার পরিসংখ্যান দেখলেই তাদের উদ্দেশ্য বোঝা যাবে।

ভারত: শ্রীলঙ্কাকে ২৬ টন প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সামগ্রী পাঠিয়েছে। এরসঙ্গে ৪০ কোটি ডলারের মুদ্রা বিনিময় করে দ্বীপরাষ্ট্রটির অর্থনীতিতে সহায়তা করেছে। রফতানি করেছে একশ’ টনের অক্সিজেন উৎপাদন সামগ্রী; ভুটানকে দেড় লাখ ডোজ টিকা, পরে আরও চার লাখ ডোজ, এবং এর সঙ্গে গ্লাভস, মাস্কের মতো অন্যান্য সামগ্রী। এছাড়া নেপালের আরও বড় জনগোষ্ঠীর জন্য আরও বড় সহায়তা দিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য জানুয়ারিতে ২০ লাখ ডোজ কোভিড ১৯ ওষুধ, এরপরে ৩ লাখ টেস্ট কিট, একই পরিমাণ মাস্ক, দেড়লাখ ক্যাপ, ৫০ হাজার গ্লাভস এবং এক হাজার টন হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ওষুধ পাঠিয়েছে।

অন্যদিকে চীনা সহায়তার দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিবেশীদের সহায়তা/ত্রাণ কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি কৌশলী মনোভাব রয়েছে।

চীন: এশিয়া ইনফ্রাসট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)-এর মাধ্যমে প্রতিবেশীদের উদার অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েছে। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশকে ২৫ কোটি ডলার দিয়েছে, এছাড়া ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তা দিতে ঢাকা সফর করে মেডিক্যাল বিশেষজ্ঞদের একটি টিম। বেইজিংয়ের সূত্র অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে পাঁচশ’ কিট এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠানো হয়। শ্রীলঙ্কায় আর্থিক সহায়তা হিসেবে ৫০ কোটি ডলার পাঠানো ছাড়াও মুদ্রা বিনিময় হিসেবে পাঠানো হয়েছে ১৫৪ কোটি ডলার। নেপাল ও ভুটান প্রাথমিকভাবে যথাক্রমে আট লাখ ও ছয় লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে। এছাড়া ভারতকেও সহায়তা করেছে চীন: পাঁচ হাজার ভেন্টিলেটর, ২১৫৬৯টি অক্সিজেন উৎপাদন যন্ত্র এবং তিন হাজার টন প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল সরঞ্জাম এপ্রিলে পাঠায়। এসব সামগ্রীর বেশিরভাগই চীনের তৈরি, কিন্তু আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে গ্রহণকারী দেশগুলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তাদের নিজস্ব বিকল্প গ্রহণ করেছে।

যদিও প্রতিবেশীদের সহায়তার ক্ষেত্রে ভারতের সহায়তা চীনের পরিমাণের তুলনায় অনেক কম হলেও এগুলো অকার্যকর বলে বিবেচনার সুযোগ নেই। চীনের প্রতি ভারত এক ধরনের অবমূল্যায়িত প্রতিযোগিতা আরোপ করতে পেরেছে, বেইজিংকে আরও বেশি মানবিক সহায়তায় ব্যয় করতে বাধ্য করেছে, যাতে উপকৃত হয়েছে সবাই।

ব্যানডং কনফারেন্সের পর থেকেই চীনের পররাষ্ট্র নীতিতে মর্যাদা কিংবা প্রথম অবস্থান লাভ বড় করেই দেখা হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে এশিয়ার শীর্ষ আলোকবর্তিকা বলে প্রশংসা করা হলে চীনের প্রয়াত নেতা চৌ এন লাই ক্ষুব্ধ হন। দিল্লির কূটনৈতিক জয়ের জন্য এরপরে চীন কখনোই ক্ষমা করেনি। কোনও কোনও পর্যবেক্ষকের বিশ্লেষণে সেখানেই নিহিত থাকতে পারে চীনের ছোট প্রতিবেশীদের সর্বোচ্চ সহায়তার নীতির সারবত্তা। চীন জোরালোভাবেই ইঙ্গিত দিচ্ছে তারা এই অঞ্চলের অবিসংবাদিত এক নম্বর অবস্থান চায়। বিদেশে তাদের সহায়তা কেবল এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। সামগ্রিকভাবে তারা এখন পর্যন্ত দেড়শ’ দেশে ১১ হাজার পাঁচশ’ কোটি ডলার সহায়তা দিয়েছে।

তবে ত্রাণ দেওয়ায় ভারতের চেয়ে চীনের এগিয়ে থাকায় বেইজিং কেবল শীর্ষ অবস্থান নয় আরও বেশি কিছু অর্জন করছে। তাদের ব্যাপক সহায়তা কর্মসূচিতে এসব দেশের বহু মানুষ তাদের মানবাধিকার নিপীড়ন ভুলে যাচ্ছে বা অন্ততপক্ষে উপেক্ষা করছে। ফলে রাজনৈতিক বিরোধী/ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে তাদের কঠোর অবস্থান, অভ্যন্তরীণ প্রশাসনের নিপীড়নমূলক দিক, নিজেদের সীমানায় আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত ঘটনা আড়ালের প্রবণতা, দুর্ভিক্ষে মৃত মানুষের পরিমাণ, কিংবা নিজ দেশের মানুষের দুর্ভোগও আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।

এখন পর্যন্ত চীনের অভ্যন্তরে করোনার বিস্তার, তাদের সরকারি হিসাব নিয়ে পশ্চিমাদের উদ্বেগ রয়েছে। কিন্তু চীন এখানে হাসতে পারে, যে অর্থ এবং চিকিৎসা সামগ্রী নিয়ে তাদের প্রস্তুতি চীনবিরোধী প্রচারণা থেকে বেশি শক্তিশালী।

চীনের ভাবমূর্তি তৈরিতে এগুলো মারাত্মক সমস্যা, যা খুব সহজে ভোলানো যাবে না। তবে পরিচিত বাংলা প্রবাদ যেমনটা বলে থাকে ‘পেটে খেলে, পিঠে সয়’ সেভাবেই নিপীড়ন সহ্য করে যাচ্ছে অন্যরা।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলকাতা

/জেজে/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

তালেবান ফ্যাক্টর: ভারতে যেভাবে দেখা হচ্ছে

তালেবান ফ্যাক্টর: ভারতে যেভাবে দেখা হচ্ছে

তালেবান ফ্যাক্টর: ভারতের জন্য কঠিন হলেও বিজেপির জন্য ইতিবাচক?

তালেবান ফ্যাক্টর: ভারতের জন্য কঠিন হলেও বিজেপির জন্য ইতিবাচক?

সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় সাধারণ মানুষের ক্ষতি কতটুকু?

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫:৪৯
আমীন আল রশীদ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। আমার ফুপা সরকারি চাকরি করতেন। অবসরে যাওয়ার বছর কয়েক আগে তিনি মারা যান। তার কোনও সন্তান নেই। ফলে স্বামীর মৃত্যুর পরে ফুপু অনেকটা অকূলপাথারে পড়েন। চাকরি বা ব্যবসা করার মতো অবস্থা নেই। কারণ, তিনি নিজেও একটা জটিল রোগে আক্রান্ত। দ্রুততম সময়ে পেনশনের টাকাটা পাওয়া যায় এবং সেই টাকা দিয়ে পরিবার সঞ্চয়পত্র কেনা হয়। এখন ফুপু ওই টাকা দিয়ে চলছেন। এ রকম সঞ্চয়পত্র-নির্ভর মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠও আছে এবং সঞ্চয়পত্রের মুনাফার নামে রাষ্ট্রের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়, সেই আলোচনাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সামগ্রিক বিষয়ের একটা নির্মোহ বিশ্লেষণ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে এই লেখায়। তার আগে দেখা যাক, এই ইস্যুতে সরকার সম্প্রতি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে?  

গত ২১ সেপ্টেম্বর সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমানো সংক্রান্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বর্তমানে তিন বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে মুনাফার হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ হলেও সেটি ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কমিয়ে করা হয়েছে ১০ শতাংশ। যাদের বিনিয়োগ ৩০ লাখ টাকার বেশি, তারা মেয়াদ শেষে মুনাফা পাবেন ৯ শতাংশ হারে।

অবসরভোগীদের জন্য নির্ধারিত পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশনার সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে এত দিন ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ হারে মুনাফা পাওয়া যেত। এখন এই সঞ্চয়পত্রে যাদের বিনিয়োগ ১৫ লাখ টাকার বেশি তারা মেয়াদ শেষে মুনাফা পাবেন ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে। আর ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ থাকলে এই হার হবে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

দেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় যে পরিবার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি এই সঞ্চয়পত্রে মেয়াদ শেষে মুনাফার হার বর্তমানে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ। এখন এই সঞ্চয়পত্রে ১৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফার হার কমিয়ে করা হয়েছে সাড়ে ১০ শতাংশ। আর ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই হার সাড়ে ৯ শতাংশ। তবে যারা নতুন করে সঞ্চয়পত্র কিনবেন, শুধু তাদের জন্য পরিবর্তিত এই হার কার্যকর হবে।

এখন পরিবার সঞ্চয়পত্রে কর কেটে নেওয়ার পরে প্রতি লাখে পাওয়া যায় ৮৬৪ টাকা। যার ২০ লাখ টাকা আছে তিনি মাসে পান ১৭ হাজার ২৮০ টাকা। কিন্তু নতুন নিয়মে কেউ ১৫ লাখ টাকার বেশি পরিবার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করলে বা চলমান সঞ্চয়পত্র মেয়াদান্তে পুনঃবিনিয়োগ করলে তিনি কর কেটে নেওয়ার পরে প্রতি লাখে পাবেন ৭৮৭.৫০ টাকা। তার মানে ২০ লাখ টাকায় পাবেন ১৫ হাজার ৭৫০ টাকা। অর্থাৎ বর্তমানে যা পান তার চেয়ে ১৫৩০ টাকা কম। যিনি শুধু এই সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপরেই নির্ভরশীল, তার জন্য দেড় হাজার টাকাও কম নয়।

তবে এই মুনাফা কমবে নতুনদের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ এ বছরও যারা ৫ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্র কিনেছেন, আগামী ৫ বছর পর্যন্ত তারা আগের নিয়মেই, অর্থাৎ লাখে ৮৬৪ টাকাই পাবেন। কিন্তু এটার মেয়াদান্তে পুনঃবিনিয়োগ করলে পাবেন ৭৮৭.৫০ টাকা। আবার এখন কেউ যদি ১৫ লাখ টাকার কম মূল্যের সঞ্চয়পত্র কেনেন তাহলে তিনি লাখে ৮৬৪ টাকাই পাবেন। কিন্তু কেউ যদি ১৫ লাখ টাকার বেশি মূল্যের সঞ্চয়পত্র কেনেন, তাহলে লাখে পাবেন ৭৮৭.৫০ টাকা। অর্থাৎ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারীদের মুনাফা কমছে না।

তবে নতুন নিয়মে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন যাদের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বেশি। এটিও বাস্তবতা যে, সঞ্চয়পত্রে যাদের নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের নামে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা আছে, তারা সাধারণ মানুষ নন। তারা উচ্চমধ্যবিত্ত ও ধনী। সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, বরং কম লাভবান হবেন।

সরকার বলছে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দিতে গিয়ে সরকারের সুদ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। তাছাড়া এতে অর্থনীতিতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে বলে অর্থনীতিবিদদেরও অনেকে সঞ্চয় কর্মসূচিতে অতিমাত্রায় বিনিয়োগ এবং বিনিয়োগের ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বগতি রোধ করার তাগিদ দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেছেন, নতুন সিদ্ধান্তে মধ্যবিত্ত বিশেষ করে অবসরভোগীদের আয় কমে গেলেও দেশের সুষ্ঠু অর্থনীতি বজায় রাখার স্বার্থে মুনাফা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সঞ্চয়পত্রে যারা বিনিয়োগ করেন, সেখানে বিরাট অংশ সাধারণ মানুষ এবং প্রকৃত অর্থেই তারা সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দিয়ে সংসার চালান এটি যেমন ঠিক, তেমনি বিপুল অঙ্কের অবৈধ ও কালো টাকা, অসৎ পথে উপার্জিত টাকা অথবা বৈধ পথে উপার্জিত সচ্ছল ব্যক্তিদের টাকাও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা আছে। তারা কোনও না কোনোভাবে আয়ের উৎস দেখিয়েই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কেন এই লোকগুলোকে সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ দিয়ে মাসে মাসে তাদের মোটা অংকের মুনাফা দেবে? যে লোক ভালো চাকরি   করেন, যার ব্যবসা আছে, যার উপার্জনের আরও একাধিক পথ আছে, রাষ্ট্র কেন তাকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে আরও বেশি পয়সা আয়ের সুযোগ দেবে?

বরং সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী এবং যাদের সংসারে উপার্জনকারী নেই; যাদের আয় কম কিন্তু জমিজমা বিক্রি করে কিছু টাকা জোগাড় করেছেন এবং সেই টাকা ব্যাংকে রাখলে যেহেতু ওই অর্থে কোনও লাভ হয় না, তাই তাদের সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ দিতে হবে। অনেক নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত বৈধ পথেই কিছু কিছু টাকা সঞ্চয় করে একটা সময় সেই টাকা কোথাও রেখে মাসে মাসে একটা ফিক্সড আয়ের ব্যবস্থা করতে চান। সেসব মানুষকেও সঞ্চয়পত্রের সুবিধা দিতে হবে। কিন্তু সচ্ছল ও ধনী লোকেরা কেন সঞ্চয়পত্র কিনবেন এবং রাষ্ট্র কেন তাদের সেই সুযোগ দেবে?

অনেক সচ্ছল মানুষও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেন বছর শেষে কর সুবিধা পাওয়ার জন্য। কারণ, চাকরিজীবীদের (যেকোনও পেশায়) মধ্যে এটা খুব সাধারণ প্রবণতা যে, আয়ের বিপরীতে তাদের ওপরে যে কর ধার্য হয়, তারা সেটি পুরোপুরি দেন না বা দিতে চান না। অর্থাৎ কোনও না কোনোভাবে সেই টাকা তারা কমাতে চান। সেই কমানোর যেসব আইনি তরিকা আছে, তার অন্যতম এই সঞ্চয়পত্র। অর্থাৎ নির্দিষ্ট অংকের টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা থাকলে কর মওকুফ পাওয়া যায়। এখানে প্রশ্ন অন্য। যেমন মানুষ কেন তার ওপর নির্ধারিত করের পুরো টাকাটা রাষ্ট্রকে দিতে চায় না? কারণ, সে মনে করে তার করের টাকা সঠিক পথে খরচ হচ্ছে না। কারণ, সে মনে করে তার করের টাকা সরকারি কর্মকর্তারা লুটপাট করে নিয়ে যায়। সে মনে করে কর দেওয়ার পরেও রাষ্ট্র থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা ও সুবিধা পাচ্ছে না। কর দেওয়ার পরেও সে সরকারি কোনও প্রতিষ্ঠানে গিয়ে বিনা হয়রানিতে বা বিনা ঘুষে সেবা পায় না। সুতরাং সে কেন কর দেবে?

যেহেতু কর না দিয়ে তার উপায় নেই, অতএব সে কর কমানোর জন্য নানা ফন্দিফিকির করে। তার মানে মানুষের এই যে করভীতি বা করবিরক্তি—তার পেছনে দায়ী রাষ্ট্রের সামগ্রিক সিস্টেম। এসব জায়গা সংস্কার করতে হবে। না হলে শুধু সঞ্চয়পত্রে মুনাফা কমিয়ে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো যাবে না।

মানুষ কেন সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে তার আরেকটি বড় কারণ প্রচলিত ব্যাংকিং সিস্টেমে মুনাফা অনেক কম। কিন্তু যাদের বাড়তি টাকা আছে তারা কী করবেন? কোথায় সঞ্চয় করবেন? রাষ্ট্র চায় মানুষ ব্যাংকে টাকা না রেখে অন্য খাতে বিনিয়োগ করুক। কিন্তু সেই জায়গাগুলো কী? শেয়ার বাজার বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ। এটা জুয়ার মতো। সবার পক্ষে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ সম্ভব নয়। দ্বিতীয় উপায় ব্যবসা। বাংলাদেশে ক্ষুদ্র-মাঝারিসহ যেকোনও ব্যবসা করতে গেলে যে কত ধরনের হয়রানি ও বিপত্তির মধ্যে পড়তে হয়—তা ভুক্তভোগী ছাড়া কারও পক্ষে আন্দাজ করাও সম্ভব নয়। সুতরাং মানুষ কী করবে? বিনা পরিশ্রমে বেশি মুনাফার আশায় ডেসটিনি, ইউনিপে, যুবক এবং সবশেষ এহসান গ্রুপের মতো ফটকা প্রতিষ্ঠানে টাকা রেখে অসংখ্য মানুষ প্রতারিত হয়েছে।

তার মানে একদিকে প্রচলিত ব্যাংকে মুনাফা কম, শেয়ার বাজারে ঝুঁকি, ফটকাবাজ প্রতিষ্ঠানের দৌরাত্ম্য বাদ দিলে বাকি থাকে সঞ্চয়পত্র। ফলে মানুষ সেখানেই যায়। প্রতিবছর বাজেটে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে যে পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে, বছর শেষে তার চেয়ে অনেক বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। তাতে সুদ পরিশোধ বাবদ সরকারের খরচ অনেক বেড়ে যায়—এ কথাও ঠিক। কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠ হলো সঞ্চয়পত্রের সুদ বেশি হওয়ায় ধনীদের একটি বড় অংশ নামে–বেনামে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে রেখেছেন। ফলে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকারের দেওয়া উচ্চ মুনাফার সুবিধা প্রকৃত অর্থে যাদের কাছে যাওয়া উচিত, তার বদলে ধনীদের পকেটে চলে যাচ্ছে।

সুতরাং সঞ্চয়পত্র কারা কিনতে পারবেন, সেটি সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া দরকার এবং এখানে শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রেখে যারা প্রকৃতই সঞ্চয়পত্রনির্ভর, তাদের জন্য মুনাফার পরিমাণ বাড়ানো দরকার। প্রতি লাখে তারা যাতে হাজার দেড়েক টাকা পান, সেই ব্যবস্থা করা দরকার। এটা হলে একটা ইনসাফভিত্তিক অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। না হলে আমাদের অর্থনীতিতে যে বিশাল দুষ্টুচক্র ভর করেছে, লুটেরা-অসৎ-অবৈধ পথে উপার্জনকারী এবং বৈধ-অবৈধ উভয় পথে উপার্জনকারী ধনী লোকেরা যেভাবে আমাদের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করেন, সেটির কোনও পরিবর্তন হবে না। সবাই যাতে সঞ্চয়পত্র কিনতে না পারে এবং যাতে প্রকৃত চাহিদাসম্পন্ন মানুষেরাই এই সুবিধা পান, রাষ্ট্রকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।
 
 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

ইভ্যালি: গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

ইভ্যালি: গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

ঘুষ খেলে নামাজ হবে না, নাকি চাকরি থাকবে না?

ঘুষ খেলে নামাজ হবে না, নাকি চাকরি থাকবে না?

সাংবাদিকদের এত ভয় কেন?

সাংবাদিকদের এত ভয় কেন?

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে পরিবারেই বুলিং বেশি

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে পরিবারেই বুলিং বেশি

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

হাসপাতালে গৃহবধূর লাশ ফেলে স্বামীর পরিবার উধাও

হাসপাতালে গৃহবধূর লাশ ফেলে স্বামীর পরিবার উধাও

প্রধানমন্ত্রীর ৭৫তম জন্মদিনে ৭৫ লাখ টিকা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু 

প্রধানমন্ত্রীর ৭৫তম জন্মদিনে ৭৫ লাখ টিকা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু 

রানীই সবচেয়ে ছোট গরু

রানীই সবচেয়ে ছোট গরু

যেসব কারণে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নেতা

যেসব কারণে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নেতা

এবার চট্টগ্রামে ড্রেনে পড়ে কলেজছাত্রী নিখোঁজ

এবার চট্টগ্রামে ড্রেনে পড়ে কলেজছাত্রী নিখোঁজ

শৃঙ্খলা ছাড়া কোনও জাতি বড় হতে পারে না: বঙ্গবন্ধু

শৃঙ্খলা ছাড়া কোনও জাতি বড় হতে পারে না: বঙ্গবন্ধু

এইচএসসি পাসেই চাকরি, বেতন ২২ হাজার ৫০০ টাকা

এইচএসসি পাসেই চাকরি, বেতন ২২ হাজার ৫০০ টাকা

সেই চালককে মোটরসাইকেল উপহার দিতে চায় শামসুল হক ফাউন্ডেশন

সেই চালককে মোটরসাইকেল উপহার দিতে চায় শামসুল হক ফাউন্ডেশন

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ: জয়

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ: জয়

কন্যা দিবস আর কন্যাশিশু দিবসের বিভ্রান্তি

কন্যা দিবস আর কন্যাশিশু দিবসের বিভ্রান্তি

ভবন থেকে ইট পড়ে পথচারীর মৃত্যু

ভবন থেকে ইট পড়ে পথচারীর মৃত্যু

বারডেমের কেবিনে ঝুলছিলো রোগীর মরদেহ

বারডেমের কেবিনে ঝুলছিলো রোগীর মরদেহ

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune