X
শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

আপডেট : ২৩ জুলাই ২০২১, ০৯:০০

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (২৩ জুলাই, ১৮৯৮-সেপ্টেম্বর ১৪, ১৯৭১) বিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট বাঙালি কথাসাহিত্যিক। তার সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি গল্পগ্রন্থ, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধের বই, ৪টি আত্মজীবনী, ২টি ভ্রমণ কাহিনী, ১টি কাব্যগ্রন্থ এবং ১টি প্রহসন। তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার, সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, জ্ঞানপীঠ পুরস্কার, পদ্মশ্রী এবং পদ্মভূষণ পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন।

 

যা খুব ছোট, তাকে খুব কাছ থেকে না দেখলে ভালো করে চেনা যায় না। দূর থেকে তা অস্পষ্ট দেখায়। কিন্তু যা খুব বড়, একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে তাকে না দেখলে, তার ব্যাপ্তিটা অধরা থেকে যায়। প্রথম হিমালয় দর্শনে ঠিক এই রকমই একটা সম্ভ্রম জাগানো অনুভূতি হয় যেকোনো মানুষের। কিন্তু আস্বাদন পরিপূর্ণ হয়, শুধু দূর থেকে নয়, যখন কাছে গিয়েও তাকে দেখি।
কিন্তু আমার তারাশঙ্করের দর্শন ঘটেছিল এর ঠিক বিপরীত ক্রমে। তাঁকে প্রথমে দেখেছিলাম খুব কাছ থেকে, পরম স্নেহের নৈকট্যে। সে প্রথম যে ঠিক কবে তা আজ আর বলতে পারি না—তবে স্মৃতির ভেতরে প্রথম যে ছবিটি দেখি তা সম্ভবত ১৯৪৮ এর, এবং স্থান কলকাতারই বাগবাজারের ১/১ আনন্দ চ্যাটার্জি লেনের একটি বাড়ির দোতলার ঘরে। একটি সাবেকী আমলের খাটের ওপর চড়ে আমরা তিনটি শিশু খেলছি, লাফাচ্ছি, কখনো বা নাচছি—আর অদূরেই কৃষ্ণবর্ণ ধ্যানমগ্ন এক প্রৌঢ় ছোট্ট একটি কাঠের ডেস্কের ওপর গভীর নিবিষ্ট হয়ে লিখে চলেছেন পাতার পর পাতা। মুক্তোর মতো অক্ষরে একে একে ফুটে উঠছে বাংলা কথাসাহিত্যের উজ্জ্বলতম রত্নখনি। তবু সে সান্নিধ্য এত সহজ ছিল বলেই হয়তো আজও সমানভাবে স্পষ্ট। তিনি লিখছেন আর আমরা—তাঁর নাতিনাতনিরা খেলছি। খেলা যখন ছিল তোমার সনে/তখন কে তুমি তা কে জানতো? জানতে পারিনি ঐ নৈকট্যের জন্যই হয়তো-বা। ফলে আমাদের খেলাটা ছিল অবাধ। কখনো ঘরে কখনো ঘর ছাড়িয়ে বারান্দায়—সরু লম্বা বারান্দার ওপাশে আরেকটা বারান্দায় কখনো কখনো দেখা দিতেন লং ক্লথের পাঞ্জাবি পরা, সাদা চুল এক বৃদ্ধ। দাদুর যামিনী দা—শিল্পী যামিনী রায়। মাঝে মাঝে দুই জ্যোতিষ্কের বার্তাবিনিময় হতো এপার ওপার।
ইতিমধ্যে দাদুর সাহিত্যিক খ্যাতি বাড়ছিল। বাড়ি তৈরির কাজও চলছিল। ১৯৪৯ এ বাগবাজার ছেড়ে তিনি উঠে গেলেন টানাপার্কে তাঁর নিজস্ব বাড়িতে। তার কিছুকাল পরেই আমরাও চলে এলাম পাইকপাড়ায় গোয়েল্কা গার্ডেন্স-এর একটি আশ্চর্য সুন্দর ফুটফুটে ফ্ল্যাটে। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। খুব কাছেই দাদুর বাড়ি। রোজ বিকেলে খেলতে যেতাম ওবাড়ির পাশের মাঠে। বাড়ির সামনেই বোগেনভেলিয়ার ছায়অর নিচে দুপাশে রোয়াক, মাঝে বেতের চেয়ার পাতা। দাদু বসে আছেন। তাঁকে ঘিরে আরো কতজন। কথা হতো কত বিষয়ে। মাঝে মাঝেই শৈল দাদু এসে উপস্থিত হতেন। সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। দাদুর বাড়ির ঠিক বিপরীতে আর্মড পুলিশের ক্যাম্প। তার ওপাশে ইন্দ্রবিশ্বাস রোডের ওপর বাড়ি করেছিলেন শৈল দাদু। প্রতিদিন সকালে বন্ধু সন্দর্শনে তাঁর আসাটা ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। দাদুও যেতেন।
কিন্তু সে অনেক পরের ঘটনা। ১৯৬০-৬১ নাগাদ তখনো সজনীকান্ত দাস বেঁচে। শনিবারের চিঠি প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত রমরমিয়ে। শৈলজানন্দের বাড়ি থেকে পূবদিকে আরেকটু এগোলেই সজনীকান্তের বাড়ি। নিচে বিশাল অফিস, প্রেস আর সেখানেই বাংলার তাবড় তাবড় সাহিত্যিকদের আড্ডা। সে আড্ডায় তারাশঙ্করকে, শুনেছি বড়বাবু বলেই চিহ্নিত করা হতো।
দেখতে দেখতে আমাদের টালা-পাইকপাড়া অঞ্চলটা একসময় সাহিত্যিকদের তীর্থস্থান হয়ে উঠল। মন্মথ দত্ত রোডের একটি ফ্ল্যাটে কাজী নজরুল ইসলাম; কিন্তু তাঁর চৈতন্য তখন মহামগ্ন। আরেকটু এগিয়ে সাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্র। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীও এলেন কিছুকাল পরে, শৈলজানন্দের বাড়ির একতলায়। পাইকপাড়ায় আমাদের বাড়িরই কাছে হাউসিং স্টেটে থাকতেন গৌরকিশোর ঘোষ।
চাঁদের শোভা থাকে, সূর্যের রামধনু। বিদ্রোহী কবি তখন ফুলের জলসায় নীরব। তাঁকে বাদ দিলে, বাকিরা ছিলেন তারাশঙ্করের...। তাঁর সভার নিত্য অতিথি।
কিন্তু আরো দুজন ছিলেন, তাঁরা শুধু তাঁর... ছিলেন না, তাঁর ভাবের অংশীদারও ছিলেন। একজন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র, আমার বড়মামা সনৎকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরেকজন আমার বাবা, তারাশঙ্করের জ্যেষ্ঠ জামাতা শান্তিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়। শুধু আত্মীয় নয়, এঁরাও ছিলেন তাঁর সভার...।
আরো কতজন, কত গুণীজন, কত কবি সাহিত্যিক শিল্পী যে তাঁর বাড়িতে পদচিহ্ন রেখে গেছেন তার হিসাব দেওয়া অসম্ভব। এসেছেন বনফুল, অচিন্ত্যসেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, প্রবোধ সান্যাল, আশাপূর্ণা দেবী, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শিবরাম চক্রবর্তী—এমনি আরো কত যে গুণীজন। আর এঁদের... আর ফুলের গন্ধে—টালাপার্কের বাড়ি ভরে উঠত প্রতিবছর ৮ই শ্রাবণ—তারাশঙ্করের জন্মদিন। বাড়িতে মানুষ ধরত না। তাই ম্যারান বেঁধে—সে এক বিপুল আয়োজন। ফুলের গন্ধের সঙ্গে যোগ দিত খাবারের মন মাতানো গন্ধ।
বছরে দুটি দিনের জন্য আমাদের ছিল একমাত্র প্রতীক্ষা দুর্গা পুজো আর আটই শ্রাবণ। আমাদের মধ্যে আবার আমার দিদি, শকুন্তলার প্রতীক্ষা ছিল সবচাইতে ব্যাকুল। কারণ, কি সৌভাগ্য ওরও জন্মদিন ঠিক ওই ৮ই শ্রাবণ। একে বড় নাতনি, তার জন্মদিনের ঐ একসূত্রতা। দাদুর কাছে ওর ছিল একটু বিশেষ সমাদর। ওকে নিয়ে কবিতাও লিখেছিলেন তিনি—
তুমি যখন হবে পঞ্চদশী
আমি হব ষাট বছরের বুড়ো
তুমি খাবে কড়মড়িয়ে মেঠাই
আমি খাব চেটে চেটে ঝুরো।

দাদুর বয়স যখন পঁয়তাল্লিশ, তখন দিদির জন্ম। অতএব দাদুর যখন ষাট, দিদি তখন পঞ্চদশী। টীকা আরো একটু হয়তো অপ্রায়োগিক হবে না। বীরভূমে মিঠাইকে বলে মেঠাই, মেটাই, কিংবা আরো সঠিকভাবে বললে ‘মিটিই’। মনে হতে পারে মিঠাই কি তবে কড়মড়িয়ে খাওয়া যাবে? আসল কথা হলো, মেঠাই মানে বীরভূমে সন্দেশ নয়—গুড় আর বেসনের লম্বা লম্বা কাঠিভাজা, ওখানে বলে সিড়িভাজা—তার নাড়ু—বেশ শক্ত, কড়া পাকেঢ়। কড়মড়িয়েই খেতে হয়। প্রতিবছর পুজোর সময় ঘরে ঘরে এইসব মেঠাই, নারকেল খণ্ড, খই বিনু—এমনি আরো কত কি তৈরি হতো। আর ঝুরো হলো শুকনো বালিগুড়। এও বীরভূমেরই শব্দ।
সে তো আসবেই। তারাশঙ্করের কবিতায় বীরভূম আসবে না, লাভপুর আসবে না—তাই হয়! কোনো না কোনোভাবে আসবেই আসবে। তাঁর শেকড় যে ঐ মাটিতেই। আর জীবনের শেষ মুহূর্তেই তাঁর ভ্রুযোগ ছিন্ন হয়নি। প্রায়ই যেতেন গ্রামের বাড়িতে। তাঁদের যে সাবেক বৈঠকখানা বাড়ি—খড়ের চাল, এপাশ ওপাশ বারান্দা, সামনে বাগান—আর এই বাগানেই তিনি রোয়াক বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন, ভারী সুন্দর একটা গোলঘর বানিয়ে ছিলেন। সামনে নানান ফুলের গাছ। রোয়াকের পাশে চেয়ার পাতা—এখানেই বসতেন বন্ধুবান্ধব পরিচিতজনের সঙ্গে। গল্প হতো। কখনো অন্ত্যজ শ্রেণির বহু মানুষ আসতেন। তাঁর কাছে তাঁরাও ছিল আপনজন। পুজোর সময় সবাইকে কাপড় দিতেন। অর্থ সাহায্য দিতেন সাধ্যমতো।
লাভপুরকে তিনি ভোলেননি। আর লাভপুরও আজও ভোলেনি তাঁকে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৪:৫১

যুক্তরাজ্যের লিডস শহরের সেভেন আর্টস থিয়েটারে উদযাপিত হতে যাচ্ছে কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'বিদ্রোহী' এবং টি এস এলিয়ট রচিত কবিতা 'ওয়েস্টল্যান্ড'র গৌরবময় শতবর্ষ। আগামী ২ অক্টোবর শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে এ অনুষ্ঠান হবে।
ভারতীয় মার্গসঙ্গীত ও দক্ষিণ এশীয় শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীতের শীর্ষ সংস্থা সৌধ সোসাইটি অব পোয়েট্রি অ্যান্ড ইন্ডিয়ান মিউজিকের ব্যবস্থাপনায় এই বিশেষ উদযাপনে মঞ্চায়িত হবে কবি টি এম আহমেদ কায়সার পরিচালিত বিশেষ কাব্য-আলেখ্য দ্য রেবেল অ্যান্ড দ্য ওয়েস্টল্যান্ড। এতে এলিয়টের চরিত্র রূপায়ন করছেন কবি ও নাট্যকার জন ফার্নডন এবং নজরুলের চরিত্রে থাকছেন আবৃত্তিকার মানস চৌধুরী। এলিয়টের সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী অধ্যাপক শিব কে কুমারের চরিত্রে অভিনয় করবেন শান্তনু গোস্বামী। মূল কবিতা দুটির নাটকীয় পাঠ ও অভিনয়ে থাকছেন কবি বেকি চেরিম্যান, কবি এরিক শিলান্ডার, কবি মাইলস সল্টার, শ্রী গাঙ্গুলি, কানিজ ফাতেমা চৌধুরী, এহসান আহমাদ রাজ, মোহাম্মদ সাদিফ, মিলি বসু, অভ্র ভৌমিক প্রমুখ। সঙ্গীত ব্যবস্থাপনায় থাকছেন প্রীতম সাহা। আলোক প্রক্ষেপণ ও ব্যবস্থাপনায় পাবলো খালেদ।
এই কবিতা দুটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত এবং বিশ্ব-কবিতায় এর প্রভাব নিয়ে বক্তব্য রাখবেন লিডস ট্রিনিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক কবি ওজ হার্ডউইক।
বাংলা ও ইংরেজি দুই সমৃদ্ধ কাব্য-ঐতিহ্যের প্রখ্যাত দুই কবিতার শতবর্ষ উদযাপনে দ্য রেবেল এবং দ্য ওয়েস্টল্যান্ড মঞ্চায়িত হবে ১৪ মার্চ লন্ডনের রিচমিপ থিয়েটারে এবং পরবর্তীতে ম্যানচেস্টার মিউজিয়াম, হাউজ অব কমন্স, ব্রিটিশ লাইব্রেরিসহ ব্রিটেনের বিভিন্ন শিল্পমঞ্চে, কয়েকটি শহরে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫:০৭

কিশোর বয়স থেকে রাজনীতি করেছেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৮৭-এর পর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক-শোষকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে সকল ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত রেখেছে, তা তিনি নিজের জীবনেই অনুভব করেছেন। ক্ষমতায় যাবেন কি না তা নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা না থাকলেও দেশের মানুষের জন্য কোন কোন কাজ করা দরকার সেই ভাবনা সব দক্ষ রাজনীতিবিদেরই থাকে। বঙ্গবন্ধুর আরো বেশি ছিল। কারণ তিনি নিজে ছিলেন স্বাপ্নিক এবং স্বপ্নদ্রষ্টা। বিরোধী রাজনীতি করার সময় দেশের অর্থনীতি কীভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত তা যেমন ভাবতেন, তেমনই ভাবতেন জনগণের স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য কোন পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হওয়া উচিত। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কর্মসংস্থান—সবকিছু নিয়েই গভীরভাবে ভাবতেন। জানতেন ঔপনিবেশিক আমলের নীতি এবং অবকাঠামো দিয়ে জনগণের জীবনের মূল চাহিদাগুলো পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই ক্ষমতায় গেলে কী করবেন, সে বিষয়ে প্রায় পূর্ণাঙ্গ ধারণা ছিল তাঁর। ছিল হয়তো লিখিত পরিকল্পনার ছকও। তাই তো দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের শেষে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ দেশের মাটিতে পা দিয়েই তিনি কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এবং প্রথমেই হাত দিয়েছেন দেশের মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করার ক্ষেত্রেগুলিতে। স্বাস্থ্য তেমনই একটি মৌলিক প্রয়োজন এবং অধিকার। সীমিত সংখ্যক সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবাকে বন্দি না রেখে দেশের সাত কোটি জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নির্মিত হয়েছে তাঁর হাত ধরে। 
          এই বইয়ের লেখক অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক পাঠকদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দেশে ফেরার ২১ দিনের মাথায় বঙ্গবন্ধু গঠন করলেন পরিকল্পনা কমিশন। হাত দিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজে।
          কেমন ছিল সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য-অবকাঠামো? লেখক হারিসুল হকের বই থেকে জানা যাচ্ছে, সারা দেশে সাত কোটি মানুষের জন্য হাসপাতালে শয্যা ছিল মাত্র ১২৩১১টি। দেশে ডাক্তারের সংখ্যা মাত্র ৭০০ জন। তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন ৭০ জন। বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ২৫৯ জন। তাদের সবার অবস্থান ছিল রাজধানী ঢাকাতে এবং মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলিতে। তার মানে, ঢাকার বাইরে কোনো রোগীর বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সেবা পাওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না।
          চিকিৎসাব্যবস্থা মানে কেবল ডাক্তার নয়। নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ান, ওয়ার্ড বয়, প্যারামেডিক, অ্যাম্বুলেন্সচালক, হেলথ ভিজিটর, সেনিটারি ইন্সপেক্টর, ফার্মাসিস্টসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যসেবাদানকারীদের নিয়ে গড়ে ওঠে একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা। সেইসব টেকনিক্যাল মানুষের সংখ্যাও ছিল নিতান্তই অপ্রতুল। সারা দেশে নার্স ছিলেন ৭০০ জন, মিডওয়াইভস ছিলেন ২৫০ জন, স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা ২৫০ জন। কমপাউন্ডার ছিলেন ১০০০ জনেরও কম। সারাদেশে নামমাত্র রুরাল হেলথ সেন্টার ছিল ১৫০টি। নামমাত্র বলা হচ্ছে এইজন্য যে সেগুলোতে কোনো ডাক্তার তো দূরের কথা, প্যারামেডিকেরও পদায়ন ছিল না।  এই সংখ্যাগুলোই বলে দেয় এই দেশের মানুষের জন্য কার্যত কোনো স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ইচ্ছাই ছিল না পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর। তাদের জীবন পুরোটাই ছিল নিয়তির ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় হাতুড়ে, কবিরাজ, হেকিমদের ওপর নির্ভর করতে হতো সর্বাংশে।
          এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা করলেন বঙ্গবন্ধু। রাতারাতি তো একটা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত করা সম্ভব নয়। তাই কিছু ছিল আশু লক্ষ্য, কিছু মধ্যম মেয়াদী, এবং কিছু সুদূরপ্রসারী। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কিউরেটিভ এবং প্রিভেনটিভ চিকিৎসাকে সমন্বিত করা হয়েছিল। বিশুদ্ধ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, এনভায়রনমেন্টাল হেলথ, গর্ভবতী মা ও প্রসূতি পরিচর্যা, জনগণকে স্বাস্থ্যশিক্ষা দেওয়া, বিভিন্ন রোগের টিকা ছিল প্রিভেনটিভ চিকিৎসার অন্তর্গত। এছাড়া যেহেতু স্বাস্থ্যখাত অনেককিছুর সাথে সমন্বিত একটি বিষয়, তাই স্বাস্থ্যের সাথে পরিবার পরিকল্পনা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে একীভূত করা হয়েছিল।
          স্বাস্থ্যখাতে জরুরি ভিত্তিতে কিছু ক্রাশ প্রোগ্রাম নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭২ সালে ৪৫০ জন ছাত্রীকে রির্বাচন করে দ্রুত নার্সিং ট্রেনিং সেন্টারে পাঠানো হলো। একটিমাত্র নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিউট ছিল ঢাকাতে। জরুরি ভিত্তিতে রাজশাহীতে খোলা হলো আরেকটি ট্রেনিং সেন্টার। ডাক্তার-সংখ্যা তো রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। একজন ছাত্রের এমবিবিএস কোর্স সম্পন্ন করার জন্য ছয় বৎসর সময় লাগে। তাই অন্তত জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য কিউবার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে একবছর মেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে প্যারামেডিক তৈরির ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
          বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিকল্পনা কমিশন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এমনভাবে পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছিল, যাতে করে দেশের যেকোনো অঞ্চলের প্রতিটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কের আওতায় আসতে পারে। বেসিক হেলথ ওয়ার্কার বা মৌলিক স্বাস্থ্যকর্মী নামে একটি পদ সৃষ্টি করা হয়। এরাই জনগণের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত স্বাস্থ্যসেবক। লেখক তার বইতে তুলে ধরেছেন মৌলিক স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের বিবরণ—‘৪০০ মানুষের স্বাস্থ্যের দেখভালের দায়িত্বে থাকবেন একজন মৌলিক স্বাস্থ্যকর্মী। তাঁরা সিডিউল অনুযায়ী মাসে অন্তত একবার প্রতিটি বাড়ি পরিদর্শন করবেন। পরিদর্শনকালে তাঁরা টিকাদান কর্মসূচি (গুটি বসন্ত, কলেরা, টাইফয়েড এবং যক্ষ্মা)-তে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করবেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যশিক্ষা (সঠিক পয়ঃনিষ্কাশন, পানীয় জল বিশুদ্ধকরণ, পরিবার পরিকল্পনা) সম্বন্ধে জনগণকে অবহিত করবেন, তাঁরা ম্যালেরিয়া শনাক্ত করার জন্য রোগীদের রক্ত ও সম্ভাব্য যক্ষ্মা আক্রান্তদের কফের নমুনা সংগ্রহ করে রুরাল হেলথ সেন্টারের ল্যাবরেটরিতে জমা দেবেন। তাঁরা ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা ও কুষ্ঠরোগীদের ঔষধ রোগীদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবেন। তাঁরা ম্যালেরিয়া নির্মূল অভিযানে সম্পৃক্ত থাকবেন এবং মহামারিকালে সরকার গৃহীত বিবিধ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হবেন। তাঁরা পারিবারিক স্বাস্থ্যকার্ড ও পরিবার পরিকল্পনা গ্রহীতাদের কার্ড যথাযথভাবে পূরণ এবং সংরক্ষণ করবেন—পরবর্তীকালে সেখান থেকে পরিসংখ্যানের জন্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা যাবে।’ [পৃষ্ঠা ৩৬]
          এই ধরনের পরিকল্পনাকে বলা যায় গণমুখী স্বাস্থ্য পরিকল্পনা। শিক্ষার মতো স্বাস্থ্যও কারো সুযোগ নয়, বরং অধিকার। এই ধারণাতেই বিশ্বাসী এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেজন্য স্বাস্থ্যখাতে যেসব পরিকল্পনা তিনি গ্রহণ করেছিলেন সেগুলির বর্ণনা পাওয়া যাবে ডা. হারিসুল হকের লেখা এই গ্রন্থে।
          বঙ্গবন্ধু সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন। কারণ, তাঁর বিশ্বাস ছিল একমাত্র সমাজতন্ত্রেই সকল মানুষের মুক্তি সম্ভব। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, অশিক্ষা থেকে মুক্তি, স্বাস্থ্যহীনতা থেকে মুক্তি। সেই লক্ষ্যেই এই ধরনের স্বাস্থ্য পরিকল্পনা। সমাজতন্ত্র গড়ে না উঠলেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অন্তত একটি কল্যাণরাষ্ট্র পেতে যাচ্ছিল বাংলাদেশের মানুষ। 
          এখন পৃথিবীতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য ভাবনায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। ঔষধ, রোগনির্ণয়, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, জটিল স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত হয়েছে অনেক নতুন নতুন আবিষ্কার। সেগুলি বয়ে এনেছে মানুষের রোগমুক্তি এবং দীর্ঘ জীবনের আশ্বাস। কিন্তু মুক্তবাজার পুঁজিবাদ এখন কেবল ধনীদের জন্যই নিশ্চিত করেছে উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী এখন আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। বিশাল বিশাল সরকারি স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। তবু সেখানে চিকিৎসা পায় দেশের মাত্র শতকরা ৩০ ভাগ মানুষ। বাকি ৭০ ভাগ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা কিনতে হয় বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, নার্সিং হোম থেকে। মুক্তবাজার পুঁজিবাদের নিয়ম অনুসারে স্বাস্থ্যখাতে গড়ে উঠেছে প্রতিযোগিতা। তবে সেই প্রতিযোগিতা রোগীদের জন্য সহায়ক হয়নি। হয়েছে উদ্যোক্তা এবং দালাল শ্রেণির জন্য। টাকার অঙ্কে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বরাদ্দ বেড়েছে। তবে অন্যখাতের তুলনায় বেদনাদায়করূপে কম। বঙ্গবন্ধুর সময়ে যেখানে বাজেটের প্রায় ৫% বরাদ্দ ছিল স্বাস্থ্যখাতে, এখন সেখানে বরাদ্দ ২%-এরও কম। বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনায় সরকারকে জনগণের স্বাস্থ্য প্রতিদিন বেশি বেশি করে ছেড়ে দিতে হচ্ছে বেসরকারি খাতে। এই প্রবণতা বঙ্গবন্ধুর চিন্তা এবং আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক।
          আমরা কৃতজ্ঞ ডা. হারিসুল হকের কাছে এমন একটি গ্রন্থ প্রণয়নের জন্য। তার এই গ্রন্থের মাধ্যমে আমরা অন্তত এটুকু বুঝতে পারছি যে স্বাস্থ্যখাতে আমাদের কোনদিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, আর এখন আমরা হাঁটছি তাঁর নির্দেশিত পথের বিপরীত দিকে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের একমাত্র উপায় হচ্ছে বর্তমানের ভুলযাত্রা থেকে বিরত হয়ে তাঁর আদর্শের পথকে অনুসরণ করা।

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা। অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক। প্রকাশক : কবিতাসংক্রান্তি, ঢাকা। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। পৃষ্ঠা : ৮৮। মূল্য :  ৩০০ টাকা।

 

/জেডএস/

সম্পর্কিত

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:৩৯

অন্নজল

গনগনে রোদ ঠেলে এসে ফকির দাস বটের নিচে বসে।
ঘষা চশমার সামনে হলুদ প্রজাপতি নাচে দাঁতরাঙা ফুলে। 
মাঠে পাকা ধান। পাখি ওড়ে হরেক কিসিম।
ফকির দেখে আর ভাবে, আহা কী রঙ কী রঙ! 
এ বছর ভালো ভিখ মিলবে গো!
বলেই জিভ কাটে, কিরে দেয়, চোখ বুঁজে আকাশে তাকায় জোড় হাতে, মোনাজাতে।
কী যে ভেবে ফেলল সে; এসব ভাবতে নেই!
ভাবলেই মেঘ জমে, ধানের দাম পড়ে যায়, দেনদারি হয় চাষি, দেশে ওঠে রোগের বালাই।

সেও তো চাষিই ছিল একদিন।
এইসব ভেবেটেবে চুপচাপ ঝোলা থেকে ছেঁড়া পুঁটলিটা বের করে আনে।
খুলে ফেলে বিচিকলা দুটো সরিয়ে রাখে, থাক।
কাল খাওয়া যাবে। আজ সে নুন ঘষে নেবে রুটির কানায়।
হরি হে, দিন দিয়ো, দেখো তুমি খোদা। এই বলে সে মুখে অন্ন দেয়। 
অন্নই তো হরি। অন্নই তো মালিক গো! সে দিন না দিলে কেমনে চলবে তার?
খাওয়া দেখে বটের তলায় সাঁৎ সাঁৎ করে শালিক নামে দুটো।
ওটা শালিক না রোদ? ফকির ঘষা কাচে ঠাওর পায় না। 
রুটি চিবোয় আর ভাবে, ভেবে যায়।
আজ ধুনিপাড়ায় কার বাড়ি যেন ভোজ আছে না? 
বিকেলে যেতে হবে। সেও তো দেশেরই লোক, দুটো এঁটোকাঁটা পাবে না কি আর?
ধুলোর ঘূর্ণি কুটো নিয়ে ঘোরে। ঘুরতে ঘুরতে উপরে উঠে যায়।
ফকির গামছা পাতে। একটু জিরোতে তো হবে। কত যে রাস্তা বাকি!


ফড়িং

একটা ফড়িং জলের ওপর মুখ দেখবে বলে থমকে দাঁড়ালো।
কী দেখতে চাইল সে? কতটা ব্যথার ভারে স্থির হয়ে থাকে জীবনের মুখ? 
অথবা ফেলে আসা উড়ানের পথ
স্মৃতির পরম জলে দাগ রেখে গেছে কিনা এইসব?
ঘরে এখন অন্ধকার, বিদ্যুৎ নেই
ঝড়ের সময়ে ভাঙা জানালাটা খোলা যাবে না।
অথচ এই অন্ধকারেই তো দেখা যায় সব–
পুকুরের জল, থমকে দাঁড়ানো ফড়িং, 
স্মৃতির শালুকপাতায় টলমল ব্যথার মিনার।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

পৃথিবী

পৃথিবী

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৪:৫৭

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

ছোটরা বড়দের কাজ করলে
আর বড়রাও ছোটদের ভূমিকায় থাকলে
বিষয়টা মজার।

বেটিদের পোশাক বেটা পরলে
আর পুরুষদের ড্রেস নারী পরলে হাস্যকর।

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে এবং রাতে সূর্য উঠবে।


তিনটি মেয়ের জামা-কাপড়

তিনটি মেয়ে ঝর্নাজলে
মনের পাখা মেলছে,
নগ্নস্নানে কী আনন্দে
জলের সাথে খেলছে।

বনপরিদের ভাগ্নি যেন
জলপরিদের কন্যা,
ঝর্না জলে জল সাঁতারে
ছড়ায় সুখের বন্যা।

হঠাৎ একটি হেলিকপ্টার
ভটভট করে এলো,
মেয়ে তিনটির স্বাধীনতা
করল এলোমেলো।

হেলিকপ্টার গুলি ছোড়ে
হারায় তারা দিশে,
একটি মেয়ে গুলিবিদ্ধ
রক্তজলে মিশে।

বাকি দুজন বন্দি হলো
সেই শিকারির খাঁচায়,
তিনটি মেয়ের জামা-কাপড়
পড়ে থাকে মাচায়।


পরাজয়

আজ কানাডায় নির্বাচন।
কোথাও ‘আমার ভাই/ তোমার ভাই, আমার নেতা/ তোমার নেতা…’নেই
কোথাও স্লোগান, মিটিং, মিছিল, পোস্টার নেই,
মাইকিং নেই।
কিন্তু শরৎ-হেমন্তের সন্ধিক্ষণে
কোথায় যেন কি হচ্ছে!

আজ কানাডার নির্বাচন।
আজ আমি খুব নীরবে হেরে গেলাম তোমার কাছে!


দেশ বিভাগের গান

আমি তুমি যুক্তাক্ষর
একই সাথে মুক্তাক্ষর।

আমরা থাকি ভালোবাসার বন্ধনে।

আমি তুমি পানি-জল
মা-জননী নির্মল—

মায়ের মুগ্ধ আঁচল থেকে গন্ধ নে!

আমি তুমি এক-দুই
দুই দেশের এক ভূঁই,

নিজ দেশটা পরবাসী, ক্রন্দনে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

পৃথিবী

পৃথিবী

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:০০

আমি সাহিত্যের কোনো মনোযোগী পাঠক নই। পড়াশোনা নিতান্তই কম। আর খাপছাড়া। ভালো লাগা-খারাপ লাগা, সবটাই ব্যক্তিগত। পেছনে কার্যকারণের ধারাবাহিকতার দিকে নজর পড়ে সামান্যই। আর, আজকাল ইচ্ছাটাও মরতে বসেছে। চোখ-কান-মাথা জুড়ে আলসেমির দাপট। বাধা দেই না। স্বেচ্ছায় তাতে গা ভাসাই।
          ক’বছর আগে একটা বই পড়ি। দক্ষিণে সূর্যোদয়। লেখক, রাজু আলাউদ্দিন। আমি চমকে যাই। এই নামটার সঙ্গে সে-ই প্রথম পরিচয়। অথচ পরে জানতে পাই, তিনি অজ্ঞাত কুলশীল নন। কবিতা লেখেন। গদ্যও। কোনোটিই গতানুগতিক নয়। তেমন যে নয়, বইটির পাতায়-পাতায় তার ছাপ। মেক্সিকোয়-দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিশ ভাষার বিশাল সাম্রাজ্যে রবীন্দ্রনাথ যে একসময় আলোড়ন জাগিয়েছিলেন, তাই নিয়ে এই বই। অবশ্য সুতোর টানে খোদ স্পেনে হিমেনেথ দম্পতির ও আরো ক’জনের আগ্রহের ও আত্মস্থ করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আসে। এতদিন আমার জানা ছিল শুধু ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো-কথা। তাও স্প্যানিশ প্রেক্ষাপট মনে করে নয়। রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা ও ব্যক্তিমায়ার তৃপ্তিকর তথ্য হিসেবে। এখানে কিন্তু বিষয়মুখটা ঘুরিয়ে দেওয়া। দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিশ সাহিত্যের সৃষ্টিকুশলময় রবীন্দ্রনাথ কতটা প্রেরণা জুগিয়েছেন, অথবা, প্রতিহত হয়েছেন, সেটি ওই ভাষার সমকালীন সাহিত্যকাণ্ড বা পরবর্তী তর্ক-বিতর্ক থেকে আপন নিরাসক্তি পুরোপুরি বজায় রেখে তিনি সাবলীল দক্ষতায় সর্বাঙ্গীন করে ফুটিয়ে তুলেছেন। এমন বই আমি আগে পড়িনি। পরেও না। কিন্তু আমাদের দেখবার চোখ পুরোপুরি খুলে দেওয়ায় এ যে কী অসাধ্য-সাধন করে, তা ভেবে মনে বিস্ময় জাগে, কৃতজ্ঞ থাকি। তাঁর এই কাজের পেছনে একটা প্রেরণা, প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে, অনুমান, তাঁর জীবনসঙ্গিনী মেক্সিকো-কন্যা, যাঁর মাতৃভাষা স্প্যানিশ, বেড়ে উঠেছেন যিনি ওই আবহেই। সম্ভবত এর একটা পরিণাম, জেনে, অথবা না জেনে, রাজু আলাউদ্দিন এখন বহন করছেন বাংলা ও স্প্যানিশ, উভয় সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্যের স্বাভাবিক উত্তরাধিকার। বাংলায় তাঁর কাজে আলোর মিশ্র প্রকাশ ঘটে। তা আভিনব ও সমৃদ্ধ। আমাদের দৃষ্টি প্রসারিত হয়।
          শুধু এই কথাগুলো বলা আমার লক্ষ্য নয়। আসলে মূল কথায় আসার জন্য বলা যেতে পারে, এ গৌরচন্দ্রিকা। তিন বছর আগে তাঁর কবিতার বই একটি প্রকাশ পেয়েছে। নাম : ‘আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি’—সবই বাংলা কবিতা-ঐতিহ্যে বাগবিধিতে, স্বপ্নকল্পনায়, আত্মস্বরূপে নির্ভুল এই পরিচয়। কিন্তু তার পরেও ফল্গুধারার মতো শৃংখলা, সংযমও পরিমিতিবোধ যেন অন্তঃসলিলা বয়ে যায়, যা কবিকে আলাদা করে চেনায়। মনে হয় বাড়তি কিছু আছে।
          বইটির আর এক বৈশিষ্ট্য, এ দ্বিভাষিক। প্রতিটি কবিতার সঙ্গে তার ইংরেজি অনুবাদ আছে। তবে অনুবাদক আর একজন, নাম, বিনয় বর্মন। শুরুতে ভূমিকাও ইংরেজিতে তাঁর লেখা। অনুষঙ্গে, এই সময়ে বাংলাভাষার অন্যতম সেরা কবি মোহাম্মদ রফিকের সপ্রশংস মূল্যায়ন,—ইংরেজিতেই। যারা বাংলা জানেন না, তাঁরাও ইংরেজি মাধ্যমে কবিতাগুলোর সুর স্বাদ ও মূল্যায়ন একসঙ্গে পাবেন। আজকের বহুভাষিক বাস্তবতায় এর মূল্য কম নয়। এখানে এই বইটি নিয়েই আমার কথা। তবে তা শুরুর আগে আরো একটু আবোলতাবোল বকবক করে নেই। লেখার সবটাই যে তেমন হবে না, ঐ নিশ্চয়তা কিন্তু দিতে পারি না। ‘পড়েছি মোগলের হাতে…’ এই প্রবাদ বাক্যটির সবটা যেন অগত্যা যাঁরা পড়ছেন, তাঁরা অনিচ্ছাতে হলেও হজম করতে রাজি থাকেন। মিনতি আমার এইটুকু।
          আমরা জানি, কবিতার অনুবাদে তার অনেক লাবণ্য, অনেক সৌকর্য হারিয়ে যাবার আশংকা থেকে যায়। বিশেষ করে মূল ভাষা ও অনুবাদের ভাষা যদি দুই পরস্পর বিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক বলয়ে বিকশিত হয়ে থাকে। গীতাঞ্জলি পর্ব থেকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কিছু কবিতা নিজেই ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। কিন্তু এতে তাঁর আত্মবিশ্বাস কখনোই খুব প্রবল ছিল না। শেষে হাল ছেড়ে দেন। যেটুকু অনুবাদ তিনি করেছেন একটু খুঁটিয়ে সেদিকে দৃষ্টি দিলে সহজেই ধরা পড়ে, বাংলায় পেলব বা গভীর অনুভবের দ্যোতনা ইংরেজিতে আসেনি। অনেক জায়গায় আক্ষরিক অনুবাদ কষ্টার্জিত বা কৃত্রিম। কোথাও কোথাও সংক্ষেপিত, ফলে তুলনায় আড়ষ্ট। উপমা-বা রূপকল্পনা হাস্যকরভাবে আবেগরিক্ত, ফলে মরা ডালের মতো নিষ্প্রাণ, অথবা আগাছার মতো শ্রীহীন। তারপরেও যদি তিনি ইংরেজি অনুবাদে নতুন মূল্য সৃষ্টি করে থাকেন, তবে তার কারণ তাঁর অলোকসামান্য প্রতিভা। একই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বিভিন্ন ভাষায় পারস্পরিক অনুবাদ সমস্যা এমন অসেতুসম্ভব হবার কথা নয়। য়োরোপ ও আমেরিকার ভাবনা ও কর্মপ্রবাহ গত প্রায় পাঁচশ বছরের যোগাযোগে বিষয়টি সেই-রকমই দেখায়। এই উপমহাদেশেও তেমনই হওয়া স্বাভাবিক। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশে এই লক্ষণ প্রত্যাশিতভাবে স্পষ্ট। কিন্তু ইংরেজির মাধ্যমে য়োরোপীয় সংযোগে এই ধারা এখন শীর্ণ। যদিও কথ্য সংস্কৃতিতে, সঙ্গীতে আদান-প্রদান আগের মতেই সচল। হয়তো যোগাযোগ আরো ব্যাপক। এখানে চলচ্চিত্রের অবদান কম নয়।
          কিন্তু য়োরোপ-আমেরিকান সাংস্কৃতিক বলয় এতটাই ভিন্ন ছিল যে সেখানে আমাদের পরম্পরার অভিঘাত প্রায় কিছুই কোনো দাগ কাটে না। যদিও উত্তমর্নের ভূমিকা এদেশের ওপরমহলে গ্রহণ-বর্জনে তারা যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। বেশ কিছু নিচু তলাতেও চুঁইয়ে পড়ে। পাশ্চাত্য সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুবাদ ও অনুকরণ আমাদেরও কৌতূহল জাগায়। কিছুটা বা জীবনযাপনের অভ্যাসে মেশে।
          অবস্থার একটা গুণগত পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে গত শতকের আশির দশক থেকে। তার আগে সত্তরের দশকে তথ্য-প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, চাই-বা-না চাই, পৃথিবীজুড়ে মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগে সম্ভাবনার বিচিত্র পথের দিশা চোখের সামনে এঁকে দেয়। নিজেরদের অজানতেই আমরা ঘর-বারের সীমারেখা মুছে ফেলতে থাকি। আপন-আপন ভাষায় প্রয়োগ কুশলতায় ও চিত্রকল্পনাতে এর অলক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করে। ফলে তা সম্পূর্ণ আত্মসচেতন হয়েও বিশ্বের সংযোগে ভিড়ে যায়। অনুবাদের কাজ মূল কাঠামো ও মূল ভাবনার অনুসরণে পূর্ণ বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েও সহজ, সাবলীল ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। কবি বা অনুবাদক কাউকেই এজন্য আগের মতো সাংস্কৃতিক বিভিন্নতার দুর্ভেদ্য প্রাচীরের সামনে আটকে যেতে হয় না। অবশ্য অভিজ্ঞতা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কেউ যদি একুশ শতকে এসেও দেড় হাজার-দুজাহার বছর আগের মূল্যবোধের বোঝা ধ্রুবজ্ঞানে বয়ে বেড়াতে সদম্ভে খাড়া থাকেন, তবে তিনি এই প্রবাহে শামিল হতে পারেন না। পারেন না তাঁরাও, যাঁরা কূপমণ্ডুকতার স্বভাব থেকে বেড়িয়ে আসতে ভয় পান। রাজু আলাউদ্দিন এমন কোনোটিই নন। জীবনস্রোতে তিনি বিশ্বনাগরিক। ঘরের পরিবেশেও তারই অন্তরঙ্গ ছোঁয়া। একান্ত বাঙালি ভাবনাতেও তাঁর মিশে যায় এই সব। এদের পরিশ্রুত প্রবাহ কবিতায় তাঁর ভাষার নির্মাণ। ইংরেজি অনুবাদে তার স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিকতা ও মৌলিক সৌরভ অনেকটাই থেকে যায়। অনুবাদকের পরিচয় কিছুই জানি না। অনুমান, তিনিও একই পথের পথিক। মূল কবিতার আকর্ষণ, অনুভবের সূক্ষ্ম চলাচল, তিনি যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে বজায় রেখেছেন। এখানে অবশ্য তাদের নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি না। যাঁরা সত্যিকারের যোগ্য, তাঁরা তা করবেন।
          সাধারণত কবিতা ও গণিতের অহেতুসম্ভব ব্যবধান প্রসঙ্গে অনেকে বলে থাকেন, গণিতে পাই বিভিন্ন উপাদানের নানা রকম সম্পর্কে একক সমাধানের বা সমাধানরাশির প্রমাণ; আর কবিতা চলে অনুভবের মুক্তাকাশে ইচ্ছেমতো ওড়ার স্বাধীনতায়। এই বিভাজন যথার্থ কি না, এ নিয়ে সংশয় কিন্তু থেকে যায়। কবিতাও খোঁজে বাস্তবের বহুবিধ কল্পনায় অন্বয় ও অন্বয়ের অন্তর্জালে স্থিতি ও অস্থিতির বিন্যাস। প্রত্যক্ষের দৃশ্যাবলি ও কর্মচঞ্চলতা মায়া জাগায়। তাকে পূর্ণপ্রাণের সমারোহে জাগ্রত করে অন্তরালের সম্পর্ক-সম্বন্ধে কান পেতে গন্ধ-বর্ণময় ধ্বনির ঐশ্বর্যে অর্থের বা তাৎপর্যের শিল্পিত অন্বেষণে কবির অভিনিবেশ। গণিতে চলকরাশির মতি-গতি ও স্থিতি বা অস্থিতির সম্পর্কের নিষ্কাশনে যে তৃপ্তি, কবিতাতেও মায়ার আড়ালে রসের খেলায় অশেষের পেছনে ছোটায় সেই অন্তহীন যাত্রার আকর্ষণ। তবে গণিতের উপাদান বস্তুনিরপেক্ষ চিহ্ন বা সংখ্যা, যারা আত্মসাৎ করতে পারে বিশ্ব-মহাবিশ্বের যাবতীয় তাড়নার নিরাসক্তিকে; বিপরীতে কবিতার ভিত্তিভূমি ষড়ৈশ্বর্যশালিনী আসক্তির সমাহার। সেও ছোটে সচ্চিদানন্দ সমাহিতির খোঁজে। এই রকম ছোটার নমুনাই পেলাম রাজু আলাউদ্দিনের কবিতাগুলোয়। স্থান-কালের আড়াল থাকলেও বাণীরূপ তাকে অতিক্রম করতে চায়। বোধ হয় এই কারণেই এরা অধিকতর অনুবেদ্য। প্রকৃতি-পরিবেশের একান্ত সীমায় আটকে থাকে না। এই সীমাই কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে প্রতিহত করেছিল। তিনি অবশ্য আজকের প্রযুক্তিবিপ্লবে মানববাস্তবতায় প্রসারমান সমজাতীয়তা প্রত্যক্ষ করেননি।
          বইটির নাম—‘আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি’—এখানেই ‘ভালোবাসার ওক্সিমোরন’ কবিতাটির এক চরণ থেকে কেটে নেওয়া। ‘ওক্সিমোরন’ তাৎক্ষণিকভাবে শুধু ওই শব্দের ব্যবহারেই বৈপরীত্যে সামঞ্জস্যের ব্যঞ্জনা ইংগিতময় করে তোলে। এভাবে ইশারায় সমগ্রের বিশেষত্ব ফুটিয়ে তোলা, অথবা, তার কোন মেজাজে দৃষ্টি আকর্ষণ করা এই সময়ের কবিতায় নতুন তাৎপর্য আনে। অবশ্য তা প্রাণবান হলে তবেই। রাজু আলাউদ্দিনের এই কবিতাসংকলনে এর দক্ষ প্রয়োগ বারবার আমাদের মুগ্ধতা কেড়ে নেয়। প্রেক্ষাপটে বিবিধ বিচিত্র আলো ফোটে। বহুমুখে ধায়। অনুভবে প্রসারণ ও সংকোচন একই শব্দসীমায় ঘটে চলে। কৃত্রিম মনে হয় না। চেতনার স্বাভাবিকতাতেই এমনটি মানিয়ে যায়। যেমন ‘আকাঙ্ক্ষা’ অসীমের অভিসারী হতে পারে, আবার তাকে বিশেষ কোনো প্রত্যক্ষের অভিমুখীও ভাবা যায়। ‘মানচিত্রে’ সমুদ্র বইয়ের পাতায় কতটুকুই-বা জায়গা নেয়, কিন্তু বাস্তবে তার কূল-কিনারা মেলে না। ‘গোপনে আঁকা, আর, উত্তমপুরুষে বলা মুহূর্তে একে ব্যক্তির অস্তিত্বে, তার সমস্ত বৈপরীত্য ও বিপন্নতা নিয়ে, নির্দিষ্ট করে। আমরা বর্তমানের অনিশ্চিত সম্ভাবনা রাশি স্পর্শ করি। সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা, উভয়ের সামনেই প্রশ্নবোধক চিহ্ন তোলে। কবিতায় কিন্তু ভারসাম্য বজায় থাকে। তারিফ করি। নতুন কিছু পাই। তা আমাদের কল্পনায় মানববাস্তবতাকে এক ইন্দ্রয়গ্রাহ্য সম্প্রসারিত, কিন্তু অন্তর্জগতে সতত পরিবর্তনশীল, প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে। বাংলাভাষার নিজস্ব সংবেদনশীলতা ও ঐতিহ্যলালিত পরিকাঠামো কিন্তু হারিয়ে যায় না। তারা বরং অভিনব অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়। সাহসীও।
          বইটির আরো অনেক কবিতা আমাদের চেতনায় আলোড়ন তোলে। কল্পমায়া ‘নূতন আভরণে’ নূতন রূপ পায়। বিশ্বাস বা অভ্যাসের জগতেও আকস্মিক হানা দিয়ে তাতে অপ্রত্যাশিত জীবনের স্পন্দন জোগায়। ‘ঢাল-তলোয়ার ঝনঝনিয়ে’ বাজে না। লাবণ্য অটুট থাকে কিন্তু পাঠাভ্যাসে ঝাঁকি দেয়। তা কল্যাণকর। সর্বান্তঃকরণে একে স্বাগত জানাই।
          সব কবিতাই কিন্তু এক একটি পূর্ণাঙ্গ সৃষ্টি। মেদহীন, স্বয়ম্প্রভ, মার্জিত ও ব্যাকুল। রজনিগন্ধা ফুলের মতো। কোনো নমুনা খাড়া করতে চাই না। প্রত্যেক কবিতার উপলব্ধি ও উপভোগ, তার সবটা নিয়ে। বিস্ময়ের সংযোজনাও। এদের খণ্ডিত করা সংগত মনে করি না।

মূল নাম : আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি। ইংরেজি নাম : Secretly have i drawn the Map of Desire. English Translation : Binoy Barman. Edited by Khaliquzzaman Elias. Published by Kheya Prokashan. First Published Ekushe Boimela, 2017. Cover : Masuk Helal. Price : 250.

/জেডএস/

সম্পর্কিত

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমার B ও ৯
সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—তিনসাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

সর্বশেষ

আসিয়ানের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করলো যুক্তরাষ্ট্র

আসিয়ানের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করলো যুক্তরাষ্ট্র

সুম্বা দ্বীপের নাচুনে গাছ! (ফটোফিচার)

সুম্বা দ্বীপের নাচুনে গাছ! (ফটোফিচার)

ভোক্তা প্রতারণা বন্ধে কার্যকর উপায় বের করার নির্দেশ রাষ্ট্রপতির

ভোক্তা প্রতারণা বন্ধে কার্যকর উপায় বের করার নির্দেশ রাষ্ট্রপতির

বৈশ্বিক সুদৃঢ় খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর

বৈশ্বিক সুদৃঢ় খাদ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ প্রধানমন্ত্রীর

বিশ্বে ‘ভ্যাকসিন বিভাজন’ দূর করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

বিশ্বে ‘ভ্যাকসিন বিভাজন’ দূর করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

© 2021 Bangla Tribune